কোথায় সেই আলাউদ্দিন সুইটমিট

কোথায় সেই আলাউদ্দিন সুইটমিট

২০০২ সালের পর ২০০৫ সাল পর্যন্ত কোনোমতে ব্যবসা চললেও এরপর চার বছর আলাউদ্দিন সুইটমিটের সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২০০৯ সালে আবার ফিরে আসে এই মিষ্টি, ঢাকায় ফের চালু হয় সাতটি শাখা। দেশের বাইরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে আছে চারটি শাখা।

গত শতকের আশির দশকে ঢাকাকে উপস্থাপনের হাতেগোনা কিছু আইকনিক প্রতিষ্ঠানের একটি আলাউদ্দিন সুইটমিট। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় নিয়মিত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মিষ্টির নাম ছড়িয়েছিল দেশজুড়ে।

সেই সময়ের প্রজন্মের অনেকের কাছে রাজধানী ঢাকা আর আলাউদ্দিন সুইটমিট মিলেমিশে এক হয়ে আছে। ‘আলাউদ্দিন মিষ্টি, অপূর্ব সৃষ্টি’- স্লোগান ঘুরত অনেকের মুখে মুখে।

আলাউদ্দিন সুইটস
পত্রিকার পাতায় আলাউদ্দিন সুইটমিটের বিজ্ঞাপন।

বাংলাদেশে ব্র্যান্ড মিষ্টির পথ দেখানো সেই আলাউদ্দিন সুইটমিট এখন এক বিস্মৃত নাম। ঢাকার বুকে কোথায় আছে সেই মিষ্টির দোকান, ভিড়ভাট্টাই বা কেমন, কী করে হারিয়ে গেল জৌলুসের অধ্যায়- সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে নিউজবাংলা।

ইতিহাস বলছে, দেড়শ বছরের কিছু বেশি আগে ভারতের লখনোউ থেকে পুরান ঢাকার চকবাজারে আসেন মিষ্টি ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন হালওয়াই। তিনি ১৮৯৪ সালে গড়ে তোলেন আলাউদ্দিন সুইটমিট, যা ছিল ঢাকা শহরের বুকে প্রথম খ্যাতি ছড়ানো মিষ্টির দোকান।

ঢাকার মিষ্টির জগতে দীর্ঘদিন রাজত্ব করা সেই আলাউদ্দিন সুইটমিট এখন চলছে ধুঁকে ধুঁকে। এক দশক আগে প্রায় চার বছর একরকম বন্ধ ছিল ব্যবসা। এর পর নতুন হাতে আলাউদ্দিন সুইটমিট ফিরে এলেও এখনও চলছে টিকে থাকার লড়াই।

দেশবিখ্যাত এই মিষ্টির জন্ম যেখান থেকে, সেই পুরান ঢাকার চকবাজারের আদি অবস্থানে এখনও রয়েছে আলাউদ্দিন সুইটমিটের প্রধান শাখা। ব্যবসার হাল ধরেছে চতুর্থ প্রজন্ম। বদলেছে মিষ্টির ধরন, এমনকি প্যাকেটের নকশাও। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে নেয়া হয়েছে ডিজিটাল বিপণন কৌশল।

আলাউদ্দিন সুইটস
আলাউদ্দিন সুইটমিটের মিষ্টির প্যাকেট। ছবি: নিউজবাংলা

আলাউদ্দিন সুইটমিটের বর্তমান পরিচালক মারুফ আহমেদ। আলাউদ্দিনের নাতির মেয়েকে ২০০৯ সালে বিয়ে করে অংশ হয়েছেন এই পরিবারের, সেই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসার।

আলাউদ্দিন সুইটস
আলাউদ্দিন সুইটমিটের বর্তমান পরিচালক মারুফ আহমেদ। ছবি: নিউজবাংলা

এক সময়ের দাপুটে আলাউদ্দিন সুইটমিটের নানান পর্যায় সম্পর্কে নিউজবাংলাকে জানান মারুফ।

‘বেসিক্যালি আমাদের প্রতিষ্ঠানটা অনেক পুরাতন। তখন শহরের প্রাণকেন্দ্র ছিল চকবাজার। আগের দিনে মিষ্টির ব্যবসা ছিল হোটেল বেইজড, মিষ্টির দোকান হিসেবে আমরাই প্রথম শুরু করি।

‘প্রতিষ্ঠার সময় তিন দেশ একসাথে ছিল (ভারতীয় উপমহাদেশ)। এরপর আলাউদ্দিন সাহেব মারা গেলেন। তার ছেলেরা দায়িত্ব নিলেন, তারপরে আমার শ্বশুর, কিন্তু ২০০২ এর দিকে শ্বশুর মারাত্মক অসুস্থ হয়ে গেলেন।’

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে জৌলুস হারাতে শুরু করে আলাউদ্দিন সুইটমিট, নতুন শতাব্দীতে ব্যবসায়িক মন্দা তীব্রভাবে দেখা দেয়। মারুফ আহমেদ জানান, ২০০২ সালের পর ২০০৫ সাল পর্যন্ত কোনোমতে ব্যবসা চললেও এরপর চার বছর আলাউদ্দিন সুইটমিটের সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২০০৯ সালে আবার ফিরে আসে এই মিষ্টি, ঢাকায় ফের চালু হয় সাতটি শাখা। দেশের বাইরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে আছে চারটি শাখা।

নতুন এই যাত্রায় হাল ধরা মারুফ আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০০৯ সালে আমি এ পরিবারে বিয়ে করি, এরপর একা হাতে আবার সব শুরু করি।’

কীভাবে হারালো আলাউদ্দিন সুইটমিটের সুদিন- জানতে চাইলে মারুফ আহমেদের জবাব, ‘এই কোম্পানি এক সময় ছিল ফ্যামিলিকেন্দ্রিক। বাইরের কোনো অংশীদার ছিল না। একা একা ব্যবসা পরিচালনার কারণে সমস্যা দেখা দেয়।

‘একজন অসুস্থ হলে তো পুরো ব্যবসা বন্ধ হতে পারে না। আজ আমার সমস্যা হলে ব্যবসাতেও প্রব্লেম হয়, কারণ সাথে আর কেউ নাই৷ পরিচালক কম৷ এমন না যে ব্যবসা করতে পারতেছি না, তবে একা একা ব্যবসা করা খুব টাফ।’

প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য মিষ্টির প্রতিষ্ঠানে শক্ত ব্যবস্থাপনার উদাহরণ দিতে গিয়ে মারুফ টানেন ‘বনফুল’ কোম্পানির নাম।

‘বনফুলের মালিক ছাড়াও বনফুলের সাথে আরও অনেকে আছেন, যারা তার অনুপস্থিতিতে ব্যবসাটা পরিচালনা করবেন। কিন্তু আমাদের পরিচালনায় তেমন কেউ নাই। তা ছাড়া আমাদের পূর্বপুরুষেরা সেভাবে শিক্ষিত ছিল না। এই কারণে মূলত আমাদের পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। অন্য কোনো কারণ নাই।’

আলাউদ্দিন সুইটস

মানুষের রুচির পরিবর্তনেও মিষ্টির ব্যবসা আগের মতো নেই বলে মনে করছেন আলাউদ্দিন সুইটমিটের পরিচালক। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে মানুষ বেড়ে গেছে। আগে এই শহরে মানুষ ছিল ২০-৩০ লাখ, এখন ২-৩ কোটি। আগে বিনোদন বলতেই ছিল মিষ্টি। জন্মদিন, বিয়ে, মৃত্যুবার্ষিকী সবকিছুতেই মিষ্টির উপস্থিতি ছিল। এখন বার্গার, পিজ্জা সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে।’

