রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের তিস্তা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তিনি পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন এবং তাদের হাতে সরকারি ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। একই সঙ্গে নদীভাঙনের ভয়াবহতা তুলে ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নোহালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চর নোহালী কাচারীপাড়া এলাকায় তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি কমতে শুরু করার পর থেকেই ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। গত কয়েক দিনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ৮টি বসতবাড়ি এবং শত বিঘা আবাদি জমি। অনেক পরিবার শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত আলহাজ মোত্তালিব বলেন, চোখের সামনে আমার বসতবাড়ি নদীতে চলে গেল। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব জানি না। সরকারের কাছে স্থায়ী সমাধান চাই। সুরুজ মিয়া বলেন, ত্রাণ পেয়েছি, কিন্তু ভাঙন বন্ধ না হলে আমাদের বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না। আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘরবাড়ি, জমিজমা সব নদীতে চলে গেছে। এখন আমরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তারের পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন ২৩ জুলাই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নোহালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চর নোহালী কাচারীপাড়ায় ২২টি এবং ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে আরও ১৪টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া চর বাগডহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনরত নদীতীর থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট (৩৬ জুলাই) ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে পতন ঘটে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের। এই বিজয়ের মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিক ও সাহসী সব রাজপথের লড়াই। আর এই লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৫ জুন, যখন হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল রাখে। চট্টগ্রামে গণআন্দোলনের প্রথম স্ফুলিঙ্গটি জ্বলে উঠেছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ঐতিহাসিক শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকেই।
শুরুতে ক্যাম্পাসে ক্ষুদ্র প্রতিবাদ হিসেবে দেখা দিলেও তা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান মহাসড়কে। এরপর ক্যাম্পাস ছেড়ে আন্দোলন নেমে আসে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মূল রাজপথে। শুরু হয় সড়ক ও রেলপথ অবরোধ। আন্দোলন দমাতে ১১ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। তবে পুলিশি বাধায় দমে না গিয়ে, পরদিন ১২ জুলাই হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে পুরো চট্টগ্রাম শহর অচল করে দেয়। চবির পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যোগ দেয়।
আন্দোলনের শুরু ও গতিপথ নিয়ে চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই বিশ্বাস করতাম যে মেধার ভিত্তিতে চাকরি হওয়া উচিত। তাই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করি। কিন্তু সরকার যখন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাল, রক্ত ঝরাল এবং গ্রেপ্তার শুরু করল, তখন আমরা বুঝতে পারি এই স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় থাকলে কোনো দিনই ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না। তাই কোটা সংস্কারের দাবিটি একপর্যায়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের একদফা আন্দোলনে রূপ নেয়।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের দমন-পীড়নের কারণে সাধারণ মানুষও ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই আন্দোলন তখন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল দেশের মানুষের ভোটাধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা ও ন্যায়ের লড়াই। চট্টগ্রাম ছাত্রদল নিজেদের দলীয় পরিচয়ের চেয়ে আন্দোলনকে বড় করে দেখেছে এবং শুরু থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে রাজপথে সক্রিয় ছিল।’
চাকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, ‘শুরুর দিকে এটি সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়নের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা যৌক্তিক আন্দোলন ছিল। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার যখনই রাজপথে আমাদের ভাই-বোনদের ওপর নির্বিচারে বুলেট চালানো শুরু করল, তখনই সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।’
স্মৃতিচারণ করে রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর আলম বলেন, ‘সারাদেশের সাথে একযোগে আন্দোলন শুরু করার জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে আমরা মাঠে নামি। প্রথম দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি ছিল, হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী ভিজে ভিজেই কর্মসূচি শেষ করি। সেদিন বড় কোনো সাংবাদিক আমাদের কাভার করেনি, তবে আমাদের মনোবল শক্ত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘৩ জুলাই আমরা চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক অবরোধ করি। এটাই ছিল আমাদের প্রথম বড় পদক্ষেপ। ১১ জুলাই পুলিশের লাঠিচার্জের পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় এবং পরদিনই হাজার হাজার তরুণের মিছিলে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো চট্টগ্রাম।
ছবি: সংগৃহীত
‘সবুজে সবুজে ভরবো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মাগুরা জেলা পুলিশ ও গ্রিনভিউ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট এর আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাগুরায় ১০ হাজার গাছের চারা রোপণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) মাগুরা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন (পিপিএম সেবা)’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে সংস্কৃতি মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরী এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
এ সময় তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়তে বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করতে হবে। বর্তমান সরকার পরিবেশ রক্ষায় সারাদেশে ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করবে। এরই আলোকে সারাদেশে চলছে বৃক্ষরোপণ অভিযান। জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদেরকে বৃক্ষরোপন করতে হবে। মা-বাবা যেমন তার সন্তানকে লালন পালন করেন তেমনি একটি বৃক্ষরোপণ করে তা লালন পালন করতে হবে। বৃক্ষ শুধু আমাদের অক্সিজেন দেয় না। বৃক্ষ আমাদেরকে নানা ফল দেন। জ্বালানি কাঠ ও প্রয়োজনে আসবাবপত্র আমরা বৃক্ষ থেকে পেয়ে থাকি। তাই বসতবাড়ির আশেপাশে, পতিত জমিতে, নদীর ধারে, বিদ্যালয়ের আশেপাশে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায় আমাদের বেশি বেশি ফলজ,বনজ ও ঔষধি গাছ লাগাতে হবে।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আরো বলেন, বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার এদেশকে জিম্মি করে রেখেছিল। দেশে কোনো আইন ছিল না। মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। শোষণ বঞ্চনার শিকার হয়েছিল এ দেশের সাধারণ মানুষ। এখন সময় এসেছে এদেশকে নতুনভাবে সাজানোর। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দেশের মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। পাশাপাশি দেশে সামাজিক কর্মকাণ্ড আরো চাঙ্গা করতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ, জেলা পরিষদ প্রশাসক আলি আহমেদ, পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুদ হাসান খান কিজিল ও গ্রিন ভিউ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট এর সভাপতি মো. আশরাফুল আলম খান। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ, মাগুরা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক সাইদুর রহমান এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।
অনুষ্ঠান শেষে পুলিশ লাইন্স চত্বরে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
ছবি: সংগৃহীত
কুড়িগ্রামে জৈব সারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এতে করে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমে আসায় লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। জৈব সার দিয়ে আবাদ করায় উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ নিরাপদ ফসল উৎপাদন হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরের বাড়ি গ্রামের কৃষক দম্পতি মিনতী রাণী-কানাই চন্দ্র ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছেন। এই সার নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি অন্য কৃষকের কাছে বিক্রি করছেন। ট্রাইকো কম্পোস্ট উপকারী ছত্রাক ‘ট্রাইকোডার্মা’ সমৃদ্ধ একটি উন্নত ও পরিবেশবান্ধব জৈব সার। গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা-ডিমের খোসা, খৈল, কচুরিপানা, খড়-কাঠের গুড়া, ছাই, চা পাতা, মেহগনির ফল,নালী গুড় এবং ট্রাইকোডার্মা মিশ্রণ করে এই সার উৎপন্ন করা হচ্ছে। এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিকর ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ ধ্বংস করতে প্রাকৃতিক প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এই সার মাটিতে উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়ায় এবং মাটির অম্লত্ব-ক্ষারত্বের ভারসাম্য বজায় রাখে। এটি প্রাকৃতিক বালাইনাশক হিসেবেও কাজ করে। বিশেষ করে শিকড় পচা, ঢলে পড়া এবং উইল্ট রোগের মতো মাটি বাহিত ক্ষতিকর ছত্রাক ধ্বংস করে। গাছের শিকড় মজবুত করে এবং উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সহজ করে। এতে ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। জেলায় বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ব্যবহারে মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়,পানির অপচয় রোধ করে। এছাড়া ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের সময় যে লিচেট বা তরলজাতীয় সংগ্রহ করা হয়, তা বিভিন্ন সবজি ও পানের বরজসহ ফল গাছে ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ ফসলের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে করা যায়। তাই স্বল্প খরচে ও সহজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত এ সার ও লিচেট ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জমি তৈরির সময় প্রতি শতকে ৮ থেকে ১০ কেজি হারে ট্রাইকো কম্পোস্ট প্রয়োগ করতে হয়। টমেটো, বেগুন, শসা, পেয়ারা,আম ইত্যাদি গাছে চারা লাগানোর সময় ২ হতে ৩ কেজি সার গর্তে ভালো ভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারে জমির রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ২৫শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ট্রাইকো লিচেট এটি বোতলে সংগ্রহ করে ১৫-২০ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা হয়। এতে অত্যন্ত কার্যকরী বালাইনাশক হিসেবে কাজ করে। ট্রাইকো কম্পোস্ট সার জেলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পরিবেশবান্ধব জৈব সার হয়ে উঠেছে।
নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় এসব জৈব সার বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন উদ্যোক্তারা।
কৃষক কানাই চন্দ্র বলেন, ১০০কেজি ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার তৈরি করতে গোবর-৬০কেজি, কচুরিপানা-৫কেজি, খড়-কাঠের গুড়া-১০কেজি, চা পাতা-১০কেজি, ছাই-৫ কেজি, বাড়ি বর্জ্য-৫ কেজি, ডিমের খোসা, মেহগনি গাছের ফলের খোসা-১ কেজি করে, নালী গুড় এবং ট্রাইকোডার্মা-১০০ গ্রাম করে দেয়া হয়। এতে প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যে জৈব পদার্থ পচে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদিত হয় এবং লিচেট পাওয়া যায়।
কৃষাণী মিনতী রাণী বলেন, বছরে আমরা প্রায় ১০ হাজার কেজি জৈব সার উৎপাদন করি। এই সার আমরা নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছি এবং ১০ হতে ১৫টাকা কেজিতে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। এতে নিজেদের চাহিদা পূরণ হবার সাথে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ধরলা ট্রাইকো কম্পোস্ট উদ্যোক্তা মাসুম মিয়া বলেন, আরডিআরএস এবং পিকেএসএফ-এর সহযোগিতায় আমি ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করি। চলতি মৌসুমে ১২০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হয়েছে আগামী মৌসুমে ৪০০ মেট্রিক টন জৈব সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি।
শ্রমিক বিধান চন্দ্র ও বুলবুলি বলেন, এই অঞ্চলে কাজের তেমন কোন কর্মসংস্থান নেই। শুধু কৃষি কাজের উপর নির্ভর থাকতে হয়। আমাদের গ্রামে জৈব সার উৎপাদন শুরু হওয়ায় ২০ হতে ৩০জন নারী-পুরুষের স্থায়ী কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে কাজ করে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পাই। বাড়ির কাজ শেষ করে সকাল ৮টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করে থাকি। এতে করে আমাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরডিআরএস বাংলাদেশের কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সজিব আহমেদ বলেন, জেলায় কৃষকদের মাঝে এই সার ব্যবহার আগ্রহ বেড়েছে। জৈব সার ব্যবহারে কৃষি জমির মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর ফসল উৎপাদন হওয়ায় রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জীব-পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে। উপজেলায় জৈব সার উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করতে আরডিআরএস এবং পল্লী-কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে কাজ করছে। পরিবেশবান্ধব কৃষিকে উৎসাহিত করতে তৃণমূলের কৃষকদের এই সার তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহার করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। এতে করে নিরাপদ ফসলসহ জমির উর্বরতা বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি ভাবে কৃষকদের এই জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
জীবন মানেই তো অদম্য পথচলা। কখনো সাফল্য, তো কখনো গভীর অন্ধকার। সব মিলিয়েই জীবন। কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের কাস্তুল ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আব্দুল আহাদ এই সত্যটি নতুন করে প্রমাণ করলেন। জীবন সংগ্রামের নানা ধাপ পেরিয়ে কোয়েল পাখির খামার করে যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা একবার হোঁচট খেয়েও আবার নতুন করে ডানা মেলেছে।
আব্দুল আহাদের খামারের নাম ‘রাকিব-সাকিব কোয়েল খামার এন্ড হ্যাচারি’। মাত্র ৫০০ কোয়েল পাখি নিয়ে যাত্রা শুরু করা আব্দুল আহাদের এই উদ্যোগটি ছিল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আস্তে আস্তে খামারটি বড় আকার ধারণ করে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তার খামারে ৪১০০টি কোয়েল পাখি ছিল এবং সেই সময় প্রতিদিন প্রায় ৩৭০০টি করে ডিম পাওয়া যেত। কিন্তু বিধিবাম! হঠাৎ করেই মরণব্যাধি ভাইরাসে একদিনেই তার খামারের সমস্ত পাখি মারা যায়। চোখের সামনে তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলো নিভে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন এই উদ্যোক্তা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল আউয়ালের পরামর্শে দীর্ঘ এক মাস খামারটি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয় এবং জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর নতুন উদ্যমে খামারটি পুনরায় চালু করেন।
বর্তমানে তার খামারের পরিবেশ ও পাখিদের অবস্থা বেশ আশাব্যঞ্জক। খামারের খাঁচায় সাজানো পাখিগুলো নিয়মিত ডিম দিচ্ছে, যা খামারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রেখেছে।
আব্দুল আহাদ জানান, খামারে উচ্চমানের ‘ইউরোপিয়ান কোয়ার্টিনিক্স’ ও ‘জাপানি কোয়েল’ জাতের পাখি লালন-পালন করছেন। ডিম দেওয়ার উপযোগী ৩০০০টি কোয়েল পাখির মধ্যে ১০০০টি নিয়মিত ডিম পাড়ছে। আর নিজস্ব হ্যাচারিতে প্রতি মাসে প্রায় ১০০০ বাচ্চা ফোটানো হচ্ছে।
সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত রাখতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ আব্দুল আহাদ। তিনি এখন আর শুধু স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা হয়ে থাকতে চান না। তার চোখে এখন বড় স্বপ্ন নিজের খামারটিকে ভবিষ্যতে সারা বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক একটি খামারে রূপান্তরিত করা। আব্দুল আহাদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প হাওরবাসীর জন্য কেবল একটি খামারের বেঁচে থাকা নয়, এটি অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি যে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন, তা স্থানীয় আরও অনেক বেকার যুবকের জন্য আশার আলো হয়ে জ্বলবে।
ছবি: সংগৃহীত
ফেনীর পরশুরাম সীমান্ত দিয়ে ৭ জন ভারতীয় নাগরিককে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
তবে বিজিবির তাৎক্ষণিক টহল দলের তৎপরতায় ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে বিজিবি জানিয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)-এর শ্রীপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার ২১৪৫-এর নিকটবর্তী দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) সূত্রে জানা যায়, ভারতের ৪৩ রাজনগর বিএসএফ ক্যাম্পের একটি টহলদল ৭ জন ব্যক্তিকে (যাদের মধ্যে ৬ জন নারী ও ১ জন ছেলে শিশু রয়েছে) বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি টহলরত বিজিবি সদস্যদের নজরে এলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেয়।
আব্দুর রহমান নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, সীমান্ত এলাকার কয়েকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর জন্য জড়ো হওয়ার খবরে তৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে জানানো হলে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে তা প্রতিহত করেছেন। এক পর্যায়ে তারা আবার ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে যায়।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করলে বিজিবি সদস্যরা তা প্রতিহত করেন।
অধিনায়ক আরো বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশইন কিংবা সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের চেষ্টা প্রতিহত করতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
ফরিদপুরে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হলো বরেণ্য কবি ও সাংবাদিক শেখ শামসুল হককে। ‘ভুবনেশ্বরের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা কোমলহৃদয়’ এই গুণী মানুষের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে সাহিত্য ভবনে গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধায় আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়।
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মো. আলতাফ হোসেনের সভাপতিত্বে স্মরণসভায় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকবৃন্দ অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা কবি শেখ শামসুল হকের স্মৃতিচারণ করে তার জীবন ও বর্ণাঢ্য সাহিত্যকর্মের নানা দিক তুলে ধরেন।
স্মরন সভায় বক্তরা কবি শেখ শামসুল হকের সাহিত্যি চর্চার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি জোরালো দাবি উত্থাপন করেন। তারা বলেন, শেখ শামসুল হকের মতো একজন নিভৃতচারী ও খ্যাতিমান কবি কে তার অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি থেকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া উচিত।
এ সময় তার জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা বহু স্মৃতিবিজড়িত মুহূর্ত ও অতীতের নানা কথা আবেগঘন পরিবেশে তুলে ধরেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে ‘অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠন সহ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তাদের তালিকায় ছিলেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক এম এ সামাদ, দৈনিক ফতেহাবাদ সম্পাদক প্রফেসর এবিএম সাত্তার, কবি ও প্রকৌশলী ফরিদউজ্জামান, ডা. মো. ইমানুল হক আজাদ, কবি হাসনাইন সাজ্জাদী, কবি ও গীতিকার অনিমেষ বড়াল, কবি ও গীতিকার ইউনুস ফার্সি সিনিয়র সাংবাদিক ও প্রাবান্ধিক মফিজ ইমাম মিলন, কবি রীনা তালুকদার, লোক গবেষক খলিলউল্লাহ দিল দারাজ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. খবিরুল ইসলাম এবং দৈনিক সমকালের প্রতিবেদক হাসানুজ্জামান।
স্মরণসভার দ্বিতীয় পর্বে কবি শেখ শামসুল হকের স্মরণে তার রচিত কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন দেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত কবি ও বাচিক শিল্পীরা। কবিতা পাঠ করেন কবি আফিয়া রুবি, কবি মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কবি জেসমিন দীপা, কবি কবীর হুমায়ুন, কবি গিয়াসউদ্দিন চাষা, কবি শেখ নজরুল ইসলাম, কবি রুনা লায়লা, কবি ও অধ্যাপক ড. মোস্তফা দুলাল, কবি এইচ এম শাখাওয়াত হোসেন, কবি নাজমুন নাহার পারভীন (নাজ), কবি নীপা চৌধুরী, কবি জেনুন্নেছা মীনা, কবি কাজী হেমায়েত হোসেন, কবি মামুনুল ইসলাম, কবি ইসমত আরা এবং কবি নিয়াজ রায়হান সাগর।
এছাড়াও ভারত থেকে আগত বাচিক শিল্পী কবি ও সাংবাদিক আব্দুল কাইউম, অধ্যাপক জেসমিন বন্যা, অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ, জারিফ জাওয়াদ ওহী এবং ওয়াজিহা আহনাফ শ্বেতা তাদের চমৎকার বাচিক শিল্প ও আবৃত্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি ফরিদপুরের স্থানীয় সাহিত্য অনুরাগী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিতে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
ছবি: সংগৃহীত
মুক্তিযুদ্ধের ৫৫ বছর। এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি নড়াইলের পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের মধ্যকার গণকবরের। ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও শহীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি ছিল পরিবারগুলোর।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে কয়েকবার সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকার আমলে দাবি পূরণ হয়নি। প্রতিবারই শুধু আশ্বাসের বাণী ছাড়া কিছু জোটেনি কপালে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়াই ছিল তাদের অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীণ সময়ে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে ছিল পাকসেনাদের ক্যাম্প। তৎকালীন নড়াইল মহকুমা পিস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সদর থানার তুলারামপুর গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা সোলায়মান। মুক্তিযুদ্ধের ১৭ এপ্রিল তারিখে ভোর রাতে মাওলানা সোলায়মানের নেতৃত্বে একদল পাক সেনা তুলারামপুর গ্রামে প্রবেশ করে। গ্রামের তরফদার পরিবারের পাচজনসহ গ্রামের আরো তিনজনকে তুলে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে। তাদের ওপর কয়েক দফা শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
পরে যশোর সেনা নিবাসে নিয়ে সেখানেও কয়েক দফা অমানুষিক পাশবিক নির্যাতন করা হয়। প্রায় আধা মরা অবস্থায় তাদের নড়াইল সেনাক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়। নড়াইল সেনা ক্যাম্পের কর্মকর্তা তাদের কয়েকজনকে দিয়ে বোর্ড অফিসের পশ্চিম পাশে কবর খুড়ে রাখে। উপর থেকে নির্দেশ পাবার পর তারা কবরের মধ্যে দাড় করিয়ে গুলি করে। এক পর্যায়ে তাদের জীবন্ত গণকবর দেয়া হয়।
গণকবরে তরফদার পরিবারের পাচজন হচ্ছে মো. আতিয়ার তরফদার, সালাম তরফদার, আলতাফ তরফদার, রফিউদ্দীন তরফদার ও মাহতাব তরফদার এবং একই গ্রামের মকবুল শিকদার, কাইজার মোল্যা ও মোকাম মোল্যা কবরে শায়িত আছেন।
তরফদার পরিবারের সদস্য মো. সাজ্জাদ হোসেন টিপু একজন সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। মুক্তিযুদ্ধের ১৭ এপ্রিলের রোম হর্ষক ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কয়েকবার আবেড়তাড়িত হয়ে পড়েন তিনি।সংযত হয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ১৭ এপ্রিল ভোর রাতটি ছিল আমাদের পরিবারের জন্য গভীর কষ্টের দিন। গ্রামের রাজাকার সেলায়মানের নেতৃত্বে এক দল পাক সেনা আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। আমার বাবা, দাদা ও চাচাদের চোখ বেঁধে সেনা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের পরিবার ছাড়াও আমার গ্রামের আরো লোকজনকেও একই সাথে নিয়ে যায়। তারা নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের মধ্যে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন চালায় এবং আধমরা অবস্থায় প্রাচীরের পাশে ফেলে রাখে। পরে তাদের মধ্য থেকে আমার দাদা আতিয়ার তরফদার, সালাম তরফদার, আলতাফ তরফদার, চাচা রফিউদ্দীন তরফদার ও মাহতাব তরফদার এবং আমার গ্রামের অপর ৩ জন মকবুল শিকদার, কাইজার মোল্যা ও মোকাম মোল্যাকে টেনে হিচড়ে পাশের একটি কক্ষে রাখে। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় যশোর সেনানিবাসে। সেখান থেকে আবারও ফিরিয়ে এনে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের সেনা ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়।
২০ জুলাই তাদেরকে দিয়ে জোরপূর্বক ক্যাম্পের পশ্চিম কোনে একটি কবর খুঁড়ে সবাইকে তাতে নামিয়ে দেয়া হয়। এরপর প্রথমে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ ও পরে মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, ঘটনাটি আমাদের জন্য খুবই বেদনার! ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি ছিলো আমাদের। বেশ কয়েকবার সরকার বদল হয়েছে। আশ্বাসও পেয়েছি। কিন্তু বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সেলিম বলেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তখন শহরে প্রবেশ করে পারেনি। শহরতলীতে থেকে সব খবরই পেতাম। শুনেছিলাম রাজাকার প্রধান মাওলানা সোলায়মান নেতৃত্ব দিয়ে তুলারামপুর গ্রামে সেনাবাহিনী নিয়ে গেছে। গ্রামের যাদেরকে রাজাকারের খাতায় নাম লেখাতে পারেনি সেই সমস্ত মুক্তিকামী মানুষদের ধরে নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে রেখে নির্যাতন করেছে। তাদের দিয়ে কবর খুড়ে জীবিত অবস্থায় মেরে ফেলে মাটি চাপা দিয়েছে। তিনি বলেন, ১০ ডিসেম্বর নড়াইল শত্রু মুক্তির দিনে মোলায়মানসহ বেশিরভাগ রাজাকারদের নড়াইলে পাওয়া যায়নি। শুনেছি তিনি ঢাকার টঙ্গী এলাকায় একটি বড় মাপের মাদ্রানা খুলে সেখানে অবস্থান করেন। বেচে আছেন কিনা বলতে পারব না।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নিহতদের অবশ্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির পাশাপাশি গণ কবরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা উচিত।
মন্তব্য