সন্তানের শিক্ষার কথা তুলতেই হবিগঞ্জে সুরমা চা বাগানের শ্রমিক স্বপ্না সাঁওতাল কাঁদতে শুরু করেন।
নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সকালে মেয়েটা কলমের টাকা চাইছে। ২০ দিন ধইরা কাজে যাই না। টাকা কই পাইতাম? দুইটা থাপ্পড় দিয়া কাজে চইলা আইছি। এখন কষ্টে বুকটা ফাইটা যাইতেছে। মা হয়ে একটা কলম না দিয়ে থাপ্পড় মারছি।’
চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানদের পড়াশোনার চিত্রই যেন ফুটে উঠল স্বপ্নার বক্তব্যে। এই জীবন তাকে কোনো স্বপ্ন দেখায় না, কেবলই কাঁদায়।
চা বাগানের শ্রমিকরা মজুরির বাইরে বাড়তি সুবিধার নামে মালিকপক্ষ যা বলে থাকে, তার মধ্যে পোষ্যদের শিক্ষার পেছনে যে ব্যয় দেখানো হয়, তা একেবারেই অপ্রতুল। ফলে শিক্ষার পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক।
দিনে একেকজন শিশুর পেছনে শিক্ষা ব্যয় ধরা হয়েছে দেড় টাকা, এই হিসাবে মাসে ৪৫ টাকা, যা মূলত দুটি খাতা কিনতেই খরচ হয়ে যাওয়ার কথা।
চা শ্রমিকরা দিনে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে টানা ১৯ দিন আন্দোলন করে ১৭০ টাকা মজুরি অর্জন করেছে।
যখন তারা ১২০ টাকা মজুরি পেত, তখন মালিকপক্ষ দাবি করে আসছিল, রেশন, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নানা খাতে খরচ মিলিয়ে ৪০১ টাকা ব্যয় করা হয় একেকজন শ্রমিকের পেছনে।
এখন দাবি করা হচ্ছে মজুরি ৫০ টাকা বাড়ায় শ্রমিকের পেছনে ব্যয় বেড়ে হবে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
আইন অনুযায়ী এসব সুবিধা কখনও মজুরির অংশ হতে পারে না। আবার নিউজবাংলা খোঁজ নিয়ে দেখেছে, আবাসন বলতে যে ঘর দেয়া হয়, তাতে মাসে ২৩০০ টাকা মজুরি দেখানো হলেও তাতে নেই আবাসনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। এসব ঘরের ভাড়া সাত থেকে আট শ টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই।
রেশন বলতে যে সুবিধার কথা বলা হয়, তাও পর্যাপ্ত নয়। কেবল চাল বা আটা দেয়া হয়। কোনো কোনো বাগানে টানা ৫ বছর আটা দেয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আবার যাদেরকে ধানের জমি ইজারা দেয়া হয়, তাদের রেশন দেয়া হয় না। অনিয়মিত শ্রমিকরাও এই রেশন পায় না।
এবার শিক্ষার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দৈনিক দেড় টাকা বরাদ্দের কথা। সেটিও আবার সরাসরি দেয়া হয় না।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী চা বাগানে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেই বাগান কর্তৃপক্ষকে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যে বাগানগুলোতে সরকারি স্কুল নেই, সেই বাগানের কর্তৃপক্ষ একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান করে দিলেও সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
সরকারি বইগুলো শিক্ষার্থীরা বিনা পয়সায় পেলেও দেয়া হয় না উপবৃত্তি, পোশাক বা খাতা। ব্যবস্থা নেই দুপুরের টিফিনেরও।
অধিকাংশ স্কুলেই প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করেন একজনমাত্র শিক্ষক।
শ্রমিকদের দাবি, লেখাপড়া করানোর ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক সংকট আর প্রতিবন্ধকতার কারণে লেখাপড়া করাতে পারছেন না। বেশির ভাগই প্রাথমিকেই ঝরে পড়ে। অর্ধেক মাধ্যমিক পর্যন্ত যায়। সেখানেও ঝরে পড়ে অর্ধেকের বেশি।
আরও পড়ুন: এই ঘর দিয়ে মাসে দেখানো হয় ২৩০০ টাকা মজুরি!
