অতিকায় সেসব গরু এখন গলার কাঁটা

অতিকায় সেসব গরু এখন গলার কাঁটা

রাজধানীর ধামরাইয়ের ‘কালো পাহাড়’ নিয়ে এখন বিপাকে মালিক। ছবি: নিউজবাংলা

নিউজবাংলায় যেসব গরুর বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল, তার মধ্যে ৯টির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিক্রি হয়েছে ৩টি। প্রথমে ক্রেতারা যে দাম বলেছিলেন, এখন সেই দামও বলছেন না কেউ। তবে এক বিক্রেতা তুলনামূলক কম দাম চাওয়ার পর বিক্রি করতে পেরেছেন তার তিনটি গরুই।

কোরবানির মৌসুমে বেশ কিছু গরু বিশাল আকারের কারণে সংবাদে জায়গা করে নিয়েছে। ২৭ থেকে ৩৫ মণ ওজনের এসব গরু ১২ থেকে ৩০ লাখ টাকায় বিক্রির আশায় ছিলেন মালিকরা।

তবে সেসব গরুর বেশিরভাগই বিক্রি হয়নি। সেগুলো বিক্রি হয়েছে তার দামও পড়েছে হাঁকানো দামের অনেক কমে। কারণ, মালিকরা যে দাম বলছেন, তার ধারে কাছেও বলছেন না ক্রেতারা।

গত দুই সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে অতিকায় বিভিন্ন গরুর তথ্য। নিউজবাংলাও বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে নয়টি গরুর বিক্রির তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, বিক্রি হয়েছে তিনটি। বাকিগুলো এখন অনেক কমে বেচতে চান মালিকরা। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না।

আবার যে তিনটি বিক্রি হয়েছে, সেগুলো মালিকরা তুলনামূলক কম দাম চেয়েছিলেন। তবে যে দাম তারা প্রত্যাশা করেছিলেন, বিক্রি হয়েছে তারও বেশ কমে।

এসব গরু দেখতে আকর্ষণীয় হলেও মালিকরা যে দাম চাইছিলেন প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই তা অস্বাভাবিক। ওজন হিসাব করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাংসের কেজি তিন হাজার টাকার বেশি হয়ে যায়।

যেমন ময়মনসিংহের ৩৬ মণের একটি গরুর দাম মালিক চাইছিলেন ২৫ লাখ টাকা। গরুর ওজনের অর্ধেক যদি মাংস পাওয়া যায়, তাহলে প্রতি কেজির দাম পড়ে তিন হাজার টাকার বেশি।

স্বাভাবিক বাজার দরের চেয়ে কোরবানির বড় পশুর মাংসের দাম কিছুটা বেশি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এতটা বেশি দাম পড়া ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ বাজারে গরুর মাংসের দাম এখন ৬০০ টাকার আশেপাশে।

‘বাহাদুর’ ও ‘কালো’ মানিকের দামে হতাশ মালিক

ময়মনসিংহে ফ্রিজিয়ান জাতের দুই ষাঁড় ‘বাহাদুর’ ও ‘কালো মানিক’কে নিয়ে ছিল তুমুল আলোচনা। তবে পর পর দুই বছর হতাশ হতে হয়েছে মালিককে। কারণ, তার প্রত্যাশিত দাম কেউ বলেনি আর প্রথমে যে দাম একজন প্রস্তাব করেছিলেন, এখন সেই দামেও কাউকে গছাতে পারছেন না।

হালুয়াঘাট উপজেলার ১১ নম্বর আমতৈল ইউনিয়নের নাগলা বাজার এলাকার এবাদুল ইসলামের ষাঁড় ‘বাহাদুর’। গত বছর ১৫ লাখ টাকা দাম ওঠায় বিক্রি করেননি। এক বছরে আরও বড় ও আকর্ষণীয় হওয়ায় এবার জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দাম ওঠেছিল ১৭ লাখ টাকা।

অতিকায় সেসব গরু এখন গলার কাঁটা
ময়মনসিংহে ফ্রিজিয়ান জাতের দুই ষাঁড় ‘বাহাদুর’ ও ‘কালো মানিক’। ছবি: নিউজবাংলা

এবাদুল দর হাঁকেন ২৫ লাখ টাকা। ভেবেছিলেন, ঈদের আগ মুহূর্তে ১৭ লাখের চেয়ে দাম বেশি বলবে কেউ। তবে তার আশা পূরণ হয়নি। এখন ১৭ লাখ টাকায় বিক্রি করতে রাজি হলেও সাড়া দিচ্ছেন না ক্রেতারা।

এবাদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরম যত্নে ষাঁড়টি এত বড় করেছি। ষাঁড়টির উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট, লম্বায় সাত ফুট ও দাঁত আটটি। ওজন প্রায় ৩৬ মণ।

‘অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম এবার ন্যায্য দাম পাব। তাই প্রথমে ১৭ লাখ টাকা দাম হলেও বিক্রি করিনি। এখন শেষ মুহূর্তে একটু পর পর ক্রেতারা দামাদামি করছেন। তবে এখন সবাই দাম কম বলতেছে৷’

তিনি বলেন, ‘বড় ষাঁড়ের চাইতে মাঝারি আকারের ষাঁড় বিক্রি হচ্ছে বেশি। রাত পর্যন্ত দেখব দাম কত ওঠে। যদি ১৭ লাখ টাকাও কেউ বলে তবে বিক্রি করে দেব। নয়ত আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব।’

এবাদুল জানান, প্রতিদিন বাহাদুরকে খড়, কলা, ভুসি, খুদ ও ভুট্টা খাওয়াতে ৫০০ টাকার। এভাবে মাসে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা। আর বছরে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। কোরবানিতে বিক্রি না হলে বছরের বাকি সময়ে এই ষাঁড় কেউ কিনবে কি না আর কিনলেও এই দাম পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে তিনি।

ত্রিশাল উপজেলার ১ নম্বর ধানীখোলা ইউনিয়নের জাকির হোসেন সুমন বিপাকে ‘কালো মানিক’কে নিয়ে। চার বছর ধরে ষাঁড়টি পালছেন। এর উচ্চতা ছয় ফুট ও লম্বায় ১০ ফুটের বেশি। ওজনও ৩৭ মণের বেশি।

সারা শরীর কালো রঙের ষাঁড়টি দেখতেও আকর্ষণীয়। গত বছর সুমন এর দাম চেয়েছিলেন ২০ লাখ টাকা। তবে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় বিক্রি করেননি। এবার দাম চাচ্ছেন ৩০ লাখ। এখনও চলছে দামাদামি। তবে এখন পর্যন্ত দাম উঠেছে ১২ লাখ।

ষাঁড়টির মালিক সুমন বলেন, ‘হাটে গরুর অভাব নেই। একেকজন একেক দাম করে চলে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে বিক্রি করলেও মন মতো দাম পেতাম। এখন ক্রেতার চেয়ে গরু বেশি।

‘হাটে থাকা ষাঁড়ের মধ্যে আমারটার ওজন ও রঙ সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এরপরও কম দামে ছোট গরুর দিকেই সবার দৃষ্টি। রাত পর্যন্ত সর্বোচ্চ দাম যিনি দেবেন, তার কাছেই বিক্রি করে দেব। তবে দাম একেবারেই কম হলে বিক্রি করব না।’

ত্রিশাল উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে ৭৫০টি গরুর খামার রয়েছে। গরুর কোনো কমতি নেই। এজন্য অনেকে গরুর হাটে না গিয়ে খামার থেকে গরু কিনছেন।

‘সবাই আশপাশ থেকেই গরু কিনতে পারছেন। আর তাই এই উপজেলায় বাড়তি দামে কেউ গরু কিনছেন না।’

‘সাকিব’ ও ‘ডিপজল’ এ আগ্রহ নেই

টাঙ্গাইলের ‘সাকিব’ ও ‘ডিপজলকে’ বাছুর অবস্থা থেকেই পালছেন বাসাইল উপজেলার জোবায়ের ইসলাম জিসান। দাম কম উঠায় ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ষাঁড় দুটিকে বিক্রি করেননি তিনি।

এবার ষাঁড় দুটি যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ মণ ওজনের। তাই প্রতিদিন হাটে নিয়ে যাওয়াটা অনেক কষ্টের। ভেবেছিলেন অনলাইনের মাধ্যমেই বিক্রি করাটা সহজ হবে। এ ছাড়া একাধিক হাট ঘুরে দেখেন, এবার গরুর দামও অনেক কম। তাই হাটে তোলেননি তিনি।

তিনি বলেন, ‘অনলাইনের মাধ্যমে যে ওদের দাম বলেনি তাও কিন্তু না। দাম উঠেছিল ৭ লাখ টাকা। তবে আমাদের খরচের সাথে দামের মিল হয়নি দেখে আর বিক্রি করিনি।’

জিসান আরও বলেন, ‘যেহেতু আমি ওদের ক্ষতিকারক কোনো খাবার খাওয়াইনি, তাই আল্লাহর রহমতে আমার অতটা ভয় নেই যে, গরুগুলো স্ট্রোক করতে পারে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শে সব প্রাকৃতিক খাবার খাওয়াইছি।

অতিকায় সেসব গরু এখন গলার কাঁটা
টাঙ্গাইলের ‘সাকিব’ ও ‘ডিপজল’

‘আর ওরা এখনও অনেক ছোট, মাত্র আড়াই বছরের দুই দাঁতের ষাড়। এবার যদি বিক্রি না হয়, তাহলে আগামী বছরও বিক্রি করতে পারব। তবে কিছু সময় যেহেতু আছে, খরচের মূল্যে যদি উঠে যায় তাহলে বিক্রি করে দিব।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রৌশনী আকতার বলেন, “আমরা আমাদের অনলাইন ‘গরুর হাট’ পেজে দিয়েছিলাম গরু দুটোকে বিক্রি করতে। দামও করেছিল অনেকেই। কিন্তু ওদের না পোষানোয় বিক্রি করেনি।

‘গরুগুলোর বয়সও কম হওয়ায় আগামীতে বিক্রি করতে পারবে। যেহেতু ষাঁড় দুটোকে ওরা বাজে কিছু খাওয়ায়নি তাই ভয়েরও কিছু নেই। আগামী ঈদে দেখা যাবে, আরও ভালো দামে বিক্রি করতে পারবে।’

গাবতলীর হাটে ‘কালো পাহাড়’ নিয়ে বিপাকে শাহজাহান

কোরবানির ঈদে পশু বেচা-কেনা শুরুর আগ থেকেই রাজধানীর ধামরাইয়ের ‘কালো পাহাড়’ ছিল আলোচনায় ছিল। ৩৫ মণের ষাঁড়টি দেখতে প্রতিদিন ধামরাইয়ের বাইশাকান্দা ইউনিয়নে মালিক শাহজাহান মিয়ার বাড়িতে ভিড় করত মানুষ।

মানুষের আগ্রহ থাকলেও ১২ লাখ টাকা দাম হাঁকানো ষাঁড়টি বিক্রি করতে পারেননি শাহজাহান। গত বছর গরুটি সাড়ে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি হলেও বন্যার কারণে ক্রেতারা নিয়ে যেতে পারেননি। আরও এক বছর পালার পর এবার দাম উঠেছে সর্বোচ্চ ছয় লাখ টাকা।

শাহজাহান জানান, ‘বাইত্তে কালা পাহাড়রে বেচবার পারি নাই। পরে ৮-১০ জন মিইল্লা গাবতলী হাটে নওয়া আইছি গত শুক্কুরবার। ৪ হাজার ৫০০ ট্যাকা খালি ট্রাক ভাড়াই লাগছে। অ্যার আগে একজন ছয় লাখ ট্যাকা দাম কইছিল। আমি দেই নাই। পরে আর কেউই পাঁচ লাখ ট্যাকাও দাম কয় না।’

শাহজাহান আরও বলেন, ‘হাটে বড় গরুর চাহিদা একবারেই নাই। এহন সাড়ে ৫ লাখ হইলে ছাইড়া দিমু। চার দিন ধইরা হাটে আমরা তিনজন আইছি। ডেইলি আমগোই খাওন আছে এক হাজার ট্যাকার। আর বেচা না হইলে বাইত্তে নেয়া লাগব আর কী করার?’

