বিদেশি ভাষার দাসত্ব করা যাবে না: যতীন সরকার

ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথকে চিনেছি। আমরা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নজরুলের খণ্ডিতকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রচর্চা যেমন হয়েছে, তেমনি বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহারের যে চর্চা সেটিও হয়েছে। কাজেই এটি প্রকৃত প্রস্তাবে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল। সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনই একসময় রাজনৈতিক আন্দোলন এবং তারপরে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে পরিণত হয়েছে। এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মুক্তির সংগ্রামের কথা। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত মুক্তির সংগ্রামে বিজয় লাভ করা।

অধ্যাপক যতীন সরকার আমাদের চেতনার অন্যতম বাতিঘর। তার মনীষা, দিকনির্দেশনা আমাদের আলো দেখায়। অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল চিন্তা ঋদ্ধ করে। স্বাধীনতা পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি পদকপ্রাপ্ত এ চিন্তাবিদ ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি, ভাষা-সংস্কৃতি ও এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন নেত্রকোনা প্রতিনিধি অনিন্দ্য পাল চৌধুরী।

প্রশ্ন: ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষা নিয়ে আমরা একটু বেশি সরব হই। সারা বছর এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য পরিলক্ষিত হয় না। এ বিষয়ে আপনি কী ভাবেন?

উত্তর: একুশের চেতনা নিয়ে আমরা অনেক বড় বড় কথা বলি। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সর্বত্র এসব কথা শোনা যায়। কিন্তু একুশের চেতনাকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার জন্যে প্রশাসন থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য মানুষ বিশেষ করে হঠাৎ বিত্তশালী হওয়া ব্যক্তিদের কোনো গরজ চোখে পড়ে না। গরজ তো করেনই না বরং একুশের চেতনাবিরোধী কাজ তারাই করেন। সেই অপকমের্র মধ্যে একটি হচ্ছে ইংরেজিমাধ্যম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং ওই মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের পড়ানো। সন্তানদের বাংলা ভাষা ভালোভাবে শেখানোর যে ব্যাপারটা, সেটিও তারা করেন না। কাজেই এই অবস্থাতে একুশের চেতনা বাস্তবায়নের কথা মুখে বলা একেবারে অনর্থক।

প্রশ্ন: অনেকে বলে থাকেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় সমস্যা আছে, সেক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?

উত্তর: বিশ্বের সব জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আমাদের ভাষায় নিয়ে আসতে হবে, করতে হবে মানসম্মত পরিভাষা ও অনুবাদ। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ইংরেজি ভাষার চর্চা ভালোভাবে করতে হবে। অন্য একটি ভাষা ভালো করে শিখলে সেই ভাষায় খুব তাড়াতাড়ি অনুবাদ করা যায়। আসল কথা হলো এটা কোনো অনুবাদই নয়। অন্য ভাষায় চিন্তা করা যায় না। চিন্তার ভাষা হচ্ছে মাতৃভাষা। ইংরেজির সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে আমরা পরিচিত। কাজেই ইংরেজি ভাষাটাও ভালো করে শিখতে হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ইংরেজির দাসত্ব করা চলবে না; কিংবা বিদেশি ভাষার দাসত্ব করা যাবে না।

প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত চেতনা প্রসঙ্গে যদি কিছু বলেন।

উত্তর: ভাষার যে আন্দোলন সেটা মূলত সাংস্কৃতিক আন্দোলনই ছিল। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথকে চিনেছি। আমরা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নজরুলের খণ্ডিতকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রচর্চা যেমন হয়েছে, তেমনি বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহারের যে চর্চা সেটিও হয়েছে। কাজেই এটি প্রকৃত প্রস্তাবে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল। সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনই একসময় রাজনৈতিক আন্দোলন এবং তারপরে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে পরিণত হয়েছে। এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন মুক্তির সংগ্রামের কথা। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত মুক্তির সংগ্রামে বিজয় লাভ করা।

প্রশ্ন: মাতৃভাষার উন্নতিকল্পে কী করণীয়?

উত্তর: মানুষ যে ভাষায় চিন্তা করে সেই ভাষায় কথা বলে। মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কেউ চিন্তা করতে পারে না। কাজেই আমাদের মাতৃভাষার উন্নতির জন্য করণীয় সব কিছু করা উচিত। বাংলা ভাষাকে সত্যিকার অর্থে প্রচার করতে হলে বিদেশি ভাষাকেও ভালো করে জানতে হবে। এ ছাড়া বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচার করার আর কোনো বিকল্প নেই।

প্রশ্ন: আপনার স্মৃতি থেকে ভাষা আন্দোলনের কথা জানতে চাই।

উত্তর: ঘটনা ঢাকায় ঘটলেও এটা যে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল সেটার সাক্ষী আমি। তখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্র। আমি স্কুল থেকে বের হয়ে গিয়ে বসুরবাজারে হরতাল করি। এলাকার সমস্ত মানুষ সেই হরতালে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়। এভাবে প্রত্যেকটা গ্রামের বাজারে বাজারে হরতাল হয়। সবখানে যখন একুশের ইতিহাস ও ঘটনার কথা লেখা হয়, তখন সেটা বড়জোর মহকুমা পর্যন্ত এসে থেমে যায়। যদি গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে, কৃষকদের সন্তানদের মধ্যে চেতনা বিস্তৃত না হতো, তাহলে একুশ এত বিস্তৃত হতে পারত না।

প্রশ্ন: একুশের চেতনায় যে সাংস্কৃতিক ধারা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি কি বর্তমান প্রবাহিত বলে মনে করেন?

উত্তর: আমরা সবাই বলি একুশের চেতনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা লাভ করেছি। একটা স্বাধিকার সংগ্রাম আমরা করেছি। একুশের চেতনার মধ্য দিয়ে একটা সাংস্কৃতিক সংগ্রাম তৈরি হয়েছিল। এখন সেই সাংস্কৃতিক ধারাটা বদলে গেছে। আমরা একুশের চেতনাকে মুখে মুখে বলি। একুশে ফেব্রুয়ারি আসলেই অনেক কথা বলি। কিন্তু একুশের চেতনাকে বাস্তবায়নের জন্য যথার্থ অর্থে বাংলা ভাষার যে সর্বত্র ব্যবহার এবং আমাদের সংবিধানে যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথা বলা হয়েছে, তা সবখানেই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং আজকে কিছুসংখ্যক মানুষ ইংরেজি মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের পড়াতে পারলে বিশেষ খুশি হন। ইংরেজিমিশ্রিত ভাষা বলার চেষ্টা চলছে; যেটাকে বাংলিশ বলা যায়।

প্রশ্ন: আপনার মতে একুশের চেতনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব?

উত্তর : একুশের চেতনা যদি সত্যি সত্যি বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলে আমাদের সব জায়গায় বাংলা ভাষা যাতে প্রয়োগ হয়, সেই ব্যবস্থাটি আগে করতে হবে। অফিস-আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে হবে। বিচারকদের বাংলায় রায় দিতে হবে। সবখানে বাংলা যদি প্রয়োগ না হয় বা বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় চালু না হয়, তবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা হুমকিতে পড়বে। ইংরেজি ভালোভাবে শেখার ব্যবস্থা বাংলা মাধ্যমেই সম্ভব। ইংরেজি ভালোভাবে শিখে এসে সেই বাংলা মাধ্যমে প্রচার করার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি না করলে প্রকৃত অর্থে একুশের চেতনার বাস্তবায়ন আমরা করতে পারব না। একুশের ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হোক। চেতনা জাগ্রত হোক, এটাই ভাষার মাসে সবচেয়ে আমার বড় চাওয়া। একুশের চেতনা জাগ্রত করতে হলে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন করতে হবে। যেমন ৬০-এর দশকে গড়ে উঠেছিল। সেই রকম একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া একুশের চেতনাকে জাগ্রত করা এবং সবখানে প্রসারিত করা সম্ভব হবে না।

প্রশ্ন: নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ

উত্তর: ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সাহসী নারীরাই সফল উদ্যোক্তা: রেজবিন হাফিজ

সাহসী নারীরাই সফল উদ্যোক্তা: রেজবিন হাফিজ

উদ্যোক্তা মানে যোদ্ধা। সাহসী না হলে উদ্যোক্তা হওয়া যায় না। ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে অর্থায়ন বড় বাধা। এ জন্য ঋণ প্রয়োজন, কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বলা হয়, ব্যাংকের ঋণ পাওয়া অনেক সহজ, কিন্তু ঋণ নিতে গেলে দেখা যায় নানা ভোগান্তি।

ব্যবসা করতে হলে নারীদের সাহসী হতে হবে। তা না হলে সফল উদ্যোক্তা হওয়া যায় না বলে মনে করেন পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার গুডসের স্বত্বাধিকারী রেজবিন হাফিজ।

