মুশতাক-কিশোরের জামিন কী কারণে নাকচ

লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। ছবি: নিউজবাংলা।

মুশতাক-কিশোরের জামিন কী কারণে নাকচ

কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদ বৃহস্পতিবার মারা যাওয়ার পর এই মামলায় তার ও কিশোরের জামিন না পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আদালতে ছয়বার আবেদন করা হলেও কী কারণে তারা জামিন পাননি সেটি অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এক মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ছয়বার আবেদন করেও আদালত থেকে জামিন পাননি। এর মধ্যে পাঁচবার বিচারিক আদালতে এবং একবার হাইকোর্টে তাদের জামিন আবেদন নাকচ হয়।

তবে এ মামলায় কারাগারে যাওয়া আরেক আসামি রাজনৈতিক সংগঠন রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া জামিন পেতে তিনবার আবেদন করেন বিচারিক আদালতে। এরপর তিনি হাইকোর্টে আবেদন করে জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া আরেক আসামি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন গ্রেপ্তারের চার মাস পর বিচারিক আদালত থেকেই জামিন পান।

কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদ বৃহস্পতিবার মারা যাওয়ার পর এই মামলায় তার ও কিশোরের জামিন না পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আদালতে ছয়বার আবেদন করা হলেও কী কারণে তারা জামিন পাননি সেটি অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা।

মুশতাক, কিশোর ও দিদারসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের মে মাসে রমনা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে র‌্যাব। অন্য আট আসামি হলেন নেত্র নিউজের এডিটর-ইন-চিফ তাসনিম খলিল, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক শাহেদ আলম, জার্মানিপ্রবাসী ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, হাঙ্গেরিপ্রবাসী জুলকারনাইন সায়ের খান (সামি), আশিক ইমরান, স্বপন ওয়াহিদ ও ফিলিপ শুমাখার।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, এই ১১ জন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস মহামারি সম্পর্কে গুজব রটিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এ ছাড়া তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনসাধারণের মধ্যে অস্থিরতা ও বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

মামলার পরপরই গ্রেপ্তার করে মুশতাক, কিশোর, দিদার ও মিনহাজকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এই চারজনের জামিন আবেদন এবং মুশতাক ও কিশোরের মুক্তি না পাওয়ার কারণ জানতে রাষ্ট্রপক্ষ ও বিবাদীপক্ষের একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

এতে দেখা যায়, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপন করতে না পারায় সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই মিনহাজ মান্নানকে জামিন দেন ঢাকার মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূঁইয়া। সম্প্রতি রমনা থানা পুলিশ আদালতে জমা দেয়া অভিযোগপত্রেও মিনহাজকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করেছে।

গ্রেপ্তার বাকি তিন আসামির কেউই বিচারিক আদালতে আবেদন করে জামিন পাননি। এরপর তারা যান হাইকোর্টে।

হাইকোর্টে কেবল দিদারের জামিন

বিচারিক আদালতে তিনবার আবেদন করে জামিন পেতে ব্যর্থ হয়ে হাইকোর্টে যান রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য দিদারুল। এরপর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ।

দিদারের পক্ষে হাইকোর্টে শুনানি করা আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম নিউজবাংলাকে বলেন, এফআইআরে দিদারের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে জামিন দেয় হাইকোর্ট।

আদালত কোন বিবেচনায় জামিন দিয়েছে, জানতে চাইলে দিদারুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। আমি কোনো আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেইনি কোথাও।’

তিনি বলেন, ‘আমাকে নিয়ে বলা হয়েছিল যে, আমি মামলার দুই নম্বর আসামি। আমি মুশতাকের পরিচিত। আমার মুশতাকের মধ্যে অনেক আলাপ হয়। আর এই সবের আড়ালে আমি ষড়যন্ত্র করি। তবে তারা (রাষ্ট্রপক্ষ) এর স্বপক্ষে কোনো আলাপের প্রমাণ বা স্ক্রিনশট দিতে পারেনি। কোনো সুনির্দিষ্ট কিছু ছিল না।

‘আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আমার বিরুদ্ধে যে ছয়জন সাক্ষী তাদের মধ্যে পাঁচজন একই কথা বলেন।’

এ মামলায় লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের জামিন আবেদন পাঁচবার নাকচ হয় বিচারিক আদালতে। এরপর তারাও হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন, তবে দুজনের আবেদন সেখানেও নাকচ হয়।

বিচারপতি রেজাউল হক ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে ওই জামিন আবেদনের সময় মুশতাক ও কিশোরের আইনজীবী ছিলেন জেড আই খান পান্না।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাস দুয়েক আগে মুশতাক ও কিশোরের হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলাম। আদালত আমাদের আবেদনটি খারিজ করে দেয়। তারা যে কার্টুন করেছে তাতে জাতির পিতাকে বিকৃত করা হয়েছে, এমন মনে করে আদালত আবেদন খারিজ করেছিল।’

মুশতাক ও কিশোরের বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়া দিদারুল বলেন, ‘সবার নামেই আলাদা আলাদা অভিযোগ ছিল। একই মামলা, তবে বলা হয়েছে আমরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করেছি। এক নম্বর আসামি কিশোরকে নিয়ে কিছু স্ক্রিনশট ছিল। মুশতাকের কিছু কনভারসেশনের স্ক্রিনশট ছিল। আমার ক্ষেত্রে কোনো স্ক্রিনশট ছিল না। মামলার চার নম্বর আসামি মিনিহাজ মান্নানের সবার আগে জামিন হয়। উনার জামিনের ১৫ থেকে ২০ দিন পর আমার জামিন হয়।’

সবশেষ ২৩ ফেব্রুয়ারি মুশতাকের জামিন নাকচের তথ্য সঠিক নয়

মুশতাক ও কিশোরের জামিন আবেদন হাইকোর্টে নাকচ হয় প্রায় দুই মাস আগে। এরপর আরেক বেঞ্চে তাদের জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। সেটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি জানুয়ারি থেকে মামলার দায়িত্ব নিয়েছি। নতুন জামিন আবেদনটি আদালতের তালিকায় অনেক পেছনে থাকায় শুনানি হতে সময় লাগছে। আশা করেছি আগামী সপ্তাহে হাইকোর্টে শুনানি হবে।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই ভুলভাবে রিপোর্ট করছে, ২৩ তারিখে নিম্ন আদালতে তার (মুশতাক) জামিন চাওয়া হয়েছিল। আসলে ওইদিন কোনো জামিন আবেদন ছিল না। মামলাটিতে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ থাকায় ওই দিন মূলত সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করার কথা ছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি যারা জামিন চাওয়ার কথা বলছেন তারা আসলে ভুল বলছেন।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওই মামলায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দেয় রমনা থানা পুলিশ। তবে সেখানে সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল ও আল জাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বিতর্কিত জুলকারনাইন সায়ের খানসহ (সামি) আট আসামির নাম না থাকায় আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে এই তদন্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দিতে বলেছিলেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসসামছ জগলুল হোসেন। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করে নিউজবাংলা

হাইকোর্টে তিনজনের মধ্যে দিদারের জামিন হলেও কিশোর ও মুশতাকের কেন হলো না জানতে চাইলে ব্যরিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা তো বলা মুশকিল। দিদারের বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলাম। আর দিদারের বিরুদ্ধে এফআইআরে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। অন্য দুজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপ, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা- এ সমস্ত বিষয় ছিল।’

মুশতাক ও কিশোরের জামিন পাওয়া উচিত বলে মত দিয়ে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘আমার বক্তব্য হলো, এগুলো (মামলায় তোলা অভিযোগ) তারা যদি করেও থাকেন, তাহলেও সেটি তাদের নাগরিক অধিকার। তারা আমিই বাংলাদেশ নামের একটা পেজ চালাতেন, সে পেজের অ্যাডমিন ছিলেন মুশতাক ও কিশোর। একটি পেজের এডমিন থেকে তারা যদি তাদের স্বাধীন মত প্রকাশ করেন, তাহলে তো ক্রিমিনাল অফেন্স পর্যায়ে আসারই কিছু নাই।’

