মাছ শিকারি একদল যাযাবর

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

পলিথিনে বানানো অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে যাযাবর জীবন যাপন করছে জেলে পরিবারগুলো। ছবি: নিউজবাংলা

বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গোয়ালট্যাক চকে অস্থায়ী আবাস গেড়েছে মাছ শিকারি কিছু যাযাবর পরিবার। প্রায় তিন মাস পলিথিনের তৈরি ঘরে তারা বসবাস করছে নির্জন প্রান্তরে। প্রতিবছর এরা আসে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থেকে।

শহুরে কোলাহলের পাশে নিস্তব্ধ জঙ্গল। চারদিক পানিতে ঘেরা ছোট্ট টিলায় কাশবনের আড়ালে গুটি কয়েক মানুষের বসবাস। কোনো রকমে দুমুঠো খাবার আর মলিন পোশাক ছাড়া বাকি মৌলিক চাহিদা নাগালের বাইরে তাদের।

পলিথিনে বানানো অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে যাযাবর জীবন যাপন করছে জেলে পরিবারগুলো। রাতে শিয়াল আর সাপের আতঙ্ক যেন তারা মেনেই নিয়েছে জীবনের অংশ হিসেবে। তবে শিশু আর বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে উৎকণ্ঠা বেশি।

রাজধানীর নিকটবর্তী সাভার উপজেলা সবার কাছে পরিচিত শিল্পাঞ্চল হিসেবে। দ্রুত শিল্পায়নের ফলে একসময়কার পল্লিপ্রান্তর এখন আধুনিক শহর। এখানে বসবাস প্রায় ২০ লাখ মানুষের।

আশুলিয়ার নলাম এলাকায় বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গোয়ালট্যাক চকে অস্থায়ী আবাস গড়েছে মাছ শিকারি কিছু যাযাবর পরিবার। প্রায় তিন মাস পলিথিনের তৈরি ঘরে তারা বসবাস করছে নির্জন প্রান্তরে। এরা নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থানার নগরথানাই খাড়া গ্রামের ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের কয়েক মাস আগে থেকে ওই জঙ্গলের টিলা গোয়ালট্যাক চকে আসে যাযাবর পরিবারগুলো। রাতভর নৌকা নিয়ে তারা বংশী নদীতে মাছ ধরার জন্য চাই (ফাঁদ) পাতে। সকালে সেই মাছ আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করেন।

মাঝেমধ্যে এলাকার লোকজন তাদের কাছ থেকে দেশীয় প্রজাতির শিং, টাকি, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন মাছ কিনে নেয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের অনেকেই দাম কম দেন। আবার কখনও জোর করে মাছ নিয়েও চলে যান। এ জন্য স্থানীয় লোকজনের কাছে অনেক সময় তারা মাছ বিক্রি করতে চান না।

নলাম এলাকার কয়েক কিলোমিটার মেঠোপথ আর কাশবন পেরিয়ে এই চকে গিয়ে দেখা যায়, বংশী নদীর পাশে জঙ্গলের ভেতর ছোট ছোট বেশ কয়েকটি ঘর। বাঁশের কাঠামোর সঙ্গে পলিথিন মুড়িয়ে বসবাসের জন্য তৈরি করা হয়েছে এসব অস্থায়ী নিবাস। ভেতরে ছোট্ট পরিসরের মধ্যে একেকটি ঘরে গাদাগাদি করে থাকছেন পাঁচ-ছয়জন। ওই জায়গাতেই রান্নার জন্য বসানো হয়েছে চুলা। সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় দূর থেকে আনতে হয়।

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

দুপুর ১২টা নাগাদ এসব জেলে পরিবারের কর্তাদের দেখা মেলে না। তারা চলে যান নদীতে রেখে আসা ফাঁদ থেকে মাছ সংগ্রহ করতে। আর স্ত্রীরা তখন রান্নাবান্না আর শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত। মাছ শিকারিদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তারা জানান তাদের নানান দুঃখ-দুর্দশা আর হতাশার কথা।

জেলে ইসরাফিল খাঁর স্ত্রী হাসি বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাগে দেশের বড়াইগ্রামে পরায় সবার এটাই পেশা। আমরা একিনে মাছ ধরি। তাই আমরা এই খালের পাড়েই থাকি। বাসা ভাড়া আমেগে দিলে পুসায় না। তাই পোলাপান লিয়া কষ্ট করে আমরা একিনেই থাকি। খালি খাওয়ার পানিটা টানেথেন টাইনা আনি। আর গোসল-মোসলতো সব নদীতেই করি। এভাবেই আমাগের জীবন কাটে।

‘পরায় ৫-৬ মাস থাকি আমরা এই জায়গায়। তারপরে আবার দ্যাশে যাই। বান আসার সময় হইলে আবার আমরা চইলা আসি।’

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

বিরান জায়গায় নিরাপত্তার অভাব নিয়ে প্রশ্ন করলে হাসি বেগম বলেন, ‘পরায় আমরা অনেক দিন যাবৎ একিনে আসা-যাওয়া করি। এই গিরামডা আমাগে নিজেগো গিরামের মতো হয়্যা গেছে, সবাই পরিচিত। ত্যা আমার একিনে অন্য কোনো সমেস্যা নাই। অন্য গিরামে গেলেও আশেপাশেই থাকি। তারপরে অনেক পানি যখন হয়্যা যায়, তখন অন্য জায়গায় যাই।

‘শিয়াল বিরক্ত করে। অনেক সাপ আছে এই জায়গায়। আমরা সাপ দেখিও মারি না। অনেক সময় ঘরের ভিতর, বিছনার ভিতর সাপ দেখা যায়। আমরা তাড়ায়া দেই। তাগো শরীলে আঘাত করি না। শিয়াল-সাপের ডরে অনেকেই আসে না এই পাড়ার। তা-ও আমরা এই জাগায় বসবাস করি।’

নদীতে মাছ পাওয়া না গেলে সমস্যার বিষয়ে বলেন, ‘আমাগের কষ্টই হয়। হয়তে কেউ সাইডে কাজে যাই। কেউ কামলা দিতে যায়। এইভাবেই দিনকাল কাটে। আমরা সবাই খুব অভাবী মানুষ।'

সরকারি কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে বলেন, ‘প্রোকিতোই (প্রকৃত) আমরা মৎসজীবী। আমরা মাছ ধরি খাই। আমাদের মৎসজীবীর কাড করি দিছে সরকার থেকে। কতা ছিল, যে ছয় মাস পানি থাকে না, এই ছয় মাস আমাগের সরকার থাকি খাবার দিবি। এখন আমরা কোনো অনুদানি পাই না। গিরামের যারা নেতা আছেন তাগের কাছে বললে কয়, য্যাখিন সময় হয় তখুন দিবি। আমাগের কাড আছে কিন্তু আমরা এখুনো কোনো অনুদান পাইয়া সারি নাই।

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

হাসি বেগমের ছোট ছেলে পুরোদস্তুর জেলে কিশোর আল আমিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পানির ভিতরে নিয়া মাছের ফাঁদ পাইতা থুই। রাতের দিক দিয়া পাতি। সকাল বেলা ওঠাই। আবার বিকালে পাইতা থুইয়া আসি। পরে চেংটি, টাহি, খইলশা, দুই-চারডা সিংগি মিংগি পাওয়া যায় আরকি। মাছ ধরতে অনেক ভাল্লাগে।’