তিনি বলছেন, অর্থায়নই নারীদের ব্যবসার বড় বাধা। ব্যাংকগুলো সহজে ঋণ দেয় না, এ কারণে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয় নারী উদ্যোক্তাদের।

ঋণপ্রাপ্তি সহজ ও নারীদের জন্য বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়ার আহ্বান জানিয়ে রেজবিন হাফিজ বলেন, ‘এটি নিশ্চিত করতে পারলে ব্যবসা–বাণিজ্যে উৎসাহিত হবেন নারী উদ্যোক্তারা।’

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উদ্যোক্তাদের সমস্যাসহ ব্যবসায়িক নানা বিষয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন এসএমই পণ্যমেলা ২০২০-এর বর্ষসেরা এই নারী উদ্যোক্তা।

করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দেশের অর্থনীতি ক্রমেই ভালোর দিক যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় ফিরে এসেছে। অর্থনীতির বাকি সূচকগুলোও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আশা করছি, চলতি বছরেই আগের চেহারায় ফিরে যাবে অর্থনীতি।

করোনার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জে পড়েন। তাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন মেলার আয়োজন করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছে। ছোট-বড় মার্কেট, শপিং মল খুলে দেয়ায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি বাড়ছে। উদ্যোক্তারা যেসব পণ্য উৎপাদন করেন সেগুলো যদি ঠিকমতো বাজারজাত করা যায়, তাহলে অচিরেই প্রাণ ফিরে পাবে অর্থনীতি।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে অর্জন আপনি কীভাবে দেখছেন?

করোনার মধ্যেও প্রবাসীরা রেকর্ড রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। আমদানি-ব্যয়ও আগের তুলনায় কমে গেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। করোনা মহামারির মধ্যে রেমিট্যান্স ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অর্জন করে। এটা অবশ্যই অর্থনীতির জন্য সুখবর।

করোনাভাইরাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। ছবি: নিউজবাংলা

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ কি যথেষ্ট?

প্রণোদনার অর্থ যদি ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের মাঝে সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়, তাহলে সরকার যে পরিমাণ সহায়তা ঘোষণা করেছে সেটা যথেষ্ট। তবে আরও সহায়তা পেলে ভালো হতো। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। যারা খুব সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করেন, তারা যেন এ অর্থ পান সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধার বিষয়ে আপনার মত কী?

প্রণোদনা প্যাকেজে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেয়া উচিত। কারণ, এখন নারীরা ব্যবসায় বেশ ভালো করছেন। তারা ব্যবসায় এগিয়ে আসছেন। সেক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া খুবই জরুরি।

নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা কী?

নারী উদ্যোক্তাদের কয়েকটি বাধা রয়েছে। প্রশিক্ষণ অন্যতম সমস্যা। তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এটা না হলে ব্যবসা শুরুর পর নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়।

এর সঙ্গে আছে সামাজিক বাধা, যদিও এটা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। তবে একজন নারী ব্যবসা করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা আরও বেশি প্রয়োজন।

অর্থায়ন নারীর ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় বাধা। অবশ্য বর্তমান সরকার উদ্যোক্তাবান্ধব হওয়ায় এ সমস্যার কিছুটা লাঘব হয়েছে। নারীদের এগিয়ে নিতে অনেক কাজ করছে সরকার। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তারা যাতে সহজে ঋণ পেতে পারেন, সেজন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ অন্য ঋণদানকারী সংস্থা। তবে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা দরকার।

রেজবিন হাফিজের ভাষায়, উদ্যোক্তা মানে যোদ্ধা, সাহসী না হলে উদ্যোক্তা হওয়া যায় না।

বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে পদে পদে বাধার অভিযোগ রয়েছে আপনি কী মনে করেন?

ব্যবসার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস খুব জরুরি। দ্রুত এটা চালু হলে উদ্যোক্তারা সুফল পাবেন। কারণ, এক জায়গায় সব সেবা পাওয়া গেলে সহজে শুরু করা যায়।

গ্রাম পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। আমাদের কাজের সুযোগ আছে, অনেকে উদ্যোক্তা হতে চান, কিন্তু প্রশিক্ষণের অভাবে সেটা হতে পারেন না। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রত্যেককে নিজের জায়গা থেকে উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। একজন উদ্যোক্তা হয়ে উঠলে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

করোনার প্রভাবে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উদ্যোক্তারা অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা দিতে হবে।

উদ্যোক্তা মানে যোদ্ধা। সাহসী না হলে উদ্যোক্তা হওয়া যায় না। ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে অর্থায়ন বড় বাধা। এ জন্য ঋণ প্রয়োজন, কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বলা হয়, ব্যাংকের ঋণ পাওয়া অনেক সহজ, কিন্তু ঋণ নিতে গেলে দেখা যায় নানা ভোগান্তি।

জামানত ছাড়া নারীদের কিছু খাতে ঋণ দেয়া হয়। এর পরিধি আরও বাড়াতে হবে। উদ্যোক্তা উৎসাহিত করতে ঋণ পাওয়া আরও সহজ করতে হবে।

করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের চামড়াশিল্পে কী প্রভাব পড়েছে?

অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো চামড়াশিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ খাতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ক্রয় আদেশ বাতিল হয়। এখন খাতটি ধীরে ধীরে ক্ষতি কাটিয়ে উঠছে। করোনা যে এত দীর্ঘ হবে, তা কেউ ভাবেনি।

সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে এসব শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চামড়া রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত। বিশেষ সুবিধা দিলে আরও ভালো করতে পারবে এ শিল্প।

করোনার কারণে অন্যান্য শিল্পের মতো চামড়াশিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীরা কতটুকু এগিয়েছেন?

গত ১০ বছরের চিত্র দেখলে বোঝা যায় নারীরা কীভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন। ২০১২ সালে যখন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করি, তখনকার পরিবেশ আর এখনকার পরিবেশ আলাদা।

বর্তমানে অনেক সংগঠন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করছে। বর্তমান সরকার নারীবান্ধব অনেক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের কারণে সারা বিশ্ব হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

এখন ইচ্ছা করলে অনলাইনে পেজ খুলে ব্যবসা করা যায়। কয়েক বছর আগেও এটা সম্ভব ছিল না। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। নারীরা এখন ঘরে বসে ফেসবুকে পেজ খুলে পোশাক, প্রসাধনী থেকে শুরু করে গৃহস্থালিসহ সব কিছুর ব্যবসা করতে পারছেন। ফলে অর্থনীতিতে নারীর সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে।

একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হতে হলে কী করতে হবে?

আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। অদম্য মনোবল থাকতে হবে। যে ধরনের উদ্যোক্তা নারী হতে চান, সে বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস, মনোবল থাকলে যেকোনো কাজে সফলতা আসবে।

আগামী বাজেটে কর্মসংস্থানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান রেজবিন হাফিজের।

আগামী বাজেটে কোন বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

করোনা মহামারির কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনশ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এ জন্য কর্মসংস্থানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আগের তুলনায় বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। তাহলে নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও উৎসাহিত হবেন। এ ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে কৃষি, শিল্প, সেবা খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শেয়ার করুন

সরকারি ব্যয়, ভোগ বাড়াতেই হবে: ড. মোয়াজ্জেম

সরকারি ব্যয়, ভোগ বাড়াতেই হবে: ড. মোয়াজ্জেম

সংক্রমণের শুরুর দিকে ঝুঁকি নিয়ে অর্থনীতি খুলে দেয় সরকার। এর সুফলও মিলেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি এবং সেবা খাতে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কম সময়ে  ঘুরে দাঁড়ায় অর্থনীতি। কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানো আর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এক নয়।

করোনার কারণে অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া ক্ষত কাটাতে আরও এক বছর লাগবে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি মনে করেন, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও এখনও পুনরুদ্ধার হয়নি। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হলে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প-এমএমই, গ্রামীণ অর্থনীতিসহ ‘লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা, অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয় এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিই আগামীতে অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ হবে।

সরকারি ব্যয় ও ভোট বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে এই অর্থনীতিদিব বলেন, যত বেশি ব্যয় হবে, তত বেশি ভোগ সৃষ্টি হবে। চাঙ্গা হবে অর্থনীতি।

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, আগামী বাজেট ভাবনাসহ নানা বিষয় নিয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন এই অর্থনীতিবিদ।

করোনা পরবর্তী অর্থনীতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী ?

