সাংবাদিক আরিফকে মাদকে ফাঁসানোর মূলে আরডিসি নাজিম

সাংবাদিক আরিফকে মাদকে ফাঁসানোর মূলে আরডিসি নাজিম

বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম ও তৎকালীন সিনিয়র সরকারী কমিশনার (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন। ফাইল ছবি

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ মার্চ রাতে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানের বাসা থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের অভিযোগে শাস্তি দেয়া হলেও তার বাসায় কোনো মাদকই পাওয়া যায়নি। বাসায় কোনো তল্লাশিই চালানো হয়নি, এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান বলা হলেও সেখানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা ছিলেন না।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নামে মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানের বাসা থেকে আধা বোতল মদ ও গাঁজা উদ্ধার এবং তাকে সাজা দেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি সাজানো ছিল বলে উঠে এসেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে।

২০২০ সালের মার্চ মাসের আলোচিত ওই ঘটনায় কুড়িগ্রামের তৎকালীন সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমার বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলার তদন্তে ক্ষমতার অপব্যবহার করার বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে।

রিন্টু বিকাশ চাকমার বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলার তদন্ত প্রতিবদেনটি ২২ পৃষ্ঠার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ মার্চ রাতে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানের বাসা থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের অভিযোগে শাস্তি দেয়া হলেও তার বাসায় কোনো মাদকই পাওয়া যায়নি। বাসায় কোনো তল্লাশিই চালানো হয়নি, এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান বলা হলেও সেখানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাই ছিলেন না।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা বলে সাংবাদিক আরিফুলকে তার বাসা থেকে বের করে নিয়ে আসেন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সরকারী কমিশনার ও রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন।

ওই ঘটনায় দেশব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে সাংবাদিক আরিফুলকে মুক্তি দেয়া হয়। পরে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়। বিভাগীয় মামলার তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দুই বছরের জন্য তার ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করা হয়েছে। সিনিয়র সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিনকে পদাবনতি দেয়া হয়।

আর রিন্টু বিকাশ চাকমাকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। যদিও রিন্টু বিকাশ চাকমার বিষয়টির এখনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। তবে অন্যদের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। তাদের মধ্যে এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলামকে বরিশাল ডিসি অফিসে পোস্টিং দেয়া হয়েছে।

রিন্টু বিকাশ চাকমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্তে গঠিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তিন সদস্যের কমিটির প্রধান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আমেনা বেগম। অপর দুই সদস্য হলেন উপসচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও উপসচিব পি কে এম এনামুল করিম।

এই কমিটি গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগে।

প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইনকানুন ও বিধিবিধান পর্যালোচনায় তদন্ত বোর্ড এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে কুড়িগ্রামের সাবেক সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা-২০১৮-এর-৩ (খ) বিধি মোতাবেক আনীত অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটি মামলায় সরকারপক্ষের ১১ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে। মামলায় একমাত্র বেসরকারি সাক্ষী সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যান।

তদন্ত বোর্ডের জিজ্ঞাসায় রিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, ২০২০ সালের ১৩ মার্চ শুক্রবার রাত আনুমানিক ১২টায় তিনি কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী ও আরডিসি নাজিম উদ্দিনের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের সরকারী কমিশনার ও এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলাম, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বের হন।

রিন্টু বলেন, অভিযানে বের হওয়ার আগে আরডিসি নাজিমের নির্দেশেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের পেশকার সাইফুল ইসলামকে দিয়ে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের পেশকার জাহিদুল ইসলামকে ফোন করা হয়। তখন জাহিদুল জানান তিনি রংপুরে আছেন। অভিযানে আরিফুলের বাসায় তল্লাশি হতে দেখেননি বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের বলেছেন রিন্টু।

তিনি জানান, অভিযানের সময় সাংবাদিক আরিফুলের বাসায় প্রবেশ করেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন। ওই সময় তিনি (রিন্টু) বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। নাজিম উদ্দিনের নির্দেশে সাংবাদিক আরিফুলকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে রাত ১২টা ৪০ মিনিটে ডিসি অফিসে নেয়া হয়। রাত ১টা ২০ মিনিটে আরডিসি নাজিম তাকে (রিন্টু) ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা পরোয়ানায় সই করতে বলেন।

রিন্টু বলেছেন, তিনি শুধু একজন প্রত্যক্ষকারী হিসেবে উপস্থিত থাকায় এবং প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ অনুপস্থিত ছিল বিধায় আরডিসি নাজিমকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অনুরোধ করেন। কিন্তু আরডিসি নাজিমের প্রচণ্ড চাপাচাপিতে মানসিকভাবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে একপর্যায়ে সাজা পরোয়ানায় সই করতে বাধ্য হন। রাত ১টা ৩০ মিনিটে নাজিম উদ্দিন জোরপূর্বক মোবাইল কোর্টের সাজা পরোয়ানায় তার (রিন্টু) সই করিয়ে নেন। এর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি জানতেন না যে, মোবাইল কোর্টের নথিপত্রে তাকেই সই করতে হবে।

সাংবাদিক আরিফকে মাদকে ফাঁসানোর মূলে আরডিসি নাজিম
কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন ও তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

তদন্ত বোর্ডকে রিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, তিনি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার উদ্দেশ্যে গেলে অবশ্যই বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে যেতেন। মোবাইল কোর্টের রিকুইজিশন ফরমে তিনি সই করলেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় ও ফোর্সের সংখ্যা নির্ধারণ করেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন। ফলে সব ঘটনাপ্রবাহে তার কোনো হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টুর দাবি, নাজিম উদ্দিন তৎকালীন জেলা প্রশাসন ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়েছিলেন ভেবে তিনি তার নির্দেশ পালন করেন। মোবাইল কোর্টের নথিতে উল্লিখিত দুজন সাক্ষীকে তিনি চেনেন না, এমনকি দেখেননি।

রিন্টু বলেন, অভিযানের ১৮ ঘণ্টা পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম প্রসিকিউশন রিপোর্টে সই করেন। এর দ্বারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও অভিযানটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এ ঘটনায় সরকারপক্ষের আরেক সাক্ষী কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বেঞ্চ সহকারী সাইফুল ইসলাম।

সাইফুল ইসলাম তদন্ত বোর্ডকে বলেন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন তাকে ডেকে বলেন, রাতে মোবাইল কোর্ট করা হবে। এ জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমার স্বাক্ষরে পুলিশ ও আনসার চেয়ে পত্র দিতে নির্দেশ দেন নাজিম উদ্দিন। এ সময় আরডিসি নাজিমের সঙ্গে সহকারী কমিশনার রাহাতুল ইসলাম ও রিন্টু বিকাশ চাকমাও বসা ছিলেন।

সাইফুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তাদের আরও বলেন, অভিযানের সময় নাজিম উদ্দিন সাংবাদিকের ঘরে প্রবেশ করেন এবং রিন্টু বিকাশ চাকমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে নাজিম উদ্দিন আরিফুলকে নিয়ে বের হয়ে আসেন। কিন্তু ওখানে কোনো তল্লাশি হয়নি এবং কোনো জব্দ তালিকাও করা হয়নি।

