রাস্তায় ভিক্ষা করা সেই ‘বিচারপতির মেয়ে’ আসলে কে

ফেসবুকে ভাইরাল তুহিন সুলতানার এই ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৮৪ লাখ বার। ছবি: সংগৃহিত।

রাস্তায় ভিক্ষা করা সেই ‘বিচারপতির মেয়ে’ আসলে কে

‘মজার টিভি’ নামের ফেসবুক পেজে তুহিন ও তার কিশোরী মেয়ের আহাজারির ভিডিও আপলোড হয় গত ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায়। বুধবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৮৪ লাখ বার, শেয়ার হয়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার। তুহিন ও তার পরিবারের প্রকৃত অবস্থা খুঁজে বের করেছে নিউজবাংলা।

রাস্তার পাশে বুকে পোস্টার ঝুলিয়ে আহাজারি করছেন বয়স্কা এক নারী। পাশে এক কিশোরী। পোস্টারে লেখা- ‘সাহায্যের আবেদন, আমরা বাঁচতে চাই’।

‘মজার টিভি’ নামের ফেসবুক পেজে এই নারী ও তার কিশোরী মেয়ের আহাজারির ভিডিও আপলোড হয় গত ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার দিকে। মাহসান স্বপ্ন নামের একজন অনলাইন ভিডিও ক্রিয়েটর এই পেজটি পরিচালনা করেন।

বুধবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৮৪ লাখ বার, শেয়ার হয়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার। এতে মন্তব্য করেছেন ১০ হাজারের বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী।

ভিডিওতে তুহিন সুলতানা তপু নামের ওই নারীকে বলতে শোনা যায়, তিনি অভিজাত পরিবারের সন্তান, বাবা উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। তার এক মেয়ে নায়িকা, ছেলেরাও বেশ ভালো অবস্থানে আছেন। অথচ তাদের কেউ দেখাশোনা করেন না বলে কিশোরী মেয়েটিকে নিয়ে রাস্তায় ভিক্ষা করছেন তিনি।

এই নারীর আহাজারি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভিডিওর বিবরণে ০১৯৫৬৮৪১৭৮১ নম্বরটি দিয়ে সেখানে বিকাশে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

একটি শীর্ষ স্থানীয় অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ওই ভিডিওর ভিত্তিতে প্রতিবেদনও প্রকাশ করে রোববার। সেখানেও উল্লেখ করা হয়েছে বিকাশে টাকা পাঠানোর মোবাইল ফোন নম্বর। ওই প্রতিবেদনটিও অসংখ্য শেয়ার হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

তবে সোমবার সকালে নিউজবাংলা কার্যালয়ে ফোন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক জানান, গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকটি পোস্টে তার নজর আকৃষ্ট হয়। সেখানে এই একই নারীর আলাদা ছবি দিয়ে মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, পিতৃহারা চতুর্থ শ্রেণির ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তুহিন সুলতানা তপু নামের ওই নারী এখন কপর্দকশূন্য। অসুস্থ অবস্থায় তিনি চিকিৎসা নিতেও পারছেন না।

সেই পোস্টটিও ফেসবুকে বেশ ভাইরাল হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক জানান, তখন অন্য অনেকের পাশাপাশি তারা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে এক লাখ টাকার বেশি অর্থ সংগ্রহ করে ওই নারীকে দিয়েছেন। এমনকি এখনও কয়েকজন তাকে বিকাশে প্রতি মাসে টাকা পাঠাচ্ছেন।

গত বছরে তুহিনকে সাহায্যের আবেদন জানানো আরেকটি ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়

এমন তথ্য পাওয়ার পর সোমবার সকালেই অনুসন্ধানে নামে নিউজবাংলা। শুরুতেই বিকাশের জন্য দেয়া ফোন নম্বরে তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কোথায় আছেন- জানতে চাইলে কোনো তথ্যই দিতে রাজি হননি তিনি।

তুহিন বলেন, ‘আমি কারো সাথে দেখা করব না। কেউ আমার ভালো চায় না, সবাই আমার ক্ষতি করতে চায়।’

একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, ‘তোরা সবাই গোয়েন্দা। সবাই আমার ক্ষতি করতে চাস। আমার বিচারপতি বাবা তোদেরকে আমার পিছনে লাগিয়ে দিয়েছে।’

‘বিচারপতি বাবা’র পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওর পরিচয় সবাই জানে, ওর পরিচয় আমি আলাদা করে বলতে চাই না। দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ওকে চেনেন, আপনি কেমনে চেনেন না! ওর নাম আমি মুখে আনতে চাই না।’

নিউজবাংলার প্রতিবেদক এরপর পরিচয় গোপন করে আরেকটি নম্বর থেকে ফোন করে তুহিনকে সরাসরি অর্থ সহায়তার প্রস্তাব দেন।

তবে এবারেও ঠিকানা বলতে রাজি হননি তিনি। তুহিন বলেন, ‘বিকাশে টাকা পাঠান। বিকাশে পাঠাতে সমস্যা হলে আমি উত্তরা ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর দিচ্ছি সেখানে টাকা পাঠিয়ে দিন। তাও আমি কোনোভাবে দেখা করব না।’

এর কিছু সময় পরেই বন্ধ হয়ে যায় তুহিনের ফোন নম্বর। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাই নতুন কৌশল নেয় নিউজবাংলা।

‘মজার টিভি’ নামের ফেসবুক পেজে ১৪ জানুয়ারি তুহিনকে নিয়ে এই ভিডিও আপলোড হয়

ফেসবুকে আপলোড করা ভিডিওতে মাহসান স্বপ্নকে বলতে শোনা যায়, তুহিনের বড় মেয়ের নাম অবনী, তিনি অভিনয়শিল্পী। সেই সূত্র ধরে টিভি নাটকের অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন- অভিনয়শিল্পী সংঘে যোগাযোগ করে নিউজবাংলা।

তবে সংঘের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব নাসিম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অবনী নামের কোনো অভিনয়শিল্পী আমাদের সংগঠনে নেই। ব্যক্তিগতভাবেও এই নামের কোনো অভিনেত্রীকে আমি চিনি না।’

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতিতে খোঁজ নিয়ে সেখানেও অবনী নামের কোনো অভিনেত্রীর খোঁজ পাওয়া যায়নি। শিল্পী সমিতির অফিস সেক্রেটারি মো. জাকির হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের ভোটার লিস্টে অবনী নামের কোনো অভিনয় শিল্পী নেই। নতুন কয়েকজন শিল্পী সমিতির সদস্য হয়েছেন, সেখানেও অবনী নামের কোনো অভিনেত্রী নেই।’

অবনীকে না পেয়ে অন্যপথে অনুসন্ধান শুরু করে নিউজবাংলা টিম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক তুহিনকে সহায়তার উদ্যোগ নেয়ার সময় তাকে নিয়ে পোস্টদাতা মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। বদরুদ্দোজা সে সময় মেসেঞ্জারে তাকে নিশ্চিত করেন, তিনি নিজে তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হন।

বদরুদ্দোজা প্রমাণ হিসেবে সে সময় উত্তরা ব্যাংকে তুহিনের নামে স্থগিত থাকা একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল করার আবেদনপত্রের কপিও পাঠান। ওই কপিতে দেখা যায়, বদরুদ্দোজা যেদিন তুহিনকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন, ঠিক সেদিনই (২২ সেপ্টেম্বর) তুহিনের নামের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল করার আবেদন করা হয়েছিল।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল করতে ২২ সেপ্টেম্বর তুহিন একটি আবেদন করেন

নিউজবাংলা ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার সঙ্গে। ফেসবুক প্রোফাইলে এনবি ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন বদরুদ্দোজা। মেসেঞ্জারে তুহিনকে নিয়ে জানতে চাইলে শুরুতে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। এরপর তুহিনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল করার আবেদনপত্রের নমুনাটি পাঠানো মাত্র তিনি নিউজবাংলা প্রতিবেদককে ব্লক করে দেন।

বদরুদ্দোজার ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে ২২ সেপ্টেম্বরের পোস্টটি সরিয়ে ফেলার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে লিংকড-ইনে মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, তিনি এনবি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পাশাপাশি রোবা এসএনএস এলএলসি নামের একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (ম্যানেজিং পার্টনার)। রাজধানীর কলাবাগানের সুলতানা টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়।

মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার সন্ধান পেতে সাহায্য করেছে তার লিংকড-ইন অ্যাকাউন্ট

তবে মঙ্গলবার বিকেলে সুলতানা টাওয়ারে গিয়ে জানা যায়, রোবা এসএনএস এলএলসি নামের প্রতিষ্ঠানটি ভবনের তৃতীয় তলায় ছিল আরও দুই বছর আগে। এরপর সেটি অন্য ঠিকানায় চলে যায়। এই ভবনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার আবু বক্করের কাছ থেকে মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার একটি ফোন নম্বর পায় নিউজবাংলা।

বদরুদ্দোজাকে ফোন করা হলে এবার তিনি কথা বলতে রাজি হন। তিনি জানান, সেপ্টেম্বরে ধানমন্ডি এলাকায় রাস্তার পাশে তুহিনকে দেখতে পান তিনি। এরপর তার দেয়া বিবরণ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

বদরুদ্দোজা বলেন, ‘সে সময় আমি ফেসবুকে একটি পোস্ট দেয়ার পর অনেকেই সাহায্য করার আগ্রহ জানিয়ে যোগাযোগ করেন। আমি নিজের গাড়ির ড্রাইভার পাঠিয়ে তুহিনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল করি। তাকে অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে কিছু চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়।’

বদরুদ্দোজা দাবি করেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে তুহিনের কথায় অসঙ্গতি ধরা পড়তে শুরু করে। এরপর তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টটি ডিলিট করে দেন এবং বনশ্রী থানায় একটি জিডি করেন। পরে তিনি আর তুহিনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। কেউ সাহায্য পাঠাতে যোগাযোগ করলে খোঁজখবর নিয়ে নিজ দায়িত্বে টাকা পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রথম দিকে এ বিষয়ে নিউজবাংলার জিজ্ঞাসা এড়ানোর কারণ জানতে চাইলে বদরুদ্দোজা সুস্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।