তিনি বলেন, ‘একটা শাসন ব্যবস্থার মূল সৌন্দর্য হলো মত প্রকাশ বা সমালোচনা গ্রহণ করে নিতে পারাটা। পতাকা, রাষ্ট্র, মুক্তযুদ্ধ, জাতির পিতা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য বা প্রোপগান্ডার করার মতো কিছু তারা করেননি। অথচ তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনের এই ২১ ধারাটি দেয়া হয়েছে। এরপর ২৫ ধারা দেওয়া হয়েছে, মিথ্যা, অসত্য তথ্য দেয়ার কারণে। ২৮ ধারা দেয়া হয়েছে মানহানির কারণে। অথচ এখানে মানহানির কিছূ হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি।’

মামলায় ২৯, ৩১ ও ৩৫ ধারাগুলো যুক্ত করাও অযৌক্তিক বলে মনে করছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় ব[ড়ুয়া।

কী বলছে রাষ্ট্রপক্ষ

মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস পাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জাতির জনক, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে এমন প্রমাণ রয়েছে। কাজেই আদালতে তাদের জামিনের বিরোধিতা করা হয়েছে। এটা বিবেচনায় নিয়ে আদালত তাদের জামিন দেয়নি।’

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

‘এই সব লেইখা লাভ নাই, কেউ কিছু দিব না’

‘এই সব লেইখা লাভ নাই, কেউ কিছু দিব না’

চলমান লকডাউনের সময়ে মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি বস্তির বাসিন্দাদের মত নিম্ন আয়ের অনেকে কাজ হারিয়েছেন। ছবি: নিউজবাংলা

চলমান দ্বিতীয় লকডাউনে নিম্ন আয়ের অনেকে কাজ হারিয়েছেন। দৈনিক আয়ে সংসার চালানো ব্যক্তিদের এখন তিন বেলা ভাত জোটাতেই কষ্ট হচ্ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি বস্তির এক নারী বলেন ‘আমাগো কেউ খোঁজ লয় না। যা দিবেন হাতে হাতে দিয়েন, নাইলে আমরা কিছু পাই না।’ সাংবাদিক পরিচয় জেনে এভাবে সাহায্যের আকুতি জানান তিনি।

‘বাবা যা দিবেন হাতে হাতে দিয়েন, নাইলে আমরা কিছু পাই না’। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি বস্তির এক নারী বলছিলেন এ কথা। সাংবাদিক পরিচয় জেনে এভাবে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছেন তিনি।

এ যেন ক্ষুধার জ্বালা থেকে জন্ম নেয়া এক আস্থাহীনতার প্রকাশ।

মহামারির প্রকোপে দেশে অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। চলমান দ্বিতীয় লকডাউনে নিম্ন আয়ের অনেকে কাজ হারিয়েছেন। দৈনিক আয়ে সংসার চালানো ব্যক্তিদের এখন তিন বেলা ভাত জোটাতেই কষ্ট হচ্ছে।

বুধবার দুপুরে বস্তির মধ্যে মাটিতে বসে ছিলেন বিনা বেগম। পাশে ছিল ছোট দুই সন্তান। সাংবাদিক শুনে যেন কিছু একটা ফিরে পেলেন।

তিনি বলেন, ‘বাবারে ঘরে বইসা আছি। কামকাজ নাই। আমাগো কেউ খোঁজ লয় না, পোলামাইয়া লইয়া মেলা কষ্টে আছি।’

তার সঙ্গে কথা শেষ করে উঠে আসার পর পেছন থেকে ডেকে বলে উঠলেন, ‘বাবা আমাগো যা দিবেন হাতে হাতে দিয়েন, নাইলে আমরা কিছু পাই না।’

রাজধানীতে প্রজাপতি পরিবহনের বাসচালক খায়রুল আনাম। তিনি দিনভিত্তিক চুক্তিতে গাড়ি চালান। গাড়ি না চালালে বেতন হয় না তার।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘লাস্ট ইনকাম করছি ১৩ তারিখ। পরিবারে আমাগো খাওনের মানুষ ৮ জন। কাম করি একাই। এই দ্যাশ পারলে আমাগো থেইকা নিবো, কিন্তু দিবো না কিছুই। গত বছরের লকডাউনে আমাগো আড়াই হাজার কইরা টাহা দেওনের কথা ছিলো, কোনো পরিবহনশ্রমিক ১০ টাহাও পায় নাই।

লকডাউনের প্রভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি বস্তির অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ছবি: নিউজবাংলা

‘কার কাছে কমু, কী জানবেন আর কীই-বা ল্যাখবেন? এই সব লেইখা লাভ নাই। কেউ কিছু দিব না। বাস্তবে আসেন আপনি। গত বছর সরকার আমাগোরে কইছিলো আড়াই হাজার টাহা কইরা দেওনের কথা। সরকার বলছে হেইডাই আমরা পাই নাই। আপনি লেইখ্যা নিয়া আর কী করবেন।’

সর্বাত্মক লকডাউনের দ্বিতীয় ধাপে এসে আর্থিকভাবে আয় না থাকার কারণে অসচ্ছল হয়ে পড়েছেন তিনি।

কষ্টের কথা বলতে গিয়ে খায়রুল আনাম বলেন, ‘আমি তিন দিন ভাত খাইবার পাই নাই, বিশ্বাস হইবো আপনের। রুটি-কলা খাইয়া আছিলাম। পরে ধার কইরা চলতাছি। আল্লায় যানে কবে গাড়ি চালামু।’

বাঁশবাড়ি বস্তিতে প্রায় আড়াই শ পরিবারের বাস। বাসা ভাড়া দুই হাজার থেকে তিন হাজারের মধ্যে। সেখানে লেগুনার হেলপার সাগরের সঙ্গে কথা হয়। তার বয়স ১৬। লকডাউনের পর থেকেই ঘরে বসে আছেন। তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ৫ সদস্যের এই পরিবারের আহার। ঘরে রয়েছে ছোট দুই ভাই-বোন, গৃহিণী মা ও অসুস্থ বাবা।

সাগর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘লকডাউনের পর থেকে লেগুনা বন্ধ। অন্য কোথাও কাজের সুযোগও পাচ্ছি না। লকডাউন আবারও বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু আমার ঘরে খাবার নাই। প্রতিদিনের আয় প্রতিদিন খাই। এখন কাজ নাই, টাকাও নাই।’

গত বছর সহায়তার অর্থ পেলেও এ বছর লকডাউনে কোনো সাহায্য পাননি রিকশাচালক আব্দুর রহিম।

গত বছর লকডাউনের সময়ে সেনাবাহিনীর সাহায্য পেলেও এ বছর কোনো সহায়তা পাননি রিকশাচালক আব্দুর রহিম। ছবি: নিউজবাংলা

তিনি বলেন, ‘গত বছর সেনাবাহিনীর সাহায্য পাইছিলাম। আর কেউ সাহায্য করে নাই। এ বছর এহনো কিছু পাই নাই। কেউ কোনো সহায়তা দেয় নাই।

‘স্কুল-কলেজ বন্ধ। ভাড়া কম। রাস্তায় যাত্রী পাওন যায় না। দিনে একটু চালাইতে পারলেও রাতে চালান যায় না। পুলিশ ঝামেলা করে। রিকশা উল্টাইয়া দেয়। ১০০ থেকে ২০০ টাকা আয় করাও কষ্ট হয়ে গেছে।’