ব্যবসায় ধস নামলেও গুণগত মানে আলাউদ্দিন সুইটমিট এখনও অনন্য বলে দাবি করছেন মারুফ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের তিনটা ফ্যাক্টরি আছে, একযোগে প্রোডাকশন হয়। আমরা গুণগত মান ধরে রাখার চেষ্টা করি। আমাদের বিশেষত্ব হলো আমরা কোনো প্রোডাক্টে প্রিজারভেটিভস ইউজ করি না।

‘আমাদের মিষ্টি নিবেন, দুই দিন পর নষ্ট হবে। কারণ, আমরা কোনো আর্টিফিশিয়াল প্রিজারভেটিভস ইউজ করি না।’

আগে আলাউদ্দিন সুইটমিটে মাত্র কয়েক ধরনের মিষ্টি থাকলেও এখন সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে বলেও জানান মারুফ।

‘আগে দোকানে ৪-৫টা আইটেম বিক্রি করা হতো। লালমোহন, রসগোল্লা, কালোজাম, ছানা, মনসুর, আমিত্তি। এখন মনসুর ও আমিত্তি বাদে সব আইটেম আছে। এর সাথে আরও আইটেম আছে।’

আলাউদ্দিন সুইটস

কেবল মিষ্টির ব্যবসাই নয়, আলাউদ্দিন সুইটমিটের জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গেও। এর বহুল পরিচিত ব্র্যান্ডিং নকশাটি করেন শিল্পী রফিকুন নবী। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকেই নকশায় থিম হিসেবে বেছে নেয়া হয় ‘অ’-কে। তবে আদি রঙ ও ডিজাইনের প্যাকেটের পরিবর্তে এখন আলাদা ধরনের প্যাকেটেও বিক্রি হচ্ছে এই মিষ্টি।

রাজধানীতে চকবাজার ছাড়াও সিদ্ধেশ্বরী, মৌচাক, নারিন্দা, আজিমপুর, ইসলামপুর, খিলগাঁওয়ে রয়েছে আলাউদ্দিন সুইটমিটের শাখা।

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

মন্তব্য

টোলারবাগে সেই বিভীষিকার কোনো চিহ্ন নেই

টোলারবাগে সেই বিভীষিকার কোনো চিহ্ন নেই

রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগ।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে মিরপুরের টোলারবাগে। সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায় আতঙ্ক। লকডাউন করা হয় ওই এলাকা।

করোনার বিভীষিকার সাক্ষরবাহী একটি নাম যদি আলাদা করতে হয়, তবে সেটি টোলারবাগ। রাজধানীর মিরপুরের এই ক্ষুদ্র মহল্লাটি এক বছর আগে সারা দেশের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছিল।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে এখানে। সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায় আতঙ্ক। লকডাউন করা হয় ওই এলাকা।

এখন করোনা মহামারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। লকডাউন উঠে গেছে আট মাস আগে। আতঙ্ক নেই কোথাও।

টোলারবাগে পা রাখলে, সংকীর্ণ মহল্লার রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল বাড়িগুলোর দিকে তাকালে এখন আর বোঝার উপায় নেই এক বছর আগে কী এক দম বন্ধ করা আতঙ্কের ছায়া পড়েছিল এখানে।

যেভাবে লকডাউন শুরু

গত বছরের ২১ মার্চ রাজধানীর টোলারবাগ এলাকার বাসিন্দা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইসলাম গণি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন সারা দেশের মানুষের আলোচনা ও আতঙ্কের কেন্দ্রে পরিণত হয় এ মহল্লা। তার দুদিনের মাথায় ২৩ মার্চ এখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় আরেকটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

এলাকাবাসী দাবি করেন, দুই ব্যক্তি একই মসজিদে নামাজ পড়তেন। মসজিদটা ছিল তাদের বাসার পাশেই।

দুদিনের ব্যবধানে পরপর দুই ব্যক্তির মৃত্যুতে টোলারবাগে বাসিন্দাদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রশাসন। তাদের বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করা হয়। ওই এলাকায় বসবাসরত প্রতিটি পরিবারকে হোম কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়।

দিনের বেলাতেও এক সুনসান নীরবতা নেমে আসে টোলারবাগে।

করোনা সংক্রমণ বাড়ার পর আতঙ্ক নেমে আসে টোলারবাগে

লকডাউনের ওই দিনগুলো কেমন ছিল, জানতে নিউজবাংলার এ প্রতিবেদক শুক্রবার এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন।

মিরপুরের পাইকপাড়া আনসার ক্যাম্পের বিপরীতে প্রধান সড়কের পাশে উত্তর টোলারবাগে ঢোকার একটি লোহার ফটক। শুক্রবার দুপুরে সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন দুজন নিরাপত্তাকর্মী। কথা হয় তাদের সঙ্গে।

নিরাপত্তাকর্মী ঝন্টু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এলাকায় প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যুর খবর জানাজানি হইলে পর পুলিশ আসে। যে বাড়িতে প্রথম মারা যায়, সেখানে তালা দেয় পুলিশ। এই বাসা থেকে কাউরে বের হইতে দেওয়া হয় নাই। মহল্লায় ওষুধ আর খাবারের দোকান ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ কইরা দেওয়া হইছিল।’

ঝন্টু বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এলাকার কেউ বাইরে যায় নাই, বাইর থাইকাও কেউ ঢুকে নাই। বহু লোক রাতের আন্ধারে মহল্লা ছাইড়া পালায় গেছিল। এক রাইতে ফাঁকা হইয়া গেল গোটা এলাকা। কিছু বাড়ির বাজারসদায় আমরা কইরা দিতাম।’

টোলারবাগ মহল্লাটি দুই ভাগে বিভক্ত। একটিকে বলা হয় উত্তর টোলারবাগ, সেটি মূলত দারুস সালাম আবাসিক এলাকার অংশ। যে দুজন প্রথম করোনায় মারা যান, তারা ওই উত্তর টোলারবাগের অধিবাসী। তার উল্টোদিকের এলাকাটি শুধু টোলারবাগ নামে পরিচিতি। তবে করোনা নিয়ে দুই টোলারবাগেই ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে মিরপুরের টোলারবাগে এই বাড়িতে। ছবি: নিউজ বাংলা

এলাকার ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি শুভাশিস বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ওপর জোর দিয়ে কাজ করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির কাছাকাছি যারা ছিলেন, তাদের সবাইকে করোনা পরীক্ষা করানো হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী ও এলাকার মসজিদে যারা নামাজ আদায় করেছেন, তাদের পরীক্ষা করা হয়। এলাকায় অবস্থিত সুপারশপ ‘‘স্বপ্ন’' ও স্থানীয় মুদি দোকানগুলোর ফোন নম্বর সব বাসায় জানিয়ে দেয়া হয়।’

কারও কিছু প্রয়োজন পড়লে তারা যেন একটি ফোনকলের মাধ্যমে দরকারি পণ্য নিজের দরজায় পেয়ে যান, সেটা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয় বলে জানান তিনি। এর ফলে এলাকার বাসিন্দাদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার বিষয়টি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রথম ব্যক্তির বসবাস ছিল উত্তর টোলারবাগের ‘দারুল আমান’ নামক ভবনে। ওই বাড়িতে দীর্ঘ পাঁচ বছর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খলিল।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি গেছিলাম তাবলিগ জামাতে। ৪০ দিন জামাতে থাইকা আবার চাকরিতে ফিরছিলাম। ডিউটিতে আসার দুই দিন পর শুনি দেশে করোনা আসছে। যে লোক করোনায় মারা গেছেন, মৃত্যুর আগে কয়দিন দেখতাম, কিছুদিন পর পর হাসপাতালে নিয়া যাইতো।

