কপিরাইটবিষয়ক নিবন্ধেও ঢাবি শিক্ষকের চৌর্যবৃত্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. আবুল মনসুর আহমেদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. আবুল মনসুর আহাম্মদ এবং তার বিতর্কিত গবেষণা নিবন্ধ। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা

২০১৩ সালে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আবুল মনসুর আহাম্মদ সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদায়নের জন্য তার নিজের ১০টি গবেষণামূলক লেখা জমা দেন। এগুলোর একটিতে অনেকাংশ হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আরেকজন শিক্ষকের লেখা থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধান ড. আবুল মনসুর আহাম্মদ তার একটি গবেষণা নিবন্ধে অন্যের লেখা চুরি করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আবুল মনসুর আহাম্মদ সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদায়নের জন্য তার নিজের ১০টি গবেষণামূলক লেখা জমা দেন। এগুলোর একটিতে অনেকাংশ হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রচারিত আরেকজন শিক্ষকের লেখা থেকে। এটিকে গবেষণাকাজে চৌর্যবৃত্তি বলা হয়ে থাকে, যার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে।

ইতোমধ্যে গত ২ মে আবুল মনসুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মনোনীত হন। সেখানে তিনি আচার্য ও রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ৫ জুন তিনি বিভাগের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পেয়েছেন।

একই অভিযোগে এ বছরের শুরুতে ওই বিভাগের আরেক শিক্ষক সামিয়া রহমানের পদানবতি হয়েছিল। তাকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে নামিয়ে সহকারী অধ্যাপক করা হয়।

আরও পড়ুন: সামিয়ার আরও অনিয়ম: অনুমতি না নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ

এ ছাড়া সামিয়ার গবেষণা প্রবন্ধের সহলেখক অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানকে শিক্ষাছুটি শেষে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর দুই বছর পদোন্নতি ছাড়া একই পদে থাকতে হবে।

পত্রিকার নিবন্ধ থেকে ‘চুরি’

আবুল মনসুরের লেখা নিবন্ধের শিরোনাম ‘Copyright protection in Bangladesh: A study of Intellectual and Copyright Legislation’। এটি ২০০৯ সালে ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউ-এর ভলিউম ২৬-এ প্রকাশিত হয়।

এই লেখাটির অনেকাংশ আবুল মনসুর অন্যের লেখা থেকে নিলেও তথ্যসূত্র সঠিকভাবে ব্যবহার করেননি। যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে এটি তার নিজের লেখা বলে মনে হয়েছে। এভাবে রেফারেন্স দেয়া কোনোভাবেই গবেষণাকাজের অংশ হতে পারে না বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

নিউজবাংলার কাছে আবুল মনসুরের লেখা নিবন্ধটি রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় দুই কিস্তিতে প্রকাশিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার শিক্ষক মোহাম্মদ মনিরুল আজমের মূল লেখাটি, যেখান থেকে অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদ তুলে দিয়েছেন আবুল মনসুর। মনিরুল আজমের লেখাটির শিরোনাম ‘Copyright Law in Bangladesh’। লেখাটি ২০০৬ সালের ২১ জানুয়ারি৪ ফেব্রুয়ারি দুই কিস্তিতে প্রকাশিত হয়।

কপিরাইটবিষয়ক নিবন্ধেও ঢাবি শিক্ষকের চৌর্যবৃত্তি
দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ মনিরুল আজমের লেখা

সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউতে আবুল মনসুরের নিবন্ধটি যখন ছাপা হয়, তখন গবেষণা লেখায় মৌলিকত্ব যাচাইয়ের ভালো পদ্ধতি ছিল না। এখন রিভিউয়ার ছাড়াও বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে লেখার মৌলিকত্ব যাচাই করা হয়ে থাকে। এ রকম একটি বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যার হলো টার্ন-ইট-ইন।

নিউজবাংলা টার্ন-ইট-ইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেছে, লেখাটিতে ৬৩ ভাগ চৌর্যবৃত্তির ফলাফল প্রদর্শিত হচ্ছে। এ ছাড়া নিবন্ধের বাকি ৩৭ ভাগ বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়ে সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। ৯ পৃষ্ঠার নিবন্ধের পাঁচ পৃষ্ঠাই অন্যের লেখা থেকে হুবহু নেয়া হয়েছে।

হুবহু বাক্যের ছড়াছড়ি

আবুল মনসুর আহাম্মদের নিবন্ধের ভূমিকা অংশটি মনিরুল আজমের লেখা থেকে হুবহু (লাইন বাই লাইন) তুলে দেয়া। শুধু ওই ভূমিকার শেষ বাক্যে তিনি মনিরুল আজমের নাম উল্লেখ করেছেন।

মনসুরের নিবন্ধের দ্বিতীয় পরিচ্ছদও হুবহু নেয়া হয়েছে মনিরুল আজমের লেখা থেকে, যার কোনো তথ্যসূত্র দেয়া নেই।

ওই নিবন্ধের ‘বিশ্লেষণ, তথ্য ও আলোচনা’ থেকে শুরু করে ‘প্রশাসনিক প্রতিকার’ উপশিরোনামের অনুচ্ছেদ পর্যন্ত প্রায় তিন পৃষ্ঠার লেখার বেশির ভাগ অংশও হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে মনিরুল আজমের অনলাইন লেখা থেকে, যার কোনো রেফারেন্স নেই।

কপিরাইটবিষয়ক নিবন্ধেও ঢাবি শিক্ষকের চৌর্যবৃত্তি
সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউ-এর ভলিউম ২৬-এ ড. আবুল মনসুর আহাম্মদের প্রকাশিত নিবন্ধ

মনসুরের প্রবন্ধের উপসংহারের পুরোটাই নেয়া হয়েছে মোহাম্মদ মনিরুল আজমের অনলাইন লেখা থেকে, যার কোনো তথ্যসূত্র দেয়া নেই।

এ ছাড়া তার নিবন্ধের বিস্তারিত সাহিত্যিক পর্যালোচনার একটি সম্পূর্ণ পরিচ্ছদ নেয়া হয়েছে ২০০৬ সালে The Journal of Electronic Publishing (Volume 9 Issue 1, Winter 2006)-এ প্রকাশিত ড্যানিয়েল এম ডাউনস (Daniel M. Downes)-এর New Media Economy: Intellectual Property and Cultural Insurrection শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে, যার কোনো রেফারেন্স প্রবন্ধে দেয়া নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান বলেন, ‘গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে রেফারেন্সিং (তথ্যসূত্র দেয়া), কোটেশন দেয়া, বিবলিওগ্রাফি (গ্রন্থপঞ্জি)- এগুলো সঠিকভাবে দিতে হবে। গবেষণা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সিরিয়াসনেস নেই। ব্যক্তিগতভাবে অনেকে কাজ করলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সেটা নিশ্চিত করতে পারেনি। এখন প্লাজিয়ারিজম চেক করার অনেক সফটওয়্যার এসেছে, তবে কোনো শিক্ষকের যদি দলীয় পরিচয় বেশি থাকে, তবে সেটা (যাচাই) বাদ দেয়া হচ্ছে।’

জার্নালের তখনকার এডিটর যা বলছেন

আবুল মনসুরের নিবন্ধ যখন প্রকাশিত হয়, তখন ওই জার্নালের এডিটর ছিলেন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি তখন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ছিলেন, এখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

লেখায় এ পরিমাণ চৌর্যবৃত্তি থাকার পরও কীভাবে জার্নালে প্রকাশিত হলো, জানতে চাইলে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তখন তো আমাদের কিছুই করার ছিল না। ওই সময় সফটওয়্যার ছিল না। যাকে দিয়ে লেখা চেক করানো হতো, তিনি যদি ঠিক বলেন, তবে সেটি মেনে নেয়া হতো।’

ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কিন্তু তাকে (রিভিউয়ার) ওই স্বাধীনতাটা দিয়ে দিই। তবে তার যদি সেই বিষয়ে জ্ঞান না থাকে বা ওই লিটারেচার সম্পর্কে জানা না থাকে, তবে সমস্যা হয়। অনেকেই আবার লেখাটির মধ্যে ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে ধরে ফেলে।

‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় কয়েকজনকে ধরেছি। আমি নিজেও কমিটিতে ছিলাম। অনেকের আমরা ডিমোশন দিয়ে দিয়েছি। যেমন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনকে ধরা হলো। তখন আমি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম। তাকে কিন্তু স্যাক করা হয়েছিল।

‘শুধু যে সোশ্যাল সায়েন্স জার্নালে এমন হয়েছে, তা নয়। বহু জার্নালে এমন লেখা আছে। এর চেয়েও খারাপ লেখা, যা ১০০ ভাগ কপি করা হয়েছে, দুনিয়ার ভুল নিয়ে জমা দিয়েছে। আপনার হাতে সোশ্যাল সায়েন্স পড়েছে শুধু। অন্য সায়েন্স পড়লে আরও দেখতে পাবেন, সেখানে কী আছে!’

এখন শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বের হতে পেরেছেন দাবি করে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমি এখানে টার্ন-ইট-ইন সফটওয়্যারটি নিয়ে এসেছি। এটাতে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে অ্যাকসেস দিয়ে দিয়েছি। তাদের সেটা সেভাবে মেনে চলতে হবে। আমি বলতে পারি, এখন আমার এই বিশ্ববিদ্যালয় ৯৮ ভাগ প্লাজিয়ারিজমের বাইরে।’

আগে যারা অনিয়ম করেছেন, তাদের জন্য এখন কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আসলে এখানে তো আমাদেরও দায় থাকে। এ দোষ আমাদেরও। এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমি অত পেছনে যেতে রাজি না। তবে এখন থেকে যেন সেটি নিশ্চিত করা হয়, তা দেখতে হবে। আমাদের তখন নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল। আমার ওপরে অনেকে ছিল। আমি ঠিকভাবে লেখা দেখার মতো জায়গা তৈরি করে পারি নাই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ যেন এখন এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেন, সেটি অনুরোধ করব আমি।’

জার্নালের বর্তমান এডিটর যা বললেন

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বর্তমান ডিন সাদেকা হালিম নিউজবাংলাকে বলনে, ‘এটা আমাদের স্বীকৃত জার্নাল।’

কীভাবে এখানে লেখা পর্যালোচনা করা হয়, জানতে চাইলে অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘আমি ডিন হয়েছি ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে প্রতিটি আর্টিকেলে প্লাজিয়ারিজম চেক করার জন্য আমাদের যে টিম আছে, তারা বিষয়টি দেখে। এ ছাড়া বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেখা হয়। আমি সব সময় আমাদের শিক্ষকদের বলে দিই যে, যেহেতু লেখাটা আপনাদের, তাই আপনারা এটা ভালোভাবে চেক করে নেবেন।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই শুরুতে জানেন না আর্টিকেল কীভাবে লিখতে হয়। আস্তে আস্তে যখন ম্যাচিউরড পর্যায়ে যান, তখন বুঝতে পারেন। এখন শিক্ষকরা নিজেরা চেক করে নেন। তারপরও আমরা অফিস থেকে চেক করে যদি দেখি, এটা বেশি কপি হয়েছে বা প্যারাফ্রেজ করতে পারেনি, তবে আমরা সেটি আবার তাদের ফেরত দিয়ে দিই। এরপর এটি রিভিউয়ারের কাছে যায়। তিনি কমেন্টস দেন। তার ওপরে সেই শিক্ষকরা কাজ করেন। এরপর ফাইনালি সেটা সাবমিট করা হয়।’

এখন প্লাজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তির তেমন সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে শিক্ষকদের সেভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। তারা সচেতন ছিলেন না। এখন সেটা আছে। সে ক্ষেত্রে অনেককেই দোষ দিতে পারি না। তবে আপনি যদি সিনিয়র হয়ে যান, আর তারপরেও এভাবে প্লাজিয়ারিজম করেন, তবে সেটার দায়দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে।’

এ বিষয়ে ড. আবুল মনসুর আহাম্মদের বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি, জবাব দেননি খুদে বার্তার। এরপর তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠান নিউজবাংলা প্রতিবেদক। তিনি সেটি ‘সিন’ করার পরপরই নিউজবাংলা প্রতিবেদককে ব্লক করে দেন।

মোহাম্মদ মনিরুল আজম এখন দেশের বাইরে আছেন। তার সঙ্গে নিউজবাংলার যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তিনি এখন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য তাকে মেইল করা হলেও উত্তর পাওয়া যায়নি।

কপিরাইটবিষয়ক নিবন্ধেও ঢাবি শিক্ষকের চৌর্যবৃত্তি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধান ড. আবুল মনসুর আহাম্মদ

চৌর্যবৃত্তি কখন বলা হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, ‘অন্য কারও লেখা নিলে সে ক্ষেত্রে সেটি যদি কোটেশন হয়ে থাকে, তাহলে বড় না হওয়া ভালো। তবে সেটার সঙ্গে ফুটনোট ও রেফারেন্স সেকশনে লেখকের নাম, আর্টিকেল হলে ইনভার্টেট কমার মধ্যে সেটির নাম, মেইন টেক্সটের নাম, ভলিউম নম্বর যাবে। অবশ্যই সংস্করণ উল্লেখ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে এটা পরিবর্তন হয়। এটা অবশ্যই করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বড় লেখা নেয়ার ক্ষেত্রে যদি এমন হয়, আধা পৃষ্ঠা নিয়ে নেয়া হচ্ছে, তবে সেটাকে সামারাইজ করতে হবে। সামারাইজ করে নিচে ফুটনোট ব্যবহার করতে হবে। সেটা সঠিকভাবে রেফারেন্স দিতে হবে। সেখানে উল্লেখ করতে হবে অমুক বা তমুক আর্টিকেলের তিন পৃষ্ঠা নেয়া হয়েছে। তবে অনেক সময় পাঁচ-ছয় লাইন হলে টেক্সটের মধ্যে ওই অংশটিকে ইটালিক হরফ করে দিতে হয়। এখানে আলাদা প্যারাগ্রাফ করতে হবে। এতে লেখকের নাম দিয়ে দিতে হবে। এসব যদি না থাকে সেটা শাস্তিযোগ্য।’

নীতিমালা নেই

গবেষণাকাজে প্লাজিয়ারিজম নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও কোনো নীতিমালা নেই, তবে সেটি তৈরি করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখনও এটা আমরা ঠিক করতে পারিনি। তাই নীতিমালার মধ্যে কী কী থাকবে, সেটি আগে থেকেই জানাতে চাই না। তবে সেটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত হবে।’

যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নীতিমালা নেই, সে ক্ষেত্রে এখন কারও চৌর্যবৃত্তি ধরা পড়লে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে সিন্ডিকেট থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়। শোকজ দেয়া হয়, ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। সেখানে যার নামে অভিযোগ, তার নিজের একজন লোক রাখার সুযোগ আছে। তাদের সঙ্গে পর্যালোচনা হয়। যদি দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে চাকরি চলে যাবে। এটা আইনেই আছে।’

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘একটা লেখা পেয়েছি, যেটাতে ৯৭ ভাগ চুরি করা। সেখানে শাস্তি দেয়া হয়েছে ডিমোশন। তবে আমি বলেছি, চাকরি গেলে সেটা ভালো হতো। এখন সুপ্রিম কোর্ট থেকে অনেকেই রায় নিয়ে আসে। একজনকে ডিমোশন দেয়া হলো, তবে আরেকজনের চাকরি যাবে কেন; এমন করলে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান যাবে। এগুলো ঠিক করতে হবে।’

আবুল মনসুর ২০০৮ সালের ২৫ মার্চ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সাত মাস ২২ দিনের মাথায় ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদন্নতি পান। এরপর এক বছর দুই মাসের মাথায় সহযোগী অধ্যাপক এবং এক বছর ৯ মাসের মাথায় তিনি অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন।

আরও পড়ুন:
ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু ১৭ অক্টোবর
রোববার সবার জন্য খুলছে ঢাবির হল

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ১২টি মণ্ডপে চলে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ। ছবি: নিউজবাংলা

বিজয়া দশমীর দিন বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন শেষ করতে বলা হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ। তবে সবগুলো অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন দেয়া হলেও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হয় চৌমুহনীর ১১টি মন্দির।

কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে নোয়াখালীতে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়নে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এবং শুক্রবার দুপুরে একই উপজেলার চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি পূজামণ্ডপে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

হামলায় প্রাণ হারান প্রান্ত চন্দ্র দাশ নামে এক যুবক, আতঙ্কে হৃদরোগে মারা যান যতন সাহা নামে আরেকজন। লুটপাট করা হয় মন্দিরের আসবাব, স্বর্ণালংকার, ভাঙচুর করা হয় প্রতিমা।

হামলার শিকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ, প্রশাসনের অনুরোধে বিজয়া দশমীর দিন সকালেই অস্থায়ী সব মণ্ডপের দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়েছিল। এরপরেও হামলা হয় সন্ধ্যায়। এই সহিংসতা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

হামলার ভয়াবহতা এখনও দৃশ্যমান

বেগমগঞ্জে সহিংসতা চলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২টি মণ্ডপেই ভয়াবহ হামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রথম হামলা চালানো হয় উপজেলার ছয়ানী বাজার এলাকার শ্রীশ্রী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে। পুরো মন্দিরে অক্ষত বলে কিছুই নেই। মাটিতে পড়ে আছে গুঁড়িয়ে দেয়া প্রতিমা।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নিউজবাংলাকে জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সবাই ব্যস্ত ছিলেন দেবীর আরাধনায়। মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করে শুরু হয় হামলা। শতাধিক মানুষের একটি মিছিল থেকে রাস্তার পাশে হিন্দুদের বাড়িতে প্রথম হামলা হয়। হামলাকারীরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে লুটপাট চালায়। এরপর হামলা হয় মণ্ডপে।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমেই হামলা হয় স্থানীয় শীল পরিবারের বাড়িতে। ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার অভিযোগ করেছেন ওই পরিবারের সদস্যরা। ভাঙচুর করা হয়েছে ঘরের আসবাব ও প্রতিমা। এ সময় গুরুতর আহত সুমন চন্দ্র শীল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পরিবারের প্রবীণ সদস্য নিমাই চন্দ্র শীল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কল্পনাও কইরতে পারি নাই এমন হামলা হইব। মণ্ডপে মাত্র দুইজন পুলিশ আছিলো। হেতারা হামলা দেখি দৌড়াই পলাই গেছে। আমার পোলারে পিডি দিয়া পুরা শরীর ফাডাই ফালাইছে। হেতে অহন হাসপাতালো আছে। ঘরের প্রতিমাও ভাঙ্গি শেষ করি হালাইছে।’

কারা হামলা করেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেগ্গুইন ১৮-১৯ বছরিয়া পোলাহাইন, দুই একটার মাথায় টুপি ও গায়ে পাইঞ্জাবি আছিলো। হেতেরা কে আমরা চিনিনো। শুধু আংগর ধর্মরে লই গালাগালি কইরতে কইরতে ভাঙচুর কইচ্চে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর হামলা হয় চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি মণ্ডপে। বাদ যায়নি নোয়াখালীর প্রধান ইসকন মন্দিরও। ওই হামলার পর শনিবার সকালে ইসকন মন্দিরের পুকুরেই পাওয়া যায় প্রান্ত চন্দ্র দাস নামে এক ভক্তের মরদেহ। মন্দিরের আর তিনজন ভক্তও গুরুতর আহত হয়েছেন।

মন্দিরের ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ। অফিসকক্ষ, মন্দিরের বিপণিবিতান, বেকারি, খাবার হল, ভক্তদের আশ্রম, উপাসনালয় সবখানেই হামলার চিহ্ন। আগুন দেয়া হয়েছে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদের ভাস্কর্যে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে দুটি রথ ও ভক্তদের মোটরসাইকেল।

ভক্তরা দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হামলা হয়। ঘটনার তিন দিন পরও ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবারের পাত্র দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মন্দিরের উঠানে সহিংসতার শিকার হন এক ভক্ত। প্রথমে তার চুল কেটে দেয়া হয়, পরে পিটিয়ে পা ভেঙে দেয়া এবং মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়। মন্দিরের উঠানে দেখা গেছে রক্তের দাগ, পাশেই পড়ে ছিল কেটে ফেলা চুলের টিকি।

মন্দিরের অধ্যক্ষ রসপ্রিয় দাস নিউজবাংলাকে আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনীতিতে নেই, আশপাশের সব ধর্মের ভাইদের নিয়ে মিলেমিশে থাকি, কারও সঙ্গে কোনো বিভেদ নেই। আমরা কোন দোষে এমন নৃশংস হামলার শিকার হলাম? আমাদের একটাই দাবি, প্রশাসন সুষ্ঠু তদন্ত করে এর বিচার করুক।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

ইসকন মন্দিরের আশপাশের আরও ১০টি মন্দির ও মণ্ডপের চিত্রও একই রকম। ভাঙচুর-লুটপাট, অগ্নিসংযোগ চলেছে চৌমুহনীর রাধামাধব জিউর মন্দির, শ্রীশ্রী লোকনাথ মন্দির, শ্রীশ্রী শিব মন্দির, রাম ঠাকুর সেবাশ্রম মন্দির, শ্রীশ্রী রক্ষাকালী মন্দির, চৌমুহনী দুর্গা মন্দির, চৌমুহনী ত্রিশূল মন্দির, চৌরাস্তা মহাশ্মশান মন্দির, নব দুর্গা মন্দির ও মহামায়া মন্দিরে।

সহিংসতা পরিকল্পিত

বেগমগঞ্জে মন্দিরে হামলার পাশাপাশি চলেছে লুটপাট। প্রতিটি জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের সময় লুট করা হয়েছে নগদ অর্থ ও প্রতিমা সাজানোর অলংকার। সব মন্দিরেই লোহার সিন্দুক ভাঙা দেখা গেছে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা বেশকিছু ভিডিওতে দেখা যায়, চৌমুহনী কলেজ রোড ধরে হাজারো মানুষ মিছিল নিয়ে মন্দিরগুলোর দিকে ছুটে যাচ্ছে। মিছিলে পাঞ্জাবি পরিহিতরা নেতৃত্ব দিলেও হামলা-লুটপাটে মূলত অংশ নিয়েছে শার্ট-প্যান্ট পরা কিশোর-যুবকেরা।

নোয়াখালী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই হামলার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করা হয়েছে। কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে আমাদের এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই বিএনপি-জামায়াত-শিবির পরিকল্পনা করে হামলা করেছে।

‘তবে জামায়াত-বিএনপি-শিবিরের মাঝে আরও একটি পক্ষ ঢুকে গিয়েছিল লুটপাট করার জন্য। তারা শুধু টাকা আর স্বর্ণ চুরি করতেই হামলাকারীদের সঙ্গে মিশে গেছে। তারা হাতুড়ি, শাবল নিয়ে এসেছিল, যা দিয়ে বড় বড় লোহার সিন্দুক ভেঙেছে।’

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীনও দাবি করছেন, এই সহিংসতা ‘জামায়াত-শিবিরের কাজ’।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এই দাবির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর এই বেগমগঞ্জের রাজগঞ্জে তাকে চাঁদে দেখার গুজব ছড়িয়ে একই কায়দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। তাছাড়া এবারের হামলার অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে বিএনপি-জামায়াতের চিহ্নিত কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।’

বেগমগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় মোট ১৮টি মামলায় হয়েছে। এসব মামলার এজাহারনামীয় আসামি ২৮৫ জন, আর অজ্ঞাতনামা আসামি প্রায় পাঁচ হাজার। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) শহীদুল ইসলাম সোমবার দুপুরে নিউজবাংলাকে জানান, এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯০ জনকে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত কর্মীর সংখ্যা কত সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান সিকদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসামিদের মধ্যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই।’

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ তাদের এবং জামায়াতকে এই হামলার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলো স্থানীয় আওয়ামী লীগের অপরাজনীতি ও কোন্দলের ফল। স্থানীয় মেয়র ও এমপির মাঝে দলীয় কোন্দল আছে। তাদের দুই পক্ষের ঝামেলার জন্য এমনটা হয়েছে। এখানে বিএনপি-জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

‘তাছাড়া দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ও দেশজুড়ে ভোগান্তি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে আওয়ামী লীগই এই হামলা চালিয়েছে। দেশে কিছু হলেই তো সব দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেয় সরকার। তারা তো শুধু সুযোগ খোঁজে কখন বিএনপির নেতা-কর্মীদের মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার করা যায়। এখন এই ইস্যু তৈরি করে আমাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা ব্যর্থ

বেগমগঞ্জের ছয়ানী ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলার পরপরই সতর্ক অবস্থান নেয়ার দাবি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরদিন শুক্রবার বিজয়া দশমীতে বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন শেষ করার অনুরোধ জানায় প্রতিটি মণ্ডপ কর্তৃপক্ষকে।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ করা হয়। সে অনুযায়ী, সব অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যেই বিসর্জন হয়ে যায়। এই সময়ের পর যেসব স্থায়ী মণ্ডপ ও মন্দিরে প্রতিমা ছিল, সেগুলো বিসর্জনের কথা আগামী দুর্গা পূজার আগে।

হামলার শিকার মন্দিরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ধরনের নির্দেশনা মেনে চলার পরেও হামলার ঘটনায় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে সহিংসতা চললেও তা ঠেকাতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এগিয়ে আসেনি।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বেগমগঞ্জের ছয়ানীতে হামলার পর আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের পরামর্শে আমরা বিকেলের পরিবর্তে সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছি। এরপরেও যখন হামলা হলো তখন আমরা পুলিশ ও এমপি সাহেবকে টেলিফোন করে সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আসছেন আসছেন করে তিন ঘণ্টা পার হলো। এর মধ্যে আমাদের মন্দিরগুলোতে তিন দফা হামলা লুটপাট হলো। যখন সব শেষ তখন পুলিশ এসেছে। এটা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বড় ধরনের ব্যর্থতা।’

এ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নোয়াখালী ৩ আসনের সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি। তবে হামলা প্রতিহত করতে না পারাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে রাজি নন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শিহাব উদ্দিন শাহীন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আসলে বুঝতে পারিনি এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে। আগের দিন ছয়ানীতে মন্দিরে হামলার পরই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, পরদিন সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হবে, যেন জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ না পায়। সকালে ঠিকঠাক বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পর আমরা সবাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম- আর কোনো অঘটন ঘটবে না। হঠাৎই শুনি হামলার ঘটনা। এটা আমাদের জন্য বড় একটা শিক্ষা হয়েছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

মন্দিরে হামলার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এগিয়ে না আসার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহীন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা খবর পেয়েও আসেননি এ কথা ভুল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের যারাই কাছাকাছি ছিলেন ছুটে গিয়েছিলেন। এমনকি স্থানীয় এমপির ছেলে নিজে সেখানে ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু তারা সংখ্যায় কম ছিল বলে উল্টো হামলার শিকার হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।’

চৌমুহনীর প্রতিটি মন্দিরে দুইজন করে পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। হামলা শুরু হলে তারা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি এড়িয়ে যান।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সকালে প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাওয়ায় আর হামলা হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়নি। তাছাড়া পুলিশে লোকবল সংকট রয়েছে।

‘হামলা শুরুর খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম, টিয়ার শেলও ছোড়া হয়েছে কয়েক রাউন্ড, কিন্তু ওইসব সামাল দিতে গুলি চালাতে হতো। তখন এতটাই টাফ সিচুয়েশন ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় পুলিশও ছিল নিরুপায়।’

আরও পড়ুন:
ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু ১৭ অক্টোবর
রোববার সবার জন্য খুলছে ঢাবির হল

শেয়ার করুন

শিশুসহ ৩ নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের তথ্য ‘ভুয়া’

শিশুসহ ৩ নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের তথ্য ‘ভুয়া’

ফেসবুকে বিভিন্ন আইডি থেকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগটি ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে দাবি করা হয়, ১০ বছরের এক শিশু, তার বোন ও মাসি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে এ তথ্য গুজব বলে দাবি করেছেন প্রশাসন, পুলিশ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বী একই পরিবারের তিন নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ গুজব বলে দাবি করেছেন প্রশাসন, পুলিশ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

সনাতন ধর্মের নেতারা বলছেন, একটি মহল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ফেসবুকে এমন গুজব ছড়াচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার রাতে ফেসবুকে বিভিন্ন আইডি থেকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ওই অভিযোগটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে দাবি করা হয়, ১০ বছরের এক শিশু, তার বোন ও মাসি ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

শনিবার কয়েকটি পোস্টে বলা হয়, ‘ধর্ষণের শিকার ১০ বছরের শিশুটি মারা গেছে। মৃত্যুর মুখে রয়েছে তার মাসি (খালা) ও বোন।’

তবে কোনো পোস্টেই ঘটনার জায়গা বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র উদ্ধৃত করা হয়নি। নিউজবাংলার পক্ষ থেকে হাজীগঞ্জ উপজেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বরং সবাই দাবি করছেন, উপজেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও তিন জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ধর্ষণের তথ্য সম্পূর্ণ গুজব বলে দাবি করেছেন হাজীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিঠুন ভদ্র।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। তার আগে ৯ বছর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। আগে থেকেই আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজনের ভালোমন্দ দেখছি। যার কারণে যেকোনো বিষয়ে মানুষ আমাকে জানায়। তবে মন্দিরে হামলা ছাড়া এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর আমার কাছে নেই। কোনো মানুষ এমন কোনো খবর আমাদের জানায়নি। এগুলো সম্পূর্ণ গুজব।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রুহিদাস বণিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের খবরটি ভুয়া। এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের পূজা উদযাপন পরিষদ, জাতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বা বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের কোনো নেতার কাছে নেই। কেউ যদি এমন কোনো খবর ফেসবুকে পোস্ট দেয়, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। যারা এই ধরনের গুজব ছড়ায় তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই। সবাইকে এ ধরনের গুজব এড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’

হাজীগঞ্জ রামকৃষ্ণ সভা আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক নিহা রঞ্জন হালদার মিলন বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ গুজব। যারা এ ধরনের ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাই।’

‘আমাদের এলাকায় এই ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাইনি। এগুলো গুজব রটানো হচ্ছে’, বলেন হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার ত্রিনয়নী সংঘ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক গোপাল সাহা।

হাজীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো খবর আমরা পাইনি। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগও করেনি। এটা সম্পূর্ণ গুজব। এভাবে একজন মানুষ মারা যাবে আর পুলিশ বসে থাকবে, তা কখনও হয়? যারা এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সারা হাজীগঞ্জ খুঁজেও আমরা এ ধরনের কোনো সংবাদ পাইনি। এগুলো সম্পূর্ণ গুজব। এসব গুজব যারা ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, ‘ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং নেতারা নিশ্চিত করেছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব।

গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু শুনলেই বিশ্বাস না করে আগে তার সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করুন।’

আরও পড়ুন:
ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু ১৭ অক্টোবর
রোববার সবার জন্য খুলছে ঢাবির হল

শেয়ার করুন

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

নোয়াখালীর প্রতিটি উপজেলার স্ট্যান্ডে শ্রমিক-মালিক নেতারা চাঁদা আদায় করেন বলে অভিযোগ চালকদের। ছবি: নিউজবাংলা

অটোরিকশা ও চাঁদা আদায়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ২৮ হাজার ৪৩৮টি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে চাঁদা আদায় হয় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বেশি। আর দৈনিক গড়ে ১০০ টাকা হিসাবে বিভিন্ন সড়কে চাঁদা বাবদ মাসে আদায় করা হয় ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি।

নোয়াখালী জেলার প্রধান সড়কগুলোতে অনেক আগে থেকেই তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে জেলা শহরের প্রধান সড়ক, ৯টি উপজেলার উপপ্রধান সড়ক এবং শাখা সড়কগুলোতে নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনিবন্ধিত আরও প্রায় ১৫ হাজার অটোরিকশা।

জেলায় প্রায় আড়াই বছর ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে রাস্তায় নামা বন্ধ হয়নি নিত্যনতুন অটোরিকশার। বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিয়ে সড়কে চলছে এসব যান।

শুধু অনিবন্ধিত নয়, নিবন্ধিত অটোরিকশাগুলো চাঁদা দিয়ে অবাধে চলছে মূল সড়কে। অভিযোগ, জেলায় পরিবহন খাতের শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকেই মাসে চাঁদাবাজি হয় ১০ কোটি টাকার বেশি।

নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় গত আড়াই বছরে একদিকে যেমন শতকোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে সরকার, আবার জেলার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড।

এসব স্ট্যান্ড থেকেই শ্রমিক-মালিক নেতারা সমিতির নামে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন ও মাসিক হিসেবে আদায় করছেন চাঁদা। সমিতির চাঁদা হিসেবে পরিচিত ‘জিবি’ নেয়ার পাশাপাশি লাইনম্যান, পৌর টোল ও পুলিশের নামেও মাসিক চাঁদা তোলেন এসব পরিবহন নেতারা।

অটোরিকশাচালক কামরুল ইসলাম, আলা উদ্দিন, নুরুল আমিন অভিযোগ করেন, তারা যা আয় করেন তার বেশির ভাগই চলে যায় রাস্তায়।

তারা জানান, জেলা সদরের সোনাপুর জিরো পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন ভোর থেকে কয়েক হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা জেলার বিভিন্ন সড়কে চলাচল করে। প্রতিদিন সোনাপুর জিরো পয়েন্টে এসেই প্রতিটি অটোরিকশাচালককে শ্রমিক-মালিক সংগঠনকে জিবি হিসেবে দিতে হয় ৪০ টাকা।

এ ছাড়া জিরো পয়েন্টের লাইনম্যানকে ১০ টাকা, পৌর টোল ১০ টাকা, সোনাপুর থেকে মাইজদী যাওয়ার পর লাইনম্যানকে ১০ টাকা, বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় টোল হিসেবে ১৫ টাকা এবং লাইনম্যানকে দিতে হয় ২০ টাকা।

প্রধান সড়ক থেকে শাখা সড়কে ঢুকলেও দিতে হয় চাঁদা। এভাবে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি অটোরিকশাকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

এটা হলো দৈনিক হিসাব। মাস হিসাবেও চাঁদা দিতে হয় চালকদের।

অটোরিকশাচালকরা জানান, প্রতি মাসে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে অটোরিকশা সংগঠনের নেতারা সোনাপুরের প্রতিটি অনিবন্ধিত সিএনজি থেকে ৩০০ টাকা ও নিবন্ধিত সিএনজি থেকে ২০০ টাকা, মাইজদীতে ২০০ টাকা ও বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় ২০০ টাকা চাঁদা আদায় করেন।

এই চাঁদা শুধু সোনাপুর-মাইজদী কিংবা চৌরাস্তায় নয়, জেলার প্রতিটি উপজেলা স্ট্যান্ডের শ্রমিক-মালিক নেতারা এই চাঁদা আদায় করেন অভিযোগ করে চালকরা বলেন, ব্যক্তিগত খরচ, গ্যাস বিল ও চাঁদার টাকা উপার্জনে হিমশিম খেতে হয় তাদের। তাই বাধ্য হয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন তারা।

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

চাঁদা আদায়ের জায়গাগুলোর একটি হিসাব দিয়েছেন অটোরিকশাচালক ইব্রাহিম, আমির হোসেন, আবদুল হক ও কামাল হোসেন।

তারা জানান, মাইজদী আর চৌরাস্তা ছাড়াও জেলা শহরের কিরণ হোটেল মোড়, মাইজদী বাজার, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল চত্বর, জজ কোর্ট সড়ক, সুপারমার্কেট সড়ক, খলিফারহাট, উদয়সাধুর হাট, বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা, বাংলাবাজার, সোনাইমুড়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস চত্বর, বজরা বাজার, দিঘিরজান, আমিশাপাড়া বাজার, চাটখিল দক্ষিণ বাজার খিলপাড়া রোড, চাটখিল উপজেলা গেট, চাটখিল বানসা-পাওড়া সড়কে চাঁদা দিতে হয় তাদের।

বদলকোট সড়ক, চাটখিল শাহাপুর-স্যামপাড়া সড়ক, কবিরহাট, চাপরাশিরহাট, নলুয়া-ভূঁইয়ারহাট, সেনবাগ বাজার, ডমুরুয়া চৌ মোড়, কানকিরহাট, চাতারপাইয়া বাজার, সেবারহাট, সুবর্ণচরের হারিছ চৌধুরী বাজার, খাসেরহাট, ভূঁইয়ারহাট, কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট, চাপরাশিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অটোরিকশা স্ট্যান্ডে প্রতিদিনই চাঁদা দেন হাজার হাজার অটোরিকশাচালক।

নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত দুই ধরনের অটোরিকশা থেকেই তোলা হয় এসব চাঁদা। নিবন্ধিত হলে শুধু কিছু ক্ষেত্রে চাঁদার পরিমাণ কমে।

চালকরা জানান, জেলায় কমপক্ষে ২৮ থেকে ৩০ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এসব অটোরিকশার চালকদের কাছ থেকে সমিতিতে ভর্তি নামে চাঁদা আদায় থেকে শুরু করে সড়কে প্রতিদিন এবং মাসিক হিসাবে চাঁদা আদায়ে কারা জড়িত বা নিয়ন্ত্রণ করছে, প্রশাসন সবই জানে। তারা নাম বলতে পারবে না। কারণ নাম বললে পরদিন থেকে আর সড়কে উঠতে পারবে না।

অটোরিকশা ও চাঁদা আদায়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ২৮ হাজার ৪৩৮টি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে চাঁদা আদায় হয় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বেশি। আর দৈনিক গড়ে ১০০ টাকা হিসাবে বিভিন্ন সড়কে চাঁদা বাবদ মাসে আদায় করা হয় ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি।

আড়াই বছর ধরে বন্ধ অটোরিকশা নিবন্ধন

দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিবন্ধন বন্ধ থাকায় এখন অটোরিকশার সংখ্যা মাত্রা ছাড়িয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সোনাপুর, মাইজদী, চৌরাস্তাসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো থাকে অটোরিকশার দখলে। এতে এসব সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায় ট্রাফিক পুলিশ।

যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব অবৈধ যানবাহন প্রধান সড়কে চলতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শহরে মাইকিংও করছে ট্রাফিক বিভাগ। তবে কাজের কাজ খুব একটা হচ্ছে না।

অনিবন্ধিত অটোরিকশার মালিক এমরান হোসেন, আবু নাছের ও নাহিদ জানান, আড়াই বছর সিএনজি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রয়েছে। তাই চেষ্টা করেও রেজিস্ট্রেশন করাতে পারিনি।

অটোরিকশার মালিক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চার বছর আগে একটি সিএনজি কিনছি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রেজিস্ট্রেশনের জন্য বিআরটিএ নোয়াখালী অফিসে যোগাযোগ করলে জানায়, সিএনজি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ। তাই আর রেজিস্ট্রেশন করি নাই।’

সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে সোনাপুর সিএনজি মালিক সমিতিতে ভর্তির পর সড়কে চলছে তার অটোরিকশাটি।

তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে পুলিশ ধরলে টাকা দিয়ে বা তদবির করে ছাড়িয়ে আনি। রেজিস্ট্রেশন করেও লাভ কি? রাস্তায় চলতে সব সিএনজির খরচ একই। মাসের শেষে সময়মতো চাঁদা দিয়ে দিলে আর সমস্যা হয় না।’

‘পুলিশও নিচ্ছে টাকা’

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের কাছ থেকে তোলা চাঁদার একটি অংশ পুলিশ নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার নিবন্ধন না থাকায় প্রধান সড়কে অটোরিকশা থামিয়ে নানা অনিয়ম দেখিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজিও করে পুলিশ।

গত ৬ অক্টোবর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ট্রাফিক সার্জেন্ট আনোয়ারকে একটি অটোরিকশা আটকে চাঁদা আদায় করতে দেখা যায়। তিনি ওই চালকের কাছে ৫০০ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরে ৩০০ টাকা দিয়ে রক্ষা পান চালক।

এর আগে ২৮ জুলাই সোনাপুর জিরো পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দিলিপ ফল বহন করায় একটি অটোরিকশা থামিয়ে ৫০০ টাকা ঘুষ নেন। ওই ঘটনার দুই দিন পর একই স্থানে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আটকে তাকে ১০০ টাকা ঘুষ নিতে দেখা যায়।

হিসাব নেই বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের কাছেও

নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার হিসাব থাকলেও অনিবন্ধিত অটোরিকশার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেনি বিআরটিএ নোয়াখালী অফিস ও জেলা ট্রাফিক বিভাগ।

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন হয়েছে। এরপর জেলা পরিবহন কমিটির সিদ্ধান্ত না থাকায় গত আড়াই বছর নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই সময়ে নিবন্ধনের চেয়ে অটোরিকশার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে বলে ধারণা তাদের।

নোয়াখালী ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) মো. বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, ‘বর্তমানে সড়কে ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, জেলায় ২০ থেকে ২৫ হাজার অটোরিকশা রয়েছে। যার কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

সড়কে চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ২০ মে আমি এই জেলায় যোগদানের পর সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে সমিতিতে ভর্তি বাণিজ্য, মাসিক চাঁদাসহ সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করে দিয়েছি। অনিবন্ধিত ও নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে এবং মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নোয়াখালীর সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত আমরা অভিযান চালিয়ে আসছি।

‘সড়কের অবস্থানের দিক বিবেচনায় জেলা পরিবহন কমিটির সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বৈধ অটোরিকশার ক্ষেত্রে অন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

আরও পড়ুন:
ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু ১৭ অক্টোবর
রোববার সবার জন্য খুলছে ঢাবির হল

শেয়ার করুন

কোথায় গেল দেশি ল্যাপটপ

কোথায় গেল দেশি ল্যাপটপ

যাত্রার ১০ বছরেও সাড়া ফেলতে পারেনি দেশীয় ল্যাপটপ দোয়েল। ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ১০ হাজার টাকায় দোয়েল নামে দেশি ল্যাপটপ বিক্রি শুরু করেছিল টেলিফোন শিল্প সংস্থা। সে উদ্যোগের ১০ বছর হয়ে গেল, কিন্তু বাজারে জনপ্রিয়তা পায়নি এ ল্যাপটপ। নিভুনিভু হয়ে এখনও চলছে এ প্রকল্প।

জাতীয় পাখির নামে দেশের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের নাম রাখা হয় দোয়েল। শুরুতে বাজারে বেশ সাড়াও পড়ে, কিন্তু তা কমতেও সময় নেয়নি। অপ্রতুল সার্ভিস সেন্টার, দক্ষ কর্মীর অভাব, সরাসরি যন্ত্রাংশ আমদানি করতে না পারা, আমদানিতে উচ্চ শুল্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা না থাকা, নতুন প্রকল্প না নেয়াসহ নানা সমস্যায় গত এক দশকেও আর ডানা মেলা হয়নি দোয়েলের।

২০১১ সালের অক্টোবরে দোয়েল ল্যাপটপের উদ্বোধন হয়। বাজারে বৈশ্বিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের চেয়ে দোয়েলের দাম কম হলেও তা জনপ্রিয়তা পায়নি। শুরু থেকেই এ ল্যাপটপে নানা সমস্যা দেখা দেয়, যেমন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, চার্জ না থাকা, স্পিড কম, হ্যাং হওয়া, অপারেটিং সিস্টেম ঠিকমতো কাজ না করা ইত্যাদি। আবার এসব সমস্যা সমাধানে কোনো সার্ভিসও পাননি গ্রাহকরা। এতে একপর্যায়ে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

পরবর্তী সময়ে আবার চালু হয় দোয়েলের উৎপাদন, কিন্তু তত দিনে ক্রেতারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। প্রচারের অভাবসহ নানা সমস্যার কারণে এটি আড়ালেই থেকে যায়।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) থেকে ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দে ল্যাপটপ উৎপাদন শুরু করা হয়। যন্ত্রাংশের প্রায় সবই বিদেশ থেকে এনে দেশে অ্যাসেমব্লি (সংযোজন) করা হয়। ধীরে ধীরে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত যন্ত্রাংশ দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও নেয়া হয়। সেটাও আর হয়ে ওঠেনি।

টেশিস এখনও শুধু বাইরে থেকে পার্টস এনে দেশে সেগুলো জোড়া দেয়ার কাজ করছে। বিভিন্ন কোম্পানি এরই মধ্যে ল্যাপটপের বিভিন্ন পার্টস দেশেই উৎপাদন শুরু করেছে। টেশিস এক যুগেও সে পথে হাঁটতে পারেনি। তা ছাড়া এত দিনেও কোনো বড় ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়নি দোয়েলকে ঘিরে।

টেশিস নিজেরা যন্ত্রাংশ আমদানিও করে না। তৃতীয় পক্ষের আমদানি করা যন্ত্রাংশ নিজেরা সংযোজনের কাজ করছে। এতে উৎপাদন খরচও বেশি পড়ে যায়। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ল্যাপটপ যন্ত্রাংশের সংকট তৈরি হয়। ফলে যারা খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী তারা ঠিকমতো সাপ্লাই দিতে পারে না। ফলে দামও বেড়ে যায়।

সম্প্রতি টেশিস যন্ত্রাংশ আমদানির উদ্যোগ নিলেও দেশীয় শিল্প সুরক্ষা দিতে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হওয়ায় এ আমদানিও আটকে আছে।

জানতে চাইলে দোয়েলের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেশিসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল হায়দার চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০১১ সালে আমরা অনেক কম দামে ল্যাপটপ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তখন মালয়েশিয়া থেকে অ্যাসেমব্লিং করে নিয়ে আসা হতো। ১০ হাজার টাকায় ল্যাপটপ দিয়েছে, অথচ তখনকার সময় মাইক্রোপ্রসেসর কিনতেই ১০ হাজার টাকা লাগত। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কম দামে ল্যাপটপ দিতে, কিন্তু এত কম দামে তো না। যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের এটা বোঝা উচিত ছিল। মানুষের উৎসাহ কমে গিয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘কমোডিটি বাজারে ছাড়লেই হবে না। আপনাকে সার্ভিস দেয়ার জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। আপনি নতুন একটা ল্যাপটপ কিনে নিয়ে আসলেন, এটির যেকোনো সমস্যা হতে পারে। তখন আপনি কোথায় নিয়ে যাবেন। এমন হয়েছে, অনেকের একটু প্রবলেম হলে সেটা আর তিনি রিকভারি করতে পারেননি। এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

‘আমরা নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা বা বড় প্রজেক্ট পাইনি। এখনও শুধু অ্যাসেমব্লিং হয়। কিছু পার্টস উৎপাদনের জন্য কোনো প্ল্যান্ট নেই। কোনো প্রকল্পও নেই। সে ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্প বা প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ পেলেও ভালো। এমন বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আগানো হয়ে ওঠেনি। তবে এখন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

কোথায় গেল দেশি ল্যাপটপ

১০ বছরের টেশিস

নিজেদের প্ল্যান্টে গড়ে দিনে ১০০০ ল্যাপটপ সংযোজনেরর সক্ষমতা থাকলেও গত ১০ বছরে এই ব্র্যান্ডটি ৮০ হাজারের কিছু বেশি ল্যাপটপ বিক্রি বা সরবরাহ করেছে, যার বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রকল্পে জোগান দেয়া হয়েছে। মাত্র ২০ হাজারের মতো ল্যাপটপ গেছে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে।

অথচ ২০১৯ সালে এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছিলেন, দেশে পাঁচ কোটি ল্যাপটপের চাহিদা রয়েছে। দোয়েল পর্যন্ত ১১টি মডেলের ল্যাপটপ উৎপাদন করেছে। এখন বাজারে দোয়েলের ১৫ হাজার টাকা থেকে ৭৫ হাজার টাকা দামের ল্যাপটপ পাওয়া যায়।

এত বছরেও সার্ভিস সেন্টার বা বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি দোয়েলের। দোয়েল ল্যাপটপ কিনতে হলে, বিটিসিএলের টেলিফোন বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে যেতে হয়, তাও মাত্র সাতটি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। দোয়েলের কোনো প্রচারও নেই।

রাজধানীর রমনা ও নীলক্ষেতে বিটিসিএল অফিসে দোয়েল বিক্রি করা হয়। শেরেবাংলা নগরে বিক্রয়কেন্দ্র করা হলেও সেখানে বিক্রি শুরু হয়নি। আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে একটি বিক্রয়কেন্দ্র আছে। ঢাকার বাইরে আছে টঙ্গী, খুলনা ও রাজশাহীতে। ফলে দেশের প্রান্তিক এলাকায় একজন ক্রেতা ল্যাপটপ কিনলে স্থানীয়ভাবে সার্ভিস পান না।

টেশিস বলছে, দোয়েল থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। এক দশকে ৩৪১ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩২৫ কোটি টাকা।

টেশিসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল হায়দর চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এখন সরাসরি যন্ত্রাংশ আনার উদ্যোগ নিয়েছি; কিন্তু টেশিসকে এসব পণ্য আনার ক্ষেত্রে উচ্চহারে শুল্ক দিতে হয়। এত শুল্ক দিয়ে তো ব্যবসা করা সম্ভব নয়। তাই আমরা শুল্ক ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করছি।

‘আমরা যখন সরাসরি আনা শুরু করব, তখন আমাদের উৎপাদন ও পণ্যের বাজার বাড়বে। শুরুতেই যে একটা ধাক্কা খেল, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে টেশিস।’

আরও পড়ুন:
ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু ১৭ অক্টোবর
রোববার সবার জন্য খুলছে ঢাবির হল

শেয়ার করুন

নর্থ সাউথে এক প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে ১২ প্রোগ্রাম

নর্থ সাউথে এক প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে ১২ প্রোগ্রাম

ইউজিসির তদন্তে এসেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়েছে, আর সেটি হলো ব্যাচেলর অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ)। তবে এই প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও ১১টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তির আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে সেই প্রোগ্রামটির অনুমোদন নিতে হয়। তবে এই নিয়মের তোয়াক্কা করছে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে এর আড়ালে মোট ১২টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে বিষয়টিকে অবৈধ ও আইনবহির্ভূত বলছে ইউজিসি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গত ২৩ সেপ্টেম্বর নর্থ সাউথসহ আরও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনহীন প্রোগ্রামের বিষয় উল্লেখ করে গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে।

ইউজিসির তদন্তে এসেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়েছে, আর সেটি হলো ব্যাচেলর অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ)। তবে এই প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও ১১টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছে। এগুলোর কোনো অনুমোদন নেই ইউজিসির।

ইউজিসির অনুসন্ধান বলছে, বিবিএ ইন জেনারেল, বিবিএ ইন ফিন্যান্স, বিবিএ ইন হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, বিবিএ ইন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, বিবিএ ইন মার্কেটিং, বিবিএ ইন ম্যানেজমেন্ট, বিবিএ ইন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস, বিবিএ ইন অ্যাকাউন্টিং, বিবিএ ইন ইকোনমিকস, বিবিএ ইন এন্টারপ্রেনিউরশিপ এবং বিবিএ সাপ্লাই চেন ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামগুলোতে তাদের কোনো অনুমোদন নেই।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে একাধিক প্রোগ্রাম পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ নীতি ও আইনবহির্ভূত। এটা কোনোভাবেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রত্যাশিত নয়। এটা করার অর্থ হলো অবৈধ কাজ করা।’

অনুমোদনহীন কোর্সে ভর্তির বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘অনুমোদনহীন কোর্সে ভর্তি করা মানে হলো শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া।

‘এসব সনদ যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তখন তারা (নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ) অনুমোদনহীন কোর্সে ভর্তি করা শিক্ষার্থীদের চার বছরের শিক্ষাজীবন ফেরত দেবে কীভাবে? নর্থ সাউথের এসব সনদের কোনো বৈধতা নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তি করা মারাত্মক অপরাধ। আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে শিগগিরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেব।’

গণবিজ্ঞপ্তি জারির বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মো. ওমর ফারুখ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে একজন শিক্ষার্থীর উচিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া। কমিশনের ওয়েবসাইটে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি হালনাগাদ করা হয়, এতে শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।’

এ ব্যাপারে কথা বলতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি।

আরও পড়ুন:
ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু ১৭ অক্টোবর
রোববার সবার জন্য খুলছে ঢাবির হল

শেয়ার করুন

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান

পির মো. দিল্লুর রহমান থাকেন রাজারবাগের এই দরবার শরিফে। ছবি: নিউজবাংলা

প্রকৌশলীর সন্তান দিল্লুর রহমান বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পত্তি দখলের জন্য ‘মামলাবাজ সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। এই সিন্ডিকেটের মামলা থেকে আপন ভাইও রেহাই পাননি। পির দিল্লুরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রপন্থায় মদদ দেয়ার অভিযোগও পুরোনো। 

রাজারবাগ দরবার শরিফের পির মো. দিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলে উচ্চ আদালতে গেছেন ভুক্তভোগীরা। এই পিরের বিরুদ্ধে অন্যের সম্পত্তি দখলে গায়েবি মামলা দিয়ে হেনস্তা করার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রাজারবাগ দরবার শরিফের সব সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে তাদের কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করতে বলা হয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে।

প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর বুকে প্রশাসনের অগোচরে কীভাবে এত ক্ষমতাধর হয়ে উঠলেন দিল্লুর রহমান? তিন দশক ধরে মুরিদ-ভক্তদের নিয়ে সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরিফ নামের দরবার শরিফ কীভাবে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে?

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকৌশলীর সন্তান দিল্লুর রহমান বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পত্তি দখলের জন্য ‘মামলাবাজ সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। এই সিন্ডিকেটের মামলা থেকে আপন ভাইও রেহাই পাননি। পির দিল্লুরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রপন্থায় মদদ দেয়ার অভিযোগও পুরোনো।

যেভাবে পির হলেন দিল্লুর রহমান

মো. দিল্লুর রহমান ১৯৮৬ সালে রাজারবাগে তার পৈত্রিক বাড়িতে ‘দরবার শরিফ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার বাবার নাম মো. মোখলেসুর রহমান।

পারিবারিক কয়েকটি সূত্র জানায়, দিল্লুর রহমানের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তরুণ বয়সে ইসলাম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান, সেই সঙ্গে আরবি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অনুসারীদের মাঝে জনপ্রিয়তা পান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তার ভক্ত-মুরিদের সংখ্যা। একপর্যায়ে তিনি ঢাকার বুকে বড় মাপের একজন পির হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পিরের পরিবারের এক সদস্য পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারে তার (দিল্লুর রহমান) আগে কোনো পির নেই। তার বাবা ছিলেন একজন প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারের প্রভাকরদীতে। নয় ভাইবোনের মধ্যে দিল্লুর রহমান তৃতীয়।’

তিনি বলেন, ‘দিল্লুরের বাবা মুক্তিযুদ্ধের আগেই রাজারবাগে বাড়ি করেন। সেখানেই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দিল্লুর রহমান ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক ছাত্র। পড়তেন লক্ষ্মীবাজারের তৎকালিন কায়েদ ই আজম কলেজে (বর্তমান সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ)। পরে এই কলেজ থেকেই তিনি ডিগ্রি পাস করেন।’

পরিবারের ওই সদস্য জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিল মাসে পিরের বাবা সপরিবারে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানে দিল্লুরের মেজ ভাই হাফিজুর রহমান হারুন ও চাচাত ভাইয়েরা যুদ্ধে যোগ দেন। কয়েক দিন পর একটি চিরকূট লিখে দিল্লুর রহমানও বাসা ছেড়ে চলে যান। চিরকূটে তিনি যুদ্ধে যাওয়ার কথা জানান। তবে একমাস পরেই বাড়ি ফিরে আসেন দিল্লুর। এরপর থেকেই তার চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে ঢাকায় ফিরে কলেজে যেতে শুরু করেন দিল্লুর। সেই সঙ্গে ধর্মকর্মে বাড়তে থাকে মনোযোগ। শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি পড়া শুরু করেন। সাধারণ পড়ালেখার পাশাপাশি ইসলামিক বই পড়া শুরু করেন তিনি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ডিগ্রি পড়ার সময় যাত্রাবাড়ীর পির আবুল খায়ের ওয়াজিউল্লাহর মুরিদ হন দিল্লুর রহমান। সেই সঙ্গে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক রোকন উদ্দীনের কাছে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষার তালিম নেন। পরে রোকন উদ্দীনের মেয়েকেই বিয়ে করেন দিল্লুর রহমান।

পির পরিবারের কয়েক সদস্যের দাবি, ইসলামি ডিগ্রি না থাকলেও অসংখ্য ধর্মীয় বই পড়ে ও আলেমদের কাছাকাছি থেকে ব্যাপক ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করেন দিল্লুর রহমান। এজন্য অনেক সুপরিচিত আলেমও তরুণ দিল্লুরের সঙ্গে যুক্তিতর্কে পেরে উঠতেন না। খুব অল্প সময়ে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। আর সেই জনপ্রিয়তাকে ভিত্তি করে ১৯৮৬ সালে ঢাকার পৈত্রিক বাড়িতে দরবার শরিফ স্থাপন করে তিনি পুরোদস্তুর পির বনে যান। বাড়তে থাকে তার ভক্ত-মুরিদের সংখ্যা।

পিরের এক আত্মীয় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইসলামজ্ঞানে তার দখলের কারণে একটা সময় পর্যন্ত তাকে নিয়ে আমরা খুব গর্ব করতাম। সম্মান দিয়ে পরিবারের সদস্যরাও তাকে হুজুর বলে সম্বোধন করত। তবে ১৯৯৮ সালে দিল্লুর রহমানের বাবা মারা যাবার পর তার কাছে ধর্মব্যবসায়ীরা ভিড়তে থাকে। তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এরপর সে তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে নিজের ভাইদের বিরুদ্ধেই মামলা করে। সেই থেকে শুরু হয় তার মামলাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।’

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান
পির মো. দিল্লুর রহমানের গ্রামের বাড়ি

পিরের মামলায় ভাইয়েরাও জেলে

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা যায়, এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি পিরের মামলাবাজ সিন্ডিকেটের হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পিরের আপন তিন ভাইও আছেন।

রাজারবাগের পৈত্রিক সম্পদ দখলের জন্য পির তার মুরিদদের দিয়ে তিন ভাই আনিসুর রহমান ফিরোজ, হাফিজুর রহমান হারুন ও জিল্লুর রহমান তরুণের বিরুদ্ধে মামলা করান। এসব মামলায় তারা জেলও খেটেছেন। এদের মধ্যে জিল্লুর রহমান তরুণের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা করেন পিরের মুরিদরা। অন্য ভাইয়েরা পরে আপসের মাধ্যমে দিল্লুরের রোষানল থেকে এখন মুক্ত হলেও সমঝোতা না করায় বাবার বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে জিল্লুর রহমান তরুণকে।

তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, মানব পাচার, মাদক, হত্যাসহ গুরুতর বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেন দিল্লুরে মুরিদরা। এর মধ্যে ২৩টি মামলায় তরুণ খালাস পেলেও সাতটি এখনও বিচারাধীন।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে জিল্লুর রহমান তরুণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার আপন ভাই আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, এই লজ্জার কথা আমি কাউকে বলতে চাই না। আমি আমার মতো আছি, তার (দিল্লুর রহমান) সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের বংশে কোনো পির ছিল না। আমরা এক সময় তাকে নিয়ে খুব গর্ব করতাম। কিন্তু কিছু খারাপ মুরিদ আর স্ত্রীর প্ররোচনায় সে অধঃপতনে গেছে।’

ভাস্কর্য ভাংচুর ও উগ্রবাদে জড়ানোর অভিযোগ

রাজারবাগ পির দিল্লুর রহমানের প্রতিষ্ঠা করা ধর্মীয় সংগঠন আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত। ২০০০ সাল থেকে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদি তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৯ সালে ১২টি ধর্মভিত্তিক সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করে সরকার। এগুলোর মধ্যে অন্যতম আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত। এছাড়া, পির দিল্লুর রহমানের নিজস্ব পত্রিকা দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক পত্রিকা আল বাইয়্যিনাতে গণতন্ত্র, নির্বাচন, জাতীয় সংগীত, বৈশাখী উৎসব, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়ে নেতিবাচক মতামত প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে।

২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর আল বাইয়্যিনাতের অনুসারীরা মতিঝিলের বলাকা ভাস্কর্য ভাংচুর করেন। এ ঘটনায় পুলিশ আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের আট সশস্ত্র কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ভাস্কর্য ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন দিল্লুর রহমান।

ওই ঘটনার কয়েক মাস পর আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের অনুসারীরা বিমানবন্দর গোলচত্বরে বাউলের ভাস্কর্যটিও ভেঙে ফেলেন। এছাড়া, ২০১৭ সালে হাইকোর্ট চত্বরে লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য স্থাপনের পরপরই আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত সেটি সরিয়ে ফেলতে উড়ো চিঠিতে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পিরের পরিবারের এক সদস্য নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এসব ঘটনার পরিকল্পনা পিরের দরবার শরিফে বসেই হতো। মতিঝিলের বক (বলাকা ভাস্কর্য) ভাঙার মিটিংয়ের আলোচনার কিছুটা আমি নিজ কানে শুনেছিলাম। তার এসব অপকর্মের জন্য অন্য ভাইদেরও পুলিশ-গোয়েন্দাদের চাপে পড়তে হয়েছে। তবে তার ভাইয়েরা জড়িত ছিল না। এরপর বাধ্য হয়ে পিরের তিন ভাই মিলে সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ঘটনার সব দায় আল বাইয়্যিনাতের।’

গ্রামের বাড়িতে যান না দিল্লুর রহমান

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার প্রভাকরদী গ্রামের মৃত মোখলেসুর রহমানের ছেলে দিল্লুর রহমান। এক সময়ের গ্রাম্য মাতবর মোখলেসুর রহমানকে গ্রামের সবাই এক নামে এখনও চেনেন। তবে তার ছেলে দিল্লুর রহমান সম্পর্কে তারা খুব একটা তথ্য দিতে পারেননি।

প্রভাকরদী গ্রামে দিল্লুরদের পৈত্রিক বাড়ির নাম ‘মিয়া বাড়ি’। সেখানে ‘মিয়া মসজিদ’ নামে একটি মসজিদও রয়েছে। ভিটায় রয়েছে তিন তলা একটি ভবন, তবে সেখানে কেউ থাকেন না।

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান
গ্রামের বাড়িতে পির মো. দিল্লুর রহমানের কথিত মাদ্রাসা

গ্রামবাসী জানান, দিল্লুর রহমান গ্রামে না গেলেও তার অনুসারীরা সেখানে যাতায়াত করেন। প্রতিবেশী এক নারী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই বাড়িতে কেউ থাকে না। হুজুর (দিল্লুর রহমান) এখানে আসে না, কিন্তু তার লোকজন আসে। তারা এসে কয়েক ঘণ্টা থেকে আবার চলে যায়। মাঝে মধ্যে তার বড় ভাই আসত, তবে তিনিও এখন আসেন না। তাই বাড়িটা ফাঁকাই থাকে।’

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগে তারা হঠাৎ শুনতে পান, মোখলেস মাতবরের ছেলে দিল্লুর পির হয়ে গেছেন। এরপর সাদা কাপড় পরে বিশাল ভক্তদল নিয়ে তিনি প্রতি বছর একবার গ্রামে মাহফিল করতে আসতেন। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে সেই মাহফিলও বন্ধ।

পিরের অনুসারীদের কয়েক জন দাবি করেন, প্রভাকরদী গ্রামের পাশে সরাবদী গ্রামে দিল্লুর রহমানের একটি মাদ্রাসা আছে। তবে সেই ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে একটি টিনশেড ঘর দেখা গেছে।

ঘরের বাইরে মাটি কাটছিলেন একজন। নিজেকে মাদ্রাসার শিক্ষক পরিচয় দিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনার জন্য মাদ্রাসা বন্ধ। এখানে বাংলা ও আরবি পড়ানো হয়। এটি পীর সাহেবের তৈরি কামিল মাদ্রাসা।’

মাদ্রাসায় কত জন শিক্ষার্থী শিক্ষক রয়েছে, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি দিতে পারেননি।

গ্রামবাসীর দাবি, টিনশেড ঘরটি কোনো মাদ্রাসা নয়। আগে সেখানে এক ব্যক্তি পরিবার নিয়ে থাকতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর এখন আরেকটি পরিবার আছে।

সরাবদী গ্রামে দিল্লুর রহমানের জমি দখলের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না কেউ। গ্রামের এক জন জানান, ‘বিভিন্ন মানুষের খেতে খুঁটি গেঁথে রেখেছেন পিরের অনুসারীরা। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। এক মামলা শেষ না হতেই আরেক মামলার মুখে পড়তে হয়।

আরও পড়ুন:
ঢাবিতে সশরীরে ক্লাস শুরু ১৭ অক্টোবর
রোববার সবার জন্য খুলছে ঢাবির হল

শেয়ার করুন