দুই নাতি, অসুস্থ ছেলে ও ছেলের বউ নিয়ে বাঁশবাড়ি বস্তিতে থাকেন হেলেনা বেগম। পেশায় গৃহকর্মী। দুইটা মেসে কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে মেসের সদস্যরা ঢাকা ছাড়ায় তিনি বেকার হয়ে পড়েন।

হেলেনা বেগম বলেন, ‘দুইডা মেসে কাম হরতাম। হ্যারা ভার্সিটির ছাত্র আছিলো। বাড়িত গেছে সবাই। আর আমার কাম বন্ধ। আমার মতো অনেকেই আছে এই বস্তিত। হ্যাগোও কাম নাই। হ্যাগো জামাইগোও কাম নাই। সবারই এহোন না খাইয়া মরনের দশা।’

নাহার বেগম দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের শাহজালাল হাউজিংয়ের একটি বস্তিতে থাকেন। ইট ভেঙে সংসার চালান।

হতাশা নিয়ে নাহার বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক লকডাউন তো কাটাইলাম ম্যালা কষ্টে। আবার সরকার লকডাউন দিছে। কী করমু কী খামু বুঝতেছি না। কাম না হরলে খাইতে হারি না। আমি ইট ভাইঙ্গা খাই।

‘এইহানের কেউ বাসায় কাম হরে, কেউ রিশকা চালায়, কেউ ভ্যান চালাইয়া দিন আইনা দিন খায়। আমার দুই ছেলে ছোড। কোনো কাম হরতে হারে না। ছেলেগো বাফ নাই। অনেক কষ্ট করতাছি ছেলেগোরে লইয়া।’

দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বাঁশবাড়ি বস্তিতে থাকেন মো. পারভেজ। কাজ করেন কেরানীগঞ্জের আটি বাজারের একটি সেলুনে। লকডাউনে সেলুন বন্ধ, তার কাজও বন্ধ। শুয়ে-বসে অলস সময় পার করছেন তিনি।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সেলুনের কাম বন্ধ। রোজার টাইম চলতাছে। পরিবাররে নিয়া কষ্টের সময় কাটাইতাছি। সামনে ঈদ। খাইতেই কষ্ট হইয়া যাইতাছে আর পোলাপাইনরে ঈদে কী দিমু আল্লায় যানে। ঈদের আগে আমাগো ভালো ইনকাম হয়। যা অবস্থা দেখতাছি এবারও ঈদ ঘরে কাটাইতে হইবো মনে হইতাছে।’

মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের শাহজালাল হাউজিংয়ের একটি বস্তিতে থাকেন রংমিস্ত্রি শাহজাহান মিয়া। কথা হয় তার সঙ্গে।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘দ্যাশের যে অবস্থা বড়লোকেরা ঘর থেইকাই বাইর হয় না। আর বাড়ির রং করাইবো ক্যামনে? কামকাজ বন্ধ। গাড়ি-ঘোড়াও বন্ধ। জমানো ট্যাকা যা আছিলো তাও শ্যাষ। সুযোগ পাইলেই গ্যারামে যামুগা। পরিবার নিয়া ঝামেলায় পইড়া যাইতাছি।’

কথা হয় একই এলাকার ৬০ বছরের বৃদ্ধ মরজিনা খাতুনের সঙ্গে। লকডাউনে কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ কোনো সাহায্য করে না বাজান। ভিক্ষা করতে গেলে পুলিশ দাবড়ানি দেয়। ভিক্ষা কইরা খাই। সরকারের থেইকাও কিছু পাই না। কী যে কষ্টে আছি কাউরে কইতে পারি না।’

গেল এক বছরে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। এদের মধ্যে বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীই শহরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। বিশেষ করে রিকশাচালক, নিরাপত্তাপ্রহরী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, পরিবহন ও রেস্তোঁরাশ্রমিক, বেসরকারি স্কুলশিক্ষক ও নির্দিষ্ট বেতনে কর্মরত মানুষ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন

করোনায় ছোট ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতি

করোনায় ছোট ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতি

প্রথম দফায় ৫ এপ্রিল লকডাউন শুরু হলে দোকান খোলা রাখার দাবিতে নিউমার্কেটের সামনে বিক্ষোভ করেন দোকানমালিক ও কর্মচারীরা। ছবি: সাইফুল ইসলাম/নিউজবাংলা

এক দিন দোকান বন্ধ থাকলেই ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা। বৈশাখ, রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসায় মোট পুঁজি বিনিয়োগ হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। লকডাউনের কারণে সব ব্যবসা এখন ধসের পথে।

পড়ালেখা শেষ করে প্রযুক্তি যন্ত্রাংশের ব্যবসায় দুই মাস ধরে যুক্ত আরিফ খান। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে শুরু করেছিলেন ব্যবসা। কিন্তু লকডাউন এসে স্বপ্নভঙ্গের মতো অবস্থা। দোকান খোলা যাচ্ছে না। মানুষজনও নেই। এভাবে আর দুই সপ্তাহ চললে কঠিন সংকটে পড়তে হবে তাকে।

লকডাউনে রাজধানীতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় নিয়োজিত লাখ লাখ ব্যবসায়ীর একই হাল। দোকানপাট বন্ধ থাকায় একদিকে বিপাকে মালিকেরা, অন্যদিকে কর্মচারীদেরও ত্রাহি অবস্থা।

প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ রয়েছে দোকানপাট, বিপণিবিতান। ফলে দোকানকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের বাড়ছে লোকসান। করোনাভাইরাস মহামারিতে এক বছর ধরেই ব্যবসায় মন্দা।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ৫ এপ্রিল থেকে চলাচলে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। পরে ১৪ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় দফা এবং সবশেষে ২১ এপ্রিল থেকে তৃতীয় দফা লকডাউন আরোপ করা হয়। দোকানপাট, শপিং মল ও বিপণিবিতান বন্ধ থাকায় পয়লা বৈশাখ, রোজাকেন্দ্রিক বাণিজ্য থেকে বঞ্চিত লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিপর্যয়

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫৩ লাখ ৭২ হাজার ৭১৬টি। প্রতি প্রতিষ্ঠানে গড়ে ৪ জন কর্মচারী ধরা হলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২ কোটি ১৪ লাখ। বলা হচ্ছে, কর্মচারীদের এপ্রিলের বেতন মে মাসে দিতে হবে। আর ঈদের কারণে মের বেতন মে মাসেই দেয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ঈদ বোনাস।

দোকানমালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, একজন কর্মচারীর ন্যূনতম বেতন ১৫ হাজার টাকা ধরলেও এপ্রিল-মে মাসের বেতন এবং বোনাস একসঙ্গে দিতে হবে। শতভাগ বোনাস ধরে হিসাব করলে একজনকেই পরিশোধ করতে হবে ৪৫ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে ২ কোটি ১৪ লাখ ব্যবসায়ীর এটা পরিশোধ করতে প্রয়োজন ৯৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

ব্যবসায় ক্ষতি কত?