সাইফুল ইসলাম জবানবন্দিতে বলেন, সাংবাদিক আরিফুলকে নিয়ে আরডিসি নাজিম ডিসি অফিসের দোতলায় চলে যান। তিনি নিচতলার কোর্ট রুম খুলে বাকি লোকদের নিয়ে বসেন। কিছুক্ষণ পর আরডিসি নাজিম তাকে একটি প্লাস্টিকের বোতল ও কাগজে প্যাঁচানো কিছু জিনিস দিয়ে সাংবাদিক আরিফুলের কাছ থেকে মদ ও গাঁজা উদ্ধার হয়েছে মর্মে জব্দ তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন।

নাজিম উদ্দিনের নির্দেশে তিনি জব্দ তালিকা ও সাজা পরোয়ানা প্রস্তুত করেন। এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা সাজা পরোয়ানায় সই করেন। রাতে নাজিম উদ্দিনের নির্দেশে তিনি আসামিকে জেলখানায় নিয়ে যান। পরদিন ২০২০ সালের ১৪ মার্চ নাজিম উদ্দিন দুজন লোককে তার কাছে পাঠান জব্দ তালিকায় সই নেয়ার জন্য। একই দিনে আরডিসি নাজিম উদ্দিন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শককে ডেকে এনে প্রসিকিউশন রিপোর্টে সই নেন।

বিভাগী মামলার আরেক সাক্ষী কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সুজাউদ্দৌলার জবানবন্দিও নিয়েছে তদন্তকারী দল।

সুজাউদ্দৌলা তার জবানবন্দিতে বলেন, ঘটনার রাতে এনডিসি রাহাতুল ইসলাম মোবাইল ফোনে তাকে জানান, রাতেই মাদকবিরোধী একটি বিশেষ টাস্কফোর্স পরিচালিত হবে এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ বিষয়ে অবগত আছেন। পরবর্তী সময়ে রাহাতুল ইসলামের মোবাইল ফোন থেকে আসা এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একজনকে এক বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।

সুজাউদ্দৌলা বলেন, ‘রাহাতুল ইসলামের ফোন ও এসএমএস দেখে মনে হয়, এনডিসি রাহাতুল ইসলামই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। কিন্তু পরদিন অফিসে এসে জানতে পারি, রিন্টু বিকাশ চাকমা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছিলেন।’

তখন তিনি নথিটি দেখছিলেন এবং তখন পর্যন্ত সাজা পরোয়ানা ছাড়া নথিতে আর কিছু ছিল না বলে দাবি করেছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুজাউদ্দৌলা।

কুড়িগ্রাম জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের সাবেক পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম তদন্ত কমিটির কাছে তার জবানবন্দি দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ২০২০ সালের ১৩ মার্চ রাতের অভিযানটি তার দপ্তরের রিকুইজিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হয়নি। ১৪ মার্চ সকাল ১০টা ৪৯ মিনিটে পেশকার সাইফুল ইসলাম ও দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে এনডিসি রাহাতুল ইসলাম তাকে বারবার আসতে বললে বিকেল ৪টা ১১ মিনিটে তিনি কুড়িগ্রাম ডিসি অফিসে আসেন। তখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজিম উদ্দিন ও এনডিসি রাহাতুল ইসলাম তাকে জানান যে, গত রাতে একটি মোবাইল কোর্ট হয়েছে এবং আসামিকে রাতেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তাদের প্রস্তুতকৃত জব্দ তালিকায় সই করতে বললে তিনিসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো স্টাফ অংশগ্রহণ করেননি বলে প্রসিকিউশন রিপোর্টে সই করতে অপারগতা জানান। এ সময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুজাউদ্দৌলা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজিম উদ্দিন তাকে ধমক দিয়ে প্রসিকিউশন রিপোর্ট ও জব্দ তালিকায় সই করতে বলেন। তাদের দ্বারা বাধ্য হয়ে তিনি একপর্যায়ে জব্দ তালিকায় সই করেন এবং প্রসিকিউশন রিপোর্ট দাখিল করেন।

এই তদন্ত কমিটির কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন ডিসি সুলতানা পারভীনও। এতে তিনি দাবি করেন, সেই রাতের মোবাইল কোর্টটি নির্ধারিত শিডিউলবহির্ভূত ছিল। এই কোর্ট পরিচালনার আগে তার অনুমতি নেয়া হয়নি। কুড়িগ্রামের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা এই মোবাইল পরিচালনা করেন। অপর দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজিম উদ্দিন ও এস এম রাহাতুল ইসলাম এই মোবাইল কোর্টে উপস্থিতি ছিলেন মর্মে মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ মারফত জানতে পারেন।

প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী তিন কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব আমেনা বেগম, উপসচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও উপসচিব পি কে এম এনামুল করিম তাদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেছেন।

এতে তারা বলেছেন, ‘মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর ৭(১) ও ৭(২) ধারার বিধানমতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার সময় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে গৃহীত হওয়ার পরপরই মোবাইল কোর্ট পরিচালনকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট লিখিত অভিযোগ গঠন করে আসামিকে পড়ে শোনাবেন এবং অভিযোগ স্বীকার করেন কি না, তা জানতে চাইবেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি তার অভিযোগ স্বীকার করলে তার স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করে তাতে তার স্বাক্ষর নিয়ে দুজন উপস্থিত সাক্ষীর স্বাক্ষর গ্রহণপূর্বক যথোপযুক্ত দণ্ড প্রদান করবেন ও উক্ত আদেশে সই করবেন।

‘কিন্তু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা পরিচালিত মোবাইল কোর্টে আসামির অপরাধ তাৎক্ষণিক আমলে গ্রহণ না করে তাকে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে নিয়ে তার বিরুদ্ধে লিখিত কোনো অভিযোগ গঠন না করে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে এবং উপস্থিত কোনো সাক্ষীর স্বাক্ষর না নিয়ে আসামিকে দণ্ড প্রদান করা হয়েছে, যা মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর ৬(১), ৭(১) ও ৭(২) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘তা ছাড়া প্রসিকিউশন পক্ষের অনুপস্থিতিতে আসামির বাসায় কোনোরূপ তল্লাশি পরিচালনা কিংবা জব্দ তালিকা প্রস্তুত না করে আসামির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ গঠন ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কিসের ভিত্তিতে রিন্টু বিকাশ চাকমা সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেছেন, তদন্ত বোর্ডের এ প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।’

সাক্ষ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা রিন্টু বিকাশ চাকমা সঙ্গীয় অপর দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ধৃত ও দণ্ডিত আসামি আরিফুল ইসলামকে ঘটনার রাতে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে স্থানান্তর করতে যান এবং জেল সুপারের অফিস কক্ষে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মচারী ও মামলার সাক্ষী সাইফুল ইসলাম, সাফিয়ার রহমান ও মোবাইল কার্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমার সাক্ষ্য দ্বারা বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত।

‘কারাগার একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত সংরক্ষিত এলাকা এবং অনুমোদিত ব্যতীত মধ্যরাতে এখানে অন্য কারো প্রবেশের সুযোগ নেই। অভিযুক্ত কর্মকর্তার সঙ্গীয় নাজিম উদ্দিন জেল সুপারের দায়িত্বে ছিলেন বিধায় তার ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মধ্যরাতে লোকজনসহ কারাগারে প্রবেশ করেছেন এবং অবস্থান করেছেন।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘উপরিউক্ত সাক্ষ্য পর্যালোচনা ও সরকারপক্ষের দাখিলকৃত দালিলিক প্রমাণ বিশ্লেষণে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০২০ সালের ১৩ মার্চ দিবাগত রাতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা রিন্টু বিকাশ চাকমা কর্তৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্টে তিনি ছাড়াও কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের আরও দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজিম উদ্দিন ও এস এম রাহাতুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

‘আসামির বাসায় কোনো তল্লাশি না হওয়া সত্ত্বেও এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো প্রতিনিধি (প্রসিকিউশন পক্ষ) উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও আধা বোতল মদ ও দেড় শ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের দাবি করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু কুমার চাকমা কর্তৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্ট।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ১০(১) চ ধারার অপরাধে আসামিকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়। যা রিন্টু বিকাশ চাকমা ও তার সঙ্গীয় ম্যাজিস্ট্রেটগণের ক্ষমতার অপব্যবহার। এর ফলে প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তদন্ত বোর্ডের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে।’

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

সম্প্রতি ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন মুসা বিন শমসের। ছবি: নিউজবাংলা

দুদকের কাছে মুসা যেসব সম্পদের তালিকা দিয়েছিলেন, তার কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেবল ফরিদপুরে তার বাবার করা বাড়িতে তার অংশ পাওয়া গেছে। তিনি বনানী ও গুলশানের যে বাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন, তার একটি ভাড়া করা, আরেকটি স্ত্রীর। সুইস ব্যাংকে কথিত অর্থের খোঁজ করার চেষ্টা করে এমন কোনো তথ্য পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

ফরিদপুরে পৈতৃক ভিটা ছাড়া আলোচিত চরিত্র মুসা বিন শমসেরের কোনো সম্পদের খোঁজ পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন। ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণা ও হয়রানির’ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।

দুদকের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত চলছে। শিগগিরই তদন্ত শেষ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

দুদকের এই অনুসন্ধান আর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদের বক্তব্য একই ধরনের।

যুগ্ম সচিব পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার কাদের মাঝির সঙ্গে সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখতে গত ১২ অক্টোবর মুসাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দা পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ডিবির যুগ্ম কমিশনারের বক্তব্য ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। তিনি সেদিন বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে উনি (মুসা) অন্তঃসারশূন্য। একটা ভুয়া লোক মনে হয়েছে। ওনার কিচ্ছু নাই। তার একটা বাড়ি রয়েছে গুলশানে। সেটাও স্ত্রীর নামে। বাংলাদেশে তার নামে আর কিছু পাই নাই। তবে উনি মুখরোচক গল্প বলেন।’

মুসা বিন শমসের গত কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশে আলোচিত চরিত্র। বাংলাদেশে কারও সম্পদ নিয়ে প্রচার করার প্রবণতা না থাকলেও ব্যতিক্রম মুসা। তিনি বরাবর তার বিপুল পরিমাণ টাকার গল্প বলে বেড়ান।

তার দাবি, তিনি আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ী, সুইস ব্যাংকে তার বিপুল পরিমাণ টাকা আছে। দেশেও বিভিন্ন এলাকায় এক হাজার একরের বেশি জমি আছে।

ডিবিতে গিয়েও দাবি করেন, সুইস ব্যাংকে তার ৮২ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। বাংলাদেশি টাকায় এটি প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এই টাকা আনতে পারলে তিনি পুলিশকে দেবেন ৫০০ কোটি টাকা। দুদককে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে বিল্ডিং করে দেবেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করে দেবেন।

তবে দুদক যখন তার সম্পদের হিসাব চেয়েছে, তখন তিনি দাবির পক্ষে কোনো নথিপত্র দিতে পারেননি।

দুদকের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান বলেন, ‘মুসা বিন শমসের অসৎ উদ্দেশ্যে দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ঢাকার সাভার ও গাজীপুরে ১ হাজার ২০০ বিঘা জমি এবং সুইস ব্যাংকের ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের) থাকার কথা বলেছেন। সেই সম্পদ অর্জনের উৎসের সমর্থনে কোনো রেকর্ডপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হন তিনি।’

অর্থাৎ দুদক ডিবির কাছে সম্পদের পরিমাণ নিয়ে দুই ধরনের তথ্য দিয়েছেন মুসা। দুদকের জমা দেয়া হিসাবের তুলনায় সুইস ব্যাংকে প্রায় সাত গুণ টাকা থাকার দাবি করেছেন ডিবির কাছে।

সুইস ব্যাংকে আদৌ কোনো টাকা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন বড় হয়েছে।

দুদকের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান বলেন, ‘সুইজারল্যান্ডে ৮৮টি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংকে তার টাকা জমা আছে, তার কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুদক টিম তদন্তের স্বার্থে বারবার চিঠি দিচ্ছে। চিঠির জবাব পাওয়া গেলেও টাকা জমা বা জব্দ থাকার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে না।’

তবে গাজীপুর ও সাভারের জমির তথ্য অসত্য, এ বিষয়ে নিশ্চিত তিনি। বলেন, ‘ঢাকা ও গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের রেকর্ডপত্র তল্লাশি করেও মুসা বিন শমসের ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা চৌধুরীর কোনো প্রকার জমি ক্রয়-বিক্রয় করার তথ্য পাওয়া যায়নি।’

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

পৈতৃক ভিটা ফরিদপুরে

মুসার নামে একমাত্র যে স্থাপনাটি দুদক পেয়েছে, সেটি ফরিদপুরে। তবে সেই সম্পদ তিনি নিজে করেননি। ব্রিটিশ আমলে কৃষি দপ্তরে কাজ করা বাবা শমসের আলী মোল্লা যে বাড়ি করেছিলেন, সেখানে ভাগ আছে মুসার।

ফরিদপুরে মুসার জন্ম ১৯৫০ সালের ১৫ অক্টোবর। চার ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

মুসার কথিত সম্পদের হিসাব খুঁজে বের করতে দুদকের পাশাপাশি কাজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউও)। দুটি সংস্থাই জানায়, তারা দেশে মুসার কোনো ব্যাংক হিসাবই খুঁজে পায়নি।

বিএফআইইউএর প্রতিবেদনে বলা হয়, মেসার্স ডেটকো লিমিটেড নামে জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মুসা বিন শমসের। এর অংশীদারত্বে আরও কয়েকজন রয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানের নামে ঢাকায় দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছেও চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠির উত্তরে সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, সেখানে মুসার নামে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে ওই ব্যক্তির নামে কোনো সম্পদও নেই।

দুদক জানায়, ইউটিউবে গুলশান প্যালেস নামে ঢাকার যে বাড়িটি দেখান, তার মালিক আসলে মুসার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা চৌধুরী।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, একসময়ে জনশক্তি রপ্তানিতে আলোচনায় থাকলেও এখন ডেটকো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হয়েছে।

বনানীতে যে বাড়িতে এই প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে, সেটিও ভাড়া করা।

যেভাবে আলোচনায় মুসা

১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী টনি ব্লেয়ারের নির্বাচনি প্রচারের জন্য ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদান দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে দেশে প্রথম আলোচনায় আসেন মুসা বিন শমসের। তিনি জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা করলেও সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে তুলে ধরে।

২০১০ সালে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মুসার ৭ বিলিয়ন ডলার জব্দ করেছে বলে আরেক দফায় ঝড় তোলে পশ্চিমা গণমাধ্যম। অনিয়মিত লেনদেনের কারণে তার অর্থ জব্দ করা হয় বলে সে সময় গণমাধ্যমে দাবি করেন তিনি।

আয়ারল্যান্ডে একটি দুর্গ কিনে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর বানানোর প্রস্তাব দিয়েও আলোচনায় এসেছিলেন মুসা।