করোনার প্রথম দিকে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। কঠিন সময় পার হয়ে ধীর ধীরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে সম্প্রতি গতি আগের চেয়ে শ্লথ হয়েছে।

এই বার্তা আমাদের মতো দেশে খুবই গুরুত্ব বহন করে। কারণ, অনেকেই এখনও কর্মহীন। তাদের পক্ষে টিকে থাকাইটাই কঠিন। অর্থনীতি গতিশীল থাকলে মানুষের আয় রোজগারের সুযোগ তৈরি হয়।

সংক্রমণের শুরুর দিকে ঝুঁকি নিয়ে অর্থনীতি খুলে দেয় সরকার। এর সুফলও মিলেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি এবং সেবা খাতে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কম সময়ে ঘুরে দাঁড়ায় অর্থনীতি। কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানো আর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এক নয়।

ঘুরে দাঁড়ানোর চালেঞ্জ কাটিয়ে উঠা গেছে। এখন পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

তবে এটা ঠিক, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে।

করোনা মহামারির মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এ অর্জনকে কীভাবে দেখছেন ?

দুই শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও বিশ্বব্যাপী হুন্ডি বন্ধের ফলে বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার অন্যতম কারণ রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ।

প্রবাসীরা বেশি টাকা পাঠানোর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভ স্ফীত হয়েছে। এটি চার হাজার ৩০০ কোটি ডলার (৪৩ বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে। আবার আমদানি কম হওয়ায় রির্জাভ বেড়েছে।

শাপলা চত্বর

করোনা মহামারির মধ্যেও দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ছবি: সাইফুল ইসলাম

এর একটি ইতিবাচক দিক আছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়কালে বেশি রিজার্ভ থাকার কারণে সহজেই অর্থ পাওয়া গেছে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। কারণ, তারা মনে করে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে বাংলাদেশের।

চলতি অর্থবছরে আট মাস চলছে সামনে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী ?

এ মুহূর্তে অর্থনীতির দুটি চ্যালেঞ্জ। একটি হলো ভোগ ব্যয় চাঙ্গা করা। অন্যটি রাজস্ব আদায় বাড়ানো।

মানুষ কাজ হারিয়েছে, কাজ কম পাচ্ছে, কম আয় করছে। ফলে যে মাত্রায় গতিশীল হওয়ার দারকার অর্থনীতি, সেটি হচ্ছে না।

অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয় না বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে না। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের দিকে না থাকিয়ে কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প নিতে হবে সরকারকে।

দ্ধিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা। আমদানি–রপ্তানি কামার কারণে রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কম রাজস্ব আহরণ সরকারের জন্য বড় দুর্ভাবনা।

ব্যয় কমার কারণ কী ?

সম্পদের সীমাবদ্ধতা তেমন নেই। কারণ, রাজস্ব আহরণ কম হলেও ব্যাংক এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি থকে প্রচুর ঋণ নিচ্ছে সরকার। বিদেশি ঋণও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সরকারের সম্পদের ঘাটতি আছে,- এমনটি বলার সুযোগ নেই।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। যেসব প্রকল্পে কাজের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, সেগুলো প্রাধিকার দিয়ে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

কিন্তু এখানে বড় দুর্বলতা আছে। দেখা যায়, অনেক বড় প্রকল্পে বেশি বরাদ্দ দেয়া হলেও তা ঠিকমতো খরচ করতে পারে না। টাকা ফেরত যাচ্ছে। অর্থবছরের শুরুতে ব্যয়ের দিকে বেশি নজর দিলে এ অবস্থা হতো না।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ কি যথেষ্ট বলে আপনি মনে করেন ?

প্রণোদনা ঘোষণার ফলে স্বস্তি দেখা দেয় অর্থনীতিতে। কিন্তু দুর্বল দিক হচ্ছে পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়ন না হওয়া। বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য দেয়া ঋণের শতভাগ ব্যয় হলেও পিছিয়ে ক্ষুদ্র,অতিক্ষুদ্র,মাঝারি ও কৃষিখাত। অথচ এসব খাতই অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি।

পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হলে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা সুবিধা দিতে হবে। ক্ষুদ্র,অতিক্ষুদ্রসহ এসএমই, সেবা ,অ-প্রাতিষ্ঠানিক, গ্রামীণ অর্থনীতিকে এ সুবিধা দিতে হবে।

ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে ক্ষুদ্রঋণ দানকারি সংস্থার, এনিজও এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমিতির মাধ্যমে ঋণসহায়তা দিতে হবে। ঋণসুবিধার পাশাপাশি কর সুবিধা দেয়া যেতে পারে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে কোন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

কর্মসংস্থানের জন্য রপ্তানিমুখী খাতের অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে। এর বাইরে কৃষিভিত্তিক, এসএমই, পরিবহন, পর্যটন খাতে বেশি সুবিধা দিতে হবে। সহজ শর্ত ও কম সুদে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি এসব খাতের কর সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি খাতে আরও বিনিযোগ বাড়াতে হবে ব্যাপক কর্মসংস্থানের জন্য। এখন থেকে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় থেকে বলে দিতে হবে, তারা যাতে এমন প্রকল্প প্রস্তাব রাখে যেখানে বেশি কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

চলতি অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদন -জিডিপি কত হতে পারে বলে আপনি মনে করেন ?

বিগত অর্থবছরের উপর ভিত্তি করে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রাক্কলণ করা হয় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এটি অর্জন সম্ভব নয়।

পূর্ণাঙ্গ তথ্য উপাত্ত নেই। ফলে এ বছর জিডিপি কত হবে তা হিসাব করা কঠিন।

গত অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত অর্থনীতি স্বাভাবিক ছিল। এর পর থেকে কয়েক মাস স্থবির হয়ে পড়ে অর্থনীতি। ফলে প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ হয়।

সেই অবস্থান থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এখনও আগের চেহারায় ফিরে যেতে পারেনি। আশা করা যাচ্ছে, গত অর্থবছরের মতো বা তার কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হতে পারে এবছর।

অর্থনীতি আগের চেহারায় ফিরে পেতে আর কত সময় অপেক্ষা করতে হবে ?

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এটি বড় সাফল্য আমাদের জন্য। মানুষ পুরো আয় করতে না পারলেও রোজগার বন্ধ হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজের সুযোগ সীমিত এখনও। যারা চাকরি হারিয়েছে কাজ পায়নি তারা।

যারা এখনও বেকার বা অর্ধ বেকার বা পূর্ণ আয় করতে পারছেন না, এদের স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে যেতে সময় লাগবে।

কিন্তু আশার দিক হলো, স্বল্প আয় ও খেটেখাওয়া মানুষ আয়- রোজগার করছে। এদের সংখ্যাই বেশি। অর্থনীতি পুরোপুরি সচল হতে ২০২১ সাল লাগবে।

এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে আন্তর্জাতিক বাজারে নানা সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক শুল্ক দিয়ে ওই দেশের বাজারে প্রবেশ করছে। এ সুবিধা না থাকায় পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি খুবে বেশি না হলেও খারাপ করছে না বাংলাদেশ।

গার্মেন্টস
এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী সিদ্ধান্ত এখন থেকেই ঠিক করার আহ্বান অর্থনীতিবিদদের। ছবি: নিউজবাংলা

শুল্কসুবিধা না থাকলে আমরা পারব না, এ ধারণা ঠিক না। দেশের উদ্যোক্তরা এখন যথেষ্ঠ সামর্থ্য অর্জন করেছেন। খরচ কীভাবে কমানো যায় সেই দিকে নজর দিচ্ছেন তারা। উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করছে, যাতে আরও বেশি মুনাফা করা যায়।

শুল্ক সুবিধা উঠে গেলে অবশ্যই বাংলাদেশের উপর চাপ বাড়বে। কিন্তু কিন্তু এটি না হলে যে সক্ষমতা হারিয়ে যাবে তা ভাবার কারণ নেই। অতীতে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ।

এ জন্য উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে।

এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার বড় একটা হাতিয়ার হতে পারে এফডিআই। এ সুযোগটি যেন কোনোভাবেই অবহেলা না করা হয়।

এলডিসি থেকে উত্তরণে দুই বছর সময় চেয়েছে বাংলাদেশ প্রস্ততি পর্বে এ সময় কি পর্যাপ্ত ?