মাহসান স্বপ্নর ‘মজার টিভি’ পেজ

তুহিনের অবস্থান জানতে ভিডিও ক্রিয়েটর মাহসান স্বপ্নের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করে নিউজবাংলা। তবে ফেসবুক পেজে তিনি যে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়েছেন সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। বিভিন্নভাবে পাওয়া তার আরও দুটি ফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে।

এমন অবস্থায় স্বপ্নর ফেসবুকে নিউজবাংলার পক্ষ থেকে বার্তা পাঠানো হয়, এরপর তিনি মঙ্গলবার সকালে একটি ল্যান্ডফোন থেকে নিউজবাংলা কার্যালয়ে ফোন করেন।

তুহিনের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহসান স্বপ্ন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওই আন্টির সাথে আমার রাস্তায় হঠাৎ করে দেখা। তিনি তার সমস্যার কথা আমাকে বলেন। সব কাগজ-পত্র আমাকে দেখান। তারপর আমি উনাকে সাহায্য করার জন্য ভিডিওটি করি। কারণ, আমি এ ধরনের অসহায় মানুষের পাশে সব সময় দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।’

ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরে তুহিনের বিকাশ নম্বরে অনেকে টাকা পাঠাচ্ছেন বলেও জানান স্বপ্ন।

তবে তুহিনের বাবার পরিচয় তিনিও জানাতে রাজি হননি। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি সবই জানি, কিন্তু কিছু বলব না। বেশ কিছুদিন যাবত আমার সকল মোবাইল নম্বর বন্ধ রাখতে হয়েছে। সেই বিচারপতির ভয়েই এটি করতে হয়েছে।’

এমন অবস্থায় নিউজবাংলার হাতে আসে একটি নথি, যাতে দেখা যায়- তুহিন একটি জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে নিজের নাম-ঠিকানা দিয়েছেন। সেই নথিতে তিনি রাজধানীর বনশ্রীর একটি বাসার ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। তুহিনের বাবার নাম মো. শামসুল হুদা, স্বামী ফখরুজ্জামান তালুকদার।

বনশ্রীর বাসার ঠিকানায় মঙ্গলবার দুপুরের দিকে গিয়ে জানা যায় তুহিন বনশ্রী এলাকায় আসেন ২০১৫ সালে। তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বনশ্রীর জি ব্লকের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সে বাসার নিরাপত্তাকর্মী নিউজবাংলাকে জানান, তুহিনের স্বামী ফখরুজ্জামান বিদেশ থাকেন।

বনশ্রী এলাকার এই বাসায় ছিলেন তুহিন সুলতানা

বনশ্রী এলাকায় অনুসন্ধানে জানা গেছে, তুহিন সুলতানা ঘন ঘন বাসা পরিবর্তন করতেন। গেল এক বছরে তিনি তিন বার বাসা বদল করেছেন। তিনটি বাসার ভাড়া যথাক্রমে ১৬ হাজার, ১৪ হাজার ও ১২ হাজার টাকা। কখনও কোনো বাসার ভাড়া বকেয়া পড়েনি।

তুহিন বনশ্রীর যে বাসায় শেষ ভাড়া ছিলেন সে বাসার মালিক জহিরুল ইসলাম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বর মাসের ৫ তারিখে আমার বাসার সাততলার ফ্ল্যাট ভাড়া নেন তিনি। তবে হঠাৎ করেই নভেম্বর মাসের শুরুতে জানান, বাসা ছেড়ে দেবেন। এরপর সে মাসের ২৫ তারিখ বাসা ছাড়েন, কিন্তু ডিসেম্বর মাসের ভাড়াও পরিশোধ করে দেন।’

বাসা ছাড়ার আগে তুহিন বাড়ির মালিককে জানিয়েছিলেন, তার বাবা অসুস্থ, তিনি তার সঙ্গেই থাকবেন।

বনশ্রী এলাকায় যেসব বাড়িতে তুহিন ভাড়া ছিলেন, তার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তুহিন বেশ স্বচ্ছল ছিলেন। অন্য ভাড়াটিয়াদের মধ্যে তিনিই নিয়মিত সবার আগে ভাড়া পরিশোধ করতেন। করোনার সময়েও ব্যতিক্রম হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তুহিনের তিন সন্তান। বড় ছেলের নাম অনিন্দ্য, এরপর মেয়ে অবনী, যাকে অভিনেত্রী বলে পরিচয় দিয়েছেন তুহিন। এর পর ছোট মেয়ে বর্ণা (ছদ্ম নাম), সে বনশ্রীর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী।

বনশ্রীর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের নথিতে তুহিন সুলতানার মেয়ের নাম

স্কুলে গিয়ে জানা যায়, করোনায় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে অনলাইনে। তাই স্কুলে দায়িত্বশীল কারো উপস্থিতি নেই। তবে স্কুলের নিবন্ধন বইয়ে বর্ণার (ছদ্ম নাম) বাবার তাইওয়ানের একটি ফোন নম্বর দেয়া আছে। তবে কয়েকবার চেষ্টা করেও সেই নম্বরে সংযোগ স্থাপন করা যায়নি।

স্কুলের অফিস সহকারী নাফিজ নিউজবাংলাকে জানান, বর্ণা (ছদ্ম নাম) ও তার মা স্কুলে খুবই পরিচিত মুখ। করোনা পরিস্থিতির আগে তুহিন মেয়েকে নিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করতেন। সবার কাছে নিজেকে সাবেক বিচারপতির মেয়ে পরিচয় দিতেন। নাফিজ জানান, সবশেষ নভেম্বর মাসে তুহিন স্কুলে এসেছিলেন। তখন তিনি মেয়ের স্কুলের ফি আগামী জুন পর্যন্ত পরিশোধ করেন। বর্ণার (ছদ্ম নাম) স্কুলে মাসিক বেতন ১৪০০ টাকা।

স্কুলের নিরাপত্তাকর্মী শাহ নেওয়াজ নিউজবাংলাকে জানান, তুহিন সুলতানার বাসায়ও যাতায়াত ছিল তার। তিনি বলেন, ‘আমি তার ভাইয়ের মতো ছিলাম। তিনি তো খারাপ মানুষ ছিলেন না। তার ঘরে দামি-দামি জিনিস আছে, সে তো এত গরিব না। আমার সাথে নভেম্বরের পর থেকে আর যোগাযোগ নাই। ফোন দিলে ফোনও ধরেন না। কী সমস্যা কে জানে।’

ভিক্ষা করার ভিডিও শাহ নেওয়াজও দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘তার অবস্থা এত খারাপ হওয়ার কথা না। আমার ছেলেকে সে সব সময় টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করত। আর আজকে এমন খারাপ অবস্থা বিশ্বাস হয় না।’

শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘তার (তুহিন) বাসায় দামি-দামি জিনিসপত্র, টিভি, ফ্রিজ, এসি সবই ছিল। ঘরে ভালো খাবার থাকত সবসময়। তবে এই এলাকা ছেড়ে যাবার পর নভেম্বর মাসে একবার আমাকে ফোনে জানায়, তার মেয়েটা না খেয়ে আছে। আমি রান্না করে নিয়ে যেতে চাইলাম। তারপর আর ফোন ধরল না। এরপর আর যোগাযোগ নাই।’

সেপ্টেম্বরের ফেসবুক পোস্টে সাহায্য পাঠাতে বিকাশ এজেন্ট নম্বর ০১৮৮৩৭৬৬৪৪৪ এবং মেয়ে বর্ণা-এর ০১৬১১৪৪৫৪৫০ নম্বর দিয়েছিলেন তুহিন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে বিকাশ এজেন্টের শাহদাত টেলিকম এর অবস্থান। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী নিউজবাংলাকে জানান, কিছু দিন পরপরই তুহিন তার মেয়েকে নিয়ে দোকানে এসে টাকা তুলে নিয়ে যেতেন। তবে গত কিছুদিন তারা আসেননি।

ফেসবুকে এবার আপলোড করা ভিডিওতে বিকাশে টাকা পাঠাতে নিজের ব্যক্তিগত ০১৯৫৬৮৪১৭৮১ নম্বরটি দিয়েছেন তুহিন সুলতানা।

নিউজবাংলা এই ফোন নম্বর পুলিশকে সরবরাহ করে বাহিনীর সহায়তা চায়। এর পরপরই শনাক্ত হয় টাঙ্গাইল সদরের বটতলা বাজার এলাকায় আছেন তুহিন।

তুহিনের বিষয়ে মঙ্গলবার সকালে নিউজবাংলার হাতে আসা নথিতে বাবার নাম মো. শামসুল হুদা পাওয়া যায়। এই নাম যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, সুপ্রিম কোর্টে গত দুই দশকে এই নামে একজনই বিচারক ছিলেন।

হাইকোর্ট বিভাগে ২০০১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি মো. শামসুল হুদা। ২০১২ সালের ২ নভেম্বর আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে তিনি অবসরে যান। তবে বিচারপতি মো. শামসুল হুদাকে ২০১৩ সালে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। বিচারপতি মো. শামসুল হুদার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় সপরিবারে আছেন।

গোপালগঞ্জ শহরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিচারপতি মো. শামসুল হুদার তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে, যাদের একজনের নাম তুহিন সুলতানা তপু। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে ঢাকায় বিচারপতি মো. শামসুল হুদার বাসায় যোগাযোগ করে নিউজবাংলা।

অন্যদিকে, বুধবার আরেকটি সূত্রে ফখরুজ্জামান তালুকদারের ফেসবুক আইডির সন্ধান পায় নিউজবাংলা। তুহিনের বড় মেয়ে অবনীর ফোন নম্বরও পাওয়া যায়। এর পরেই পরিষ্কার হতে থাকে তুহিনকে ঘিরে নানান রহস্য।

