ঐক্যফ্রন্ট কি ভেঙে গেছে

ঐক্যফ্রন্ট কি ভেঙে গেছে

যোগাযোগ নেই শরিকদের সঙ্গে। বিএনপি নেতারা কথা বলতে চান না। শরিক দলের নেতারা হতাশ।

বর্তমান সরকারের আমলে যতগুলো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছে, তার একটিতেও শরিক দলগুলোকে পাশে পায়নি দলটি।

ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনে উপনির্বাচনে ভোটের প্রচারে বিএনপি ছিল একা। ভোটে দলটি কারচুপির অভিযোগ এনে বিক্ষোভের ডাক দিলেও জোটের নেতাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য-বিবৃতিও আসেনি।

জোট ভেঙে গেছে এমন কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি। জোট আছে কি নাই, তা নিয়ে বিএনপির নেতারা কিছু বলতেও চান না। তবে শরিক দলগুলোর হতাশা স্পষ্ট।

ঐক্যফ্রন্ট গঠনে ভূমিকা রাখা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আমার বলার কিছু নাই। এটা নিয়ে আর কোনো নিউজ নেই।’

জোট কি তবে ভেঙে গেল বা অকার্যকর, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটার এখন কিছু নাই। এটা এখন স্ট্যান্ড ডিসপ্লেতে আছে। আসলে আমার বলার মতো ও খবর দেওয়ার মতো কিছু নাই এখানে। এটা ছিল; এখন তো নাই।

‘এখন বিএনপি তার মর্জি মতো চলছে। আবার গণফোরাম ভাঙছে। আমি যা যা সন্দেহ করেছি, তাই তাই হচ্ছে। তাই এটাকে নিয়ে আর কিছু বলার নাই। আমাকে এখান থেকে বাদ দেন।’

বিএনপি ১৯৯৯ সাল থেকেই জোটবদ্ধ আন্দোলন ও নির্বাচন করে আসছে। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে তৈরি করা জোট দুই বছর পরের জাতীয় নির্বাচনে বড় জয়ও পায়।

নির্বাচনের আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি একপর্যায়ে জোট ছেড়ে গেলে তার দলে ভাঙন ধরে। পরে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও বিএনপির জোটে হেরফের হয়নি; বরং একপর্যায়ে ১৭ দল এবং পরে ২০ দলীয় জোট গঠন করে বিএনপি।

তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই জোটের বাইরে বিএনপি আরও একটি জোট গঠনে মনোনিবেশ করে। গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ আর ব্যক্তি হিসেবে জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মইনুল হোসেন যোগ দেন এতে।

নিজেরা সবচেয়ে বড় দল হলেও সে সময় কার্যত জোটের নেতৃত্ব তুলে দেয় কামাল হোসেনের গণফোরামের হাতে। তিনিই জোটের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

এই জোট করার পর বিএনপির প্রতি ক্ষোভ জানায় তার আগের ২০ দলীয় জোটের শরিকরা। কারণ তাদের গুরুত্ব সে সময় কমে গিয়েছিল।

যদিও বিএনপি দুটি জোটই একসঙ্গে চালিয়ে যায়। তারপরও গণফোরামকে বেশি গুরুত্ব দেয়া নিয়ে অন্য শরিক এমনকি বিএনপিতেও ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট।

তবে ভোটে ভরাডুবির পর বিএনপি ধীরে ধীরে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিতে থাকে। আর এখন এ নিয়ে তারা কথাই বলতে চাইছেন না।

সর্বশেষ গত ৩০ জুন পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। এরপর বিভিন্ন ইস্যুতে এর আগে ‘ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক’ হিসেবে ড. কামাল হোসেন গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠালেও বর্তমানে তিনি বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন শুধু গণফোরামের সভাপতি হিসেবে।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন আদৌ এখন আমাদের ঐক্যফ্রন্টের কোনো দৃশ্যমান কাজ নেই। এটা অনেক দিন থেকেই চলে এসেছে।’

বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন নির্বাচন ও উপনির্বাচনের বিষয়ে এক প্রশ্নে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমি এটা সরাসরিই বলব যে, উপনির্বাচন নিয়ে বিএনপি আমাদের সাথে কোনোই আলোচনা করেনি; বরং আমি আমাদের লোকদের বলেছি নির্বাচনে তাদেরকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে। তবে ওরা (বিএনপি) যে পথটা বেছে নিয়েছে সেটার সাথে আমি একমত না। ওরা মনে করে জাস্ট দাঁড়ানোর দরকার তাই দাঁড়িয়ে আছি।’

জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন রেজা কিবরিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিনে বুঝেছি যে শুধু ঐক্যফ্রন্ট দিয়ে আসলে হবে না। এটা নিয়ে আমি মির্জা ফখরুল সাহেব ও আ স ম আব্দুর রব সাহেবের সঙ্গে খুব শিগগিরই আলোচনা করব। আসলে আমাদের বসা দরকার যে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।’

গণফোরাম থেকে বহিষ্কৃত সুব্রত চৌধরীর কাছে তাদের অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টে আমরা পরে হাত দেব। আগে তো নিজেদের দলগুলো গোছাতে হবে। বিএনপিরও তো নানান সমস্যা চলছে। অন্যান্য দলেও তো ভাঙাগড়া চলছে। এইটা ডিসেম্বর পর্যন্ত এমনই যাবে মনে হয়।’

ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না বিভিন্ন আলোচনায় দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার সমালোচনা করছেন। এমন বক্তব্য দিয়ে কীভাবে জোটে থাকেন, এ বিষয়টি নিয়ে জানতে মান্নার সঙ্গে সম্প্রতি যোগাযোগ করা হলে তিনি আপাতত এ নিয়ে কিছু বলবেন না বলে জানান।

আবদুল কাদের সিদ্দিকী অবশ্য ভোটের পর ঘোষণা দিয়েই ঐক্যফ্রন্ট ছেড়েছেন। ২০১৯ সালের ৮ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অস্তিত্ব বা ঠিকানা খোঁজার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে জনগণের সকল সমস্যায় তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকারে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করবে।’

জোট নিয়ে বিএনপির নেতারা কিছু বলতে চান না। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট এখন আছে কী নেই, সেটি আমি বলতে পারছি না। এই বিষয়ে মহাসচিবের সঙ্গে (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) যোগাযোগ করেন। আমার সময় থাকলেও কথা বলব না।’

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেন, ‘আমি এটা নিয়ে কথা বলব না। আমি এটার সঙ্গে নাই। দলের মহাসচিবের সঙ্গে এটা নিয়ে কথা বলেন।’

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কল রিসিভ হয়নি। পরে তার ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি (ফখরুল) হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছেন।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য