স্বাভাবিক সময়ে ২০২৪ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বাংলাদেশ। করোনার কারণে অর্থনীতি দুর্বল হওয়ায় তা থেকে পিছিয়েছে। এ জন্য সরকার দুই বছর সময় চেয়েছে এবং বাড়তি সময় চাওয়াটা যুক্তিসঙ্গত।

আরও সময় নিলে ভালো হতো। তবে সরকার মনে করছে, কাজটি দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারবে এবং অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। সেই বিবেচনায় দুই বছর সময় যুক্তিসঙ্গত।

শেয়ার করুন

উহানের সেই ‘অপয়া’ মার্কেট করোনার উৎস নয়  

উহানের সেই ‘অপয়া’ মার্কেট করোনার উৎস নয়  

উহানের আলোচিত হুয়ানান সি-ফুড মার্কেট এখনও বন্ধ।

চীনা বিজ্ঞানীরা এই মার্কেটের প্রতিটি জায়গা থেকে নমুনা পরীক্ষা করেছেন। মার্কেটের আশপাশের প্রাণীর নমুনা নিয়েছেন। তারা বিড়াল, ইঁদুর, এমনকি একটি বেজির নমুনা নিয়েও কাজ করেছেন। সাপ পরীক্ষা করেছেন। মার্কেটে জীবন্ত সাপ, কচ্ছপ ও ব্যাঙ বিক্রি করা লোকজনকেও পরীক্ষা করা হয়েছে।

কোভিড-১৯-এর জন্য দায়ী করোনাভাইরাসের (সার্স-কোভ-২) উৎস অনুসন্ধানে সম্প্রতি চীনের উহানে গিয়ে কাজ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিশেষজ্ঞ দল। এই দলেরই একজন সদস্য ব্রিটিশ প্রাণিরোগ বিশেষজ্ঞ পিটার ডাসজাক।

পিটার ডাসজাক মনে করেন, উহানের গবেষণাগার থেকে করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনকি উহানের আলোচিত হুয়ানান সি-ফুড মার্কেটও ভাইরাস সংক্রমণের প্রাথমিক কেন্দ্র নয়। চীনের দক্ষিণাঞ্চলের অন্য কোনো প্রদেশ থেকে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব ঘটে ওই মার্কেটে। বিশ্বজুড়ে আলোচিত সেই মার্কেট এখনও স্থানীয়দের জন্য নিষিদ্ধ। চলছে নানা ধরনের অনুসন্ধান।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এক সাক্ষাৎকারে পিটার ডাসজাক বলেছেন, করোনাভাইরাসের প্রকৃত উৎস জানতে আরও অনুসন্ধান দরকার। তবে সেই অনুসন্ধান হতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে।

পিটার ডাসজাক ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তিনি ইকোহেলথ অ্যালায়েন্সের প্রধান হিসেবে নিউইয়র্ক সদরদপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সাক্ষাৎকারটি নিউজবাংলার পাঠকের জন্য বাংলায় ভাষান্তর করেছেন মোশফেকুর রহমান

চীন ও উহানে আপনি আগে অনেকবার গিয়েছিলেন। এবারের অভিজ্ঞতা কেন ব্যতিক্রমী?

পিটার: এবারের অভিজ্ঞতা ছিল উদ্ভট। এর আগে, চীনে গেলে আমরা প্রচলিত নিয়মে কয়েকটি কাজ করতাম। প্রথমটি হলো, সংশ্লিষ্ট চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ভোজে অংশ নিতাম। এবার হোটেলে কোয়ারেন্টিনে থাকার সময় জুমে টানা দুই সপ্তাহ চীনাদের সঙ্গে মিটিং করেছি। এরপর তাদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়েছে, তবে তখনও একসঙ্গে খাবার খেতে পারিনি। আলাদা কক্ষে আমাদের খেতে হয়েছে।

তাই এবারের ভ্রমণ ছিল অনেক বেশি কঠিন আর চাপের। উহানজুড়ে ছড়িয়ে আছে মহামারি-পরবর্তী মনো-অভিঘাত।

উহান পরিদর্শনে যাওয়া ডাব্লিউএইচও প্রতিনিধি দলের সদস্য পিটার ডাসজাক

শহরটিতে দীর্ঘদিন লকডাউন ছিল, আমার মনে হয় সেটি সব মিলিয়ে ৭৬ দিন। শহরের বাসিন্দারা বাসায় আটকে ছিলেন, মানুষ মারা গেছে এবং এ বিষয়ে অনেকে জানতেও পারেননি। এবং তখন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে মহামারি ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে, এটিকে চীনা ভাইরাস, উহান ভাইরাস বলে অভিহিত করা হয়েছে। ফলে সেখানে ক্ষোভ ও দুঃখের একটি আবহ রয়েছে।

এ অবস্থা কি আপনাদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে কঠিন করে তুলেছিল?

পিটার: না, আপনি কাজটি করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। আপনি জানেন, কাজের ধারা কেমন হতে চলেছে। আপনি এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও বুঝতে পারছেন। আমি জানি না, আমরাই প্রথম বিদেশি ছিলাম কি না, যারা হুয়ানান সি ফুড মার্কেট ঘুরে দেখেছি, যে জায়গাটি এমনকি চীনা নাগরিকের জন্য এখনও নিষিদ্ধ। সেখানে কেবল চীনা রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদেরই প্রবেশাধিকার আছে। আমরা এমন চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করেছি, যারা প্রথম দিকের কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন।

এই মানুষেরা একটি ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেছেন এবং এখন তারা চীনে নায়ক হিসেবে প্রশংসিত, যেখানে বাকি বিশ্ব এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে চীন এখনও ভাইরাসটির ফের সংক্রমণের বিষয়ে অবশ্যই শংকিত।

আপনি যখন বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন, তখন তারা পুরো পিপিই পরে উড়োজাহাজে ঢুকবে; আপনাকে কোয়ারেন্টিনে পাঠাতে আলাদা একটি পথ দিয়ে নামিয়ে আনা হবে; আপনাকে পরীক্ষা করা হবে। হোটেল পৌঁছানোর পর আপনাকে নিজের কক্ষে ঢুকিয়ে দিয়ে দুই সপ্তাহ দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আপনার দরজার কাছে আসা প্রতিটি মানুষ সম্পূর্ণ পিপিই ঢাকা থাকবে। হোটেল কক্ষ থেকে আবর্জনা সরানো হবে হলুদ ব্যাগে করে, যাতে বায়ো-হ্যাজার্ডের চিহ্ন থাকবে।

চীন থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর আমার অভিজ্ঞতা ছিল একদম আলাদা, এমনকি কোয়ারেন্টিনে থাকার বিষয়ে আমি কোনো নোটিশও পাইনি। আমি নিউইয়র্ক রাজ্য অ্যাপে সাইন ইন করেছি, কিন্তু কেউ আমার বাড়ির দরজায় এসে কড়া নেড়ে বলেনি, ‘বাসার ভিতরে থাকুন।’

এবারের ভ্রমণ থেকে আপনি কি নতুন কিছু শিখেছেন?

পিটার: অনুসন্ধানের প্রথম দিন থেকে আমরা যেসব উপাত্ত পেয়েছি তা চীনের বাইরে থেকে কখনও জানা যেত না। হুয়ানান সি-ফুড মার্কেটে বিক্রেতা কারা? তার কোথা থেকে পণ্যের জোগান পেতেন? প্রথম দিকে আক্রান্তরা কাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন? প্রথম সংক্রমণের তথ্য কতটা সঠিক? আক্রান্তদের অন্য গুচ্ছগুলোর বিষয়ে কী তথ্য রয়েছে?

এ ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে আমরা যখন আরও তথ্য জানতে চেয়েছি, চীনা বিজ্ঞানীরা চলে গেলেন। এর কয়েক দিনের মধ্যে তারা সমস্ত বিশ্লেষণ হাজির করেন এবং আমরা নতুন তথ্য পেয়ে যাই। এগুলো পাওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। সেই সময়ে আপনি সত্যিই বেশি কিছু বলতে পারেন না। আমরা চেষ্টা করেছি, অনুসন্ধানের ওই পর্যায়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করে পুরো প্রক্রিয়াটিকেই দুর্বল করে না ফেলতে।

ওই মার্কেটের বর্তমান অবস্থা এখন কেমন? কী দেখেছেন সেখানে?

পিটার: উহানের মার্কেটটি (সি ফুড মার্কেট) ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা ১ জানুয়ারিতে বন্ধ করে দেয়া হয় এবং চীনা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ বিভাগ (সিডিসি) সেখানে বিজ্ঞানীদের একটি দল পাঠায়। এটি ছিল অনেক বিস্তৃত অনুসন্ধান, সেখানকার প্রতিটি জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।

প্রথম দিকে অন্তত ৫০০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, যার মধ্যে অনেক নমুনাতেই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এসব নমুনার মধ্যে মৃত প্রাণী ও মাংসও রয়েছে। তবে সেখানে কী করা হচ্ছে সে ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য জনসমক্ষে আসেনি। আমরা উহানে যাওয়ার পর সেগুলো জানতে পেরেছি, এটি সত্যিই আমার জন্য চোখ খুলে দেয়ার মতো ঘটনা ছিল।

প্রকৃতপক্ষে তারা (চীনা বিজ্ঞানী) ৯০০টির বেশি নমুনা সংগ্রহ করে, যেটি ছিল এক বিশাল কাজ। তারা নর্দমা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। ভ্যান্টিলেটর থেকে বাদুর ধরে পরীক্ষা করেছে। মার্কেটের আশপাশের প্রাণীর নমুনা নিয়েছে। তারা বিড়াল, বেওয়ারিশ বিড়াল, ইঁদুর, এমনকি একটি বেজির নমুনা নিয়েও কাজ করেছে। সাপ পরীক্ষা করেছে। মার্কেটে জীবন্ত সাপ, কচ্ছপ ও ব্যাঙ বিক্রি করা লোকজনকেও পরীক্ষা করা হয়েছে।

নমুনার মধ্যে জীবিত ও মৃত খরগোশ ছিল। খরগোশের একটি খামার সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ব্যাজার (গর্তবাসী এক জাতীয় ছোট নিশাচর প্রাণী) নিয়ে কথা উঠেছিল এবং চীনারা যে ব্যাজারের কথা বলে সেটি আসলে ফেরেট ব্যাজার। এর লেজ খানিকটা লম্বা। মার্কেটে যেসব প্রাণী আনা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে করোনাভাইরাসের পোষক থাকতে পারে। এরা চীনের অন্য কোথাও বাদুড়ের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে এবং তারপর তাদের হয়ত এই মার্কেটে আনা হয়ে থাকতে পারে। সুতরাং এটা হলো করোনাভাইরাসের মানুষে সংক্রমণের উৎস সংক্রান্ত প্রথম ক্লু বা সূত্র।

উহানের আলোচিত হুয়ানান সি-ফুড মার্কেট পরিদর্শনে ডাব্লিউএইচও প্রতিনিধি দল

সেখানে ১০টি দোকানে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হতো। বিক্রেতারা ছিলেন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউনান, গুয়াংজি ও গুয়াংডং প্রদেশের বাসিন্দা। ইউনান প্রদেশে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের (কোভিড ১৯ এর জন্য দায়ী ভাইরাস) খুব কাছাকাছি নমুনা বাদুরের দেহে পাওয়া গেছে। গুয়াংজি ও গুয়াংডং প্রদেশ থেকে প্যাঙ্গোলিন ধরে এনে মার্কিটে বিক্রি হতো, এদের দেহেও প্রায় একই ধরনের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

মার্কেটে আনা এমন অনেক সন্দেহজনক প্রাণী রয়েছে। কিছু প্রাণী এমন সব জায়গা থেকে আনা হয়েছে, যেখানে ভাইরাসটির কাছাকাছি ধরনের ভাইরাসের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা জানি। সুতরাং সেখানে প্রকৃত ঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে।

এখন চীনা দলটি সন্দেহজনক সব প্রাণীর দেহ ধ্বংস করেছে। তবে এগুলো হলো ফ্রিজে থাকা প্রাণীদের ছোট্ট একটি অংশ। আমরা জানি না সেখানে বিক্রি করার জন্য আর কী ছিল। সুতরাং এই দুটি সূত্র সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যখন মার্কেটটি দেখতে গেলাম, বিষয়টি আমাকে খুব তাড়িত করছিল। শাটার লাগানো সারিবদ্ধ ভবনের বন্ধ মার্কেটটির এখনকার ছবি দেখে আপনি হয়ত মনে করেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ শহুরে বাজার। এটিকে সত্যিই জীবন্ত প্রাণী বেচাকেনার জায়গা বলে মনে হয় না। তবে সরেজমিনে দেখলে একদম আলাদা মনে হবে। এটি খুবই ভগ্নদশার একটি মার্কেট।

দেখেই মনে হয়, জায়গাটি জীবিত প্রাণী বিক্রির জন্য তৈরি। জীবিত জলজ প্রাণী বিক্রির নিদর্শন যত্রতত্র ছড়ানো, রয়েছে কচ্ছপ, মাছের ট্যাঙ্ক, সাপের খোয়াড়, যেগুলো এখানে হরদম বিক্রি হতো বলে আমরা জানি। আমাদের কাছে এখন যে তথ্য আছে, তা হলো এটি ভাইরাসের একটি স্পষ্ট সম্পর্ক সূত্র ও ছড়ানোর একটি সম্ভাব্য পথ।

মহামারির প্রাদুর্ভাবের আগে সি-ফুড মার্কেটে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের ঘটনাগুলো কেমন ছিল?

পিটার: হুয়ানান মার্কেটের বাইরেও অন্যদের মাঝে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছিল। এমন আরও কিছু রোগী আছেন যাদের সঙ্গে বাজারের কোনো সম্পর্ক নেই, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এ ধরনের কিছু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সেখানে আরও কয়েকটি বাজার রয়েছে। আমরা এখন জানি কিছু রোগীর সঙ্গে অন্য বাজারের সম্পর্ক ছিল। আমাদের আরও কাজ করা দরকার এবং এরপর চীনা সহকর্মীদেরও বেশকিছু কাজ করতে হবে।

কাজের শেষ দিকে চীনা দল এবং ডাব্লিউইএচওর প্রতিনিধিরা যখন একসঙ্গে বসলাম, তখন বলা হলো, ‘আসুন আমরা একটি অনুমানের মধ্যে দিয়ে যাই’। সেখানে যে বিষয়টি সমর্থন পেয়েছে তা হলো, ঘরোয়া পরিবেশে আবদ্ধ বন্যপ্রাণী থেকে সংক্রমণ।

পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?

পিটার: প্রাণীর সরবরাহ লাইনের ধারাটি খুবই স্পষ্ট। সরবরাহকারীদের পরিচয় জানা গেছে। তারা খামারের নাম জানে, এগুলোর মালিকদের সম্পর্কে জানে। খামারে গিয়ে তাদের মালিক ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তাদের পরীক্ষা করতে হবে। কমিউনিটির সদস্যদের পরীক্ষা করতে হবে। আপনাকে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে হবে, খামারের কাছাকাছি সংক্রমিত কোনো প্রাণী আছে কিনা এবং তাদের আন্তঃসীমান্ত চলাচল রয়েছে কিনা। ভাইরাসটি যদি চীনের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী রাজ্যে থেকে থাকে, তাহলে আক্রান্ত প্রাণীদের সম্ভবত ভিয়েতনাম, লাওস বা মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশেও চলাচল রয়েছে। আমরা এখন এই ভাইরাসের কাছাকাছি ধরনের আরও ভাইরাস খুঁজে পাচ্ছি। এর একটি আছে জাপানে, একটি কম্বোডিয়ায় এবং একটি রয়েছে থাইল্যান্ডে।

মানুষের ক্ষেত্রে প্রথম দিকের গুচ্ছ ও আক্রান্তের দিকে লক্ষ্য রাখুন; সম্ভব হলে সিরামের জন্য ব্লাড ব্যাংকের দিকে নজর দিন। চীনের মধ্যে এ জাতীয় বিষয়গুলোকে এগিয়ে নেয়া বেশ স্পর্শকাতর এবং এটি করতে গেলে তাদের কিছুটা কূটনীতি এবং শক্তির আশ্রয় নিতে হবে। কারণ, সত্যি বলতে আমি মনে করি, নিজের দেশের ভেতরে এই ভাইরাসের উত্স অনুসন্ধান করার বিষয়টি চীনা সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকারে নেই। যেখানেই এই ভাইরাসটির উৎস শনাক্ত হোক না কেন, সেটি শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক ইস্যু। এটি অন্যতম একটি সমস্যা।

এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাণীকে কি আপনি সন্দেহ করছেন?

পিটার: বিষয়টি এখনও ধোয়াশাপূর্ণ। আমরা জানতে পারিনি সেখানে গন্ধগোকুল বেচাকেনা হয়েছিল কিনা। আমরা জানি, এরা খুব সহজে সংক্রমিত হয়। আমরা জানি না, চীনে বেজি জাতীয় প্রাণী বা কুকুরের মতো অন্য রোমশ প্রাণীর খামারগুলোর কী অবস্থা। এগুলোও পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

তবে আপনি যদি বলেন, ভাইরাসটির কোন পথে বিস্তারের সম্ভাবনায় আমি জোর দিচ্ছি; সেক্ষেত্রে আমি মনে করি, ভাইরাসটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অথবা দক্ষিণ চীন থেকে বাদুড়ের মাধ্যমে একটি বন্যপ্রাণী খামারে সংক্রমিত হয়েছে। গন্ধগোকুল, ফেরেট ব্যাজার, কুকুর- এ ধরনের প্রাণী বাদুড় থেকে সংক্রমিত হতে সক্ষম।

হয় ওই খামারে কাজ করা লোকজন সংক্রামিত হওয়ার পর হুয়ানান মার্কেটে এসে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে, অথবা আক্রান্ত জীবন্ত বা মৃত প্রাণির মাধ্যমে সেটি বাজারে এসেছে। একবার এটি হুয়ানান বা উহানের অন্য কোনো মার্কেটে পৌঁছানোর পর জনঘনত্বের সুবিধা নিয়ে ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ঘটায়।

বিক্রেতা এবং তাদের সরবরাহ চেইন সম্পর্কে যেসব নতুন তথ্য পেয়েছেন সেগুলো কি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে প্রকাশ করবেন?