তিন দিনের অনুসন্ধানে খুলল জট

ফখরুজ্জামানের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করা হলে সাড়া দেন তিনি। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, এক যুগ আগে আগে তুহিনের সঙ্গে তার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। অবনী ও অনিন্দ্য তাদের দুই সন্তান। বিয়েবিচ্ছেদের কিছুদিন আগেই দেশ ছেড়ে তাইওয়ানে চলে যান ফখরুজ্জামান। আর সেখান থেকে পরে পাড়ি জমান নিউজিল্যান্ডে। দেশে দুই সন্তানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে তার।

নিউজিল্যান্ড থেকে নিউজবাংলার জিজ্ঞাসার জবাব দেন ফখরুজ্জামান

তাহলে বর্ণা (ছদ্ম নাম) কার সন্তান- সেই প্রশ্নের জবাব মিলেছে তুহিনের বড় মেয়ে অবনীর কাছ থেকে। অবনী মডেলিং পেশার সঙ্গে জড়িত। ভাই অনিন্দ্য বিয়ে করার পর যে বাসায় আছেন সেখানেই থাকছেন অবনী।

মোবাইল ফোনে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাবার জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসার পার্টনার ছিলেন আবদুস সালাম লিটন নামের একজন। তার সঙ্গে মা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি জানতে পেরে আমার বাবা দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপরেই বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে মা লিটনের সাথে থাকতে শুরু করেন।’

বর্ণা (ছদ্ম নাম) এই লিটনেরই সন্তান। বিদেশে যাওয়ার পর ফখরুজ্জামান তার দুই সন্তানের ভরণ-পোষণের জন্য টাকা পাঠাতেন। তবে সেই টাকার পুরোটাই নিজের বিলাসি জীবনের জন্য তুহিন খরচ করতেন বলে অভিযোগ করেন অবনী। এ নিয়ে বিরোধের জেরে প্রায় সাত বছর আগে মায়ের ঘর ছেড়ে যান অবনী-অনিন্দ্য।

অবনী জানান, জনশক্তি রপ্তানিতে জড়িত লিটনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তিনিও নিরুদ্দেশ হন। এরপরই অর্থ সংকটে পড়েন তুহিন। বিচারপতি বাবার বাড়ি থেকে প্রায়ই আর্থিক সাহায্য আনতেন। মায়ের গয়না এনে বিক্রি করার ঘটনাও ঘটেছে। এসব নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় ভাই-বোনের সঙ্গে, ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় বাবার বাড়ির দরজা।

ও আমাদের শেষ করে দিয়েছে: বিচারপতি মো. শামসুল হুদা

বিচারপতি মো. শামসুল হুদা শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছেড়ে দেন ২০১৪ সালে। এরপর থেকে রাজধানীর সেগুনবাগিচার নিজ ফ্ল্যাটে আছেন। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি বুধবার বিকেলে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হন।

নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেন বিচারপতি মো. শামসুল হুদা, ছবিটি তার অনুমতি নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে

মেজ মেয়ে তুহিনকে নিয়ে বিব্রত বিচারপতি মো. শামসুল হুদা বলেন, ‘ও (তুহিন) ছোট বেলা থেকেই লোভী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাস করার কথা বললেও আসলে সে এসএসসিও পাস করতে পারেনি। আমি ওর বাবা হয়েও বলছি, ওরে তিন বার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়াইছি, তিনবারই ফেল করেছে।

‘একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তার সঙ্গে সংসার টেকেনি। ও আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওর সঙ্গে এখন যে মেয়েটি আছে তার বাবার নাম আব্দুস সামাদ লিটন। আর আমরা বিয়ে দিয়েছিলাম যার সঙ্গে সে এখন নিউজিল্যান্ডে থাকে। বিদেশে থাকলেও ওর সাথে আমাদের এখনও যোগাযোগ আছে।’

তুহিন সুলতানার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা জানিয়ে বিচারপতি শামসুল হুদা বলেন, ‘এর আগেও কয়েকবার এভাবে পোস্ট করেছে। তার এসব আচরণের কারণেই আমার স্ট্রোক করেছে। আমার এই অসুস্থতার জন্য সে-ই দায়ী। এখনও বাসায় বেডে শুয়ে আমার দিন কাটে।

‘তার (তুহিনের) অনেক সম্পত্তির লোভ। সে কী চায় সেটাই আমি জানি না। প্রতি মাসে তাকে হাত খরচের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে এখনও আমরা দিয়ে যাচ্ছি।’

বিচারপতি শামসুল হুদা বলেন, ‘প্রত্যেক শীতে আমি গ্রামে কিছু কম্বল বিতরণ করি। সেই কম্বলও চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে সে (তুহিন)। বাসায় এসে ১০টা মোবাইল চুরি করে নিয়ে গেছে। বাড়িতে আসলেই স্বর্ণ চুরি করে নিয়ে যায়। সে কারণে ও বাসায় আসলেই আমরা ভয় পাই।

‘তার সঙ্গে একজন ইয়াবা ডিলারের সম্পর্ক রয়েছে। আমাদেরকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসায় দিতে পারে- এমন আশঙ্কায় আমরা ওকে বাসায় আনতে ভয় পাই। তাকে গ্রামে যেতে বললে সে যায় না।’

বিচারপতি শামসুল হুদা কথা বলার সময় তার সঙ্গে ছিলেন ছোট মেয়ে তানিয়া সুলতানা সুমি। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওর (তুহিন) কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। আজ এখানে, তো কালকে আরেক জায়গায়, এসব করেই চলে। তার থাকার জন্য আমাদের গোপালগঞ্জের একটি বাড়ি ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছি, কিন্তু সে সেখানে থাকবে না। গত মাসেও গোপালগঞ্জ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাসা ভাড়া উঠিয়ে নিয়ে এসেছে।’

সুমি বলেন, ‘এখন রাস্তায় রাস্তায় এভাবে মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে আমাদের মান-মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। তার এই আচরণের জন্য আমরা এখন সমাজে মুখ দেখাতে পারছি না। আমাদের বাসা থেকে সে দুইশ ভরি স্বর্ণ নিয়ে গেছে। প্রতিটি ভাই-বোনকে বঞ্চিত করছে।’

তুহিনের বেপরোয়া জীবনের তথ্য জানিয়ে সুমি বলেন, ‘সে তার প্রথম স্বামীকে পিটিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। দ্বিতীয় স্বামীর সাথে যদিও তার বিয়ে হয়নি, তাকেও পিটিয়ে বের করে দিয়েছে। এখন তার সঙ্গে যে মেয়েটি আছে তাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করে।’

বাবার সম্পত্তির লোভে তুহিন এখন নতুন করে প্রতারণায় নেমেছেন বলেও অভিযোগ করেন সুমি। তিনি বলেন, ‘আমরা ওকে মানসিক ডাক্তারও দেখিয়েছি। ডাক্তার মোহিত কামাল, ডাক্তার হেদায়েত উল্লাহকে দেখিয়েছি। তবে ওর কোনো মানসিক রোগ নেই। সবই ওর ভনিতা। সে টাকার জন্য সব করতে পারে।

‘ওর এই আচরণে আমরা লজ্জিত, মর্মাহত। আমরা সমাজে বের হতে পারছি না। আত্মীয়-স্বজনের সাথে কথা বলতে পারছি না। সন্তানেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেতে পারছে না।’

তুহিনের বক্তব্য যাচাই না করে একপাক্ষিক ভিডিও প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান বিচারপতি শামসুল হুদা ও তার মেয়ে তানিয়া সুলতানা সুমি।

তুহিন এখন কোথায়

নিউজবাংলা মঙ্গলবার বিকেলে নিশ্চিত হয়, তুহিন ও তার মেয়ে বর্ণা (ছদ্ম নাম) টাঙ্গাইল সদরে অবস্থান করছেন৷ এরপর টাঙ্গাইল প্রতিনিধি শামীম আল মামুনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা থেকে যাওয়া টিম টাঙ্গাইলের সাবালিয়া পাঞ্জাপাড়া এলাকায় বুধবার দিনভর অনুসন্ধান চালায়।

টাঙ্গাইলের এই এলাকায় আছেন তুহিন সুলতানা

এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই তুহিনের ছবি শনাক্ত করেছেন। তারা জানান, ডিসেম্বরের শুরুর দিকে তুহিন এ এলাকার একটি বাড়ির পাঁচতলার ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। তবে ১৫ দিন পরই সে বাসা ছেড়ে দেন।

পাশের বাড়ির বাসিন্দা রীতা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৫ দিনে কয়েকবার তার সাথে আমার কথা হয়েছে। সে জানিয়েছিল, স্বামী বিদেশ থাকে, তার সাথের মেয়েটি পালিত এবং তার আর কোনো সন্তান নেই। আমি দুইবার তার বাসায়ও গেছি, সেখানে দামি-দামি সব জিনিসপত্র ছিল।’

রীতা বলেন, ‘তুহিন খুব উগ্র মেজাজের, আশপাশের সবার সঙ্গে ঝগড়া করতেন। একদিন দেখি বাসার সামনে ট্রাক, সেই ট্রাকে মালামাল তুলে চলে গেলেন। আমাকে বললেন, পাশের এলাকায় বাসা নিছে, কিন্তু ঠিকানা বলে যায় নাই।’

তুহিন টাঙ্গাইল সদরের বটতলা বাজার এলাকায় নতুন বাসা ভাড়া নিয়ে আছেন বলে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে নিউজবাংলা।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন টাঙ্গাইল প্রতিনিধি শামীম আল মামুন ও গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি হুসাইন ইমাম সবুজ

আরও পড়ুন:

শেয়ার করুন

মন্তব্য

টোলারবাগে সেই বিভীষিকার কোনো চিহ্ন নেই

টোলারবাগে সেই বিভীষিকার কোনো চিহ্ন নেই

রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগ।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে মিরপুরের টোলারবাগে। সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায় আতঙ্ক। লকডাউন করা হয় ওই এলাকা।

