বিষণ্নতা কমাতে এক ঘণ্টা আগে উঠুন

বিষণ্নতা কমাতে এক ঘণ্টা আগে উঠুন

ভোরের আলো যত বেশি পাওয়া যাবে ততেই কমবে বিষণ্নতা। ছবি সংগৃহীত

‘আপনার দিনের উজ্জ্বলতাকে আরও দীর্ঘ করুন। একইভাবে দীর্ঘ হোক রাতের অন্ধকারও। ভোরে উঠুন, কফি খান। হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে কাজে যান। একই সঙ্গে সন্ধ্যা থেকে প্রযুক্তিনির্ভরতা কমিয়ে আনুন। এতে বিষণ্নতা কমবে। কমবে ঘুম নিয়ে দুশ্চিন্তাও।’

সূর্যের আলো বিষণ্নতা কমায়—এ মত নতুন নয়। তবে এ মতের ওপর যখন গবেষণার সিলমোহর পড়ে, তখন নিঃসন্দেহে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

গবেষকদের দাবি, সকালে ঘুম থেকে এক ঘণ্টা আগে উঠলে বিষণ্নতা অন্তত ২৩ শতংশ পর্যন্ত কমে।

প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষের ঘুমের অভ্যাস নিয়ে চার বছর ধরে কাজ করে এ তথ্য জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডার, ব্রড ইনস্টিটিউট অফ এমআইটি এবং হার্ভার্ডের গবেষকরা।

জামা সাইকিয়াট্রি সাময়িকীতে সম্প্রতি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনকেই মানুষের ঘুমের অভ্যাসের সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্কের ওপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা হিসেবে মনে করা হচ্ছে।

চলমান করোনা মহামারি মানুষের কাজের এমনকি শিশুদের স্কুল করার সময়ের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলেছে। পরিস্থিতির কারণে বেশির ভাগ মানুষই এখন রাতজাগা পাখি এবং একই সঙ্গে বিষণ্নতায় ভুগছেন।

এই প্রতিবেদনের জ্যেষ্ঠ লেখক ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডারের সহযোগী অধ্যাপক সেলিন ভেটার বলেন, ‘মেজাজ ও ঘুমের সময়ের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি আমাদের সবারই জানা। প্রশ্ন হচ্ছে, উপকার পাওয়ার জন্য আমাদের কতটা সময় আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে? বা কখন ঘুমাতে যেতে হবে?

‌‘আমাদের গবেষণা বলছে, সাধারণত যে সময় আমরা ঘুম থেকে উঠি, তার এক ঘণ্টা আগে উঠলেও বিষণ্নতায় ভোগার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।’

অতীতে করা গবেষণা থেকে দেখা যায়, যারা দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন, তারা ভোরে ঘুম থেকে ওঠা মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ বিষণ্নতায় ভোগেন। কতটা সময় ঘুমালেন তা দিয়ে কিছু আসে যায় না।

২০১৮ সালে ভেটার নামে এক সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভোরে ঘুম থেকে উঠলে বিষণ্নতার মাত্রা ২৭ শতাংশ কমে যায়। ৩২ হাজার নার্সের ওপর চার বছর ধরে এ গবেষণা চালানো হয়। কিন্তু সময়ের সুস্পষ্ট হিসাব না থাকায় এ গবেষণাটিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ঠিক এ বিষয়টি নিয়েই সর্বশেষ গবেষণাটিতে কাজ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের গ্র্যাজুয়েট ইয়াস ডগলাস বলেন, জেনেটিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লক জিন নামে পরিচিত পিইআর২ মানুষের ঘুমের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে। এই জিনের প্যাটার্ন অনেকটা প্রকৃতির ঘড়ির মতোই। এর বিরুদ্ধে গেলেই স্বাভাবিকভাবেই বিরোধ হয়। যার ফল বিষণ্নতা।

গবেষকরা সাড়ে আট লাখ মানুষের ওপর এই গবেষণাটি করেন। এর মধ্যে ৮৫ হাজারকে সাত দিনের জন্য স্লিপ ট্র্যাকার পরিয়ে দেয়া হয়। আড়াই লাখ মানুষ তাদের ঘুমের অভ্যাস নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেন। এগুলো দিয়েই ঘুম ও জেগে ওঠার ওপর জিনের প্রভাব অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়।

আর এই গবেষণা বলছে, সকালে যত দ্রুত বিছানা ছাড়া যাবে, বিষণ্নতার ঝুঁকি ততটাই কমবে। এক ঘণ্টা আগে উঠলে ঝুঁকি কমবে ২৩ শতাংশ।

হিসাবটি সহজ, যে ব্যক্তি ১টায় ঘুমাতে যান, তিনি যদি রাত ১২টায় ঘুমাতে যান এবং এক ঘণ্টা আগে ওঠেন, তার বিষণ্নতায় ভোগার ঝুঁকি কমবে ২৩ শতাংশ। ঘুমাতে যাওয়ার সময় ১১টায় নামিয়ে আনা যায়, একই সঙ্গে ওঠার সময়ও যদি আরও এক ঘণ্টা পেছানো যায়, তাহলে ঝুঁকি কমবে ৪০ শতাংশ।

বলা হয়ে থাকে, সূর্যের আলো মন ভালো করে দেয়। যারা ভোরে ওঠেন, তারা অনেক বেশি সময় এ আলো পান। তাদের হরমনের ওপর এর ছাপ পড়ে। যার প্রভাব পড়ে তাদের মেজাজে।

ডগলাস বলেন, ‘আমাদের সমাজ ভোরে ওঠা মানুষদের দেখতে পছন্দ করে। যারা দেরিতে ওঠেন তারা বিষয়টি নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন।

‘আপনার দিনের উজ্জ্বলতাকে আরও দীর্ঘ করুন। একইভাবে দীর্ঘ হোক রাতের অন্ধকারও। ভোরে উঠুন, কফি খান। হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে কাজে যান। একই সঙ্গে সন্ধ্যা থেকে প্রযুক্তিনির্ভরতা কমিয়ে আনুন। এতে বিষণ্নতা কমবে। কমবে ঘুম নিয়ে দুশ্চিন্তাও।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মধু ছেড়ে মাংস খাওয়া শিখছে মৌমাছি!

মধু ছেড়ে মাংস খাওয়া শিখছে মৌমাছি!