তিনি প্রচার করে বেড়ান, সাউথ আফ্রিকার বিশ্বনন্দিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ বইটি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন মুসা বিন শমসেরকে।

এর পরই ২০১১ সালের এপ্রিলে একবার তার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুদক, কিন্তু সেই অনুসন্ধান-প্রক্রিয়া বেশি দূর আগায়নি।

২০১৪ সালে বিজনেস এশিয়া ম্যাগাজিন মুসা বিন শমসেরকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশি অস্ত্র ব্যবসায়ীর ৭ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে সুইস ব্যাংকে।

ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে মুসা বিন শমসেরের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। দুদকের পরিচালক মীর জয়নুল আবেদিন শিবলীকে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয় কমিশন।

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে ‘দেহরক্ষী নাটক’

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক দফা গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মুসাকে।

২০১৫ সালের ১৯ মে তাকে আবার সম্পদ বিবরণী জমা দিতে নোটিশ দেয় দুদক। ৭ জুন আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী জমা দেন তিনি।

এরপর ১৮ ডিসেম্বর মুসা বিন শমসের আলোচনায় আসেন দুদকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে। চার নারী নিরাপত্তাকর্মীসহ ৪০ জনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বহর নিয়ে সেদিন তিনি দুদকের ফটকে গাড়ি থেকে নামেন।

সে মুহূর্তে তার ডান হাতে শুভ্র আলোর দ্যুতি, হীরকখচিত বিশ্বখ্যাত রোলেক্স ব্র্যান্ডের অতি দামি ঘড়ি। হিরা বসানো চশমা, কলম ও জুতা পরা ছিল।

তবে পরে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে, এরা কেউ তার দেহরক্ষী ছিল না। তার জনশক্তি রপ্তানির কোম্পানির সাধারণ কর্মী তারা।

২০১৬ জানুয়ারি আবার তাকে দুদকে তলব করা হয় এবং ২৮ জানুয়ারি তাকে দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

২০১৭ সালের ৭ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মুসার বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির তিনটি অপরাধের প্রমাণ পাওয়ায় তিনটি মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

‘স্বাধীনতাবিরোধী পরিচয়’ও সামনে

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক এম এ হাসানের ‘পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী’ বইয়ে ১৯৭১ সালে সে সময়ের তরুণ মুসা বিন শমসেরকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ওই গ্রন্থের তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুসা ছিলেন পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের ঘনিষ্ঠজন আর মুক্তিকামী বাঙালির আতঙ্ক।

তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একাত্তরের ২৫ মার্চ আমি বঙ্গবন্ধুর বাসায় ছিলাম। পরদিন তিনি আমাদের যার যার এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। আমি নদী পার হয়ে হেঁটে ফরিদপুর যাই। ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি আর্মির হাতে ধরা পড়ি। আমি তাদের হাতে বন্দি ছিলাম। একাত্তর সালের ৯ ডিসেম্বর অর্ধমৃত অবস্থায় মুক্তি পাই।’

দুদকে জমা দেয়া সম্পদের হিসাব

২০১৫ সালের ৭ জুন দুদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেন মুসা বিন শমসের। তার জমা দেয়া হিসাব অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে ১২ বিলিয়ন ডলার জমা রয়েছে, যা বাংলাদেশি টাকায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি।

এ ছাড়া সুইস ব্যাংকের ভল্টে ৯০ মিলিয়ন ডলার দামের (বাংলাদেশি প্রায় সাড়ে সাত শ কোটি টাকা) অলংকার জমা থাকার দাবি করেছেন মুসা।

সে সময় দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সুইস ব্যাংকে জব্দ অর্থ অবমুক্ত হলে এসব অর্থ পদ্মা সেতু নির্মাণসহ মানবকল্যাণে ব্যয় করবেন তিনি।

সেদিন দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে মুসা দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে তার কোনো অর্থই সুইস ব্যাংকে জমা হয়নি। ৪২ বছর বিদেশে বৈধভাবে ব্যবসার মাধ্যমেই তিনি ১২ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছেন, যা সুইস ব্যাংকে তার নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, মিসর, সিরিয়া, পাকিস্তানসহ অনেক দেশের সরকারি প্রতিরক্ষা ক্রয়সংক্রান্ত পাওনা পরিশোধের অর্থ ওই সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সুইস ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।

দুদকে জমা দেয়া হিসাব বিবরণীতে মুসা দুদককে জানান, ঢাকার সাভার ও গাজীপুরে তার ১ হাজার ২০০ বিঘা জমি আছে। দেশে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ। এর মধ্যে গুলশান ও বনানীতে বাড়ির তথ্য দেন।

পরে দুদকের প্রতিবেদনে সবকিছু ‘ভুয়া’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ধনকুবের’ মুসার জালিয়াতি গাড়ি নিবন্ধনেও

যুক্তরাজ্য থেকে আনা একটি গাড়ি জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধন করে বিক্রির অপরাধে মুসা বিন শমসেরসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

সংস্থাটির পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর করা মামলায় ২ কোটি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৩৩ টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়।

এতে বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আইয়ুব আনসারী, ফারিদ নাবীর, মুসা বিন শমসের, তার শ্যালক ফারুক উজ জামান ও মেসার্স অটো ডিফাইনের মালিক ওয়াহিদুর রহমানকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল হক।

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন

গ্রামের নারীরা শহরমুখী কেন

গ্রামের নারীরা শহরমুখী কেন

গ্রামের নারীদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বেড়েই চলছে। ছবি: সংগৃহীত

গ্রামীণ নারীদের শহরমুখী হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এর মধ্যে নারীর কাজের মূল্যায়ন না করাটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।

মোহাম্মদপুর কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের ৫ নম্বর রোডের মুখে শীতকালীন পিঠা বিক্রি করেন রেজিয়া সুলতানা। বিকেল ৫টা থেকে বিক্রি শুরু হয়ে চলে রাত ১১টা; আবার কখনও তার থেকেও বেশি। হাউজিংয়ের সবাই রেজিয়ার কাছ থেকে পিঠা নেন। প্রতিদিনে তার বিক্রি বেশ ভালোই।

বগুড়ার তারাকান্দির মেয়ে রেজিয়া। স্বামী শহরে রিকশা চালাতেন। তিনি গ্রামে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকতেন। কৃষিকাজে দেবরকে সহযোগিতা করতেন। মাস ছয় হলো তিনি স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় চলে এসেছেন।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘গেরামে ধরেন, ভোর রাইত্তে ধইরা মাঝ রাইত পর্যন্ত কাম করতাম। এত জনের রান্ধা-বান্ধা, হাঁস-মুরগি। আবার মাঠের কাম। এত কিছু কইরাও অশান্তির শেষ আছিল না। জামাই যাইত মাসখানেক পরে পরে।

‘আমগোর গেরামের তানিয়া ঢাকায় থাকে। হের কথা হুইনা ঢাকাত আইছি জোর কইরা। এইহানে আমি অনেক বাসায় কাম করি। এই যে পিঠা বেচি। আল্লাহর রহমতে রাকিবের আব্বার থিকা বেশি আয় আমার মাসে। আমার টেকা এখন শ্বশুরবাড়িতেও যায়। এহন বুঝি যে নিজের একটা দাম আছে।'