এক দিন দোকান বন্ধ থাকলেই ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা। বৈশাখ, রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসায় মোট পুঁজি বিনিয়োগ হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। লকডাউনের কারণে সব ব্যবসা এখন ধসের পথে। কারণ, এই বিনিয়োগের কোনো টাকাই এখন আর ফেরত আসবে না। পাইকারি ব্যবসা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

দোকানমালিক সমিতির সভাপতি হেলালউদ্দিন জানান, সাধারণ ছুটিতে কেনাবেচা বন্ধ থাকায় দোকানগুলোর দিনে ক্ষতি হচ্ছে মোট ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একেকটি দোকানে গড়ে দিনে বিক্রি ধরা হয় ২০ হাজার টাকা। আর এই বিক্রির ক্ষেত্রে লভ্যাংশ ধরা হয় ১০ শতাংশ। এতে দৈনিক লাভের ক্ষতি দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৭৪ কোটি ৫৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

আত্মহত্যার হুমকি

লকডাউনে সবকিছু বন্ধ থাকায় বাড়ছে দীর্ঘশ্বাস। গত বছর ব্যবসায় মন্দা প্রকট আকার ধারণ করে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এবারও যদি এমন হয়, তাহলে আর বাঁচার উপায় নেই। ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এত খারাপ অবস্থা যে আগামী সপ্তাহ থেকে তাদের খাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ব্যবসায়ী নেতা হেলালউদ্দিন জানান, প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি প্রায় ১০০ ব্যবসায়ী বলেছে তারা আত্মহত্যা করবে, যদি ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারে।’

এমন অবস্থায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিলে কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

২৫-২৬ এপ্রিল দোকান খুলে দেয়ার ইঙ্গিত

২৮ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছে লকডাউনের সময়সীমা। তবে এর আগেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার দাবি করেছে ব্যবসায়ীদের কয়েকটি সংগঠন।

দোকানমালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘লকডাউনে গার্মেন্টস, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, বিমা, পুঁজিবাজার সবকিছু খোলা। কিন্তু দোকান কেন বন্ধ, সেটা বোধগম্য নয়। বড় ব্যবসায়ীদের সব খোলা আছে, কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সবকিছুই বন্ধ।’

তিনি বলেন, ‘২৫ এপ্রিল থেকে দোকান খুলে দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছি।’

হেলাল উদ্দিন জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যাংকসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে তারা বিনিয়োগ করেছেন। এখন খুললে আগের মতো ব্যবসা না হলেও কিছুটা তো ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যাবে।

এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অথবা ২৬ এপ্রিল সীমিত পরিসরে সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করে দোকান খুলে দেয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দোকানপাট খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ‘স্মার্ট সুরক্ষা’ ব্যবস্থা পরিপালন করতে হবে।

নিউমার্কেট দোকানমালিক সমিতির সভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলাম নিউজবাংলাকে জানান, দোকানপাট খুলে দেয়ার সুযোগ দেয়া হলে সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে যেসব ব্যবসায়ী ব্যর্থ হবে, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হবে।

ঢাকা মহানগর দোকানমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু নিউজবাংলাকে বলেন, ব্যবসায়ীদের এখন আর কোনো উপায় নেই।

পেটে ভাত নেই। তাই যেকোনো সময় তারা রাস্তায় নামতে পারে। এত বড়সংখ্যাক মানুষকে বুঝিয়ে রাখা কঠিন হবে।

তিনি বলেন, কঠোর তদারকির মাধ্যমে দোকানপাট খুলে দেয়া হোক। তা না হলে বিপর্যয় তৈরি হবে।

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন

করোনার টিকা না নিয়েই মিলল সনদ!

করোনার টিকা না নিয়েই মিলল সনদ!

টিকা না নিয়েও অনলাইনে সনদ পেয়েছেন এস এম নূরুজ্জামান। ছবি: নিউজবাংলা

নিবন্ধনের পর টিকা না নিলেও মঙ্গলবার এস এম নূরুজ্জামানের মোবাইল ফোনে কোভিড১৯ ভ্যাক্সের মেসেজ আসে। সেখানে উল্লেখ ছিল,  ‘আপনার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।  www.surokkha.gov.bd অথবা অ্যাপ থেকে ভ্যাকসিন সনদ গ্রহণ করুন।’

করোনাভাইরাসের টিকার কোনো ডোজ না নিয়েই টিকা গ্রহণের সনদ মিলেছে। কেবল নিবন্ধন করায় অনলাইনে চলে এসেছে এই সনদ।

বিস্ময়কর এই ঘটনাটি ঘটেছে নিউজবাংলার প্রতিবেদক এস এম নূরুজ্জামানের ক্ষেত্রে।

এই প্রতিবেদক করোনাভাইরাসের টিকা নিতে গত ২৭ জানুয়ারি অনলাইনে নিবন্ধন করেন। পরে তিনি রাজধানীর রাজারবাগে পুলিশ কেন্দ্রীয় হাসপাতাল থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি টিকা গ্রহণের জন্য মেসেজ পান। তবে সে সময়ে ঢাকার বাইরে অবস্থান করায় টিকা নিতে পারেননি।

এরপর ১২ এপ্রিল টিকার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের নির্দেশনা আসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘কোভিড১৯ ভ্যাক্স’ এর পক্ষ থেকে। ততদিনে নূরুজ্জামান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বাসায় চিকিৎসাধীন। ফলে ওই তারিখেও টিকা নিতে পারেননি।

এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার কোভিড১৯ ভ্যাক্সের আরেকটি মেসেজ আসে। সেখানে উল্লেখ ছিল, ‘আপনার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। www.surokkha.gov.bd অথবা অ্যাপ থেকে ভ্যাকসিন সনদ গ্রহণ করুন।’

এই মেসেজ পেয়ে অনলাইনের লিঙ্কে প্রবেশ করে নিজের নামে টিকা গ্রহণের সনদ পান এস এম নূরুজ্জামান।

টিকা না নিলেও এই সনদ কীভাবে পাওয়া গেল, সেই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি শুরুতে দাবি করেন, এটা অসম্ভব। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টিকা না নিয়ে সনদ নেয় কীভাবে? এটা অসম্ভব, সনদ নিতেই পারে না, যারা এসব কথা বলছেন তারা বিভ্রান্তি অথবা গুজব ছড়াচ্ছেন।’

এরপর প্রমাণ উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘আসলে কোথায় ভুল হলো বুঝতে পারছি না। বিষয়টি জানিয়েছেন এজন্য ধন্যবাদ। এই তথ্য জায়গা মতো জানিয়ে দিচ্ছি।’

হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতির কারণে অনলাইনে এমন হতে পারে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো আইসিটি মন্ত্রণালয় দেখে, তাদের কাছে প্রশ্ন করেন।’

এ বিষয়ে জানতে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে তার একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ফোন ধরেন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আপনার জিজ্ঞাসার বিষয়ে টেক্সট করেন, মন্ত্রী মহোদয় জবাব দেবেন।’

কিছুক্ষণ পর প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক নিজেই ফোন করেন। প্রতিবেদকের কথা শুনে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলোই আমরা সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে থাকি। এক্ষেত্রে কী হয়েছে সেটি তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে।’

টিকা না নিয়েও ‘সনদ পাওয়া’ এস এম নূরুজ্জামান সামনে কখনও সত্যি টিকা নিতে পারবেন কিনা- সেটি জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমও দিতে পারেননি এর উত্তর। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই, আপনারা এমআইএস পরিচালকের (অধ্যাপক মিজানুর রহমান) সঙ্গে কথা বলুন।’

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন

লকডাউনে জন্মনিয়ন্ত্রণে ধস, রেকর্ড নবজাতকের শঙ্কা

লকডাউনে জন্মনিয়ন্ত্রণে ধস, 
রেকর্ড নবজাতকের শঙ্কা

যুক্তরাজ্যে লকডাউনের মাঝে বেড়েছে সন্তান জন্মদান। ছবি: সংগৃহীত

লকডাউনের মধ্যে গর্ভধারণ ও নবজাতকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন রয়েল কলেজ অফ মিডওয়াইভস-এর মহাপরিচালক বিরথ হারলেভ ল্যাম। তিনি জানান, ‘এ মহামারি অধিকাংশ মানুষকে একটু ধীর গতির জীবনযাত্রার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলে। অনেকেই বাসা থেকে অফিসের কাজ করছেন। তারা আরও বেশি করে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এতে করে কেউ কেউ সন্তান নেয়ার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।’