নলাম এলাকার বাসিন্দা আশরাফ হোসেন কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম আসার আগে ওই চকে জেলেদের প্রায় ১০-১৫টি পরিবার আসে মাছ ধরতে। তারা বংশী নদীর তীরে জঙ্গলের মধ্যে পলিথিনের তৈরি ঘরে বসতি গড়ে। ওখানেই ছয়-সাত মাস থেকে আবার চলে যায়। আমরা যারা এলাকায় থাকি, তারা নদীর দেশীয় মাছ তাদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে পাই। কিন্তু এলাকার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মাঝেমধ্যে মাছ নিয়ে নামমাত্র টাকা দেয়। আবার অনেকে টাকা না দিয়েই মাছ নিয়ে চলে যায়। এ জন্য তারা স্থানীয়দের কাছে মাছ বিক্রি করতে চান না।’

ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা না দিয়ে কেউ জোর করে মাছ নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে বিষয়টা স্থানীয় থানাকে জানাতে হবে। পাশাপাশি ইউএনও মহোদয়কেও লিখিতভাবে অবহিত করলে এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার সিনিয়র মৎস্য অফিসার জাহাঙ্গীর আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চার-পাঁচ বছর আগে একটা সরকারি প্রজেক্টের মাধ্যমে রাজশাহী প্রকল্প থেকে মৎসজীবী কার্ড দেয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে রাজশাহী প্রকল্প থেকে ৪০ জনের একটা বরাদ্দ দিয়েছিল কমিটির মাধ্যমে, ওটা দিয়েছি। এদিকে খাদ্য সহায়তা নাই। এদিকে মৎস্য আইন বাস্তবায়ন হয় না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যেখানে সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, সেসব অঞ্চলে দেয়া হয় এগুলো।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

কঙ্কালসার ভবনটিই সেই বিশ্ব বিজ্ঞানাগার

কঙ্কালসার ভবনটিই সেই বিশ্ব বিজ্ঞানাগার

হেমায়েতপুরের শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের স্মৃতি বিজড়িত বিশ্ব বিজ্ঞানাগার ভবন দুটির বেহাল দশা। ছবি: নিউজবাংলা

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আশ্রমের ভক্তদের অভিযোগ, ভবন দুটির সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হলেও নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। উপরন্তু সেখানে প্রায়ই হানা দিচ্ছে চোর। তারা ভবনের রডসহ অবশিষ্ট সামগ্রী খুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে।

পলেস্তারা খসে গেছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছে গুল্ম লতা। নেই দরজা কিংবা জানালা। আছে শুধু কঙ্কালসার দেহটি।

বলছি পাবনার হেমায়েতপুরের শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের স্মৃতি বিজড়িত বিশ্ব বিজ্ঞানাগার ভবন দুটির কথা। পাবনা মানসিক হাসপাতালের সামনে হলেও এগুলোর ভাগ্যে যেন শুধুই বঞ্চনা।

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আশ্রমের ভক্তদের অভিযোগ, ভবন দুটির সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হলেও নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। উপরন্তু সেখানে প্রায়ই হানা দিচ্ছে চোর। তারা ভবনের রডসহ অবশিষ্ট সামগ্রী খুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে।

বিভিন্ন নথি ঘেঁটে জানা যায়, শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পাবনার হেমায়েতপুরে জন্ম নেন। ১৯২৯ সালে তিনি সেখানে অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি একে একে গড়ে তোলেন সৎসঙ্গ তপোবন বিদ্যালয়, সৎসঙ্গ মেকানিক্যাল ও ইলেট্রিক্যাল ওয়ার্কসপ, প্রেস ও পাবলিকেশন হাউস, কুঠির বিভাগ, ব্যাংক, বিশ্ব বিজ্ঞানাগারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

কঙ্কালসার ভবনটিই সেই বিশ্ব বিজ্ঞানাগার

১৯৪৬ সালে ঠাকুর অসুস্থতা হওয়ার পর বায়ু পরিবর্তনের জন্য স্বপরিবারে ভারতে যান। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রেখে যান বিশাল কর্মযজ্ঞ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে নানা জটিলতায় কারণে ঠাকুর আর ফিরেননি এ দেশে।

আশ্রম কর্তৃপক্ষ জানায়, ঠাকুরের জন্মস্থান, তার বাসগৃহ, মাতৃমন্দির, স্মৃতিমন্দির, নিভৃত নিবাস, অফিসসহ স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো হেমায়েতপুর সৎসঙ্গকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য ১৯৬১ সাল থেকে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়। অনেকবার আবেদন করার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুপারিশ পাঠানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ পাবনার সাধারণ সম্পাদক নরেশ মধু বলেন, ‘এটি ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের স্মৃতি বিজড়িত স্থাপনাগুলোর একটি। অথচ এতটাই অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে যে, ভবনটি দিনে দিনে মিলিয়ে যাচ্ছে।

‘মানসিক হাসপাতালের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কিছু জানে না। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে সংরক্ষণ করা হোক।’

কঙ্কালসার ভবনটিই সেই বিশ্ব বিজ্ঞানাগার

ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আশ্রমের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ‘মানসিক হাসপাতালের ভেতরে যেসব স্মৃতি রয়েছে, তা হাসপাতালের শুরু থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। এইসব স্থাপনা মানসিক হাসপাতালের কার্যক্রমকে কখনো কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি।

‘সৎসঙ্গ কর্তৃপক্ষ বহুবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারপ্রধানের কাছে আবেদন জানিয়েছে যাতে করে ঠাকুরের ফেলে যাওয়া ভবনগুলোকে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের আওতায় নেয়া হয়। কিন্তু কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক আবুল বাসার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘স্মৃতি বিজড়িত এ স্থাপনাটি ভাঙার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। এটি ভেঙে ফেলার কোনো নির্দেশনাও আমাদের কাছে আসেনি।

হাসপাতালের সামনে বিজ্ঞানাগার ভাঙচুর হওয়া নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, ‘এটি দেখভালের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তাকর্মী নেই। রাতের আঁধারে কে বা কারা ভেঙেছে তা আমরা কীভাবে জানব?’

কঙ্কালসার ভবনটিই সেই বিশ্ব বিজ্ঞানাগার

পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ারুল আজিম বলেন, ‘পাবনা মানসিক হাসপাতালের ভেতরে অনুকূলচন্দ্রের কোনো স্থাপনা ভেঙে ফেলার কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে নেই। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমাদের ভেঙে ফেলার কোনো ক্ষমতাও নেই।

‘আমি যতটুকু জানি, এটি সংরক্ষণের জন্য একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) বিশ্বাস রাসেল হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনাটি আমি ভালোভাবে জানি না। বিষয়টি জেনে তারপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

শেয়ার করুন

প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তায় রোহিঙ্গা নিয়ে বিদেশি চাপ

প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তায় রোহিঙ্গা নিয়ে বিদেশি চাপ

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা বা রেখে দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে ঢাকা রাজি নয়। আমাদের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, রোহিঙ্গারা তাদের বাসভূমে ফিরে যাবে।’

মিয়ানমারের আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফেরত যাওয়া বা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আপাতত দেখছে না বাংলাদেশ। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসার পর এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আর এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা সংস্থা ও রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে রাখার কথা বিবেচনায় নিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজাচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের ওপর নানা রকম চাপ প্রয়োগের চেষ্টাও আছে। যদিও শুরু থেকে এ ধরনের চাপ নাকচ করে আসছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কিন্তু হাল ছেড়ে বসে নেই। আমরা সেখানে সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকেই চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কারণ রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চীন মূল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিল। তাদের উদ্যোগেই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়।

