ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের সড়কে ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারীদের ধরতে র্যাব নিয়মিত অভিযান চালালেও সেই শূন্যস্থান দ্রুত পূরণ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন র্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু চারপাশে এত বস্তি থাকার কারণে কোনো না কোনোভাবে আবার সেটা রিফিল হয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে ঢাকার কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মূলত, গাজীপুরের শ্রীপুরে দুই শিশুসন্তানের সামনে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় স্বামী ছায়েদুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তথ্য জানানো হয়। এর ফাঁকে উত্তরার ছিনতাই পরিস্থিতির প্রসঙ্গটি উঠে আসে।
উত্তরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে র্যাব-১ অধিনায়ক বলেন, ‘উত্তরা বিভাগের পুলিশ গত দুই দিন অভিযান চালিয়েছে। প্রথম দিনে ৮২ জন এবং গতকাল প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সপ্তাহে আমরা টঙ্গী রেল স্টেশন ও মাজার বস্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
চলতি বছর এ পর্যন্ত উত্তরা ও আশপাশের এলাকা থেকে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারীসহ প্রায় ১ হাজার ২০০ অপরাধীকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেন র্যাবের এই কর্মকর্তা।
ছিনতাইকারীদের ‘আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতাদের’ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু তথ্য পাচ্ছি। যারা পেছন থেকে সহযোগিতা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হবে। আমরা কিছু নাম পেয়েছি, তবে তদন্তের স্বার্থে তা গোপন রাখা হচ্ছে।’
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে শ্রীপুরের হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল নেয়ামুল হালিম। তিনি বলেন, ‘গত রোববার গভীর রাতে শ্রীপুর পৌর এলাকায় ভাড়া বাসায় খুন হন পোশাককর্মী নাসিমা আক্তার (২৭)। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার স্বামী ছায়েদুল ইসলামকে (৪০) গ্রেপ্তার করে র্যাব। এই দম্পতি এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ওই বাসায় বসবাস করতেন।’
র্যাব বলছে, ছায়েদুল দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন এবং নেশার জন্য তিনি নিয়মিত নাসিমার কাছে টাকা চাইতেন।
গত রোববার (১২ জুলাই) নাসিমা কারখানা থেকে বেতন পেয়ে বাসায় ফিরেছিলেন। রাতে ছায়েদুল তার কাছে তিন হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দুজনের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম বলেন, ‘একপর্যায়ে ছায়েদুল ধারালো ছুরি দিয়ে স্ত্রীকে এলোপাতাড়ি আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই নাসিমার মৃত্যু হয়।’
হত্যাকাণ্ডের সময় তাদের ৮ বছর বয়সি মেয়ে ও ৫ বছর বয়সি ছেলে ঘরেই ছিল এবং তাদের সামনেই এ ঘটনা ঘটে বলে জানান এই র্যাব কর্মকর্তা।
গ্রেপ্তার ছায়েদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অপরাধের পুরনো কোনো রেকর্ড আছে কি না জানতে চাইলে র্যাব-১ অধিনায়ক বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আগের কোনো মামলার রেকর্ড নেই। তবে তিনি নিয়মিত মাদক সেবন করতেন।’
ছবি: সংগৃহীত
বিগত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারী বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি হুঁ হুঁ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এর ফলে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এ বছরে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।
গত এক সপ্তাহ আগে হ্রদের পানি ৭৮ ফুট মিনসি লেভেলের কাছে থাকলেও মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল থেকে হ্রদের পানি ১০২ দশমিক ২৫ ফুট মিনসি লেভেল অতিক্রম করেছে। সেই সঙ্গে কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২২২ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টায় পানির লেভেল ছিল ১০২ দশমিক ২৫ ফুট মিন সি লেভেল। কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট থেকে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২ শত ২২ মেগাওয়াট। যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন।
এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ২ শত মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও হ্রদে পানি স্বল্পতায় গত বছরের ডিসেম্বর হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০০ মেগাওয়াটের নিচে চলে আসে।
ছবি: সংগৃহীত
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে দেশের সাত জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আকাশভাঙা বৃষ্টি আর দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় দেশের ৪৩টি জেলার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিকেলে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ৫৬ জন মারা গেছেন। রাঙামাটিতে ৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, কক্সবাজারে ৩১ জন, চট্টগ্রামে ১৫ জন, মৌলভীবাজারে একজন মারা গেছেন। কক্সবাজারে নিহতদের মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় ও ১৩ জন রোহিঙ্গা।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫৯ উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এক হাজার ৫৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ১০ হাজার ৮৫৪ জন আশ্রয় নিয়ে আছেন।
মন্ত্রণালয় বলছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা হিসেবে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন্যাকবলিত সাত জেলায় এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং তিন হাজার ২৫০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর বাকি ৫৭ জেলার প্রত্যেকটিতে ৫ লাখ টাকা করে নগদ সহায়তা এবং ১০০ মেট্রিক টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের ভারি বৃষ্টিপাতে দেশের ৪৩টি জেলা কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং ড্রেনেজ বা নিষ্কাশন ব্যবস্থার বিপর্যয়ের ফলে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমির ফসল পুরোপুরি বা আংশিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই বিপুল পরিমাণ জমির ফসলের মধ্যে রয়েছে চলতি মৌসুমের প্রধান চালিকাশক্তি আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন হরেক রকমের সবজি, আদা, হলুদ ও পেঁপেসহ নানা ধরনের অর্থকরী ফসল। নিচে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রধান খতিয়ান তুলে ধরা হলো:
আউশ ধান: সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধানের। প্রায় ৭৯,৫০০ হেক্টর জমির আউশ ধান এখন পানির নিচে। অনেক স্থানে ধান পেকে যাওয়ার মুহূর্তে এই দুর্যোগ আসায় কৃষকেরা ঘরে ফসল তুলতে পারেননি।
আমনের বীজতলা: আমন মৌসুমকে সামনে রেখে কৃষকেরা যে চারা তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে ১০,৫০৪ হেক্টর বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে আগামী দিনে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
গ্রীষ্মকালীন সবজি: প্রায় ১৭,৮০০ হেক্টর জমির সবজি খেত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। কাঁচামরিচ, করলা, ঝিঙে, ধুন্দুল, শসাসহ বাজারে চলমান সবজির সরবরাহ লাইনে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
কৃষকদের চোখে জল ও দীর্ঘশ্বাস: কাগজে-কলমে হেক্টর কিংবা সংখ্যার যে হিসাব আমরা দেখি, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের জীবনের বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি নির্মম ও হৃদয়বিদারক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই মুহূর্তে তাদের চারপাশ শুধু পানি আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
খুলনা জেলার বতিয়াঘাটা উপজেলার খলশিবুনিয়া গ্রামের একজন আদর্শ কৃষক প্রসাদ রায়। চলতি আমন মৌসুমকে ঘিরে তার মনে ছিল অনেক বড় পরিকল্পনা। গত সপ্তাহেই তিনি অনেক কষ্ট করে নিজের ১০ কাঠা জমিতে আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। তার আশা ছিল, এই বীজতলা থেকে উৎপাদিত চারা দিয়ে তিনি নিজের ১৭ বিঘা জমিতে ধান চাষ করবেন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে তার পুরো বীজতলাটি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
প্রসাদ রায় বারবার চেষ্টা করেছেন নিজের উদ্যোগে শ্যালো পাম্প দিয়ে পানি সেচে খেতটা বাঁচাতে, কিন্তু চারদিকের পানি এত বেশি ছিল যে তার সমস্ত চেষ্টা ভেস্তে গেছে। চারাগুলো পানির নিচে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তার সামনে নতুন করে বীজতলা তৈরি করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, ‘আবার শুরু থেকে সব করতে হবে। নতুন করে বীজ কিনতে হবে, টাকা খরচ করতে হবে। অথচ পকেটে টাকা নেই। সামনে কী হবে, সেই অনিশ্চয়তা তো আছেই।’
নদী ভরাট ও মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতার অভিশাপ: প্রসাদ রায়ের এই দুর্দশার পেছনে কেবল প্রকৃতির বৃষ্টি দায়ী নয়, বরং মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ও সমানভাবে দায়ী। তিনি জানান, তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শালতা নদীটি গত পাঁচ বছরে পলি জমে সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া বিলের ভেতরের প্রাকৃতি খালগুলো প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করে ফেলেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ার কোনো পথ নেই। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ এই অবহেলা ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
শিমের চারা হারিয়ে দিশেহারা মিরিন গোলদার: একই উপজেলার চক শৈলমারী গ্রামের কৃষক মিরিন গোলদার একটু বাড়তি লাভের আশায় এবার আগাম শিমের চাষ করেছিলেন। ধারদেনা করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি শিমের চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে তার মাঠের প্রায় অর্ধেক চারা পচে গেছে। খুলনা জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই জেলায় প্রায় ৩৪০ হেক্টর কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু ফসল হয়তো পানি কমলে স্বাভাবিক হতে পারে, তবে বেশিরভাগই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
পটুয়াখালীর আমন চাষি ও পানচাষিদের হাহাকার: পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেনের গল্পটাও একই রকম। এক একর জমিতে তিনি রোপা আমনের বীজতলা করেছিলেন, যা এখন হাঁটুপানির নিচে। তিনি জানান, বাজার থেকে চড়া দামে আবার ধানের বীজ কিনে নতুন করে কাজ শুরু করার মতো আর্থিক সামর্থ্য এই মুহূর্তের অনেক কৃষকেরই নেই।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কাগজিরপুল এলাকার পানচাষিরা। টানা বৃষ্টিতে পানের বরজগুলোর মাটি নরম হয়ে ভেঙে পড়েছে এবং লতাগুলো পচে গেছে। এখানকার পানচাষি বেলায়েত খান, জাকির হোসেন ও জাহাঙ্গীর হোসেনের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা। ৭০ বছর বয়সি প্রবীণ চাষি বেলায়েত কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার জীবনের সব সঞ্চয় এই বরজেই ঢেলেছিলাম। এখন সব হারিয়ে আমি নিঃস্ব।’ ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জাকির জানান, তিনি ইতোমধ্যে ব্যাংক ও এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের বোঝায় জর্জরিত। আর জাহাঙ্গীর ভাবছেন, এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতি কাটিয়ে কীভাবে ঋণের কিস্তি শোধ করবেন আর কীভাবে পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেবেন।
শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ: এই দুর্যোগ কেবল মাঠের কৃষকদেরই নয়, গ্রামীণ ও মফস্বল শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জীবনকেও স্থবির করে দিয়েছে। পটুয়াখালী শহরের রিকশাচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেনের কথাই ধরা যাক। গত কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টির কারণে শহরের রাস্তাঘাট ফাঁকা, মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।
জাকির হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে যাত্রী এক্কেবারে কমে গেছে। সকাল থেকে ভিজা ভিজা রিকশা চালাচ্ছি, কিন্তু রাস্তায় মানুষ নাই। স্বাভাবিক দিনে যা আয় করি, আজ তার অর্ধেকও হয় নাই। এই বাজারে অল্প টাকা দিয়া চাল-ডাল কিনব নাকি পরিবারের খরচ চালাব, তা মাথায় ধরছে না।’ দিনমজুর, ভ্যানচালক কিংবা ফেরিওয়ালাদের অবস্থাও ঠিক একই রকম।
এই বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি এবং সাধারণ ভোক্তাদের জীবনের ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ভর করবে বন্যা বা জলাবদ্ধতা কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। যদি পানি দ্রুত নেমে যায়, তবে কিছু ফসল হয়তো রক্ষা পাবে। কিন্তু জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আউশ, আমন ও সবজির ক্ষতি অপূরণীয় রূপ নেবে।
জাহাঙ্গীর আলম খান আরও উল্লেখ করেন যে, এই দুর্যোগের প্রভাব শুধু ফসলের মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘস্থায়ী পানির কারণে গ্রামীণ অঞ্চলে হাঁস-মুরগির খামার, গবাদিপশু, মৎস্য চাষের ঘের এবং পশুখাদ্যের (খড় ও ঘাস) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক মাছের ঘের ভেসে গেছে, যা চাষিদের আরও ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাৎণিক পুনর্বাসন: কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সরকার কৃষকের পাশে আছে। কৃষকেরা যাতে এই ধাক্কা সামলে দ্রুত মাঠে ফিরে যেতে পারেন এবং কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারেন, তার জন্য সব ধরনের পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত এই তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণের কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা।
ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিন-বাংলাদেশের মানুষের কাছে সৌন্দর্যের এক স্বর্গ। নীল জলরাশি, প্রবাল, সারি সারি নারিকেল গাছ আর অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে প্রতি বছর লাখো পর্যটক ছুটে আসেন এই দ্বীপে। কিন্তু এই স্বর্গের বাসিন্দাদের কাছে সেন্টমার্টিনে টিকে থাকা যেন প্রতিদিনের এক কঠিন পরীক্ষা।
বর্ষা এলেই মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি। বন্ধ হয়ে যায় নৌযোগাযোগ। তখন টেকনাফ থেকে খাবার, ওষুধ, জ্বালানি কিংবা প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় বাজারের মজুত। বাধ্য হয়ে প্রায় ১১ হাজার মানুষকে পানি, বিস্কুট কিংবা যা পাওয়া যায় তা খেয়ে দিন পার করতে হয়।
১৯৯৭ সালে ভূমিহীন ও গৃহহীন ৫০ পরিবারের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোও এখন জরাজীর্ণ। দীর্ঘ ২৯ বছরেও এসব ঘরের বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। টিনের ছাউনি, বাঁশের বেড়া ও কাঠামো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। এসব ঘরে বসবাস করা প্রায় ৩০০ মানুষের জীবন এখন ঝুঁকিপূর্ণ।
পর্যটনের স্বর্গ, বর্ষায় দুর্ভোগের দ্বীপ
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের উপকূল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় এর অবস্থান। মাত্র প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ পর্যটন মৌসুমে মুখর থাকলেও বর্ষা নামলেই নেমে আসে দুর্ভোগ।
থেমে যায় মাছ ধরা, বন্ধ আছে পর্যটন ব্যবসা। ফলে দ্বীপবাসীর আয়-রোজগারের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা জাবেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, ভারি বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে দক্ষিণপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও গলাচিপা এলাকার অনেক জায়গা পানির নিচে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘হালকা বৃষ্টি ও বাতাসেই সেন্টমার্টিনের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তখন খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির সংকট দেখা দেয়। এখানে কোনো সরকারি খাদ্য গুদাম নেই। প্রতিদিন টেকনাফ থেকেই এসব পণ্য আনতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সূর্যের আলো না থাকায় সোলার বিদ্যুৎও বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত দুর্যোগের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়, কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।’
সেন্টমার্টিন বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী হালামিতুস সাদিয়া বলেন, ‘ঝড়-তুফানে এখানে টাকা থাকলেও খাবার মেলে না। ঘরে কিছু না থাকায় অনেকে উপোষে থাকে। বাঁচতে চাইলে পানিও লবণাক্ত—তখন প্রশ্ন জাগে, আর কী খেয়ে আমরা টিকে থাকব?’ দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ায় খাদ্যসংকটের সমাধান হলে আমাদের এক নিঃশব্দ কান্না কমে যাবে। যদি এই সংকটের লাগাম টানা না হয়, তবে কোনো এক দুর্যোগে আমরা খাদ্যের অভাবে প্রাণ হারাব।’
সেন্টমার্টিন দ্বীপের অনার্স পড়ুয়া ছাত্র দিলোয়ার বলেন,
‘এটি বাংলাদেশের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। টেকনাফ থেকে কয়েকদিন ট্রলার না এলে বাজারে নিত্যপণ্যের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়, তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। এভাবেই দুর্ভোগের শেষ হয় না আমাদের।’
সেন্টমার্টিন দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, ‘দীর্ঘ ৫৮ দিন মাছ শিকার বন্ধ ছিল। কয়েকদিন হলো আবার সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছি। মাছ ধরা ছাড়া আমাদের আয়ের আর কোনো পথ নেই। পর্যটন বন্ধ থাকায় বিকল্প কোনো কাজও নেই। ‘আবহাওয়া খারাপ হলে মাছ ধরাও বন্ধ হয়ে যায়। তখন ঘরে চুলা জ্বলে না। আবার যোগাযোগ বন্ধ থাকলে বাজারের পণ্যও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেক সময় পানা (বুনো শাক) খেয়ে দিন কাটাতে হয়।’
অতীতেও দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট
২০২৫ সালের জুন মাসে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল থাকায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে ১১ দিন পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে দ্বীপে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জাহাজে করে ১৫০ টন খাদ্যপণ্য পাঠানো হয়েছিল।
এর আগে ঘূর্ণিঝড় মোখায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেন্টমার্টিন। ধ্বংস হয়েছিল হাজারো ঘরবাড়ি, উপড়ে গিয়েছিল অসংখ্য গাছ। মোখার পর দুই মাস পর্যন্ত খাদ্য ও পানির সংকটে কাটাতে হয়েছিল দ্বীপবাসীকে।