‘একদিন শুনলাম জ্বর উঠছে। কিছুদিন এই হাসপাতালে, ওই হাসপাতালে নিছে। অনেক টাকা খরচ হইছে তাদের। মারা যাওয়ার পর শুনছি, করোনা ছিল। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর পুলিশ আইসা বাসায় তালা দেয়। কেউ ঘর থেকে বের হয় না। হঠাৎ কইরা পুরা এলাকা ফাঁকা হইয়া যায়। বাজার করার লোকও নাই কোনো। যে স্যারেরা ছিলেন, তারা এক দিনে অনেক বাজার করে আনতেন। টিভির লোকেরা (টিভি সাংবাদিক) আমারে অনেক বিরক্ত করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পর বাড়ি থেকে ফোন করে (আমাকে) টিভিতে দেখা যায় বলে। পরে দুই দিন পর আমি রাতে বাড়িতে চলে গেছি। বাড়িতে গিয়ে দেখি আমারে টিভিতে দেখাইতেছে।’

তিনি আরও জানান, ‘বাসার মালিকেরা ভয়ে কেউই বাড়িতে ছিল না। প্রায় দুই মাস পর এইখানে লকডাউন তুইলা নেওয়া হয়। আমিও ছিলাম না। এক মাস ২০ দিন গ্রামের বাড়িতে ছিলাম।’

ওই সময় বহিরাগতদের কাউকে এলাকায় আসতে দেয়া হতো না বলেও জানান এলাকাবাসী।

নিরাপত্তাকর্মীদের একজন কালু মিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ সইরা গেলেও দিনরাত পাহারা চলছিল। বাইরের লোক কাউরে ঢুকতে দেওয়া হইতো না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, গত বছর পরপর দুটি মৃত্যুতে এলাকার বাসিন্দারা ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এরপর ২৩ মার্চ এলাকাটিকে সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে লকডাউন ঘোষণা দেয় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

এটিই হচ্ছে ঢাকার প্রথম লকডাউন ঘোষিত এলাকা। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ৪৮ দিনের মাথায় উত্তর টোলারবাগ থেকে পুলিশের পাহারা তুলে নেওয়া হয়।

দারুসসালাম থানার পুলিশ এ আবাসিক এলাকার প্রধান ফটকে সার্বক্ষণিক পাহারা বসায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উত্তর টোলারবাগে ৪০টি ৯ তলা ও ১০ তলা ভবনে ৬৭২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এখানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে। এর পেছনের বস্তিতে ১৬৩টি পরিবারে হাজার খানেক মানুষের বসবাস। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ গতকাল বলেন, করোনায় আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে ওঠায় আইইডিসিআরের সঙ্গে পরামর্শে পুলিশের পাহারা তুলে নেয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ‘শের শাহ সড়ক’

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ‘শের শাহ সড়ক’

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ভেতর দিয়ে যাওয়া শের শাহ সড়ক। ছবি: নিউজবাংলা।

যশোর ও মাগুরার দুটি উপজেলার আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে আছে একসময়ের জমজমাট ‘শের শাহ সড়ক’। তবে ঐতিহ্যের কথা জানেন না এলাকার বেশির ভাগ মানুষ। এমনকি সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছেও নেই যথেষ্ট তথ্য।

‘সড়ক এ আজম’ বা ‘শের শাহ সড়ক’। ২৫০০ কিলোমিটারের এই সড়ক যুক্ত করেছিল উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে।

শুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ্‌র শাসনামলে (খ্রিষ্টাব্দ ১৫৪১-১৫৪৫) প্রাচীন সড়কটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে নাম দেয়া হয় ‘সড়ক এ আজম’। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে সোনারগাঁও হয়ে যশোর জেলার উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, দিল্লি ও পাকিস্তানের পেশোয়ার হয়ে এই সড়ক বিস্তৃত ছিল আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত।

ব্রিটিশ শাসনামলে সেনা চলাচল এবং ডাক বিভাগের উন্নতির উদ্দেশ্যে সড়কটির সংস্কার করে কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত অংশের নাম দেয়া হয় ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’।

তবে সময়ের আবর্তে বাংলাদেশ অংশে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহাসিক সেই ‘শের শাহ সড়ক’। ছয় শতাব্দীর পুরোনো সড়কটি বাংলাদেশ অংশে অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে তা ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হিসেবে।

যশোর ও মাগুরার দুটি উপজেলার আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে আছে এক সময়ের জমজমাট ‘শের শাহ সড়ক’। তবে ঐতিহ্যের কথা জানেন না এলাকার বেশির ভাগ মানুষ। এমনকি সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছেও নেই যথেষ্ট তথ্য।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার প্রবেশমুখেই দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের একটি নামফলক। ইট-সিমেন্টের ফলকটি অনেকটাই এখন অস্পষ্ট। এর পাশের মাইলফলকে ছোট করে ‘শের শাহ সড়ক’ নামটি চোখে পড়ে। সরকারি নথিপত্রে উল্লিখিত এই ‘শের শাহ সড়ক’ই প্রাচীন আমলের ‘সড়ক এ আজম’।

বাঘারপাড়ায় শের শাহ সড়কের বিবর্ণ নামফলক

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাঘারপাড়া থেকে মাগুরার শালিখা, মহম্মদপুর হয়ে ফরিদপুর পর্যন্ত শের শাহ সড়কের সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কেবল যশোরের বাঘারপাড়া ও মাগুরার শালিখার একাংশে সড়কটি পূর্ব নামে পরিচিত।

কী বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা

বাঘারপাড়ার আজমপুর এলাকার বর্ষীয়ান আব্দুল হামিদ নিউজবাংলাকে জানান, গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকেও এটি ইট বিছানো রাস্তা ছিল।

তিনি বলেন, ‘তখন আশপাশে আর কোনো ইটের রাস্তা দেখিনি। এরপর কত বড় বড় রাস্তা হইছে, কিন্তু এইটায় পিচ ঢালাই হইছে কয়েক বছর আগে।’

আরেক বর্ষীয়ান কামরুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাধীনতার পরেও এই রাস্তা ব্যবহার করে আমরা ঢাকা গেছি। পরে অন্য বড় বড় রাস্তা হওয়ায় এইটা দিয়ে এখন আর যাওয়া হয় না। এ রাস্তা দিয়ে এখন আর তেমন গাড়িঘোড়াও চলে না। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী এহসান জুয়েলের বাড়ি বাঘারপাড়ায়। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাস্তার নামফলকে শের শাহ সড়ক দেখেছি। তবে আমরা এই রাস্তাকে নারিকেলবাড়িয়া-বুনোগাতি সড়ক বলি। ’

ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ

এই অঞ্চলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ সড়ক ই আজমের বিলীন হওয়া ঠেকাতে উদ্যোগ চান ঐতিহ্য রক্ষা কর্মীরা। যশোরের সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য জিল্লুর রহমান ভিটু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ছোটবেলায় গ্রামে যাওয়ার সময় সড়কটি দেখতাম। তখন ইতিহাসের বইয়ের পাতার সাথে এটি মেলাতাম। ভালো লাগত, কিন্তু এখন গ্রামে যাওয়ার পথে নামফলকটি চোখে পড়ে না। অনেকটা হারিয়েই গেছে শের শাহ সড়কের ইতিহাস।’

তিনি বলেন, ‘সড়কটি রক্ষা কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। ইতিহাসবিদদের এগিয়ে আসতে হবে প্রথম। তাদের সাথে আমরাও থাকব। ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা না গেলে তা দেশ ও জাতির জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনবে না।’

যশোরের সমাজকর্মী ও রাজনীতিক নাজিমউদ্দিন বলেন, ‘যশোরের পশ্চিমাংশের সড়কটিকে আমরা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড হিসেবে চিনি, যদিও আজ তা আর কাগজেকলমেও নেই। শুধু বাঘারপাড়ার ওই অংশটুকুতেই শের শাহর নামে আছে। এই ঐতিহ্য অবশ্যই রক্ষা করা দরকার।’

যশোর সরকারি এমএম কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জিল্লুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সড়কটি কলকাতা থেকে বেনাপোলে এসে শেষ হয়েছে। এরপর আর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে বাঘারপাড়ার কিছু অংশে এটি আছে। আমি মনে করি, সড়কটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য আমাদের রক্ষা করা উচিত। তবে এটি আমার বা আমাদের কারোরই একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার যদি চায়, তাহলেই কেবল এটা সম্ভব।’

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

বাঘারপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ভিক্টোরিয়া পারভীন সাথী বলেন, ‘সড়কটি রক্ষার বিষয় নিয়ে আমিও ভাবছি। সবার সহযোগিতা পেলে এটি করা সম্ভব। সড়কটির উন্নয়নে প্রয়োজনে উপজেলার পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।’

বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম মোয়াজ্জেম হোসেনের। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ইতিহাসের আলোকে বলতে পারছি না। আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। যেহেতু এটি অনেক পুরোনো একটি বিষয়, আমাদের ম্যাপ দেখতে হবে। যদি সেখানে কিছু পাওয়া যায়।’

সড়কটির বর্তমান অবস্থা ও নামফলকের বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র না দেখে আমি কিছুই বলতে পারব না। যেহেতু সড়ক ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে, সেহেতু অনেক সড়ক নির্মাণ হয়েছে এবং হচ্ছে। সেখানে এ বিষয়টি আসেনি।’

অন্যদিকে, সড়কটির তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মির্জা মো. ইফতেখার আলী বলেন, ‘সড়কটি এলজিইডির তত্ত্বাবধানে আসার পর সাবেক কর্মকর্তারা ইতিহাসকে ধরে রাখার জন্য দুটি নামফলক স্থাপন করেছিলেন। সেগুলো এখনও আছে। তবে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে তা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। আসছে বাজেটে ইতিহাস ও ঐতিহ্যর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আরও দুটি নামফলক স্থাপনের ব্যাপারে আমরা ভাবছি। সেগুলো অনুমোদন পেলে সড়কটির আসল ইতিহাস আমরা নামফলকে সংযুক্ত করে দেব। একই সঙ্গে সড়কটি সংস্কারের ব্যাপারেও উদ্যোগ নেয়া হবে।’

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

ঋণপ্রাপ্তিতে তলানিতে নারী

ঋণপ্রাপ্তিতে তলানিতে নারী

রাজধানীর সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে টাকা তুলছেন এক নারী। ছবি: নিউজবাংলা

এক দশকে নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৪৪ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার ঋণ, যা মোট বিতরণ হওয়া ঋণের মাত্র ৪ শতাংশ।

উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজন ব্যাংক ঋণ; কিন্তু সেই ঋণ নেবার ক্ষেত্রে বাড়ছে না নারীর অংশগ্রহণ। এক দশকে মোট বিতরণ হওয়া ঋণের মাত্র ৪ শতাংশ পেয়েছেন নারী। এতেই স্পষ্ট, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণ কতটা বিস্তৃত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নারীদের স্বাবলম্বী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যাংকগুলো কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো পরিদর্শনের সময়ও বলা হয় বছরে তিনজন নারী উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। তারপরও ঋণ বিতরণ সেই হারে বাড়েনি। কেন ঋণ বাড়ছে না সেটা আগে খতিয়ে দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ঋণ নেবার ক্ষেত্রে নারীদের আগ্রহ কম, নাকি ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহজলভ্যতা একটি বড় বাধা, সেটা বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নারীর নামে ঋণের আবেদন করছেন তার স্বামী। এ জন্য ঋণের হার কম। কিন্তু মূল নারী উদ্যোক্তারা ঋণ চাইলে ব্যাংক তাদের ঋণ দেবে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, যেকোনো ব্যবসা শুরু এবং তা টিকিয়ে রাখাও নারীদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ঋণ নেয়ার জন্য নারীদের নির্দিষ্ট উদ্যোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। আবার ঋণের টাকা যথাযথভাবে ফেরত দেয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

এখন নারীর ঋণ পাওয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। এরপরও ব্যাংক ব্যবস্থা, এনজিও বা সমবায়- সব উৎস থেকেই ঋণ নেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নারী। নারীকে সামনে রেখে অনেক পুরুষ ঋণ নিতে চান। ব্যাংক এসব খতিয়ে দেখে ঋণ দেয় বলে প্রকৃত নারী উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি হার কম।

নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ উদ্যোগ নারীর নামে চালানোকে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখে ব্যাংকগুলো। বিভিন্ন ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঋণের জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা জোগাড় না করেই ব্যাংকে যান নারীরা। আবার ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেয়ে অনেক সময় উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

নারী উদ্যোক্তাদের জামানতের অপর্যাপ্ততা থাকে। কারণ, আর্থিক বিষয়ে নারীরা পুরুষদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।

কেন নারী উদ্যোক্তা ঋণ পাচ্ছেন না, জানতে চাইলে পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার গুডসের স্বত্বাধিকারী রেজবিন হাফিজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কম। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের অজ্ঞতাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ নেয়ার জন্য এত বেশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা কাগজপত্র দেখাতে হয়, যা হয়রানির পর্যায়ে চলে যায়।’

‘বানিস ক্রিয়েশন’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তাহমিনা আহমেদ বাণী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন মূল উদ্যোক্তার সংখ্যা খুব কম। ফেসবুক বা এফ-কমার্স উদ্যোক্তা বেশি। আগে মূল উদ্যোক্তা চিহ্নিত করতে হবে। অনেক নারী জানেনই না যে ব্যবসা করার জন্য ঋণ নেয়া যায়। আবার অনেকে মনে করেন, ঋণ নেয়া ঝামেলার একটা বিষয়। ব্যাংকে কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন- এই বিষয়টি সম্পর্কে অনেকের ধারণা স্পষ্ট নয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, গত এক দশকে (২০১০-২০২০) নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৪৪ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার ঋণ, যা মোট বিতরণ হওয়া ঋণের মাত্র ৪ দশমিক ০৩ শতাংশ।

এ সময় শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়েছেন ১৪ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার। এ ছাড়া সেবা খাতে ৬ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার এবং ব্যবসা খাতে ২৩ হাজার ৫৫২ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছে নারী।

ঋণ তেমন না বাড়লেও এ সময় বেড়েছে নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ২০১০ সালে দেশে নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ২৩৩টি। ২০২০ সাল শেষে সেটা বেড়ে হয়েছে ৬৬ হাজার ১৮৯টি।

