একটা সময় ছিল যখন বছর শেষ হতে না হতেই আমরা খোঁজ করতাম নতুন বছরের ক্যালেন্ডার। সে ক্যালেন্ডারে আঁকা থাকত নানা ধরনের দৃশ্যপট। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা রঙে সে ক্যালেন্ডার বাজারে ছাড়ত। শুধু ক্যালেন্ডার নয়, বই, খাতা থেকে শুরু করে নানান ধরনের কাজের একমাত্র ভরসা ছিল অ্যানালগ প্রিন্টিং।
সময়ের পরিক্রমায় প্রিন্টিংয়ের ধারণা পাল্টেছে। আগে একটা প্রিন্ট করাতে যেখানে ছুটতে হতো কমপক্ষে জেলা শহরে, সেখানে এখন চাইলে ঘরে বসেই যেকোনো কিছু প্রিন্ট করা যাচ্ছে। এমন সব সুবিধা নিয়ে প্রিন্টিং ডিজিটালাইজড করার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন এসএম আল মাহমুদ অনিক।
দেশে কয়েক দশকের প্রিন্টিংয়ের ইতিহাস হলেও তার ধারণা কিছুটা ব্যতিক্রম। দেশের প্রেক্ষপটে প্রিন্টিংয়ের ডিজিটালাইজেশন খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু বাধা থাকলেও তরুণ উদ্যোক্তা অনিক সেটা করছেন।
পড়ালেখা শেষ করে চাকরির খোঁজ না করে তিনি গড়ে তুলেছেন অনলাইন প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান ‘প্রিন্টএগ্রাফি’।
শুধু প্রিন্টিং নয়, পাশাপাশি প্যাকেজিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিওগ্রাফি ও ওয়েব ডিজাইনসহ অনলাইনভিত্তিক বেশ কিছু সেবা দিচ্ছে তার প্রতিষ্ঠান।
অনিক জানান, ২০১৮ সালে তিনিসহ কয়েকজন তরুণ শুরু করেন প্রিন্টিং নিয়ে কাজ। সেটা পুরোটাই অনলাইনভিত্তিক। ধীরে ধীরে পরিসর বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘শুরুতে আমাদের নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমাদের দেশে এখনও প্রিন্টিংয়ের বিষয়টি কম্পিউটারাইজড বা ডিজিটাল হয়ে ওঠেনি। ফলে প্রথম দিকে গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছে।’
সেসব সমস্যা নিজেদের মতো করে কাটিয়ে উঠছেন তারা। এখন প্রিন্টএগ্রাফিতে ২৩ তরুণ কাজ করছেন বলে জানান অনিক।
পথচলার তিন বছরের মধ্যেই অনিকের প্রিন্টএগ্রাফি দেশের টপ ব্র্যান্ডসহ সরকারি বেশ কিছু কাজ করে সফলতা পেয়েছে বলে জানান তিনি।
অনিক বলেন, ‘খুব ছোট পরিসরে কাজ শুরু করেছিলাম। এত অল্প সময়ে এত বেশি সাড়া পাব ভাবিনি। এখন আমরা শুধু দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই কাজ করছি না, আমাদের কাজ এখন যাচ্ছে বিদেশেও।’
এরই মধ্যে লন্ডনে বেশকিছু প্রিন্টিং পণ্য রপ্তানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনিক জানান, তারা ক্যালেন্ডার, নোট-প্যাড, খাম, প্যাকেজিং, ভিজিটিং কার্ডসহ প্রিন্টিয়ের যেকোনো পণ্য খুচরা ও পাইকারিভাবে ছাপানোর কাজ করেন। সেটা অর্ডার থেকে শুরু করে কাজ, সবই হয় অনলাইনে।
‘চাইলে ক্রেতারা নিজেরা ডিজাইন দিতে পারেন। যদি চান, আমরাও তাদের মতো করে ডিজাইন করে দিই। এ জন্য আমাদের রয়েছে গ্রাফিক্স ডিজাইনার।’
প্রিন্টএগ্রাফির কাজ লন্ডনেও যাচ্ছে বলে জানান অনিক। বলেন, ‘প্রিন্টিং কোনো কিছু যে রপ্তানি করা যায় সেটা আমরা জানতাম না। কিন্তু যখন প্রথম আমরা একটি অর্ডার পাই লন্ডন থেকে, সেই কাজটা করে তাদের পাঠাই। বিমানে করে দেশটিতে আমাদের প্রিন্টিংয়ের কাজ গেছে। তারপরও তাদের অনেক অর্থ সাশ্রয় হয়েছে।’
ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে যেন আরও কাজের অর্ডার আসে সে জন্য লন্ডনে একটি অফিস খুলেছে প্রিন্টএগ্রাফি।
উদ্যোক্তা হলেও সমাজসেবামূলক কাজও করেন অনিক। ‘চিলড্রেন'স হ্যাভেন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন তিনি। যেখানে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনে সহযোগিতা করা হয়।
ছবি: সংগৃহীত
জনগণের হক আদায় না করে যদি কেউ দুর্নীতি বা তছরুপ করেন তবে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এমপি।
শুক্রবার (১৯ জুন) মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কার্যক্রম বাস্তবায়নবিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যবর্তী স্থানে যে সকল সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী রয়েছেন তারা যদি জনগণের হক আদায় না করেন কিংবা কেউ যদি দুর্নীতি করেন বা জনগণের অধিকার তছরুপ করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সম্প্রতি বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড প্রদানসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অচিরেই আপনারা এর সুফল দেখতে পাবেন।’
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতন, পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম এবং গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাফছা নাদিয়া।
ছবি: সংগৃহীত
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ১৭ শয্যার হাম ওয়ার্ডে ৮৭ শিশু ভর্তি রয়েছে। এতে নানা সংকটে রোগীদের দুর্ভোগ চরমে ওঠেছে। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, সংকটের মধ্যেও সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে ঘুরে দেখা যায়, হাম ওয়ার্ডের ভেতরে-বাহিরে বিছানা ও মেঝেতে অসংখ্য রোগী ও তাদের স্বজনরা। বাথরুমের দুর্গন্ধ ও অতিরিক্ত লোকজনের চাপে চিকিৎসা নিতে আসা স্বজনরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫ শিশুসহ হামের আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৮৭ শিশু ভর্তি রয়েছে। এ সময়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৫ জন। এখানে এ পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জানা গেছে, জনবল সংকটের কারণে এ হাসপাতালের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বিঘ্ন ঘটছে। এখানে পরিচ্ছনতা কর্মীর ৩০ পদের বিপরীতে খালি রয়েছে আটটি। এছাড়া সিনিয়র কনসালটেন্ট ১০ পদের ছয়টিই খালি রয়েছে। পাশাপাশি সিনিয়র স্টাফ নার্স ২১, স্টাফ নার্স ছয় ও মিডওয়াইফ নার্স তিনটি পদও খালি রয়েছে।
রোগীর স্বজনরা জানান, রোগী ভর্তি আছে ৮৭ জন। তাদের সঙ্গে আরও দুই শতাধিক স্বজনসহ এ ওয়ার্ডে তিন শতাধিক লোকজন ভিড় করছেন। যেহেতু ব্যাপকহারে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তাই এ ওয়ার্ডের শয্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও বাড়ানো জরুরি।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. রাজিব আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, ১৭ রোগীর শয্যায় ৮৭ জন ভর্তি থাকলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এ ওয়ার্ডে গত আড়াই মাস ডা. রাশেদ ও ডা. ইউসুফসহ দুজন সিনিয়র স্টাফ নার্স দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে নতুন তত্ত্বাবধায়ক আরও দুজন সিনিয়র স্টাফ নার্স যুক্ত করেছেন। তবে রোগীর চাপ অনুযায়ী এখানে জনবল আরও বাড়ানো উচিত।
এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে আকষ্মিক পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
এসময় নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের দায়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন। পরে নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেনকে এ হাসপাতালের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন।
ছবি: সংগৃহীত
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এটার জন্য আমি মনে করি বিদেশের মুখাপেক্ষী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের জিওবি ফান্ড থেকে এটা করতে পারব। এটার মেয়াদ আছে দশ বছর। দুই স্তরে কাজ হবে। সুতরাং প্রতি বছর ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও আমরা করতে পারব। তবে প্রযুক্তির ব্যাপারে আমাদের দেশীয় যারা আছেন তাদের সঙ্গে হয়তো বহির্বিশ্বের আরও উচ্চতর যারা জ্ঞান রাখেন এই ব্যাপারে তাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন।
শুক্রবার (১৯ জুন) নীলফামারীর তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শন শেষে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এসময় পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘এখন সমস্যাটা দেখা দিয়েছে যে আমরা দিয়ে উজান থেকে পানি কতটুকু পাবো সেটা কিন্তু এখনো আমাদের কাছে যথেষ্ট সন্দেহের কারণ। পানি চুক্তি ছাড়া আমাদের কাঙিক্ষত পানি পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। বর্ষাকালে প্রচুর পানি হয়। শুকনা মৌসুমে যদি পানি আমরা না পাই তাহলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে এটা কোন কার্যকর কার্যকরী ভূমিকা রাখবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই জায়গাটি অ্যাড্রেস করছেন। উনি বলছেন যে, যাতে পানির রিজার্ভার তৈরি করা যায় ডিজাইনের মধ্যে সেটাকে গুরুত্ব দিতে বলছেন উনি। যাতে বর্ষাকালে আমরা পানি ধরে রাখতে পারি।’
এক মাসের মধ্যে টেকনিক্যাল কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর মহাপরিকল্পনার মূল কার্যক্রম শুরু হবে জানিয়ে আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘কিছু লোক দেখতেছি, তারা আবার আন্দোলনের কর্মসূচি দিচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন যে আমরা আন্দোলন করলাম, তাদের চেহারা তো আমি একদিনও পাইনি। এখন এরা দেখছে যে কাজ রেডি হয়ে যাচ্ছে। তাই ওরা আন্দোলন করে ক্রেডিট নিতে চায়। তারা কই ছিল এতদিন।
এর আগে মন্ত্রীরা তিস্তা প্রধান সেচ খাল, জলঢাকার ধাইজান নদী, চারালকাটা নদী ও দিনাজপুর সেচ খাল পরিদর্শন করেন। এসময় পানি সম্পদ সচিব ড. এ.কে.এম শাহাবুদ্দিন সহ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গঠিত ৯ দস্যের কমিটির অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর শ্যামপুরের পোস্তগোলায় মাইক্রোবাসের ধাক্কায় অজিত বাবু (৫৫) নামে এক পথচারী নিহত হয়েছেন। এদিকে, কলাবাগানে ভুতের গলি মসজিদের পাশে একটি ষষ্ঠতলা নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময়ে পড়েএক রাজমিস্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