সেন্টমার্টিনের সাবেক ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিনিয়ত দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমরা খাদ্য সংকটে পড়ি। বিষয়টি সরকার ও দেশবাসী জানেন। কিন্তু এখনো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ‘সেন্টমার্টিনে সরকারি খাদ্য গুদামের জন্য জায়গা রয়েছে। সেখানে দ্রুত খাদ্য গুদাম নির্মাণ করা হলে দুর্যোগের সময় মানুষ অন্তত খাদ্য নিরাপত্তা পাবে।’
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মী তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘বর্ষাকাল এখানে জীবন নিয়ে শঙ্কার সময়। সংকটাপন্ন রোগীকে টেকনাফে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসক সংকটও রয়েছে।’ আমরা শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধার নিশ্চয়তা চাই। দুর্যোগের সময় হোটেল-রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নিতে হয়, যা নিরাপদ নয়। তাই স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও পশ্চিম পাশে টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি।’
সংসদে উঠেছে সেন্টমার্টিনবাসীর দুর্ভোগ
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী জাতীয় সংসদে সেন্টমার্টিনের মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। জরুরি সময়ে রোগীদের টেকনাফে নিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী, এমনকি প্রসূতি নারীও মারা গেছেন।’
তিনি সেন্টমার্টিনে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, সি-ট্রাক ও সি-অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
৫০ আশ্রয়ণ ঘরে ঝুঁকিতে ৩০০ মানুষ
১৯৯৭ সালে সরকার সেন্টমার্টিনে ভূমিহীন ও গৃহহীন ৫০ পরিবারের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করে। কিন্তু নির্মাণের পর প্রায় তিন দশকে এসব ঘরের উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আয়শা খাতুন বলেন, ‘বৃষ্টি এলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দিনমজুর, জেলে ও নিম্ন আয়ের মানুষ। নিজেদের টাকায় এসব ঘর সংস্কার করা সম্ভব নয়।’
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল আলম আরমান বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বিবেচনা করে ঘরগুলো সংস্কারের জন্য আবেদন করেছি। এখানে প্রায় ৩০০ মানুষ বসবাস করছে। উপজেলা প্রশাসন দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।’
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সেন্টমার্টিনের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। স্থায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সি-অ্যাম্বুলেন্স, সি-ট্রাক, সরকারি খাদ্য গুদাম, আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘দুর্যোগ বা বৈরী আবহাওয়ায় সেন্টমার্টিনের মানুষ খাদ্য সংকটে পড়ে—বিষয়টি আমরা অবগত আছি। খাদ্য গুদামের জায়গা থাকলে খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সি-ট্রাক ও সি-অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়েও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক পাঠানোর বিষয়টি দেখা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর সংস্কারের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
মঙ্গলবার ঢাকায় বন্যাদুর্গত এলাকায় পানিবন্দী মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করছেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত ও মহাসচিব মজিবুর রহমান মৃধা।
সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে প্লাবিত ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের পানিবন্দী ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে গুলশান সোসাইটি। আজ ১৪ই জুলাই, ২০২৬ (রোজ মঙ্গলবার) সোসাইটির নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় চরম সংকটে থাকা মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে তাৎক্ষণিক খাদ্য সংকট দূরীকরণের লক্ষ্যে এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। খাবার বিতরণকালে উপস্থিত ছিলেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত, মহাসচিব মজিবুর রহমান মৃধা এবং সোসাইটির অন্যান্য সম্মানিত সদস্যবৃন্দ।
খাবার বিতরণ কর্মসূচি চলাকালে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্য্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, "জলাবদ্ধতার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই সংকটের মুহূর্তে অভুক্ত ও পানিবন্দী মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব। গুলশান সোসাইটি সবসময় সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।"
তিনি সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আরো বলেন, "পানিবন্দী মানুষের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জরুরি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি তাদের এই কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে। সমাজের অন্যান্য সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও সংগঠনকেও এই দুর্যোগে সহায়তায় এগিয়ে আসার জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি।"
গুলশান সোসাইটির সদস্যবৃন্দের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও স্বেচ্ছাসেবকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পানিবন্দী মানুষের হাতে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,জলাবদ্ধতার পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এবং আক্রান্ত মানুষ স্বাভাবিক জীবনে না ফেরা পর্যন্ত তাদের এই ধরনের মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে অব্যাহত থাকবে।
ছবি: সংগৃহীত
পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার। সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এ কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলেও, বর্তমানে অনেক এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাস্থ্য, কৃষি ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভায় বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন, কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, দেশের সাতটি জেলা ও সিলেটসহ মোট আটটি জেলার ৫৯টি উপজেলা, ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১টি পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এ পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘দুর্গত এলাকায় জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যেই ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খাবার ও শুকনো খাবার সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রমে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডকে নিয়োজিত করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে স্পিডবোট ও রাবার বোট পাঠানো হয়েছে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দেওয়া হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর মহাসড়ক ও সড়ক মেরামত করবে, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার করা হবে।’
গ্রামীণ কাঁচা সড়ক সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দুর্গত এলাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু রাখা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
এ সময় ত্রাণমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করে কৃষকদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের এই বন্যা চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।’
আসাদুল হাবিব দুলু জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তিনি আজ বুধবার থেকে বন্যাকবলিত এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন শুরু করবেন।
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রদত্ত কৃষিসেবা যেমন মানসম্পন্ন বীজ, সুষম নন-ইউরিয়া সার এবং সেচ সুবিধাদি কৃষকের দোরগোড়ায় আরো নির্বিঘ্নে ও যথাসময়ে সরবরাহ করার লক্ষ্যে গত ১১ ও ১২ জুলাই পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করলেন বিএডিসির চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম।
পরিদর্শকালে চেয়ারম্যান বিএডিসি বলেন, কৃষকদের নিকট মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ করার বিষয়ে সমুদয় পদক্ষেপ পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং এক্ষেত্রে কোনরূপ ছাড় দেওয়া হবে না। বিএডিসির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশের অভ্যন্তরে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের বিষয়টি বিএডিসির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী আরও দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতার পরিচয় দিয়ে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি আরো বলেন যে, ডিলারদের নিকট সার সরবরাহের পর ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকদের নিকট সার বিক্রির কার্যক্রমটি তদারকি করতে হবে।
কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে তিনি এক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করে বলেন যে, কৃষদের উন্নতি হলেই দেশের উন্নয়ন ঘটবে। সরকারের আধুনিক ও স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সকলকে একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান, বিএডিসি গুরুত্বারোপ করেন।
বিএডিসির চুয়াডাঙ্গাস্থ বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে ধানবীজের গুণগতমান পরিদর্শন করছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম।
মন্তব্য