× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বাংলাদেশ
A native fighter in World War II
hear-news
player
print-icon

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দেশি এক যোদ্ধা

দ্বিতীয়-বিশ্বযুদ্ধের-দেশি-এক-যোদ্ধা
শতবর্ষী আবদুল মান্নান অংশগ্রহণ করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। ছবি: নিউজবাংলা
পোশাকে এখনও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন র‍্যাংক মেডেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এমন তিনটি পোশাক ও বিভিন্ন কাগজপত্র এখনও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ঘরের ট্রাংকে থাকা এসব কাগজপত্র ও পোশাকে কাউকে হাত দিতে দেননি।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের বড় আজলদী গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মান্নান। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ১৯১৫ সালের ৫ জুন। সে হিসাবে তার বয়স ১০৭ বছর। তবে তার দাবি বয়সটা ১১৫ বছরেরও বেশি।

শত বছর পার করা এই মানুষটি এখনও চলাফেরা করেন নিজে নিজে। কারও সহযোগিতার প্রয়োজন বোধ করেন না তিনি।

গ্রামের কাদামাটিতে বেড়ে ওঠা শতবর্ষী আবদুল মান্নান অংশগ্রহণ করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। আর এ জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ভাতা পেয়ে আসছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে স্থানীয় এক মৌলভীর মাধ্যমে তিনি চিঠি লিখেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বরাবর। আর সেই চিঠির জবাবও দিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। আর এই চিঠির জবারের পর থেকে চালু হয় আবদুল মান্নানের ভাতা।

মঙ্গলবার দুপুরে পাকুন্দিয়ার বড় আজলদী গ্রামে আবদুল মান্নানের বাড়ির সামনে যেতেই দেখা যায় বেশ কিছু মানুষের জটলা। বাড়ির উঠানে মাথায় কালো টুপি আর গায়ে খাকি কালারের জামা আর পায়ে কালো সুজ পরিহিত একজন বৃদ্ধা বসে আছেন।

তিনিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ সৈনিক আবদুল মান্নান। আর বাড়ির উঠানে জটলার সৃষ্টি তাকে ঘিরেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দেশি এক যোদ্ধা

সেখানে গিয়ে কথা হয় আবদুল মান্নানের সঙ্গে। শত বছর পার করা এই সৈনিক এখনও ভোলেননি তখনকার স্মৃতি। কথা বলেন ইংরেজিতে। এই ভাষা তিনি শিখেছেন ইংরেজদের কাছ থেকে।

সাংবাদিক পরিচয় দিতেই হাত ধরে টেনে নিয়ে যান নিজের ঘরে। শুরু করেন স্মৃতিচারণা। একপর্যায়ে ঘরে থাকা পুরোনো ট্রাংক থেকে বের করে আনেন ওই সময়কার কাগজপত্র, যুদ্ধ শেষে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিঠির জবাব। বের করে আনেন যুদ্ধকালীনের পোশাক।

পোশাকে এখনও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন র‌্যাংক মেডেল ঝুলে রয়েছে। সেই যুদ্ধের এমন তিনটি পোশাক ও বিভিন্ন কাগজপত্র এখনও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ঘরের ট্রাংকে থাকা এসব কাগজপত্র ও পোশাকে কাউকে হাত দিতে দেননি।

কীভাবে যুদ্ধে গেলেন?

মান্নান বলেন, ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তার বাবা আবদুর রহমান স্থানীয় বাজারে গিয়ে শোনেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীতে নেয়ার জন্য ঢোল পিটিয়ে লোক সংগ্রহ করছে। যারা আগ্রহী, তারা যেন কিশোরগঞ্জ সদরের ডাকবাংলোতে গিয়ে অংশগ্রহণ করেন।

এ ঘোষণা শুনে মান্নানের বাবা তাকে সেখানে যেতে বলেন। মান্নান গিয়ে দেখেন দেরি হয়ে যাওয়ায় লাইন অনেক লম্বা হয়ে গেছে। তিনি ছিলেন পেছনে। এক পর্যায়ে তিনি শুনতে পান, ওজনে ও লম্বায় কম হলে তাদেরকে সৈনিক হিসেবে নেয়া হবে না। তিনি ওজন, সুস্বাস্থ্য এবং উচ্চতার মাপে প্রাথমিক বাছাইতে টিকে যান।

তিনি বলেন, এরপর লাইন থেকে সৈনিক বাছাই করতে আসেন এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা। তিনি এসেই সবার বুকে জোরে থাপ্পড় মারতে থাকেন। থাপ্পড় খেয়ে অনেকে মাটিতে পড়ে গেলেও তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

পরে প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত এলাকা হাসনাবাদে নেয়া হয় তাদের।

প্রশিক্ষণের সময় জ্বরে আক্রান্ত হন মান্নান। সেখানে দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা তার বাবার কাছে চিঠি পাঠান। এতে সেই কর্মকর্তা লেখেন, ‘আপনার ছেলে ভীষণ অসুস্থ, যেকোনো সময় মারা যেতে পারে। এখন আমাদের করণীয় কী?’

জবাবে মান্নানের বাবা লেখেন, ‘তাকে জীবিত পাই বা না পাই, ছেলের মরদেহটি পেলেই হবে। তাকে যুদ্ধে পাঠিয়েছি সৈনিক হিসেবে। জীবন-মরণের প্রশ্নই আসে না।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দেশি এক যোদ্ধা

পরে জ্বর সেরে যায় আর এক মাসের প্রশিক্ষণ শেষে মান্নানের ব্যাটালিয়ন ক্যাপ্টেন ড. গলিব আদুল তাকে ল্যান্স নায়েকের দায়িত্ব দেন। তার অধীনে ছিল ১১ জন সৈনিক।

মান্নান জানান, প্রশিক্ষণ শেষে সেখান থেকে চার হাজার সৈনিক সমুদ্রপথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। বড় একটি জাহাজে করে ছয় মাসের খাবার নিয়ে কলম্বোর দিকে রওনা দেন তারা। সেই জাহাজে অস্ত্র, গোলাবারুদসহ চারটা কামান বিভিন্ন দিকে তাক করা ছিল।

জাহাজে শুধু ভারত উপমহাদেশীয় সৈনিকরা ছিল। জাহাজটি টানা এক মাস আটলান্টিক মহাসাগরে তাদেরকে নিয়ে মহড়া দেয়।

সেখানে সৈনিকদের বলা হলো, এ পানিপথে অনেকেই আক্রমণ করতে আসবে। তাদের যেন গুলি করে হত্যা করা হয়।

কিন্তু তাদের সামনে কোনো শত্রুই পড়েনি। এক মাস পর আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আবার কলম্বোয় ফিরলেন তারা। তখন কলম্বোর কাছাকাছি জার্মানির একটি জাহাজকে তারা ডুবিয়ে দিয়েছিলেন।

পরে সেখান থেকে আবার হায়দরাবাদ নিয়ে আসা হয় তাদের। এরপর তাদের ১৫ দিনের ছুটি দেয়া হয়। ছুটি শেষে আবারও করাচি থেকে মিয়ানমারের দিকে রওনা দেন মান্নান।

প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে হিমালয়ের নিচ দিয়ে মিয়ানমার পৌঁছায় তাদের সেই সৈনিক দলটি। সেখানে কিছু কিছু স্থানে শত্রুপক্ষের সংবাদ পেয়ে গুলিও করেন। মিয়ানমার এসে ক্যাম্প করার পরই তারা সংবাদ পেয়ে যান হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলা হয়েছে। তখনই যুদ্ধ শেষ হয়।

মান্নান জানান, সামনাসামনি যুদ্ধে শত্রুপক্ষের একজনকেও তিনি হত্যা করেননি। এ ধরনের পরিস্থিতির সামনে তাকে পড়তে হয়নি যুদ্ধের ময়দানে।

বলেন, যুদ্ধের প্রথম ট্রেনিংয়ের সময় তাদের চারটি কথা বুঝিয়ে দেয়া হয়। কাউকে থাপ্পড় দেয়া যাবে না, সম্পদ লুট করা যাবে না, নারীদের যৌন নির্যাতন করা যাবে না এবং মিথ্যা বলা যাবে না।

দেশে ফিরলেন কীভাবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হিরোশিমায় যখন বোমা হামলা হলো, তখন ব্রিটিশ সৈনিকরা আমাদেরকে ভারতীয়দের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে তারা চলে যেতে থাকে। পাঁচ-সাতজন করে একেকটি দল ক্যাম্প ছেড়ে যাচ্ছিল। তখন আমরা জানতে চাইলাম আপনারা কোথায় যান? তখন ভারতীয় সৈনিকেরা আমাদের কাছে সত্যটা গোপন করে জানায়, তারা কোয়ার্টারে যাচ্ছে।

‘আর সত্যিটা হলো, সব ব্রিটিশ সৈনিক তখন আমাদেরকে ক্যাম্পে রেখেই ফ্লাইটে করে লন্ডন চলে যাচ্ছিল। যেতে যেতে কয়েক দিনের মধ্যে সকল সাদা চামড়ার অফিসারই চলে গেল।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দেশি এক যোদ্ধা

তিনি বলেন, ‘হিরোশিমায় বোমা হামলার পর যুদ্ধটা আসলে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর সেখান থেকে আমাদের আবার হায়দরাবাদে নিয়ে আসা হয়। এরপর আমাদের হাতে মাত্র ৫০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে কলকাতায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়।’

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লেখার গল্পটা শুনতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেই যুদ্ধে গিয়ে আমি তেমন কিছুই পাইনি। এমনকি প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাইনি। এরপর মন চাইল ব্রিটিশ সরকারের কাছে একটি চিঠি লেখার।

‘কিন্তু আমি তো পড়াশোনা জানি না। ইংলিশ বলতে পারি তবে লিখতে পারি না। ইংলিশ লেখার মধ্যে কেবল নিজের নামটাই লিখতে জানি। তাই শরণাপন্ন হলাম আমাদের এলাকার আলতাফ মৌলভীর। তিনি ইংরেজিতে খুব পারদর্শী ছিলেন।’

কী লিখেছিলেন সেই চিঠিতে?

মান্নান বলেন, ‘তখন ছিল এরশাদ সরকারের আমল। ওই সময় লিখেছিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আপনার ব্রিটিশ সেনাবাহিনী আমাদের ফেলে কমান্ড ছেড়ে চলে গেল। অথচ আমাকে কিছুই বলে যায়নি। আমার অধিকার আমি পাইনি। যুদ্ধ জয় করে আপনার দেশের সৈন্যরা আমাদের কাছে কিছু না বলে চুপিচুপি সেখান থেকে চলে গেল। এখন লন্ডন শহরে তারা মাথা উঁচু করে হাঁটে। আর আমি যে আপনাদের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিলাম, আমাকেও তো প্রাপ্য সম্মানটুকু দেননি আপনারা। কোনো খোঁজখবরও রাখেননি।’

তিনি জানান, চিঠির একটি কপি তিনি সে সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও আরেকটি ব্রিটিশ হাইকমিশনে দেন।

কিছুদিন পর ব্রিটিশ রানির চিঠির জবাব আসে আমার কাছে।

রানি কী লিখেছিলেন?