রেজিয়া সুলতানার মতো এমন অনেক গ্রামীণ নারী শহরের দিকে ঝুঁকছেন। দিন দিন এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এই গ্রামীণ নারীদের শহরমুখী হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এর মধ্যে নারীর কাজের মূল্যায়ন না করাটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী; আর তার ৮৬ শতাংশের বাস গ্রামে। গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ নারীরা দিনের মোট সময়ের ৫৩ শতাংশ ব্যয় করে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে, যেখানে পুরুষরা ব্যয় করে ৪৭ শতাংশ সময়।

‘গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান’-এর ২০১২ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী। এর ৬৮ শতাংশ কৃষি, পোলট্রি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ ৪১ শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত। ৪৮ শতাংশ জড়িত মাছ চাষের সঙ্গে।

কৃষি খাতেই নারীর অংশগ্রহণ এখনও বেশি। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিপণন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজেই নারী অংশগ্রহণ করছে।

তারপরও তাদের এই অংশগ্রহণকে ‘পারিবারিক সহযোগিতা’ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে গ্রামীণ নারীরা শহরমুখী হচ্ছে। কৃষিতে নারীরা অধিক হারে অংশগ্রহণ করলেও কৃষক হিসেবে পরিবারে তাদের মূল্যায়ন করা হয় না এবং সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। তাদের অংশগ্রহণকে ধরা হয় পারিবারিক সহযোগিতা হিসেবে। কৃষি থেকে পারিবারিক আয়ে নারীদের ভাগ থাকে না। কৃষিতে নারীর কাজ হচ্ছে অবৈতনিক, কারণ এটিকে পারিবারিক শ্রম গণ্য করা হয়।’

নারীর শহরমুখী হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি আরও বলেন, ‘কৃষিঋণসহ সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা নারী কৃষকরা পান না। তা ছাড়া ভূমিতে নারীর সম-অধিকার নেই। বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও নারীরা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। তাদের জন্য বাজারে আলাদাভাবে কোনো জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখলে তাদের পণ্য বাজারজাতের সুবিধা বাড়বে। তাদের এখনও নিজেদের পণ্য বিক্রির জন্য স্বামীর নামে দোকান বরাদ্দ করতে হচ্ছে।

‘গ্রামীণ অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নিতে হলে তাদের জন্য একদিকে দরকার উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হলে তারা শহরমুখী না হয়েই নিজ নিজ গ্রামেই কর্মসংস্থানের সুযোগ নিজেরাই গড়ে তুলবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ফাতেমা রৌসন জাহান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গ্রামীণ নারীদের শহরমুখী হওয়াটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। গ্রামে নারীদের হাড়ভাঙা শ্রমকে শুধু পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। এটা আসলে নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে অনেক বড় একটা বাধা। যেকোনো শ্রমকে মূল্যায়ন করা উচিত। তা ছাড়া কাজের সেই সুযোগ বা জায়গা সেটিও নারীর জন্য স্পেসিফাইড না। আরও নানা কারণ রয়েছে, তবে এই যে অবমূল্যায়ন করার যে ব্যাপারটা, সেটাই আসলে মুখ্য কারণ নারীদের শহরমুখী হওয়ার।

আজ বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য: ‘সবার জন্য ভালো খাদ্য চাষ করেন গ্রামীণ নারী’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও উন্নয়ন সংস্থা।

পরিবার ও সমাজে গ্রামীণ নারীর অবস্থানের মূল্যায়ন করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এর আগে ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের চতুর্থ নারী সম্মেলনে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে জেনেভাভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উইমেনস ওয়ার্ল্ড সামিট ফাউন্ডেশন দিবসটি পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পালন করে।

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন

ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি হলেও নেমেছে অবস্থান

ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি হলেও নেমেছে অবস্থান

ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশ ২০১২ সালে ২৮.৬ স্কোর নিয়ে হলুদ ক্যাটাগরিতে ছিল। জিএইচআই-এর সূচকে এই হলুদ রংয়ের ক্যাটাগরি ‘সিরিয়াস’ বা বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ ২০০০ সাল থেকে এই ‘সিরিয়াস’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও দেশটি এখন আকাশি রংয়ের ‘মডারেট’ ক্যাটাগরিতে জায়গা করে নিয়েছে। ২০০০ সালের চেয়ে স্কোরে ১৪.৯ পয়েন্ট এগিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে (জিএইচআই) বাংলাদেশের স্কোরের বেশ উন্নতি হলেও সামগ্রিকভাবে তালিকায় গত বছরের চেয়ে এক ধাপ পিছিয়েছে। এ তালিকায় এবার বাংলাদেশ নেপালের সঙ্গে যৌথভাবে ৭৬তম স্থানে রয়েছে। এই সূচকে পাশের দেশ ভারত পিছিয়েছে ৭ ধাপ। এতে ১১৬ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১০১তম। গত বছর দেশটি ৯৪তম অবস্থানে ছিল।

ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশ ২০১২ সালে ২৮.৬ স্কোর নিয়ে হলুদ ক্যাটাগরিতে ছিল। জিএইচআই-এর সূচকে এই হলুদ রংয়ের ক্যাটাগরি ‘সিরিয়াস’ বা বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ ২০০০ সাল থেকে এই ‘সিরিয়াস’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও দেশটি এখন আকাশি রংয়ের ‘মডারেট’ ক্যাটাগরিতে জায়গা করে নিয়েছে। ২০০০ সালের চেয়ে স্কোরে ১৪.৯ পয়েন্ট এগিয়েছে বাংলাদেশ।

এই তালিকায় স্কোরের দিক থেকে সর্বোচ্চ পয়েন্ট পাওয়া দেশগুলোকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা লাল তালিকায় রাখা হয়। আর তালিকায় ভালো অবস্থায় থাকা দেশগুলো ঝুঁকির দিক থেকে কম পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে সবুজ রংয়ের ক্যাটাগরিতে।

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশ গত কয়েক বছর থেকেই এগোচ্ছে। ২০১৯ সালে একবারে ১৩ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ ৮৮তম স্থানে উঠে আসে। পরের বছর এ অবস্থান হয় ৭৫তম স্থানে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২০.৪, এবার সেটির আরও উন্নতি হয়ে স্কোর পয়েন্ট হয়েছে ১৯.১। তবে এবার স্কোরের দিক থেকে বাংলাদেশের উন্নতি হলেও তালিকায় নতুন করে ৯টি দেশ যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ নেমে হয়েছে ৭৬।

২০২০ সালে বিশ্ব ক্ষুধা সূচক তৈরি হয়েছিল ১০৭টি দেশকে নিয়ে। আর চলতি বছর ১১৬ দেশ নিয়ে তৈরি হয়েছে এ সূচক।

তালিকায় গত বছর ভারতের স্থান ছিল ৯৪তম, এবার দেশটির অবস্থান ১০১তম। তালিকায় ক্যাটাগরি বিবেচনায় দেশটি আছে হলুদ রংয়ের ‘সিরিয়াস’ বা বিপদজনক অংশে।

ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার এমনকি পাকিস্তানেরও নিচে।

সূচকে মিয়ানমার রয়েছে ৭১তম স্থানে, আর পাকিস্তানের অবস্থান ৯২তম।

২০০০ সালে ভারতের সূচক পয়েন্ট ছিল ৩৮ দশমিক ৮। তারপর ২০১২ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তা ২৭ দশমিক ৫ থেকে ২৮ দশমিক ৮ পয়েন্টের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

আইরিশ সাহায্য সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড এবং জার্মান সংগঠন ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফ-এর যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে।

চীন, ব্রাজিল এবং কুয়েতসহ ১৮টি দেশ পাঁচটির কম জিএইচআই স্কোর নিয়ে ইনডেক্সের শীর্ষস্থানে রয়েছে।

বিশ্ব ক্ষুধার সূচক তৈরি করা হয় মূলত চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যার মধ্যে অপুষ্টি একটি অন্যতম নির্ধারক মাপকাঠি।

পাশাপাশি যে দিকগুলো রয়েছে, তা হলো পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতার তুলনায় কম ওজন, উচ্চতা কী রকম ও শিশু মৃত্যুর হার।

জিএইচআই অনুমান বলছে, সারা বিশ্ব এবং বিশেষ করে ৪৭টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা কমিয়ে আনতে ব্যর্থ হবে। খাদ্য সুরক্ষা একাধিক ক্ষেত্র ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন

মঞ্চে ফেরা আনন্দের: আফজাল

মঞ্চে ফেরা আনন্দের: আফজাল

ছোট ও বড় পর্দার তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা আফজাল হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

সবশেষ প্রায় ২৪ বছর আগে ‘কেরামত মঙ্গল’ নামে একটি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। ওই নাটকের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন বাচ্চু। এরপর পেশাগত ব্যস্ততা ও ভালো গল্পের অভাবে আর মঞ্চ নাটকে অভিনয় করা হয়ে উঠেনি।

নির্মাতা, ছোট ও বড় পর্দার তুমুল জনপ্রিয় মুখ আফজাল হোসেন। প্রায় দুই যুগ পর তিনি ফিরছেন মঞ্চে। পেন্ডুলাম নামের নতুন এক নাটক দিয়ে মঞ্চে ফেরা হচ্ছে তার।

নাটকটির রচয়িতা নাট্যকার মাসুম রেজা। নির্দেশনা দিচ্ছেন খ্যাতিমান নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু।

৪৭ বছর আগে ঢাকা থিয়েটারের নাটক ‘বিদায় মোনালিসা’ দিয়ে মঞ্চে যাত্রা শুরু আফজাল হোসেনের। এরপর টানা অভিনয় করেছেন মঞ্চে।

সবশেষ প্রায় ২৪ বছর আগে ‘কেরামত মঙ্গল’ নামে একটি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। ওই নাটকের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন বাচ্চু। এরপর পেশাগত ব্যস্ততা ও ভালো গল্পের অভাবে আর মঞ্চ নাটকে অভিনয় করা হয়ে উঠেনি।

দীর্ঘ প্রায় ২৪ পর মঞ্চে ফেরা নিয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন আফজাল।

তিনি বলেন, ‘একটা সময় নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় করতাম। এরপর পেশাগত কারণে আর ওইভাবে সময় দেয়া হতো না; যেতেও না। কারণ মঞ্চে অভিনয়ের জন্য তো প্রচুর সময় লাগে।

‌‘আমার প্রধান দুর্বলতম বিষয় ছিল অভিনয় এবং মঞ্চের জন্য আলাদা একটা টান তো ছিলই। কারণ মঞ্চই তো আমার আলাদা একটা পরিচয় তৈরি করে দিয়েছিল।’

অনেক বছর ধরেই মঞ্চে অভিনয়ের পরিকল্পনা ছিল জানিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, ‘অনেক বছর ধরেই পরিকল্পনা ছিল আবার মঞ্চে অভিনয় করব, কিন্তু প্রোপার ক্রিপ্ট ও সে রকম কোনো কিছু হয়তো মেলে নাই। অনেক দিন পর একটা ভালো স্ক্রিপ্ট ও স্পেশাল কিছুর জন্য নাটকটি করা।

‘স্পেশাল বলতে ঢাকা থিয়েটার এবং দেশ নাটক দুটি দল একসঙ্গে নাটকটি প্রযোজনা করছে। সব মিলিয়ে ইন্টারেস্টিং একটা বিষয়। সেই কারণেই আবার মঞ্চে অভিনয় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যাকে আমরা নাট্যগুরু ভাবি, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, তিনি এই নাটকের ডিরেকশন দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে আমার জন্য আনন্দের বিষয়; ভালো লাগার বিষয়।’

মঞ্চে ফেরা আনন্দের: আফজাল
‘পেন্ডুলাম’ নাটকের মহড়ায় বাঁ থেকে নাজনীন চুমকি, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু (মাঝে) ও আফজাল হোসেন (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

পেন্ডুলাম নাটকটির গল্প নিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, ‘এটা মূলত আমাদের যে শহরে সোসাইটি...আমরা তো প্রত্যেকেই মফস্বল থেকে আসি। এরপর জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা তো বহু কিছু করি। তারপর কী হয়? একটা সময় বহু কিছুতে আমাদের সব পাওয়া পূর্ণ হয় বলে মনে করি। আমরা যখন একদম একটা মানুষ পরিচয়হীন অবস্থায় পরিচয়ের সন্ধানে শহরে আসি, তারপর নানা কিছু করি, একটা পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করি।

‌‘অনেক কিছু করি; এটায় আমার সাফল্য আসবে, ওইটায় আমার সাফল্য আসবে। সব পাওয়া হয়, তারপর শেষমেশ কি মনে হয় সব পাওয়া হলো? এটা এমন কোনো অসাধারণ বিষয় না; যেকোনো মানুষের গল্প। গল্পটা হচ্ছে এই, আমরা যে জীবনটা যাপন করি স্বার্থসিদ্ধির জন্য, ভালোর জন্য, জীবন উপভোগের জন্য, এগুলো একটা সময় যে কী হয়ে ফেরত আসে, সেই চিত্রটা দেখানো হবে।’

মঞ্চে ফেরা আনন্দের: আফজাল
‘পেন্ডুলাম’ নাটকের মহড়ায় আফজাল হোসেন ও নাজনীন চুমকি। ছবি: সংগৃহীত

নাটকটি ডিসেম্বরের শেষে মঞ্চে আসবে বলে জানালেন নাট্যকার মাসুম রেজা।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকটির মহড়া করছি। আগামী ডিসেম্বরে নাটকটি মঞ্চস্থ হবে। তবে হল বুকিংয়ের আগে তারিখ ঘোষণা করতে পারছি এখন।’

নাটকে আরও অভিনয় করছেন নাজনীন চুমকি, কামাল আহমেদসহ অনেকে।

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন

পূজার নিরাপত্তাকর্মীর খাবার দিচ্ছে মাদ্রাসা

পূজার নিরাপত্তাকর্মীর খাবার দিচ্ছে মাদ্রাসা

খাগড়াছড়ির নারায়ণ মন্দির ও বোয়ালখালীর ইসলামিয়া মাদ্রাসা হেফজখানা। ছবি: নিউজবাংলা

বোয়ালখালী মাদরাসার পরিচালক মাওলানা আব্দুল্লাহ মেহেরী বলেন, ‘আমাদের ধর্ম ও নবীজী বলেছেন, প্রত্যেক ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। মাদরাসায় দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এমন সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমিও খুশি। দুর্গা পূজা কিংবা রাস উৎসবসহ মন্দিরের প্রতিটি উৎসবে যদি আমাদের কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন পড়ে, আমরা দিয়ে থাকি।’

শারদীয় দুর্গোৎসবে একটি মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। অনন্য সম্প্রীতির এমন নিদর্শন পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালায়।

শুধু এবার নয়, ২১ বছর ধরে এমন ধারাবাহিকতা রেখেছে দীঘিনালার বোয়ালখালীর ইসলামিয়া মাদরাসা হেফজখানা ও এতিমখানা।