‘সম্প্রতি তাসখন্দ সফরেও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াই ইয়ির সঙ্গে আমার বৈঠক হয়। বৈঠকে আমরা আবারও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরুর বিষয়ে একমত হই। কিন্তু সমস্যাটা হলো মিয়ানমারে সামরিক শাসন জারির পর থেকে তাদের দেশে যে পরিমাণ বিক্ষোভ-সংঘর্ষ চলছে, তাতে প্রকৃত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগটা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে জানিয়েছেন।’

মোমেন বলেন, তাসখন্দে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে তার কথা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বললাম, আপনারা বলছেন, মিয়ানমারের বিষয়ে অ্যাফ্রেড। আপনারা বলেছিলেন যে, রোহিঙ্গা ইস্যুটা দ্বিপক্ষীয় হোক। তৃতীয় পক্ষ এলে অনিশ্চয়তা বাড়বে। আপনি বলেছিলেন, মিডেল-ইস্টে দেখো। সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনে তৃতীয় পক্ষ আসায় কোনো লাভ হয়নি। আপনাদের কথামতো আমরা দ্বিপক্ষীয় অনেক মিটিং করলাম। কোনো লাভই তো হয়নি। অনেক চেষ্টাই তো করলাম। একজন লোকও ফিরিয়ে দিতে পারলাম না। আমরা তো ত্রিপক্ষীয় আলোচনাও করলাম।’

মোমেন বলেন, ‘আমি তাকে বললাম, আমি চাই আপনি এই ট্রাইলেটারাল উদ্যোগে অংশ নিন এবং রোহিঙ্গা ফেরাতে ভূমিকা রাখেন। আপনার সঙ্গে তাদের এত ভালো সম্পর্ক! এই সেদিন ওদের (মিয়ানমার) মিলিটারি চিফ আসল। আপনারা তাদের জিনিসপত্র দিচ্ছেন! আপনারা বললে ওরা শুনবে।

‘জবাবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে বললেন, “আমরা তো বলছি। আবারও বলব।” কিন্তু ত্রিপক্ষীয় বৈঠক সম্পর্কে আমি যেটা বলছি, সেটায় তিনি রাজি হননি। কারণ হিসেবে উনি বললেন, এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। আমি বললাম, আচ্ছা সময় নেন। প্রয়োজনে চীনের সঙ্গেও কথা বলেন। কেননা আপনি ও চীনই তো মিয়ানমারকে শক্ত অবস্থানে রাখছেন। উনি এতে সাদামাটা কোনো জবাব দেননি। কেবল বলেছেন, এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।’

এদিকে ২৬ জুলাই ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মিয়ানমারের অন্যতম মিত্র জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পথ খুঁজছেন তারা। রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান এই পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইতো নাওকি বলেন, জাপান দ্রুত প্রত্যাবাসনে সক্রিয় পরিবেশ তৈরিতে যথাযথ চেষ্টা করবে। তবে ‘উপযুক্ত সময়’ এলেই মিয়ানমারের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অবস্থান

এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক তাদের প্রস্তাবিত ‘রিফিউজি পলিসি রিভিউ ফ্রেমওয়ার্ক’-এ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মূল সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা বা স্থায়ীভাবে রেখে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে প্রস্তাবটিকে অবাস্তব বা কল্পনাপ্রসূত অভিহিত করে তা নাকচ করে দিয়েছে সরকার।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা বা রেখে দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে ঢাকা রাজি নয়। আমাদের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, রোহিঙ্গারা তাদের বাসভূমে ফিরে যাবে।’

প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তায় রোহিঙ্গা নিয়ে বিদেশি চাপ

বিশ্বব্যাংক তাদের প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের জন্য সব ধরনের অধিকার দাবি করেছে, যাতে তারা দেশের সর্বত্র কাজ করতে পারে অন্য সকল বাংলাদেশির মতো। তাদের আইনি অধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের কথা বলা হয়েছে। তাদের চলাচলের স্বাধীনতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি বলা হয়েছে, তাদের জমিজমা কেনার ও ব্যবসা করতে ক্ষমতা দেয়ার কথাও। বলা হয়েছে, তারা যাতে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে দেশের নাগরিকদের মতো।

মোমেন বলেন, ‘আমরা বলেছি, প্রথমে আমাদের সংজ্ঞায় রোহিঙ্গারা রিফিউজি না। আমরা এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছি না। দে শুড গো ব্যাক। দে আর ট্যাম্পোরারি পিপল, নট রিফিউজিস। আর আমাদের প্রতিবেশী মিয়ানমারও কখনও বলেনি তারা ফেরত নেবে না।

‘আমরা কোনো শরণার্থী আশ্রয় দিইনি। আমরা বিপদগ্রস্ত, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি। তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ তাদের মাতৃভূমিতে আছে। তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তাই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ করতে হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘তারা (ইউএনএইচসিআর) রোহিঙ্গাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। আমরা বলেছি, না আমরা এটা গ্রহণ করতে পারছি না। রোহিঙ্গা সমস্যা সাময়িক। এ নিয়ে ট্যাম্পোরারি কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। আমরা আমাদের এই কথা তাদের জানিয়ে দিয়েছি।’

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কড়া প্রতিক্রিয়ায় সুর বদলেছে বিশ্বব্যাংক। তারা মঙ্গলবার নিজেদের ওয়েবসাইটে দেয়া বিবৃতিতে বলছে, শরণার্থী বিষয়ে বাংলাদেশসহ কোনো দেশকেই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়নি তারা। যতদিন রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ফেরত না যাচ্ছে, ততদিন সহায়তা অব্যাহত রাখারও অঙ্গীকার করেছে বৈশ্বিক এই দাতা সংস্থা।

শেয়ার করুন

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

ছোট ছোট ব্যয় হলেও সবই নিয়মের বাইরে। খরচ হলেও নথিপত্র নেই। মালামাল কেনার দাবি করা হলেও আদৌ পণ্য এসেছে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রাজধানীর স্বনামধন্য স্কুলটিতে কী কী অনিয়ম হয়েছে, তা উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

ফেসবুকে ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপকে কেন্দ্রকে ফের আলোচনায় রাজধানীর নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এর মধ্যে নিউজবাংলার হাতে এলো নানা কাজের অজুহাতে প্রতিষ্ঠানটির যাচ্ছেতাই অর্থ খরচের নথি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির খরচের ৫ কোটি টাকা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

অনিয়মগুলো একেকটি টাকার অঙ্কে খুব বেশি নয়। তবে ছোট ছোট বেশ কিছু অনিয়ম এক হয়ে টাকার পরিমাণ বেশ বড় হয়ে দাঁড়ায়।

অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আসবাবপত্র না পেয়েই বিল পরিশোধ, দরপত্রের বাইরে বিল পরিশোধ, বিল ভাউচার ছাড়াই টাকা খরচ, সরকারি কোষাগারে করের টাকা জমা না দেয়াসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে স্কুলটিতে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-কর্মচারীরা আয়কর বাবদ ২ কোটি ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেননি।

