দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর এবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও পেল স্পেন। গতকাল সোমবার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে লা রোজারা।
এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতে একই কীর্তি গড়েছিল স্পেন। এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করল তারা।
২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গত ৫ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত বিশ্ব ও ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় স্পেন ১৬টি শিরোপা জিতেছে। এর মধ্যে নারী ফুটবলে এসেছে ১১টি এবং পুরুষ ফুটবলে ৫টি ট্রফি।
কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে শুরু করা বিশ্বকাপে এই স্পেনকে দেখে বিস্ময় জেগেছিল। কিন্তু বদলে গেল তারা। একের পর এক জয়, আর গোলপোস্ট অক্ষত রেখে ফাইনালে ওঠে আসে লা রোজারা। সোমবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে শুরুটা হতাশার হলেও শেষটা একেবারে অবিশ্বাস্য। ফাইনালে বিশ্বকাপের হট ফেভারিট আর্জেন্টিনাকে কোনো রকম পাত্তা না দিয়েই চ্যাম্পিয়ন হলো স্পেন। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি জিতল তারা। ১০ জনের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ গোলে জিতে ইউরোপের পর বিশ্বজয় করল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
দারুণ সব প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফাইনালে একেবারে হতাশ করল আর্জেন্টিনা। মাত্র ৩৫ শতাংশ বল দখলে রেখে লক্ষ্যে কোনো শট রাখতে পারেনি তারা। ১২০ মিনিট খেলে পুরো ম্যাচে ছড়ি ঘুরিয়েছে স্পেন। নির্ধারিত সময়ে তাদের জয় না পাওয়া ছিল দুর্ভাগ্যজনক। ১০টি সেভে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিতে বড় অবদান রাখেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। কিন্তু পারেননি অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের গোল ঠেকাতে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে তো বটেই, অতিরিক্ত সময়েও লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের শুরু থেকে স্পেনের দাপুটে শুরু। ইয়ামাল ৫ মিনিটে প্রায় স্পেনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম বড় সুযোগটি পায় লা রোজা। ইয়ামাল বক্সে ক্রস বাড়ানোর চেষ্টা করেন এবং বলটি ডিফ্লেক্ট হয়ে ওলমোর কাছে চলে যায়। ওলমো দারুণভাবে বলটি আবার তার দিকেই বাড়িয়ে দেন। ইয়ামাল বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন। কিন্তু লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় বলটি জালে জড়াতে পারেনি!
ওয়ারজাবাল চমৎকার এক ফ্লিকে পোরোর উদ্দেশে বল বাড়িয়েছিলেন। তাকে ম্যাক অ্যালিস্টার ফাউল করে ফেলে দেন। কিন্তু রেফারি স্লাভকো ভিনসিক ফাউলের সেই আবেদন নাকচ করে দেন!
দুই দলের মধ্যে স্পেনই শুরুটা ভালো করেছে, তবে আর্জেন্টিনাও ভীতি ছড়ায়। এর ঠিক কিছুক্ষণ আগে ৭ মিনিটে সিমন দ্রুত নিজের লাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসে মেসিকে নিশ্চিত গোলের সুযোগ পাওয়া থেকে দুর্দান্তভাবে রুখে দেন!
স্পেন তাদের আক্রমণের চাপ আরও বাড়ায়। ৩৯ মিনিটে লাপোর্তে, রদ্রি ও বায়েনা নিজেদের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়ায় বল দেওয়া-নেওয়া করেন। এরপর ফাবিয়ান আলতো টোকায় বল বাড়িয়ে দেন ওয়ারজাবালের দিকে। তিনি বক্সের প্রান্ত থেকে প্রথম সুযোগেই বাম পায়ের এক জোরালো শট নেন। কিন্তু মার্টিনেজ নিচে নেমে এসে দারুণভাবে বলটি রুখে দেন।
৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। দুই মিনিট পর ইনজুরির লক্ষণ নিয়ে তিনি নিকোলাস ওতামেন্দির বদলি হন। পর্তুগাল ম্যাচের পর থেকে স্পেনের প্রতি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়লেন। একই সময়ে কুকুরেয়ার দারুণ একটি প্রচেষ্টা ডানপাশের পোস্টের সামনে দিয়ে মাঠের বাইরে যায়।
হাফটাইমের আগে ৬৫ শতাংশ বল পজেশনে রেখেছিল স্পেন। মাত্র ৩৫ শতাংশ আর্জেন্টিনা। লক্ষ্যে লা রোজারা শট রেখেছে দুটি। পাসেও দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার ১৫৫ নিখুঁত পাসের বিপরীতে তাদের ৩১৩! পুরোটা সময় লক্ষ্যে তো বটেই, কোনো শট নিতে পারেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমন দুইবার ক্লিয়ার সুইপ করে তাদের প্রচেষ্টা নষ্ট করে দেন। স্পেন ফাইনাল থার্ডে ৩৫ বার ঢুকেছে, যেখানে আর্জেন্টিনা মাত্র ১৮ বার।
দ্বিতীয়ার্ধে লিওনেল স্কালোনি পরিবর্তন আনেন দলে। প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়া নিকো গঞ্জালেজকে উঠিয়ে নামান লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটে স্পেন ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। ওয়ারজাবালের পাস ধরে বায়েনা শট নেন। তার দুর্বল শট মাটিতে লাফিয়ে মার্টিনেজের হাতে পড়ে।
বিরতির পর মাঠে নামার পর থেকেই পারদেসের জন্য এই বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরুটা যেন একটি দুঃস্বপ্নের মতো হয়েছে! তিনি অযথাই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন এবং এই ঘটনার জন্য তাকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। এই সিদ্ধান্তের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত ওলমো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
৫৫ মিনিটে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের ট্যাকল! স্পেন ফাবিয়ানের মাধ্যমে পেছন থেকে পাল্টা আক্রমণ করে। বলটি ওয়ারজাবালের কাছে পৌঁছালে তিনি ফাবিয়ানকে পাস দেন। তিনি শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে বলটি পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওতামেন্দি এগিয়ে এসে বলটি বিপদমুক্ত করেন!
পরের মিনিটে আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার বক্সের ডানপ্রান্ত থেকে ওলমোর ব্যাকপাস গোলপোস্টের সামনে কুকুরেয়ার পায়ে পড়ার আগেই গঞ্জালো মন্তিয়েল ক্লিয়ার করেন। দুই মিনিট পর নাহুয়েল মলিনাকে তার বদলি মাঠে নামান স্কালোনি।
৬২ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ফাবিয়ানের জায়গায় পেদ্রি এবং ওয়ারজাবালের পরিবর্তে ফেরান তোরেস মাঠে নামেন। দুই মিনিট পর ওলমোর বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট রুখে দেন মার্টিনেজ। তিনি বল ধরে রাখতে না পারলেও মাঠের বাইরে যায়।
আর্জেন্টিনার ডানপ্রান্ত থেকে ইয়ামাল দারুণ একটা সুযোগ তৈরি করে দেন। আলভারেজ ও ম্যাকঅ্যালিস্টারকে পেছনে ফেলে বাইলাইন থেকে বার্সা তারকার বাঁ পায়ের ক্রস। তোরেস নিচু হেড করেন। কিন্তু মার্টিনেজের হাতে পড়ে বল।
৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনা দুটি পরিবর্তন আনেন। মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলকে তুলে নিয়ে ফরোয়ার্ড জিউলিয়ানো সিমিওনেকে নামায় তারা। আর ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ডিফেন্সে জায়গা পান ফাকুন্দো মেদিনা। ৭৫ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনো ও বায়েনার জায়গায় নিকো উইলিয়ামস আসেন।
