× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
The sun is revolving around the earth why the claim of deposit is wrong
hear-news
player

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল

সূর্যই-ঘুরছে-পৃথিবীর-চারদিকে-আমানতের-দাবি-কেন-ভুল চুয়াডাঙ্গার আমানত উল্লাহর দাবি, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে সূর্য। এ বিষয়ে বইও লিখেছেন তিনি (বাঁয়ে)। ছবি: নিউজবাংলা
আমানত উল্লাহর পর্যবেক্ষণ বিস্তারিত জানার পাশাপাশি মহাকাশ বিজ্ঞানের আলোকে সেগুলোর সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেছে নিউজবাংলা। সৌরজগৎ সম্পর্কিত বিজ্ঞানের ধারণা রাখা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ খণ্ডন করেছেন আমানত উল্লাহর দাবি।

পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে এমন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে ‘ভুল’ দাবি করে কয়েক মাস ধরে ব্যাপক আলোচিত চুয়াডাঙ্গার আমানত উল্লাহ। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধরনের লেখাপড়ার সুযোগ না পাওয়া ৭০ বছর বয়সী আমানতের পাল্টা পর্যবেক্ষণ, সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারপাশে।

তার এই দাবি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা। নানা ধরনের বিদ্রুপ ও রসিকতার মুখে পড়েছেন আমানত উল্লাহ।

তবে এই বৃদ্ধের দাবি, ২৮ বছর টানা পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের অনেক রহস্য অকাট্য প্রমাণসহ তিনি উন্মোচন করেছেন। তার মতে, পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘুরছে, আর মানুষের বসতি এই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে সূর্য।

আমানত উল্লাহর পর্যবেক্ষণ বিস্তারিত জানার পাশাপাশি মহাকাশ বিজ্ঞানের আলোকে সেগুলোর সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেছে নিউজবাংলা। সৌরজগৎ সম্পর্কিত বিজ্ঞানের ধারণা রাখা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ খণ্ডন করেছেন আমানত উল্লাহর দাবি।

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল
পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ১৬ কোটি কিলোমিটার

আমানতের দাবি অনুসন্ধানের সময় মহাকাশবিদ্যার প্রতি তার তুমল আগ্রহ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রচেষ্টার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ব্যাপক বিদ্রুপের শিকার হলেও তিনি সৌরজগতের রহস্য ভেদ করার চেষ্টায় অনড় থেকেছেন। নিজের সীমিত সম্পদের পুরোটাই বিক্রি করে খরচ করেছেন গবেষণার কাজে। এ কাজে তাকে সাহায্য করা তিনজনও অত্যন্ত দরিদ্র।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের মৃত কিয়ামদ্দিন মালিতার ছেলে আমানত উল্লাহ। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছোট। দাম্পত্য জীবনে কোনো সন্তান হয়নি। আড়াই বছর আগে মারা গেছেন স্ত্রী রহিতন নেছা।

মহাকাশের রহস্য ভেদের নেশায় মেতে থাকা আমানত জীবনে কোনো দিন স্কুলে যাননি। আলমডাঙ্গা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসে ২৮ বছর ‘গবেষণা’ করে পৃথিবীকেন্দ্রিক ‘বিশ্বতত্ত্বের মডেল’ আবিষ্কারের দাবি তার।

আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ী বাজারের একটি দোকানে তার বানানো সেই মডেল দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এমনকি সাধারণ মানুষও। কেউ কেউ দিচ্ছেন উৎসাহ, আবার অনেকে করছেন উপহাস।

দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর আমানতের তৈরি করা পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের মডেলটি শুরুতে ছিল অনেক বড়। পুরো ঘরে ছিল এর বিস্তৃতি। পরে তিনি সেই মডেলটি ছোট আকারে তৈরি করেন, যা এখন সহজেই বহনযোগ্য।

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল
আমানত উল্লাহর পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের মডেল

আমানতের এই কর্মযজ্ঞে সহযোগিতা করছেন উপজেলার জাহাপুর গ্রামের ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি বাদল কুমার কর্মকার, জোড়গাছা গ্রামের রেডিও মিস্ত্রি মতিয়ার রহমান ও ঘোলদাড়ি বাজারের বাইসাইকেল মিস্ত্রি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ গত বছর কোরবানির সময় ঢাকায় গরু বিক্রি করতে গিয়ে স্ট্রোকে মারা যান। আব্দুল্লাহর সাইকেলের দোকানেই এখন গবেষণার সরঞ্জাম রেখেছেন আমানত।

কী দাবি করছেন আমানত

দীর্ঘ গবেষণা শেষে নিজ অক্ষে ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর চারপাশে সূর্য ঘুরছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন আমানত। এ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক যেকোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন এই বৃদ্ধ। আমানতের দাবি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ২০১৩ সালে প্রণীত মাধ্যমিক পর্যায়ের নবম-দশম শ্রেণির ‘ভূগোল ও পরিবেশ’ বিষয়ের পাঠ্যবইয়ে পৃথিবীর বার্ষিক গতির পাঁচটি প্রমাণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিজের কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছেন তিনি।

ওই পাঠ্যবইয়ে পৃথিবীর বার্ষিক গতির প্রথম প্রমাণে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে রাতের আকাশে পূর্ব থেকে পশ্চিমে নক্ষত্রগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করতে দেখা যায়। মেঘমুক্ত আকাশে কয়েক দিন পর পর লক্ষ করলে নক্ষত্রের পূর্ব থেকে পশ্চিম আকাশে সরে যাওয়া বোঝা যায়। এরপর একদিন এরা অদৃশ্য হয়ে যায়। ঠিক এক বছর পর এরা আদি স্থানে ফিরে আসে। এ থেকে পৃথিবীর যে বার্ষিক গতি আছে তা বোঝা যায়।

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল
আমানতের দাবি সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহের সঙ্গে পৃথিবীর বৈশিষ্ট্যের তফাত রয়েছে

তবে আমানত উল্লাহর দাবি, পূর্ব থেকে পশ্চিমে সাধারণ নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে নয়, সূর্যের বার্ষিক গতির কারণে ঘটছে।

বইটিতে পৃথিবীর বার্ষিক গতির দ্বিতীয় প্রমাণে বলা হয়েছে, বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্যকে বিভিন্ন অবস্থানে দেখা যায়। সূর্য প্রতিদিন পূর্ব আকাশে একই জায়গা থেকে ওঠে না এবং পশ্চিম আকাশে একই জায়গায় অস্ত যায় না। বছরের ছয় মাস সূর্য একটু একটু করে দক্ষিণ দিকে সরে গিয়ে পূর্ব আকাশে উদিত হয়। বাকি ছয় মাস সূর্য একটু একটু করে উত্তর দিকে সরে গিয়ে পূর্ব আকাশে উদিত হয়। পৃথিবী একই জায়গায় স্থির থেকে ঘুরলে প্রতিদিনই সূর্য একই জায়গায় উদিত হতো। পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণেই সূর্যের অবস্থান বদলে যেতে দেখা যায়।

আমানত উল্লাহর মতে, এমনটি পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে নয়, বরং সূর্য একটু একটু করে সরছে বলেই ঘটছে। এ ঘটনাকে সূর্যের দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণ বলা হয়। সূর্যের দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণের কারণে পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তন হয়।

পৃথিবীর বার্ষিক গতির তৃতীয় প্রমাণে বলা হয়েছে, দুরবিনের সাহায্যে পৃথিবী থেকে দেখা গেছে সব গ্রহ সূর্যকে পরিক্রম করছে। পৃথিবীও একটি গ্রহ। সুতরাং এরও পরিক্রম গতি বা বার্ষিক গতি রয়েছে।

এ বিষয়ে আমানত উল্লাহর দাবি, ওই বর্ণনা পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি প্রমাণ করে না। বর্ণনায় পরিক্রমণশীল গ্রহদের সঙ্গে পৃথিবীকে এক করে ফেলা হয়েছে। ব্যাপারটা এমন যে, সব গ্রহ যেহেতু সূর্যকে পরিক্রম করছে, আর পৃথিবীও একটি গ্রহ, তাই এরও পরিক্রমণ গতি রয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে।

বিষয়টিকে বোঝাতে একটি উদাহরণও দিয়েছেন আমানত। যেমন- কোনো হত্যা মামলায় প্রমাণিত ৫ আসামির ফাঁসি হচ্ছে। এ অবস্থায় একজন গ্রাম্য মোড়ল বিচারকের কাছে অভিযোগ করলেন, ‘হুজুর আসামিরা ৬ ভাই। ওদের আরও এক পালিত ভাই আছে। তাই এই হত্যায় সেও জড়িত। তাকেও সাজা দিন।’

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল
পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের মডেল দিয়েছেন আমানত উল্লাহ

আমানতের মতে, সূর্যের চারদিকে পৃথিবী ঘোরার দাবি ওই গ্রাম্য মোড়লের অভিযোগের মতোই। ‘পৃথিবী গ্রহ নয়’ দাবি করে আমানত বলছেন, এর প্রমাণ মিলবে পৃথিবী ও গ্রহদের নামকরণের ইতিহাস থেকে।

এই আকাশ পর্যবেক্ষক মনে করছেন, মঙ্গল থেকে নেপচুন পর্যন্ত গ্রহগুলো শুধু সূর্যকে পরিক্রমণ করছে না, তারা পৃথিবীসহ সূর্যকে পরিক্রমণ করছে। তাদের কক্ষপথের মধ্যে রয়েছে সূর্য, এমনকি পৃথিবীও।

