শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলায় কুপির আলোয় রাত

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়িত ঘোষণা করা হলেও এখনও সেখানে কুপির আলোয় কাটছে অনেকের রাত। ছবি: নিউজবাংলা

শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলায় কুপির আলোয় রাত

গুচ্ছগ্রামে আশ্রিত দুই শতাধিক মানুষের মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের সুফল জোটেনি তাদের কপালে। কেরোসিনের কুপিবাতি, হারিকেনের আলোতেই জীবন কাটছে তাদের।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়িত ঘোষণা করা হলেও এখনও সেখানে কুপির আলোয় কাটছে অনেকের রাত। বিদ্যুতের খুঁটি বসার প্রায় দুই বছর পার হলেও বিদ্যুতের সংযোগ মেলেনি।

সীমান্ত ঘেঁষা ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের চর গোরকমণ্ডল আবাসন বা গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয় ২০১০ সালে। এটি উপজেলার দুস্থ অসহায় ৬০টি ভূমিহীন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গুচ্ছগ্রামে আশ্রিত দুই শতাধিক মানুষের মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের সুফল জোটেনি তাদের কপালে। কেরোসিনের কুপিবাতি, হারিকেনের আলোতেই জীবন কাটছে তাদের।

বিদ্যুতের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও লাভ হচ্ছে না গুচ্ছগ্রামবাসীর। অন্ধকারেই লেখাপড়া করতে হচ্ছে স্কুলশিক্ষার্থীদের।

বিদ্যুৎ ছাড়া গরমের দিনগুলোয় গুচ্ছগ্রাম ছেড়ে চলে গেছে ২০টি পরিবার। ঠাঁই নিয়েছে অন্যত্র।

শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলায় কুপির আলোয় রাত

দুই বছর আগে বিদ্যুতের খুঁটিসহ বিদ্যুতের লাইন স্থাপিত হলেও এখনও সংযোগ দেয়া হয়নি গুচ্ছগ্রামে। ফলে সরকারের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ-সুবিধার সুফল থেকে বঞ্চিত এখানকার দরিদ্র পরিবারগুলো।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মালেকা বেগম বলেন, ‘হামার জমিজমা না থাকায় গুচ্ছগ্রামে হইছে থাকি এটে আছি। সাখানে কারেন দিলেও হামার গুচ্ছগ্রামত নাই আইসে। সে জন্য এলাও হামরাগুলা রাত হইলে অন্ধকারতে থাকি। আইতোত ন্যাম্পো (কুপিবাতি) নাগে আন্দন করি। সেই আলোতে খাই। আর গরমোত থাকায় না যায়।’

শিক্ষার্থী আম্বিয়া খাতুন জানায়, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে পড়াশোনা ঠিকমতো হয় না। কুপির আলোয় বেশিক্ষণ লেখাপড়া করা যায় না। চোখ জ্বালাপোড়া করে।

গুচ্ছগ্রামের সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, ‘মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও সরকারের বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছি না। গুচ্ছগ্রামে রাত হলেই বিপদ বাড়ে। নারী-পুরুষ-শিশু সবাই কষ্ট করে চলছি। বিদ্যুতের পোল বসাবার প্রায় দুই বছর পার হইল। এলাও লাইন দেয়নি। বহুবার বিদ্যুৎ অফিস গেছি লাইনের জন্য, তা-ও পাইনি।’

শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলায় কুপির আলোয় রাত

নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মুসাব্বের আলী মুসা বলেন, ‘শুধু গুচ্ছগ্রাম নয়, আমার এলাকার খোকারচরে এখনও পাঁচটি গরিব পরিবার বিদ্যুৎ-সংযোগ পায়নি। তাদের জন্য বারবার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি।’

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ফুলবাড়ী জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোস্তফা কামাল বলেন, চর গোরকমণ্ডল গুচ্ছগ্রাম এবং খোকার চরের পাঁচ পরিবারে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা ওই পাঁচটি পরিবার এখনও জামানত, সদস্য ফি না দেওয়ায় এবং ওয়্যারিং না থাকায় বিদ্যুৎ-সংযোগ পায়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন দাস জানান, এ বিষয়ে খোঁজখরব নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাকিংয়ের নেপথ্যের অবিশ্বাস্য কাহিনি

বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাকিংয়ের নেপথ্যের অবিশ্বাস্য কাহিনি

২০১৬ সালে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার চুরির এক নিখুঁত পরিকল্পনা সাজায়। ছবি: নিউজবাংলা

পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরির ঘটনা সারা বিশ্বে তোলপাড় তোলে। এটি আন্তর্জাতিক হ্যাকিংয়ের ইতিহাসে এক দুর্ধর্ষ ঘটনা। এই ঘটনায় শুধু বাংলাদেশই নয়, যুক্ত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, চীন ও শ্রীলঙ্কা। উত্তর কোরিয়ার একদল হ্যাকার কীভাবে ১ বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, কীভাবে তাদের নিখুঁত পরিকল্পনা ঘটনাচক্রে কেঁচে যায়, সে কাহিনি উঠে এসেছে বিবিসি ওয়ার্ল্ডের ১০ পর্বের পডকাস্টে। সেটির সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরেছেন রুবাইদ ইফতেখার।

২০১৬ সালে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার চুরির এক নিখুঁত পরিকল্পনা সাজায়। তারা প্রায় সফল হয়েই গিয়েছিল। নেহাত ভাগ্যের জোরে তাদের পরিকল্পনা হোঁচট খায়। বাংলাদেশ ৮১ মিলিয়ন ডলার খোয়ানোর পর এই চুরি ঠেকাতে সক্ষম হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র ও বিচ্ছিন্ন দেশ উত্তর কোরিয়া কীভাবে এত চৌকস একটি সাইবার অপরাধী দল তৈরি করতে পারল?

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে বিবিসি ওয়ার্ল্ড ১০ পর্বের একটি পডকাস্ট তৈরি করেছে, যার শিরোনাম: ‘লাজারাস হেইস্ট: হাউ নর্থ কোরিয়া অলমোস্ট পুলড অফ আ বিলিয়ন ডলার’ (লাজারাস হেইস্ট: যেভাবে উত্তর কোরিয়া বিলিয়ন ডলার প্রায় সরিয়ে ফেলেছিল)।

এখানে সেই পডকাস্টের কিছুটা সংক্ষেপিত রূপ তুলে ধরা হলো:

এ গল্পের শুরু একটি অকেজো প্রিন্টার দিয়ে। প্রিন্টারটি নষ্ট হলে অন্য সকলের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও ভেবেছিলেন, এটি মামুলি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি।

কিন্তু প্রিন্টার যেখানে রাখা, সেটা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দশম তলার একটি কক্ষ আর এই প্রিন্টারও কোনো যেনতেন প্রিন্টার না। এর একটিই কাজ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোটি-কোটি টাকার আদান-প্রদানের রেকর্ড প্রিন্ট করা।

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল পৌনে ৯টার দিকে ব্যাংকের কর্মকর্তারা টের পান, ওই প্রিন্টারটি কাজ করছে না। ডিউটি ম্যানেজার জুবায়ের বিন হুদা বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, সাধারণ কোনো সমস্যা। যেমনটা সাধারণত ঘটে থাকে, তেমন কিছু হয়েছে। আগেও এ ধরনের সমস্যা দেখে দিয়েছে প্রিন্টারে।’

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক যে এক বিরাট সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে, এটি ছিল তার প্রথম আলামত। হ্যাকাররা ততক্ষণে ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়েছে এবং ওই সময়ে ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চকাঙ্ক্ষী সাইবার অ্যাটাক শুরু করে দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল এক বিলিয়ন ডলার চুরি করা।

চুরি করা টাকা সরিয়ে নিতে হ্যাকাররা নকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, দাতব্য সংস্থা, ক্যাসিনো এবং সহযোগীদের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাকিংয়ের নেপথ্যের অবিশ্বাস্য কাহিনি

এই হ্যাকাররা কারা এবং কোথা থেকে এসেছে?

সকল ডিজিটাল ফিঙ্গার প্রিন্ট কেবল একটি দিকই নির্দেশ করছিল: উত্তর কোরিয়া সরকার।

সাইবার-অপরাধের ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়াকে সন্দেহ করা হবে এটা অনেকের কাছে অবাক করার মতো লাগতে পারে। এটি বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলির মধ্যে একটি। দেশটি প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল, অর্থনৈতিক ও প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন।

তারপরও এফবিআইয়ের মতে, এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হ্যাকার ও মধ্যস্থতাকারীদের গোপন একটি দলের বহু বছরের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফসল ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকে এই দুঃসাহসী হ্যাকিং অভিযান।

সাইবার নিরাপত্তা ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তর কোরিয়ান হ্যাকারদের ডাকা হয় ল্যাজারাস গ্রুপ নামে। নামটি দেয়া হয়েছে বাইবেলে বর্ণিত ল্যাজারাসের নাম অনুযায়ী, যিনি মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছিলেন। এই গ্রুপের কম্পিউটার ভাইরাসগুলিকে সামলানো বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই হ্যাকাররাও বারবার ফিরে আসে।

গ্রুপটি সম্বন্ধে খুব বেশি জানা যায়নি। এফবিআই এই গ্রুপের শুধু একজন সন্দেহভাজনের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পেরেছে, তার নাম পার্ক জিন-হিয়ুক। তিনি পার্ক জিন-হেক ও পার্ক কোয়াং-জিন নামেও পরিচিত।

কে এই পার্ক?

এফবিআই বলছে, পার্ক একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার। উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষে তিনি চীনা বন্দর শহর দালিয়ানে উত্তর কোরিয়ার একটি সংস্থা চোসুন এক্সপোর হয়ে কাজ করতেন। পার্ক সারা বিশ্বের ক্লায়েন্টদের জন্য অনলাইন গেমিং ও জুয়ার প্রোগ্রাম তৈরি করেছিলেন।

দালিয়ানে থাকার সময় তিনি একটি ই-মেইল আইডি ও একটি সিভি তৈরি করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের নেটওয়ার্কও তৈরি করেন। এফবিআইয়ের তদন্তকারীর হলফনামায় বলা হয়েছে, পার্কের সাইবার-ফুটপ্রিন্ট থেকে জানা যায়, ২০০২ সালের দিকে দালিয়ানে তার যাতায়াত শুরু হয়, যা ২০১৩ বা ২০১৪ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এরপর তার ইন্টারনেট কার্যকলাপ উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ং ইয়ং থেকে রেকর্ড করে এফবিআই।

বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাকিংয়ের নেপথ্যের অবিশ্বাস্য কাহিনি
উত্তর কোরিয়ার সন্দেহভাজন হ্যাকার পার্ক জিন-হিয়ুক আছেন এফবিআইয়ের ওয়ান্টেড তালিকায়

আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থাটি পার্কের একটি ছবিও প্রকাশ করে, যা ক্লায়েন্টের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য একটি ই-মেইলে ব্যবহার করেছিলেন চসুন এক্সপোর ম্যানেজার। ছবিতে দেখা যায়, ক্লিন-শেভ বিশ বা ত্রিশের ঘরের এক কোরিয়ান যুবক পার্ক। পরনে ছিল চকোলেট রঙের সুট ও কালো রঙের পিন স্ট্রাইপ শার্ট। একবারেই সাধারণ একটি চেহারা, যাতে ক্লান্তির ছাপ রয়েছে।

এফবিআইয়ের দাবি, পার্ক দিনে প্রোগ্রামার হলেও রাতে হ্যাকারের কাজ করেন।

২০১৮ সালের জুনে আমেরিকান কর্তৃপক্ষ পার্ককে সেপ্টেম্বর ২০১৪ ও আগস্ট ২০১৭-এর মধ্যে করা কম্পিউটার জালিয়াতি ও অপব্যবহারের ষড়যন্ত্র এবং ই-মেইল জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত করে। ধরা পড়লে তার ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। (অভিযোগ দায়েরের চার বছর আগে তিনি চীন থেকে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যান।)

পার্ক রাতারাতি হ্যাকার হননি। তিনি হাজার হাজার তরুণ উত্তর কোরিয়ানের একজন, যাদের শৈশব থেকেই সাইবার-যোদ্ধা হওয়ার জন্য বেছে নেয়া হয়। গণিতে ভালো এইসব প্রতিভাবান কিশোরদের, যাদের অনেকের বয়স ১২, স্কুল থেকে রাজধানীতে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের সকাল থেকে রাত অবধি নিবিড় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

সাপ্তাহিক ছুটির চক্কর

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা যখন সেই প্রিন্টারটি রিস্টার্ট করেন, তখন তাদের কপালে পড়ে চিন্তার ভাঁজ। প্রিন্টার থেকে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে আসা জরুরি কিছু বার্তা প্রিন্ট হয়ে বের হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশের ইউ ডলারের একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আমেরিকান ব্যাংকটি জানায়, তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার উঠিয়ে নেয়ার নির্দেশ পেয়েছে।

ফেডারেল ব্যাংক অফ রিজার্ভের সঙ্গে বাংলাদেশ যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু হ্যাকারদের দক্ষতায় তারা সেটা করতে পারেনি।

আগের দিন (৪ ফেব্রুয়ারি) বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় হ্যাকিং শুরু হয়। বাংলাদেশ যখন ঘুমন্ত তখন নিউ ইয়র্কে বৃহস্পতিবার সকাল। ফলে ফেডারেল ব্যাংকের হাতে ওই নির্দেশ পালনের জন্য যথেষ্ট সময় ছিল।

পরের দিন থেকে বাংলাদেশের শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয়। যার কারণে ঢাকার বাংলাদেশ ব্যাংক দুই দিনের ছুটিতে যাচ্ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন শনিবার এই চুরির বিষয়টি ধরতে পারে, তখন নিউ ইয়র্কে উইকেন্ড শুরু হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্থানা বলেন, ‘এ থেকে বোঝা যায় আক্রমণ কতটা নিঁখুত ছিল। বৃহস্পতিবার এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রবার নিউ ইয়র্কে কাজের দিন আর বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংক আবার যখন খুলছে, তখন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাতে পুরো বিষয়টি ধরা পড়তে পড়তে তিন দিন দেরি হয়।’

সময়ক্ষেপণ করতে হ্যাকাররা আরও একটি কৌশল অবলম্বন করে। ফেড থেকে বের করার পর তারা টাকাটা পাঠিয়ে দেয় ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার কয়েকটি অ্যাকাউন্টে। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ছিল চন্দ্রবর্ষের প্রথম দিন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ওই দিন সরকারি ছুটি পালন করা হয়।

বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক ও ফিলিপাইনের সময়ের পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা টাকা সরিয়ে নিতে পুরো পাঁচ দিনের একটা সময় বের করে।

বহুদিন ধরেই তারা এই সমস্ত পরিকল্পনা করে। চুরির আগে প্রায় এক বছর ল্যাজারাস গ্রুপটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমের মধ্যে লুকিয়ে ঘোরাফেরা করছিল।

চুরির এক বছর আগে

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আপাতদর্শনে নিরীহ একটি ই-মেইল পান। রাসেল আহলাম নামের এক চাকরি প্রার্থীর মেইল ছিল সেটি। বিনম্রভাবে মেইলে রাসেল ব্যাংকে চাকরির বিষয়ে আর তার সিভি ডাউনলোডের জন্য একটি ওয়েবসাইটের লিংক দেয়।

এফবিআই জানায়, রাসেল নামের কেউ আসলে ওই মেইল করেননি। মেইল করেছিল ল্যাজারাস গ্রুপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত একজন কর্মকর্তা ল্যাজারাসের ধোঁকায় পা দেন ও ওই সিভি ডাউনলোড করেন। অজান্তেই তাতে লুকিয়ে থাকা ভাইরাসটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে আক্রমণ করে।

ব্যাংকের সিস্টেমে ঢোকার পর ল্যাজারাস গ্রুপ গোপনে কম্পিউটার থেকে কম্পিউটারে প্রবেশ করে। যে ডিজিটাল ভল্টে বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাখা ছিল, সেটায় ঢোকার কাজ শুরু করে তারা।

এবং তারপরে তারা থেমে যায়।

হ্যাকাররা প্রাথমিক ফিশিং ই-মেইল পাঠানোর এক বছর অপেক্ষার পর কেন টাকা চুরি করল? ব্যাংকের সিস্টেমে এক বছর লুকিয়ে থাকতে গিয়ে ধরা পড়ার ঝুঁকি কেন নিল তারা?

নিয়েছে, কারণ চুরির টাকা বের করে নেয়ার পথ ঠিক করতে ল্যাজারাসের সময় দরকার ছিল।

ঢাকার টাকা ম্যানিলায়

ম্যানিলার ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি জুপিটার স্ট্রিট। ফিলিপাইনের অন্যতম বড় ব্যাংক আরসিবিসির একটা শাখা রয়েছে এখানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে প্রবেশের পর ২০১৫ সালের মে মাসে এই শাখায় চারটি অ্যাকাউন্ট খোলে হ্যাকারদের সহযোগীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাকিংয়ের নেপথ্যের অবিশ্বাস্য কাহিনি

পরে জানা যায়, অ্যাকাউন্টগুলো খোলার সময় ব্যবহার করা হয় জাল ড্রাইভার্স লাইসেন্স। আর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা চার আবেদনকারীর জব টাইটেল ও বেতন ছিল হুবহু এক। প্রাথমিকভাবে ৫০০ ডলার দিয়ে খোলা অ্যাকাউন্টগুলো মাসের পর মাস একইভাবে পড়ে ছিল। কেউ ওই টাকাতেও হাত দেয়নি। এই অস্বাভাবিকতা কারও চোখে পড়েনি। হ্যাকাররা ততদিনে পালানোর অন্য বুদ্ধি আঁটছিল।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাক করে ও টাকা সরিয়ে ফেলার পথ পরিষ্কার করে ল্যাজারাস গ্রুপ প্রস্তুত হয়ে যায় চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য।

তবে তাদের সামনে তখনও একটা বাধা ছিল।

১০ তলার সেই প্রিন্টার।

বাংলাদেশ ব্যাংক তার অ্যাকাউন্ট থেকে সমস্ত লেনদেন রেকর্ড করার জন্য একটি পেপার ব্যাক-আপ সিস্টেম তৈরি করে। লেনদেনের এই রেকর্ড সঙ্গে সঙ্গে চুরির ঘটনা প্রকাশ করার ঝুঁকিতে ফেলে দেয় হ্যাকারদের। তারা তাই একে নিয়ন্ত্রণকারী সফটওয়্যারটিতে আগে হ্যাক করে ও অকার্যকর করে দেয়।

নিজেদের গোপনীয়তা পুরোপুরি নিশ্চিত করার পর, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৩৬ মিনিটে হ্যাকাররা টাকা সরাতে শুরু করে।

নিউ ইয়র্কের ফেডারেল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশের জমা করা টাকার প্রায় পুরোটাই, মোট ৩৫টি লেনদেনে তারা সরাতে শুরু করে। এর পরিমাণ ছিল ৯৫১ মিলিয়ন ডলার।

চোররা যখন নিজেদের বড় পারিশ্রমিকের স্বপ্নে বিভোর, তখন একেবারে হলিউডি ফিল্মের মতো ছোট্ট একটা ভুলে ভন্ডুল হয়ে যায় সবকিছু। ধরা পড়ে তাদের চুরি।

পরের দুই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা টাকা খোয়া গেছে বুঝতে পারলেও ঠিক কী হয়েছে ধরতে পারছিলেন না।

গোপন রাখা হয় চুরি

ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে রাকেশ আস্থানা ও তার সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইনফরম্যাটিকসের পরিচয় ছিল। গভর্নর রাকেশকে সাহায্যের জন্য ফোন করেন।

আস্থানা বিবিসিকে জানান, ওই মুহূর্তেও গভর্নর ভাবছিলেন, তিনি চুরি হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। যার কারণে তিনি হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি শুধু জনগণের কাছ থেকেই নয়, দেশের সরকারের কাছেও গোপন রাখেন।

আস্থানা বোঝার চেষ্টা করছিলেন, হ্যাকাররা কতদূর কী করেছে। তিনি বের করেন, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমের অন্যতম অংশ সুইফটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে হাজারো ব্যাংকের বড় অঙ্কের লেনদেনের সামাল দেয় সুইফট সফটওয়্যার সিস্টেম। সুইফটের কোনো দুর্বল দিক হ্যাকাররা কাজে লাগায়নি। তার দরকারও পড়েনি। কারণ সুইফট সফটওয়্যার হ্যাকারদের ব্যাংকের কর্মচারী ভেবে নিয়েছিল।

দ্রুতই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তারা বুঝতে পারেন, হারানো টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। ততক্ষণে ফিলিপাইনে কিছু টাকা পৌঁছে গিয়েছিল।

ওখানকার কর্তৃপক্ষ জানায়, টাকা ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া আদালতের আদেশ ছাড়া শুরু করা সম্ভব নয়। আদালতের আদেশ সরকারি নথি। যে কারণে যখন বাংলাদেশ ব্যাংক ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আবেদন করে, তখন পুরো বিষয়টি সবাই জানতে পারেন ও বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর তোপের মুখে পড়েন। আস্থানা বলেন, ‘তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। তাকে আমি আর দেখিনি।’

টাকা যেভাবে বের করা হয়

হ্যাকাররা ম্যানিলার অসংখ্য ব্যাংক ব্যবহার করতে পারত, কিন্তু তারা জুপিটার স্ট্রিটে অবস্থিত আরসিবিসি ব্যাংকের শাখাটিকেই বেছে নেয়। এই সিদ্ধান্তের কারণেই তাদের কয়েক শ মিলিয়ন ডলার গচ্চা দিতে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের আর্থিক সেবা বিষয়ক কমিটির সদস্য ক্যারোলিন ম্যালোনি জানান, ঘটনাচক্রে ইরানের একটি জাহাজের নামের সঙ্গে মিলে যায় এ ব্যাংকের ঠিকানা।

তিনি বলেন, লেনদেনগুলোকে ফেড আটকে দেয়। কারণ এর ঠিকানায় জুপিটার শব্দটি ছিল। জুপিটার একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজেরও নাম, যার ওপর ফেডের নিষেধাজ্ঞা আছে। এটি কালো তালিকাভুক্ত।

‘জুপিটার’ শব্দটির কারণেই ফেডারেল ব্যাংকের কম্পিউটারগুলো সতর্ক হয়ে ওঠে এবং লেনদেনগুলো রিভিউ করা হয়। এ কারণে অধিকাংশ লেনদেন ঠেকানো সম্ভব হয়। তবে ১০১ মিলিয়ন ডলার ঠিকই ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়।

এই ১০১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কার একটি দাতব্য সংস্থা ‘শালিকা ফাউন্ডেশন’-এর নামে। হ্যাকারদের দোসররা চুরি করা টাকা পাচারের জন্য আগেই একে ঠিক করে রাখেন। এর মালিক শালিকা পেরেরা জানান, তার ধারণা ছিল লেনদেনগুলো বৈধভাবে দান করা হয়েছে।

এখানেও ছোট একটা ঝামেলার কারণে ফেঁসে যায় হ্যাকাররা। টাকা পাঠানো হয় ‘Shalika Fundation’ এর নামে। এক ব্যাংক কর্মকর্তার চোখে পড়ে এই বানান ভুল, কারণ এতে ফাউন্ডেশনের একটি অক্ষর (o) বাদ পড়েছে। ফলে লেনদেনটি ফেরত পাঠানো হয়।

শেষ পর্যন্ত ৮১ মিলিয়ন ডলার

লক্ষ্য ছিল ১ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি করতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা। লক্ষ্য পূরণ না হলেও বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে পাঁচজনের একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, তাদের জন্য এই ক্ষতিও ছিল বড় অঙ্কের।

বাংলাদেশ ব্যাংক যতক্ষণে টাকা ফেরত নেয়ার চেষ্টা শুরু করে, ততক্ষণে হ্যাকাররা একে নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে। হ্যাকিংয়ের পরদিন অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার জুপিটার স্ট্রিটের আরসিবিসি শাখায় এক বছর আগে খোলা অ্যাকাউন্ট হঠাৎই যেন জীবন ফিরে পায়।

টাকাগুলোকে চারটি অ্যাকাউন্টে পাঠানোর পর সেখান থেকে স্থানীয় একটি মানি এক্সচেঞ্জ ফার্মে পাঠানো হয়। স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত করার পর সেগুলোকে আবারও ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে ফিরিয়ে আনা হয়। কিছু অংশ নগদ হিসেবে ব্যাংক থেকে তোলাও হয়েছে।

মানি লন্ডারিং বিশেষজ্ঞদের কাছে পুরো বিষয়টিই ছিল নিয়মমাফিক। ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবারি ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ফিনান্সিয়াল ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের প্রধান মোয়ারা রুয়েসেন বলেন, ‘পরবর্তীতে ব্যবহার করার জন্য সমস্ত বেআইনি উপার্জনকে সাদা দেখাতে হবে ও এমনভাবে দেখাতে হবে যেন মনে হয় তা বৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত। অর্থের লেনদেনটিকে যতটা সম্ভব ঘোলা ও অস্পষ্ট করে তুলতে হবে।’

তারপরও তদন্তকারীদের সামনে টাকার উৎস খুঁজে পাওয়ার উপায় ছিল। সম্পূর্ণ আত্মগোপনের জন্য এর দরকার ছিল ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে হাওয়া হয়ে যাওয়া।

ক্যাসিনোর জুয়ার টেবিল

বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরি করা দলটির পরের গন্তব্য ছিল সলিটেয়ার হোটেল। ম্যানিলার এই হোটেলটি বিখ্যাত এর ক্যাসিনোর জন্য। ৪০০টি জুয়ার টেবিল ও ২ হাজার স্লট মেশিন সংবলিত ক্যাসিনোটিতে মোটা পকেটওয়ালা চীনা ব্যবসায়ীরা জুয়া খেলতে আসেন।

চুরি করা ৮১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৫০ মিলিয়ন ডলার এই ক্যাসিনো ও মাইডাস নামের আরেকটি ক্যাসিনোর অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। বাকি ৩১ মিলিয়ন ডলারের কী হলো সেটা জানতে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তাদের দাবি, বাকি টাকা শু ওয়েইকাং নামের এক চীনা ব্যক্তিকে দেয়া হয়, যিনি একটি প্রাইভেট জেটে শহর ছাড়েন ও তারপর কোনোদিন আর ম্যানিলায় আসেননি।

অর্থের উৎস ও লেনদেন গোপনের জন্যই ক্যাসিনোতে টাকা পাঠানো হয়। চুরি করা টাকা দিয়ে ক্যাসিনোর চিপস কিনে, জুয়া খেলার পর নগদ টাকায় বদলে ফেলা হলে তদন্তকারীদের পক্ষে একে খুঁজে বের করা অসম্ভব।

ক্যাসিনোতে জুয়া খেলে যেন টাকা খোয়া না যায় সে জন্য চোরদের দল প্রাইভেট রুম ভাড়া করে এবং নিজেদের লোকদের সঙ্গেই নিজেরা জুয়া খেলে। এতে করে তারা পুরো জুয়ার টাকাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়ত তারা চুরি করা টাকা দিয়ে ‘বাকারাত’ খেলে। এটি এশিয়ার বহু দেশে প্রচলিত জনপ্রিয় একটি জুয়া, যেটাতে শুধুমাত্র দুটা ফল। হার অথবা জিত। এবং অধিকাংশ টাকা (প্রায় ৯০ শতাংশ) ফিরে পাওয়া সম্ভব।

অপরাধীরা চুরি হওয়া টাকা লন্ডারিং করে লাভের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সেটা নিশ্চিত করতে খেলোয়াড় ও তাদের ধরা বাজিকে খুব সাবধানে তারা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা বেশ খানিকটা সময় নেয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা টাকা সাদা করার জন্য ম্যানিলার ক্যাসিনোতে অপেক্ষায় ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকও তখন টাকা উদ্ধারের চেষ্টায় বেশ এগিয়ে যাচ্ছিল। এর কর্মকর্তারা ম্যানিলা সফরে আসেন ও টাকা পাচারের পথ খুঁজে পান। কিন্তু ক্যাসিনোতে যাওয়ার পর তারা নিরুপায় হয়ে পড়েন। ওই সময়ে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলো মানি লন্ডারিংয়ের নিয়মের অধীনে ছিল না। ক্যাসিনোদের হিসেবে তাদের অ্যাকাউন্টের টাকা বৈধ ও বৈধ জুয়াড়িদের টাকা। তাদের নিজের টাকা দিয়ে তারা বৈধভাবেই জুয়া খেলছেন।

সলিটেয়ার জানায়, তারা জানত না যে, তাদের ক্যাসিনোতে অবৈধ টাকা ঢালা হচ্ছে, এ নিয়ে তারা কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে। আর মাইডাস বিবিসির কাছে কোনো মন্তব্য করেনি।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা কিম ওয়ং নামের মাইডাস ক্যাসিনোতে জুয়ার আসরের আয়োজনকারী এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৬ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হন। বাকি ৩৪ মিলিয়ন তখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এর পরবর্তী গন্তব্য উত্তর কোরিয়ার আরও এক ধাপ কাছে।

তদন্তকারীদের বিশ্বাস ছিল যে, চুরি যাওয়া অর্থের পরবর্তী গন্তব্য মাকাও।

চীনের এই রাজ্যটির সঙ্গে সলিটেয়ারে জুয়া খেলা অনেকেরই সম্পর্ক ছিল। সলিটেয়ারে প্রাইভেট রুম ভাড়া করা দুটি প্রতিষ্ঠান ছিল মাকাওয়ের। তদন্তকারীরা দাবি করেন অধিকাংশ অর্থ মাকাও থেকেই উত্তর কোরিয়ায় ঢুকেছে।

বাংলাদেশ চুরি হওয়া বাকি অর্থ প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক ডজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকও আছে। তারা অবশ্য আইন ভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে আক্রমণের পরের বছর ২০১৭ সালের মে মাসে ওয়ানাক্রাই র‍্যানসমওয়্যার হাজার হাজার ব্যবহারকারীকে আক্রমণ করে। আক্রান্তদের ব্ল্যাকমেইল করা হয় ও বিটকয়েনের বিনিময়ে তাদের ডেটা ফিরিয়ে দেয়া হয়।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির এক গোয়েন্দা এফবিআইয়ের সঙ্গে মিলে র‍্যানসমওয়্যারের কোড ভাঙার চেষ্টা করে দেখেন এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ২০১৪ সালে সোনি পিকচার্সে হ্যাকিংয়ে ব্যবহৃত ভাইরাসের অনেকাংশে মিল রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এফবিআই এই আক্রমণের জন্য পার্ক জিন-হিয়ুককে দোষী সাব্যস্ত করে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস আরও দুই উত্তর কোরিয়ার নাগরিককে দোষী খুঁজে পায়। তাদের দাবি ওই দুইজনও ল্যাজারাস গ্রুপের সদস্য এবং ক্যানাডা থেকে নাইজেরিয়া পাঠানো একটি মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত।

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন

নারীকে বসের দেয়া উপহারের ঘড়িতে গোপন ক্যামেরা!

নারীকে বসের দেয়া উপহারের ঘড়িতে গোপন ক্যামেরা!

এ ধরনের স্পাই ক্যাম দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় চলছে নারীর গোপন ভিডিও ধারণ। ছবি: সংগৃহিত

অনলাইনে ঘড়িটি সম্পর্কে খোঁজখবর করতেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। ওই নারী বুঝতে পারেন, ঘড়িটি আসলে একটি গোপন ক্যামেরা। আর এটি এক মাসের বেশি সময় ধরে বসের মোবাইলে পাঠাচ্ছিল তার শোবার ঘরের ভিডিও।

অফিসের বস তার নারী সহকর্মীকে উপহার দিয়েছিলেন একটি টেবিল ঘড়ি। সেই ঘড়িটি জায়গা পায় ওই নারীর শোবার ঘরের এক কোণে। সব কিছুই চলছিল ঠিকঠাক। তবে একদিন ঘড়িটি কক্ষের আরেক কোনো সরিয়ে রাখার পরই দেখা দেয় বিপত্তি।

বস ওই নারীকে বলে বসেন, যদি উপহারের ঘড়িটি পছন্দ না হয়, তবে যেন ফিরিয়ে দেন। আর এতেই তৈরি হয় সন্দেহ। ঘড়ির জায়গা পরিবর্তনের বিষয়টি বস কী করে জানলেন?

এরপর অনলাইনে ঘড়িটি সম্পর্কে খোঁজখবর করতেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। ওই নারী বুঝতে পারেন, ঘড়িটি আসলে একটি গোপন ক্যামেরা। আর এটি এক মাসের বেশি সময় ধরে বসের মোবাইলে পাঠাচ্ছিল তার শোবার ঘরের ভিডিও।
এ বিষয়ে বসকে প্রশ্ন করতেই তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দেন, এই কারণেই কি সারারাত গুগল নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন?

ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ায় এক নারীর সঙ্গে। চলতি সপ্তাহে এ রকম বেশ কিছু ঘটনা নিয়ে ১০৫ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।

মাই লাইফ ইজ নট ইওর পর্ন: ডিজিটাল সেক্স ক্রাইম ইন সাউথ কোরিয়া’ শিরোনামে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে ৩৮ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে। তাদের কেউ ভুক্তভোগী, কেউ সরকারি কর্মকর্তা আবার কেউ মানবাধিকারকর্মী। প্রতিবেদনটি তৈরিতে সাহায্য করেছেন অনলাইন জরিপে অংশ নেয়া ৫৫৪ জন উত্তরদাতা।

এতে দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় সেক্স ক্রাইম সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। ২০০৮ সালে যেখানে ৫৮৫টি মামলা হয়েছিল, ২০১৮ সালে তা ৬ হাজার ৬১৫-তে দাঁড়ায়। এ রকম অনেক ঘটনা অবশ্য অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।

ঘড়িতে গোপন ক্যামেরার বিষয়টি যখন দক্ষিণ কোরিয়ান ওই নারী বুঝতে পারেন, তিনি আইনের আশ্রয় নেন। তবে তিনি হতাশা জানিয়েছেন বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। বিচারে অবশ্য অভিযুক্তের ১০ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এরপরেও কয়েক বছর আগের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।

মানবাধিকার সংস্থা ইউম্যান রাইটস ওয়াচকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার নিজের ঘরে ঘটনাটি ঘটেছিল। এখনও আমি নিজের ঘরে কোনো কারণ ছাড়াই আতঙ্কিত হয়ে উঠি।’

২০১৮ সালে এমন এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় আরেক নারীর। অপরিচিত এক যুবক তার ঘরের জানালা দিয়ে গোপনে ভিডিও করছিল। বিষয়টি তিনি জানতে পারেন যখন পুলিশ তার দরজায় কড়া নাড়ে। তবে ততদিনে দুই সপ্তাহের বেশি পার হয়ে গেছে। এ সময় ধরে চলেছে গোপন ভিডিও ধারণ।

ওই নারী হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, সেই ঘটনার পর তিনি আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। নতুন বাড়ি কিংবা জনসমাগমস্থল সবখানেই মনে হয় গোপনে তাকে কেউ দেখছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, তার এক পরিচিত যিনি গোপন ক্যামেরার ভুক্তভোগী, তিনি এখন নিজের ঘরে তাবু গেড়ে বসবাস করেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া অনেক নারী আত্মহত্যার কথা ভাবতে শুরু করেছেন, অনেকে তা করেও ফেলেছেন।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ের ঠিক তিন মাস আগে আত্মহত্যা করেন এক হাসপাতালকর্মী। তিনি জানতে পেরেছিলেন এক সহকর্মী তার কাপড় বদলের সময় গোপনে ভিডিও করেছিলেন। সেই অভিযুক্তকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দেন বিচারক।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, দুর্বল আইনের কারণে এ ধরনের ঘটনার রাশ টানা যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তারা দেখিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় আইন অনুযায়ী কেবল অনুমতি ছাড়া কারও ছবি বা ভিডিও যেগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তিকে যৌন হয়রানি করা যায়, সেগুলো অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর অর্থ হলো, কারও নগ্ন ছবি না তোলা হলে, সেগুলোকে সেক্স ক্রাইম হিসেবে ধরা হবে না।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, একবার তিনি এক যুগলের অন্তরঙ্গ ছবি খুঁজে পান ওই নারীর সাবেক প্রেমিকের কাছে, যেটি তোলা হয়েছিল তার অনুমতি ছাড়া। কর্তৃপক্ষ ওই নারীকে সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। তবে পুলিশ, গোয়েন্দা আর আইনজীবীরা ওই নারীকে অভিযোগ তুলে নিতে পরামর্শ দেয়। তারা জানায়, এই ঘটনায় উল্টো বিপদে পড়বেন তিনি। কেননা তার সাবেক প্রেমিক ব্যক্তিগত ছবির জন্য তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে পারেন।

তবে অভিযোগ প্রত্যাহার করেননি ওই নারী। বিচারে সাবেক প্রেমিকের ২ হাজার ৬৫০ ডলার জরিমানা হয়েছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ডিজিটাল সেক্স ক্রাইমের সাজার মাত্রা পুনর্বিবেচনা করতে কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জোর দিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া যৌনতায় সম্মতি নিয়ে আলোচনা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার তাগিদও দেয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি ডিজিটাল সেক্স ক্রাইম রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার। এই লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ডিজিটাল সেক্স ক্রাইম ভিকটিম সেন্টার চালু করেছে দেশটির সরকার। তবে এই পদক্ষেপ দেশজুড়ে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে মনে করছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন

আগের চেয়ে দ্রুত বিবর্তন ঘটছে মানুষের

আগের চেয়ে দ্রুত বিবর্তন ঘটছে মানুষের

ফাইল ছবি।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিককালের পৃথিবীতে মানুষের বিবর্তন শুধু জিনের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং জেনেটিক রূপান্তরের চেয়ে সংস্কৃতিই মানব বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। নতুন এই ধারণা অনুযায়ী, টিকে থাকার সুবিধার জন্য জেনেটিক রূপান্তর এখন আর জরুরি নয়।

হোম স্যাপিয়েন্সের উদ্ভবের পর থেকেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারণে আমাদের পূর্বপুরুষেরা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়েছেন। এর পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে জিনগত বিবর্তন। জেনেটিক এই রূপান্তরের কারণেই বর্তমান মানুষের আবির্ভাব।

তবে এক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিককালের পৃথিবীতে মানুষের বিবর্তন শুধু জিনের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং জেনেটিক রূপান্তরের চেয়ে সংস্কৃতিই মানব বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।

নতুন এই ধারণা অনুযায়ী, টিকে থাকার সুবিধার জন্য জেনেটিক রূপান্তর এখন আর জরুরি নয়। বরং সংস্কৃতির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠা অভ্যাসই ‘রূপান্তর’ এর মূল চালিকা শক্তি, যা মানুষকে টিকে থাকার সুবিধা দিচ্ছে।

এই ‘সাংস্কৃতিক বিবর্তন’ আগামীতেও মানবজাতির ভাগ্যকে আরও শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে বলে গবেষকদের ধারণা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মাইনের বায়োলজি অ্যান্ড ইকোলজি বিভাগের গবেষক জ্যাক উড বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট লাইভ সায়েন্সকে বলেন, ‘যখন কোনো প্রজাতিকে ভাইরাস আক্রমণ করে, সাধারণত সেটি জেনেটিক রূপান্তরের মাধ্যমে ওই ভাইরাস থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখে।’

এই ধরনের বিবর্তন ঘটে ধীরে। কারণ, যারা ভাইরাস আক্রমণের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর তারা মৃত্যুবরণ করে এবং যারা টিকে থাকে তারা আগ্রাসী ভাইরাস সংক্রান্ত জেনেটিক কোড পরের প্রজন্মে সঞ্চার করে।

তবে বর্তমানে এ ধরনের হুমকিতে জেনেটিকভাবে ভাবে খাপ খাইয়ে নেয়ার আর দরকার নেই। বরং এখন মানুষ এখন কোনো নির্দিষ্ট একজনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহু মানুষের সংগ্রহ করা সাংস্কৃতিক জ্ঞানের ‘রূপান্তরের’ ফলে আবিষ্কৃত টিকা ও অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম।

ইউনিভার্সিটি অফ মাইনের সোশ্যাল ইকোসিস্টেম মডেলিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক টিম ওয়ারিং বলেন, “টিকা উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানব সংস্কৃতি তার সম্মিলিত ‘ইমিউন সিস্টেম’ উন্নত করছে”।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফলেও জিনগত বিবর্তন ঘটে। ওয়ারিং লাইভ সায়েন্সকে বলেন, ‘গরুর দুধ পান করা শুরুতে একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকলেও পরে তা এক দল মানুষের জেনেটিক বিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়।’

এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে জেনেটিক পরিবর্তনের আগে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে।

ওয়ারিং বলেন, সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারণাটি শুরু হয়েছে বিবর্তনবাদের জনকের কাছ থেকেই। চার্লস ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষের অভ্যাস বিবর্তিত হতে পারে এবং সেটি সন্তানের মধ্যে তার শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মতোই হস্তান্তর করা সম্ভব। কিন্তু তার সময়ে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, আচরণের পরিবর্তন উত্তরাধিকার সূত্রে পায় সন্তানেরা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনও মায়ের যদি এমন প্রবণতা থাকে, যা তার মেয়েকে খাবার অন্বেষণ শেখাতে পারে; তাহলে তিনি সেটি তার মেয়েকে দিয়ে যাবেন। এতে তার মেয়ের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে এবং এর ফলে, এই প্রবণতা আরও মানুষের মধ্যে আরও বেশি দেখা যাবে।

‘প্রসিডিংস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি’ এর জার্নালে ২ জুন প্রকাশিত গবেষণায় ওয়ারিং ও উড দাবি করেন, মানব ইতিহাসের কোনো এক সময়ে সংস্কৃতি আমাদের ডিএনএর বিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। দুই গবেষক বলছেন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আমাদের এমনভাবে বিবর্তিত হতে সাহায্য করছে, যা শুধু জৈবিক পরিবর্তনের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বরেন, সংস্কৃতি দল বা গ্রুপ নির্ভর। দলের সবাই একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন, শেখেন ও অনুকরণ করেন। এই দলভিত্তিক আচরণ, সংস্কৃতি থেকে শেখা, খাপ খাইয়ে নেয়ার পদ্ধতি জিনগত ভাবে টিকে থাকার সুবিধার চেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

একজন ব্যক্তি অল্প সময়ে প্রায় সীমাহীন সংখ্যক লোকের কাছ থেকে দক্ষতা ও তথ্য গ্রহণ করতে পারেন এবং ঘুরেফিরে আরও অনেকের কাছে সেই তথ্য ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। গবেষকেরা বলছেন মানুষ যত বেশি লোকের কাছ থেকে শিখতে পারছে তত ভাল। বড় দলগুলো ছোট দলের চেয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধান করে ও আন্তঃদলীয় প্রতিযোগিতা অভিযোজন ক্ষমতাকে উদ্দীপ্ত করে, যা তাদের টিকে থাকতে সহায়তা করে।

নতুন ধারণা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সংস্কৃতিতে নতুন বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটে।

বিপরীতভাবে, একজন ব্যক্তি বাবা-মায়ের কাছ থেকে কেবল জেনেটিক তথ্য উত্তরাধিকার সূত্রে পান এবং তাদের ডিম্বাণু বা শুক্রাণুতে তুলনামূলকভাবে মাত্র কয়েকটি এলোমেলো রূপান্তর রেকর্ড করেন। এগুলো তাদের সন্তানদের ছোট গ্রুপের মধ্যে সঞ্চারিত করতে প্রায় ২০ বছর সময় লাগে। এই পরিবর্তনের গতি অনেক ধীর।

গবেষণাটির বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার কগনিটিভ অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্সেসের সহযোগী অধ্যাপক পল স্মলডিনো বলেন,‘এই থিওরির জন্য অপেক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের। বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞান সংস্কৃতির সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করে তা বর্ণনা করার জন্য অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।’

গবেষকদের মতে, মানব সংস্কৃতির উপস্থিতি বিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

লাইভ সায়েন্সকে স্মলডিনো বলেন, ‘তাদের (দুই গবেষক) বড় দাবি হচ্ছে, মানুষের পরবর্তী বিবর্তনভিত্তিক রূপান্তরের সেতুবন্ধনের জায়গায় রয়েছে সাংস্কৃতিক প্রভাব।’

প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে এ ধরনের সেতুবন্ধন বিবর্তনের গতিপ্রকৃতির ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছে। ডিএনএযুক্ত কোষের বিবর্তন ছিল এমন একটি বড় পর্যায়। এরপর ক্ষুদ্রাঙ্গ ও জটিল অভ্যন্তরীণ কাঠামোযুক্ত কোষের আবির্ভাব সবকিছুকে বদলে দেয়। প্রাণি ও উদ্ভিদকোষের আবির্ভাব ছিল আরেকটি বড় পরিবর্তন। লিঙ্গের উদ্ভব, ভূ-পৃষ্ঠে জীবনের শুরু- এর সবগুলোই একেকটি বড় মাইলফলক।

এই প্রতিটি ঘটনাই বিবর্তন যেভাবে কাজ করে তাতে বদল এনেছে। গবেষকেরা বলছেন, এখন মানুষ আরও একটি বিবর্তনীয় রূপান্তরের মধ্যে পড়েছে। এখনও জিনগত পরিবর্তন অব্যাহত থাকলেও তা মানুষের টিকে থাকার শর্তকে খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

ওয়ারিং এক বিবৃতিতে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে আমাদের প্রস্তাব এই যে, আমরা একক জেনেটিক জীব থেকে পিঁপড়ার বাসা বা মৌমাছির চাকের মতো সুপার অর্গানিজমে পরিণত হওয়া সাংস্কৃতিক গ্রুপে পরিণত হয়েছি।’

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন

৫৩ হাজার পরিবারের দুঃখ ঘুচবে আজ

৫৩ হাজার পরিবারের দুঃখ ঘুচবে আজ

বিনা মূল্যের প্রত্যেকটিতে বাড়িতে রয়েছে দুটি করে শয়নকক্ষ, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট ও একটি লম্বা বারান্দা। ফাইল ছবি

যে ঘরগুলো দেয়া হচ্ছে সেগুলোর প্রত্যেকটিতে রয়েছে দুটি করে শয়নকক্ষ, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট ও একটি লম্বা বারান্দা। ঘরের নকশা পছন্দ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই।

মুজিববর্ষে দ্বিতীয় দফায় ৫৩ হাজার ৩৪০ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিচ্ছে সরকার।

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রোববার এ কার্যক্রম শুরু করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা, ‘মুজিববর্ষে কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় এ ঘরগুলো পাবেন গৃহহীন দরিদ্র পরিবারগুলো।

এর আগে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২৩ জানুয়ারি ৬৬ হাজার গৃহহীন পরিবারকে ঘর হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না’ স্লোগান সামনে রেখেই গৃহহীন পরিবারগুলোকে বিনা মূল্যে ঘর করে দিচ্ছে সরকার।

যে ঘরগুলো দেয়া হচ্ছে সেগুলোর প্রত্যেকটিতে রয়েছে দুটি করে শয়নকক্ষ, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট ও একটি লম্বা বারান্দা। ঘরের নকশা পছন্দ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই।

প্রতিটি বাড়ির নির্মাণে খরচ হচ্ছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

দেশের ইতিহাসে এর আগে এত মানুষকে এক দিনে সরকারি ঘর হস্তান্তর করা হয়নি। সরকারের পক্ষে থেকে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বেই একদিনে এর আগে এত বেশি ঘর বিনা মূল্যে হস্তান্তর করা হয়নি কখনো।

৫৩ হাজার পরিবারের দুঃখ ঘুচবে আজ

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গত বৃহস্পতিবার সকালে সরকারপ্রধানের মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও এক লাখ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে বিনা মূল্যে জমিসহ ঘর দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে।

‘এসব গৃহহীন, ভূমিহীন, ছিন্নমূল পরিবারকে শুধু সেমিপাকা ঘরই দেয়া হচ্ছে না; সঙ্গে সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে জমির মালিকানাসহ সারা জীবনের জন্য স্থায়ী ঠিকানা দেয়া হচ্ছে। এতে তাদের জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন এসেছে। নারীর ক্ষমতায়নও হচ্ছে।’

কায়কাউস বলেন, ‘এটার অন্য দিক হলো এতে এমপাওয়ারমেন্ট হচ্ছে। একটা লোক যখন রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে, মাথায় ছাদ ছিল না, পায়ের নিচে মাটি ছিল না, সে কিন্তু লাখপতি হয়ে যাচ্ছে। জমির মূল্য যদি আমরা হিসাব করি, ৩০ হাজার থেকে ৮ লাখ টাকা প্রতি শতকের দাম পড়ে।

‘গড়ে ধরলে ৫০ হাজার টাকা যদি ধরি জমির মূল্য, ২ লাখ টাকা বাড়ি বানাতে খরচ হচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা সম্পত্তির মালিক হচ্ছে একটি দরিদ্র পরিবার। পাশাপাশি তাদের মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি অনেক জমিই অবৈধ দখলে ছিল। সেগুলো উদ্ধার করে দরিদ্র পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। আপনারা রোববার দেখতে পাবেন, শ্রীমঙ্গলে প্রায় ৩৩ একর জমি অবৈধ দখলে ছিল। সেটাতে এখন একটা নান্দনিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

‘দ্বিতীয় পর্যায়ে ঘরগুলো হস্তান্তরে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। রোববার প্রধানমন্ত্রী এটা উদ্বোধন করবেন।’

‘এখানেই হয়তো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার জন্মাবে’

আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীনদের যে ঘর দেয়া হচ্ছে, সরকার আশা করছে, সেখান থেকেই একদিন চিকিৎসক ও প্রকৌশলীর জন্ম হবে। বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস এ আশা ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি, যারা এ বাড়িগুলোতে বসবাস করেন, এই বাড়িতেই একদিন ইঞ্জিনিয়ার জন্ম নেবে, ডাক্তার জন্ম নেবে, ম্যাজিস্ট্রেট জন্ম হবে বা রাজনীতিবিদ-মন্ত্রী জন্ম হবে।’

তিনি বলেন, ‘যারা বাড়িগুলো বরাদ্দ পেয়েছেন এগুলোর মালিকানা তাদেরই। আর তারা চাইলে ভবিষ্যতে বাড়িগুলো ভেঙে আরও উন্নত বাড়ি তৈরি করতে পারবেন।’

মুখ্যসচিব কায়কাউস বলেন, ‘যে ভূখণ্ডে তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে, সেটা কিন্তু তাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়া। এতে অনেকে হয়তো অজ্ঞতার জন্য বুঝতে পারছেন না কী করবেন। কিন্তু এখানে তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

‘কেউ যদি মনে করে ভবিষ্যতে অন্যরকম বাড়ি করবে, সেটাও সে করতে পারবে। কারণ সরকার কিন্তু তাকে বাড়ি-জমিসহ দিয়ে দিয়েছে।’

তিনি জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। দেয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণও।

তিনি বলেন, ‘আমরা গৃহ নির্মাণের জন্য যে জায়গাগুলো সিলেক্ট করেছি, সেগুলো গ্রোথ সেন্টারের পাশে। এর আগে আমরা দেখেছি, ভূমি মন্ত্রণালয় যখন চরাঞ্চলে পুনর্বাসন করেছিল তখন কেউ সেখানে থাকতে আগ্রহী হচ্ছিলেন না। এ কারণে সচেতনভাবেই আমরা চেষ্টা করছি তারা যেন কাজ পায় এমন জায়গায় তাদের বাড়ি দিতে।

‘প্রথম পর্যায়ে যে ৭০ হাজার পরিবারকে ঘর দেয়া হয়েছে সেখানে বেশির ভাগেরই কর্মসংস্থান হয়েছে। ঘরের আঙিনাতে অনেকে চাষাবাদ করছেন, কেউ হয়তো ছোট করে দোকান শুরু করেছেন, মুরগি-ছাগল এগুলো পালন করছেন।’

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে জানান, মালিকানা থাকলেও চাইলেই কেউ জমিগুলো অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না।

তিনি বলেন, ‘এই জমিগুলো তাদের দিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের মিউটেশন বা নামজারিও করে দেয়া হয়েছে, সরেজমিনে দখলও দিয়েছি। এই জমিগুলোতে মুজিব শতবর্ষের একটা সিল দেয়া আছে। উপজেলা প্রশাসন বা জেলা প্রশাসনকে বলা আছে, যদি এটা কেউ অন্যায়ভাবে বা জোর করে হস্তান্তর করতে যায়, এটা যাতে সহজে ট্র্যাক করা যায় সেই ব্যবস্থা রাখতে।

‘ফলে এটি হস্তান্তর করতে গেলেই জানাজানি হয়ে যাবে। এ পর্যায়ে হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। আইডেন্টিফাই করার কিছু চিহ্ন কিন্তু প্রত্যেক দলিলে আমরা ব্যবহার করেছি।’

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন

আগাম জামিনের সুযোগ মিলবে কবে?

আগাম জামিনের সুযোগ মিলবে কবে?

হাইকোর্টে বন্ধ রয়েছে আগাম জামিনের দরজা। কবে নাগাদ আগাম জামিনের সুযোগ মিলবে সুনির্দিষ্ট করে সেটি কেউ বলতে পারছে না কেউ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে করে বিচারপ্রার্থীদের অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আইনজীবীরা।

জমি সংক্রান্ত বিরোধে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় এক জন খুন হওয়ার পর তাড়াইল থানায় ২৫ জনকে আসামি করে মামলা হয়। এ মামলার আসামি মনু মিয়াসহ কয়েক জন আগাম জামিনের আশায় হাইকোর্টে এসেছিলেন। তবে হাইকোর্টে আগাম জামিন বন্ধ থাকায় পালিয়ে থেকেই দিন কাটছে তাদের।

তাদের আইনজীবী জানিয়ে দিয়েছেন, আগাম জামিনের পথ খুললে তবেই তিনি হাইকোর্টে আবেদন করতে পারবেন।

একইভাবে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন মামলায় শতাধিক ব্যক্তির আগাম জামিন আবেদন তৈরি করে রেখেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল। তবে আগাম জামিনের এখতিয়ারসম্পন্ন বেঞ্চ না থাকায় আবেদন করতে পারছেন না তিনি।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে উচ্চ আদালতের কার্যক্রম কিছু দিন বন্ধ থাকার পর ৪ এপ্রিল থেকে ধীরে ধীরে ভার্চুয়ালি চালু হয় হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ। রোববার সবগুলো বেঞ্চে ভার্চুয়ালি বিচারকাজ শুরু হচ্ছে।

তবে বন্ধ রয়েছে আগাম জামিনের দরজা। কবে নাগাদ আগাম জামিনের সুযোগ মিলবে সুনির্দিষ্ট করে সেটি কেউ বলতে পারছে না কেউ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে করে বিচারপ্রার্থীদের অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আইনজীবীরা।

আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের পথ খোলা আছে, একই সঙ্গে গ্রেপ্তারও বহাল আছে, কিন্তু আগামী জামিন বহাল নেই। ফলে ভার্চুয়ালি হলেও উচ্চ আদালতে আগাম জামিন পাওয়ার সুযোগ রাখা উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগাম জামিনের পথ খুলে দেয়া উচিত। যদি প্রমাণিত হয় বিনা কারণে কাউকে ধরতে চাচ্ছে বা গ্রেপ্তার করতে চাচ্ছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে নাগরিক হিসেবে তার অধিকার রয়েছে আদালতে এসে জামিন নেয়া। ভার্চুয়ালি হোক কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে আদালতে হাজির হয়ে হোক, ব্যক্তির আগাম জামিনের সুযোগ রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।’

তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে আদালত যে আদেশ দেবে সেটাই তো তাকে মানতে হবে। আদালত যদি তাকে গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দেয় তাহলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে। আর আদালত যদি তাকে জামিন দেয় তাহলে সে জামিন পাবে। এটি খুলে দেয়া উচিত।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনার কারণে দীর্ঘ দিন ধরে হাইকোর্টে আগাম জামিন বন্ধ রয়েছে। তার ফলে নাগরিকদের আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগাম জামিন না পাওয়ার ফলে একটি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে তাদের। মানুষের মৌলিক অধিকার দেয়া অর্থাৎ আইনশৃংখলা বাহিনী কর্তৃক অযথা হয়রানি থেকে বাচাতে ভার্চুয়ালি আদালতগুলোতে ফৌজদারি মামলার মোশন যে কোর্টে আছে সেখানে আগাম জামিনের আবেদনের সুযোগ দেয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘আগাম জামিনে বিচারপ্রার্থীকে আদালত হাজির হতে হবে এমন কোনো কথা নাই। তার যে আইনজীবী থাকবেন তিনিই তাকে প্রত্যয়ন করবেন। আগাম জামিন না দিলে বিচারপ্রার্থী মানুষ অযথা হয়রানির শিকার হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সব কোর্ট খুলে দিয়েছে, এটা ভালো দিক। তবে কোর্ট মনে করলে আগাম জামিন খুলে দিতে পারে। দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আগাম জামিন খুলে দেয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘আগাম জামিনের নিয়ম হলো কোর্টের সামনে আসামিকে উপস্থিত থাকতে হবে। এখন দেখা গেল এক সঙ্গে ১০/১৫ আসামি কোর্টে উপস্থিত হয়। এই কারণে কোর্ট যদি মনে করেন এটা তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ঝুকি হবে, তাহলে কোর্ট সে সিদ্ধান্ত নিতে পারেই। সংক্রমণের শঙ্কা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। তবে এতে আসামিদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে আমি মনে করি না।’

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগের সবগুলো বেঞ্চ ভার্চুয়ালি খুলে দেয়া হয়েছে, কিন্তু আগাম জামিনের পথটি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে আমি মনে করি, সব আদালত খুলে দেয়া অর্থপূর্ণ হলো না। আগাম জামিনসহ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সবগুলো পথ খুলে দিলেই বলা যেত, প্যানডেমিক বিবেচনায় নিয়ে এটি করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মামলাও হচ্ছে, এক্ষেত্রে তারা আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে দ্রুত কার্যকর ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবাই সমান সুযোগ পাবে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগাম জামিনের বিষয়টি খুলে দেবেন কিনা সেটা কোর্ট বিবেচনা করবেন। প্রধান বিচারপতি বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগাম জামিন বন্ধ আছে।’

কবে নাগাদ খুলবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো আমি বলতে পারব না। যে দিন সিদ্ধান্ত হবে, তারপর থেকেই খুলবে।’

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের সব আদালত। কিছু দিন বন্ধ থাকার পর তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমে সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল কোর্টে বিচার কাজ শুরু হয়। এরপর দফায় দফায় কোর্ট সংখ্যা বাড়ানো হয়। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট বিভাগের সবগুলো বেঞ্চ খুলে দেয়া হয়।

প্রধান বিচারপতির আদেশে সবগুলো বেঞ্চের তালিকা সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়েছে।

হাইকোর্ট বিভাগের এই ৫৩টি বেঞ্চের মধ্যে ১৪টি বেঞ্চকে ফৌজদারি মোশনের ক্ষমতা দেয়া হলেও তাতে আগাম জামিন আবেদন নিষ্পত্তির এখতিয়ার দেয়া হয়নি।

এসব বেঞ্চের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, মানি লন্ডারিং আইন ও আগাম জামিনের আবেদনপত্র ব্যতীত ডিভিশন বেঞ্চে গ্রহণযোগ্য ফৌজদারি মোশনের শুনানি হবে।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর এপ্রিল মাসের শুরুতে চারটি ভার্চুয়াল বেঞ্চ গঠন করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। পরে ২২ এপ্রিল আরও দুটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। এরপর ২৯ এপ্রিল আরও তিনটি যোগ করা হয়।

এ নয়টি বেঞ্চের পাশাপাশি ২২ মে আরও সাতটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। গত ৩১ মে আরেকটি আদেশে ২১টি বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি।

সব শেষ গত ১০ জুন আরও কয়েকটি নতুন বেঞ্চ গঠন করেন প্রধান বিচারপতি। তখন সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ এ। বৃহস্পতিবার সব মিলিয়ে ৫৩ বেঞ্চ খুলে দিলেন প্রধান বিচারপতি।

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

পলিথিনে বানানো অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে যাযাবর জীবন যাপন করছে জেলে পরিবারগুলো। ছবি: নিউজবাংলা

বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গোয়ালট্যাক চকে অস্থায়ী আবাস গেড়েছে মাছ শিকারি কিছু যাযাবর পরিবার। প্রায় তিন মাস পলিথিনের তৈরি ঘরে তারা বসবাস করছে নির্জন প্রান্তরে। প্রতিবছর এরা আসে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থেকে।

শহুরে কোলাহলের পাশে নিস্তব্ধ জঙ্গল। চারদিক পানিতে ঘেরা ছোট্ট টিলায় কাশবনের আড়ালে গুটি কয়েক মানুষের বসবাস। কোনো রকমে দুমুঠো খাবার আর মলিন পোশাক ছাড়া বাকি মৌলিক চাহিদা নাগালের বাইরে তাদের।

পলিথিনে বানানো অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে যাযাবর জীবন যাপন করছে জেলে পরিবারগুলো। রাতে শিয়াল আর সাপের আতঙ্ক যেন তারা মেনেই নিয়েছে জীবনের অংশ হিসেবে। তবে শিশু আর বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে উৎকণ্ঠা বেশি।

রাজধানীর নিকটবর্তী সাভার উপজেলা সবার কাছে পরিচিত শিল্পাঞ্চল হিসেবে। দ্রুত শিল্পায়নের ফলে একসময়কার পল্লিপ্রান্তর এখন আধুনিক শহর। এখানে বসবাস প্রায় ২০ লাখ মানুষের।

আশুলিয়ার নলাম এলাকায় বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গোয়ালট্যাক চকে অস্থায়ী আবাস গড়েছে মাছ শিকারি কিছু যাযাবর পরিবার। প্রায় তিন মাস পলিথিনের তৈরি ঘরে তারা বসবাস করছে নির্জন প্রান্তরে। এরা নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থানার নগরথানাই খাড়া গ্রামের ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের কয়েক মাস আগে থেকে ওই জঙ্গলের টিলা গোয়ালট্যাক চকে আসে যাযাবর পরিবারগুলো। রাতভর নৌকা নিয়ে তারা বংশী নদীতে মাছ ধরার জন্য চাই (ফাঁদ) পাতে। সকালে সেই মাছ আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করেন।

মাঝেমধ্যে এলাকার লোকজন তাদের কাছ থেকে দেশীয় প্রজাতির শিং, টাকি, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন মাছ কিনে নেয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের অনেকেই দাম কম দেন। আবার কখনও জোর করে মাছ নিয়েও চলে যান। এ জন্য স্থানীয় লোকজনের কাছে অনেক সময় তারা মাছ বিক্রি করতে চান না।

নলাম এলাকার কয়েক কিলোমিটার মেঠোপথ আর কাশবন পেরিয়ে এই চকে গিয়ে দেখা যায়, বংশী নদীর পাশে জঙ্গলের ভেতর ছোট ছোট বেশ কয়েকটি ঘর। বাঁশের কাঠামোর সঙ্গে পলিথিন মুড়িয়ে বসবাসের জন্য তৈরি করা হয়েছে এসব অস্থায়ী নিবাস। ভেতরে ছোট্ট পরিসরের মধ্যে একেকটি ঘরে গাদাগাদি করে থাকছেন পাঁচ-ছয়জন। ওই জায়গাতেই রান্নার জন্য বসানো হয়েছে চুলা। সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় দূর থেকে আনতে হয়।

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

দুপুর ১২টা নাগাদ এসব জেলে পরিবারের কর্তাদের দেখা মেলে না। তারা চলে যান নদীতে রেখে আসা ফাঁদ থেকে মাছ সংগ্রহ করতে। আর স্ত্রীরা তখন রান্নাবান্না আর শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত। মাছ শিকারিদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তারা জানান তাদের নানান দুঃখ-দুর্দশা আর হতাশার কথা।

জেলে ইসরাফিল খাঁর স্ত্রী হাসি বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাগে দেশের বড়াইগ্রামে পরায় সবার এটাই পেশা। আমরা একিনে মাছ ধরি। তাই আমরা এই খালের পাড়েই থাকি। বাসা ভাড়া আমেগে দিলে পুসায় না। তাই পোলাপান লিয়া কষ্ট করে আমরা একিনেই থাকি। খালি খাওয়ার পানিটা টানেথেন টাইনা আনি। আর গোসল-মোসলতো সব নদীতেই করি। এভাবেই আমাগের জীবন কাটে।

‘পরায় ৫-৬ মাস থাকি আমরা এই জায়গায়। তারপরে আবার দ্যাশে যাই। বান আসার সময় হইলে আবার আমরা চইলা আসি।’

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

বিরান জায়গায় নিরাপত্তার অভাব নিয়ে প্রশ্ন করলে হাসি বেগম বলেন, ‘পরায় আমরা অনেক দিন যাবৎ একিনে আসা-যাওয়া করি। এই গিরামডা আমাগে নিজেগো গিরামের মতো হয়্যা গেছে, সবাই পরিচিত। ত্যা আমার একিনে অন্য কোনো সমেস্যা নাই। অন্য গিরামে গেলেও আশেপাশেই থাকি। তারপরে অনেক পানি যখন হয়্যা যায়, তখন অন্য জায়গায় যাই।

‘শিয়াল বিরক্ত করে। অনেক সাপ আছে এই জায়গায়। আমরা সাপ দেখিও মারি না। অনেক সময় ঘরের ভিতর, বিছনার ভিতর সাপ দেখা যায়। আমরা তাড়ায়া দেই। তাগো শরীলে আঘাত করি না। শিয়াল-সাপের ডরে অনেকেই আসে না এই পাড়ার। তা-ও আমরা এই জাগায় বসবাস করি।’

নদীতে মাছ পাওয়া না গেলে সমস্যার বিষয়ে বলেন, ‘আমাগের কষ্টই হয়। হয়তে কেউ সাইডে কাজে যাই। কেউ কামলা দিতে যায়। এইভাবেই দিনকাল কাটে। আমরা সবাই খুব অভাবী মানুষ।'

সরকারি কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে বলেন, ‘প্রোকিতোই (প্রকৃত) আমরা মৎসজীবী। আমরা মাছ ধরি খাই। আমাদের মৎসজীবীর কাড করি দিছে সরকার থেকে। কতা ছিল, যে ছয় মাস পানি থাকে না, এই ছয় মাস আমাগের সরকার থাকি খাবার দিবি। এখন আমরা কোনো অনুদানি পাই না। গিরামের যারা নেতা আছেন তাগের কাছে বললে কয়, য্যাখিন সময় হয় তখুন দিবি। আমাগের কাড আছে কিন্তু আমরা এখুনো কোনো অনুদান পাইয়া সারি নাই।

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

হাসি বেগমের ছোট ছেলে পুরোদস্তুর জেলে কিশোর আল আমিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পানির ভিতরে নিয়া মাছের ফাঁদ পাইতা থুই। রাতের দিক দিয়া পাতি। সকাল বেলা ওঠাই। আবার বিকালে পাইতা থুইয়া আসি। পরে চেংটি, টাহি, খইলশা, দুই-চারডা সিংগি মিংগি পাওয়া যায় আরকি। মাছ ধরতে অনেক ভাল্লাগে।’

নলাম এলাকার বাসিন্দা আশরাফ হোসেন কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম আসার আগে ওই চকে জেলেদের প্রায় ১০-১৫টি পরিবার আসে মাছ ধরতে। তারা বংশী নদীর তীরে জঙ্গলের মধ্যে পলিথিনের তৈরি ঘরে বসতি গড়ে। ওখানেই ছয়-সাত মাস থেকে আবার চলে যায়। আমরা যারা এলাকায় থাকি, তারা নদীর দেশীয় মাছ তাদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে পাই। কিন্তু এলাকার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মাঝেমধ্যে মাছ নিয়ে নামমাত্র টাকা দেয়। আবার অনেকে টাকা না দিয়েই মাছ নিয়ে চলে যায়। এ জন্য তারা স্থানীয়দের কাছে মাছ বিক্রি করতে চান না।’

ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা না দিয়ে কেউ জোর করে মাছ নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে বিষয়টা স্থানীয় থানাকে জানাতে হবে। পাশাপাশি ইউএনও মহোদয়কেও লিখিতভাবে অবহিত করলে এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার সিনিয়র মৎস্য অফিসার জাহাঙ্গীর আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চার-পাঁচ বছর আগে একটা সরকারি প্রজেক্টের মাধ্যমে রাজশাহী প্রকল্প থেকে মৎসজীবী কার্ড দেয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে রাজশাহী প্রকল্প থেকে ৪০ জনের একটা বরাদ্দ দিয়েছিল কমিটির মাধ্যমে, ওটা দিয়েছি। এদিকে খাদ্য সহায়তা নাই। এদিকে মৎস্য আইন বাস্তবায়ন হয় না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যেখানে সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, সেসব অঞ্চলে দেয়া হয় এগুলো।’

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন

‘তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই পুচি ফ্যামিলির ফ্যান’

‘তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই পুচি ফ্যামিলির ফ্যান’

রীদি বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি, তদন্ত কর্মকর্তা ও পুচি ফ্যামিলির তাপসীর স্বামী পার্থ চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামে। তারা পূর্বপরিচিত। তার ওপর তাপসীর টপ ফ্যান হিসাবে নিজেই স্বীকার করেছেন। তাই এই পুলিশ কর্মকর্তার ওপর আমাদের আস্থা নেই।’

পুচি ফ্যামিলির তাপসী দাশের বিরুদ্ধে বিড়াল নির্যাতনের দুটি অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শরিফুল ইসলাম নিজেই তাপসী দাশের ফ্যান। এ কারণে তাপসীর বিরুদ্ধে মুখে মুখে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বললেও গোপনে তাকে সহযোগিতা করছেন।

নিউজবাংলার কাছে এমন অভিযোগ করেছেন এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের চেয়ারম্যান দীপান্বিতা রীদি।

তিনি বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা প্রথম দিকে আমাদের অভিযোগ পড়েই বলে ওঠেন, আরে পুচি ফ্যামিলিকে তো আমি চিনি। আমি ওদের টপ ফ্যান। কবে কোন বিড়ালের বিয়ে দিয়েছে, সব মুখস্থ আমার।'

রীদি বলেন, ‘তার এমন কথা শুনেই আমাদের সন্দেহ হয়েছিল। আজ তার প্রমাণ পেলাম। কারণ উনি বিড়াল উদ্ধারের কথা বলে তাপসীর বাসায় যান। ফিরে এসে বলেন, বাসায় তালা।’

রীদি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘বাসায় তালা হলে ভেতর থেকে লাইভ করছে কীভাবে? কারণ আজকেও তিনি লাইভ ভিডিও প্রচার করেছেন ইউটিউবে। খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি, তদন্ত কর্মকর্তা ও পুচি ফ্যামিলির তাপসীর স্বামী পার্থ চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামে। তারা পূর্বপরিচিত। তার ওপর তাপসীর টপ ফ্যান হিসাবে নিজেই স্বীকার করেছেন। তাই এই পুলিশ কর্মকর্তার ওপর আমাদের আস্থা নেই।’

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পুচি ফ্যামিলির ফলোয়ার ৪০ হাজারের ওপরে। সেটা কে না দেখে। এখানে ফ্যান হওয়ার কী আছে?’

পুচি ফ্যমিলির তাপসী আপনার পূর্বপরিচিত কি না এমন প্রশ্নে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ‘তাপসীর স্বামী পার্থ চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামে। আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জে। আর তাপসীর বাড়ি আড়াইহাজারে। তাকে কয়েক দিন ফোন করেছি, কখনও বলেছেন নরসিংদীতে, কখনও বলেছেন নারায়ণগঞ্জে। আজকেও ফোন করেছি, বলেছেন পুরান ঢাকায় আছেন। তার বাসায় গিয়ে কাউকে পাইনি। শুধু ১৫ থেকে ২০টা বিড়াল দেখেছি।’

লিখিত অভিযোগের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসআই শরিফুল বলেন, ‘মনিরা নামে এক নারী তার বিড়াল আটকে রেখেছে বলে তাপসীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, সেই বিড়াল উদ্ধারের জন্যই গিয়েছিলাম।’

এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের বিড়াল নির্যাতনের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিড়ালরে যে মারছে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট আছে? এটা কী ধরনের অভিযোগ? এটা প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরে অভিযোগ করে তাদের মাধ্যমে আসলে কিংবা আদালতের মাধ্যমে আসলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব। অন্যথায় এ বিষয়ে আমরা কিছু করতে পারব না।’

এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের বিড়ালপ্রেমীরা জানান, বুধবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তারা থানা পুলিশ, মিরপুর ডিওএইচএসের পরিষদ ও খামারবাড়ি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ঘুরেছেন নির্যাতনের শিকার বিড়ালগুলো উদ্ধারের জন্য।

দীপান্বিতা রীদি বলেন, ‘ডিওএইচএসের পরিষদ থেকে তাপসীর বাসায় অভিযান চালানোর সম্মতি দেয়া হলেও পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আমাদের না নিয়ে তালা মারা দেখে ফিরে এসেছেন বলে দাবি করেন। পরে থানার ওসির কাছে গেলে তিনি জানান, লাইভ স্টকে মামলা করা ছাড়া তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না।’

তিনি বলেন, ‘এরপর কর্মীরা খামারবাড়ি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে যান। সেখান থেকে বলা হয়, থানাতেই মামলা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পুলিশ চাইলে লাইভ স্টক থেকে একজন প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন। আইনগত ব্যবস্থা থানাকেই নিতে হবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক - ইউটিউবে বিড়ালের নানা কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রচার নিয়ে আলোচিত-সমালোচিত ‘পুচি ফ্যামিলি’ র তাপসী দাশ। তার বিরুদ্ধে বিড়াল নির্যাতনের অভিযোগে গত ১৩ জুন পল্লবী থানায় দুটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের তাজকিয়া দিলরুবা ও বিড়ালপ্রেমী আরেক নারী। ওই দুটি লিখিত অভিযোগে বিড়ালের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়।

আরও পড়ুন:
বগুড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
হালখাতায় মাইক ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু
বিদ্যুৎযোদ্ধাদের বেতনের অর্ধেক টাকা কাদের পকেটে?
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ট্রাফিক সার্জেন্টের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধের মৃত্যু, আহত ২

শেয়ার করুন