× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বাংলাদেশ
Death of baby Maisha That hospital in Dhaka was running without approval
hear-news
player
google_news print-icon

শিশু মাইশার মৃত্যু: অনুমোদন ছাড়াই চলছিল ঢাকার সেই হাসপাতাল

শিশু-মাইশার-মৃত্যু-অনুমোদন-ছাড়াই-চলছিল-ঢাকার-সেই-হাসপাতাল
শিশু মাইশা (বাঁয়ে) এবং ঢাকার আলম মেমোরিয়াল হাসপাতাল। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
একটি ৯ তলা ভবনের ওপরের দিকে চারটি ফ্লোরে কয়েক মাস ধরে চলছিল আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের কার্যক্রম। সম্প্রতি এর মালিকানা কিনে নেন জিকরুল্লাহ স্বপন। স্বপনের দাবি, তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা।  

হাতের আঙুলে অস্ত্রোপচারের সময় মারা যাওয়া কুড়িগ্রামের ছয় বছর বয়সী শিশু মারুফা জাহান মাইশাকে ঢাকার যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সেটি অনুমোদন ছাড়াই চলছিল।

মাইশার মৃত্যুর পর থেকে রাজধানীর রূপনগরের আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালটির সব কার্যক্রম বন্ধ। মাইশাকে ওই হাসপাতালে পাঠানো এবং অস্ত্রোপচার নিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্যে রয়েছে অস্পষ্টতা। তারাসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মাইশার বাবা।

একটি ৯ তলা ভবনের ওপরের দিকে চারটি ফ্লোরে কয়েক মাস ধরে চলছিল আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের কার্যক্রম। সম্প্রতি এর মালিকানা কিনে নেন জিকরুল্লাহ স্বপন। স্বপনের দাবি, তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা।

আগের মালিক ডা. সৈয়দ মাসুদ রহমান একসময়ে মিরপুরে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালাতেন। তবে ঘটনার পর থেকে তার ফোন বন্ধ। তার চিকিৎসা-সংক্রান্ত অনুমোদন আছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

কুড়িগ্রাম পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভেলাকোপা ব্যাপারী পাড়ার মোজাফফর আলী ও বেলি আক্তারের মেয়ে মাইশা। তার ডান হাতের আঙুল ৯ মাস বয়সে পুড়ে বাঁকা হয়ে যায়।

মোজাফফর হোসেন মেয়ের চিকিৎসার জন্য গত ২৮ নভেম্বর মিরপুর ১১-এর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে আসেন। ওই হাসপাতালে রোগী দেখেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি) ডা. আহসান হাবীব। মাইশাকে তার কাছেই দেখানো হয়।

মোজাফফর হোসেনের অভিযোগ, ডা. আহসান হাবীব মাইশার হাতে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। পরদিন অভিভাবকেরা সম্মতি দিলে ডা. হাবীব তাদের জানান, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করতে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা লাগবে। আর রূপনগর আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে খরচ হবে ৭০ হাজার টাকা।

আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিজের শেয়ার থাকায় কম খরচে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে পারবেন বলেও জানান ডা. হাবীব।

স্বজনদের দাবি, ৩০ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে মাইশার অস্ত্রোপচার শুরু হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ডা. হাবীব অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে জানান অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। হাতের আঙুলে প্রতিস্থাপনের জন্য চামড়া নেয়া হয়েছে মাইশার পেট থেকে।

তবে বেলা দেড়টার দিকে ডা. হাবীব স্বজনদের জানান মাইশার জ্ঞান ফিরছে না। তাকে অন্য হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠাতে হবে। তিনি নিজেই অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে একজন নার্স, ওয়ার্ড বয়সহ মিরপুর মাজার রোডের গ্লোবাল স্পেশালাইজড হসপিটালে নিয়ে যান। তবে সেখানকার চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান মাইশা আগেই মারা গেছে।

এ ঘটনায় সোমবার দুপুরে রাজধানীর রূপনগর থানায় অভিযোগ জমা দেন মাইশার বাবা। সন্ধ্যায় সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পুলিশ।

অভিযোগে মাইশার বাবা বলেন, মাইশার মৃত্যুর পর ডা. হাবীব তড়িঘড়ি করে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সেই সঙ্গে অস্ত্রোপচারের আগাম ফি হিসেবে জমা দেয়া ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেয়া হয়।

অভিযোগে বলা হয়, মরদেহ দাফনের আগে গোসলের সময় দেখা যায় মাইশার নাভির নিচে আড়াআড়িভাবে পুরো পেট কাটা এবং সেখানে ১৭টি সেলাই রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্বজনরা ডা. হাবীবকে ফোন করলে তিনি তখন জানান, অস্ত্রোপচার তিনি করেননি, সেটি করেছেন ডা. শরিফুল ইসলাম ও ডা. রনি।

এরপরেই আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের অবস্থান যেখানে সেই রূপনগর থানায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় মাইশার পরিবার। তাদের অভিযোগ, মাইশাকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে।

শিশু মাইশার মৃত্যু: অনুমোদন ছাড়াই চলছিল ঢাকার সেই হাসপাতাল
মাইশার অস্ত্রোপচার চলে এই অপারেশন থিয়েটারে

পার্টি সেন্টারের স্টেজের ওপরেই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার

রূপনগরের আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় একটি ৯ তলা ভবনের ওপরের দিকের চারটি ফ্লোরে এর অবস্থান।

ভবনের নিচতলায় খাবার হোটেলসহ তিনটি দোকান রয়েছে। এরপর দুই, তিন ও চারতলায় পার্টি সেন্টার। চতুর্থ তলার পার্টি সেন্টারে গান-বাজনার স্টেজের ঠিক ওপরেই পঞ্চম তলায় হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার। সেখানেই মাইশার দেহে অস্ত্রোপচার করা হয়।

ভবনের ষষ্ঠ তলায় আল-আরাফাহ ইসলামী জীবনবিমার অফিস। এর পরের সপ্তম তলায় হাসপাতালের ওয়ার্ড, অষ্টম তলায় কেবিন ও নবম তলায় কনসালটেশন সেন্টার।

মাইশার মৃত্যুর পর থেকে অনুমোদনহীন এই হাসপাতালের সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চারটি ফ্লোরই সোমবার সকালে তালাবন্ধ দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটি চালু ছিল, রোগীও ভর্তি ছিলেন। তবে এরপর থেকে কোনো কার্যক্রম নেই।

ভবনের অন্য প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, ৩০ নভেম্বর মাইশার মৃত্যুর পর হাসপাতালের দায়িত্ব আগের মালিকের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছেন স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা জিকরুল্লাহ স্বপন।

অবৈধ হাসপাতালের নতুন মালিক

মাইশার অস্ত্রোপচার হয়েছে যেখানে সেই আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের কোনো অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বিল্লাল হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের কোনো নিবন্ধন নেই এবং এ জন্য তারা আবেদনও করেনি। ওই শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি জানার পরই আমরা কালক্ষেপণ না করে পরিচালকের নির্দেশে সেখানে যাই এবং হাসপাতালটি বন্ধ করে দিই।’

তিনি বলেন, ‘সেখানে গিয়ে দেখি সব কক্ষ তালা দেয়া। শুধু ফজলুল রহমান রাব্বি নামে একজনকে পাওয়া যায়। তিনি আমাদের পরিচালকের স্বাক্ষরিত নোটিশটি রিসিভ করেন।

‘নোটিশে নির্দেশনা দেয়া হয় কোনো চিকিৎসক যেকোনো হাসপাতালে কাজ করতে গেলে আগে দেখে নেবেন সেটি নিবন্ধিত কিনা। যদি না থাকে তবে তিনি কাজ করতে পারবেন না। করলে দায়ভার তাকেই নিতে হবে।’

শিশু মাইশার মৃত্যু: অনুমোদন ছাড়াই চলছিল ঢাকার সেই হাসপাতাল
আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের কার্যক্রম এখন বন্ধ

অনুমোদন ছাড়াই ঢাকার বুকে এভাবে একটি হাসপাতাল কীভাবে চলল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই। তবে আমাদের লোকবল কম। অলিগলিতে গিয়ে সব তো দেখা সম্ভব হয় না। অভিযানে যেগুলো অনিবন্ধিত নজরে আসে, সেগুলো বন্ধ করা হয়।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলম মেমোরিয়াল হাসপাতাল গড়ে তোলেন ডা. সৈয়দ মাসুদ রহমান নামে এক ব্যক্তি। ৯ তলা ভবনটির মালিকানাও তার। আগে তিনি মিরপুরে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ছিলেন। ৩০ নভেম্বরের পর হাসপাতালটির মালিকানায় পরিবর্তন এসেছে, এখন এটির মালিক জিকরুল্লাহ স্বপন।

স্বপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি নিজে একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক এবং মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সহসম্পাদক।

‘এই হাসপাতালের আগের মালিক ছিলেন ডা. সৈয়দ মাসুদ রহমান। প্রায় চার মাস ধরে হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে। আমার কাছে মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে ডিসেম্বরের ১ তারিখ।’

ডা. সৈয়দ মাসুদ রহমানের সঙ্গে পরিচয় কীভাবে জানতে চাইলে স্বপন বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার দেখা হয় মিরপুর মেডিট্যাগ অথবা মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এখন নামটা সঠিক মনে নেই।’

হাসপাতালের আগের মালিক এখন কোথায় আছেন সে ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের কেউ তথ্য দিতে পারেননি। তার ব্যবহৃত ফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া গেছে।

ডা. মাসুদের বিষয়ে জানতে চাইলে জিকরুল্লাহ স্বপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তিনি আগে মিরপুর ১২-তে মিম জেনারেল হাসপাতালে বসতেন। পরে নিজেই মিরপুরে ডায়াগনস্টিক সেন্টার দিয়ে সেখানে বসতেন। সবশেষে আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে কাজ শুরু করেন এ বছরের জুলাই-আগস্ট থেকে।

‘আমি ওনার কোনো কাগজপত্র দেখিনি। যতটুকু জানি উনি এমবিবিএস ডাক্তার এবং রাশিয়া থেকে এমডি ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। এটা তো অনেক বড় ডিগ্রি।’

অনুমোদনহীন একটি হাসপাতাল কেন কিনলেন, এমন প্রশ্নে আগের বক্তব্য থেকে সরে আসেন ছাত্রলীগ নেতা স্বপন। এবার তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠান কেনেননি, ভাড়া নিয়েছেন।

স্বপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি হাসপাতাল কিনিনি। শুধু হাসপাতালের মালামাল কিনেছি। এটার অনুমোদন পেতে তিন-চার মাস ধরে আলোচনাও হচ্ছে। আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য জানিয়েছে এ ধরনের কোনো আবেদন তারা পায়নি।

জিকরুল্লাহ স্বপন নিজেকে মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সহসম্পাদক দাবি করলেও সংগঠনের নেতারা তা অস্বীকার করছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক এবং মঙ্গলবারের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশী জাকওয়ান হোসাইন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জিকরুল্লাহ স্বপন নামে কাউকে আমি চিনতে পারছি না। সহসম্পাদক পদে অনেককেই চিঠি দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ হলেও হতে পারে, তবে আমি তাকে চিনতে পারছি না।’

মিরপুরে ছাত্রলীগের সবশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটি ২০ বছর আগে ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেড় বছর আগে একটি কমিটি ঘোষণা করা হলেও সেখানে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ছিল। আর এবারের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সামনে রেখে ১ ডিসেম্বর আরেকটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে সেখানেও শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম রয়েছে।’

আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের চারটি ফ্লোর ঘুরে কেবল ফজলুর রহমান রাব্বি নামে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীকে পেয়েছে নিউজবাংলা।

মার্কেটিংয়ের কর্মী দাবি করা রাব্বি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চলতি মাসের ১ তারিখ স্বপন ভাই এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছেন। এখানে যে অকারেন্সটা হয়েছে সেটা গত মাসের ৩০ তারিখে। আমি যতটুকু শুনেছি মাইশার আঙুলের অপারেশন ছিল। এসব ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় ডাক্তাররা চামড়া নেয় রান (ঊরু) থেকে। তার রান চিকন হওয়ায় সেখান থেকে চামড়া নিতে পারেনি। পরে পেট থেকে চামড়া নিয়ে অ্যাডজাস্ট করেছে।’

শিশু মাইশার মৃত্যু: অনুমোদন ছাড়াই চলছিল ঢাকার সেই হাসপাতাল
পার্টি সেন্টারের রেস্তোরাঁর স্টেজের ঠিক ওপরেই আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার

হাসপাতালে এখন কোন রোগী ভর্তি আছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন কোনো রোগী নাই। হাসপাতাল ফাঁকা। আমাদের হাসপাতালের কিছু কাজ বাকি আছে। এগুলো শেষ করে রোগী ভর্তি নেব।’

আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের পাশের সুজন পেইন্ট অ্যান্ড স্যানিটারি দোকানের কর্মচারী মো. ফয়সাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে পাঁচ-ছয় মাসের বেশি সময় ধরে। রোগী আসা-যাওয়া দেখেছি। এখন শুনলাম হাসপাতাল নাকি বন্ধ।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের পাশের একটি ভবনের কেয়ারটেকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পাঁচ-ছয় মাস ধরে এই হাসপাতাল চালু আছে। সিজারসহ বিভিন্ন ধরনের অপারেশন হতো। যখন রোগী আসত তখন ডাক্তার আসত। ডা. মাসুদ এই হাসপাতালে নিয়মিত ৯ তলায় বসতেন। তিনি মেডিসিনের ডাক্তার। মাসুদ হাসপাতাল এবং এই ভবনের মালিক।’

তিনি বলেন, ‘ডা. মাসুদের বোন হাসপাতালের পাশের সাততলা ভবনের মালিক। তারা কেউ এখানে পরিবার নিয়ে থাকেন না। পল্লবীর বাসায় থাকেন। ডা. মাসুদ প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ২টা এবং আবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নিয়মিত আসতেন।’

দায় নিচ্ছেন না চিকিৎসকেরা

মাইশাকে আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে পাঠানো চিকিৎসক ডা. আহসান হাবীব দাবি করছেন হাসপাতালের শেয়ার হোল্ডার তিনি নন। শিশু মাইশার মৃত্যুর ঘটনাটি ‘দুঃখজনক’ মন্তব্য করে তিনি বলেন এর কারণ বুঝতে পারছেন না।

ডা. হাবীব নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মেয়েটির হাতের চামড়া ঠিক করতেই পেট থেকে চামড়া নেয়া হয়। সেখানে ডা. শরিফুল ইসলাম অপারেশন করেন। পুরো সময়টা আমি ছিলাম তাদের সঙ্গে।’

মাইশার পরিবারকে তিনি ওই হাসপাতালের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকার কোনো তথ্য দেননি দাবি করে ডা. হাবীব বলেন, ‘এগুলো বানোয়াট। আমি, ডা. শরিফুল ইসলাম এবং এনেস্থিসিয়া স্পেশালিস্ট রনি অপারেশনের সময় ছিলেন। সেখানে মেয়ের হাতের ছবি তোলা হয়েছে। সিসিটিভি আছে, পুরোটা দেখা যাবে। আর আমি কোনো শেয়ারহোল্ডার না।’

সিসিটিভি ফুটেজ চাইলে অবশ্য তিনি দিতে রাজি হননি।

অনুমোদনহীন একটি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনুমোদনের ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন ছিল। আমরা সার্জন। বিভিন্ন জায়গায় সার্জারি করি। এটা প্লাস্টিক সার্জারি ছিল, তাই ডা. শরিফুলকে রেফার করেছিলাম।’

মাইশার অস্ত্রোপচার করেন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শরিফুল ইসলাম।

অনুমোদনহীন আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত থাকা নিয়ে প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অনুমোদন আছে কি না, এটা তো আমি জানি না। আহসান হাবীব জানেন।’

মাইশার মৃত্যুর জন্য অ্যানেস্থেশিওলজিটদের দায় দিচ্ছেন ডা. শরিফুল।

তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক সার্জারিতে আমাদের মেইন কাজ হচ্ছে তলপেট থেকে অথবা থাই থেকে স্কিন নিয়ে আরেক জায়গায় দিই। তবে হাত পুড়ে গেলে সেখানে থাইয়ের স্কিন দেয়া যায় না। কারণ, থাইয়ের স্কিনের পুরুত্ব বেশি। ভালো রেজাল্টের জন্য স্কিন পেট থেকে নেয়া হয়।’

মাইশা কেন মারা গেল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা এনেস্থেশিয়া যিনি দিয়েছেন তিনি ভালো বলতে পারবেন। আমি অপারেশন শেষ করতে পারিনি। এনেস্থেশিয়ায় প্রব্লেম হয়েছিল। তখন তাড়াতাড়ি ডা. আহসান হাবীব আসেন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে একজন এনেস্থেশিয়া স্পেশালিস্ট আসছিলেন তখন। তার নামটা মনে নেই। হাবীব ভাই ভালো বলতে পারবেন। তিনি তাকে নিয়ে এসেছিলেন। দুঃখজনক হচ্ছে রোগীকে বাঁচানো যায়নি।’

আইসিইউ হাসপাতালে নেয়ার আগেই মারা যায় মাইশা

আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর মাইশাকে মিরপুর-১ মাজার রোডের গ্লোবাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে পাঠানোর আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়।

গ্লোবাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে নির্বাহী পরিচালক এম এম নেয়ামত উল্লাহ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে তো রোগীকে ভর্তিই করিনি। হাসপাতালে ঢুকতে দেয়া হয়নি। কারণ মাইশাকে আমরা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই মৃত পেয়েছি।

‘তাদের সঙ্গে দুইজন ডাক্তার ও ওটির লোক এসেছিলেন। তারা আমাকে নানাভাবে অনুরোধ করে চেষ্টা করেছেন ম্যানেজ করে রোগীকে আইসিউতে ঢোকানোর জন্য। কিন্তু একজন মরা বাচ্চাকে কেন আমরা আইসিউতে ঢোকাব?’

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহাবিলিয়েশন হসপিটালের শল্যবিদ আওলাদ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শরীরের কোনো অংশ থেকে অন্য অংশে চামড়া কেটে লাগানোকে বলে স্কিন গ্রাফটিং। এটি সাধারণত ঊরু বা থাই থেকে নেয়া হয়। তবে ঊরু চিকন হলে পেটের ওপরের অংশ বা হাতের শোল্ডার থেকে নেয়া যায়। এই সেলাই চামড়ার ওপরেই থাকে। চিকিৎসক মনে করলে যেকোনো সুবিধাজনক জায়গা থেকেই চামড়া নিতে পারেন।’

পাঁচ দিনের মাথায় মামলা

মায়েশাকে হত্যা করার অভিযোগ তুলে সোমবার ঢাকার রূপনগর থানায় মামলা করেছেন তার বাবা মোজাফফর হোসেন।

রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল রহমান সরদার নিউজবাংলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবার আমাদের থানায় মামলা করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার জসীম উদ্দীন মোল্লা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে যা যা করণীয় সব ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে। আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া প্রেসক্রিপশনে সরকারি ওষুধ তুলে পাচার
ভুল চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুর অভিযোগে হাসপাতালে ভাঙচুর-সংঘর্ষ
রিপোর্ট আনতেই ডাক্তারের সময় শেষ
মেডিক্যাল কলেজ আছে, ভবন নেই
চালুর দেড় বছর পর চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালের উদ্বোধন

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Actresss cigarette fire explosion in the shooting house?

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ?

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ? অভিনেত্রী শারমিন আঁখি। ফাইল ছবি
অভিনেত্রী আঁখির স্বামী রাহাত কবির টেলিফোনে নিউজবাংলাকে জানান, আঁখি তাকে জানিয়েছেন যে চুল আয়রন করার জন্য সকেটে হেয়ার স্ট্রেইটনার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে বৈদ্যুত্যিক গোলযোগের আলামত মেলেনি। সেখানে হেয়ার স্ট্রেইটনারও পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর পল্লবীতে শনিবার দুপুরে একটি শুটিং হাউজে বিস্ফোরণের ঘটনায় অভিনেত্রী শারমিন আঁখি দগ্ধ হন। এতে অভিনেত্রীর শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে যায়। তিনি শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।

ঘটনার পর অভিনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, শুটিং হাউজের ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুত্যিক সংযোগের শর্ট সার্কিট থেকে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

তবে প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, বাথরুমে জমে থাকা কোনো ধরনের গ্যাসের সংস্পর্শে সিগারেটের আগুন থেকে এই বিষ্ফোরণ। ঘটনাস্থলে কোনো বৈদ্যুত্যিক শর্ট সার্কিটের আলামত পাওয়া যায়নি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন, একাধিক ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং নানা আলামত বিশ্লেষণ করে নিউজবাংলাও। তাতে পুলিশের ধারণার যথার্থতার প্রমাণ মিলেছে।

মিরপুরের পল্লবী এলাকার শুটিং হাউজটির তৃতীয় তলার ভাড়া করা ফ্লোরে চলছিল একটি টেলিফিল্মের শুটিং। প্রথম দিনের শুটিংয়ের এক ফাঁকে বেলা পৌনে ২টার দিকে অভিনেত্রী শারমিন আখিঁ মেকআপ রুমে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এমন সময় বিকট শব্দে বিষ্ফোরণ হয়। দগ্ধ অবস্থায় মেকআপ রুম থেকে আর্তনাদ করতে করতে বেরিয়ে আসেন অভিনেত্রী। ঘটনার আকষ্মিকতায় উপস্থিত হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। দ্রুতই অভিনেত্রীকে হাসপাতালে পাঠান তার হাউজ মালিক ও সহকর্মীরা।

কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি হাউজ ও শুটিং-সংশ্লিষ্ট কেউই।

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ?
বিস্ফোরণের ধাক্কায় বাথরুমের দরোজা ভেঙে বাইরের দিকে এসে পড়ে। ছবি: নিউজবাংলা

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি নিউজবাংলাকে জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে অভিনেত্রী শারমিন আঁখি মেকআপ রুমে মেকআপ নেয়া শেষ করেন। তখন তার পোশাক পাল্টানোর কথা ছিল বলে সঙ্গে থাকা মেকআপ আর্টিস্ট রুম থেকে বেরিয়ে যান। ফলে ওই সময় অভিনেত্রী ছাড়া মেকআপ রুমে আর কেউ ছিলেন না। এর কিছুক্ষণ পরই বিস্ফোরণের শব্দ হয় এবং দগ্ধ অবস্থায় মেকআপ রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আসেন আঁখি।

রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, তৃতীয় তলার মেকআপ রুমের সঙ্গে একটি বাথরুম ও পোশাক পাল্টানোর জন্য পৃথক আরেকটি কক্ষ রয়েছে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় বাথরুমের দরজা ভেঙে মেকআপ রুমের ভেতরে এসে পড়ে। আর বাথরুমের এক্সজস্ট ফ্যান ভেঙে ভবনের বাইরে গিয়ে পড়ে।

এতে স্পষ্ট যে বিস্ফোরণের কেন্দ্র ছিল বাথরুম। তবে অক্ষত ছিল বাথরুমের আয়না, বেসিন। ওই বাথরুমে কোনো বৈদুত্যিক সকেট লাগানো নেই, যার সাহায্যে কোনো বৈদ্যুত্যিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব। অন্যদিকে অক্ষত আছে বাথরুমের একমাত্র বৈদ্যুত্যিক বাতিটিও। পুরনো ভবন হওয়ায় বাথরুমের দেয়ালের বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে মোজাইক। তাছাড়া ওই বাথরুম বা মেকআপ রুমের আশপাশে কোনো রান্নাঘর বা গ্যাসের সংযোগও নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শুটিং-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নিউজবাংলাকে জানান, বিস্ফোরণের সময় ভবনে কোনো বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়নি। বরং ঘটনার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ছুটে গিয়ে বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে দেন।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে টেলিফোনে কথা হয় হাউজ মালিক ইরফান হাইউমের সঙ্গে। তিনি নিউজবাংলাকে জানান, তিন মাস আগে ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা ভাড়া নিয়ে শুটিং হাউজ নির্মাণ করেন। এই টেলিফিল্ম শুটিয়ের প্রথম দিনেই এমন ঘটনা ঘটলেও আরও আগে থেকেই নিয়মিত শুটিংয়ের কাজ চলছে তার হাউজে। কখনও এমন দুর্ঘটনা ঘটেনি।

কীভাবে এমন ঘটনা ঘটলো তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ধারণাই নেই। আমি এখনও শকের মধ্যেই আছি। ঘটনার সময় আমি পাশের রুমেই ছিলাম। হঠাৎ মেকআপ রুমে বিস্ফোরণের শব্দ শুনলাম। ছুটে গিয়ে দেখি অভিনেত্রী চিৎকার করে মেকআপ রুম থেকে বেরিয়ে আসছেন। আমরা তাকে বাথরুমে নিয়ে গায়ে পানি ঢেলে গাড়িতে করে হাসপাতালে পাঠাই।

‘ভবনে যেন আগুন না লাগে সেজন্য মেইন সুইচ বন্ধ করে দিই। ফোন করে পুলিশকে জানাই। এখন কীভাবে এমন ঘটনা ঘটলো তা আমার জানা নেই। পুলিশ তদন্ত করছে, তারাই বের করবে কী ঘটেছিল।’

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ?

বাঁ থেকে- শুটিং হাউজে বিস্ফোরণের পর ক্ষতিগ্রস্ত বাথরুম, মেঝেতে পড়ে থাকা গ্যাস লাইটার ও পোড়া সিগারেটের অংশবিশেষ। ছবি: নিউজবাংলা

বিস্ফোরণের পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পল্লবী থানা পুলিশ। সে সময় মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজ এখন নিউজবাংলার হাতে। তাতে দেখা যায়, বাথরুমের মেঝেতে একটি অক্ষত লাইটার ও সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে। বেসিনের ওপর রাখা আছে একটি সিগারেটের প্যাকেট। এতে বুঝা যায় ঘটনার আগে কেউ বাথরুমে সিগারেট জ্বালিয়েছিলেন। আর সে সময় মেকআপ রুম ভেতর থেকে বন্ধ করে অভিনেত্রী পোশাক পাল্টান। পুলিশের ধারণা অভিনেত্রী নিজেই সিগারেট জ্বালিয়েছিলেন।

জানতে চাইলে অভিনেত্রীর স্বামী রাহাত কবির টেলিফোনে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমিও ওই ফ্লোরে ছিলাম। ঘটনার সময় আমি পাশের রুমে ছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে জানায় সে পোশাক পরিবর্তনের আগে চুল আয়রন করার জন্য সকেটে হেয়ার স্ট্রেইটনার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে এই বিস্ফোরণ ঘটে। তবে আমার স্ত্রী বাথরুমে নাকি মেকআপ রুমে স্ট্রেইটনার কানেক্ট করেছিলেন, তা তার ঠিক মনে নেই।

‘তবে সে এটুকু নিশ্চিত করে বলেছে যে, স্ট্রেইটনার কানেক্ট করার সঙ্গে সঙ্গে রুমের বাতি স্পার্ক করে। এরপরই বিস্ফোরণ ঘটে। আমার ধারণা শুটিং হাউজটি যেহেতু নতুন রং করা, তাই রংয়ের গ্যাস জমা ছিল। সেখানে স্ট্রেইটনারের কানেকশন দেয়ার পরই স্পার্ক থেকে এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।’ স্ত্রী ধূমপায়ী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার স্ত্রী ধূমপায়ী। কিন্তু তার বাথরুমে বসে ধূমপান করার কোনো কারণ নেই। একই সঙ্গে বাথরুমে যে ব্র্যান্ডের সিগারেট মিলেছে সে ওই ব্র্যান্ডের সিগারেট খায় না।’

তবে প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে কোনো বৈদ্যুত্যিক গোলযোগের আলামত পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অভিনেত্রী যে হেয়ার স্ট্রেইটনারের কথা বলছেন সেটিও ঘটনাস্থলে মেলেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে হাউজ মালিক ফোন করে জানালে আমরা তাৎক্ষণিক ছুটে যাই। এ বিষয়ে অভিনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না করা হলেও আমরা অভিনেত্রী ও তার স্বামীর বক্তব্য নিয়েছি। তাদের বিবরণ অনুযায়ী বিস্ফোরণের স্থানটিতে শর্ট সার্কিটের আলামত মেলেনি।

‘আমরা যা পেয়েছি তা হল, বাথরুমে কোনো গ্যাস জমে ছিল। পরে সেখানে কেউ সিগারেট ধরাতে লাইটার জ্বালালে এই বিস্ফোরণ ঘটে।’

বাথরুমে গ্যাস কোথা থেকে জমা হল এবং কে সিগারেট ধরিয়েছিল তা জানতে চাইলে পারভেজ ইসলাম বলেন, ‘এটি তদন্ত শেষ না হলে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।’

থানা-সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র বলছে, অভিনেত্রী আঁখি সম্ভবত বাথরুম ব্যবহারের আগে সেখানে কোনো সুগন্ধি স্প্রে করেছিলেন। পরে হাই কমোডে বসেই সিগারেট ধরাতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আর সে কারণে অভিনেত্রীর দুই উরু, দুই হাতের কনুই পর্যন্ত ও মুখমণ্ডলের কিছু অংশ দগ্ধ হয়েছে।

তাছাড়া বাথরুমে অন্য কোনো গ্যাস জমা থাকার বিষয়টি পুলিশের ধারণায় থাকলেও এর সম্ভাবনা খুব একটা নেই বলে মনে করছে ওই সূত্র। তাদের যুক্তি, এদিন সকাল থেকে অনেকেই সেই বাথরুম ব্যবহার করেছেন এবং এগজস্ট ফ্যান থাকায় লম্বা সময় ওই বাথরুমে গ্যাস জমা থাকা সম্ভবও নয়।

আরও পড়ুন:
শুটিং স্পটে দগ্ধ অভিনেত্রী আঁখি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Bag did not catch the porter wages why?

‘ব্যাগ ধরেইনি, কুলি মজুরি কেন?’

‘ব্যাগ ধরেইনি, কুলি মজুরি কেন?’ গাবতলী বাস টার্মিনালের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজির রসিদ। ছবি: নিউজবাংলা
মেহেরপুর থেকে আসা বাসযাত্রী সনু বিশ্বাস বলেন, ‘আমি টাকা দেব না বললে আমার ব্যাগ আমাকেই নিতে দিচ্ছে না। এমনকি আমি যেসব সিএনজি অটোরিকশ ডাকছি সে প্রতিটিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটা তো ওপেন চাঁদাবাজি ভাই। যে আমার ব্যাগ ধরেইনি, আমি কেন তাকে কুলি মজুরি দেব?’

‘বাসের বাঙ্কার থেকে ব্যাগটা নামিয়ে পাশের ফুটপাতে রাখার সঙ্গে সঙ্গে এই লোক কোথা থেকে এসে একটা রসিদ ধরিয়ে বলে ৪০ টাকা দেন। কাগজটা পড়ে দেখি এটা কুলি মজুরির রসিদ। অথচ আমি কোনো কুলি ডাকিনি এবং আমার ব্যাগ অন্য কেউ বহনও করেনি।’

রাজধানীর মিরপুর মাজার রোড এলাকায় পূর্বাশা বাস কাউন্টারের সামনে কথাগুলো বলছিলেন মেহেরপুর থেকে আসা বাসযাত্রী সনু বিশ্বাস।

এই প্রতিবেদক তার আগে দেখতে পান যে রাফি ট্রেডার্স লেখা অ্যাপ্রন পরিহিত এক যুবক বাস যাত্রী সনু বিশ্বাসের সঙ্গে কী একটি বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন।

এগিয়ে গিয়ে কারণ জানতে চাইলে ওই যাত্রী বলেন, ‘আমি এসেছি মেহেরপুর থেকে। আমার ব্যাগ ছিল বাসের বাঙ্কারে। তেমন ভারি ব্যাগ নয় যে কুলি ডাকতে হবে। আমি নিজে বাঙ্কার থেকে ব্যাগ নামিয়েছি। এখন একটা সিএনটি অটোরিকশা ডেকে বাসায় চলে যাব। এর মাঝে তারা কোনো কারণ ছাড়াই এসে টাকা দাবি করছে।

‘আমি টাকা দেব না বললে সে আমার ব্যাগ আমাকেই নিতে দিচ্ছে না। এমনকি আমি যাওয়ার জন্য যেসব সিএনজি অটোরিকশ ডাকছি সে প্রতিটিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটা তো ওপেন চাঁদাবাজি ভাই। যে আমার ব্যাগ ধরেইনি, আমি কেন তাকে কুলি মজুরি দেব?’

এ বিষয়ে সোহেল নামে রাফি ট্রেডার্সের ওই কর্মীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে আমরা এই এলাকা ইজারা নিয়েছি। এই এলাকার ফুটপাত আর রাস্তায় ব্যাগ রাখলে আমাদের টাকা দিতে হবে।’

এই ঘটনা রোববার দুপুরের। এর ঘণ্টাখানেক আগে একই স্থানে এমন চাঁদাবাজির শিকার হন খন্দকার বশির উদ্দিন মিলন নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাড়ি ঝিনাইদহ। সেখান থেকে পূর্বাশা পরিবহনের বাসে আমার পরিবার দুটি ব্যাগ পাঠিয়েছে। আমি সেই ব্যাগ নিতে এসেছি। বাস থেকে ব্যাগ নামিয়ে আমি সিএনজিতে উঠাতে গেলে এক লোক এসে হাতে রসিদ ধরিয়ে দিয়ে দুই ব্যাগ বাবদ ৮০ টাকা দাবি করে বসে।

‘আমি কোনো কুলিকে ডাকিনি। এমনকি আমার ব্যাগ তুলতে কেউ সাহায্যও করেনি। অথচ এই রাফি ট্রের্ডাসের লোক আমার কাছ থেকে জোর করে ৮০ টাকা নিয়ে গেল। প্রথমে আমি টাকা দেব না বললে সে আশপাশ থেকে আরও ৩-৪ জনকে ডেকে আমাকে মারতে আসে। পরে নিরুপায় হয়ে তাদের টাকা দিয়ে দিলাম।’

আরেক ভুক্তভোগী ইসহাক আলী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘মেয়রের নামে চাঁদাবাজি! ঢাকা শহরে ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে মেয়রকে চাঁদা না দিয়ে শহরে ঢোকা যাবে না। আমি তাদেরকে চাঁদা না দিয়ে গাড়ি ভাড়া করার যতবার চেষ্টা করেছি ততবার সেই গাড়ি তারা ভাঙতে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ব্যাগ প্রতি ৪০ টাকা হিসাবে দুইটা ব্যাগে ৮০ টাকা দিয়ে মাজার রোড থেকে বাসায় ফিরতে পেরেছি।’

রোববার ও আগের কয়েকদিন সরেজমিনে গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে এমন আরও অনেক যাত্রীর কাছ অভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা এসব বিষয়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান।

আবার কুলি মজুরির নামে এই চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে জানালেন টার্মিনালের বিভিন্ন কাউন্টারে দায়িত্বরত কর্মীরা। তারা বলেন, ইজারা নেয়া প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের কাছ আমরাও জিম্মি। আমাদেরও সব পরিষেবা বিল তাদের কাছেই জমা দিতে হয়।

ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কর্তৃপক্ষও কুলি মজুরির নামে রাফি ট্রেডার্সের এই চাঁদাবাজি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। জানে পুলিশ প্রশাসনও। তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন:
চাঁদাবাজি মামলায় চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
অপহরণ-চাঁদাবাজি: সাঁথিয়া ছাত্রলীগ সেক্রেটারিসহ গ্রেপ্তার ৫
হাইওয়ে পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’, চালকদের মহাসড়ক অবরোধ
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটুনি
বরিশালের অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Extortion if you have a bag with you at Gabtali terminal

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’ রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল এলাকায় বাস থেকে ব্যাগ নিয়ে নামলেই চাঁদার রসিদ নিয়ে হাজির ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের লোকজন। ছবি: নিউজবাংলা
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাস থেকে ব্যাগ হাতে নামলেই হাতে কুলি মজুরির রসিদ নিয়ে সামনে হাজির হয় ইজারাদার প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের অ্যাপ্রন পরা কর্মীরা। নিজের ব্যাগ নিজে বহন করলেও চাঁদা না দিয়ে উপায় নেই। পুলিশ, ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিএনসিসি কাউকেই পরোয়া করে না ওরা।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ট্রেন ও বাস স্টপেজগুলোতে যাত্রীর ব্যাগ-বোচকা নিয়ে কুলি-মজুরদের টানাটানি নতুন কিছু নয়। গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে দেয়ার বিনিময়ে জবরদস্তি অতিরিক্ত টাকা আদায়ও গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই বলে বাস থেকে নিজের ব্যাগটা নামিয়ে রাস্তায় রাখলেই চাঁদা দিতে হবে!

রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রকাশ্যে এবং দোর্দণ্ড প্রতাপে এমন চাঁদাবাজি চলছে। গাবতলী টার্মিনাল হয়ে বাসে কোনো গন্তব্যে যেতে বা আসতে হাতে ব্যাগ থাকলেই চাঁদা না দিয়ে নিস্তার নেই।

রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার গাবতলী হয়ে দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আসা-যাওয়া করা যাত্রীদের কাছ থেকে কুলি মজুরির নামে এই চাঁদাবাজি করে এই বাস টার্মিনালের ইজারাদার রাফি ট্রেডার্স।

বাড়তি ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, সময়ক্ষেপণ, পরিবহনকর্মীদের আপত্তিকর আচরণে এমনিতেই দিশেহারা বাসযাত্রীরা। এবার তাতে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে এই চাঁদাবাজি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গাবতলী এলাকায় বাসে উঠা-নামার পর যাত্রীদের ব্যাগ না ধরেই তাদের কাছ থেকে জোরজবস্তি ব্যাগ প্রতি ৪০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে রাফি ট্রেডার্সের কর্মীরা। এ নিয়ে প্রতিদিনই যাত্রীদের সঙ্গে রাফি ট্রেডার্সের কর্মীদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে তা হাতাহাতিতেও গড়াচ্ছে।

গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় নিউজবাংলার সরেজমিন অনুসন্ধানে এই চাঁদাবাজির সত্যতা মিলেছে। ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের এক কর্মকর্তা প্রথমে এমন চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে এর সত্যতা স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

তবে বাস্তবতা হলো, এই চাঁদাবাজদের কাছে পুলিশও যেন অসহায়। ওদের সঙ্গে পেরে না উঠে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে প্রতিকার চেয়েছেন।

রোববার দুপুরে মিরপুর মাজার রোড এলাকায় পূর্বাশা বাস কাউন্টারের সামনে গিয়ে চোখে পড়ল এক যাত্রীর সঙ্গে ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের অ্যাপ্রন পরা এক কর্মী তর্ক করছেন।

জানা গেল, সনু বিশ্বাস নামে ওই যাত্রী মেহেরপুর থেকে এসেছেন। তার কাছ থেকে জোর করে কুলি মজুরি বাবদ ৪০ টাকা আদায় করাকে কেন্দ্র করে এই বিতণ্ডা।

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’
গাবতলী বাস টার্মিনালে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের কার্যালয়। ছবি: নিউজবাংলা

সনু বিশ্বাস বলেন, ‘আমি বাসের বাঙ্কার থেকে ব্যাগ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে এই লোক কোথা থেকে এসে একটা রসিদ ধরিয়ে বলে, ৪০ টাকা দেন। পরে কাগজটা পড়ে দেখি এটা কুলি মজুরির রসিদ। অথচ আমি কোনো কুলি ডাকিনি এবং আমার ব্যাগ অন্য কেউ বহনও করেনি।’

এ বিষয়ে সোহেল নামে রাফি ট্রেডার্সের ওই কর্মীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে আমরা এই এলাকা ইজারা নিয়েছি। এই এলাকার ফুটপাত আর রাস্তায় ব্যাগ রাখলে আমাদের টাকা দিতে হবে। আর আপনি ঝামেলা করতাছেন ক্যান? আপনি এইখান থ্যইক্যা যান।’

আপনার বস কে- এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুজন নামে একজনকে দেখিয়ে দেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে সুজন বলে ওঠেন, ‘এসব রিপোর্ট করে আপনি আমাদের কিছুই করতে পারবেন না। ওই যে নাবিল বাস কাউন্টারের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে। আপনার যা জানার সেটা আপনি ওই চায়ের দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন।’

এরপর ওই চায়ের দোকানদারের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি নিজেকে শাহীন নামে পরিচয় দেন। চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। গাবতলী বাস টার্মিনালের দ্বিতীয় তলায় আমাদের অফিস আছে। আপনি সেখানে গিয়ে কথা বলেন।’ গাবতলী বাস টার্মিনালের দ্বিতীয় তলায় রাফি ট্রেডার্সের অফিসে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।

সনু বিশ্বাসের মতো আরও বেশ কয়েকজন বাস যাত্রী কুলি মজুরির নামে এভাবে গাবতলী বাস টার্মিনালে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন।

তাদের একজন খন্দকার বশির উদ্দিন মিলন নিউজবাংলাকে বলেন, পূর্বাশা পরিবহনের বাস থেকে ব্যাগ নামিয়ে সিএনজিতে উঠাতে গেলে এক লোক এসে রসিদ ধরিয়ে দিয়ে দুই ব্যাগ বাবদ ৮০ টাকা দাবি করে। অথচ আমি কোনো কুলিকে ডাকিনি। আমার ব্যাগ তুলতে কেউ সাহায্যও করেনি। অথচ এই রাফি ট্রের্ডাসের লোক আমার কাছ থেকে জোর করে ৮০ টাকা নিয়ে গেল।

ইসহাক আলী নামে আরেক ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘মেয়রের নামে চাঁদাবাজি! শেষ পর্যন্ত ব্যাগ প্রতি ৪০ টাকা হিসাবে দুইটা ব্যাগে ৮০ টাকা দিয়ে মাজার রোড থেকে বাসায় ফিরতে পেরেছি।’

প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি

গাবতলী বাস টার্মিনালে এক কাউন্টারের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এরা মাফিয়া কায়দায় এই বাস টার্মিনাল চালায়। কেউ এদের কিছু বলে না। বাস টার্মিনালসহ পর্বত সিনেমা হল থেকে মাজার রোড পর্যন্ত পুরা এলাকা এই রাফি ট্রেডার্সের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে। এই এলাকায় কোনো যাত্রী ফুটপাত অথবা ফুটপাতের পাশে রাস্তায় কোনো ব্যাগ রাখলেই ওদেরকে টাকা দিতে হয়।

‘আমরা আমাদের কাউন্টারের ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিচ্ছন্ন বিলসহ এ বাবদ সে বাবাদ সব টাকাই এদের হাতে দিই। অথচ এরা এই বাস টার্মিনাল পরিষ্কার কী করে সেটা আপনারাই দেখেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই টার্মিনালসহ সামনের রাস্তায় এদের একশ’র বেশি কর্মী থাকে সব সময়। এর মধ্যে রাফি ট্রের্ডাসের নাম লেখা ড্রেস পরে থাকে ৩০-৪০ জন। বাকিরা সাধারণ মানুষের মতো থাকে। এই ড্রেস পরা কর্মীরা যাত্রীদের কুলি মজুরি রসিদ ধরিয়ে দিয়ে চাঁদাবাজি করে। এরা যাত্রীদের ছোট ব্যাগে ৪০ টাকা আর বিদেশ থেকে আসা যাত্রীর ব্যাগ প্রতি নেয় ১২০ টাকা।

‘এরা লক্ষ্য রাখে যে যাত্রীদের ব্যাগে বিমানবন্দরের কোনো ট্যাগ লাগানো আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে সেই যাত্রীর আর রক্ষা নেই। ব্যাগ প্রতি ১২০ টাকা আদায় করে ছাড়ে। কোনো যাত্রী টাকা দিতে না চাইলে সাধারণ মানুষের বেশে থাকা ওদের বাকি সদস্যরা গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে ঝামেলা বাধিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে গায়ে হাত তুলে বসে।

‘অনেক সময় যাত্রীরা আমাদের কাছে অভিযোগ করে। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই। কিছু বললে তো আমরাই এখানে থাকতে পারব না।

আরেক কাউন্টারের এক কর্মীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনিও পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘রাফি ট্রেডার্সের ড্রেস পরা কর্মীরা নামে কুলি হলেও এদের কাউকে দিয়ে আপনি কোনো মালামাল উঠাতে পারবেন না। এই ৩০-৪০ জনের একেক জন ১০ হাজার টাকার উপরে চাঁদাবাজির করে আয় করে।

‘সব মিলিয়ে দিনে তারা ৩-৪ লাখ টাকার চাঁদাবাজি করে। এদের কাউকেই রাফি ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে বেতন দেয়া হয় না। এরা চাঁদাবাজির কমিশন পায়। তাছাড়া এই টাকা পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে উপর মহলেও যায় বলে শুনেছি। তাই তারাও সব কিছু দেখে না দেখার ভান করে।’

রাফি ট্রেডার্সের এই চাঁদাবাজি নিয়ে মাজার রোড়ে কর্তব্যরত পুলিশ সার্জেন্ট রাফিউল ইসলাম রাফির সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তিনি বলেন, ‘এই রাফি ট্রেডার্স ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসি) কাছ থেকে পুরো গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা ইজারা নিয়েছে। আমরাও যাত্রীদের ব্যাগ বহন না করে জোর করে টাকা নেয়ার অভিযোগ পাই। এ বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সব জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যাত্রীরা এভাবে একের পর এক হয়রানির শিকার হলেও কেউ এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করে না। তাই আমরা কিছু করতে পারি না। এরা টাকা দাবি করলে সাধারণ মানুষ ঝামেলা এড়াতে টাকা দিয়ে চলে যায়। আমাদেরও কিছু জানায় না।’

সাধারণ মানুষ মামলা না করলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে আপনারা কেন এই চাঁদাবাজি বন্ধ করছেন না?- এমন প্রশ্নে তিনি কোনও উত্তর দেননি।

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’
ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের চাঁদাবাজির উল্লেখ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লেখা সহকারী ব্যবস্থাপকের চিঠির অনুলিপি।

গাবতলী বাস টার্মিনালের প্রধান কর্তৃপক্ষ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক (গাবতলী বাস টার্মিনাল) মোহাম্মাদ জাহিদ হাসান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি যাত্রীদের কাছ থেকে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য চাঁদাবাজির অভিযোগ পাই। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর চিঠি দিয়ে সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন দেখি স্যারেরা কী সিদ্ধান্ত নেন।’

ডিএনসিসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে রাফি ট্রেডার্সকে ইজারা দেয়ার সময় বেশকিছু শর্ত দেয়া হয়। তার মধ্যে ২২ নম্বর শর্ত- কোনো যাত্রী সামান্য মালামাল উঠানো বা নামানোর জন্য কুলির সাহায্য না চাইলে কোনো কুলি ওই মালামাল স্পর্শ করা বা মজুরি দাবি করতে পারবে না। ওরা এই শর্ত ভঙ্গ করেছে।’

ডিএনসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ সেলিম রেজা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাফি ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে আমরাও এই অভিযোগ পেয়েছি। এর আগেও আমরা তাদের সতর্ক করেছি। এখন আমরা তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছি।

‘এখনও যদি তারা এই কাজ করে তাহলে সিরিয়াসলি তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় এ ধরনের কুলি মজুরির রসিদ দিয়ে চাঁদাবাজি করার কোনো সুযোগ নেই।’

ইজারাদার রাফি ট্রেডার্স যা বলছে

রাফি ট্রের্ডাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) লিয়াকত হোসেন সবুজ নামে এক ব্যক্তি। নিউজবাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে রাফি ট্রেডার্সের প্রজেক্ট ডিরেক্টর সাইফুল ইসলাম শ্রাবণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এমন চাঁদাবাজি হাওয়ার তো কথা না। আমাদের এখানকার কর্মীরা কোনো যাত্রীর মালামাল বহন করা নিয়ে জোরজবরদস্তি করে না। এরকম করার নিয়মও এখানে নেই। যাদের কুলির প্রয়োজন হয় শুধু তাদের কাছ থেকেই আমাদের কর্মীরা টাকা নেয়।’

যাত্রীদের অভিযোগ, উত্তর সিটি করপোরেশনের চিঠিসহ নিউজবাংলার কাছে এই চাঁদাবাজি চলার বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ আছে জানালে শ্রাবণ বলেন, ‘আসলে কি, এরকম দুই/একটা ঘটনা হয়তো ঘটতে পারে। ওরা লেবার মানুষ তো। অনেক কিছুই হয়তো ওরা করে ফেলে। এর আগেও আমরা ওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা সব সময়ই ওদের মনিটরিংয়ে রাখি। তারপরও আমি খোঁজ নিচ্ছি, যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে ব্যবস্থা নেব।’

আরও পড়ুন:
চাঁদাবাজি মামলায় চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
অপহরণ-চাঁদাবাজি: সাঁথিয়া ছাত্রলীগ সেক্রেটারিসহ গ্রেপ্তার ৫
হাইওয়ে পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’, চালকদের মহাসড়ক অবরোধ
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটুনি
বরিশালের অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
E ticketing Anarchy reduced fares not reduced on roads

ই-টিকেটিং: নৈরাজ্য কমেছে ভাড়ায়, কমেনি সড়কে

ই-টিকেটিং: নৈরাজ্য কমেছে ভাড়ায়, কমেনি সড়কে ই-টিকেটিং চালুর পর ভাড়ায় নৈরাজ্য কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, ‘আলিফ এবং শিকড় পরিবহনে আমি নিয়মিত চলাচল করি। ই-টিকেটিং চালু হওয়ার পরে এই দুই বাসের ভাড়া কমেছে, কিন্তু তারা টিকিট দিতে উদাসীন। অনেক সময় কনডাক্টর ইচ্ছা করে বাসের দরজা থেকে ভেতরে আসেন না। নামার সময় তাড়াহুড়ো করে টাকা রেখে দেন, কিন্তু টিকিট দেন না।’

রাজধানীতে ই-টিকেটিং চালুর উদ্দেশ্য ছিল দূরত্ব অনুযায়ী বাস ভাড়া নিশ্চিত, নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে যাত্রী ওঠানামা এবং এক বাসের সঙ্গে আরেকটির রেষারেষি বন্ধ করা।

ই-টিকেটিংয়ের আওতাধীন বিভিন্ন রুটে বাস ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য কিছুটা কমেছে, তবে বাকি দুই সমস্যা থেকেই গেছে।

গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বাসে ই-টিকেটিং চালু করে। এর আওতায় চলাচল করা রুটে প্রথমে কাউন্টারে টিকিটের ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে কাউন্টার উঠিয়ে বাসে টিকিট কাটার ব্যবস্থা করা হয়, তবে টিকিটের গায়ে দূরত্ব লেখা না থাকায় ন্যায্য ভাড়া নেয়া হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে অনেক যাত্রীর।

কাউন্টার উঠিয়ে দেয়ার কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষ জানায়, কাউন্টার থেকে পাওয়া টাকা ব্যানার মালিকরা বাসমালিকদের ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেন না। তাদের দুর্নীতির কারণে বাসমালিকরা লাভ পেতেন না। তাই বাসের মধ্যে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়।

রাজধানীতে ৯৬টি বাস রুটের মধ্যে ৪৬টিতে চলছে ই-টিকেটিং। চলতি মাসের শেষে অথবা আগামী মাসের শুরুতে আরও ১৭ রুটকে ই-টিকেটিংয়ের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে বাসমালিক সমিতি।

ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ঢাকার ৯৬ রুটকে ই-টিকেটিংয়ের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।

ই-টিকেটিংয়ের আওতায় চলাচল করা বেশ কয়েকটি রুটে ঘুরে দেখা যায়, যাত্রীদের ই-টিকিট দিতে অনীহা কনডাক্টরদের। অনেক যাত্রীদের মধ্যেও উদাসীনতা আছে টিকিট নিয়ে। আবার অনেক যাত্রীকে চেয়ে চেয়ে টিকিট নিতে হয়েছে।

একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, না চাইলে কনডাক্টররা টিকিট দেন না। বাসের রেষারেষি রয়েই গেছে। এ ছাড়া যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হয়। এমনকি চলন্ত রাস্তার মাঝখানে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী তোলা হয়।

মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, ‘আলিফ এবং শিকড় পরিবহনে আমি নিয়মিত চলাচল করি। ই-টিকেটিং চালু হওয়ার পরে এই দুই বাসের ভাড়া কমেছে, কিন্তু তারা টিকিট দিতে উদাসীন। অনেক সময় কনডাক্টর ইচ্ছা করে বাসের দরজা থেকে ভেতরে আসেন না। নামার সময় তাড়াহুড়ো করে টাকা রেখে দেন, কিন্তু টিকিট দেন না।’

‘শুধু ভাড়াই কমেছে, কিন্তু বাসে সেই আগের বিশৃঙ্খলা রয়েই গেছে।’

কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে উত্তরা রুটে চলাচল করা প্রজাপতি ও পরিস্থান পরিবহনেও একই চিত্র দেখা যায়।

এ রুটে চলাচলকারী ইয়াসিন মোল্লা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রথম থেকেই এই রুটে ই-টিকেটিং চালু হয়। প্রথম দিকে যখন কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে উঠতাম, তখন একটা শৃঙ্খলা ছিল। পরে ই-টিকিট বাসের ভেতরে কাটা শুরু হলে সেই আগের মতোই রেষারেষি শুরু হয়।’

তিনি বলেন, ‘এখন তো ড্রাইভারের সঙ্গে চিল্লাপাল্লা করতে হয় নিয়মিত। তারা বাস থামিয়ে মিনিটের পর মিনিট বসে থাকে। যখন একই রুটে পেছনে আরেকটা বাস আসে, তখন শুরু হয় রেষারেষি।

‘মাঝে মাঝে এক বাসের চালক আরেক বাসকে ধাক্কাও দেয়। যে কারণে ই-টিকেটিং চালু করা, সেটা ফলপ্রসূ হয়নি।’

এই রেষারেষির কারণ অবশ্য বাসের মালিকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অনেক রুটের বাসমালিক চুরি ঠেকাতে এখন চুক্তিতে গাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রজাপতি ও পরিস্থান পরিবহনের অন্তত সাতজন বাসমালিকের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। এই দুই পরিবহনের বাস চলে চুক্তিতে। এ ছাড়া অন্য রুটের অনেক বাসই চলে চুক্তিতে।

তাদের একজন বলেন, ‘যখন কাউন্টারে ই-টিকিট দেয়া হতো, তখন ব্যানার মালিকরা দুর্নীতি করে টাকা মেরে দিত। পরে বাসের ভেতরে টিকিট দেয়া শুরু হলে কনডাক্টর ভাড়ার টাকা নিয়ে টিকিট দিত না। আর টিকিট না দিলে মেশিনে টাকার পরিমাণ উঠত না। বেলা শেষে আমরা টাকা পেতাম না।

‘এখন প্রতিদিন আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে চুক্তিতে তাদের গাড়ি ভাড়া দিই। আমাদের বাসপ্রতি আড়াই হাজার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে সব খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, সেটা ড্রাইভার ও কনডাক্টরের লাভ।’

অর্থাৎ বাস মালিকদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, টিকিট নামে মাত্র। বাকি সব আগের নিয়মেই চলছে।

সব বাস চুক্তিতে না চললেও চুরি ও নৈরাজ্য রয়েই গেছে। বিকাশ পরিবহনের তিনটি বাসের মালিক মো. কাওসার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাস চুক্তিতে চলে না। আমাদের কোম্পানি থেকে বলা আছে সবাইকে টিকিট দিতে হবে, তবে তারা মাঝে মাঝে টিকিট দেয় না, এটা আমরা জানি। কয়েক দিন ই-টিকেটিং চালু হয়েছে। আশা করছি কয়েক দিন গেলে ঝামেলা দূর হবে।’

যাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের দায়িত্ব নিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। প্রতিদিন দেড় শ টাকা মেশিন ভাড়া দিই। এটা তো আর এমনি এমনি দেব না।’

ভাড়ার বিষয়টা কিছুটা সমাধান হলেও বাকি দুই বিষয়ে এখনও বিশৃঙ্খলা রয়ে গেছে বলে স্বীকার করে নেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আগে যাত্রীদের থেকে অধিক ভাড়া আদায় করা হতো। ই-টিকেটিং চালু করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভাড়ার নৈরাজ্য ঠেকানো। শতভাগ ভাড়ার নৈরাজ্য ঠেকানো না গেলেও ম্যাক্সিমাম নৈরাজ্য বন্ধ হয়েছে।’

বাসের রেষারেষি এখনও আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনও যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো হচ্ছে। এই ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর ৯৭ রুটে ই-টিকেটিংয়ের আওতায় আনার কাজ শেষ হবে। পরবর্তী সময়ে এই দুই বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করব। পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে আমরা ব্যবস্থা নেব। এ ছাড়া লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলো চলাচল বন্ধ করব।’

কিছু কিছু রুটে চুক্তিতে বাস চলছে স্বীকার করে তিনি যাত্রীদের টিকিট নেয়ার বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন।

এসব বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ভাড়া নির্ধারণের যে শর্ত আছে, সেই শর্তে না চলে যদি বাস চুক্তিতে চলে, তাহলে পরিবহনের শৃঙ্খলা, রেষারেষি এবং ভাড়ার নৈরাজ্য কোনোভাবেই বন্ধ হবে না। তার আগে চালকের স্বচ্ছ নিয়োগ ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে।

‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সঠিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে যেন তৃতীয় পক্ষের হাতে টাকা না যায়। ই-টিকেটিং তার অন্যতম একটা হাতিয়ার ছিল।’

তিনি বলেন, ‘গণপরিবহনে যদি নগদ লেনদেন বন্ধ না থাকে, ভাড়ার নৈরাজ্য কমবে না। দেশ উন্নত হচ্ছে, কিন্তু পরিবহন খাত উন্নত হচ্ছে না। ভাড়া আদায়ের পরে মালিকের পকেটে পৌঁছাবে কি না, এটা নিয়ে যদি চিন্তা করা লাগে, তাহলে র‍্যাপিড পাসের প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিবহনে নগদ লেনদেন বন্ধ করা গেলে এ খাতের মানোন্নয়ন হবে।’

আরও পড়ুন:
এলিফ্যান্ট রোডে বাসচাপায় বৃদ্ধার মৃত্যু
দেশের প্রতিটি নাগরিকের হেলথ কার্ড থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
রাজধানীতে ৭১১ বাসে ই-টিকেটিং চালু মঙ্গলবার
নতুন বছরেও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা
বগুড়ায় জমি নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৫০

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Auto driver by day thief by night

দিনে অটোচালক, রাতে চোর

দিনে অটোচালক, রাতে চোর মোটরসাইকেল চোর চক্রের মূলহোতা মো.জসিম ও তার সহযোগীর। ছবি: নিউজবাংলা
গত ডিসেম্বরে মিরপুর মডেল থানাধীন একটি বাসা থেকে দুটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তদন্তে নেমে মোটরসাইকেল চোর চক্রের মূলহোতা মো.জসিম ওরফে বাইক জসিমের সন্ধান পায় পুলিশ।

দিনে রাজধানীর মিরপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন মাদারীপুর শিবচরের বেলদারহাট গ্রামের বাসিন্দা মো. জসিম। রাতে চুরি করতেন মোটরসাইকেল। এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় তার নাম হয় বাইক জসিম। সম্প্রতি নারায়নগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ।

পুলিশ জানায়, জসিমের ২০ সদস্যের একটি দল রয়েছে। এ দল জসিমের নেতৃত্বে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল চুরি করে আসছে। গত দশ বছরে পাঁচ শতাধিক মোটরসাইকেল চুরি করেছেন জসিম।

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোহাম্মদ মহসীন জানান, গত ডিসেম্বরে মিরপুর মডেল থানাধীন একটি বাসা থেকে দুটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তদন্তে নেমে মোটরসাইকেল চোর চক্রের মূলহোতা মো.জসিম ওরফে বাইক জসিমের সন্ধান পায় পুলিশ। পরে গত ১৪ জানুয়ারি তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর মোটরসাইকেল চোর চক্রের আরও চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে চারটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছ ।

মিরপুর থানার ওসি বলেন, ‘জসিমের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় কমপক্ষে ১২ টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সে ১০ বার জেল খেটেছেন। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। ’

আরও পড়ুন:
গরু ব্যবসায়ীর ১৩ লাখ টাকা চুরি, কারাগারে বন্ধুবেশী ‘চোর’
গুনে দেয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে পালাল প্রতারক
চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল হাফিজারের
বিদ্যালয়ের ১৪ ল্যাপটপ চুরি
গরুচোর আতঙ্ক শেরপুরে

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The meter is not a money laundering factory

মিটার তৈরি নয়, টাকা পাচারের ফ্যাক্টরি ‘বেসিকো’

মিটার তৈরি নয়, টাকা পাচারের ফ্যাক্টরি ‘বেসিকো’ খুলনার মোহাম্মদনগরে বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানির (বেসিকো) একমাত্র ফ্যাক্টির ও মূল কার্যালয়। ছবি: নিউজবাংলা
বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানির (বেসিকো) অনিয়ম-দুর্নীতির ডালপালা ছড়িয়েছে চারপাশে। ভিত্তিহীন বাজেট তৈরি, মালামাল ক্রয়ে সরকারি নিয়ম অমান্য, স্বাক্ষর স্ক্যান করে বোর্ড সভার ভুয়া কার্যবিবরণী তৈরি, ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি, সার্কুলার ছাড়া নিয়োগ, জাল স্বাক্ষরে ব্যাংক থেকে টাকা হন্তান্তর, সর্বোপরি মিটার ক্রয়ের জন্য চুক্তিবহির্ভূত ও মিথ্যা ডিক্লারেশনে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে কোম্পানিটি।

দেশের বিদ্যুৎ খাত ডিজিটালাইজেশনে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সংযোজনে কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে বেশ আগেই। এই মিটার তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানিকে (বেসিকো)। কিন্তু সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি সে পথে হাঁটেনি। তারা মিটার তৈরি না করে চীন ধেকে আমদানি করে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ চালিয়ে দিয়েছে।

আর রেডিমেইড মিটার আমদানির জন্য ব্যাংকে যে অংকের এলসি খোলা হয়েছে, সেই সংখ্যক মিটার বা যন্ত্রাংশ দেশে আসেনি। মিটার ক্রয়ের জন্য চুক্তিবহির্ভূত ও মিথ্যা ডিক্লারেশনে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে কোম্পানিটি।

বেসিকোর অনিয়ম-দুর্নীতির ডালপালা ছড়িয়েছে চারপাশে। ভিত্তিহীন বাজেট তৈরি, মালামাল ক্রয়ে সরকারি নিয়ম অমান্য, স্বাক্ষর স্ক্যান করে বোর্ড সভার ভুয়া কার্যবিবরণী তৈরি, ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি, সার্কুলার ছাড়া নিয়োগ, ফ্যাক্টরি ও আবাসিক ভবনের ভাড়ার টাকা আত্মসাৎ, জাল স্বাক্ষরে ব্যাংক থেকে টাকা হন্তান্তরসহ লাগামহীন দুর্নীতির কারণে গত দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে কোম্পানিটি।

তবে কোম্পানি বন্ধ থাকলেও দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিদ্যুৎ খাতকে ডিজিটালাইজেশনের জন্য স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সংযোজনে ব্যয় সাশ্রয় করতে ২০১৮ সালে দেশেই মিটার তৈরির নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) পক্ষ থেকে খুলনায় মিটার তৈরির কারখানা তৈরির প্রস্তাব করা হয়।

২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর নিবন্ধিত হয় কোম্পানি। এর ৫১ শতাংশ মালিকানা ওজোপাডিকো এবং ৪৯ শতাংশ চায়না হেক্সিংয়ের। শুরুতে কোম্পানির নাম ছিল বাংলাদেশ স্মার্ট প্রিপেইড কোম্পানি। পরে নামকরণ হয় বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি। ২০২০ সালে শুরু হয় বাণিজ্যক কার্যক্রম। এক বছরের মাথায় ধারাবাহিক অনিয়মের কারণে কোম্পানি বন্ধ রাখে পরিচালনা পর্ষদ।

শর্ত ভঙ্গ করে রেডিমেইড মিটার আমদানি

বেসিকোর মিটার তৈরির ব্যাপারে ২০১৯ সালের ৩০ মে তৎকালীন বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়, ‘মিটার অবশ্যই বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল করে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।‘

২০২০ সালে ওজোপাডিকোর আওতাধীন যশোর এলাকায় ৬৯ হাজার ১৬০টি মিটার সরবরাহের অর্ডার পায় বেসিকো। এর বিপরীতে ওই বছরের ৫ ও ১৪ মে দুটি এলসি খুলে ২০ লাখ ১১ হাজার ৬৬০ ডালারের বিনিময়ে চীন থেকে রেডিমেইড মিটার আমদানি করা হয়। সরবরাহের সময় সেই মিটারে ‘সার্টিফিকেট অফ কান্ট্রি অফ অরিজিন’-এ বলা হয়, ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড বা আস ইন বাংলাদেশ’। এর মাধ্যমে সরাসরি শর্ত ভঙ্গ করা হয়।

দেশে স্মার্ট মিটারের যন্ত্রাংশ আমদানিতে ১০ শতাংশ ও রেডিমেইড মিটার আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। বেসিকোর আমদানি করা রেডিমেইড মিটারের জন্য ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়েছে, যাতে আর্থিকভাবে লোকসান হয় বেসিকোর।

২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর বেসিকো থেকে ওজোপাডিকোতে পাঠানো পত্রে দেখা যায়, শর্ত ভঙ্গ করে তারা চীন থেকে সরাসরি মিটার আমদানি করেছে।

ওজোপাডিকো সূত্র জানায়, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (ওটিএম) ওইসংখ্যক মিটার কিনলে তাদের প্রায় ১৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সাশ্রয় হতো।

সেবা খাতের ক্রয়ে কোটি কোটি টাকা পাচার

২০২০ সালের ২৫ অক্টোবরে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঢাকার গুলশান শাখায় একটি এলসি খোলে বেসিকো। ওজোপাডিকোর সঙ্গে মিটার বিক্রির চুক্তিতে বিভিন্ন সেবা খাতের জন্য এই এলসি খোলা হয়।

ওই এলসির এক নম্বর ছিল এমডিএম ও হেস (এইচইএস) সিস্টেম সফটওয়্যার বাবদ ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকার। তবে ওই সফট্যাওয়ারটি ওজোপাডিকোর কাছে বিক্রির জন্য বেসিকো চুক্তি করেছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা এলসি করে চীনে পাচার করা হয়েছে।

হেস সিস্টেম হলো বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটারের ডাটা মূল সার্ভারে পাঠানোর একটি সফটওয়্যার। যদিও ইতোপূর্বে এ ধরনের সফটওয়্যার আইডিয়াল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ওজোপাডিকোকে মাত্র ৫৮ লাখ ৬২ হাজার টাকায় সরবরাহ করেছিল। এই সফট্যাওয়ারটি পুনরায় কেনার জন্য ওজোপাডিকোর বোর্ড সভায় কখনও অনুমোদন করা হয়নি। তারপরও বেসিকোর সঙ্গে সফটওয়্যারটি কেনার জন্য চুক্তি করে ওজোপাডিকো।

বেসিকো’র পক্ষ থেকে ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকায় হেস সিস্টেম আমদানি দেখানোতে ঢাকা কাস্টমস অথরিটি ভ্যাট বাবদ ৬ কোটি ২০ লাখ টাকার চাহিদা ইস্যু করে। এর ফলে মাত্র ৫৮ লাখ ৬২ হাজার টাকার একটি হেস সিস্টেম কিনতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

শুধু তাই নয়, বেসিকো থেকে ওই হেস সিস্টেমটি ওজোপাডিকোকে সরবরাহ করার পর সোর্স কোডসহ যাবতীয় ডাটাবেজ হস্তান্তর করা হয়নি। এ কারণে হেস সিস্টেমে কোনো ত্রুটি হলে ওজোপাডিকোর কিছুই করার থাকবে না। তবে আইডিয়াল ইলেক্ট্রনিক এন্টারপ্রাইজ থেকে যে হেস সিস্টেমটি ওজোপাডিকোকে সরবরাহ করা হয়েছিল, তার সঙ্গে সোর্স কোড ও ডাটাবেজ হস্তান্তর করা হয়েছিল।

২০২১ সালের ২৪ অক্টোবরে ওজোপাডিকোর প্রি-পেইড মিটারিং প্রকল্পের পরিচালকের এক পত্রে বলা হয়েছে, বেসিকোর হেস সিস্টেমের সোর্স কোড, ডাটা ফ্লো ডায়াগ্রাম, ডাটাবেজসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি।

ওই এলসির দুই নম্বরে রয়েছে হেস সিস্টেম স্টেস্টিং ও ইনস্টলিং বাবদ ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। যদিও হেস সিস্টেমের সঙ্গে স্টেস্টিং ও ইনস্টলিং যুক্ত থাকে। আলাদা করে এই খাতে অর্থ নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ টাকার পুরো অংশই পাচার হয়েছে।

এলসির তিন নম্বরে রয়েছে প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট সার্ভিস বাবদ ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। যদিও ওজোপাডিকোর সঙ্গে বেসিকোর চুক্তিতে এ বাবদ কোনো অর্থের উল্লেখ নেই। বেসিকো তার নিজস্ব টেকনিক্যাল লোকবল দিয়ে মিটার স্থাপন ও ফ্যাক্টরিতে উৎপাদনের কথা ছিল। যারা টেকনিকাল পার্সন হিসেবে চীন থেকে এসেছেন তারা বেসিকো থেকে বেতন নিয়ে কাজ করেছেন। ফলে এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো অর্থ দেয়ার সুযোগ নেই। এভাবে পুরো টাকাটাই পাচার হয়েছে।

এলসির চার নম্বরে রয়েছে বিদেশ প্রশিক্ষণ বাবদ ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। যদিও এ খাতে ওজোপাডিকোর সঙ্গে বেসিকোর চুক্তি ছিল ৪২ লাখ টাকা। তবে বাস্তবে ওজোপাডিকোর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়নি। এভাবে প্রশিক্ষণের নামেও বিদেশে টাকা পাচার করা হয়েছে।

এলসির পাঁচ নম্বরে রয়েছে মিটারের তিন বছর ওয়ারেন্টি বাবদ ৭ কোটি ২২ লাখ টাকা। ভুল অজুহাতে এ খাতের টাকাটাও বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

এলসির ছয় নম্বরে রয়েছে হেস সিস্টেম তিন বছরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তবে এই বাবদ ওজোপাডিকোর সঙ্গে বেসিকোর চুক্তি ছিল ৩২ লাখ টাকা। সে হিসাবে অতিরিক্ত ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ব্যাংকে এই এলসি খোলা হয়েছিল বেসিকোর অর্থ পরিচালক আব্দুল মোতালেব ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ে ওয়েনজুনের যৌথ স্বাক্ষরে। তবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছেড়ে যান ওয়েনজুন। বাংলাদেশে তার অনুপস্থিতিতেই ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি এলসিগুলোর বিল দেয়া হয় তার জাল স্বাক্ষরে।

এছাড়াও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) সঙ্গে ২০২০ সালের ১১ জুন বেসিকোর ২০ হাজার মিটার বিক্রির চুক্তি হয়। এ চুক্তির বিভিন্ন সেবা খাত দেখিয়ে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের খুলনা শাখা থেকে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার এলসি খোলা হয়। তার মধ্যে ছিল মিটার ইন্টিগ্রেশন, প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, মিটার ওয়ারেন্টি ও ট্রেনিং; যাতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল না। এমনকি মিটার ক্রয়ের জন্য এসব খাতে অর্থ প্রদানের সুযোগ নেই।

এসব টাকা পাচার না হলে বেসিকোর ৩৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বেশি লাভ হতো।

ওজোপাডিকোর এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এই অর্থ পাচারের সঙ্গে বেসিকোর অর্থ পরিচালক আব্দুল মোতালেব এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ে ওয়েনজুন ও রুলং ওয়াংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব অর্থ পাচার করে তারা মানি লডারিং-এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

আমদানির পরিবহন খাতেও অর্থ পাচার

বেসিকোর পক্ষ থেকে মোট এক লাখ ৯০ হাজার মিটার বা তার যন্ত্রাংশ আমদানির পরিবহন খরচ বাবদ বিভিন্ন সময়ে প্রিমিয়ার ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে এলসি খোলা হয়েছে। এ বাবদ মোট টাকা ব্যায় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। তবে ওজোপাডিকোর নীরিক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যক মিটার আমদানিতে পরিবহন বাবদ ৩৭ লাখ টাকার বেশি কোনোভাবেই খরচ হতে পারে না। এখান থেকেও কমপক্ষে এক কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।

দুই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন দামে মিটার বিক্রি

ওজোপাডিকো ও ডিপিডিসি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) বেসিকো’র কাছ থেকে মিটার কিনেছে। তবে বেসিকো প্রতিটি সিঙ্গেল ফেজ মিটার ডিপিডিসিকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় ও ওজোপাডিকোকে ৫ হাজার ৮৮৯ টাকায় বিক্রি করেছে। সে হিসাবে ডিপিডিসি থেকে ওজোপাডিকো’র কাছে মিটার প্রতি এক হাজার ৩৮৯ টাকা করে বেশি নিয়েছে।

সূত্র জানায়, ওজোপাডিকো বেসিকোর কাছ থেকে এক লাখ ৬৬ হাজার প্রি-পেইড মিটার ক্রয় করেছে। এই হিসাবে বেসিকো অতিরিক্ত লাভ করেছে ২৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। যদিও বেসিকো লাভ বাবদ তাদের বাজেট দেখিয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

ওজোপাডিকোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই লাভের টাকার একটি বড় অংশই চীনে পাচার করা হয়েছে।

ভিত্তিহীন বাজেট প্রণয়ন

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেসিকোর ৭তম বোর্ড সভায় যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল তার বাস্তবসম্মত ভিত্তি নাই। যথাযথভাবে বাজেট প্রণয়ন করলে বেসিকোর ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা টাকা লাভ হতো। অথচ তাদের লাভ দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। বাজেটে তারা মালামাল ক্রয়ে যথাযথ অনুমোদন নেয়নি। কারণ তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থ পাচার।

মালামাল ক্রয়ে সরকারি নিয়ম অমান্য

বেসিকো সরকারি কোম্পানি হিসেবে ওজোপাডিকো ও ডিপিডিসিকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) মিটার সরবরাহ করেছে। তবে এসব মিটার বা যন্ত্রাংশ ক্রয়ে বেসিকো সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) অনুসরণ করেনি। বরং বেসিকোর শেয়ারের অংশীদার হেক্সিং থেকে বিভিন্ন মালামাল বেশি দামে কেনা হয়েছে।

বেসিকোর ৫১ শতাংশ মালিক ওজোপাডিকো। আর বেসিকোর ব্যবস্থাপনায় ওজোপাডিকো’র কর্মকর্তারা থাকা সত্ত্বেও হেক্সিংয়ের স্বার্থ সুরক্ষা হয়েছে।

নিয়োগে অনিয়ম

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোন ধরনের নিয়ম নীতি না মেনে নিজেদের ইচ্ছামতো কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে বেসিকোতে। এক্ষেত্রে নিয়োগের কোনো সার্কুলার দেয়া হয়নি। নিজেদের পছন্দের লোকবল নিয়োগের জন্য জীবন বৃত্তান্ত সংগ্রহ করে মেধা তালিকা প্রস্তুত করা হলেও তার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়নি। অনেকে মেধা তালিকা প্রস্তুতের পরীক্ষায় হাজির না হয়েও নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া এই নিয়োগের ব্যাপারে বোর্ডের কোনো অনুমোদন নেই।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

খুলনার রূপসা সেতুর বাইপাস সড়কের মোহাম্মদনগর এলাকার মৃধা কমপ্লেক্সে বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানির (বেসিকো) একমাত্র ফ্যাক্টির ও মূল কার্যালয়। সম্প্রতি ফ্যাক্টির ঘুরে দেখা গেছে পিনপতন নীরবতা। মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া সেখানে কেউ নেই।

বেসিকোর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিক উদ্দিন ২০২২ সালের ২ মে অবসরে যান।

বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফিজুল বারী বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানটি হলো অর্ডার বেইজড কোম্পানি। কিছুদিন আগে ডেসকো থেকে কিছু অর্ডার পেয়েছিলাম। তা সরবরাহ হয়ে গেছে। সামনে কিছু অর্ডার পেতে পারি। সেই প্রস্তুতি চলছে।’

কোম্পানিটির আগের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি নিয়ে তিনি কথা বলতে চাননি। প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘দেখুন সে সময়ে আমি ছিলাম না। আর সে সম্পর্কে কিছু জানলেও বলতে চাই না।’

ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্বের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে আমি অবগত আছি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থার কার্যাবলী প্রক্রিয়াধীন।’

বেসিকো’র বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, ‘কোম্পানিটি সচল রাখতে আমরা কিছু অর্ডার দেয়ার পরিকল্পনা করেছি। ওই অর্ডারগুলো পেলে তাদের কর্মকাণ্ড সচল হবে।’

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Hear the story behind this bahari cake

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন এই কেকটি (বাঁয়ে) বানানোর আগের দুটি ধাপ ছিল এমন। ছবি: নিউজবাংলা
যে কক্ষে ডেকোরেশনের কাজ চলে সেখানে ফুড কালার, কোকো পাউডার থাকলেও একটি বাক্সে দেখা গেল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার। এই রং মিশিয়েই বালতিতে নানা রঙের ক্রিম তৈরি করছেন কারখানার কর্মীরা।

জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকীর মতো দিনগুলো কেক কেটে উদ্‌যাপন শহুরে জীবনে এখন খুব সাধারণ ঘটনা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কেক দেদার বিক্রি হয় এসব উপলক্ষ ঘিরে। পরিচিত ব্র্যান্ড ছাড়াও পাড়া-মহল্লায় রয়েছে অনেক দোকান, সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে বাহারি নানান কেক।

সুপরিচিত পেস্ট্রিশপে মান ভেদে প্রতি পাউন্ড ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় কেক বিক্রি হয়। পাড়ার বেকারি ও দোকানে এসব কেক মেলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পাউন্ড হিসেবে। অপেক্ষাকৃত কম দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষই এসব কেকের প্রধান ক্রেতা।

এত কম দামে কেক কীভাবে তৈরি হচ্ছে তা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। এই অনুসন্ধানে রাজধানীর একটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে ভড়কে যাওয়ার মতো পরিবেশ। ভয়ংকর অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশের মাঝে ক্ষতিকর উপকরণ ও রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব কেক।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন
মর্নিং ফুড কারখানায় বানানো কেক

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকার হাসেম খান রোডের একটি দোতলা ভবন। সামনের অংশ মার্কেট আর পেছনে দিকটি ভাড়া দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কারখানা হিসেবে।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন
এই ভবনের দোতলায় রয়েছে মর্নিং ফুড কারখানা

গেট দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই দেখা যায় শত শত কেকের বাক্স। নানান আকৃতির বাক্সগুলোর ডিজাইন মনকাড়া। পাশেই তিনটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে মর্নিং ফুড নামের কেক তৈরির কারখানা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

কারখানার কর্মীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। কেউ কেকের ডেকোরেশন করছেন, কেউ ক্রিম তৈরি করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত প্যাকিং নিয়ে। বিভিন্ন রঙের কেক দেখলেই জিভে পানি এসে যায়।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

তবে চারদিকে অবিশ্বাস্য নোংরা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ। কারখানার তিনটি কক্ষই নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে। কেকের খামির তৈরির জায়গাটির পাশেই আবর্জনার স্তূপ। পুরো কারখানা চষে বেড়াচ্ছে তেলাপোকা, মাছি ও পিঁপড়া।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

ভেতরের দিকের একটি কক্ষ কেক তৈরির মূল জায়গা। সেখানে আছে একটি গ্যাস ওভেন, চুলা ও খামির তৈরির মেশিন। মাটিতে একটির ওপর আরেকটি করে অনেকগুলো ট্রেতে রাখা আছে তৈরি করা কেক। এগুলোর ওপর হামলে পড়ছে মাছি। খামির তৈরির মেশিনের সঙ্গে রাখা ডাস্টবিনে ডিমের খোসাসহ অন্য আবর্জনা উপচে পড়ছে।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

এর পাশেই একটি পাত্রে দেখা গেল ‘চকলেট ক্রিম’। ডালডার সঙ্গে রং মিশিয়ে কয়েক দিন আগে তৈরি করা হয়েছে এই কথিত চকলেট ক্রিম। ওই কক্ষেই ডালডার মজুত ও বালতি ভর্তি লাল, হলুদ, সবুজ নানা রঙের বিভিন্ন ক্রিমও রয়েছে। এগুলো দিয়ে ময়দার তৈরি কেকের ওপর বাহারি নকশা করা হয়।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

যে কক্ষে ডেকোরেশনের কাজ চলে সেখানে ফুড কালার, কোকো পাউডার থাকলেও একটি বাক্সে দেখা গেল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার। এই রং মিশিয়েই বালতিতে নানা রঙের ক্রিম তৈরি করছেন কারখানার কর্মীরা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

পেছনের এই ভয়ংকর ধাপগুলো পেরিয়ে সুসজ্জিত কেকগুলো জায়গা পাচ্ছে আকর্ষণীয় বাক্সে।

এসব কেক সংরক্ষণের রেফ্রিজারেটরের দরজা খুলতেই আরও আতঙ্ক জাগে। কেকগুলোর সঙ্গেই রাখা হয়েছে কাঁচা মাছ-মাংস ও মসলা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

কারখানাটির মালিক কে সে বিষয়ে কর্মীদের কেউ কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। এমনকি নিজের নামও জানাননি কোনো কর্মচারী।

তারা জানান, ছয় মাস ধরে চলছে এই কারখানা। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ পিস কেক সরবরাহ করা হয় আশপাশের বিভিন্ন দোকানে। রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ এলাকার বিভিন্ন কনফেশনারি ও বেকারি দোকানিরাই তাদের প্রধান ক্রেতা। কারখানা থেকে প্রতি পাউন্ড কেক ১০০ টাকা করে বিক্রি হয়। আর সেগুলো বেকারি ও কনফেকশনারিতে বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পাউন্ড হিসাবে।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

কেক তৈরির প্রক্রিয়া জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার এক কর্মী নিউজবাংলাকে জানান, ময়দার সঙ্গে চিনি, ডিম ও তেল মিশিয়ে খামির তেরি করে ওভেনের মাধ্যমে মূল কেক তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো নানা আকৃতিতে কেটে তার ওপরে ক্রিম দিয়ে ডেকোরেশন করা হয়।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

এই কারখানায় ভ্যানিলা ও চকলেট ফ্লেভারের দুই ধরনের বেসিক ক্রিম রয়েছে। ডালডার সঙ্গে রং, ফ্লেভার ও কোকো পাউডার মিশিয়ে এই ক্রিম তৈরি হয়। আকর্ষণ বাড়াতে লাল, সবুজ, হলুদসহ নানা রঙের ক্রিম তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

এক কর্মী স্বীকার করেন, কারখানা চালাতে মালিকের কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেই।

কোথায় যাচ্ছে এসব কেক

অত্যন্ত নিম্নমানের এসব কেকের গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিষ্কার কোনো তথ্য দেননি মর্নিং ফুড কারখানার কর্মীরা। তারা জানান, বিভিন্ন দোকান থেকে লোক এসে অর্ডার দিয়ে নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যান। তারা সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দোকানে কেক সরবরাহ করেন না।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

তবে পরদিন কারখানার ওপর নজর রেখে নিউজবাংলা দেখতে পায় সকাল ১০টার কিছু পরে দুই ব্যক্তি সেখান থেকে দুটি সাইকেলে চড়ে বেরিয়ে যান। ঘণ্টাখানেক পর তারা সাইকেলের পেছনে কয়েকটি কেকের বাক্স নিয়ে কারখানায় ফিরে আসেন।

এক সাইকেল আরোহী বুলবুলকে প্রশ্ন করলে স্বীকার করেন তিনি কারখানার ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে খণ্ডকালীন কেক তৈরি করেন।

তার কাজ হলো প্রতিদিন দুপুরের পর বিভিন্ন দোকানে অর্ডার অনুযায়ী কেক পৌঁছে দেয়া। আর পরদিন সকালে তিন দিনের বেশি পুরোনো কেক কারখানায় ফিরিয়ে আনা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন
এভাবে বিভিন্ন দোকানে পাঠানো হয় মর্নিং ফুড কারখানার কেক

ঘটনার দিন সকালে তিনি দুই দোকান থেকে তিনটি পুরোনো কেক ফেরত এনেছেন।

কারখানার এক কর্মী নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, দোকান থেকে ফিরিয়ে আনা বাসী কেকে আবার নতুন ক্রিম মাখিয়ে পরদিন ফের দোকানে সরবরাহ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘পাউন্ড ১০০ টাকা দরে কেক বিক্রি করে খুব সীমিত লাভ হয়। এর মধ্যে যদি আবার কেক ফেরত আসে তাহলে ব্যবসা চলবে না। তাই আমরা পুরোনো কেকে আবার ক্রিম মাখিয়ে বিক্রি করি।’

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

দুপুরের পর কারখানা থেকে নতুন কেক নিয়ে সাইকেলে চড়ে বেরিয়ে যান ওই দুই ডেলিভারি ম্যান। একজনের পিছু নিয়ে দেখা যায় কারখানা থেকে কিছুটা দূরে হাসেম খান রোড বাজারের হৃদয় কনফেকশনারি ও ভাগ্যকুল মিষ্টিমুখ নামে দুটি দোকানে তিনি কেক পৌঁছে দিলেন। দোকানের কর্মচারীরা বেশ যত্ন নিয়ে এই কেক সাজিয়ে রাখেন।

দাম জানতে চাইলে ভাগ্যকুল মিষ্টিমুখ নামের দোকানের কর্মচারী ১ পাউন্ড কেকের দাম চান সাড়ে ৩০০ টাকা, আর দুই পাউন্ডের দাম ৬০০ টাকা। তবে দামাদামির পর ১ পাউন্ড কেক ২৫০ টাকায় দিতে রাজি হন তিনি।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

দোকান মালিক আরাফাত রহমান লিংকন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পাশের একটি কারখানা থেকে এই কেকগুলো দিয়ে যায়। দুই ধরনের কেক হয়। হাই কোয়ালিটি আর লো কোয়ালিটি। হাই কোয়ালিটির কেক বাটার দিয়ে তৈরি হয় আর লো কোয়ালিটির কেক ডালডা দিয়ে।

‘তবে এই এলাকায় হাই কোয়ালিটি কেক খুব একটা চলে না। মাঝে মাঝে কেউ অর্ডার করলে আমরা কারখানাকে হাই কোয়ালিটি কেক দিতে বলি। এ ধরনের কেক প্রতি পাউন্ড ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়।’

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

লিংকন জানান, সাধারণত তিনি লো কোয়ালিটির কেক অর্ডার করেন, কারণ এই কেক সস্তা হওয়ায় চাহিদা বেশি।

বাসী কেক ফেরত দেয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কারখানার সঙ্গে আমার কনট্রাক্ট হলো বিক্রি না হলে ফেরত নিয়ে নতুন কেক দেবে। এটাই হয় সব জায়গায়।’

বাসী কেকের ওপর ক্রিমের নতুন প্রলেপ দেয়া এবং কারখানায় নোংরা পরিবেশের তথ্য জানেন কি না, এমন প্রশ্নে লিংকনের দায়সারা জবাব, ‘এত কিছু আমাদের জানতে হয় না, এত কিছু জানলে ব্যবসা করা যাবে না।’

আরও পড়ুন:
দাম নিয়ে কারসাজির মামলার পর আরও বাড়ল বাজার খরচ
বাসি মাংসে রং মিশিয়ে বিক্রি, লাখ টাকা জরিমানা
পাম তেলে ১২ ও চিনিতে ৪ টাকা কমানোর সুপারিশ
জেলা পর্যায়ে ডিলারপ্রতি আটা দিনে ১ টন
পণ্যমূল্য বেঁধে দেয়া: তথ্য দিতে ব্যবসায়ীদের গড়িমসি

মন্তব্য

p
উপরে