সবাই চান এমপি হতে, কেন্দ্র বলছে সাংগঠনিক দুর্বলতা

সবাই চান এমপি হতে, কেন্দ্র বলছে সাংগঠনিক দুর্বলতা

‘দুটি কারণে এটি হচ্ছে। একটি হলো, এই মুহূর্তে রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তির তেমন কোনো অবস্থান নেই। আমাদের আওয়ামী লীগের বিরোধী যারা আছে, তাদের সাংগঠনিক ও জনসমর্থনে দুর্বলতার কারণেই অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা হয়েছে যে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেলেই জয় সুনিশ্চিত।’

ঢাকা-১৪ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চেয়েছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের ৩৩ জন নেতা-কর্মী। এ ছাড়া একই সময় অনুষ্ঠেয় কুমিল্লা-৫ ও সিলেট-৩ আসনেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা-কর্মী দলের মনোনয়ন চেয়েছেন। এর মধ্যে কুমিল্লা-৫-এ ৩৫ জন এবং সিলেট-৩-এ ২১ জন আওয়ামী লীগের টিকিট পেতে আগ্রহ জানিয়েছেন।

আপাতদৃষ্টিতে উপনির্বাচনে এত বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর মনোনয়ন সংগ্রহকে গণতান্ত্রিক অধিকার মনে করা হলেও বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলছেন, কোনো দলের জন্যই এটি শুভ লক্ষণ নয়। এটি সাংগঠনিক দুর্বলতার পরিচায়ক।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হকের মৃত্যুর পর এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে বেশ আগে থেকেই দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের তৎপরতা দেখা গেছে। অনেকেই দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। অনেকেই এলাকায় লাগিয়েছেন প্রচারণামূলক পোস্টার ও ব্যানার।

অবশ্য রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। এ কারণে নেতা-কর্মীদের অনেকেরই মনে বিশ্বাস জন্মেছে, যিনি মনোনয়ন পাবেন, জয় হবে তারই। এ কারণে সহজে সংসদে যেতে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যাও অনেক বেশি।

এরই মধ্যে এই আসনে নৌকা প্রতীক পেতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী যেমন আছেন, তেমনি আছেন সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরাও।

মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাইনুল হোসেন খান, ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এ মান্নান কচি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোবাশ্বের চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সভাপতি সাবিনা আক্তার তুহিন, মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিরিন রুখসানা, প্রয়াত আসলামুল হকের স্ত্রী মাকছুদা হকসহ দুই ডজনেরও বেশি নেতা-কর্মী।

গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যু হয় ৬০ বছর বয়সী আসলামুলের। তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০১৪ সাল ও ২০১৮ সালেও জয়লাভ করেন।

তার মৃত্যুর পর গত ১৩ এপ্রিল আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ভোট হওয়ার কথা ২৮ জুলাই।

ঢাকা-১৪-সহ তিন আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ১২ জুন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

প্রয়াত আসলামুল হকের স্ত্রী মাকছুদা হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্বামীর অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিতেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছি। এলাকাকে চাঁদামুক্ত, ইভ টিজিংমুক্ত করার পাশাপাশি এলাকাবাসীর নানা সমস্যা সমাধানই আমার লক্ষ্য।’

মাকছুদা বলেন, ‘আমার স্বামী আওয়ামী লীগের একজন পরীক্ষিত নেতা। সে যেভাবে দলকে ভালোবাসত, সভাপতির যে নির্দেশ সেগুলো যেভাবে পালন করত, এমন নিবেদিত কর্মী আমি খুব কমই দেখেছি। আপা, যেটা নির্দেশ করেছেন, সে কিন্তু সেটা শতভাগ করার চেষ্টা করেছে।

‘নেতা-কর্মী এবং এলাকার জন্য সে যা করেছে, এগুলো সবাই জানে। সে হিসেবে আমি আশাবাদী। ওপরে আল্লাহ, নিচে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। যদি আমাকে এখানে তিনি যোগ্য মনে করেন, যদি আমাকে মনোনয়ন দেন, তাহলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। তাকে আমি নিশ্চয়ই নিরাশ করব না।’

ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এ মান্নান কচি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আবেদন করেছি। এখন সবকিছু মাননীয় সভানেত্রী আর বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে। প্রত্যাশা তো আছেই, যেহেতু কাজ করি। ওনারা সিদ্ধান্ত নেবেন, যেটাই নেবেন আমি মেনে নেব।

‘মনোনয়ন পেলে চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করার ইচ্ছা আছে। এলাকায় একজন এমপির কাজ হলো সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি করা। মানুষ যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারে। মানুষ যেন ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো করতে পারে। এ কাজগুলোই আমি করব।’

নেতা-কর্মীদের বিপুল আগ্রহ থাকলেও আসলে বিপুলসংখ্যক মনোনয়নপ্রত্যাশীর ঘটনাকে ভালোভাবে দেখছে না কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে এমনটা হতে পারে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘একই আসনে বিপুলসংখ্যক মনোনয়নপ্রত্যাশী বা আগ্রহী হওয়াটা ভালো নয়। আমি মনে করি, রাজনীতিতে এটাকে খুব ভালো মনে করার কোনো সুযোগ নেই।

‘দুটি কারণে এটি হচ্ছে। একটি হলো, এই মুহূর্তে রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তির তেমন কোনো অবস্থান নেই। আমাদের আওয়ামী লীগের বিরোধী যারা আছে, তাদের সাংগঠনিক ও জনসমর্থনে দুর্বলতার কারণেই অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা হয়েছে যে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেলেই জয় সুনিশ্চিত।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই নেতা আরও বলেন, ‘এ ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকের মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। তারা ভাবছে, যদি মনোনয়ন পাওয়া যায়, তাহলে তারা হয়তো সংসদ সদস্য হতে পারবে। প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরই তো স্বপ্ন থাকে যে তারা রাজনীতি করে জনগণের সেবা করার জন্য জনপ্রতিনিধি হবে। নির্বাচন করার জন্য আগ্রহ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

‘বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর মনোনয়ন প্রত্যাশার কারণ একটাই। মাঠে আমাদের শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় তাদের মধ্যে ধারণা হয়েছে মনোনয়ন পেলেই হয়তো জয়লাভ করবে। আমাদের সাংগঠনিক কিছু দুর্বলতাও হয়তো আছে। এ কারণেই হয়তো এ পর্যায়ে চলে এসেছে।’

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, তিন উপনির্বাচনে ১৫ জুন মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১৭ জুন। ১৮, ১৯ ও ২০ জুন আপিলের দিন ঠিক করা হয়েছে। প্রার্থিতা বাতিলের শেষ দিন ২৩ জুন। প্রতীক বরাদ্দের তারিখ ২৪ জুন।

আরও পড়ুন:
তিন আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট চান ৯৪ জন

শেয়ার করুন

মন্তব্য