আমানত আরও দাবি করেন, পৃথিবী বাদ দিয়ে শুধু সূর্যকে পরিক্রমণ করছে বুধ ও শুক্র। গ্রহদের মতো বুধ ও শুক্রের কোনো চাঁদ নেই এবং গ্রহদের সঙ্গে অক্ষ আবর্তনকালেরও মিল নেই। তাই বুধ ও শুক্র গ্রহ নয়, এরা স্বতন্ত্র চাঁদ যা সূর্যের চারদিকে ঘুরছে।

এভাবে মাধ্যমিকের ‘ভূগোল ও পরিবেশ’ বিষয়ের পাঠ্যবইয়ে পৃথিবীর বার্ষিক গতির ৪ ও ৫ নং প্রমাণেরও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার দাবি করছেন আমানত উল্লাহ।

‘পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব’ শিরোনামে গত বছর ১১২ পৃষ্ঠার একটি বইও লিখেছেন তিনি। ওই বইয়ের ১০১ পৃষ্ঠায় ‘সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে’ দাবি করে ছয়টি যুক্তি দিয়েছেন আমানত। এই দাবির পক্ষে পরে আরও পাঁচটি প্রমাণ বের করার দাবি করছেন এই আকাশ পর্যবেক্ষক। তিনি বলছেন, বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে এই ১১টি যুক্তির সবই তুলে ধরা হবে।

বিজ্ঞানের সঙ্গে আমানতের যুক্তির বিরোধ কোথায়

‘পৃথিবীর চারপাশে সূর্য ঘোরার’ দাবি প্রতিষ্ঠায় আমানত উল্লাহ যে ১১টি যুক্তি দিচ্ছেন সেগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তারা বলছেন, আমানত সাধারণ কিছু ধারণা থেকে এসব যুক্তি সত্যি বলে ধারণা করছেন। এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমানতের দাবি অতি সাধারণ মানের

আমানত উল্লাহর পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষক খান আসাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘোরে, এটা এখন আর কোনো তাত্ত্বিক গাণিতিক মডেল নয়, এটা পর্যবেক্ষণ করা সত্য। এ পর্যবেক্ষণ এখন শুধু পৃথিবী থেকে নয়, পৃথিবীর বাইরে কক্ষপথে স্থাপন করা স্যাটেলাইট ও মহাশূন্যে পাঠানো প্রোব থেকেও করা হয়ে থাকে। ফলে এ নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

আমানত উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে জানানো হলে খান আসাদ বলেন, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ কেউ এখন আর এককভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে করেন না, এটা করা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করেন। তাদের সম্মিলিত পর্যবেক্ষণ একত্র বা সংশ্লেষ করেই সার্বিকভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ দাঁড় করানো হয়।

‘যে তত্ত্ব বা মডেল সব পর্যবেক্ষণকেই ব্যাখ্যা করতে পারে, সেটিকেই গ্রহণ করা হয়। সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের মডেল খারিজ করে দেয়ার মতো কোনো নতুন পর্যবেক্ষণ এখনও কোথাও দেখা যায়নি।’

খান আসাদ সৌরকেন্দ্রিক মডেলের পক্ষে অকাট্য যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী যদি চিন্তা করা যায়, তাহলে এমনকি কোনো পর্যবেক্ষণ ছাড়াই চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়, সৌরজগতের সব গ্রহ সূর্যের চারদিকে ঘুরবে, ঘুরতে বাধ্য। কেননা মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী, যে বস্তুটির ভর সবচেয়ে বেশি, সবাই সেই বস্তুটিকে ঘিরে ঘুরবে। সৌরজগতের মোট ভরের ৯৯ শতাংশই সূর্যের ভর। ফলে সৌরজগতের সব গ্রহ, এমনকি উল্কা ও গ্রহাণুগুলো সূর্যের চারদিকে ঘুরবে।

‘আরও সঠিকভাবে বললে বলা উচিত ঘুরবে পুরো সৌরজগতের ভরকেন্দ্রকে ঘিরে, যে ভরকেন্দ্রটি সূর্যের কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি অবস্থিত এবং সৌরজগতের ওই ভরকেন্দ্রকে ঘিরে এমনকি সূর্য নিজেও ঘুরছে।’

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল
প্রয়াত বন্ধুর সাইকেলের দোকানকে গবেষণাগারে পরিণত করেছেন আমানত

জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই গবেষক বলেন, ‘সারা বিশ্বেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের অ্যামেচার পর্যবেক্ষকরা চমক তৈরি করার জন্য নতুন তত্ত্ব হাজির করেন। তারা আসলে ভুল বা সীমিত পর্যবেক্ষণ দিয়ে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হন। অনেকে সমতল পৃথিবী (ফ্ল্যাট আর্থ) তত্ত্বেও বিশ্বাস করেন। এগুলো শুনতে চিত্তাকর্ষক, কিন্তু ধোপে টেকে না।’

আমানতের যুক্তির দুর্বলতা

আমানত উল্লাহর দাবি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞান লেখক বিমান নাথ এবং বিজ্ঞান লেখক দীপেন ভট্টাচার্যের মন্তব্যও পেয়েছে নিউজবাংলা। আমানতের ১১টি যুক্তি ও সেগুলোর প্রেক্ষাপটে দুই জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষকের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:

আমানতের যুক্তি ১: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণে পৃথিবীর দুই মেরু প্রাকৃতিক নির্দিষ্ট দিকে সব সময় নির্দিষ্ট থাকে। এর ফলে ধ্রুব নক্ষত্র উত্তর মেরু বরাবর একই অবস্থানে স্থির থাকতে দেখা যায়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত, তাহলে কক্ষপথে পৃথিবী গতির নিয়ম অনুযায়ী ঘুরত। তাতে দুই মেরু প্রাকৃতিক নির্দিষ্ট দিকে নির্দিষ্ট থাকত না, চতুর্দিকে ঘুরত। যার ফলে, ধ্রুব নক্ষত্রকে ওই অবস্থায় সারা বছর একই অবস্থানে স্থির থাকতে দেখা যেত না।

বিমান নাথের জবাব: এটা ঠিক নয়। পৃথিবীর (সেই অর্থে যেকোনো ঘূর্ণমান বস্তুর) অক্ষরেখা বদলায় না যদি না অক্ষরেখার দিক বদল করার জন্য সেটাকে ধাক্কা দেয়া হয়। দুই মেরুর ‘চতুর্দিকেঘোরার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এটা গতিবিদ্যার নিয়ম (কনজারভেশন অফ অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম) মেনেই হচ্ছে।

দীপেন ভট্টাচার্যের জবাব: ধ্রুবতারা স্থির নয়। পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে হিপারোকস স্যাটেলাইট ধ্রুবতারার প্যারালাক্স মেপেছে ৭.৫৪ মিলি আর্ক সেকেন্ড (৭.৫৪"), অর্থাৎ ছয় মাস পরের পর্যবেক্ষণে আকাশে ধ্রুবতারা এক কৌণিক সেকেন্ডের সাড়ে সাত সহস্রাংশের মতো সরে, যা কিনা এই তারাটির দূরত্ব দেয় ৪৩৩ আলোকবর্ষের মতো।

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল

আমানতের যুক্তি ২: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই কয়েক দিন পরপর আকাশে লক্ষ্য করলে সাধারণ নক্ষত্রের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থান পরিবর্তন হওয়া বোঝা যায়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত, তাহলে সাধারণ নক্ষত্রের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থান পরিবর্তন হওয়া বোঝা যেত না।

বিমান নাথের জবাব: নক্ষত্রের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যাওয়ার কারণ হলো পৃথিবীর আহ্নিক গতি। বার্ষিক গতি থাকলে যে আহ্নিক গতি থাকতে পারে না, এমন তো কোনো দায়বদ্ধতা নেই। দুই ধরনের ঘূর্ণনই থাকতে পারে।

দীপেন ভট্টাচার্যের জবাব: নক্ষত্রদের পূর্ব পশ্চিম গতির সঙ্গে সূর্যের কী সম্পর্ক? এটা পৃথিবী আহ্নিক গতির সঙ্গে জড়িত, বার্ষিক গতির সঙ্গে নয়। বার্ষিক গতির ভূমিকা হলো নতুন নক্ষত্রদের আকাশে নিয়ে আসা।

আমানতের যুক্তি ৩: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই পর্যায়ক্রমে সূর্যের খাড়া কিরণ পৃথিবীর কর্কটক্রান্তি থেকে মকরক্রান্তি পর্যন্ত সব জায়গায় পড়ে। এর ফলে ঋতু পরিবর্তন হয়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত তাহলে সূর্যের খাড়া কিরণ পৃথিবীর কর্কটক্রান্তি থেকে মকরক্রান্তি পর্যন্ত সব জায়গায় পড়ত না। যেকোনো এক জায়গায় পড়ত। ফলে পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তন হতো না।

বিমান নাথের জবাব: পৃথিবীর অক্ষরেখা হেলানো- এই তথ্য এবং পৃথিবীর বার্ষিক গতির তথ্য মিলিয়েই ঋতু পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা যায়।

দীপেন ভট্টাচার্যের জবাব: পৃথিবীতে ঋতুর পরিবর্তন হয় সৌরমণ্ডলের তলে পৃথিবীর ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে থাকার ফলে। এর ফলে সূর্যের তাপ গ্রীষ্মকালে ঘন থাকে আর শীতকালে ছড়িয়ে পড়ে।

আমানতের যুক্তি ৪: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই ৩৬৫ দিনে বছর হয়, লিপিয়ার ৩৬৬ দিনে। পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকলে ৩৬৬ দিনে বছর হতো, লিপিয়ার ৩৬৭ দিনে।

বিমান নাথের জবাব: বার্ষিক গতি থাকলে ৩৬৬ দিনে হতো সেটা বিজ্ঞানের কোন নিয়ম থেকে এসেছে? বছরের হিসাব নির্ভর করে কক্ষপথের দূরত্বের ওপর। সেটা যেখানে খুশি হতে পারে, তাই বছরের মাপেরও কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। আর বছরের মাপ ৩৬৫ দিন নয়, সেখানে আরও ছয় ঘণ্টা, আরও কয়েক মিনিট যোগ করতে হবে।

দীপেন ভট্টাচার্যের জবাব: এর সঙ্গে লিপ ইয়ারের সম্বন্ধ কী? বছর তো ৩৬৫ দিনে হয় না, ৩৬৫.২৫ দিনে হয়- এটা তো তার বলতে হবে।

আমানতের যুক্তি ৫: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই চাঁদের পর্যায়কাল পূর্ণ আর অমাবস্যা- এই দুটি দুই তারিখে হয়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত তাহলে চাঁদের পর্যায়কাল পূর্ণ আর অমাবস্যা এক তারিখেই হতো।

বিমান নাথের জবাব: এটা ছবি এঁকে বোঝাতে হবে যা যেকোনো প্রাথমিক বইতেই পাওয়া যায়। বার্ষিক গতি না থাকলেই বরং পর্যায়কাল পূর্ণ আর অমাবস্যা এক তারিখে হতো। এটা একেবারে গোড়ায় গলদ।

দীপেন ভট্টাচার্যের জবাব: এটার অর্থ করা মুশকিল। তিনি কি চাঁদ যে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে সেটাও অস্বীকার করছেন?

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল

আমানতের যুক্তি ৬: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণে চান্দ্রমাসের হিসাবে প্রায় ৬ মাস পরপর গ্রহণ মৌসুম আসে। মৌসুমে এক বা একাধিক গ্রহণ হয়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত তাহলে গ্রহণ প্রচলিত নিয়মে হতো না।

বিমান নাথের জবাব: গ্রহণ মৌসুম বলে কিছু হয় না।

আমানতের যুক্তি ৭: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই মঙ্গল ও পৃথিবী নিকটবর্তী হওয়ার তারিখে মঙ্গলকে সূর্যাস্তের পর হতে রাতের যেকোনো অংশে উদিত হতে দেখা যেতে পারে। যার ফলে পৃথিবীর কাছে আসার তারিখে মঙ্গলকে রাত ১২টায় পূর্ব দিগন্ত থেকে উদিত হতে দেখা গেছে। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত তাহলে পৃথিবী মঙ্গলগ্রহের নিকটবর্তী হওয়ার তারিখে প্রতিবার মঙ্গলের পূর্ণিমা হতো। তাতে মঙ্গলকে চিরকাল ওই তারিখে সূর্যাস্তের পরপর সন্ধ্যায় পূর্ব দিগন্তে উদয় হতে দেখা যেত। এ ছাড়া রাতের অন্য কোনো অংশে উদিত হতে দেখা যেত না।

বিমান নাথের জবাব: ‘মঙ্গলের পূর্ণিমা’ বলে কিছু হয় না। মঙ্গল এবং পৃথিবী দুই গ্রহই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। তাই তাদের পারস্পরিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে রাতের যেকোনো অংশে মঙ্গলকে উদিত হতে দেখা যেতে পারে।

আমানতের যুক্তি ৮: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই ১২ মাস মঙ্গলের অবস্থানে পরিবর্তন হতে দেখা যায়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত, তাহলে মঙ্গলের উত্তরায়ণের সময় পৃথিবীর উত্তরায়ণ হলে পৃথিবীর উত্তরায়ণের সাপেক্ষে মঙ্গলের দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়া বোঝা যেত এবং মঙ্গলের দক্ষিণায়নের সময় পৃথিবীর দক্ষিণায়ন হলে পৃথিবীর দক্ষিণায়নের সাপেক্ষে মঙ্গলের উত্তরদিকে সরে যাওয়া বোঝা যেত।

বিমান নাথের জবাব: মঙ্গলের ‘উত্তরায়ণ-দক্ষিণায়ন’ বলে কিছু নেই। আগের উত্তর দেখুন। পৃথিবী ও মঙ্গলের পারস্পরিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে দিগন্তের কোথায় মঙ্গলের উদয় হবে।

‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল

আমানতের যুক্তি ৯: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই বৃহস্পতির উত্তরায়ণের সময় একটানা উত্তর দিকে এবং দক্ষিণায়নের সময় একটানা দক্ষিণ দিকে সরতে দেখা যায়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত তাহলে বৃহস্পতির উত্তরায়ণের সময় পৃথিবীর উত্তরায়ণ হলে পৃথিবীর উত্তরায়ণের সাপেক্ষে বৃহস্পতির দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়া বোঝা যেত। আর বৃহস্পতির দক্ষিণায়নের সময় পৃথিবীর দক্ষিণায়ন হলে পৃথিবীর দক্ষিণায়নের সাপেক্ষে বৃহস্পতির উত্তর দিকে সরে যাওয়া বোঝা যেত।

বিমান নাথের জবাব: এর উত্তর আগের উত্তরের মতোই।

আমানতের যুক্তি ১০: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই শনির উত্তরায়ণের সময় একটানা উত্তর দিকে এবং দক্ষিণায়নের সময় একটানা দক্ষিণ দিকে সরতে দেখা যায়। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত, তাহলে শনির উত্তরায়ণের সময় পৃথিবীর উত্তরায়ণ হলে পৃথিবীর উত্তরায়ণের সাপেক্ষে শনির দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়া বোঝা যেত এবং শনির দক্ষিণায়নের সময় পৃথিবীর দক্ষিণায়ন হলে পৃথিবীর দক্ষিণায়নের সাপেক্ষে শনির উত্তর দিকে সরে যাওয়া বোঝা যেত।

বিমান নাথের জবাব: এটির জবাবও আগের মতো।

আমানতের যুক্তি ১১: সূর্যের বার্ষিক গতির কারণেই শুক্রের পর্যায়কাল পূর্ণ আর সূর্য পৃথিবীর মাঝখান অতিক্রম করা- এই দুটি সমান সময়ে হয়। বুধের ক্ষেত্রেও একই হিসাব। যদি পৃথিবীর বার্ষিক গতি থাকত তাহলে শুক্রের পর্যায়কাল পূর্ণ আর সূর্য পৃথিবীর মাঝখান অতিক্রম দুটি বিষয় আলাদা সময়ে হতো।

বিমান নাথের জবাব: ‘সূর্য পৃথিবীর মাঝখান অতিক্রম করা কথাটির কোনো অর্থ হয় না।

থামবেন না আমানত

আমানত উল্লাহর গবেষণাকে আমল দিচ্ছেন না অনেকেই, তবে এতে দমবার পাত্র নন তিনি। বুয়েটের শিক্ষকসহ অনেকেই তার মডেল দেখতে এসেছেন জানিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। যাওয়ার সময় তারা আমাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বলেছেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন।’

তিনি বলেন, “বিজ্ঞানে গবেষণার কোনো শেষ নেই। আমি যদি এত বছর পর ‘সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে’ প্রমাণ করতে পারি তাহলে মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? আমাকে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন। আমি যুক্তিসহ প্রমাণ দেব।”

এ বিষয়ে ঘোলদাড়ী বাজার মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক উসমান গণি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে তিনি (আমানত) এই গবেষণা করছেন। পাঠ্যবইয়েরও ভুল ধরেছেন। আমরা তাকে বিভিন্নভাবে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলেও সব প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।’

আরও পড়ুন:
চোখ যে মনের কথা বলে
নারী ডেটে ডাকলে যৌনতার সম্ভাবনা বেশি
সঙ্গীরা একদম বোরিং, কেন?
গবেষণা: সোলার জিওইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শত কোটি মানুষের ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ সুদহার ১১ শতাংশ

মন্তব্য

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
Why children disobey their mother after 12 years

১২ বছরের পর কেন শিশুরা মায়ের ‘অবাধ্য’

১২ বছরের পর কেন শিশুরা মায়ের ‘অবাধ্য’ গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ বছর বয়সের পর শিশুর কাছে মায়ের কণ্ঠের গুরুত্ব কমতে থাকে। ছবি: সংগৃহীত
গবেষকরা বলছেন, একটা বয়সের পর মায়ের কণ্ঠের গুরুত্ব কমে যাওয়ার ভালো দিকই বেশি। কারণ এই প্রক্রিয়া কিশোর-কিশোরীদের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করে, সংযোগ তৈরি করে। পরিবারের বাইরে তাদের সামাজিকভাবে পারদর্শী করে তোলে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা অপরিচিত কণ্ঠের দিকে আকৃষ্ট হয়। ১২ বছর পার হলেই ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় সবচেয়ে কাছের স্বজন মায়ের কণ্ঠস্বর।

বিষয়টি একদমই প্রাকৃতিক বলে প্রমাণিত হয়েছে গবেষণায়। তবে অনেক পরিবার একে ভেবে নেয় শিশুর ‘অবাধ্য’ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে।

জার্নাল অফ নিউরোসায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণার ফল বলছে, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ প্রক্রিয়ায় টিনএজ শিশুরা অন্যদের কণ্ঠস্বরকে আমলে নিতে শুরু করে বলেই মায়ের কণ্ঠ বাড়তি গুরুত্ব হারাতে শুরু করে।

‘তুমি কি আমার কথাও শুনছ’- মায়েরা অহরহ এমন প্রশ্ন টিনএজারদের করে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা এর সঠিক জবাব দিলে উত্তরটি ‘না’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আর এই ‘না’ এর পেছনে সত্যিই টিনএজারদের কোনো দায় নেই। বয়ঃসন্ধিকালের শিশুদের মস্তিষ্কের ওপর নতুন গবেষণা বলছে, কিছু কণ্ঠস্বরের প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়। একটা সময়ে মায়ের কণ্ঠস্বরও কিশোর-কিশোরীর কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শিশুদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা গেছে, ১২ বছর বা তার কম বয়সীদের স্নায়ু মায়ের কণ্ঠস্বরের প্রতি ভীষণভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। সক্রিয় হয়ে ওঠে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টারস এবং আবেগ-প্রক্রিয়া করার কেন্দ্রগুলো।

তবে এরপর শিশুদের মস্তিষ্কে বেশ পরিবর্তন আসে। এ সময়ে মায়ের কণ্ঠ আগের মতো মস্তিষ্ককে আর আন্দোলিত করে না। এর পরিবর্তে অন্যসব কণ্ঠে (পরিচিত বা অপরিচিত) তাদের মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তন এতটাই স্পষ্ট যে গবেষকরা মায়ের কণ্ঠের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে শিশুদের বয়স অনুমান করতে পেরেছেন।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মনোচিকিৎসক ড্যানিয়েল অ্যাব্রামস বলেন, ‘একটি শিশু যেমন তার মায়ের কণ্ঠে আন্দোলিত হয়, তেমনি একজন কিশোর নতুন কণ্ঠেও আকৃষ্ট হয়।

‘একজন কিশোর হিসেবে আপনি জানেন না যে আপনি এটি করছেন। আপনি নতুন বন্ধু এবং সঙ্গী পেয়েছেন। তাদের সঙ্গেই আপনি সময় কাটাতে চান। আপনার মন ক্রমে সংবেদনশীল এবং আকৃষ্ট হচ্ছে অপরিচিত কণ্ঠের দিকে।’

গবেষকরা বলছেন, এটি কিশোর মস্তিষ্কের সামাজিক দক্ষতা তার বিকাশের লক্ষণ। একজন কিশোর ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের পরিবার থেকে দূরে সরে যায় না; তাদের মস্তিষ্ক একটি সুস্থ উপায়ে পরিপক্ব হওয়ার কারণেই এই পরিবর্তনটি ঘটে।

গবেষণা বলছে, একজন মায়ের কণ্ঠস্বর শিশুর স্বাস্থ্য এবং বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুদের মানসিক চাপের মাত্রা, সামাজিক বন্ধন, খাওয়ার দক্ষতা এবং কথা বলার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তবে একপর্যায়ে মায়ের কণ্ঠের চেয়ে অন্য সব কণ্ঠ তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী বিনোদ মেনন বলেন, ‘যখন কিশোর-কিশোরীরা তাদের বাবা-মায়ের কথা শোনে না, তখন তাদের অনেকে ভুল বুঝতে পারেন। তবে এর আসল কারণ একেবারেই ভিন্ন। তারা বাড়ির বাইরের কণ্ঠের প্রতি আরও মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়।’

২০১৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মস্তিষ্ক তাদের মায়ের কণ্ঠের সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িত।

পরে গবেষকদলটি ১৩ থেকে সাড়ে ১৬ বছর বয়সী ২২ কিশোর-কিশোরীর ওপর পরীক্ষা চালায়। এতে দেখা গেছে, মায়ের কণ্ঠস্বর তাদের মস্তিষ্কে তেমন প্রভাব ফেলেনি। এর পরিবর্তে কিশোর-কিশোরীদের শোনা সব কণ্ঠ তাদের শ্রবণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত নিউরাল সার্কিটকে সক্রিয় করে। মস্তিষ্ক তখন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাছাই করে এবং তৈরি করে সামাজিক স্মৃতি।

স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা বলছেন, যেসব শিশু অটিজমে আক্রান্ত, তারা তাদের মায়ের কণ্ঠস্বরের প্রতি তেমন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখায় না। অন্তর্নিহিত নিউরোবায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়াটি আরও ভালো করে বোঝা গেলে সামাজিক বিকাশের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হওয়া যাবে।

মেনন বলেন, ‘একটি শিশু একপর্যায়ে স্বাধীন হয়ে ওঠে। এটি একটি অন্তর্নিহিত জৈবিক সংকেত।

‘এটাই আমরা উদ্ঘাটন করেছি। এটি একটি সংকেত, যা কিশোর-কিশোরীদের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করে, সংযোগ তৈরি করে। যা তাদের পরিবারের বাইরে সামাজিকভাবে পারদর্শী করে তোলে।’

আরও পড়ুন:
আমৃত্যু তারুণ্য ধরে রাখার এ কেমন অদ্ভুত উপায়
শঙ্খ নদে দুই শিশুকে হারালেন বাবা
নির্মাণাধীন ভবনের গর্তে পড়ে শিশুর মৃত্যু
যৌন মিলনের পর অনেকে কেন কাঁদেন?
‘সূর্যই ঘুরছে পৃথিবীর চারদিকে’, আমানতের দাবি কেন ভুল

মন্তব্য

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
That is why there is a long line of bikes in front of Bangabandhu Bridge

বঙ্গবন্ধু সেতুর মুখে যে কারণে বাইকের দীর্ঘ লাইন

বঙ্গবন্ধু সেতুর মুখে যে কারণে বাইকের দীর্ঘ লাইন বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকায় শুক্রবার সকালে হঠাৎ বাইকচালকদের চাপ পড়ে।
ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) এশরাজুল হক বলেন, ‘ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল চালিয়েই অনেক মানুষ এবার বাড়ি ফিরছে। আমার মনে হয়, শুক্রবার বন্ধের দিন শুরু হওয়ায় মোটরসাইকেল আরোহীরা সেহেরি খেয়েই রওনা হয়েছিল। তাই একসঙ্গে দুটি কাউন্টারে চাপ পড়েছিল। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।’

উত্তরবঙ্গগামী মানুষের ভোগান্তি কমাতে ঈদের আগে বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায়ের জন্য লেন বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোটরসাইকেলের জন্য করা হয়েছে দুটি লেন।

তার পরও সেতুর পূর্ব প্রান্তের গোলচত্বর থেকে টোলপ্লাজা পর্যন্ত মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।

সেতু পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বাইকচালকদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে আরোহী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে শত শত চালককে।

হৃদয় জোবায়ের নামে একজন ভিডিওটি শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় তার আইডি থেকে শেয়ার করেন। শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেটি আড়াই হাজারের বেশি শেয়ার হয়েছে। এতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ।

কমেন্ট অপশনে পড়েছে নানা মন্তব্য। কেউ কেউ সড়ক ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন, আবার কেউ কেউ করেছেন হাসি-ঠাট্টা। ঘরমুখো মানুষের কষ্টে সমব্যথী হতে দেখা গেছে অনেক ব্যবহারকারীকে।

রমজান আলী নামে একজন লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিটা ঘরে ঘরে ব্রিজ বানাইয়া (বানিয়ে) দিলেও শুধু অব্যবস্থাপনার কারণে এ রকম হবেই।’

মোহাম্মাদ রতন নামে একজন লিখেছেন, ‘টোলপ্লাজা কই, দেখে তো বনের মধ্যে মনে হচ্ছে।’

জুনায়েদ আজিম চৌধুরী লিখেছেন, ‘তবু সবাই নিরাপদে পৌঁছে যাক নিজের ঠিকানায়।’


বঙ্গবন্ধু সেতুর মুখে যে কারণে বাইকের দীর্ঘ লাইন


সালমান আল শাহরিয়ার রিজভী লিখেছেন, ‘একটা ড্রোন শট নিলে জোশ হতো... ইট ক্যান বি রেকর্ড।’

কেন বা কী কারণে ওই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘বাইকজটের’ ওই ছবি শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে সেতুর পূর্ব প্রান্তের।

সেতুর টোলপ্লাজা ইনচার্জ প্রবীর ঘোষ নিউজবাংলাকে জানান, ওই দিন হুট করে একসঙ্গে অনেক মোটরসাইকেল আরোহী সেতু এলাকায় চলে আসেন। এতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়। সাধারণ সময়ে সব লাইন দিয়ে মোটরসাইকেল প্রবেশ করলেও ঈদের কারণে গোলচত্বর থেকেই বাইকারদের আলাদা লাইনে টোলপ্লাজায় যেতে হচ্ছে। এতে করে ওই জট তৈরি হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন থাকলেও এরপর মোটরসাইকেলের লেনে চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) এশরাজুল হক বলেন, ‘ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল চালিয়েই অনেক মানুষ এবার বাড়ি ফিরছে। আমার মনে হয়, শুক্রবার বন্ধের দিন শুরু হওয়ায় মোটরসাইকেল আরোহীরা সেহেরি খেয়েই রওনা হয়েছিল। তাই একসঙ্গে দুটি কাউন্টারে চাপ পড়েছিল। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।’

অন্য সময়ে টোল প্লাজায় চার-পাঁচটি লেন থাকলেও এবার সেটি ৯টি করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন:
রানীশংকৈলে হাটে ‘অতিরিক্ত’ টোল আদায়ের প্রতিবাদ
বাইক চুরি: বগুড়ায় মামলা না নেয়ার কারণ কী?
মহাসড়কে চলতে পারবে না ইজিবাইক: আপিল বিভাগ
ইজিবাইকচালক ও হাইওয়ে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
অটোরিকশায় বাইকের ধাক্কা, মাদ্রাসাছাত্র নিহত

মন্তব্য

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
Why are the companions so boring?

সঙ্গীরা একদম বোরিং, কেন?

সঙ্গীরা একদম বোরিং, কেন? একঘেয়েমির পরিণতি নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। ছবি: ভাইস
সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ভাইনান্ড ফন টিলবার্গ দেখিয়েছেন, যেসব মানুষকে একঘেয়ে বলে মনে করা হয় তারা হয় খুব বেশি বা খুব কম কথা বলেন। টিলবার্গ বলেন, ‘উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যার সঙ্গে কথা বলছেন তার জায়গায় নিজেকে রাখুন ও নিশ্চিত করুন তারাও এ আলাপচারিতা উপভোগ করছেন।’

দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই অনেকের অভিযোগ, একদম বোরড হয়ে গেলাম। জীবনসঙ্গী বা বন্ধুদের সাহচর্যও বোরিং বলে মনে হয়। কেন এমনটা হয়? কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি কীভাবে একঘেয়ে পরিস্থিতি তৈরি করে সেটা নিয়ে গবেষণা করেছেন একদল বিজ্ঞানী। তাদের দাবির ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সভিত্তিক সাইট ভাইস। সেটি অবলম্বনে লিখেছেন রুবাইদ ইফতেখার।

কোভিড মহামারি ঠেকাতে লকডাউনের সময় ‘বাড়িতে বসে বসে বোর হচ্ছি’ এ কথাটা বহুবার বহুজন উচ্চারণ করেছেন। একঘেয়েমির হাত থেকে রক্ষার উপায়ও খুঁজেছেন অনেকে।

একঘেয়েমি বা বোরড হচ্ছে আগ্রহের অভাব বা কিছু করার নেই ভেবে অসুখী বা অসন্তুষ্টি বোধ করার মতো মানসিক অবস্থা। আমাদের মধ্যে অনেকেই জরুরি কাগজপত্র পূরণ করা, জ্যামে বসে থাকা, সব সময় দেরি করেন এমন কারও জন্য অপেক্ষার মতো প্রাত্যহিক কাজ নিয়ে অবিরাম বিরক্তি প্রকাশ বা ঘ্যানঘ্যান করেন।

এই একঘেয়েমির বিজ্ঞান নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ এসেক্সের পরীক্ষামূলক সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ভাইনান্ড ফন টিলবার্গ। প্রায় দেড় দশকের গবেষণায় তিনি যা খুঁজে পেয়েছেন তা বেশ মজার।

টিলবার্গ বলেন, ‘স্নাতক পড়ার সময় আমি একঘেয়েমি নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে উঠি। আমি ও আমার সহকারী এরিক ইগোউ লক্ষ করেছি, মানুষ একঘেয়েমিকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না এবং ভাবে এর কোনো পরিণতি নেই। আমরা যখন বইপত্র ঘাঁটার চেষ্টা করলাম, তখন দেখলাম একঘেয়েমির পরিণতি কী তা নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি।’

ইগোউ ও টিলবার্গ পরীক্ষাভিত্তিক গবেষণার একটি সিরিজ নিয়ে কাজ করেছেন। তারা দেখতে চেয়েছেন, একঘেয়েমি মানুষকে কীভাবে প্রভাবিত করে। তাদের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এমন কিছু কাজ ছিল যা সত্যিই বিরক্তিকর। যেমন, অংশগ্রহণকারীদের বিবলিওগ্রাফি রেফারেন্স (গবেষণাপত্রে উদ্ধৃত রেফারেন্সের বিশদ তালিকা) অন্য একটি নথিতে হুবহু লিখতে বলা হয়েছে, বেশ কিছু অযৌক্তিক পাজল দেয়া হয়েছে যা কখনই সমাধান করা যাবে না অথবা চলমান বৃত্ত আঁকতে বলা হয়েছে।

টিলবার্গ বলেন, ‘আমরা দেখেছি, একঘেয়েমির একটি নেতিবাচক পরিণতি আছে। একঘেয়েমিতে ভোগা লোক বাইরের মানুষের প্রতি নেতিবাচক হয়ে পড়েন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সম্বন্ধে ভালো বোধ করেন। এর সঙ্গে আগ্রাসী মনোভাবেরও সংযোগ আছে।

‘আমরা এও দেখেছি একঘেয়েমি শেষ পর্যন্ত কোনো একটি মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্যকে আলোড়িত করে এবং মানুষকে নতুন কিছুর অনুসন্ধানে ঠেলে দেয়; যাকে তারা অর্থপূর্ণ বা মূল্যবান হিসেবে মনে করতে পারেন। এটি একটি ইতিবাচক পরিণতিও।’

টিলবার্গ যোগ করেন, গবেষণায় দেখা গেছে একঘেয়েমির অনুভূতি সাধারণত নস্টালজিয়ার অনুভূতির দিকে পরিচালিত করে। মানুষ অতীতের স্মৃতিচারণা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বা আগ্রহ পায়।

একঘেয়ে অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাওয়া ব্যক্তির প্রদর্শিত মানসিক প্রতিক্রিয়ার তালিকা সংক্ষিপ্ত করে আনার পর টিলবার্গ বুঝতে পারেন, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের ওপর একঘেয়েমির পরিণতি পরীক্ষার মতো যথেষ্ট গবেষণা নেই। সুতরাং তিনি কাউকে বোরিং বলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিত্ব, শখ ও বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করতে শুরু করেন।

‘বোরিং পিপল: স্টিরিওটাইপ ক্যারেক্টারিস্টিকস, ইন্টারপারসনাল অ্যাট্রিবিউশনস অ্যান্ড সোশ্যাল রিয়্যাকশনস’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে টিলবার্গ ও তার দল গভীরভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। কোনো গতানুগতিক কারণে কাউকে বোরিং, একঘেয়ে বা বিরক্তিকর হিসেবে দেখা হয়, সেটি বের করার চেষ্টা করেছেন তারা।

গবেষণাটি বিরক্তিকর মানুষ বা বিরক্তিকর বা একঘেয়ে সম্পর্কে আছেন এমন মানুষের ওপর জোর দিয়েছে।

টিলবার ও তার দল ৫০০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে পাঁচটি আলাদা পরীক্ষা করেন। পরীক্ষাগুলোতে জানতে চাওয়া হয় কোন ক্যারিয়ার ও শখগুলোকে তারা বোরিং, একঘেয়ে ও বিরক্তিকর ভাবেন। এরপর জানতে চাওয়া হয় এইসব পেশার সঙ্গে জড়িত লোকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে তারা কীভাবে দেখেন।

অংশগ্রহণকারীরা ডেটা অ্যানালাইসিস, অ্যাকাউন্টিং, ট্যাক্স/ইন্স্যুরেন্স, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যাংকিংকে সবচেয়ে বোরিং পাঁচটি পেশা হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন। তারা যে পাঁচটি হবি বা শখকে বোরিং হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো কিছুটা অবাক হওয়ার মতো। এগুলো হলো ঘুমানো, প্রার্থনা করা, টিভি দেখা, পশুপাখি দেখা ও অঙ্ক করা।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, তাদের চোখে যাদের কোনো কিছুতে আগ্রহ নেই, সেন্স অফ হিউমার নেই, কোনো মতামত নেই বা কোনো কিছু নিয়ে বেশি অভিযোগ নেই সেসব ব্যক্তি গতানুগতিকভাবে বোরিং।

তবে টিলবার্গ ও তার দলকে গবেষণার যে দিকটি সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে তা হলো, যাদেরকে গতানুগতিকভাবে বোরিং, একঘেয়ে বা বিরক্তিকর মনে করা হয়েছে তাদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অক্ষম ও শীতল চরিত্রের মানুষ হিসেবেও গণ্য করা হয়েছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, গতানুগতিক ধারণায় বোরিং ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া বা ঘোরাফেরার জন্য অর্থ চেয়েছেন অনেকে। এ থেকে বোঝা যায়, বিরক্তিকর হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ব্যক্তি সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে আসতে পারেন।

টিলবার্গ বলেন, ‘আমরা দেখেছি, গতানুগতিকভাবে বিরক্তিকর বা একঘেয়ে বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি তাদের সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। তবে আবার গতানুগতিকভাবে একঘেয়ে পেশায় জড়িতদের, যেমন অ্যাকাউন্ট্যান্টকে তার পেশার জন্য অত্যন্ত দক্ষ হিসেবে দেখা হয়।’

আরেকটি বিষয় লক্ষ করে টিলবার্গ হতবাক হয়ে গেছেন। সেটি হলো, ধূমপানকে একঘেয়ে বা বিরক্তিকর হিসেবে দেখা হয়েছে। তিনি বলেন, “যখন আমি বড় হয়েছি, তখন এটাকে ‘কুল’ বিষয় হিসেবে প্রচার করা হতো। তবে এখন ততটা নয়।”

টিলবার্গ বলছেন, গবেষণার জন্য মাত্র ৫০০ জনের নমুনা নেয়ার অর্থ হলো এর ফল চূড়ান্ত ও সম্পূর্ণ নয়। অবশ্য কী করলে মানুষকে বোরিং হিসেবে বিবেচিত হবে না সেটি বের করার জন্য এটি বেশ ভালো একটা পদ্ধতি।

তিন বলেন, ‘লোকজন ডেটা বিশ্লেষণ ও গণিতের মতো বিষয়গুলোকে একঘেয়ে বা বিরক্তিকর বলেছেন। তবে তারাই আবার বিজ্ঞানীদের বেশ ইন্টারেস্টিং বলে মনে করেন। অথচ একজন বিজ্ঞানী যা করেন তার একটি বড় অংশ ডেটা বিশ্লেষণ। সুতরাং, একজন ব্যক্তি যেভাবে নিজেকে বর্ণনা করেন এবং তারা যা করেন তা তাদেরকে গতানুগতিকভাবে কম বিরক্তিকর হিসেবে দেখতে সাহায্য করতে পারে।’

টিলবার্গ এও দেখিয়েছেন, যেসব মানুষকে একঘেয়ে বলে মনে করা হয় তারা হয় খুব বেশি বা খুব কম কথা বলেন। তিনি যোগ করেন, ‘উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যার সঙ্গে কথা বলছেন তার জায়গায় নিজেকে রাখুন ও নিশ্চিত করুন তারাও এ আলাপচারিতা উপভোগ করছেন।’

গবেষণায় টিলবার্গ দেখেছেন, পারফর্মিং আর্টস বা সাংবাদিকতার মতো সৃজনশীল পেশায় জড়িত লোকেরা কম একঘেয়ে। তবে এই ধারণাটি পরিবর্তন করার দায়িত্ব শুধু গতানুগতিক ব্যক্তির দায়িত্ব নয় বলেও সতর্ক করছেন তিনি।

টিলবার্গ বলেন, ‘আমি মনে করি যারা আদতে একঘেয়ে ব্যক্তি তাদের ইমেজ সংশোধনের পরামর্শ দেয়া সহজ। তবে মানুষকে সচেতন করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের খোলা মনের হতে হবে এবং অন্যদের বেনিফিট অফ ডাউট দিতে হবে। লোকজন প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে- একঘেয়ে বোধ করা ভালো না খারাপ, তবে শেষ পর্যন্ত আপনাকে একঘেয়েমি মোকাবিলা করতে জানতে হবে।

আরও পড়ুন:
জলবায়ু উদ্বাস্তু নিয়ে আইওএমকে কাজ করার আহ্বান বাংলাদেশের
ট্রান্স পুরুষের পরিপক্ব ডিম্বাণুতে জন্ম নেবে সন্তান
সরকারি প্রতিষ্ঠানে লাভ নয়, সেবাটা মুখ্য: প্রধানমন্ত্রী
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নয়, টানেলের পক্ষে পরিকল্পনামন্ত্রী
মদন উপজেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত ঘোষণা

মন্তব্য

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
Why not air fares according to distance

আকাশপথে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নয় কেন

আকাশপথে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নয় কেন
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বিমানে সব রুটে একভাবে ভাড়া হিসাব করার সুযোগ নেই। কক্সবাজারে যে ধরনের ক্যালকুলেশন থাকবে, বরিশাল বা সৈয়দপুরে সেই ক্যালকুলেশন থাকবে না। শুধু নটিক্যাল মাইলের ভিত্তিতে ভাড়া দেখাতে চাইলে প্যাসেঞ্জারদের কাছে ভুল তথ্য যাবে।’

দেশি বিমান সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অন্য পথের তুলনায় ঢাকা-বরিশাল আকাশপথে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, সবসময় এই পথে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু দূরত্ব দিয়ে বিমানের ভাড়া বিবেচনার সুযোগ নেই।

ফ্লাইট কানেকশনস নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলের সবচেয়ে ছোট দৈর্ঘ্যের পথ ঢাকা-বরিশাল। এই পথের দূরত্ব ৭২ অ্যারোনটিক্যাল মাইল। এবং সবচেয়ে বেশি দূরত্ব ঢাকা-কক্সবাজার আকাশপথে, যা ১৯২ অ্যারোনটিক্যাল মাইল।

প্রতিদিন ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমান বাংলাদেশের একটি, ইউএস বাংলার দুইটি ও নভোএয়ারের একটি ফ্লাইট এবং ঢাকা-কক্সবাজারে ১০টি ফ্লাইট চলাচল করে।

বিমান সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পথে বিমান বাংলাদেশের সর্বনিম্ন ভাড়া ৪৮০০ টাকা এবং ইউএস বাংলা ও নভোএয়ারের ৫০০০ টাকা।

ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বিমান বাংলাদেশের সর্বনিম্ন ভাড়া ৬৫০০ টাকা, ইউএস বাংলার ৫২০০ টাকা এবং নভোএয়ারের ৪৫০০।

অর্থাৎ ঢাকা-বরিশাল রুটের দূরত্ব ঢাকা-কক্সবাজারের তুলনায় প্রায় এক তৃতীয়াংশ। তবে ভাড়ার পার্থক্য বেশ কম।

এ বিষয়ে বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার মানুষ বিমানের ভাড়ায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আমরা ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ জানাই। আমরা চাই অ্যারোনটিক্যাল মাইল অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হোক।

‘এ ছাড়া ঈদের সময় যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেয়া হয় সেটারও প্রতিবাদ জানাই।’

জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার বলেন, ‘বিষয়টি আমারও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বরিশাল অঞ্চলের মানুষ কেন বিমানে অতিরিক্ত ভাড়া দেবে? বিষয়টি সম্পর্কে আমরা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) লিখব। প্রয়োজনে বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করব।

‘দূরত্বের ভিত্তিতে দ্রুত যেন ঢাকা-বরিশাল রুটের বিমান ভাড়া নির্ধারণ করা হয় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করব।’

ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বরিশাল অফিসের ব্যবস্থাপক আবু আহম্মেদ জানান, বিষয়টি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ওপর নির্ভরশীল। তারা এ বিষয়ে কিছু জানেন না।

নভোএয়ার ও ইউএস বাংলার বরিশাল অফিসে যোগাযোগ করেও একই উত্তর পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলামের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘ল্যান্ডিং, পার্কিং, সিকিউরিটি, রুট নেভিগেশন, ফুয়েল প্রাইস, এয়ার ক্রাফটের লিজিং মানি, পাইলট-ক্রুদের বেতন-ভাতা, ট্যাক্স এরকম অনেক কিছু হিসাব করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। তবে সব রুটে একভাবে ভাড়া হিসাব করার সুযোগ নেই। কক্সবাজারে যে ধরনের ক্যালকুলেশন থাকবে, বরিশাল বা সৈয়দপুরে সেই ক্যালকুলেশন থাকবে না। শুধু নটিক্যাল মাইলের ভিত্তিতে ভাড়া দেখাতে চাইলে প্যাসেঞ্জারদের কাছে ভুল তথ্য যাবে।

‘একটা এয়ারলাইন্সের রুটের ইনকাম ছাড়া আর কোনো ইনকাম নেই। এর ভাড়ার সঙ্গে অনেক ধরনের ভ্যারিয়েবল কস্ট এবং ফিক্সড কস্ট ইনভলভ আছে। তা ছাড়া কোনো রুটে যদি ভাড়া বেশি হয় তাহলে সেটার ইনকাম দিয়ে আরেকটি রুটে সাবসিডি দেয়া হয়।’

কামরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘কক্সবাজার আর সৈয়দপুরের নটিক্যাল মাইল প্রায় এক। তবে এই দুই রুটে ভাড়ার পার্থক্য প্রায় ১ হাজার টাকা। কারণ সব রুটের অপারেশনাল কস্ট এক নয়।

‘বরিশালের দূরত্ব কক্সবাজারের চেয়ে কম হলেও অ্যারোনটিক্যাল, নন অ্যারোনটিক্যাল চার্জ কিন্তু দুই জায়গাতেই এক। আবার যাত্রী সংখ্যাতেও কমবেশি আছে। তাই ফুয়েলের খরচ কিছুটা কম হলেও সব মিলিয়ে ভাড়া বেশি চলে আসে।’

আরও পড়ুন:
ঈদে অতিরিক্ত ফ্লাইট চায় বেসরকারি এয়ারলাইনস
‘ভাড়া কমাতে এয়ারলাইন্সগুলোকে বাধ্য করার সুযোগ নেই’
বিমানের দুই উড়োজাহাজের ধাক্কা
শাহজালালে ইয়াবাসহ ২ রোহিঙ্গা আটক
বাসা ভাড়া দিতে না চাইলে আইনের আশ্রয়ের সুযোগ

মন্তব্য

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
What is the moment of joy after death?

মৃত্যুর পরের মুহূর্ত কি আনন্দের?

মৃত্যুর পরের মুহূর্ত কি আনন্দের? মৃত্যুপরবর্তী মস্তিষ্কের অবস্থা জানতে চলছে বিভিন্ন গবেষণা। ছবি: সংগৃহীত
মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে- এমন ব্যক্তিদের দাবিগুলোকে বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো শরীরের বাইরের অভিজ্ঞতা, গভীর আনন্দের অনুভূতি, কোনো বিদেহী আহ্বান, আলোকোজ্জ্বল আকাশ দেখার সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে উদ্বেগ বা চূড়ান্ত শূন্যতা ও নীরবতার তথ্যও পাওয়া যায়।

সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অকার্যকর হয়ে পড়ে মস্তিষ্ক। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার পরেও কিছুটা সময় সচল থাকে মগজ। থাকে অনুভবের ক্ষমতা।

যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গর ইউনিভার্সিটির কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক গুইলাম থিয়েরি মনে করছেন, আরও অনেক কিছু আমাদের জানার বাকি। মৃত্যুর পর মানুষ কতক্ষণ সচেতন থাকে, সে সময়টি মস্তিষ্ক কী অনুভব করে- তা নিয়ে নিবন্ধ লিখেছেন প্রখ্যাত এই স্নায়ুবিজ্ঞানী। দ্য কনভারসেসনে প্রকাশিত নিবন্ধটি অনুবাদ করা হয়েছে নিউজবাংলার পাঠকদের জন্য।

আমি তখন প্রায় ১৫ বছর বয়সী কিশোর। সেই বয়সে প্রথম মৃত্যুভয়ে আক্রান্ত হই এবং মৃত্যুর অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে তা নিয়ে দুর্ভাবনা আমাকে ঘিরে ধরে। আমি তখন মাত্র ফরাসি বিপ্লবের ভয়ংকর দিকগুলো জানতে পেরেছি। গিলোটিন কী করে শরীর থেকে মাথাগুলোকে নিখুঁতভাবে কেটে ফেলে জেনে শিউরে উঠেছি।

ফরাসি বিপ্লবের নেতা জর্জেস ডান্টনকে গিলোটিনে চড়িয়ে হত্যা করা হয় ১৭৯৪ সালের ৫ এপ্রিল। মৃত্যুর আগে তার শেষ কথাটি আমার মনে গেঁথে আছে। জল্লাদকে তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণকে আমার কাটা মাথা দেখিও, এটি হবে দেখার মতো।’

অনেক বছর পরে একজন কগনেটিভ স্নায়ুবিজ্ঞানী হয়ে ওঠার পর একটি চিন্তা আমার মধ্যে তৈরি হয়। আমি ভাবতে শুরু করি, শরীর থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন একটি মস্তিষ্ক সম্ভবত আশপাশের পরিবেশ বুঝতে পারে এবং চিন্তাও করতে পারে।

ডান্টন চেয়েছিলেন তার কাটা মাথা জনগণের সামনে প্রদর্শন করা হোক, কিন্তু তিনি কি লোকদের দেখতে বা শুনতে পাচ্ছিলেন? তিনি কি খানিকটা সময়ের জন্যও সচেতন ছিলেন? কীভাবে তার মস্তিষ্ক অচল হয়ে গেল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ২০২১ সালের ১৪ জুন তারিখেও আমি প্রবলভাবে খুঁজেছি। সেদিন ফ্রান্সের মার্সেইয়ে রওনা হয়েছিলাম। কারণ আমার মা অ্যাভিগননে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে আমার ভাইয়ের অবস্থা ছিল গুরুতর। কিছুদিন আগেই ওর ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়েছে।

তবে অ্যাভিগননে পৌঁছানোর পর জানতে পারি আমার ভাই চার ঘণ্টা আগে মারা গেছে। ওর মৃতদেহটি ছিল একদম সৌম্য, নিখাদ স্থির। মাথাটি এমনভাবে খানিকটা কাত হয়ে ছিল যেন ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কেবল শ্বাস নিচ্ছে না, সেই সঙ্গে দেহটি শীতল।

ওই দিন এবং তার পরের কয়েক মাস ধরে আমি যতই অবিশ্বাস করি না কেন, বাস্তবতা হলো, আমার ভাইয়ের অনন্য উজ্জ্বল এবং সৃজনশীল জীবনের অবসান ঘটে গিয়েছিল। কেবল রয়ে গেছে তার রেখে যাওয়া শিল্পকর্মগুলো

সেদিন আমাকে হাসপাতালের একটি কক্ষে ভাইয়ের প্রাণহীন দেহের সঙ্গে থাকতে দেয়া হয়েছিল। আমি তখন ওর সঙ্গে কথা বলার তীব্র ইচ্ছা অনুভব করেছি এবং কথা বলার চেষ্টাও করেছি।

মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে আমি ২৫ বছর অধ্যয়ন করেছি। খুব ভালোভাবে জানি, হৃৎপিণ্ড অচল হওয়ার পর মস্তিষ্কে রক্ত ​​​​সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় ছয় মিনিট পরে মস্তিষ্ক মূলত মারা যেতে থাকে। এই সময়ের পর অবনতির মাত্রা এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছায় যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়। আমাদের মৌলিক চেতনা, নিজেকে অনুভব করার ক্ষমতা এবং যেসব চিন্তা আমাদের নিজস্ব বলে মনে হয়- তা হারিয়ে যায়।

আমার প্রিয় ভাই মারা যাওয়ার পাঁচ ঘণ্টা পরে আমার কণ্ঠস্বর শোনার এবং চিন্তাভাবনার জন্ম দেয়ার মতো কিছু কি অবশিষ্ট ওর মস্তিষ্কে থাকতে পারে?

মৃত্যুর পরের মুহূর্ত কি আনন্দের?

কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে- এমন ব্যক্তিদের দাবিগুলোকে বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো শরীরের বাইরের অভিজ্ঞতা, গভীর আনন্দের অনুভূতি, কোনো বিদেহী আহ্বান, আলোকোজ্জ্বল আকাশ দেখার সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে উদ্বেগ বা চূড়ান্ত শূন্যতা ও নীরবতার তথ্যও পাওয়া যায়। তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতার দিকে নজর দেয়া গবেষণাগুলোর প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলো মূলত ব্যক্তির অভিজ্ঞতার প্রকৃতির ওপর বেশি জোর দেয় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে উপেক্ষা করে।

কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে অ্যানেস্থেশিয়ার কারণে বা আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে চেতনা হারানোর ঘটনা ঘটে। এর ফলে তাদের মস্তিষ্ক দ্রুত সক্রিয়তা হারানোয় গভীর উদ্বেগ অনুভবের জায়গা খুব কম থাকে। বিপরীতে, দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর অসুস্থতার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তির এ ধরনের রুক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকতে পারে।

আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তে মস্তিষ্কে আসলে কী ঘটে তা গবেষণার সুযোগ পাওয়া সহজ নয়। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে ৮৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপ পরীক্ষা করা হয়েছে। তিনি মৃগীর খিঁচুনি এবং হৃদরোগে ভুগছিলেন। পড়ে যাওয়ার পর মাথায় আঘাত পেয়ে তিনি মারা যান।

জীবন থেকে মৃত্যুর যাত্রাপথে মানবমস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে এটাই প্রথম সুনির্দিষ্ট গবেষণা। তবে এ ক্ষেত্রেও মৃত্যুর সময়ে সম্ভাব্য ‘মনের অভিজ্ঞতা’র বিষয়গুলো অত্যন্ত অনুমাননির্ভর।

গবেষকেরা আবিষ্কার করেছেন, মস্তিষ্কে রক্ত​​​​প্রবাহ বন্ধ হওয়ার পরেও আলফা ও গামা নামে মস্তিষ্কের কিছু তরঙ্গ প্যাটার্ন পরিবর্তন করে। গবেষণাপত্রটিতে লেখা হয়েছে, “আলফা এবং গামার এই ক্রিয়াকলাপ মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া এবং স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। এটাই সম্ভবত জীবনের ‘শেষ সাড়া’, যেটি মৃত্যুর একদম কাছাকাছি পর্যায়ে ঘটে থাকতে পারে।”

যাই হোক, সুস্থ মস্তিষ্কেও এ ধরনের ক্রিয়াকলাপ ঘটা অস্বাভাবিক নয়, এবং এর মানে এই নয় যে জীবন বিলীনের আগ মুহূর্তে আমাদের চোখের সামনে এমন ঝলক তৈরি হচ্ছে।

ওই গবেষণাটি আমার মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দেয়নি। এই প্রশ্নটি হলো, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর স্নায়বিক কার্যকলাপ পুরোপুরি বন্ধ হতে কতক্ষণ সময় লাগে? গবেষণাটিতে শুধু শেষ মুহূর্তের ১৫ মিনিটে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুপরবর্তী কয়েক মিনিটের তথ্য রয়েছে।

ইঁদুরের ওপর পরীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে, মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড পরে চেতনার অবসান ঘটে। ৪০ সেকেন্ড পর স্নায়ু সক্রিয়তার বড় অংশই অদৃশ্য হয়ে যায়। কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মস্তিষ্ক অচল হওয়ার সময়ে সেরোটোনিন নিঃসৃত হয়। উত্তেজনা এবং সুখের অনুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে বিশেষ এই রাসায়নিক।

তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটে? তাত্ত্বিকভাবে মানবমস্তিষ্ক পুরোপুরি মারা যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় নেয়। এ ক্ষেত্রে মানুষকে ছয়, সাত, আট, এমনকি ১০ মিনিটের পরেও পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে।