দুই মিনিট পর গোল করার মতো জায়গা থেকে পেদ্রির শট মার্টিনেজের কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কয়েক মুহূর্ত পর ইয়ামালের দারুণ এক প্রচেষ্টা মেদিনা ব্লক করেন। তবে বল পড়ে কুবারসির পায়ে। দূর থেকে তার নেওয়া শট দুর্ভাগ্যজনকভাবে মার্টিনেজের গায়ে লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৮০ মিনিটে উইলিয়ামসের ক্রসে ব্যাকপোস্টে আইমেরিক লাপোর্তের দুর্বল হেড তিনি রুখে দেন। ৮৭ মিনিটে তোরেসের একটি শট গোলবারের পাশ দিয়ে যায়।
ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে উইলিয়ামসের একটি শক্তিশালী শট রুখে দেন আর্জেন্টাইন কিপার। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। কুবার্সিকে ফাউল করেন তিনি। শেষ মুহূর্তে পারেদেসের ফাউলের শিকার হন ইয়ামাল। বক্সের সামনে থেকে তার নেওয়া ফ্রি কিক দারুণভাবে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে রাখেন মার্টিনেজ।
অতিরিক্ত সময়ে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জাল কাঁপায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামস গোল করেন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ৯৬ মিনিটে স্পেন ভেবেছিল তারা এই বিশ্বকাপ ফাইনালে এগিয়ে গিয়েছে! বল স্পর্শ করার জন্য ইয়ামালের প্রচেষ্টা মেরিনোর কাছে পৌঁছায়। তিনি ওতামেন্দির চ্যালেঞ্জকে প্রতিহত করে শট নেন। কিন্তু মার্টিনেজ তা ব্লক করেন!
উইলিয়ামস আলগা বলটি লুফে নিয়ে জালে জড়ান। কিন্তু রেফারি ওতামেন্দির ওপর মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করে দেন! অবশ্যই ভিএআর এটি পরীক্ষা করে দেখে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এর কিছুক্ষণ পর দারুণ এক গোলে স্পেনকে এগিয়ে দিলেন তোরেস। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ২৭ সেকেন্ডে পেদ্রো পোরোর ক্রসে উইলিয়ামসের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে তিনি জালে বল জড়িয়ে দেন। ফাইনালে পঞ্চম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোল করলেন তোরেস। সবশেষ ২০১৪ সালে জার্মানির গোৎসের গোলে হার দেখেছিল আর্জেন্টিনা।
১১৩ মিনিটে আরেকবার গোল করেছিলেন তোরেস। কিন্তু তিনি অফসাইডে থাকার কারণে গোলটি বাতিল হয়। ১২০ মিনিটে মেরিনো ও কুবার্সির প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনার একটি গোলের সুযোগ নষ্ট হয়। মেসির ফ্রি কিক থেকে গোলমুখের সামনে সিমিওনে বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর তার আরেকটি শট গোলবারের উপর দিয়ে যায়। তারও আগে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের একটি রকেট গতির শট গোলমুখের সামনে থাকা মিকেল মেরিনোর মুখে লেগে ব্যর্থ হয়।
রেকর্ড সেভ ও ৮০০ পাসে আর্জেন্টিনার স্বপ্নভঙ্গ
নির্ধারিত সময়ে কষ্টার্জিত ড্রয়ের পর স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারল আর্জেন্টিনা। ইউরোপিয়ান দলটি জিতে নিলো বিশ্বকাপ ট্রফি। জয়টা ছোট ব্যবধানে হলেও পরিসংখ্যান বলছে, লিওনেল স্কালোনির দলের ওপর স্প্যানিশরা পুরোপুরি ছড়ি ঘুরিয়েছে।
বল দখলে রেখে ম্যাচে আধিপত্য করা স্পেনের জন্য নতুন কিছু নয়। ফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ৬৫ শতাংশ বল দখলে রেখেছিল তারা। এর মধ্যে সফল পাস ছিল ৮৫২টি, আর্জেন্টিনার (৪৬৪) চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ৭৬২ পাস ছিল নিখুঁত। বলাবাহুল্য, লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল পুরোপুরি ম্যাচ তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
সত্যি হলো স্পেনের পারফরম্যান্স কেবল বল দখল ও পাসিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। আর্জেন্টিনার গোলে তাদের শট ছিল ২০টি, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ১১টি সেভ করেন, যা বিশ্বকাপ ফাইনালে একজন গোলকিপারের রেকর্ড।
বিপরীতে স্কালোনির দল মাত্র দুটি শট নিয়েছিল গোলে। অবশ্য দুটি ক্ষেত্রেই স্প্যানিশ কিপার উনাই সিমনকে তেমন কিছু করতে হয়নি। এই প্রচেষ্টাগুলোই আর্জেন্টিনাকে শেষ দিকে বেঁচে থাকার আশা জাগিয়েছিল।
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে আজ রাতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের দুই শক্তিশালী দল ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। অনেক ক্ষেত্রে এই ম্যাচটিকে স্রেফ সান্ত্বনার লড়াই বা গুরুত্বহীন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। যদিও ফুটবলারদের অনীহার কথা উল্লেখ করে ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল ইতিমধ্যে মন্তব্য করেছেন যে, “তার দলের কোনো খেলোয়াড় ম্যাচটা খেলতে চায় না”, তবুও ব্যক্তিগত অর্জনের দৌড়ে থাকা অন্তত চারজন তারকার কাছে এই ম্যাচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মূলত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের লড়াই এই ম্যাচটিকে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে।
সেমিফাইনাল হতে বিদায় নেওয়ায় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হলেও কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমানে দেম্বেলে, হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহ্যামের সামনে এখনও সুযোগ রয়েছে আসরের সেরা গোলদাতা হওয়ার। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে করা গোলগুলোও টুর্নামেন্টের সামগ্রিক গোলসংখ্যার সাথে যুক্ত হয়। বর্তমানে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ৮টি করে গোল নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে একটি অ্যাসিস্ট বেশি থাকায় আপাতত মেসির অবস্থান কিছুটা সুবিধাজনক। অন্যদিকে ৭ গোল করা আর্লিং হলান্ডের দল বিদায় নেওয়ায় তাঁর আর কোনো সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম ৬টি করে এবং ফ্রান্সের দেম্বেলে ৫টি গোল নিয়ে এখনও শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে টিকে আছেন।
ফিফার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী, একাধিক খেলোয়াড়ের গোলসংখ্যা সমান হলে প্রথমে তাঁদের করা অ্যাসিস্টের সংখ্যা বিচার করা হয়। সেখানেও যদি সমতা বিরাজ করে, তবে দেখা হয় কোন খেলোয়াড় তুলনামূলক কম সময় মাঠে থেকে সেই গোলগুলো করেছেন। এই জটিল সমীকরণের কারণেই ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার আজকের লড়াইটি স্রেফ মর্যাদার লড়াই ছাপিয়ে গোল্ডেন বুটের ভাগ্য নির্ধারণী ম্যাচে পরিণত হয়েছে। হ্যারি কেইন বা বেলিংহ্যাম যদি আজকের ম্যাচে একাধিক গোল করতে পারেন, তবে তাঁরা মেসি বা এমবাপ্পেকে টক্কর দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এর আগেও অনেকবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ গোল্ডেন বুট নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ফুটবল বিশ্বের অন্তত সাতজন গোল্ডেন বুট জয়ী এই বিশেষ ম্যাচে গোল করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন। ২০১০ সালে জার্মানির টমাস মুলার, ১৯৯৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার ডেভর সুকর এবং ১৯৯০ সালে ইতালির সালভাতোরে শিলাচি এই লড়াইয়ে গোল করার সুবাদেই শেষ পর্যন্ত আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট পরেছিলেন। এমনকি ১৯৩৮ সালে ব্রাজিলের কিংবদন্তি লিওনিদাসও এই পথেই তাঁর অর্জন নিশ্চিত করেছিলেন। এছাড়া জাস্ট ফন্টেইন ও ইউসেবিওর মতো মহাতারকারাও এই ম্যাচে লক্ষ্যভেদ করে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
লিওনেল মেসির অর্জনের খাতা এতটাই সমৃদ্ধ যে নতুন কোনো রেকর্ড গড়া তাঁর জন্য এখন প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে স্পেনের বিপক্ষে আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালটি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। শিরোপা ধরে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এই ম্যাচে একাধিক মহাকাব্যিক রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আর্জেন্টাইন এই জাদুকর। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে ফাইনালে মাঠে নেমে তিনি গোলরক্ষক ব্যতীত বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে ফাইনাল খেলার অনন্য কীর্তি স্থাপন করবেন। বর্তমানে এই তালিকায় গোলরক্ষকসহ সবার শীর্ষে রয়েছেন ইতালির কিংবদন্তি দিনো জফ।
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে প্রথম অধিনায়ক হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল কৃতিত্ব গড়ার অপেক্ষায় আছেন মেসি। এর আগে কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা দুইবার ফাইনালে আলবিসেলেস্তেদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কেবল ব্রাজিলের কাফুরই তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার রেকর্ড রয়েছে, যার পাশে এখন নিজের নাম লেখাবেন মেসি। এছাড়া স্পেনের বিপক্ষে জয় পেলে তিনি হবেন বিশ্ব ফুটবলের প্রথম অধিনায়ক, যাঁর অধীনে একটি দল দুইবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। একই সাথে ব্রাজিল ও ইতালির পর তৃতীয় দেশ হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করবে আর্জেন্টিনা।
ব্যক্তিগত গোলের পরিসংখ্যানেও এই ফাইনাল মেসির জন্য বিশেষ কিছু হতে পারে। স্পেনের বিপক্ষে একটি গোল করলেই তিনি সুইডেনের নিলস লিডহোমকে টপকে বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেবেন। সেই সাথে চলতি আসরে তাঁর গোলসংখ্যা আটে পৌঁছালে তিনি ১৯৩০ বিশ্বকাপে গিয়ের্মো স্তাবিলের গড়া আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটিও ছুঁয়ে ফেলবেন। যদি তাঁর পা থেকে দুটি গোল আসে, তবে এক আসরে ১০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করবেন তিনি। ইউরোপীয় ফুটবলারদের বাইরে এই কীর্তি আগে কেউ গড়তে পারেননি; ইতিপূর্বে কেবল জুস্ত ফঁতেন, সান্দর কচিস ও গার্ড মুলার এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল করা মেসি এবার জালের দেখা পেলে ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে দুটি ভিন্ন ফাইনালে গোল করার রেকর্ড গড়বেন। আর দুই গোল করলে বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ চার গোলের রেকর্ডে কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে যৌথভাবে শীর্ষে উঠবেন তিনি, আর হ্যাটট্রিক করলে বসবেন একক সিংহাসনে। এছাড়া চ্যাম্পিয়ন দলের হয়ে এক আসরে সর্বোচ্চ আট গোলের যে রেকর্ড বর্তমানে ব্রাজিলের রোনালদোর দখলে রয়েছে, সেটিও ভাঙার সুযোগ রয়েছে মেসির সামনে। ফলে নিউ জার্সির এই ফাইনাল কেবল একটি শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ নয়, বরং মেসির শ্রেষ্ঠত্বকে ইতিহাসের পাতায় নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক মহেন্দ্রক্ষণ।
ছবি: সংগৃহীত
আগামী রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ফাইনালটি ফুটবল বিশ্বের জন্য এক অনন্য ও আবেগী মুহূর্ত হয়ে উঠতে যাচ্ছে। শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচে স্পেনের কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে যখন আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনির মুখোমুখি হবেন, তখন সেটি কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, বরং হয়ে উঠবে গুরু ও শিষ্যের এক ধ্রুপদী দ্বৈরথ। প্রায় নয় বছর আগে ২০১৭ সালে মাদ্রিদের লাস রোসাসে প্রো কোচিং লাইসেন্স কোর্স করার সময় স্কালোনির শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং ডি লা ফুয়েন্তে। সেই শিক্ষক ও ছাত্র ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখর জয়ের লক্ষ্যে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
পেশাদার ফুটবল ছেড়ে কোচিংয়ে আসার মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন স্কালোনি। ডি লা ফুয়েন্তের কাছ থেকে পাওয়া দীক্ষাকে কাজে লাগিয়ে তিনি আলবিসেলেস্তেদের এক স্বর্ণযুগে নিয়ে গেছেন, যেখানে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পাশাপাশি ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ও অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ডি লা ফুয়েন্তে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের পর স্প্যানিশ দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে দলটিকে পুনরায় বিশ্বসেরাদের কাতারে নিয়ে এসেছেন। ২০২৪ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর এবার ফ্রান্সকে হারিয়ে স্পেনকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের দোরগোড়ায় নিয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