এ অনিয়মগুলো যখন হয়েছে, তখন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বেশ কয়েকজন। তারা হলেন ফেরদৌসী বেগম, কেকা রায় চৌধুরী, নাজনীন ফেরদৌস, হাসিনা বেগম, সুফিয়া বেগম ও ফৌজিয়া রেজওয়ান।

এদের মধ্যে কয়েকজন দুই থেকে ৬ মাস আর সবচেয়ে বেশি সোয়া এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন ফৌজিয়া। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।

অডিট আপত্তিতে উঠে আসা অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ফৌজিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাকে অফিশিয়ালি বিষয়টি জানানো হয়নি। যদি জানানো হয়, তাহলে আমি জবাব দেব।’

অন্য দুই সাবেক অধ্যক্ষ ফেরদৌসী বেগম ও কেকা রায় চৌধুরীও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ফেরদৌসী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব ছেড়েছি অনেক আগে। এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’

কেকা বলেন, ‘এখন এসব বিষয়ে কথা বলার সময় না।’

বর্তমান অধ্যক্ষ যা বলছেন

বর্তমান অধ্যক্ষ কামরুন নাহার জানালেন, এসব অনিয়মগুলো তার জানা আছে। তিনি বলেন, এগুলো হয়েছে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণের আগে। আর তিনি এগুলোর সমাধান চান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলের গভর্নিং বডির (পরিচালনা পর্ষদ) সভাপতির হাতে তারা প্রতিবেদনটি দিয়েছেন। আমি এখনও প্রতিবেদনটি দেখিনি। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নিয়ম-নীতি মেনে কাজ করার জন্য চেষ্টা করছি।

‘প্রতিবেদনটি দেখে খুব সহসাই এর জবাব দেয়া হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যত টাকার আপত্তি জানানো হয়েছে, তার সবগুলো সে সময়ের দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ কামরুন নাহার বলেন, ‘সরকারের যদি পাওনা থাকে, অবশ্যই তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’

কবে নিরীক্ষা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর গত ১৮ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ভিকারুননিসার আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নিরীক্ষা চালায়। দলটি ২০১৫-২০১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছরের আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করে।

তাদের প্রতিবেদন গত মাসের শেষে জমা দেয়া হয় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে। এর একটি কপি স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকেও দেয়া হয়েছে।

নিরীক্ষা দলের এক সদস্য নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভিকারুননিসায় গত পাঁচ বছরের আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা করে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম পাওয়া গেছে, যা আমাদের অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এই প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। স্কুলের গভর্নিং বডিকেও দিয়েছি জবাব দেয়ার জন্য।’

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

প্রতিবেদনটি জমা দেয়া হয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও। এখন কী ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে বোর্ডের চেয়ারম্যান নেহাল আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তিনি বলেন, ‘অডিট আপত্তির বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ জবাব দেবে।’

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যত আপত্তি

ভ্যাট জমা না দেয়া

২০১৫-২০১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছর পর্যন্ত ভ্যাট বাবদ মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৬২ টাকা আদায় করে ভিকারুননিসা স্কুল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয় ১ কোটি ৭১ হাজার ৬১৫ টাকা। আর বাকি ৩৯ লাখ ২২ হাজার ৫৪৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চালানের কপি মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তি থেকে ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত আয়ের ওপর ৪৫ লাখ ২৮ হাজার ৩০০ টাকার ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা পড়েনি। এ অর্থ ফেরত দেয়ার দিতে নির্দেশ দেয়া হয় প্রতিবেদনে।

আয়কর ফাঁকি

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ অর্থবছরে ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-কর্মচারীরা মোট ২১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৩২ টাকা সম্মানি বাবদ নিয়েছেন। এর বিপরীতে আয়কর বাবদ ২ কোটি ১৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮২২ টাকা পরিশোধ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে এটি রাজস্ব ফাঁকি হিসেবে উল্লেখ করে তা শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করতে বলা হয়।

দরপত্র ছাড়াই নির্মাণকাজ

ভিকারুননিসার বসুন্ধরা শাখার সিভিল, স্যানিটারি, বৈদ্যুতিক কাজের ১ কোটি ৫৯ লাখ ১১ হাজার ৬৩৯ টাকার কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনএইচ-কেটিএ (জেভি)। এ কাজ দেয়ার ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান করার কথা থাকলে তা করা হয়নি।

নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ কাজের বিল পরিশোধে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্যাডে কোনো বিল পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া পাওয়া যায়নি কাজের গুণগত মানের কোনো সনদ।

আসবাবপত্র না পেয়েও বিল পরিশোধ

আসবাব প্রতিষ্ঠান জুটো ফাইবার গ্লাসকে (তারাবো, নারায়ণগঞ্জ) ১৯০ জোড়া ফাইবার গ্লাস (হাই-লো বেঞ্চ) সরবরাহের জন্য বলা হয়। তবে ১৩০ জোড়া হাই লো বেঞ্চ সরবরাহের চালান পাওয়া যায়। আর বাকি ৬০ জোড়ার কোনো চালান পায়নি নিরীক্ষা দল। অথচ ১৯০ জোড়ার বেঞ্চেরই বিল সররবাহ করা হয়। এতে মোট ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জুটো ফাইবার গ্লাসকে বেইলি রোড শাখায় লো বেঞ্চ এবং হাই বেঞ্চ কিনতে ১২ লাখ ৫৮ হাজার এবং বসুন্ধরা কলেজ শাখার জন্য ১১ লাখ ১৬ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে বলেও মনে করে নিরীক্ষা দল।

এসব মালামাল আদৌ কেনা হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ টাকা যিনি বা যারা দিয়েছেন, তার বা তাদের কাছ থেকে আদায় করার সুপারিশও করা হয়েছে।

দরপত্রের বাইরেও কাজ, টাকা পরিশোধ নিয়ে আপত্তি

গত বছর বেইলি রোডের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে স্কুল শাখার সীমানা প্রাচীর সংস্কারে ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৮ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজ পায় মেসার্স আদিবা কনস্ট্রাকশন। তবে দরপত্রের বাইরেও তাদের দিয়ে কাজ করানো হয়। আর সেই কাজে অতিরিক্ত বিল দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

ঠিকাদারকে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয় ১ লাখ ৭১ হাজার ৭২৭ টাকা। কিন্তু বিল পরিশোধের স্বপক্ষে কোনো নথি পায়নি নিরীক্ষা দল।

প্রাচীর নির্মাণের কাজটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩০ টাকা বর্গমিটার দরে করবে বলে দরপত্র দাখিল করলেও অতিরিক্ত কাজের বিল পরিশোধের সময় ২২৮ টাকা দরে বিল পরিশোধ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

বিল ছাড়াই টাকা পরিশোধ

প্রতিবেদনে বলা হয়, খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম বিভিন্ন দোকান থেকে কেরা হয়েছে। অথচ একটি প্রতিষ্ঠানের নামে চেক ইস্যু করা হয়েছে। এর পরিমাণ ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে মনে করছে নিরীক্ষা দল।

পুরস্কারেও অনিয়ম

২০১৯ সালের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় (যা অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালে) নিয়ম না মেনেই ৪৭ জন শিক্ষককে সাধারণ পুরস্কার হিসেবে ফ্রাইপ্যান দেয়া হয়। সেখানে খরচ করা হয় ৩২ হাজার ৭০০ টাকা, যা প্রতিবেদনে অপচয় হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

ম্যাজিস্ট্রেট কি কম্পিউটার পোড়ানোর ক্ষমতা রাখেন?

ম্যাজিস্ট্রেট কি কম্পিউটার পোড়ানোর ক্ষমতা রাখেন?

ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনে ‘প্রয়োজনে জব্দকৃত বস্তু বিলিবন্দেজ (disposal)’ করার ক্ষমতা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের রয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ডিজপোজালের অর্থ জব্দ করা বস্তু তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে দেয়া নয়। রেজওয়ানের কম্পিউটারের পর্নোগ্রাফি ধ্বংসের আইনি এখতিয়ার রাখেন ম্যাজিস্ট্রেট, এর পরিবর্তে তিনি কম্পিউটার পুড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।  

সাতক্ষীরায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের সময় এক দোকানিকে জরিমানা করার পাশাপাশি জনসমক্ষে তার কম্পিউটার পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা নিয়ে চলছে আলোচনা।

শাটডাউনের মধ্যে রোববার বিকেলের এ ঘটনা ছড়িয়েছে ফেসবুকে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জব্দ করা মালামাল এভাবে পুড়িয়ে দিতে পারেন কি না, এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামানের দাবি, আইনের মধ্যে থেকেই তিনি কম্পিউটার পুড়িয়েছেন। আগামীতেও এ ধরনের অভিযান চলবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আবাদেরহাট এলাকায় টেলিকম ব্যবসায়ী রেজওয়ান সরদারের দোকানে রোববার অভিযান চালায় উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

রেজওয়ান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিকেল ৪টার দিকে আমার বাড়িতে বিদ্যুতের সমস্যার কারণে দোকানে সরঞ্জাম নিতে আসি। এ সময় দোকান খোলা দেখে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান আসেন। তিনি আমাকে এক হাজার টাকা জরিমানা করেন। এরপর আমার একমাত্র আয়ের উৎস দোকানে থাকা কম্পিউটারটি জব্দ করে জনসমক্ষে পুড়িয়ে দেন।’

তিনি বলেন, ‘এই কম্পিউটারের ওপর চলত আমার ছয় সদস্যের সংসার। দাদি, বাবা-মা, স্ত্রী নিয়ে আমার সেই সংসার এখন প্রায় অচল। লকডাউনে এমনিতেই খুব খারাপ অবস্থা, তার ওপর ব্যবসার কম্পিউটার পুড়িয়ে দেয়ায় আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।’

ম্যাজিস্ট্রেট কি কম্পিউটার পোড়ানোর ক্ষমতা রাখেন?
ব্যবসায়ী রেজওয়ানের পুড়িয়ে দেয়া কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ

অভিযানের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, রেজওয়ানের দোকানের কম্পিউটারে পর্নোগ্রাফি ছিল। এ জন্য সেটি জব্দ করে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২৯২ ধারা অনুযায়ী পুড়িয়ে ফেলা হয়।

অশ্লীল পুস্তকাদি বিক্রয়কেন্দ্রিক অপরাধ ও এ-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে অপরাধের শাস্তির বিষয়টি ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। দণ্ডবিধির এই ধারায় জব্দ করা আলামত ধ্বংসের কোনো বিধান নেই।

বিষয়টি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামানকে জানানোর পর মঙ্গলবার তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসির ১২ ধারা অনুসারে তিনি কম্পিউটারটি পোড়ানোর আদেশ দিয়েছিলেন।

মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুসারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময়ে পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা প্রদানের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে ১২ ধারায়।

১২ (২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে, উক্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এর সংশ্লিষ্ট অপরাধ সংশ্লেষে তল্লাশি (search), জব্দ (seizure) এবং প্রয়োজনে জব্দকৃত বস্তু বিলিবন্দেজ (disposal) করিবার ক্ষমতা থাকিবে।’

আইন বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনে ‘প্রয়োজনে জব্দকৃত বস্তু বিলিবন্দেজ (disposal)’ করার ক্ষমতা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের রয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ডিজপোজালের অর্থ জব্দ করা বস্তু তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে দেয়া নয়। রেজওয়ানের কম্পিউটারে পর্নোগ্রাফি থাকলে সেগুলো ধ্বংসের আইনি এখতিয়ার রাখেন ম্যাজিস্ট্রেট, এর পরিবর্তে কম্পিউটার পুড়িয়ে দিয়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

ম্যাজিস্ট্রেট কি কম্পিউটার পোড়ানোর ক্ষমতা রাখেন?

আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি নিজামুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি মনে করি কম্পিউটার পোড়ানো ঠিক হয়নি। মোবাইল কোর্ট এমনভাবে একটা জিনিস পুড়িয়ে দেবে বা ধ্বংস করে দেবে তা গ্রহণ করা যায় না।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভিডিও যেখানে পাওয়া গেল, সেটা তো ধ্বংস করা যাবে না। কেউ ক্যামেরায় ছবি তুললে ক্যামেরা তো ভেঙে ফেলা যাবে না, বরং ক্যামেরার ছবিগুলো ধ্বংস করা যাবে। যে ম্যাটেরিয়ালটা সাবজেক্ট ম্যাটার, সেটার বাইরে কেন যাবেন। এটা তার (ম্যাজিস্ট্রেট) এখতিয়ার নাই।’

এ অবস্থায় আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘যার কম্পিউটার পুড়িয়েছে, তিনি সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা করতে পারবেন।’

‘এ ক্ষেত্রে পদ্ধতি হলো, মোবাইল কোর্টে মামলাটি যখন নিষ্পত্তি হয়ে যাবে, সেটা তো আর লংটার্ম না, সামারি প্রসিডিং। তার কম্পিউটারটা যে জব্দ করা হয়েছে সেটার তো ডকুমেন্টে থাকবে। জব্দ তালিকা দেখিয়েই তিনি (রেজওয়ান) ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন।’

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেজওয়ানকে কম্পিউটার জব্দসংক্রান্ত কোনো নথি দেননি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান। তাকে কেবল এক হাজার টাকা জরিমানা করার একটি রসিদ দেয়া হয়েছে।

ম্যাজিস্ট্রেট কি কম্পিউটার পোড়ানোর ক্ষমতা রাখেন?
উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে চলে অভিযান

মোবাইল কোর্ট আইনের ১৪ ধারায় ‘সরল বিশ্বাসে কৃত কার্য রক্ষণ’ সংক্রান্ত সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধির অধীন সরল বিশ্বাসে কৃত, বা কৃত বলিয়া বিবেচিত, কোন কার্যের জন্য কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে তিনি মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সহিত সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো প্রকার আইনগত কার্যধারা রুজু করিতে পারিবেন না।’

এমন অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কী করে আইনি প্রতিকার পাবেন, এমন প্রশ্নে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আইনে তো আর সবকিছু লেখা থাকে না। আর এটা তো সরল বিশ্বাসে হয়েছে এমন কিছুও না।’

সাতক্ষীরার জজ কোর্টের অতিরিক্ত পিপি ফাহিমুল হক কিসলু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কোনো বেআইনি দ্রব্য বা পণ্য পুড়িয়ে বা অন্য কোনোভাবে বিনষ্ট করতে গেলে আদালতের নির্দেশ থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে নিয়মিত মামলা হতে হবে, সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা থাকবেন। তারপর আদালত আলামত ধ্বংসের নির্দেশ দিলে তা ধ্বংস করা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘কম্পিউটারে কোনো অশ্লীল ছবি বা ভিডিও থাকলে শুধু সেগুলো নষ্ট করা যেতে পারে। তাই বলে কম্পিউটার পুড়িয়ে দেয়া আইনসিদ্ধ নয়।’

শেয়ার করুন

২০১৯ এর মতো এবারও ভয়ংকর ডেঙ্গু

২০১৯ এর মতো এবারও ভয়ংকর ডেঙ্গু

ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী এডিস মশা।

এ বছর শনাক্ত রোগীর বেশির ভাগই ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ থ্রি ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত। দুই বছর আগেও এ ধরনের ভ্যারিয়েন্টে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। ডেঙ্গুর এখন পর্যন্ত চারটি ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সেরোটাইপ থ্রি বেশি সংক্রমিত করতে সক্ষম।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর ডেঙ্গুর যে ভ্যারিয়েন্টটি বেশি ছড়াচ্ছে, সেই একই ভ্যারিয়েন্ট ২০১৯ সালে বিপর্যয় ঘটিয়েছিল।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত (রোববার) সারা দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ১৮২। এর মধ্যে জুলাইয়ে শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ২৮৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৯৭৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন করোনাতেও আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

এর আগে গত বছর সারা দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ৪০৫ জনের, যাদের মধ্যে ছয় জন মারা যান। এর আগের বছর ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার ঘটে। সেবার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখের বেশি, যাদের মধ্যে মারা যান ১৭৯ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন এ বছর শনাক্ত রোগীর বেশির ভাগই ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ থ্রি ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত। দুই বছর আগেও এ ধরনের ভ্যারিয়েন্টে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। ডেঙ্গুর এখন পর্যন্ত চারটি ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সেরোটাইপ থ্রি বেশি সংক্রমিত করতে সক্ষম।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এবারও ডেঙ্গুর টাইপ থ্রি বেশি মানুষকে আক্রান্ত করছে। এবার করোনা সংক্রমণের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে একটু বেশি সতর্ক হতে হবে।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. মোতলেবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এবার ডেঙ্গুর টাইপ সি-তে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এখনকার রোগীদের যে লক্ষণ দেখা দিচ্ছে তা হল দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। তবে অন্য উপসর্গের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই মাথা ব্যথা, চোখ জ্বলা, বমি, পাতলা পায়খানা এগুলো হচ্ছে।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের আরেক সহযোগী অধ্যাপক পার্থ প্রতিম দাশ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি যেসব রোগী দেখেছি তাদের হাই ফিভার রয়েছে। কিছু কিছু রোগীর বমি ও ডায়রিয়া রয়েছে। যদিও এটা গতবারও ছিল।’

২০১৯ এর মতো এবারও ভয়ংকর ডেঙ্গু

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাসের আসলে চারটি সেরোটাইপ রয়েছে। টাইপ ওয়ান, টাইপ টু, টাইপ থ্রি, টাইপ ফোর। এবার ডেঙ্গু টাইপ থ্রি দিয়ে জ্বরটা বেশি হচ্ছে।

এ বছর কেনো সেরোপাইট থ্রি বেশি সক্রিয়, সেই প্রশ্নে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘এই চারটার মধ্যে কোনো একটা ভাইরাসের বিস্তার কোনো বছর বেশি হয়। ২০১৯ সালে টাইপ থ্রি বেশি হয়েছিল। গত বছরেও এই টাইপ থাকলেও তখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল।’

ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে কোনটি বেশি প্রাণঘাতী, সে বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রায় সবগুলোই এক রকমের। তবে কিছু টাইপ বেশি সংক্রামক, যেমন করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বেশি সংক্রমিত করে। ২০১৯ সালে টাইপ থ্রি বেশি ছড়িয়েছিল, তাই বলা যায় এটার সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।’

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ‘ঢাকা থেকে আক্রান্ত অনেক রোগী গ্রামের বাড়িতে গেছেন। ফলে সেখানেও ডেঙ্গু ছড়াতে পারে। কারণ অন্যান্য জেলাতেও এডিস মশা আছে। আক্রান্তকে কামড়ানোর পর ভাইরাস মশা থেকে আবার সুস্থ মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাস এডিস ইজিপটাই মশার মাধ্যমে সাধারণত ছড়ায়। আরেকটি আছে এডিস এলবোপিকটাস, তবে ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে এডিস ইজিপটাই ডেঙ্গুর বাহক।’

শেয়ার করুন

করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু ভয়ংকর

করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু ভয়ংকর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির মধ্যে করোনা ও ডেঙ্গু নিয়ে যেসব রোগী হাসপাতালে আসছেন তাদের অনেকেরই স্বাস্থ্য জটিলতা বেশি। আগামীতে এ ধরনের রোগী বাড়লে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ডেঙ্গু বিপর্যয় উদ্বিগ্ন করে তুলেছে চিকিৎসকদের। তারা বলছেন, দুটি রোগের আক্রমণ একসঙ্গে হলে চিকিৎসা পদ্ধতির জটিলতা বাড়ে। এতে বেশি ঝুঁকি তৈরি হয় আক্রান্ত রোগীর।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত (রোববার) সারা দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৮৯৫। এর মধ্যে জুলাইয়ে শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ২৮৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৮২৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন করোনাতেও আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির মধ্যে করোনা ও ডেঙ্গু নিয়ে যেসব রোগী হাসপাতালে আসছেন তাদের অনেকেরই স্বাস্থ্য জটিলতা বেশি। আগামীতে এ ধরনের রোগী বাড়লে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ও ডেঙ্গুর চিকিৎসা আলাদা হওয়ায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। করোনা আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে রক্ত জমাটের প্রবণতা থাকে। তবে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। ফলে দুটি রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিতেও পার্থক্য রয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনা এবং ডেঙ্গু একসঙ্গে ভয়াবহ হতে পারে। দুইটা যখন একসঙ্গে থাকবে তখন কিছু জিনিস বেড়ে যেতে পারে, যদি কেয়ারফুল না হওয়া যায়। মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায় দুইটা একসঙ্গে হলে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসে। রোগীদেরও তাদের নিজেদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে সন্দেহ করতে হবে। আমরাও ম্যানেজ করার চেষ্টা করব।’

ডা. টিটো মিঞা বলেন, ‘কোনো কোনো ডেঙ্গুতে কোনো বিপদ থাকে না। কারণ সব ক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগীর ব্লিডিং হয় না। তবে ব্লিডিং থাকলে আর যদি করোনা থাকে তবে ব্লাড সিনাপ ব্যবহারের দরকার নেই। প্লাটিলেট কমে গেলে ভীত হওয়া যাবে না যতক্ষণ না ব্লিডিং হয়।’

তিনি জানান, কেউ একসঙ্গে করোনা ও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে করোনা আক্রান্ত হিসেবেই মৃত্যু নথিভুক্ত হচ্ছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দুইটা (করোনা ও ডেঙ্গু) একসঙ্গে হলে একটা বড় ইফেক্ট তো হবেই। এ ধরনের পেশেন্টকে ট্রিটমেন্টের জন্য করোনা হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।’

এ ধরনের ক্ষেত্রে জটিলতার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুতে যদি ব্লিডিং থাকে, সে রকম ক্ষেত্রে আসলেই কঠিন অবস্থা হবে।’