পোস্তগোলায় শুক্রবার (১৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পোস্তগোলা যাত্রী ছাউনির সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি হাইয়েস মাইক্রোবাস তাকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, কলাবাগান থানার ভুতের গলি মসজিদের পাশে একটি ষষ্ঠতলা নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময়ে পড়ে গিয়ে মো. ইয়াসিন (৩৮) নামে এক রাজমিস্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মৃত ইয়াসিন লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার মো. হাবিবুর রহমানের ছেলে।
মৃত মো. ইয়াসিনের সহকর্মী সায়েদুল জানান, নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। সেখান থেকে, তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল পৌনে ১২টায় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সত্যতা নিশ্চিত করে ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, মরদেহটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানায় জানানো হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
দেশের রেস্তোরাঁ শিল্পকে সংকট থেকে উত্তরণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং সার্ভিসের ক্ষেত্রে একই শুল্ককর এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত উৎসে কর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার চায় বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।
শুক্রবার (১৯ জুন) পুরানা পল্টনের বিজয়নগরে সমিতির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব ও দাবি তুলে ধরা হয়। এ সময় এ দুই ক্ষেত্রে শুল্ককর কমানোসহ সাতটি প্রস্তাব দিয়েছে মালিক সমিতি।
সমিতির পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের মহাসচিব ইমরান হাসান। তিনি দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক খাতের সংকটের মধ্যেও ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করার জন্য বিএনপি সরকার এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানান। তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এলপিজি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে রেস্তোরাঁ খাতের পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে, যা এই খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে এ খাতকে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
এ সময় তিনি বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, আগের মতো প্রতি মাসে ভ্যাট আদায়, রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনায় ওয়ান স্টপ সার্ভিসের দ্রুত বাস্তবায়ন, রেস্তোরাঁ খাতে জন্য সুনিদ্দিষ্ট শিল্প নীতি ঘোষণা এবং সমিতির সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবসহ রেস্তোরাঁ সেক্টরে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা এবং রেস্তোরাঁ শিল্পকে আর্ন্তজাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার প্রস্তাব দেন।
ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং খাতের জন্য ভ্যাট ও করের হার সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। বর্তমানে রেস্তোরাঁ খাতে ভ্যাট ৫ শতাংশ এবং ক্যাটারিং সার্ভিসে ১৫ শতাংশ দিতে হয়। সব ক্ষেত্রে সেটা সমান করে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। বিভিন্ন শ্রেণির রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং সেবার ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট ও কর আরোপের ফলে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং কর প্রশাসনও জটিল হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি স্ট্রিট ফুডসহ সব প্রকার রেস্তোরাঁকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এতে চলমান অসম প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় অনেকটা বৃদ্ধি পাবে।
এ ব্যবসায়ী বলেন, এছাড়া বাজেটে জীবন যাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যর ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর এবং ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ হ্রাস করার প্রস্তাব করছি। বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপ, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কর আরোপ বা বহাল রাখা জনসাধারণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করবে।
ইমরান হাসান বলেন, সরকার ঢাকার বাইরে রেঁস্তোরা ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নতুন রেস্তোরাঁর স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ অবচয় সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করায় আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এতে নতুন উদ্যোক্তারা কর রেয়াত পাবেন। তবে আমরা চাই, রেস্তোরাঁ শিল্পের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ নিশ্চিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কর কাঠামোকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমানো, কর প্রশাসনে হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। আমরা আশা করি, চূড়ান্ত বাজেটে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিতের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে।
এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট পরিশোধের সময় বাড়িয়ে তিন মাস করা প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে পূর্বের ন্যায় মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট পরিশোধ ও রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা বহাল রাখার প্রস্তাব করছি আমরা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি সরকারের নীতি ও নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনার জন্য একাধিক দপ্তর থেকে ১০-১২টি অনুমোদন নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ফলে ব্যবসা পরিচালনা এবং কার্যকর তদারকি উভয়ই বাধাগ্রস্ত হয়। তাই রেস্তোরাঁ খাতকে একটি সমন্বিত কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার আওতায় এনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি একটি ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর প্রস্তাব করছি। এর মাধ্যমে লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ হবে, সময় ও ব্যয় কমবে এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কার্যকর মনিটরিং সম্ভব হবে।
এছাড়া প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আলোকে আমরা রেস্তোরাঁ সেক্টরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট শিল্পনীতি ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছি। একটি পৃথক শিল্পনীতি প্রণয়ন করা হলে লাইসেন্সিং, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং উদ্যোক্তা সহায়তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পৃথক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে উদ্যোক্তারা জটিলতা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। যে কোনো রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বাণিজ্য সংগঠন আইন অনুযায়ী রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সদস্য পদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক আছে, তবে এর বাস্তবায়ন চাই আমরা।
তিনি আরও বলেন, বাজেটে রন্ধনশিল্পকে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে আমরা প্রস্তাব করছি, গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে সরকারি-বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকিসহ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে পৃথক তহবিল গঠন করা হোক। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিক ও কর্মীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর দাবি জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সহসভাপতি শাহ সুলতান খোকন, যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমন, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌফিকুর ইসলামসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশের ওপর গিয়ে পড়ে। তবে যখন সেই প্রভাব মানবাধিকার, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় আস্থার প্রশ্নে রূপ নেয়, তখন বিষয়টি আর কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ঘিরে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কথিত ‘পুশইন’ এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসা, এমনই একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে।
প্রথম ঘটনাটি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় ঘটনাটি কূটনৈতিক সৌজন্য, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে। দুটি ঘটনাই আলাদা হলেও উভয়ের মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে, বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের নীতিগত অবস্থান এবং সেই অবস্থানের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের সম্ভাব্য প্রভাব।
সীমান্তে পুশইন: মানবাধিকার নাকি অভিবাসন রাজনীতি?
গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ সীমান্তে কথিত ‘পুশইন’ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি জানিয়েছে, জুন মাসের শুরু থেকে শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার অন্তত ২১টি প্রচেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে।
এই অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পায় যখন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। সংস্থাটি বলেছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর সদস্যদের, বিশেষ করে মুসলমানদের, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীর বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রশ্নে বিরোধ থাকতে পারে; কিন্তু সেই বিরোধের সমাধান কখনোই সীমান্তে নারী, শিশু ও পরিবারকে আটকে রেখে করা যায় না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কাউকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করার আগে তার পরিচয়, নাগরিকত্ব, আইনি অধিকার এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়।’
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে আসে। যদি এসব মানুষ সত্যিই বাংলাদেশি হন, তাহলে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। আর যদি তারা ভারতীয় নাগরিক হন, তাহলে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। দুই ক্ষেত্রেই ‘পুশইন’ কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।
বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলো অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলা করে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত, ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্য রুট কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রোহিঙ্গা সংকট, সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ‘ডিউ প্রসেস’ বা আইনি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাগরিকত্ব ও ভোটার পরিচয়ের প্রশ্ন একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং ‘অবৈধ অভিবাসী’ প্রসঙ্গ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষত বাংলাভাষী মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এই বিতর্ক অনেক সময় রাজনৈতিক মেরুকরণের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
২০১৯ সালে আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রক্রিয়ার সময় প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আলোচনার বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরোনো উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
অতএব প্রশ্ন ওঠছে, সীমান্তে পুশইনের অভিযোগ কি কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ, নাকি এটি বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের বহিঃপ্রকাশ?
দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনা: প্রশাসনিক যাচাই নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ভারত সরকারের আমন্ত্রণে আয়োজিত ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লি যান। সফরের বিষয়ে আগাম কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই তার সফর সম্পর্কে অবগত ছিল।
কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় আটকে রাখা হয়। পরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি অপমানিত বোধ করে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় সূত্রগুলোর বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা স্বীকার করেছে যে জাহেদ উর রহমানের অতীতের ভারতবিষয়ক বক্তব্য এবং ইউটিউব আলোচনাগুলো যাচাইয়ের অংশ ছিল। এখানেই মূল প্রশ্নটি নিহিত।
একজন আমন্ত্রিত বিদেশি সরকারি প্রতিনিধিকে তার অতীত রাজনৈতিক মতামতের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে আলাদা করে যাচাই করা হলে সেটি কি কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি তা রাজনৈতিক বার্তাও বহন করবে? বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত সমালোচনাকে নিরাপত্তা ঝুঁকির সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করে না। বিশেষত যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একটি স্বীকৃত সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি।
ভারত যদি শেষ পর্যন্ত তাকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েই থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, দুই ঘণ্টার বিলম্বের প্রয়োজন কী ছিল? এই ঘটনাকে হয়তো অনেকেই একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখবেন। কিন্তু কূটনীতিতে প্রতীকী ঘটনা অনেক সময় বাস্তব নীতির চেয়েও বড় প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আস্থার নতুন ভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনাটি উল্টো বার্তা দিয়েছে।
বাংলাদেশে অনেকেই এটিকে ভারতের পক্ষ থেকে একটি ‘সিগন্যাল’ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ভারতের একটি অংশ এটিকে নিরাপত্তাজনিত নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধারণাই অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি একটি দেশ মনে করে যে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাহলে সেই অনুভূতি সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও কিছু প্রশ্ন
এই আলোচনায় বাংলাদেশের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনায় প্রতিনিধিদলের বাকি সদস্যরা বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য এগিয়ে যান। বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হয়তো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু কূটনৈতিকভাবে এটি একটি প্রশ্নও তৈরি করেছে, সংকট মুহূর্তে একটি প্রতিনিধিদল কতটা ঐক্যবদ্ধ ছিল? আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের মর্যাদা মুখ্য। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশেরও আরও সুসংগঠিত কৌশল প্রয়োজন।
বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের পর দুই দেশই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। ভারতের জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল এবং সংযোগনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অংশীদার। এই বাস্তবতায় সীমান্তে মানবাধিকার বিতর্ক এবং কূটনৈতিক অস্বস্তি কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়।
সামনে করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন তিনটি বিষয়।
প্রথমত, সীমান্তে পুশইনসংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন ও যৌথ তদন্ত।
দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্ব ও প্রত্যাবাসন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনের পূর্ণ অনুসরণ।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৃষ্ট আস্থার ঘাটতি দূর করতে উচ্চপর্যায়ের নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ।
কারণ শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো একটি সরকার, কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা কোনো একটি নির্বাচনের চেয়েও বড়।
সীমান্তে আটকে থাকা একটি শিশু, দিল্লি বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ একজন সরকারি প্রতিনিধি কিংবা দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বিশ্বাস, এসবই মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি শক্তি নয়, আস্থা; চাপ নয়, সম্মান; এবং রাজনৈতিক সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক স্বার্থ।
দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সীমান্তের শূন্যরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আস্থার ভিত্তিকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়,
দুই দেশ সেই প্রশ্নের উত্তর সংঘাত দিয়ে দেয়, নাকি সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে।
লেখক: শিক্ষার্থী, চতুর্থ বর্ষ অন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ফাইল ছবি
রাজধানীর পূর্ব জুরাইন এলাকায় টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে পুর্বশত্রুতার জেরে আব্দুল কুদ্দুস (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাত সাড়ে ১২টার দিকে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ছোট ভাই আব্দুল হাশেম জানান, তাদের বাড়ি মাদারীপুর শিবচর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। বাবার নাম আব্দুল মালেক। থাকেন পূর্ব জুরাইন দারোগাবাড়ী রোডে ভাড়া বাসায়। পেশায় বাসচালক ছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাত আনুমানিক পৌনে ১২টার জুরাইন পপি স্কুলের সামনে একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন কুদ্দুস। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। এসময় ৮-১০ জন দুর্বৃত্ত চায়ের দোকানের ভেতর ঢুকে প্রথমে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এরপর তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ফেলে রেখে যায়। খবর পেয়ে স্বজন ও এলাকার লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তবে চিকিৎসক মৃত বলে জানান।
তিনি বলেন, আব্দুল কুদ্দুসের শরীরে ধারালো অস্ত্রের অন্তত ১২০টি জখম রয়েছে। তাকে নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। তবে কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা আমরা বলতে পারছি না।
কদমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সোহেল রানা জানান, টাকা পয়সার লেনদেনকে কেন্দ্র করে পুর্বশত্রুতার জেরে বৃহস্পতিবার রাতে চায়ের দোকানে ঢুকে কুদ্দুস নামে ওই ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের শরীরে অসংখ্য আঘাত রয়েছে। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন। ঘাতকদের চিহ্নিত করে আটকের চেষ্টা চলছে। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে।
মন্তব্য