বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান

বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান

আফগানিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকা দখলের দাবি করেছে তালেবান। ছবি:এএফপি

আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় এলে সংকটে পড়তে পারে কিছু দেশের স্বার্থ। তালেবানের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা যত বাড়ছে, গোষ্ঠীটির সঙ্গে নানা দরকষাকষি ও বোঝাপড়া করে নিতে চাইছে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো।

তালেবানদের পুনরুত্থান আফগানিস্তানকে আবার বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। পরাশক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি শক্তিশালী দেশকে নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষতে হচ্ছে।

দুই দশক পর আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে দেশটিতে নিজেদের প্রধান বিমান ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছে তারা। এর পরপরই আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের দখল নেয়া শুরু করেছে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী তালেবান।

দেশটিতে তালেবান ক্ষমতায় এলে সংকটে পড়তে পারে কিছু দেশের স্বার্থ। তালেবানের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা যত বাড়ছে, গোষ্ঠীটির সঙ্গে নানা দরকষাকষি ও বোঝাপড়া করে নিতে চাইছে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো।

দুশ্চিন্তায় ভারত

আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশে হারি নদীর ওপর থাকা সালমা ড্যাম ছিল দেশটিতে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এটি নতুন করে তৈরির পর নাম দেয়া হয়েছিল ভারত-আফগানিস্তান মৈত্রী সেতু। ২০১৬ সালে বাঁধটি উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

৬ জুলাই বাঁধটিতে হামলা চালিয়ে ১৬ নিরাপত্তা কর্মীকে হত্যা করেছে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীটি।

এ ঘটনার কয়েক দিন পরেই কান্দাহার শহরের ভারতীয় কনস্যুলেটে কর্মরত কূটনীতিকদের দিল্লিতে ফিরিয়ে আনে ভারত ।

আফগান-ভারত সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ওই বাঁধে হামলার পর তালেবানের উদ্দেশ্য নিয়ে মধ্যে শঙ্কিত দেশটি।

বিশ বছর আগে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে তালেবান ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পর আফগানিস্তানে প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে সবচেয়ে তৎপর হয়েছিল ভারত।

৩১ আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই দেশের ৮৫ শতাংশ এলাকা নিজেদের কবজায় নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান।

জুন মাসে ফাঁস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনা প্রত্যাহারের ছয় মাসের মধ্যে বর্তমান কাবুল সরকারের পতন হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে তালেবানের উত্থান ভারতকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, কেননা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি স্বার্থ ভারতের।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারে গত দুই দশকে প্রায় ৪০০ সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ৩০০ কোটি ডলারেও বেশি বিনিয়োগ করেছে ভারত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক উন্নয়নে ডজন ডজন প্রকল্প ছাড়াও দিলারাম-জারাঞ্জ মহাসড়ক নামে ২১৮ কিমি দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক তৈরি করে দিয়েছে দেশটি। কাবুলে নতুন আফগান পার্লামেন্ট ভবনটিও তৈরি করেছে তারা।

মধ্য এশিয়ার বাজারে ঢোকার জন্য ভারতের জন্য আফগানিস্তানকে দরকার। আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে দুটো পাইপলাইন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।

এছাড়া কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে এবং লাদাখ নিয়ে চীনের সাথে বিপজ্জনক দ্বন্দ্ব রয়েছে ভারতের। এখন তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তান শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হলে ভারতের জন্য সেটি বড়রকমের দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।

কেননা এর আগে আফগানিস্তান থেকে মুজাহিদরা এসে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। তালেবান ক্ষমতায় এলে বা তাদের প্রভাব বাড়লে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

তালেবান ক্ষমতায় আসলে ভারতের এসব স্বার্থ ও সংকটের কী হবে এমন চিন্তায় পড়েছে দেশটি।

তালেবানের উত্থানের সম্ভাবনায় অন্য সব আঞ্চলিক পরাশক্তি গোষ্ঠীটির সঙ্গে নানা দেনদরবারে গেলেও ভারত বিষয়টিকে এড়িয়ে আসছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল বর্তমান আফগান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ও তালেবানের পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা।

বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান

আফগানিস্তানের হেরাতে সালমা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিদর্শনে ২০১৬ সালে দেশটি সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এএফপি

তবে শেষ মুহূর্তে ভারতও তালেবানের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় আসতে চাইছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম।

২১ জুন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে কাতারের রাজধানী দোহায় তালিবানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমটিকে নিশ্চিত করেন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড রেডিয়েশন অফ কনফ্লিক্ট রেজুলেশনে কাতারের বিশেষ দূত মুতলাক বিন মাজেদ আল কাহতানি।

তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ভারত।

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেও মস্কো যাওয়ার পথে ইরানের তেহরানে নামেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি যখন ওইসব দেশের রাজধানীতে যান, তখন সেখানে তালেবান নেতারাও ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, তালেবানের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে সন্দিহান থাকার চেয়ে গোষ্ঠীটির সঙ্গে এবার সরাসরি আলোচনায় যেতে চাইছে ভারত।

২৯ জুন তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পাকিস্তানের সাংবাদিক সামি ইউসুফজাই এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘তালেবান সূত্র নিশ্চিত করেছে তালেবান নেতা মোল্লা বারাদার ও খায়রুল্লাহ শেখ দিলওয়ারের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের। যেখানে তালেবান নেতারা তাকে ভরসা দিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পাকিস্তানের ইচ্ছামতো হবে না।’

চীন-তালেবান সুসম্পর্ক

আফগানিস্তানের প্রধান কয়েকটি শহর দখলের পর বুধবার প্রথমবারের মতো তালেবানের কোনো শীর্ষ নেতা হিসেবে চীন সফর করেছেন দলটির সহপ্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল ঘানি বারাদার।

দেশটির উত্তরাঞ্চলের শহর তিয়ানজিনে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং য়ির সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ঘানি বারাদারের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেন।

এ সময় ওয়াং য়ি বলেন, ‘তালেবান আফগানিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। দেশের শান্তি, সংহতি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াতেও গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রতিবেশী চীনের প্রায় ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ওয়াখান করিডর নামে ওই অঞ্চলটি পড়েছে চীনের উইঘুর মুসলমান অধ্যুষিত শিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে। অভিযোগ রয়েছে, উইঘুরদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে নিপীড়ন চালাচ্ছে চীন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিনজিয়াংয়ের স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম)।

চীনের ভয়, তালেবান ক্ষমতা দখল করলে আরও নির্বিঘ্নে ওয়াখান করিডর ব্যবহার করতে পারবে ইটিআইএম যোদ্ধারা।

বুধবারের বৈঠকের পর তালেবান নেতা মোল্লা বারাদার প্রতিশ্রুতি দেন, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে কাউকে তৎপরতা চালাতে দেবে না তালেবান।

চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদক হু জিজিন এক নিবন্ধে লিখেছেন, তালেবানকে আর সন্ত্রাসী সংগঠন বলে না যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন, তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসলে তাদের সঙ্গে কাজ করবে দেশটি। এমন মুহূর্তে চীন যদি তালেবানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তাহলে সেটি হবে নিজেই কূটনৈতিক ফাঁদে পড়ার মতো ঘটনা।

বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান
বুধবার চীনের তিনজিয়ান শহরে এক বৈঠকের আগে তালেবান নেতা মোল্লা আব্দুল ঘানি বারাদারকে স্বাগত জানাচ্ছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং য়ি। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক র‍্যান্ড করপোরেশনের বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যান ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী আফগানিস্তানে আরেকটি কারণে নিজের অবস্থান সংহত করতে চাইছে চীন। সেটি হলো দেশটির পর্বতাঞ্চলে মাটির নিচে থাকা ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ। চীন এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে চায়।

এছাড়া আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে পাকিস্তানের পেশওয়ার শহর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে চীন। এটি চীন ও পাকিস্তানকে যুক্ত করবে। এর ফলে চীনের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হবে কাবুল।

আফগানিস্তানে এসব সুবিধা পাওয়ার আগে দেশটিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখার বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে চীনকে। আফগান সরকারের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে তালেবানের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা যত জোরালো হচ্ছে, আফগানিস্তানে চীনের জন্য সুখবরও তত বাড়ছে।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব চায়নার অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, ‘আফগানিস্তানে সরাসরি অর্থনৈতিক এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের চেয়ে আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা এখন চীনের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিয়ার উদ্বেগ

তালেবানের ক্ষমতা দখল নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে রাশিয়াও। নব্বইয়ের দশকে তালেবানের প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই এর অনেক সদস্য আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। সেই সূত্রেও রাশিয়ার সঙ্গে এক ধরনের ঐতিহাসিক বিরোধ রয়েছে গোষ্ঠীটির।

১ জুলাই কাবুলের পাশের বাগরামের প্রধান বিমান ঘাঁটি থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। এর তিন দিন পর ৪ জুলাই তালেবানের হামলার ভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে তাজিকিস্তানে চলে যায় আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ১ হাজার সদস্য।

তাজিকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ বাদাখশানের অন্তত ছয়টি প্রধান জেলা দখল করেছে তালেবান।

তাজিকিস্তানের দুশানবেতে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি থাকায় এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন দেশটি নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য ২০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে।

বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান
মস্কোতে রাশিয়ার বিশেষ দূতের সঙ্গে দেখা করার আগে তালেবান নেতারা।

৮ জুলাই মস্কোতে আফগানিস্তানে রাশিয়ার বিশেষ দূত জামির কুবালোভের সঙ্গে দেখা করে তালেবানের একটি প্রতিনিধি দল। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, উত্তর আফগানিস্তানে সংঘাত বাড়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন কুবালোভ। একই সঙ্গে এই সংঘাত যেন আফগানিস্তানের বাইরেও ছড়িয়ে না পড়ে সে বিষয়ে তালেবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৈঠকে তালেবানের প্রতিনিধি দল জানায়, তারা আফগানিস্তানের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সীমান্তকে অস্থির করে হয়ে উঠতে দেবে না। একই সঙ্গে জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট আফগানিস্তানে যাতে ঘাঁটি গাড়তে না পারে রাশিয়াকে সেই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে গোষ্ঠীটি।

পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান

এদিকে ১৩ জুলাই ডেইলি টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেন, তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসলে তাদের সঙ্গে কাজ করবে যুক্তরাজ্য। তবে তালেবান মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত হলে এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হতে পারে বলেও জানান তিনি।

বেন ওয়ালেস বলেন, ‘তালেবান যা চায় সেটি হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জাতি গঠনের জন্য তাদের টাকা ও সহায়তা দরকার। সন্ত্রাসী তকমা থাকলে সেটি তারা করতে পারবে না।’

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শান্তি প্রক্রিয়ায় আপনি সহযোগী না হলে বিচ্ছিন্নতার ভয় রয়েছে। এটি তাদেরকে সেখানেই নিয়ে যাবে, এর আগে তারা (তালেবান) যা ছিল।’

এদিকে আফগানিস্তান থেকে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সব সেনা সেপ্টেম্বরে চলে যাওয়ার ঘোষণার পরও কাবুলের প্রধান বিমানবন্দর পাহারায় নিজেদের কয়েকজন সেনা রেখে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে তুরস্ক। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ তালেবান দেশটিকে সতর্ক করে দিয়েছে।

তুরস্কের এ পরিকল্পনার বিষয়ে তালেবান এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইসলামিক আমিরাত অফ আফগানিস্তান তুরস্কের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাচ্ছে। তুরস্কের কর্মকর্তারা তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় ব্যর্থ হলে এবং আমাদের দেশ দখলের প্রক্রিয়া জারি রাখলে ইসলামিক আমিরাত তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।’

বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান
কাবুলে আফগান শিশুদের চকোলেট দিচ্ছেন তুরস্কের এক সেনা। ছবি: এএফপি

তালেবান আরও জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে পরিণতির দায় তাদের নিতে হবে, যারা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে।

এমন বিবৃতির পর আফগানিস্তানে তালেবানের কর্মকাণ্ডের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে তুরস্ক।

মঙ্গলবার গণমাধ্যমের সামনে দেয়া এক বক্তব্যে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করতে চান বলে জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

বিমানবন্দরে নিজেদের সেনা রাখার বিষয়টি টেনে তিনি বলেন, ‘তালেবান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে, তারা তুরস্কের সঙ্গে একই বিষয় নিয়ে আরও সহজে আলোচনা করতে পারে।’

সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি যাতে তৈরি না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে সম্মত হয়েছে তালেবান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আসলেও নতুন চুক্তিপত্রের কোথাও গোষ্ঠীটিকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। চুক্তিপত্রে শান্তিপূর্ণ সংলাপের ভেতর দিয়ে আফগানিস্তানে যেই সরকার গঠন করুক না কেন, এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করারও অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পুরো ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় ও নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে তালেবান নেতারা।

বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান
আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরের রাস্তায় কয়েকজন তালেবান যোদ্ধা। ছবি: এএফপি

ভারতে দুই দিনের সফরে এসে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন জানান, আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আলোচনার শান্তিপূর্ণ পথেই এগোতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘তালেবান বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছে। চাইছে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হোক, তাদের নেতারা যেন দুনিয়ায় অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারেন।

‘কিন্তু আফগানিস্তানে জোর করে ক্ষমতা দখল করতে গেলে বা নিজেদের লোকদের ওপর অত্যাচার করে সে লক্ষ্য পূরণ হবে না।’

ব্লিংকেন বলেন, ‘এটা ঠিক যে গত সপ্তাহে আমরা বেশ কয়েকটি জেলা সদরে তালেবানের অগ্রযাত্রা দেখেছি। প্রাদেশিক কয়েকটি রাজধানীও তারা কবজা করতে চাইছে। যে সব এলাকা তারা দখল করেছে, সেখানে নির্যাতন চালানোরও খবর আসছে, যেগুলো সত্যিই বিচলিত করার মতো।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলা চালানো জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে তালেবানের সম্পর্কের জেরে আফগানিস্তানে সে সময় সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো।

বিশ্ব পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে তালেবান
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের একটি মসজিদ প্রাঙ্গণ। ছবি:এএফপি

মিত্র বাহিনীর সম্মিলিত অভিযানে ওই বছরই আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে তালেবানকে উৎখাত করা হয়। তালেবান উৎখাত হলেও আফগানিস্তানে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর অবস্থান করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র ন্যাটোভুক্ত দেশের সেনারা। চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বরের আগেই আফগানিস্তান থেকে সব সেনা সরাতে নিজেদের সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এপ্রিলে বাইডেনের ওই ঘোষণার পর ন্যাটোর অন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোও আফগানিস্তান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের কথা বলে এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি থেকে বিদেশি সেনা সরতে শুরু করে।

এর ধারাবাহিকতায় ১ জুলাই বিদেশি সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ বাগরাম বিমানঘাঁটি ছেড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনী। তবে সেপ্টেম্বর নয়, ৩১ আগস্টের মধ্যেই আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সব সেনা প্রত্যাহারের এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

‘মোদিবিরোধিতায় মমতাই যোগ্য মুখ’

‘মোদিবিরোধিতায় মমতাই যোগ্য মুখ’

মোদির বিকল্প মুখ মমতাই, রাহুল নয়- সুদীপ। ছবি: সংগৃহীত

‘মোদির বিকল্প হিসেবে জবরদস্ত, বিশ্বাসযোগ্য মুখ সামনে রেখে প্রচারে যেতে হবে। আর তা হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’

জোটের রাস্তা খোলা রেখে মোদিবিরোধিতায় মমতাই যোগ্য মুখ বলে কংগ্রেসকে খোলাখুলি বার্তা দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা সুদীপের কর্মীসভায় দেয়া একটি বক্তব্যের অংশ ছেপে শুক্রবার তার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে ‘জাগো বাংলা’ মুখপত্রটিতে।

সেখানে সুদীপ বলেছেন, ‘রাহুল গান্ধীকে আমি বহুদিন চিনি। বলতে বাধ্য হচ্ছি, তিনি এখনও নরেন্দ্র মোদির বিকল্প মুখ হয়ে উঠতে পারেননি।

‘আমরা সব বিরোধীদলের সঙ্গে কথা বলেই মমতাকে বিকল্প মুখ হিসেবে সামনে রেখে প্রচারে যাব। তবে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে আমরা কখনই বিকল্প জোটের কথা বলছি না।’

তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘রাহুল সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু পারেননি। বারবার নির্বাচনি ব্যর্থতায় সুযোগ ও সময় নষ্ট করা যাবে না।

‘মোদির বিকল্প হিসেবে জবরদস্ত, বিশ্বাসযোগ্য মুখ সামনে রেখে প্রচারে যেতে হবে। আর তা হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’

তৃণমূলের তরফে মোদিবিরোধী জোটের নেতৃত্ব দেয়ার বার্তা প্রকাশের পরই কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী তার প্রতিক্রিয়া জানান।

তিনি বলেন ‘তৃণমূলের এই বার্তায় সবচেয়ে খুশি হবেন নরেন্দ্র মোদি। কারণ, প্রধানমন্ত্রী চান আঞ্চলিক দলগুলো যেন ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে।’