তবে খুব বেশি উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ বি এম আবদুল্লাহ।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনা বা ডেঙ্গু যেটাই হোক না কেন, সেটি কিন্তু সব ক্ষেত্রে খারাপ না। বেশিরভাগ রোগীই বাসায় থেকে ভালো হচ্ছে।

‘দুটি একসঙ্গে হলেই যে খুব খারাপ হবে, তা নয়। তবে খারাপ হতে পারে। ডেঙ্গুর হেমোরেজিক রোগী বেশি খারাপ হয়, যেটাকে শক সিনড্রোম বলে।’

করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু ভয়ংকর

ডেঙ্গু ও করোনার লক্ষণ প্রায় কাছাকাছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে এখন অবহেলা করা যাবে না। অনেকেই বাসায় ওষুধ খান। তবে শুধু নাপা খেতে হবে। অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ খাওয়া যাবে না। খেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

‘কেউ একসঙ্গে দুটো পজেটিভ হলে অবশ্যই ডাক্তার সিনড্রোম দেখে ওষুধ দেবেন। যেহেতু এটা ভাইরাস, এর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তাই আলাদা আলাদা লক্ষণ অনুযায়ী সেবা দিতে হবে।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মোতলেবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কারও যদি করোনা ও ডেঙ্গু একসঙ্গে হয় তাহলে কোনোভাবেই তার বাসায় থাকা উচিত হবে না। তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।’

এ ধরনের রোগীদের বিপরীতমুখী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে জানিয়ে এ অধ্যাপক বলেন, ‘করোনাতে রক্ত জমাট বাঁধার একটা প্রবণতা থাকে। আমরা রক্ত পাতলা করার ওষুধ দিচ্ছি। অন্যদিকে ডেঙ্গু আক্রান্তদের রক্তপাতের সম্ভাবনা থাকে। তাই রক্ত পাতলা করার ওষুধ দিলে ব্লিডিং হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব ক্ষেত্রে একটু কন্ট্রোভার্সিয়াল কন্ডিশন দাঁড়িয়েছে।’

একসঙ্গে ডেঙ্গু ও করোনা আক্রান্ত রোগী এখন পর্যন্ত অনেকটা কম হলেও চিকিৎসকদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় এ সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের আরেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. পার্থ প্রতিম দাশ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার কাছে এখন দিনে ১০টা জ্বরের রোগী এলে তার মধ্যে তিনটা বা চারটা করোনার রোগী পাচ্ছি। সেই সঙ্গে দুই থেকে তিনটা ডেঙ্গু রোগী পাচ্ছি।

‘তবে প্রতিদিন না হলেও এক-দুই দিন পর একজনকে পাচ্ছি, যার দুইটাই পজেটিভ আছে।’

তিনি বলেন, ‘এমন অনেক হচ্ছে যে, ডেঙ্গুর জন্য ট্রিটমেন্ট নিতে গিয়ে কেউ করোনা পজেটিভ হয়েছে। আবার একইভাবে করোনা চিকিৎসা চলার সময় ডেঙ্গু পজেটিভ হয়েছে। এখন যদি ডেঙ্গু কন্ট্রোল করা না যায়, তবে মারাত্মক সমস্যা হবে।’

শেয়ার করুন

রিকশাচালক শাফী যেভাবে ভাইরাল ইউটিউবার

রিকশাচালক শাফী যেভাবে ভাইরাল ইউটিউবার

ইউটিউবার শফিকুল ইসলাম ওরফে শাফী।

বেশি উপার্জনের আশায় ইউটিউবার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন শাফী। কেনেন পুরোনো একটি স্মার্টফোন। সেটি দিয়ে কিছুদিন কৌতুক ও হাস্যরসাত্মক ভিডিও আপ করেন। সেগুলোর আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও বানাতে শুরু করেন। ‘ইমাম মাহদীর আগমনের আলামত’ শিরোনামে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপরই তিনি ইউটিউবারের পরিচিতি পান।

মোংলার রিকশাচালক শফিকুল ইসলাম ওরফে শাফী। বেশি উপার্জনের আশায় নিজের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে বিতর্কিত বিভিন্ন ভিডিও আপ করে ‘হইচই’ ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ৩৫ বছর বয়সী এই যুবক ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের জন্য মনগড়া ও উসকানিমূলক বিভিন্ন ভিডিও আপ করার কথা আদালতেও স্বীকার করেছেন। তাকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার ইউটিউব চ্যানেলে ‘শান্তির আহ্বান’-এর সাবস্ক্রাইবার ৩ লাখ ২ হাজার। একই নামে ফেসবুক পেজে ফলোয়ার সংখ্যাও কাছাকাছি।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মোংলা বন্দরের শ্রমিক ফজলুল হকের ছেলে শাফীর সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত আলিয়া মাদ্রাসায় যাতায়াত ছিল। আর্থিক সংকটে মাদ্রাসা ছেড়ে রিকশা চালানো শুরু করেন তিনি; ভ্যান-টমটম চালানোও বাদ দেননি। একটা পর্যায়ে বেশি উপার্জনের জন্য মোংলা থেকে চলে যান চট্টগ্রাম শহরে। সেখানে কিছুদিন রিকশা চালানোর পর চাকরি নেন একটি পোশাক কারখানায়।

পরে রাজধানী ঢাকায় এসেও পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। তাতেও সুবিধা করতে না পেরে বেশি উপার্জনের আশায় ইউটিউবার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কেনেন পুরোনো একটি স্মার্টফোন। সেটি দিয়ে কিছুদিন কৌতুক ও হাস্যরসাত্মক ভিডিও আপ করেন। সেগুলোর আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও বানাতে শুরু করেন। ‘ইমাম মাহদীর আগমনের আলামত’ শিরোনামে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপরই তিনি ইউটিউবারের পরিচিতি পান।

এরপর আরও বেশি উপার্জনের লোভে কোরআন-হাদিস নিয়ে অপব্যাখ্যা দিয়ে একের পর এক ভিডিও আপ করতে থাকেন। এভাবে বিভিন্ন বিতর্কিত ভিডিও আপ করে মাসে মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় করতেন শাফী।

সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করেন তিনি। এ অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) তাকে গ্রেপ্তার করেছে। রোববার বিকেলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ডিএমপির সিটিটিসির সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের উপকমিশনার (ডিসি) আ ফ ম আল কিবরিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভিউ বাড়াতে সরকার ও ধর্ম নিয়ে মিথ্যা, মনগড়া ভিডিও বানিয়ে আপলোড করার অভিযোগে শাফীকে ২৮ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ায় আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে।’

সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের কর্মকর্তারা জানান, শাফীর কাছ থেকে উদ্ধারকৃত শত শত ভিডিও বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এই রিকশাচালক গুগল থেকে কনটেন্ট সংগ্রহ করতেন। পরে সেগুলোতে ভয়েস দিয়ে বিতর্কিত ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে আপ করতেন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিতর্কিত নানা ইস্যুকে পুঁজি করতেন তিনি। এভাবে ‘বিকৃত ভিডিও’ বানিয়ে ভিউয়ার ও সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর চেষ্টা করতেন।

কর্মকর্তারা আরও জানান, সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে তার ‘শান্তির আহ্বান’ নামে ফেসবুক পেজের সন্ধান পাওয়া যায়। এই পেজ থেকে বিভিন্ন হাদিস অস্বীকার করা হতো। হাদিসের অপব্যাখ্যা করে ভিডিও শেয়ার করা হতো। ‘শান্তির আহ্বান’ নামেরই ইউটিউব চ্যানেল থেকেও একই ধরনের কনটেন্ট আপ করা হতো।

শাফী জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তার ইউটিউব চ্যানেলে দিতেন। চ্যানেলটি ব্রাউজ করে আরও দেখা গেছে, আলোচিত প্রায় সব ঘটনা নিয়েই ভিডিও বানাতেন তিনি। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে মনগড়া বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে ছবি যুক্ত করতেন শাফী।

এসব ভিডিওর মাধ্যমে ধর্ম, রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী নানা উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা চালান তিনি। প্রযুক্তির সহায়তায় তার ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল শনাক্ত করা হয়। সিটিটিসির সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ধ্রুব জ্যোতির্ময় গোপের নেতৃত্বে ২৮ জুলাই ঝালকাঠি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ সময় তার মোবাইল ফোনে ‘শান্তির আহ্বান’ নামের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ লগইন অবস্থায় পাওয়া যায়। ইউটিউব চ্যানেলটিতে এ ধরনের পাঁচ শতাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। তার বিরুদ্ধে রমনা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। সেই মামলায় আদালতের মাধ্যমে তাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিমান্ডে ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের জন্য মনগড়া ও উসকানিমূলক ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা ও প্রচারের কথা স্বীকার করেছেন শাফী।

সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের সহকারী কমিশনার ধ্রুব জ্যোতির্ময় গোপ নিউজবাংলাকে জানান, রোববার আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে প্রায় সব অভিযোগই স্বীকার করেছেন তিনি। মোংলায় রিকশা চালিয়ে তেমন আয় না হওয়ায় ২০০১ সালের দিকে চট্টগ্রামের কলসি দিঘিরপাড় এলাকায় চলে যান শাফী। সেখানে কিছুদিন রিকশা চালানোর পর একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেন। সেখানে একটি মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়।

সম্পর্কের অবনতি হলে ২০১১ সালে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় চলে যান। সেখানকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেন। সেখানেও আরেক মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম হয়। ২০১২ সালের মে মাসে তারা বিয়ে করেন। কিছুদিন পর শাফীর বাবা ঢাকায় তার বাসায় আসেন। কিছুদিন থাকার পর তিনি মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের শেষ দিকে স্ত্রীসহ মোংলায় মায়ের কাছে চলে যান শাফী।

সেখানে গিয়ে রিকশা, ভ্যান ও টমটম যখন যেটা সুবিধাজনক মনে হতো সেটাই চালাতেন। ২০১৪ সালের মে মাসে তিনি বাবা হন। উপার্জন কম হওয়ায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে টানাটানিতে পড়েন। এ অবস্থায় চলতে থাকলে ২০১৮ সালের দিকে একটি পুরোনো স্মার্টফোন কেনেন। ফেসবকু, ইউটিউবসহ সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো ব্যবহার শুরু করেন। কিছুদিন পর জানতে পারেন, ইউটিউবে ভিডিও আপলোডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা যায়। সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা আনার জন্য তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখা শুরু করেন।

পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ধ্রুব জ্যোতির্ময় গোপ জানান, শাফী ভ্যান-রিকশা চালানোর পাশাপাশি অবসর সময়ে ইউটিউবের ভিডিওতে দেখানো টিউটরিয়াল অনুসরণ করতে থাকেন। কয়েকটি ইউটিউব চ্যানেল খুলে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেন। কিন্তু সেসব চ্যানেলে আপ করা ভিডিওগুলোর পর্যাপ্ত ভিউ হচ্ছিল না। সেসব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবারও কম থাকায় অর্থ পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি হাস্যরসাত্মক ছোট ছোট ভিডিও তৈরি করে সেগুলো ওই সব চ্যানেলে আপ করতে থাকেন। কিন্তু সেগুলোও ভাইরাল না হওয়ায় অর্থ পেতেন না। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৩ এপ্রিল ‘শান্তির আহ্বান’ নামে আরও একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলেন।

এই চ্যানেলের জন্য গুগল ও ফেসবুক থেকে কিছু ইসলামিক আর্টিকেল সংগ্রহ করেন। সেগুলোর সঙ্গে নিজের মনগড়া বক্তব্য জুড়ে দিয়ে ভিডিও বানিয়ে আপ করতে থাকেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আরেকটি ছেলে হয় তাদের; বেড়ে যায় সংসারের খরচও। তখন ইউটিউব থেকে উপার্জনের জন্য আরও মনোযোগী হন। এর মধ্যে এক সন্তানের চিকিৎসার খরচ বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভিডিওর ভিউ বাড়াতে মনগড়া ও উসকানিমূলক আরও ভিডিও আপ করতে থাকেন।

একপর্যায়ে ‘ইমাম মাহদীর আগমের আলামত’ শিরোনামে একটি ভিডিও আপ করেন, যেটি ভাইরাল হয়। এরপর গুগল ও ফেসবুক থেকে ‘ইমাম মাহদী’-সম্পর্কিত বিভিন্ন আর্টকেল নিয়ে নিজের মনগড়া বক্তব্য জুড়ে ভিডিও বানাতে থাকেন। এর আগে তিনি প্রায় এক বছর ইউটিউব থেকেই ভিডিও এডিটিং শেখেন। কীভাবে ভিডিও আপলোড ও থাম্বনেল করতে হয় তাও শিখে নেন।

পুলিশ কর্মকর্তা ধ্রুব জ্যোতির্ময় গোপ জানান, ইউটিউব চ্যানেল খোলা থেকে শুরু করে ভিডিও এডিটিং, আপলোড, থাম্বনেল বানানো, অ্যাডসেন্সের সঙ্গে চ্যানেল যুক্ত করা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যুক্ত করে টাকা উত্তোলন পর্যন্ত সবকিছুই ইউটিউব থেকে শেখেন। তার দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার তিন-চার মাস পর ‘শান্তির আহ্বান’ চ্যানেল অর্থ উপার্জনের উপযুক্ত হয়। তবে ভোটার আইডি কার্ড না থাকায় স্ত্রীকে দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের মোংলা শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন।

এই ইউটিউব চ্যানেল থেকে প্রথম উপার্জন হিসেবে প্রায় ৩৭ হাজার টাকা তোলেন তারা। এরপর প্রায় প্রতি মাসেই ৩০-৪০ হাজার টাকা করে তুলেছেন। এ পর্যায়ে ভ্যান ও রিকশা চালানো ছেড়ে দিয়ে ইউটিউবের প্রতি আরও মনোযোগী হন শাফী। এর মধ্যে ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে একটি ভিডিও আপ করেন। সেই ভিডিওটিও ভাইরাল হয়। তখন থেকেই তিনি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিতর্কিত ভিডিও তৈরি করতে থাকেন। তার আয়ও বাড়তে থাকে।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, সরকারি বিষয় ছাড়া অন্য কোনো নিয়ে কথা বললে তেমন ভিউ হয় না। এ জন্য শাফী ভিউ বাড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়েই সরকারবিরোধী ভিডিও বানিয়ে আপ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করেন। যে ভিডিওতে তিনি মনগড়া নানা প্রশ্ন রেকর্ড করেন আর প্রধানমন্ত্রীর কথা কেটে কেটে জোড়া লাগান। একইভাবে কোরআনের একটি সুরারও ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ভিডিও বানিয়ে আপ করেন।

শেয়ার করুন