বেগমপাড়া বাগানের শ্রমিক মণি সাধু বলেন, ‘আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাবারই দিতে পারি না, লেখাপড়া কীভাবে করাব? বাগান থেকে একটা বই, খাতা কলম দেয়া হয় না। এত কম মজুরিতে কীভাবে লেখাপড়া করাব? ছেলেরা এখানে সেখানে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালায়। কিন্তু মেয়েরা কীভাবে রুজি করবে? তাই তারা হাইস্কুলে যায় না।’
সুরমা বাগানের অর্চনা বাউড়ি বলেন, ‘হাইস্কুলে গেলে অনেক টাকা লাগে। স্কুলের ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, বই-খাতা কিনতে অনেক সময় আমাদের সন্তানদের টাকা দিতে পারি না। তাহলে তারা কীভাবে লেখাপড়া করবে। আমাদেরও তো ইচ্ছে করে সন্তানদের লেখাপাড়া করাইতে। কিন্তু টাকার অভাবে পারি না। যাদের টাকা আছে, তারা শুধু লেখাপাড়া করাইতে পারে।’
‘মালিকদের উদ্যোগ লোক দেখানো’
চা বাগানের শিশুদের শিক্ষা সহায়তা প্রদানে কাজ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন- একডো।
বাগানের শিক্ষার চিত্র প্রসঙ্গে সংস্থাটি নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চা বাগানের শিক্ষা কার্যক্রম মূলত লোক দেখানো। মালিকপক্ষ চুক্তি আর শ্রম আইনের শর্ত পূরণের জন্য নামমাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু রাখে। সেখানকার স্কুলগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।
‘বেশির ভাগ স্কুলই এক কক্ষের। একটি কক্ষেই প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে ক্লাস নেয়া হয়। তাও একজনমাত্র শিক্ষক দিয়ে। শিক্ষকের জন্যও আলাদা কোনো কক্ষ নেই এসব বিদ্যালয়ে।’
তিনি বলেন, ‘এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতনও থাকে সামান্য। তাই ভালো মানের কোনো শিক্ষক বাগানের স্কুলে কাজ করেন না। ফলে সেখানকার শিক্ষার মানও খুব খারাপ। বাগানের স্কুল থেকে পাস করে আসা শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাইরের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায়ই টিকতে পারে না।’
চা শ্রমিকদের নিয়ে পিএইচডি করা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আশ্রাফুল করিম বলেন, ‘শিক্ষা নিয়ে মালিকদের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। স্কুলের নামে একটি ছাপড়া ঘর আর একজন শিক্ষক ছাড়া আর কিছুই নেই বেশির ভাগ বাগানে। শহর আর মহাসড়কের পাশের বাগানগুলো ছাড়া বাকিগুলোতে সরকারি বিদ্যালয়ও নেই।’
তিনি বলেন, ‘চা বাগান মালিকরাই তাদের হিসাবে দেখিয়েছেন, শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য দিনে ১.৫০ টাকা ব্যয় করেন তারা। এই যুগে দেড় টাকা দিয়ে কী শিক্ষা মিলবে?’
দায় সরকারেরও
লক্ষ্মীকান্ত এই অবস্থার জন্য সরকারকেও দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করলেও ১৬৭ চা বাগানের মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ১৭ টিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। বাকি বাগানগুলোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।’
সরকার পরিচালিত সিলেটের লাক্কাতুরা বাগানে একটি এনজিও পরিচালিত স্কুলে শিক্ষকতা করেন জেনি পাল। তিনি জানান, পড়ালেখার ব্যাপারে শিশুদের আগ্রহ রয়েছে। তবে বাবা-মায়েরা শিক্ষার খরচ বহন করতে পারে না। ফলে পঞ্চম শ্রেণির পরেই ঝরে পরে বেশির ভাগ শিশু।
তিনি বলেন, ‘বাগানের প্রাথমিকের পর আর পড়ার সুযোগ নেই। বাইরের বিদ্যালয়গুলোতে পড়ার মতো টাকা তাদের নেই। তাই পঞ্চম শ্রেণির পর বেশির ভাগ শিশুই আর স্কুলে যায় না।’
পাঁচ বছর ধরে চা বাগানের শিশুদের নিয়ে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঊষা। এই সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক নিগার সাদিয়া জানান, ‘অপুষ্টির কারণে চা বাগানের শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতিশক্তি অনেক কম। তারা কিছু মনে রাখতেও পারে না। এখানকার কোনো শিশুই তিন বেলা ভালো খেতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘বাবা-মা কাজে থাকায় দুপুরে চা শ্রমিকদের ঘরে রান্নাবান্না হয় না। ফলে চা বাগানের প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য মিড ডে মিল চালু করা প্রয়োজন। অথচ মিড ডে মিল দূরে থাকা শিক্ষা উপকরণগুলোই পায় না তারা।’
বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের চম্পা নাইডু বলেন, ‘বাগানে শিক্ষা বলতে একটি ভাঙা স্কুলঘর। এক বা দুইজন শিক্ষক। যারা আবার যোগত্যসম্পন্ন নন। এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর শিক্ষার আর কোনো সুযোগ নেই। অনেক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নেই।’
কালাগুল চা বাগানের শ্রমিক রতন কৈরির ছেলে ওই বাগানের বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। রতন বলেন, ‘ছেলেটার পড়ালেখায় আগ্রহ আছে। আমিও তারে পড়াতে চাই। কিন্তু স্কুল থেকে তো বইখাতা কিছু দেয় না। এগুলো আমি কিনে দিতে পারি না। আর পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর তো নতুন স্কুলে ভর্তি ফি ও বেতন দিতে হবে। এগুলো কোথায় পাব?’
বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা প্রসঙ্গে সিলেট বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য নিজস্ব জমি থাকা আবশ্যিক। কিন্তু বাগানের জমি তো ইজারা নেয়া। তাই বাগানগুলোতে সরকারি বিদ্যালয় করা যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চা বাগানের জন্য এই শর্ত শিথিল করা হয়েছে। ফলে বাগানের অনেক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। আরও কিছু করার প্রক্রিয়ায় আছে।’
তিনি দাবি করেন, বাগানের ভেতরে সরকারি বিদ্যালয় না থাকলেও বাগানের আশপাশ এলাকায় দুই শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
তবু বদলাচ্ছে দিন
তবে ইদানীং কষ্ট করে হলেও সন্তানদের পড়ানোর দিকে ঝোঁক কিছুটা বেড়েছে। যে কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধার-দেনা করেও পাঠানো হচ্ছে সন্তানদের। তবে সেখানেও নানা বাধা।
হবিগঞ্জের বেগমখান বাগানের পরেশ বাগতি বলেন, ‘আমাদের বাগানের অনেক ছেলে কলেজে পড়ে। প্রতি বছর বাগান থেকে ১৮ থেকে ২০ জন ছেলে এসএসসি পাস করছে। কিন্তু কলেজ পর্যায়ে পড়তে গিয়ে অনেকেই ঝরে পড়ে। মেয়েরা কলেজ পর্যায়ে নেই বললেই চলে।’
কেউ কেউ অবশ্য কলেজ পেরিয়ে আরও দূরে যাচ্ছে, যাদের হাত ধরেই দিন বদলের স্বপ্ন দেখছে শ্রমিকরা।
একই জেলার চাঁন্দপুর বাগান, বেগমখান, চন্ডিছড়া ও লস্করপুর চা বাগানের শিক্ষার্থীরা ৬ কিলোমিটার দূরে চুনারুঘাট কলেজ, দেওয়ন্দি বাগানের শিক্ষার্থীরা ৮ কিলোমিটার দূরের শায়েস্তাগঞ্জ কলেজ, আমু ও নালুয়া বাগানের শিক্ষার্থীরা ৭ কিলোমিটার দূরের আমরোড কলেজ এবং সুরমা, জগদীলপুর, নোয়াপড়া, তেলিয়াপাড়া বাগানের শিক্ষার্থীদের অন্তত ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের মাধবপুর কলেজে গিয়ে পড়তে হয়।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ। তবে এর সিংহভাগই ছেলে। আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করছে ২০ শতাংশ।
‘শ্রমিকরা এখন আগের চেয়ে সচেতন। তারা না খেয়ে হলেও সন্তানদের লেখাপড়া করাতে চান। যে কারণে শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। এমনকি বিভিন্ন ভার্সিটিতে অন্তত ২০০ চা শ্রমিক সন্তান লেখাপড়া করছেন। আমি তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ছাত্র-যুব সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বীরেন ভৌমিক বলেন, ‘বাগান থেকে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কিছু দেয়া হয় না। তাও সেই বিদ্যালয়গুলোতে একজনের বেশি শিক্ষক নেই। আধুনিক যুগে এসেও কি আমাদের সন্তানরা কেবল নাম-দস্তখতই শিখবে?
‘আমরা শিক্ষিত যুবকরা চা বাগানে শিক্ষার হার বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি মেয়েদেরকেও যেন কাজে না দিয়ে লেখাপড়া করানো হয় সে জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করে যাচ্ছি।’
ছবি: সংগৃহীত
ব্যক্তিগত কারণ দর্শিয়ে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আশিক রুবাইয়াৎ। মঙ্গলবার (১৬ জুন) তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে এই পদত্যাগপত্র দাখিল করেন।
পদত্যাগ পত্রে তিনি তার সিদ্ধান্তের সপক্ষে উল্লেখ করেন, 'আমাকে এ পদে কাজ করার সুযোগ দেয়ার জন্য আমি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে আমার পক্ষে এ পদে কাজ করা আর সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় আমি সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ হতে আজ পদত্যাগ করছি।'
এই পদত্যাগের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, 'তিনি নিয়মিত অফিস করেন না। এ বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা চাইলে তিনি তার সদুত্তর দিতে পারেননি। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি তার পদত্যাগপত্র দিয়েছেন।' আইন ও বিচার বিভাগের কাছে পাঠানো এই আবেদনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপক্ষের আইনি কর্মকর্তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব পালনে অনিয়মিত থাকা এবং কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হওয়ার পরই তিনি এই পদত্যাগপত্র জমা দেন।
ছবি: সংগৃহীত
উন্নত কর্মসংস্থান ও ভালো বেতনের প্রলোভনে পড়ে কম্বোডিয়ায় গিয়ে সাইবার প্রতারণা বা ‘স্ক্যাম’ চক্রের হাতে বন্দি হওয়া আরও ৭৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার (১৭ জুন) রাতে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এ নিয়ে গত চার দিনে কম্বোডিয়ার বিভিন্ন বন্দিশালা থেকে উদ্ধার হয়ে সর্বমোট ২২১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ফেরত আসা এই ব্যক্তিদের জরুরি সহায়তা ও বাড়ি ফেরার যাতায়াত খরচ প্রদান করছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের এটি এক ভয়াবহ নতুন রূপ। বিদেশে আকর্ষণীয় চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে মূলত আইটি বা কল সেন্টারের কাজের কথা বলে লোকজনকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে ‘সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড’ নামক বিশেষ সুরক্ষিত এলাকায় বন্দি করা হয়। সেখানে তাদের মাধ্যমে জিম্মি করে বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণা করানো হয় এবং টার্গেট পূরণে ব্যর্থ হলে চালানো হয় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দালালরা তাদের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভিজিট ভিসায় কম্বোডিয়ায় পাঠাত। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের চীনা নাগরিকদের পরিচালিত স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। কাজ করতে অস্বীকার করলে টর্চার সেলে নিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হতো। অনেক ভুক্তভোগী ইতিমধ্যে এই পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, গত দেড় বছরে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মী কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে বিপদে থাকতে পারেন। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলো এই পাচার চক্রের দেশি-বিদেশি হোতাদের আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ করছে বলে জানা গেছে।
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করতে প্রথমবারের মতো ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ বা ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বুধবার (১৭ জুন) সকালে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
ড. নাসিমুল গনি জানান, প্রস্তাবিত এই অঞ্চলে প্রচলিত কাস্টমসের কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে না এবং ব্যবসায়ীরা সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করবেন। মূলত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী ৬০০ একর জমিতে এই বিশেষ বাণিজ্যিক অঞ্চলটি স্থাপন করা হবে। এছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চিনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ (সিইআইজেড) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্পেশাল পারপাস কোম্পানির সাথে ভূমি ইজারা ও উন্নয়ন চুক্তির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তজনা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানিতে যে ব্যাঘাত ঘটছে, তা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রচলিত জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থা পর্যালোচনার সময় এসেছে এবং বর্তমান সংকট মেটাতে সরকার স্পট মার্কেট থেকে তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করছে। তবে জ্বালানি পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়া বৈঠকে রাশিয়ার কাছ থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সরকারের এই বহুমুখী পদক্ষেপগুলো দেশের শিল্পায়ন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১৫৫টি পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের লক্ষে শ্রীমঙ্গলের ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৭ জুন) ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সিলেট পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে দুপুর ১টার দিকে তিনি শ্রীমঙ্গলে পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে আসীন হওয়ার পর জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
শ্রীমঙ্গলের কর্মসূচি শেষ করে প্রধানমন্ত্রী দুপুর আড়াইটায় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আরেকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। সেখানে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ১৫২টি পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। সরকারি এই দায়িত্ব পালন শেষে তিনি বিকেলে ‘দুসাই রিসোর্ট’-এ বিশ্রামের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সভায় মিলিত হবেন। সভা শেষে সন্ধ্যায় তিনি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে পুনরায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে মৌলভীবাজারে এসেছিলেন তারেক রহমান। নির্বাচনে বিপুল বিজয় এবং সরকার গঠনের পর এটিই মৌলভীবাজার জেলায় তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে এবং বিএনপি নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহর। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাইলটিং কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ের শুভ উদ্বোধন করতে মৌলভীবাজারে পৌঁছেছেন। বুধবার বেলা ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে তিনি মৌলভীবাজার জেলা শহরে পৌঁছান। এর আগে তিনি ঢাকা থেকে বিমানযোগে সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন এবং সেখান থেকে সড়কপথে মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
মৌলভীবাজার পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী সরাসরি শ্রীমঙ্গলের পথে রওনা হয়েছেন। দুপুর ১টায় শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত হয়ে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল শহরজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো জেলাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে পুলিশ ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে জেলা শহরকে নতুন সাজে সাজানো হয়েছে। সরকারি স্থাপনাগুলো পরিষ্কার ও রঙ করে চাকচিক্য বাড়ানো হয়েছে এবং রাস্তার ব্রিজ-কালভার্টগুলোও নতুন রঙে রাঙানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জনসভাস্থল শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ এবং মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মঞ্চের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)। স্থানীয় জনগণের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো মৌলভীবাজার সফরের উদ্দেশ্যে বুধবার সকাল ১০টা ২১ মিনিটে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছেন। বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি সড়কপথে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট বিমানবন্দরে অবতরণের পর প্রধানমন্ত্রীকে বর্ণাঢ্য ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এই সময় জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছ, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মিফতাহ সিদ্দিকী, জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী এবং সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ চৌধুরীসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সিলেটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানও তাকে অভ্যর্থনা জানান।
এই সফরের বিস্তারিত জানিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সিলেটে পৌঁছেছেন। তিনি সড়কপথে শ্রীমঙ্গলের পথে রয়েছেন। সেখানে কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণসহ বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।’ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, দুপুর ১টায় শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া দিনব্যাপী তিনি মৌলভীবাজারে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে সিলেট ও মৌলভীবাজারজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে এবং রাস্তার দুই পাশে শত শত নেতাকর্মী তাকে দেখার জন্য ভিড় জমান। সফরকালীন সময়ে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সফর শেষে বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে তার রওনা হওয়ার কথা রয়েছে এবং রাত সাড়ে ৮টায় তিনি বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে সিলেট ত্যাগ করবেন।
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ এক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রস্তাবিত ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরের ঠিক আগ মুহূর্তে এই অঞ্চলের জন্য ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। একই সাথে সরকারি অর্থ ব্যয়ে মিতব্যয়িতা বজায় রাখতে প্রকল্প থেকে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয়ের প্রস্তাব বাতিল করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক সভায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ মোট ৭ হাজার ৩ কোটি টাকার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি: ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের সরকারের (জিটুজি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরই ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ঠিকাদার নিয়োগ, মালিকানা ও সরকারি ক্রয়নীতি সংক্রান্ত নানা জটিলতায় দীর্ঘ বছর ধরে প্রকল্পটি আটকে থাকে।
শুরুতে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে ডেভেলপার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে চীন সরকার ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ (সিআরবিসি)-কে নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডেভেলপার—দুই ভূমিকায় থাকতে না পারার আইনি জটিলতায় কাজটি আবারও থমকে যায়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই জটিলতা নিরসন করে প্রকল্পটিতে নতুন গতি এনেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, সিআরবিসির সাথে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে।
কী থাকছে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে: বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এবং শিল্পাঞ্চলটিকে কার্যকর করতে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প’-এর আওতায় বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই কাজগুলো শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান যেসব অবকাঠামো নির্মিত হবে: যোগাযোগ ব্যবস্থা: ১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক রোড, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু এবং ১,১৮১ মিটার ফোর-লেন বিশিষ্ট সড়ক।
পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট (CETP)।
বন্দর ও জ্বালানি সুবিধা: ২০ হাজার ডেডওয়েট টন হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন বহুমুখী জেটি, প্রায় দুই কিলোমিটার গ্যাস সরবরাহ লাইন, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন ও সঞ্চালন লাইন। এবং পানি সংরক্ষণাগার, জলাধার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর।
কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার আশা করছে, এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং এখানে বস্ত্র, ওষুধ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে। একই সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সৃষ্টি হবে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান।
অর্থায়ন ও ঋণের শর্ত: এই প্রকল্পের মোট ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে জোগান দেবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীন সরকার থেকে বৈদেশিক ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে। একনেক সভায় ঋণের শর্ত সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই ঋণের সুদের হার ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সহজ শর্তের আওতাভুক্ত।
গাড়ি কেনায় প্রধানমন্ত্রীর বাধা, মিতব্যয়িতার দৃষ্টান্ত: এদিনের একনেক সভায় সরকারের মিতব্যয়িতা নীতি ও অর্থ সাশ্রয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১,৫৪২ কোটি টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পটিতে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি জিপ গাড়ি কেনার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল।
প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় গাড়ি কেনার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় তা বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অন্তত একটি গাড়ি রাখার অনুরোধ করলেও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এর বিরোধিতা করে বলেন, একটি গাড়ির অনুমতি দেওয়াও অনুচিত, কারণ এটি একটি খারাপ উদাহরণ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনায় গাড়ি ক্রয়ের প্রস্তাবটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়।
একনেকে অনুমোদিত অন্য প্রকল্পসমূহ: চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়াও সভায় পানি সম্পদ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরও চারটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত ৫টি প্রকল্পের মধ্যে ৩টি নতুন এবং ২টি সংশোধিত। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় ৭ হাজার ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪,৫৩৬ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ২,৪৬৭ কোটি টাকা।
অন্যান্য অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো: ১. মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প (১ম পর্যায়): ফেনী জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও কৃষি সেচ ব্যবস্থার পুনর্বাসন। ২. করতোয়া নদীব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প: নদী ব্যবস্থাপনা ও নাব্যতা বৃদ্ধি। ৩. পদ্মা নদীর ভাঙন রক্ষা প্রকল্প (১ম সংশোধিত): কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া এবং কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের কোমরকান্দি এলাকা রক্ষা। ৪. কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন (৩য় সংশোধিত): দেশের ১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন, যা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
কৌশলগত গুরুত্ব: চলতি মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বাংলাদেশে চিনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। এই সফরের ঠিক আগে বহু প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো প্রকল্প পাস হওয়াকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য