পিটার: আশা করি করব। তবে সন্দেহাতীতভাবে কিছু বিষয় গোপন রাখা হবে। চীনের অভ্যন্তরীণ নীতি অনুযায়ী, রোগীদের পরিচয় গোপন রাখা হয়। পশ্চিমে একটি ধারণা হলো, চীনে একনায়কতান্ত্রিক শাসক সব নাগরিকের ভিডিও ধারণ করে। সব ক্ষেত্রে তাদের প্রবেশাধিকার রয়েছে। তবে এরপরেও সেখানে রোগীদের তথ্য অত্যন্ত গোপনীয় এবং কিছু বিষয় কখনও প্রকাশ করা হয় না।

আমরা নির্দিষ্ট কিছু রোগীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। তবে তারা দেখা করতে চাননি বলে কর্তৃপক্ষও তাদের বাধ্য করেনি। আশা করছি, বিক্রেতা ও সরবরাহ চেইনের গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্যই থাকবে। যদি সেটি না থাকে, তারপরেও বলব, আমরা সেগুলো দেখেছি, সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। আমরা বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণে রাখব।

শেয়ার করুন

টিকাকেন্দ্রে গিয়েও নিবন্ধন করা যাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

টিকাকেন্দ্রে গিয়েও নিবন্ধন করা যাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

টিকা নিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। ছবি: নিউজবাংলা

গণটিকাদান কর্মসূচির শুরুর দিনই রোববার টিকা নিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। নিউজবাংলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে টিকা কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন মন্ত্রী।  

টিকা আসতে দেরি হয়নি। গণটিকাদানেও বিলম্বের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে টিকাদান শুরু করেছে সরকার। আর শুরুর দিনেই টিকা নিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন। এ কর্মসূচির সার্বিক দিক, নানা গুজব ও টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক

প্রশ্ন: গণটিকাদানের শুরুতেই কেন টিকা নিলেন?

জাহিদ মালেক: টিকা নিয়ে এক ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছিল। নানা মহল থেকে সমালোচনা আসছিল। অনেকেই বলেছে, এ টিকা নিরাপদ নয়, মান ভালো না। এ কারণে মন্ত্রী হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জনে প্রথমে টিকা নেয়া। টিকা নেয়ার পর আমি কোনো ধরনের অসুস্থতা বোধ করছি না। আমি মনে করি, সকলেরই টিকা নেয়া দরকার। এতে আপনিও সুরক্ষিত থাকবেন, আপনার পরিবার এবং দেশও সুরক্ষিত থাকবে।

প্রশ্ন: টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তো অনেকেই ভয়ে ছিলেন, টিকা নেয়ার পর আপনি কী বললেন।

জাহিদ মালেক: আপনি জানেন, আজ আমিসহ অনেক মন্ত্রী টিকা নিয়েছেন। আজ সারা বাংলাদেশে সমস্ত জেলা-উপজেলায় টিকা কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। আশা করি, আজ লক্ষাধিক লোক টিকা গ্রহণ করবেন। ইতোমধ্যে যারা টিকা নিয়েছেন, তাদের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। একেক জনের কথা শুনেছি। তাদের হাল্কা জ্বর এসেছিল, যা কারও কয়েক ঘণ্টায় বা কারও এক দিনেই সেরে যায়। আশা করি, আজ আমাদের টিকা নেয়ার মাধ্যমে সকলে টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ হবেন। মানুষের জন্যই তো টিকা।

আমরা আজ যারা টিকা নিয়েছি, সকলেই খুব ভালো আছি, সুস্থ আছি। আমাদের মধ্যে কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কিছু মানুষ হয়তো নিজেদের স্বার্থে বিরূপ প্রচারণা চালান। কিন্তু আমাদের স্বার্থ হলো দেশবাসীকে রক্ষা করা। আমরা চাই, এ টিকার মাধ্যমে দেশবাসীকে করোনা থেকে রক্ষা করতে। সে জন্য কোনো ধরনের অপপ্রচারে কান না দিয়ে আমাদের আহ্বান: টিকা গ্রহণ করবেন এবং ভালো থাকবেন।

প্রশ্ন: সবাই কি টিকা পাবেন, নাকি টিকা নিয়ে সংকট দেখা দেবে?

জাহিদ মালেক: আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকা রয়েছে। আপনারা জানেন, ইতোমধ্যে আমাদের হাতে ৭০ লাখ টিকা রয়েছে। সে টিকা আমরা ৩৫ লাখ লোককে দুই ডোজ করে দিতে পারব। যদি এক ডোজ করে দেই, ৭০ লাখ লোককে দিতে পারব। ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা দ্বিতীয় লটের টিকা পাব। তারপর আবার মার্চ-এপ্রিলে পাব। কাজেই কখনই আমাদের টিকার কমতি বা সংকট হবে না। শহরের ও গ্রামের যারা ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার, ডাক্তার, নার্স, মিডিয়াকর্মী, পুলিশ বাহিনীসহ অন্যান্য যারা সব সময় বাইরে কাজ করেন, তারা সবার আগে টিকা নেবেন। ৫৫ বয়সের ওপরে যারা আছেন তাদের আহ্বান করব, যে জায়গাতেই থাকুন না কেন আপনারা এসে টিকা নেবেন।

প্রশ্ন: টিকা পেতে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। এ নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর সমাধান কী?

জাহিদ মালেক: টিকা পেতে সবাইকে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। যদি কারও কোনো সমস্যা হয়, তাহলে আমাদের উপজেলা-ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রে এসে নিবন্ধন করবেন এবং সেখান থেকে এসেই টিকা নেবেন। যদি তথ্যকেন্দ্রেও নিবন্ধন করতে না পারেন, তাহলে টিকাকেন্দ্রে আপনাদের জন্য নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকবে, সেখানে এসে নিবন্ধন করে টিকা নিয়ে যাবেন।

প্রশ্ন: নিবন্ধন শুরুর ১০ দিন পার হলেও এখনও সুরক্ষা অ্যাপ আসেনি গুগল প্লে স্টোরে, এই ব্যর্থতার দায় কার?

জাহিদ মালেক: অ্যাপ আইসিটি মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে এবং গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপটি আপলোড করেছে। এটা একটা প্রসেসিংয়ের বিষয়, তাই একটু সময় লাগছে। এখন আপাতত সুরক্ষা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন চলছে। ওয়েবসাইটটি আইসিটি ডিভিশনের তত্ত্বাবধানেই চলছে। তারাই এটার দেখাশোনা করছে। নতুন একটা ওয়েবসাইট তৈরি হলে কিছু সমস্যা হতেই পারে। এক্ষেত্রে যখনই যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, আইসিটি ডিভিশনকে আমরা জানাচ্ছি এবং তারা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে দিচ্ছে। আমরা সব সময় এ বিষয়ে সজাগ আছি। তাদের সঙ্গে সব সময়ই আমাদের যোগাযোগ আছে। আমরা বলেছি, কোনো কারণে অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যদি নিবন্ধন করতে দেরি হয়, তাহলে আপনারা টিকাকেন্দ্রে এসে হাতে নিবন্ধন করে নেবেন। পরে আমরা ওই কাগজগুলো আমাদের মূল সার্ভারে এন্ট্রি করে দেব। কাজেই অ্যাপ বা ওয়েবসাইট কোনো সমস্যা নয়, আমরা বিকল্প ব্যবস্থা করে রেখেছি।

প্রশ্ন: তাহলে সমাধান কী?

জাহিদ মালেক: অ্যাপের বিষয়টা সময়মতো হওয়া দরকার। আগে-পরে কোনো বিষয় নয়। সেটা সময়মতোই হয়েছে, কাজ চলছে। আশা করি এটা নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হবে না।

শেয়ার করুন

প্রবৃদ্ধি নয়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বেশি জরুরি: ড. সেলিম

প্রবৃদ্ধি নয়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বেশি জরুরি: ড. সেলিম

কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান। প্রবৃদ্ধির বির্তকে না গিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় বেশি নজর এবং মধ্য মেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করছেন, শুধু রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব, দারিদ্র্য পরিস্থিতি, আয়-বৈষম্যসহ অর্থনীতির নানা বিষয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ইকনোমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু কাওসার

বর্তমান অর্থনীতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

করোনাভাইরাস দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এই অভিঘাত অপ্রত্যাশিত। অর্থনীতিতে এমন সংকট আগে কখনও দেখা যায়নি। অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টার কারণে কঠিন সময় পার হয়েছে, তবু সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

লকডাউন দেয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে অবস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও এখনও স্বাভাবিক হয়নি। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পখাতের দিকে যথাযথ নজর দেয়া গেলে সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ সম্ভব যাবে।

করোনার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে একে কীভাবে দেখছেন?