দুর্গা পূজার পাশাপাশি হিন্দুদের রাস উৎসব ও মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিল অনুষ্ঠানেও সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।

দীঘিনালার বোয়ালখালী এলাকায় রাস্তার এক পাশে নারায়ণ মন্দিরে চলছে শারদীয় দুর্গোৎসব। রাস্তার অন্য পাশেই বোয়ালখালী ইসলামিয়া মাদ্রাসা হেফজখানা ও এতিম খানা। দুই সম্প্রদায়ের দুই প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি হলেও সব কিছুই সেখানে স্বাভাবিক। প্রতিবেশীর মতো একে অপরের সহায়তায় দাঁড়িয়েছে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

বোয়ালখালী নারায়ণ মন্দিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন পুলিশের পাঁচ সদস্য। দায়িত্বে থাকা পুলিশের সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) মো. খলিলুর রহমান নিউজবাংলাকে জানান, সম্প্রীতির অনন্য নজির দেখে তিনি বিস্মিত। পুলিশ সদস্যদের প্রতি বেলার খাবার আসছে মাদরাসা থেকে।

বোয়ালখালী নারায়ণ মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি মৃদুল কান্তি সেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মন্দির ও মাদারাসার পাশাপাশি এ সহাবস্থান ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। আমাদের বিভিন্ন উৎসব ও পূজায় সহযোগিতা করছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। মাদরাসার বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও আমরা যাই।’

বোয়ালখালী মাদরাসার পরিচালক মাওলানা আব্দুল্লাহ মেহেরী বলেন, ‘আমাদের ধর্ম ও নবীজী বলেছেন, প্রত্যেক ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। মাদরাসায় দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এমন সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমিও খুশি। দুর্গা পূজা কিংবা রাস উৎসবসহ মন্দিরের প্রতিটি উৎসবে যদি আমাদের কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন পড়ে, আমরা দিয়ে থাকি। এ ছাড়া মাদরাসায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তারা (হিন্দু সম্প্রদায়) এগিয়ে আসেন।’

দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কাশেম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ উপজেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদীর্ঘ কাল ধরে অটুট। প্রতিটি উৎসব এখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে সার্বজনীন রূপ পায়।’

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন

পুলিশে মাদক ঠেকাতে রোলকল

পুলিশে মাদক ঠেকাতে রোলকল

পুলিশ সদস্যদের মাদকাসক্তি ঠেকাতে নিয়মিত রোলকলের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

রোলকলের উদ্দেশ্য হলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একটি ইউনিটের পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং কেউ মাদক গ্রহণ করে এলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সদস্যদের মাদকাসক্তি ঠেকাতে নিয়মিত রোলকলের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে এই কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি ইস্যু করেছে সদর দপ্তর।

গত ৭ অক্টোবর ডিএমপির প্রফেশনাল স্টান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়।

রোলকলের উদ্দেশ্য হলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একটি ইউনিটের পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কেউ মাদক গ্রহণ করে এলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া।

পাশাপাশি মাদকের সঙ্গে কেউ যেন জড়িয়ে না যায় সে জন্য সতর্ক করা এবং মাদক থেকে সদস্যদের দূরে রাখতে অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্যই এই রোলকল করা হবে।

নির্দেশনা পাওয়ার পর ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিটে তা চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ইউনিট-প্রধানরা।

ডিএমপি রমনা বিভাগের উপকমিশনার সাজ্জাদুর রহমান জানান, তার ইউনিটে আগে থেকেই রোলকল চালু ছিল। এই চিঠি পাওয়ার পর গতি বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘রোলকলের মাধ্যমে যেখানে যে ইউনিট থাকে তার হাজিরা নেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, কার কী ডিউটি তা শুনানো হয়। তৃতীয়ত, কারও কোনো সমস্যা আছে কি না দেখা হয়। থানাতে ওসি থেকে শুরু করে এসি, এডিসিরা উপস্থিত থাকেন। কখনও কখনও ডিসিরা যান।

‘এই চিঠির মর্ম হলো, আমাদের সিনিয়র অফিসাররা যেন নিশ্চিত করে যে, ফোর্সের সবাই উপস্থিত আছে। যাদের ডিউটি নেই তারাও যেন থাকে। এবং তাদের যাতে ব্রিফ করা হয় যে, তোমরা মাদকের সঙ্গে যুক্ত হইও না।’

বিভিন্ন ইউনিট তাদের নিজেদের সুবিধামতো সময়ে এই রোলকলটি করে থাকে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঊর্ধ্বতনদের নিয়মিত তদারকির ফলে পুলিশে কেউ মাদক নিলে সেই প্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করে ডিএমপি।

তবে চিঠিটি গত ৭ অক্টোবর ইস্যু করা হলেও একাধিক ইউনিট তা এখনও পায়নি বলে জানিয়েছেন ইউনিট-প্রধানরা।

চিঠি না পেলেও রোলকল প্রক্রিয়া আগে থেকে চালু রয়েছে বলে জানান গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মো. আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের নিয়মিত প্রক্রিয়া। রোলকলের মাধ্যমে আমরা অফিসার ও সদস্যদের কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কী করা যাবে, কী করা যাবে না- এসব বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়, আলোচনা হয়।

‘মাদক সেবন থেকে বিরত রাখার জন্য নিয়মিত রোলকলটা হলো- এই সময়ে মাদকের কুফল, মাদকের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ত না হওয়ার বিষয়গুলো সবার সঙ্গে আলোচনা করা, সতর্ক করা।’

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন

দেশে খাদ্যমান নির্ধারণ নিয়েই প্রশ্ন

দেশে খাদ্যমান নির্ধারণ নিয়েই প্রশ্ন

মান মেনে ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: প্রতীকী

বিএসটিআইয়ের মান উইংয়ের উপপরিচালক (কৃষি ও খাদ্য) গোলাম মো. সারোয়ার বলেন, ‘খাদ্যমান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আবহাওয়া-জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে মানুষের খাদ্যমান গ্রহণের তারতম্য ভিন্ন হয়। তাই বিডিএস বাংলাদেশের জন্যই করা হয়। অন্য দেশ সেটি গ্রহণ করতেও পারে আবার নাও পারে। অন্য দেশের খাদ্যমান গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান অভিন্ন রকমের।’

খাদ্যকে স্বাভাবিক, ভেজাল ও অন্যান্য দূষণ থেকে নিরাপদ অবস্থায় বিতরণ এখন বিশ্বব্যাপীই একটি সমস্যা। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছাড়াও নানা কারণে খাদ্য তার মান হারাতে পারে। উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন, খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়ার যেকোনো পর্যায়ে খাদ্য খাবারের অনুপযোগী হতে পারে।

এসব কারণে নানা ধরনের রোগ সৃষ্টির জন্য খাবারকেই দায়ী করা হয়। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। অধিকাংশ খাদ্যসামগ্রী অনিরাপদ বা বিভিন্ন মাত্রায় ভেজালযুক্ত। খাদ্য প্রস্তুত করা থেকে তা খাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এ সমস্যা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে আমরা বুঝব, যে খাবার খাচ্ছি তা মানসম্মত কি না কিংবা রাসায়নিক মেশানো বিষ কি না?

দেশে কৃষি ও শিল্পজাত খাদ্যপণ্যের নিরাপদ মান নিয়ে সংশয়ের এমন সময় আজ পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মান দিবস’। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘শেয়ার ভিশন ফর এ বেটার ওয়ার্ল্ড: স্ট্যান্ডার্ডস ফর এসডিজিস’ বা ‘সমন্বিত উদ্যোগে টেকসই উন্নত: বিশ্ব বিনির্মাণে মান’।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিএসটিআই নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপন করছে দিবসটি।

খাদ্যমান সুরক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে এর মান বজায় রাখা। তাই বিশ্বের সব দেশেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে খাদ্য বা খাদ্যপণ্যের মান বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে থাকে। ফলে ভোক্তারা কোনো রকম ঝুঁকি ছাড়াই সেসব গ্রহণ করতে পারেন।

বাংলাদেশে খাবারের মান নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।

বিএসটিআইয়ের স্ট্যান্ডার্ড ক্যাটালগ ২০২০ অনুযায়ী ৪ হাজার ৮টি পণ্যের বাংলাদেশে জাতীয় মান (বিডিএস) নির্ধারণ করা আছে; যা এখন প্রচলিত। এর মধ্যে কৃষি ও খাদ্যজাত ৬১১টি পণ্যের মান নির্ধারণ করা আছে। বাধ্যতামূলক খাদ্যমান নির্ধারিত পণ্যের সংখ্যা ৮৮টি। বাকিগুলো ব্যবহার্য পণ্য।

খাদ্যপণ্যের বাংলাদেশ মানটি (বিডিএস) নির্ধারণ করে বিএসটিআইয়ের মান উইং। এ শাখাটি বিভাগীয় কমিটির মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় মান প্রণয়নের কাজ করে।

জাতীয় স্বার্থে ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সময়ের প্রয়োজনে প্রণীত বাংলাদেশ মানগুলো ৫ বছর পর পর পুনরায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানের পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়।

মানের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি নিয়ে জনমনে সৃষ্ট সংশয় দূর করার মতো আস্থাও অর্জন করেছে বিএসটিআই। সংস্থাটি ১৯৭৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মান সংস্থা আইএসওর সদস্য। ২০০১ সাল থেকে আইইসি অ্যাফিলিয়েট সদস্য এবং ২০১২ সাল থেকে আইইসি অ্যাফিলিয়েট প্লাস সদস্যপদ লাভ করে।

মান নির্ধারণে দুর্বলতা থাকলে বিশ্বের কোনো মাননির্ধারণী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক এসব সংস্থাগুলোর সদস্য পদ লাভ করতে পারে না।

বিএসটিআইয়ের মান উইংয়ের উপপরিচালক (কৃষি ও খাদ্য) গোলাম মো. সারোয়ার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মান নির্ধারণে বিএসটিআইয়ের একটি টেকনিক্যাল কমিটি আছে। এর মাধ্যমে পণ্য ও সেবার মানগুলো নির্ধারণ করা হয়। পাঁচটি স্ট্যান্ডার্ড মেথডের ওপর বাংলাদেশ মান নির্ধারণ করে।

‘মেথডগুলো হলো প্রোডাক্ট স্পেসিফিকেশন, মেথডস অফ-টেস্ট, কোড অফ প্র্যাকটিস গাইডলাইনস ও টারমিনোলজি-ভোকাবোলারি, গ্লোসারি অফ টার্মস এবং বেসিক স্ট্যান্ডার্ডস।’

তিনি দাবি করেন, খাদ্যমান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আবহাওয়া-জলবায়ু এবং এ ধরনের ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে মানুষের খাদ্যমান গ্রহণের তারতম্য ভিন্ন হয়। তাই বিডিএস বাংলাদেশের জন্যই করা হয়। অন্য দেশ সেটি গ্রহণ করতেও পারে আবার নাও পারে। অন্য দেশের খাদ্যমান গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান অভিন্ন রকমের।’

রপ্তানি হওয়া পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রপ্তানির বিষয়টি আবার ভিন্ন। যে দেশ আমদানি করবে তারা কিছু বাড়তি রিকোয়ারমেন্ট দিতে পারে। রপ্তানি করতে হলে সেগুলো ফুলফিল করেই রপ্তানি করতে হবে।

‘এ ক্ষেত্রে কোনো পণ্যের চালান দেশে ফিরে এলে সেগুলো দেশে বিক্রি হতে বাধা নেই, কারণ ওই মান আগে থেকেই দেশের উপযোগী করেই তৈরি করা। আমদানীকৃত দেশ কী কারণে নিল না সেটি তাদের বিষয়। কিন্তু আমাদের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করলে আমরা বলব খাদ্যমান আমাদের উপযোগী।’

‘আসলে জাতীয় মান উন্নয়ন, সংশোধন, প্রত্যাহার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া’ -যোগ করেন গোলাম মো. সারোয়ার।

বিএসটিআই ছাড়াও ভোক্তার কাছে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছাতে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করছে আরেক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া দেশে প্রায় এক ডজন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খাদ্যমান বজায় রাখার কাজে নিযুক্ত।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (নিরাপদ খাদ্য প্রমিতকরণ ও প্রত্যয়ন সমন্বয়) বিভাগের পরিচালক আবু সাইদ মো. নোমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেশে খাদ্যমান নির্ধারণের মূল কাজটি করে বিএসটিআই। তবে তারা নিজেরা এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ জন্য বহুস্তরের লোকের ও বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত নিতে হয়। সেসব করে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই মান নির্ধারণ হয়।’

তাদের ভূমিকার কথা জানিয়ে বলেন, ‘কোনো খাদ্যপণ্যের মান নির্ধারণের প্রয়োজন হলে বিএসটিআই গঠিত কমিটিতে অংশীজন হিসেবে থাকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তবে বিএসটিআই খাদ্যমানের বিষয়ে আগে আমাদের কাছে একটা ড্রাফট পাঠায়। ওই ড্রাফট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটিতে মতামত দিই।’

তিনি আরও জানান, তাদের লক্ষ্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। তাই মান নির্ধারণী সংস্থা বিএসটিআইর কাছে মতামত দেয়ার আগে প্যাকেজিং রুলস বা নিরাপদ খাদ্য প্রবিধান, টক্সিন রুলস প্রবিধান, লেভেলিং রুলস বা নিরাপদ খাদ্য প্রবিধান এবং নিরাপদ খাদ্যপ্রবিধান অনুযায়ী মতামত দিয়ে থাকে।

মান নির্ধারণের যত ধাপ

বিএসটিআইয়ের মান উইং পাঁচটি বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত। বিভাগগুলো হলো কৃষি ও খাদ্য, রসায়ন, পাট ও বস্ত্র, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস এবং প্রকৌশল।

এসব বিভাগের অধীনে আবার ছয়টি বিভাগীয় কমিটি কাজ করে। সেগুলো হলো কৃষি ও খাদ্য, রসায়ন, পাট ও বস্ত্র, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশল (যন্ত্র) এবং প্রকৌশল (পুর) বিভাগীয় কমিটি।

এই ছয়টি বিভাগীয় কমিটির অধীনে আবার ৭২টি কারিগরি কমিটি (শাখা কমিটি) থাকে। এসব কমিটির মাধ্যমে জাতীয় মান প্রণয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে বিএসটিআই।

সাধারণত, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, বণিক সমিতি, ক্যাব ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক ও বিশেষজ্ঞসহ পণ্যের উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সমন্বয়ে এসব শাখা কমিটি গঠন করা হয়।

আরও পড়ুন:
ডিসি সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়বে না দুই বছর

শেয়ার করুন