করোনার বিভীষিকার সাক্ষরবাহী একটি নাম যদি আলাদা করতে হয়, তবে সেটি টোলারবাগ। রাজধানীর মিরপুরের এই ক্ষুদ্র মহল্লাটি এক বছর আগে সারা দেশের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছিল।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে এখানে। সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায় আতঙ্ক। লকডাউন করা হয় ওই এলাকা।

এখন করোনা মহামারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। লকডাউন উঠে গেছে আট মাস আগে। আতঙ্ক নেই কোথাও।

টোলারবাগে পা রাখলে, সংকীর্ণ মহল্লার রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল বাড়িগুলোর দিকে তাকালে এখন আর বোঝার উপায় নেই এক বছর আগে কী এক দম বন্ধ করা আতঙ্কের ছায়া পড়েছিল এখানে।

যেভাবে লকডাউন শুরু

গত বছরের ২১ মার্চ রাজধানীর টোলারবাগ এলাকার বাসিন্দা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইসলাম গণি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন সারা দেশের মানুষের আলোচনা ও আতঙ্কের কেন্দ্রে পরিণত হয় এ মহল্লা। তার দুদিনের মাথায় ২৩ মার্চ এখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় আরেকটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

এলাকাবাসী দাবি করেন, দুই ব্যক্তি একই মসজিদে নামাজ পড়তেন। মসজিদটা ছিল তাদের বাসার পাশেই।

দুদিনের ব্যবধানে পরপর দুই ব্যক্তির মৃত্যুতে টোলারবাগে বাসিন্দাদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রশাসন। তাদের বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করা হয়। ওই এলাকায় বসবাসরত প্রতিটি পরিবারকে হোম কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়।

দিনের বেলাতেও এক সুনসান নীরবতা নেমে আসে টোলারবাগে।

করোনা সংক্রমণ বাড়ার পর আতঙ্ক নেমে আসে টোলারবাগে

লকডাউনের ওই দিনগুলো কেমন ছিল, জানতে নিউজবাংলার এ প্রতিবেদক শুক্রবার এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন।

মিরপুরের পাইকপাড়া আনসার ক্যাম্পের বিপরীতে প্রধান সড়কের পাশে উত্তর টোলারবাগে ঢোকার একটি লোহার ফটক। শুক্রবার দুপুরে সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন দুজন নিরাপত্তাকর্মী। কথা হয় তাদের সঙ্গে।

নিরাপত্তাকর্মী ঝন্টু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এলাকায় প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যুর খবর জানাজানি হইলে পর পুলিশ আসে। যে বাড়িতে প্রথম মারা যায়, সেখানে তালা দেয় পুলিশ। এই বাসা থেকে কাউরে বের হইতে দেওয়া হয় নাই। মহল্লায় ওষুধ আর খাবারের দোকান ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ কইরা দেওয়া হইছিল।’

ঝন্টু বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এলাকার কেউ বাইরে যায় নাই, বাইর থাইকাও কেউ ঢুকে নাই। বহু লোক রাতের আন্ধারে মহল্লা ছাইড়া পালায় গেছিল। এক রাইতে ফাঁকা হইয়া গেল গোটা এলাকা। কিছু বাড়ির বাজারসদায় আমরা কইরা দিতাম।’

টোলারবাগ মহল্লাটি দুই ভাগে বিভক্ত। একটিকে বলা হয় উত্তর টোলারবাগ, সেটি মূলত দারুস সালাম আবাসিক এলাকার অংশ। যে দুজন প্রথম করোনায় মারা যান, তারা ওই উত্তর টোলারবাগের অধিবাসী। তার উল্টোদিকের এলাকাটি শুধু টোলারবাগ নামে পরিচিতি। তবে করোনা নিয়ে দুই টোলারবাগেই ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে মিরপুরের টোলারবাগে এই বাড়িতে। ছবি: নিউজ বাংলা

এলাকার ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি শুভাশিস বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ওপর জোর দিয়ে কাজ করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির কাছাকাছি যারা ছিলেন, তাদের সবাইকে করোনা পরীক্ষা করানো হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী ও এলাকার মসজিদে যারা নামাজ আদায় করেছেন, তাদের পরীক্ষা করা হয়। এলাকায় অবস্থিত সুপারশপ ‘‘স্বপ্ন’' ও স্থানীয় মুদি দোকানগুলোর ফোন নম্বর সব বাসায় জানিয়ে দেয়া হয়।’

কারও কিছু প্রয়োজন পড়লে তারা যেন একটি ফোনকলের মাধ্যমে দরকারি পণ্য নিজের দরজায় পেয়ে যান, সেটা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয় বলে জানান তিনি। এর ফলে এলাকার বাসিন্দাদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার বিষয়টি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রথম ব্যক্তির বসবাস ছিল উত্তর টোলারবাগের ‘দারুল আমান’ নামক ভবনে। ওই বাড়িতে দীর্ঘ পাঁচ বছর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খলিল।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি গেছিলাম তাবলিগ জামাতে। ৪০ দিন জামাতে থাইকা আবার চাকরিতে ফিরছিলাম। ডিউটিতে আসার দুই দিন পর শুনি দেশে করোনা আসছে। যে লোক করোনায় মারা গেছেন, মৃত্যুর আগে কয়দিন দেখতাম, কিছুদিন পর পর হাসপাতালে নিয়া যাইতো।

‘একদিন শুনলাম জ্বর উঠছে। কিছুদিন এই হাসপাতালে, ওই হাসপাতালে নিছে। অনেক টাকা খরচ হইছে তাদের। মারা যাওয়ার পর শুনছি, করোনা ছিল। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর পুলিশ আইসা বাসায় তালা দেয়। কেউ ঘর থেকে বের হয় না। হঠাৎ কইরা পুরা এলাকা ফাঁকা হইয়া যায়। বাজার করার লোকও নাই কোনো। যে স্যারেরা ছিলেন, তারা এক দিনে অনেক বাজার করে আনতেন। টিভির লোকেরা (টিভি সাংবাদিক) আমারে অনেক বিরক্ত করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পর বাড়ি থেকে ফোন করে (আমাকে) টিভিতে দেখা যায় বলে। পরে দুই দিন পর আমি রাতে বাড়িতে চলে গেছি। বাড়িতে গিয়ে দেখি আমারে টিভিতে দেখাইতেছে।’

তিনি আরও জানান, ‘বাসার মালিকেরা ভয়ে কেউই বাড়িতে ছিল না। প্রায় দুই মাস পর এইখানে লকডাউন তুইলা নেওয়া হয়। আমিও ছিলাম না। এক মাস ২০ দিন গ্রামের বাড়িতে ছিলাম।’

ওই সময় বহিরাগতদের কাউকে এলাকায় আসতে দেয়া হতো না বলেও জানান এলাকাবাসী।

নিরাপত্তাকর্মীদের একজন কালু মিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ সইরা গেলেও দিনরাত পাহারা চলছিল। বাইরের লোক কাউরে ঢুকতে দেওয়া হইতো না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, গত বছর পরপর দুটি মৃত্যুতে এলাকার বাসিন্দারা ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এরপর ২৩ মার্চ এলাকাটিকে সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে লকডাউন ঘোষণা দেয় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

এটিই হচ্ছে ঢাকার প্রথম লকডাউন ঘোষিত এলাকা। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ৪৮ দিনের মাথায় উত্তর টোলারবাগ থেকে পুলিশের পাহারা তুলে নেওয়া হয়।

দারুসসালাম থানার পুলিশ এ আবাসিক এলাকার প্রধান ফটকে সার্বক্ষণিক পাহারা বসায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উত্তর টোলারবাগে ৪০টি ৯ তলা ও ১০ তলা ভবনে ৬৭২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এখানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে। এর পেছনের বস্তিতে ১৬৩টি পরিবারে হাজার খানেক মানুষের বসবাস। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ গতকাল বলেন, করোনায় আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে ওঠায় আইইডিসিআরের সঙ্গে পরামর্শে পুলিশের পাহারা তুলে নেয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ‘শের শাহ সড়ক’

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ‘শের শাহ সড়ক’

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ভেতর দিয়ে যাওয়া শের শাহ সড়ক। ছবি: নিউজবাংলা।

যশোর ও মাগুরার দুটি উপজেলার আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে আছে একসময়ের জমজমাট ‘শের শাহ সড়ক’। তবে ঐতিহ্যের কথা জানেন না এলাকার বেশির ভাগ মানুষ। এমনকি সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছেও নেই যথেষ্ট তথ্য।

‘সড়ক এ আজম’ বা ‘শের শাহ সড়ক’। ২৫০০ কিলোমিটারের এই সড়ক যুক্ত করেছিল উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে।

শুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ্‌র শাসনামলে (খ্রিষ্টাব্দ ১৫৪১-১৫৪৫) প্রাচীন সড়কটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে নাম দেয়া হয় ‘সড়ক এ আজম’। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে সোনারগাঁও হয়ে যশোর জেলার উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, দিল্লি ও পাকিস্তানের পেশোয়ার হয়ে এই সড়ক বিস্তৃত ছিল আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত।

ব্রিটিশ শাসনামলে সেনা চলাচল এবং ডাক বিভাগের উন্নতির উদ্দেশ্যে সড়কটির সংস্কার করে কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত অংশের নাম দেয়া হয় ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’।

তবে সময়ের আবর্তে বাংলাদেশ অংশে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহাসিক সেই ‘শের শাহ সড়ক’। ছয় শতাব্দীর পুরোনো সড়কটি বাংলাদেশ অংশে অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে তা ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হিসেবে।