সংকটকালীন অর্থনীতির জন্য অবশ্যই এটা ভালো খবর। তবে রপ্তানির জন্য রিজার্ভ বাড়েনি, বরং করোনায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে রপ্তানি খাতে। বৈধ চ্যানেল এবং সরকারের দুই শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়ায় রেমিট্যান্স বেশি এসেছে। রিজার্ভ বৃদ্ধির এটি অন্যতম কারণ।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আমদানি কমে গেছে। এর সঙ্গে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সম্পর্ক রয়েছে। আমদানি কমায় ডলারের চাহিদাও কমেছে। ফলে রিজার্ভ বাড়ার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটি দিকই রয়েছে।

চলতি অর্থবছরের অর্ধেকের বেশি পার হয়েছে, আগামীতে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজন বিবেচনায় তিনটি বড় খাত হলো দারিদ্র্য, অসাম্য ও শ্রমবাজার। করোনা এই তিনটি খাতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। করোনা প্রাদুর্ভাবে অনেকেই নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। পাশাপাশি অসাম্য বেড়েছে।

অসংখ্য গরিব পরিবারের ছেলেমেয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সঠিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এখন প্রধান কাজ ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা।

করোনা সংকটে তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন খাতে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। ছবি: নিউজবাংলা

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ কি পর্যাপ্ত?

এটা অবশ্যই সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ। প্রণোদনার সুফল মিলেছে, ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে।

তবে প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু খাতে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে সুবিধা বেশি পেলেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতে হতাশাজনক চিত্র দেখা যায়। এই প্যাকেজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি আরও বাড়বে।

আগামী অর্থবছরের (২০২১‌-২০২২) বাজেটে কোন খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনে দুটি বড় খাত হচ্ছে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। গত দুই দশক ধরে এ দুটি খাতের শক্তিশালী অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে করোনার প্রভাব বেড়েছে। ফলে বৈশ্বিক পরিসরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় রপ্তানি খাতের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে অর্থনীতি পনুরুদ্ধার সম্ভব নয়। আগামী অর্থবছরের বাজেটে রপ্তানি খাতের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পে আরও বেশি সুরক্ষা দিতে হবে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সে অনুযায়ী নীতি ও সহায়তা প্রদান করতে হবে।

রাজস্ব আহরণের অবস্থা ভালো নয়, করোনাকালে আরও খারাপ হয়েছে। রাজস্ব আদায় কম হলে সরকারের বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে। ফলে রাজস্ব খাতে কার্যকর সংস্কারের পদক্ষেপ থাকতে হবে আগামী বাজেটে।

কোন ধরনের সংস্কার করলে অর্থনীতির গতি আরও বাড়বে?

কর ও ভ্যাটে বাস্তবমুখী ও কার্যকর সংস্কার করতে হবে। আর্থিক খাতে নজর দিতে হবে। সংকটের সময়ে সংস্কারের বড় ধরনের সুযোগ থাকে। চাইলে সুযোগ কাজে লাগাতে পারে সরকার। সংস্কারের বিষয়ে সরকারের নির্দিষ্ট কমিটমেন্ট থাকাতে হবে বাজেট।

ব্যাংক খাতে কমিশন গঠন নিয়ে কথা উঠেছিল। উদ্যাগ নেয়া হলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হলে কমিশন গঠন জরুরি।

করোনায় দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বেসরকারি জরিপে উঠে এসেছে। ছবি: নিউজবাংলা

সানেমের সাম্প্রতিক জরিপে দেশে দারিদ্র্যহার দ্বিগুণ বাড়ার তথ্য গ্রহণ করেনি সরকার বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

করোনাকালে দেশে দারিদ্র্য বাড়লেও এ বিষয়ে কোনো জরিপ হয়নি। কতটা দারিদ্র্য বেড়েছে, এর সমাধানে কোন ধরনের নীতি সহায়তা নেয়া প্রয়োজন, সে বিষয়গুলো বিবেচনা করে দেশব্যাপী জরিপ করেছে সানেম। তথ্য উপাত্তের বিষয়ে যে কেউ ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু এটাকে প্রত্যাখ্যান করা ঠিক নয়। প্রকৃত চিত্রের জন্য বরং আরও ব্যাপকভিত্তিক জরিপের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) চাইলে এটা করতে পারে। এখনও সময় আছে।

কোন পদ্ধতিতে এই জরিপ করা হয়েছে?

দেশব্যাপী প্রায় ছয় হাজার পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের মতামত নেয়া হয়। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা ছিল। ঝুঁকি এড়াতে টেলিফোনে মতামত নেয়া হয়। ছয় হাজার খানা জরিপ কিন্তু কম সংখ্যা নয়। আমাদের উদ্যোগগুলো অবাস্তব নয়। বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, এতে কোনো ধরনের ভুল নেই।

গরিব ধনীর মধ্যে আয় বৈষম্য বেড়েছে বলে জরিপের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে এর কারণ কী?

নতুন করে যারা গরিব হয়েছেন তারা নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। করোনা সেই সব কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। শহরের বিভিন্ন হোটেল–রেস্তরাঁসহ ছোট ছোট কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবিকা নির্বাহে অনেকেই নানান কাজ করছিলেন, করোনার কারণে হঠাৎ করে কাজ চলে যায়। এতে বন্ধ হয়ে যায় আয়-রোজগার।

ক্ষেত্রবিশেষে ধনীদেরও ক্ষতি হয়েছে, তবে গরিবের তুলনায় কম। অর্থাৎ ধনীদের আয় অতটা কমেনি, যতটা কমেছে গরিবের। সামগ্রিকভাবে করোনাকালে আয়–বৈষম্য বেড়েছে।

প্রবৃদ্ধি বাড়লেও জনগণ কী সুফল পাচ্ছে?

উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেই এর সুফল পাওয়া যাবে তা ঠিক না। প্রবৃদ্ধি হতে হবে ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক)। গত কয়েক বছর ধরে শ্রম বাজারের ওপরে যে তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিএস তাতে দেখা গেছে, জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও কমেছে কর্মসংস্থান।

কর্মসংস্থান না হলে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না। মুষ্ঠিমেয় বেশি সুবিধা পাবে। তাই, প্রবৃদ্ধির সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে কর্মসংস্থানের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। যেসব খাতে কাজের সম্ভাবনা সেসব খাতে বেশি করে নীতি-সহায়তা দিতে হবে। ফলে মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ আরও বাড়বে।

বর্তমান সরকার ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এটা ভালো উদ্যোগ। এতগুলো হয়তে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, তবে আগামী কয়েক বছরে মধ্যে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। পাশাপাশি ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, এসব খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে কর্মসংস্থান না বাড়লে প্রবৃদ্ধির সুফল পাবে না সাধারণ মানুষ

বৈষম্য বাড়ার কারণ কী?

উচ্চ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বৈষম্যের সম্পর্ক আছে। যেসব দেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে সেসব দেশেও বৈষম্য বাড়ছে। এর একটা কারণ হতে পারে নীতি প্রণয়নে অসঙ্গতি।

বাংলাদেশে কর নীতিতে সমস্যা আছে। ধনীদের ওপর কর আরোপের বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগ দেয়া দরকার। পাশাপাশি গরিবের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি ও তাদের কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। শহরের লোক যেভাবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধা পাচ্ছে, গ্রামে সে ভাবে পাচ্ছে না। এসব বিষয়ে নজর না দিলে বৈষম্য কমবে না।

চলতি অর্থবছরে জিডিপি কত হতে পারে?

এটা বলা কঠিন। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক আছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান দিয়েছে। মতভেদ আছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।

প্রবৃদ্ধির হার কত হলো সে বিষয়ে বিতর্ক না করে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায়। এ জন্য সঠিক নীতি ও কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা ও এসএমই খাত পুনরুদ্ধারের বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সে ক্ষেত্র প্রবৃদ্ধি কম হলেও তা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। প্রবৃদ্ধির হারের দিকে না তাকিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি ত্বরান্বিত করাই হচ্ছে বেশি জরুরি।

অর্থনীতি আগের চেহারায় ফিরতে কত সময় অপেক্ষা করতে হবে?

সংকট এখনও আছে। কারণ, করোনা বিদায় নেয়নি, নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর নতুন ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে। ফলে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। পৃথিবীর সব মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে আরও সময় লাগবে।

সহসাই এখান থেকে মুক্তি মিলবে না। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন মধ্য মেয়াদি পরিকল্পনা। বাজেট এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বাইরে কমপক্ষে দুই বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে, যেখানে থাকবে সংকট মোকাবিলার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। অর্থনীতির আগের চেহারায় ফিরে আসতে আরও দুই বছর লাগবে।

শেয়ার করুন

সুশাসন ফিরেছে পুঁজিবাজারে: শরীফ আনোয়ার

সুশাসন ফিরেছে পুঁজিবাজারে: শরীফ আনোয়ার

‘পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হলে একটি কোম্পানির কমপক্ষে পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যদি কোম্পানিগুলো সম্পর্কে জেনেশুনে বিনিয়োগ করে তাহলে লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

কমিশনের কিছু সিদ্ধান্তের ফলে পুঁজিবাজারে সুশাসন ফিরেছে বলে মনে করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি শরীফ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলছেন, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হলে বিনিয়োগকারীদের শিক্ষিত হতে হবে।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রোকার হাউজ ফের চালু করায় শেয়ারবাজার আরও বিকশিত হবে বলেও মনে করছেন তিনি।

বর্তমান বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেন ডিবিএ সভাপতি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন সুমন।

বর্তমান পুঁজিবাজার কতটা বিনিয়োগ উপযোগী বলে আপনি মনে করেন?

