× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বাংলাদেশ
Father also wanted to kill Sanjana
hear-news
player
google_news print-icon

সানজানাকে খুনও করতে চেয়েছিলেন বাবা

সানজানাকে-খুনও-করতে-চেয়েছিলেন-বাবা
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সানজানা মোসাদ্দিকা (বাঁয়ে) এবং তার বাবা শাহীন ইসলাম। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সানজানাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন সুরাইয়া লতা। তার কাছেই জানা গেল তার বাবার খুন করতে যাওয়ার কাহিনি। সেটি মাসখানেক আগের কথা। লতা বলেন, ‘ওই বাসা থেকে একজন নক করে বলেন আমাদের বাঁচান। গিয়ে দেখি সানজানার বাবা বঁটি হাতে মেয়েকে মারার জন্য উদ্যত হয়েছেন। আমরা সবাই যাওয়ায় আর মারেনি। তবে এমনভাবে সানজানার ঘাড়ে বঁটি ধরা ছিল যে আঘাত করলেই মারা যেতে পারত মেয়েটি।’

ছাদ থেকে পড়ে মারা যাওয়া ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সানজানা মোসাদ্দিকার মৃত্যুর পরই জানা গিয়েছিল বাবার হাতে তার নিয়মিত নির্যাতিত হওয়ার কথা। এই তরুণীর এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে এবার জানা গেল মাসখানেক আগে সানজানা তার প্রাণ বাঁচাতে চিৎকার করার পর তারা গিয়ে দেখতে পান, তার গলায় বঁটি ধরে আছেন বাবা।

নিয়মিত মারধরের চাপ নিতে পারেননি সানজানা। তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন মা।

তার মৃত্যুর জন্য বাবা শাহীন ইসলামকে দায়ী করে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সানজানার মা উম্মে সালমা।

রাজধানীর বিমানবন্দর মোড়ে হাজি ক্যাম্পের পাশে দক্ষিণখানের বটতলা এলাকার বাড়ি ধানসিঁড়ি ভিলার অষ্টম তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকতেন সানজানা।

মেয়ে এবং তাকে নিয়মিত নির্যাতনের অভিযোগ এনে সালমা দুই মাস আগে শাহীনকে তালাক দিলেও তিনি জোর করেই বাসাতে থাকতেন বলে তথ্য মিলেছে। তবে ঘটনার রাত থেকেই তিনি পলাতক।

সানজানাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন সুরাইয়া লতা। তার কাছেই জানা গেল সানজানাকে তার বাবার নিপীড়ন-নির্যাতনের কাহিনি।

সানজানাকে খুনও করতে চেয়েছিলেন বাবা

রাজধানীর দক্ষিণখানের বটতলা এলাকার বাড়ি ধানসিঁড়ি ভিলার অষ্টম তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকতেন সানজানা। ছবি: নিউজবাংলা

সেটি মাসখানেক আগের কথা। লতা বলেন, ‘ওই বাসা থেকে একজন নক করে বলেন আমাদের বাঁচান। গিয়ে দেখি সানজানার বাবা বঁটি হাতে মেয়েকে মারার জন্য উদ্যত হয়েছেন। আমরা সবাই যাওয়ায় আর মারেনি। তবে এমনভাবে সানজানার ঘাড়ে বঁটি ধরা ছিল যে আঘাত করলেই মারা যেতে পারত মেয়েটি।’

লতা জানান, সেদিন মেয়েটির জীবন বাঁচাতে দীর্ঘ সময় সেখানে অপেক্ষা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকি এই ভেবে যে বাইরের মানুষের সামনে হয়তো কিছু করবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে সেখান থেকে আসি।’

আরেক প্রতিবেশী নাজমুন নাহার বলেন, ‘তাদের (শাহীন ও সালমা) এসব ঝগড়াঝাঁটি অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। আমি বলেছি, যার সঙ্গে হচ্ছে না, বাদ দেন। কিন্তু রোজ এসব মারামারি চারপাশের পরিবেশ নষ্ট করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সানজানার বাবা আশপাশে প্রচার করেছেন, সে তার সন্তান না। তার স্ত্রীর আগের ঘরের সন্তানসহ তাকে বিয়ে করেছেন। তবে ঘটনা যাই হোক, জেনেশুনেই উনি সব করেছেন। এভাবে মারামারি তো করতে পারেন না।’

সানজানাকে খুনও করতে চেয়েছিলেন বাবা

সানজানা মোসাদ্দিকার মৃত্যুর জন্য বাবা শাহীন ইসলামকে দায়ী করে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সানজানার মা উম্মে সালমা। ছবি: নিউজবাংলা

মেয়েকে নিয়মিত মারতেন শাহীন

সানজানার ফ্ল্যাটে ঢুকতেই তার মা উম্মে সালমা জড়িয়ে ধরে শুরু করেন কান্না। মেয়েটির নানিও চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না।

সাংবাদিকদের দেখে বিলাপ করে সানজানার নানি বলছিলেন, ‘তোমরাই পারবা আসল বিচার আইন্যা দিতে। তোমরা তরুণ, তরুণরা ছাড়া কেউ পারবে না।’

পরিস্থিতি একটু শান্ত হতেই সালমা বলতে শুরু করেন সানজানার করুণ কাহিনির বয়ান।

তিনি বলেন, ‘আমাকে প্রায়ই প্রচুর মারধর করত তার বাবা। মেয়ে সব সময় প্রতিবাদ করত বলে তাকেও মারত। ঘটনার দিন সকালে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে আমাকে মারতে এলে সানজানা প্রতিবাদ করে। তখন মেয়েকেও প্রচুর মারধর করে।’

‘মেয়েকে পড়াতে চাইতেন না বাবা। সেমিস্টারের টাকা চেয়েছে বলেও মারধর করেছে অনেক।’

সালমা জানান, মাস কয়েক আগে শাহীনের আরও একটি বিয়ে করার তথ্য জানতে পারেন তিনি। এটি সানজানাকে ভীষণ আহত করে।

তিনি বলেন, ‘সেই ঘরে তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। একদিকে বাবার অত্যাচার এবং দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনায় সানজানা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।’

কত দিন ধরে এমন অত্যাচার চলছে জানতে চাইলে সালমা বলেন, ‘সানজানার বাবা আগে ড্রাইভার ছিল। ৫ বছর ধরে অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে।

‘আমি অনেক ছোট থাকতে ১৪ বছর বয়সে তাকে পালিয়ে বিয়ে করি। আমার মা-বাবা শুরুতে রাজি না থাকলেও পরে এই বিয়ে মেনে নেন। শাহীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাই বারবারই টাকা দিতেন তারা।’

সালমা জানান, তার বাবা-মা শাহীনকে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত করতে জমি বিক্রির ৫৭ লাখ টাকা দেন। কিন্তু মুফতে পাওয়া সেই টাকা তিনি উড়ান আর বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করেন।

এমনকি বাসার কাজের মেয়ের সঙ্গে জোরপূর্বক শাহীনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানার পর সেই মেয়েটিকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন সালমা। জানান, সানজানা নিজের চোখে দেখার পর বাবাকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। পরে এ নিয়েও মেয়েকে মারধর করা হতো।

সানজানার ডায়েরি

সানজানা ডায়েরি লিখতেন। সেখানেও তার হতাশার কথা লেখা আছে। বেশি দিন বাঁচতে চান না, এই কথাটি নানাভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।

জীবনে কিছু ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার কথাও লেখা তার ডায়েরিতে। বাবার অত্যাচার, মানসিক অশান্তি থেকে কোনোভাবেই বের হতে না পারার কথাও উল্লেখ আছে।

সানজানার মা বলেন, ‘ছোট থেকেই নিজের বাবার প্রতি ঘৃণা নিয়ে বড় হয়েছে মেয়েটা। তাই সে ছেলেদের সহ্য করতে পারত না। বিয়ের কথা বললে রেগে যেত। ওর এক মেয়েবন্ধু সব সময় তাকে সাপোর্ট দিত, তাই সে তার খুব প্রিয় ছিল।’

আত্মহত্যার দিন সকালে সেই মেয়েবন্ধুর সঙ্গে সানজানা হোয়াটসঅ্যাপে যে চ্যাটিং করেন, সেখানেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ইঙ্গিত ছিল বলে জানান সালমা।

সেই মেয়েটি সেদিনও তাকে সহায়তা করার চেষ্টা করেন। তিনি বারবার জিজ্ঞেস করেন, ‘এগুলো কী করছ?’, ‘আমি কি আসব?’, ‘তুমি, আন্টি ঠিক আছ?, ‘আংকেল কি গেছে?’- এ রকম আরও কিছু কথা।

অত্যাচারে দেখা দেয় মানসিক রোগ

সানজানার মা জানান, বাবার অত্যাচার ও নানা আপত্তিকর কর্মকাণ্ড দেখে সানজানা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে যান। ডিপ্রেশনের কারণে তাকে ডাক্তারও দেখাতে হয়েছে।

প্রেসক্রিপশনে স্পষ্ট লেখা আছে সানজানার আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। তাকে নজরদারিতে রাখতে বলা হয়। পরে অন্য একজন চিকিৎসককে দেখালে তিনিও একই মত দেন। এই বিষয়টি জানার পরও শাহীন নিজেকে পাল্টাননি। সানজানাকে মারধর করেই গেছেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এইচ এম মাহমুদ হারুন নিউজবাংলাকে বলেন, 'এই ধরনের রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। তবে পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে তা আরও তীব্র হয়। পারিবারিক অশান্তি তার একটি বড় কারণ।

সানজানাকে খুনও করতে চেয়েছিলেন বাবা

প্রেসক্রিপশনে স্পষ্ট লেখা আছে সানজানার আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। তাকে নজরদারিতে রাখতে বলা হয়। ছবি: নিউজবাংলা

‘যেহেতু সানজানার পারিবারিক তীব্র অশান্তি ছিল এবং বাবাই তাকে শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার করত, তাই তার এই আত্মহত্যার প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পারিবারিক অশান্তি যেকোনো ছেলেমেয়েকে ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়, যা চূড়ান্ত রূপ হতে পারে আত্মহত্যা।’