যুক্তরাজ্যে লকডাউনের মধ্যে শিশু জন্মে ধস নামার আশঙ্কা করা হলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। চিকিৎসকের সঙ্গে সন্তান-সম্ভবা নারীদের দেখা করার (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) হার বেড়ে গেছে।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস) আওতাধীন মেটারনিটি বিভাগের দেয়া পরিসংখ্যান মতে, গত বছর মে মাসে সন্তান-সম্ভবা নারীদের চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার সংখ্যা একটু কমে আসলেও এর পর থেকেই তা বেড়ে যেতে দেখা যায়। এই সংখ্যা এখনও বাড়ছে। এতে শিশু জন্মের রেকর্ড হতে পারে বলে আশঙ্কা জানানো হয়েছে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে

গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর) গর্ভবতী নারীদের তার চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার সংখ্যা গেল পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল।

দেশটিতে গত বছর মে মাসে ২০১৯ সালের একই মাসের তুলনায় এমন অ্যাপয়েন্টমেন্টের হার সাড়ে দশ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫১ হাজারে। তবে এর পর থেকে আবারও অ্যাপয়েন্টমেন্টের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সেপ্টেম্বরে এসে তা হয়েছিলো ৫৮ হাজারের বেশি। ২০১৫ সালের পর এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) অ্যাপয়েন্টমেন্টের সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭৩ হাজারের বেশি। যা ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি।

সংক্রমণ রোধে দেশটিতে প্রথমবারের মতো লকডাউন ঘোষিত হয়েছিল গত বছর ২৩ মার্চ। সরকার ঘোষিত এই লকডাউনের সময় স্বাস্থ্য বিভাগের আওতাধীন সব প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রগুলো ছয় সপ্তাহ বন্ধ থাকার মধ্যেও বেড়েছে গর্ভধারণের সংখ্যা।

লকডাউনের মধ্যে গর্ভধারণ ও নবজাতকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন রয়েল কলেজ অফ মিডওয়াইভস-এর মহাপরিচালক বিরথ হারলেভ ল্যাম।

তিনি জানান, ‘এ মহামারি অধিকাংশ মানুষকে একটু ধীর গতির জীবনযাত্রার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলে। অনেকেই বাসা থেকে অফিসের কাজ করছেন। এতে করে আরও বেশি সময় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন তারা। এতে করে কেউ কেউ সন্তান নেয়ার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।’

এ প্রসঙ্গে সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির জনসংখ্যাবিষয়ক অধ্যাপক অ্যান বেরিংটন বলেন, ‘মহামারির মধ্যেও যেসব দম্পতির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল তাদের মধ্যে সন্তান নেয়ার প্রবণতা ছিল বেশি। তবে অধিকাংশ নতুন দম্পতি, যাদের চাকরির নিশ্চয়তা ছিল না, তাদের মধ্যে সন্তান নেয়ার সংখ্যা কম ছিল।’

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হতাশাজনক ঘটনার পরে অনেক সময় শিশু জন্মের সংখ্যা বেড়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একই ভাবে সন্তান-সম্ভবা নারীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল।

গবেষণা সংস্থা অপিনিয়াম জানায়, লকডাউন শেষে পরের দুই বছরে যুক্তরাজ্য কমপক্ষে ২০ লাখ শিশু ভূমিষ্ঠ হতে পারে যদি ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী সব নারী সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন।

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন

কালো টাকার ‘জাদু’ করোনার অর্থনীতিতে

কালো টাকার ‘জাদু’ করোনার অর্থনীতিতে

অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার ব্যাপক সুযোগ দেন। এ সুযোগের প্রত্যক্ষ প্রভাবে শুধু আবাসন ও পুঁজিবাজারই নয়, ব্যাংকসহ অন্য সব খাতেও গতির সঞ্চার হয়েছে।

করোনার বছরে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে কালো টাকা রূপ বদলে সাদা হতে শুরু করেছে। এতে প্রকাশ্য হচ্ছে ব্যক্তির দীর্ঘ বছরের পুঞ্জীভূত অপ্রদর্শিত অর্থ, যা ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে অর্থনীতির মূলস্রোতে।

এভাবে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থের ধাক্কায় বছরজুড়ে করোনায় দেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতির পালেও লেগেছে উত্তরণের হাওয়া। গতি ফিরছে আবাসন খাতে। আমানত বাড়ছে ব্যাংকে। এর পাশাপাশি কালো টাকার প্রবাহে এক দশক ধরে তলানিতে পড়ে থাকা শেয়ারবাজারও তার গতি ফিরে পেতে শুরু করেছে।

ব্যক্তির উপার্জিত আয়ের যে অংশ তার আয়কর বিবরণীতে অপ্রদর্শিত অবস্থায় থাকে, সেটাই অর্থনীতিতে কালো টাকা হিসেবে গণ্য। সমাজে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, আমলা, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, শিক্ষকসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষ; উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি করযোগ্য নিম্ন মধ্যবিত্তদেরও নানা পরিমাণে অর্থ অপ্রদর্শিত থাকে।

তবে সমস্যা এর স্বাভাবিক লেনদেন বা বিনিয়োগে। ব্যাংকে রাখাতেও ভয় থাকে এই অপ্রদর্শিত অর্থের। কেউ রাখলেও সেখানে বেনামি হিসাবের প্রবণতাই বেশি। এতেও সংশয় রয়েছে সম্পর্কের টানাপোড়েনে। ফলে প্রায়শ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই কালো টাকা গড়ায় না শিল্প-কারখানা বা অন্য কোনো খাতের বিনিয়োগে। যে কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই টাকা অপচয় হয়, ব্যয় হয় ব্যক্তি কিংবা পরিবারের সদস্যদের বেহিসাবি ভোগ-বিলাসে। বাকি অর্থের জায়গা হয় বাড়ির অন্দর মহলে, সিন্দুকে, খাটের নিচে বিশেষ ড্রয়ার কিংবা দেয়াল কেটে বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি সুরক্ষিত কোনো স্থানে।

দেরি হলেও কালো টাকা এভাবে লুকিয়ে রাখায় এখন ছেদ পড়ছে। সরকারের এক ঘোষণায় কালো টাকার মালিকরাও যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন। এখন তারা নির্ভয়ে বের করে আনছেন এই অপ্রদর্শিত অর্থ, যা আইনি কৌশলের সুযোগে রূপ বদলে সাদায় রূপান্তরিত হচ্ছে। দিনদিন কালো টাকা সাদা হওয়ার প্রবাহও বাড়ছে।

করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনীতি সচল করতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার ব্যাপক সুযোগ দেন।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি টাইম রিকয়্যারস এক্সট্রা অর্ডিনারি মেজারস’ - অর্থাৎ বিশেষ সময়ে বিশেষ উদ্যোগের দরকার। এই উদ্যোগের আওতায় মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বা ফ্ল্যাট ও জমি কিনে নগদ বা ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ সাদা করা যাবে। এভাবে অবৈধ আয় বৈধ, অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শন করার ব্যবস্থা করে দিয়ে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং রাজস্ব বাড়বে।

এদিকে অর্থমন্ত্রীর এই আশাবাদের বাস্তব প্রতিফলনও ঘটেছে দেশের অর্থনীতিতে। কালো টাকা সাদা হয়ে এখন অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। এ সুযোগের প্রত্যক্ষ প্রভাবে শুধু আবাসন ও পুঁজিবাজারই নয়, ব্যাংকসহ অন্য সব খাতেও গতির সঞ্চার হয়েছে।

গত কয়েক বছরের মন্দায় আবাসন খাত ছিল বিপর্যস্ত। এখন তা চাঙা। কালো টাকা প্রশ্নহীন বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় প্লট, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনার চাহিদাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এ খাতের উদ্যোক্তার সক্ষমতা বেড়েছে।