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দায়িত্ব নেয়ার পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান সরকারও পুঁজিবাজারের প্রতি আন্তরিক। ফলে সুশাসন ফিরে এসেছে পুঁজিবাজারে।

দীর্ঘ সময় ধরে আস্থার ঘাটতি ছিল। এটি দূর করে বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করেছে বর্তমান কমিশন। বিনিয়াগকারীরা যখন দেখল, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালকেরা শেয়ার ধারণ না করলে স্বপদে থাকতে পারবেন না এবং প্রতিষ্ঠানের বোর্ড ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিএসইসি, মূলত তখন থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে।

নতুন কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ডিএসইর মতামত গ্রহণ না করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে ডিএসইর মতামত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আগে ডিএসইর বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সঙ্গে কমিশনের অনেক বিষয়ে দ্বিমত ছিল। ডিএসই কোনো কোম্পানির বিভিন্ন অসঙ্গতি উল্লেখ করে তালিকাভুক্ত না করার পরামর্শ দিলেও তা আমলে নিত না বিএসইসি।

এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলো নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। সবগুলো কোম্পানি পুঁজিবাজারে ভালো করছে। ফলে বিএসইসি যে কোম্পানিগুলোকে বাছাই করছে সেগুলো অবশ্যই মৌলভিত্তিক বা ফান্ডামেন্টাল কোম্পানি। এ বিষয়ে ডিএসইর সঙ্গে মতের পার্থক্য নেই।

আমরা চাই ডিএসইর মতামতের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা হোক। নতুন কমিশন আসার পর আমাদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে না। বাজার চাঙা করতে এটি ইতিবাচক দিক।

দেশের যেকোনো স্থানে ব্রোকার হাউজের শাখা ফের চালুর সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের জন্য কতটা উপযোগী?

এটি ব্রোকার হাউজগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। ২০১০ সালে পুঁজিবাজার ধসের পর প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রোকার হাউজগুলোর শাখা খোলার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। তখন অনেক বড় বড় ব্রোকার হাউজ দেশের বিভিন্ন স্থানে শাখা খুলে বসে ছিল। লাইসেন্স না পাওয়ায় সেসব ব্রোকার হাউজ কার্যক্রম চালাতে পারেনি। কিন্তু ব্যয়ভার বহন করতে হয়েছে। এখন আর সেই বাধা নেই।

শাখা সম্প্রসারণের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী আসবে। তবে ব্রোকার হাউজগুলোকে বাছাই করতে হবে কোন ধরনের বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে আসবে। অনেক অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী আছেন যারা হাতের কাছে ব্রোকার হাউজ না পাওয়ায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন না। বিএসইসির এ সিদ্ধান্তের ফলে আশা করা যাচ্ছে, পুঁজিবাজার আরও সম্প্রসারণ হবে।

ব্রোকার হাউজগুলো কীভাবে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে পারে?

বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে প্রতি বছরই বিনিয়োগ সপ্তাহ পালন করা হয়। এতে বিএসইসি, ডিএসইসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।

গুজব থেকে পুঁজিবাজারকে রক্ষা করতে হলে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে হবে। কারো কথায় কান না দিয়ে বরং নিজে কোম্পানি যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করতে হবে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হলে একটি কোম্পানির কমপক্ষে পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যদি কোম্পানিগুলো সম্পর্কে জেনেশুনে বিনিয়োগ করে তাহলে লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা কম।

পুঁজিবাজারের উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও নির্দেশ আছে যেন বিনিয়োগকারীদের সচেতন করা হয়। আমরা সবাই জানি, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বিনা মূল্যে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। করোনার সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারের জন্য দরকার সচেতন ও শিক্ষিত বিনিয়োগকারী।

করোনার সময়ে ব্রোকার হাউজগুলো কেমন চলছে?

করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর আগে পুঁজিবাজারে নিয়মিত ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন হতো। ফলে ব্রোকার হাউজগুলোর আয়ও কম ছিল। করোনার কারণে সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তারপরও সে সময় অফিস ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়েছে। দেড় মাসের মতো বন্ধ ছিল পুঁজিবাজার। এতে আয় যেমন কম হয়েছে, তেমনি পুঁজিবাজার থেকে কমেছে সরকারের রাজস্ব। করোনা-পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারের সার্বিক অবস্থা ভালো থাকায় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমান অবস্থায় পুঁজিবাজারের জন্য আলাদা প্রণোদনার প্রয়োজন আছে কী?

আছে। প্রণোদনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। বলা হলো, আমরা গুরুত্বপূর্ণ খাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নই। অথচ দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির বড় একটি খাত হচ্ছে পুঁজিবাজার।

করোনার সময় সবকিছু বন্ধ থাকায় ব্রোকার হাউজগুলোর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রতিটি ব্রোকার হাউজের আয়-ব্যয়ের হিসাব আছে।

অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ব্রোকার হাউজগুলোর নিয়মিত খরচ প্রণোদনা বাবদ দেয়া হোক। ছয় মাসের জন্য প্রণোদনা দেয়া হলে দুই বছরের মধ্যে সরকারকে ফেরত দেয়ার শর্তে এ সুবিধা চাওয়া হয়। আশা করছি সরকার তা বিবেচনা করবে।

মার্জিন ঋণ পুঁজিবাজার উন্নয়নে কতটা প্রয়োজন?

মার্জিন ঋণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমি ব্যক্তিগতভাবে মার্জিন ঋণকে নিরুৎসাহিত করি। এই ঋণের সুদ হার বাড়ানো উচিত। আপনার কাছে টাকা আছে, সেই টাকা বিনিয়োগ করে শেয়ার কিনবেন। কিন্তু মার্জিন ঋণে জড়িয়ে পড়লে আপনার ক্রয়ক্ষমতার চেয়ে বেশি শেয়ার কিনতে পারবেন। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

যদি শেয়ারের দাম কমে যায় তাহলে আপনি হাউজে আসা বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু যে হাউজ থেকে ঋণ নিয়েছেন তার টিকে থাকার জন্য ফোর্স সেল বা বিনিয়োগকারীকে না জানিয়ে শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করতে হয়। এতে প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। কোন কোন কোম্পানিতে মার্জিন ঋণ দেয়া উচিত তা ব্রোকার হাউজগুলোকে বাছাই করে দিতে হবে। ব্রোকার হাউজ থেকে ঋণ দিয়ে খারাপ কোম্পানির শেয়ার কেনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

ফোর্স সেল নিয়ে ব্রোকার হাউজগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এটি বন্ধ করার উপায় কী?

ফোর্স সেল বন্ধ করতে হলে মার্জিন ঋণ পরিহার করতে হবে। ব্রোকার হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। পুঁজিবাজার যখন মন্দা থাকে তখনই ফোর্স সেল বেশি হয়।

এখন পুঁজিবাজারের সার্বিক অবস্থা ভালো। ফলে ফোর্স সেল খুবই কম। মার্জিন ঋণে যেসব হিসাব পরিচালনা হয়, সেগুলোতে ফোর্স সেল বেশি হয়।

বিও হিসাব খোলার সময় আবেদনকারীদের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রির অনুমতি নেয়া হয়। মার্জিন ঋণে শেয়ার কেনার পর শেয়ারের দাম কমে গেলে ঋণের সুদ প্রদান করতেই হয়।

এখন যদি বিনিয়োগকারী সেই সুদ প্রদান না করে তাহলে শেয়ার বিক্রি করতেই হবে। শেয়ারের দর কমে গেছে। তাই বলে ব্রোকার হাউজে আসা বন্ধ করা চলবে না। বিনিয়োগকারীর সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ করে শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করবে ব্রোকার হাউজগুলো।

আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের কতটুকু উন্নতি হয়েছে বলে মনে করেন?

চেষ্টা করেছি ডিবিএকে আরও আধুনিকায়ন করতে। কতটুকু পেরেছি তা সদস্যরা বলতে পারবেন। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার তৈরি করতে হলে বিনিয়োগাকারীদের এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। সেটিকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা অনেকগুলো ওয়েবিনার করেছি। বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে করোনার সময় অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আমি মনে করি, বিনিয়োগকারীরা সচেতন হলে পুঁজিবাজারের আরও সম্প্রসারণ হবে।

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg