জলবায়ু অর্থায়নে প্রতিশ্রুত তহবিল ছাড় করতে উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার ভি২০ দেশগুলোর প্রথম ক্লাইমেট ভালনারেবল ফিন্যান্স সামিটের উদ্বোধনী দিন সভাপতি বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন সরকার প্রধান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে উন্নত দেশগুলোর প্রতি আমরা আহ্বান জানাই। জলবায়ু অর্থায়নের জন্য প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার দিতে যে ঐক্যমত এসেছিল, তা ছাড় করার উপরেও আমরা নির্ভর করছি। একইসঙ্গে ঢাকা-গ্লাসগো ঘোষণা অনুযায়ী, কপ ২৬ ও সিভিএফের একটি যৌথ প্রকল্প নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
জলবায়ুজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় পাঁচটি প্রস্তাবও দেন শেখ হাসিনা। এগুলো হলো,
১. বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে প্রতিটি দেশকে গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে উচ্চাকাঙ্ক্ষি লক্ষ্য আবশ্যিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
২. সিভিএফ-ভি২০ দেশগুলোর সবুজ পুনরুদ্ধারে উন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা উচিৎ। এজন্য মূলধন খরচ কমাতে এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রয়োজন।
৩. তহবিল প্রবাহ হতে হবে অনুমানযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ন, উদ্ভাবনী এবং ক্রমবর্ধমান। উন্নয়ন সহযোগী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল বরাদ্দ ও ছাড়ে একটি সহজ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা উচিৎ। নানান জলবায়ু তহবিলের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকতে হবে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ থেকে রক্ষায় ধনী রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই বর্তমান আর্থিক বৈষম্য কমিয়ে সিভিএফ-ভি২০ রাষ্ট্রগুলোকে সহযোগিতা করতে হবে। সিভিএফ রাষ্ট্রগুলোর জন্য চৌকস বীমা প্রিমিয়াম সাবসিডি প্রবর্তন ও বীমা পণ্যের মূলধনের জন্য আর্থিক সমর্থন প্রয়োজন।
৫. ঝুঁকিতে থাকা সব দেশই ‘মুজিব জলবায়ু সম্মৃদ্ধি পরিকল্পনা’র মতো ‘জলবায়ু সম্মৃদ্ধি পরিকল্পনা নেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে।
জলবায়ু পরিস্থিতি উন্নয়নে উদ্ভাবনী অর্থায়ন সমাধান খুঁজতে সম্মেলনে অংশ নেয়া অর্থমন্ত্রী, উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সারা বিশ্বেই দেখা যাচ্ছে। আমাদের নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখতে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
‘সিভিএফ-ভি২০ভুক্ত ৪৮টি দেশ বৈশ্বিক দূষণের মাত্র ৫ শতাংশের জন্য দায়ী। কিন্তু তারাই এই মানবসৃষ্ট সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। একইসঙ্গে, চলমান কোভিড ১৯ মহামারি মানুষের লাখো মানুষের জীবন এবং জীবিকার ক্ষতির কারণ হয়ে নতুন সংকট তৈরি করেছে। মানব ইতিহাসের এ ক্রান্তিলগ্নে আমাদের অবশ্যই একতাবদ্ধ ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলা করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব সম্প্রদায়কে আমাদের জনগণের ঝুঁকি, আমাদের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা, প্রযুক্তি স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও কোভিড ১৯ মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় অতিরিক্ত তহবিলের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।
‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং উন্নতদেশগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন এবং নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা পালন করা উচিৎ।’
জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নেয়া নানা উদ্যোগ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘২০২০ সালের জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৭। কোভিড ১৯ মহামারি এবং দীর্ঘায়িত বন্যা ও অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পান ২০২০ সালে বাংলাদেশে অনেক প্রাণহানি ও লাখো মানুষের জীবন-জীবিকায় আঘাত করেছে।
‘বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবেলা এবং স্থানীয়ভাবে অভিযোজন ও প্রশমনে বিশ্বে নেতৃস্থানীয়। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন ও সহনশীলতা তৈরিতে প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করছি যা আমাদের জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ। চলমান মহামারির মধ্যে আমার সরকার ১৫ বিলিয়ন ডলারের ২৩টি পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা আমাদের জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশ।’
তিনি বলেন, ‘সারা দেশে সবুজায়নের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকীর বছরে আমরা তিন কোটি গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা করেছি। নিরাপদ, জলবায়ু সহনশীল ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে আমার সরকার বঙ্গবন্ধু ডেলটা পরিকল্পনা ২১০০ তৈরি করেছে।’