ফাইনালের এই হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের আগে উভয় কোচই একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও মৈত্রী প্রকাশ করেছেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করার পর স্কালোনি তাঁর সাবেক শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, "তিনি ছিলেন আমার পরামর্শদাতা। আমি যা জানি, তার সবই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আর এখন আমরা একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছি। কাতার বিশ্বকাপের পর কোচদের একটি সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল। তিনি তাঁর দল নিযয় অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁর জন্য আমি সত্যিই আনন্দিত।" উল্লেখ্য যে, খেলোয়াড়ি জীবনের দীর্ঘ সময় স্পেনে কাটানো স্কালোনির পরিবারও স্প্যানিশ এবং তাঁরা বর্তমানে মায়োর্কায় বসবাস করেন। তবে পেশাদারিত্বের প্রশ্নে তিনি অনড়। তাঁর ভাষায়, ‘‘সবাই জানে আমি স্পেনে থাকি এবং আমার পরিবার স্প্যানিশ। তারপরও আমি ডি লা ফুয়েন্তেকে হারানোরই চেষ্টা করব। তিনি মাঠে দল পরিচালনার ধরন এবং একজন মানুষ হিসেবে- দুই দিক থেকেই আমার সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেছেন।"
ছাত্রের এই অভাবনীয় সাফল্যে গর্বিত ডি লা ফুয়েন্তেও স্কালোনির প্রশংসা করে বলেন, "লিওনেলের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে সে সবকিছু জিতেছে। তার অনেক চিন্তাধারার সঙ্গে আমি একমত। পেশাগত ও ব্যক্তিগত- দুই ক্ষেত্রেই আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। সে অসাধারণ একজন মানুষ।" তিনি স্কালোনির ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরও যোগ করেন, "লিওনেল খুবই পরিশ্রমী ছাত্র ছিল। শেখার প্রতি তার দারুণ আগ্রহ এবং ইতিবাচক মনোভাব ছিল। তার মধ্যে সব সময় নিজেকে আরও উন্নত করার তাগিদ দেখেছি। তার শিক্ষক হতে পারাটা আমার জন্য সম্মানের। তবে সবকিছুর আগে সে আমার বন্ধু। আমাদের মধ্যে এখনো দারুণ সম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশংসা পোষণ করি।" এখন দেখার বিষয়, রবিবারের এই লড়াইয়ে গুরুর রণকৌশল জয়ী হয় নাকি শিষ্যের নতুন ফুটবল দর্শন বিশ্ব জয় করে।
ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল সম্রাট পেলের একটি ঐতিহাসিক জার্সি নিলামে ৪.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৭ কোটি টাকা) বিক্রি হয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপের ফাইনালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে এই জার্সিটি পরেই পেলের বিশ্বমঞ্চে রাজসিক অভিষেক হয়েছিল। নিউ ইয়র্কে আয়োজিত এই নিলামটি পরিচালনা করে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘সোথবি’। পেলের ব্যবহৃত যে কোনো স্মারক সামগ্রীর মধ্যে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দামে বিক্রির নতুন নজির।
নিলাম সংস্থা সোথবি জানিয়েছে, ঐতিহাসিক এই জার্সিটি সংগ্রহ করতে সংগ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা গেছে। নিলামে পাঁচজনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী মোট ১০টি পৃথক দরপ্রস্তাব জমা দেন। মূলত ১৯৫৮ সালের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনাল ম্যাচে পেলের অসামান্য অবদানের কারণেই জার্সিটির গুরুত্ব সংগ্রাহকদের কাছে আকাশচুম্বী। ওই ম্যাচে পেলের জোড়া গোলের সুবাদে ব্রাজিল ৫-২ ব্যবধানে সুইডেনকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা লাভ করেছিল। ফুটবল সম্রাট হিসেবে পেলের যে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি, তার সূচনা হয়েছিল মূলত এই ম্যাচটি দিয়েই।
সোথবির কর্মকর্তাদের মতে, ১৯৫৮ সালের ফাইনাল ম্যাচের ছবিগুলো ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত প্রতিচ্ছবি, আর সেই কালজয়ী মুহূর্তে পেলে এই জার্সিটিই পরিধান করেছিলেন। মজার বিষয় হলো, আজ হতে দুই দশক আগে ২০০৪ সালেও এই জার্সিটি একবার নিলামে তোলা হয়েছিল। তবে সে সময় এর বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ১ লাখ ৫ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার। বিশ বছরের ব্যবধানে এই জার্সির দাম গগনচুম্বী হয়ে ওঠা পেলের প্রতি ফুটবল বিশ্বের চিরন্তন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২২ সালে কিংবদন্তি এই ফুটবলারের প্রয়াণের পর তাঁর ব্যবহৃত স্মারকগুলোর মূল্য সংগ্রহকারীদের কাছে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
পুরনো ছবি
আসন্ন বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে গ্যালারিতে বসে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াই উপভোগ করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই জমকালো ফাইনাল ম্যাচে তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউস।
বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান যে, ‘রবিবারের ফাইনালের জন্য আমরা মুখিয়ে আছি। প্রেসিডেন্টও ম্যাচটি সরাসরি দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।’ তাঁর মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সরাসরি অংশগ্রহণ টুর্নামেন্টের সফল সমাপ্তিতে বিশেষ মাত্রা যোগ করবে।
লেভিট আরও উল্লেখ করেন যে, ‘তার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয়, সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপের সমাপ্তি ঘটবে।’ তবে টানটান উত্তেজনার এই ফাইনালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিক কোন দলের পক্ষে সমর্থন জানাবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি প্রেস সেক্রেটারি। সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত কৌতূহলের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, তিনি আপনাদের এ বিষয়ে মজার একটি উত্তর দেবেন।’ মূলত ট্রাম্পের উপস্থিতি এবারের আসরের নিরাপত্তাও শ্রেষ্ঠত্বকে বিশ্ববাসীর সামনে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবে বলে মনে করছে হোয়াইট হাউস।
চ্যাম্পিয়নশিপ রিং। ছবি: ফিফা
ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এক নতুন ও আভিজাত্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। এবারই প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্টের শিরোপাজয়ী দল ট্রফি ও স্বর্ণপদকের পাশাপাশি বিশেষভাবে তৈরি ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’ লাভ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ক্রীড়া সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই সম্মানটি এবার বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চেও যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা। সংস্থাটির পক্ষ হতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঘোষণাটি দেওয়া হয়েছে।
আগামী রবিবার (১৯ জুলাই) রাতে নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচে বিজয়ীর মুকুট যারা পরবেন, তাঁদের হাতেই তুলে দেওয়া হবে এই আকর্ষণীয় স্মারক রিং। ফিফা জানিয়েছে যে, এবারের আসরকে স্মরণীয় রাখতে মোট ২ হাজার ২৬টি সীমিত সংস্করণের রিং তৈরি করা হয়েছে, যার প্রতিটি স্বতন্ত্র সিরিয়াল নম্বরযুক্ত। এর মধ্যে কেবল ৩০টি রিং চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। অবশিষ্ট ১ হাজার ৯৯৬টি রিং বিশ্বের সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিক্রয় করা হবে, যাতে তাঁরা এই ঐতিহাসিক মূহূর্তের অংশীদার হতে পারেন।
রিংয়ের নকশায় থাকবে শৈল্পিক ছোঁয়া; যার এক পাশে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিকৃতি এবং অন্য পাশে চ্যাম্পিয়ন দলের বিশেষ পরিচয় খোদাই করা থাকবে। প্রতিটি রিং ব্যবহারকারীর আঙ্গুলের মাপ অনুযায়ী কাস্টমাইজ করে তৈরি করা হবে এবং সাথে থাকবে একটি সত্যতা নিশ্চিতকারী সনদ। ফাইনাল শেষ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে বিজয়ী দলের অধিনায়ক ও প্রধান কোচকে একটি প্রতীকী রিং প্রদান করা হবে এবং পরবর্তীতে বাকি রিংগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।
উল্লেখ্য যে, এনবিএ বা সুপার বোলের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ক্রীড়া ইভেন্টগুলোতে চ্যাম্পিয়নশিপ রিং প্রদানের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও ফুটবলের বিশ্ব আসরে এটিই প্রথম। ফিফার মতে, এই রিংটি বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবকে খেলোয়াড়দের জন্য আজীবন এক অস্পৃশ্য স্মারক হিসেবে ধরে রাখবে। এই নতুন সংযোজন বিশ্বকাপ ফুটবলকে আরও বেশি মহিমান্বিত করবে বলে ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন।
স্লাভকো ভিনচিচ। ছবি: সংগৃহীত
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী মহারণের মহাগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ার অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। আগামী রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার হাইভোল্টেজ ফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনা করবেন ৪৬ বছর বয়সী এই রেফারি। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে চূড়ান্ত এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। মাঠের লড়াইয়ে প্রধান রেফারি ভিনচিচকে সহায়তা করবেন তাঁরই স্বদেশি দুই সহকারী তোমাজ ক্লানচনিক ও আন্দ্রাজ কোভাচিচ। এছাড়া চতুর্থ রেফারির ভূমিকায় থাকবেন জর্ডানের আধহাম মাখাদমেহ এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কাতারের মোহাম্মদ আলকালাফ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রেফারিংয়ে ভিনচিচের অভিজ্ঞতা বেশ দীর্ঘ। ২০১০ সালে ফিফার তালিকাভুক্ত রেফারি হওয়ার পর থেকে প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় বড় আসরে সফলতার সাথে বাঁশি বাজাচ্ছেন। ক্লাব ফুটবলেও তাঁর সাফল্যের ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ, যার অন্যতম উদাহরণ ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের মধ্যকার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনা করা। ফিফা বিশ্বকাপে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে কাতার আসর দিয়ে। এবারের আসরে ইতিমধ্যে তিনি তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে গ্রুপ পর্বের ব্রাজিল-মরক্কো ও জর্ডান-আলজেরিয়া এবং শেষ বত্রিশের মেক্সিকো-ইকুয়েডর ম্যাচ। আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের মধ্যকার ফাইনালটি হতে যাচ্ছে ভিনচিচের ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ম্যাচ এবং চলমান আসরের চতুর্থ ম্যাচ।
লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনার ম্যাচে ভিনচিচ এখন পর্যন্ত মাত্র একবারই দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ২-১ গোলে পরাজিত হয়ে ৩৬ ম্যাচের অপরাজিত থাকার গৌরব হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। রয়টার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, সেই ম্যাচের সপ্তম মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে ফাউল করার প্রেক্ষিতে পেনাল্টির নির্দেশ দিয়েছিলেন ভিনচিচ, যা থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন মেসি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেই খেলায় সৌদি আরবের ছয়জন খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখালেও আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড়কে কার্ড দেখাননি তিনি।
স্পেনের ফুটবলের সাথে ভিনচিচের পরিচয় দীর্ঘদিনের এবং বেশ ইতিবাচক। ২০১৭ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে স্প্যানিশ ফুটবলে তাঁর যাত্রা শুরু। এরপর ২০২০ ইউরোয় স্পেন-সুইডেন লড়াই এবং ২০২৩ উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে স্পেন-ইতালি ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের ক্যারিয়ারের দুটি স্মরণীয় ম্যাচেও রেফারির ভূমিকায় ছিলেন তিনি। ২০২৪ ইউরোতে ইতালির বিপক্ষে জয় এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ইয়ামালের সেই অভাবনীয় দূরপাল্লার গোলের রাতেও বাঁশি ছিল ভিনচিচের হাতে। এএফপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ জয়গুলোতে ভিনচিচের ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা দলটির জন্য পরিচিত এক আবহাওয়া তৈরি করবে। সব মিলিয়ে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এক রোমাঞ্চকর ফাইনালের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।
মন্তব্য