মান্নান বলেন, ‘রানি লেখেন, আপনার বিষয়টি দেখার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের রাষ্ট্রপতি এরশাদকে বলা হয়েছে। ব্রিটিশ অ্যাম্বাসি থেকে আমাকে চিঠি দেয়া হলো। আপনার বিষয়টি ব্রিটিশ সোলজার বোর্ড থেকে অচিরেই সমাধান করা হবে।’

এরপর সে সময়ে ময়মনসিংহের কাচারীঘাট সোলজার বোর্ডে তাকে ডেকে নিয়ে ৩ হাজার ৫৩৮ টাকা ৭৭ পয়সা দেয়া হয়।

‘তখন কাচারীঘাট সোলজার বোর্ডের অফিসার আমাকে বলেন, আপনি তো কিশোরগঞ্জ থেকে লন্ডনে রাস্তা তৈরি করে ফেলেছেন। আপনি আমাদের ডিঙিয়ে কীভাবে এই কাজ করলেন?

‘আমার সাহসের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আপনার সাহসও অনেক। আমরা অবাক।’

এরশাদের পতনের পর তিনি গ্রেপ্তার হলে কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায় মান্নানের ভাতা। পরে আবারও ময়মনসিংহের কাচারীঘাট সোলজার বোর্ড থেকে তিনজন লোক এসে তার খোঁজখবর নেন।

‘তারা বলেছিলেন, আমি ছাড়া আরও ৭৫ জনের সঙ্গে দেখা করেছেন তারা। যাদের সঙ্গে দেখা করেছেন তাদের সবাইকে নাকি ধরে তুলতে হয়, বসাতে হয়। আর আমাকে দেখে তারা অবাক। কারণ, আমি এখনও নিজে নিজে সবকিছু করতে পারি’-বলেন মান্নান।

জানান, এখন নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন তিনি।

এই ব্রিটিশ যোদ্ধা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এলাকার লোকজনকে যুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারতে পাঠিয়েছেন। তবে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেলেও তিনি সনদ পাননি।

মান্নান জানান, কিশোরগঞ্জের কালিয়াচাপড়া চিনিকলে তিনি নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখন থেকে অবসরে পাঠানোর পর তার পাওনা বুঝে পাননি। তার দাবি, এখনও ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা তাদের কাছে পান।

আপনার শেষ ইচ্ছা কী? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার শেষ ইচ্ছে আমি দেশের মাটিতেই মরতে চাই। তবে ব্রিটিশ সরকার যদি আমাকে তাদের দেশে ভ্রমণের সুযোগ দেয় তাহলে আমি লন্ডনে গিয়ে দেশটা একটু ঘুরে দেখতে চাই।’

মান্নান বিয়ে করেছেন পাঁচটি। বেঁচে আছেন একজন। সব মিলিয়ে ১৭ জন সন্তানের জনক। এর মধ্যে ছয় ছেলে, পাঁচ মেয়ে বেঁচে আছেন। এক ছেলে ছাড়া বাকিরা বিবাহিত।

আবদুল মান্নানের বড় ছেলে মো. আরিফ বলেন, ‘আমার বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক এই পরিচয়টা আমাদের জন্য গর্বের। বাবা বিশ্বযুদ্ধের পরে নিজের সম্মানের জন্য আরেকটি যুদ্ধ করেছেন। সেটি হলো একজন ব্যক্তি যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরেও নিজের প্রাপ্য সম্মানটা অর্জনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে তৎকালীন সময়েই চিঠি লিখেছেন। এটাও বিরাট সাহসের ব্যাপার ছিল।

‘তার সেই চিঠির জবাবও দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকার। এমনকি এই জবাবের পরেই তার ভাতা চালু হয়েছে। এখনও ভাতা চলমান। যেটা দিয়ে বাবা সুন্দরভাবে চলতে পারেন।’

মেয়ে সেলিনা আক্তার বলেন, ‘আমরা বইয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাহিনি পড়েছি। বাবার মুখ থেকেও বহু শুনেছি। বইয়ে যেগুলো পড়েছিলাম তার অনেক কিছুই ভুলে গেলেও বাবার মুখ থেকে যেগুলো শুনেছি সেগুলোর একটাও ভুলিনি।’

স্থানীয় বাসিন্দা বছির উদ্দিন বলেন, ‘সৈনিক আব্দুল মান্নান আমাদের দাদা হন। তাকে দেখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসেন। কয়েক দিন ধরে সাংবাদিকরা সারা দিনই তার বাড়িতে আসছেন সাক্ষাৎকার নিতে। তিনিও খুব আনন্দ পাচ্ছেন। সারা দিন ড্রেসটা খোলারও সুযোগ পাচ্ছেন না।’

আরও পড়ুন:
৮ হাজার থেকে ৫৭ রান দূরে তামিম
ওয়ানডে পরিসংখ্যান স্বস্তি দিচ্ছে টাইগারদের
ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে সংশোধনী আনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ব্যাটিং ব্যর্থতায় সিরিজ হার বাংলাদেশের
দ্রুত ৪ উইকেট হারিয়ে বিপাকে বাংলাদেশ

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Because of the rise in the egg chicken market

ডিম-মুরগির বাজার চড়া যে কারণে

ডিম-মুরগির বাজার চড়া যে কারণে
বাজারে মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরই তিন দিনের অঘোষিত ধর্মঘট পরিস্থিতি বাজারে অল্প সময়ের জন্য সরবরাহ ঘাটতি তৈরি করে। এরপর ঘটে এটির চেইন রিঅ্যাকশন।

সারা দেশে ডিম ও মুরগির দাম চড়ে যাওয়ার নেপথ্যে মাত্র তিন দিনের পরিবহন সংকট। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সরকারি ঘোষণার পর ভাড়া বাড়ানোর পাঁয়তারা হিসেবে পণ্য পরিবহন খাতে ছিল অঘোষিত ধর্মঘট। ফলে খামার থেকে প্রথম তিন দিন এ দুই পণ্যের সরবরাহ আসেনি।

এতে গোটা দেশে খবর ছড়িয়ে পড়ে সরবরাহ সংকট। এ সুযোগ কাজে লাগায় মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা।

দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ও অনৈতিক বাড়তি মুনাফার চেষ্টায় প্রথম দফায় এই মধ্যস্বত্বভোগীরা যার যার আগের মজুত থেকেই দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। অন্যদিকে খামারিরা পরিবহন সংকটে সরবরাহ দিতে না পেরে প্রথম দিকে কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়লেও বাজারে দাম বাড়ার ফায়দা পরে তারাও নিতে শুরু করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে ডিম ও মুরগির সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি খামার গেটে প্রতি পিস ডিমের ক্ষেত্রে ২০-৫০ পয়সা হারে এবং লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা করে বাড়াতে থাকেন খামারিরা। এভাবে খামারিরা দফায় দফায় যে হারে দাম বাড়িয়েছেন, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা স্থানভেদে নিজেদের লাভ বিবেচনায় আনুপাতিক হারে দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামেন। ফলাফল বাজারে এখন এসব পণ্যের দাম নামছে না।

এ প্রসঙ্গে ফিড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আহসানুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘খামার পর্যায়ে দাম বেড়েছে এটা সত্য। এই বাড়তি দামের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগী যারা রয়েছে, তাদের আরও বাড়তি মুনাফার একটা অপচষ্টো তো সব সময়ই থাকে। আগে ৬ টাকায় কিনে ৯ টাকায় বিক্রি করত, এখন ৯-১০ টাকায় কিনে ১৩-১৪ টাকা বিক্রি করছে। তবে এবার দাম বাড়ার এই অপচেষ্টার পেছনে ছিল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।’

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার জানান, সারা দেশে ডিম ও মুরগির দাম বৃদ্ধি উসকে দিয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর মাত্র তিন দিনের পরিবহন সংকট।

কারওয়ান বাজারের খুচরা ডিম ব্যবসায়ী বশিররুল্লাহ বলেন, ‘বাজারে কাঁচা সবজি ও মাছ-মাংসের দাম বাড়ায় মানুষ ডিম ও ব্রয়লার বেশি খাচ্ছে। ফলে চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে।’

ভোক্তার পকেট কেটে কে কতটা লাভ করছে

খামারে একটি ডিমের উৎপাদনের পেছনে খরচ পড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৮ টাকা। খামারিরা সেই ডিমে পরিচালন খরচ যোগ করার পর আনুপাতিক হারে মুনাফা নির্ধারণ করে থাকেন। খামারসংশ্লিষ্টদের দাবি, খামার গেটে একটি ডিম এখন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখানে খামারির ডিমপ্রতি লাভ দুই থেকে আড়াই টাকা।

সেই ডিম খামার গেট থেকে আড়তদার, পাইকার ও খুচরাপর্যায়ে তিন দফা হাতবদলের পর পরিবহন খরচ যোগ হয়ে ভোক্তাপর্যায়ে স্থানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টাকা। অর্থাৎ এই মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রতিটি ডিম থেকে লাভ করছেন ৪ থেকে ৫ টাকা।

একইভাবে ১৩৫ টাকা আট মাস বিনিয়োগের পর খামারিরা এক কেজি ওজনের একটি ব্রয়লার থেকে লাভ করেন ১৫-২০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে খামারিদের বিক্রয় মূল্য ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। হাতবদলের পর ভোক্তাপর্যায়ে সেটি বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০ টাকায়। এখানে হাতবদলে দর বৃদ্ধি ৪০-৪৫ টাকা, যা পুরোটাই যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।

বাড়তি দামে খামারিদেরও আছে যৌক্তিকতা

দেশে ছয়-সাত মাস ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলছে। ১৭ টাকার ভুট্টা হয়ে গেছে ৩৬ টাকা, ৩০ টাকার সয়াবিন মিল হয়ে গেছে ৬৫ টাকা। আটার দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এগুলো দিয়ে পোল্ট্রি ফিড তৈরি হয়। এর দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে মুরগি ও ডিমের উৎপাদন খরচের ওপর।

এ ছাড়া বিদ্যুতে লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে আগের তুলনায় খরচ দুই থেকে আড়াই টাকা বাড়তি যোগ হয়েছে। এর সঙ্গে ওষুধের দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। সব কিছুর দাম বাড়ায় ব্যবসার পরিচালন খরচও বেড়েছে। এর ফলে এক বছর আগে একটি ডিম উৎপাদনে যেখানে খরচ হতো ৬ টাকা, এখন তার খরচ পড়ছে ৮ থেকে সাড়ে ৮ টাকা।