উত্তরাঞ্চলের সেরা ‘নয়া দামান’ নিয়ে খুব চিন্তিত খামারি

গাইবান্ধায় ৩০ মণের ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড় ‘নয়া দামান’-এর মালিক সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মাদরাসা শিক্ষক আবুল কাশেম মাস্টার। তিনি এর দাম চেয়েছিলেন ১৫ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দাম উঠেছে ৮ লাখ টাকা।

করোনা মহামারিতে নিজ এলাকায় পশুর হাট না হওয়ায় ‘নয়া দামান’-কে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কাশেম। জানান, প্রতিদিন পশুটির খাবারের জন্য ব্যয় হয় দুই হাজার টাকার বেশি।

অতিকায় সেসব গরু এখন গলার কাঁটা

তিনি বলেন, ‘খুব চিন্তিত আচি। তবে এটা যাতে অনলাইনে বিক্রি করা যায় সেই চিন্তা-ভাবনা করতিচি। এর আগে ক্রেতা ৮ লক্ষ টাকা দাম বলচি। আমি দেই নাই।’

যৌক্তিক মূল্য চেয়ে বেচা গেল ‘প্রেমকুমার’ ‘মাস্তান’দের

সিলেট নগরের উপকণ্ঠের খাদিম এলাকায় ‘আল্লার দান ডেইরি এগ্রো ফার্ম’-এ ছিল বিশাল আকৃতির ‘প্রেমকুমার’ এবং ‘কালো মাস্তান’ ও ‘সাদা মাস্তান’। খামারের মালিক আব্দুছ ছাত্তার লাভলু এই তিনটি ষাঁড়সহ বিক্রি করছেন ২৫টি পশু।

এরমধ্যে তামাটে রঙয়ের মধ্যে সাদা ছোপের ‘প্রেমকুমার’ বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকায়। ‘সাদা মাস্তান’ ও ‘কালো মাস্তান’ বিক্রি হয়েছে প্রতিটি ৫ লাখে।

লাভলু জানান, এই তিন ষাঁড়ের প্রতিটির ওজন সাড়ে ৭০০ থেকে সাড়ে ৮০০ কেজি। এর মধ্যে প্রেমকুমার দেশি সাওয়াল জাতের। দুই মাস্তান ফিজিয়ান জাতের। ‘প্রেমকুমারের’ দাম চেয়েছিলেন সাড়ে পাঁচ লাখ আর দুই মাস্তানের প্রতিটির জন্য ছয় লাখ টাকা।

তিনি বলেন, ‘করোনার সময়ে অন্য ব্যবসা নিয়ে সংকটে আছি। তবে গরুর ব্যবসা ভালোই হয়েছে। এখন তো সকলেই সংকটে আছে। মানুষের হাতে তেমন টাকা পয়সা নেই। তারপরও আমি ভালোই ব্যবসা করেছি। লাভও হয়েছে।’

অতিকায় সেসব গরু এখন গলার কাঁটা
যৌক্তিক মূল্য চাওয়ায় সহজেই বিক্রি হয়েছে সিলেটের ‘প্রেমকুমার’ ও ‘মাস্তানরা’। ছবি: নিউজবাংলা

তিনি জানান, তার গরুগুলো হাটে নিতে হয়নি। খামারে এসেই ক্রেতারা গরু নিয়ে গেছেন। কয়েকদিন আগেই সবগুলো গরু বিক্রি হয়ে গেছে।
লাভলু খামারটি শুরু করেন ২০১৮ সালে। তিন বছর আগের বাছুরগুলোই এখন এখন বিরাট ষাঁড়ে পরিণত হয়েছে। ব্যতিক্রমী নামের তার ষাঁড়গুলোর নিয়ে গত ৮ জুলাই নিউজবাংলায় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তার খামারের সব গরু বিক্রি হয়ে যায়।

লাভলু বলেন, ‘প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে এগুলো লালন-পালন করছি। সম্পূর্ণ দেশীয় জাতের খাবার খাইয়েছি। সাদা মাস্তান ও কালো মাস্তানের দাম চেয়েছিলাম ৬ লাখ টাকা। আর প্রেমকুমারের দাম সাড়ে ৫ লাখ টাকা।

‘তবে দরদামের পর ও বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় কিছুটা কমেই বিক্রি করতে হয়েছে। তবে আমার কোনো লোকসান হয়নি। বরং কিছুটা লাভই হয়েছে।’

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন

মন্তব্য

পাহাড়ে শান্তি না ফেরার কারণ কী

পাহাড়ে শান্তি না ফেরার কারণ কী

পাহাড়ের বাসিন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী মনে করছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত বাড়ার পেছনে মূল কারণ সংগঠনগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও চাঁদার ভাগ-বাটোয়ারা।

শান্তি চুক্তির দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনও বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে শান্তি ফেরেনি। পাহাড়ে গুম, খুন, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। সহিংসতার ভয়ে কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছেন।

চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে সরকার ও পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত।

সরকার বলছে, পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত ও ১৫টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। এ ছাড়া ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান।

তবে পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা বলছেন, এতো দীর্ঘ সময়ে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে, ১৮টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকি ২৯টি ধারার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি।

ভূমি সমস্যা সমাধানসহ চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলায় ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পাহাড়ের নেতারা।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সঙ্গে চুক্তি করেন, যেটিকে ‘শান্তি চুক্তি’ নামে অভিহিত করা হয়।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরও অস্ত্রের ঝনঝনানি থামেনি পাহাড়ে। নতুন নতুন সশস্ত্র গ্রুপের আবির্ভাব এবং সেগুলোর অন্তর্কোন্দলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেই চলেছে। নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের কলহে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জড়িয়ে পড়ছে সংঘাতে।


পাহাড়ে শান্তি না ফেরার কারণ কী


দুই যুগে আড়াই হাজার খুন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, শান্তি চুক্তির পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সামাজিক অপরাধের বাইরে তিন পার্বত্য জেলায় খুন হয়েছে ২ হাজার ৫৭৩ জন মানুষ। অপহৃত হয়েছে অন্তত ২ হাজার ৬২৬ জন। নিহতদের মধ্যে পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের লোক আছে।

গত চার বছরে শুধুমাত্র রাঙামাটিতেই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন হয়েছে ১২৪ জন। পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হানাহানির ঘটনা ঘটেছে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে। এই দুই জেলায় নিহত হন ১০৫ জন। আর বান্দরবানে নিহত হন ১৯ জন।

পাহাড়ে শান্তি না ফেরার কারণ কী
ইউপি সদস্য সমর বিজয় চাকমাকে পিআইও অফিসে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ছবি: নিউজবাংলা

নিহতদের মধ্যে ৯২ জন পার্বত্য এলাকার চারটি আঞ্চলিক দলের নেতা-কর্মী। এর মধ্যে ইউপিডিএফের ৩৯ জন, জেএসএসের (লারমা) ৩৮ জন, পিসিজেএসএসের ১৩ জন ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের ২ জন। অন্যদের মধ্যে ২০ জন সাধারণ নাগরিক, একজন সেনাসদস্য, বিএনপির নেতা ১ জন, আওয়ামী লীগের ১০ জন ও মগ পার্টির ১ জন রয়েছেন।

পাহাড়ের রাজনীতির মারপ্যাঁচ

পাহাড়ে এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) নামে একটিমাত্র আঞ্চলিক দল ছিল। এই দলের সঙ্গেই ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করেছিল সরকার। চুক্তির বিরোধিতা করে প্রথমে একটি অংশ জেএসএস থেকে বেরিয়ে ১৯৯৮ সালে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে নতুন সংগঠন করে। পরে জেএসএস ভেঙে জেএসএস (সংস্কারপন্থি) নামে ২০০৭ সালে আরেকটি সংগঠন হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক নামে নতুন সংগঠন হয়।

পার্বত্য চুক্তির এক বছরের মধ্যে চুক্তির পক্ষের জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে ইউপিডিএফের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি ভেঙে গঠিত হয় জনসংহতি সমিতি (লারমা) বা জেএসএস (লারমা) নামের নতুন দল। ২০১৭ সালে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি হয়। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর তপনজ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক নামের নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

পাহাড়ে শান্তি না ফেরার কারণ কী


পার্বত্য চট্টগ্রামে এই চারটি সংগঠনের বাইরে আরও কয়েকটি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি)। এই দলের সদস্যদের অবস্থান বান্দরবানের গহীনে। ২০১৮ সালে এএলপি ভেঙে গঠিত হয় মগ পার্টি। তাদের অবস্থানও বান্দরবানে। তবে এই দুই দলের অবস্থান শুধু বান্দরবানে; রাঙামাটি কিংবা খাগড়াছড়িতে এদের কোনো তৎপরতা নেই।

কার শক্তি কোথায়?

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিদে যে চারটি গ্রুপ বা সংগঠন রয়েছে, সেগুলোর একেকটির অবস্থান একেক জায়গায় শক্ত। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের দুটি অংশের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। খাগড়াছড়ির স্থানীয় বাসিন্দা ও পাহাড়ের নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের শক্ত অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে বান্দরবানে জেএসএসের দুইটি অংশের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। সেখানে জেএসএস শক্তিশালী। বান্দরবানের ইউপিডিএফের তৎপরতা নেই বললে চলে। আর রাঙামাটিতে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের চার পক্ষই শক্তিশালী।

শান্তি না ফেরার কারণ কী?

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) নেতা ত্রিদিব চাকমা বলেন, ‘চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে সমস্যা সমাধান হবে না। দুই যুগেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক সুদর্শন চাকমা বলেন, চুক্তি ‘বাস্তবায়নের জন্য আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। আমরাও চাই পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থা থাকুক। সবাই নিরাপদে শান্তিতে বসবাস করুক।’

ইউপিডিএফের সংগঠক অংগ মারমা বলেন, ‘পাহাড়ে অশান্তির মূল কারণ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া। চুক্তি বাস্তবায়নে যেসব কথা বলা হয়েছে, সেগুলো ন্যূনতম বাস্তবায়ন হয়নি। এ জন্য এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

তবে, পাহাড়ের বাসিন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী মনে করছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত, হানাহানি বাড়ার পেছনে মূল কারণ সংগঠনগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও চাঁদার ভাগ-বাটোয়ারা।

তবে আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের হতাশা থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই পাহাড়ে শান্তি ফেরেনি।

ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা বলেন, ‘প্রসীত খীসার ইউপিডিএফের জন্য আজ পাহাড়ে এত সংঘাত। তারা তখন চুক্তির বিরোধিতা না করলে হয়তো পাহাড়ে আজ চারটি আঞ্চলিক সংগঠন হতো না। পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক, এটা আমরা সব সময় চাই।’

পাহাড়ের সংগঠনগুলো যা বলছে

পার্বত্য চুক্তির যতদিন পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হবে, ততদিন শান্তি ফিরবে না বলে মনে করছে পাহাড়ের নাগরিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনরত সংগঠনের কর্মীরা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, ‘আমরা চাই সরকার অবিলম্বে চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ লিখিতভাবে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করুক।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, ‘চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো আইন-শৃঙ্খলা, ভূমি সমস্যার সমাধান, আঞ্চলিক পরিষদ আইন সংশোধন ও বিধিমালা তৈরি, ভারত প্রত্যাগত ৮৩ হাজার অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি শরণার্থীর পুনর্বাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।’

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্যাঞ্চল শাখার সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফসল। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য মঙ্গল ও শান্তি বয়ে আনবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার আন্দোলন ও সংরক্ষণ কমিটির জেলা সমন্বয়ক জোয়াম লিয়ান আমলাই বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তির যতদিন পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হবে, ততদিন শান্তি তিমিরেই থাকবে।’

যা বলছেন সরকারদলীয় নেতারা

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু বলেন, শেখ হাসিনার সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো বেশি ক্ষমতায়িত করেছে।

শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি বলেন, কিছু সমস্যা থাকলেও চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে।

রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, ‘এখানকার মানুষের মধ্যে সমঝোতা, আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এবং চুক্তির পক্ষে সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে একটি পরিবেশ সৃষ্টি প্রধান শর্ত। শান্তিপূর্ণভাবে চুক্তি বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন

‘গরু-ছাগলের ডাক্তার’: মুখোমুখি দুই পক্ষ

‘গরু-ছাগলের ডাক্তার’: মুখোমুখি দুই পক্ষ

মায়ের সঙ্গে দুর্জয় ও অবন্তিকা। ছবি: সংগৃহীত

অধ্যাপক নূরজাহান সরকার বলছেন, তার মন্তব্যটি ছিল ‘স্লিপ অফ টাং’, অর্থাৎ ভুল করে বলে ফেলা। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে চিড়িয়াখানায় ভেটেরিনারিয়ানদের নিয়োগ না দেয়ার দাবিতে অনড় তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন নেতাদের দাবি, মৌখিক দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয়, লিখিতভাবে অধ্যাপক নূরজাহানকে ক্ষমা চাইতে হবে।

ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় দুটি বাঘ শাবকের মৃত্যুর ঘটনায় চিড়িয়াখানার প্রাণী চিকিৎসকদের দায়ী করে দুটি সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক নূরজাহান সরকার।

অধ্যাপক নূরজাহান তার বক্তব্যে চিড়িয়াখানায় কর্মরত ভেটেরিনারিয়ানদের ‘গরু-ছাগলের ডাক্তার’ বলে মন্তব্য করেন। আর এতে চরম ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন পাঠিয়েছে আইনি নোটিশ।

নোটিশে অধ্যাপক নূরজাহানের বিরুদ্ধে ‘সম্মানহানিকর, অশালীন, বিদ্বেষপ্রসূত ও কটূক্তিমূলক’ বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ এনে সংবাদ মাধ্যম থেকে সাক্ষাৎকারটি অপসারণ করতে বলা হয়েছে। নইলে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছে নোটিশে।

অধ্যাপক নূরজাহান সরকার অবশ্য এখন বলছেন, তার মন্তব্যটি ছিল ‘স্লিপ অফ টাং’, অর্থাৎ ভুল করে বলে ফেলা। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে চিড়িয়াখানায় ভেটেরিনারিয়ানদের নিয়োগ না দেয়ার দাবিতে অনড় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক শিক্ষক। তিনি বলছেন, দায়িত্বটি পালন করতে পারেন কেবল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যা থেকে মাস্টার্স করা ‘বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা’।

অধ্যাপক অধ্যাপক নূরজাহানের দুঃখ প্রকাশকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (বিভিএ)। তবে অ্যাসোসিয়েশন নেতাদের দাবি, মৌখিক দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয়, লিখিতভাবে অধ্যাপক নূরজাহানকে ক্ষমা চাইতে হবে।

