চামড়া শিল্পনগরীর ‘গোড়ায় গলদ’

চামড়া শিল্পনগরীর ‘গোড়ায় গলদ’

বড় কারিগরি প্রকল্প সাভার বিসিক চামড়া শিল্পনগরী।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর অব্যবস্থাপনার জন্য বুয়েটকে দুষেছেন। তবে প্রকল্প পরিচালক বলছেন, এককভাবে দায়ী নয় কেউ। শুরু থেকেই প্রকল্পটি ছিল ভুলে ভরা।

দেশে প্রথম বড় কারিগরি প্রকল্প সাভার বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর যাত্রা শুরু থেকেই ছিল ভুলে ভরা। এটির নকশায় ভুল ছিল। বাস্তবায়নেও ভুল হয়।

এটির নকশা প্রণয়নের জন্য দেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা না থাকায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ডাকা হয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে। তারা যে নকশা দিয়েছিল, সেটিতে ছিল ভুল।

পরে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব যে চীনা কোম্পানিকে দেয়া হয়, সেখানেও হয় আরেক ভুল। তাদের স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও সুনাম এ প্রকল্পে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

খোদ বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক জিতেন্দ্রনাথ পাল বলেছেন, প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও কোনো একক ব্যক্তি ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে আজকের চামড়া শিল্পনগরীর বর্তমান বাস্তবতায় কে দায়ী, কে ব্যর্থ, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষকে কোনো পক্ষের দোষারোপ না করাই ভালো।

গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান আন্তর্জাতিক মানের চামড়া শিল্পনগরী না হওয়া ও সময়ক্ষেপণের পেছনে প্রকল্পের দেশি কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) দায়ী করেন।

এটির পরামর্শকের দায়িত্বে ছিলেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধান (পরিবেশ প্রকৌশল) অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেইন।

অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফ আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে এই উপদেষ্টা বলেন, ‘শিল্পটিকে কমপ্লায়েন্স না করতে পারার অন্যতম কারণ হলো, যে চায়নিজ ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তারা সঠিকভাবে কাজটি করেনি। আরেকটা কথা আমি বলতে চাই। এই সাভার সিইটিপির হোল থিংক, একটা তো ছিল কন্ট্রাক্ট বা কন্ট্রাক্টর। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে, কন্ট্রাক্টরের চেয়ে বড় দোষ হলো কনসালটেন্টের। এখানে কনসালটেন্টটা ছিল আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকার যখনই কিছু করতে চায় তখন বুয়েটকে বলা হয়। তারা একটা সুপারিশ দেয়, আমরা সেটি গ্রহণ করি। এটাই হলো গভর্নম্যান্টের মাইন্ডসেট।

‘কিন্তু এই সিইটিপি কেইসে আমি কিন্তু মনে করি বুয়েট আমাদের কিন্তু সাংঘাতিকভাবে লেটডাউন-ই করে নাই, দেশের সাংঘাতিক রকম ক্ষতি করেছে। আই হ্যাভ অ্যাট ট্রিমেন্ডাস নাম্বার অফ মিটিং দ্যাট- বুয়েটের যে কনসালটেন্ট আছেন, উনি সব সময় আমাদের এনশিউর করতেছে আগামী ১৫-২০ দিনে এটা ঠিক হয়ে যাবে। লাস্টে যখন এটা হলো না তখন উনি ব্লেইম করতে শুরু করলেন, যারা এটা ব্যবহার করেন তারা ঠিকমতো ব্যবহার করছেন না। ওনাদের বুয়েটের নিজের ডিজাইনে যে ফল্ট আছে, কন্ট্রাক্টরদেরকে কন্ট্রোল করার যে ফল্ট আছে- ওইগুলো নিয়ে কিন্তু ওনারা কোনো দিন এটা স্বীকার করতে রাজি হন নাই।’

উপদেষ্টার এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিউজবাংলা বুয়েট পরামর্শক অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেইনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করে।

দেলোয়ার হোসেইন বলেন, ‘প্রকল্পটির টেন্ডার আহ্বান করেছে বিসিক। এর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও ছিল বিসিক। বুয়েট সেখানে সিইটিপি নির্মাণকাজের সুপারভিশন ও মনিটরিংয়ে কনসালটেন্ট নিয়োগ পায়। সেখানে পরামর্শক হিসেবে বুয়েটের যা করণীয় সঠিকভাবেই তা করেছে।’

চামড়া শিল্পনগরীর ‘গোড়ায় গলদ’
প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান

বুয়েট বা আমি তো কোনো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নই- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমি তো কাউকে বাধ্য করতে পারি না। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরিটি হচ্ছে বিসিক বা শিল্প মন্ত্রণালয়। যাদের সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে প্রতি মাসে রিপোর্টও করা হতো। সেখানে আমার বা বুয়েটের দোষটা কোথায়? ভুলটাই বা কী করল?’

বুয়েট পরামর্শকের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিউজবাংলা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ সাভার বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক জিতেন্দ্রনাথ পালের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দেরিতে হলেও দেশে একটি চামড়া শিল্পনগরী চালু হয়েছে। সেখানে উৎপাদনও হচ্ছে। এর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারও (সিইটিপি) পুরো ফাংশনাল, যা নিয়মিত রাসায়নিক বর্জ্য মিশ্রিত পানি সাফল্যের সঙ্গে পরিশোধন করে যাচ্ছে। এর সুফলও পাচ্ছে ট্যানারিগুলো। এখন দরকার কী করে প্রকল্পটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করা।

আগে কে কী করেছে, কার দোষ কোথায়, সেদিকে না যাওয়াই ভালো। কারণ, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একার দায়িত্ব ছিল না। সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই চামড়া শিল্পনগরীটি আজকের পর্যায়ে এসেছে।

দেশে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে পরিবেশবান্ধব ও সুপরিকল্পিত একটি চামড়া শিল্পনগরীর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর প্রকল্পটি যাত্রা শুরুর আগেই নানা কারণে নষ্ট হয় ১৫টি বছর।

অবশেষে ট্যানারি মালিকরা হাজারীবাগ ছেড়ে প্রকল্প এলাকায়ও যেতে বাধ্য হন, উৎপাদনে থাকা প্রকল্পের বয়সও ইতিমধ্যে তিন বছর পার হয়েছে। কিন্তু গত ১৮ বছরেও আন্তর্জাতিক মানে রূপ পায়নি বহুল আলোচিত এই প্রকল্পটি।

নিউজবাংলার সঙ্গে আলোচনায় সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন সাভার বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক।

জিতেন্দ্রনাথ পাল বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বিসিক এটা যেমন ঠিক, আবার এ দায়িত্ব কেউ একা পালন করেনি, যখন যে এসেছে সে দায়িত্ব সামলেছে- সেটাও দেখতে হবে। সেখানে অনেক কিছু দেখার ছিল এবং বাস্তবতা মেনে চলারও যথেষ্ট কারণ ছিল।’

প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন, ‘এর আগে বাংলাদেশে এত বড় কারিগরি প্রকল্প দ্বিতীয়টি হয়নি। যে কারণে প্রকল্পের নকশা থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের জন্যও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে হয়। দোষ বা ভুল যদি কিছু হয়ে থাকে, সেখানেই হয়েছে, যা আমাদের কারিগরি জ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারণার অভাবেই হয়েছে।’

নকশা প্রণয়নেও বড় ভুল ছিল জানিয়ে জিতেন্দ্রনাথ পাল জানান, ‘একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠান ওই দরপত্রে অংশ নিয়েছে। তারা চামড়া শিল্পনগরীর জন্য যে নকশা দিয়েছে, সেখানেও একটা বড় ভুল ছিল। বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতায় সচল ট্যানারিগুলোর বর্জ্য পরিশোধনে সিইটিপির সক্ষমতার দরকার ছিল দৈনিক অন্তত ৫০ হাজার কিউবিক লিটারের, কিন্তু সেখানে নকশা দেয়া হয়েছিল মাত্র ২৫ হাজার কিউবিক লিটার পানি পরিশোধনের সক্ষমতার। বর্তমান চাহিদার তুলনায় এই সক্ষমতা খুবই কম।’

চামড়া শিল্পনগরীর ‘গোড়ায় গলদ’


এ ছাড়া ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে যে ঠিকাদারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারাও কারণে-অকারণে যথেষ্ট সময় নষ্ট করেছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় চালু হওয়ার অল্প দিনের মধ্যেই প্রকল্পটির স্থাপিত মেশিনারিজের জীবনকাল সক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে ফুরিয়ে গেছে, কোনো ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে। আবার চালু হওয়ার পর সেগুলোর নতুন করে কখনও ওভারহেলিংও করা হয়নি। যার কারণে আজকে সিইটিপি ও সলিড ওয়েইস্ট ম্যানেজমেন্টসহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে এত কথাবার্তা।’

কেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখা গেল না, জানতে চাইলে জিতেন্দ্রনাথ পাল বলেন, ‘ওই যে আগেই বলেছি, এ ধরনের কারিগরি প্রকল্প বাংলাদেশে আগে কখনও হয়নি। যে কারণে ডাকতে হয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে। এরা অনেক ভুগিয়েছে আমাদের। তা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিসিক বা শিল্প মন্ত্রণালয় কঠোর হতে পারেনি, যদি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বেঁকে বসে- এই আশঙ্কায়।’

এমন আশঙ্কা কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমনিতেই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল দেরি হয়েছে। সব মহলেরই একটা চাপ ছিল প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করার। যদিও ওদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ৪০ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়। এর বেশি কিছু করা যায়নি, ওরা যদি প্রকল্প ছেড়ে চলে যায় তাহলে পুনরায় আবার টেন্ডার ডাকতে হবে, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাইয়ে সময় লাগবে। এতে ব্যয়ভার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও দীর্ঘসূত্রতায় গড়াবে- এটা ছিল ভয়।’

তাই কাউকে ঢালাওভাবে বিসিককে, বুয়েট পরামর্শককে দোষারোপ না করে সবাইকেই বাস্তবতা বোঝার অনুরোধ করেন তিনি।

অবশ্য কথাবার্তার একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্পে কারিগরি নানা দিক নিয়ে তখন বুয়েটেরও তেমন সক্ষমতা ছিল বলে মনে হয় না। থাকলে আজকের প্রেক্ষাপট নিয়েও ভাবনায় আসত। কারণ, দেশে যেটুকুই কারিগরি জ্ঞানের বাতিঘর বলা হয়, তা শুধু বুয়েটেরই আছে।’

তবে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘রুটিনওয়ার্ক, ওভারহেলিংয়ের মাধ্যমে যেখানে যেটা প্রয়োজন তা পুনঃস্থাপন ও মেরামত এবং সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে উদ্যোক্তাদের নিয়মের মধ্যে পরিচালিত করা গেলে এই চামড়া শিল্পনগরীই আন্তর্জাতিক মানের বিবেচিত হবে।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য