চাকুরিচ্যুতদের পুনরায় কাজে ফেরার সুযোগ যেমন হচ্ছে, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। আবার এসব কিছুর প্রভাবে সরকারের রাজস্ব সক্ষমতাও বেড়েছে, যা দেশের জনকল্যাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন পদক্ষেপেও সরকারকে সাহস যোগাচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, গত ৩১ ডিসেম্বর ছিল ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার আয়কর বিবরণী জমার শেষ দিন। ওই দিনের হিসাব শেষে এনবিআর জানায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে রাখা সুবিধা অনুযায়ী জুলাই-ডিসেম্বর এই ছয় মাসে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়েছেন ৭ হাজার ৪৪৫ জন করদাতা। তারা এর মাধ্যমে ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা সাদা করেছেন, যা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সরকার এ প্রক্রিয়া থেকে রাজস্ব পেয়েছে প্রায় ৯৪০ কোটি টাকা।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সেনাবাহিনীসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৯ হাজার ৬৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা সাদা করা হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল।

আওয়ামী লীগের আগের দুই মেয়াদে যথাক্রমে ১ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা এবং ৪ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল।

কালো টাকা সাদা করা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘অফিশিয়ালি টাকাগুলো আসাতে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এই টাকাগুলো অর্থনীতির মূল স্রোতে আসায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেগবান হবে এবং আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’

এতে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা চাই টাকা আরও সাদা হোক।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডিভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেশে কিছু কালো টাকা আছে। এ টাকা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নানা অপরাধমূলক কাজেও ব্যবহার হচ্ছে, আবার পাচার হয়ে বাইরেও চলে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, এখন চলতি বাজেটে কম কর দিয়ে প্রশ্নহীনভাবে টাকা সাদা করার সুযোগ থাকায় একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কালো টাকা খুব অল্প সময়ের ভেতরে সাদা হয়েছে। অর্থবছরের আরও ছয় মাস বাকি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে সেখানেও একটা বড় অঙ্কের কালো টাকা সাদা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাকার রূপ বদলের এই প্রক্রিয়া সাময়িক সময়ের জন্য বা নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য ভালো ফল বয়ে আনতে পারে এবং সেটা ঠিক আছে। কারণ এ ধরনের উদ্যোগ অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য বাড়াতে টনিক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বেশি দিন চলতে দিলে অর্থনীতির জন্য তা হবে আত্মঘাতী। কারণ এটা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর এবং আইনের দৃষ্টিতেও অনৈতিক।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আগেও বিভিন্ন সময় দেয়া হয়েছে। কিন্তু তেমন সাড়া মেলেনি। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

করোনা পরিস্থিতিতে হুন্ডি প্রক্রিয়ায় শ্লথ হয়ে যাওয়া বা পাচারের রুটগুলোতে বিঘ্ন ঘটায় বিকল্প হিসেবে সেই অর্থ আবাসন খাতে কিংবা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। কেউ রেখেছে ব্যাংকেও।

তিনি বলেন, টাকা কালো কিংবা সাদা যে অবস্থাতেই থাকুক সেটি অর্থনীতির চলমান প্রবাহের মধ্যেই ঘোরাফেরা করে থাকে। তাকে মূলস্রোতে আনার কথা বলে যে অনৈতিক সুবিধা দেয়া হচ্ছে, তা অতি অন্যায্য। এর মাধ্যমে সৎ ও নিয়মিত করদাতার সঙ্গে চরম অন্যায় ও বৈষম্য করা হয়েছে।

এ এইচ মনসুর বলেন, ‘এ প্রক্রিয়ায় অর্থমন্ত্রী লাভ দেখছেন। আর আমি দেখছি অর্থনীতির চরম ক্ষতি করা হয়েছে।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কালো টাকার মালিককে টাকা সাদা করতে মাত্র ১০ শতাংশ কর ধরা হয়েছে। সেখানেও টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না এনবিআর। এমনকি ওই আয় কোনো দুর্নীতির মাধ্যমে এসেছে না নিষিদ্ধ ও অবৈধ উৎস থেকে অর্জিত হয়েছে, তা দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) খতিয়ে দেখবে না।

অন্যদিকে নিয়মিত ও সৎ করদাতাকে দিতে হবে ৩০ শতাংশ কর। মনসুর দাবি করেন, এই অসাম্যের নীতি ধনী-দরিদ্রের আয় বৈষম্য বাড়বে। এর মাধ্যমে দেশের কর ব্যবস্থা পুরোপুরি নষ্ট হবে এবং করদাতাকে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনে উৎসাহ জোগানো হবে, যার প্রথম প্রভাবটি পড়বে চলতি অর্থবছরেই।

সরকার রাজস্ব বাড়বে মনে করলেও নিয়মিতরা নিরুৎসাহিত হওয়ার দরুন দেখা যাবে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাতেই হোঁচট খেতে হয়েছে।

চলমান অর্থনীতিতে এই কালো টাকার পরিমাণ কত তার সরকারি বা বেসরকারি সঠিক হিসাব নেই কারও কাছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন সংস্থার দেয়া হিসাবের গড় পর্যালোচনা থেকে ধারণা করছেন, দেশে বর্তমানে কালো টাকার পরিমাণ হবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি।

বিশ্বব্যাংকের ২০০৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০২-২০০৩ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, ২০১০ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৬২ দশমিক ৭৫ ভাগ। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত গড়ে এই কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩৫ দশমিক ৬ ভাগ। আর ১৯৭৩ সালে ছিল জিডিপির মাত্র ৭ ভাগ।

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন

মেডিক্যালে ‘চান্স পাওয়া’ অনেকেই পুলিশে

মেডিক্যালে ‘চান্স পাওয়া’ অনেকেই পুলিশে

লকডাউনে রাজধানীর চেকপোস্টে তৎপর পুলিশ। ছবি: নিউজবাংলা

নিউজবাংলা অনুসন্ধানে দেখেছে, মেডিক্যাল কলেজে পড়ালেখার পর বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুযোগ পেয়েও অনেকে পরে পেশা বদল করে পুলিশের চাকরি বেছে নিয়েছেন। এ ধরনের অন্তত ২৫ পুলিশ কর্মকর্তার খোঁজ পেয়েছে নিউজবাংলা। এছাড়া, স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দিয়ে পরে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করছেন, এমন কর্মকর্তাও আছেন অনেকে।   

গাড়িতে চিকিৎসক স্টিকার সাঁটানো, গায়ে অ্যাপ্রোন। তিনি নিজেও বলছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন।

তবে এই পরিচয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না পুলিশ কর্মকর্তা। দেখতে চাইছিলেন পরিচয়পত্র।

আর এ নিয়ে শুরু দুই পক্ষে তর্কাতর্কি। এলিফ্যান্ট রোডে গত রোববার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদা শওকত জেনির সঙ্গে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এ কাইয়ুমের তর্কাতর্কির ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ওই ঘটনার জেরে চিকিৎসক ও পুলিশের প্রধান সংগঠনগুলো পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দিয়েছে। চিকিৎসকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বলেছেন, তাদের হয়রানি করা হলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে। বিপরীতে পুলিশ সদস্যদের পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চিকিৎসকের আচরণে পুলিশের প্রতিটি সদস্য অত্যন্ত মর্মাহত।

বিষয়টি গড়িয়েছে সর্বোচ্চ আদালতেও। চিকিৎসক-পুলিশের মধ্যে মুভমেন্ট পাস নিয়ে বাগবিতণ্ডার ঘটনায় দুই পেশাজীবী সংগঠনের পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেয়া সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট।

এলিফ্যান্ট রোডে রোববারের ওই উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে ডা. জেনির একটি মন্তব্য আলাদা করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।ডা. জেনি বলছিলেন, তিনি মেডিক্যালে চান্স পেয়েছেন বলেই তিনি ডাক্তার, কিন্তু ওসি পাননি বলেই তিনি পুলিশে চাকরি করছেন।

আরও পড়ুন: লকডাউনে এবার ডাক্তার-পুলিশ বিতর্কে তোলপাড়

তবে নিউজবাংলা অনুসন্ধানে দেখেছে, মেডিক্যাল কলেজে পড়ালেখার পর বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুযোগ পেয়েও অনেকে পরে পেশা বদল করে পুলিশের চাকরি বেছে নিয়েছেন। এ ধরনের অন্তত ২৫ পুলিশ কর্মকর্তার খোঁজ পেয়েছে নিউজবাংলা।এছাড়া, স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দিয়ে পরে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করছেন, এমন কর্মকর্তাও আছেন অনেকে।

রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে পরিচয়পত্র দেখানো নিয়ে পুলিশ-চিকিৎসকের তর্কাতর্কি নিয়ে নেট দুনিয়ায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। পরে বিষয়টির মীমাংসা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ছবি: নিউজবাংলা

এই কর্মকর্তারা পেশা পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বলছেন, পুলিশ ও প্রশাসন ক্যাডারে সুযোগ-সুবিধা বেশি, সমাজে অবস্থানও শক্তিশালী। অন্যদিকে, চিকিৎসকদের চাকরি জীবনে অনেক ধরনের ‘প্রতিবন্ধকতার’ বিষয়টি বিবেচনা করেই তারা পেশা পরিবর্তন করেছেন।

এমবিবিএস পাস করে ২৮তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন নন্দিতা মালাকার। তবে সেই চাকরি না করে ৩০তম বিসিএসে পাস করে পুলিশে যোগ দেন তিনি। বর্তমানে গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত আছেন।

নন্দিতা মালাকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘একজন নারী হিসেবে আমার নিরাপত্তা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং যথাযথ সম্মান এসবের শতভাগই আমি পুলিশ ক্যাডারে এসে পেয়েছি। আমি যখন স্বাস্থ্য ক্যাডারে ছিলাম তখন এসবের কোনো কিছুই পাইনি। নারীর যথাযথ ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে পুলিশ ক্যাডার সবচেয়ে ভালো বলে আমি মনে করি।’

তিনি বলেন, ‘আমি হেলথ ক্যাডারে থাকাকালীন উপজেলা পর্যায়ে অনেক সময় রাতে ডিউটি করতে হতো। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হতো। কাউকে দিয়ে বাইরে থেকে খাবার আনলে তাকে বকশিস হিসেবে কিছু টাকা দিতে হতো, কিন্তু পুলিশে এসে দেখলাম এসব সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নেই।

‘মেডিক্যাল অফিসার থাকাকালীন সুবিধামতো জায়গায় পোস্টিং নিতে চাইলে দেয়া হতো না। ভিআইপিদের প্রাধান্য দেয়া হতো পোস্টিংয়ের বেলায়, কিন্তু পুলিশে তেমনটা না। আমি এ পর্যন্ত সব প্রমোশন যথাযথভাবে পেয়েছি। আবার আমার স্বামী গাজীপুর চাকরি করার কারণে আমার এখানে পোস্টিং দরকার ছিল। পুলিশ হেডকোয়াটার্সে বলার পর আমাকে সেটা দেয়া হয়।’

নন্দিতা বলেন, ‘আমি মনে করি এমবিবিএস পড়েছি, সেই শিক্ষার জায়গায় ঠিক আছে। তবে পেশাগত জীবনে ডাক্তারির চেয়ে পুলিশ সার্ভিস অনেক সম্মান ও মর্যাদার।’

মেডিক্যাল থেকে পাস করে বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার হয়েছেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করা শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রশাসনিক ক্যাডারের অনেক সুবিধাই পাওয়া যায় না।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতা করে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেয়ার পর একজন চিকিৎসক পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন অর্থাৎ এমডি, এমএস, এফসিপিএস ইত্যাদি ডিগ্রি না করলে তার পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। ওই সব ডিগ্রির জন্য একজন চিকিৎসককে কয়েক বছর একটি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপকের অধীনে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এর পর তিনি ফাইনাল পরীক্ষা দেন।

‘এসব শেষ করতে সব মিলিয়ে ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। এই পুরো সময়ে একজন চিকিৎসকের মাসিক ভাতা খুবই কম।’

চিকিৎসক সাঈদা শওকত জেনি

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি ছাড়া একজন ডাক্তারের কোনো মূল্য নেই। কারণ সবাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খোঁজেন। কিন্তু এর পেছনে যে সময় লাগে, সেই সময়ে অন্য পেশায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি। এই পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এড়ানো, পাশাপাশি পদোন্নতি, গাড়ি-বাড়িসহ অন্য সুবিধা পেতে অনেক চিকিৎসক আজকাল মেডিক্যাল ক্যাডারের পরিবর্তে জেনারেল ক্যাডারে পরীক্ষা দিতেই বেশি আগ্রহী।’

স্বাস্থ্য ক্যাডারে এসে চাকরির শুরুতে চিকিৎসকদের অন্তত দুই বছর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করতে হয় জানিয়ে মেডিক্যাল উত্তীর্ণ ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সেখানে সরকারি কোয়ার্টারে ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়, থাকে না গাড়ির সুবিধা। অথচ প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে গাড়ি তো বটেই, আরও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।’

আরও পড়ুন: ডা. জেনিকে ‘পাপিয়া’ বলা ওসির শাস্তি দাবি

পুলিশ হেডকোয়াটার্সে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত আছেন শহীদুল ইসলাম। তবে তার পড়াশোনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে। চীনের উহানের খুঞ্জি মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে দেশে এসে ২৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে নড়াইলের একটি উপজেলায় মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর ২৫তম বিসিএসে পাশ করে যোগ দেন পুলিশ ক্যাডারে।

শহীদুল ইসলামের কাছে ডাক্তারি ‘একঘেয়েমি’ পেশা। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা পেশায় একই রকম ধাচের মধ্যে থাকতে হয়, কিন্তু আমার মনে হতো পুলিশের পেশা তেমনটা নয়। এখানে ডাইভারসিটি বেশি, মেধা খাটানোর সুযোগ বেশি আর সুযোগ সুবিধার তো অভাব নাই।

‘আমার পরিবারে আরও কয়েকজন ডাক্তার আছেন। তাদের দেখেছি গতানুগতিক কাজ করেন। হাসপাতাল, রোগী আর পড়াশোনার মধ্যে মগ্ন থাকেন তারা। এর ফলে অনেক সময় আইডেন্টিটি সংকট হয়।’

পুলিশের চাকরি নিয়ে সন্তুষ্টি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ক্ষেত্রে আমি এমনটা অনুভব করি না। আমি মনে করি পুলিশ ক্যাডারে আসার সিদ্ধান্তটা আমার জন্য খুব ভালো ছিলো। তাছাড়া আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তারা পুলিশ বা প্রশাসনকেন্দ্রীক চাকরিগুলোতে বেশি আগ্রহী হই। এর পেছনে নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা এমনকি সম্মান পাওয়ার ব্যাপারগুলো বেশি কাজ করে বলে আমার মনে হয়।’

এমবিবিএস পাস করে পুলিশে যোগ দেয়া মোহাম্মদ লোকমান পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে সম্প্রতি অবসরে গেছেন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ ক্যাডারে চাকরি হলে ধারাবাহিক পদোন্নতি, ড্রাইভারসহ গাড়ি সুবিধা, সরকারি বাংলো, বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনার সুযোগসহ নানা সুবিধা পাওয়া যায়।

‘তাছাড়া আলাদা অফিস কক্ষ, ব্যক্তিগত সহকারী এবং সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সম্মান তো আছেই।এসব কিছু বিবেচনা করেই চিকিৎসক হওয়ার চেয়ে এই ক্যাডারে আসাটা আমার কাছে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে।’

মেডিক্যালে পড়ে অন্য ক্যাডারে যাওয়ার প্রবণতা কেমন

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ক্যাডারের পরিবর্তে অন্য ক্যাডারে যাওয়ার অনেক উদাহরণ থাকলেও এর সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই।

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইশরাত শারমীন ঈশিতার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তবে তিনি বলেন, ‘কে কোন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে কোন ক্যাডারে আসলো সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমাদের কাজ হলো সুপারিশ করা।’

বাংলাদেশ পুলিশের অফিসার্স ডিরেক্টরি ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৩৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে চাকরি পাওয়া ১১৪ জনের মধ্যে চার জন ছিলেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী। ৩৬তম বিসিএসে এই সংখ্যা দুই।

শুধু পুলিশ ক্যাডার নয়, এর বাইরে অন্য ১৪টি সাধারণ ক্যাডারেও মেডিক্যাল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে।

এ ব্যাপারে আক্ষেপ রয়েছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরীর। তিনি বলেন বলেন, ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। কে পোশাকের দাপটের পেছনে ছুটবে, আর কে প্রশাসনিক ক্ষমতা পাওয়ার আশায় দৌড়াবে সেটা তো আমরা নির্ধারণ করতে পারি না। বর্তমান জেনারেশন কম আলোর চেয়ে বেশি আলোর দিকে ছুটতে পছন্দ করে। তবে অনেক সময় কম আলোতে যে শান্তি বেশি, সেটা অনেকে বুঝতে পারে না। আমি শুধু বলব, পুলিশ-প্রশাসন ক্যাডারের চেয়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারের মর্যাদা কম নয়।’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, সরকারি মেডিক্যাল কলেজে প্রতি শিক্ষার্থীদের পেছনে ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়। একজন শিক্ষার্থীকে চিকিৎসক হিসেবে তৈরি করতে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর তিনি অন্য পেশায় চলে গেলে সেটি রাষ্ট্রের জন্য বিশাল ক্ষতি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের হিসাব বলছে, দেশের সরকারি হাসপাতালে ২০ শতাংশের বেশি চিকিৎসক পদ খালি রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হিসাবে শূন্য পদের সংখ্যা অনেক বেশি।

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন

লকডাউনে খাবার পাচ্ছে না সৈকতের ঘোড়াগুলো

লকডাউনে খাবার পাচ্ছে না সৈকতের ঘোড়াগুলো

করোনার মধ্যে ভালো নেই কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়াগুলো। ছবি: নিউজবাংলা

আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের কারণে প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ রয়েছে সমুদ্রসৈকত। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে সৈকতে পর্যটকদের বিনোদনে ব্যবহার হওয়া ঘোড়াগুলোও। ঘোড়ার মাধ্যমে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মালিকদের অবহেলার শিকার হচ্ছে নিরীহ প্রাণীগুলো।

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে বেড়াতে আসা মানুষের বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ঘোড়া। কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে সৈকত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে রাজকুমার ও রাজকুমারী বেশে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন। ছবি তোলার বিনিময়ে পর্যটকদের গুনতে হয় ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।

কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রুখতে সরকারের আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের কারণে প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ রয়েছে সমুদ্রসৈকত। কক্সবাজারে আসছেন না কোনো পর্যটক। বন্ধ রয়েছে পর্যটন স্পট, হোটেল-মোটেলসহ সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

এর ফলে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে সৈকতে পর্যটকদের বিনোদনে ব্যবহার হওয়া ঘোড়াগুলোও। ঘোড়ার মাধ্যমে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মালিকদের অবহেলার শিকার হচ্ছে নিরীহ প্রাণীগুলো। সুসময়ে ঘোড়াগুলোকে নিজেদের উপার্জনে ব্যবহার করলেও ঘোড়াগুলোর এমন দুঃসময়ে পাশে নেই তাদের মালিকরা।

ঘোড়াগুলোর প্রতি এমন অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় অনেকে।

ঘোড়ার মালিকরা জানান, করোনায় আর্থিক সংকটে রয়েছেন তারা। নিজেদের খাবার জোগাতে যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে ঘোড়ার খাবার জোগানো তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তাই ঘোড়াগুলোকে একপ্রকার বেওয়ারিশের মতো রাস্তায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এখন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ঘোড়াগুলো খাবার খেয়ে নিচ্ছে আর ফুটপাত হয়েছে তাদের নতুন ঠিকানা। ঘোড়াগুলো ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গিয়ে অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।

কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া, পেশকারপাড়া, সমিতিপাড়া, বাহারছড়া, কলাতলী, লাইট হাউস, আদর্শগ্রাম, বড় ছড়া ও ইনানী এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে পর্যটকদের বিনোদন কাজে ব্যবহার হতো এমন প্রায় শতাধিক ঘোড়া রয়েছে সেখানে।

সৈকতে বেড়াতে আসা স্থানীয় ও পর্যটকদের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ওই সব ঘোড়া ব্যবহার হতো। এ ছাড়া বিবাহসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও ভাড়ায় খাটত ঘোড়াগুলো। ঘোড়াগুলোকে এ কাজে ব্যবহার করে ভালোই আয় হতো মালিক-শ্রমিকদের। কিন্তু চলমান মহামারির কারণে পর্যটনশিল্প থমকে পড়েছে।

পর্যটন স্পটগুলোও কখন খুলে দেয়া হবে, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে পর্যটন খাতের অন্য ব্যবসায়ীদের মতো ঘোড়ার ব্যবসায়ীরাও সংকটময় সময় পার করছেন।

অনেকে পেশা বদলে পান বিক্রি, অটোরিকশা ও টমটম চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু তাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

এ অবস্থায় ঘোড়ার খাবার জোগাতে পারছেন না মালিকেরা। নজর দিতে পারছেন না পশুগুলোর স্বাস্থ্যের প্রতিও। অযত্ন-অবহেলায় রোগা হয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে অনেক ঘোড়া।

মালিকের কাছ থেকে ঘোড়া নিয়ে সৈকতে যাওয়া কর্মচারী মোহাম্মদ সিফাত, লুকমান, নুরুল ইসলাম, মো. তারেক, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, আকতার হোসেনসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার এই প্রতিনিধির। এদের মধ্যে অনেকে জানান কঠোর বিধিনিষেধের আগে সৈকতে এক একটি ঘোড়া নিয়ে প্রতিদিন এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতো তাদের। মালিককে ভাড়ার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত আয় থাকত তাদের একেকজনের।

কিন্তু এখন সবকিছু বন্ধ থাকায় ঘোড়ার মাধ্যমে আয়ও বন্ধ। তাই অন্য পেশার মাধ্যমে সংসারের খরচ জোগাচ্ছেন তারা। ঘোড়ার মালিক রায়হান সিদ্দিকী বলেন, ‘করোনা সব শেষ করে দিয়েছে। পর্যটন ব্যবসা বন্ধ থাকায় এখন টমটম চালিয়ে সংসার চলছে।’

তিনি আরও জানান আর্থিক সংকটের কারণে ঘোড়াগুলোকে রাস্তায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে যতটুকু পারা যায় ঘোড়ার খবর রাখছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যখন আবার পুনরায় সমুদ্রসৈকত খুলবে, পযটক আসবে তখন ফের ঘোড়াগুলো নিয়ে সমুদ্রসৈকতে নেমে পড়বেন।

তবে ঘোড়ার প্রতি মালিকদের এমন আচরণকে অমানবিক বলেছেন স্থানীয়রা। তাই করোনার এই সংকটময় মুহূর্তে মালিকদের প্রতি তাদের আহ্বান ঘোড়াগুলোর পাশে থাকার।

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলে শাহবাগে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যু: প্রতিবাদে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি
মুশতাকের মৃত্যু বর্বর হত্যাকাণ্ড: সিপিবি
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’

শেয়ার করুন