তবে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও ঋণ আশানুরূপ বাড়েনি। ২০১০ সালে মোট ঋণের ৩ দশমিক ৩৭ ভাগ বা ১ হাজার ৮০৪ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। ১০ বছর পরে সেটা সামান্য বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।

নারীদের অর্থনীতিতে এগিয়ে নিতে ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতে তাদের সহায়তা দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর মোট এসএমই ঋণের একটি অংশ নারীদের জন্য বিতরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়নের আওতায় নারীরা মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন। পুরুষ উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে এ হার ৯ শতাংশ।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়নের আওতায় এসএমই খাতে বিতরণ করা ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারীদের মাঝে দেওয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৪ সাল নাগাদ এসএমই খাতে একটি ব্যাংকের বিতরণ করা মোট এসএমই ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারীদের দিতে হবে।

আবার করোনাভাইরাসের ক্ষতি পোষাতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ৫ শতাংশ নারীদের জন্য বরাদ্দ দিতে বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব উদ্যোগের পরও ব্যাংক ঋণে নারীদের অংশ সেভাবে বাড়ছে না।

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে নারী উদ্যোক্তাকে দেয়া হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ২৯০ কোটি টাকার ঋণ। এর মানে, মোট ঋণের মাত্র ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ পেয়েছেন নারীরা। ২০১৯ সালে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ঋণের ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ পেয়েছিলেন নারীরা। ২০১৮ সালে দেয়া হয় ৫ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। যা এসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গত ১০ বছরের চিত্র একই রকম।

দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। এদের প্রায় ৮৭ শতাংশই করোনাকালে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আর বাকি ১৩ শতাংশ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে যুদ্ধ করছেন।

জরিপ বলছে, করোনা মহামারিতে পুরুষের চেয়ে নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষতির মাত্রা ছিল বেশি। নারীদের প্রতি ১০০ জনে ৮৭ জনই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

নারী উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেকে ব্যাংক ঋণ চেয়েও খালি হাতে ফিরেছেন । ব্যবসায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে সামাজিক বাধা ও ঋণ পাবার বাধা দুটোই দূর করতে হবে।

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

রপ্তানি-সহায়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে

রপ্তানি-সহায়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে

প্রস্তুতিপর্বে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। রপ্তানি খাত পোশাকসহ গুটি কয়েক পণ্যের ওপরও নির্ভরশীল।

স্বল্পোন্নত-এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। চূড়ান্তপর্বে যেতে হলে আমাদের এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাহলে পণ্যের খরচ কমবে। ফলে প্রতিযোগিতার সামর্থ্য বাড়বে। উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে যাবে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, তাতে খুব অসুবিধা হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমরা বাজারসুবিধা পাই না। তাতে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং প্রতিযোগিতা করে ভালোভাবে টিকে রয়েছে। দেখা গেছে, শুল্ক পরিশোধ করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। আসল কথা হলো, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানি বাড়বে।

প্রস্তুতিপর্বে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। রপ্তানি খাত পোশাকসহ গুটি কয়েক পণ্যের ওপরও নির্ভরশীল।

অনেক দিন ধরে তা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে পারলে যেসব বাজারে শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে সেখানে অসুবিধা হবে না।

পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আরেকটি কাজ করতে হবে। তা হলো, যেসব দেশ বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় না, সেসব দেশে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে এ পদক্ষেপ নিতে হবে।

পোশাকপণ্যের রপ্তানির মধ্যে বেশির ভাগই বেসিক আইটেম। এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক সস্তা। রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে উচ্চ মূল্যের পোশাক বানানোর দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।

এ ছাড়া কৃষি ও ইলেকট্রনিক পণ্যে বহুমুখীকরণের সুযোগ রয়েছে। এসব খাতের বিকাশে কর প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা আরও বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রণয়নে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বলতা আছে। এখানেও নজর দিতে হবে।

চামড়া দেশের সম্ভাবনাময় খাত। নানা সমস্যায় জর্জরিত খাতটি। সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরিত হলেও অবকাঠমো দুর্বলতার কারণে অনেক কারখানা সক্রিয় নয়। পরিবেশ দূষণরোধে ব্যবহৃত বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনে ঘাটতি রয়েছে।

এসব দুর্বলতার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে করা হয় না। গলদ রয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনায়। উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে হবে রপ্তানি সহায়ক। যথাযথ নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন ঠিকমতো করতে পারলে বাংলাদেশ অনেক দূর যাবে।

শিল্প খাতে প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগত ত্রুটি আছে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে অনেক ক্ষেত্রে দেয়া হয় না। প্রণোদনা দিতে হবে খাতভিত্তিক বা টার্গেট করে। তা হলে এর সুফল পুরোপুরি মিলবে। করোনা মহামারির কারণে অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারে প্রণোদনাসুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে।

গত কয়েক বছর বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি অনুপাতে বিনিয়োগ একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন উন্নয়নের ধারাকে সামনের দিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে দেশি–বিদেশি (এফডিআই) বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি জোর দিতে হবে।

এই বিনিয়োগ হতে হবে ভৌত অবকাঠামো খাতে। দেশের বন্দরের অবকাঠামো দুর্বল এখনও। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায়ও ত্রুটি আছে। সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম একটি অংশ হচ্ছে দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে নজর দিতে হবে সরকারকে।

পণ্যের খরচ কমাতে হলে উন্নত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ নানা ধরনের অবকাঠামো সমস্যা রয়েছে। এর সমাধান করতে হবে। দ্রুত মালামাল পাঠাতে হলে শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

উত্তরণের পর উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নমনীয় ঋণ পাওয়া না গেলে অসুবিধা হবে না। বিদেশ থেকে কম সুদে ঋণ না নিয়ে বাংলাদেশ যে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, তার বড় উদাহরণ পদ্মা সেতু। বিশ্ব ব্যাংক ঋণ দেয়নি। নিজেদের টাকায় দৃশ্যমান পদ্মা সেতু। নিজেদের টাকায় করতে পেরেছি, তার অর্থ হচ্ছে আমাদের সক্ষমতা আছে। আরও বাড়াতে হবে। তা হলে ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে এবং আরও বেশি ঋণ পাওয়া যাবে।

ড. জায়েদ বখত, সাবেক ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক বিআইডিএস, চেয়ারম্যান অগ্রণী ব্যাংক

# সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, আবু কাওসার

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

১৬ হাজার কোটি ঘণ্টার কাজ, নেই স্বীকৃতি

১৬ হাজার কোটি ঘণ্টার কাজ, নেই স্বীকৃতি

গৃহস্থালি কাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। ছবি: সাইফুল ইসলাম

গৃহস্থালিকাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে জিডিপিতে নারীর অংশ বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশে।

নাজমা আক্তার। পেশায় গৃহকর্মী। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে দুপুর পর্যন্ত মিরপুরের শেওড়াপাড়ার তিনটি বাসায় গৃহস্থালিকাজ করেন। দুপুরের পর আবার বের হন। আরও তিনটি বাসায় কমপক্ষে ছয় ধরনের কাজ শেষ করে যখন বাসায় ফেরেন, ততক্ষণে অস্তমিত সূর্য।

মাসের ২৫ থেকে ২৮ দিনই এমন রুটিন মেনে চলে জীবন। সব মিলিয়ে মাসে নাজমার আয় হয় আট থেকে নয় হাজার টাকা। ঘরভাড়া এবং দুই সন্তানের চাহিদা এই টাকায় পূরণ হয়। আর খাওয়াদাওয়ায় ব্যয় হয় স্বামীর আয়। সংসারে যে খরচ হয়, তার সিংহভাগের জোগান দেন নাজমা।

কিন্তু নাজমার এই আয় অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে কতটুকু? সংসারে আয়ের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী সমান হলেও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে নাজমার কাজের কী মূল্যায়ন?

নাজমার মতোই দেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত প্রায় ১৭ লাখ নারী।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত। গৃহকর্মে শ্রমের প্রায় ৯০ ভাগই নারীর। এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে এত দিনেও নিশ্চিত হয়নি অধিকার এবং কর্মপরিবেশ।

সরকারি পর্যায়ে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এখনও শেষ হয়নি নীতিমালা তৈরির কাজ। শুধু গৃহকর্মই নয়, সার্বিকভাবে নারীর গৃহস্থালিকাজের কোনো স্বীকৃতি নেই।

গৃহস্থালি কাজে বিপুল কর্মঘণ্টা ব্যয় করেও স্বীকৃতি পান না নারীরা। ছবি: সাইফুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘৯০ শতাংশের ওপরে নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। আশির দশকে শ্রমবাজারে নারীর অবদান ছিল ৮ শতাংশ। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৩২ শতাংশ।

‘কিন্তু সার্বিকভাবে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়, পরিচালক, বড় ধরনের উচ্চপদে নারীর অবস্থান এখনও অনেক কম। এ জন্য বাল্যবিয়ে বন্ধ, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। পারিবারিক বা গৃহস্থালি শ্রমের কারণে নারীরা মূলধারায় আসতে পারে না। এ জন্য নারীর কাজের সহায়কপদ্ধতি, পলিসি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

একটা স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট খুলে নারীর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমমূল্যের একটা আলাদা হিসাব করার প্রস্তাব দেন বিদিশা। তিনি বলেন, ‘এমন হিসাব করলে নারীর যে অবদান একেবারে আমাদের চোখের বাইরে থেকে যায়, সেটা বোঝা যাবে। এটা নারীর সম্মান বৃদ্ধিতে একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

তিনি বলেন, ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজগুলো শুধু স্বীকৃতি দিলে হবে না, পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যরা যেন ঘরের কাজে সমভাবে অংশ নেয়, সেটার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক কাজের চাপের কারণে নারীরা মূলধারার শ্রমবাজারে কাজ করতে চায় না।

‘ইচ্ছা করলেও নারীরা অন্য কাজ করতে পারে না। এ জন্য প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি খাতের অফিসে শিশু দিবাকেন্দ্র থাকা জরুরি। আর যেসব অফিসে শিশু দিবাকেন্দ্র আছে সেগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগের তুলনায় শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণই বেশি। সংসারে সচ্ছলতার জন্য নিজের জমানো অল্প কিছু অর্থ নিয়েই গ্রামের অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত একজন নারী তার ব্যবসা শুরু করার সাহস দেখাচ্ছে। তাদের এ শ্রমের মূল্যায়ন হচ্ছে না।’

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বড়সংখ্যক নারী

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন দেশের বিপুলসংখ্যক নারী। ছবি: সাইফুল ইসলাম

সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে জীবিকা নির্বাহ করছে দেশের শ্রমশক্তির বিশাল অংশ। মোট শ্রমশক্তির ৮৫ দশমিক ১ শতাংশেরই স্থায়ী কাজ নেই। দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে মোট শ্রমশক্তির মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। এর মধ্যে নারীশ্রমিক রয়েছেন ১ কোটি ৭১ লাখ ২১ হাজার।

কর্মক্ষেত্রে নারী

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গৃহস্থালিকাজ নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়ার পথে বড় বাধা। শ্রমবাজারে যোগ না দেওয়া নারীর ৮১ দশমিক ১০ শতাংশই এর জন্য ঘরের কাজের চাপকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে একই কারণে শ্রমবাজারে প্রবেশে বাধা পাচ্ছেন ৮ দশমিক ১০ শতাংশ পুরুষ। উপযুক্ত কাজ পেলে শ্রমবাজারে যোগ দিতে ইচ্ছুক এমন নারীর সংখ্যাও পুরুষের প্রায় দ্বিগুণ।

উপযুক্ত কাজ পেলে শ্রমবাজারে পুুরুষের চেয়ে নারীর আগ্রহ বেশি বলে জানিয়েছে বিবিএস। ছবি: সাইফুল ইসলাম

জিডিপিতে গৃহস্থালিকাজ

গৃহস্থালিতে নারীর যে কাজ দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না, সেই শ্রমের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য কত? বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক গবেষণা বলছে, গৃহস্থালিকাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে জিডিপিতে নারীর অংশ বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ।

শ্রম জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫-২৯ বছর বয়স্ক নারীর ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ নেই। অর্থাৎ তারা ঘরের ভেতরে সাংসারিক কাজে নিয়োজিত। একই বয়সের পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ। তাই শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং সার্বিক শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে না নিতে পারায় গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকার প্রবণতা বাড়ছে।

শ্রমশক্তিতে নারী

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬ ভাগের বেশি। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প, সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। তবে, এর মধ্যে মাত্র ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে কাজ করছে। তাদের মাসিক আয় গড়ে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকেরা জানান, শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও দৈনিক মজুরির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

নারীর কর্ম খাত

দেশের নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ কাজ করেন কৃষি খাতে। ছবি: সাইফুল ইসলাম

কৃষি খাত এখনও নারীর শ্রম নিয়োজনের প্রধান জায়গা। নারীরা যেসব খাতে শ্রম দেয়, তার মধ্যে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ হচ্ছে কৃষি। ৫ দশমিক ২ শতাংশ শিল্প খাতে এবং সেবা খাতে রয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। শিল্প খাতে নারীশ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে নারীশ্রমিক নিয়োগের সংখ্যা কমে গেছে। আশির দশকে গার্মেন্টস খাতে নারীশ্রমিকের হার ছিল প্রায় ৮০ ভাগ। তবে এখন তা নেই।

সিপিডির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতে নারীশ্রমিকের সংখ্যা ৬০ ভাগের বেশি না। নারীর বড় পদে না আসার কারণ দক্ষতার অভাব, পারিবারিক কাজের চাপ ও নিয়োগকর্তাদের মানসিকতা।

পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার গুডসের স্বত্বাধিকারী রেজবিন হাফিজ নিউজবাংলাকে বলেন, একজন নারী সামনে এগিয়ে যেতে পারবে কি না, সে বিষয়ে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তবে আগের চেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। নারীর নিজে কিছু করার ক্ষেত্রে অর্থায়ন সবচেয়ে বড় বাধা। নারীরা ক্ষুদ্র কোনো ব্যবসার জন্যও যেন সহজে অর্থ পেতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

‘তোর দ্বারা কিছু হবে না’

‘তোর দ্বারা কিছু হবে না’

বানী’স ক্রিয়েশনের স্বত্বাধিকারী তাহমিনা আহমেদ বানী। ছবি: নিউজবাংলা

বানী বলেন, ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে ভালো লাগত না। তাই সবাই বলত, তোর দ্বারা কিছু হবে না।’

‘হোম ইকোনমিকস কলেজে অ্যাপ্লায়েড আর্টে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে স্বামীর কাছে টাকা চাইতে হতো। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, টাকা না চাওয়ার জন্য কী করতে হবে? বিকল্প একটাই খুঁজে পাই তখন, নিজে কিছু করতে হবে।’

নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুর দিকের গল্প বলছিলেন বানী’স ক্রিয়েশনের তাহমিনা আহমেদ বানী।

কথা প্রসঙ্গে নিজের ছোটবেলার একটি গল্পও বলেন উদ্যোক্তা এই নারী।

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে ভালো লাগত না। তাই সবাই বলত, তোর দ্বারা কিছু হবে না।

‘বারবার এমন কথা শুনে মনের মধ্যে জেদ চেপে বসে। তৈরি হয় অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সকলের তাচ্ছিল্য থেকে স্থির করি, কিছু একটা করতে হবে।’

ইচ্ছাশক্তির জোরে বানী এখন বড় উদ্যোক্তা। তৈরি করেন বাহারি কেক। তবে বাজারে এখন যে ধরনের কেক পাওয়া যায়, তেমন না। বানীর কেকে রয়েছে ভিন্নতা।

২০১৩ সালে বানী তার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৭ সালে খিলগাঁও তালতলাতে চালু হয় প্রথম আউটলেট। বানী বলেন, ‘আগে মানুষের আস্থা তৈরি করেছি। তারপর আউটলেটে কার্যক্রম শুরু করি।’

বর্তমানে বানী’স ক্রিয়েশনের তিনটি আউটলেট রয়েছে। এগুলোতে কাজ করছেন ২২ জন।

বানী বলেন, ‘যেকোনো থিম কেকের অর্ডার কিংবা যেকোনো কাস্টমাইজড কেক যত বড়ই হোক না কেন, তা তৈরি করে দেয়া অসম্ভব না। একটা বাচ্চার জন্মদিনে সাধারণ কেক না হয়ে যদি তার উপযোগী ডিজাইন কেক হয়, তাহলে উৎসবে আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।’

বানীর একাডেমি
বানীর ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেখানে বেকিং, কুকিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

বানী তার মেয়ের জন্মদিনের কথা বলছিলেন। প্রথম জন্মদিনে খুব সাদাসিধে একটি কেক নিয়ে আসেন তিনি। পরে একটা ‘হামটি ডামটি’ পুতুল বানিয়ে কেকের ওপর বসিয়ে দেন। এতে বেড়ে যায় উৎসবের আমেজ। এরপর তিনি বিভিন্ন বইয়ে রেসিপি দেখে কেক বানাতে শুরু করেন। কেকের সঙ্গে পুতুল দিয়ে নিজেই ডিজাইন করা শুরু করেন।

এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রথমে বাসা থেকে কেক সরবরাহ করতাম। পরিবারের বা বন্ধুদের যেকোনো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে নিজের বানানো কেক নিয়ে যেতাম। সবার বাসায় এভাবে খাবার নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মার্কেটিং শুরু হয়। তখন সবাই এটা বাণিজ্যিকভাবে করার পরামর্শ দেয়। একটা সময় সবাই অর্ডার দেয়া শুরু করে।’

যতই দিন যাচ্ছে বড় হচ্ছে বানীর উদ্যোগ। বানী’স ক্রিয়েশন নামে খোলা হয়েছে ফেসবুক পেজ। সেখানে বিভিন্ন কেকের ছবি দেয়া আছে। প্রতিদিন একটি নতুন করে কেক বানান এবং তার ছবি তুলে ফেসবুকে পেজে দেন। দেড় মাস পর ফোনে মারমেইড ডিজাইনের প্রথম কেকের অর্ডার পান তিনি। এর থেকে অনলাইনে অর্ডার আসা শুরু হয়।

ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চাহিদা। স্বামী নাসিম আহমেদ নিপ্পন এবং বানী সিদ্ধান্ত নিলেন প্রফেশনাল একটি কোর্স করবেন। এক বছরব্যাপী ‘ব্রেড অ্যান্ড কুকিস’ তৈরির একটি কারিগরি কোর্স সম্পন্ন করলেন বানী। ইন্টার্নশিপ শুরু করলেন স্বনামধন্য বেকারিতে।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বানী’স ক্রিয়েশনে প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি করে অর্ডার আসতে শুরু করে। ক্রেতাও বাড়তে থাকে হু হু করে। কয়েক বছরের মধ্যে ফেসবুক পেজের সদস্য ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

কেকের সঙ্গে আরও অন্য কিছু যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে বলে জানান বানী।

বললেন, ‘আমার নিজস্ব একটা ইনস্টিটিউট আছে, যেখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এখানে বেকিং, কুকিং এসবের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটাকে আরও বড় পরিসরে পরিপূর্ণ ইনস্টিটিউট করতে চাই।’

করোনাভাইরাস মহামারিতে গত বছর অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান বানী। শুরুতে অনেক বড় বড় বুকিং ছিল, সেগুলো বাতিল হয়ে যায়। করোনার কারণে গ্রিন রোড ও পান্থপথ এ দুটি আউটলেট বন্ধ করতে হয়। কিন্তু তিনি আশাহত হননি। ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকলে তিনিও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

Bannis-Workers-NB
বানী’স ক্রিয়েশনের তিনটি আউটলেট রয়েছে। এগুলোতে কাজ করছেন ২২ জন। ছবি: নিউজবাংলা

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বানী বলেন, ‘উদ্যোক্তা হতে হলে আগে লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। আমি কী করতে চাই, সেই বিষয়টি ঠিক করা জরুরি। যেকোনো একটি বিষয় নিয়ে আগে শুরু করতে হবে।

‘ধৈর্য, সততা, অদম্য মনোবল আর সর্বোপরি ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে। তাহলে যে কারও পক্ষে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আগে ঠিক করতে হবে, কোন খাতের উদ্যোক্তা হব। যে কাজকে ভালোবাসব সেটা নিয়েই এগোতে হবে। উদ্যোক্তা হতে হলে অর্থায়ন সবচেয়ে বড় বিষয়। এ জন্য অল্প অল্প পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বানীর পরামর্শ, ‘কোনো কিছু নিয়ে তাড়াহুড়া করা যাবে না। আগে পথঘাট চিনতে হবে। তারপর কাজ শুরু করতে হবে।’

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

ঘরের কাজে হাত লাগাচ্ছে পুরুষেরাও

ঘরের কাজে হাত লাগাচ্ছে পুরুষেরাও

ঘরের কাজে নারীদের সাহায্য করছেন অনেক পুরুষ। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

২০১৭ সালে যেখানে নারী ও পুরুষের গৃহস্থালির কাজে সময় ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ১৯ ঘণ্টা, ২০১৮ সালে এই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭৫ ঘণ্টায়। ২০১৯ সালে এ ব্যবধান ৩ দশমিক ৪৩ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।

পুরুষের শ্রম মানে সংসারের আয়। বিনিময়মূল্য বা মজুরি ছাড়া কোনো পুরুষ শ্রম দেয় এমনটা এত দিন চিন্তাই করা যায়নি। বিপরীতে গৃহস্থালির কাজের দায় কেবল নারীর, যার কোনো পারিশ্রমিক নেই। এ থেকে আয় আসে না। সংসারের যাবতীয় কাজ নারীরাই করে যাবেন।

এই ছিল চিরকালীন মানসিকতা।

কিন্তু সময় বদলেছে। পুরুষের এই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। এখন পুরুষেরাও বাড়ির কাজে নারীর মতো বিনা মজুরির শ্রম দিচ্ছেন। পরিমাণ বিচারে তা অনেক কম হলেও পারিবারিকভাবে এ চর্চা এখন শুরু হয়েছে।

কিশোর, তরুণ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহরাঞ্চল বা গ্রামে পুরুষের মধ্যে ঘরের কাজে অংশ নেয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।

বাসাবাড়ি বা গৃহস্থালির কাজের তালিকায় রয়েছে রান্না করা, সন্তান লালনপালন এবং স্কুলে আনা-নেয়া, কাপড় পরিষ্কার, ঘর ধোয়ামোছা, বিছানা ঝাড়া, মশারি টাঙানো, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সেবা করার মতো বিষয়গুলো।

ঐতিহ্যগতভাবে সেবামূলক এসব কাজে নারীর অবদান একচ্ছত্র। যুগ যুগ ধরে তারাই মূলত পরিবারের সদস্যদের ভালোবেসে কোনো অর্থমূল্য ছাড়া এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সেবামূলক এই কাজগুলোকে পুরুষেরা এত দিন নারীর দায়িত্ব ভেবে এড়িয়ে চলতেন। খুব একটা মূল্যায়নও করতেন না। এখন সচেতন পুরুষেরা এসব সেবামূলক কাজের জন্য নারীর কষ্ট ও ত্যাগকে অনুধাবন করতে শুরু করেছেন। কিছুটা হলেও ভার তুলে নিচ্ছেন নিজেদের কাঁধে।

অনেকেই এখন বাইরের কাজে ব্যস্ততা সেরে ঘরে ফিরে সহায়তা দিচ্ছেন স্ত্রীকে, কেউ মা কিংবা বোনকে। সবকিছু দেখছেন ভালোবাসার দৃষ্টিতে। বয়সের পার্থক্য এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ফলে অনেকেই কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাসাবাড়ির জমে থাকা অনেক কাজ সারছেন নিজ হাতে।

গৃহস্থালির কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও জরিপে।

এ বিষয়ে অ্যাকশনএইড পরিচালিত জরিপে নারীর কাজে পুরুষের সহায়তা প্রদানের প্রবণতা বাড়ার সুস্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে।

অ্যাকশনএইডের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে নারীরা মজুরিবিহীন সেবামূলক কাজ করেছেন দৈনিক ৭ দশমিক ৭৮ ঘণ্টা। পুরুষেরা করেছেন ১ দশমিক ১ ঘণ্টা। ২০১৭ সালে একই কাজে নারীর সেই অবদান কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৫০ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। আর পুরুষের অবদান বেড়ে ২ দশমিক ৩৭ ঘণ্টায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থাৎ গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজে নারী-পুরুষের সময় ব্যয়ের ব্যবধান প্রতিবছর কমে আসছে। অর্থাৎ পুরুষেরা এ কাজে নিজেদের সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছেন।

২০১৭ সালে যেখানে নারী ও পুরুষের গৃহস্থালির কাজে সময় ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ১৯ ঘণ্টা, ২০১৮ সালে এই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭৫ ঘণ্টায়। ২০১৯ সালে এ ব্যবধান ৩ দশমিক ৪৩ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা জরিপে দেখেছি, গৃহস্থালির অবৈতনিক সেবামূলক কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বাড়ছে। তারা এ কাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখন ঘরের সেবামূলক কাজকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করতে শিখেছেন এবং এর পাশাপাশি নারীকেও সহযোগিতা দিচ্ছেন।’

এটি শুধু যে শহুরে পরিসরে ঘটছে তা নয়। রাজধানীর বাইরে জেলা বা থানা পর্যায়েও গৃহকাজে বাড়ছে পুরুষের অংশগ্রহণ।

তিনি বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে নারীদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন পুরুষেরাও। স্বামী গৃহস্থালি কাজের ভাগ নেয়ায় নারীরা বাড়তি আয়ের জন্য কাজের সময় পাচ্ছেন।

গৃহস্থালির সেবামূলক মজুরিবিহীন কাজে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে গবেষণা করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তার গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে, ভোর শুরু হওয়ার পর আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একজন নারী কীভাবে অবৈতনিক সেবামূলক কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে থাকেন। এ কাজ অবৈতনিক হওয়ায় মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তাদের শ্রম ও কর্মঘণ্টা হিসাব হচ্ছে না।

গৃহস্থালির কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে, এ সম্পর্কে ড. ফাহমিদা খাতুনের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা ঠিক, পুরুষের মানসিকতায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে সবার মধ্যে আসেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠরা এখনও আগের মানসিকতাই পোষণ করছেন। তারা এ সেবামূলক কাজগুলোকে এখনও নারীর দায়িত্ব ভেবে সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. ফাহমিদা বলেন, গৃহস্থালির সেবামূলক ও মজুরিবিহীন কাজে পুরুষ ভিড়তে শুরু করেছে, এটা ইতিবাচক দিক। তবে শতকরা কত ভাগ বেড়েছে, প্রকৃত তথ্য পেতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ এমন স্লোগানে নারীর অমূল্যায়িত কাজের স্বীকৃতির দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। কতটা অগ্রগতি হলো এ লড়াইয়ে, এমন প্রশ্ন রাখা হলে বেসরকারি এ সংস্থাটির কো-অর্ডিনেটর শাহানা হুদা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি, তাহলে বলব অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। পুরুষের মানসিকতার বড় পরিবর্তন ঘটেছে। একটা সময় বাপ-দাদারা পানিটুকুও ঢেলে খেতেন না। এখন পানি ঢেলে খাচ্ছেন, এমন মানুষ বহু মিলবে। এটা একটা উদাহরণ। নারীর কষ্ট লাঘব হয়, এমন অন্যান্য কাজেও পুরুষেরা এখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।’

তবে তথ্য-উপাত্তের দিক থেকে সেটি এখনও খুব বেশি নয় বলে মনে করেন শাহানা হুদা। তিনি বলেন, ‘কারণ এখনও নারী প্রতিদিন গড়ে ১২টির বেশি মজুরিবিহীন কাজ করছেন, পুরুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজের সংখ্যা মাত্র ২ দশমিক ৭টি।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ মতে, ১৯৮৩-৮৪ সালে বেতনভুক্ত কাজে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৭ দশমিক ৮ ভাগ এবং পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল ৮৯ দশমিক ৯ ভাগ। ২০১০ সালের হিসাবে এতে নারীর অবদান বেড়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বেতনভুক্ত কাজে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে অবৈতনিক কাজ হ্রাস পায়। অবৈতনিক কাজ সাধারণত গৃহস্থালিতেই হয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বাড়ছে। ফলে বেতনভুক্ত কাজেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প, সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। এর মধ্যে ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে উৎপাদনশীল বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। বাকিরা অনুৎপাদনশীল খাতে মজুরির বিনিময়ে কাজ করছে।

শাহানা হুদা বলেন, ‘গৃহকাজে নারী-পুরুষ সমতায় না এলেও অন্তত সমতার কাছাকাছি পরিবর্তন আমরা দেখতে চাই। যদিও এর জন্য আরও সময় লাগবে। আগামী প্রজন্ম হয়তো এটা দেখতে পাবে। সে আশাতেই আমরা কাজ করছি। সরকারও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে দরকার সমাজ সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জেন্ডার সহায়ক বাজেট বৃদ্ধি করে এ-সম্পর্কিত প্রকল্প চালু করা।’

আরও পড়ুন:
আসল পোড়াবাড়ির চমচমে চাই ধলেশ্বরীর গরু

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg