রপ্তানি-সহায়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে

রপ্তানি-সহায়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে

প্রস্তুতিপর্বে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। রপ্তানি খাত পোশাকসহ গুটি কয়েক পণ্যের ওপরও নির্ভরশীল।

স্বল্পোন্নত-এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। চূড়ান্তপর্বে যেতে হলে আমাদের এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাহলে পণ্যের খরচ কমবে। ফলে প্রতিযোগিতার সামর্থ্য বাড়বে। উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে যাবে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, তাতে খুব অসুবিধা হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমরা বাজারসুবিধা পাই না। তাতে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং প্রতিযোগিতা করে ভালোভাবে টিকে রয়েছে। দেখা গেছে, শুল্ক পরিশোধ করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। আসল কথা হলো, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানি বাড়বে।

প্রস্তুতিপর্বে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। রপ্তানি খাত পোশাকসহ গুটি কয়েক পণ্যের ওপরও নির্ভরশীল।

অনেক দিন ধরে তা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে পারলে যেসব বাজারে শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে সেখানে অসুবিধা হবে না।

পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আরেকটি কাজ করতে হবে। তা হলো, যেসব দেশ বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় না, সেসব দেশে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে এ পদক্ষেপ নিতে হবে।

পোশাকপণ্যের রপ্তানির মধ্যে বেশির ভাগই বেসিক আইটেম। এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক সস্তা। রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে উচ্চ মূল্যের পোশাক বানানোর দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।

এ ছাড়া কৃষি ও ইলেকট্রনিক পণ্যে বহুমুখীকরণের সুযোগ রয়েছে। এসব খাতের বিকাশে কর প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা আরও বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রণয়নে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বলতা আছে। এখানেও নজর দিতে হবে।

চামড়া দেশের সম্ভাবনাময় খাত। নানা সমস্যায় জর্জরিত খাতটি। সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরিত হলেও অবকাঠমো দুর্বলতার কারণে অনেক কারখানা সক্রিয় নয়। পরিবেশ দূষণরোধে ব্যবহৃত বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনে ঘাটতি রয়েছে।

এসব দুর্বলতার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে করা হয় না। গলদ রয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনায়। উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে হবে রপ্তানি সহায়ক। যথাযথ নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন ঠিকমতো করতে পারলে বাংলাদেশ অনেক দূর যাবে।

শিল্প খাতে প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগত ত্রুটি আছে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে অনেক ক্ষেত্রে দেয়া হয় না। প্রণোদনা দিতে হবে খাতভিত্তিক বা টার্গেট করে। তা হলে এর সুফল পুরোপুরি মিলবে। করোনা মহামারির কারণে অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারে প্রণোদনাসুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে।

গত কয়েক বছর বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি অনুপাতে বিনিয়োগ একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন উন্নয়নের ধারাকে সামনের দিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে দেশি–বিদেশি (এফডিআই) বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি জোর দিতে হবে।

এই বিনিয়োগ হতে হবে ভৌত অবকাঠামো খাতে। দেশের বন্দরের অবকাঠামো দুর্বল এখনও। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায়ও ত্রুটি আছে। সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম একটি অংশ হচ্ছে দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে নজর দিতে হবে সরকারকে।

পণ্যের খরচ কমাতে হলে উন্নত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ নানা ধরনের অবকাঠামো সমস্যা রয়েছে। এর সমাধান করতে হবে। দ্রুত মালামাল পাঠাতে হলে শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

উত্তরণের পর উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নমনীয় ঋণ পাওয়া না গেলে অসুবিধা হবে না। বিদেশ থেকে কম সুদে ঋণ না নিয়ে বাংলাদেশ যে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, তার বড় উদাহরণ পদ্মা সেতু। বিশ্ব ব্যাংক ঋণ দেয়নি। নিজেদের টাকায় দৃশ্যমান পদ্মা সেতু। নিজেদের টাকায় করতে পেরেছি, তার অর্থ হচ্ছে আমাদের সক্ষমতা আছে। আরও বাড়াতে হবে। তা হলে ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে এবং আরও বেশি ঋণ পাওয়া যাবে।

ড. জায়েদ বখত, সাবেক ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক বিআইডিএস, চেয়ারম্যান অগ্রণী ব্যাংক

# সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, আবু কাওসার

আরও পড়ুন:
অবকাঠামো উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে
এলডিসি থেকে উত্তরণ: করতে হবে বাণিজ্য চুক্তি
সামনে এগিয়ে যেতে পরিকল্পনা এখনই
উন্নয়নশীল বাংলাদেশ কী পাবে, কী হারাতে পারে
বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে  

শেয়ার করুন

মন্তব্য