জুয়েলের ব্যাটিংয়ে কাঁপত মাঠ, গুলিতে পাকিস্তানিরা

পাকিস্তানের সাবেক টেস্ট অধিনায়ক আব্দুল হাফিজ কারদার (মাঝে) এর সঙ্গে দুই বাংলাদেশে ক্রিকেট চৌধুরী জুয়েল (বাঁয়ে) ও রকিবুল হাসান। ফাইল ছবি

জুয়েলের ব্যাটিংয়ে কাঁপত মাঠ, গুলিতে পাকিস্তানিরা

‘স্লগ সুইপটা সে দারুণ খেলত। ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে হাঁটু গেড়ে সুইপ মেরে দিত। এই শট খেলতে দারুণ চোখের দৃষ্টি আর সাহস প্রয়োজন। আমরা কিন্তু তখন ম্যাটিং উইকেটে খেলতাম। পাকিস্তান দলের ফাস্ট বোলাররাও খেলত তখন। সে সাংঘাতিক সাহসের সাথে এই শটটা খেলত।’

‘নাহ, হেভি আরাম লাগতেছে। দেশের জন্য রক্ত দেয়াও হইল, আবার জানটাও বাঁচল।’

বক্তব্যটি সিনেমার কোনো দুর্ধর্ষ নায়কের ডায়ালগ নয়, তবে এই নায়ক সিনেমার নায়কের চেয়েও ছিলেন দুর্ধর্ষ। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য, শহিদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল।

জুয়েল এই কথাটি বলেছিলেন বাড্ডার পিরুলিয়ায় পাকিস্তানি আর্মির মুখোমুখি হওয়ার পর। গুলি লেগে হাতের তিন আঙুলে জখম হয় জুয়েলের।

চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর জুয়েল বলেছিলেন, তার আঙুল তিনটি রাখতে। কারণ জুয়েল স্বপ্ন দেখতেন, স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে ব্যাটিংয়ে ওপেন করবেন।

জুয়েলের স্বপ্ন সত্যি হয়নি। আগস্টের শেষ দিকে সহযোদ্ধা আজাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। এরপর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। জুয়েল বাংলাদেশের হয়ে ওপেন করতে পারেননি।

‘লাশ পাইনি আমরা। খুঁজেছিলাম। পরে কোথাও লাশ পাইনি। এই দুঃখটা রয়েই গেল। আমার বন্ধুটাকে মাটি দিতে পারলেও কিছুটা ঋণ শোধ হতো আমাদের। মাটি দিতে পারলেও তো একটা সান্ত্বনা থাকত। যেখানেই থাকুক, হয়ত ভালোই থাকবে’, বলছিলেন জুয়েলের সতীর্থ রকিবুল হাসান।

‘শহিদের মর্যাদাই তো পাবে। ধর্মীয় যুদ্ধ বলি আর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধিকার যুদ্ধ, এটা আমাদের ধর্মেও তো আছে। শহিদের দরজা পায় ওরা’, যোগ করেন তিনি।

সেই রকিবুল মাত্র ১৮ বছর বয়সে পাকিস্তানি বঞ্চনার প্রতিবাদে ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে নেমে পড়েছিলেন মাঠে।

জুয়েলের সঙ্গে রকিবুলের পরিচয় ১৯৬৬ সালে, ক্রিকেটের মধ্য দিয়েই।

ঢাকার মাঠে ওপেনিং জুটি ছিল জুয়েল-রকিবুলের। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে সফর করার সময় তারা ছিলেন রুমমেট।

স্মৃতিচারণ করে রকিবুল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তখন আমি স্কুলে পড়ি; আজাদ বয়েজ ক্লাবে খেলি। প্র্যাকটিস করি। জুয়েল তখন মোহামেডানে, আজাদের হয়ে খুব কম খেলেছে। আমার থেকে সে বয়সে বড় ছিল। আমি আর জুয়েল ওপেনার ছিলাম ঢাকার মাঠে।

‘অল-পাকিস্তান ফাইনাল, ইস্ট পাকিস্তান বনাম লাহোর। ওই টিমে ইমরান খান ছিল। অনেক বড় বড় প্লেয়ার ছিল, যারা পরবর্তীতে পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলেছে। এভাবে আমরা পাকিস্তানে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলতে যেতাম। আমরা রুমমেট থাকতাম সবসময়। জুয়েল আমাকে অনেক সাপোর্ট দিত যেহেতু আমি ছোট ছিলাম।’

স্মৃতির পাতা উল্টে সাবেক এই ব্যাটসম্যান ফিরে যান ষাটের দশকে। তিনি জানান, জুয়েলের বদলেই পূর্ব পাকিস্তান দলে জায়গা পেয়েছিলেন রকিবুল। অথচ করাচির মাঠে ম্যাচের আগে রকিবুলকে ডেকে অনুশীলনে নিয়ে যান জুয়েল।

রকিবুল বলেন, “আমি যখন ইস্ট পাকিস্তান টিমে ঢুকি, জুয়েলকে সরিয়েই ঢুকি। একজন খেলোয়াড় যখন তার ক্যাটাগরির অন্য একটা খেলোয়াড়কে সরিয়ে দলভুক্ত হয়, তার মনে দুঃখ থাকে। কিন্তু অবাক হয়ে যাই যখন দেখি করাচির মাঠে জুয়েলই আমাকে বলল, ‘রকিবুল, তুমি প্র্যাকটিস করো নাই; ওয়ার্ম আপ করো নাই। টস হয়ে গেছে, আমরা ব্যাটিং করব আধা ঘণ্টা পরেই।’ সে আমাকে ব্যাট-প্যাড নিতে বলল, আমরা সাইড নেটে গেলাম, আমাকে বল করল। এ রকম স্পোর্টসম্যান স্পিরিট তার মধ্যে ছিল।”

ব্যাটসম্যান হিসেবে তো বটেই, ব্যক্তিগত জীবনেও দারুণ স্টাইলিশ ছিলেন জুয়েল। রকিবুল স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘সে খুবই সাহসী এবং স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান ছিল। শুধু খেলার ব্যাপারেই নয়, সবদিকেই সে খুবই ফ্যাশনেবল ছিল। ভালো কাপড়চোপড় পরতে পছন্দ করত।’

জুয়েলের স্লগ সুইপ ছিল বিখ্যাত। পেস বোলারদের বিপক্ষে নিয়মিতই তিনি এই শট খেলতেন বলে জানান রকিবুল।

‘স্লগ সুইপটা সে দারুণ খেলত। ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে হাঁটু গেড়ে সুইপ মেরে দিত। এই শট খেলতে দারুণ চোখের দৃষ্টি আর সাহস প্রয়োজন। আমরা কিন্তু তখন ম্যাটিং উইকেটে খেলতাম। পাকিস্তান দলের ফাস্ট বোলাররাও খেলত তখন। সে সাংঘাতিক সাহসের সাথে এই শটটা খেলত।’

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রকিবুল প্রথমে লুকিয়ে ছিলেন গোপালগঞ্জে। এরপর চলে যান ভারতে। সেখান থেকে জুয়েলের খবর পেলেও রকিবুলের আর দেখা হয়নি তার সঙ্গে।

“জুয়েলের সাথে আমার আর দেখা হয়নি। কিন্তু আমি জানতাম একটা অপারেশনে যেয়ে নৌকাতে তার হাতে গুলি লাগে। বেঁচে যায়, কিন্তু হাতে লাগে। ওই ব্যান্ডেজ করা অবস্থাতেই সে কিন্তু ধরা পড়ে দিলু রোডের বাড়িতে। পাকিস্তান আর্মিরা সন্দেহ করে, জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার হাতে কি হইছে?’”

তিনি বলেন, ‘নভেম্বর পর্যন্ত ওর খবর আমরা জানতাম, খোঁজ-খবরও দুয়েকটা নিছিলাম। যা হয় আরকি। বন্ধু-বান্ধব মারফত, চিঠি মারফত, উড়ো খবর। জুয়েল যে ধরা পড়ে গেছে, এই খবরও জানতাম।

‘নভেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আমরা জানতাম, ওরা বেঁচে আছে। ওদের শেরে-বাংলা নগরের কোথাও আটকে রেখেছে।’

ধরা পড়ার পর আর ফেরেননি জুয়েল। তার লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই হাহাকার এখনও তাড়া করে রকিবুলকে।

জুয়েল হয়ত অন্যলোকে বসে দেখছেন, মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে তার নামে বানানো স্ট্যান্ড। সেই মাঠে তার উত্তরসূরিদের উল্লাস।

আরও পড়ুন:
একাত্তরে প্রতিরোধের সাক্ষ্য দিচ্ছে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি
কিলো ফ্লাইট: মুক্তিযুদ্ধে আকাশ জয়ের গল্প
আজ হানাদার মুক্ত হয়েছিল মুন্সিগঞ্জ
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের নামে নিয়োগ, ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ

শেয়ার করুন

মন্তব্য