অন্যদিকে এক বছর আগে এক কেজি ওজনের একটি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ছিল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। এখন সেই একই ওজনের ব্রয়লারের উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা।

দাম বাড়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (বিএবি) সভাপতি ও নাহার এগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রকিবুর রহমান (টুটুল) জানান, দাম বৃদ্ধির প্রবণতা যেভাবেই ঘটুক, খামারপর্যায়ে দাম যৌক্তিকভাবেই বাড়ানো হয়েছে। দামের এই বৃদ্ধি না হলে দেশি খামারিরা এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যেত।

পাইকারি ডিম ব্যবসায়ী সাত্তার মিয়া বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ করে ঢাকায় আনা হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় গাড়ি ভাড়া বেড়েছে। সেতুর টোল ভাড়া বেড়েছে। সড়কে চাঁদাবাজি বেড়েছে। সব মিলিয়ে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় ডিমের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।’

চাহিদার তুলনায় আছে ঘাটতি

করোনা-পরবর্তী সময়ে মুরগি ও ডিমের দাম অনেক কমে গিয়েছিল। ফলে প্যারেন্ট মার্কেট হোল্ডাররা মুরগির বাচ্চা উৎপাদন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক ডিমের খামারও বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া অতিমাত্রার গরম ও সার্বিক উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় কুলাতে না পারায় সারা দেশে এখন ছোট বেশির ভাগ খামার বন্ধ রয়েছে। এসবের প্রভাবে সারা দেশে চাহিদার তুলনায় মুরগি ও ডিমের সরবরাহ আগের চেয়ে ২০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভের’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডিমের ভোগ ৭ দশমিক ২ গ্রাম থেকে ১৩ দশমিক ৫৮ গ্রাম বেড়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের উৎপাদনের তথ্য বলছে, দেশে প্রতিদিন মুরগি, হাঁস, কবুতর ও কোয়েলের প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি ডিম উৎপাদন হয়। এর মধ্যে খামার পর্যায়ে ডিম উৎপাদন হয় প্রায় চার কোটি পিস।

পোল্ট্রি খাতের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা দাবি করছেন, বিভিন্ন খামার বন্ধ হয়ে পড়ায় এখন সেই উৎপাদন নেমে এসেছে তিন কোটিতে।

১০ টাকায় ডিম খাওয়ার দিন শেষ

ফিড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহসানুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন,লোকসান দিয়ে কেউ ব্যবসা করবে না। সব কিছুর দামই যেখানে বেড়েছে, সেখানে খামারিরা করোনা-পরবর্তী দীর্ঘদিন লোকসান করছিল। এখন পরিস্থিতির কারণে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। একটা ক্রাইসিস পিরিয়ডে মধ্যস্বত্বভোগীরাও হয়তো কিছুটা বাড়তি লাভের চেষ্টা করছে। তাই বলে কি লোকেরা কিনছে না? চাহিদা আছে বলেই তো কিনছে, আবার বাড়তি খরচের পাশাপাশি ঘাটতি থাকার কারণেই তো দাম বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘প্যারেন্ট হোল্ডাররা যখন ৫ টাকায় মুরগির বাচ্চা বিক্রি করেন, লোকসান দেন, তখন তো সরকার ২০ টাকা লাভ করে দিতে পারে না। যেটা বাড়ছে, সেটা বাড়তি চাহিদা এবং সরবরাহে ঘাটতি কারণেই। কিন্তু এটাকে নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি হচ্ছে। সবারই মনে রাখা দরকার, ৮ টাকায় ডিম খাওয়ার দিন আর নেই। ৯০ টাকার ডলার এখন অফিশিয়ালি হয়েছে ১১৪-১১৫ টাকা। ডলারের এই বাড়তি দামের কারণে এ খাতে ফিড আমদানি খরচ সরাসরি ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ডিজেলের কারণে দেড় থেকে দুই টাকা খরচ বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে বাড়তি ডেলিভারি খরচ দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে পোল্ট্রি খাতটি একটি বিপজ্জনক অবস্থায় আছে।’

ডিম আমদানির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা

খুচরা এক হালি ডিমের দাম এখন ৫৫-৬০ টাকা। স্থানভেদে এখনও প্রতি ডজন ১৫০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। যারা মাছ-মাংস ও কাঁচাবাজারের অসহনীয় দামে ভরসা করত এই ডিমের ওপর, তাদের কাছে এখন সেই ডিমও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার ডিম আমদানির পথ উন্মুক্ত করে দেয়ার চিন্তাভাবনা করছে। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডিমের দাম এত বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কিছু ব্যবসায়ী ডিমের বাজারকে অস্থির করে তুলেছেন। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ভারত থেকে ডিম আমদানির বিষয়ে সক্রিয় চিন্তাভাবনা করছে।’

তবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন খামারিরা। এ প্রসঙ্গে ফিড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহসানুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডিমের দাম বাড়ছে, সেটি ঠিক হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে মুরগির দাম অনেকটা কমে আসছে। কিন্তু খরচ অনেক বাড়ছে। সেটিও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। তাই বলে ডিম আমদানি? এটা কোনোভাবেই দেশীয় শিল্পের জন্য সুখকর হতে পারে না।’

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বলেন, ‘সরকার এখনও সেই সিদ্ধান্ত নেয়নি। শুধু পরিকল্পনায় আছে। আমার বিশ্বাস, বাস্তবে সেটির প্রতিফলন ঘটবে না, দেশীয় শিল্পের স্বার্থেই।’

আরও পড়ুন:
বিশ্বজুড়ে ডিমের দাম বাড়ল কেন
ফোন দিলে বিনা মূল্যে ডিম
মুরগির ডিম ফোটানোর ডিজিটাল মেশিন তৈরি করলেন রাশেদ
ডিমের খাবারে নাজিম মামার দিনে আয় ২৫ হাজার
‘শয়তানের ডিম’ খাওয়ার দিন আজ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The launch owners are happy that the government has decided 1860

এই প্রথম সরকার নির্ধারিত বেশি ভাড়ায় অখুশি লঞ্চ মালিকরা

এই প্রথম সরকার নির্ধারিত বেশি ভাড়ায় অখুশি লঞ্চ মালিকরা
এক লঞ্চ মালিক জানান, সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, সেটা যাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া যাবে না। লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারা সিন্ডিকেট করে ভাড়া বাড়িয়েছে।

ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে এতদিন দুশ্চিন্তায় ছিলেন যাত্রীরা। এবার এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় লঞ্চ মালিক ও শ্রমিকরা।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সরকার লঞ্চের ভাড়া যেভাবে বাড়িয়েছে, সেই ভাড়ায় যাত্রী পাওয়া যাবে কি না, এ নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠেছেন বরিশালের লঞ্চসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যে কারণে সরকার যে হারে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, নেয়া হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। আর সেই কম নিয়েও ভালোই মুনাফা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন লঞ্চসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন যারা, তারা প্রশ্ন তুলছেন, যদি নির্ধারিত হারের চেয়ে কম নিয়ে লঞ্চ লাভে থাকতে পারে, তাহলে এত বেশি হারে ভাড়া নির্ধারণ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আসলে কার স্বার্থ দেখেছে?

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এমনিতে যাত্রীসংকটে ভোগা লঞ্চগুলোতে ভাড়া কমিয়ে যাত্রী ফেরানোর চেষ্টা ছিল। এর মধ্যে ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়ানোর পর সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নৌপথে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে ৩০ শতাংশ। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ঠিক করা হয়েছে ৩ টাকা।

এই হার সড়কপথে ভাড়া বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। সড়কপথে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৬ শতাংশ আর দূরপাল্লায় ২২ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়েছে সরকার। আর নগরে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া আড়াই টাকা আর দূরপাল্লায় ২ টাকা ২০ পয়সা করা হয়েছে।

সড়কের চেয়ে নৌপথে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া কেন বেশি হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। তবে এই হারে যে ভাড়া আসে, তা দেখে বরিশালের যাত্রীরা রীতিমতো আঁতকে উঠেছেন। ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে নৌপথে কেন যাবেন, সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‘সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিলে যাত্রী কমবে, লোকসান হবে’

ঢাকা-বরিশাল রুটে চলা এমভি মানামীর সুপারভাইজার শাহাদাৎ ইসলাম শুভ বলেন, ‘নভেম্বরে তেলের দাম বাড়ানোর পর ডেকের ভাড়া ৩৫২ টাকা করা হয়। সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া সে সময় হয় ১ হাজার ৪০০ টাকা আর ডাবল কেবিনের ২ হাজার ৬০০ টাকা। তখনই যাত্রী কমে গিয়েছিল। এরপর পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রীর ভাটা নামে। যে কারণে ডেকে ২০০ টাকায়, সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার ও ডাবল কেবিন ২ হাজার টাকা নেয়া হতো। এতে ধীরে ধীরে যাত্রী বাড়ছিল।

‘তবে ডেকে ৪৫৮ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার ৮৩৬ ও ডাবল কেবিন ৩ হাজার ৬৫০ টাকা করেছে সরকার। এই ভাড়ায় যাত্রী নেয়া শুরু করলে আবারও যাত্রী কমতে থাকবে।’

তাহলে আপনারা কত টাকা ভাড়া নিচ্ছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ডেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ৫৮ টাকা কমিয়ে ৪০০ টাকা করে নিচ্ছি। আর কেবিনের ভাড়া সেই আগেরটাই রয়েছে, সিঙ্গেল কেবিনে ১ হাজার আর ডাবল কেবিনে ২ হাজার টাকাই নেয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে যদি সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিতে থাকি তাহলে যাত্রী কমবে এবং লোকসান হবে। তার থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাড়া রাখার চেষ্টা করছি আমরা।’

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে আরও এক লঞ্চ মালিক বলেন, ‘সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, সেটা যাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া যাবে না। ভাড়া বাড়িয়েছে লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারা সিন্ডিকেট করে। ঈদে লঞ্চগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়াই রাখবে।’

‘এত ভাড়া কি লঞ্চ মালিকদের ভালোবাইসা?’

লঞ্চ ভাড়া বাড়ার কারণে অনেক যাত্রীকেই বরিশাল নদীবন্দর থেকে ঘুরে যেতে দেখা গেছে। তারা বাসে করে পদ্মা সেতু পার হয়ে ঢাকায় আসবেন বলে জানিয়েছেন।

সাইফুল শাহ নামের এক যাত্রী বলেন, ‘ডেকে এত ভাড়া বেড়েছে তা ভাবিনি। অতি জরুরি কোনো কাজও নেই। তাই লঞ্চঘাট ত্যাগ করছি। কাল ৫০ টাকা কমে বিএমএফ পরিবহনে ঢাকা যাব।’

বরিশাল নদীবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে মঙ্গলবার রাত সোয়া ৯টার দিকে ছেড়ে যায় পারাবত ১১, সুরভী ৯, সুন্দরবন ১০, অ্যাডভেঞ্চার ১ ও মানামী লঞ্চ। সব লঞ্চের ডেক ভরা দেখা গেলেও কেবিন প্রায় সব লঞ্চেই ফাঁকা ছিল।

যাত্রীদের একটি বড় অংশ বলেছে, নতুন ভাড়ার বিষয়ে তারা জানতেন না। জানলে লঞ্চে উঠতেন না। তাদের মতে, এত বেশি ভাড়ায় যাতায়াত করা সম্ভব নয়।

এক যাত্রী বলেন, ‘লঞ্চ কর্তৃপক্ষ তো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ৩০০ বা ৩৫০ টাকা ভাড়ায় যাত্রী নিয়েছে। তারা তো লোকসানে ছিল না। তাহলে এত বেশি ভাড়া কেন সরকার ঠিক করে দিল?’

মানামী লঞ্চে ডেকের যাত্রী শাওন হাওলাদার বলেন, ‘গত সপ্তাহে ঢাকায় মাল আনতে গেছিলাম ২৫০ টাকা ভাড়া দিয়া পারাবাত লঞ্চে। ওই সময় অনেক লঞ্চে ৩০০ টাকা নিতেও দেখছি। এই ভাড়া কিন্তু নেয়া হইত তেলের দাম বাড়াইন্নার পর। এই ভাড়ায় যদি লঞ্চ মালিকগো ক্ষতি না অয়, তাইলে নতুন কইরা ভাড়া বাড়াইয়া কেন সাধারণ মানুষরে ভোগান্তিতে ফেলা হইতেছে? লঞ্চ মালিকদের ভালোবাইসা?’

এই প্রথম সরকার নির্ধারিত বেশি ভাড়ায় অখুশি লঞ্চ মালিকরা

‘সরকার কাদের পক্ষে বুঝতেছি না’

আবুল হোসেন নামের আরেক যাত্রী বলেন, ‘সরকার কাদের পক্ষে বুঝতেছি না। যেখানে অলরেডি লঞ্চ মালিকরা লাভবান, সেখানে তাদের আরও লাভবান করা হচ্ছে জনগণের পকেট কেটে। যদি লঞ্চ চালাতে লোকসান হতো, তাহলে কি মনে হয় লঞ্চ মালিকরা লঞ্চ চালাত?

‘এক টাকা লস হলেই লঞ্চ বন্ধ করে ধর্মঘটের ডাক দেয়। সেখানে তারা তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর আগে নির্ধারিত ৩৫০ টাকার কম ভাড়ায়ও যাত্রী পরিবহন করেছে। সেখানে নতুন করে ভাড়া বাড়ানোটা সার্কাস মনে হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সরকার রোলার চাপা দিচ্ছে।’

লঞ্চ মালিক সমিতি অবশ্য সরকারকে ৩০ শতাংশ নয়, শতভাগ ভাড়া বাড়ার সুযোগ দিয়েছিল।

সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট। ডেকের ভাড়ার থেকে চার গুণ ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে কেবিনে। আশা করছি আমাদের লোকসান কমবে এবারে। তাছাড়া ভাড়া যে পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলেছিলাম, সেই পরিমাণও বাড়ায়নি। আর পদ্মা সেতু চালুর পর লঞ্চে যাত্রীসংখ্যা কমলেও ধীরে ধীরে এখন বাড়ছে।’

‘সরকারের ভাড়ায় যাত্রী পাব না’

কেবল বরিশাল থেকে ঢাকার পথে নয়, ঢাকা থেকে বরিশালের পথেও একই চিত্র। সদরঘাট যেন খাঁ খাঁ করছে।

বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত সদরঘাট থেকে নদীপথে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলোতে ঘুরে দেখে মেলেনি যাত্রীর সরব আনাগোনা। চাঁদপুর, ভোলাসহ অন্যান্য নৌরুটে যাত্রী থাকলেও অন্য রুটগুলোতে যাত্রী খুবই কম।

রেডসন ৫, এম ভি কুয়াকাটা ১, ২-এর সুপারভাইজার রফিকুল ইসলাম রাজু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যাত্রী অনেক কম। সচরাচর এমন কম থাকে না। ইদানীং তো আরও কম।’

এমভি পারাবাত ১৮ লঞ্চের মালিক ও সমিতির মহাসচিব শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই ভাড়া যাত্রীর কাছে চাইলে টিকিটই নিতে চাইবে না। তাই আমরা কম রাখছি।’

সুন্দরবন লঞ্চের মালিক ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান রিন্টু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের লঞ্চগুলোতে যাত্রী টানতে সেবার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি বেশ কিছু বিষয় আমরা সরকারের নজরে আনছি। গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত যানজট মুক্ত করাসহ সদরঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ও ঘিঞ্জি দূর করতে আমরা ওপর মহলে বারবার বলে আসছি।’

‘তাহলে ভাড়া বাড়ল কেন?’

যাত্রী অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন ব‌রিশাল নৌযাত্রী ঐক্য প‌রিষদের আহ্বায়ক দেওয়ান আব্দুর র‌শিদ নিলু বলেন, ‘য‌দি আগের ভাড়ায় যাত্রী নিতে লঞ্চের সমস্যা না হয়, তাহলে নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর তো কোনো যৌ‌ক্তিকতা দেখ‌ছি না।

‘এটাই প্রমাণ করে নৌপ‌রিবহন মন্ত্রণালয় লঞ্চ মা‌লিকদের কথা মতো ভাড়া বা‌ড়িয়েছে, তারা আসলে কোনো যাচাই-বাছাই করেনি। তাদের উচিত ছিল মাঠপর্যায়ে এসে বিষয়‌টি দেখা।’

স‌ম্মি‌লিত সামা‌জিক আন্দোলন ব‌রিশাল জেলা ক‌মি‌টির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, ‘আগের ভাড়াতেই যখন লোকসান হচ্ছে না, তখন নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর কী দরকার? আসলে সরকারের সঙ্গে লঞ্চ মা‌লিকদের আলোচনার সময় যাত্রীর পক্ষ হয়ে কেউ থাকে না। সেই সময়টাতেই সরকারকে ভুলভাল বু‌ঝিয়ে লঞ্চ মা‌লিকরা ভাড়া বা‌ড়িয়ে নেয়।

‘ঢাকা-ব‌রিশাল রুটের প্রতি‌টি লঞ্চে যাত্রী ধারণক্ষমতা ৯০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ পর্যন্ত। তবে তারা যাত্রী বহন করে থাকে দ্বিগুণ বা তার চেয়ে বেশি। পাশাপা‌শি যে পণ্য প‌রিবহন করা হয়, সেটিও তোলা হয় না ভাড়া বাড়ানোর আলোচনায়।’

বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তার উদ্ভট যুক্তি

যে ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো মুনাফা করছে, তার চেয়ে বেশি ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পথের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা) রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ভাড়া না বাড়ালে লঞ্চগুলো চলতে পারত না।

তার দাবি, লঞ্চে সব সময় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেয়া হয়। এবারও তাই হচ্ছে।

তাহলে এত ভাড়া নির্ধারণের দরকার কী- আরও কম বাড়লে পারতেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সরকারের গঠিত কমিটির সিদ্ধান্ত। আপনি যেটা মনে করছেন, ৩০ শতাংশ, সেটা হয়ত কথার কথা। ২৫ শতাংশ বা ২২ শতাংশ বাড়ালে যেটা হতো, সেটা আদায় করা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
তেলের দাম সমান হলেও কলকাতায় বাস ভাড়া ঢাকার চেয়ে কম
অভিযান-১০ লঞ্চ বুঝে পেলেন মালিক
যাত্রী ঠকছে বিআরটিসির বাসেও
সর্বনিম্ন ভাড়া ১০, তবে প্রজাপতি ও পরিস্থানে ২৫
ওয়েবিল থাকবে না ঘোষণা দিয়ে কয়েক মাস সময় দাবি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
That old trick to increase the price of edible oil

ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সেই পুরোনো কৌশল

ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সেই পুরোনো কৌশল কোনো কোনো দোকানে আগে সরবরাহ করা ভোজ্যতেল থাকলে তা কিনতে পারছেন কিছু ক্রেতা। তবে চাহিদার তুলনায় তা কম। ফাইল ছবি
সরকারের কাছে সয়াবিন ও পামওয়েল তেলের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে আমদানি ও উৎপাদক সমিতি। এবার তাদের যুক্তি টাকার বিপরীতে ডলারের উচ্চ মূল্য। দাম বৃদ্ধির এই প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ট্যারিফ কমিশন। কিন্তু সময় দিতে রাজি নয় কোম্পানিগুলো।

দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয়া। ফলে বাজারে পণ্যের সংকট সৃষ্টি। আর ঘাটতির কারণে বেড়ে যাচ্ছে দাম।

ভোজ্যতেলের বাজারে এমন চিত্র বরাবরের। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম বাড়াতে আবারও সেই পুরোনো কৌশলের আশ্রয় নিতে চলেছেন ব্যবসায়ীরা।

সরকারের কাছে সয়াবিন ও পামওয়েল তেলের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে আমদানি ও উৎপাদক সমিতি। এবার তাদের যুক্তি টাকার বিপরীতে ডলারের উচ্চ মূল্য। দাম বৃদ্ধির এই প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ট্যারিফ কমিশন। কিন্তু সময় দিতে রাজি নয় কোম্পানিগুলো।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, মিরপুরের শেওড়াপাড়াসহ অলিগলির দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বাজারে তেলের সংকট হয়েছে। কোম্পানির প্রতিনিধিরা পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করছেন না।

দোকানিরা বলছেন, টাকা দিলেও তেলের চাহিদা নিচ্ছে না সব কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি। ফলে ক্রেতারা চাহিদামতো তেল পাচ্ছে না। কোনো কোনো দোকানে আগে সরবরাহ করা তেল থাকলে তা কিনতে পারছেন কিছু ক্রেতা। তবে চাহিদার তুলনায় তা কম।

বাজার পরিস্থিতি

রাজধানীর হাতিরপুল বাজারে মদিনা স্টোরের দোকানি আলতাফ হোসেন জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তেলের সরবরাহ নেই। দোকানে সরিষার তেল ছাড়া কোনো সয়াবিন তেল নেই।

তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ কোম্পানির কোনো প্রতিনিধিকে এখন দেখা যায় না। দু-একজনের দেখা পেলেও তাদের বক্তব্য- দাম বাড়বে, তাই তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না।’

জামাল নামে আরেক দোকানি বলেন, ‘আগের কেনা সামান্য তেল আছে। তা-ও শেষ হয়ে যাবে। তেল চাইলে দেয়া হচ্ছে না। যেসব কোম্পানি বেশি পরিমাণ তেল সরবরাহ করে, তারাই চাহিদা নিচ্ছে না। ক্রেতারা পাঁচ লিটারের ক্যান চান। অথচ দোকানে এক ও দুই লিটারের মাত্র কয়েক বোতল ভোজ্যতেল আছে।’

মিরপুর ৬০ ফুট রোডের জহির জেনারেল স্টোরের জসিম জানান, ‘দোকানে তেল নেই। কোম্পানির লোকদের পাওয়া যায় না। দুই-একজনকে পেলেও তার সরবরাহের বিপরীতে অগ্রিম টাকা নেয় না। বলে, কোম্পানি থেকে তেল দেয়া হচ্ছে না।

‘বাধ্য হয়ে ক্রেতারা রাইস ব্রান অয়েল, সরিষা ও সানফ্লাওয়ার তেল নিচ্ছে। কিন্তু সাধারণ ক্রেতারা এত দামি তেল কিনতে পারছে না। এ নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডাও হচ্ছে।’

কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা বিপ্লব কুমার সাহা বলেন, ‘তেলের সরবরাহ থাকলেও আগের মতো না। দুই-একটি কোম্পানি তেল দিলেও কমিশন কমিয়ে দিয়েছে। এ কারণে বোতলের গায়ে লেখা দামের চেয়ে একটু ছাড় দিয়ে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

দামবৃদ্ধির প্রস্তাব

বিশ্ববাজারে দাম ক্রমান্বয়ে কমে আসায় দেশে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় করা হয় ১৮ জুলাই। এক মাস না যেতেই নতুন করে আবার দামবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য পতনের উল্লেখ করে তেলের দামবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে ভোজ্যতেল উৎপাদক সমিতি।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনে পাঠানো প্রস্তাবে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮০, বোতলজাত ২০৫ ও পাঁচ লিটার তেলের দাম ৯৬০ টাকা করার কথা বলা হয়।

বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন থেকে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বোতলজাত সয়াবিন লিটারে ২০ টাকা, খোলা সয়াবিন ১৪ টাকা ও পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে ৫০ টাকা দাম বৃদ্ধির কথা বলা হয়।

পর্যালোচনা করছে ট্যারিফ কমিশন

সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলেন, ১৮ জুলাই দাম সমন্বয়ের পর আবার ১৫ দিনের মাথায় দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব হাস্যকর।

‘দাম নির্ধারণ করা হয় এক মাসের জন্য। কিন্তু কোম্পানিগুলো নেই নিয়ম মানছে না। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম দ্রুত কমছে। আবার ডলারের বিপরীতে কমছে টাকার মান। সবদিক পর্যালোচনা শেষে সবশেষ যে মূল্য নির্ধারণ হয় তখনও ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখীই ছিল।’

ট্যারিফ কমিশন সূত্র জানায়, ডলারের তেজিভাব কমছে। তবে আগের তুলনায় এখনও বেশি। আমদানি পর্যায়ে ডলারের দাম এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বিবেচনা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে ট্যারিফ কমিশন। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

ক্রেতার নাভিশ্বাস

প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম চড়া। বাজারে গিয়ে ক্রেতার নাভিশ্বাস উঠেছে। ভোজ্যতেল যেহেতু ক্রেতার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, তাই এই পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে কেনার ক্ষমতা হারাচ্ছে ভোক্তা। পড়ছে বাড়তি চাপ।

ক্রেতারা বলেন, সংকট সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধি এর আগেও করা হয়েছে। এবারও একই কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। ক্রেতাদের স্বার্থ দেখবে কে?

হাতিরপুল বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতা আলিম উদ্দিন বলেন, ‘বেতন বাড়ছে না। অথচ সবকিছুর দাম বাড়ছে। ভয়াবহ এক সংকট সামনে এসেছে। আগে সংসারে যে পরিমাণ তেল প্রয়োজন হতো, এখন তা প্রায় অর্ধেক কমিয়েও সামাল দেয়া যাচ্ছে না।’

শেওড়াপাড়া বাজারের সানজিদা খাতুন বলেন, ‘তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেল দিতে পারছে না। অগত্য দুই লিটার নিতে হলো।’

আলিম স্টোরে তেল কিনতে আসা ক্রেতা আমিনুল জানান, ‘তিনটি দোকান ঘুরে এক দোকানে তেল পাওয়া গেছে। তাও বোতলের গায়ে উল্লেখ থাকা দামের চেয়ে ১০ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। তেল কিনতে পকেটের টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে।’

সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা

ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, তরল পদার্থ পরিমাপের একক হিসেবে লিটার ব্যবহৃত হলেও ভোজ্যতেলের পাইকারি বাজারে মণ ও খুচরা বাজারে কেজিতে বিক্রির প্রবণতা রয়ে গেছে। এতে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খোলা ভোজ্যতেলের মিলগেট মূল্য অতিমাত্রায় পরিবর্তনশীল হওয়ায় সেকেন্ডারি মার্কেটে মূল্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। তাই খোলা ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। খোলা ভোজ্যতেলে সেকেন্ডারি বা পাইকারি বাজারে প্রবেশের পর এই তেলের কোনো ব্রান্ডিং থাকে না।

সরকারের এই প্রতিষ্ঠান মনে করে, খোলা ভোজ্যতেল সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিশোধনকারী মিলগুলো সরবরাহ আদেশে দেয়া মেয়াদ ১৫ দিন উল্লেখ করলেও তা ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত ছাড়িয়ে গ্রহণ করা হয়। এতে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যের এসও (চাহিদাপত্র) বাজারে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুন:
অবৈধ কারখানায় বোতলজাত করা হয় সয়াবিন
তেলের দাম: পিটিয়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধেই পুলিশের মামলা
তেলের পুষ্টিগুণ নিশ্চিতের উদ্যোগ
সয়াবিনের নতুন দাম কার্যকর
ধনী-গরিবের আলাদা পানির বিলে সময় লাগবে

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Public participation in political programs during working days

কর্মদিবসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের নাভিশ্বাস

কর্মদিবসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের নাভিশ্বাস বুধবার রাজধানীর রমনায় আওয়ামী লীগের মিছিলেন একাংশ। এই কর্মসূচির কারণে এদিন দুপুর থেকে নগরে চলাচলে ছিল তীব্র ভোগান্তি। ছবি: নিউজবাংলা
‘ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। একটার পর একটা মিছিল যাচ্ছে। সব বাস থমকে দাঁড়িয়ে। মানুষ সব হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এসব প্রোগ্রাম এমন দিনে হওয়া উচিত, যেদিন ছুটি থাকে অথবা এমন জায়গায় হোক, যে জায়গাগুলো উন্মুক্ত। নেতাদের মধ্যে এই বোধ আছে কি না, সেটাই আমার প্রশ্ন।’

বৃহস্পতিবার জন্মাষ্টমীতে সরকারি ছুটির আগের দিন রাজধানীতে চলাচলে দুঃসহ অবস্থা। দুপুরের পর থেকে প্রধান সড়কগুলোতে ঠায় দাঁড়িয়ে যানবাহন। কোনো রুটে আবার গাড়ির অভাবে দীর্ঘ অপেক্ষা যাত্রীদের। এর কারণ, সেই রুট দিয়ে আসতে পারছে না আটকে থাকা গাড়ি।

দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটির আগে এক দিন বাড়তি ছুটির কারণে এই অবস্থা তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটি কর্মসূচিকে ঘিরে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে একযোগে বোমা হামলার স্মরণে আওয়ামী লীগের প্রতি বছরের কর্মসূচির সঙ্গে এবারের কর্মসূচির পার্থক্য আছে। এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় ক্ষমতাসীন দল আরও বেশি কর্মী-সমর্থকদের জড়ো করতে চাইছে। কেবল ঢাকা নয়, দেশের প্রতিটি মহানগর, জেলা শহর, উপজেলা, এমনকি ইউনিয়নেও একই ধরনের জমায়েতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে লোকসমাগম।

রাজধানীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জমায়েত হয়েছেন রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে। বিকেল ৪টায় জমায়েত হওয়ার কথা থাকলেও আগে থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে আসেন নেতাকর্মীরা। ফলে কার্যত দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন সড়ক অচল হয়ে যায় মিছিলে মিছিলে। আর এর প্রভাবে তৈরি হয় দুঃসহ যানজট।

কর্মদিবসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের নাভিশ্বাস
আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে নগরীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মিছিলের কারণে এক পর্যায়ে শাহবাগ থেকে গুলিস্তানের দিতে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়

আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচি মূলত ছয় দিন আগে বিএনপির বড় একটি জমায়েতের জবাব। সেদিনও ছিল কর্মদিবস। দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটির আগে সেদিন নয়াপল্টনের সড়কে নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন মিছিল করে। সেদিনও নয়াপল্টন, কাকরাইলসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত রয়ে যায় এর রেশ।

জাতীয় নির্বাচনের দেড় বছর আগেই নানা ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। রাজপথে বাড়ছে কর্মসূচি। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কর্মসূচিগুলো পালিত হচ্ছে কর্মদিবসে সড়ক বন্ধ রেখে।

বড় ধরনের কর্মসূচিগুলো ছুটির দিনে করা যায় কি না, এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার দাবি করছেন নগরবাসী।

ক্ষমতাসীন দলের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, তাদের আপত্তি নেই। তবে এ জন্য সব দলের ঐকমত্য জরুরি।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের জন্য উন্মুক্ত করার সুপারিশ করেছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন আহমেদ প্রিন্স মনে করেন, সরকার জনগণের দুর্ভোগ বিবেচনা করে না। এখন এসব নিয়মনীতি অলীক কল্পনা।

রাজপথে কর্মসূচি বাড়ছে

গত ৪ আগস্ট নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে ভোলায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ছাত্রদল নেতা নুরে আলমের জানাজা পড়ে বিএনপি। পরে সেখানে হয় সমাবেশ।

দুই দিন পর একই সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল। এই কর্মসূচি পালনেরও কারণও ভোলায় সংঘর্ষে দলের দুই কর্মীর মৃত্যু।

ভোলার সেই ঘটনায় ৮ আগস্ট একই সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদল।

এর তিন দিন পর ১১ আগস্ট সেই সড়কে দুপুরের পর থেকে অবস্থান নিয়ে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সমাবেশ করে বিএনপি।

কর্মদিবসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের নাভিশ্বাস
চলতি মাসে বেশ কয়েক দিন নয়াপল্টনের সড়ক বন্ধ রেখে জমায়েত করে বিএনপি। প্রতিটি দিনই সড়কে দেখা গেছে তীব্র যানজট

একই দিনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখায় নতুন রাজনৈতিক জোট গণতান্ত্রিক মঞ্চ।

এর পরদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপিপন্থি পেশাজীবী সংগঠনের সমাবেশ হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। সেদিনও যান চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে কয়েক ঘণ্টা।

১৬ আগস্ট জ্বালানি তেল ও ইউরিয়া সারের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার এবং গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভিমুখে মিছিল করে গণতান্ত্রিক বাম জোট। সেটি শাহবাগে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। এই কর্মসূচি ঘিরেও কয়েক ঘণ্টা ব্যস্ত এ সড়ক স্থবির হয়ে থাকে।

পরদিন নগরবাসীর দুর্ভোগ হয় আওয়ামী লীগের কর্মসূচির কারণে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বলতে গেলে স্থবির হয়ে থাকে নগরীর একটি বড় অংশ।

আগামী ২২ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী লাগাতার কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে সভা, সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

বুধবার আওয়ামী লীগের কর্মসূচির দিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শরীফুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আজকে সারা ঢাকা সিটির লোককে হাঁটতে হচ্ছে। এই প্রোগ্রামের কারণে বেলা ৩টার দিকে যে অবস্থা এই ভোগান্তি রাত পর্যন্ত থাকবে। প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর আরও ভয়াবহ হয়েছে।

‘আমি শাহবাগ যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছিলাম। তবে জ্যাম দেখে বাস থেকে নেমে হেঁটে যাই। অনেকেই বাচ্চা নিয়ে গরমে ঘামতে ঘামতে যাচ্ছে। ঘামে ভিজতেছে, কষ্ট করছে।’

কর্মদিবসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের নাভিশ্বাস
বাম দলের তুলনামূলক স্বল্প সংখ্যক কর্মীদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে মিছিলের কারণে মঙ্গলবার ব্যাপক ভোগান্তি হয় নগরবাসীর

তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা তাসিন মল্লিক বলেন, ‘ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। একটার পর একটা মিছিল যাচ্ছে। সব বাস থমকে দাঁড়িয়ে। মানুষ সব হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব প্রোগ্রাম এমন দিনে হওয়া উচিত, যেদিন ছুটি থাকে অথবা এমন জায়গায় হোক যে জায়গাগুলো উন্মুক্ত।’

রাজনৈতিক দলগুলোর জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব আছে বলেও মনে করেন তাসিন। বলেন, ‘নেতাদের মধ্যে এই বোধ আছে কি না, সেটাই আমার প্রশ্ন।’

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ভাবান্তর নেই

তীব্র যানজটের মধ্যে কর্মদিবসে রাজপথে কর্মসূচিতে জনভোগান্তির বিষয়টি নজরে আনলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘ছুটির দিনে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে জনদুর্ভোগ এড়াতে হলে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য প্রয়োজন।’

ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আপনাদের দায়দায়িত্ব তো বেশি- এমন মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের কাজ করছে। জনদুর্ভোগের কর্মসূচি আমরা এড়িয়ে চলতে চাই। তবে দিবসভিত্তিক কর্মসূচিগুলো রুটিন ওয়ার্ক।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সভা, সমাবেশ, মিছিল এগুলো সাংবিধানিক অধিকার।’

তবে তার মতে, তাদের কর্মসূচিতে জনগণ খুশি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা ঠিক রাস্তার ওপরে হওয়ায় কিছুটা ট্র‍্যাফিক সমস্যা হয়েছে। তবে এতদিন পর বিরোধী দলের বড় সমাবেশের উপস্থিতি দেখে জনগণের ভোগান্তি নয়, তারা খুশি হয়েছে।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি না দেয়াকেও সড়কে কর্মসূচি পালনের একটি কারণ হিসেবে দেখান বিএনপি নেতা। বলেন, ‘নানা রকম স্থাপনা বানিয়ে সেটা অনুপযোগী করে ফেলা হচ্ছে।’

তাহলে সমাধান কী- জানতে চাইলে যেদিন বিএনপির কর্মসূচি থাকে, সেদিন সেসব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে বিকল্প রাস্তায় দিয়ে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন ফখরুল।

সেই সঙ্গে সরকারকে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেয়ার পরামর্শ দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে সমাবেশের উপযোগী করে তোলার কথা বলেছেন।

কর্মদিবসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের নাভিশ্বাস
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে নতুন জোট গণতন্ত্র মঞ্চের মিছিল। ওই সড়কে নিত্যদিন নানা কর্মসূচিত ব্যাহত হয় যান চলাচল

জনগণের ‘অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলে’ নতুন যে জোট গঠন হয়েছে, সেই গণতন্ত্র মঞ্চের সবচেয়ে প্রবীণ নেতা আ স ম আবদুর রবের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি তার রাজনৈতিক পরামর্শক শহীদুল্লাহ ফরায়জীর মাধ্যমে জবাব পাঠান।

তিনি জানান, আন্দোলন সংগ্রামে, রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল-বিক্ষোভ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। তবে বর্তমান সরকার বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন সংগ্রামকে বল প্রয়োগে স্তব্ধ করে ক্ষমতাকে ধরে রাখার অপকৌশল নিয়েছে।

তিনি বলেন, 'এমন কর্মসূচি সবার জন্য সমান হতে হবে। বিরোধীদের সরকার কোনো সভা সমাবেশ বা জনসভা করার অনুমোদন দেয় না। কদাচিৎ শর্তের বেড়াজালে একদিন আগে অনুমোদন দিলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।

'এই সরকারকে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদায় করতে হলে জনগণকে রাজপথই দখল করতে হবে। স্বৈরাচারের সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব মীমাংসিত হবে রাজপথেই। জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে আন্দোলন সংগ্রামের প্রয়োজনে জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।'

তিনি বলেন, 'অতীতে আওয়ামী লীগ ৯৬ ঘণ্টা অবরোধ দিয়েছে, রাজপথ দখল করেছে, ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলেছে, বাসে আগুন দিয়েছে, এখন বিরোধী দলকে জনগণের দুর্ভোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে এক ধরনের, আর সরকারে থাকলে আরেক ধরনের আচরণ করে।'

গণ আন্দোলন গণবিস্ফোরণের প্রয়োজনে যা করার প্রয়োজনে তাই করতে হবে, সে জন্য সাময়িক দুর্ভোগ হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

একই প্রশ্নে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স দায় দেন সরকারকে। তিনি বলেন, ‘সরকার যখন নায্য আচরণ করে, তখন দায়িত্বশীল সংগঠনগুলো এগুলো মেনে চলে। তবে সরকার যখন নায্য আচরণ করতে পারে না, তখন এসব নিয়মনীতি মানার প্রশ্ন ওঠে না।’

তিনি বরং রাজপথে কর্মসূচি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘জনগণকে আমি আহ্বান জানাব, তারা যে দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে অর্থাৎ মানুষের যে সংকট, তা সমাধানে প্রতিবাদী হয়ে উঠুক। যে যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানাবে।’

আরও পড়ুন:
ড. কামালকে ডাকছে না বিএনপি
আলেমদের ধোঁকা দিয়ে রাস্তায় নামানো হয়েছিল: ইসলামী ঐক্যজোট
সাইফুল-সাকিকে ছাড়াই চলবে বাম জোট
‘বিআইপি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা
সিলেটের রাজনীতিতে নেতৃত্ব-শূন্যতা

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The love of UNO spread throughout the school

ইউএনওর ভালোবাসা মুগ্ধতা ছড়াল স্কুলজুড়ে

ইউএনওর ভালোবাসা মুগ্ধতা ছড়াল স্কুলজুড়ে শ্রেণিকক্ষে সিফাতের সঙ্গে ইউএনও। ছবি: নিউজবাংলা
উচ্ছ্বসিত প্রধান শিক্ষক খোরশেদা আক্তার বলেন, ‘ইউএনও স্যারের এমন মহতী কাজে আমরা খুবই আনন্দিত।’

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার চৌয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। টিফিন পিরিয়ডে মাঠে খেলা করছে সহপাঠীরা। কেউ আবার ব্যস্ত দুপুরের খাবার নিয়ে। শুধু সিফাত (প্রতীকী নাম) বসে আছে ক্লাসের এক কোণে। একা!

মঙ্গলবার দুপুরে এক আকস্মিক পরিদর্শনে সিফাতের স্কুলে গিয়ে হাজির হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুভাশিস ঘোষ। ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেন তিনি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সুবিধা-অসুবিধা আর স্বপ্ন নিয়ে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন।

এ সময়ই ক্লাসের কোনায় বসে থাকা সিফাতকে দেখেন ইউএনও। পরনে স্কুল ড্রেস নেই তার। সবাই যখন সুন্দর স্কুল ড্রেসে পরিপাটি তখন সিফাতের স্কুল ড্রেস না থাকা বেশ ভালো করেই নজরে আসে ইউএনওর।

এ অবস্থায় সিফাতের দিকে এগিয়ে যান শুভাশিস ঘোষ। মিষ্টি কথায় তাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। আলাপচারিতায় জানতে পারেন, কিছুদিন আগে স্কুল ড্রেস ছিঁড়ে গেছে সিফাতের। ছিঁড়ে যাওয়া স্কুল ড্রেস লজ্জায় আর গায়ে চাপায় না সে। বাবার আর্থিক অসংগতির কারণে নতুন ড্রেসও বানানো হয় না তার। তাই টিফিন পিরিয়ডে সবাই যখন স্বতঃস্ফূর্ত তখন বেমানান ড্রেসে জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিল সিফাত।

তুমি স্কুলের ড্রেস পরে আসোনি কেন- ইউএনওর এমন প্রশ্নে শুরুতে কিছুটা চুপসে যায় সিফাত। ইতস্তত হয়ে বলে, ‘ড্রেস সেলাই করতে দিয়েছে বাবা।’

কিন্তু সিফাতের ইতস্ততা নজর এড়ায়নি ইউএনও শুভাশিস ঘোষসহ উপস্থিত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের।

এ অবস্থায় সিফাতের পারিবারিক অবস্থা জানার চেষ্টা করেন ইউএনও। তিনি জানতে পারেন, তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট সিফাতের বাবা একজন পিকআপ ভ্যানচালক। এই ভ্যান চালিয়ে যে আয়- তা দিয়েই সংসার আর সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহ করেন তিনি। তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমেই চলছে পাঁচ সন্তানের পড়াশোনা।

এসব কথা শুনে সিফাতকে নিয়ে বিদ্যালয়সংলগ্ন চৌয়ারা বাজারে যান ইউএনও। দর্জির দোকানে গিয়ে তার জন্য নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করেন। কৃতজ্ঞতায় সিফাতের চোখেমুখে তখন রাজ্যের বিস্ময়! বড় মানুষ হওয়ার তাড়না।

ইউএনওর ভালোবাসা মুগ্ধতা ছড়াল স্কুলজুড়ে

এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের উচ্ছ্বসিত প্রধান শিক্ষক খোরশেদা আক্তার বলেন, ‘ইউএনও স্যারের এমন মহতী কাজে আমরা খুবই আনন্দিত।’

ইউএনও শুভাশিস ঘোষ বলেন, ‘যেখানে আর্থিক সংকটের দোহাই দিয়ে অনেকেই সন্তানদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ করে তাদের শিশুশ্রমে জড়ায়, সেখানে সিফাতের বাবা শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন নিয়মিত। এটা অবশ্যই আমাদের জন্য আনন্দের বার্তা। আমরা সেই আনন্দের অংশীদার হয়েছি মাত্র।’

আরও পড়ুন:
ইউএনও-এসিল্যান্ডের নামে আদালতে মামলা
ইউএনওকে হত্যাচেষ্টা মামলা: তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য নিতে সমন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২ ইউএনওর ওপর অসন্তুষ্ট ডিসি
এবার ইউএনওর গাড়ির ধাক্কায় আহত বাইকের ৩ আরোহী
ইউএনওর গাড়ির ধাক্কায় সাংবাদিক নিহত: মামলা করবে না পরিবার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Where is the way to buy Russian oil?

রাশিয়ার তেল কেনার কী উপায়, বাধা কোথায়?

রাশিয়ার তেল কেনার কী উপায়, বাধা কোথায়? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিল পরিশোধ করা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে আমরা রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করব কি না? এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। রাশিয়া থেকে তেল কিনলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি বিরাগভাজন হয়, তাহলে এই পথে যাওয়া ঠিক হবে না।

রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার ‍উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মঙ্গলবার তিনি এ নির্দেশ দেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও রাশিয়া থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল কিনতে পারে। অনেক পথও আছে, তবে সমস্যা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশটিকে ‘না চটিয়ে’ রাশিয়া থেকে তেল কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অখুশি হলে এই দুই বড় বাজারে বাংলাদেশের ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হুমকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে তারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি না করলে বা কমিয়ে দিলে দেশ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।

বেশ কিছুদিন ধরেই রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গত মে মাসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও এমন ইঙ্গিত দেন। তবে কীভাবে আমদানি হবে, দাম কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো উপায় নির্ধারণ হয়নি।

একনেক সভা শেষে মঙ্গলবার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না?”'

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি করা গেলে বিনিময় মুদ্রা কী হবে, সে বিষয়েও একটি সমাধান খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান মান্নান।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পরে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া আগে প্রতিদিন প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করত, যার অর্ধেকের বেশি যেত ইউরোপে। ।

গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী ইউক্রেনে অভিযান শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা একের পর এক মস্কোর ওপর অবরোধ আরোপ শুরু করে।

একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।

রাশিয়ার তেল কেনার কী উপায়, বাধা কোথায়?

নিষেধাজ্ঞার মুখে অন্য ক্রেতারা রুশ তেল কেনা থেকে পিছু হটলেও বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাপক মূল্য ছাড়ে তাৎক্ষণিক টেন্ডারের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে বাড়তি তেল কেনা শুরু করে। চীনও রাশিয়া থেকে তেল কেনা বাড়িয়েছে বলে খবর এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে রাশিয়া থেকে ভারতের অতিরিক্ত তেল কেনার বিষয়টি ভালোভাবে না নেয়ার বিষয়টি এরই মধ্যে স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন।

রাশিয়ার পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দাম পরিশোধ নিয়েও জটিলতা রয়েছে। সুইফটে নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারে দাম পরিশোধ সম্ভব নয়। আর রাশিয়াও অনেক দেশের ক্ষেত্রে রুবলে দাম পরিশোধের শর্ত দিচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর পরপর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও এখন তা অনেকটা কমে এসেছে। কিন্তু তেল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকি কমাতে আর ডলার বাঁচাতে সরকার আগস্টের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যার প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে অনেকটা।

তেল বাঁচাতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমিয়ে দিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে রুটিন করে সব এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় রাশিয়া থেকে তেল কেনা হলে অনেক কম দামে পাওয়া যাবে বলে বাংলাদেশ সরকার আশা করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে দামে তেল কেনে ভারত, তার তুলনায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২০ ডলার বা তারও বেশি ছাড় দিচ্ছে রাশিয়া৷ তাই ভারত এখন যেসব দেশ থেকে তেল কেনে, সেই তালিকায় দুই নম্বরে উঠে গেছে রাশিয়া৷ আগে সৌদি আরব ছিল দুই নম্বরে৷ এখন তারা তিন নম্বরে আছে৷ এক নম্বরে আগের মতোই ইরাক আছে৷

বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে তেল কিনলে মূল্য পরিশোধ করা যাবে কীভাবে- এ প্রশ্নের উত্তরে অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তিনভাবে দাম পরিশোধ করা যেতে পারে। প্রথমত, আমরা এখন রাশিয়ায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের মতো পণ্য রপ্তানি করে থাকি। আমরা যে তেল কিনব সেই দাম রপ্তানি থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে একটা সমন্বয় করা যেতে পারে।

’দ্বিতীয়ত, আমাদের রূপপুর পারমণবিক বিদুৎ কেন্দ্রের জন্য বড় ধরনের কেনাকাটা করতে হচ্ছে, সেই কেনাকাটার বিলের সঙ্গে তেল আমদানির বিল সমন্বয় করা যেতে পারে। আর শেষেরটি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সম্মতি দিলে ডলারেও পেমেন্ট করা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিল পরিশোধ করা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে আমরা রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করব কি না? এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। রাশিয়া থেকে তেল কিনলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি বিরাগভাজন হয়, তাহলে এই পথে যাওয়া ঠিক হবে না।

’কেননা, এই দুই বড় বাজারে বাংলাদেশের ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি। রাশিয়া থেকে তেল কেনা শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো যদি নাখোশ হয়, তারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি না করে বা কমিয়ে দেয় তাহলে বাংলাদেশ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।’

এক হিসাব দিয়ে আহসান মনসুর বলেন, ‘রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কিনলে হয়তো আমাদের ৩০-৪০ কোটি ডলারের মতো সাশ্রয় হবে। কিন্তু রাশিয়া-ইউরোপ অখুশি হলে ৩৫-৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

‘তাই আমি মনে করি, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাড়াহুড়া না করে ভেবেচিন্তে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব দিক বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা কিন্তু ভারতের মতো বড় দেশ নই। যুক্তরাষ্ট্র অনেক কিছুতে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের অনেক বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি আছে। যাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নির্ভর করে।

‘কিন্তু আমাদের কিন্তু সে রকম অবস্থা নেই। আমরা ছোট দেশ, ছোট অর্থনীতি। যে অর্থনীতির অনেক কিছুই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তাই এই দুই দেশ নাখোশ হয়, এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না।

‘যুক্তরাষ্ট্র যদি নীরব থাকে আমরা ভারতের মতো রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারি, কিন্তু তারা চটে গেলে দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সেই ঝুঁকি আমরা নেব কি না-সেটাই এখন বড় বিষয়। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র চটলে, ইইউও চটবে।’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। রাশিয়া, চীন ও ভারত—এই তিন দেশের সঙ্গে এমন হতে পারে। আমরা এসব দেশ থেকে আমদানি বেশি করি। তাহলে তারা আমাদের টাকা কী করবে? এ নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাশিয়ার আর্থিক লেনদেনের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞার কারণে সুইফট সিস্টেমের বাইরে গিয়ে চীনের মুদ্রা বা টাকা এবং রুবলে লেনদেনের বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ও মস্কো ভাবছে। এটা সম্ভব। রাশিয়ায় আমাদের যে ১ বিলিয়ন ডলারের মতো রপ্তানি হয়, সেই রপ্তানি বিল রাশিয়ার মুদ্রা রুবলে নিলে, সেই রুবল দিয়ে আমরা তেলের দাম শোধ করতে পারি। আবার ডলার বা টাকা দিয়ে চীনের মুদ্রা ইউয়ান কিনে সেই ইউয়ান দিয়েও তেলের দাম পরিশোধ করা যেতে পারে।’

দেশের আরেক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভারত রাশিয়া থেকে রুবলে তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। সেটা সম্ভব হলে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যও রুবল-টাকায় হওয়া সম্ভব।

‘তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, সরকার টু সরকার বাণিজ্য হলে সেটা রুবল-টাকাতে হওয়ায় খুব একটা সমস্যা নেই। কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে। কেননা, বেসরকারি উদ্যোক্তারা টাকা দিয়ে যেমন সহজেই ডলার কিনতে পারেন; রুবল তো সেভাবে পাবেন না।’

ভারতের রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনকারী সংস্থা হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (এইচপিসিএল) সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে রাশিয়া থেকে মাত্র ৪৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের তেল কিনেছিল ভারত৷ আর চলতি ২০২২ সালের শুধু মে মাসেই ১৯০ কোটি ডলারের তেল কিনেছে ভারত৷

আগে বছরে চাহিদার মোট ২ শতাংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করত ভারত। এবার এপ্রিল-মে মাসে চাহিদার ১০ শতাংশ তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে। যত সময় গড়াচ্ছে, ততই রাশিয়া থেকে তেল আনার পরিমাণও বাড়ছে৷ কারণ রাশিয়া সস্তায় তেল দিচ্ছে ভারতকে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ভারত সফরে গিয়ে বাংলাদেশও যাতে ভারতের মতো সস্তায় রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারে, সেই রাস্তা বাতলে দিতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে অনুরোধ করেছিলেন।

দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা আহসান মনসুর বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকার চোখ রাঙানিকে ভারত ভয় না পেয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার কারণ হলো- আয়তনে ও প্রভাবে ভারত অনেকটাই বড়৷ ভারতের বিশাল বাজার ধরতে সব দেশের কোম্পানি উদগ্রীব৷ ভারতের বাজার হারালে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি রীতিমতো বিপাকে পড়বে৷’

‘অস্ত্র থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য- সবকিছুর ক্ষেত্রেই ভারতের বাজার তাদের কাছে খুবই লোভনীয়৷ সে জন্য ভারত এই চাপকে উপেক্ষা করতে পারে।’

‘কিন্তু বাংলাদেশ পারে না, এটাই বাস্তব সত্য,’ বলেন আহসান মনসুর।

আরও পড়ুন:
‘পারমাণবিক বিপর্যয়ে দায়ী থাকবে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা’
মুসলিম লীগের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে বিএনপি: তথ্যমন্ত্রী
পরিত্যক্ত ঘরে মিলল ৩ হাজার লিটার ডিজেল
কাঁচাবাজার নিয়ন্ত্রণহীন
আমদানি কমছে, বাড়ছে রেমিট্যান্স, ফিরছে স্বস্তি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
In the event that there is no additional fare chart on the bus
বাস ভাড়ায় নৈরাজ্য-১২

বাসে বাড়তি ভাড়া চার্ট না থাকার সুযোগে

বাসে বাড়তি ভাড়া চার্ট না থাকার সুযোগে কয়েকটি বাসে দেখা গেছে জানালার দুটি গ্লাসের মধ্যে যে গ্লাসটি বাইরের অংশে থাকে সেই গ্লাসে ভাড়ার তালিকা টানাচ্ছে। ফলে জানালা খুলে রাখার কারণে বাইরের গ্লাসে টানানো ভাড়ার তালিকা ভেতরের গ্লাস দিয়ে ঢেকে যাচ্ছে। ছবি: নিউজবাংলা
কেন যাত্রীদের চোখের আড়ালে ভাড়ার তালিকা লাগানো হয়েছে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থেকে চিটাগাং রোডগামী সুগন্ধা পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৯১৬৮ বাসের চালক মো. ফারুক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভাড়ার চার্ট আমরা না মালিকে লাগিয়েছে এভাবে। কথা সত্য, জানালা খোলা রাখলে ভাড়ার তালিকা দেখা যায় না। তবে জানালা বন্ধ করলে তো দেখা যায়।’

বাসভাড়া নির্ধারণের পর কোনো এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ভাড়া কত, সেটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ নির্ধারণ করে দিলেও কার্যত সে তথ্য পাচ্ছে না যাত্রীরা। অথচ এই বিষয়টিই বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধে একটি হাতিয়ার হতে পারত।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ৭ আগস্ট বিআরটিএ থেকে নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনের পরে ৯ দিন চলে গেলেও রাজধানীতে বেশির ভাগ বাসে এখনও ভাড়ার তালিকা টানানো হয়নি।

এবার চাপে পড়ে বাস মালিক সমিতি বাড়তি ভাড়া আদায়ের প্রধান কৌশল ওয়েবিল পদ্ধতি বাতিল করে দূরত্ব অনুসারে ভাড়া আদায়ের ঘোষণা অবশ্য দিয়েছেন। তবে কোনো একটি গন্তব্য থেকে অন্য একটি গন্তব্য পর্যন্ত যে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হতো, সেটিই আদায় করা হচ্ছে। এর কারণ এই পথের দূরত্ব কত, সেটি না জানা।

দূরত্বের বিষয়টি জানা যেত ভাড়ার চার্ট সাঁটানো থাকলে। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা বাসে সেই চার্ট সাঁটান না, আর সাঁটালেও দুই চার দিন পর তা ছিঁড়ে ফেলেন অথবা এমন জায়গায় থাকে, যেখানে যাত্রীর চোখ যায় না।

কয়েকটি বাসে দেখা গেছে, জানালার দুটি গ্লাসের মধ্যে যে গ্লাসটি বাইরের অংশে থাকে, সেই গ্লাসে ভাড়ার তালিকা টানাচ্ছে। ফলে জানালা খুলে রাখার কারণে বাইরের গ্লাসে টানানো ভাড়ার তালিকা ভেতরের গ্লাস দিয়ে ঢেকে যাচ্ছে, যা যাত্রীদের চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

বাসে বাড়তি ভাড়া চার্ট না থাকার সুযোগে

কেন যাত্রীদের চোখের আড়ালে ভাড়ার তালিকা লাগানো হয়েছে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থেকে চিটাগাং রোডগামী সুগন্ধা পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৯১৬৮ বাসের চালক মো. ফারুক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভাড়ার চার্ট আমরা না মালিকে লাগিয়েছে এভাবে। কথা সত্য, জানালা খোলা রাখলে ভাড়ার তালিকা দেখা যায় না। তবে জানালা বন্ধ করলে তো দেখা যায়।’

কেউ তো আর জানালা বন্ধ করে রাখে না। জানালার ওপরের গ্লাসে কেন ভাড়ার তালিকা লাগানো হয় নাই- উত্তরে তিনি একই কথা বলেন। ফারুক বলেন, ‘এটা মালিক এভাবে টানিয়েছে।’

অনেক বাসে আবার চালকের সামনে ভাড়ার তালিকা টানানো। যেটা দূর থেকে দেখে যাত্রীরা কিছুই বুঝবে না।

ভাড়ার চার্ট টানানোর শর্ত হিসেবে বিআরটিএ থেকে বলা হয়েছে, যাত্রীদের থেকে এমন দূরত্বে ভাড়ার তালিকা লাগাতে হবে যাতে তারা সহজেই দেখে ভাড়া দিতে পারেন।

চালকের মাথার ওপর চার্ট থাকার বিষয়ে বাইপাইল থেকে সাইনবোর্ড এম এম লাভলী পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৯৬৫১ বাসের ভাড়া কাটার দায়িত্বে থাকা মো. রনি বলেন, ‘ভাড়ার চার্ট আজকে দিছে। তাই সামনে একটা টানাইছি।’

বাসে বাড়তি ভাড়া চার্ট না থাকার সুযোগে

এই পরিবহনের বেশ কয়েকটি বাসে একই চিত্র দেখা যায়।

মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তানগামী মিডলাইন পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৩-০৫৪০ বাসের চালক শুকুর আলী বলেন, ‘একটা চার্ট টানাইছি।’

যাত্রীদের সুবিধাজনক স্থানে বেশ কয়েকটি ভাড়ার তালিকা টানানোর কথা। সামনের ভাড়ার তালিকা তো দেখা যায় না- উত্তরে শুকুর আলী বলেন, ‘আপনি বলেছেন, আজকেই চার্ট টানাব।’

বাসে যাত্রীদের সুবিধাজনক স্থানে ভাড়ার তালিকা টানানো হয়নি কেন- জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থেকে ধুপখোলাগামী মালঞ্চ পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৯৭৬২ বাসের চালক আল-আমিন বলেন, ‘আমাদের একটা চার্ট দিছে। সেটা সামনে টানিয়ে রাখছি।’

আপনি ভাড়ার তালিকা পাঁচটা ফটোকপি করে বাসে টানাতেন- উত্তরে আল-আমিন বলেন, ‘আমাদের তো মালিকপক্ষ থেকে কিছু বলে নাই। এই একটাই টানাতে বলছে। আমাদের বললে আমরা জানালায়, দরজার সামনে টানাতাম। ভাড়ার চার্ট একটা দিছে, একটাই টানাইছি।’

বাসে বাড়তি ভাড়া চার্ট না থাকার সুযোগে

একই পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৯৫২৭ বাসের চালক মো. মাহাবুব বলেন, ‘চার্ট এখনও কোম্পানি দেয় নাই।’

আপনাদের অন্য বাসে তো ভাড়ার তালিকা দিয়েছে?– জবাবে মাহাবুব বলেন, ‘আমারে এখনও দেয় নাই। আমরা চাইছি, বলছে আজকে দিবে।’

মোহাম্মদপুর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারগামী স্বাধীন পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৯৯৬০ বাসেও দেখা যায়নি চার্ট। কারণ জানতে চাইলে এর চালক মো. বিল্লাল বলেন, ‘ভাড়ার চার্ট আমাদের এখনো দেয় নাই।’

বাসে ভাড়ার তালিকা দেয়া হয়েছে আগেই। আপনাকে না দেয়ার কারণ থাকতে পারে না- এমন মন্তব্যের জবাবে বিল্লাল বলেন, ‘ছুটিতে ছিলাম। গতকাল থেকে বাস চালাচ্ছি। এগুলা কিছু জানি না।’

মোহাম্মদপুর থেকে বনশ্রীগামী তরঙ্গ প্লাস পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-১১৬৮ বাসের চালক তানভীর হাসান বলেন, ‘চার্টের বিষয়ে মালিক জানে। মালিক বলছে, কালকে থেকে আমাদের চার্ট দিবে।’

অনেকে আবার বলছেন, ভাড়ার তালিকা নাই। তারা ওয়েবিলে ভাড়া কাটছেন।

মিরপুর দুয়ারীপাড়া থেকে সদরঘাটগামী বিহঙ্গ পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৩-০৭৫০ বাসের ভাড়া কাটার দায়িত্বে থাকা মো. তুহিন বলেন, ‘চার্ট নাই। ওয়েবিলে ভাড়া লেখা আছে।’

ওয়েবিল তো থাকার কথা না, ভাড়া কাটার কথা কিলোমিটার হিসেবে- সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই প্রশ্ন করতেই তুহিন বলেন, ‘চার্ট ছিল। গাম নাই, তাই উঠে গেছে। আরও দুই সপ্তাহ আগে ভাড়ার চার্ট লাগানো ছিল।’

দুই সপ্তাহ আগে তো পুরাতন ভাড়ার তালিকা ছিল- উত্তরে তুহিন বলেন, ‘চার্ট সামনের সপ্তাহে দিছিল। উঠে গেছে।’

ডিজিটাল ব্যানার ও ই-টিকিটিংয়ের দাবি

যাত্রী অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রত্যেক বাসস্টান্ডে ডিজিটাল ব্যানারে বড় হরফে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়ার অঙ্কের তালিকা টানানোর দাবি জানাচ্ছি। যাত্রী, চালক ও ভাড়া কাটার দায়িত্বে যিনি থাকেন, তারা যাতে সবাই ভাড়া দেখতে পারে এই দাবি জানাই।’

ই-টিকিটিং পদ্ধতিতে ভাড়া কাটার ব্যবস্থা করলে যাত্রীরা সঠিকভাবে ভাড়া দিতে পারবেন বলেও মনে করেন তিনি। বলেন, ‘এই পদ্ধতিতে ভাড়া নিলে যাত্রী গোনার কথা বলে মালিকরা যে ওয়েবিল চালু রেখে ভাড়া বেশি নিচ্ছে এই ওয়েবিল লাগবে না।’

ভাড়ার চার্ট নিশ্চিত করার ব্যর্থতা নিয়ে জানতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফোন দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহর ফোনে কয়েকবার কল দিলে তিনি তা না ধরে ফোন কেটে দেন।

আরও পড়ুন:
তেলের দাম সমান হলেও কলকাতায় বাস ভাড়া ঢাকার চেয়ে কম
যাত্রী ঠকছে বিআরটিসির বাসেও
সর্বনিম্ন ভাড়া ১০, তবে প্রজাপতি ও পরিস্থানে ২৫
ওয়েবিল থাকবে না ঘোষণা দিয়ে কয়েক মাস সময় দাবি
ভাড়ার প্রতারণায় হাতিরঝিলে রাজউকের বাসও

মন্তব্য

p
উপরে