বন্যপ্রাণীর দেখভালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে মাস্টার্স উত্তীর্ণদের নিয়োগ দেয়ার দাবির সঙ্গেও একমত নন বিভিএ অ্যাসোসিয়েশন নেতারা। এর মহাসচিব ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মোল্লা বলছেন, ‘বইয়ের থিওরি পড়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় না। বন্যপ্রাণী চিকিৎসার বাস্তব অভিজ্ঞতা দেশে একমাত্র ভেটেরিনারিয়ানদেরই আছে।’

ঢাকা চিড়িয়াখানায় মাছিবাহিত রোগ ইপেসনোমায় আক্রান্ত হয়ে গত ২১ ও ২২ নভেম্বর মারা যায় দুর্জয় ও অবন্তিকা নামের দুটি বাঘ শাবক।

এ বিষয়ে ইনডেপেনডেন্ট টেলিভিশনে ২৬ নভেম্বর প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে অধ্যাপক নূরজাহান সরকার ভেটেরিনারিয়ানদের ‘গরু-ছাগলের ডাক্তার’ বলে মন্তব্য করেন। পরে একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমেও একই মন্তব্য করেন তিনি।

এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার অধ্যাপক নূরজাহানকে ডাক ও রেজিস্ট্রিযোগে আইনি নোটিশ পাঠান বিভিএ মহাসচিব ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক নূরজাহান বুধবার নিউজবাংলাকে বলেন, “সেই টিভিতে (ইনডিপেনডেন্ট) যদি ‘আলতু-ফালতু’ বা ‘গরু-ছাগলের ডাক্তার’ শব্দগুলো এসে থাকে, তা হলে এটি স্লিপ অফ টাং। তবে আমি তাদের (ভেটেরিনারিয়ান) ‘আলতু-ফালতু’ বলিনি। তাদের আলতু-ফালতুভাবে সেখানে (চিড়িয়াখানা) দেয়া হয়েছে, এটা বুঝিয়েছি।’

তবে ভেটেরিনারিয়ানদের চিড়িয়াখানায় বন্যপ্রাণী চিকিৎসার দায়িত্ব ঠিক নয় বলে বুধবারও দাবি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের চিড়িয়াখানায় দায়িত্ব পালন করা ঠিক নয়। কারণ এখানে দায়িত্ব পালন করবেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে পাস করা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা।’

প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে কী করে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে চার বছরের স্নাতক শেষ করে মাস্টার্সে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ হবে তারাই এ দায়িত্ব পালন করবে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে মাস্টার্সে ওয়াইল্ড লাইফ বায়োলজি নামে একটি কোর্স রয়েছে।’

‘প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীরা থিওরিটিক্যাল পড়াশোনার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে ফিল্ড ভিজিটেও যান। এর মাধ্যমে তারা অভিজ্ঞতা (বন্যপ্রাণী বিষয়ক) অর্জন করেন।’

অধ্যাপক নূরজাহান অবশ্য স্বীকার করেন বাঘের মতো বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা বিষয়ে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তরদের ‘হাতেকলমে’ প্রশিক্ষণ নেয়ার কোনো সুযোগ দেশে নেই। তাহলে তারা বাঘের চিকিৎসা কীভাবে করবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাঘ তো আর ফিল্ডে গিয়ে দেখা যাবে না। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের সুন্দরবনে নিয়ে যাই, চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাই। এতে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ বিষয়ে আলাদা কোনো ল্যাব ফ্যাসিলিটিও নেই, তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা করার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা বিশেষজ্ঞ হন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক জোর দিচ্ছেন বই থেকে অর্জিত জ্ঞানের উপর। তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আপনার যখন বেসিক নলেজ থাকবে, তখন গবেষণার মাধ্যমে আপনি দক্ষ হয়ে উঠবেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা এভাবেই অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে।

‘ভেটেরিনারি চিকিৎসকেরা তো গৃহপালিত পশুর ওপর পড়াশোনা করে। আর বাঘ হলো বন্যপ্রাণী। তাই চিড়িয়াখানায় ভেটেরিয়ানদের নিয়োগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেয়া উচিত।’

তবে অধ্যাপক নূরজাহানের এই দাবি উড়িয়ে দিচ্ছেন বিভিএ মহাসচিব ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ভেটেরিনারিয়ানদের পড়াশোনার মেয়াদকাল পাঁচ বছর। এর মধ্যে এক বছরের ইন্টার্নিতে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া হয়। এই এক বছর ভেটেরিনারিয়ানরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, এর মধ্যে বন্যপ্রাণী পরিচর্যার অভিজ্ঞতাও আছে।

‘শুধু থিওরি পড়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় না। বন্যপ্রাণী চিকিৎসার জন্য বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যতগুলো ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টি রয়েছে, সেখানে হাসপাতালও আছে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পাশাপাশি যারা বিশেষজ্ঞ হন তাদের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রাণিবিদ্যা থেকে পাস শিক্ষার্থীরা শুধু থিওরিই পড়েন।’

অধ্যাপক নূরজাহান সরকারের যুক্তিতে ক্ষুব্ধ ডা. হাবিব বলেন, ‘আমি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ সারা পৃথিবীতে বন্যপ্রাণীর ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসার দায়িত্বে ভেটেরিনারিয়ানেরাই নিয়োজিত আছেন।

‘এ বিষয়ে হাইকোর্টেরও একটি রুল আছে। সেখানে বলা হয়েছে কেউ প্রেসক্রিপশন দিতে চাইলে তাকে প্রেসক্রিপশনার সার্টিফিকেটধারী হতে হবে। একমাত্র ভেটেরিনারিয়ানদেরই বন্যপ্রাণী চিকিৎসার বিষয়ে প্রেসক্রিপশনার সার্টিফিকেট আছে। প্রাণিবিদ্যা থেকে যারা পাস করেন, তাদের তো এ বিষয়ে কোনো সনদ নেই। তা হলে তারা কীভাবে এ পেশায় দায়িত্ব পালন করবেন!’

ঢাকা জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর আব্দুল লতিফও সমর্থন করছেন ডা. হাবিবকে। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীতেই বন্যপ্রাণী চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করেন ভেটেরিনারিয়ানরা।’

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন

‘বর্জনের ভোটে’ চেয়ারম্যান বিএনপির ৯৬ জন

‘বর্জনের ভোটে’ চেয়ারম্যান বিএনপির ৯৬ জন

রোববারের ভোটে সবচেয়ে বেশি ৪৩৯ ইউনিয়নে জয় পেয়েছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়াই করা আওয়ামী লীগ নেতারা। আরও বেশ কিছু ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছেন অন্তত ২৬৭ এলাকায়। সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, যারা জিতেছে ১৫টির মতো ইউনিয়নে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর ৮ জন নেতা জিতেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়ে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট বর্জন করলেও তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেশ ভালো ফল করেছেন বিএনপির নেতারা। রোববারের এই ভোটে সারা দেশে অন্তত ৯৬ জন বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিতে এসেছেন।

বিভাগওয়ারি হিসাব করলে বিএনপির এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবচেয়ে ভালো করেছেন রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে। রংপুর বিভাগে জিতেছেন ২৪ জন আর রাজশাহী বিভাগে ২০ জন নেতা।

এ ছাড়া সিলেট বিভাগে ১৩ জন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১০ জন করে এবং খুলনা বিভাগে জিতেছেন ৯ জন নেতা। কেবল বরিশাল বিভাগে কেউ জিততে পারেননি।

তৃণমূলের ভোটে বিএনপি নেতাদের জিতে আসার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেশের সাধারণ জনগণ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তারা জনগণের সরকার চায়। তারই প্রতিচ্ছবি এটা; এখন যার প্রমাণ আপনারাও পাচ্ছেন।’

গত কয়েক বছরে বিএনপি জাতীয় ও স্থানীয় যেসব নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে অংশ নিয়েছে, তাতে তারা ভালো ফল করতে পারেনি। দলটির পক্ষ থেকে অবশ্য ভোট সুষ্ঠু না হওয়ার অভিযোগ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তাদের সমর্থকদের ভোট দিতে দেয়া হয় না, প্রচারেও বাধা দেয়া হয়।

চলতি বছর পৌরসভা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনার পর বর্তমান সরকার আর নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো ভোটে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। ফলে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তাদের কোনো প্রার্থী নেই।

এই নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ভোট হয়েছে তিন ধাপে, যার মধ্যে সবশেষ ভোট হয় রোববার।

এই ধাপে নির্বাচন কমিশন ১ হাজার ৭টি ইউনিয়নে ভোটের তফসিল ঘোষণা করে। তবে রোববার ভোট হয় সাড়ে আটশর কিছু বেশি এলাকায়। এর আগেই বেশ কিছু এলাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে যান।

তৃতীয় ধাপের এই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী না দিলেও বিভিন্ন এলাকায় দলের নেতারা ভোটে অংশ নেন স্বতন্ত্র পরিচয়ে। দলের পুরো সমর্থনও তারা পেয়েছেন নানা এলাকায়।

গত ২ নভেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে এক ব্রিফিংয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যা বলেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে বিএনপি এই ভোটে না থেকেও আছে।

তিনি সেদিন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করাটা সঠিক নয়। তাই বিএনপি এ নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছে না। তবে বিএনপি থেকে কেউ স্বতন্ত্র হয়ে অংশ নিলে সেখানে বাধা নেই।’

রোববারের ভোটে সবচেয়ে বেশি ৪৩৯ ইউনিয়নে জয় পেয়েছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়াই করা আওয়ামী লীগ নেতারা। আরও বেশ কিছু ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জিতেছেন অন্তত ২৬৭ জন। দলীয় প্রতীকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, যারা জিতেছে ১৫টির মতো এলাকায়।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর ৮ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র পরিচয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে জিতেছেন। এর মধ্যে রংপুর বিভাগে দুজন আর রাজশাহী বিভাগে আছেন ছয়জন।

এই ছয়জনের মধ্যে দুজন সর্ব-উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের। তিনজন আছেন রাজশাহীর নওগাঁর, দুজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আর একজন আছেন রাজশাহীর।

ইসলামী আন্দোলন, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ৩২ জন প্রার্থীও জিতে এসেছেন রোববারের ভোটে।

রংপুর বিভাগে জিতলেন বিএনপির যে নেতারা

এই জেলায় বিএনপির নেতারা সবচেয়ে ভালো করেছেন দিনাজপুরে। দুই উপজেলায় মোট ছয়টি ইউনিয়নে জয় পেয়েছেন তারা।

এই জেলার ফুলবাড়ীর ১ নম্বর এলুয়াড়ী ইউনিয়নে নবিউল ইসলাম, বিরামপুর উপজেলায় ৪নং দিওড় ইউনিয়নে আব্দুল মালেক ও ৫নং বিনাইল ইউপিতে হুমায়ন কবীর বাদশা জয় পেয়েছেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলায় ২ নম্বর বিনোদনগড় ইউনিয়নে নজরুল ইসলাম, ৪ নম্বর শালখুরিয়া ইউনিয়নে তারা মিয়া এবং ৫ নম্বর পুটিমারা ইউনিয়নে আনিছুর রহমান জয় পেয়েছেন।

বিএনপি ভালো করেছে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটেও। দুই জেলাতেই পাঁচজন করে নেতা জয় পেয়েছেন।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ঘোগাদহ ইউনিয়নে আবদুল মালেক, ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নে সাইদুর রহমান, নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নে শফিউল আলম শফি, রায়গঞ্জ ইউনিয়নে আরিফুল ইসলাম দীপ ও নারায়ণপুর ইউনিয়নে মো. মোস্তফা পেয়েছেন জয়।

লালমনিরহাটে সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নে আব্দুল মজিদ মণ্ডল, কুলাঘাট ইউনিয়নে ইদ্রিস আলী, বড়বাড়ি ইউনিয়নে হবিবর রহমান হবি, দলগ্রাম ইউনিয়নে ইকবাল হোসেন এবং ভোটমারী ইউনিয়নে জিতেছেন ফরহাদ হোসেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে জিতেছেন বিএনপির তিন নেতা। এর মধ্যে পীরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নে মোখলেছুর রহমান চৌধুরী, সেনগাঁওয়ে সাইদুর রহমান এবং বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ভানোর ইউনিয়নে জিতেছেন বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম।

আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থানের এই জেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৮টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে ১৪টিকে নৌকা আর একটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা জিতেছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম ও আওয়ামী লীগের মাহাবুবার রহমানের ভোট সমান হওয়ায় ফলাফল ড্র হয়েছে।

এই বিভাগের পঞ্চগড় ও গাইবান্ধায় জয় পেয়েছেন বিএনপির দুজন করে নেতা।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নে রবিউল ইসলাম ও আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে জিতেছেন আবদুস সামাদ, যাদেরকে বিএনপি মার্কা না দিলেও সমর্থন দিয়েছিল।

গাইবান্ধায় পলাশবাড়ী উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়নে মাহাবুবুর রহমান মণ্ডল ও হরিনাথপুর ইউনিয়নে মো. কবির হোসাইন জাহাঙ্গীর জয় পেয়েছেন।

নীলফামারী জেলায় জিতেছেন বিএনপির একজন নেতা। কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিতাই ইউনিয়নে জিতেছেন মোস্তাকিনুর রহমান।

রাজশাহী বিভাগে বিএনপির যে নেতাদের জয়

এই বিভাগের মধ্যে বিএনপির নেতারা সবচেয়ে বেশি জিতেছেন বগুড়ায়। দলটির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলাটিতে ১০ জন নেতা জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।

