× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বাংলাদেশ
The doctor was released from the peon while going to jail
hear-news
player
google_news print-icon

জেলে যাওয়ার সময় পিয়ন, ছাড়া পেয়ে ‘ডাক্তার’

জেলে-যাওয়ার-সময়-পিয়ন-ছাড়া-পেয়ে-ডাক্তার
করোনার ভুয়া সনদ তৈরি করায় গ্রেপ্তার হন সাঈদ হোসেন। জামিনে মুক্তি পেয়ে গ্রামে গিয়ে হয়েছেন চিকিৎসক। ছবি: নিউজবাংলা
সাঈদ হোসেনের মা সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসকের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মায়ের অনুরোধে সাঈদকে সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পিওনের চাকরি পাইয়ে দেন সেই চিকিৎসক। করোনার ভুয়া সনদ বিক্রির অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন ২০২০ সালের ২৫ মে। পরের বছর জামিনে মুক্তি পেয়ে ফেরেন বাড়িতে। সেখানে গিয়ে নামের সঙ্গে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করে শুরু করেন চিকিৎসা।

নওগাঁর সাঈদ হোসেন। ছিলেন ঢাকার সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর অফিস সহায়ক (পিয়ন)। ২০২০ সালে দেশে করোনা মাহামারি শুরু হলে বিদেশগামী যাত্রীদের কাছে করোনার জাল সনদ বিক্রির দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে যান কারাগারে। জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি গ্রামের বাড়ি নওগাঁর হোগল বাড়িতে ফিরে বনে গেছেন চিকিৎসক।

সব রোগের ‘চিকিৎসা জানা আছে’ সাঈদের। তাই কাউকে ফেরান না। নামের আগে পদবিও লিখছেন, ‘ডাক্তার’। রোগীদের ওষুধ লিখে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়।

সেই ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের পাশে ডিগ্রি হিসেবে লিখেছেন, ‘ডিএমএফ’, নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার।

কোত্থেকে এই ‘ডিএমএফ’ ডিগ্রি নিয়েছেন, এর মানে কী, কারা এই ডিগ্রি নেন, তার সনদ বা রোল-রেজিস্ট্রেশন নম্বর কী, তার কোনো কিছুই দেখাতে পারেননি সাঈদ।

এই ডিএমএফ ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের একটি ডিগ্রি। তবে যে কেউ এটি করতে পারেন এমন নয়। বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়ে এই কোর্সে ভর্তি হতে হয়।

চার বছরের এই ডিগ্রি শেষ করে সদনধারীদের কমিউনিটির ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে হবে। তাদেরকে গ্রামে-গঞ্জে থাকতে হবে। শহরে থাকতে পারবেন না।

আবার হাইকোর্টের একটি রায় অনুযায়ী বিকল্প ধারার চিকিৎসা পদ্ধতির পেশাধারীরা নামের সঙ্গে ডাক্তার লিখতে পারবেন না।

চিকিৎসকদের নিবন্ধন দেয় যে সংস্থা, সেই বিএমডিসির আইনেও নিবন্ধনভুক্ত মেডিক্যাল বা ডেন্টাল ইনস্টিটিউট কর্তৃক এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া কেউ ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না।

তবে সাঈদ থাকেন শহরে। নওগাঁর সদর উপজেলার হোগল বাড়ি মোড়ে ভাই ভাই মেডিকেয়ার ফার্মেসিতে বসেন। রোগী দেখেন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত।

পরিচিতজনদের কাছ থেকে তথ্য মিলেছে, সাঈদ হোসেনের মা সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসকের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মায়ের অনুরোধে সাঈদকে সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পিওনের চাকরি পাইয়ে দেন সেই চিকিৎসক।

করোনা শুরু হওয়ার পর সাঈদ জড়িয়ে যান করোনার ভুয়া সনদ তৈরিতে। বিষয়টি জানাজানি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে করে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। ২০২০ সালের ২৫ মে গ্রেপ্তার হন তিনি।

মামলাটির বিচার এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যে ২০২১ সালে জামিনে মুক্তি পান তিনি। ফিরে আসেন গ্রামের বাড়িতে। সেখানে একটি ফার্মেসি ও চেম্বার বসিয়ে শুরু করেন চিকিৎসা।


চিকিৎসা করাতে এসে প্রাণ যায় যায়

হোগল বাড়ি গ্রামের সাজু হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, মাস তিনেক আগে তার বাচ্চার সুন্নাতে খাৎনা করান সাঈদের কাছে। এরপর থেকে শিশুর রক্তপাত থামছিল না। অবস্থা বেগতিক দেখে রাত দেড়টার দিকে শিশুটিকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান তার বাবা।

সাজু বলেন, ‘আমার বাচ্চা সেদিন মরেই যাচ্ছিল। আল্লাহ পুনরায় হায়াত দিছে।’

সেদিনের ঘটনা গ্রামের মাতব্বরদের জানালে শালিসে সাঈদকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

জেলে যাওয়ার সময় পিয়ন, ছাড়া পেয়ে ‘ডাক্তার’
সাঈদ হোসেনের দেয়া ব্যবস্থাপত্র। ছবি: নিউজবাংলা

স্থানীয় মোতাহার হোসেন নামের এক প্রবীণ বলেন, ‘সাঈদ একটা ভুয়া ডাক্তার। আমার একটা সমস্যার জন্য দীর্ঘদিন থেকে তার কাছে চিকিৎসা করছি, কিন্তু রোগ সারেনা। উপায় না পেয়ে আমি শহরে ভালো ডাক্তার দেখাই। তারা আমাকে জানায় অসুখ অনুযায়ী ওষুধ ঠিক হয় নাই, রোগ সারবে কই থেকে?

‘পরে সেই ডাক্তার আমাকে এক শ টাকার ওষুধ দিছে, খেয়ে আমি বর্তমানে সুস্থ। এ তো রোগ-ই ধরতে পারে না, তাহলে কীসের ডাক্তার এই সাঈদ?’

চিকিৎসা নিতে আসা খাদেমুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘প্রসাবের জ্বালাপোড়া, মাথা ঘোরানো ও চোখে ঝাপসা এই সমস্যা নিয়ে আসছি। এর আগেও চিকিৎসা নিয়েছি, কিন্তু কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বরং সমস্যা আরও বাড়ছে। ১০দিন পর আসতে বলছিল, তাই আবার এসেছি।’

আবুল কালাম আজাদ হোসেন নামে স্থানীয় একজন বলেন, ‘সে (সাঈদ) তো ঢাকায় একটা হাসপাতালের পিওন ছিল। এরপর শুনেছি করোনার জাল সনদ বিক্রি করার জন্য জেলে গেছে। এখন জেল থেকে এসে আবার দেখি ডাক্তার হয়ে গেছে। সে কখন ভর্তি হলো, আর কখন চাকরি করল, আর কীভাবেই বা ডাক্তার হলো বিষয়টা তদন্ত হওয়া দরকার।’


সাঈদ যা বলছেন

সাঈদ হোসেনের চেম্বারে গিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাভার প্রিন্স মেডিক্যাল ইনস্টিটিটিউট (ম্যাটস) থেকে আমি ১১-১২ সেশনে ডিএমএফ করেছি।’

এর চেয়ে বেশি কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

আপনার কোনো সনদ বা পাশ করার প্রমাণ আছে- এমন প্রশ্ন করা হলে জবাব এড়িয়ে চেম্বার ছেড়ে বাইরে চলে যান সাঈদ।

পরে আবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সামনে মাসে ২৩ তারিখ আমার মামলার হাজিরা আছে। সেটা শেষ করে এসে সকল তথ্য দেবো, আমার সকল কাগজপত্র আছে।’

এক পর্যায়ে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘এসব ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারব না। আপনাদের যা ইচ্ছে করতে পারেন।’

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে নওগাঁর সিভিল সার্জন আবু হেনা মোহাম্মদ রায়হানুজ্জামান সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে জানলাম। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন:
রোগীর পেটে কাঁচি ফেলে আসায় চিকিৎসক জেলে
নারী চিকিৎসক হত্যা: রেজাউলের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন পিছিয়েছে
‘ভুল চিকিৎসা’য় প্রসূতির মৃত্যুর জেরে সংঘর্ষ
নিজ হাসপাতালে হয়রানির শিকার হয়ে বিস্মিত চিকিৎসক
বাবার লাশের পাশে ফেসবুক লাইভ: অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Durant Biplab was not killed but drowned in the Buriganga

দুরন্ত বিপ্লব খুন হননি, বুড়িগঙ্গায় ডুবে মৃত্যু

দুরন্ত বিপ্লব খুন হননি, বুড়িগঙ্গায় ডুবে মৃত্যু দুরন্ত বিপ্লবের নৌকাকে ধাক্কা দেয়া লঞ্চ মর্নিংসান-৫ (বাঁয়ে) এবং ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে উদ্ধার বিপ্লবের জুতা। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
দুরন্ত বিপ্লবের জুতা শনাক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তার ছোট বোন শাশ্বতী বিপ্লব শনিবার সন্ধ্যায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দাদা (বিপ্লব) এ ধরনের জুতাই পরতেন। আগামীকাল (রোববার) ডিবি একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। সেখানে তারা নৌকাডুবিতে মৃত্যুর কথাই জানাবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কৃষি খামারি দুরন্ত বিপ্লব বুড়িগঙ্গায় ডুবে মারা গেছেন। তাকে হত্যা করা হয়নি। একটি লঞ্চের ধাক্কায় নৌকাডুবে পানিতে তলিয়ে যান তিনি।

ঘটনার ছায়া তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা নিউজবাংলাকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

কৃষিখামারি দুরন্ত বিপ্লব ৭ নভেম্বর নিখোঁজ হন। এর পাঁচ দিন পর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান অবস্থায় একটি মরদেহ পায় পুলিশ। সেদিন রাতে মরদেহটি বিপ্লবের বলে নিশ্চিত করেন তার স্বজনরা। পরদিন দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বিপ্লবের মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক নারায়ণগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার মফিজ উদ্দিন প্রাথমিকভাবে জানান, বিপ্লবকে হত্যা করা হয়েছে। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

তবে বিপ্লব নিখোঁজের দিন সন্ধ্যায় বুড়িগঙ্গা নদীর সোয়ারীঘাট এলাকায় একটি নৌকাডুবির তথ্য জানিয়েছিল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ।

দুরন্ত বিপ্লব খুন হননি, বুড়িগঙ্গায় ডুবে মৃত্যু
ঘটনার দিন নিজের খামার থেকে রওনা দেয়ার পর একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় দুরন্ত বিপ্লবের ছবি

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার (ওসি) শাহ জামান ১৩ নভেম্বর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সোয়ারীঘাটের দিকে নৌকা থেকে একজনের পড়ে যাওয়ার কথা আমরা শুনেছি। জিঞ্জিরার বিপরীতে নদীতে ঘটনাটি ঘটে। ওনার (বিপ্লব) মোবাইল কললিস্ট ও নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেখানে ঘটনাটি ঘটে, সেখানেই ওনার অবস্থান ছিল।

‘বুড়িগঙ্গার এই অংশটায় নৌকা দিয়েই পারাপার হতে হয়। সোয়ারীঘাট, পানঘাট, আরও অনেকগুলো ঘাট রয়েছে ওখানে। তবে উনি নৌকা থেকে পড়েই মারা গেছেন, এমনটা আমরা এখনই বলছি না। আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কারণ বলা যাবে।’

বিষয়টি নিয়ে ছায়া তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই-এর ঢাকা জেলার উপ পরিদর্শক সালেহ ইমরান শনিবার নিউজবাংলাকে জানান, দুরন্ত বিপ্লব নৌকাডুবিতেই প্রাণ হারিয়েছেন বলে তারা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছেন।