অধীর আরও বলেন, ‘বিজেপি পাঞ্জাবকে সাহায্য করছে। বাংলায় হয়তো তৃণমূলকে সাহায্য করবে। বিজেপি বলে, রাহুল পারবেন না। একথা তৃণমূল বললে বিজেপির সঙ্গে তাদের পার্থক্য কমবে।’

মোদিবিরোধী জোটের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ‘১৯টি দল সংসদের ভেতরে-বাইরে বিজেপির বিরোধিতা করছে। এ আন্দোলন চলবে। কিন্তু কোনো ফ্রন্ট এখনো তৈরি হয়নি। ভোটের অনেক দেরি। এর মধ্যে অনেক রকম প্রস্তাব আসতে থাকবে।’

শেয়ার করুন

তৃণমূলে যোগ দিলেন বাবুল সুপ্রিয়

তৃণমূলে যোগ দিলেন বাবুল সুপ্রিয়

রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ওব্রেয়ান ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তৃণমূলে যোগ দেন বিজেপি সাংসদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। ছবি: সংগৃহীত

তৃণমূলে যোগ দিয়ে বিজেপি সাংসদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় বলেন, ‘কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর কী ক্ষমতা আপনারা সবাই জানেন। সাত বছর ধরে আমি পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাঙালি হিসেবে কোন কাজ করতে পারিনি। পশ্চিমবঙ্গের জন্য কাজ করার সুযোগ আমার সামনে এসেছে। তৃণমূলে যোগ দিয়ে আমি সেই সুযোগটি নিয়েছি।’

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর শনিবার পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের বিজেপি সাংসদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় তৃণমূলে যোগ দেন।

এদিন রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ওব্রেয়ানের উপস্থিতিতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে তৃণমূলের দলীয় পতাকা হাতে তুলে নেন বাবুল।

তৃণমূলে যোগ দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বাবুল সুপ্রিয় বলেন, ‘কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর কী ক্ষমতা আপনারা সবাই জানেন। সাত বছর ধরে আমি পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাঙালি হিসেবে কোন কাজ করতে পারিনি। পশ্চিমবঙ্গের জন্য কাজ করার সুযোগ আমার সামনে এসেছে। তৃণমূলে যোগ দিয়ে আমি সেই সুযোগটি নিয়েছি।’

এদিন বাবুল বলেন, ‘মমতা দিদি, অভিষেক দায়িত্ব দিচ্ছেন। আমি খুব উৎসাহী। মন থেকে রাজনীতি ছেড়ে ছিলাম। মন থেকে পশ্চিমবঙ্গের কাজ করার সুযোগ গ্রহণ করলাম।’

তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন টুইট করে লেখেন, ‘খেলা হবে’।

সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদি সরকারের মন্ত্রিসভায় রদবদলের সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে বাবুলকে ইস্তফা দিতে বলা হয়েছিল। তিনি ইস্তফা দিয়ে দেন। এরপর তার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে জলঘোলা হয়।

বাবুল রাজনীতি, এমনকি সাংসদ পদ ছেড়ে দেয়ার কথা ফেসবুকে ঘোষণা করেন। সে সময় তিনি বলেন সমাজসেবা করতে কোন দল লাগে না। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে দল না ছাড়ার পরামর্শ দিলে, তিনি বলেছিলেন তার একটাই দল, বিজেপি। মানুষের কথা ভেবে তিনি এখনই সাংসদ পদে ইস্তফা দিচ্ছেন না।

সম্প্রতি ভবানীপুর উপনির্বাচনে বিজেপির তারকা প্রচারকের তালিকায় তার নাম ছিল। যদিও বাবুল প্রচারে অংশ নেবেন না বলে আগেই জানিয়ে ছিলেন।

এদিন মুখ্যমন্ত্রীর প্রচারে অংশ নেবেন কিনা সে প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচারে বাবুলকে লাগে না। তবে দল চাইলে যাবো।’

শুক্রবার বাবুলের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাবুল সুপ্রিয় আচমকা তৃণমূলে যোগ দেয়ায় রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তবে কি অর্পিতা ঘোষের ছেড়ে যাওয়া রাজ্যসভা সাংসদ পদে যাচ্ছেন বাবুল সুপ্রিয়। সূত্রের খবর, বাবুল সাংসদ পদ ছেড়ে দিচ্ছেন।

শেয়ার করুন

আফগানিস্তানে খুলল স্কুল, বাদ মেয়েরা

আফগানিস্তানে খুলল স্কুল, বাদ মেয়েরা

আফগানিস্তানে মেয়ে শিক্ষার্থী ও নারী শিক্ষকদের বাদ দিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেছে তালেবান সরকার। ছবি: সংগৃহীত

দিনটিকে চরম বিষাদময় বললেন কাবুলের ১৬ বছর বয়সী এক ছাত্রী। এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি চিকিৎসক হতে চেয়েছিলাম। আমার এমন স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আমি মনে করি না তালেবান মেয়েদের স্কুলে ফিরতে দেবে। এমনকি যদি তারা উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো খুলেও দেয়, তারা চাইবেনা মেয়েরা শিক্ষিত হোক।’

আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর নারীর অধিকারসহ অন্যান্য নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান জানানোর অঙ্গীকার থেকে ফের সরে এসেছে তালেবান।

এবার দেশটিতে মেয়ে শিক্ষার্থী ও নারী শিক্ষকদের বাদ দিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেছে নতুন ক্ষমতায় বসা কট্টর ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীটি।

শনিবার দেশটিতে শুরু হয়েছে সশরীরে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কর্মসূচি। তালেবান সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী এতে অংশ নিয়েছেন ছেলে শিক্ষার্থী ও পুরুষ শিক্ষকরা।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেয়েদের জন্যে আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হবে শিগগিরই।

এর মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের দশকে তালেবানের প্রথম ক্ষমতায় থাকাকালীন কট্টর নারী বিদ্বেষী মনোভাব ফের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় চাপিয়ে দেয়ার আতঙ্ক পেয়ে বসেছে সাধারণ জনগণের মনে।

মেয়ে শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরা দেশটিতে নারী শিক্ষার ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন।

শনিবারের ওই বিবৃতিতে তালেবান শাসকগোষ্ঠী জানায়, সব পুরুষ শিক্ষক ও ছেলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারবে। তবে ওই বিবৃতিতে মেয়ে শিক্ষার্থী ও নারী শিক্ষকদের উপস্থিত থাকার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়।

দেশটিতে সাধারণত ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ছাত্র-ছাত্রীরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। দেশটির অধিকাংশ বিদ্যালয়গুলোতে সহশিক্ষার সুযোগ নেই।

তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা স্কুল চালুর প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। শিক্ষকদের বিষয়ে আসবে আলাদা ও নতুন নীতিমালা।’

আফগানিস্তানে খুলল স্কুল, বাদ মেয়েরা

তবে মেয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা তালেবানের এমন প্রতিশ্রুতিকে ফাঁকা বুলি বলে শঙ্কা করছেন।

এক কিশোরী বলেন, ‘আমার শিক্ষাজীবন আর ভবিষ্যত নিয়ে ভীষণ শঙ্কিত আমি।’ এই মেয়ে শিক্ষার্থী আইনজীবী হবার সংকল্প রয়েছে।

ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘ তালেবানের অধীন সবকিছু ভীষণ অন্ধকার আচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে নিজেকে প্রতিদিন প্রশ্ন করি, কেনইবা আমি বেঁচে রয়েছি। আমার কি বাড়িতে বসে অপেক্ষা করা উচিত যে কখন কেউ দরজায় টোকা দিয়ে আমাকে বিয়ে করতে বলবে? এটাই কী নারী হওয়ার উদ্দেশ?

এসময় কিশোরীটির বাবা বলেন, ‘আমার মা নিরক্ষর ছিলেন। আমার বাবা এই নিয়ে মাকে হেয় করতেন। তাকে বোকা বলতেন। আমি চাইনি যে আমার মেয়ের জীবনে আমার মায়ের কষ্টের জীবন ফিরে আসুক।

এই দিনটিকে চরম বিষাদময় বললেন কাবুলের ১৬ বছর বয়সী আরেক ছাত্রী।

এই শিক্ষার্থী বিবিসির প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি চিকিৎসক হতে চেয়েছিলাম। আমার এমন স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আমি মনে করি না তালেবান আমাদের স্কুলে ফিরতে দেবে। এমনকি যদি তারা উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো খুলেও দেয়, তারা চাইবেনা মেয়েরা শিক্ষিত হোক।

আফগানিস্তানে খুলল স্কুল, বাদ মেয়েরা

এক আফগান স্কুলছাত্রী জানান, তিনি ভেঙে পড়েছেন। সবকিছু অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

সম্প্রতি নারী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি দিলেও ক্লাসরুমের মাঝে পর্দা ও পোশাকের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিয়ম চাপিয়ে দেয় তালেবান।

মেয়ে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তে না দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাদের উচ্চ শিক্ষার পথ রুখে দেয়া।

২০০১ সালে কট্টরপন্থি তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীরা অনেক এগিয়ে গিয়েছিল। তবে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা দখলের পর আগের রক্ষণশীল মনোভাব থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছিল গোষ্ঠীটি।

তবে তালেবানের বিভিন্ন নির্দেশনা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ধারাবাহিকতা সেসবের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং কট্টরপন্থি গোষ্ঠিটি সেই আগের মতোই রয়ে গেছে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন

মোদির জন্মদিনে টিকায় বিশ্ব রেকর্ড ভারতের

মোদির জন্মদিনে টিকায় বিশ্ব রেকর্ড ভারতের

ভারতে এক দিনে আড়াই কোটি মানুষকে টিকা দেয়া হয়। ছবি: এনডিটিভি

ভারতে শুক্রবার সন্ধ্যায় দুই কোটির বেশি মানুষকে টিকা দেয়ার পর টুইটে অভিনন্দন বার্তা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অফিস। সরকারের ট্র্যাকারে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮০০ বা এক মিনিটে প্রায় ৪৮ হাজার মানুষের টিকা নেয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭১তম জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে রেকর্ড টিকাদানের পরিকল্পনা নিয়েছিল দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার মধ্য দিয়ে।

১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বর্তমান গুজরাটের বড়নগরে জন্ম হয় নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদির। শুক্রবার তার জন্মদিনে ভারতে টিকা দেয়া হয় দুই কোটি ৫০ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ জনকে।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মানসুখ মান্দাবিয়া শুক্রবার রাত ১১টা ৫৮ মিনিটে টুইট করে টিকাদানে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার বিষয়টি জানিয়েছেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকেও একই বিষয় জানান।

তিনি বলেন, ‘আজকের রেকর্ড সংখ্যার জন্য গর্ব বোধ করবেন প্রতিটি ভারতীয়।’

টিকাদান অভিযান সফল করতে নিরলস প্রচেষ্টার জন্য স্বাস্থ্যকর্মী ও সম্মুখসারির কর্মীদের ধন্যবাদ জানান মোদি।

প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আড়াই কোটি টিকা দেয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। এক দিনে সে লক্ষ্যের বেশি মানুষকে টিকা দেয়া হয়।

এর আগে চলতি বছরের জুনে এক দিনে সর্বোচ্চ ২ কোটি ৪৭ লাখ মানুষকে টিকা দিয়েছিল চীন।

ভারতে শুক্রবার সন্ধ্যায় দুই কোটির বেশি মানুষকে টিকা দেয়ার পর টুইটে অভিনন্দন বার্তা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অফিস।

সরকারের ট্র্যাকারে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮০০ বা এক মিনিটে প্রায় ৪৮ হাজার মানুষের টিকা নেয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) প্রধান আর এস শর্মা শুক্রবার সন্ধ্যায় এনডিটিভিকে বলেন, দিনটি ঐতিহাসিক।

ওই সময় তিনি দেশব্যাপী টিকাদানে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশংসা করেন।

সরকারের শীর্ষ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এনকে অরোরা বলেন, কয়েক মাসের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছে।

শেয়ার করুন

কাবুলে বেসামরিক নাগরিক হত্যার কথা স্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের

কাবুলে বেসামরিক নাগরিক হত্যার কথা স্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হয় এক পরিবারের ১০ সদস্য। ছবি: এএফপি

গত ২৯ আগস্টের ওই হামলায় এক ত্রাণকর্মী ও তার পরিবারের অন্য ৯ সদস্য নিহত হয়। নিহত ১০ জনের মধ্যে সাত শিশু রয়েছে। সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স দুই বছর।

আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের আগে দেশটির রাজধানী কাবুলে ড্রোন হামলায় ১০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের তদন্তে উঠে এসেছে, জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংশ্লিষ্ট ভেবে গাড়িতে ড্রোন হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র, যার বলি হয় একটি পরিবারের সদস্যরা।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৯ আগস্টের ওই হামলায় এক ত্রাণকর্মী ও তার পরিবারের অন্য ৯ সদস্য নিহত হয়।

নিহত ১০ জনের মধ্যে সাত শিশু রয়েছে। সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স দুই বছর।

গত ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে দেশটিতে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। পরে ‘অজেয়’ উপত্যকা পাঞ্জশিরও দখলে নেয় সংগঠনটি।

তালেবানের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার পরই কাবুল থেকে সামরিক-বেসামরিক নাগরিকদের প্রত্যাহারে তোড়জোড় শুরু করে বিভিন্ন দেশ। এ পরিস্থিতির মধ্যেই কাবুল বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। সে হামলার কয়েক দিন পর ড্রোন হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

ড্রোন হামলার বিষয়ে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের কর্মকর্তা জেনারেল কেনেথ ম্যাকেঞ্জি বলেন, ত্রাণকর্মীর গাড়িটি আটঘণ্টা ধরে ট্র্যাক করা হচ্ছিল। ধারণা ছিল, গাড়িটি আইএসের স্থানীয় শাখা আইএস-কে সংশ্লিষ্ট।

ম্যাকেঞ্জির মতে, হামলাটি ছিল ‘বেদনাদায়ক ভুল’।

যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত অনুযায়ী, জামাইরি আহমাদি নামের ত্রাণকর্মী

কাবুল বিমানবন্দর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে নিজ বাড়িতে গাড়িতে চড়ার পরপরই হামলা চালানো হয়।

বোমা হামলার পর আরেকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, গাড়িতে বিস্ফোরক ছিল। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলিন্ডার থেকে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ হতে পারে।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা এক অনুবাদকও রয়েছেন, যার নাম আহমদ নাসের।

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন বলেন, ‘আমরা এ পর্যায়ে এসে জানতে পেরেছি, আহমাদির সঙ্গে আইএস-খোরাসানের কোনো যোগসূত্র ছিল না। ওই দিন (হামলার সময়) তার কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অহিংস ছিল এবং সেটি ছিল আমাদের মনে করা আসন্ন হুমকির একেবারে উল্টো।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি ভয়াবহ এ ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সচেষ্ট হব।’

শেয়ার করুন

স্বাভাবিক রূপে ফিরছে পাঞ্জশির

স্বাভাবিক রূপে ফিরছে পাঞ্জশির

পাঞ্জশিরের প্রবেশদ্বার। ছবি: সংগৃহীত

খুলে দেয়া হয়েছে পাঞ্জশিরের রাস্তাগুলো; ফিরে এসেছে টেলিফোন নেটওয়ার্ক। তবে পাঞ্জশিরের বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে তালেবান ও স্থানীয় প্রতিরোধী বাহিনীর লড়াইয়ের মধ্যে সেখানকার বাসিন্দাদের ৯০ শতাংশই ঘর ছেড়ে পালিয়েছে।

তালেবান ও স্থানীয় যোদ্ধাদের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের প্রায় ২০ দিন পর স্বাভাবিক রূপে ফিরতে শুরু করেছে আফগানিস্তানের পর্বতঘেরা প্রদেশ পাঞ্জশির। সেখানকার রাস্তাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। টেলিফোন নেটওয়ার্কেও মেরামতের কাজ চলছে।

পাঞ্জশিরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকর্তা এবং বাসিন্দাদের বরাতে এ তথ্য দিয়েছে টলোনিউজ

অবশ্য বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, রাজ্যটিতে এখনও বিদ্যুৎ ফেরেনি।

স্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ ওয়াসি আলমাস বলেছেন, ‘টেলিকম নেটওয়ার্ক গতকাল থেকে কাজ করছে। বড় সমস্যা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন, যা এখনও সমাধান হয়নি।’

পাঞ্জশিরের বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে তালেবান ও স্থানীয় প্রতিরোধী বাহিনীর লড়াইয়ের মধ্যে সেখানকার বাসিন্দাদের ৯০ শতাংশই ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। তারা পাহাড়-পর্বতের ঢালে আশ্রয় নিয়েছে। মারাত্মক সংকটে পড়েছে তারা।

পাঞ্জশিরের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে এক বাসিন্দা বলেন, ‘অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখা দিয়েছে। মানুষজনকে অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।’

প্রদেশটির আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘১০০ ভাগ মানুষের মধ্যে এখন ১০ ভাগ মানুষ এখানে বাস করছে। বাকিরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।’

অবশ্য পাঞ্জশিরের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, প্রদেশটির পরিবেশ স্বাভাবিক আছে।

স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা মৌলভি সানা সানগিন ফাতিহ বলেন, ‘নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের রক্ষা আমাদের দায়িত্বের বাধ্যবাধকতা। বিদ্যুৎ নেই, খাদ্য নেই- এসব যা বলা হচ্ছে তা মিথ্যা।’

গত ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণে নিলেও পাঞ্জশির নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছিল না তালেবান। তুমুল লড়াই শেষে গত ৬ আগস্ট আফগানিস্তানের সবচেয়ে ছোট প্রদেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় কট্টর ইসলামপন্থি সংগঠনটি।

প্রদেশটিকে তালেবান মুক্ত রাখার ঘোষণা দেন ‘পাঞ্জশিরের সিংহ’ খ্যাত আহমেদ শাহ মাসুদের ছেলে আহমেদ মাসুদ, কিন্তু সম্ভব হয়নি। প্রথমবারের মতো কোনো শক্তির কাছে পরাজিত হয় ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের (এনআরএফ)।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবর, এনআরএফ প্রধান আহমেদ মাসুদ যুক্তরাষ্ট্রে একজন লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছেন, যাতে তার বাহিনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সহায়তা পায়।

আহমেদ মাসুদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, লবিস্ট নিয়োগ দেয়ার উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্র যাতে তালেবানকে স্বীকৃতি না দেয়, এ বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই কাজ করে যাচ্ছে তালেবানও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈধতা এবং অর্থ সহায়তা পেতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

শেয়ার করুন

৯ বছরে ৬ বার পরাজিত ক্যানসার

৯ বছরে ৬ বার পরাজিত ক্যানসার

অদম্য জয়ন্ত কানড়োইয়ের কাছে ছয়বার হার মেনেছে ক্যানসার। ছবি: দ্য বেটার ইন্ডিয়া

২০২০ সালের নভেম্বরে ষষ্ঠবার ক্যানসার শনাক্তের পর অস্থিমজ্জা স্থানান্তরের জটিল চিকিৎসার যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয় জয়ন্তকে। তিনি বলেন, ‘ছয়বার ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেছি। প্রায় প্রতিবারই দেহের নতুন কোনো অংশ আক্রান্ত হয়েছে। যতবার অসুস্থ হয়েছি, আত্মীয়রা আমার মা-বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিল কোনো হাসপাতালে আমাকে ফেলে রেখে আসতে। তারা ভেবেছিল যে আমি যেহেতু বাঁচবোই না, শুধু শুধু কেন আমার বোঝা টানবেন আমার মা-বাবা।’

২৩ বছর বয়সী ভারতীয় যুবক জয়ন্ত কানড়োইয়ের ওজন মাত্র ৩৬ কেজি, কিন্তু তার কণ্ঠের বলিষ্ঠতায় স্পষ্ট লড়াকু ব্যক্তিত্ব। জয়ন্তর প্রতিদ্বন্দ্বী সহজ কেউ নয়। প্রাণঘাতী রোগ ক্যানসারের সঙ্গে তার লড়াই চলছে কিশোর বয়স থেকে। জীবন জয়ের যুদ্ধে গত নয় বছরে ছয়বার ক্যানসারকে হারিয়েছেন তিনি।

জয়ন্ত জানান, গত নয় বছরে গুণে গুণে এক হাজার ২৩৭ দিন বা প্রায় চার বছরই হাসপাতালে কেটেছে তার। ক্যানসারকে জিততে না দিলেও তার শরীরজুড়ে রোগটির ধ্বংসলীলা। ১৭টি কেমোথেরাপি, ৬০টির বেশি রেডিওথেরাপি আর অস্থিমজ্জা স্থানান্তরের মতো কঠিন চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

একের পর এক অস্ত্রোপচার, আর শরীর-মনের শক্তি নিংড়ে নেয়া ওষুধ, আর স্বাস্থ্যপরীক্ষার কষ্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছেন জয়ন্ত। তার কাছে ক্যানসার এখনও অজেয়।

টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য রাজস্থানের আজমির শহরের বাসিন্দা জয়ন্ত। ২০১৩ সালে যখন দশম শ্রেণির ছাত্র সে, তখন প্রথম ক্যানসার ধরা পড়ে তার।

তিনি বলেন, ‘ঘাড়ের ডান দিকে মাংসপিণ্ডর মতো কিছু একটা অনুভব করি। পরে জানা যায়, এটা ক্যানসার। সেই প্রথম হজকিন লিম্ফোমার নাম শুনি আমি। কোনো ব্যথা ছিল না। কিন্তু দিন দিন মাংসপিণ্ডটি বড় হচ্ছিল।

‘প্রথমবার অপারেশন থিয়েটার দেখি আমি সে সময়। ভয় পাইনি একটুও। জয়পুরের ভগবান মহাবীর ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি হই। অস্ত্রোপচারের পর শুরু হয় কেমোথেরাপির ধাক্কা। ছয়টি কেমোথেরাপি নিয়ে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি প্রথম আমাকে ক্যানসারমুক্ত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। সেই দিনটির সব স্মৃতি আজও চোখে ভাসে আমার।’

এরপর জয়পুর থেকে আজমিরে ফেরেন জয়ন্ত, অংশ নেন মাধ্যমিক পরীক্ষায়, নিজ ক্লাসে প্রথম হন তিনি। গর্ব নিয়ে জয়ন্ত বলেন, ‘শিক্ষাজীবনের পুরো সময়েই প্রথম সারির শিক্ষার্থী ছিলাম আমি।’

এসবের মধ্যেই ক্যানসারমুক্ত জয়ন্ত তীব্র ক্লান্তিতে ভুগতেন। এতটাই যে লম্বা সময়ের জন্য স্কুলেও যেতে পারছিলেন না। অথচ পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত একটি দিনও স্কুল বাদ না দেয়ার রেকর্ড ছিল তার।

একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় জয়ন্তর দেহে আরেকটি মাংসপিণ্ড ধরা পড়ে; এবার ঘাড়ের বাম পাশে। ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আবারও ভগবান মহাবীর ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন।

জয়ন্ত কখনোই নিজের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে দেননি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উৎরে যান এসবের মধ্যেই, বিকমে পড়াশোনা শুরু করেন।

জয়ন্ত বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৭ সালের শুরুতে আবারও ক্যানসার ধরা পড়ে আমার শরীরে, এবার অগ্ন্যাশয়ে। প্রায়ই পেটে অসহ্য ব্যথা হতো। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় শেষ বর্ষে পড়াশোনার সময়। দিল্লিতে একা থাকছিলাম বলে বাবা আমাকে দ্রুত বাড়িতে ফিরে চিকিৎসা শুরু করার অনুরোধ করেন।’

দ্য বেটার ইন্ডিয়ার জুলাই মাসের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অসুস্থতা মারাত্মক রূপ নেয়ায় পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই ২০১৭ সালে আজমিরে ফেরেন জয়ন্ত। তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ না করে বাড়ি ফেরার কারণে খুব কষ্টে ছিলাম। কিন্তু ব্যথাও সহ্য করতে পারছিলাম না। ভেঙেচুরে যাচ্ছিলাম মনে হতো।’

সেবার চিকিৎসকরা জানান, অগ্ন্যাশয়ের টিউমারে পৌঁছাতে জয়ন্তর পেটে নয় ইঞ্চি লম্বা ফুটো করতে হবে।

জয়ন্ত বলেন, ‘সেবারই প্রথম বাবার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখলাম। টিউমারটা মাত্র এক সেন্টিমিটার ছিল। কিন্তু পাকস্থলীর যে অংশে এটি ছিল, সে অংশটি কেটে ফেলে দিতে হবে- এই চিন্তা আমার বাবাকে কুড়ে খাচ্ছিল।’

অগ্ন্যাশয়ে টিউমার ধরা পড়ার দুই বছর পর কেমোথেরাপিসহ সব চিকিৎসা শেষ করেন জয়ন্ত। তৃতীয়বার ক্যানসারকে হারিয়ে বাড়ি ফিরেই নতুন উদ্যমে শুরু করেন পড়াশোনা। সশরীরে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রমে নাম লেখান তিনি, সম্পন্ন করেন স্নাতক।

জয়ন্তর বাবা ৫৭ বছর বয়সী অশোক কানড়োই বলেন, ‘পড়াশোনার জন্য ছেলেকে আবারও দূরে পাঠানোর ঝুঁকি নিতে চাইনি। ওর ডিগ্রির চেয়ে জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নয় বছর ধরে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু সন্তানের সুস্বাস্থ্য চেয়েছি। তাই চেয়ে যাব আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।’

২০১৯ সালে আবারও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হন জয়ন্ত; ২০১৭ সালে যেখানে ক্যানসার ধরা পড়েছিল, ঠিক সেই একই জায়গায় ধরা পড়ে নতুন টিউমার।

চতুর্থবার ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পরও মুখের হাসি মুছতে দেননি জয়ন্ত। দীর্ঘযুদ্ধে শরীর ভেঙে পড়লেও আবারও চিকিৎসা শুরু করেন; আবারও জয়ী হয়ে ফেরেন।

গত দুই বছরে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার আর দেখা দেয়নি। কিন্তু গত বছর জয়ন্তর ডান হাতের বগলের নিচে আরেকটি টিউমার ধরা পড়ে। এবার ছেলেকে নিয়ে আহমেদাবাদের গুজরাট ক্যানসার হাসপাতালে যান বাবা।

জয়ন্ত বলেন, ‘২০২০ সালের ২০ মার্চ চিকিৎসা শেষে আজমিরে নিজের বাড়িতে ফিরলাম। পরদিন থেকে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে লকডাউন শুরু হলো। অস্ত্রোপচারপরবর্তী চিকিৎসার জন্য আহমেদাবাদ যাওয়ার দরকার হলেও আর যেতে পারিনি।’

ক্যানসারের পঞ্চম আঘাত থেকে সেরে উঠতে না উঠতেই আট মাসের ব্যবধানে জয়ন্ত জানতে পারেন ষষ্ঠবারের মতো শরীরে বাসা বেঁধেছে হতচ্ছাড়া রোগটি। সময় ২০২০ সালের নভেম্বর। এবার ক্যানসারের আক্রমণস্থল তলপেট।

এই সময় অস্থিমজ্জা স্থানান্তরের জটিল চিকিৎসার যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয় জয়ন্তকে। শরীরে সুঁই ঢোকাতে ভয় না পেলেও মেরুদণ্ডের নিচ থেকে অস্তিমজ্জা বের করে আনার সময় অসহনীয় ব্যথা সহ্য করতে হয়েছিল তাকে।

জয়ন্ত বলেন, ‘ছয়বার ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেছি। প্রায় প্রতিবারই দেহের নতুন কোনো অংশ আক্রান্ত হয়েছে। যতবার অসুস্থ হয়েছি, আত্মীয়রা আমার মা-বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিল কোনো হাসপাতালে আমাকে ফেলে রেখে আসতে। তারা ভেবেছিল যে আমি যেহেতু বাঁচবোই না, শুধু শুধু কেন আমার বোঝা টানবেন আমার মা-বাবা।

‘আজ যখন আমি অন্যদের বাঁচতে উৎসাহ দিই, আমার ওই আত্মীয়-স্বজনরা হাঁ করে তাকিয়ে শোনে। তারা আজ আমাকে ভাগনে ডেকে যোগাযোগ করতে চায়।’

পুরো যাত্রা শুধু জয়ন্তর জন্য নয়, তার পরিবারের জন্যও একইরকম ক্লান্তিকর ছিল। শারীরিক ব্যথা সহ্য করেছেন তিনি, একইরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে তার পুরো পরিবার। এখন সবাই খুশি।

ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা তৈরি, দুঃস্থদের চিকিৎসায় তহবিল সংগ্রহ, ক্যানসারে আক্রান্তদের মনোবল বাড়ানো ইত্যাদি লক্ষ্য নিয়ে বন্ধুদের সহযোগিতায় একটি দাতব্য সংগঠন গড়ে তুলেছেন জয়ন্ত। সংগঠনটিতে বর্তমানে ৩৫০ জন নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবক আছেন।

শেয়ার করুন