এদের মধ্যে সদর উপজেলার নিশিন্দারা ইউনিয়নে সহিদুল ইসলাম সরকার, সাবগ্রাম ইউনিয়নে ফরিদ উদ্দিন সরকার, লাহিড়ীপাড়া ইউনিয়নে জুলফিকার আবু নাসের আপেল মাহমুদ, শেখেরকোলা ইউনিয়নে জিতেছেন রশিদুল ইসলাম মৃধা।

ধনুট উপজেলায় জিতেছেন কালেরপাড়া ইউনিয়নে সাজ্জাদ হোসেন, চিকাশি ইউনিয়নে জাকির হোসেন, গোসাইবাড়ী ইউনিয়নে মাসুদুল হক বাচ্চু, ভাণ্ডারবাড়ী ইউনিয়নে বেলাল হোসেন, শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নে আতিকুর রহমান এবং মাদলা ইউনিয়নে আতিকুর রহমান।

এই বিভাগে চারজন করে বিএনপির নেতা জিতেছেন নাটোর ও নওগাঁয়।

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার ফাগুয়ারদিয়ার ইউনিয়নে এসএম লেলিন, জামনগরে গোলাম রাব্বানী, লালপুর উপজেলার ঈশ্বরদী ইউনিয়নে আব্দুল আজিজ রঞ্জু আর বিলমাড়িয়া ইউনিয়নে জিতেছেন সিদ্দিক আলী মিষ্টু।

নওগাঁর প্রসাদপুর ইউনিয়নে আব্দুল মতিন, বিষ্ণপুর ইউনিয়নে এসএম গোলাম আজম, গণেশপুর ইউনিয়নে শফিকুল ইসলাম বাবুল চৌধুরী এবং কাঁশোপাড়া ইউনিয়নে আব্দুস সালাম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নে মাহমুদুল হক হায়দারী এবং পাঁকা ইউনিয়নে জিতেছেন আব্দুল মালেক।

সিলেট বিভাগে বিএনপির যে নেতারা জিতলেন

গোটা বিভাগে বিএনপির নেতারা সবচেয়ে ভালো করেছেন সুনামগঞ্জে। এই জেলার সদর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৭টি ইউনিয়নে। এর ছয়টিতে জিতেছেন বিএনপি নেতারা। পক্ষান্তরে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগ জিততে পেরেছে কেবল দুটি ইউনিয়নে।

‘বর্জনের ভোটে’ চেয়ারম্যান বিএনপির ৯৬ জন



সদর উপজেলা রঙ্গারচর ইউনিয়নে মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে জিতেছেন বিএনপি নেতা মো. আব্দুল হাই, মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে জিতেছেন নুরুল হক, লক্ষণশ্রী ইউনিয়নে জিতেছেন আব্দুল ওয়াদুদ৷

শান্তিগঞ্জে স্বতন্ত্র পরিচয়ে জয়ী বিএনপির নেতারা হলেন দরগাপাশা ইউনিয়নে ছুফি মিয়া, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নে মাসুক মিয়া ও পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নে লুৎফর রহমান জায়গীরদার খোকন।

লক্ষণশ্রী ইউনিয়নে নির্বাচিত জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের জবাব দিয়েছে। আমাদের শঙ্কা ছিল ক্ষমতাসীনরা কিছু করে কি না। তবে সবকিছুকে হারিয়ে জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে আমাকে জয়ী করেছে। আমি এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান হয়েছি। মানুষও জানে কাকে ভোট দিলে মেহনতি মানুষের উন্নয়ন হয়।’

হবিগঞ্জের ২১টি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটিতে জয় পেয়েছেন বিএনপি নেতারা। তারা হলেন সদর উপজেলার গোপায়া ইউনিয়নে আব্দুল মন্নান, নবীগঞ্জ উপজেলার দিঘলবাগ ইউনিয়নে মোহাম্মদ ছালিক মিয়া এবং বাউসা ইউনিয়নে সাদিকুর রহমান শিশু।

সিলেট ও মৌলভীবাজারে জয় পেয়েছেন বিএনপির দুজন করে নেতা। এদের মধ্যে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্তে বাহারুল আলম বাহার ও গোয়াইনঘাটের রুস্তমপুরে জিতেছেন শাহাব উদ্দিন।

মৌলভীবাজারের এর মধ্যে বড়লেখা উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নে জিতেছেন জয়নাল আবেদীন। কুলাউড়া উপজেলায় ভূকশিমইলে জিতেছেন আজিজুর রহমান। তিনি গতবারও জিতেছিলেন।

ঢাকা বিভাগে যারা জিতলেন

এই বিভাগে বিএনপির নেতারা সবচেয়ে টাঙ্গাইলে। এ জেলায় তিনজন সক্রিয় বিএনপি নেতা এবং একজন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া নেতা জিতেছেন। এই জেলায় ভোট হয়েছে মোট তিনটি উপজেলায়। এর মধ্যে বিএনপি সম্পৃক্তরা জিতেছেন কেবল নাগরপুর ইউনিয়নে।

এরা হলেন গয়হাটা ইউনিয়নে সামছুল হক, ভাদ্রা ইউনিয়নে শওকত হোসেন ও সহবতপুর ইউনিয়নে তোফায়েল আহমেদ। পাকুটিয়া ইউনিয়নে জয়ী সিদ্দিকীকুর রহমানও বিএনপি করতেন। তবে সম্প্রতি তিনি দলীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

দ্বিতীয় দুজন করে নেতা জয় পেয়েছেন মুন্সীগঞ্জ ও ফরিদপুরে।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের তোতা মিয়া মুন্সী আর টঙ্গীবাড়ি উপজেলার বেতকা ইউনিয়নে জয় পেয়েছেন রোকনুজ্জামান রিগ্যান।

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নে ইয়াকুব আলী (বিএনপি সমর্থক), বর্তমানে কোনো পদে নেই) এবং চরহরিরামপুর ইউনিয়নে জাহাঙ্গীর কবির (বিএনপি সমর্থক), বর্তমানে কোনো পদে নেই)।

কিশোরগঞ্জে কুলিয়ারচর, নিকলী ও সদর উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ২৩টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে বিএনপি থেকে জিতেছেন একজন নেতা। সদর উপজেলায় চৌদ্দশত ইউনিয়নে জয় পেয়েছেন দলটির নেতা আতহার আলী।

নরসিংদীতেও জয় পেয়েছেন বিএনপির একজন নেতা। চিনিশপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান হয়েছেন মেহেদী হাসান ভূইয়া তুহিন।

চট্টগ্রাম বিভাগে জয় যাদের

এই বিভাগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা জেলায় বিএনপির তিনজন করে নেতা জয় পেয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় পাকশিমুল ইউনিয়নে কাওসার হোসেন, সদর ইউনিয়নে আবদুল জব্বার, চুন্টা ইউনিয়নে জিতেছেন মনসুর আহমেদ।

কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মাথাভাঙ্গা ইউনিয়নে জাহাঙ্গীর আলম, ঘাগটিয়া ইউনিয়নে মফিজুল ইসলাম গনি ও ঘারমোড়া ইউনিয়নে জিতেছেন শাহজাহান মোল্লা। বিএনপির এই তিন নেতার পক্ষে দলের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রচারে ছিলেন।

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় জয় পেয়েছেন বিএনপির দুই নেতা। এরা হলেন ছাতারপাইয়া ইউনিয়নে আবদুর রহমান ও কাবিলপুর ইউনিয়নে বাহার হোসেন।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ছিপাতলী ইউনিয়নে জিতেছেন বিএনপি নেতা নূরুল আহসান লাভু।

চাঁদপুরে মতলব উত্তর উপজেলার এখলাশপুর ইউনিয়নে জিতেছেন বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী মফিজুল ইসলাম।

খুলনা বিভাগে বিজয়ী বিএনপির নেতারা

এই বিভাগে এক জেলায় বিএনপির সর্বোচ্চ তিনজন নেতা জিতেছেন সাতক্ষীরায়। এরা হলেন কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগরে জাহাঙ্গীর আলম, পারুলিয়ায় গোলাম ফারুক বাবু এবং দেবহাটা উপজেলার দেবহাটা ইউনিয়নে আব্দুল মতিন।

বিভাগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুজন নেতা জয় পেয়েছেন যশোরে। এরা হলেন মনিরামপুর উপজেলায় মনিরামপুর সদরে নিস্তার ফারুক এবং মনোহরপুরে আকতার ফারুক মিন্টু।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নে জিতেছেন খোয়াজ হোসেন মাস্টার।

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার সাফদারপুর ইউনিয়নে জিতেছেন আব্দুল মান্নান।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বাড়াদী ইউনিয়নে বিএনপি বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী (মোটরসাইকেল) তোবারক হোসেন নির্বাচিত হয়েছেন।

মাগুরার শালিখা উপজেলার শালিখা ইউনিয়নে জিতেছেন ইউনিয়নে বিএনপির আহ্বায়ক হুসেইন শিকদার।

ময়মনসিংহ বিভাগের জয়ীরা

এই বিভাগে বিএনপির নেতারা সবচেয়ে বেশি জিতেছেন শেরপুরে। এই জেলায় দলটির পাঁচজন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন।

তারা হলেন নকলা উপজেলার ৭ নম্বর টালকি ইউনিয়নের মোজাফফর আহমদ বুলবুল, নালিতাবাড়ী উপজেলার রাজনগর ইউনিয়নের আতাউর রহমান, মরিচপুরান ইউনিয়নের আয়ুব আলী, কলসপাড় ইউনিয়নের আবদুল মজিদ ও নয়াবিল ইউনিয়নের মিজানুর রহমান।

নেত্রকোনায় জিতেছেন বিএনপির তিন নেতা। তারা হলেন কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়নের সাইদুর রহমান ভুইয়া, রংছাতি ইউনিয়নের আনিসুর রহমান খান পাঠান বাবুল ও দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আব্দুল আওয়াল।

ময়মনসিংহে জিতেছেন দুজন। তারা হলেন ত্রিশাল উপজেলার ৩ নম্বর কাঁঠাল ইউনিয়নের নূরে আলম সিদ্দিকী ও মুক্তাগাছা উপজেলার ৬ নম্বর মানকোন ইউনিয়নের শহিদুল ইসলাম।

এই বিভাগের অন্য জেলা জামালপুরে বিএনপির কোনো নেতা চেয়ারম্যান হতে পারেননি।

প্রতিবেদনটি প্রস্তুত হয়েছে সারা দেশে নিউজবাংলার প্রতিবেদকদের তথ্যে

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গে বাসে ছাত্রদের ছাড় ছিল, এখন নেই

পশ্চিমবঙ্গে বাসে ছাত্রদের ছাড় ছিল, এখন নেই

পশ্চিমবঙ্গে বাস ভাড়ার ক্ষেত্রে ছাত্র বলে আর কিছু নেই। সবাই সাধারণ যাত্রী। ছবি: সংগৃহীত

করোনায় রাজ্যজুড়ে লকডাউনের আগে পর্যন্ত কোথাও ৫০ শতাংশ, কোথাও ৪০ শতাংশ ভাড়া দিতে হতো ছাত্রছাত্রীদের। করোনা সংকটকালে বাস পরিষেবা বন্ধ থাকায় বাস মালিকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এরপর রাজ্যের কোথাও আর তেমনভাবে তা বিবেচনা করা হচ্ছে না। বাস ভাড়ার ক্ষেত্রে ছাত্র বলে আর কিছু নেই। সবাই সাধারণ যাত্রী।

সরকারি বা বেসরকারি বাসের ভাড়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কোনো ছাড়ের নির্দেশনা নেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিবহন দপ্তরের তরফে। তবে অলিখিতভাবে কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন রকম ছাড় পাওয়া যায়।

করোনায় রাজ্যজুড়ে লকডাউনের আগে পর্যন্ত কোথাও ৫০ শতাংশ, কোথাও ৪০ শতাংশ, কোথাও বা এক-তৃতীয়াংশ ভাড়া দিতে হতো ছাত্রছাত্রীদের। এ জন্য স্কুল-কলেজের সুপারিশপত্রসহ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আবেদন করতে হতো। তার ভিত্তিতে বেসরকারি বাস মালিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট দূরত্বের জন্য ছাড়ের অনুমতি দেয়া হতো।

করোনা সংকটকালে বাস পরিষেবা বন্ধ থাকায় বাস মালিকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। তার ওপর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বাস মালিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বাস ভাড়া বৃদ্ধির জোরালো দাবি জানানো হয়।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পরিবহনমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে বাস ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে না । তবে বাস মালিকদের অন্যভাবে আমরা পুষিয়ে দেব।’

এই পরিস্থিতিতে বাস মালিক সংগঠনগুলি বিভিন্ন রুটে বিভিন্ন স্ল্যাবে নিজেদের মতো ৫ টাকা ১০ টাকা ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছেন। যাত্রীরাও গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদে ৫ টাকা ১০ টাকা বেশি দিচ্ছেন। প্রতিবাদ হচ্ছে, কোথাও বা ঝগড়া বিবাদ হচ্ছে।

ফলে বেসরকারি বাস মালিক সংগঠনগুলি ছাত্রদের ভাড়ায় আগে যে ছাড় দিত, এ সময় রাজ্যের কোথাও আর তেমনভাবে তা বিবেচনা করা হচ্ছে না। বাস ভাড়ার ক্ষেত্রে ছাত্র বলে আর কিছু নেই। সবাই সাধারণ যাত্রী।

পশ্চিমবঙ্গে বাসে ছাত্রদের ছাড় ছিল, এখন নেই

সরকারি বাস ভাড়ায় ছাত্রদের কোনো ছাড় আছে কি না, সেটা পশ্চিমবঙ্গ পরিবহন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে জিজ্ঞেস করায় ওই কর্মকর্তা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘না’। অন্য কোনো প্রশ্ন করার আগেই ফোন রেখে দেন।

নদীয়ার হরিণঘাটা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী স্নেহা বেলা এবং রাজদীপ মালাকার জানান, কলেজ আসা-যাওয়ার জন্য তারা এখন বাস ভাড়ায় কোনো ছাড় পান না। পুরো ভাড়া দিতে হয়।

কলকাতার এসবি/৩ রুটের কন্ডাক্টর আফতাব হোসেন বলেন, ‘বাস ভাড়ায় ছাত্রদের কোনো ছাড় নেই।’

মেটিয়াবুরুজ-রাজাবাজার পথে ১২/১ রুটের বাস কন্ডাক্টর বলেন, ‘ছাত্র বললে ১০ টাকায় দু টাকা ছেড়ে দেই।’

নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার জাগুলি কচরাপাড়া রুটের ২৭ নম্বর বেসরকারি বাসের অপারেটর কেষ্ট দাস জানান, আগে ছাত্রছাত্রীদের ৫০ শতাংশ ছাড় দেয়া হতো। এখন পুরোপুরি বন্ধ।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর-মজিলপুর বেসরকারি বাস ইউনিয়নের সম্পাদক আখতার শেখ জানান, ‘আগে আবেদন করলে ছাত্র ছাত্রীদের ৪০ শতাংশ ছাড় দেয়া হতো। এখন কোনো ছাড় নেই।’

শিয়ালদা ২৮ নম্বর রুটের বাস মালিক সংগঠনের পক্ষে সুশান্ত চক্রবর্তী বলেন, ‘ছাত্রদের জন্য বাস ভাড়ায় কোনো ছাড় নেই । তবে কেউ বললে, আমরা বিবেচনা করি।’

বরিশা-কদমতলা রুটের বেসরকারি বাস মালিক সংগঠনের পক্ষে অমল সাহা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পেট্রোপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, করোনা সংকটের বিধিনিষেধ এবং দীর্ঘকাল বাস না চালানোর ফলে বাস মালিকরা অর্থ সংকটে আছেন। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের থেকে দু-চার টাকা বেশি ভাড়া নিয়ে পরিষেবা চালু রাখা হয়েছে। বিরোধ নয়, যাত্রীরা ভালোবেসে বেশি ভাড়া দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে আলাদা করে ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোনো ছাড়ের ব্যবস্থা নেই।’

ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এসইউসিআই কর্মী প্রভাশিষ দাস বলেন, ‘এখন ভাড়ায় কোথাও কোনো ছাড় নেই। বরঞ্চ অনেক বেশি টাকা দিয়েই ছাত্রদের স্কুল-কলেজে যাওয়া আসা করতে হয়। এটা রাজ্যের সব জেলার চিত্র বলা যায়। সরকার সঠিকভাবে ভাড়া কাঠামো না করে ছেড়ে রেখে দিয়েছে। ফলে মালিকরা ইচ্ছে মতো ভাড়া নিচ্ছে। আমরা এর বিরুদ্ধে বড় ধরনের ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন

রেইনট্রি মামলা: ধর্ষণের স্বীকারোক্তি আমল পায়নি

রেইনট্রি মামলা: ধর্ষণের স্বীকারোক্তি আমল পায়নি

রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলায় আসামিদের সবাই খালাস পেয়েছেন। ছবিতে মামলার অন্যতম দুই আসামি সাফাত আহমেদ (বাঁয়ে) ও নাঈম আশরাফ। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা

অভিযোগকারীর জবানবন্দি ও আসামির জবানবন্দি মিলে গেলে মামলার অভিযোগ পোক্ত হয় বলেই সাধারণত ফৌজদারি মামলায় মনে করা হয়। রেইনট্রি ধর্ষণ মামলার আসামিরা ধর্ষণের অভিযোগ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় হাকিমের কাছে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তা বিচারক যথেষ্ট আমলে নেননি।

আলোচিত রেইনট্রি মামলায় ভুক্তভোগীরা যে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং চার আসামি মহানগর হাকিমের কাছে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতে মিল রয়েছে। ভুক্তভোগীরা ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন। আসামিরা জবানবন্দিতে তা স্বীকার করেছেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক তার রায় দেয়ার ক্ষেত্রে এ জবানবন্দিগুলোকে খুব বেশি আমলে নেননি বলেই আইনজীবীদের মনে হয়েছে। তারা এটিকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করে বলেছেন, অভিযোগকারীর জবানবন্দি ও আসামির জবানবন্দি মিলে গেলে মামলার অভিযোগ পোক্ত হয় বলেই সাধারণত ফৌজদারি মামলায় মনে করা হয়।

রায় ঘোষণা করার সময় ঢাকার ৭ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোছা. কামরুন্নাহার আলোচিত এই মামলার বাদী কর্তৃক করা এজাহার, প্রাথমিক তথ্য বিবরণী, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, দুই পক্ষের আইনজীবীদের জেরার অংশ, মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনসহ খুঁটিনাটি সব বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন।

এ সময় আদালতের এজলাস কক্ষের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী, আসামিপক্ষের আইনজীবীসহ স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রস্তুত না হওয়ায় মামলাটির চার শতাধিক পৃষ্ঠার নথিপত্রের অংশবিশেষ আড়াই ঘণ্টা যাবৎ পড়ে শোনান বিচারক কামরুন্নাহার।

এ দিন তিনি আদালতে মৌখিক কিছু কথা উপস্থাপন করেন, যা ওই মামলার রায়, পর্যবেক্ষণ বা নথিপত্রের কোথাও লেখা ছিল না।

আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করা নিয়ে বিচারক তার মতামত দিয়ে বলেন, ‘সরকারের মূল্যবান সময় ও অর্থ অপচয় করার অধিকার কারো নেই। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

তিনি বলেন, ‘মামলার ঘটনায় ভুক্তভোগীকে (ভিকটিম) বারবার ওয়ারেন্ট পাঠিয়েও আদালতে হাজির করা যায়নি। এটা খুবই দুঃখজনক! এই আদালতে আজকেসহ ৯৪টি কার্যদিবস নষ্ট করা হয়েছে। অনেকে মামলা করেন ঠিকই, কিন্তু বিচার শুরু হলে পরে তাদের কোনো খবর থাকে না। এমনকি অনেক সময় মামলার বাদী পর্যন্ত আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন না।’

মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভুক্তভোগীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় জবানবন্দি দেন।

ঘটনাটি ২০১৭ সালের ২৮ মার্চের হলেও ১ নম্বর ভুক্তভোগী রাজধানীর বনানী থানায় এজাহার করেন ঘটনার ৩৮ দিন পর ৬ মে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক ইসমত আরা এমি ওই বছরের ১১ মে মামলার বাদী ও তার সমবয়সী বান্ধবীকে ঢাকার মুখ্যমহানগর হাকিম আদালতের হাকিমের কাছে হাজির করে ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এর ১৮ দিন পর ২৯ মে, ২০১৭ তাদের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার মহানগর হাকিম (সিএমএম) মো. খুরশীদ আলমের কাছে ২২ ধারায় জবানবন্দি দেন।

এসব জবানবন্দিতে তারা তিনজনই স্বীকার করেন, আপন জুয়েলার্সের কর্ণধার সাফাত আহমেদ ১ নম্বর ভুক্তভোগী মামলার বাদীকে এবং সাফাত আহমেদের বন্ধু নাঈম আশরাফ ওরফে এ ই এম হালিম ১ নম্বর ভুক্তভোগীর বান্ধবীকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষণের আগে তাদের প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করানো হয়। বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ছাদের সুইমিংপুলে সুইমিং করা, দফায় দফায় মদ্যপান করা, ব্লু টুথ চালু করে সাউন্ড বক্সে সংযোগ দিয়ে ‘ডান্স’ করার পর ধর্ষণের কথা ভুক্তভোগীরা তাদের ২২ ধারার জবানবন্দিতে বর্ণনা করেন।

১ নম্বর ভুক্তভোগী তার জবানবন্দিতে বলেন, তিনি মামলার ৩ নম্বর আসামি সাদমান সাকিফের সঙ্গে পরিচিত দুই বছর আগে থেকে। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব আছে। সেই সুবাদে কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল। এই মামলার ঘটনার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে পিকাসো রেস্টুরেন্টে তাদের যেতে বলেন সাদমান সাকিফ।

সাদমান তার এক ‘ঘনিষ্ঠ বড় ভাই’ আপন জুয়েলার্সের কর্ণধার দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার কথা বলেন। এরপর বান্ধবীকে নিয়ে ১ নম্বর ভুক্তভোগী পিকাসো রেস্টুরেন্টে যান। সেখানে সাফাতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেখানে সাফাত বসে মদ্যপান করছিলেন। এ সময় সাফাত তার ব্যক্তিগত অনেক কথা ‘শেয়ার করেন’। সেখানে তিনি দুজনের মোবাইল নম্বর নেন।

এর পর ২৮ মার্চ, ২০১৭ সালে সাফাত তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে ভুক্তভোগীকে দাওয়াত দেন। এর আগে প্রায় প্রতিদিনই সাফাতের সঙ্গে তার ফোনে কথা হতো। অনেক কথা হওয়ার মধ্য দিয়ে সাফাতের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে যান ভুক্তভোগী। এরপর কয়েক দফা তাদের দেখাও হয় হোটেল পিকাসোতে। ভুক্তভোগী তার জবানবন্দিতে বলেন, তার একটি ‘ফ্রেন্ডলি রিলেশন’ ছিল সাফাতের সঙ্গে।

২৮ মার্চ সাফাত তার জন্মদিনে যাওয়ার জন্য ভুক্তভোগীকে বারবার বলেন। ভুক্তভোগীর বান্ধবী অসুস্থ ছিলেন, তাই তারা কেউ যেতে চাচ্ছিলেন না, কিন্তু সাফাত অনেক অনুরোধ করেন যাওয়ার জন্য এবং গাড়ি পাঠিয়ে দেন। তার ড্রাইভার বিল্লাল আর গানম্যান রহমত আলী এসে দুই বান্ধবীকে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে নিয়ে যান।

রাত তখন ৯টা বাজে। তারা রুফটপে যান। সেখানে সাফাত ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাঈম আশ্রাফ এবং দুটি মেয়ে নাজিয়া, তানজিলা আলিশা ছিলেন। কিছুক্ষণ পর ভুক্তভোগীর বন্ধু শাহরিয়ার ও স্নেহা আসে। তারা আর কোনো অতিথি দেখেননি।

সুইমিং করার কথা জেনে ভুক্তভোগী বাড়তি পোশাক নিয়ে গিয়েছিলেন।

ভুক্তভোগী তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘ড্রেস পরিবর্তন করতে গিয়ে আমি ড্রিংকসের বোতল (মদ), সিগারেট ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দেখি। আমি সুইমিং করি শুনে সুইমিংয়ে যাওয়ার আগে সাকিফ আসে। এদিন ও সরাসরি ইন্ডিয়া থেকে ওখানে আসে। সাফাত ও সাকিফ সুইমিং করে। আমরা চলে যেতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু মাহির হারুন নামের এক লোক আসে, সে নাকি রেইনট্রি হোটেলের মালিকের ছেলে। আমাদের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে চলে যায়। এরপর শাহরিয়ার নিচে ফ্রেশ হতে গিয়ে ভুল করে ওয়াশরুমে গাড়ির চাবি রেখে আসে। গাড়ির চাবি আমরা সবাই খোঁজাখুঁজি করেও পাই না।

‘সাকিফ সব দেখছিল। এরপর নাইম একসময় গাড়ির চাবি বের করে দেয়। বিষয়টি আমাদের একটু সন্দেহ হলে আমরা চলে যেতে চাই। এ সময় শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা আছে বলে সাফাত তাকে নিচে ডেকে নিয়ে যায়। আবার শাহরিয়ার এসে আমাদের নিচে নিয়ে যেতে চাইলে ওরা শাহরিয়ারের কাছ থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে যায়। আমাকে ও আমার বান্ধবীকে সাফাত ফ্যামিলি স্যুটে নিয়ে যায়। নাইম ও সাকিফ আগে থেকে ওই রুমে ছিল। সাফাত, সাকিফ আর আমি লিভিং রুমে থাকি। আমার বান্ধবী আর নাঈম ফ্যামিলি স্যুটে ছিল। সাফাত শটগান দিয়ে আমাকে জোর করে ড্রিংক করায়, সাকিফ এ সময় চুপ করে ছিল। আমার অনেক সময় সেন্স ছিল না।

ওই ভুক্তভোগী আরও বলেন, ‘সেন্স ফেরার পর আমি খেয়াল করি যে, আমি সোফায় পড়ে আছি। শরীরটা ভারি ভারি। সাকিফ বসে মোবাইল টিপাটিপি করছে, সাফাত প্যান্টের চেইন লাগাচ্ছে। এ সময় দেখি, আমার বান্ধবী আমার সঙ্গে নেই। চিৎকার শুনে ফ্যামিলি স্যুটে ঢুকে দেখি, নাইম আমার বান্ধবীর সঙ্গে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করছে।

‘সে কাঁদছিল। সাকিফ চলে যায়। আমাদের ছেড়ে দিতে বলি। নাঈম, সাফাত এ সময় তুই-তুকারি করে কথা বলে ও আমাকে থাপ্পড় দেয়। এরপর শাহরিয়ারকে আমাদের রুমে নিয়ে আসে, তাকে খুব মারধর করে এবং তাকে দিয়ে বলায় যে, সে ইয়াবার ডিলার। সাফাত তার ড্রাইভার বিল্লালকে দিয়ে শাহরিয়ারের কথা তিনবার করে ভিডিও করায়। সেই ভিডিও দেখিয়ে তারা অনেক কথা বলতে থাকে। এরপর শাহরিয়ারকে আবার পাশের রুমে পাঠিয়ে দেয়।’

ওই তরুণী আরও বলেন, ‘আমাকে সাফাত এক রুমে নেয়, নাইম আমার বান্ধবীকে নিয়ে ফ্যামিলি স্যুটে থাকে। সাফাত আমাকে লিভিং রুমে নিয়ে রেপ (ধর্ষণ) করে। এরপর নাঈমের রুমে গিয়ে তাকে সাহায্য করে আমার বান্ধবীকে রেপ করার জন্য। এ সময় বিল্লাল বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে নাঈম আমার বান্ধবীকে রেপ করার দৃশ্য ভিডিও করে। আমি নিজে বিল্লালকে ভিডিও করতে দেখেছি।

‘একসময় সকাল হয়ে আসে। আর আমরা কাঁদতে থাকি। এরপর সাফাত আমাকে শাসিয়ে বলে যে, ওর কিছু হবে না, এসব কথা যেন কাউকে কিছু না বলি। এরপর সকাল বেলা সাফাত শাহরিয়ারের গাড়ির চাবি আমার কাছে দিলে আমি শাহরিয়ারকে ফেরত দিয়ে চলে যেতে বলি। সে তখন তার বান্ধবী স্নেহাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর সাফাতরা উবার ডাকে। আমি, আমার বান্ধবী, সাফাত ও নাঈম সেই উবারে উঠি।’

জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘সাফাতরা বাসায় নেমে যায়। আমরা সেই গাড়ি নিয়ে চলে যাই। এরপর সাফাত অনেকবার ফোন দিয়েছে, কিন্তু আমি ধরিনি। এরপর সাকিফ আমাকে (মেসেজ দিয়ে) নক করে, তাকে বলি তোমরা যেন সামনেই না আসো। তুমি আমাদের রেখে চলে গেলে কেন? সাকিফ তখন বলে, এগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে আরো খারাপ কিছু হতে পারে।

‘এরপর সাফাত এক দিন ফোন দিয়ে আমাকে গালিগালাজ করে। এরপর পাপ্পু আর সৌরভ নামে দুই বড় ভাইকে সব বলার পর সাফাত ও নাঈমকে ওরা হোটেল পিকাসোতে ডাকে। আমি, আমার বান্ধবী, সাকিফ, সাফাত, নাঈম, পাপ্পু, সৌরভ আর নাদিম ৩১ মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যায় মিট করি। তখন সাফাত ও নাঈম বলে, ওরা সেদিন ইয়াবা আর মদ খাওয়া ছিল, তাই হুঁশ ছিল না। ওরা ফাজলামি করে ‘স্যরি’ বলে এবং বলে যে ভিডিও ডিলিট করে দিয়েছি। কিন্তু আবার আমাদের ‘ফ্রড’, ‘বাজে মেয়ে’ বলে, বলে ভিডিও আছে। তখন আমাদের চলে যেতে বলে। এরপর আমরা আর চুপ না থেকে মামলা করি।’

এভাবেই ১ নম্বর ভুক্তভোগী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ২২ ধারার জবানবন্দি দেন, যেটি সাড়ে ছয় পৃষ্ঠার। ২ নম্বর ভুক্তভোগী ৮ পৃষ্ঠার জবানবন্দি দেন।

৩ নম্বর ভুক্তভোগী আহমেদ শাহরিয়ার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. খুরশীদ আলমের কাছে ২২ ধারায় দুই পৃষ্ঠার জবানবন্দি দেন।

এ ছাড়া পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন মুখ্য মহানগর আদালতের হাকিমের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

ঢাকার মহানগর হাকিম মো. আহসান হাবিব ১৮ মে, ২০১৭ তার খাস কামরায় আসামি সাফাত আহমেদের জবানবন্দি গ্রহণ ও রেকর্ড করেন, যা হাতে লেখা এবং ১০ পৃষ্ঠার।

একই তারিখে মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী তার খাস কামরায় সাদমান সাকিফের জবানবন্দি গ্রহণ ও রেকর্ড করেন, যা হাতে লেখা সাড়ে ছয় পৃষ্ঠা।

মহানগর হাকিম সত্যব্রত শিকদার ২৫ মে (২০১৭) তারিখে তার খাস কামরায় হাতে লেখা সাড়ে ছয় পৃষ্ঠার নাঈম আশ্রাফের জবানবন্দি গ্রহণ করেন।

মহানগর হাকিম মো. মাহমুদুল হাসান ২১ মে, ২০১৭ সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেনের জবানবন্দি গ্রহণ করেন, যেটি কম্পিউটার টাইপকৃত সাড়ে চার পৃষ্ঠার।

জবানবন্দিতে নাইম আশরাফ বলেন যে, সাফাতসহ তারা বিভিন্ন উঠতি মডেল ও তাদের বান্ধবীদের টাকার বিনিময়ে ‘শারীরিক মেলামেশা’ করতেন।

সাফাত ও নাঈম তাদের জবানবন্দিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ২৩ বছর বয়সী ওই দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া সাদমান সাকিফ ও গাড়িচালক বিল্লাল ধর্ষণের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেছেন।

নথিপত্রের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২২ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে ভুক্তভোগীসহ তিনজন ধর্ষণের যে অভিযোগ করেছেন চার আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তা অকপটে স্বীকার করেছেন। এ সাতজনের সাক্ষ্য আদালতের কাছে কেন গ্রহণযোগ্যতা পেল না, তা নিয়ে আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন।

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাজমা আক্তার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যদি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দেয়া ভুক্তভোগীর ২২ ধারায় দেয়া জবানবন্দি মিলে যায় এবং যদি কোনো নরমাল সাক্ষীও আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তাহলে কেন সাজা দেয়া হবে না? এসব ক্ষেত্রে শাস্তি না দেয়ার কারণই বা কী থাকতে পারে?’

তিনি বলেন, দুই ছাত্রীর ২২ ধারায় দেয়া জবানবন্দির সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার জবানবন্দির যেহেতু মিল রয়েছে, ফলে আসামিদের খালাস পাওয়াটাই একটি নজির হয়ে গেল।

সুপ্রিম কোর্টের অন্য আইনজীবী পারভেজ হাসেম বলেন, ২২ ধারা ও ১৬৪ ধারা মিলে গেলে এবং দু-একটি সাক্ষী আসামিদের বিরুদ্ধে যাওয়ার পরও যদি কোনো সন্দেহের সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে আসামিরাই আইনগতভাবে লাভবান হয়। তবে সবই বিচারকের নিজস্ব এখতিয়ারের বিষয়। তিনি চাইলে সাজা দিতে পারেন আবার নাও দিতে পারেন।

ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী জীবন জয়ন্ত বলেন, দুই ধরনের জবানবন্দি মিলে যাওয়ার পর যদি একটি সাক্ষ্যও আসামির বিপক্ষে সত্য বলে মানা হয়, তাহলে তাকে সাজা দিতে বিচারকের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। তিনি আরও বলেন, একটি সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে দণ্ডিত করার বহু নজির ও উচ্চ আদালতের দেয়া সিদ্ধান্ত রয়েছে।

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন

নৌকা ডোবালেন ২৬৭ আওয়ামী লীগ নেতা

নৌকা ডোবালেন ২৬৭ আওয়ামী লীগ নেতা

তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোলার একটি কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি। ছবি: নিউজবাংলা

রোববারের ভোটের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের সবচেয়ে বেশি ধরাশায়ী করেছেন খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আওয়ামী লীগ নেতারা। সেখানে আওয়ামী লীগের যতজন জিতেছেন, তার প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে জয় পেয়েছেন মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী নেতারা। আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান থাকা ঢাকা ও রংপুর বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্রোহী নেতা হারিয়ে দিয়েছেন নৌকার প্রার্থীদের। অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগে বিদ্রোহী প্রার্থীরা তুলনামূলক কম ভালো করেছেন।

রোববারের ভোটে সারা দেশে যেসব ইউনিয়নে ভোট হয়েছে, এর মধ্যে কয়েকটিতে ফলাফল স্থগিত আছে। বাকিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৩৯টি ইউনিয়নে জয় পেয়েছে নৌকা মার্কা নিয়ে লড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬৭টি ইউনিয়নে জয় পেয়েছেন দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে লড়াই করা প্রার্থীরা।

এর আগের দুই ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও নৌকা ডুবিয়েছেন কয়েক শ আওয়ামী লীগ নেতা। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বহিষ্কারের পদক্ষেপ, ভবিষ্যতে আর কখনও মনোনয়ন না দেয়ার সতর্কতার পরেও বিদ্রোহী নেতারা সেসব গা করেননি। বরং প্রায় ৩০০ এলাকায় তাদের জয় এটা নির্দেশ করছে যে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন আসলে ভুল মানুষের হাতে উঠেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য আব্দুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দল থেকে যাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তাদের বিচার-বিবেচনা করেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। আমরা মনে করি, তাদের জয়ে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণে যে নির্বাচন হয়েছে এটা নির্বাচনের সৌন্দর্য।’

বিজয়ী বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে আগের সিদ্ধান্তেই অটল থাকবে আওয়ামী লীগ বলে জানান দলের এই নেতা। বলেন, ‘তাদের জন্য আগের চেয়ে কঠোর সিদ্ধান্তও আসতে পারে।’

জাতীয় নির্বাচনের দুই বছর বাকি থাকতে স্থানীয় সরকারের মনোনয়ন নিয়ে দলের মধ্যে তৃণমূলে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা আগামী নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না- এমন প্রশ্নে আবদুর রহমান বলেন, ‘এটা আমরা মনে করি না। কারণ একজন প্রার্থী স্থানীয় নির্বাচনে দলের বিরুদ্ধে গেলেও তিনি একজন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। তাই জাতীয় নির্বাচনে তিনি ঠিক দলের বিরুদ্ধে যাবেন না।’

রোববারের ভোটের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের সবচেয়ে বেশি ধরাশায়ী করেছেন খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আওয়ামী লীগ নেতারা। সেখানে আওয়ামী লীগের যতজন জিতেছেন, তার প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে জয় পেয়েছেন মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী নেতারা।

আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান থাকা ঢাকা ও রংপুর বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্রোহী নেতা হারিয়ে দিয়েছেন নৌকার প্রার্থীদের। অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগে বিদ্রোহী প্রার্থীরা তুলনামূলক বিচারে কম ভালো করেছেন।

নৌকা ডোবালেন ২৬৭ আওয়ামী লীগ নেতা

নৌকা-বিদ্রোহী সমানে সমান

খুলনা বিভাগে নৌকা নিয়ে ৬০ জন নেতার জয়ের মধ্যে ৫৮ জনই জিতে গেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিদ্রোহী নেতারা।

এই বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে ভোট হয়েছে ৯টিতে। এর মধ্যে চার জেলাতেই বিদ্রোহীরা জিতেছেন দলের প্রার্থীর চেয়ে বেশি। একটিতে ‘দুই পক্ষের’ আসন সমান সমান।

এর মধ্যে নড়াইলে নৌকা নিয়ে জিতেছেন কেবল দুজন। অপরপক্ষে দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহীরা জিতেছেন ১০টিতে।

খুলনার রূপসা ও তেরোখাদা উপজেলার মধ্যে ভোট হয়েছে ৭টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে জিতেছেন ৫ নেতা। দুজন নৌকা না পেয়ে প্রার্থী হয়ে জিতেছেন।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ এবং দেবহাটা উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৭টি ইউনিয়নে।

এর মধ্যে নৌকা জিতেছে মোট ৬টিতে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী জিতেছেন ৫টিতে।

এই বিভাগের বাগেরহাটে তৃতীয় দফায় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়নি।

যশোরের তিন উপজেলা শার্শা, বাঘারপাড়া ও মনিরামপুরের ৩৫টি ইউনিয়নের ২১টিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। বাকিগুলোর মধ্যে ১১টিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ভোট হয়েছে মোট ১৪টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা জিতেছেন ৪টিতে। ৯টিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

মেহেরপুর সদর ও গাংনী মিলিয়ে ভোট হয়েছে ৬টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা জয় পেয়েছে তিনটিতে। তিনটিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ভোট হয়। এদের মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ৫ জন। বাকি ৮ স্বতন্ত্র প্রার্থী জিতেছেন। এদের মধ্যে ৭ জনই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী।

মাগুরার মহম্মদপুর ও শালিখা উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৫ ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা জয় পেয়েছে মোট ৯টিতে। পাঁচটিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

নৌকা ডোবালেন ২৬৭ আওয়ামী লীগ নেতা

নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা নিয়ে জয় পেয়েছেন দুজন। বাকি ১০ জনের সবাই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে ভোটে লড়েছেন।

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর ও কালীগঞ্জের ১৬ ইউনিয়নের মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগেই নির্বাচিত হন তিনজন। রোববারের ভোটে জেতেন ৫ জন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জিতেছেন ৬ জন।

একই বিষয় দেখা গেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এই বিভাগে নৌকা নিয়ে ৩৮ জন পাস করেছেন। অন্যদিকে নৌকা না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জিতেছেন ৩২ নেতা।

এই বিভাগের চার জেলার মধ্যে নেত্রকোণায় নৌকার প্রার্থীর চেয়ে বেশি জিতেছেন বিদ্রোহীরা। ময়মনসিংহ জেলায় দুই পক্ষের অবস্থান প্রায় সমান সমান।

ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা মিলিয়ে ভোট হয়েছে মোট ২৭টি ইউনিয়নে। এসব ইউনিয়নের মধ্যে ১৪টিতে জিতেছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। ১১টিতে জিতেছেন বিদ্রোহীরা।

নেত্রকোণায় ভোট হয়েছে কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও পূর্বধলা উপজেলার ২৪টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে ৮টিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। ১৩টিতে নৌকাকে হারিয়ে জিতেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

শেরপুরের নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ২১টি ইউনিয়নে।

এর মধ্যে নকলায় ৯ ইউনিয়নের মধ্যে ৪টিতে নৌকা, ৪ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, নালিতাবাড়ীর ১২ ইউনিয়নের মধ্যে ৫টিতে আওয়ামী লীগের নৌকা জিতেছে। বাকি ৭টির দুটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন।

সব মিলিয়ে এই জেলায় নৌকা জিতেছে মোট ৯টি, ৬টিতে জিতেছেন বিদ্রোহী নেতারা।

জামালপুর সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টিতে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকি ১০টির মধ্যে রোববার ৭টিতে নৌকা জিতেছে। একটিতে ফলাফল স্থগিত। দুটিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতারা।

রংপুর বিভাগে নৌকা জিতেছে মোট ৫৯টি ইউনিয়নে। আর বিদ্রোহীরা জিতেছেন ৩৮টিতে। এর মধ্যে দিনাজপুরে নৌকা নিয়ে যতজন জিতেছেন, দলীয় প্রতীক না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জিতেছেন তার চেয়ে বেশি।

এর মধ্যে রংপুরের সদর, কাউনিয়া ও তারাগঞ্জ উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৩ ইউনিয়নে। এর মধ্যে সদরের দুই ইউনিয়নেই জিতেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতারা।

কাউনিয়ায় নৌকা জিতেছে তিনটি ইউনিয়নে। নৌকা না পেয়ে বিদ্রোহী নেতারাও জয় পেয়েছেন তিনটিতে।

তারাগঞ্জ উপজেলায় নৌকা জিতেছে একটিতে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন দুটিতে।

সব মিলিয়ে এই জেলায় নৌকা জিতেছে চারটিতে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা জিতেছেন সাতটিতে।

কুড়িগ্রামের ৩টি উপজেলার ২৭টি ইউনিয়নের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে ১০টি ইউনিয়নে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহ করা নেতারা জয় পেয়েছেন ৪টিতে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৯টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা জিতেছে ৪টিতে। দলের বিদ্রোহীরা জিতেছেন তিনটিতে।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ ও জলঢাকা উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৬টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা জয় পেয়েছে ৭টিতে। বাকিগুলোর মধ্যে একটিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতা।

লালমনিরহাট সদর ও কালিগঞ্জ উপজেলার মোট ১৭টি ইউনিয়নে হয়েছে ভোট। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৭ ইউনিয়নে। দলের বিদ্রোহী নেতারা জয় পেয়েছেন ৪টিতে।

পঞ্চগড় সদর ও আটোয়ারী উপজেলার মোট ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জিতেছেন ছয়টি ইউনিয়নে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহীরা জিতেছেন তিনটিতে।

দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ ইউনিয়নে ভোট হয়েছে মোট ২৩টি ইউনিয়নে।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক জিতেছে সাতটিতে। ৯টিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী নেতারা।

ঠাকুরগাওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও পীরগঞ্জ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে নৌকা জিতেছে ১৪টিতে। একটিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়েও ভোটে লড়া এক নেতা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম বিভাগের যে চিত্র

ঢাকা বিভাগে নৌকা নিয়ে ৫৯ জনের জয়ের বিপরীতে দলের বিদ্রোহী নেতারা জয় পেয়েছেন ৩৮টি ইউনিয়নে। এই বিভাগের দুই জেলা মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে ভোট হয়েছে দলীয় প্রতীক ছাড়া।

ঢাকা বিভাগের দুই জেলা গাজীপুর ও ফরিদপুরে নৌকা নিয়ে জিতেছেন যথাক্রমে এক ও দুজন। বিপরীতে দলের বিদ্রোহীরা জিতেছেন যথাক্রমে ৬ ও ১২ জন।

ঢাকা বিভাগের মধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা জিতেছে কেবল একটিতে। বাকি ৬টিতে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৪ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৬ প্রার্থী জয় পেয়েছেন। তাদের মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত চারজন।

সোমবার ভোট হয় চারটিতে। এর মধ্যে দুটিতে জিতেছেন নৌকার প্রার্থী, একটিতে জাতীয় পার্টি এবং একটিতে কোনো দল না করা নেতা জিতেছেন।

মুন্সিগঞ্জ সদর ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ২১টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা জিতেছে ১১টিতে। এই জেলায় কোনো বিদ্রোহী নেতা জেতেননি।

নরসিংদী সদর ও রায়পুরার মোট ২২টি ইউনিয়নে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে নৌকা জিতেছে ১৪টি ইউনিয়নে। ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছেন ৭টি ইউনিয়নে।

টাঙ্গাইলের নাগরপুর, মধুপুর ও কালিহাতী উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ২৪টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জিতেছেন মোট ১৬টিতে। দলের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী নেতারা জিতেছেন চারটি ইউনিয়নে।

কিশোরগঞ্জ জেলার তিন উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ২৩টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে কুলিয়ারচর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের সবকটিতে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীরা জিতেছেন।

নিকলী উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা আর একটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার প্রার্থীরা, ৫টিতে জিতেছেন দলের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহীরা।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১০টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জিতেছেন মোট আটটিতে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করা নেতারা জিতেছেন দুটিতে।

রাজবাড়ীর কালুখালী ও বালিয়াকান্দি উপজেলায় ভোট হয় মোট ১৪টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে ৯টিতে জিতেছেন নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। পাঁচটিতে জিতেছেন নৌকা না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করা নেতারা।

ফরিদপুরের জেলার ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসনের মোট ১৫টি ইউনিয়নে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগ জিতেছে একটিতে। নৌকা না পেয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা জিতেছেন ১২টিতে।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টিতে জিতেছে আওয়ামী লীগের নৌকা। একটিতে জিতেছেন দলের মনোনয়ন না পেয়ে লড়াই করা ক্ষমতাসীন দলের নেতা। দুটিতে জিতেছেন কোনো দলীয় রাজনীতি না করা স্বতন্ত্র প্রার্থী।

মাদারীপুর সদর উপ‌জেলার ১৪টি ইউপিতে স্বতন্ত্র সবাই বিজয়ী হ‌য়ে‌ছেন। এই উপ‌জেলায় আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় ম‌নোনয়ন দেয়া হয়‌নি। সেখানে আওয়ামী লীগ পদটি উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

শরীয়তপুরের সোগাইরহাট উপজেলার ৭টি উপজেলায় ভোট হয়েছে। এখানে আওয়ামী লীগ কোনো দলীয় প্রার্থী দেয়নি। যারা জিতেছেন সবাই ক্ষমতাসীন দলেরই নেতা এবং তারা স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করেছেন।

চট্টগ্রামের দুই উপজেলা হাটহাজারী ও রাঙ্গুনিয়ায় ভোট হয়েছে মোট ২৬ উপজেলায়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১০ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। রোববার ভোট হয়েছে ১৬টিতে। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে জিতেছেন ১১ জন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী জিতেছেন ৪টিতে।

রাঙামা‌টির কাউখালী, কাপ্তাই ও রাজস্থলী উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক নিয়ে জয় পেয়েছেন মোট ৭টিতে। এদের মধ্যে তিনজন নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। রোববার ভোট হয় মোট ৫টিতে। এর মধ্যে নৌকা জিতেছে ৪টিতে। ১টিতে জেতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থী।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি ও দীঘিনালার ৭টি ইউনিয়নে ভোট হয় রোববার। এর মধ্যে দুটিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। তিনটির ফলাফল স্থগিত। দুটিতে জয় পেয়েছে জনসংহতি সমিতির নেতারা।

বান্দরবানের রুমা ও আলীকদমের ৮ ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা জিতেছে ৫ ইউনিয়নে। ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী নেতারা জিতেছেন দুটিতে এবং বিএনপির স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী পরিচয়ে জিতেছেন একটিতে।

কক্সবাজারের চকোরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় ভোট হয়েছে মোট ১৬ ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা জিতেছে ৬টিতে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছেন ৫টিতে।

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে একটিতে আওয়ামী লীগের এক নেতা জয় পেয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকি ৪টির মধ্যে দুটি পেয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, দুটি পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়া বিএনপি নেতা।

ফেনীর পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ায় ভোট হয়েছে মোট ৮টি ইউনিয়নে। এর সবগুলোতেই জয় পেয়েছেন নৌকা মার্কার প্রার্থীরা।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ও রায়পুর উপজেলার ২০ ইউনিয়নের মধ্যে ১৪টিতে জিতেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। বাকি ছয়জন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। এদের মধ্যে তিনজন আগেই নির্বাচিত হয়েছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। রোববার ভোট হয়েছে বাকি ১৭টিতে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি, বরুড়া ও হোমনা উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নে রোববার ভোট হয়।

এর মধ্যে ১৫ ইউনিয়নে জয় পেয়েছে নৌকা আর ১১ ইউনিয়নে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী নেতারা।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও দক্ষিণে ভোট হয়েছে মোট ১৮ ইউনিয়নে। এর মধ্যে একটিতে ফলাফল স্থগিত আছে। বাকি ১৭টির মধ্যে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা জিতেছেন ১০টি ইউনিয়নে। নৌকা না পেয়ে বিদ্রোহীরা জিতেছেন ৬ ইউনিয়নে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ৩২ ইউনিয়নে ভোট হয়। ৮ প্রার্থী আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান। রোববার ভোট হয় বাকি ২৪টিতে। এর মধ্যে নৌকা জেতে ৯টিতে। ১১টিতে জয় পান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী নেতারা।

অন্য তিন বিভাগের চিত্র

বাকি তিন বিভাগ রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন। তবে অন্য পাঁচ বিভাগের মতো সংখ্যাটি এত বেশি নয়।

রাজশাহীর পবা ও মোহনপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ১০টিতে আওয়ামী লীগ, দুটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতারা জিতেছেন।

একটি ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় ১১ ইউনিয়নের মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। বাকি ৫টির একটিতে আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী নেতা জিতেছেন।

চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী থাকায় দুটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। ওই দুই ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী।

নওগাঁর মান্দা ও বদলগাছি উপজেলার ২২টি ইউনিয়নে ভোট হয়েছে।

এর মধ্যে মান্দায় ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে তিনজন জিতেছেন। সেখানে নৌকা না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করা আওয়ামী লীগের নেতারা জিতেছেন ৪ ইউনিয়নে।

বদলগাছী উপজেলার আটটির মধ্যে নৌকা জিতেছে ৫টিতে। বাকি তিনটির মধ্যে দুটিতে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতারা। একজন কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।

নাটোরের লালপুর এবং বাগাতিপাড়া উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা প্রতীকে ৫টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জিতেছেন।

নৌকার চেয়ে বেশি জিতেছেন স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করা আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা জয় পেয়েছেন মোট ৬টি ইউনিয়নে।

পাবনার ঈশ্বরদী, চাটমোহর, সাঁথিয়া এই তিন উপজেলার ২৭টি ইউনিয়ন ও বেড়া পৌরসভায় নির্বাচন হয়েছে। বেড়া পৌরসভাসহ ২০টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীক ও ৭টি ইউনিয়নে জিতেছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করা নেতারা।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও বেলকুচি উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৬টিতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা জিতেছেন।

এদের মধ্যে ২ জন জিতেছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। রোববার ভোট হয়েছে বাকি ১৭টিতে। এর মধ্যে ১৪টিতে জয় পান নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। ৩টিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহী নেতারা।

বগুড়ায় ভোট হয়েছে মোট ২৭টি ইউনিয়নে। এর মধ্যে নৌকা নিয়ে জিতেছেন আওয়ামী লীগের ১২ নেতা, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহ করা নেতারা জিতেছেন চারটি ইউনিয়নে।

জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রতিটিতেই জিতেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এর মধ্যে একটিতে জয় এসেছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। রোববার ভোট হয় বাকি চারটিতে।

সিলেট বিভাগে সিলেট জেলার ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিতে আওয়ামী লীগ, ৩টিতে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।

সুনামগঞ্জ সদর ও শান্তিগঞ্জে ভোট হয়েছে।

সদর উপজেলার ৯ ইউনিয়নের একটিতেও জয় পায়নি নৌকা মার্কা। তবে দলের বিদ্রোহী নেতারা জয় পেয়েছেন দুটি ইউনিয়নে।

শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৮ ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা জিতেছে দুটিতে। নৌকা না পেয়ে বিদ্রোহী নেতারা জিতেছেন তিনটিতে।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলার ২৩টি ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জিতেছেন ১২টিতে। দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহীরা জিতেছেন মোট ৭টিতে।

হবিগঞ্জের ২১টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটিতে নৌকা প্রতীক জয় পেয়েছে। ছয়টিতে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা।

বরিশাল বিভাগে নৌকা জিতেছে ১১টিতে, বিদ্রোহীরা ৬টিতে।

এর মধ্যে রিশালের পাঁচটি ইউ‌নিয়‌নে চেয়ারম্যান প‌দে উ‌জিরপু‌রের বামরাইল ও মুলাদীর বাটামারায় আওয়ামী লী‌গের দুজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন।

রোববার উ‌জিরপুরের হারতা ও বাবু‌গঞ্জের রহমতপু‌রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জেতেন। উজিরপুরের গুঠিয়ায় জেতেন দলের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী। সেখানে নৌকার প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।

পি‌রোজপুরের দুটি ইউনিয়নেই জিতেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপ‌জেলার ছয়টি ইউ‌নিয়‌নের মধ্যে চার‌টি‌তে নৌকা ও দুটি‌তে স্বতন্ত্র হিসেবে আওয়ামী লী‌গের বি‌দ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছেন।

বরগুনার পাথরঘাটায় চার‌টি ইউ‌নিয়‌নের মধ্যে একটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতেন আওয়ামী লী‌গের প্রার্থী। বা‌কি তিন‌টি‌তেও জেতেন নৌকা মার্কার প্রার্থীরা।

ভোলার চরফ্যাশন উপ‌জেলার সাত‌টি ইউ‌নিয়‌নের মধ্যে পাঁচটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জেতেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

বা‌কি দুটির ম‌ধ্যে এক‌টি‌তে আওয়ামী লী‌গের প্রার্থী এবং অপর‌টি‌তে আওয়ামী লী‌গের বি‌দ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ ক‌রেন। ‌

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিউজবাংলার জেলা প্রতিনিধিরা

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক

করোনারোগীদের সেবায় গত এপ্রিলে এগিয়ে এসেছিল ট্রান্সজেন্ডারদের সংগঠন বৃহন্নলা। ফাইল ছবি

ক্লিনিকের নামের সঙ্গে ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট’ থাকা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা। তারা বলছেন, ‘রোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় ট্রান্সজেন্ডারদের সম্পর্কে সমাজে ভুল ও নেতিবাচক ধারণা বাড়বে। শৈশবে ট্রান্সজেন্ডার শনাক্ত করা সম্ভব নয় দাবি করে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তনের সার্জারি তাদের ভবিষ্যত জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মত দিচ্ছেন তারা।

ট্রান্সজেন্ডারসহ অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের লিঙ্গ রূপান্তরের জন্য সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) একটি বহির্বিভাগ ক্লিনিক চালু হয়েছে ।

‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক’ এর উদ্বোধন হয়েছে ২১ নভেম্বর। তবে এই ক্লিনিকের নাম এবং লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, আধুনিক বিজ্ঞান ট্রান্সজেন্ডারকে আলাদা লিঙ্গ হিসেবে স্বীকার করেছে। বাংলাদেশেও নারী-পুরুষের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে এই লিঙ্গ স্বীকৃতি পেয়েছে। এমন অবস্থায় ট্রান্সজেন্ডারকে ‘অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গ’ হিসেবে উপস্থাপন করে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ অসংবেদনশীল মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে।

ক্লিনিকের নামের সঙ্গে ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট’ থাকা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন তারা। ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, ‘রোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় ট্রান্সজেন্ডারদের সম্পর্কে সমাজে ভুল ও নেতিবাচক ধারণা বাড়বে।

শৈশবে নারী ও পুরুষের বাইরে ট্রান্সজেন্ডার শনাক্ত করা সম্ভব নয় দাবি করে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তনের সার্জারি তাদের ভবিষ্যত জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মত দিচ্ছেন তারা।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের দাবি, অনেক ভেবেচিন্তেই ক্লিনিকটির এমন নাম রাখা হয়েছে। বিভিন্ন দেশে এই নামে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।

নতুন সেবা উদ্বোধনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মূলত তৃতীয় লিঙ্গসহ অপূর্ণাঙ্গ বা ক্রটিপূর্ণ লিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের শারীরিক ফেনোটাইপ (বাইরের প্রজনন অঙ্গ) ও জেনোটাইপ (জিনগত ভিতরের প্রজনন অঙ্গ) অনুযায়ী সার্জারিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ লিঙ্গে রূপ দিতে ক্লিনিকটি চালু করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, শূন্যের কোটায় আসবে থার্ড জেন্ডার’। সবাই মিলে চেষ্টা করলে এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আন্দোলনে পরিণত করতে পারলে অবশ্যই এই শ্লোগান বাস্তবায়ন করা সম্ভব।”

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক

উপাচার্য বলেন, ‘রূপান্তরিত লিঙ্গ বা ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে মানুষ অনেক কিছুই জানেন না। সমাজে যারা হিজরা নামে পরিচিত চিকিৎসার মাধ্যমে তারা পূর্ণাঙ্গ নারী বা পুরুষে রূপান্তরিত হতে পারেন। শিশুকালেই এ সমস্যা সমাধানের জন্য শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করে চিকিৎসা নিলে ভুক্তভোগীরা দ্রুত মুক্তি লাভ করবে।’

তবে এই বক্তব্য চরম আপত্তিকর বলে মনে করছেন ট্রান্সজেন্ডার নারী তাসনুভা আনান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে প্রথম আপত্তিকর শব্দ তৃতীয় লিঙ্গের শিশু। তাহলে প্রথম লিঙ্গ কারা, দ্বিতীয় বা ‍চতুর্থ কারা? লিঙ্গতে এমন কোনো ক্রমবিভাজন নেই।’

তাসনুভা বলেন, ‘জন্মের পর অনেক শিশুর ক্ষেত্রে সময় মতো যৌন অঙ্গের ডেভেলপমেন্ট হয় না। এদের আমরা ইন্টারসেক্স ফিমেল ও ইন্টারসেক্স মেল বলে থাকি। শিশুদের হারমোন ডেভেলপমেন্ট হয় ৬ থেকে ৭ বছর বয়সে। তখন সে বিপরীত লিঙ্গর প্রতি আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করে।

অপরিণত যৌনাঙ্গের ভিত্তিতে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তনের চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ দাবি করে তিনি বলেন, ‘ওই বয়সে বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে সার্জারি করার পর বড় হয়ে শিশুটি যদি মনে করে পরিবর্তিত লিঙ্গটা সে বিলং (ধারণ) করছে না, তাহলে কী ঘটবে? তখন যদি সে ভারসাম্যহীন জীবনে চলে যায় তার দায়িত্ব কে নেবে? বর্তমানে বিশ্বে যেসব ইন্টারসেক্স শিশু রয়েছে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজেরাই নিজেদের লিঙ্গের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এটি রাষ্ট্র বা বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নয়।’

অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গের সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও উল্লেখ করেন তাসনুভা। ‘ট্রান্সজেন্ডারের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা’র লক্ষ্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এটি একটি স্বতন্ত্র লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য। আমি তো বায়োলজিক্যালি পুরুষ বা নারী নই। তাহলে কেনো আমাকে আমার মতো থাকতে দেয়া হবে না। আমাকে জোর করে কেনো খোপের মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে!’

ক্লিনিকের নামকরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “তারা ব্যবহার করছে ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক। সেক্স ডেভেলপমেন্টে ডিসঅর্ডার কী রকম, এটা আমি বুঝতে পারছি না। এমন হলে সাধারণ মানুষ ট্রান্সজেন্ডারকে এক ধরনের রোগী হিসেবে ধরে নেবে। মনে করবে তারা ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। এই নামের পরিবর্তে তারা ‘সেক্সুয়াল রিঅ্যাসাইন সেন্টার’ নাম দিতে পারত।”

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক

ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট হোচিমিন ইসলামও বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করেছেন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শিশুদের এই চিকিৎসা দেয়ার উদ্যোগ একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত ও ভুল কাজ।’

‘কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সেক্স অর্গান স্পষ্ট হয় না। এমন সন্তান যখন জন্ম নেয় তখন আমাদের সামাজে অভিভাবকেরা চান সার্জারি করে ছেলে সন্তান বানাতে। ওই বাচ্চাটি বড় হয়ে যদি দেখে তার ইমোশন মেয়েদের মতো, তখন সে ভাবতে থাকে কেনো আমাকে ছেলে বানানো হলো। এমন জটিল সমস্যায় ভোগা অনেক ব্যক্তি আমাদের সামনেই রয়েছে।’

ট্রান্সজেন্ডারের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করে হোচিমিন বলেন, ‘ট্রান্সজেন্ডারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের আত্মার সঙ্গে সত্তার মিল থাকে না। ফলে সেক্স ডিজঅর্ডার বা লৈঙ্গিক ত্রুটির সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই।’

তিনি বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রতিবছর যে ডিরেক্টরি বের হয় সেখানে শিশুর লৈঙ্গিক অপূর্ণতাকে ডিসঅর্ডার বলতে নিষেধ করা হয়েছে।’

হোচিমিন এবং তাসনুভা দুজনেই মনে করছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার আগে ট্রান্সজেন্ডারদের সঙ্গে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের আলোচনা করা উচিত ছিল।

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক
দুই ট্রান্সজেন্ডার নারী হোচিমিন ইসলাম (বাঁয়ে) এবং তাসনুভা আনান শিশির

তবে উদ্যোগটি নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই বলে দাবি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ হোসেন।

ট্রান্সজেন্ডারকেও একটি ‘রোগ’ দাবি করে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট একটি ডেভেলপমেন্টমূলক রোগ। এই নামটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এর আগে ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স এসব নামে এগুলো পরিচিত ছিল। তবে টার্ম নিয়ে আপত্তির কারণে সবগুলোকে এখন ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বলা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই নামটি শিকাগো থেকে ২০০৫ সালে নির্ধারণ করা হয়েছে, আমাদের টেক্সবুকেও রয়েছে। এই ডেভেলপমেন্টমূলক রোগ শিশুদের জন্ম থেকেই দেখা যায়।’

অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ হোসেন ট্রান্সজেন্ডারকে ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট হিসেবে দাবি করলেও বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ দুটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেস (এনএইচএস) বলেছে, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি হলেন এমন কেউ যিনি নিজের জন্মগতভাবে পাওয়া লিঙ্গের সঙ্গে নিজের মনোগত লিঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যের তফাৎ অনুভব করেন।

অন্যদিকে এনএইচএস-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বা ডিএসডি হলো বিরল একটি শারীরিক অবস্থা যার সঙ্গে জিন, হরমোন এবং যৌনাঙ্গসহ প্রজনন অঙ্গের অপূর্ণাঙ্গতা জড়িত। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির যৌন বিকাশ অন্যান্য মানুষের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এনএইচএস সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসডির পূর্ণাঙ্গ অর্থের ক্ষেত্রে ‘ডিসঅর্ডার’ শব্দটিও আর ব্যবহার করছে না। তারা ডিএসডিকে বলছে ডিফারেন্সেস ইন সেক্স ডেভেলপমেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির সেন্ট লুইস চিলডেন হসপিটালের ওয়েবসাইটে ট্রান্সজেন্ডার ও ডিএসডি আলাদা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ট্রান্সজেন্ডার এবং ডিএসডি এক জিনিস নয়। ট্রান্সজেন্ডাররা জন্মের সময় প্রাপ্ত লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যকে নিজের বলে মনে করেন না।

উদাহরণ দিয়ে হাসপাতালটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, একজন ট্রান্সজেন্ডার নারীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও পরে তিনি নিজেকে মানসিকভাবে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন। এসব মানুষ চাইলে হরমোন থেরাপি বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের পছন্দসই লিঙ্গ বেছে নিতে পারেন।

অন্যদিকে, ডিএসডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরবৃত্তীয় বিকাশ বা হরমোন উৎপাদনে তারতম্য দেখা যায়। এ ধরনের বেশিরভাগ শিশুর জেন্ডার তাদের নির্ধারিত লিঙ্গের ভিত্তিতেই চিহ্নিত হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।

বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ ট্রান্সজেন্ডারদের ‘রোগী’ হিসেবে দাবি করলেও ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ট্রান্সজেন্ডারকে আলাদা লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি দেয়। এটি কোনো মানসিক রোগ নয় বলেও সিদ্ধান্ত দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক
বিএসএমএমইউতে ২১ নভেম্বর ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক’ এর উদ্বোধন হয়

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় ভাবে ট্রান্সজেন্ডারকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রেও তাদের আলাদা লিঙ্গ স্বীকার করা হয়েছে। এর পরেও তাদের কেন ‘রোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, এমন প্রশ্নে বিএসএমএমইউর অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের মেডিক্যাল রিলেটেড নামটিই রেখেছি। আর আমাদের চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই নাম দেয়া হয়েছে। আমরা আগেও এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছি। তবে আগে একটা ডিভিশনের আন্ডারে করতাম না। এখন সেটা শুরু হচ্ছে।’

শিশুদের ক্ষেত্রে লিঙ্গ পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করলে অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ বলেন, ‘যাদের বাবা-মা সন্তানের চিকিৎসার জন্য রাজি হয়ে আমাদের এখানে আসবে তাদের আমরা সার্জারি করব। আমাদের সমাজ আর ওয়েস্টার্ন সমাজ এক নয়। আমাদের সমাজের বাচ্চারা বাবা-মায়ের উপরে নির্ভর করে। তারা যদি রাজি হয় আমাদের চিকিৎসা দিতে সমস্যা নেই।’

আরও পড়ুন:
কোরবানির জন্য ২৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার পশু
‘এহন আর ঘাটত ঘাটত চান্দা দিওন লাগবো না’
৫০০ টাকায় ব্রাহামা গরু
চাঁদাবাজি: গরু নিয়ে টানাটানি করলেই ব্যবস্থা
ট্রেনে গরু পরিবহন শুরু

শেয়ার করুন