চিরকুট রহস্য

সানজানার মৃত্যুর পর একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। তার মা বলছেন, এটি মেয়ে লিখে রেখে গেছে।

চিরকুটটি সানজানারই কি না, সেটি যাচাই করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর জন্য আমার বাবা দায়ী। একটা ঘরে পশুর সাথে থাকা যায়। কিন্তু অমানুষের সাথে না। একজন অত্যাচারী ও রেপিস্ট যে কাজের মেয়েকেও ছাড়ে নাই। আমি তার করুণ ভাগ্যের সূচনা।’

সানজানার মা বলেন, 'চিরকুটটা হাসপাতালে আমাদের বাসার নিরাপত্তারক্ষী দিয়েছে। এটি কোথায় ছিল জানি না। তবে শুনেছি সানজানার পাশেই পড়ে ছিল।’

সানজানাকে খুনও করতে চেয়েছিলেন বাবা

চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর জন্য আমার বাবা দায়ী। একটা ঘরে পশুর সাথে থাকা যায়। কিন্তু অমানুষের সাথে না। একজন অত্যাচারী ও রেপিস্ট যে কাজের মেয়েকেও ছাড়ে নাই। আমি তার করুণ ভাগ্যের সূচনা।’ ছবি: নিউজবাংলা

তবে নিরাপত্তারক্ষী জলিল শেখ বলেন, ‘চিরকুটের ব্যাপারে কিছু জানি না। আমার কাছ থেকে সানজানা দুপুর ১২টার দিকে চাবি নিয়ে যান। সাড়ে ১২টার দিকে ছাদ থেকে পড়ে যান।

‘পড়ার সময় নারকেলগাছের সঙ্গে বাধা পেয়ে বালিতে পড়েন। তাই সেভাবে আহত না দেখালেও হাত-পা কাটা এবং ভেঙেছে বোঝা যায়। আমরা তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে তুলে পাশেই উত্তরা একটা হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন সানজানা বলেছিল, ‘পা পিছলে পড়ে গেছি।’

দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজিজুল হক বলেন, ‘আমরা একটা চিরকুট পেয়েছি। হাতের লেখা যাচাই না করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলেও বোঝা যাবে। তবে পরিবার থেকে জানতে পেরেছি, সানজানা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। তার চিকিৎসাও চলছিল।’

সানজানাকে খুনও করতে চেয়েছিলেন বাবা

সানজানা মোসাদ্দিকার মৃত্যুর জন্য বাবা শাহীন ইসলামকে দায়ী করে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সানজানার মা উম্মে সালমা। ছবি: নিউজবাংলা

শাহীন কোথায়?

সানজানার মৃত্যুর ঘটনায় রোববার তার বাবার বিরুদ্ধে মামলা হয় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে। সালমার করা সেই মামলার আগেই শাহীন লাপাত্তা হয়ে যান।

সানজানার মায়ের ধারণা, ভারতে পালিয়েছেন শাহীন। এই ধারণা করার কারণ জানতে চাইলে সালমা বলেন, ‘তার ভিসা লাগানো আছে। কয়েক দিন ধরেই চেষ্টা করছিলেন সেই দেশে যাওয়ার।’

দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজিজুল হক জানান, শাহীনের ভারত চলে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‌‌‘আমাদের কয়েকটি টিম কাজ করছে। আশা রাখি, দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’

ব্র্যাকের প্রতিবাদ

বেসরকারি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী সানজানা মুসাদ্দিকাকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে তার বাবাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা।

মহাখালীর ওয়্যারলেস গেট এলাকায় রোববার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে এমন দাবি করেন সানজানার সহপাঠী ও বন্ধুরা।

সানজানাকে খুনও করতে চেয়েছিলেন বাবা
সানজানাকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে তার বাবাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা।

সানজানা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন।

আরও পড়ুন:
স্কুলের টয়লেটে ছাত্রের বিবস্ত্র মরদেহ
আমার মেয়েকে জীবিত ফেরত চাই: সুকন্যার মা
ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে শিক্ষক বরখাস্ত
হলে নিষিদ্ধ রাইসকুকার, মধ্যরাতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ
ছাত্রীর ‘শ্লীলতাহানি’, প্রধান শিক্ষকের অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Actually the SP wears the rank badge of DIG

আদতে এসপি, পরেন ডিআইজির র‍্যাংক ব্যাজ

আদতে এসপি, পরেন ডিআইজির র‍্যাংক ব্যাজ পুলিশ সুপার মীজানুর রহমান পরে আছেন ডিআইজির র‍্যাংক ব্যাজ। ছবি: নিউজবাংলা
ঢাকা রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের পুলিশ সুপার (কমান্ড্যান্ট) মীজানুর রহমান নিজের পদবিতে ব্রাকেটে লিখে থাকেন ‘উচ্চ আদালতের রায়ে ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত’। পরেন ডিআইজির র‍্যাংক ব্যাজ। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে উচ্চ আদালতের এক আদেশের রেফারেন্স টানেন তিনি।

পদবি পুলিশ সুপার (এসপি), তবে পরেন পুলিশের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) র‌্যাংক ব্যাজ। নিজেকে সব সময় পরিচয় দেন প্রভাবশালী এক পরিবারের আত্মীয় হিসেবে। ইতোমধ্যে অদৃশ্য ইশারায় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আসা অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত এড়িয়েছেন তিনি। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে অপকর্মের নানা অভিযোগ।

ওই কর্মকর্তার নাম মীজানুর রহমান। ঢাকা রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সে (আরআরএফ) পুলিশ সুপার (কমান্ড্যান্ট) হিসেবে দায়িত্বরত। তবে দাপ্তরিক কাজে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ব্রাকেটে লিখে থাকেন ‘উচ্চ আদালতের রায়ে ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত’।

এসপি পদে থেকে ডিআইজি র‍্যাংক ব্যাজ পরা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে উচ্চ আদালতের এক আদেশের রেফারেন্স টানেন মীজানুর রহমান। যদিও সেই রায়ে বলা আছে- ‘পদোন্নতিতে বাধা নেই’। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তের পরোয়া করেন না তিনি।

পুলিশ বিভাগ বলছে, আদালতের রায়ের কপি তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি। রায়ে কী লেখা আছে তা দেখে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে তারা। আদালত যদি মীজানকে পদোন্নতি দিয়ে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে আইনি লড়াই করবে পুলিশ সদর দপ্তর।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আদালত যদি তার পদোন্নতির রায় দিয়ে থাকে তা প্রতিপালনের দায়িত্ব পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু তিনি পুলিশ সদর দপ্তর ও মন্ত্রণালয়কে সেই সুযোগ দেননি। তার আগেই তিনি কাগজে-কলমে পুলিশ সুপার পদে থেকে ডিআইজি র‍্যাংক ব্যাজ পরিধান করে চলেছেন। পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তার কাছ থেকে কোনোভাবেই এমনটা আশা করা যায় না।

আদতে এসপি, পরেন ডিআইজির র‍্যাংক ব্যাজ
মো. মীজানুর রহমানের জারি করা অফিস আদেশ।

মীজানের বিতর্কিত কার্যক্রমের এখানেই শেষ নয়। তার উল্টোপাল্টা আচরণে আগেও বহুবার বিব্রত ও অপ্রস্তুত হয়েছে পুলিশ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ভেজাল সারের কারখানা খুলে জালিয়াতির ব্যবসা, পুলিশ দিয়ে জমি দখল করে পদস্থ কর্মকর্তাদের নামে সাইনবোর্ড টাঙানো, বাড়ি বানানোয় ৬০ পুলিশকে রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে ব্যবহার, প্রভাবশালী পরিবারের দোহাই দিয়ে দুদকের তদন্ত থেকে অব্যাহতি, নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি অর্জন, কনস্টেবল রিলিজে উৎকোচ গ্রহণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে পুলিশের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

বাস্তবতা হলো, এতসবের পরও রহস্যজনক কারণে মীজানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। একের পর এক বাহিনীর শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলেও চুপ পুলিশ সদর দপ্তর।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, আদালতের নাম ব্যবহার করে একদিকে পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন মীজান; অন্যদিকে ডিআইজি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে মন্ত্রণালয়ে জোর তদবির চালাচ্ছেন। একজন বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তার এভাবে লাগাতার অপকর্ম পুলিশ বিভাগের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এসপি মীজানুর রহমানের লাগাতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিব্রত মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগ। এখন ‌আবার তিনি আদালতের দোহাই দিয়ে ডিআইজির ব্যাজ-র‍্যাংক পরে বের হচ্ছেন।

‘তিনি বলছেন, আদালত তাকে প্রমোশন দিয়েছে। কিন্তু আদালত তো আমাদের বলবে রায় বাস্তবায়ন করতে। আমরা প্রজ্ঞাপন জারি করে তা প্রতিপালন করব। কিন্তু তিনি তার আগেই শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বসে আছেন।’

অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অ্যাডমিন) কামরুল আহসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি, তাই কথা বলা কঠিন। সব দেখে পরে বলব।’

এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (জননিরাপত্তা) আকতার হোসেইন ব্যস্ততার কথা বলে এড়িয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ) জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

জাহাঙ্গীর আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মীজানুর রহমান পদোন্নতি না পেয়ে একটার পর একটা মামলা করেন পুলিশ বিভাগের নামে। তিনি বলে থাকেন, আদালত তাকে পদোন্নতি দিয়ে ব্যাজ-র‍্যাংক পরতে বলেছে। সম্প্রতি তিনি নাকি আদালত থেকে ডিআইজি হওয়ারও রায় পেয়েছেন। আমরা এখনও রায়ের কপি পাইনি। তবে জেনেছি, রায়ের কপি পেলে পুলিশ আইনি ব্যবস্থা নেবে।’

‘আমরা জানি না আসলে আদালত তাকে কী বলেছে। আমি এখনও রায়ের কপি হাতে পাইনি। তবে ওনাকে দেখি, একজন পুলিশ সুপার হয়েও ডিআইজির ব্যাজ-র‍্যাংক পরে ঘোরাঘুরি করেন।’

আদতে এসপি, পরেন ডিআইজির র‍্যাংক ব্যাজ
পুলিশ সুপার মীজানুর রহমান পরে আছেন ডিআইজির র‍্যাংক-ব্যাজ। ছবি: নিউজবাংলা

আদালত মূলত কী বলেছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ নিউজবাংলাকে বলেন, “তার ‘পদোন্নতিতে বাধা নেই’ বা ‘পদোন্নতি দেয়া হলো’ এমন কোনো কথা রায়ে নেই। আপিল বিভাগের রায়ে কিছু ক্লারিক্যাল ভুলও আছে। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ সেটা সংশোধনের জন্য আদালতে আবেদন জানিয়েছি। এ আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত ২৩ অক্টোবর দিন ঠিক করে দিয়েছে।”

মীজানুর রহমানের আইনজীবী ব্যারিস্টার মৌসুমী কবিতা ফাতেমা বলেন, ‘আদালত কী বলেছে তা সার্টিফায়েড কপি দেখে বুঝে নেবেন। এখন আর এই মামলা চলমান নেই। তাই আর কথা বলব না।’

এসপি হয়ে ডিআইজির ব্যাজ-র‍্যাংক পরা বৈধ না অবৈধ- এমন প্রশ্নের উত্তরও এড়িয়ে যান তিনি। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে মীজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। কিন্তু একাধিকবার কল করেও মীজানকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে ১৫ সেপ্টেম্বর ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেন মীজানুর রহমান। মীজানের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী মো. ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবকে এই লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। পুলিশের মহাপরিদর্শককেও (আইজিপি) এ নোটিশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

নোটিশে তিনি পদোন্নতির সঙ্গে বকেয়া পাওনাদি পরিশোধের কথাও উল্লেখ করেন। প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে ডিআইজিসহ পরবর্তী উচ্চপদে পদোন্নতি পেতে তার আর কোনো বাধা নেই বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

মীজানুর রহমান ১৯৮৯ সালে উপপরিদর্শক পদে পুলিশে যোগ দেন। পরে ১৭তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর ১৯৯৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার, ২০০৩ সালে অ্যাডিশনাল এসপি ও ২০০৬ সালে এসপি হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন এই কর্মকর্তা। ওই পদে থেকেই ২০১৮ সালের ৩ জুলাই ডিআইজি হিসেবে র‌্যাংক ব্যাজ পরা শুরু করেন তিনি। এর আগে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে ২০১০ সালে বাগেরহাটের এসপির পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল তাকে।

আরও পড়ুন:
‘ভুল চিকিৎসা’য় প্রসূতির মৃত্যুর জেরে সংঘর্ষ
মুন্সীগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত যুবদল কর্মীর মৃত্যু
সাফজয়ী আঁখির বাড়িতে পুলিশ: এসআই-কনস্টেবল প্রত্যাহার
পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে আহত অর্ধশত
বিচারকের মামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তার জামিন

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The doctor was released from the peon while going to jail

জেলে যাওয়ার সময় পিয়ন, ছাড়া পেয়ে ‘ডাক্তার’

জেলে যাওয়ার সময় পিয়ন, ছাড়া পেয়ে ‘ডাক্তার’ করোনার ভুয়া সনদ তৈরি করায় গ্রেপ্তার হন সাঈদ হোসেন। জামিনে মুক্তি পেয়ে গ্রামে গিয়ে হয়েছেন চিকিৎসক। ছবি: নিউজবাংলা
সাঈদ হোসেনের মা সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসকের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মায়ের অনুরোধে সাঈদকে সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পিওনের চাকরি পাইয়ে দেন সেই চিকিৎসক। করোনার ভুয়া সনদ বিক্রির অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন ২০২০ সালের ২৫ মে। পরের বছর জামিনে মুক্তি পেয়ে ফেরেন বাড়িতে। সেখানে গিয়ে নামের সঙ্গে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করে শুরু করেন চিকিৎসা।

নওগাঁর সাঈদ হোসেন। ছিলেন ঢাকার সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর অফিস সহায়ক (পিয়ন)। ২০২০ সালে দেশে করোনা মাহামারি শুরু হলে বিদেশগামী যাত্রীদের কাছে করোনার জাল সনদ বিক্রির দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে যান কারাগারে। জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি গ্রামের বাড়ি নওগাঁর হোগল বাড়িতে ফিরে বনে গেছেন চিকিৎসক।

সব রোগের ‘চিকিৎসা জানা আছে’ সাঈদের। তাই কাউকে ফেরান না। নামের আগে পদবিও লিখছেন, ‘ডাক্তার’। রোগীদের ওষুধ লিখে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়।

সেই ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের পাশে ডিগ্রি হিসেবে লিখেছেন, ‘ডিএমএফ’, নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার।

কোত্থেকে এই ‘ডিএমএফ’ ডিগ্রি নিয়েছেন, এর মানে কী, কারা এই ডিগ্রি নেন, তার সনদ বা রোল-রেজিস্ট্রেশন নম্বর কী, তার কোনো কিছুই দেখাতে পারেননি সাঈদ।

এই ডিএমএফ ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের একটি ডিগ্রি। তবে যে কেউ এটি করতে পারেন এমন নয়। বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়ে এই কোর্সে ভর্তি হতে হয়।

চার বছরের এই ডিগ্রি শেষ করে সদনধারীদের কমিউনিটির ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে হবে। তাদেরকে গ্রামে-গঞ্জে থাকতে হবে। শহরে থাকতে পারবেন না।

আবার হাইকোর্টের একটি রায় অনুযায়ী বিকল্প ধারার চিকিৎসা পদ্ধতির পেশাধারীরা নামের সঙ্গে ডাক্তার লিখতে পারবেন না।

চিকিৎসকদের নিবন্ধন দেয় যে সংস্থা, সেই বিএমডিসির আইনেও নিবন্ধনভুক্ত মেডিক্যাল বা ডেন্টাল ইনস্টিটিউট কর্তৃক এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া কেউ ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না।

তবে সাঈদ থাকেন শহরে। নওগাঁর সদর উপজেলার হোগল বাড়ি মোড়ে ভাই ভাই মেডিকেয়ার ফার্মেসিতে বসেন। রোগী দেখেন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত।

পরিচিতজনদের কাছ থেকে তথ্য মিলেছে, সাঈদ হোসেনের মা সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসকের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মায়ের অনুরোধে সাঈদকে সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পিওনের চাকরি পাইয়ে দেন সেই চিকিৎসক।

করোনা শুরু হওয়ার পর সাঈদ জড়িয়ে যান করোনার ভুয়া সনদ তৈরিতে। বিষয়টি জানাজানি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে করে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। ২০২০ সালের ২৫ মে গ্রেপ্তার হন তিনি।

মামলাটির বিচার এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যে ২০২১ সালে জামিনে মুক্তি পান তিনি। ফিরে আসেন গ্রামের বাড়িতে। সেখানে একটি ফার্মেসি ও চেম্বার বসিয়ে শুরু করেন চিকিৎসা।


চিকিৎসা করাতে এসে প্রাণ যায় যায়

হোগল বাড়ি গ্রামের সাজু হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, মাস তিনেক আগে তার বাচ্চার সুন্নাতে খাৎনা করান সাঈদের কাছে। এরপর থেকে শিশুর রক্তপাত থামছিল না। অবস্থা বেগতিক দেখে রাত দেড়টার দিকে শিশুটিকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান তার বাবা।

সাজু বলেন, ‘আমার বাচ্চা সেদিন মরেই যাচ্ছিল। আল্লাহ পুনরায় হায়াত দিছে।’

সেদিনের ঘটনা গ্রামের মাতব্বরদের জানালে শালিসে সাঈদকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

জেলে যাওয়ার সময় পিয়ন, ছাড়া পেয়ে ‘ডাক্তার’
সাঈদ হোসেনের দেয়া ব্যবস্থাপত্র। ছবি: নিউজবাংলা

স্থানীয় মোতাহার হোসেন নামের এক প্রবীণ বলেন, ‘সাঈদ একটা ভুয়া ডাক্তার। আমার একটা সমস্যার জন্য দীর্ঘদিন থেকে তার কাছে চিকিৎসা করছি, কিন্তু রোগ সারেনা। উপায় না পেয়ে আমি শহরে ভালো ডাক্তার দেখাই। তারা আমাকে জানায় অসুখ অনুযায়ী ওষুধ ঠিক হয় নাই, রোগ সারবে কই থেকে?

‘পরে সেই ডাক্তার আমাকে এক শ টাকার ওষুধ দিছে, খেয়ে আমি বর্তমানে সুস্থ। এ তো রোগ-ই ধরতে পারে না, তাহলে কীসের ডাক্তার এই সাঈদ?’

চিকিৎসা নিতে আসা খাদেমুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘প্রসাবের জ্বালাপোড়া, মাথা ঘোরানো ও চোখে ঝাপসা এই সমস্যা নিয়ে আসছি। এর আগেও চিকিৎসা নিয়েছি, কিন্তু কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বরং সমস্যা আরও বাড়ছে। ১০দিন পর আসতে বলছিল, তাই আবার এসেছি।’

আবুল কালাম আজাদ হোসেন নামে স্থানীয় একজন বলেন, ‘সে (সাঈদ) তো ঢাকায় একটা হাসপাতালের পিওন ছিল। এরপর শুনেছি করোনার জাল সনদ বিক্রি করার জন্য জেলে গেছে। এখন জেল থেকে এসে আবার দেখি ডাক্তার হয়ে গেছে। সে কখন ভর্তি হলো, আর কখন চাকরি করল, আর কীভাবেই বা ডাক্তার হলো বিষয়টা তদন্ত হওয়া দরকার।’


সাঈদ যা বলছেন

সাঈদ হোসেনের চেম্বারে গিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাভার প্রিন্স মেডিক্যাল ইনস্টিটিটিউট (ম্যাটস) থেকে আমি ১১-১২ সেশনে ডিএমএফ করেছি।’

এর চেয়ে বেশি কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

আপনার কোনো সনদ বা পাশ করার প্রমাণ আছে- এমন প্রশ্ন করা হলে জবাব এড়িয়ে চেম্বার ছেড়ে বাইরে চলে যান সাঈদ।

পরে আবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সামনে মাসে ২৩ তারিখ আমার মামলার হাজিরা আছে। সেটা শেষ করে এসে সকল তথ্য দেবো, আমার সকল কাগজপত্র আছে।’

এক পর্যায়ে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘এসব ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারব না। আপনাদের যা ইচ্ছে করতে পারেন।’

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে নওগাঁর সিভিল সার্জন আবু হেনা মোহাম্মদ রায়হানুজ্জামান সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে জানলাম। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন:
রোগীর পেটে কাঁচি ফেলে আসায় চিকিৎসক জেলে
নারী চিকিৎসক হত্যা: রেজাউলের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন পিছিয়েছে
‘ভুল চিকিৎসা’য় প্রসূতির মৃত্যুর জেরে সংঘর্ষ
নিজ হাসপাতালে হয়রানির শিকার হয়ে বিস্মিত চিকিৎসক
বাবার লাশের পাশে ফেসবুক লাইভ: অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The freedom fighters son made his wife a sister to take advantage of the quota

কোটা সুবিধা নিতে স্ত্রীকে বোন বানালেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান

কোটা সুবিধা নিতে স্ত্রীকে বোন বানালেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটা সুবিধা পেতে জাতীয় পরিচয়পত্রে মুক্তিযোদ্ধা শ্বশুরকে বাবা এবং শাশুড়িকে মা হিসেবে তথ্য দেয়া হয়। ছবি: নিউজবাংলা
সন্তোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকু বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা আইনুল হকের ৮ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সোনালী খাতুন নামে কোনো সন্তান নেই। এই নামে তার পুত্রবধূ আছেন। তিনি আনিছুর রহমানের স্ত্রী।’

আছে একাধিক সন্তান, প্রতিবেশীরাও জানেন তারা স্বামী-স্ত্রী। অথচ জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তারা ভাই-বোন!

কোটা এবং সরকারি সুযোগ সুবিধা নিতে স্ত্রীকে বোন বানানোর এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছেন আনিসুর রহমান। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এর আগে ছোট ভাইকে ভোটার আইডি এবং শিক্ষা সনদ জালিয়াতি করে রেলওয়েতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাইয়ে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে আনিসুরের বিরুদ্ধে।

এলাকাবাসী জনায়, নাগেশ্বরী উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের কুটিনাওডাঙ্গা আমিরটারী তালবেরহাট গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আইনুল হকের ৮ ছেলে-মেয়ে।। তাদের মধ্য সবার বড় আনিছুর রহমান। তিনি রংপুর বেতারে অফিস সহায়ক পদে চাকরি করেন।

২০০৭ সালে জেলার উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের নাগড়াকুরা বাজার এলাকার মৃত রবিউল ইসলামের মেয়ে সোনালী খাতুনকে বিয়ে করেন আনিসুর। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সোনালী সবার ছোট। আনিছুর-সোনালী দম্পতির ঘরে জমজসহ বর্তমানে তিন সন্তান রয়েছে।

তবে বিয়ের পর উপজেলার সাপখাওয়া দাখিল মাদরাসায় নিজের শ্বশুর-শাশুড়িকে বাবা-মা হিসেবে তথ্য দিয়ে ২০১০-১১ সেশনে অনিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন সোনালী। ২০১৩ সালে ওই মাদরাসা থেকে জিপিএ-২.৯৪ পেয়ে দাখিল পাশ করেন তিনি।

পরে দাখিল পাসের সনদ ও ভুয়া জন্ম নিবন্ধন দেখিয়ে ২০১৪ সালে ভোটার হন সোনালী। সনদ অনুসারে মুক্তিযোদ্ধা শ্বশুর আইনুল হককে নিজের বাবা ও শাশুড়ি জামিলা বেগমকে নিজের মা হিসেবে তথ্য দেন তিনি।

সোনালী আনিসুরের বোন নয় দাবি করে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ জহুরুল হক বলেন, ‘আনিছুর রহমান আমার বাল্যবন্ধু। সোনালী খাতুন তার স্ত্রী। উলিপুর উপজেলায় সোনালীর বাবার বাড়ি।’

আনিছুর রহমানের ছোট ভাই খালেক জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি দেখে নিশ্চিত করেন সোনালী খাতুন তার ভাবী। তিনি স্বীকার করেন, মুক্তিযোদ্ধা বাবার সুযোগ সুবিধা পেতেই তার ভাই এমনটি করেছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সন্তোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা আইনুল হকের ৮ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সোনালী খাতুন নামে কোনো সন্তান নেই। এই নামে তার পুত্রবধূ আছেন। তিনি আনিছুর রহমানের স্ত্রী।’

অভিযুক্ত আনিছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, স্ত্রীকে বোন বানানোর বিষয়টি ভুলবশত হয়েছে। তার স্ত্রী এমনটি করেছেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে আনিসুরের স্ত্রী সোনালী খাতুন কথা বলতে রাজি হননি।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, ২০১৪ সালে ভোটার হালনাগাদ করার সময় সোনালী খাতুন এসএসসি সনদ এবং জন্ম নিবন্ধনের তথ্য দিয়ে ভোটার হন। তথ্য গোপন করার বিষয়ে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেনি।

এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে ভোটার তালিকা আইন ও বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান আনোয়ার হোসেন।

এর আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা আইনুল হকের দুই ছেলে আনিছুর রহমান এবং আজিজুল হক তথ্য গোপন করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন বলে অভিযোগ আছে। এনআইডিতে দুই ভাইয়ের একই নাম হলেও আলাদা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

২০১২ সালে রংপুর বেতারে অফিস সহায়ক পদে চাকরি নেন আনিছুর। আর ২০১৪ সালে রেলওয়ের ওয়েম্যান পদে অষ্টম শ্রেণি পাশের যোগ্যতা দেখিয়ে চাকরি পান আনিসুরের ছোট ভাই আজিজুল হক।

চাকরি নিতে তথ্য গোপনের আশ্রয় নেন আজিজুল। এ ক্ষেত্রে তিনি তার আগের ভোটার আইডি সংশোধন করেন।

বড় ভাই আনিসুরের সব তথ্য ব্যবহার করে তিনি এনআইডি সংশোধন করেন। পড়াশুনা না করেও তিনি বড় ভাই আনিছুর রহমানের অষ্টম শ্রেণি পাশের সনদ ব্যবহার করেন।

আগের ভোটার আইডিতে আজিজুল হকের জন্ম সাল ছিল ১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল। পেশা ছিল কৃষক। নতুন আইডিতে তার জন্মের সাল-তারিখে লেখা ১৯৮২ সালের ৭ জুলাই।

জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য গোপন করে নাম পরিবর্তন করলেও স্বাক্ষর পরিবর্তন করেননি আজিজুল হক।

২০১৪ সালে এনআইডিতে তথ্য গোপন করে চাকরি করার সংবাদ গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। পরে তদন্ত করে নির্বাচন কমিশন দুই ভাইয়ের নামে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইনে মামলার নির্দেশ দেয়।

২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচন অফিসার আনোয়ার হোসেন তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও করেন।

আরও পড়ুন:
সন্তানকে মৃত দেখিয়ে ভাতা তোলেন মুক্তিযোদ্ধার বাবা
ভাতা পান নকল মুক্তিযোদ্ধা, আসলের সন্তানরা দ্বারে দ্বারে
প্রতিবন্ধী কোটা ব্যবহার করেন না তামান্না
সাড়ে ২৪ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা পাচ্ছেন স্মার্ট আইডি
ব্যবহার হচ্ছে না ঝিনাইদহের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সগুলো

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Maryam was informed about Rahims location in Faridpur on Friday

রহিমার ফরিদপুরে অবস্থানের তথ্য শুক্রবারই জানানো হয় মরিয়মদের

রহিমার ফরিদপুরে অবস্থানের তথ্য শুক্রবারই জানানো হয় মরিয়মদের মায়ের সন্ধান চেয়ে ক্রন্দনরত মরিয়ম মান্নান। ফাইল ছবি
বোয়ালমারীর সৈয়দপুর গ্রামের জয়নাল ব্যাপারী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শুক্রবার রাতে মিরাজের (রহিমার ছেলে) নম্বরে কল দিলে তার স্ত্রী ফোন ধরে। আমি তাকে বলি রহিমা বেগম এখানে আছে। তখন অপর পাশ থেকে উত্তর আসে আমি ওনাকে চিনি না। এ নম্বরে আর ফোন দেবেন না।’

ময়মনসিংহের ফুলপুরে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর মরদেহকে নিজের মা দাবি করে শনিবারও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন দেশজুড়ে আলোচিত মরিয়ম মান্নান। অথচ তার মা রহিমা বেগম ফরিদপুরে যাদের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন তাদেরই এক আত্মীয় শুক্রবার মরিয়মের পরিবারে ফোন করে রহিমার অবস্থানের বিষয়ে তথ্য দেন।

জবাবে রহিমা নামের কাউকে চেনেন না বলে ফোন কেটে দেন মরিয়মের ভাই মিরাজ আল সাদীর স্ত্রী।

খুলনার মহেশ্বরপাশা থেকে নিখোঁজ রহিমা বেগমকে শনিবার অক্ষত অবস্থায় ফরিদপুরের বোয়ালমারীর সৈয়দপুর গ্রাম থেকে উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মায়ের নিখোঁজের তথ্য জানিয়ে প্রায় এক মাস ধরে তার সন্ধান করছিলেন তার মেয়ে মরিয়ম মান্নান। মরিয়মের কান্নার ছবি ছুঁয়ে যায় সবাইকে।

বোয়ালমারীর সৈয়দপুর গ্রামে কুদ্দুস মোল্লার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় রহিমা বেগমকে।

রহিমার ফরিদপুরে অবস্থানের তথ্য শুক্রবারই জানানো হয় মরিয়মদের
ময়মনসিংহে অজ্ঞাতপরিচয় নারীর মরদেহকে মায়ের দাবি করে শনিবারও স্ট্যাটাস দেন মরিয়ম

রহিমাকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে তোলপাড়ের মধ্যে শুক্রবার এ বিষয়ে জানতে পারেন কুদ্দুস মোল্লার ভাগনে জয়নাল ব্যাপারী।

জয়নাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মোবাইল ফোনে শুক্রবার বিকেলে যমুনা টিভিতে তার নিখোঁজ সংবাদ দেখি। রহিমার সঙ্গে মিল দেখে আমি বাড়িতে গিয়ে তার চেহারারা সঙ্গে মিলাই, দেখি উনিই সেই জন।

“রহিমা বেগমকে ভিডিও দেখালে শুধু বলে 'এটা তো আমি'। তখন তাকে খোঁজা হচ্ছে জানালে সে বলে 'আমি বাড়ি ফিরে যাব না।“

জয়নাল বলেন, ‘এরপর আমি যমুনা টিভির ভিডিওতে কমেন্ট করি। সেখানে কোনো উত্তর না পেয়ে আর সার্চ দিতে থাকি। তখন নিখোঁজ বার্তায় তার ছেলে মিরাজের নম্বর পাই। শুক্রবার রাতে মিরাজের নম্বরে কল দিলে তার স্ত্রী ফোন ধরে।

“আমি তাকে বলি রহিমা বেগম এখানে আছে। তখন অপর পাশ থেকে উত্তর আসে 'আমি ওনাকে চিনি না। এ নম্বরে আর ফোন দেবেন না'। এই বলে সে ফোন কেটে দেয়।“

কুদ্দুস মোল্লার বড় মেয়ের জামাই নূর মোহাম্মদের দাবি, সম্পত্তি নিয়ে প্রতিবেশী ও মেয়েদের সঙ্গে রহিমার বিরোধ চলছিল। এ কারণেই তিনি বাড়ি থেকে চলে এসেছিলেন।

রহিমার ফরিদপুরে অবস্থানের তথ্য শুক্রবারই জানানো হয় মরিয়মদের
ফরিদপুর থেকে খুলনা আনার পর মরিয়মের মা রহিমা বেগম

নূর মোহাম্মদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রহিমা বেগম আমাদের এখানে এসে বলেছিলেন আমাকে একটা কাজ খুঁজে দেন, আমি আর বাড়ি ফিরে যাব না। যেকোনো কাজ, ইটভাটার হোক, জুট মিলের হোক বা বাসাবাড়ির হোক।

‘আমার মেয়েদের সঙ্গে আমার শত্রুতা, মেয়েরা আমাকে ভালো জানে না, তারা আমাকে চায় না, আমার সম্পত্তি চায়। প্রতিবেশীও আমার সম্পত্তি চায়।’

কুদ্দুস মোল্লার প্রতিবেশীদেরও একই কথা বলেছেন রহিমা বেগম।

নূর মোহাম্মদ নিউজবাংলাকে জানান, রহিমা বেগম ১৭ সেপ্টেম্বর তাদের বাড়িতে আসেন।

তিনি বলেন, ‘ওই দিন বিকেলে রহিমা বেগম সৈয়দপুর বাজারে আসেন। তিনি অনেক দোকানে কুদ্দুস মোল্লার বাবা মোতালেব মুসল্লির বাড়ি খুঁজছিলেন। এই বাজারেই আমার দোকান আছে। এক দোকানদার আমার দাদা শ্বশুরকে খুঁজছে দেখে আমার কাছে নিয়ে আসে।

‘আমি তাকে বাড়িতে পাঠাই। বাড়ি গিয়ে আমার শাশুড়ি প্রথমে চিনতে পারছিলেন না। মরিয়মের মা তখন বলতে থাকেন, খুলনায় আমার বাড়িতে আপনারা ভাড়া ছিলেন, আমি মিরাজের মা, হুজুরের বউ। তখন চিনতে পেরে তাকে ভেতরে নিয়ে যান। সে বলেছিল, আমি বেড়াতে আসছি, দুই-তিন দিন থাকব। আমরা অতিথি ভেবে স্বাভাবিক আচরণ করেছি।’

নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘এর মধ্যে তিনি (রহিমা) দুই বার বোয়ালমারী সদর হাসপাতালে গেছেন চোখ দেখাতে। একদিন গেছেন ইউনিয়ন কার্যালয়ে। তিনি বাইরে গিয়ে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন কি না বা বা টাকা কোথা থেকে পেতেন সেটা বলতে পারছি না।’

প্রতিবেশী স্থানীয় মেম্বার মোশারফ হোসেন মূসা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শনিবার সকালে জয়নাল আমাকে রহিমা বেগমের নিখোঁজের বিষয়টি জানায়। তখন আমি খুলনা সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইফুল ইসলামকে অবগত করি। আমি একটা সালিশে গিয়েছিলাম তার অফিসে। তিনি মিটিংয়ে ছিলেন জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলেন।

‘পরে বিকেল ৫টার দিকে তিনি আমাকে কল দেন। বলেন, এ রকম একটা ঘটনা আছে। কাউন্সিলর বলেন আপনি ওই নারীকে দেখে রাখেন, আমরা আসব। এর মধ্যেই রাত ১০টার দিকে আমাকে ফোন করে লোকেশন জানতে চান, সাড়ে ১০টার দিকে তারা উপস্থিত হন। পরে খুলনা পুলিশ বোয়ালমারী থানাকে ইনফর্ম করে তাকে (রহিমা) খুলনা নিয়ে যান।’

রহিমার ফরিদপুরে অবস্থানের তথ্য শুক্রবারই জানানো হয় মরিয়মদের
মরিয়ম মান্নানের কান্নার ছবি ভাইরাল হয় ফেসবুকে

রহিমার অবস্থানের তথ্য জানিয়ে জয়নাল ব্যাপারীর ফোন করার বিষয়ে জানতে চাইলে তার ছেলে মিরাজ নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, সেদিন রাতে তার দুটি ফোনই ছিল বোন মরিয়ম মান্নানের কাছে।

তিনি বলেন, ‘আমার ফোন কখনই স্ত্রীর কাছে থাকে না। শুক্রবার সারা দিন প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে ক্লান্ত হয়ে বিকেলের পর ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর আমার দুটি ফোনই ছিল মরিয়মের কাছে। সে সময় কেউ ফোন করে বোনকে মায়ের বিষয়ে তথ্য দিয়েছিল কি না সেটি আমার জানা নেই।’

অজ্ঞাতপরিচয় নারীর মরদেহকে নিজের মায়ের দাবি করে বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন মরিয়ম মান্নান। পরদিন মরিয়মসহ তিন বোন ময়মনসিংহের ফুলপুর থানায় যান।

ফুলপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল মোতালেব চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে থানায় তারা পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ সময় তিন বোনকে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ছবি, পরনের গোলাপি রঙের সালোয়ার; গায়ে সুতির ছাপা গোলাপি, কালো-বেগুনি ও কমলা রঙের কামিজ এবং গোলাপি রঙের ওড়না দেখায় পুলিশ।’

নিহত নারীর বয়স ২৮ থেকে ৩০ বছর। এ কারণে পুলিশ মরিয়মকে জানায়, মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষা লাগকে। এরপর মরিয়ম মান্নান নিজের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার আবেদন করেন।

শুক্রবার বিকেলে ফুলপুর উপজেলা থেকে চলে যান মরিয়মরা৷ পরদিন শনিবার সকালে মরিয়মের ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন আদালতে জমা দেয় পুলিশ। শনিবার সকালেও ফেসবুক স্ট্যাটাসে মরিয়ম দাবি করেন, ফুলপুরে পাওয়া মরদেহটি তার মায়েরই।

আরও পড়ুন:
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কিশোরী ‘অপহরণ’
‘প্রেমে ব্যর্থ হয়ে’ প্রেমিকার ছোট বোনকে অপহরণ
অপহরণ করে যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগে আটক
কারা অপহরণ করেছিল, জানেন না অপহৃত দুজন
টেকনাফে অপহৃত ৪ জন উদ্ধার, গ্রেপ্তার যুবক

মন্তব্য

বাংলাদেশ
That weapon Kanak had no chance to fire

সেই অস্ত্র কনকের নয়, গুলি করার সুযোগও ছিল না

সেই অস্ত্র কনকের নয়, গুলি করার সুযোগও ছিল না গোয়েন্দা বাহিনীর উপপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান কনকের এই গুলি করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত।
সেদিনের ঘটনার ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা যায়, বিএনপির নেতা-কর্মীরা যখন পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ছিলেন, তখন কনক দাঁড়িয়ে, নিচের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এবং হাঁটু গেড়ে সরাসরি নেতা-কর্মীদের দিকে গুলি করছেন। তবে তিনি যখন সেখানে যান, হাতে ছিল একটি লাঠি। অন্যের রাইফেল হাতে তুলে নিয়ে গুলি করেছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জে বিএনপির নেতা-কর্মীদের দিকে রাইফেল দিয়ে গুলি করেছেন গোয়েন্দা পুলিশের যে কর্মকর্তা, সেটি তার ছিল না। তিনি অন্য একজনের হাত থেকে রাইফেল নিয়ে গুলি করেছেন।

নারায়ণগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর মনিরুজ্জামান বুলবুল বলেন, অন্যের অস্ত্র ব্যবহার করা যায় কেবল আত্মরক্ষার্থে। আক্রমণের জন্য ব্যবহারের সুযোগ নেই।

গোয়েন্দা বাহিনীর উপপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান কনকের এই গুলি করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নারায়ণগঞ্জে দলটির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় গুলিতে নিহত হন শাওন প্রধান, যাকে যুবদল কর্মী উল্লেখ করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ করছে দলটি।

সেদিনের ঘটনার ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা যায়, বিএনপির নেতা-কর্মীরা যখন পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ছিলেন, তখন কনক দাঁড়িয়ে, নিচের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এবং হাঁটু গেড়ে সরাসরি নেতা-কর্মীদের দিকে গুলি করছেন।

সেই অস্ত্র কনকের নয়, গুলি করার সুযোগও ছিল না

এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এটি নিয়ে কোনো তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। বিএনপির করা একটি মামলার আবেদনও ফিরিয়ে দিয়েছে আদালত।

এ ঘটনার পর পাঁচ দিন ধরে কনক নারায়ণগঞ্জের গোয়েন্দা অফিসেই দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাকে এরপর আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।


লাঠি নিয়ে ঘটনাস্থলে যান কাকন

পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, সেদিন কনককে কোনো অস্ত্র দেয়া হয়নি। তিনি সেখানে যান হাতে লাঠি নিয়ে। সংঘর্ষ চলাকালে তিনি অন্য এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে গুলি করেন।

একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সংঘর্ষের আগে মাহফুজ কনক অন্য ডিবি পুলিশদের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন। কনকের ডান হাতে একটি লাঠি আর বাম হাতে ওয়্যারলেস। আরেক অংশে দেখা যায় কনকের হাতে চাইনিজ রাইফেল। তিনি গুলি করছেন বিএনপির নেতা-কর্মীদের দিকে।

কনক সেই ঘটনার চার বা পাঁচ দিন আগে ভোলা থেকে নারায়ণগঞ্জে বদলি হয়ে আসেন। তিনি ভোলায় থাকাকালেও পুলিশের গুলিতে বিএনপির মিছিলে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে সেই গুলি কে বা কারা ছুড়েছিল, সেটি প্রকাশ পায়নি।

নারায়ণগঞ্জ পুলিশের পরিদর্শক শরফুদ্দিন ভূঁইয়া জানান, শটগান ও রাইফেল থাকে কনস্টেবলদের কাছে। উপপরিদর্শকের (এসআই) কাছে পিস্তল থাকে। তবে কারো কারো কাছে শটগান থাকে।

মাহফুজ কনক যে রাইফেল দিয়ে গুলি করেছে, সেটি কার দায়িত্বে ছিল, সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি শরফুদ্দিন।

তবে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনসে কর্মরত একাধিক পুলিশ সদস্য নিশ্চিত করেছেন, রাইফেলটি ছিল লিটন নামের এক পুলিশ সদস্যের। তার পুরো নাম অবশ্য জানাতে পারেননি তারা। এই নামেই ডাকেন বলে জানান।

সেই অস্ত্র কনকের নয়, গুলি করার সুযোগও ছিল না

তদন্তের উদ্যোগ নেই

সেদিন নেতা-কর্মীদের ওপর সরাসরি গুলি করার মতো পরিস্থিতি ছিল কি না এই বিষয়টি নিয়ে যেমন কোনো তদন্তের উদ্যোগ নেই, তেমনি অন্য একজনের অস্ত্র দিয়ে কেন গোয়েন্দা বাহিনীর উপপরিদর্শক গুলি করেছেন, সেটি নিয়েও কোনো জবাবদিহির দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমির খসরুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডিবি পুলিশের রাইফেল দিয়ে গুলি করার বিষয় নিয়ে এখন কথা বলার সময় নয়।’

মাহফুজ কার রাইফেল নিয়ে গুলি করলেন, সেখানে গুলি করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না– এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেলের মোবাইল ফোনে অন্তত ১০ বার কল করা হয়। তবে তিনি ফোন ধরেননি।

অন্যের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ আছে কি?

একজনের অস্ত্র আরেকজন ব্যবহার করতে পারেন না বলে নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে তিনি নাম প্রকাশে রাজি হননি।

সেই অস্ত্র কনকের নয়, গুলি করার সুযোগও ছিল না

তিনি বলেন, ‘সাধারণত যার অস্ত্র তিনি ব্যবহার করবেন। অন্যজন করতে পারবেন না। তবে যদি কোনো কারণে তিনি তা করতে না পারেন এবং সেই সময় যদি জানমালের ক্ষতির মুখে পড়েন, তাহলে অন্য কেউ সেটি ব্যবহার করতে পারবে।

নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মনিরুজ্জামান বুলবুল বলেন, ‘আইনে বলা হয়েছে যে পুলিশ সদস্যের দায়িত্বে অস্ত্র থাকবে, তিনি আত্মরক্ষার্থে তা ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু একজনের অস্ত্র আরেকজন ব্যবহার করতে পারেন না।’

অন্যের অস্ত্র দিয়ে কনক যে গুলি করেছেন, তাতে তার বিরুদ্ধে তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কি না, জানতে চাইলে জেলা গোয়েন্দা শাখার প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম কোনো উত্তর দেননি।

তিনি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমির খসরুর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে তিনি এই বিষয়ে প্রশ্ন শুনে ‘মিটিংয়ে আছি’ বলে কেটে দেন আমির খসরু।

আরও পড়ুন:
অতিরিক্ত বল প্রয়োগ: বরগুনায় দ্রুত ব্যবস্থা, নারায়ণগঞ্জে চুপ
আ.লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে রণক্ষেত্র পাথরঘাটা
পুলিশের কথা মানলে সংঘাত হবে না: ডিএমপি কমিশনার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The police have registered a case against BNP the brother of Lapatta Shaon

বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা ‘লিখে দিয়েছে পুলিশ’, লাপাত্তা শাওনের ভাই

বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা ‘লিখে দিয়েছে পুলিশ’, লাপাত্তা শাওনের ভাই গত বৃহস্পতিবার বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশের ধাওয়া। ছবি: নিউজবাংলা
নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত শাওন প্রধানের বড় ভাই বিএনপির পাঁচ হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকে অজ্ঞাত স্থানে আছেন। তার মামা বলছেন, মিলন চাপ নিতে পারছে না। তিনি এও জানান, সেই রাতে তিনি ও মিলন থানায় গিয়েছিলেন। পুলিশ মামলাসহ নানা কাগজে সই নিয়েছে। সেগুলো তারা পড়েও দেখতে পারেননি। তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে নিহত শাওন প্রধান নিহতের ঘটনায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকেই লাপাত্তা তার ভাই মিলন প্রধান। তার সঙ্গে সে রাতে থানায় যাওয়া মামা মোক্তার হোসেন জানিয়েছেন, এজাহার আগেই লিখে রেখেছিল পুলিশ। সেটি না পড়েই মিলনের সই নেয়া হয়েছে।

পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও বাদীর নাম নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, তার কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বাদী হিসেবে নাম উল্লেখ আছে মিলন হোসেন। তবে শাওনদের ভাইদের সবার নামের সঙ্গেই প্রধান আছে, মিলনের ক্ষেত্রেও তাই প্রযোজ্য। একজন তার নাম ভুল লিখে মামলা করবেন কেন, সেটিই এক বড় প্রশ্ন।

বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নারায়ণগঞ্জে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় নিহত হন শাওন প্রধান, যাকে যুবদলকর্মী বলছে বিএনপি। এ ঘটনায় দুই দিনের বিক্ষোভও করছে দলটি।

এর মধ্যে শুক্রবার প্রকাশ পায় বিএনপির পাঁচ হাজার নেতা-কর্মীকে আসামি করে শাওনের বড় ভাইয়ের মামলা করার বিষয়টি। মামলাটি হয়েছিল অবশ্য আগের রাতে।

বিএনপির পক্ষ থেকে সেদিনই বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে, অভিযোগ তোলা হয়েছে, পুলিশ চাপ দিয়ে এই মামলা করিয়েছে। তবে জেলার পুলিশ সুপার জবাব দেন এই বলে যে, চাপ দিয়ে কিছু করানোর যুগ এখন নেই।

বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা ‘লিখে দিয়েছে পুলিশ’, লাপাত্তা শাওনের ভাই
নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত যুবদলকর্মী শাওন। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপির বিরুদ্ধে শাওনের বড় ভাইয়ের মামলার বিষয়ে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শাওনকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করবে, তখন পুলিশ সরকারের পারপাস সার্ভ করতে আমাদের নামে মিথ্য মামলা করেছে। বিএনপি নেতাদের হয়রানি করছে এবং গণগ্রেপ্তার শুরু করা করেছে। আমরা নিন্দা জানাই।’

বাদী কোথায়

মামলার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর দুই দিন ধরে মিলন প্রধানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি।

মিলনের বাড়ি ফতুল্লা উপজেলার নবীনগরের বক্তাবলীতে। সেটি নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে।

শুক্রবার বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও বাড়িতে পাওয়া যায়নি মিলনকে। পাশাপাশি বহুবার মোবাইলে কল করলেও তিনি ধরেননি।

শনিবারও একই চিত্র। বাড়িতে গেলে স্বজনরা জানান, মিলন আজও বাড়িতে নেই। আগের দিন ফোন খোলা থাকলেও সেটি বন্ধ হয়ে গেছে।

‘পুলিশ কাগজ দিলে, কোনোটা পড়তে পারি নাই’

যে রাতে মামলা হয়েছিল, সে রাতে মিলনের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলেন তার মামা মোক্তার হোসেনও।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, 'আমার ভাগিনার লাশ আমাদের কাছে যাতে পুলিশ বুঝিয়ে দেয়। এ জন্য আমি আর মিলন দুপুর ২টার দিকে থানায় যাই। রাত ১২টার দিকে আমাদের থানা থেকে লাশ নেয়ার কাগজ বুঝিয়ে দেয়। এরপর পুলিশসহ লাশ নিয়ে শাওনের বাড়িতে আসি।’

এত সময় থানায় কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওসির রুমে বসাইয়া রাখছিল। সেখানে আমরা অপেক্ষা করতেছিলাম আমাগো লাশের জন্য।’

মামলার প্রসঙ্গ তুলতেই মোক্তার বলেন, ‘মামলার এহাজার পুলিশ লেখছে। আমরা তো লেখি না। আমরা ওসির রুমে বসেছিলাম। আমরা তো জানতাম না কী লেখছে। আমরা খালি অপেক্ষায় ছিলাম কখন লাশ বুইঝা পামু। পুলিশ তো অনেক কাগজে মিলনের স্বাক্ষর নিছে। কিন্তু আমরা তা কোনোটা পড়তে পারি নাই।’

বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা ‘লিখে দিয়েছে পুলিশ’, লাপাত্তা শাওনের ভাই
নিহত যুবদলকর্মী শাওনের বাড়িতে শোকের মাতম। ছবি: নিউজবাংলা

ঘটনার পর থেকে মিলন কেন আড়ালে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বুঝেনই তো মরা বাড়ি। তা ছাড়া তার ওপর চাপ বেশি। ছেলেটা আর কত চাপ নিব?’

শাওনের মামা বলেন, ‘আমার ভাগিনা হত্যার বিচার চাই। সে রাজনীতি করুক আর না করুক, আমার ভাগিনারে যে গুলি কইরা মারছে, এইটা তো পরিষ্কার।’

শাওনের অন্য স্বজনরা কী বলছেন

নিহত শাওনের খালাতো ভাই জিহাদ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শাওনের গুলি লাগার খবর শুনে ফরহাদ ও মিলন ভাই আমরা সেখানে যাই। ফরহাদ ভাইসহ আমরা ছিলাম হাসপাতালে আর মিলন ভাই ও মামা থানায় গিয়েছিলেন ক্লিয়ারেন্স আনতে।’

জিহাদ হোসেনের ভাষ্য মতে, থানায় যাওয়ার পর মিলন প্রধান ও তার মামা মোক্তার হোসেনকে বসিয়ে রাখা হয় সদর থানার ওসির কক্ষে। বেশি জরুরি না হলে ফোনও ধরতে দেয়া হয়নি। সেখান থেকে রাত ১২টার দিকে হাসপাতালে যান তারা। এরপর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়িতে যান।

শাওনের আরেক বড় ভাই ফরহাদ প্রধান বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধু এবং আরেকজন প্রতিবেশী হাসপাতালে লাশ পাওয়ার জন্য স্বাক্ষর করেছি। সেখানে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট ও অনেক পুলিশ ছিলেন।

‘আমরা হাসপাতালে ছিলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। আর বড় ভাই মিলন ও মামা ছিলেন থানায়। তারা দুপুর থেকেই থানায় অপেক্ষা করেন লাশ বুঝে পাওয়ার জন্য। রাতে আমাদের কাছে মরদেহ দেয়ার পর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু দাফনের সময় কেন পুলিশ পাহারা দিল, আমরা তাই বুঝতে পারলাম না।’

বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা ‘লিখে দিয়েছে পুলিশ’, লাপাত্তা শাওনের ভাই
বিএনপি নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করছে পুলিশ। ছবি: নিউজবাংলা

মামলা করার বিষয়ে মিলনের সঙ্গে তাদের কোনো কথা হয়নি উল্লেখ করে ফরহাদ বলেন, ‘মামলা লেখার বিষয়ে তো আমার ভাই বা মামা আমাকে কিছুই জানায়নি। তারা বলে, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স কাগজ নিয়া আসতাছি।’

সমাহিত করার সময় কঠোর নিরাপত্তা

শাওনের বোনের দেবর আব্দুল জলিল জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে পুলিশ ও ডিবি পুলিশের গাড়ি তাদের বাড়ির দিকে রওনা হয়। সেটি বাড়িতে পৌঁছলে এক ঘণ্টার মধ্যে গোসল ও দাফন শেষ হয়।

পরে শাহ্ওয়ার আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে জানাজা দিয়ে মসজিদের পাশের কবরস্থানে সমাহিত করা হয় শাওনকে। তখন ২টা বাজে।

তিনি বলেন, ‘লাশ আনা থেকে শুরু করে দাফন পর্যন্ত পুলিশ, ডিবি পুলিশসহ অন্তত ১২ জন সেখানে ছিলেন। লাশ দাফন শেষ হলে তারা চলে যান।’

অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের

মামলা নিজেরা লিখে মিলনের সই নেয়ার যে অভিযোগ পরিবারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে, তা স্বীকার করেননি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিচুর রহমান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমরা এজাহার লিখিনি। তারা বাইরে থেকে লিখে আনছে। আমার কাছে দেয়ার পর আমি মামলা রেকর্ড করছি।’

শাওনের পরিবারকে চোখে চোখে রাখার বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শাওনের বাড়ি ফতুল্লা থানার অধীন। ওই এলাকার পুলিশ তাদের খোঁজখবর রাখছে। তাদের নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা নেই।’

মামলায় পুরো দায় বিএনপির ওপর

শাওন স্পষ্টত মারা গেছেন গুলিতে। সেদিনের যে নানা ছবি ও ভিডিও পাওয়া গেছে, তাতে দেখা গেছে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল ছুড়ছেন। অন্যদিকে পুলিশকে, এমনকি গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যদের বিএনপি নেতা-কর্মীদের দিকে সরাসরি গুলি চালাতে দেখা গেছে।

মামলায় বলা হয়েছে, শাওন প্রধান ফতুল্লার নবীনগর বাজারে ওয়ার্কশপ মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে তিনি ওয়ার্কশপের মালামাল কিনতে বাসা থেকে বের হন।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সাইদুজ্জামান এজাহারের বরাত দিয়ে বলেন, মামলায় বলা হয়েছে, ১০টার দিকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের আনুমানিক পাঁচ হাজার নেতা-কর্মী ইটপাটকেল, লোহার রড, হকিস্টিকসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দফায় দফায় মিছিল করে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকেন।

‘বেলা পৌনে ১১টার দিকে ২ নম্বর রেলগেট এলাকা দিয়ে শাওন প্রধান যাওয়ার সময় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা পুলিশের ওপর আক্রমণ করতে থাকেন। এ সময় অবৈধ অস্ত্রের গুলি ও ইটের আঘাতে শাওন মাথা ও বুকে গুরুতর আঘাত পেয়ে রাস্তায় পড়ে যান।

‘তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তার লোকজন গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শাওনকে মৃত ঘোষণা করেন।’

আরও পড়ুন:
নারায়ণগঞ্জে সংঘর্ষ: নামে আসামি বিএনপির ৭১, বেনামে ৫ হাজার
সুযোগ না দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে: ফখরুল
জিয়ার আমলের নির্যাতন-খুন নিয়ে বিশ্বদরবারে যাব: তথ্যমন্ত্রী
নেত্রকোণায় বিএনপির ৫০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা
শাওনের ভাইয়ের মামলায় বিএনপির বিস্ময়, চাপের অভিযোগ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Due to which Jhumon was arrested the donation box was removed from the temple

যে কারণে ঝুমন গ্রেপ্তার সেই দানবাক্স সরেছে মন্দির থেকে

যে কারণে ঝুমন গ্রেপ্তার সেই দানবাক্স সরেছে মন্দির থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। ছবি: সংগৃহীত
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের নবরত্ন মন্দিরের গেটে ঝোলানো মসজিদের দানবাক্সের ছবি সম্প্রতি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হেঁটে দেশ পরিভ্রমণে নামা এক ব্যক্তি ছবিটি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেই ছবিটি শেয়ারের কারণে গ্রেপ্তার হন ঝুমন দাস।  

ফেসবুকে ‘উসকানিমূলক পোস্ট’ শেয়ার করার অভিযোগে ফের কারাগারে গেছেন সুনামগঞ্জের শাল্লার ঝুমন দাস।

এর আগে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পর গত বছরের মার্চে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ঝুমন। ছয় মাস কারাগারে থাকার পর গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

এর ১১ মাস পর আবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার মুখে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেন ঝুমন। এবার যে পোস্টটি শেয়ার দিয়ে ‘সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয়ার’ অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন ঝুমন দাস, সেটি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে নিউজবাংলা।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের নবরত্ন মন্দিরের গেটে ঝোলানো মসজিদের দানবাক্সের ছবি সম্প্রতি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হেঁটে দেশ পরিভ্রমণে নামা এক ব্যক্তি ছবিটি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করেন। মন্দিরের গেটে মসজিদের দানবাক্স ঝোলানোর ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আরও পড়ুন: কারামুক্তির ১১ মাস পর ফের কারাগারে ঝুমন দাস

সেই ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করার কারণেই ঝুমন দাসকে ফের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

যে কারণে ঝুমন গ্রেপ্তার সেই দানবাক্স সরেছে মন্দির থেকে
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঝুমন দাস। ছবি: নিউজবাংলা



ঐতিহাসিক নিদর্শন নবরত্ন মন্দির

সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির এখন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে মন্দিরটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘রামনাথ ভাদুড়ী মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর আমলে (১৭০৪ থেকে ১৭২৮ খ্রিষ্টাব্দ) এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। হিন্দু স্থাপত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন কারুকার্যমণ্ডিত নবরত্ন মন্দিরটি তিনতলা। এই মন্দিরে ছিল পোড়ামাটির ফলকসমৃদ্ধ ৯টি চূড়া। এ জন্য এটিকে নবরত্ন মন্দির বলা হতো।’

মন্দিরটি সম্পর্কে আরও বলা হয়, ‘দিনাজপুর জেলার কান্তজীউ মন্দিরের অনুকরণে গঠিত এই মন্দিরের আয়তন ৬৫.২৪ বাই ৬৫.২৪। বর্গাকার মন্দিরটি প্রায় ২ ফুট প্ল্যাটফরমের ওপর তৈরি। মন্দিরের মূল কক্ষটি বেশ বড়।

‘চারদিকের দেয়ালের বাইরের চারপাশে পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সাজানো ছিল। পরে কালের বিবর্তনে প্রাকৃতিক আর মানুষের অবহেলায় সংস্কারের অভাবে সব নষ্ট হলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরটি অধিগ্রহণ এবং নতুন করে এর সংস্কার করে।’

নবরত্ন মন্দিরের গেটে মসজিদের দানবাক্স কীভাবে

নবরত্ন মন্দিরের গেটে পাশের একটি মসজিদের দানবাক্সের ছবিটি তোলা হয় গত ২৮ আগস্ট। ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পরদিনই স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়।

স্থানীয়রা নিউজবাংলাকে জানান, মন্দিরের উল্টো দিকেই রয়েছে একটি মসজিদ। আগের অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় সেটি ভেঙে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ওই মসজিদের জন্য অনুদান পেতে দুটি দানবাক্স ঝুলিয়েছিল মসজিদ কমিটি। এর মধ্যে একটি মসজিদের সামনে গাছে ঝোলানো, আরেকটি লাগানো হয় মন্দিরের গেটে।

বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে মন্দিরের গেটের দানবাক্সটি রাস্তার পাশের একটি খুঁটিতে ঝোলানো দেখা যায়।

মসজিদ কমিটির সভাপতি রঞ্জু আলম অবশ্য দাবি করছেন, তারা মন্দিরের গেটে দানবাক্স ঝোলাননি; ‘অজ্ঞাতপরিচয় লোকজন’ এ কাজ করেছে।

রঞ্জু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মসজিদ আমাদের গ্রামের, ওইটার নির্মাণকাজ করতেছি, ভাঙা মসজিদ। নবরত্ন মন্দিরের সামনে একটা খুঁটির সঙ্গে দানবাক্স লাগানো ছিল। হয়তো কোনো গাড়ির সঙ্গে লেগে খুঁটিটা ভেঙে গেছিল, পরে কারা জানি ওই মন্দিরের লোহার গেটের সঙ্গে নিয়ে ঝুলিয়ে রাখছিল।’

ফেসবুকে ছবি ভাইরাল হওয়ার পর দানবাক্সটি সরিয়ে নেয়া হয় জানিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরদিনই আমাদের লোকাল থানার স্যার বলল, রঞ্জু ওখানে কী হইছে? পরে স্যার নিজে গিয়ে দেখছে ওখানে আর নাই। কেউ রাখছিল হয়তো এক দিনের জন্য, পরে সরায়ে দোকানের সামনে নিয়ে আবার রাখছে। আমি অবশ্য সেদিন ওইখানে ছিলাম না। তাই আমিও দেখি নাই।’

তবে মসজিদ কমিটির সহকারী সেক্রেটারি রুবেল আহমেদ নিউজবাংলাকে জানান, দানবাক্সটি তাদের উদ্যোগেই প্রায় দুই মাস আগে ঝোলানো হয়।

তিনি বলেন, “কোরবানি ঈদের দুই দিন আগে আমরা এটা লাগাইছিলাম। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে নিয়েই লাগাইছি। ওরা তো এটা নিয়ে কিছু বলে নাই।

“মন্দিরের কেয়ারটেকারকে (প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের) বলার পর দুই দিন সময় নিয়ে সে জানাইছে, ‘ঠিক আছে লাগাও।’ হিন্দুদের কেউ তো বাধা দেয় নাই। এই যে আমার সঙ্গেই আছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সলঙ্গা থানার সাধারণ সম্পাদক পল্লব কুমার দাস। তার উপস্থিতিতেই ওই বক্স লাগানো হইছে।”

রুবেলের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন পল্লব কুমার দাস।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা তো ওখানে বসে ছিলাম। ওরা দানবাক্সটা লাগাইছে। কেয়ারটেয়ার বলছে লাগাইতে পারে। আমরা তো আপত্তি করি নাই। ওইভাবে কারও সঙ্গে তো আমাদের হিংসা-টিংসা নাই।’

মন্দির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্দির রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মোহাব্বত আলী সম্মতি দেয়ার পর মসজিদ কমিটি দানবাক্সটি মন্দিরের গেটে ঝোলায়।

পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি শংকর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মসজিদ কমিটির সদস্য রুবেল আহমেদ দুইটা দানবক্স লাগায়। একটা মন্দিরের বাইরের গ্রিলে, আরেকটা একটু দূরে গাছের মধ্যে। ঈদের সময় এখানে তো প্রচুর লোক হয়, তাই দান পাওয়ার জন্য ওইখানে লাগাইছে।

‘মাস দুয়েক আগে এটা লাগাইছে। ভাইরাল হওয়ার পর প্রশাসনিকভাবে আলোড়ন হইছে, কিন্তু এলাকার লোকজনের কিন্তু এটা নিয়ে কিছু নেই। এখানে কিন্তু এটা নিয়ে কোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতি নেই।’

তিনি বলেন, ‘এটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির হলেও নিয়ন্ত্রণ করে বগুড়া আঞ্চলিক প্রত্নতত্ত্ব অফিস। এখানে একজন কেয়ারটেকার আছে, নাম মোহাব্বত আলী। মন্দিরটার সে-ই দেখাশোনা করে।

‘তার কাছে নাকি রুবেল অনুমতি চাইছে মন্দিরের গেটে দানবাক্সটা লাগানোর। তখন মোহাব্বত আলী সময় চাইছে ওই প্রত্নতত্ত্ব অফিস থেকে অনুমতি নেয়ার জন্য। তারপর অনুমতি নিয়ে লাগানো হইছে।’

এলাকায় হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে তো আমাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমরা তো মিলেমিশে থাকি। যা হোক, পরে তো এটা সরায়ে ফেলা হইছে।’

অনুমতি দেয়ার তথ্য অস্বীকার মোহাব্বতের

নবরত্ন মন্দিরের গেটে মসজিদের দানবাক্স ঝোলাতে অনুমতি বা সম্মতি দেয়ার তথ্য এখন অস্বীকার করছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়োজিত কর্মী মোহাব্বত আলী।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, “এই দানবাক্স তো ওই মসজিদের লোকজন আর হিন্দুরা মিলেই লাগাইছে। আমি তো জানতাম না, এসে দেখি লাগানো। পরে আমি সরাইতে বললে ওরা বলে, ‘লাগাইছি তো কী হইছে?’ ওই হিন্দু লোকজনও আসছে। ওদের এক উকিল, সে আর কয়েকজন হিন্দু এসে বলতেছে, ‘আমাদের সামনেই লাগাইছে বাক্স, তো কী হইছে, আমাদের তো কোনো সমস্যা নাই।’”

তিনি দাবি করেন, দানবাক্সটি সরিয়ে ফেলতে ‘বারবার অনুরোধ’ করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

মোহাব্বত নিউজবাংলাকে বলেন, “এটা সরাইতে বলছি, ওরা আজকে না কালকে করে এতদিনেও সরায় নাই। পরে সেদিন সলঙ্গা থানার ওসি এসে বলছে, ‘যারা লাগাইছে তাদের ডাকো।’ পরে আমি গিয়ে ওদের ডাকাইছি। ওসি সাহেব গিয়ে সরাইছে ওইটা।

“এটা লাগানোর জন্য আমার অফিসও অনুমতি দেবে না, আমিও দিতে পারব না। আমি তো অফিসকে জানাই নাই। জানালে তো আমাকে গালি দিবে। ওইটা তো আমার সম্পত্তি না, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, আমি তো অনুমতি দেয়ার কেউ না।”

বিষয়টি নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে এ ধরনের কিছু লাগানোর কোনো নিয়মই নেই। ওখানে মোহাব্বত আলী নামে আমাদের একজন দেখাশোনা করে। সে দিন হিসেবে কাজ করে ওখানে। সে তো যেকোনো কিছু হলে আমাদের জানায়। এটা কেন জানালো না, তা বুঝলাম না।’

সলঙ্গা থানার ওসি আব্দুল কাদের জিলানী নিউজবাংলাকে বলেন, “ফেসবুকে ছবিটি দেখামাত্র আমি মন্দিরের পাহাড়াদারকে কল দেই। সে বলল, ‘আমি দেখে জানাচ্ছি।’ এর মধ্যে আমি নিজেই সেখানে গেছি।

“গিয়ে দেখছি, ওটা ওখানে নেই। মানে ছবিতে দেখা গেছে যে মন্দিরের বাইরে গ্রিলে লাগানো, সেখানে সেটা নেই। হয়তো কেউ সরিয় ফেলছে।”

উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জল হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নবরত্ন মন্দিরের গ্রিলে মসজিদের দানবাক্স লাগানোর খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম, তবে গ্রিলে কোনো বক্স পাইনি। তার আগেই নাকি সেটা খুলে নেয়া হয়েছে।’

ঝুমনকে নিয়ে ফের উদ্বেগে পরিবার

ঝুমন দাস ফের কারাগারে যাওয়ায় আবারও উদ্বেগে পড়েছে পরিবার। ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে দাবি করে ঝুমনের মা নীভা রানী দাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ছেলে নির্দোষ। হে জেল থেকে বের হওয়ার পর অনেক নম্র ভদ্রভাবেই চলাফেরা করেছে। মানুষের ইচ্ছায় ইউপি নির্বাচনও করছিল। কিন্তু হে ফেসবুকও কার লেখা পোস্ট বলে ছাড়ি দিসে যার লাগি পুলিশ নিজে মামলা দিয়া আমার ছেলেটারে ধরিয়া নিসেগি। আমি আমার ছেলের নিঃশর্ত মুক্তি চাই।’

ঝুমনের জামিনের আবেদন আগামী ২০ সেপ্টেম্বর আবারও আদালতে উঠতে পারে বলে তিনি জানান।

ঝুমনের স্ত্রী সুইটি রানী দাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উনি বাড়ি ফেরার পর থেকে মানুষের সহযোগিতায় একটি ছোট দোকান খুলেছিলেন। আর ক্ষেত খামারে কাজ করে দিন কাটিয়েছেন। তিনি এমন কোনো পোস্ট করেননি যা উসকানিমূলক বা ধর্মীয় অনূভুতিতে আঘাত লাগে। আমাদের একটা সন্তান আছে। আমরা এসব থেকে মুক্তি চাই।’

ঝুমন দাসের ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দীর্ঘদিন কারাভোগের পর গণদাবির মুখে জামিনে মুক্ত হলেও ঝুমনের সুনামগঞ্জের বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তার চলাফেরাও নানাভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। তারেপরও ফেসবুকে পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে ঝুমন দাসকে আবারও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

‘কারণ সিরাজগঞ্জের একটি মন্দিরের গেটে মসজিদের দানবাক্স ঝোলানোর নিন্দা জানিয়েছিলেন ঝুমন। মন্দিরের গেটে মসজিদের দানবাক্স লাগানোর মতো সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কাজ করায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো এ কাজের সমালোচনা যে করলেন তাকেই গ্রেপ্তার করল পুলিশ। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক এবং নিন্দনীয় কাজ বলে মনে করছে উদীচী।’

ঝুমনের ব্যাপারে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঝুমনের এই স্ট্যাটাস শেয়ারের পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে স্বীকার করে সে নিজ ইচ্ছায় এই কাজ করেছে। তখন এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হামলার উত্তেজনা সৃষ্টির দায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় তাকে আমরা গ্রেপ্তার করি।’

আরও পড়ুন:
আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী: ঝুমন
৬ মাস পর মুক্তি পেলেন ঝুমন
ঝুমনের মুক্তি কবে
সুনামগঞ্জের বাইরে যেতে আদালতের অনুমতি লাগবে ঝুমনের
হাইকোর্টে জামিন পেলেন ঝুমন দাস

মন্তব্য

p
উপরে