মাংস খেতে শকুনি মৌমাছির মুখে গজিয়েছে দাঁত। ছবি: সংগৃহীত

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সম্পূর্ণ মাংসাশী মৌমাছির খোঁজ পেয়ে রীতিমতো বিস্মিত বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, মধু সংগ্রহের প্রবল প্রতিযোগিতা এড়াতেই সম্ভবত এমন বিবর্তন। এ ধরনের মৌমাছির মুখে মধু শুষে নেয়ার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে গজিয়েছে তীক্ষ্ণ দাঁত।

ফুলের সঙ্গে মৌমাছির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা সবাই আমরা জানি। ফুল মধুর বিনিময়ে মৌমাছির গায়ে জড়িয়ে দেয় রেণু, সেই রেণু ছড়িয়ে যায় দূরের কোনো ফুলে, এভাবেই ঘটে পরাগায়ন।

তবে হাজারো বছরের এমন স্বাভাবিকতার মাঝে সবার অগোচরেই ঘটছে ছন্দপতন। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, ফুলের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠছে মৌমাছির কিছু প্রজাতি। এরা নিরামিষ জীবন ছেড়ে পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। আবার নিরামিষ-আমিষ দুই খাবারে আসক্ত মৌমাছিও পাওয়া গেছে।

পঁচা মাংস ছিড়ে খেতে কিছু মৌমাছির মুখে গজিয়েছে দাঁত, এমনকি হজমে গণ্ডগোল এড়াতে এদের পরিপাকতন্ত্রও প্রস্তুত।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সম্পূর্ণ মাংসাশী মৌমাছির খোঁজ পেয়ে রীতিমতো বিস্মিত বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, মধু সংগ্রহের প্রবল প্রতিযোগিতা এড়াতেই সম্ভবত এমন বিবর্তন। এ ধরনের মৌমাছির মুখে মধু শুষে নেয়ার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে গজিয়েছে তীক্ষ্ণ দাঁত।

প্রাণিবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণায়, কর্মী মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে ‌মৌ-রস সংগ্রহ করে। এই মৌ-রসকে ইংরেজিতে বলে নেকটার। নেকটার হলো ফুলের রেণুতে থাকা মিষ্টি তরল। মৌমাছির শরীরে দুটি পাকস্থলি রয়েছে। একটিতে সে মৌ রস জমা করে, আর অন্যটিতে স্বাভাবিক ভাবে খাবার পরিপাক হয়।

কর্মী মৌমাছি পেটে মৌ-রস নিয়ে এসে মৌচাকে জমা করে। মৌচাকের প্রকোষ্ঠে মধু ঢালার আগে এরা পেট থেকে মধু মুখে নিয়ে আসে। মধু প্রকোষ্ঠে ভরার পর ডানা ঝাপটে বাড়তি পানি বাষ্পীভূত করে দেয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন মধু ভালো রাখার জন্য মৌমাছি নিজের পেট থেকে মোম বের করে প্রকোষ্ঠের মুখ বাতাসরোধী করে আটকে দেয়।

তবে মাংসাশী মৌমাছির বেলায় এই রুটিনের কোনো বালাই নেই। এরা মাংস চিবিয়ে খেতে দক্ষ প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড (ইউসিআর) এর কীটতত্ত্ববিদ ডগ ইয়ানেগা বলছেন, ‘এরা এমন ধরনের মৌমাছি যারা উদ্ভিদজাত খাদ্য উৎসের বাইরে সম্পূর্ণ আলাদা উৎস ব্যবহারের জন্য বিবর্তিত হয়েছে। এটি মৌমাছির খাদ্যাভাসের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।’

দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে পাওয়া মাংসাশী মৌমাছির পরিপাক তন্ত্রে মাংস হজমের উপযোগী রূপান্তরও লক্ষ্য করেছেন বিজ্ঞানীরা।

খাবার হজমে সহায়তার জন্য প্রতিটি প্রাণীর পরিপাকতন্ত্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীব। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, মধু জাতীয় খাদ্য পরিপাকে মৌমাছির পরিপাকতন্ত্রে মূলত পাঁচটি অণুজীব সক্রিয়। প্রায় আট কোটি বছর ধরে এগুলোই প্রায় সব প্রজাতির মৌমাছির পরিপাকতন্ত্রে আধিপত্য বজায় রেখেছে। তবে মাংসাশী মৌমাছির পরিপাকতন্ত্রে পাওয়া গেছে একদম আলাদা ধরনের অণুজীব।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড এর গবেষক দলটির গবেষণাটি সম্প্রতি আমেরিকান সোসাইটি অফ মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশিত হয়েছে। মাংস খেতে সক্ষম মৌমাছিরা ‘ভালচার বি’ বা শুকুনি মৌমাছি নামে পরিচিতি পেয়েছে।

শকুনি মৌমাছির দেখা মিলেছে কোস্টারিকার বনে-জঙ্গলে। এদের আচরণ ও খ্যাদ্যাভাস পর্যবেক্ষণে ইউসিআর গবেষক দলটি গাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল মুরগির কাঁচা মাংসের টুকরো। দেখা গেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে শুকুনি মৌমাছিরা। মাংস ও মধু- দুটিই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এমন প্রজাতিও পাওয়া গেছে সেখানে।

গবেষক দলটি বলছে, মাংসাশী, সর্বভুক এবং কেবল মধু খাওয়া মৌমাছিদের পরিপাক তন্ত্রের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

ইউসিআর-এর কীটতত্ত্ববিদ কুইন ম্যাকফ্রেডরিক বলেন, ‘শকুনি মৌমাছির অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম অ্যাসিড সম্মৃদ্ধ ব্যাকটেরিয়ায় পরিপূর্ণ, সাধারণভাবে অন্যান্য মৌমাছিতে যা একেবারেই দেখা যায় না। শকুন, হায়েনার মতো প্রাণীর পরিপাকতন্ত্রেও এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া দেখা যায়। এসব ব্যাকটেরিয়া পঁচা মাংসের রোগজীবাণু থেকে খাদ্য গ্রহণকারী প্রাণীকে রক্ষা করে।’

শকুনি মৌমাছির অন্ত্রে পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার একটি হল ল্যাকটোব্যাসিলাস, যা দই জাতীয় খাবারে পাওয়া যায়। এই ব্যাকটেরিয়া শক্ত খাবার হজমে সাহায্য করে।

গবেষক দলের সদস্য জেসিকা ম্যাকারো বলছিলেন, ‘মৌমাছি কোনো প্রাণীর মৃতদেহ ছিড়ে খাচ্ছে, এটা ছিল ভয়ঙ্কর দৃশ্য। মৃতদেহের পঁচা মাংসে ক্ষতিকর অনেক জীবাণু থাকে, তবে এসব জীবাণুকে প্রতিরোধের ক্ষমতা শকুনি মৌমাছি অর্জন করেছে।’

কোস্টারিকায় পাওয়া শকুনি মৌমাছির বেশিরভাগ প্রজাতির হুল নেই। তবে আক্রমণ ঠেকাতে এদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কয়েকটি প্রজাতি কামড়ানোর শক্তি রাখে, আর সেই কামড়ে ত্বকে ফোস্কা পড়াসহ, ঘা তৈরি হতে পারে।

শেয়ার করুন

সন্তান জন্ম দিতে পারা রোবট উদ্ভাবন

সন্তান জন্ম দিতে পারা রোবট উদ্ভাবন

কম্পিউটার ডিজাইন মেনে বিশেষ এক ধরনের ব্যাঙের কোষ নতুন ধরনের প্রাণ তৈরি করেছে। অতি ক্ষুদ্র এই জীবসত্তা (অর্গানিজম) ক্ষুদ্র থালায় সাঁতার কাটতে পারে, নতুন একক কোষ খুঁজে বের করতে পারে ও এক সঙ্গে শত শত একত্রিত হতে সক্ষম।

টিকে থাকার প্রয়োজনে জীবের বংশবৃদ্ধি আবশ্যিক প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে এই প্রথম জৈবিক প্রজননে সক্ষম রোবট উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এই জীবন্ত রোবট ক্রমাগত তৈরি করতে পারে নিজের প্রতিলিপি।

যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানীর তৈরি রোবট এক ধরনের জেনোবট (জীবন্ত রোবট) । তবে রোবট বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা যা বুঝি এই জেনোবট ঠিক তেমন নয়। সুপার কম্পিউটারের ডিজাইন অনুসারে জৈবিক বংশবিস্তারের এক নতুন কৌশল কাজে লাগানো হয়েছে এ ক্ষেত্রে।

গবেষণাগারে এই ডিজাইন মেনে বিশেষ এক ধরনের ব্যাঙের কোষ নতুন ধরনের প্রাণ তৈরি করেছে। অতি ক্ষুদ্র এই জীবসত্তা (অর্গানিজম) ক্ষুদ্র থালায় সাঁতার কাটতে পারে, নতুন একক কোষ খুঁজে বের করতে পারে ও এক সঙ্গে শত শত একত্রিত হতে সক্ষম।

এক মিলিমিটারের চেয়েও ছোট (০.০৪ ইঞ্চি) জেনোবটগুলো শিশু জেনোবট তৈরি করতে পারে। এসব শিশু জেনোবট এরপর আবার নতুন কোষ খুঁজে বের করে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জেনোবট সনাতনি ধরনের রোবট যেমন নয়, তেমনি আবার কোনো প্রচলিত প্রাণীও নয়। কম্পিউটারে তৈরি ডিজাইন অনুসারে এটি কাজ করে এবং অতিক্ষুদ্র এই জীবসত্তার মাধ্যমে আগামীতে মানবদেহের অভ্যন্তরে ওষুধ পরিবহন সম্ভব।

গবেষণা দলের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্টের (ইউভিএম) কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও রোবটিকস বিশেষজ্ঞ জশুয়া বোনগার্ড বলেন, ‘সঠিক ডিজাইন করা গেলে জেনোবটগুলো নিজে থেকেই নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করবে।’

তাদের গবেষণার ফল গত ২৯ নভেম্বর প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।

জেনোবট তৈরিতে বেছে নেয়া হয়েছে আফ্রিকান ব্যাঙের প্রজাতি জেনোপাস লিভিসের বিশেষ ধরনের কোষ। এই ভ্রূণ কোষগুলো পরে ব্যাঙের ত্বকে পরিণত হয়।

গবেষণা দলের আরেক সদস্য ম্যাসাচুসেটসের টাফটস ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক মাইকেল লেভিন বলেন, ‘বিশেষ ভ্রূণকোষগুলো ব্যাঙাচি জন্মের ত্বক আবরণ তৈরি করে। এই কোষ শ্লেষাজাতীয় পদার্থের নিঃসরণ ঘটিয়ে ব্যাঙকে রোগজীবাণুর হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে। তবে ল্যাবরেটরিতে আমরা এদের নতুন একটি পরিস্থিতিতে রেখেছি। এগুলোর বহুকোষী বৈশিষ্ট্যকে নতুন ভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছি। এর ফলে কোষগুলো নতুন যা তৈরি করছে তা ত্বক থেকে একেবারে আলাদা।’

গবেষক দলের সদস্য টাফটস ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ডগলাস ব্ল্যাকিস্টন বলেন, ‘এতদিন মানুষের ধারণা ছিল, জীবনের বিস্তার বা বংশবৃদ্ধি কীভাবে ঘটে সে বিষয়ক সব রহস্য ভেদ করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই পরীক্ষা এমন কিছু পাওয়া গেছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।’

বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে গবেষক দলটি। অধ্যাপক মাইকেল লেভিন বলেন, ‘এই কোষগুলোতে ব্যাঙের জিনোম রয়েছে, কিন্তু এরা ব্যাঙাচিতে পরিণতা হওয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। ফলে এরা যৌথ বুদ্ধিমত্তা, নমনীয়তা প্রয়োগ করে অবাক করার মতো অনেক কিছু ঘটাতে সক্ষম।’
গবেষণায় দেখা গেছে, কম্পিউটারে ডিজাইন করা কোষগুলো নিজে থেকেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।

গবেষণা দলের প্রধান স্যাম ক্রিগম্যান বলেন, ‘ব্যাঙের এই কোষগুলো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করছে এক দম আলাদা পদ্ধতিতে। ব্যাঙের দেহে সাধারণভাবে প্রতিলিপি তৈরির চেয়ে এই প্রক্রিয়া একেবারে ভিন্ন।’

জেনোবটের জনক কোষ নিজে থেকেই ৩ হাজার কোষের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি বৃত্ত তৈরি করে।

ক্রিগম্যান বলেন, ‘এগুলো সন্তান তৈরি করতে পারে, কিন্তু এর পরই প্রক্রিয়াটির অবসান ঘটে। এই প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখার পদ্ধতিটি খুবই জটিল।’

জেনোবটের আকৃতি তৈরির জন্য গবেষণায় ডিপ গ্রিন সুপার কম্পিউটারে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রোগ্রামের নতুন ধরনের এলগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে। কোন আকৃতি বংশবিস্তারের জন্য উপযোগী সেটি জানতে ত্রিভূজ, চতুষ্কোণ, পিরামিড বা তারকাকৃতি তৈরি করা হয়েছে।

ক্রিগম্যান বলেন, ‘আমরা কম্পিউটারকে বলেছিলাম, জনকের আকৃতি ঠিক করতে। এআই কয়েক মাস চেষ্টার পর কয়েকটি অদ্ভূত ধরনের আকৃতি তৈরি করে, যার একটি দেখতে প্যাক-ম্যানের (ভিডিও গেইম চরিত্র) মতো। এটা সে সজ্ঞানে করেনি। এরপর ওই জনক থেকে সন্তান তৈরি হলো। তাদের থেকে আবার সন্তান ও তাদের থেকে আবারও। এক কথায় সঠিক ডিজাইনের কারণে বংশবিস্তার কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত চলেছে।’

বোনগার্ড বলেন, ‘আমরা আবিষ্কার করেছিম অর্গানিজম বা কোনো কোষীয় জীবন ব্যবস্থার মধ্যে এমন সব জায়গা রয়েছে যার সম্বন্ধে আমরা জানতাম না। এর আগে আমরা হাঁটতে পারে এমন রোবট পেয়েছি। সাঁতরাতে পারে এমন রোবট পেয়েছি। আর এই গবেষণায় পেলাম এমন কিছু জেনোবট যারা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।’

নতুন জেনোবটের সম্ভাবনা নিয়ে বোনগার্ড বলেন, ‘নতুন ওষুধ তৈরি করা বা পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিষ্কার করার কাজে এ যন্ত্রগুলোকে ব্যবহার করা যাবে। আমরা চাই যে হারে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, ঠিক একই হারে প্রযুক্তিগত সমাধান খুঁজে বের করতে।’

শেয়ার করুন

‘শি’-কে ভয়, তাই এলো ‘ওমিক্রন’!

‘শি’-কে ভয়, তাই এলো ‘ওমিক্রন’!

গ্রিক বর্ণমালার অক্ষরগুলো দিয়ে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের নামকরণ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

গ্রিক বর্ণমালার ক্রমানুসারে ১২টি অক্ষরের নামে করোনার ১২টি ভ্যারিয়েন্টের নামকরণের পর হঠাৎ করেই দুটি অক্ষর বাদ দিয়ে পঞ্চদশ অক্ষর ‘ওমিক্রন’ বেছে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর এতেই তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

কোভিড ১৯ এর জন্য দায়ী করোনাভাইরাসের সবশেষ ধরন ‘ওমিক্রন’ নিয়ে উদ্বেগ এখন সারা বিশ্বে।

আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণের দেশ বতসোয়ানায় প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ভ্যারিয়েন্টের শুরুতে নাম ছিল ‘বি.১.১.৫২৯’, তবে শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় ‘ওমিক্রন’।

ভাইরাসটির গতি-প্রকৃতি এবং এটি কতটুকু ক্ষতির কারণ হতে পারে- তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নতুন ধরনটির নাম নিয়েও চলছে হৈ চৈ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে করোনাভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার প্রথম দিকে এটি ‘২০১৯ নভেল করোনাভাইরাস’ হিসেবে পরিচিতি পায়। মানবদেহে সংক্রমিত যে কোনো নতুন করোনাভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নামকরণের আগে ‘নভেল (নতুন) করোনাভাইরাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটির নাম দেয় সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনাভাইরাস টু (সার্স-কভ-২)। এর পর একের পর এক ভাইরাসটির নতুন ধরন তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর নতুন বৈজ্ঞানিক নামও দিতে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তবে এসব নাম বেশ জটিল হওয়ায় ভাইরাসের পরবর্তী ধরনগুলো এদের পরিচিতি পেতে থাকে প্রথম শনাক্ত হওয়া দেশের নামে। যেমন বি.১.৬১৭.২ ভ্যারিয়েন্টটি ভারতীয় ধরন হিসেবে সংবাদ মাধ্যমে পরিচিত পায়। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের সহজ নামকরণের উদ্যোগ নেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এই নামকরণে একটি পদ্ধতিও ঠিক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এক্ষেত্রে গ্রিক বর্ণমালার অক্ষরগুলো দিয়ে শুরু হয় নামকরণ।

২৪ অক্ষরের গ্রিক বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘আলফা’। সে অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া একাধিক মিউটেশনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া করোনার ‘বি.১.১.৭’ ধরনটির নাম দেয়া হয় ‘আলফা’। এরপরে ২০২০ সালেই সাউথ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া আরেকটি উচ্চ মিউটেশনের ধরনের (বি.১.৩৫১) নামকরণ হয় গ্রিক বর্ণমালার দ্বিতীয় অক্ষর ‘বেটা’ নামে।

ব্রাজিলে প্রথমবার শনাক্ত হওয়া আরেকটি ধরনের (পি.১) নাম রাখা হয় ‘গামা’। এটি গ্রিক বর্ণমালার তৃতীয় অক্ষর। চতুর্থ অক্ষর ‘ডেল্টা’ নামকরণ করা হয় ভারতে শনাক্ত হওয়া ধরনটির (বি.১.৬১৭.২)।

এভাবে ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শনাক্ত হওয়া ধরনগুলোর নাম রাখা হয়েছে- এপসাইলন, জেটা, এটা, থেটা, আইওটা, কাপা, ল্যাম্বডা, মিউ। এগুলোর মধ্যে ল্যাম্বডা ছাড়া বাকিগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা কম হওয়ায় খুব বেশি আলোচনায় আসেনি।

এভাবে গ্রিক বর্ণমালার ক্রমানুসারে ১২টি অক্ষরের নামে করোনার ১২টি ভ্যারিয়েন্টের নামকরণের পর হঠাৎ করেই দুটি অক্ষর বাদ দিয়ে পঞ্চদশ অক্ষর ‘ওমিক্রন’ বেছে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর এতেই তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

ওমিক্রনের আগে পাশ কাটিয়ে যাওয়া গ্রিক অক্ষর দুটি হলো- নু এবং শি।

অনেকের অভিযোগ, চীনা প্রেসিডেন্ট চিনপিং-এর পারিবারিক উপাধি শি হওয়ার কারণেই এই অক্ষরটিকে এড়িয়ে গেছে সংস্থাটি।

এক বিবৃতিতে বিষয়টি স্বীকারও করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের বক্তব্য হলো, ‘শি’ শব্দটি পারিবারিক উপাধি হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করেন, তাই এটি বাদ দেয়া হয়েছে। আর ‘নু’ এর উচ্চারণ ইংরেজি শব্দ ‘নিউ’ এর সঙ্গে মিলে যায় বলে, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য অক্ষরটি বাদ দেয়া হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, যে কোনো নতুন রোগের নাম নির্ধারণে তারা খুবই সতর্ক থাকেন, যাতে এই নাম কোনো সংস্কৃতি, সমাজ, জাতি, অঞ্চল বা গোষ্ঠীর জন্য বিব্রতকর না হয়।

তবে ‘শি’ এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে রাজনীতি রয়েছে বলে তীর্যক মন্তব্য ছুড়ছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর এক টুইটে লিখেছেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের কম্যুনিস্ট পার্টিকে এতটাই ভয় পেলে তারা পরে কীভাবে বিশ্বাস করবে যে, দেশটি একটি মহামারিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে।’

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ট্রাম্প জুনিয়র টুইটে লিখেছেন, ‘আমি যতদূর জানি, শি ভ্যারিয়েন্টই হলো করোনার আসল ভ্যারিয়েন্ট।’

প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেণী নামে এক ভারতীয় রাজনীতিক লিখেছেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের নাম নিতে ভয় পায়। কিন্তু তারা ভারত আর সাউথ আফ্রিকাকে দোষারোপ করতে এক পা সবসময় বাড়িয়ে রাখে।’

শেয়ার করুন

ভাঙা প্রেমে কেন ভেঙে যায় বুক?

ভাঙা প্রেমে কেন ভেঙে যায় বুক?

ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। বিরহ এমন এক আসক্তি জন্ম দিতে পারে, যার মাত্রা কোকেইনে আসক্তির মতোই।  

প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার দুদিনের মাথায় নতুন প্রেমে জড়ানোর উদাহরণ আজকাল অফুরন্ত।

বিচ্ছেদের পর অনেকে খুব সহজে সব ভুলে যেতে পারেন। কেউ কেউ আবার নিয়মিত বিরতিতে সঙ্গী বদলকে গৌরবজনকও মনে করেন।

তবে সবাই তো আর এমন ‘পেশাদার’ প্রেমিক বা প্রেমিকা নন, কেউ কেউ এখনও আছেন ভীষণ আটপৌঢ়ে। তাদের কাছে প্রেম ভেঙে যাওয়া মানে সব কিছু ‘শেষ হয়ে’ যাওয়া।

শুধু পুরোনো দিনের ঢাকাই সিনেমার বিবাগি প্রেমিক নয়, বাস্তব জীবনেও ব্যর্থ প্রেমের হাহাকারের নজির অসংখ্য।

ভালোবাসা হারানোকে সহজে মেনে নিতে পারেন না অনেকেই। বুকে একরাশ ব্যথা নিয়ে বিষাদে কাতর কেউ কেউ বুক পকেটে আগলে রাখেন প্রাক্তনের ছবি। কেউ কেউ নানান উপলক্ষ্য ধরে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। আবার কারও কাছে একেবারেই তুচ্ছ মনে হয় জীবন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। বিরহ এমন এক আসক্তি জন্ম দিতে পারে, যার মাত্রা কোকেইনে আসক্তির মতোই।

বিচ্ছেদের পরেও প্রাক্তন প্রেমিক/প্রেমিকার প্রতি কেনো মানুষের তীব্র আকর্ষণ- সেটি জানতে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রুটগার্স ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যানথ্রপলজির অধ্যাপক হেলেন ই. ফিশার ও তার কয়েক সহকর্মী।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সবারই ছিল ব্রেক আপের অভিজ্ঞতা। তাদের একটি লিফলেট দেয়া হয়, যেখানে প্রশ্ন ছিল, ‘প্রেমে বিচ্ছেদের পর কি প্রাক্তনকে ভুলতে পারছেন?’

অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই জানান, তারা প্রাক্তনের কাছে ফিরে যেতে চান এবং ব্রেক আপের চাপ সামাল দিতে পারছেন না। এদের অনেকেই মানসিক বিষাদের মাত্রা সামলাতে না পেরে মদ্যপান বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, মন খারাপ এবং ডুকরে কান্না ছিল নিয়মিত ঘটনা। অনেকে প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছিলেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেমে প্রত্যাখ্যানের ঘটনা কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার মতো গভীর আবেগ জন্ম দিতে পারে মনের মাঝে। অনেক ক্ষেত্রে এটি তীব্র মানসিক হতাশার জন্ম দেয়, যেটি হত্যা বা আত্মহত্যার মতো ঘটনাতেও গড়াতে পারে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তাদের প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার ছবি দেখানো হয়। পাশাপাশি দেখানো হয়েছে, তাদের পরিচিত কোনো মানুষের ছবি।

দেখা গেছে, দুই ধরনের ছবি দেখার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের মনোসংযোগের মাত্রা ছিল আলাদা।

অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা প্রেমকে একটি ‘লক্ষ্য অর্জনভিত্তিক আবেগ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের বাকি সব আবেগের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক এতটা নিবিষ্টভাবে কাজ করে না।

ফিশার ও তার সহকর্মীরা দেখেছেন, সাবেক প্রেমিক/প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে থাকা এবং কোকেইন সেবনের তীব্র ইচ্ছার মধ্যে একটি স্নায়বিক সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে একটি হাইপোথিসিস হলো, প্রেমে প্রত্যাখ্যানও এক ধরনের প্রবল আসক্তির জন্ম দিয়ে থাকে।

তীব্র আসক্তি কি ‘অসুস্থতা’?

প্রেমের ক্ষত কী করে দূর করা হয়, সে বিষয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ডাকোটা স্কুল অফ মেডিসিনের ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্সের অধ্যাপক এম. সানচেস। তার সঙ্গে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস হেলথ সায়েন্স সেন্টারের ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্সের অধ্যাপক ভি.পি জন।

‘ট্রিটমেন্ট অফ লাভ অ্যাডিকশন: কারেন্ট স্ট্যাটাস অ্যান্ড পারসপেক্টিভ’ শিরোনামে ২০১৯ সালে প্রকাশিত তাদের গবেষণাপত্রে প্রাক্তনের প্রতি মাত্রাছাড়া আসক্তিকে এক ধরনের ‘মানসিক ব্যাধি’ বলা হয়েছে।

সানচেস ও জন ‘অসুস্থ ভালোবাসা’র ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন থাকে, যেখানে সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট, মাত্রাছাড়া ও তীব্র আগ্রহ দেখা যায়। এর ফলে মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান এবং অন্য আর সব কিছুতে তার আগ্রহ শূন্যে নেমে আসে। আচরণগত বিভিন্ন পরিবর্তনও আসে অতি বিরহীর জীবনে।

এই গবেষকেরা বলছেন, অনেকেই বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবন ও মানসিক তীব্র দহনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না।

বিচ্ছেদ ব্যথা সামলাবেন কী করে

ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করা যখন এত কঠিন তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে, হৃদয়ে ক্ষত সারানোর উপায় কী?

মন গবেষকদের মতে, বিচ্ছেদ যন্ত্রণাদায়ক হলেও এটি হৃদয়কে অন্যান্য সম্পর্ককে বিবেচনায় নেয়ার পথ খুলে দিতে পারে। ফলে বিচ্ছেদ শুধু হতাশাই তৈরি করে না, উন্মোচন করে সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়।

তাই প্রাক্তনের পেছনে অযথা ঘুরঘুর না করে নিজেকে সামলাতে শিখুন। এছাড়া অন্য উপায়ের মধ্যে রয়েছে ব্যস্ত থাকা, বন্ধু- পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো এবং সারাক্ষণ দুঃখের গান না শুনে মন চনমনে রাখা কাজে নিজেকে জড়িত করা।

সবচেয়ে ভালো ওষুধ হচ্ছে সময়। সময়ের সঙ্গে মানুষের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, ধারণা বদলায় এবং আবেগের মাত্রা হালকা হতে থাকে। সেই সময়কে আসতে দিন, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবুন এবং নতুন কোনো সম্পর্কের জন্য তৈরি করে নিন।

শেয়ার করুন

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করতে চুমুর বিকল্প নেই। শিল্প, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে তাই বারবারই এসেছে চুমুর জয়গান।

বিভিন্ন গবেষণাতেও এসেছে, সুখী জুটির পেছনে চুমুর সঙ্গোপন ভূমিকা। বলা হয়ে থাকে, দাম্পত্য সম্পর্ক ফিকে হয়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইলে নিয়মিত চুমু খাওয়া ভুলে গেলে চলবে না।

এটা তো গেল সম্পর্কের আকর্ষণ ধরে রাখতে চুমুর টোটকা; বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্যও দীর্ঘ ও নিয়মিত চুমু খাওয়া প্রয়োজন। এটি সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বজায় রাখার পাশাপাশি আপনাকে সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে।

বিষয়টি ঘেঁটে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোন স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশনসের অধ্যাপক কোরি ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণা চালিয়েছেন। ৫২ জোড়া বিবাহিত ও অবিবাহিত জুটিকে বেছে নিয়ে তারা যাচাই করেছেন চুমু খাওয়ার দৃশ্যমান বা পরিমাপযোগ্য কোনো সুবিধা আছে কিনা।

ফ্লয়েডের দল আগে থেকেই জানতেন, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুমুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ফলে তারা সম্পর্ক জোরদারে চুমুর প্রয়োজনীতা নিয়ে মাথা ঘামাননি; গবেষণায় দেখা হয়েছে, সুস্বাস্থ্যের উন্নতিতে চুমুর অবদান কী।

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চুমুর সময়ে লালা বা থুতু বিনিময়ে মনোনিউক্লিওসিস (কিসিং ডিজিজ) ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তবে ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা চুম্বনের এই ঝুঁকির বাইরে উপকারিতাই বেশি খুঁজে পেয়েছেন।

তারা দেখেছেন, নিয়মিত চুমু খাওয়ার অভ্যাস অ্যালার্জির বিরুদ্ধে দেহের ইমিউন সিস্টেমকে তাতিয়ে তোলে। তার চেয়েও বড় কথা, মানসিক চাপ এক নিমিষে কমিয়ে দেয় গভীর ও দীর্ঘ চুমু।

স্নায়ুতন্ত্রের প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমকেও চাঙা করে তোলে চুম্বন। সহজ কথায় প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম হলো স্নায়ুতন্ত্রের এমন কার্যকলাপ, যা আরামদায়ী বা নিশ্চিন্ত থাকার সময়ে দেহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় থাকা মানেই হলো বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ কমে যাওয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে বিদ্যমান সিবাম নামের বিশেষ একটি পদার্থ চুমু খাওয়ার সময় সঙ্গীর দেহে পরিবাহিত হতে পারে। আর এই সিবাম মস্তিষ্ককে বন্ধন ও ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ রাসায়নিক সিগন্যাল দেয়।

চুমুর আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বেরিয়ে এসেছে গবেষণায়। দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

গবেষণার সময় চুমু খাওয়ার অনুমতি পাওয়া যুগলেরা জানিয়েছেন তারা কম চাপ অনুভব করছেন ও নিজেদের শরীরও বেশ ঝরঝরে লাগছে। এমনকি পরিমাপ করে দেখা গেছে তাদের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমেছে।
চুমু খেতে পারা গ্রুপের যুগলেরা গবেষণা চলার সময়ে বেশি ব্যায়াম করেছেন, কম ঝগড়া করেছেন, তর্ক করে সময় অপচয়ের আগ্রহও ছিল কম। একে অপরকে আরও ভালো বুঝতে পেরেছেন এই যুগলেরা।

আর বলাই বাহুল্য, চুমুবঞ্চিত যুগলদের ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল একদম উল্টো।

শেয়ার করুন

কষ্ট পেলেও বিভা কেন হাসেন?

কষ্ট পেলেও বিভা কেন হাসেন?

মানুষ সব সময় আনন্দের কারণে হাসে না, শোক বা কষ্টের সময়েও হাসির ছাপ পড়তে পারে মুখে। ছবি: নিউজবাংলা

যতই লোকনিন্দা হোক, কঠিন চাপের মুহূর্তে হেসে ফেলা সব সময় কিন্তু খারাপ নয়। বরং কখনও কখনও এটি আমাদের ভালো থাকার জন্যই প্রয়োজন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার কাইনসিওলজি, স্পোর্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অনুষদের অধ্যাপক বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘আমার মনে হয় এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে হালকা হওয়ার জন্য বেশি বেশি হাসা প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতিতে হাসি এক ধরনের ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।’

কথায় কথায় হাসিতে ভেঙে পড়া নুসরাত জাবীন বিভাকে নিয়ে অফিসের সহকর্মীদের রসিকতার কোনো শেষ নেই। কাজের মাঝে বিভার এই হাসির দমক মাতিয়ে রাখে সবাইকে।

বিভাও চান আজীবন এভাবে হেসে যেতে, তবে এত হাসি নিয়ে খানিকটা দুঃখবোধও আছে এই তরুণীর। একবার পরিচিত এক নারী তার কষ্টের কথা বলছিলেন, সেই কথা কানে পৌঁছানোর আগেই বিভার মুখে ছড়িয়ে পড়ে স্বভাবসুলভ হাসি। কয়েক বছর আগের সেই ঘটনা মনে করে এখনও বিব্রত হন বিভা।

বিজ্ঞান বলছে, মানুষ সব সময় আনন্দের কারণেই হাসে না। তীব্র শোক বা কষ্টের সময়েও অট্টহাস্যে ফেটে পড়েন অনেকে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, বিভ্রান্তি, এমনকি বিব্রতবোধের অনুভূতি থেকেও হাসির ছাপ পড়তে পারে মুখে।

মৃত মানুষের দাফনের সময় শোকাবহ পরিবেশেও কেউ হেসে ফেলেছেন, এমন নজির অসংখ্য। তবে এই হাসি মোটেই আনন্দের নয়, বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুঃখের হাসিও মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং এ ধরনের ঘটনা হরহামেশা ঘটে আশপাশে।

হাসিকে সাধারণভাবে একটি মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। মানুষ জন্মের তিন মাস বয়সেই হাসতে শেখে। এমনকি কোনো কোনো গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, গর্ভের শিশুর মুখমণ্ডলেও হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

নবজাতকের মুখে কথা ফুটতে শুরুর আগেই হাসির রেখা দেখা যায় কেন- তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, হাসি সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কথার চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে। এটি এক জনের সঙ্গে আরেক জনের সম্পর্কের প্রাথমিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। গোমড়ামুখো মানুষের চেয়ে তাই হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা সমাজে অনেক বেশি।

তবে হাসি অনেক সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। শোকাবহ বা কষ্টের মুহূর্তেও কেন অনেকে হাসেন তা নিয়ে ১৯৬০ এর দশকে একটি গবেষণা করেছিলেন মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্রাম। মিলগ্রাম অর্থের বিনিময়ে কিছু স্বেচ্ছাসেবক বেছে নিয়ে তাদেরকে ‘শিক্ষক’ মনোনীত করেছিলেন। এই শিক্ষকদের দায়িত্ব ছিল কিছু ‘শিক্ষার্থীকে’ প্রশ্ন করা। তবে শিক্ষার্থীরা আসলে ছিলেন একেকজন অভিনেতা, যা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবকদের অজানা ছিল।

গবেষণার সময় বলা হয়েছিল, শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের ভুল উত্তর দিলে তাদের ১৫ থেকে ৪৫০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক দেয়া হবে। তবে বাস্তবে বিদ্যুতের তারে কোনো বিদ্যুৎপ্রবাহ ছিল না। স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকেরা প্রশ্ন শুরুর পর একের পর এক ভুল উত্তর দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা (অভিনেতা)। এসব ভুলের জন্য তাদের দেহে শিক্ষকেরা বিদ্যুতের তার স্পর্শ করলে তারস্বরে অভিনেতারা চিৎকার শুরু করেন। এটি যে অভিনয় সেটি মোটেই বুঝতে পারেননি স্বেচ্ছাসেবকেরা।

এই গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৫ ভাগ স্বেচ্ছাসেবক কিছুক্ষণ পরেই শিক্ষার্থীদের ‘বৈদ্যুতিক শক’ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে ৬৫ ভাগ শকের মাত্রা বাড়াতে আগ্রহী ছিলেন। শিক্ষার্থীরা যখন আর্ত চিৎকারের অভিনয় করছিলেন, তখন অনেক স্বেচ্ছাসেবক ভয়ঙ্কর মানসিক চাপে ভুগলেও তাদের মুখ জুড়ে ছিল বিব্রতকর হাসি।

মজার বিষয় হল, কথিত শিক্ষার্থীদেরকে ‘শক’ দেয়ার মাত্রা যত বাড়ছিল শিক্ষকদের মানসিক চাপজনিত হাসিও তত বাড়ছিল। এই গবেষণার ভিত্তিতে স্ট্যানলি মিলগ্রাম সিদ্ধান্তে পৌঁছান, অপ্রতিরোধ্য আবেগ মানুষকে একটি বিশেষ শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার দিকে পরিচালিত করে, আর সেই প্রতিক্রিয়া হলো- ‘হাসি’।

হাসি যতটা সহজ, ততটাই জটিল

হাসতে দেখলেই মানুষ আনন্দে আছেন, এমন ভাবনা মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলাই ভালো। একই ভাবে কান্নার ক্ষেত্রেও দুঃখের ধারণাও সব সময় ঠিক নয়। এ কারণেই প্রিয় মানুষকে কাছে পেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলার উদাহরণ অসংখ্য, আবার প্রিয়জনকে হারিয়ে হাহাকারের ভুলে অট্টহাসির ঘটনাও বিরল নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক কষ্টের মাঝে হাসির কারণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স জার্নালে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাদের নিবন্ধ

এই গবেষক দলটির দাবি, মানবীয় আবেগের সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ‘নাটকীয় বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া’র জন্ম দেয় অথবা শরীরে যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ামূলক সংকেতকে (হাসি-কান্না) উসকে দিতে পারে। যেমন লটারিতে লাখ টাকা জয়ের আনন্দে যেখানে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কথা সেখানে আপনি কখনও কখনও চোখ পানিতে ভাসিয়ে ফেলতে পারেন, আবার প্রেমিকার চলে যাওয়ার কষ্টের মাঝেও আপনি হো হো করে হেসে উঠতে পারেন।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষক দল বলছেন, দৃশ্যত এই ‘অস্বাভাবিক’ প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ হলো, অতিশক্তিশালী কিছু মানসিক উদ্দীপনা, যার প্রকাশ ঘটে অনিয়ন্ত্রিত ভঙ্গীতে।

স্নায়ুবিজ্ঞানী ভি.এস. রামচন্দ্রন তার ‘আ ব্রিফ ট্যুর অফ হিউম্যান কনসাসনেস’ এ দাবি করেছেন, সাধারণ হাসি আর মানসিক চাপ-যন্ত্রণার মধ্যে হাসির মধ্যে শারীরবৃত্তীয় কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তার মতে, কষ্টের মধ্যে আমরা যে হাসি দিয়ে থাকি সেটি বেরিয়ে আসে গলার ভেতর থেকে, আর সাধারণ হাসির দমক আসে পেট থেকে। যে কারণে আনন্দের হাসির তোড়ে পেটে ব্যথা অনুভব করেন অনেকে।

রামচন্দ্রন বলছেন, কষ্টের মধ্যে হাসিরও বেশ কিছু উপযোগিতা আছে। চাপের মধ্যে থেকেও এই এ ধরনের মৃদু বা অট্টহাসিতে আমরা অপরকে আশ্বস্ত হতে সংকেত দেই। আমরা অন্যকে জানাতে চাই- ‘ঘাবড়াবেন না, আমি ভালো আছি। নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছি।’

হাসি কি ভালো ওষুধ?


কঠিন পরিস্থিতিতে হাসিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে মনে করার সামাজিক প্রবণতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসি আটকানোর চেষ্টাও যথেষ্ট বিব্রতকর। এ অবস্থা দূর করতে মেডিটেশনের মাধ্যমে মন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যেতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মনকে চাপমুক্ত রাখা সম্ভব। এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত হাসির বিড়ম্বনাও এড়ানো যায়।

তবে যতই লোকনিন্দা হোক, কঠিন চাপের মুহূর্তে হেসে ফেলা সব সময় কিন্তু খারাপ নয়। বরং কখনও কখনও এটি আমাদের ভালো থাকার জন্যই প্রয়োজন।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার কাইনসিওলজি, স্পোর্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অনুষদের অধ্যাপক বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘আমার মনে হয় এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে হালকা হওয়ার জন্য বেশি বেশি হাসা প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতিতে হাসি এক ধরনের ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাসি প্রাকৃতিক চাপমুক্তকরণ উপায় হিসেবে কাজ করে। হাসির মনোজাগতিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে এটি উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং চাপ কমায়।’

আমেরিকান জার্নাল অফ লাইফস্টাইল মেডিসিন জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে দাবি করা হয়, হাসি বেশ কিছু শারীরবৃত্তীয় সুবিধাও দিয়ে থাকে। চিকিত্সকরা হাসিকে কীভাবে একটি প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন, সে বিষয়ে পরামর্শও দেয়া হয়েছে ওই নিবন্ধে। গবেষণায় বলা হয়, হাসির সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম, পেশীর প্রশান্তি এবং বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি।

হাসি আমাদের শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়ায় এবং এর ফলে প্রাকৃতিকভাবে মস্তিষ্কে এন্ডোরফিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এই প্রক্রিয়াটি হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের মতো অঙ্গগুলোকে উদ্দীপ্ত করে। মানসিক চাপের সঙ্গে দেহের দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। হাসি উদ্বেগ কমিয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অট্টহাসি রক্তের মধ্যে অ্যান্টিবডি এবং টি-কোষের সংখ্যা বাড়াতেও সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বব্যাপী বেড়েছে বিষণ্নতা, এ অবস্থা কাটাতে বে-হিসাবী হাসির উপযোগিতাও বেড়েছে অনেক। বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘বিষণ্ন সময়ে আমরা যত বেশি জীবনের হালকা দিক খুঁজে পেতে পারি এবং হাসির সুযোগ তৈরি করতে পারি, তত আমরা ভালো থাকব। আপনি যদি হাসির সমস্ত সুবিধাগুলো একটি ট্যাবলেটে পুরে ফেলতে পারতেন, তবে নিঃসন্দেহে সেটি বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ওষুধের তালিকায় সবার ওপরে থাকত।’

শেয়ার করুন

ধরা দিল মিল্কি ওয়ের প্রথম ‘পালক’

ধরা দিল মিল্কি ওয়ের প্রথম ‘পালক’

মিল্কি ওয়ের মাঝখানে পালক সদৃশ অংশটি ছয় হাজার থেকে ১৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি অংশকে যুক্ত করেছে। ছবি: সায়েন্স নিউজ

মানবজাতির ধারক এ ছায়াপথে পালক সদৃশ অংশটি আবিষ্কারের পর একে ‘গঙ্গোত্রী তরঙ্গ’ নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের দীর্ঘতম গঙ্গা নদীর উৎস যে হিমবাহ, সেটির নামে এ নামকরণ করা হয়েছে।

মনুষ্যজাতির গ্রহ এ পৃথিবীকে ঘিরে থাকা সৌর জগৎ যে ছায়াপথটির সদস্য, সেই মিল্কি ওয়ের প্রথম পরিচিত ‘পালক’ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গ্যাসে পরিপূর্ণ সেতুর মতো এই অংশটির মাধ্যমে বৃত্তাকার প্যাঁচবহুল ছায়াপথটির দুটি অংশ দৃশ্যত এক হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কি ওয়ের উপরিভাগের এই অংশটি দেখতে পাখির পালকের মতো। কেন্দ্র থেকে নির্গত ঠাণ্ডা ও ঘন গ্যাসের লম্বা আস্তর এ অংশটি ছায়াপথের দুটি প্রান্তের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে।

সায়েন্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়. চলতি মাসে বিজ্ঞান সাময়িকী অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে মূল গবেষণা প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে। মিল্কি ওয়েতে এবারই প্রথম এ ধরনের কোনো কাঠামো শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

মানবজাতির ধারক এ ছায়াপথে পালক সদৃশ অংশটি আবিষ্কারের পর একে ‘গঙ্গোত্রী তরঙ্গ’ নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের দীর্ঘতম গঙ্গা নদীর উৎস যে হিমবাহ, সেটির নামে এ নামকরণ করা হয়েছে।

জার্মানির কোলোনে ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট বীণা ভি.এস. জানান, হিন্দিসহ ভারতে প্রচলিত আরও কিছু ভাষায় মিল্কি ওয়েকে বলা হয় ‘আকাশা গঙ্গা’, যার অর্থ হলো ‘আকাশে বহমান গঙ্গা নদী’।

বীণা ভি.এস. ও তার সহকর্মীরা গঙ্গোত্রী তরঙ্গের আবিষ্কারক। চিলির স্যান পেদ্রো ডি আতাকামায় অবস্থিত অ্যাপেক্স টেলিস্কোপের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন তারা। ঘন ও সহজে শনাক্তযোগ্য বলে শীতল কার্বন মনোঅক্সাইডের খোঁজ করছিলেন তারা, পেয়ে গিয়েছেন গঙ্গোত্রী তরঙ্গের সন্ধান।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, এই কাঠামোটি মিল্কি ওয়ের ছয় হাজার থেকে ১৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি অংশকে যুক্ত করেছে। কার্বন মনোঅক্সাইড ছাড়াও এ অংশকে ঘিরে রয়েছে আরও অনেক ধরনের গ্যাস।

ছায়াপথের গঙ্গোত্রী তরঙ্গ অঞ্চলের আরেকটি ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো ঢেউয়ের সঙ্গে সাদৃশ্য। হাজারো আলোকবর্ষ দীর্ঘ অংশটিতে সারাক্ষণই ঢেউ খেলে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানীরা, যদিও এর কারণ অস্পষ্ট।

বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কি ওয়ের মতো অন্য ছায়াপথগুলোতেও গ্যাসে পূর্ণ অংশ আছে। কিন্তু মিল্কি ওয়ের ভেতরে থেকে এই ছায়াপথটির মানচিত্র তৈরি করা খুব কঠিন।

তবে ধীরে ধীরে মিল্কি ওয়ের ভেতরে এমন পালক সদৃশ আরও অনেক কাঠামো ও ছায়াপথের অংশ আবিষ্কার হবে বলে মনে করেন তারা। একটি একটি করে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো পুরো ছায়াপথটির মানচিত্র এঁকে ফেলাও সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন