20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
বেড়েছে কুকুরের কামড়, কমেছে জলাতঙ্ক

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসা শিশু। ছবি: সাইফুল ইসলাম

বেড়েছে কুকুরের কামড়, কমেছে জলাতঙ্ক

২০১৯ সালে ঢাকায় কুকুরের কামড়ের পর টিকা নিয়েছে ৭৬ হাজার মানুষ, আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার। তবে টিকা নেয়ার সচেতনতা বাড়ায় কমে আসছে জলাতঙ্ক। এক দশকে কমেছে ৯০ শতাংশ।

জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। বাবার হাত ধরে এসেছে সাত বছরের রাহাত। হাঁটছে খুঁড়িয়ে। কারণ, পায়ে কামড় দিয়েছে কুকুর। জলাতঙ্ক যেন না হয় সে জন্য বাবাকে নিয়ে এসেছে টিকা দিতে।

রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়ায় থাকে রাহাত। বাড়ির পাশেই কুকুরের কামড়ে আহত হয়েছে সে।

‘আমি (মাঠে) খেলছিলাম। হঠাৎ করে পেছন থেকে কুকুর এসে আমার পায়ে কামড় দেয়। আমি জোরে চিৎকার দিলে আমায় ছেড়ে দিয়ে কুকুর পালিয়ে যায়।’

কীভাবে ঘটনাটি ঘটল-সেটা বলছিল রাহাত। বাসায় গিয়ে বলার পর বাবা দেরি না করে জলাতঙ্কের টিকা দিতে নিয়ে আসেন।

মহাখালীর হাসপাতালটিতে এই টিকা দেওয়া হয়। আর রাহাতকে টিকা নিতে হয়েছে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে; লাইনে দাঁড়িয়ে।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসেন ২০০ জনেরও বেশি
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসে ২০০ জনের বেশি মানুষ।
ছবি: সাইফুল ইসলাম

রাজধানীতে পথ কুকুর অপসারণ নিয়ে বিতর্ক চলছে। এক পক্ষ কুকুর সব রাজধানীর বাইরে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তবে একটি পক্ষ আবার একে অমানবিক বলে বিরোধিতা করে বলছে, কুকুর বড় কোনো সমস্যা তৈরি করছে না।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কর্মীরা বলছেন, দিনে ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ মানুষ আসে জলাতঙ্কের টিকা নিতে। বছর শেষে সংখ্যাটি চমকে উঠার মতো; ৭০ হাজারের বেশি। এই রোগীদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই রাজধানী ঢাকার।

এত মানুষকে কুকুরে কামড়ালেও জলাতঙ্ক রোগীর সংখ্যা কমছে। গত তিন বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ ছুঁই ছুঁই। তাদের সবাই মারা গেছেন।

হাসপাতালের কর্মীরা বলছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর এপ্রিল থেকে কুকুরে কামড়ানোর টিকা নিতে আসা এবং জলাতঙ্কের রোগীর সংখ্যা বছরের আগের চার মাসের তুলনায় কম।

হাসপাতালের ভেতরে দেখা হয় ৭০ বছরের হোসনে আরা বেগমের সঙ্গে। রাজধানীর খিলগাঁও এলাকা থেকে এসেছেন জলাতঙ্কের টিকা নিতে। জানালেন কুকুর তাকে সাত থেকে আট বার কামড়েছে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে ৭০ হাজার ১৮১ জন এবং পরের বছর ৭৬ হাজার ৩৭০ জন টিকা নিয়েছেন।

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে টিকা নেওয়ার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবের পর মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা ছিল আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে কম। মানুষের বাড়ির বাইরে যাওয়া কমে যাওয়াই এর কারণ।

তবে জুলাই আগস্ট থেকে রোগী আবার বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ হাজার নয়শ পাঁচ জন কুকুরে কামড়ানো রোগী টিকা নিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল ইউনিট-সিডিসির তথ্য অনুসারে, সারা দেশে কুকুরের আক্রমণের একটি বড় অংশ ঘটে ঢাকায়। ২০১৮ সালে ঢাকায় যেখানে টিকার সংখ্যা ৭০ হাজারের কিছু বেশি, সেখানে সারাদেশে টিকাদানের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪০৯টি।

২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে টিকা দেওয়া হয়েছে তিন লাখ।

এত মানুষকে কেন কুকুর কামড়ায়? হাসপাতালে আসা যাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সবাই বলেছেন, তারা কিছুই করেননি। কুকুরগুলো ছিল আক্রমণাত্মক।

তবে সিডিসির কুকুর টিকাদান কর্মসূচির এমডিভি সুপারভাইজার হাসান সায়েদুল মুরসালিন বলেছেন, এমনটা হয় খুব কমই। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ কুকুরকে উত্যক্ত না করলে কুকুর কখনও কামড়ায় না।’

জলাতঙ্ক কমছে

কুকুরের কামড় বাড়লেও জলাতঙ্কের প্রকোপ অবশ্য কমছে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত সারা দেশে প্রতি বছর গড়ে জলাতঙ্কে মারা যেত দুই হাজার জন। তবে ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মৃত্যু কমে ২৩০ জনে নেমেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যু সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।

কুকুরের কামড়ের মতোই জলাতঙ্কে মৃত্যুর সিংহভাগ হয় ঢাকায়। ২০১৮ সালে মহাখালির জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মারা যায় ৩৬ জন। ২০১৯ সালে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ জন। তবে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছে ১৫ জন।

জলাতঙ্ক রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত। রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে বড়জোর দুই থেকে তিন দিন বাঁচেন একজন রোগী।সাধারণত দুই ধরনের জলাতঙ্ক রোগী দেখা যায়। এক ধরনের রোগী নীরবে মারা যান। এছাড়া খিঁচুনি হওয়া, পানি দেখে ভয় পাওয়া, শরীরে বাতাস লাগলে ভয় পাওয়া, খাবার খেতে না চাওয়া, মানুষকে কামড়াতে যাওয়ার উপসর্গ দেখা দেয়। এই রোগীদের বলা হয় রেবিজ এনসেফালাইটিস।

বিশ্বে বছরের ৫৫ হাজার মানুষ এই রোগে মারা যায়। এই মৃত্যু কমাতে ব্যাপকহারে কুকুর টিকাদান কার্যক্রম গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে সারা পৃথিবীতে।

কুকুরের জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকাদান (এমডিভি) কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশে ৬৭ কেন্দ্রের মাধ্যমে টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩০টি কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে। আগামী এক বছরে আরও আনুমানিক পাঁচ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য