মস্তিষ্ক মরে যাওয়ার সময় চোখের সামনে কেন জীবনের ঝলক তৈরি হতে পারে- তার ব্যাখ্যা সংক্রান্ত অনেকগুলো তত্ত্ব আমি পেয়েছি। হতে পারে এটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম একটি প্রভাব, যা মস্তিষ্ক অকার্যকর হতে শুরু করার সময়ে আকস্মিক স্নায়বিক সক্রিয়তার বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।

আবার হতে পারে এটি একটি শেষ প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসন্ন মৃত্যুকে এড়ানোর চেষ্টা করছে। অথবা হতে পারে এটি আমাদের জিনের গভীরে প্রোথিত একটি চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া। এই প্রতিক্রিয়া হয়তো আমাদেরকে জীবনের সবচেয়ে দুঃখময় ঘটনাটি ঘটার সময়ে মনকে অন্যভাবে ‘ব্যস্ত’ রাখে।

আমার অনুমান কিছুটা ভিন্ন। হয়তো আমাদের সামনে অস্তিত্বসংক্রান্ত সবচেয়ে জরুরি দিকটি হলো, আমরা নিজেদের অস্তিত্বের অর্থটি উপলব্ধি করতে চাই। যদি তাই হয়, তাহলে, মৃত্যুর সময় চোখের সামনে জীবনের ঝলক দেখা আমাদের সেই চূড়ান্ত প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।

যাই ঘটুক না কেন- আমরা দ্রুত একটি উত্তর খুঁজতে চাই, কারণ আমাদের সময় শেষ হয়ে আসছে।

এতে আমরা সফল হই বা না হই বা আমরা যে বিভ্রমের জোগান পাই, তা অবশ্যই মানসিক পরামানন্দ বয়ে আনে। আশা করছি, ভবিষ্যতের গবেষণা, মৃত্যুর পরে স্নায়ুর ক্রিয়াকলাপের দীর্ঘ সময়ের পরিমাপ, এমনকি মস্তিষ্কের ইমেজিং- আমার এই ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করবে।

এটি আমার ভাই এবং আমাদের সবার জন্যই হয়তো সত্যি, তা মিনিট বা ঘণ্টা যতটুকু সময় ধরেই স্থায়ী হোক না কেন।

আরও পড়ুন:
পুকুরে ডুবে দুই বোনের মৃত্যু 
‘তেলাপোকা মারার ওষুধে’ গৃহবধূর মৃত্যু
‘আমার বাবারে আইন্যা দেও’
আকাশি গাছে ঝুলছিল যুবকের মরদেহ
যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে হত্যায় মৃত্যুদণ্ড

মন্তব্য

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
What will happen in 5 seconds without oxygen?

৫ সেকেন্ড অক্সিজেনশূন্য পৃথিবীতে কী ঘটবে

৫ সেকেন্ড অক্সিজেনশূন্য পৃথিবীতে কী ঘটবে অক্সিজেন ছাড়া কংক্রিটের তৈরি সব স্থাপনা ভেঙে পড়বে। ছবি: সংগৃহীত
অধিকাংশ মানুষই ৩০ সেকেন্ড অক্সিজেন ছাড়া থাকলে তাদের শারীরবৃত্তীয় কোনো সমস্যা হয় না। ৫ সেকেন্ড অক্সিজেন ছাড়া আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকই থাকবে। কিন্তু শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্যই কেবল অক্সিজেন প্রয়োজনীয় নয়।

কল্পনা করুন এই পৃথিবীতে অক্সিজেন অদৃশ্য হয়ে গেল। আজীবনের জন্য এমনটি হবে বলছি না। ধরুন মাত্র ৫ সেকেন্ডের জন্য। চিন্তামুক্ত! এ আর এমনকি, ৫ সেকেন্ডের জন্য দম বন্ধ করে রাখব। আপনি না হয় ৫ সেকেন্ডের জন্য দম বন্ধ করে রাখলেন। কিন্তু পরিবেশের ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

একটি সুন্দর গভীর শ্বাস নিন। বেঁচে আছেন? নিজেকে সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে? আপনি বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস নিতে গিয়ে যা গ্রহণ করছেন তাই অক্সিজেন। আমাদের বায়ুমণ্ডলে ২১ শতাংশ গ্যাস হলো অক্সিজেন। কিন্তু এটিই এই সবুজ গ্রহের সর্বাধিক গ্যাস নয়। এই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে বেশি গ্যাস হলো নাইট্রোজেন, যার পরিমাণ ৭৮ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি গ্যাস না হলেও আমাদের জন্য অক্সিজেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রহে অক্সিজেন না থাকলে গাছপালা, প্রাণী, মানুষ এমনকি পানিও থাকত না। আমরা যে খাওয়ার পানি খাই, পানির অপর নাম জীবন বলি, সেই পানি কিন্তু অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের মিলিত যৌগ।

অধিকাংশ মানুষই ৩০ সেকেন্ড অক্সিজেন ছাড়া থাকলে তাদের শারীরবৃত্তীয় কোনো সমস্যা হয় না। ৫ সেকেন্ড অক্সিজেন ছাড়া আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকই থাকবে। কিন্তু অন্য যেকোনো কিছুর জন্য নয়।

হোয়াটইফে প্রকাশিত প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এই ৫ সেকেন্ডে পৃথিবীর চিত্র পুরো বদলে যাবে। অক্সিজেন কংক্রিটের বাঁধাই হিসেবে কাজ করে। যদি অক্সিজেন না থাকে, তবে কংক্রিট কেবল ধুলোমাত্র। অর্থাৎ অক্সিজেন যদি উধাও হয়ে যায়, ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীর সব ছোট-বড় দালানকোঠা ধসে পড়বে। রক্ষা পাবে না অ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং থেকে ব্রুজ আল আরব, এমনকি ভেঙে পড়বে সেতু, ফ্লাইওভার, মেট্রো।

আপনি ভাবছেন এ সময় যদি সমুদ্রসৈকতে থাকেন। হয়তো বেঁচে যাবেন। দালানকোঠা নেই। আসলে তাতেও রক্ষা নেই। অক্সিজেন পরমাণু দ্বারা গঠিত ওজোন স্তর সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা করে। অক্সিজেন না থাকলে পৃথিবী অত্যন্ত গরম হয়ে উঠবে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা করার মতো আর কিছুই থাকবে না।

রোদে পুড়ে গিয়েও রক্ষা নেই। এ সময় আমাদের কানও ফেটে যাবে। এই বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ ২১ শতাংশ। অর্থাৎ অক্সিজেন না থাকা মানে বায়ুমণ্ডল বায়ুচাপ হারাবে ২১ শতাংশ, যা তাৎক্ষণিকভাবে সমুদ্রের ২০০ মিটার গভীরের চাপের সমান এবং আমাদের কান মানিয়ে নেয়ার সময় পাবে না। ফলে ৫ সেকেন্ডেই আমাদের শ্রবণশক্তি হারাতে হবে।

আগুন ধরার ক্ষেত্রে অক্সিজেনের ভূমিকা আমরা জানি। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন নেই তো আগুন নেই। যানবাহনে জ্বলন প্রক্রিয়াও ঘটবে না। বৈদ্যুতিক যানবাহন ছাড়া সব ট্রাক, গাড়ি রাস্তায় থেমে যাবে। আকাশ থেকে পাখির মতো বিমান পড়তে থাকবে।

আকাশ হয়ে যাবে সম্পূর্ণ অন্ধকার। সূর্যের আলো পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগে বায়ুমণ্ডলে একাধিক স্থানে বাউন্স হয়ে আসে। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন না থাকলে আলো বাউন্স করার উপাদান কম পাবে। ফলে আকাশ দেখাবে অন্ধকার।

এতক্ষণ তো বললাম বায়ুমণ্ডলের কথা। ভূত্বকের কী হবে? আমরা যেই ভূপৃষ্ঠে হেঁটে বেড়াই, গাড়ি চালাই, সাইকেল চালাই তা অক্সিজেন, সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম, লৌহ, ক্যালশিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম এই আটটি প্রধান উপাদান দিয়ে গঠিত। আর এই আটটি উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে অক্সিজেন, যার পরিমাণ ৪৫ শতাংশ। তার মানে ভূপৃষ্ঠে অক্সিজেন না থাকলে প্রায় অর্ধেকই থাকবে না। ফলে মাটিতে দেখা দেবে ফাটল। আমরা সব পৃথিবী পৃষ্ঠের ভেতরেই হারিয়ে যেতে থাকব। ভূত্বকের উপরিভাগের নিচেই রয়েছে উত্তপ্ত লাভা। আসলে মানুষের বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।

ভয় লাগছে? চিন্তা হচ্ছে? বায়ুমণ্ডলের ২১ শতাংশ অক্সিজেন থেকে একটা গভীর শ্বাস গ্রহণ করুন। জেনে রাখুন এমনটা কখনই ঘটবে না।

আরও পড়ুন:
শিশুরা কেন সাহায্য চাইতে ভয় পায়?
দুর্ঘটনাক্রমে ভূত হাঙ্গরের বাচ্চার সন্ধান
যৌনতায় আগ্রহ হারাচ্ছে সব বয়সী মানুষ!
সবচেয়ে বড় ধূমকেতুর সন্ধান, নিরাপদে পৃথিবী
বিজ্ঞানী বানাতে চাই: সেঁজুতি সাহা

মন্তব্য

উপরে