যশোর ও মাগুরার দুটি উপজেলার আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে আছে এক সময়ের জমজমাট ‘শের শাহ সড়ক’। তবে ঐতিহ্যের কথা জানেন না এলাকার বেশির ভাগ মানুষ। এমনকি সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছেও নেই যথেষ্ট তথ্য।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার প্রবেশমুখেই দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের একটি নামফলক। ইট-সিমেন্টের ফলকটি অনেকটাই এখন অস্পষ্ট। এর পাশের মাইলফলকে ছোট করে ‘শের শাহ সড়ক’ নামটি চোখে পড়ে। সরকারি নথিপত্রে উল্লিখিত এই ‘শের শাহ সড়ক’ই প্রাচীন আমলের ‘সড়ক এ আজম’।

বাঘারপাড়ায় শের শাহ সড়কের বিবর্ণ নামফলক

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাঘারপাড়া থেকে মাগুরার শালিখা, মহম্মদপুর হয়ে ফরিদপুর পর্যন্ত শের শাহ সড়কের সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কেবল যশোরের বাঘারপাড়া ও মাগুরার শালিখার একাংশে সড়কটি পূর্ব নামে পরিচিত।

কী বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা

বাঘারপাড়ার আজমপুর এলাকার বর্ষীয়ান আব্দুল হামিদ নিউজবাংলাকে জানান, গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকেও এটি ইট বিছানো রাস্তা ছিল।

তিনি বলেন, ‘তখন আশপাশে আর কোনো ইটের রাস্তা দেখিনি। এরপর কত বড় বড় রাস্তা হইছে, কিন্তু এইটায় পিচ ঢালাই হইছে কয়েক বছর আগে।’

আরেক বর্ষীয়ান কামরুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাধীনতার পরেও এই রাস্তা ব্যবহার করে আমরা ঢাকা গেছি। পরে অন্য বড় বড় রাস্তা হওয়ায় এইটা দিয়ে এখন আর যাওয়া হয় না। এ রাস্তা দিয়ে এখন আর তেমন গাড়িঘোড়াও চলে না। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী এহসান জুয়েলের বাড়ি বাঘারপাড়ায়। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাস্তার নামফলকে শের শাহ সড়ক দেখেছি। তবে আমরা এই রাস্তাকে নারিকেলবাড়িয়া-বুনোগাতি সড়ক বলি। ’

ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ

এই অঞ্চলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ সড়ক ই আজমের বিলীন হওয়া ঠেকাতে উদ্যোগ চান ঐতিহ্য রক্ষা কর্মীরা। যশোরের সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য জিল্লুর রহমান ভিটু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ছোটবেলায় গ্রামে যাওয়ার সময় সড়কটি দেখতাম। তখন ইতিহাসের বইয়ের পাতার সাথে এটি মেলাতাম। ভালো লাগত, কিন্তু এখন গ্রামে যাওয়ার পথে নামফলকটি চোখে পড়ে না। অনেকটা হারিয়েই গেছে শের শাহ সড়কের ইতিহাস।’

তিনি বলেন, ‘সড়কটি রক্ষা কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। ইতিহাসবিদদের এগিয়ে আসতে হবে প্রথম। তাদের সাথে আমরাও থাকব। ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা না গেলে তা দেশ ও জাতির জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনবে না।’

যশোরের সমাজকর্মী ও রাজনীতিক নাজিমউদ্দিন বলেন, ‘যশোরের পশ্চিমাংশের সড়কটিকে আমরা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড হিসেবে চিনি, যদিও আজ তা আর কাগজেকলমেও নেই। শুধু বাঘারপাড়ার ওই অংশটুকুতেই শের শাহর নামে আছে। এই ঐতিহ্য অবশ্যই রক্ষা করা দরকার।’

যশোর সরকারি এমএম কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জিল্লুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সড়কটি কলকাতা থেকে বেনাপোলে এসে শেষ হয়েছে। এরপর আর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে বাঘারপাড়ার কিছু অংশে এটি আছে। আমি মনে করি, সড়কটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য আমাদের রক্ষা করা উচিত। তবে এটি আমার বা আমাদের কারোরই একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার যদি চায়, তাহলেই কেবল এটা সম্ভব।’

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

বাঘারপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ভিক্টোরিয়া পারভীন সাথী বলেন, ‘সড়কটি রক্ষার বিষয় নিয়ে আমিও ভাবছি। সবার সহযোগিতা পেলে এটি করা সম্ভব। সড়কটির উন্নয়নে প্রয়োজনে উপজেলার পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।’

বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম মোয়াজ্জেম হোসেনের। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ইতিহাসের আলোকে বলতে পারছি না। আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। যেহেতু এটি অনেক পুরোনো একটি বিষয়, আমাদের ম্যাপ দেখতে হবে। যদি সেখানে কিছু পাওয়া যায়।’

সড়কটির বর্তমান অবস্থা ও নামফলকের বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র না দেখে আমি কিছুই বলতে পারব না। যেহেতু সড়ক ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে, সেহেতু অনেক সড়ক নির্মাণ হয়েছে এবং হচ্ছে। সেখানে এ বিষয়টি আসেনি।’

অন্যদিকে, সড়কটির তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মির্জা মো. ইফতেখার আলী বলেন, ‘সড়কটি এলজিইডির তত্ত্বাবধানে আসার পর সাবেক কর্মকর্তারা ইতিহাসকে ধরে রাখার জন্য দুটি নামফলক স্থাপন করেছিলেন। সেগুলো এখনও আছে। তবে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে তা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। আসছে বাজেটে ইতিহাস ও ঐতিহ্যর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আরও দুটি নামফলক স্থাপনের ব্যাপারে আমরা ভাবছি। সেগুলো অনুমোদন পেলে সড়কটির আসল ইতিহাস আমরা নামফলকে সংযুক্ত করে দেব। একই সঙ্গে সড়কটি সংস্কারের ব্যাপারেও উদ্যোগ নেয়া হবে।’

শেয়ার করুন

ঋণপ্রাপ্তিতে তলানিতে নারী

ঋণপ্রাপ্তিতে তলানিতে নারী

রাজধানীর সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে টাকা তুলছেন এক নারী। ছবি: নিউজবাংলা

এক দশকে নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৪৪ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার ঋণ, যা মোট বিতরণ হওয়া ঋণের মাত্র ৪ শতাংশ।

উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজন ব্যাংক ঋণ; কিন্তু সেই ঋণ নেবার ক্ষেত্রে বাড়ছে না নারীর অংশগ্রহণ। এক দশকে মোট বিতরণ হওয়া ঋণের মাত্র ৪ শতাংশ পেয়েছেন নারী। এতেই স্পষ্ট, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণ কতটা বিস্তৃত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নারীদের স্বাবলম্বী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যাংকগুলো কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো পরিদর্শনের সময়ও বলা হয় বছরে তিনজন নারী উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। তারপরও ঋণ বিতরণ সেই হারে বাড়েনি। কেন ঋণ বাড়ছে না সেটা আগে খতিয়ে দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ঋণ নেবার ক্ষেত্রে নারীদের আগ্রহ কম, নাকি ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহজলভ্যতা একটি বড় বাধা, সেটা বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নারীর নামে ঋণের আবেদন করছেন তার স্বামী। এ জন্য ঋণের হার কম। কিন্তু মূল নারী উদ্যোক্তারা ঋণ চাইলে ব্যাংক তাদের ঋণ দেবে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, যেকোনো ব্যবসা শুরু এবং তা টিকিয়ে রাখাও নারীদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ঋণ নেয়ার জন্য নারীদের নির্দিষ্ট উদ্যোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। আবার ঋণের টাকা যথাযথভাবে ফেরত দেয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

এখন নারীর ঋণ পাওয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। এরপরও ব্যাংক ব্যবস্থা, এনজিও বা সমবায়- সব উৎস থেকেই ঋণ নেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নারী। নারীকে সামনে রেখে অনেক পুরুষ ঋণ নিতে চান। ব্যাংক এসব খতিয়ে দেখে ঋণ দেয় বলে প্রকৃত নারী উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি হার কম।

নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ উদ্যোগ নারীর নামে চালানোকে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখে ব্যাংকগুলো। বিভিন্ন ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঋণের জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা জোগাড় না করেই ব্যাংকে যান নারীরা। আবার ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেয়ে অনেক সময় উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

নারী উদ্যোক্তাদের জামানতের অপর্যাপ্ততা থাকে। কারণ, আর্থিক বিষয়ে নারীরা পুরুষদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।

কেন নারী উদ্যোক্তা ঋণ পাচ্ছেন না, জানতে চাইলে পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার গুডসের স্বত্বাধিকারী রেজবিন হাফিজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কম। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের অজ্ঞতাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ নেয়ার জন্য এত বেশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা কাগজপত্র দেখাতে হয়, যা হয়রানির পর্যায়ে চলে যায়।’

‘বানিস ক্রিয়েশন’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তাহমিনা আহমেদ বাণী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন মূল উদ্যোক্তার সংখ্যা খুব কম। ফেসবুক বা এফ-কমার্স উদ্যোক্তা বেশি। আগে মূল উদ্যোক্তা চিহ্নিত করতে হবে। অনেক নারী জানেনই না যে ব্যবসা করার জন্য ঋণ নেয়া যায়। আবার অনেকে মনে করেন, ঋণ নেয়া ঝামেলার একটা বিষয়। ব্যাংকে কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন- এই বিষয়টি সম্পর্কে অনেকের ধারণা স্পষ্ট নয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, গত এক দশকে (২০১০-২০২০) নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৪৪ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার ঋণ, যা মোট বিতরণ হওয়া ঋণের মাত্র ৪ দশমিক ০৩ শতাংশ।

এ সময় শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়েছেন ১৪ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার। এ ছাড়া সেবা খাতে ৬ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার এবং ব্যবসা খাতে ২৩ হাজার ৫৫২ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছে নারী।

ঋণ তেমন না বাড়লেও এ সময় বেড়েছে নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ২০১০ সালে দেশে নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ২৩৩টি। ২০২০ সাল শেষে সেটা বেড়ে হয়েছে ৬৬ হাজার ১৮৯টি।

তবে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও ঋণ আশানুরূপ বাড়েনি। ২০১০ সালে মোট ঋণের ৩ দশমিক ৩৭ ভাগ বা ১ হাজার ৮০৪ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। ১০ বছর পরে সেটা সামান্য বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।

নারীদের অর্থনীতিতে এগিয়ে নিতে ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতে তাদের সহায়তা দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর মোট এসএমই ঋণের একটি অংশ নারীদের জন্য বিতরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়নের আওতায় নারীরা মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন। পুরুষ উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে এ হার ৯ শতাংশ।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়নের আওতায় এসএমই খাতে বিতরণ করা ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারীদের মাঝে দেওয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৪ সাল নাগাদ এসএমই খাতে একটি ব্যাংকের বিতরণ করা মোট এসএমই ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারীদের দিতে হবে।

আবার করোনাভাইরাসের ক্ষতি পোষাতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ৫ শতাংশ নারীদের জন্য বরাদ্দ দিতে বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব উদ্যোগের পরও ব্যাংক ঋণে নারীদের অংশ সেভাবে বাড়ছে না।

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে নারী উদ্যোক্তাকে দেয়া হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ২৯০ কোটি টাকার ঋণ। এর মানে, মোট ঋণের মাত্র ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ পেয়েছেন নারীরা। ২০১৯ সালে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ঋণের ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ পেয়েছিলেন নারীরা। ২০১৮ সালে দেয়া হয় ৫ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। যা এসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গত ১০ বছরের চিত্র একই রকম।

দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। এদের প্রায় ৮৭ শতাংশই করোনাকালে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আর বাকি ১৩ শতাংশ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে যুদ্ধ করছেন।

জরিপ বলছে, করোনা মহামারিতে পুরুষের চেয়ে নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষতির মাত্রা ছিল বেশি। নারীদের প্রতি ১০০ জনে ৮৭ জনই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

নারী উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেকে ব্যাংক ঋণ চেয়েও খালি হাতে ফিরেছেন । ব্যবসায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে সামাজিক বাধা ও ঋণ পাবার বাধা দুটোই দূর করতে হবে।

শেয়ার করুন

রপ্তানি-সহায়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে

রপ্তানি-সহায়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে

প্রস্তুতিপর্বে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। রপ্তানি খাত পোশাকসহ গুটি কয়েক পণ্যের ওপরও নির্ভরশীল।

স্বল্পোন্নত-এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। চূড়ান্তপর্বে যেতে হলে আমাদের এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাহলে পণ্যের খরচ কমবে। ফলে প্রতিযোগিতার সামর্থ্য বাড়বে। উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে যাবে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, তাতে খুব অসুবিধা হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমরা বাজারসুবিধা পাই না। তাতে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং প্রতিযোগিতা করে ভালোভাবে টিকে রয়েছে। দেখা গেছে, শুল্ক পরিশোধ করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। আসল কথা হলো, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানি বাড়বে।

প্রস্তুতিপর্বে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। রপ্তানি খাত পোশাকসহ গুটি কয়েক পণ্যের ওপরও নির্ভরশীল।

অনেক দিন ধরে তা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে পারলে যেসব বাজারে শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে সেখানে অসুবিধা হবে না।

পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আরেকটি কাজ করতে হবে। তা হলো, যেসব দেশ বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় না, সেসব দেশে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে এ পদক্ষেপ নিতে হবে।

পোশাকপণ্যের রপ্তানির মধ্যে বেশির ভাগই বেসিক আইটেম। এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক সস্তা। রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে উচ্চ মূল্যের পোশাক বানানোর দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।

এ ছাড়া কৃষি ও ইলেকট্রনিক পণ্যে বহুমুখীকরণের সুযোগ রয়েছে। এসব খাতের বিকাশে কর প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা আরও বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রণয়নে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বলতা আছে। এখানেও নজর দিতে হবে।

চামড়া দেশের সম্ভাবনাময় খাত। নানা সমস্যায় জর্জরিত খাতটি। সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরিত হলেও অবকাঠমো দুর্বলতার কারণে অনেক কারখানা সক্রিয় নয়। পরিবেশ দূষণরোধে ব্যবহৃত বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনে ঘাটতি রয়েছে।

এসব দুর্বলতার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে করা হয় না। গলদ রয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনায়। উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে হবে রপ্তানি সহায়ক। যথাযথ নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন ঠিকমতো করতে পারলে বাংলাদেশ অনেক দূর যাবে।

শিল্প খাতে প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগত ত্রুটি আছে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে অনেক ক্ষেত্রে দেয়া হয় না। প্রণোদনা দিতে হবে খাতভিত্তিক বা টার্গেট করে। তা হলে এর সুফল পুরোপুরি মিলবে। করোনা মহামারির কারণে অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারে প্রণোদনাসুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে।

গত কয়েক বছর বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি অনুপাতে বিনিয়োগ একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন উন্নয়নের ধারাকে সামনের দিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে দেশি–বিদেশি (এফডিআই) বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি জোর দিতে হবে।

এই বিনিয়োগ হতে হবে ভৌত অবকাঠামো খাতে। দেশের বন্দরের অবকাঠামো দুর্বল এখনও। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায়ও ত্রুটি আছে। সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম একটি অংশ হচ্ছে দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে নজর দিতে হবে সরকারকে।

পণ্যের খরচ কমাতে হলে উন্নত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ নানা ধরনের অবকাঠামো সমস্যা রয়েছে। এর সমাধান করতে হবে। দ্রুত মালামাল পাঠাতে হলে শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

উত্তরণের পর উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নমনীয় ঋণ পাওয়া না গেলে অসুবিধা হবে না। বিদেশ থেকে কম সুদে ঋণ না নিয়ে বাংলাদেশ যে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, তার বড় উদাহরণ পদ্মা সেতু। বিশ্ব ব্যাংক ঋণ দেয়নি। নিজেদের টাকায় দৃশ্যমান পদ্মা সেতু। নিজেদের টাকায় করতে পেরেছি, তার অর্থ হচ্ছে আমাদের সক্ষমতা আছে। আরও বাড়াতে হবে। তা হলে ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে এবং আরও বেশি ঋণ পাওয়া যাবে।

ড. জায়েদ বখত, সাবেক ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক বিআইডিএস, চেয়ারম্যান অগ্রণী ব্যাংক

# সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, আবু কাওসার

শেয়ার করুন

১৬ হাজার কোটি ঘণ্টার কাজ, নেই স্বীকৃতি

১৬ হাজার কোটি ঘণ্টার কাজ, নেই স্বীকৃতি

গৃহস্থালি কাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। ছবি: সাইফুল ইসলাম

গৃহস্থালিকাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে জিডিপিতে নারীর অংশ বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশে।

নাজমা আক্তার। পেশায় গৃহকর্মী। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে দুপুর পর্যন্ত মিরপুরের শেওড়াপাড়ার তিনটি বাসায় গৃহস্থালিকাজ করেন। দুপুরের পর আবার বের হন। আরও তিনটি বাসায় কমপক্ষে ছয় ধরনের কাজ শেষ করে যখন বাসায় ফেরেন, ততক্ষণে অস্তমিত সূর্য।

মাসের ২৫ থেকে ২৮ দিনই এমন রুটিন মেনে চলে জীবন। সব মিলিয়ে মাসে নাজমার আয় হয় আট থেকে নয় হাজার টাকা। ঘরভাড়া এবং দুই সন্তানের চাহিদা এই টাকায় পূরণ হয়। আর খাওয়াদাওয়ায় ব্যয় হয় স্বামীর আয়। সংসারে যে খরচ হয়, তার সিংহভাগের জোগান দেন নাজমা।

কিন্তু নাজমার এই আয় অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে কতটুকু? সংসারে আয়ের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী সমান হলেও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে নাজমার কাজের কী মূল্যায়ন?

নাজমার মতোই দেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত প্রায় ১৭ লাখ নারী।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত। গৃহকর্মে শ্রমের প্রায় ৯০ ভাগই নারীর। এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে এত দিনেও নিশ্চিত হয়নি অধিকার এবং কর্মপরিবেশ।

সরকারি পর্যায়ে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এখনও শেষ হয়নি নীতিমালা তৈরির কাজ। শুধু গৃহকর্মই নয়, সার্বিকভাবে নারীর গৃহস্থালিকাজের কোনো স্বীকৃতি নেই।

গৃহস্থালি কাজে বিপুল কর্মঘণ্টা ব্যয় করেও স্বীকৃতি পান না নারীরা। ছবি: সাইফুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘৯০ শতাংশের ওপরে নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। আশির দশকে শ্রমবাজারে নারীর অবদান ছিল ৮ শতাংশ। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৩২ শতাংশ।

‘কিন্তু সার্বিকভাবে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়, পরিচালক, বড় ধরনের উচ্চপদে নারীর অবস্থান এখনও অনেক কম। এ জন্য বাল্যবিয়ে বন্ধ, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। পারিবারিক বা গৃহস্থালি শ্রমের কারণে নারীরা মূলধারায় আসতে পারে না। এ জন্য নারীর কাজের সহায়কপদ্ধতি, পলিসি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

একটা স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট খুলে নারীর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমমূল্যের একটা আলাদা হিসাব করার প্রস্তাব দেন বিদিশা। তিনি বলেন, ‘এমন হিসাব করলে নারীর যে অবদান একেবারে আমাদের চোখের বাইরে থেকে যায়, সেটা বোঝা যাবে। এটা নারীর সম্মান বৃদ্ধিতে একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

তিনি বলেন, ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজগুলো শুধু স্বীকৃতি দিলে হবে না, পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যরা যেন ঘরের কাজে সমভাবে অংশ নেয়, সেটার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক কাজের চাপের কারণে নারীরা মূলধারার শ্রমবাজারে কাজ করতে চায় না।

‘ইচ্ছা করলেও নারীরা অন্য কাজ করতে পারে না। এ জন্য প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি খাতের অফিসে শিশু দিবাকেন্দ্র থাকা জরুরি। আর যেসব অফিসে শিশু দিবাকেন্দ্র আছে সেগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগের তুলনায় শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণই বেশি। সংসারে সচ্ছলতার জন্য নিজের জমানো অল্প কিছু অর্থ নিয়েই গ্রামের অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত একজন নারী তার ব্যবসা শুরু করার সাহস দেখাচ্ছে। তাদের এ শ্রমের মূল্যায়ন হচ্ছে না।’

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বড়সংখ্যক নারী

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন দেশের বিপুলসংখ্যক নারী। ছবি: সাইফুল ইসলাম

সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে জীবিকা নির্বাহ করছে দেশের শ্রমশক্তির বিশাল অংশ। মোট শ্রমশক্তির ৮৫ দশমিক ১ শতাংশেরই স্থায়ী কাজ নেই। দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে মোট শ্রমশক্তির মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। এর মধ্যে নারীশ্রমিক রয়েছেন ১ কোটি ৭১ লাখ ২১ হাজার।

কর্মক্ষেত্রে নারী

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গৃহস্থালিকাজ নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়ার পথে বড় বাধা। শ্রমবাজারে যোগ না দেওয়া নারীর ৮১ দশমিক ১০ শতাংশই এর জন্য ঘরের কাজের চাপকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে একই কারণে শ্রমবাজারে প্রবেশে বাধা পাচ্ছেন ৮ দশমিক ১০ শতাংশ পুরুষ। উপযুক্ত কাজ পেলে শ্রমবাজারে যোগ দিতে ইচ্ছুক এমন নারীর সংখ্যাও পুরুষের প্রায় দ্বিগুণ।

উপযুক্ত কাজ পেলে শ্রমবাজারে পুুরুষের চেয়ে নারীর আগ্রহ বেশি বলে জানিয়েছে বিবিএস। ছবি: সাইফুল ইসলাম

জিডিপিতে গৃহস্থালিকাজ

গৃহস্থালিতে নারীর যে কাজ দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না, সেই শ্রমের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য কত? বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক গবেষণা বলছে, গৃহস্থালিকাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে জিডিপিতে নারীর অংশ বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ।

শ্রম জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫-২৯ বছর বয়স্ক নারীর ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ নেই। অর্থাৎ তারা ঘরের ভেতরে সাংসারিক কাজে নিয়োজিত। একই বয়সের পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ। তাই শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং সার্বিক শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে না নিতে পারায় গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকার প্রবণতা বাড়ছে।

শ্রমশক্তিতে নারী

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬ ভাগের বেশি। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প, সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। তবে, এর মধ্যে মাত্র ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে কাজ করছে। তাদের মাসিক আয় গড়ে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকেরা জানান, শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও দৈনিক মজুরির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

নারীর কর্ম খাত

দেশের নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ কাজ করেন কৃষি খাতে। ছবি: সাইফুল ইসলাম

কৃষি খাত এখনও নারীর শ্রম নিয়োজনের প্রধান জায়গা। নারীরা যেসব খাতে শ্রম দেয়, তার মধ্যে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ হচ্ছে কৃষি। ৫ দশমিক ২ শতাংশ শিল্প খাতে এবং সেবা খাতে রয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। শিল্প খাতে নারীশ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে নারীশ্রমিক নিয়োগের সংখ্যা কমে গেছে। আশির দশকে গার্মেন্টস খাতে নারীশ্রমিকের হার ছিল প্রায় ৮০ ভাগ। তবে এখন তা নেই।

সিপিডির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতে নারীশ্রমিকের সংখ্যা ৬০ ভাগের বেশি না। নারীর বড় পদে না আসার কারণ দক্ষতার অভাব, পারিবারিক কাজের চাপ ও নিয়োগকর্তাদের মানসিকতা।

পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার গুডসের স্বত্বাধিকারী রেজবিন হাফিজ নিউজবাংলাকে বলেন, একজন নারী সামনে এগিয়ে যেতে পারবে কি না, সে বিষয়ে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তবে আগের চেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। নারীর নিজে কিছু করার ক্ষেত্রে অর্থায়ন সবচেয়ে বড় বাধা। নারীরা ক্ষুদ্র কোনো ব্যবসার জন্যও যেন সহজে অর্থ পেতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।

শেয়ার করুন

‘তোর দ্বারা কিছু হবে না’

‘তোর দ্বারা কিছু হবে না’

বানী’স ক্রিয়েশনের স্বত্বাধিকারী তাহমিনা আহমেদ বানী। ছবি: নিউজবাংলা

বানী বলেন, ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে ভালো লাগত না। তাই সবাই বলত, তোর দ্বারা কিছু হবে না।’

‘হোম ইকোনমিকস কলেজে অ্যাপ্লায়েড আর্টে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে স্বামীর কাছে টাকা চাইতে হতো। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, টাকা না চাওয়ার জন্য কী করতে হবে? বিকল্প একটাই খুঁজে পাই তখন, নিজে কিছু করতে হবে।’

নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুর দিকের গল্প বলছিলেন বানী’স ক্রিয়েশনের তাহমিনা আহমেদ বানী।

কথা প্রসঙ্গে নিজের ছোটবেলার একটি গল্পও বলেন উদ্যোক্তা এই নারী।

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে ভালো লাগত না। তাই সবাই বলত, তোর দ্বারা কিছু হবে না।

‘বারবার এমন কথা শুনে মনের মধ্যে জেদ চেপে বসে। তৈরি হয় অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সকলের তাচ্ছিল্য থেকে স্থির করি, কিছু একটা করতে হবে।’

ইচ্ছাশক্তির জোরে বানী এখন বড় উদ্যোক্তা। তৈরি করেন বাহারি কেক। তবে বাজারে এখন যে ধরনের কেক পাওয়া যায়, তেমন না। বানীর কেকে রয়েছে ভিন্নতা।

২০১৩ সালে বানী তার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৭ সালে খিলগাঁও তালতলাতে চালু হয় প্রথম আউটলেট। বানী বলেন, ‘আগে মানুষের আস্থা তৈরি করেছি। তারপর আউটলেটে কার্যক্রম শুরু করি।’

বর্তমানে বানী’স ক্রিয়েশনের তিনটি আউটলেট রয়েছে। এগুলোতে কাজ করছেন ২২ জন।

বানী বলেন, ‘যেকোনো থিম কেকের অর্ডার কিংবা যেকোনো কাস্টমাইজড কেক যত বড়ই হোক না কেন, তা তৈরি করে দেয়া অসম্ভব না। একটা বাচ্চার জন্মদিনে সাধারণ কেক না হয়ে যদি তার উপযোগী ডিজাইন কেক হয়, তাহলে উৎসবে আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।’

বানীর একাডেমি
বানীর ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেখানে বেকিং, কুকিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

বানী তার মেয়ের জন্মদিনের কথা বলছিলেন। প্রথম জন্মদিনে খুব সাদাসিধে একটি কেক নিয়ে আসেন তিনি। পরে একটা ‘হামটি ডামটি’ পুতুল বানিয়ে কেকের ওপর বসিয়ে দেন। এতে বেড়ে যায় উৎসবের আমেজ। এরপর তিনি বিভিন্ন বইয়ে রেসিপি দেখে কেক বানাতে শুরু করেন। কেকের সঙ্গে পুতুল দিয়ে নিজেই ডিজাইন করা শুরু করেন।

এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রথমে বাসা থেকে কেক সরবরাহ করতাম। পরিবারের বা বন্ধুদের যেকোনো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে নিজের বানানো কেক নিয়ে যেতাম। সবার বাসায় এভাবে খাবার নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মার্কেটিং শুরু হয়। তখন সবাই এটা বাণিজ্যিকভাবে করার পরামর্শ দেয়। একটা সময় সবাই অর্ডার দেয়া শুরু করে।’

যতই দিন যাচ্ছে বড় হচ্ছে বানীর উদ্যোগ। বানী’স ক্রিয়েশন নামে খোলা হয়েছে ফেসবুক পেজ। সেখানে বিভিন্ন কেকের ছবি দেয়া আছে। প্রতিদিন একটি নতুন করে কেক বানান এবং তার ছবি তুলে ফেসবুকে পেজে দেন। দেড় মাস পর ফোনে মারমেইড ডিজাইনের প্রথম কেকের অর্ডার পান তিনি। এর থেকে অনলাইনে অর্ডার আসা শুরু হয়।

ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চাহিদা। স্বামী নাসিম আহমেদ নিপ্পন এবং বানী সিদ্ধান্ত নিলেন প্রফেশনাল একটি কোর্স করবেন। এক বছরব্যাপী ‘ব্রেড অ্যান্ড কুকিস’ তৈরির একটি কারিগরি কোর্স সম্পন্ন করলেন বানী। ইন্টার্নশিপ শুরু করলেন স্বনামধন্য বেকারিতে।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বানী’স ক্রিয়েশনে প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি করে অর্ডার আসতে শুরু করে। ক্রেতাও বাড়তে থাকে হু হু করে। কয়েক বছরের মধ্যে ফেসবুক পেজের সদস্য ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

কেকের সঙ্গে আরও অন্য কিছু যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে বলে জানান বানী।

বললেন, ‘আমার নিজস্ব একটা ইনস্টিটিউট আছে, যেখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এখানে বেকিং, কুকিং এসবের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটাকে আরও বড় পরিসরে পরিপূর্ণ ইনস্টিটিউট করতে চাই।’

করোনাভাইরাস মহামারিতে গত বছর অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান বানী। শুরুতে অনেক বড় বড় বুকিং ছিল, সেগুলো বাতিল হয়ে যায়। করোনার কারণে গ্রিন রোড ও পান্থপথ এ দুটি আউটলেট বন্ধ করতে হয়। কিন্তু তিনি আশাহত হননি। ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকলে তিনিও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

Bannis-Workers-NB
বানী’স ক্রিয়েশনের তিনটি আউটলেট রয়েছে। এগুলোতে কাজ করছেন ২২ জন। ছবি: নিউজবাংলা

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বানী বলেন, ‘উদ্যোক্তা হতে হলে আগে লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। আমি কী করতে চাই, সেই বিষয়টি ঠিক করা জরুরি। যেকোনো একটি বিষয় নিয়ে আগে শুরু করতে হবে।

‘ধৈর্য, সততা, অদম্য মনোবল আর সর্বোপরি ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে। তাহলে যে কারও পক্ষে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আগে ঠিক করতে হবে, কোন খাতের উদ্যোক্তা হব। যে কাজকে ভালোবাসব সেটা নিয়েই এগোতে হবে। উদ্যোক্তা হতে হলে অর্থায়ন সবচেয়ে বড় বিষয়। এ জন্য অল্প অল্প পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বানীর পরামর্শ, ‘কোনো কিছু নিয়ে তাড়াহুড়া করা যাবে না। আগে পথঘাট চিনতে হবে। তারপর কাজ শুরু করতে হবে।’

শেয়ার করুন

ঘরের কাজে হাত লাগাচ্ছে পুরুষেরাও

ঘরের কাজে হাত লাগাচ্ছে পুরুষেরাও

ঘরের কাজে নারীদের সাহায্য করছেন অনেক পুরুষ। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

২০১৭ সালে যেখানে নারী ও পুরুষের গৃহস্থালির কাজে সময় ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ১৯ ঘণ্টা, ২০১৮ সালে এই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭৫ ঘণ্টায়। ২০১৯ সালে এ ব্যবধান ৩ দশমিক ৪৩ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।

পুরুষের শ্রম মানে সংসারের আয়। বিনিময়মূল্য বা মজুরি ছাড়া কোনো পুরুষ শ্রম দেয় এমনটা এত দিন চিন্তাই করা যায়নি। বিপরীতে গৃহস্থালির কাজের দায় কেবল নারীর, যার কোনো পারিশ্রমিক নেই। এ থেকে আয় আসে না। সংসারের যাবতীয় কাজ নারীরাই করে যাবেন।

এই ছিল চিরকালীন মানসিকতা।

কিন্তু সময় বদলেছে। পুরুষের এই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। এখন পুরুষেরাও বাড়ির কাজে নারীর মতো বিনা মজুরির শ্রম দিচ্ছেন। পরিমাণ বিচারে তা অনেক কম হলেও পারিবারিকভাবে এ চর্চা এখন শুরু হয়েছে।

কিশোর, তরুণ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহরাঞ্চল বা গ্রামে পুরুষের মধ্যে ঘরের কাজে অংশ নেয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।

বাসাবাড়ি বা গৃহস্থালির কাজের তালিকায় রয়েছে রান্না করা, সন্তান লালনপালন এবং স্কুলে আনা-নেয়া, কাপড় পরিষ্কার, ঘর ধোয়ামোছা, বিছানা ঝাড়া, মশারি টাঙানো, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সেবা করার মতো বিষয়গুলো।

ঐতিহ্যগতভাবে সেবামূলক এসব কাজে নারীর অবদান একচ্ছত্র। যুগ যুগ ধরে তারাই মূলত পরিবারের সদস্যদের ভালোবেসে কোনো অর্থমূল্য ছাড়া এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সেবামূলক এই কাজগুলোকে পুরুষেরা এত দিন নারীর দায়িত্ব ভেবে এড়িয়ে চলতেন। খুব একটা মূল্যায়নও করতেন না। এখন সচেতন পুরুষেরা এসব সেবামূলক কাজের জন্য নারীর কষ্ট ও ত্যাগকে অনুধাবন করতে শুরু করেছেন। কিছুটা হলেও ভার তুলে নিচ্ছেন নিজেদের কাঁধে।

অনেকেই এখন বাইরের কাজে ব্যস্ততা সেরে ঘরে ফিরে সহায়তা দিচ্ছেন স্ত্রীকে, কেউ মা কিংবা বোনকে। সবকিছু দেখছেন ভালোবাসার দৃষ্টিতে। বয়সের পার্থক্য এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ফলে অনেকেই কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাসাবাড়ির জমে থাকা অনেক কাজ সারছেন নিজ হাতে।

গৃহস্থালির কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও জরিপে।

এ বিষয়ে অ্যাকশনএইড পরিচালিত জরিপে নারীর কাজে পুরুষের সহায়তা প্রদানের প্রবণতা বাড়ার সুস্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে।

অ্যাকশনএইডের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে নারীরা মজুরিবিহীন সেবামূলক কাজ করেছেন দৈনিক ৭ দশমিক ৭৮ ঘণ্টা। পুরুষেরা করেছেন ১ দশমিক ১ ঘণ্টা। ২০১৭ সালে একই কাজে নারীর সেই অবদান কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৫০ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। আর পুরুষের অবদান বেড়ে ২ দশমিক ৩৭ ঘণ্টায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থাৎ গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজে নারী-পুরুষের সময় ব্যয়ের ব্যবধান প্রতিবছর কমে আসছে। অর্থাৎ পুরুষেরা এ কাজে নিজেদের সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছেন।

২০১৭ সালে যেখানে নারী ও পুরুষের গৃহস্থালির কাজে সময় ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ১৯ ঘণ্টা, ২০১৮ সালে এই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭৫ ঘণ্টায়। ২০১৯ সালে এ ব্যবধান ৩ দশমিক ৪৩ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা জরিপে দেখেছি, গৃহস্থালির অবৈতনিক সেবামূলক কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বাড়ছে। তারা এ কাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখন ঘরের সেবামূলক কাজকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করতে শিখেছেন এবং এর পাশাপাশি নারীকেও সহযোগিতা দিচ্ছেন।’

এটি শুধু যে শহুরে পরিসরে ঘটছে তা নয়। রাজধানীর বাইরে জেলা বা থানা পর্যায়েও গৃহকাজে বাড়ছে পুরুষের অংশগ্রহণ।

তিনি বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে নারীদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন পুরুষেরাও। স্বামী গৃহস্থালি কাজের ভাগ নেয়ায় নারীরা বাড়তি আয়ের জন্য কাজের সময় পাচ্ছেন।

গৃহস্থালির সেবামূলক মজুরিবিহীন কাজে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে গবেষণা করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তার গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে, ভোর শুরু হওয়ার পর আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একজন নারী কীভাবে অবৈতনিক সেবামূলক কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে থাকেন। এ কাজ অবৈতনিক হওয়ায় মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তাদের শ্রম ও কর্মঘণ্টা হিসাব হচ্ছে না।

গৃহস্থালির কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে, এ সম্পর্কে ড. ফাহমিদা খাতুনের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা ঠিক, পুরুষের মানসিকতায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে সবার মধ্যে আসেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠরা এখনও আগের মানসিকতাই পোষণ করছেন। তারা এ সেবামূলক কাজগুলোকে এখনও নারীর দায়িত্ব ভেবে সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. ফাহমিদা বলেন, গৃহস্থালির সেবামূলক ও মজুরিবিহীন কাজে পুরুষ ভিড়তে শুরু করেছে, এটা ইতিবাচক দিক। তবে শতকরা কত ভাগ বেড়েছে, প্রকৃত তথ্য পেতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ এমন স্লোগানে নারীর অমূল্যায়িত কাজের স্বীকৃতির দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। কতটা অগ্রগতি হলো এ লড়াইয়ে, এমন প্রশ্ন রাখা হলে বেসরকারি এ সংস্থাটির কো-অর্ডিনেটর শাহানা হুদা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি, তাহলে বলব অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। পুরুষের মানসিকতার বড় পরিবর্তন ঘটেছে। একটা সময় বাপ-দাদারা পানিটুকুও ঢেলে খেতেন না। এখন পানি ঢেলে খাচ্ছেন, এমন মানুষ বহু মিলবে। এটা একটা উদাহরণ। নারীর কষ্ট লাঘব হয়, এমন অন্যান্য কাজেও পুরুষেরা এখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।’

তবে তথ্য-উপাত্তের দিক থেকে সেটি এখনও খুব বেশি নয় বলে মনে করেন শাহানা হুদা। তিনি বলেন, ‘কারণ এখনও নারী প্রতিদিন গড়ে ১২টির বেশি মজুরিবিহীন কাজ করছেন, পুরুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজের সংখ্যা মাত্র ২ দশমিক ৭টি।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ মতে, ১৯৮৩-৮৪ সালে বেতনভুক্ত কাজে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৭ দশমিক ৮ ভাগ এবং পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল ৮৯ দশমিক ৯ ভাগ। ২০১০ সালের হিসাবে এতে নারীর অবদান বেড়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বেতনভুক্ত কাজে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে অবৈতনিক কাজ হ্রাস পায়। অবৈতনিক কাজ সাধারণত গৃহস্থালিতেই হয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বাড়ছে। ফলে বেতনভুক্ত কাজেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প, সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। এর মধ্যে ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে উৎপাদনশীল বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। বাকিরা অনুৎপাদনশীল খাতে মজুরির বিনিময়ে কাজ করছে।

শাহানা হুদা বলেন, ‘গৃহকাজে নারী-পুরুষ সমতায় না এলেও অন্তত সমতার কাছাকাছি পরিবর্তন আমরা দেখতে চাই। যদিও এর জন্য আরও সময় লাগবে। আগামী প্রজন্ম হয়তো এটা দেখতে পাবে। সে আশাতেই আমরা কাজ করছি। সরকারও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে দরকার সমাজ সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জেন্ডার সহায়ক বাজেট বৃদ্ধি করে এ-সম্পর্কিত প্রকল্প চালু করা।’

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg