রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ ২৯ প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৫ ধারা অনুসারে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে সরকার।
ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে কেউ বেআইনি প্রবেশ করলে অনধিক সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে ক্ষতিসাধন বা বিনষ্ট অথবা অকার্যকর করা বা করার চেষ্টার শাস্তি হবে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
এই ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ ঘোষণার ফলে দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য প্রকাশে সাংবাদিককেরা নতুন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বেন- এমন উদ্বেগ জানাচ্ছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে আলোচনা।
বিষয়টি নিয়ে দুই ধরনের অবস্থান রয়েছে আইনজ্ঞদের মধ্যে। একটি অংশ বলছে, সরকারের এই গেজেট দুর্নীতি, অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নতুন কোনো বাধা তৈরি করবে না। তবে অন্য অংশের আশঙ্কা, সরাসরি না হলেও এটি সংবাদকর্মীদের মনে পরোক্ষ ভীতির জন্ম দেবে।
বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগের ‘কারণ নেই’ বলে দাবি করছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক। তিনি বলছেন, সাইবার স্পেসে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা নিরাপদ রাখা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্যই ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ ঘোষণা করা হয়েছে।
‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ কী?
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ২(ছ) ধারায় ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’র সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়, ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (Critical Information Infrastructure)’ অর্থ সরকার ঘোষিত এমন কোনো বাহ্যিক বা ভার্চুয়াল তথ্য পরিকাঠামো যা কোনো তথ্য-উপাত্ত বা কোনো ইলেকট্রনিক তথ্য নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াকরণ, সঞ্চারণ বা সংরক্ষণ করে এবং যা ক্ষতিগ্রস্ত বা সংকটাপন্ন হলে জননিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বা সার্বভৌমত্বের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, এই সংজ্ঞা অনুযায়ী অপরাধ বিবেচনায় নিতে হলে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষিত প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক বা ভার্চুয়াল তথ্য পরিকাঠামোতে ‘বেআইনি প্রবেশ বা ক্ষতিসাধন’-এর ঘটনা ঘটতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সাধারণ অবকাঠামো এর আওতাভুক্ত নয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-এর ২(থ) ধারায় ‘বেআইনি প্রবেশ’-এর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়, ‘বেআইনি প্রবেশ’ অর্থ কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বা অনুমতির শর্ত লঙ্ঘন করে কোনো কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইস বা ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থায় প্রবেশ, বা প্রবেশের মাধ্যমে তথ্যব্যবস্থার কোনো তথ্য-উপাত্তের আদান-প্রদানে বাধা প্রদান বা এর প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত বা ব্যাহত করা বা বন্ধ করা, বা ওই তথ্য-উপাত্তের পরিবর্তন বা পরিবর্ধন বা সংযোজন বা বিয়োজন করা অথবা কোনো ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে কোনো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বেআইনি প্রবেশ’ সংজ্ঞা অনুযায়ী, অপরাধের বিষয়টি সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল তথ্য পরিকাঠামোসংশ্লিষ্ট।
সাংবাদিকতায় বাধা কতটা
ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনের অধীনে ২৯ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আসায় এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশে বিশেষ কোনো বাধা তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক।
তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলো হলো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ডেটাবেজ-সংক্রান্ত। ধরুন কেউ একজন এনআইডি ডেটাবেজে ঢুকে আপনার নাম বদলিয়ে দিল বা জন্মতারিখ বদলে দিল। অথবা কেউ ব্যাংকে ঢুকে ডেটাবেজ থেকে আমাদের ডাটা মুছে দিল, এটা কি ভালো হবে?
‘অথবা কেউ ব্যাংকের ডেটাবেজে ঢুকে আমার অ্যাকাউন্টের টাকা আপনার অ্যাকাউন্টে দেখিয়ে দিল, এতে আপনি খুশি হলেও আমি কিন্তু হব না। এ জন্যই সরকার ২৯টি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে।’
ড. শাহদীন মালিক মনে করছেন, আইনের বিষয়গুলো যথেষ্ট পর্যালোচনা না করেই অনেকে ‘তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন’।
তিনি বলেন, ‘এই যে চার বছর ধরে ডিজিটাল আইন বলে অনেকে চিৎকার করছেন। অথচ কতজন সাংবাদিককে দেখাতে পারবেন যারা আইনটি ভালো করে পড়েছেন? চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে অনেকেই দৌড়াচ্ছেন।’
সুপ্রিমকোর্টের আরেক আইনজীবী তানজীব উল আলমও মনে করছেন সরকারি গেজেটে সাংবাদিকদের উদ্বেগের বিশেষ কোনো কারণ নেই।
তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি মনে করি এই তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের জন্য কোনো বাধা নেই। কারণ এখানে তথ্য সংগ্রহে কোনো বাধা প্রদান করা হয়নি। যেটা করা হচ্ছে সেটা হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
‘এখানে যদি সেটি নাও থাকত তাহলেও ডিজিটাল নিরাপত্তার অন্য বিধানে বেআইনি প্রবেশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তালিকা প্রকাশের ফলে এখন একটাই পার্থক্য হলো, বিষয়টি এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭ ধারায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে সাজার মাত্রা বেশি হবে।’
ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ ঘোষণাকে স্বাগত জানাচ্ছেন ব্যারিস্টার তানজীব।
তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটি একটা গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন বলা যায়, সেটা হলো এসব প্রতিষ্ঠানের যেসব তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হয় তা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য পরিকাঠামোতে কেউ যদি অ্যাকসেস করে তাহলে তা ১৭ ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।’
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর আওতায় আরও প্রতিষ্ঠানের নাম আসা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তিনি।
ব্যারিস্টার তানজীব বলেন, ‘এখানে একটা বিষয় বাদ পড়েছে, সেটা হলো মানুষের স্বাস্থ্যগত যে বিষয়গুলো আছে, সেটারও সুরক্ষা থাকার দরকার ছিল। তালিকায় কোনো সরকারি হাসপাতালের নাম আসেনি। তাছাড়া এখানে শুধু সরকারি ব্যাংকগুলোর কথা বলা হয়েছে। বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকও আনা দরকার ছিল। সব মিলিয়ে তালিকাটি অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে।’
তবে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার আশংকা এই প্রজ্ঞাপন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধতা বাড়াবে।
তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে ২৯ প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেয়া হয়েছে, সেখানে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণার কিছু নেই।
‘ধরুন বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি ব্যাংকগুলোতে কত ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম হয় আমরা দেখেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেক টাকা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা এটা নিয়ে তেমন কিছু বের করতে পারেননি। অথচ একই বিষয়ে ফিলিপাইনে কী হয়েছে সেটা কিন্তু সবাই দেখতে পেয়েছি, যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। আর আমাদের দেশের ব্যাংকে কী হয়েছে তা জানা গেল না।’
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বলেন, ‘এমনিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণার আগেই কোনো রকম সাংবাদিকতার সুযোগ ছিল না। সেখানে এ রকম একটা ঘোষণা আসার পর তো সাংবাদিকেরা এ বিষয়ে আর কেনো সাহস করবে না।’
আরও উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ধরুন এখন যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে, এটা তো একটা বড় সমস্যা। এখানে বড় কোনো দুর্নীতি থাকলে সেখানে অ্যাকসেস করতে গেলে তো আপনাকে তথ্য পরিকাঠামোয় ঢুকতে হচ্ছে, তাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে।
‘এখন তথ্য পরিকাঠামো বলতে এই ওয়েবসাইট অ্যাকসেসকেও বোঝাবে, সেটি কিন্তু ঘোষণা বা আইনে পরিষ্কার করা নেই। এখন ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলেও আপনাকে এই আইনের মধ্যে ফেলে মামলায় জড়ানো সম্ভব।’
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বলেন, ‘এই আইনে (ডিজিটাল নিরাপত্তা) এত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, কিন্তু আইনটাকে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পরিকাঠামোর মধ্যে আনলে সেখানে তেমন কিছু বলার ছিল না। তবে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান রাখা হয়েছে যেগুলোর প্রয়োজন ছিল না।’
‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ হিসেবে ঘোষণা করা ২৯টি প্রতিষ্ঠান হলো রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড, সেতু বিভাগ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, জাতীয় ডেটা সেন্টার (বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ (নির্বাচন কমিশন সচিবালয়), সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক।
এছাড়া তালিকায় রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইমিগ্রেশন পুলিশ, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অফ বাংলাদেশ, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বাংলাদেশ, রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় (জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শিশির মনির মনে করছেন, এই তালিকায় এমন প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে যেগুলো রাখার কোনো যুক্তি নেই।
তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই ২৯ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সোনালী, রূপালী, অগ্রণীর মতো ব্যাংকগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা ভঙ্গ হওয়ার কী আছে! তবে হ্যা মহামান্য রাষ্ট্রপতির দপ্তর, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এনআইডি বা ডেটা সংরক্ষণ সেটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে সরকারি ব্যাংকগুলোকে কেন এর আওতায় আনা হলো তা বুঝতে পারছি না।’
শিশির মনির বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকতে পারে। তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি থাকতে পারে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কেউ ক্ষতি করতে চাইলে তাকে আইনের আওতায় আনা উচিত। এগুলো সুরক্ষার বিধান থাকা উচিত।
‘তবে এখানে কথা হলো এই যে ২৯ প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হলো এর মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুযোগ থাকতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অনিয়ম বা বেআইনি কাজ প্রকাশের সুযোগ না থাকলে সংবিধানের ২৯ ধারা অনুযায়ী স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে।’
যেকোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সুযোগ রাষ্ট্রকেই করে দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক নেই, দাবি প্রতিমন্ত্রীর
সরকারি ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ ঘোষণা করে ২১ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগ। আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয় ২৬ সেপ্টেম্বর।
বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগের কারণ নেই বলে দাবি করছেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহ্মেদ পলক।
তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কিছু অবকাঠামো আছে যেগুলো আইসিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এগুলো সাইবার হামলার শিকার হলে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বেশিসংখ্যক তথ্য ও অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হতে পারে।
‘এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আমরা এই ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে আইডেন্টিফাই করেছি।’
তিনি বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার হবে, যাতে করে আমাদের যে ইনফরমেশন সিকিউরিটি ম্যানুয়াল আছে, তাতে হাই প্রায়োরিটি দিয়ে, আমরা এগুলোর দেখাশোনা করতে পারি। আবার প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নিয়মিত আইটি অডিট প্রস্তুতি ও যেসব সতর্কতা মেনে চলা প্রয়োজন সেটা করতে পারবে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সাইবার স্পেসে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা নিরাপদ রাখা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। যেমন ধরুন সরকারের কোনো একটি ওয়েবসাইট আছে, সেখানে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের শুধু তথ্য আছে, সেটি হ্যাকড হলে আমরা যাতে এক ঘণ্টার মধ্যে সেটি রেস্টোর করতে পারি।
‘সাইবার ক্রিমিনালরা বাংলাদেশ ব্যাংক বা সিভিল এভিয়েশন বা পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি হামলা চালায় বা তথ্য চুরি করতে পারে তাহলে ক্ষতির পরিমাণটা অনেক বেশি ও মারাত্মক হবে। এসব গুরুত্ব বিবেচনায় আমরা প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছি।’
বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যেই আমি সাংবাদিকদের সামনে পুরো ব্যাখ্যাটি তুলে ধরব।’
সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে দোয়া মোনাজাতের মধ্য দিয়ে নিজ কার্যালয়ে কাজ শুরু করেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল
নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কিছু আইন কর্মকর্তার অনিয়ম, নোট বাণিজ্য ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আজ দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিজের কার্যালয়ে প্রথম কর্মদিবসে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে দোয়া মোনাজাতের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল। এসময় সিনিয়র আইনজীবীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
এ সময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিলন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ফিদা এম কামাল, সিনিয়র আইনজীবী ও সংসদ সদস্য ফজলুল রহমান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ, মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা ও মোহাম্মদ অনীক আর হক প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।
গত বুধবার ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মাদারীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুন বাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এক নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। কমিশনের সহকারী পরিচালক এস. এম. রাশেদুল হাসান বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ঐশী খানের নামে অনুসন্ধানে ১ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৭৫০ টাকার সম্পদ এবং ১১ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৪ টাকার পারিবারিক ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়। মোট ১ কোটি ৮১ লাখ ৭১ হাজার ৯০৪ টাকার সম্পদের বিপরীতে তার বৈধ আয় পাওয়া যায় মাত্র ১০ লাখ ৫৩ হাজার ৮৯২ টাকা। তার নামে ১ কোটি ৭১ লাখ ১৮ হাজার ৯২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক।
এছাড়া তার নামে বা বেনামে আরও সম্পদ থাকার সম্ভাবনার কথাও অনুসন্ধান টিম প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
দুদক জানায়, অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কমিশন তাকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারি করে। নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়েও নোটিশ প্রদান সম্ভব না হওয়ায় গত ১০ জুলাই সম্পদ বিবরণী ফরম লটকিয়ে জারি করা হয়। পরে তিনি এক মাস সময় বৃদ্ধির আবেদন করলে নির্ধারিত ২১ কার্যদিবসের পাশাপাশি, আরও ১৫ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। তবে বাড়তি সময় পেলেও তিনি সম্পদ বিবরণী দাখিল করেননি।
দুদক উল্লেখ করে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পাশাপাশি তার নামে বিপুল অপ্রদর্শিত ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ায় ২৭ (১) ধারার অভিযোগও প্রযোজ্য বলে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা পৃথক ৩ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন মামলার রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে ২৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন। এই তিন মামলায় কেবল রাজউকের সাবেক সদস্য (ভূমি ও স্থাপনা) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম আত্মসমর্পণের পর কারাগারে রয়েছেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ হাসিনা, তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে, ছোট বোন শেখ রেহানা ও তাঁর দুই ছেলে-মেয়ের নামে প্রতিটি ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে করা ছয়টি মামলার মধ্যে এই তিনটির রায় হয়েছে আজ।
এ ছাড়া শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও রেহানার বড় মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে করা অপর একটি মামলার রায়ের দিন ধার্য রয়েছে আগামী ১ ডিসেম্বর। আজ যে তিন মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে হয় ২৩ নভেম্বর। সেদিনই রায়ের এই তারিখ ধার্য করা হয়।
চলতি বছরের ১২,১৩ ও ১৪ জানুয়ারি এই তিন মামলাসহ ছয়টি মামলা করে দুদক। ২৫ মার্চ প্রতিটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ৩১ জুলাই আদালত এই তিন মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনার নামে প্লট বরাদ্দের মামলায় তিনিসহ ১২ জন আসামি। আরেক মামলায় জয়সহ ১৭ জন এবং অন্য মামলায় পুতুলসহ ১৮ জন আসামি। প্রতিটি মামলায়ই শেখ হাসিনা এবং রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা আসামি। ছয় মামলার মধ্যে বাকি তিনটি মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এ বিচারাধীন। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, টিউলিপ ও অন্যদের বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ের জন্য ১ ডিসেম্বর রায়ের দিন ধার্য রয়েছে।
অপর দুটি মামলা করা হয়েছে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, মেয়ে আজমির সিদ্দিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। এ দুই মামলায়ও শেখ হাসিনা ও রাজউকের কর্মকর্তারা আসামি। এ দুটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৩০ নভেম্বর ও ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য আছে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তাঁরা বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর সড়কের ৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বহুল আলোচিত সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে ৬ আসামির যাবজ্জীবন দণ্ডও বহাল রেখেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় প্রকাশ করেছেন। এখন ৩০ দিনের মধ্যে আসামিরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন।
এর আগে এ বছরের ২ জুন মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ৬ আসামির যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল রাখেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামির ৫০ হাজার টাকার জরিমানার আদেশও বহাল রাখা হয় রায়ে। যাবজ্জীবন বহাল থাকা আসামিরা হলেন— টেকনাফ থানার সাবেক এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল রুবেল শর্মা, সাগর দেব, কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিন।
এই মামলায় গত ২৯ মে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষ হয়।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। ঘটনার পাঁচ দিন পর ২০২০ সালের ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়ে র্যাব। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল এই মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত এবং কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি সাত আসামি খালাস পান। পরে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। কারাগারে থাকা দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেন।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ঐতিহাসিক এ রায় ঘোষণা করেন। রায় প্রদানকারী এই ট্রাইব্যুনালে অপর দুই সদস্য বিচারক হলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
বহুল আলোচিত এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিলেন প্রসিকিউশন।
অন্যদিকে, আসামিদের নির্দোষ দাবি করে খালাস চায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী। এছাড়া রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের খালাস চান তার আইনজীবী।
এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এস. এইচ. তামিম শুনানি করেন। এছাড়া শুনানিতে প্রসিকিউটর বি. এম. সুলতান মাহমুদ, শাইখ মাহদি, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। আর রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
ঐতিহাসিক এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের পিতাসহ স্বজনহারা পরিবারের অনেকে। এছাড়া স্টার উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। সর্বোমোট ৫৪ জন সাক্ষী এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
একপর্যায়ে দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনে (অ্যাপ্রুভার) রাজসাক্ষী হন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মামলার বৃত্তান্ত
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার—সব পর্যায়ের বৃত্তান্ত এভাবে এগিয়েছে।
মামটির নম্বর আইসিটি বিডি কেস নম্বর ২/২০২৫। চিফ প্রসিকিউটর বনাম শেখ হাসিনা ও অন্যান্য শিরোনামে দায়ের হওয়া এই মামলায় আসামি করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে।
অভিযোগ প্রাপ্তি ও তদন্ত শুরু
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট এবং ২৯ অক্টোবর অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়। মিস কেস নং ০২/২০২৪ করা হয় ১৬ অক্টোবর। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় ১৬ অক্টোবর এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ১৭ অক্টোবর। গ্রেপ্তার আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জ
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ১২ মে। ১ জুন দাখিল হয় ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। এতে ১৪ খণ্ডে প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার দালিলিক সাক্ষ্য জমা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল পত্রুপত্রিকা, দেশি-বিদেশি অনুসন্ধান প্রতিবেদন, শহীদ ও আহতদের তালিকাসহ গেজেট, বই, স্মারকগ্রন্থ, ঘটনাভিত্তিক তালিকা, গ্রাফিতির বই, অভ্যুত্থানকালীন প্রকাশিত পত্রিকার প্রথমপাতার সংকলন, আহতদের চিকিৎসা সনদ, পোস্টমর্টেম ও সুরতহাল প্রতিবেদন, অস্ত্র ও বুলেট ব্যবহারের জিডি, হেলিকপ্টারের ফ্লাইট শিডিউলসহ নানান নথি। ৯৩টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে এসব দালিলিক সাক্ষ্য ও ৩২টি বস্তু প্রদর্শনীর মাধ্যমে বুলেট, পিলেট, রক্তমাখা কাপড়, ভিডিও, অডিও, ডিভিডি, পেনড্রাইভ ও বই ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়।
মোট ৮৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি জমা পড়ে, যার মধ্যে ৫৪ জন সরাসরি সাক্ষ্য দেন। ১৭ জুন পলাতক আসামিদের জন্য দুই জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ২৪ জুন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। ১ জুলাই চার্জ শুনানি শুরু হয় এবং ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হয়। এ সময় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করেন।
প্রসিকিউশনের ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপন করা হয় ৩ আগস্ট; একই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী ছিলেন গুরুতর আহত খোকন চন্দ্র বর্মন। ৮ অক্টোবর শেষ সাক্ষ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর। মোট ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ১২ অক্টোবর শুরু হয় যুক্তিতর্ক। ২৩ অক্টোবর এটর্নি জেনারেলের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তা শেষ হয় এবং রায়ের তারিখ ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় রাখা হয়। ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল ১৭ নভেম্বরকে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগসমূহ
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ ১: চব্বিশের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা রাজাকারের নাতিপুতি সম্মোধন করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। এরপর ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজন নেতা একই ধরনের মন্তব্য করেন। এসব বক্তব্যের পর ছাত্ররা আন্দোলনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণ করে ও নির্যাতন চালায়।
অভিযোগ ২: কাউন্ট-১, ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মাকসুদ কামালকে ফোন দিয়ে আসামি শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে তাদের ফাঁসি অর্থাৎ হত্যার নির্দেশ দেন।
কাউন্ট-২, ১৮ জুলাই শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথোপকথনে লেথাল উইপন (মরণাস্ত্র) ব্যবহারের নির্দেশ, ড্রোন ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার নির্দেশসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুড়িয়ে জনতার উপর দায় চাপানোর নির্দেশনা প্রদান করেন।
কাউন্ট-৩, হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে ফোনে ২ বার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে বোমা নিক্ষেপ, আটক-নির্যাতন এবং বিএনপি, জামায়াত ও জঙ্গি ট্যাগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
অভিযোগ ৩: ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
সাক্ষ্যপ্রমাণ:
শেখ হাসিনার ১৪ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও, ঢাবি ভিসি মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনের রেকর্ড, আবু সাঈদকে পুলিশের গুলির সময় এনটিভির লাইভ ভিডিও ও মূল কপি, আবু সাইদের পাঁচটি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট যা পুলিশের নির্দেশে চারবার পরিবর্তন করা হয়, ওই ঘটনায় সাজানো মামলার নথি, আবু সাঈদের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক, ডাক্তার, ছাত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য।
অভিযোগ ৪: চব্বিশের ৫ আগস্ট ঢাকার চানখারপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
অভিযোগ ৫: চব্বিশের ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানা এলাকায় ছয়জনকে হত্যা করে তাদের লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ।
জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রায় ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড একটি ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে সর্বস্তরের জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এতে বলা হয়েছে, রায়-পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা, উত্তেজনাপ্রসূত আচরণ, সহিংসতা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হচ্ছে। জনগণের, বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই রায়কে ঘিরে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আবেগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে যেন কেউ জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়—সরকার এ বিষয়ে দৃঢ়ভাবে সবাইকে সতর্ক করছে।
জাতি ঐক্যবদ্ধ আর জনগণ যদি জেগে থাকে তাহলে দেশের ভাগ্য নিয়ে বা দেশে নৈরাজ্য করার শক্তি কারোরই কোনোদিন ছিল না কিংবা হবেও না বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
শেখ হাসিনার মামলার রায়ের দিন ধার্যের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রায় ঘোষণার দিন ধার্য ঘিরে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, সরাসরি যদি কেউ বিচারপ্রক্রিয়াকে বানচালের জন্য কোনো হুমকি দেন কিংবা কোনো কার্যক্রম করেন, সেটা আদালতের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল হবে। আমরা আমাদের আইনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে চাই। তবে দেশে সরকার আছে, জনগণ আছেন তারা সবকিছু ভালো বোঝেন। এছাড়া যারা উসকানি দেবেন বা সন্ত্রাসের চেষ্টা করবেন সে ব্যাপারে আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। আমরা বাংলাদেশের জনগণের দেশপ্রেম ও ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দেশের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাহিনীর প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। আশা করি যা কিছু বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে সেগুলো কোনো জায়গায় প্রভাব পড়বে না। সবকিছু স্মুথলি হবে এবং বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে।
বিচারকাজ নিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের অভিযোগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যারা যা খুশি প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারেন। এই বিচার আমরা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছি সেটা ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) ছিল। এখানে অকাট্য ও শক্তিশালী সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। জাতির সামনে এই বিচার হয়েছে। আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুনিয়ার সামনে ক্রিস্টাল ক্লিয়ারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং তারা যত খুশি প্রশ্ন করতে পারেন। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। ন্যায়বিচার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
এদিন দুপুর ১২টা ৯ মিনিটে জুলাই গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের রায়ের দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদসহ অন্যরা। শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। এছাড়া মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও ছিলেন।
গত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় সমাপনী বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রীসহ হেভিওয়েট নেতাদের যেভাবে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল; সেসব বর্ণনা ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন। পরে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর যুক্তি উপস্থাপনের কয়েকটি বিষয়ে জবাব দেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এরপর তাদের কিছু কথার পাল্টা উত্তর দেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন। পরে রায়ের তারিখ ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার রায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে জুলাই গণহত্যার প্রথম কোনো রায় শুনবে এ জাতি।
এ মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের নামও রয়েছে। তবে রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। এজন্য যুক্তিতর্কে শেখ হাসিনা-কামালের চরম দণ্ড বা সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও তার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে প্রসিকিউশন। মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও তার অ্যাকুইটাল (খালাস) চেয়েছেন। সবমিলিয়ে সাবেক এই আইজিপির মুখে হাসি ফুটবে নাকি অন্য কিছু; তা জানা যাবে রায় ঘোষণার দিন।
শেখ হাসিনার এ মামলায় ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৫৪ জন। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় চলতি বছরের ৩ আগস্ট। প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেন খোকন চন্দ্র বর্মণ। ৮ অক্টোবর মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরের জেরার মাধ্যমে শেষ হয় সাক্ষ্যগ্রহণের ধাপ। এরপর প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীর যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয় ২৩ অক্টোবর।
এ মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছে উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার, আবু সাঈদ হত্যা, চানখারপুলে হত্যা ও আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার ও শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। সাক্ষী করা হয়েছে ৮৪ জনকে। গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলায় বন বিভাগের ফরেস্টার সুলতানুল আলম চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (১২ নভেম্বর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত এ আদেশ দেন।
এদিন আসামি সুলতানুল আলম আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে তা নামঞ্জুর করেন এবং আসামিকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগের দাগনভূঞা সামাজিক বন বিভাগের ফরেস্টার সুলতানুল আলম চৌধুরী ১৯৯০ সালে বন বিভাগের নার্সারি প্রকল্পে প্ল্যান্টেশন সহকারী হিসেবে অস্থায়ীভাবে যোগ দেন। ২০০০ সালে তাঁর চাকরি স্থায়ী হয় এবং পরে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে ফেনীর দাগনভূঞায় কর্মরত আছেন।
২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরিচালক বাদী হয়ে সুলতানুল আসামি করে মামলাটি করেছিলেন। তদন্ত শেষে গত ১২ মার্চ চট্টগ্রাম দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতানুল আলম চৌধুরীর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীর বাইরে তার নামে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পায় দুদক। এছাড়া, দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে তিনি আরও ১ লাখ ৬১ হাজার টাকার সম্পদ গোপন করেন।
দুদক চট্টগ্রামের আইনজীবী মো. রেজাউল করিম রনি বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চেয়েছিলেন। কিন্তু আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মন্তব্য