দুরন্ত বিপ্লব খুন হননি, বুড়িগঙ্গায় ডুবে মৃত্যু
খেয়াঘাটে পৌঁছাতে অটোরিকশায় চড়ার আগে দুরন্ত বিপ্লব

তিনি জানান, ৭ নভেম্বর বিকেল ৫টার পর কেরানীগঞ্জের বটতলা ঘাট থেকে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে সোয়ারীঘাট আসছিলেন বিপ্লব। ওই নৌকার মালিক ও মাঝি ছিলেন শামসু নামের একজন।

একই সময়ে ঢাকা-বরিশাল রুটের মর্নিংসান-৫ লঞ্চটি সোয়ারীঘাট থেকে সদরঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করে।

উপ পরিদর্শক সালেহ ইমরান বলেন, ‘দুরন্ত বিপ্লবসহ আরও চারজনকে বহন করা শামসু মাঝির নৌকাটি নদীর দুই-তৃতীয়াংশ পাড়ি দেয়ার পর মর্নিংসান-৫ লঞ্চটির ডান পাশে ধাক্কা লাগে। এতে উল্টে যায় নৌকাটি।’

দুর্ঘটনার পর আশপাশের নৌকা গিয়ে চার যাত্রী ও শামসু মাঝিকে উদ্ধার করে। তবে নিখোঁজ হন এক যাত্রী।

দুর্ঘটনার পর শামসু মাঝি তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে পালিয়ে গেলেও তাকে সম্প্রতি আটক করেছে পিবিআই। ষাটোর্ধ শামসু মাঝি নদীতে ডুবে যাওয়া যাত্রীর যে বিবরণ দিয়েছেন তার সঙ্গে দুরন্ত বিপ্লবের মিল রয়েছে। এছাড়া, ডুবে যাওয়া নৌকার পাটাতনের নিচ থেকে বিপ্লবের জুতা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পিবিআই।

অন্যদিকে মর্নিংসান-৫ লঞ্চের চালকসহ কয়েকজন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে আছেন বলে নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র।

পিবিআই ঢাকা জেলার উপ পরিদর্শক সালেহ ইমরান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দুরন্ত বিপ্লবের লাশ উদ্ধারের পরই আমরা ছায়া তদন্ত শুরু করি। যে নৌকায় তিনি নদী পার হচ্ছিলেন সেই নৌকার মাঝিকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি জানিয়েছেন, তার নৌকার পাঁচ যাত্রীর মধ্যে চার জনকে উদ্ধার করা হলেও দুরন্ত বিপ্লবকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

‘আমরা শামসু মাঝির নৌকা থেকে দুরন্ত বিপ্লবের একটি জুতাও উদ্ধার করেছি। জুতাটি যে দুরন্ত বিপ্লবের তা তার বোন ও খামারের ম্যানেজার নিশ্চিত করেছেন। তিনি (বিপ্লব) সাঁতারও জানতেন না। নৌকাটি উল্টে যাওয়ার পর অন্যরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসার আগেই তিনি তলিয়ে যান। দুরন্ত বিপ্লবকে হত্যা করা হয়নি, তিনি ডুবে মারা গেছেন।’

ছাত্রলীগের সাবেক নেতা দুরন্ত বিপ্লব কয়েক বছর ধরে কেরানীগঞ্জে ‘সোনামাটি অ্যাগ্রো’ নামে একটি কৃষি খামার পরিচালনা করছিলেন। ৭ নভেম্বর বেলা ৩টার দিকে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি জানান, ঢাকার মোহাম্মদপুরের মায়ের বাসায় তিনি আসছেন।

তবে মায়ের বাসায় আসেননি দুরন্ত বিপ্লব। তার কোনো সন্ধান না পেয়ে ৯ নভেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার। এরপর ১২ নভেম্বর তার ভাসমান দেহ উদ্ধার করা হয়।

দুরন্ত বিপ্লবের জুতা শনাক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তার ছোট বোন শাশ্বতী বিপ্লব শনিবার সন্ধ্যায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দাদা (বিপ্লব) এ ধরনের জুতাই পরতেন। আগামীকাল (রোববার) ডিবি একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। সেখানে তারা নৌকাডুবিতে মৃত্যুর কথাই জানাবে।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় যেভাবে দুর্ঘটনা

বুড়িগঙ্গার আলোচিত খেয়াঘাটের দুই তীরে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর খোঁজ পেয়েছে নিউজবাংলা। তারা জানান, ৭ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে জিঞ্জিরার বটতলা ঘাট থেকে পাঁচ জন যাত্রী নিয়ে সোয়ারীঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় শামসু মাঝির নৌকা। তবে সোয়ারীঘাটে পৌঁছানোর আগেই লঞ্চের ধাক্কায় নৌকাটি তলিয়ে যায়।

বটতলা ঘাটের টোল আদায়কারী সিদ্দিকুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের ঘাটে শামসু নামের একজন মাঝি আছেন। উনি জিঞ্জিরার বটতলা ঘাট থেকে সেদিন পাঁচ জন যাত্রী নিয়ে সোয়ারীঘাটের দিকে যাচ্ছিলেন। তখন একটা লঞ্চ ব্যাক দিছে, লঞ্চের নিচে পইরা নৌকা ডুইবা গেছে। এইখান (বটতলা) দিয়া মাঝিরা গিয়ে যাত্রী ও মাঝিরে উদ্ধার করছে। আমি জিগাইলাম, সব লোক উঠছে, ওরা কইলো উঠছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন শুনি এক লোকরে পায় নাই। এক লোক ডুইবা গেছে। মাঝিরা আমারে সত্য তথ্য দেয় নাই। সত্য দিলে আমি থানায় জানায়ে দিতাম। পুলিশ খবর দিতাম, ডুবারও খবর দিতাম। ওই দিনের পরে আর শামসু ঘাটে আহে নাই।’

দুরন্ত বিপ্লবের মরদেহ উদ্ধারের পর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ শরীফ নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান পায়। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সোয়ারীঘাটে একটা লঞ্চ ঘুরাইবার সময় একটা নৌকা ডুইবা গেছে। নৌকায় পাঁচ জন যাত্রী ছিল। পাঁচ জনের ভিতর চার জন উঠছে, একজনের শুধু হাত দেখা গেছে। আর কিছুই দেখা যায় নাই। চারজন নৌকা ধইরা বইসা ছিল। আর একজন তলাইয়া গেছে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, সোয়ারীঘাট বিআইডাব্লিউটিএ ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দুটি লঞ্চ সদরঘাটে গিয়ে নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রথমে মর্নিংসান-৫ ও পরে পারাবাত-১৫ লঞ্চটি সদরঘাট গিয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পারাবাত-১৫ এর একজন কর্মচারী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের আগে মর্নিংসান-৫ ছাইড়া গেছে। এরপর আমরা গেছি। মর্নিংসান-৫ যাওয়ার সময় একটা নৌকারে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা লাইগা নৌকাটা উল্টায়া যায়। দুই পার থাইকাই মাঝিরা আইসা যাত্রীগো উদ্ধার করে। আমরা লঞ্চ থাইকা এই ঘটনাটা দেখছি।’

দুরন্ত বিপ্লব খুন হননি, বুড়িগঙ্গায় ডুবে মৃত্যু
খেয়াঘাটে নৌকায় চড়ার আগে দুরন্ত বিপ্লব

দুরন্ত বিপ্লবের খেয়া ঘাটে যাওয়ার ছবি সিসিটিভি ক্যামেরায়

তদন্তকারীদের অনুসন্ধানে জানা গেছে ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ৪৭ মিনিটে দুরন্ত বিপ্লব নিজের খামার থেকে ঢাকার উদ্দেশে বের হন। তার খামারের পাশের একটি পেট্রল পাম্পের সিসিটিভি ক্যামেরায় এ দৃশ্য ধরা পড়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুরন্ত বিপ্লবের পরনে ছিল পাঞ্জাবি ও প্যান্ট, পায়ে ছিল চামড়ার স্যান্ডেল। হেঁটেই তিনি কোনাখোলা মোড়ের অটোরিকশা স্ট্যান্ডে আসেন।

আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুরন্ত বিপ্লব অটোরিকশা স্ট্যান্ডে পৌঁছান ৪টা ৫৫ মিনিটে। এরপর বিল্লাল নামের একজনের অটোরিকশায় চড়ে জিঞ্জিরার বটতলা ঘাটে পৌঁছান। ঘাট এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দুরন্ত বিপ্লবকে দেখা গেছে বিকেল ৫টা ২৭ মিনিটে। এ সময় তিনি একাই ছিলেন।

পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা সালেহ ইমরান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দুরন্ত বিপ্লব ওখান থেকে শামসু মাঝির নৌকায় চড়েন। এরপর লঞ্চের ধাক্কায় তার নৌকাটি ডুবে যায়। নৌকার মাঝি আমাদেরকে বলেছেন, চার যাত্রীকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও একজন ডুবে যান।’

দুরন্ত বিপ্লবের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার বিষয়ে পিবিআই কর্মকর্তা ইমরান বলেন, ‘নৌকা থেকে পরে যাওয়ার পর উনি পাঁচদিন নদীতে ছিলেন। শত শত লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা, বাল্কহেড নদীতে চলাচল করে। ভাসতে ভাসতে ৮-৯ কিলোমিটার যাওয়ার পথে এগুলোর সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘খামার থেকে দুরন্ত বিপ্লব বের হওয়ার পর যেখানে তিনি গেছেন প্রতিটা স্পটে আমরা গিয়েছি। যে নৌকায় দুর্ঘটনা ঘটছে ওই নৌকার মাঝির স্টেটমেন্ট পেয়েছি। তার জুতা পেয়েছি। এসব থেকে স্পষ্ট তিনি হত্যার শিকার হননি। পানিতে ডুবে মারা গেছেন।’

আরও পড়ুন:
জাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা দুরন্ত বিপ্লবকে খুনের সন্দেহ
বুড়িগঙ্গায় পাওয়া মরদেহ কৃষি খামারি দুরন্ত বিপ্লবের
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাবি শাখার আহ্বায়ক কমিটি গঠিত
মাদক মামলার তদন্তে মিলল ২ বছর আগে নিখোঁজের দেহাবশেষ
বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ৩ জনসহ জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধকারী গ্রেপ্তার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
BUET student Fardin went to Chanpara by autorickshaw

ফারদিন অটোরিকশায় যান চনপাড়ায়, গুম প্রাইভেট কারে

ফারদিন অটোরিকশায় যান চনপাড়ায়, গুম প্রাইভেট কারে লেগুনা থেকে নামার পর চনপাড়ামুখী অটোরিকশায় ফারদিন; চনপাড়ায় তাকে হত্যার পরে মরদেহ সরিয়ে নেয়া হয় প্রাইভেট কারে করে। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
নিউজবাংলার হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ৪ নভেম্বর রাত ২টা ৩ মিনিটে যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে একটি লেগুনায় চড়েন ফারদিন। এর ১০ মিনিট পর চার যুবকের সঙ্গে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা মহাসড়কের স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে নামেন। এর মিনিটখানেকের মধ্যে ফারদিন ওই চার ব্যক্তির সঙ্গে একটি অটোরিকশায় চড়ে চনপাড়ার দিকে যান।

বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার কিছুক্ষণ আগে একটি অটোরিকশায় পৌঁছান রূপগঞ্জের আলোচিত চনপাড়া বস্তিতে।

চনপাড়া বস্তিমুখী অটোরিকশায় ফারদিনের ওঠার দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। সেই ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। সিসিটিভি ফুটেজটি দেখানোর পর ফারদিনের বাবা কাজী নূর উদ্দিন ছেলেকে শনাক্ত করেছেন।

ফারদিন চনপাড়া যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে মাদক কারবারিদের বেদম পিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারান। এরপর একটি প্রাইভেট কারে তুলে নিয়ে তার মৃতদেহ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

নিউজবাংলার হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ৪ নভেম্বর রাত ২টা ৩ মিনিটে যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে একটি লেগুনায় চড়েন ফারদিন। এর ১০ মিনিট পর চার যুবকের সঙ্গে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা মহাসড়কের স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে নামেন। সেখান থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরেই চনপাড়া বস্তি।

ফারদিন অটোরিকশায় যান চনপাড়ায়, গুম প্রাইভেট কারে
বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশ। ছবি: সংগৃহীত

লেগুনা থেকে নামার মিনিটখানেকের মধ্যে ফারদিন ওই চার ব্যক্তির সঙ্গে একটি অটোরিকশায় চড়ে চনপাড়ার দিকে যান।

আরও পড়ুন:সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়

যে সিসিটিভি ক্যামেরায় ফারদিনের সিসিটিভি ফুটেজে স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে নামা এবং চনপাড়ামুখী অটোরিকশায় চড়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে, সেটির সময় রিয়েল টাইমের চেয়ে ১০ মিনিট পিছিয়ে রাখা ছিল। ফলে সিসিটিভিতে ফারদিনকে রাত ২টা ৩ মিনিটে লেগুনা থেকে নামতে দেখা গেলেও প্রকৃত সময় তখন ছিল রাত ২টা ১৩ মিনিট।

এর আগে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে চনপাড়া এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে যেসব মাদক কারবারি শনাক্ত হন, তাদের সঙ্গেই ফারদিন লেগুনা থেকে নেমে অটোরিকশায় চড়েছিলেন।

ফারদিন অটোরিকশায় যান চনপাড়ায়, গুম প্রাইভেট কারে
সিসিটিভি ফুটেজে স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে ফারদিনের নামা এবং চনপাড়ামুখী অটোরিকশায় চড়ার দৃশ্য।

চনপাড়ার পরবর্তী সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ২টা ২৩ মিনিটে ওই চার ব্যক্তি অটোরিকশা থেকে নেমে হেঁটে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রবেশ করছেন। বস্তির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ফারদিন বস্তি এলাকায় ঢোকেন অটোরিকশায় চড়ে। পরে তাকে র‌্যাবের সোর্স সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করে রায়হান বাহিনী।

আরও পড়ুন: ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে

সিসিটিভি ফুটেজে চার যুবকের ঢোকার আগে-পরে বেশ কয়েকটি অটোরিকশাকে ওই পথে দেখা গেছে।

কাঁচপুর ব্রিজের আশপাশের নদীতে ফেলা হয় মৃতদেহ

চনপাড়া বস্তির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র নিউজবাংলাকে জানায়, সে রাতে ফারদিনের সঙ্গে থাকা চার যুবকের আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল। সেটি হলো মাদক গ্রহণের পর চলে যাওয়ার সময় ফারদিনের কাছ থেকে বাকি টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়া। এ কারণেই তারা বস্তিতে ঢোকার আগে অটোরিকশা থেকে নেমে যান।

তবে এর আগেই স্থানীয় মাদক কারবারি রায়হান আহমেদের অনুসারীরা র‌্যাবের সোর্স মনে করে পিটিয়ে ফারদিনকে হত্যা করে। হত্যার পর রায়হানের বন্ধু ও বোনজামাই ফাহাদ আহমেদ শাওনের প্রাইভেট কারে করে ফারদিনের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে সরানো হয়।

আরও পড়ুন: মাথায় ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে ফারদিনের মৃত্যু

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ফারদিন হত্যার খবর পেয়ে শাওন তার বাসার সামনে থেকে প্রাইভেট কারটি নিয়ে রাত ২টা ৫২ মিনিটে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সিসিটিভি ফুটেজেও এ দৃশ্য ধরা পড়েছে।

এরপর রাত ৩টা ৩ মিনিটে গলি থেকে বেরিয়ে বালুব্রিজ হয়ে মূল সড়ক ধরে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে চলে যায় শাওনের সাদা রঙের এক্সিও প্রাইভেট কারটি। এরপর সেখান থেকে বামে মোড় নিয়ে সুলতানা কামাল সেতুর দিকে চলে যায় গাড়িটি। এটির গতিবিধি ধরা পড়েছে- সিসিটিভির এমন ফুটেজও পেয়েছে নিউজবাংলা।

ফারদিন অটোরিকশায় যান চনপাড়ায়, গুম প্রাইভেট কারে
গলি থেকে বেরিয়ে বালুব্রিজ হয়ে মূল সড়ক ধরে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে চলে যায় শাওনের সাদা রঙের এক্সিও প্রাইভেট কারটি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ধারণা, এরপর সেতুতে ওঠার আগে ডানে মোড় নিয়ে সাইনবোর্ডে যাওয়ার রাস্তা বেছে নেয় গাড়িটি। পরে সাইনবোর্ড এলাকার আগে বামে মোড় নিয়ে নদীতীরের নির্জন রাস্তা ধরে কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় গিয়ে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়া হয় ফারদিনের মরদেহ।

সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবা নির্বাক

যাত্রাবাড়ী-ডেমরা মহাসড়কের স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ের সিসিটিভি ফুটেজে ফারদিনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন তার বাবা কাজী নূর উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘আমি ৯০ পারসেন্ট নিশ্চিত যে, দুটি ফুটেজেই আমার ছেলে ফারদিন রয়েছে। ওর কালো প্যান্ট আর জুতাটা বোঝা যাচ্ছে। তাছাড়া আমার ছেলের দেহের গড়নেই তো তাকে চোখের পলকে ধরা যায়।’

আবেগতাড়িত বাবা বলেন, ‘আমি শুধু চাই আমার ছেলে হত্যাকরীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এখন আর কোনো চাওয়া নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কখনও সিগারেটের ধোঁয়া পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না। এই ছেলে হঠাৎ কেন মাদকের স্পটের দিকে যাবে- এটা আমার কোনোভাবেই মাথায় আসছে না। আমার ছেলে নিশ্চয়ই কোনো কিছু নিয়ে ডিপ্রেশনে ছিল, নইলে এমন কিছু করার সিদ্ধান্ত কেন নেবে!’

আরও পড়ুন:
সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
মাথায় ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে ফারদিনের মৃত্যু
যাত্রাবাড়ীতে ফারদিনের উপস্থিতি শনাক্তের দাবি ডিবির
তদন্তে কোথাও একটা ফাঁকি আছে: ফারদিনের বাবা
ফারদিন হত্যায় গ্রেপ্তার বুশরার জামিন মেলেনি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The picture of Fardin going to Chanpara that night is on the CC camera

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায় লেগুনা থেকে নেমে চনপাড়ামুখী অটোরিকশায় ফারদিন। ছবি: নিউজবাংলা
নিউজবাংলার হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে ছেড়ে আসা লেগুনায় চারজনের সঙ্গে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা মহাসড়কের স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে নামেন ফারদিন। সেখান থেকে একটি অটোরিকশায় চড়ে চনপাড়ার দিকে যান। এই ফুটেজ ফারদিনকে শনাক্ত করেছেন তার বাবা।   

বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই গিয়েছিলেন রূপগঞ্জে মাদকের জন্য আলোচিত চনপাড়া বস্তি এলাকায়। তিনি সেখানে যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে মাদক কারবারিদের বেদম পিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারান। এরপর একটি প্রাইভেট কারে তুলে নিয়ে তার মৃতদেহ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

চনপাড়া বস্তিমুখী অটোরিকশায় ফারদিনের ওঠার দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। সেই ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। সিসিটিভি ফুটেজটি দেখানোর পর ফারদিনের বাবা কাজী নূর উদ্দিন ছেলেকে শনাক্ত করেছেন।

ফারদিনের মৃতদেহ বহনকারী প্রাইভেট কারের নদীর দিকে যাওয়ার আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজও রয়েছে নিউজবাংলার কাছে। এর আগে চনপাড়া বস্তিতে ওই প্রাইভেট কারটির ঢোকা ও বেরিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ নিউজবাংলা প্রকাশ করে।

বুয়েট ছাত্র ফারদিন নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। বর্তমানে হত্যা মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পাশাপাশি র‌্যাবসহ আরও কয়েকটি সংস্থা ছায়াতদন্ত করছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেন, ৪ নভেম্বর গভীর রাতে ফারদিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক অনুযায়ী তার সবশেষ অবস্থান শনাক্ত হয় রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তি এলাকায়।

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
ফারদিন নূর পরশ

তবে ফারদিন হত্যা মামলার তদন্ত কর্তৃপক্ষ ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, ফারদিনের চনপাড়া বস্তিতে যাওয়ার প্রমাণ এখনও মেলেনি, তাকে অন্য কোথাও হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘ঘটনার রাত সোয়া ২টার কাছাকাছি সময়ে সবশেষ যাত্রাবাড়ী মোড়ে ফারদিনকে দেখা গেছে। সাদা গেঞ্জি পরা অবস্থায় এক যুবক তাকে একটি লেগুনায় তুলে দেয়। ওই লেগুনায় আরও চারজন ছিল। লেগুনাটি তারাবোর দিকে নিয়ে যায়। ওই লেগুনার চালক ও সহযোগীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

‘ফারদিনের মৃত্যুর কারণ এখনও জানা যায়নি। কোথায় তাকে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।’

তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে নিহত হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার বিষয়ে তথ্য মিলেছে। নিউজবাংলার হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে ছেড়ে আসা লেগুনায় চারজনের সঙ্গে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা মহাসড়কের স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে নামেন ফারদিন। সেখান থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরেই চনপাড়া বস্তি।

লেগুনা থেকে নামার মিনিটখানেকের মধ্যে ফারদিন ওই চার ব্যক্তির সঙ্গে একটি অটোরিকশায় চড়ে চনপাড়ার দিকে যান।

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
ফারদিনসহ পাঁচ যাত্রী নিয়ে চনপাড়ামুখী অটোরিকশা

যে সিসিটিভি ক্যামেরায় ফারদিনের সিসিটিভি ফুটেজে স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে নামা এবং চনপাড়ামুখী অটোরিকশায় চড়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে, সেটির সময় রিয়েল টাইমের চেয়ে ১০ মিনিট পিছিয়ে রাখা ছিল। ফলে সিসিটিভিতে ফারদিনকে রাত ২টা ৩ মিনিটে লেগুনা থেকে নামতে দেখা গেলেও প্রকৃত সময় তখন ছিল রাত ২টা ১৩ মিনিট।

ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বৃহস্পতিবার সকালে জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে রাত সোয়া ২টার কাছাকাছি সময় ফারদিনকে যাত্রাবাড়ী থেকে লেগুনায় চড়তে দেখা গেছে। নিউজবাংলার পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ বলছে, রাত ২টা ৩ মিনিটে যাত্রাবাড়ী থেকে লেগুনায় চড়ার কিছু সময় পরই তিনি স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে নামেন।

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
যাত্রাবাড়ীতে লেগুনায় চড়ার সময় ফারদিন

এর আগে নিউজবাংলার আরেকটি অনুসন্ধানে চনপাড়া এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে যেসব মাদক কারবারি শনাক্ত হন, তাদের সঙ্গেই ফারদিন লেগুনা থেকে নেমে অটোরিকশায় চড়েছিলেন।

চনপাড়ার পরবর্তী সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ২টা ২৩ মিনিটে ওই চার ব্যক্তি অটোরিকশা থেকে নেমে হেঁটে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রবেশ করছেন। বস্তির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ফারদিন বস্তি এলাকায় ঢোকেন অটোরিকশায় চড়ে। পরে তাকে র‌্যাবের সোর্স সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করে রায়হান বাহিনী।

আরও পড়ুন: ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে

সিসিটিভি ফুটেজে চার যুবকের ঢোকার আগে-পরে বেশ কয়েকটি অটোরিকশাকে ওই পথে দেখা গেছে।

ফারদিন চনপাড়ায় যান মাদকের খোঁজে

ফারদিনের নিখোঁজের পর তার ফোনের সিডিআর বিশ্লেষণ করে সবশেষ অবস্থান পাওয়া যায় চনপাড়া বস্তির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আলোর জ্যোতি ফার্নিচার ও পাশের একটি অটোরিকশার গ্যারেজের মধ্যবর্তী স্থানে। তখনই ফারদিনের মাদকসংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন, সেদিন রাত ১০টার দিকে সবশেষ বন্ধু বুশরার সঙ্গে রামপুরা টিভি সেন্টারের পাশের গলির মুখে ছিলেন ফারদিন। সেখান থেকে বুশরা রিকশায় তার মেসে চলে যান। এরপর ফারদিনকে আর কোনো সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন: ফারদিন হত্যায় বুশরার যোগসাজশ মিলছে না

তবে তার মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের তথ্য যাচাই করে তদন্তসংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হন, ফারদিন বুশরাকে বিদায় জানিয়ে বাসে চড়ে গুলিস্তান হয়ে বাবুবাজার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় যান। সেখান থেকে জনসন রোড, ধোলাইখাল, জুরাইন এলাকা হয়ে যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচা এলাকা হয়ে চনপাড়ায় যান।

তবে এসব পথের কোথাও ফারদিনের দৃশ্যমানতার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ায় তদন্তকারীরা ধারণা করেন, ফারদিন অপহরণের শিকার হতে পারেন অথবা অপরাধীদের খপ্পরে পড়তে পারেন। তাকে কেউ প্রলুব্ধ করে বা জোর করে চনপাড়া এলাকার আশপাশে নিয়ে হত্যা করতে পারে।

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
যাত্রাবাড়ী-ডেমরা মহাসড়কের স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে লেগুনা থেকে চারজনের সঙ্গে নামেন ফারদিন

তবে যাত্রাবাড়ী এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে ফারদিনকে একা হেঁটে লেগুনায় চড়তে দেখা গেছে। একইভাবে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় লেগুনা থেকে নেমে ফারদিন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওই চার ব্যক্তির সঙ্গে অটোরিকশায় চড়েন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট বাহিনীর এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, সে রাতে বুশরাকে নামিয়ে দিয়ে ফারদিন মাদকের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান। পরে একজন মাদক সরবরাহকারীর সঙ্গে তার হোয়াটস অ্যাপে যোগাযোগ হয়।

এই দলটির সঙ্গেই ফারদিন যাত্রাবাড়ী থেকে লেগুনায় চড়ে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের উদ্দেশে রওনা দেন। এরপর যান চনপাড়ায়। তবে মাদকের দাম নিয়ে বিতণ্ডা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সোর্স হিসেবে সন্দেহ করে তাকে মাদক কারবারিরাই হত্যা করে।

কাঁচপুর ব্রিজের আশপাশের নদীতে ফেলা হয় মৃতদেহ

চনপাড়া বস্তির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র নিউজবাংলাকে জানায়, সে রাতে ফারদিনের সঙ্গে থাকা চার যুবকের আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল। সেটি হলো মাদক গ্রহণের পর চলে যাওয়ার সময় ফারদিনের কাছ থেকে বাকি টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়া। এ কারণেই তারা বস্তিতে ঢোকার আগে অটোরিকশা থেকে নেমে যান।

তবে এর আগেই স্থানীয় মাদক কারবারি রায়হান আহমেদের অনুসারীরা র‌্যাবের সোর্স মনে করে পিটিয়ে ফারদিনকে হত্যা করে। হত্যার পর রায়হানের বন্ধু ও বোনজামাই ফাহাদ আহমেদ শাওনের প্রাইভেট কারে করে ফারদিনের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে সরানো হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ফারদিন হত্যার খবর পেয়ে শাওন তার বাসার সামনে থেকে প্রাইভেট কারটি নিয়ে রাত ২টা ৫২ মিনিটে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সিসিটিভি ফুটেজেও এ দৃশ্য ধরা পড়েছে।

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
ফারদিনের মরদেহ আনতে যাওয়ার সময়ে শাওনের প্রাইভেট কার

এরপর রাত ৩টা ৩ মিনিটে গলি থেকে বেরিয়ে বালুব্রিজ হয়ে মূল সড়ক ধরে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে চলে যায় শাওনের সাদা রঙের এক্সিও প্রাইভেট কারটি। এরপর সেখান থেকে বামে মোড় নিয়ে সুলতানা কামাল সেতুর দিকে চলে যায় গাড়িটি। এটির গতিবিধি ধরা পড়েছে- সিসিটিভির এমন ফুটেজও পেয়েছে নিউজবাংলা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ধারণা, এরপর সেতুতে ওঠার আগে ডানে মোড় নিয়ে সাইনবোর্ডে যাওয়ার রাস্তা বেছে নেয় গাড়িটি। পরে সাইনবোর্ড এলাকার আগে বামে মোড় নিয়ে নদীতীরের নির্জন রাস্তা ধরে কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় গিয়ে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়া হয় ফারদিনের মরদেহ।

আরও পড়ুন: মাথায় ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে ফারদিনের মৃত্যু

চনপাড়া এলাকায় শাওনের স্ত্রীকে খুঁজে পেয়েছে নিউজবাংলা। তবে তিনি নিজের নাম জানাননি। তিনি বৃহস্পতিবার দাবি করেন, শাওন মাদক কারবার করলেও পেশায় মূলত একজন গাড়িচালক। আগে সাইনবোর্ড এলাকায় বাসের চালক ছিলেন।

শাওন এখন কোথায় আছেন তা জানেন না দাবি করে তিনি বলেন, র‌্যাবের সঙ্গে গোলাগুলিতে স্থানীয় সন্ত্রাসী সিটি শাহিন নিহত হওয়ার পর শাওন আতঙ্কে বাড়ি ছেড়েছেন, আর ফেরেননি। ৪ নভেম্বর রাতে শাওন গাড়ি নিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান।

সাবেক একজন ইউপি মেম্বার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চনপাড়া বস্তির পুরোটাই মাদকের সাম্রাজ্য। এখানে ৬৪টি মাদকের স্পট রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্প্রতি র‌্যাবের অভিযানের সময় গোলাগুলিতে নিহত রাশেদুল ইসলাম শাহিন ওরফে সিটি শাহিন।

‘রায়হান, শাওন ছিলেন শাহিনের আস্থাভাজন বন্ধু। শাহিনকে গ্রেপ্তারে গত কয়েক মাসে একাধিক অভিযান চালায় র‌্যাব। তবে অনুসারীদের হামলার কারণে এসব অভিযান ব্যর্থ হয়।’

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
লেগুনা থেকে নেমে অটোরিকশায় চড়ার আগে ফারদিন

সাবেক ওই জনপ্রতিনিধি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সবশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর র‌্যাব শাহিনকে ধরতে গেলে অল্পের জন্য তিনি হাত ফসকে যান। এরপর শাহিন ও তার সহযোগীরা এলাকায় নিজেদের মতো করে পাহারা জোরদার করে।

‘মাদক কারবারিরা বিশেষ করে রাতে দলে দলে ভাগ হয়ে টহল দিতে শুরু করে। ঘটনার রাতে ময়নার বাড়িতে আসা যুবক মাদকের দাম নিয়ে তর্কে জড়ানোয় তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সোর্স হিসেবে সন্দেহ করে মাদক কারবারিরা।’

স্থানীয় কয়েকজন পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, সোর্স সন্দেহে পিটিয়ে মারার কারণেই ফারদিনের মোবাইল, মানিব্যাগ কিছুই ছিনিয়ে নেয়া হয়নি। মাদক কারবারিরা ভেবেছিলেন এগুলো রেখে দিলে পরে বিপদ হতে পারে। আর সোর্স হিসেবে বিবেচনা করার কারণেই মরদেহ সরাসরি এলাকার পাশের নদীতে না ফেলে প্রাইভেট কারে করে বেশ কিছুটা দূরে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়।

সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবা নির্বাক

যাত্রাবাড়ী-ডেমরা মহাসড়কের স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ের সিসিটিভি ফুটেজে ফারদিনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন তার বাবা কাজী নূর উদ্দিন।

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
চনপাড়ামুখী অটোরিকশায় চড়ার আগে ফারদিন

ফুটেজ দেখার পর বৃহস্পতিবার নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি ৯০ পারসেন্ট নিশ্চিত যে, দুটি ফুটেজেই আমার ছেলে ফারদিন রয়েছে। ওর কালো প্যান্ট আর জুতাটা বোঝা যাচ্ছে। তাছাড়া আমার ছেলের দেহের গড়নেই তো তাকে চোখের পলকে ধরা যায়।’

আবেগতাড়িত বাবা বলেন, ‘আমি শুধু চাই আমার ছেলে হত্যাকরীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এখন আর কোনো চাওয়া নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কখনও সিগারেটের ধোঁয়া পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না। এই ছেলে হঠাৎ কেন মাদকের স্পটের দিকে যাবে- এটা আমার কোনোভাবেই মাথায় আসছে না। আমার ছেলে নিশ্চয়ই কোনো কিছু নিয়ে ডিপ্রেশনে ছিল, নইলে এমন কিছু করার সিদ্ধান্ত কেন নেবে!’

তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বৃহস্পতিবার রাতে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা যতটুকু পেয়েছি, তা জানিয়েছি। নতুন কোনো তথ্য পেলে আমরা সেগুলো যাচাই করব। আমাদের তদন্ত শেষ হয়নি, তদন্ত চলমান রয়েছে।'

সেই রাতে ফারদিনের চনপাড়ায় যাওয়ার ছবি সিসি ক্যামেরায়
মাদক কারবারি রায়হান (বাঁয়ে) ও শাওন

এ ঘটনার ছায়া তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ফারদিনের ঘটনাস্থলে যাওয়ার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট পেয়েই নিশ্চিত হয়েছিলাম, তিনি চনপাড়ায় গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি যে সুলতানা কামাল সেতু পাড়ি দিয়ে তারাবোর দিকে যাননি সেটাও নিশ্চিত ছিলাম। কারণ সেতু পাড়ি দিলেই অন্য নেটওয়ার্ক টাওয়ারের অধীনে তার মোবাইল ফোনের অবস্থান পাওয়া যেত।

‘এখন আমরা যেহেতু ফারদিনের চনপাড়ায় প্রবেশের চিত্র পেয়েছি, নতুন করে আর কিছু বলার নেই। এখন শুধু অপরাধীদের ধরে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

আরও পড়ুন:
ফারদিন হত্যায় এখনও কোনো প্রমাণিত তথ্য নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
চনপাড়া বস্তিতে ফারদিনের যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন বাবার
ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে
‘ফারদিনের মৃত্যু মাদক কিনতে গিয়ে’: নিশ্চিত নয় ডিবি
ফারদিন ও বুশরার পরিচয় চার বছরের

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Fardins death due to blunt force injury to the head

মাথায় ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে ফারদিনের মৃত্যু

মাথায় ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে ফারদিনের মৃত্যু ফারদিন নূর পরশ। ফাইল ছবি
নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মশিউর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ফারদিনের মাথায় ৪-৫টি এবং বুকের দুই পাশে ২-৩টি ভোঁতা দেশীয় অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফারদিন নূর পরশের মৃত্যু হয় মাথায় রক্তক্ষরণের কারণে। ভোঁতা কোনো দেশীয় অস্ত্র বা লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয় বলে মনে করছেন ময়নাতদন্তকারীরা।

নারায়ণগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শেখ ফরহাদ হোসেনের উপস্থিতিতে ময়নাতদন্ত করেন ডা. মফিজ উদ্দিন। এসংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে।

বুয়েট ছাত্র ফারদিন নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। বর্তমানে হত্যা মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পাশাপাশি র‌্যাবসহ আরও কয়েকটি সংস্থা ছায়াতদন্ত করছে।

মৃতদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে বলা হয়, ফারদিনের মাথার সামনে, পেছনে, ডানে, বামে অর্থাৎ পুরো মাথায়ই আঘাতের কালশিটে দাগ রয়েছে। একইভাবে পাঁজরের ডান ও বাম পাশে কালশিটে দাগ রয়েছে।

মদনাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ফারদিনের শরীরের কোনো হাঁড় ভাঙেনি। ফুসফুসে জমাট বাঁধা কিছুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মশিউর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ফারদিনের মাথায় ৪-৫টি এবং বুকের দুই পাশে ২-৩টি ভোঁতা দেশীয় অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়।

‘তার পাকস্থলীতে খাবারের সঙ্গে অন্য কিছু ছিল কি না সেটা পুলিশ জানতে চেয়েছিল। এ জন্য আমরা কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস ও ভিসেরা রিপোর্টের জন্য নমুনা পাঠিয়েছি।’

ফারদিন হত্যা মামলার তদন্ত কর্তৃপক্ষ ডিবি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার রাত সোয়া ২টার দিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে ফারদিনকে দেখা গেছে। সাদা গেঞ্জি পরা অবস্থায় এক যুবক তাকে একটি লেগুনায় তুলে দেয়। ওই লেগুনায় আরও চারজন ছিল। লেগুনাটি তারাবোর দিকে নিয়ে যায়। ওই লেগুনার চালক ও সহযোগীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’

হারুন অর রশীদ বলেন, ‘ফারদিনের মৃত্যুর কারণ এখনও জানা যায়নি। কোথায় তাকে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।’

অন্যদিকে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, রূপগঞ্জের চনপাড়ায় খুন হন ফারদিন। মামলার সার্বিক তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান গত রোববার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা একেবারেই ক্লুলেস একটা ঘটনা। অনেক প্রশ্নের উত্তরই মিলছে না। ফারদিনের মোবাইল ফোনের লাস্ট লোকেশন থেকে বডি পাওয়া গেছে বেশ দূরে। সেখানে কীভাবে গেল তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি সব কিছুই খুব সূক্ষ্মভাবে আমরা তদন্ত করছি।

‘আমরা খুব চেষ্টা করছি ফারদিনের লাস্ট লোকেশনে উপস্থিতি কীভাবে হলো সেটা জানার। কারণ আমরা রামপুরা থেকে ওর কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, তারপর চনপাড়া যাওয়ার ফুটপ্রিন্ট পেয়েছি। এতগুলো জায়গা সে কেন ঘুরল এটা জানাটা জরুরি। আমরা কাজ করছি। আশা করি, সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।’

আরও পড়ুন:
তদন্তে কোথাও একটা ফাঁকি আছে: ফারদিনের বাবা
টাকার বস্তা খালি, গলার জোর কমে ডিফেন্সিভ মুডে ফখরুল: কাদের
ফারদিন হত্যায় গ্রেপ্তার বুশরার জামিন মেলেনি
দুদকের মামলায় চীনের নাগরিকসহ ৬ জনের কারাদণ্ড
বাগান থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
After killing Fardeen the body was moved in a private car

ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে

ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশের মরদেহ সরাতে এই প্রাইভেট কারটি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
৪ নভেম্বর রাত পৌনে দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে ফারদিনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। সে সময়ে এলাকার কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে ঘটনায় জড়িত একাধিক ব্যক্তি ও মরদেহ সরিয়ে নিতে ব্যবহৃত প্রাইভেট কার দেখা গেছে।

বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স সন্দেহে রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তি এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করেন মাদক কারবারিরা। ৪ নভেম্বর গভীর রাতে এ ঘটনার পর একটি প্রাইভেট কারে করে তার মরদেহ সরিয়ে নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

ফারদিন হত্যা মামলার তদন্তে যুক্ত একটি বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মরদেহ সরিয়ে নেয়ার কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটি শনাক্ত হয়েছে সিসিটিভি ফুটেজে।

ঘটনাস্থলের বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিউজবাংলার কাছেও এসেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ঘটনার আগে-পরে চনপাড়া বস্তি ঘিরে অস্বাভাবিক তৎপর ছিলেন মাদক কারবারিরা।

বুয়েট ছাত্র ফারদিন নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। বর্তমানে হত্যা মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পাশাপাশি র‌্যাবসহ আরও কয়েকটি সংস্থা ছায়াতদন্ত করছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেন, ৪ নভেম্বর গভীর রাতে ফারদিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক অনুযায়ী তার সবশেষ অবস্থান শনাক্ত হয় রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তি এলাকায়।

চনপাড়া বস্তি এলাকা পুরোটাই মাদক বিক্রির এলাকা হিসেবে পরিচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, ফারদিনকে চনপাড়া বস্তি এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় হত্যা করা হয়। এরপর একটি প্রাইভেট কারে তুলে তার মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেন মাদক কারবারিরা।

৪ নভেম্বর রাত পৌনে দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে ফারদিনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। সে সময়ে ওই এলাকার কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে ঘটনায় জড়িত একাধিক ব্যক্তি ও মরদেহ সরিয়ে নিতে ব্যবহৃত প্রাইভেট কার দেখা গেছে।

এরই মধ্যে ঘটনায় জড়িত স্থানীয় দুই মাদক কারবারিকে হেফাজতে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আলাদা দুটি ইউনিট। জব্দ করা হয়েছে প্রাইভেট কারটিও।

সিসিটিভি ফুটেজে মাদক কারবারিদের তৎপরতা দৃশ্যমান

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফারদিনের মোবাইল ফোনের শেষ লোকেশন শনাক্ত করে চনপাড়া এলাকায়। এরপর ফোন নম্বরের সিডিআর বিশ্লেষণ করে বস্তির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আলোর জ্যোতি নামের ফার্নিচারের দোকান ও তার পাশের একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজের মধ্যবর্তী অংশ চিহ্নিত করা হয়।

সেখানেই রাত ২টা ৩৫ মিনিটে ফারদিনের মোবাইলটি সবশেষ চালু ছিল। নিউজবাংলার হাতে আসা সেই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চনপাড়া বস্তি এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ওই নির্দিষ্ট জায়গাটি ঘিরে রাত দেড়টার দিক থেকে পরবর্তী দুই ঘণ্টা স্থানীয় মাদক কারবারিদের অস্বাভাবিক তৎপরতা ছিল।

ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে

রাত ১টা ২৮ মিনিটে স্থানীয় ৬ যুবক ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গলি থেকে বেরিয়ে চনপাড়া-রূপগঞ্জ মূল সড়কে উঠে হাতের বাঁয়ে মোড় নিয়ে ১ নম্বর ওয়ার্ডের দিকে চলে যান।

এর ঠিক ২৩ মিনিট পর ১টা ৫১ মিনিটে তারা আবাব ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দিকে ফিরে আসেন।

এরপর রাত ২টা ২৩ মিনিটে দ্রুত পায়ে চারজন যুবক বালু ব্রিজ এলাকা থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আসেন। তারা স্থানীয় একটি মাদ্রাসা মাঠে অপেক্ষায় থাকা একজনের সঙ্গে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে কথা শুরু করেন। তাদের অভিব্যক্তিতে পরিষ্কার কোনো ঘটনার খবর পেয়ে তারা তাৎক্ষণিক ছুটে এসেছেন।

এর পরবর্তী ২০ মিনিটে একাধিক যুবক ঘটনাস্থলের দিকে যান।

রাত ২টা ৪৪ মিনিটে দুই যুবক গলির মুখে এসে অনেকটা পাহারা দেয়ার মতো করে পায়চারি করতে থাকেন।

ঠিক ২টা ৫২ মিনিটে বালু ব্রিজ এলাকা থেকে দ্রুতগতির একটি সাদা রঙের টয়োটা এক্সিও গাড়ি এসে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঘটনাস্থল দিকে যায়। একই সঙ্গে গলির মুখে পাহারা দেয়া দুই যুবক গলি থেকে বেরিয়ে যান।

এর ঠিক ১১ মিনিট পর দ্রুত গতিতে সাদা প্রাইভেট কারটি ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল ঠিক সেদিকেই অর্থাৎ বালু ব্রিজের দিকে চলে যায়।

ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে

গাড়িটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গলি অতিক্রমের সময় স্থানীয় যুবকদের দুইজন গাড়ির দুই পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে গাড়িটিকে গলি পার করে দেন।

সিসিটিভি ফুটেজে প্রাইভেট কারটি ঢোকার সময় তাতে চালক ছাড়া আর কাউকে দেখা না গেলেও বের হওয়ার সময় পেছনের আসনে আরোহী দেখা গেছে।

ফারদিনের সবশেষ অবস্থানের ফুটেজ কেন নেই

ফারদিন হত্যারহস্য তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট শুরুতে প্রযুক্তিগত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে। তারা ফারদিনের মোবাইল ফোনের লোকেশন ধরে চনপাড়া বস্তির ৬ নম্বর ওয়ার্ডকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।

তবে ওই এলাকায় একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও সেগুলোর কোনোটিতে মূল ঘটনাস্থলের (হত্যাকাণ্ডের স্থান হিসেবে ধরণা করা জায়গা) কোনো ছবি ধরা পড়েনি।

এর কারণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, স্থানীয় মাদক কারবারি রাশেদুল ইসলাম শাহিন বা সিটি শাহিন গ্রুপের সঙ্গে র‌্যাব সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। এরপর থেকে মাদক কারবারিরা এলাকার সব দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরার মুখ রাস্তার দিক থেকে ঘুরিয়ে দেন। গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গার ক্যামেরা ভাঙচুরও করেন। এর মধ্যে অন্যতম এই ৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকাটি। সিটি শাহিনের বাড়িও এই ওয়ার্ডে।

সিটি শাহিন ১১ নভেম্বর গোলাগুলিতে নিহত হন। র‌্যাবের দাবি, মাদক কারবারিদের মধ্যে গোলাগুলিই তার মৃত্যুর কারণ।

ফারদিনের মোবাইল ফোনের সবশেষ লোকেশন পাওয়া গেছে সিটি শাহিনের বাসার গলি থেকে কিছুটা উত্তর দিকে অফিসঘাট অভিমুখে। সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর মুখ রাস্তা থেকে উল্টো দিকে ঘোরানো থাকায় সেখান থেকে ফারদিনের উপস্থিতির কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া না গেলেও ওই এলাকার সোর্সের পাশাপাশি স্থানীয় এক বয়স্ক প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনার দিন দায়িত্বরত এক নৈশপ্রহরীর কাছ থেকে সে রাতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পায় তদন্তকারী একটি বাহিনী।

ওই বাহিনীর দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, চনপাড়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডের যে জায়গায় ফারদিনের মোবাইল লোকেশন পাওয়া গেছে তার ঠিক বিপরীত পাশেই পূর্ব দিকে ৪ নম্বর ওয়ার্ড। সেখানে মাদক কারবার চালান মনেয়ারা বেগম মনু নামের প্রভাবশালী এক নারী।

ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে
মাদক কারবারি মনেয়ারা বেগম মনু (বাঁয়ে) এবং এখন তার তালাবদ্ধ ঘর

বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মাদকসেবীরা তার ঘরে বসে মাদক সেবন করেন। ওই রাতে আনুমানিক ২টার দিকে ফেনসিডিল খেয়ে টাকা কম দিতে চাওয়া এক যুবকের সঙ্গে মনুর লোকজনের বিবাদ হয়। একপর্যায়ে পাশের তিনতলা ভবন মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী আরেক মাদক কারবারি রায়হান ও তার অনুসারীও ওই যুবকের ওপর চড়াও হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ’আমরা ঘটনাটির ছায়াতদন্ত করতে গিয়ে ঘটনাস্থলের ফারদিনের উপস্থিতির সিসিটিভি ফুটেজ এখনও পাইনি। কারণ কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ঘটনাস্থল কাভার করে না। সব ক্যামেরার মুখ আগে থেকেই উল্টো দিকে ঘোরানো ছিল।

‘যেহেতু ফারদিনের মোবাইলটি তার কাছেই পাওয়া গেছে আর মোবাইল নেটওয়ার্কের সবশেষ লোকেশন ওখানকার, তাই আমরা নিশ্চিত ফারদিন যেভাবেই হোক সেখানে অবশ্যই গিয়েছিলেন।

‘তিনি কোনো মোটরসাইকেলে চড়ে আসেননি। তেমনটা হলে প্রধান সড়কের ক্যামেরায় তার আসার দৃশ্যটি ধরা পড়ত। হয়তো কোনো অটোরিকশায় করে এসেছিলেন, তাই তার আসার দৃশ্য ধরা পড়েনি।’

ফারদিনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স সন্দেহে হত্যা

ফারদিন হত্যার ঘটনাস্থল হিসেবে দাবি করা চনপাড়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এলাকাটি ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফারদিনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন ওই এলাকার মাদক কারবারিরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারী মাদক কারবারি ময়নার বাসায় যাওয়া ফারদিনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে সন্দেহ করেন স্থানীয় মাদক কারবারি রায়হান আহমেদের অনুসারীরা।

রায়হানের বাসা ও মাদক স্পট ময়নার বাসার ঠিক পাশেই। সিসিটিভি ফুটেজে রাত ১টা ২৮ মিনিটে ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে ২৩ মিনিট পর আবার ফিরে আসা ৬ যুবকই রায়হানের অনুসারী। তারা ফারদিনকে বেদম পিটিয়ে হত্যা করেন।

ফারদিন নিথর হয়ে গেলে রায়হানের ফোন পেয়ে ২টা ২৩ মিনিটে দ্রুত পায়ে ৪ যুবক বালু ব্রিজ এলাকা থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আসেন। তারা মাদ্রাসার গেটে অপেক্ষমাণ একজনের কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান।

রায়হানের পারিবারিক আত্মীয় হলেন একই এলাকার অপর শীর্ষ মাদক কারবারি ফাহাদ আহমেদ শাওন। ঘটনার পর শাওন তার দুই মাস আগে কেনা টয়োটা এক্সিও গাড়িটি নিয়ে সেখানে আসেন। এরপর ফারদিনের মরদেহ গাড়ির ট্রাঙ্কে তুলে ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে যান শাওন ও তার সহযোগীরা।

ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে
মাদক কারবারি রায়হান (বাঁয়ে) ও শাওন

সিসিটিভিতে ধরা পড়া প্রাইভেট কারটি শাওনের বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি। তারা নিউজবাংলাকে জানান, দুই মাস আগে কেনা গাড়িটি শাওন নিজেই চালাতেন।

সোর্স সন্দেহে ফারদিনকে পিটিয়ে মারার বিষয়টি নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় একাধিক সূত্র। সাবেক একজন ইউপি মেম্বার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চনপাড়া বস্তির পুরোটাই মাদকের সাম্রাজ্য। এখানে ৬৪টি মাদকের স্পট রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্প্রতি র‌্যাবের অভিযানের সময় গোলাগুলিতে নিহত রাশেদুল ইসলাম শাহিন ওরফে সিটি শাহিন।

‘রায়হান, শাওন ছিলেন শাহিনের আস্থাভাজন বন্ধু। শাহিনকে গ্রেপ্তারে গত কয়েক মাসে একাধিক অভিযান চালায় র‌্যাব। তবে অনুসারীদের হামলার কারণে এসব অভিযান ব্যর্থ হয়।’

ফারদিন হত্যার পর মরদেহ সরানো হয় প্রাইভেট কারে
গোলাগুলিতে নিহত শাহিনের (বাঁয়ে) সঙ্গে শাওন

সাবেক ওই জনপ্রতিনিধি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সবশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর র‌্যাব শাহিনকে ধরতে গেলে অল্পের জন্য তিনি হাত ফসকে যান। এরপর শাহিন ও তার সহযোগীরা এলাকায় নিজেদের মতো করে পাহারা জোরদার করে।

‘মাদক কারবারিরা বিশেষ করে রাতে দলে দলে ভাগ হয়ে টহল দিতে শুরু করে। ঘটনার রাতে ময়নার বাড়িতে আসা যুব্ক মাদকের দাম নিয়ে তর্কে জড়ানোয় তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে সন্দেহ করে মাদক কারবারিরা।’

স্থানীয় কয়েকজন পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, সোর্স সন্দেহে পিটিয়ে মারার কারণেই ফারদিনের মোবাইল, মানিব্যাগ কিছুই ছিনিয়ে নেয়া হয়নি। মাদক কারবারিরা ভেবেছিলেন এগুলো রেখে দিলে পরে বিপদ হতে পারে। আর সোর্স হিসেবে বিবেচনা করার কারণেই মরদেহ সরাসরি এলাকার পাশের নদীতে না ফেলে প্রাইভেট কারে করে বেশ কিছুটা দূরে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়।

ঘটনার পর হত্যাকারীরা ও নারী মাদক কারবারি ময়না এলাকাতেই ছিলেন। গত শুক্রবার শাহিন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তারা সবাই পালিয়ে যান।

তবে বরিশাল থেকে রায়হানকে এবং রাজধানীর গুলিস্তান থেকে ওই প্রাইভেট কারসহ শাওনকে গ্রেপ্তার করেছে আলাদা ‍দুটি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। অবশ্য এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।

ফারদিন হত্যা মামলার সার্বিক তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা একেবারেই ক্লুলেস একটা ঘটনা। অনেক প্রশ্নের উত্তরই মিলছে না। ফারদিনের মোবাইল ফোনের লাস্ট লোকেশন থেকে বডি পাওয়া গেছে বেশ দূরে। সেখানে কীভাবে গেল তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি সবকিছুই খুব সূক্ষ্মভাবে আমরা তদন্ত করছি।

‘আমরা খুব চেষ্টা করছি ফারদিনের লাস্ট লোকেশনে উপস্থিতি কীভাবে হলো সেটা জানার। কারণ, আমরা রামপুরা থেকে ওর কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, তারপর চনপাড়া যাওয়ার ফুটপ্রিন্ট পেয়েছি। এতগুলো জায়গা সে কেন ঘুরল এটা জানাটা জরুরি। আমরা কাজ করছি। আশা করি, সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।’

ডিবি মতিঝিল বিভাগে উপকমিশনার রাজিব আল মাসুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অনেকগুলো বিষয় সামনে রেখে আমাদের তদন্ত চলছে। আমরা সম্ভাব্য সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। এখনও মন্তব্য করার মতো কোনো কিছু সামনে আসেনি।’

আরও পড়ুন:
ফারদিনের লাশ শীতলক্ষ্যায় গেল কীভাবে যাচাই হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বুয়েটছাত্র ফারদিন হত্যা মামলা: ৫ দিনের রিমান্ডে বান্ধবী বুশরা
ফারদিন হত্যা মামলা যাচ্ছে ডিবিতে
বুয়েটছাত্র ফারদিন হত্যা মামলায় বান্ধবী গ্রেপ্তার
বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিনের দাফন

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Hear the story behind this bahari cake

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন এই কেকটি (বাঁয়ে) বানানোর আগের দুটি ধাপ ছিল এমন। ছবি: নিউজবাংলা
যে কক্ষে ডেকোরেশনের কাজ চলে সেখানে ফুড কালার, কোকো পাউডার থাকলেও একটি বাক্সে দেখা গেল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার। এই রং মিশিয়েই বালতিতে নানা রঙের ক্রিম তৈরি করছেন কারখানার কর্মীরা।

জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকীর মতো দিনগুলো কেক কেটে উদ্‌যাপন শহুরে জীবনে এখন খুব সাধারণ ঘটনা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কেক দেদার বিক্রি হয় এসব উপলক্ষ ঘিরে। পরিচিত ব্র্যান্ড ছাড়াও পাড়া-মহল্লায় রয়েছে অনেক দোকান, সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে বাহারি নানান কেক।

সুপরিচিত পেস্ট্রিশপে মান ভেদে প্রতি পাউন্ড ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় কেক বিক্রি হয়। পাড়ার বেকারি ও দোকানে এসব কেক মেলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পাউন্ড হিসেবে। অপেক্ষাকৃত কম দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষই এসব কেকের প্রধান ক্রেতা।

এত কম দামে কেক কীভাবে তৈরি হচ্ছে তা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। এই অনুসন্ধানে রাজধানীর একটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে ভড়কে যাওয়ার মতো পরিবেশ। ভয়ংকর অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশের মাঝে ক্ষতিকর উপকরণ ও রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব কেক।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন
মর্নিং ফুড কারখানায় বানানো কেক

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকার হাসেম খান রোডের একটি দোতলা ভবন। সামনের অংশ মার্কেট আর পেছনে দিকটি ভাড়া দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কারখানা হিসেবে।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন
এই ভবনের দোতলায় রয়েছে মর্নিং ফুড কারখানা

গেট দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই দেখা যায় শত শত কেকের বাক্স। নানান আকৃতির বাক্সগুলোর ডিজাইন মনকাড়া। পাশেই তিনটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে মর্নিং ফুড নামের কেক তৈরির কারখানা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

কারখানার কর্মীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। কেউ কেকের ডেকোরেশন করছেন, কেউ ক্রিম তৈরি করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত প্যাকিং নিয়ে। বিভিন্ন রঙের কেক দেখলেই জিভে পানি এসে যায়।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

তবে চারদিকে অবিশ্বাস্য নোংরা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ। কারখানার তিনটি কক্ষই নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে। কেকের খামির তৈরির জায়গাটির পাশেই আবর্জনার স্তূপ। পুরো কারখানা চষে বেড়াচ্ছে তেলাপোকা, মাছি ও পিঁপড়া।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

ভেতরের দিকের একটি কক্ষ কেক তৈরির মূল জায়গা। সেখানে আছে একটি গ্যাস ওভেন, চুলা ও খামির তৈরির মেশিন। মাটিতে একটির ওপর আরেকটি করে অনেকগুলো ট্রেতে রাখা আছে তৈরি করা কেক। এগুলোর ওপর হামলে পড়ছে মাছি। খামির তৈরির মেশিনের সঙ্গে রাখা ডাস্টবিনে ডিমের খোসাসহ অন্য আবর্জনা উপচে পড়ছে।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

এর পাশেই একটি পাত্রে দেখা গেল ‘চকলেট ক্রিম’। ডালডার সঙ্গে রং মিশিয়ে কয়েক দিন আগে তৈরি করা হয়েছে এই কথিত চকলেট ক্রিম। ওই কক্ষেই ডালডার মজুত ও বালতি ভর্তি লাল, হলুদ, সবুজ নানা রঙের বিভিন্ন ক্রিমও রয়েছে। এগুলো দিয়ে ময়দার তৈরি কেকের ওপর বাহারি নকশা করা হয়।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

যে কক্ষে ডেকোরেশনের কাজ চলে সেখানে ফুড কালার, কোকো পাউডার থাকলেও একটি বাক্সে দেখা গেল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার। এই রং মিশিয়েই বালতিতে নানা রঙের ক্রিম তৈরি করছেন কারখানার কর্মীরা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

পেছনের এই ভয়ংকর ধাপগুলো পেরিয়ে সুসজ্জিত কেকগুলো জায়গা পাচ্ছে আকর্ষণীয় বাক্সে।

এসব কেক সংরক্ষণের রেফ্রিজারেটরের দরজা খুলতেই আরও আতঙ্ক জাগে। কেকগুলোর সঙ্গেই রাখা হয়েছে কাঁচা মাছ-মাংস ও মসলা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

কারখানাটির মালিক কে সে বিষয়ে কর্মীদের কেউ কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। এমনকি নিজের নামও জানাননি কোনো কর্মচারী।

তারা জানান, ছয় মাস ধরে চলছে এই কারখানা। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ পিস কেক সরবরাহ করা হয় আশপাশের বিভিন্ন দোকানে। রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ এলাকার বিভিন্ন কনফেশনারি ও বেকারি দোকানিরাই তাদের প্রধান ক্রেতা। কারখানা থেকে প্রতি পাউন্ড কেক ১০০ টাকা করে বিক্রি হয়। আর সেগুলো বেকারি ও কনফেকশনারিতে বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পাউন্ড হিসাবে।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

কেক তৈরির প্রক্রিয়া জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার এক কর্মী নিউজবাংলাকে জানান, ময়দার সঙ্গে চিনি, ডিম ও তেল মিশিয়ে খামির তেরি করে ওভেনের মাধ্যমে মূল কেক তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো নানা আকৃতিতে কেটে তার ওপরে ক্রিম দিয়ে ডেকোরেশন করা হয়।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

এই কারখানায় ভ্যানিলা ও চকলেট ফ্লেভারের দুই ধরনের বেসিক ক্রিম রয়েছে। ডালডার সঙ্গে রং, ফ্লেভার ও কোকো পাউডার মিশিয়ে এই ক্রিম তৈরি হয়। আকর্ষণ বাড়াতে লাল, সবুজ, হলুদসহ নানা রঙের ক্রিম তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

এক কর্মী স্বীকার করেন, কারখানা চালাতে মালিকের কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেই।

কোথায় যাচ্ছে এসব কেক

অত্যন্ত নিম্নমানের এসব কেকের গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিষ্কার কোনো তথ্য দেননি মর্নিং ফুড কারখানার কর্মীরা। তারা জানান, বিভিন্ন দোকান থেকে লোক এসে অর্ডার দিয়ে নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যান। তারা সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দোকানে কেক সরবরাহ করেন না।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

তবে পরদিন কারখানার ওপর নজর রেখে নিউজবাংলা দেখতে পায় সকাল ১০টার কিছু পরে দুই ব্যক্তি সেখান থেকে দুটি সাইকেলে চড়ে বেরিয়ে যান। ঘণ্টাখানেক পর তারা সাইকেলের পেছনে কয়েকটি কেকের বাক্স নিয়ে কারখানায় ফিরে আসেন।

এক সাইকেল আরোহী বুলবুলকে প্রশ্ন করলে স্বীকার করেন তিনি কারখানার ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে খণ্ডকালীন কেক তৈরি করেন।

তার কাজ হলো প্রতিদিন দুপুরের পর বিভিন্ন দোকানে অর্ডার অনুযায়ী কেক পৌঁছে দেয়া। আর পরদিন সকালে তিন দিনের বেশি পুরোনো কেক কারখানায় ফিরিয়ে আনা।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন
এভাবে বিভিন্ন দোকানে পাঠানো হয় মর্নিং ফুড কারখানার কেক

ঘটনার দিন সকালে তিনি দুই দোকান থেকে তিনটি পুরোনো কেক ফেরত এনেছেন।

কারখানার এক কর্মী নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, দোকান থেকে ফিরিয়ে আনা বাসী কেকে আবার নতুন ক্রিম মাখিয়ে পরদিন ফের দোকানে সরবরাহ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘পাউন্ড ১০০ টাকা দরে কেক বিক্রি করে খুব সীমিত লাভ হয়। এর মধ্যে যদি আবার কেক ফেরত আসে তাহলে ব্যবসা চলবে না। তাই আমরা পুরোনো কেকে আবার ক্রিম মাখিয়ে বিক্রি করি।’

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

দুপুরের পর কারখানা থেকে নতুন কেক নিয়ে সাইকেলে চড়ে বেরিয়ে যান ওই দুই ডেলিভারি ম্যান। একজনের পিছু নিয়ে দেখা যায় কারখানা থেকে কিছুটা দূরে হাসেম খান রোড বাজারের হৃদয় কনফেকশনারি ও ভাগ্যকুল মিষ্টিমুখ নামে দুটি দোকানে তিনি কেক পৌঁছে দিলেন। দোকানের কর্মচারীরা বেশ যত্ন নিয়ে এই কেক সাজিয়ে রাখেন।

দাম জানতে চাইলে ভাগ্যকুল মিষ্টিমুখ নামের দোকানের কর্মচারী ১ পাউন্ড কেকের দাম চান সাড়ে ৩০০ টাকা, আর দুই পাউন্ডের দাম ৬০০ টাকা। তবে দামাদামির পর ১ পাউন্ড কেক ২৫০ টাকায় দিতে রাজি হন তিনি।

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

দোকান মালিক আরাফাত রহমান লিংকন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পাশের একটি কারখানা থেকে এই কেকগুলো দিয়ে যায়। দুই ধরনের কেক হয়। হাই কোয়ালিটি আর লো কোয়ালিটি। হাই কোয়ালিটির কেক বাটার দিয়ে তৈরি হয় আর লো কোয়ালিটির কেক ডালডা দিয়ে।

‘তবে এই এলাকায় হাই কোয়ালিটি কেক খুব একটা চলে না। মাঝে মাঝে কেউ অর্ডার করলে আমরা কারখানাকে হাই কোয়ালিটি কেক দিতে বলি। এ ধরনের কেক প্রতি পাউন্ড ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়।’

বাহারি এই কেকের পেছনের গল্পটি শুনুন

লিংকন জানান, সাধারণত তিনি লো কোয়ালিটির কেক অর্ডার করেন, কারণ এই কেক সস্তা হওয়ায় চাহিদা বেশি।

বাসী কেক ফেরত দেয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কারখানার সঙ্গে আমার কনট্রাক্ট হলো বিক্রি না হলে ফেরত নিয়ে নতুন কেক দেবে। এটাই হয় সব জায়গায়।’

বাসী কেকের ওপর ক্রিমের নতুন প্রলেপ দেয়া এবং কারখানায় নোংরা পরিবেশের তথ্য জানেন কি না, এমন প্রশ্নে লিংকনের দায়সারা জবাব, ‘এত কিছু আমাদের জানতে হয় না, এত কিছু জানলে ব্যবসা করা যাবে না।’

আরও পড়ুন:
দাম নিয়ে কারসাজির মামলার পর আরও বাড়ল বাজার খরচ
বাসি মাংসে রং মিশিয়ে বিক্রি, লাখ টাকা জরিমানা
পাম তেলে ১২ ও চিনিতে ৪ টাকা কমানোর সুপারিশ
জেলা পর্যায়ে ডিলারপ্রতি আটা দিনে ১ টন
পণ্যমূল্য বেঁধে দেয়া: তথ্য দিতে ব্যবসায়ীদের গড়িমসি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Prashant Kumars poetry behind the controversial question of HSC

এইচএসসির বিতর্কিত প্রশ্নের পেছনে প্রশান্ত কুমারের ‘কবিমন’!

এইচএসসির বিতর্কিত প্রশ্নের পেছনে প্রশান্ত কুমারের ‘কবিমন’! এইচএসসি পরীক্ষায় বিতর্কিত প্রশ্ন করে সমালোচিত শিক্ষক প্রশান্ত কুমার পাল। গ্রাফিক্স: মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা
অভিযুক্ত শিক্ষক প্রশান্ত কুমার পাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ওপরে তো চারজন মডারেটর ছিলেন। আমি না হয় অবচেতন মনে, কবি হিসেবে কবিমন নিয়ে হয়তো কোনো উদ্দীপক তৈরি করেছি। প্রশ্নে যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার মতো কিছু থাকে বা আপত্তিকর কিছু থাকে তাহলে তারা (মডারেটর) তো সেটা সংশোধন করবেন।’

এইচএসসি পরীক্ষায় বাংলা প্রথম পত্রে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক প্রশ্ন প্রণয়নকারী শিক্ষক প্রশান্ত কুমার পাল দাবি করছেন, কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি আলোচিত প্রশ্নটি করেননি। নিজের 'কবিমন' থেকে অবচেতনভাবে কাজটি করেছেন।

এই প্রথম প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছেন দাবি করে তিনি বলছেন, এ বিষয়ে তার যথাযথ প্রশিক্ষণ ছিল না।

তবে যশোর শিক্ষা বোর্ড ও আন্তশিক্ষা বোর্ডের দাবি, প্রশান্ত কুমার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু) থেকে প্রশিক্ষণ না পেলেও অন্য প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তার প্রশ্নপত্র তৈরির অভিজ্ঞতাও নতুন নয়।

শিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এসএসসি বা এইচএসসির প্রতিটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য নির্বাচিত শিক্ষকদের তালিকা রয়েছে।

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রতি বিষয়ের প্রশ্নপত্র তৈরিতে ৯টি শিক্ষা বোর্ডে নির্বাচিত শিক্ষক আছেন ৩৬ জন। অর্থাৎ প্রতি বিষয়ের জন্য প্রতিটি বোর্ডে প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব পান চারজন শিক্ষক। একইভাবে প্রতিটি বোর্ডে প্রতি বিষয়ের প্রশ্নপত্র মডারেট করেন আলাদা চারজন শিক্ষক।

এইচএসসির বিতর্কিত প্রশ্নের পেছনে প্রশান্ত কুমারের ‘কবিমন’!
এইচএসসির বিতর্কিত প্রশ্নপত্র

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক নিউজবাংলাকে জানান, প্রশ্নপত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় পরীক্ষার পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রাথমিক কার্যক্রম।

তিনি জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট থেকে শিক্ষকদের মান উন্নয়নের পরীক্ষা নেয়া হয় ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণে ভালো ফলের ভিত্তিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারী বা মডারেটর নিয়োগ দেয়া হয়।

অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘আমরা সাধারণত বেডুর ট্রেনিংকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। এই ট্রেনিং মূলত প্রশ্নপত্র তৈরি ও মডারেশনের জন্যই দেয়া হয়। এটা থেকেই মাস্টার ট্রেইনার তৈরি হয়।’

আরও পড়ুন: এইচএসসিতে বিতর্কিত প্রশ্নটি করেন ঝিনাইদহের শিক্ষক

অন্যদিকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে শুধু পাঠ্যবই-বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বা ওই সব বিষয়ে ট্রেনিং প্রদান করে বেডু।’

তবে বেডু থেকে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি বলে নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন বিতর্কিত প্রশ্ন প্রণয়নকারী শিক্ষক প্রশান্ত কুমার পাল।

ঝিনাইদহের মহেশপুরের ডা. সাইফুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক প্রশান্ত কুমারের দাবি, এবারই প্রথম তিনি প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন এবং কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো পূর্ব নির্দেশনা দেয়নি।

যেসব দাবি করছেন প্রশান্ত কুমার

প্রশান্ত কুমার পাল বুধবার রাতে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার বিষয়ে যদি কোনো সার্ভে বা জরিপ করেন তাহলে দেখবেন আমি ২২-২৩ বছর শিক্ষকতা করছি।

‘এই প্রথম আমি এইচএসসির প্রশ্ন করেছি, তাই আমি বুঝে উঠতে পারি নাই। আর আমার প্রশ্ন যে প্রথমবারেই সিলেক্ট হবে সেটাও ধারণা ছিল না। প্রশ্ন সেটার (প্রণয়নকারী) হিসেবে আমরা চারজন ছিলাম, এর মধ্যে আমারটাই সিলেক্ট হয়েছে।’

প্রশ্নপত্র মডারেশনের (পরিমার্জনের) দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন প্রশান্ত কুমার।

এইচএসসির বিতর্কিত প্রশ্নের পেছনে প্রশান্ত কুমারের ‘কবিমন’!
শিক্ষক প্রশান্ত কুমার পাল। গ্রাফিক্স: মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ওপরে তো চারজন মডারেটর ছিলেন। আমি না হয় অবচেতন মনে, কবি হিসেবে কবিমন নিয়ে হয়তো কোনো উদ্দীপক তৈরি করেছি। প্রশ্নে যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার মতো কিছু থাকে বা আপত্তিকর কিছু থাকে তাহলে তারা (মডারেটর) তো সেটা সংশোধন করবেন।

‘ওখানে (প্রাথমিক প্রশ্নপত্রে) আমার ফোন নম্বর দেয়া ছিল। আমাকে যদি ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন তাহলে আমি আরেকটা উদ্দীপক সেটআপ করতে পারতাম। আর এটা সাংঘর্ষিক হলে কেন তারা বাদ দেননি?’

আলোচিত প্রশ্নপত্রটি মডারেশনের দায়িত্বে ছিলেন নড়াইলের সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তাজউদ্দীন শাওন, সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. শফিকুর রহমান, মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের সহকারী অধ্যাপক শ্যামল কুমার ঘোষ, কুষ্টিয়া ভেড়ামারা আদর্শ কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম।

তাদের মধ্যে অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম দাবি করছেন, কাসালাং সেটের ১১ নং প্রশ্নের বিতর্কিত অংশ তারা বাতিল করেছিলেন। এর পরেও চূড়ান্ত প্রশ্নে তা থেকে যাওয়ার কারণ অজানা।

আরও পড়ুন: বিতর্কিত প্রশ্ন: অভিযুক্ত শিক্ষক লাপাত্তা, দায় নিচ্ছেন না মডারেটর

রেজাউল করিম সম্প্রতি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার চেয়ে সিনিয়র তিনজন মডারেটর আছেন। আমি সবার জুনিয়র। শোকজ করলে আমরা বিষয়টির জবাব দেব।

‘মডারেশনের সময় প্রশ্নটি আমরা দেখেই বুঝেছিলাম এতে বিতর্ক হতে পারে। সে জন্য আমরা প্রথমে উদ্দীপক ও প্রশ্ন পরিবর্তন করেছিলাম। আমি নিজেও একটি উদ্দীপক বানিয়েছিলাম। সেখানে হিন্দু-মুসলমান কিছু ছিল না।’

নিজেদের দায় নাকচ করে তিনি বলেন, ‘ওই প্রশ্নটি (বিতর্কিত প্রশ্ন) ছিল ১০ নম্বরে। আমরা সেটা কেটে দিয়ে (বাতিল করে) ১১ নম্বর প্রশ্ন দিয়েছিলাম। হাতে লেখা প্রশ্ন ফেলে দেয়ার নিয়ম নেই, তাই আমরা যুক্ত করে রেখেছিলাম। কিন্তু কীভাবে বাতিল করা উদ্দীপক ও প্রশ্ন ছাপা হলো, সেটা আমি জানি না।

‘২৪ বছর ধরে চাকরি করছি, এর মধ্যে ১২ বছর ধরে মডারেশন করছি। ভুল করার সুযোগ নেই।’

প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বিষয় যুক্ত করা ‘ভুল হয়েছে’ বলে স্বীকার করেন প্রশান্ত কুমার। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কীভাবে প্রশ্ন করতে হবে সে ব্যাপারে আমার ওপর তো কোনো নির্দেশনা ছিল না। আমি তো প্রথমবার করেছি। আমার কোনো ট্রেনিং নাই।’

‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট থেকে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তা আমি পাইনি। আমি শিক্ষা বোর্ডে যাওয়ার পর ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আরও লোক ছিলেন, তারাও প্রশ্নপত্র করছিলেন। আমিও কাগজ নিয়ে লেখা শুরু করলাম।’

প্রশান্ত কুমার বলেন, ‘ওই প্রশ্নটা (বিতর্কিত প্রশ্ন) ১১ নং প্রশ্ন আর শেষ প্রশ্ন ছিল। এর ওপরের প্রশ্নগুলো দেখবেন কত সুন্দর। আমার প্রশ্ন খারাপ হলে তো আর ওরা (মডারেটর) চয়েজ করতেন না। আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না, এটা আমি ভাবিও না।’

নিজেকে কবি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি এ ধরনের (সাম্প্রদায়িক) কোনো মানসিকতায় পোষণ করি না। আমি সারা জীবনই অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোক। ধর্ম দিয়ে মানুষকে বিচার করি না। আমার কাছে ধর্ম মুখ্য নয়, মানুষ মুখ্য।’

তার ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখার অনুরোধ জানিয়ে প্রশান্ত কুমার বলেন, ‘সেখানে দেখতে পাবেন আমার দুই হাজার কবিতা আছে। সেখানে কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক কথা নেই। প্রশ্নের মধ্যে আমার নিজের লেখা কবিতাও আছে।’

প্রশ্ন প্রণয়নকারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। প্রশান্ত কুমার বলেন ‘নিয়োগ পেতে আমি কাউকে ঘুষ দিইনি। আমি লেখালেখির মধ্যেই থাকি। বোর্ড থেকে অধ্যক্ষকে কল করেছিল। অধ্যক্ষ আমাকে বলেছেন, এরপর আমি প্রশ্নপত্র তৈরি করেছি।’

আরও পড়ুন: এইচএসসির প্রশ্নপত্র মডারেশনের পর সংশোধনের আর সুযোগ নেই

আলোচিত ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত কমিটি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে জানিয়ে প্রশান্ত কুমার বলেন, ‘আমাকে আমার যাবতীয় পেপার নিয়ে যেতে বলেছে। এখানে পেপারের মধ্যে আমার সমস্ত সার্টিফিকেট ও প্রশ্নের পাণ্ডুলিপি। নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, প্রশ্নের খসড়া, আমার লেখা বই, বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের সার্টিফিকেট ইত্যাদি থাকবে।’

প্রশান্ত কুমারের দাবি মানছে না শিক্ষা বোর্ড

প্রশ্নপত্র প্রণয়নের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা না পাওয়ার দাবি করছেন প্রশান্ত কুমার পাল। তবে এ অভিযোগ মানছে না শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সভাপতি তপন কুমার সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে ওনার প্রশিক্ষণের বিষয়ে তথ্য আছে। যশোর বোর্ড থেকে তার সব ধরনের ট্রেনিংয়ের কথা আমাদের জানানো হয়েছিল। সেভাবেই তার লিস্ট পাঠানো হয়।’

তপন কুমার সরকার বলেন, ‘যশোর বোর্ড থেকে আমাদের জানানো হয়েছে তার (প্রশান্ত কুমার) টিচার্স কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট ট্রেনিং আছে। সৃজনশীলের জন্য ট্রেনিং আছে। সেটা নিয়ে তিন দিনের ট্রেনিং হয় আবার ১২ দিনের একটা হয়। আমাদের সেচিপ (সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম)-এর বিভিন্ন প্রজেক্টের আওতায় এসব ট্রেনিং দেয়া হয়, এনসিটিবি থেকেও দেয়া হয়।’

তবে বেডুর ট্রেনিং প্রশান্ত কুমারের ছিল কিনা সেটি নিশ্চিত নন আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সভাপতি তপন কুমার সরকার।

এইচএসসির বিতর্কিত প্রশ্নের পেছনে প্রশান্ত কুমারের ‘কবিমন’!
এইচএসসির বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষায় বিতর্কিত প্রশ্ন নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা

যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মাধব চন্দ্র রুদ্র বলছেন, প্রশান্ত কুমার বেডুর প্রশিক্ষণ না পেলেও প্রয়োজনীয় অন্য প্রশিক্ষণ তার ছিল। প্রশান্ত এর আগেও প্রশ্নপত্র প্রণয়নে জড়িত ছিলেন বলেও দাবি করছেন তিনি।

অধ্যাপক মাধব চন্দ্র নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তার (প্রশান্ত) টিচার্স কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট ট্রেনিং আছে। তিনি ২২ বছর ধরে শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান পরীক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। গতবারও তিনি প্রশ্ন তৈরি করেছেন। ২২ বছরের একজন শিক্ষক কীভাবে এমন প্রশ্ন তৈরি করতে পারলেন!’

প্রশান্ত কুমারকে নির্বাচনের প্রক্রিয়া কী ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের শিক্ষতকার অভিজ্ঞতা, খাতা দেখার অভিজ্ঞতা, প্রধান পরীক্ষক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হয়েছে। উনি এর আগে একবার প্রশ্নপত্র তৈরি করেছেন। এগুলোর ভিত্তিতেই উনি এবার নিয়োগ পেয়েছেন।’

অধ্যাপক মাধব চন্দ্র নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তবে তিনি (প্রশান্ত) এবার বদলি নিয়োগ পেয়েছিলেন। যার কাজটি করার কথা ছিল সেই নারী শিক্ষক একটু অসুস্থ। আর বাংলার মাস্টার ট্রেইনার আছেনই ছয়জন বা আটজন। তাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাজটি দিতে হয়। সব বোর্ডেই বাংলার এমন অবস্থা।

‘তাই যারা ফিল্ড ট্রেনিংয়ে আছেন তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রশ্ন করার অভিজ্ঞতা যাদের আছে তাদের নিয়েই প্রশ্ন করানো হয়।’

প্রশান্ত কুমারকে বাছাইয়েরে প্রক্রিয়া জানতে চাইলে ড. সাইফুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বলাই চন্দ্র পাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি তাকে নিয়োগ দিইনি। আমাকে বোর্ড থেকে বলেছে, তাকেও বলেছে। এরপর আমি তাকে ছুটি দিয়েছি।’

প্রশান্ত পালের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আছে দাবি করে বৃহস্পতিবার তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যা যা প্রশিক্ষণ আছে তার কাগজ নিয়ে তিনি আজ বোর্ডে গিয়েছেন। আমি জানি, তার টিচার্স কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট ট্রেনিং আছে। তিনি আগেও প্রশ্নপত্র করেছেন। পরীক্ষার খাতা দেখছেন। বোর্ড জানে তার সব ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। তারাই তাকে সিলেক্ট করেছে।’

আরও পড়ুন:
ওয়াদুদ স্মারক বিতর্ক চ্যাম্পিয়ন জাবি ডিবেটিং সোসাইটি
ডিপিএস-এসটিএসে দুই দিনব্যাপী আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় ৬ জনের রিমান্ড
মা মহিলা দলে, ছেলে ছাত্রলীগে
বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না সিলেটের মেয়রের

মন্তব্য

p
উপরে