× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বাংলাদেশ
Arrogance has given land to take Padma bridge
google_news print-icon

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

পদ্মা-সেতু-নিয়েছে-জমি-দিয়েছে-অহংকার
পদ্মা সেতুর জন্য বাবুল শেষ পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জমি দিয়েছেন। ২০০৮ সালের ৩ জুলাই জমি অধিগ্রহণের নোটিশ পায় তার পরিবার। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালে ক্ষতিপূরণ বাবদ তারা পান ২১ লাখ ৬ হাজার ৪১৫ টাকা।

আলোয় উদ্ভাসিত রাতের পদ্মা সেতু। প্রতিবিম্ব পদ্মার বুকে তৈরি করেছে অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। নিজ ঘর ছেড়ে মৃদু পায়ে নদীর তীরে এসে দাঁড়ান ৪২ বছর বয়সী বাবুল হাওলাদার। দুই চোখ বেয়ে নামছে অশ্রুধারা।

বাংলাদেশের অহংকার হয়ে প্রমত্তা পদ্মাকে পরাস্ত করে দুই প্রান্তের সংযোগ ঘটিয়েছে যে সেতু, তার নাড়ির টান বাবুল হাওলাদারের। আরও অনেকের মতো তার পৈতৃক জমি এই সেতুর জন্য করা হয়েছে অধিগ্রহণ। ফলে পদ্মা সেতু কেবল একটি স্টিল-কংক্রিটের কাঠামো নয়, বাবুলের কাছে এই সেতু যেন আপন সন্তানতুল্য।

জাজিরা প্রান্তের ১০১ নম্বর নাওডোবা মৌজার ১০৪৯ নম্বর খতিয়ানের ৪৩৪৯ নম্বর দাগে পদ্মা সেতুর টোলপ্লাজার আগে ভায়াডাক্টের সর্বশেষ পিলারের জায়গায় ছিল বাবুল হাওলাদারের বসতি। ৯ দশমিক ৮১ একর জমিতে বসতবাড়ির পাশাপাশি ছিল কৃষিজমি।

সেই জমিতে কৃষিকাজ করত বাবুলের পরিবার। পাশাপাশি ঢাকার শ্যামবাজারে হকারের কাজ করতেন বাবুল। ২০০৬ সালের শেষ দিকের কথা। বাবা লাল মিয়া হাওলাদার মোবাইল ফোনে বাবুলকে জানান তাদের জমি থেকে পাঁচ একর জায়গা পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছাড়ার শঙ্কায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে বাবুলের।

তবে নিজেকে সামলে নেন দিন কয়েকের মধ্যেই, বুঝতে পারেন তার মতো আরও অনেকের ত্যাগের মধ্য দিয়েই দক্ষিণের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের দ্বার উন্মোচিত হবে।

পদ্মা সেতুর জন্য বাবুল শেষ পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জমি দিয়েছেন। ২০০৮ সালের ৩ জুলাই জমি অধিগ্রহণের নোটিশ পায় তার পরিবার। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালে ক্ষতিপূরণ বাবদ তারা পান ২১ লাখ ৬ হাজার ৪১৫ টাকা।

তারপর কেটে গেছে প্রায় ১১ বছর। বাবুলের চোখের সামনে ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেয়েছে বিশ্বকে অবাক করে দেয়া বাংলাদেশের গর্বের গল্প।

রাতের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে আলো ঝলমলে পদ্মা সেতুর দিকে তাকিয়ে সেই সব দিনের স্মৃতিতাড়িত হন বাবুল।

নিউজবাংলাকে শোনান, প্রথম কয়েক দিনের টানাপড়েন আর এখনকার গর্ব-আনন্দের নানা কথা। পদ্মা সেতু নিয়ে প্রথম দিককার ষড়যন্ত্রে বাবুল হাওলাদারও ভেঙে পড়েছিলেন। তবে কি তার মতো আরও অনেকের ত্যাগ আর দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন বিফলে যাবে?

বাবুল বলেন, ‘জমি দেয়ার পর জানতে পারলাম সেতু নিয়া ষড়যন্ত্র হইতাছে। বিদেশিরা নাকি টাকা দিব না। তহন ভাবছিলাম পদ্মা সেতু মনে অয় অইব না। কিন্তু আইজ এই সেতু এভাবে দেইখা খুবই আনন্দ লাগতাছে।’

বাবুলের মতোই এমন অসংখ্য গল্পের নায়ক পদ্মাপারের খেটে খাওয়া অসংখ্য মানুষ। পৈতৃক জমি অধিগ্রহণের পর তাদের অনেকের আশ্রয় হয়েছে পুনর্বাসন কেন্দ্রে। নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রের মো. আজাহারের বয়স ৬৫ বছর। সেতুর কারণে জমি হারানোর কষ্ট ভুলে গেছেন অনেক আগেই।

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০০৭ সালে প্রথম যখন আমাগো জমি অধিগ্রহণ করল, তখন খুবই খারাপ লাগতেছিল। পরে যখন টাকা-পয়সা দিল আর থাকার জন্য একটা প্লট দিল, তখন থেকে মন ভালো হয়ে গেছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হইতাছে, দেশের অনেক উন্নতি হইব। আমাগো সব কষ্ট দূর হইয়া গেছে।’

পদ্মা সেতুর কারণে জমি হারানোদের সবাইকে পুনর্বাসন করেছে সরকার। তাদের সবাই আছেন আগের চেয়ে সচ্ছল জীবনে।

পুনর্বাসন কেন্দ্রের ৩৮ বছর বয়সী মাকসুদা বেগম বলেন, ‘দ্যাশের একটা বড় কাজের লিগ্যা জমি ছাইড়া দিছি। সরকার আমাগো জমির লিগ্যা টাহাও দিছে। আবার থাকোইন্যা ব্যবস্থাও কইরা দিছে। ঢাহা (ঢাকা) শহরের মতো পানি টিপ দিলেই পড়তে থাকে। কারেন আছে। হাসপাতালে গেলে ওষুদ-বড়ি দেয়। এহানের স্কুলে পোলাপাইনে লেহাপরা করাইতে পারি। এইহানে অনেক ভালো আছি।’

পূর্ব নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা আলেয়া বেগম বলেন, ‘পোলাইনের পড়ালেখার জন্য সুন্দর বিদ্যালয় আছে। যারা কাজ শিখতে চায় তাদের জন্য গাড়ি চালানোর ট্রেনিং দিয়া আবার চাকরিও দিয়া দিছে। মেয়েছেলেরা শিলাইয়ের (টেইলারিং) কাজ শিখছে। অহন তারা জামাকাপড় বানাইয়া টাকা কামাই করতে পারে।’

পদ্মার বুকে এখন সগর্বে দাঁড়ানো পদ্মা সেতু নির্মাণের শুরুর দিকের পথ ছিল ভয়ংকর পিচ্ছিল। আড়াই দশক আগেও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে এই নদীর ওপর সেতু ছিল কষ্টকল্পনা।

পদ্মার ওপর সেতু তৈরির দাবিতে আশির দশকে প্রথম আনুষ্ঠানিক আন্দোলনে নামেন ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের এই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এখন শরীয়তপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে আছেন।

খোকা সিকদার নিউজবাংলাকে বলেন, সে সময়ে আন্দোলনের মূল প্রেরণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি নিজে ডেকে নিয়ে আন্দোলনে উৎসাহ দিয়েছেন।

খোকা সিকদার বলেন, এ আন্দোলনের কারণে নানান বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাকে। অনেকে তাকে পাগল বলেও উপহাস করেছেন।

খোকা সিকদারসহ আরও কিছু মানুষের স্বপ্ন আলোর মুখ দেখার সুযোগ পায় আন্দোলন শুরুর এক দশকেরও পর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের প্রথম মেয়াদে ১৯৯৯ সালে শুরু হয় প্রাক-সম্ভাব্যতা জরিপ। এরপর ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়ায় সেতুর ভিত্তি স্থাপন করেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে। শুরু হয় বিদেশি দাতাদের যুক্ত করার কাজ।

মূল সেতু ও নদীশাসন কাজের কারিগরি মূল্যায়ন ও সুপারভিশন কনসালট্যান্সির প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠন হয় মূল্যায়ন কমিটি।

পদ্মার ওপর সেতু নিয়ে গোটা জাতি যখন স্বপ্নে বিহ্বল, ঠিক তখন আকস্মিকভাবে প্রকল্পে দুর্নীতিচেষ্টার অভিযোগ তুলে অর্থায়ন থেকে সরে যায় বিশ্বব্যাংক। অন্য বিদেশি দাতারাও একই পথ অনুসরণ করে। অনিশ্চয়তায় পড়ে পুরো প্রকল্প।

তবে থেমে যায়নি বাংলাদেশ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনমনীয় দৃঢ়তায় নিজস্ব অর্থায়নেই শুরু হয় সেতু নির্মাণের কাজ। কঠিন সেই সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা নিউজবাংলাকে বলছিলেন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি শুরু থেকে এই প্রকল্পে ছিলাম না। এখানে এসেছি ২০১১ সালের নভেম্বরে। বিশ্বব্যাংক চলে যাওয়ার কারণে ক্রাইসিস তৈরি হলো। তখন আমাদের সে সময়ের সচিব, প্রকল্প পরিচালক, এমনকি মন্ত্রীও চলে গেছেন। ওই সময়ে আমি এলাম আর একজন নতুন মন্ত্রী ও নতুন সচিবও এলেন দায়িত্বে। ততদিনে ডিজাইন শেষ হয়েছে, টেন্ডার শেষ হুয়েছে, প্রি-কোয়ালিফিকেশনও শেষ হয়েছে। সরকার বলল, যেখানে থেকে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে আমরা শুরু করব।

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

‘আমরা কিছু ফাউন্ডেশন পেয়েছি, একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছি এটা বলা ঠিক হবে না। ভুল হবে। নির্মাণকাজের শুরুটা আমাদের সময়ের। তার মানে ফুল টেন্ডার, টেন্ডার প্রকিউরমেন্ট এবং কনস্ট্রাকশন আমাদের হাতে হয়েছে।

‘বাংলাদেশে সবচেয়ে কঠিন হলো প্রকিউরমেন্ট। প্রকিউরমেন্টে অনেক গন্ডগোল লাগে, মামলা-মোকদ্দমা হয়, এটা-সেটা অনেক কিছু হয়। এই প্রকল্পে ওসব কিছু ওভারকাম করে আমরা নির্মাণকাজ করতে পেরেছি।’

এত বড় প্রকল্প নিজেদের টাকায় আর কখনও করেনি বাংলাদেশ। ফলে বিপুল অর্থের জোগান নিশ্চিত করাই ছিল প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কীভাবে সেই টাকার জোগান এলো- বলছিলেন শফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “ওটা অচলাবস্থা ঠিক আছে, কিন্তু আমরা সব মহল থেকে সহায়তা পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বললেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করব। অনেকের প্রশ্ন ছিল যে নিজস্ব অর্থায়ন কীভাবে সম্ভব? কারণ আমাদের বাজেটের আকার এমন, এটা হলে সব উন্নয়ন থমকে যাবে। একই সঙ্গে এত ফরেন কারেন্সি আমরা কোথায় পাব? ৮০ ভাগ ফরেন কারেন্সি, আড়াই বিলিয়ন ডলার ফরেন কারেন্সি লাগবে। এটা নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় কাজ করেছে।

“তখন আমি মিটিং করেছি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে। আমার ব্যাংকার ছিল অগ্রণী ব্যাংক। তাদের দুই জিএম সাহেবকে নিয়ে আমি গেলাম। তারপর ওনাকে ব্যাখ্যা করলাম যে টাকা তো আমাদের একবারে লাগবে না। চার-পাঁচ বছরে টাকাটা লাগবে।

“শুনতে আড়াই বিলিয়ন ডলার মনে হলেও এটা তো আর একসঙ্গে লাগছে না। বাংলাদেশের তখনকার বাজেটের হয়তো একটা বড় অংশ। তবে পরের বাজেটে কিন্তু এটা কমে আসবে, কারণ বাজেট বড় হচ্ছে। আমার সেতুর বাজেট তো আর সামনে বাড়বে না।

“ওনারা কনভিনসড হলেন। অগ্রণী ব্যাংক বলল, যে টাকাটা লাগবে তারা দিতে পারবে। আমি বললাম, আমার এক মাসে ম্যাক্সিমাম ২০০ মিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। তখন অগ্রণী ব্যাংক বলল, তারা এটা দিতে পারবে। গভর্নর সাহেব খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে ফাইন। তাহলে তো আমার ওপর কোনো চাপই নেই। লাগলে আমি আপনাকে সাহায্য করব।’

“পরে বিষয়টা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা করলাম। তারাও দেখল টাকা তো আর একবারে লাগছে না। আমাদেরও আত্মবিশ্বাস বাড়ল যে আমরা এটার অর্থ দিতে পারব। ফরেন কারেন্সির জন্য কোনো সমস্যা হবে না।”



এভাবেই অনিশ্চয়তার পাহাড় ডিঙিয়ে যাত্রা শুরু স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। কেবল অর্থায়ন নয়, প্রমত্তা পদ্মা বহু দিক থেকে বিশ্বের অনন্য এক নদী। তাই এর ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণে পেরোতে হয়েছে অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ।

শফিকুল বলেন, ‘এখানে পানির স্রোত অনেক বেশি। কারণ দুটি নদীর সম্মিলন ঘটেছে এখানে । আমরা এর আগে পদ্মাতেও ব্রিজ করেছি, যমুনাতেও করেছি। লালন শাহ ব্রিজ করেছি পদ্মায়, আর যমুনায় করেছি বঙ্গবন্ধু সেতু। তবে এখানে কিন্তু ওই দুইটা নদীর কম্বিনেশন।

‘সাধারণ সেন্সই তো বলবে দুই নদীর স্রোত যখন এক জায়গায় আসে, তখন সমস্যা এমনিতেই বেশি হবে। যমুনায় আমরা তলদেশে ৮০ মিটার যাওয়ার পর হার্ড লেয়ার পেয়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এর থেকে মজার আর ভালো কিছুই হতে পারে না। আর এখানে আমরা ১৪০ মিটার গিয়েও হার্ড লেয়ার পাচ্ছি না। সে ক্ষেত্রে বিয়ারিংয়ের জন্য আমার অন্যান্য মেথড খাটাতে হয়েছে। যে কারণে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে গেছে।’

পদ্মার তলদেশের নরম মাটির স্তর অনেক ভুগিয়েছে প্রকৌশলীদের। প্রকল্প সফল করতে নিতে হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। যার অনেক কিছুই বিশ্বে এই প্রথম।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাটির ভিন্নতা থাকার কারণে ২২টি পিয়ারে আমরা বিয়ারিং ক্যাপাসিটি পাইনি। পরে আবার ডিজাইন করা হয়েছে। সেখানে ছয়টির জায়গায় সাতটি পাইল দেয়া হয়েছে। তার পরও আমাদের বিয়ারিং আসছিল না। তখন আমরা একটা নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করেছি। সেটার নাম গ্রাউটিং, যেটা আগে বাংলাদেশে ব্যবহার হয়নি।

‘আবার যে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা আগে বাংলাদেশে ব্যবহার করা হয়নি। মাইক্রোফাইন সিমেন্ট, যেটা অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছে। এই সিমেন্ট আর গ্রাউটিং দিয়ে বিয়ারিং ক্যাপাসিটি বাড়ানো হয়েছে।

‘এর পরও আমরা কনফিডেন্স পাচ্ছিলাম না। শুধু থিওরিটিক্যালি দেখলে আসলে হবে না, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং তো প্র্যাকটিক্যাল বিষয়। আপনারা দেখবেন পাইলিংয়ের লোড টেস্ট হয়। বিল্ডিং বানাতে গেলেও লোড টেস্ট করে। ইঞ্জিনিয়ার প্রথমে ডিজাইন করে দেন পাইলের লেন্থ এত হবে। সেটা হওয়ার পর কিন্তু আবার লোড টেস্ট করে যে থিওরিটিক্যাল ক্যালকুলেশন বাস্তবের সঙ্গে মিলছে কি না। আমরাও তেমন টেস্ট করেছি এবং সেটায় ভালো ফল আসছে। এরপর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াতে আমরা দ্বিতীয়বারের মতো টেস্ট করেছি। এটা বিশ্বে শুধু পদ্মা সেতুতেই হয়েছে। সেটাতেও ভালো ফল আসায় আমরা কনফার্ম হয়েছি, হ্যাঁ এখন এটাতে যেতে পারি।’

পদ্মা সেতুতে ১২০ মিটার পাইল বিশ্বরেকর্ড। একই সঙ্গে গ্রাউটিং টেকনোলজি ও মাইক্রোফাইন সিমেন্ট দেয়াও বিশ্বরেকর্ড। আরও বেশ কিছু অনন্য প্রযুক্তি রয়েছে এই সেতুতে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভূমিকম্প প্রতিরোধের জন্য বিয়ারিং ব্যবহার করেছি ৯০ দশমিক ৬ হাজার কিলো ইউনিট টন, মানে সবচেয়ে বড়। পৃথিবীতে এত বড় বিয়ারিং আর কোনো সেতুতে ব্যবহার হয়নি। নদীশাসনের ক্ষেত্রেও বিশ্বরেকর্ড হয়েছে। এখানে ২৮ মিটার ডেপথে এত বড় দৈর্ঘ্যে নদীশাসন আর কোথাও হয়নি।‘

এই সেতু নির্মাণে বিশেষভাবে অর্ডার দিয়ে বানানো কিছু সরঞ্জামও ব্যবহার করা হয়েছে। এদিক থেকেও বিশেষত্ব রয়েছে পদ্মা সেতুর।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে যে ক্রেনটা ব্যবহার করা হয়েছে সেটা পাঁচ হাজার টন ক্যাপাসিটির। এর নাম তিয়ানি; চাইনিজ একটি ক্রেন। এটি পৃথিবীর অন্যতম বড় ক্রেন। সবচেয়ে বড় ক্রেন কি না জানা নেই। যেহেতু আমাদের স্প্যানের ওজন ৩ হাজার ২০০ টন। তাই এর চেয়ে বেশি ক্যাপাসিটির ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে।

‘এ সেতুর ব্যবহৃত হ্যামারটাও বিশেষ হ্যামার। যমুনাতেও একই কোম্পানির হ্যামার ব্যবহার হয়েছিল, তবে সেটা এত বড় ছিল না। এখানে যেহেতু ডেপথ বেশি, তাই হ্যামারের ক্যাপাসিটিও বেশি লেগেছে।’

বিশেষজ্ঞদের কাছে পদ্মা সেতু শুধু একটি যোগাযোগের বড় মাধ্যম নয়, এটা এক আবেগ ও ভালোবাসারও নাম। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে দেশে রূপান্তরকামী এক চেতনা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. সামছুল হকের কাছে পদ্মা সেতু দেশ রূপান্তরকারী একটি প্রকল্প, এটা দেশের সক্ষমতার প্রতীক।

তিনি বলেন, ‘পদ্মা ব্রিজ না থাকার ফলে আমাদের দেশটা দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল পূর্ব ও পশ্চিমে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ঢাকার এত কাছে থাকার পরও বিনিয়োগ ও উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল। এটা একটা বৈষম্য ছিল। খুলনা ঐতিহাসিকভাবে একটা শিল্পাঞ্চল ছিল। সবচেয়ে পুরোনো মোংলা পোর্ট ছিল। কুয়াকাটা হয়েছে। এদের সংযোগকারী যে অবকাঠামো দরকার ছিল সেটাই পদ্মা সেতু।’

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

পদ্মা সেতুর নির্মাণকৌশল ও প্রযুক্তিগত দিক নিয়েও মুগ্ধ ড. সামছুল হক। তিনি বলছেন, সেতুর নির্মাণকৌশল দেখতে গেলে বিজ্ঞানের আশীর্বাদই সামনে ভেসে ওঠে।

ড. সামছুল হক বলেন, ‘আমরা যদি দেশের উল্লেখযোগ্য একটি স্থাপনা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব সেখানে ট্র্যাডিশনাল প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটেছে। লোহা, নাট-বল্টু ব্যবহৃত হয়েছে। ওই সেতুটার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সময়-অর্থ ও জনবলের প্রয়োজন হয়। নাট-বল্টু ও রেবেটিং থাকলে সেগুলো ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। সেতু যত পুরোনো হতে থাকে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খরচও তত বাড়তে থাকে।

এই সেতুর কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অবকাঠামোগত অভূত পরিবর্তন দেখা দেবে বলে আশা করেন ড. সামছুল হক।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা-মাওয়া যে এক্সপ্রেসওয়েটা, সেটা বড় ধরনের যোগাযোগের ও সংযোগের জন্য সহায়ক। যে কারণে অর্থনৈতিক সার্বিক উন্নতির পাশাপাশি যোগাযোগ উন্নয়ন ও পর্যটনের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এ সেতু প্রভাব রাখবে। পর্যটন এমন একটা খাত, যেটার সঙ্গে ৩১টি খাত একই সঙ্গে চাঙা হয়। সেদিক থেকে পদ্মা ব্রিজ আমাদের অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গেছে। যমুনা ব্রিজের যে উন্নয়ন ছিল, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সেটার গতি ছিল ধীর। এখন আমাদের উদ্যোক্তারা অনেক সাহসী। ঢাকা অনেক কাছে। সে কারণে উন্নয়নটা আরও বেশি হবে। এর সঙ্গে যে রেলসেতু হবে, সেটাও যোগাযোগের বহুমাত্রিকতা নিয়ে আসবে। যাত্রী পরিবহন ও পায়রা বন্দর থেকে কনটেইনার বহনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে। সার্বিকভাবে বলা যায়, অনেক দিক থেকেই বলিষ্ঠ উন্নয়ন হবে।’

জাজিরার বাবুল হাওলাদারের মতো কয়েক হাজার পরিবারের ভিটেমাটি অধিগ্রহণ হয়েছে পদ্মা সেতুর জন্য। তবে তা নিয়ে বাবুলের আক্ষেপ নেই, বরং গোটা বাংলাদেশের গৌরবের সামনের সারিতে নিজেকে ভাবছেন তিনি।

রাতের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে আলো ঝলমলে পদ্মা সেতু বাবুলের চোখে বইয়ে দেয় আনন্দ অশ্রু। অতীতের স্মৃতিতাড়িত বাবুল স্বপ্ন দেখেন আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। এই সমৃদ্ধির মেরুদণ্ড হিসেবে পদ্মার ওপর দিয়ে গড়ে উঠেছে সেতু। বাবুল হওলাদারের অহংকারের সেতু এখন গোটা বাংলাদেশের অহংকার।

আরও পড়ুন:
যে গ্রামে অপরাধ কম, কালেভদ্রে পুলিশ  
অ্যামাজন, গুগল ও অ্যাপলে নিউজবাংলা পডকাস্ট
রহস্যে ঘেরা মানুষশূন্য মঙ্গলপুর গ্রাম
ষাটের দশকের সেই হেলিকপ্টার সার্ভিস ও ভুলে যাওয়া দুর্ঘটনা
যে রহস্যের কিনারা নেই

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
All local Dhaka city transport

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় এখন লোকাল বাসকেও যেন টেক্কা দিচ্ছে ঢাকা নগর পরিবহন। ছবি: নিউজবাংলা
ঢাকা নগর পরিবহনে এ পর্যন্ত তিনটি রুট চালু হয়েছে। কোনোটিতেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস নেই। কোনো কোনো রুটে টিকিট কাউন্টারও তুলে দেয়া হয়েছে। রুট ছেড়ে বাস চলছে বাণিজ্য মেলায়। যততত্র যাত্রী উঠা-নামা, ভাড়া নিয়ে টিকিট না দেয়া, বাসগুলোতে ধুলো-ময়লা, বাসের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা- এমন নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা সব রুটে।

আসাদগেট, ফার্মগেট, শাহবাগ, কাকরাইল…। ভাই আসেন। ওঠেন। কই যাবেন? রাস্তায় অপেক্ষমাণ যাত্রীর উত্তর- ধানমন্ডি। হেলপার বলছেন- না ভাই, এটা ফার্মগেট রুটের বাস।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচল করা লোকাল বাসের কর্মীদের এমন হাঁক-ডাক বরাবরের চিত্র। যাত্রীরা রাস্তার যেকোনো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে হাত তুললেই থেমে যাবে বাস। যাত্রীর ভিড়ে পা ফেলার জায়গা না থাকলেও হেলপারের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। চিঁড়েচ্যাপ্টা করে হলেও যাত্রী তুলতে থাকেন। নারী-পুরুষ নির্বিচারে যাত্রীরাও প্রয়োজনের তাগিদে ঠ্যালা-ধাক্কা দিয়ে একটু জায়গা করে নেন।

যাত্রীদের এমন হয়রানি আর ভোগান্তি থেকে রেহাই দিতেই রাজধানীতে চালু করা হয়েছে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’। শুরুতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেলেও অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় এখন লোকাল বাসকেও যেন টেক্কা দিচ্ছে এই বিশেষ পরিবহনের বাসগুলো। রাস্তায় আর ১০টা লোকাল বাসের মতোই যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। নামার ক্ষেত্রেও যাত্রীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে যেখানে ইচ্ছা বাস থামিয়ে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে।

রাজধানীবাসীকে লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহনের হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহনের ২২ নম্বর রুট। পরিকল্পনা রয়েছে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ রাজধানীকে একটা কোম্পানির আওতায় আনার।

যাত্রীরাও আশায় বুক বাঁধেন- যাক, নগরে ভালো একটা পরিবহন সেবা মিলবে। তবে দিন যত যাচ্ছে, ততই নিরাশ হতে হচ্ছে তাদেরকে।

শুধু ২২ নম্বর রুট নয়, বাকি দুই রুটেরও বেহাল দশা। শুরুতে ২১ নম্বর রুটের সমস্যাগুলোকে পাইলট প্রজেক্ট বলে অযুহাত দেখাতেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বাকি দুই রুট চালু হওয়ার পর সমস্যার সমাধান মিলবে- এমন আশ্বাসও দেন তারা। কিন্তু সমাধান তো দূরের কথা, দিনকে দিন সমস্যা আরও বেড়েছে। আর পুরো বিষয়টিতে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও চোখে পড়ার মতো।

ঢাকা নগর পরিবহনের ২২, ২৩ ও ২৬ নম্বর রুট চালু হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর। পরবর্তীতে সময় পিছিয়ে ২২ ও ২৬ নম্বর রুট উদ্বোধন করা হয় ২৩ অক্টোবর। ২৩ নম্বর রুটটি এখনও চালুই হয়নি।

ঢাকা নগর পরিবহনের চলমান তিনটি রুট নিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়েছে নিউজবাংলা। তাতে যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা কেবলই হতাশার। সর্বত্রই হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

রুট-২১

বাস রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ২১ নম্বর রুটে (ঘাটারচর-মোহাম্মদপুর-জিগাতলা-প্রেস ক্লাব-মতিঝিল-যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর) পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে বাস সেবা শুরু হয়।

বিআরটিসির ৩০টি ডাবল ডেকার এবং ট্রান্স সিলভা পরিবহনের ২০টি বাস দিয়ে এই রুট চালু হওয়ার কথা ছিল। পরে দুই মাসের মধ্যে এতে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল ১০০টি বাস। তবে এই দীর্ঘ ১৩ মাসে এই রুট ৫০টি বাসেরও মুখ দেখেনি।

শুরু থেকেই এই রুটে চলাচল করা বিআরটিসি বাসে চালকের কোনো সহকারী নেই। এটা যাত্রীদের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনা হয়ে দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা নগর পরিবহনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২১ নম্বর রুটে বাস চলে ২৫ থেকে ৩৫টি। এর মধ্যে ট্রান্সসিলভা পরিবহনের বাস ৮টি। বাকিগুলো বিআরটিসির ডবল ডেকার।’

ট্রান্সসিলভার ২০টি বাস চলার কথা থাকলেও কেন তা হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে বনিবনা হয় না। তারা বাস দিতে চায় না।’

যাত্রীদের আরেকটি বড় অভিযোগ, এই রুটে চলাচল করা বাসগুলো দেরি করে আসে। বাসের ভেতরের অবস্থা নোংরা।

তাদের একজন মো. সুমন বলেন, ‘২১ নম্বর রুটের বাসগুলো মোড়ে মোড়ে থামিয়ে যাত্রী তোলে। আর বাড়তি এই টাকাটা যায় ড্রাইভারের পকেটে। ট্রান্সসিলভার বাসেও একই অবস্থা। লোকাল বাস আর নগর পরিবহনের বাসের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। দিন যত যাচ্ছে সেবার মান ততো খারাপ হচ্ছে।’

লোকালের নামান্তর ২২ নম্বর রুট

ঢাকা নগর পরিবহনের ২২ নম্বর রুটে চলে হানিফ পরিবহনের বাস। এই রুটে তাদের ৫০টি বাস চলার কথা থাকলেও শুরু হয়েছিল ৩০টি বাস দিয়ে। তা না বেড়ে উল্টো কমে দাঁড়িয়েছে ২০টিতে। শুরুতে টিকিট কাউন্টার থাকলেও পরে তা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাস কমে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।

প্রতিদিন এই রুটে চলাচল করা অন্তত ১০ জন যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে নিউজবাংলার। তাদের একজন মো. শাহীন বলেন, ‘শুরু থেকেই ২২ নম্বর রুটে চলাচল করা হানিফ পরিবহনের বাসগুলো শুরু থেকেই রাস্তার যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী তোলে। অন্য দুই রুটের কাউন্টার থাকলেও এই রুটের কাউন্টার উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে তারা এখন লোকাল বাসের মতো যাত্রী নিচ্ছে। অনেক কন্ড্রাক্টর টিকিটও দিচ্ছে না।

‘দীর্ঘক্ষণ বাসের অপেক্ষায় থাকতে হয়। আর বাস কম থাকায় যাত্রীর ভিড়ে গাদাগাদি করে চলতে হয়। রাজধানীর আর ১০টা পরিবহনের মতোই অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় চলছে এই রুটের বাসগুলো।’

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন
অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় চলছে ২২ রুটের বাসগুলো।ছবি: নিউজবাংলা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক টিকিট বিক্রেতা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টিকিট পদ্ধতি উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাস এখন চলছে কন্ট্রাক্টে। এছাড়া এই রুটে চলাচল করা বাস বিভিন্ন সময় কোনো প্রোগ্রামে অন্যত্র রিজার্ভেও ভাড়া দেয়া হয়। বাস কন্ট্রাক্টে চলার কারণে যে যেমনে পারে ওঠে-নামে, ভাড়া নিচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ২২ নম্বর রুটের ইনচার্জ মো. আরমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রথম সমস্যা হচ্ছে আমাদের গাড়ি বসে থাকে। ড্রাইভারসহ অন্যান্য স্টাফ পাই না। আমাদের লোকসান হচ্ছিল। কাউন্টারের লোকদের টাকা দিতে পারছিলাম না। তাই কাউন্টার উঠিয়ে দিয়েছি।’

বাসে যাত্রীর উপচেপড়া ভিড়, তারপরও কিভাবে লোকসান হয়- এমন প্রশ্নে আরমান বলেন, ‘ঘাটারচর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ভিড় থাকে। তার পর আর যাত্রী তেমন একটা থাকে না।’

গাড়ির ভেতরে টিকিট কাটার ব্যবস্থা রাখার কারণে অনেক সময় কন্ডাক্টর অনিয়ম করছেন। ফলে টাকাটা কোম্পানি পায় না। এমন তথ্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওদের খরচ লাগে তো! এটা আপনার বুঝতে হবে। আপনি মানবিক দৃষ্টিতে চিন্তা করেন, ওদেরও একটা খরচ আছে।

‘ওরা দুই-এক টাকা সরাবে, এটা আপনাকে বুঝতে হবে। সবাইকে টিকিট দিলে তো টাকাটা জায়গামতো চলে যাবে। ওদের বেতন দেয়া হয় রাতে। সারাদিন ওরা খাবে কি?’

৫০টি বাস চলার কথা ছিল। তা থেকে এখন চলছে ২০টি। এর কারণ জানতে চাইলে আরমান বলেন, ‘সেটা আমি বলতে পারব না। ৩০টা চলত, এখন চলে ২০টা। ড্রাইভারের সংকটে আমরা বাস চালাতে পারছি না।’

২৬ নম্বর রুটের বাস চলে বাণিজ্য মেলায়

২৬ নম্বর রুটে বিআরটিসির ৫০টি ডবল ডেকার বাস দেয়ার কথা ছিল এই রুটে। তবে এখন পর্যন্ত বাস চলেছে সর্বোচ্চ ২৫টি।

এদিকে বাণিজ্য মেলা শুরু হওয়ার পর এখন ১৭ থেকে ১৮টি বাস চলছে। বাকি বাসগুলো বাণিজ্য মেলা রুটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাস কমে যাওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এই রুটের বাসে চালকের কোনো সহকারী নেই। যত্রতত্র বাস থামিয়ে তোলা হয় টিকিট ছাড়া যাত্রী।

এই রুটে নিয়মিত চলাচল করা মো. মহসিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা লাগে। বাসের পরিবেশ নোংরা। সিটগুলোতে ধুলা পড়ে থাকে। চালক মোড়ে মোড়ে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলে। মানা করলেও শোনে না।

‘বসিলা থেকে শুরু হয় টিকিট ছাড়া যাত্রী তোলা। সারা পথেই চালক সামনের দরজা খোলা রেখে যাত্রী তোলেন। টিকিট ছাড়া যাত্রীরা নামার সময় চালকের হাতে টাকা দিয়ে যান।’

এই রুটের এক চালককে যাত্রীর কাছ থেকে টাকা নেয়ার সময় অনিয়ম করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোন উত্তর দেননি। বলেন, ‘মাফ করে দেন, আর হবে না।’

পরে তার নাম জিজ্ঞাসা করলেও একই কথা বলেন, ‘মাফ করে দেন।’

তিনি কিছুই জানেন না

নগর পরিবহনে কম বাস চলার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক ও বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির সদস্য সচিব সাবিহা রহমানের কাছে। মোবাইল ফোনে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২১ নম্বর রুটে ৩০টি বিআরটিসির বাস ও ২০টি ট্রান্সসিলভার বাস চলার কথা। তবে তাদের কিছু অসুবিধা আছে, যে কারনে ৫০টি বাস দেখছেন না আপনারা।’

কখনোই ৫০টি বাস চলেনি- এমন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

২২ নম্বর রুটে বর্তমানে ২০টি বাস চলে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে সাবিহা রহমান বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই। আমার একটি পরিদর্শন টিম আছে। তারা আমায় জানিয়েছে যে, বাস রাস্তার মাঝে থামে। ড্রাইভারও টাকা আদায় করছে। কিন্তু বাস কম চলার বিষয় আমার নলেজে নেই। আগামী মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।’

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন
লোকাল বাসের মতো দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে যাত্রীরা। ছবি: নিউজবাংলা

টিকিট কাউন্টার উঠিয়ে বাসের ভেতরে টিকিট কাটা হচ্ছে। এছাড়া লোকাল বাসের মতো যত্রতত্র যাত্রী উঠানো ও নামানো হচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের সচেতন হতে হবে। জনগণেরও দায়িত্ব আছে। জনগণও যেখানে সেখানে নামতে চায়। আমি আজ জানলাম। এটা আমার জানার বাইরে ছিল। বিষয়টি খোঁজ নেব।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরিদর্শন টিম আমাকে রিপোর্ট দিয়েছে। ওরা তো আর সব সময় বসে থাকে না।’

২৬ নম্বর রুটের বাস বাণিজ্য মেলার যাত্রী টানছে তা-ও জানেন না এই কর্মকর্তা। বলেন, ‘আগামী ৭ তারিখ মিটিং আছে। তখন এটা আলোচনা করব। আর আমি এখনই বিআরটিসির চেয়ারম্যানকে ফোন করব।’

বিআরটিসির বক্তব্য

নিউজবাংলার পক্ষ থেকে এর আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বিআরটিসির বাস কম চলা ও চালকদের দুর্নীতির বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজেই আজ থেকে নগর পরিবহনের তদারকি করব। আশা করছি আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বাস চালকের সহকারীও দেয়া হবে।’

তার ওই আশ্বাসের পর কয়েক মাস কেটে গেছে। কিন্তু সমস্যা কমেনি, বরং বেড়েছে।

মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানানোর পর তাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২১ নম্বর রুটে আমার ৩০টি গাড়ি চলে। আপনার কোনো কথা থাকলে আমার অফিসে এসে বলুন। আমার ২০০ রুটে বাস চলে; আমি কি সব রুটের খবর রাখি?’

বাণিজ্য মেলায় নগর পরিবহনের বাস চলছে জানালে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য মেলায় চলবে কেন? বাণিজ্য মেলার যাত্রীদের নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেয়া সরকারের এজেন্ডা এবং আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সিনিয়র ডিরেক্টর, জিএমরা রাস্তায় তদারকি করছেন। আর কী করতাম বলেন? আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন
বিআরটিসির ড্রাইভার যাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। ছবি: নিউজবাংলা

বিআরটিসির চালকেরা মোড়ে মোড়ে বাস থামিয়ে টিকিট ছাড়া যাত্রী তুলছেন। এ তথ্য জানানোর পর বিআরটিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘পুরো বিষয়টি দেখার জন্য আমাদের সিনিয়র লেভেলের কর্মকর্তাদের কমিটি করে পাঠাচ্ছি। এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট সামারাইজ করে আমরা বুঝতে পারব কোথায় কোথায় আমাদের গ্যাপ আছে। আপনার তথ্য পজিটিভলি আমলে নিচ্ছি।’

‘এখানে হরিলুট চলছে’

ঢাকা নগর পরিবহনের কার্যকলাপে ক্ষুব্ধ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি নগর পরিবহন পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, টিকিটের টাকাটাই শুধু কোম্পানি পায়। এর বাইরে টিকিটবিহীন যাত্রী তুলে অনেক বড় অংকের টাকা চালক এবং সহযোগী ভাগাভাগি করে নিয়ে নেয়। ইতোমধ্যে আমি বিআরটিসির চেয়ারম্যানকেও এ বিষয়ে অভিযোগ করেছি।

‘এমনকি আমি যে গাড়িগুলোতে ভ্রমণ করেছি, তার পাঁচটা ভিডিও চেয়ারম্যানকে আমার মোবাইল থেকে করে পাঠিয়েছি। তিনি আমাকে বলেন- ভিডিও দেখে কিছু বুঝতেছেন না। এখানে একটা হরিলুট চলছে। প্রকল্পটি ধ্বংস করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করা হচ্ছে।’

মোজাম্মেল বলেন, ‘নগর পরিবহনের পরিণতি হবে- তারা বলবে যে আমরা চেষ্টা করেছি। এই নগরীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না। আর এমনটা বলে কোনো একদিন তারা এই প্রকল্প বন্ধ করে দেবে।

‘যাত্রীদের কাছ থেকে এখনও যে পরিমাণ টাকা কালেকশন হয় তাতে লোকসান হওয়ার কথা না। যেখানে মালিক সমিতির একটা ভয়ঙ্কর ঐক্য গড়ে উঠেছে সেখানে নগর পরিবহন টেকা দায়।’

আরও পড়ুন:
নাইকো মামলা: খালেদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি ১৭ জানুয়ারি
৬ মাস ধরে পার্কে ঝড়ে ভাঙা গাছ
ঋণ নিতে ‘বাড়তি খরচ দিতে হয় তাকে’
সোনালী ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ: ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলবে
গরিবের ভাতার ৫০০ টাকা ‘চেয়ারম্যানের পকেটে’

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Actresss cigarette fire explosion in the shooting house?

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ?

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ? অভিনেত্রী শারমিন আঁখি। ফাইল ছবি
অভিনেত্রী আঁখির স্বামী রাহাত কবির টেলিফোনে নিউজবাংলাকে জানান, আঁখি তাকে জানিয়েছেন যে চুল আয়রন করার জন্য সকেটে হেয়ার স্ট্রেইটনার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে বৈদ্যুত্যিক গোলযোগের আলামত মেলেনি। সেখানে হেয়ার স্ট্রেইটনারও পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর পল্লবীতে শনিবার দুপুরে একটি শুটিং হাউজে বিস্ফোরণের ঘটনায় অভিনেত্রী শারমিন আঁখি দগ্ধ হন। এতে অভিনেত্রীর শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে যায়। তিনি শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।

ঘটনার পর অভিনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, শুটিং হাউজের ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুত্যিক সংযোগের শর্ট সার্কিট থেকে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

তবে প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, বাথরুমে জমে থাকা কোনো ধরনের গ্যাসের সংস্পর্শে সিগারেটের আগুন থেকে এই বিষ্ফোরণ। ঘটনাস্থলে কোনো বৈদ্যুত্যিক শর্ট সার্কিটের আলামত পাওয়া যায়নি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন, একাধিক ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং নানা আলামত বিশ্লেষণ করে নিউজবাংলাও। তাতে পুলিশের ধারণার যথার্থতার প্রমাণ মিলেছে।

মিরপুরের পল্লবী এলাকার শুটিং হাউজটির তৃতীয় তলার ভাড়া করা ফ্লোরে চলছিল একটি টেলিফিল্মের শুটিং। প্রথম দিনের শুটিংয়ের এক ফাঁকে বেলা পৌনে ২টার দিকে অভিনেত্রী শারমিন আখিঁ মেকআপ রুমে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এমন সময় বিকট শব্দে বিষ্ফোরণ হয়। দগ্ধ অবস্থায় মেকআপ রুম থেকে আর্তনাদ করতে করতে বেরিয়ে আসেন অভিনেত্রী। ঘটনার আকষ্মিকতায় উপস্থিত হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। দ্রুতই অভিনেত্রীকে হাসপাতালে পাঠান তার হাউজ মালিক ও সহকর্মীরা।

কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি হাউজ ও শুটিং-সংশ্লিষ্ট কেউই।

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ?
বিস্ফোরণের ধাক্কায় বাথরুমের দরোজা ভেঙে বাইরের দিকে এসে পড়ে। ছবি: নিউজবাংলা

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি নিউজবাংলাকে জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে অভিনেত্রী শারমিন আঁখি মেকআপ রুমে মেকআপ নেয়া শেষ করেন। তখন তার পোশাক পাল্টানোর কথা ছিল বলে সঙ্গে থাকা মেকআপ আর্টিস্ট রুম থেকে বেরিয়ে যান। ফলে ওই সময় অভিনেত্রী ছাড়া মেকআপ রুমে আর কেউ ছিলেন না। এর কিছুক্ষণ পরই বিস্ফোরণের শব্দ হয় এবং দগ্ধ অবস্থায় মেকআপ রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আসেন আঁখি।

রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, তৃতীয় তলার মেকআপ রুমের সঙ্গে একটি বাথরুম ও পোশাক পাল্টানোর জন্য পৃথক আরেকটি কক্ষ রয়েছে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় বাথরুমের দরজা ভেঙে মেকআপ রুমের ভেতরে এসে পড়ে। আর বাথরুমের এক্সজস্ট ফ্যান ভেঙে ভবনের বাইরে গিয়ে পড়ে।

এতে স্পষ্ট যে বিস্ফোরণের কেন্দ্র ছিল বাথরুম। তবে অক্ষত ছিল বাথরুমের আয়না, বেসিন। ওই বাথরুমে কোনো বৈদুত্যিক সকেট লাগানো নেই, যার সাহায্যে কোনো বৈদ্যুত্যিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব। অন্যদিকে অক্ষত আছে বাথরুমের একমাত্র বৈদ্যুত্যিক বাতিটিও। পুরনো ভবন হওয়ায় বাথরুমের দেয়ালের বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে মোজাইক। তাছাড়া ওই বাথরুম বা মেকআপ রুমের আশপাশে কোনো রান্নাঘর বা গ্যাসের সংযোগও নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শুটিং-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নিউজবাংলাকে জানান, বিস্ফোরণের সময় ভবনে কোনো বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়নি। বরং ঘটনার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ছুটে গিয়ে বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে দেন।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে টেলিফোনে কথা হয় হাউজ মালিক ইরফান হাইউমের সঙ্গে। তিনি নিউজবাংলাকে জানান, তিন মাস আগে ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা ভাড়া নিয়ে শুটিং হাউজ নির্মাণ করেন। এই টেলিফিল্ম শুটিয়ের প্রথম দিনেই এমন ঘটনা ঘটলেও আরও আগে থেকেই নিয়মিত শুটিংয়ের কাজ চলছে তার হাউজে। কখনও এমন দুর্ঘটনা ঘটেনি।

কীভাবে এমন ঘটনা ঘটলো তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ধারণাই নেই। আমি এখনও শকের মধ্যেই আছি। ঘটনার সময় আমি পাশের রুমেই ছিলাম। হঠাৎ মেকআপ রুমে বিস্ফোরণের শব্দ শুনলাম। ছুটে গিয়ে দেখি অভিনেত্রী চিৎকার করে মেকআপ রুম থেকে বেরিয়ে আসছেন। আমরা তাকে বাথরুমে নিয়ে গায়ে পানি ঢেলে গাড়িতে করে হাসপাতালে পাঠাই।

‘ভবনে যেন আগুন না লাগে সেজন্য মেইন সুইচ বন্ধ করে দিই। ফোন করে পুলিশকে জানাই। এখন কীভাবে এমন ঘটনা ঘটলো তা আমার জানা নেই। পুলিশ তদন্ত করছে, তারাই বের করবে কী ঘটেছিল।’

অভিনেত্রীর সিগারেটের আগুনে শুটিং হাউজে বিস্ফোরণ?

বাঁ থেকে- শুটিং হাউজে বিস্ফোরণের পর ক্ষতিগ্রস্ত বাথরুম, মেঝেতে পড়ে থাকা গ্যাস লাইটার ও পোড়া সিগারেটের অংশবিশেষ। ছবি: নিউজবাংলা

বিস্ফোরণের পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পল্লবী থানা পুলিশ। সে সময় মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজ এখন নিউজবাংলার হাতে। তাতে দেখা যায়, বাথরুমের মেঝেতে একটি অক্ষত লাইটার ও সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে। বেসিনের ওপর রাখা আছে একটি সিগারেটের প্যাকেট। এতে বুঝা যায় ঘটনার আগে কেউ বাথরুমে সিগারেট জ্বালিয়েছিলেন। আর সে সময় মেকআপ রুম ভেতর থেকে বন্ধ করে অভিনেত্রী পোশাক পাল্টান। পুলিশের ধারণা অভিনেত্রী নিজেই সিগারেট জ্বালিয়েছিলেন।

জানতে চাইলে অভিনেত্রীর স্বামী রাহাত কবির টেলিফোনে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমিও ওই ফ্লোরে ছিলাম। ঘটনার সময় আমি পাশের রুমে ছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে জানায় সে পোশাক পরিবর্তনের আগে চুল আয়রন করার জন্য সকেটে হেয়ার স্ট্রেইটনার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে এই বিস্ফোরণ ঘটে। তবে আমার স্ত্রী বাথরুমে নাকি মেকআপ রুমে স্ট্রেইটনার কানেক্ট করেছিলেন, তা তার ঠিক মনে নেই।

‘তবে সে এটুকু নিশ্চিত করে বলেছে যে, স্ট্রেইটনার কানেক্ট করার সঙ্গে সঙ্গে রুমের বাতি স্পার্ক করে। এরপরই বিস্ফোরণ ঘটে। আমার ধারণা শুটিং হাউজটি যেহেতু নতুন রং করা, তাই রংয়ের গ্যাস জমা ছিল। সেখানে স্ট্রেইটনারের কানেকশন দেয়ার পরই স্পার্ক থেকে এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।’ স্ত্রী ধূমপায়ী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার স্ত্রী ধূমপায়ী। কিন্তু তার বাথরুমে বসে ধূমপান করার কোনো কারণ নেই। একই সঙ্গে বাথরুমে যে ব্র্যান্ডের সিগারেট মিলেছে সে ওই ব্র্যান্ডের সিগারেট খায় না।’

তবে প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে কোনো বৈদ্যুত্যিক গোলযোগের আলামত পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অভিনেত্রী যে হেয়ার স্ট্রেইটনারের কথা বলছেন সেটিও ঘটনাস্থলে মেলেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে হাউজ মালিক ফোন করে জানালে আমরা তাৎক্ষণিক ছুটে যাই। এ বিষয়ে অভিনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না করা হলেও আমরা অভিনেত্রী ও তার স্বামীর বক্তব্য নিয়েছি। তাদের বিবরণ অনুযায়ী বিস্ফোরণের স্থানটিতে শর্ট সার্কিটের আলামত মেলেনি।

‘আমরা যা পেয়েছি তা হল, বাথরুমে কোনো গ্যাস জমে ছিল। পরে সেখানে কেউ সিগারেট ধরাতে লাইটার জ্বালালে এই বিস্ফোরণ ঘটে।’

বাথরুমে গ্যাস কোথা থেকে জমা হল এবং কে সিগারেট ধরিয়েছিল তা জানতে চাইলে পারভেজ ইসলাম বলেন, ‘এটি তদন্ত শেষ না হলে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।’

থানা-সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র বলছে, অভিনেত্রী আঁখি সম্ভবত বাথরুম ব্যবহারের আগে সেখানে কোনো সুগন্ধি স্প্রে করেছিলেন। পরে হাই কমোডে বসেই সিগারেট ধরাতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আর সে কারণে অভিনেত্রীর দুই উরু, দুই হাতের কনুই পর্যন্ত ও মুখমণ্ডলের কিছু অংশ দগ্ধ হয়েছে।

তাছাড়া বাথরুমে অন্য কোনো গ্যাস জমা থাকার বিষয়টি পুলিশের ধারণায় থাকলেও এর সম্ভাবনা খুব একটা নেই বলে মনে করছে ওই সূত্র। তাদের যুক্তি, এদিন সকাল থেকে অনেকেই সেই বাথরুম ব্যবহার করেছেন এবং এগজস্ট ফ্যান থাকায় লম্বা সময় ওই বাথরুমে গ্যাস জমা থাকা সম্ভবও নয়।

আরও পড়ুন:
শুটিং স্পটে দগ্ধ অভিনেত্রী আঁখি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Bag did not catch the porter wages why?

‘ব্যাগ ধরেইনি, কুলি মজুরি কেন?’

‘ব্যাগ ধরেইনি, কুলি মজুরি কেন?’ গাবতলী বাস টার্মিনালের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজির রসিদ। ছবি: নিউজবাংলা
মেহেরপুর থেকে আসা বাসযাত্রী সনু বিশ্বাস বলেন, ‘আমি টাকা দেব না বললে আমার ব্যাগ আমাকেই নিতে দিচ্ছে না। এমনকি আমি যেসব সিএনজি অটোরিকশ ডাকছি সে প্রতিটিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটা তো ওপেন চাঁদাবাজি ভাই। যে আমার ব্যাগ ধরেইনি, আমি কেন তাকে কুলি মজুরি দেব?’

‘বাসের বাঙ্কার থেকে ব্যাগটা নামিয়ে পাশের ফুটপাতে রাখার সঙ্গে সঙ্গে এই লোক কোথা থেকে এসে একটা রসিদ ধরিয়ে বলে ৪০ টাকা দেন। কাগজটা পড়ে দেখি এটা কুলি মজুরির রসিদ। অথচ আমি কোনো কুলি ডাকিনি এবং আমার ব্যাগ অন্য কেউ বহনও করেনি।’

রাজধানীর মিরপুর মাজার রোড এলাকায় পূর্বাশা বাস কাউন্টারের সামনে কথাগুলো বলছিলেন মেহেরপুর থেকে আসা বাসযাত্রী সনু বিশ্বাস।

এই প্রতিবেদক তার আগে দেখতে পান যে রাফি ট্রেডার্স লেখা অ্যাপ্রন পরিহিত এক যুবক বাস যাত্রী সনু বিশ্বাসের সঙ্গে কী একটি বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন।

এগিয়ে গিয়ে কারণ জানতে চাইলে ওই যাত্রী বলেন, ‘আমি এসেছি মেহেরপুর থেকে। আমার ব্যাগ ছিল বাসের বাঙ্কারে। তেমন ভারি ব্যাগ নয় যে কুলি ডাকতে হবে। আমি নিজে বাঙ্কার থেকে ব্যাগ নামিয়েছি। এখন একটা সিএনটি অটোরিকশা ডেকে বাসায় চলে যাব। এর মাঝে তারা কোনো কারণ ছাড়াই এসে টাকা দাবি করছে।

‘আমি টাকা দেব না বললে সে আমার ব্যাগ আমাকেই নিতে দিচ্ছে না। এমনকি আমি যাওয়ার জন্য যেসব সিএনজি অটোরিকশ ডাকছি সে প্রতিটিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটা তো ওপেন চাঁদাবাজি ভাই। যে আমার ব্যাগ ধরেইনি, আমি কেন তাকে কুলি মজুরি দেব?’

এ বিষয়ে সোহেল নামে রাফি ট্রেডার্সের ওই কর্মীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে আমরা এই এলাকা ইজারা নিয়েছি। এই এলাকার ফুটপাত আর রাস্তায় ব্যাগ রাখলে আমাদের টাকা দিতে হবে।’

এই ঘটনা রোববার দুপুরের। এর ঘণ্টাখানেক আগে একই স্থানে এমন চাঁদাবাজির শিকার হন খন্দকার বশির উদ্দিন মিলন নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাড়ি ঝিনাইদহ। সেখান থেকে পূর্বাশা পরিবহনের বাসে আমার পরিবার দুটি ব্যাগ পাঠিয়েছে। আমি সেই ব্যাগ নিতে এসেছি। বাস থেকে ব্যাগ নামিয়ে আমি সিএনজিতে উঠাতে গেলে এক লোক এসে হাতে রসিদ ধরিয়ে দিয়ে দুই ব্যাগ বাবদ ৮০ টাকা দাবি করে বসে।

‘আমি কোনো কুলিকে ডাকিনি। এমনকি আমার ব্যাগ তুলতে কেউ সাহায্যও করেনি। অথচ এই রাফি ট্রের্ডাসের লোক আমার কাছ থেকে জোর করে ৮০ টাকা নিয়ে গেল। প্রথমে আমি টাকা দেব না বললে সে আশপাশ থেকে আরও ৩-৪ জনকে ডেকে আমাকে মারতে আসে। পরে নিরুপায় হয়ে তাদের টাকা দিয়ে দিলাম।’

আরেক ভুক্তভোগী ইসহাক আলী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘মেয়রের নামে চাঁদাবাজি! ঢাকা শহরে ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে মেয়রকে চাঁদা না দিয়ে শহরে ঢোকা যাবে না। আমি তাদেরকে চাঁদা না দিয়ে গাড়ি ভাড়া করার যতবার চেষ্টা করেছি ততবার সেই গাড়ি তারা ভাঙতে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ব্যাগ প্রতি ৪০ টাকা হিসাবে দুইটা ব্যাগে ৮০ টাকা দিয়ে মাজার রোড থেকে বাসায় ফিরতে পেরেছি।’

রোববার ও আগের কয়েকদিন সরেজমিনে গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে এমন আরও অনেক যাত্রীর কাছ অভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা এসব বিষয়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান।

আবার কুলি মজুরির নামে এই চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে জানালেন টার্মিনালের বিভিন্ন কাউন্টারে দায়িত্বরত কর্মীরা। তারা বলেন, ইজারা নেয়া প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের কাছ আমরাও জিম্মি। আমাদেরও সব পরিষেবা বিল তাদের কাছেই জমা দিতে হয়।

ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কর্তৃপক্ষও কুলি মজুরির নামে রাফি ট্রেডার্সের এই চাঁদাবাজি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। জানে পুলিশ প্রশাসনও। তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন:
চাঁদাবাজি মামলায় চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
অপহরণ-চাঁদাবাজি: সাঁথিয়া ছাত্রলীগ সেক্রেটারিসহ গ্রেপ্তার ৫
হাইওয়ে পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’, চালকদের মহাসড়ক অবরোধ
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটুনি
বরিশালের অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Extortion if you have a bag with you at Gabtali terminal

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’ রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল এলাকায় বাস থেকে ব্যাগ নিয়ে নামলেই চাঁদার রসিদ নিয়ে হাজির ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের লোকজন। ছবি: নিউজবাংলা
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাস থেকে ব্যাগ হাতে নামলেই হাতে কুলি মজুরির রসিদ নিয়ে সামনে হাজির হয় ইজারাদার প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের অ্যাপ্রন পরা কর্মীরা। নিজের ব্যাগ নিজে বহন করলেও চাঁদা না দিয়ে উপায় নেই। পুলিশ, ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিএনসিসি কাউকেই পরোয়া করে না ওরা।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ট্রেন ও বাস স্টপেজগুলোতে যাত্রীর ব্যাগ-বোচকা নিয়ে কুলি-মজুরদের টানাটানি নতুন কিছু নয়। গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে দেয়ার বিনিময়ে জবরদস্তি অতিরিক্ত টাকা আদায়ও গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই বলে বাস থেকে নিজের ব্যাগটা নামিয়ে রাস্তায় রাখলেই চাঁদা দিতে হবে!

রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রকাশ্যে এবং দোর্দণ্ড প্রতাপে এমন চাঁদাবাজি চলছে। গাবতলী টার্মিনাল হয়ে বাসে কোনো গন্তব্যে যেতে বা আসতে হাতে ব্যাগ থাকলেই চাঁদা না দিয়ে নিস্তার নেই।

রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার গাবতলী হয়ে দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আসা-যাওয়া করা যাত্রীদের কাছ থেকে কুলি মজুরির নামে এই চাঁদাবাজি করে এই বাস টার্মিনালের ইজারাদার রাফি ট্রেডার্স।

বাড়তি ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, সময়ক্ষেপণ, পরিবহনকর্মীদের আপত্তিকর আচরণে এমনিতেই দিশেহারা বাসযাত্রীরা। এবার তাতে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে এই চাঁদাবাজি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গাবতলী এলাকায় বাসে উঠা-নামার পর যাত্রীদের ব্যাগ না ধরেই তাদের কাছ থেকে জোরজবস্তি ব্যাগ প্রতি ৪০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে রাফি ট্রেডার্সের কর্মীরা। এ নিয়ে প্রতিদিনই যাত্রীদের সঙ্গে রাফি ট্রেডার্সের কর্মীদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে তা হাতাহাতিতেও গড়াচ্ছে।

গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় নিউজবাংলার সরেজমিন অনুসন্ধানে এই চাঁদাবাজির সত্যতা মিলেছে। ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের এক কর্মকর্তা প্রথমে এমন চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে এর সত্যতা স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

তবে বাস্তবতা হলো, এই চাঁদাবাজদের কাছে পুলিশও যেন অসহায়। ওদের সঙ্গে পেরে না উঠে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে প্রতিকার চেয়েছেন।

রোববার দুপুরে মিরপুর মাজার রোড এলাকায় পূর্বাশা বাস কাউন্টারের সামনে গিয়ে চোখে পড়ল এক যাত্রীর সঙ্গে ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের অ্যাপ্রন পরা এক কর্মী তর্ক করছেন।

জানা গেল, সনু বিশ্বাস নামে ওই যাত্রী মেহেরপুর থেকে এসেছেন। তার কাছ থেকে জোর করে কুলি মজুরি বাবদ ৪০ টাকা আদায় করাকে কেন্দ্র করে এই বিতণ্ডা।

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’
গাবতলী বাস টার্মিনালে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের কার্যালয়। ছবি: নিউজবাংলা

সনু বিশ্বাস বলেন, ‘আমি বাসের বাঙ্কার থেকে ব্যাগ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে এই লোক কোথা থেকে এসে একটা রসিদ ধরিয়ে বলে, ৪০ টাকা দেন। পরে কাগজটা পড়ে দেখি এটা কুলি মজুরির রসিদ। অথচ আমি কোনো কুলি ডাকিনি এবং আমার ব্যাগ অন্য কেউ বহনও করেনি।’

এ বিষয়ে সোহেল নামে রাফি ট্রেডার্সের ওই কর্মীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে আমরা এই এলাকা ইজারা নিয়েছি। এই এলাকার ফুটপাত আর রাস্তায় ব্যাগ রাখলে আমাদের টাকা দিতে হবে। আর আপনি ঝামেলা করতাছেন ক্যান? আপনি এইখান থ্যইক্যা যান।’

আপনার বস কে- এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুজন নামে একজনকে দেখিয়ে দেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে সুজন বলে ওঠেন, ‘এসব রিপোর্ট করে আপনি আমাদের কিছুই করতে পারবেন না। ওই যে নাবিল বাস কাউন্টারের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে। আপনার যা জানার সেটা আপনি ওই চায়ের দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন।’

এরপর ওই চায়ের দোকানদারের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি নিজেকে শাহীন নামে পরিচয় দেন। চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। গাবতলী বাস টার্মিনালের দ্বিতীয় তলায় আমাদের অফিস আছে। আপনি সেখানে গিয়ে কথা বলেন।’ গাবতলী বাস টার্মিনালের দ্বিতীয় তলায় রাফি ট্রেডার্সের অফিসে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।

সনু বিশ্বাসের মতো আরও বেশ কয়েকজন বাস যাত্রী কুলি মজুরির নামে এভাবে গাবতলী বাস টার্মিনালে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন।

তাদের একজন খন্দকার বশির উদ্দিন মিলন নিউজবাংলাকে বলেন, পূর্বাশা পরিবহনের বাস থেকে ব্যাগ নামিয়ে সিএনজিতে উঠাতে গেলে এক লোক এসে রসিদ ধরিয়ে দিয়ে দুই ব্যাগ বাবদ ৮০ টাকা দাবি করে। অথচ আমি কোনো কুলিকে ডাকিনি। আমার ব্যাগ তুলতে কেউ সাহায্যও করেনি। অথচ এই রাফি ট্রের্ডাসের লোক আমার কাছ থেকে জোর করে ৮০ টাকা নিয়ে গেল।

ইসহাক আলী নামে আরেক ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘মেয়রের নামে চাঁদাবাজি! শেষ পর্যন্ত ব্যাগ প্রতি ৪০ টাকা হিসাবে দুইটা ব্যাগে ৮০ টাকা দিয়ে মাজার রোড থেকে বাসায় ফিরতে পেরেছি।’

প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি

গাবতলী বাস টার্মিনালে এক কাউন্টারের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এরা মাফিয়া কায়দায় এই বাস টার্মিনাল চালায়। কেউ এদের কিছু বলে না। বাস টার্মিনালসহ পর্বত সিনেমা হল থেকে মাজার রোড পর্যন্ত পুরা এলাকা এই রাফি ট্রেডার্সের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে। এই এলাকায় কোনো যাত্রী ফুটপাত অথবা ফুটপাতের পাশে রাস্তায় কোনো ব্যাগ রাখলেই ওদেরকে টাকা দিতে হয়।

‘আমরা আমাদের কাউন্টারের ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিচ্ছন্ন বিলসহ এ বাবদ সে বাবাদ সব টাকাই এদের হাতে দিই। অথচ এরা এই বাস টার্মিনাল পরিষ্কার কী করে সেটা আপনারাই দেখেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই টার্মিনালসহ সামনের রাস্তায় এদের একশ’র বেশি কর্মী থাকে সব সময়। এর মধ্যে রাফি ট্রের্ডাসের নাম লেখা ড্রেস পরে থাকে ৩০-৪০ জন। বাকিরা সাধারণ মানুষের মতো থাকে। এই ড্রেস পরা কর্মীরা যাত্রীদের কুলি মজুরি রসিদ ধরিয়ে দিয়ে চাঁদাবাজি করে। এরা যাত্রীদের ছোট ব্যাগে ৪০ টাকা আর বিদেশ থেকে আসা যাত্রীর ব্যাগ প্রতি নেয় ১২০ টাকা।

‘এরা লক্ষ্য রাখে যে যাত্রীদের ব্যাগে বিমানবন্দরের কোনো ট্যাগ লাগানো আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে সেই যাত্রীর আর রক্ষা নেই। ব্যাগ প্রতি ১২০ টাকা আদায় করে ছাড়ে। কোনো যাত্রী টাকা দিতে না চাইলে সাধারণ মানুষের বেশে থাকা ওদের বাকি সদস্যরা গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে ঝামেলা বাধিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে গায়ে হাত তুলে বসে।

‘অনেক সময় যাত্রীরা আমাদের কাছে অভিযোগ করে। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই। কিছু বললে তো আমরাই এখানে থাকতে পারব না।

আরেক কাউন্টারের এক কর্মীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনিও পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘রাফি ট্রেডার্সের ড্রেস পরা কর্মীরা নামে কুলি হলেও এদের কাউকে দিয়ে আপনি কোনো মালামাল উঠাতে পারবেন না। এই ৩০-৪০ জনের একেক জন ১০ হাজার টাকার উপরে চাঁদাবাজির করে আয় করে।

‘সব মিলিয়ে দিনে তারা ৩-৪ লাখ টাকার চাঁদাবাজি করে। এদের কাউকেই রাফি ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে বেতন দেয়া হয় না। এরা চাঁদাবাজির কমিশন পায়। তাছাড়া এই টাকা পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে উপর মহলেও যায় বলে শুনেছি। তাই তারাও সব কিছু দেখে না দেখার ভান করে।’

রাফি ট্রেডার্সের এই চাঁদাবাজি নিয়ে মাজার রোড়ে কর্তব্যরত পুলিশ সার্জেন্ট রাফিউল ইসলাম রাফির সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তিনি বলেন, ‘এই রাফি ট্রেডার্স ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসি) কাছ থেকে পুরো গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা ইজারা নিয়েছে। আমরাও যাত্রীদের ব্যাগ বহন না করে জোর করে টাকা নেয়ার অভিযোগ পাই। এ বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সব জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যাত্রীরা এভাবে একের পর এক হয়রানির শিকার হলেও কেউ এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করে না। তাই আমরা কিছু করতে পারি না। এরা টাকা দাবি করলে সাধারণ মানুষ ঝামেলা এড়াতে টাকা দিয়ে চলে যায়। আমাদেরও কিছু জানায় না।’

সাধারণ মানুষ মামলা না করলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে আপনারা কেন এই চাঁদাবাজি বন্ধ করছেন না?- এমন প্রশ্নে তিনি কোনও উত্তর দেননি।

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’
ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের চাঁদাবাজির উল্লেখ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লেখা সহকারী ব্যবস্থাপকের চিঠির অনুলিপি।

গাবতলী বাস টার্মিনালের প্রধান কর্তৃপক্ষ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক (গাবতলী বাস টার্মিনাল) মোহাম্মাদ জাহিদ হাসান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি যাত্রীদের কাছ থেকে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য চাঁদাবাজির অভিযোগ পাই। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর চিঠি দিয়ে সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন দেখি স্যারেরা কী সিদ্ধান্ত নেন।’

ডিএনসিসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে রাফি ট্রেডার্সকে ইজারা দেয়ার সময় বেশকিছু শর্ত দেয়া হয়। তার মধ্যে ২২ নম্বর শর্ত- কোনো যাত্রী সামান্য মালামাল উঠানো বা নামানোর জন্য কুলির সাহায্য না চাইলে কোনো কুলি ওই মালামাল স্পর্শ করা বা মজুরি দাবি করতে পারবে না। ওরা এই শর্ত ভঙ্গ করেছে।’

ডিএনসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ সেলিম রেজা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাফি ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে আমরাও এই অভিযোগ পেয়েছি। এর আগেও আমরা তাদের সতর্ক করেছি। এখন আমরা তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছি।

‘এখনও যদি তারা এই কাজ করে তাহলে সিরিয়াসলি তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় এ ধরনের কুলি মজুরির রসিদ দিয়ে চাঁদাবাজি করার কোনো সুযোগ নেই।’

ইজারাদার রাফি ট্রেডার্স যা বলছে

রাফি ট্রের্ডাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) লিয়াকত হোসেন সবুজ নামে এক ব্যক্তি। নিউজবাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে রাফি ট্রেডার্সের প্রজেক্ট ডিরেক্টর সাইফুল ইসলাম শ্রাবণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এমন চাঁদাবাজি হাওয়ার তো কথা না। আমাদের এখানকার কর্মীরা কোনো যাত্রীর মালামাল বহন করা নিয়ে জোরজবরদস্তি করে না। এরকম করার নিয়মও এখানে নেই। যাদের কুলির প্রয়োজন হয় শুধু তাদের কাছ থেকেই আমাদের কর্মীরা টাকা নেয়।’

যাত্রীদের অভিযোগ, উত্তর সিটি করপোরেশনের চিঠিসহ নিউজবাংলার কাছে এই চাঁদাবাজি চলার বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ আছে জানালে শ্রাবণ বলেন, ‘আসলে কি, এরকম দুই/একটা ঘটনা হয়তো ঘটতে পারে। ওরা লেবার মানুষ তো। অনেক কিছুই হয়তো ওরা করে ফেলে। এর আগেও আমরা ওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা সব সময়ই ওদের মনিটরিংয়ে রাখি। তারপরও আমি খোঁজ নিচ্ছি, যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে ব্যবস্থা নেব।’

আরও পড়ুন:
চাঁদাবাজি মামলায় চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
অপহরণ-চাঁদাবাজি: সাঁথিয়া ছাত্রলীগ সেক্রেটারিসহ গ্রেপ্তার ৫
হাইওয়ে পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’, চালকদের মহাসড়ক অবরোধ
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটুনি
বরিশালের অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
E ticketing Anarchy reduced fares not reduced on roads

ই-টিকেটিং: নৈরাজ্য কমেছে ভাড়ায়, কমেনি সড়কে

ই-টিকেটিং: নৈরাজ্য কমেছে ভাড়ায়, কমেনি সড়কে ই-টিকেটিং চালুর পর ভাড়ায় নৈরাজ্য কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, ‘আলিফ এবং শিকড় পরিবহনে আমি নিয়মিত চলাচল করি। ই-টিকেটিং চালু হওয়ার পরে এই দুই বাসের ভাড়া কমেছে, কিন্তু তারা টিকিট দিতে উদাসীন। অনেক সময় কনডাক্টর ইচ্ছা করে বাসের দরজা থেকে ভেতরে আসেন না। নামার সময় তাড়াহুড়ো করে টাকা রেখে দেন, কিন্তু টিকিট দেন না।’

রাজধানীতে ই-টিকেটিং চালুর উদ্দেশ্য ছিল দূরত্ব অনুযায়ী বাস ভাড়া নিশ্চিত, নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে যাত্রী ওঠানামা এবং এক বাসের সঙ্গে আরেকটির রেষারেষি বন্ধ করা।

ই-টিকেটিংয়ের আওতাধীন বিভিন্ন রুটে বাস ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য কিছুটা কমেছে, তবে বাকি দুই সমস্যা থেকেই গেছে।

গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বাসে ই-টিকেটিং চালু করে। এর আওতায় চলাচল করা রুটে প্রথমে কাউন্টারে টিকিটের ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে কাউন্টার উঠিয়ে বাসে টিকিট কাটার ব্যবস্থা করা হয়, তবে টিকিটের গায়ে দূরত্ব লেখা না থাকায় ন্যায্য ভাড়া নেয়া হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে অনেক যাত্রীর।

কাউন্টার উঠিয়ে দেয়ার কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষ জানায়, কাউন্টার থেকে পাওয়া টাকা ব্যানার মালিকরা বাসমালিকদের ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেন না। তাদের দুর্নীতির কারণে বাসমালিকরা লাভ পেতেন না। তাই বাসের মধ্যে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়।

রাজধানীতে ৯৬টি বাস রুটের মধ্যে ৪৬টিতে চলছে ই-টিকেটিং। চলতি মাসের শেষে অথবা আগামী মাসের শুরুতে আরও ১৭ রুটকে ই-টিকেটিংয়ের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে বাসমালিক সমিতি।

ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ঢাকার ৯৬ রুটকে ই-টিকেটিংয়ের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।

ই-টিকেটিংয়ের আওতায় চলাচল করা বেশ কয়েকটি রুটে ঘুরে দেখা যায়, যাত্রীদের ই-টিকিট দিতে অনীহা কনডাক্টরদের। অনেক যাত্রীদের মধ্যেও উদাসীনতা আছে টিকিট নিয়ে। আবার অনেক যাত্রীকে চেয়ে চেয়ে টিকিট নিতে হয়েছে।

একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, না চাইলে কনডাক্টররা টিকিট দেন না। বাসের রেষারেষি রয়েই গেছে। এ ছাড়া যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হয়। এমনকি চলন্ত রাস্তার মাঝখানে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী তোলা হয়।

মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, ‘আলিফ এবং শিকড় পরিবহনে আমি নিয়মিত চলাচল করি। ই-টিকেটিং চালু হওয়ার পরে এই দুই বাসের ভাড়া কমেছে, কিন্তু তারা টিকিট দিতে উদাসীন। অনেক সময় কনডাক্টর ইচ্ছা করে বাসের দরজা থেকে ভেতরে আসেন না। নামার সময় তাড়াহুড়ো করে টাকা রেখে দেন, কিন্তু টিকিট দেন না।’

‘শুধু ভাড়াই কমেছে, কিন্তু বাসে সেই আগের বিশৃঙ্খলা রয়েই গেছে।’

কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে উত্তরা রুটে চলাচল করা প্রজাপতি ও পরিস্থান পরিবহনেও একই চিত্র দেখা যায়।

এ রুটে চলাচলকারী ইয়াসিন মোল্লা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রথম থেকেই এই রুটে ই-টিকেটিং চালু হয়। প্রথম দিকে যখন কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে উঠতাম, তখন একটা শৃঙ্খলা ছিল। পরে ই-টিকিট বাসের ভেতরে কাটা শুরু হলে সেই আগের মতোই রেষারেষি শুরু হয়।’

তিনি বলেন, ‘এখন তো ড্রাইভারের সঙ্গে চিল্লাপাল্লা করতে হয় নিয়মিত। তারা বাস থামিয়ে মিনিটের পর মিনিট বসে থাকে। যখন একই রুটে পেছনে আরেকটা বাস আসে, তখন শুরু হয় রেষারেষি।

‘মাঝে মাঝে এক বাসের চালক আরেক বাসকে ধাক্কাও দেয়। যে কারণে ই-টিকেটিং চালু করা, সেটা ফলপ্রসূ হয়নি।’

এই রেষারেষির কারণ অবশ্য বাসের মালিকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অনেক রুটের বাসমালিক চুরি ঠেকাতে এখন চুক্তিতে গাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রজাপতি ও পরিস্থান পরিবহনের অন্তত সাতজন বাসমালিকের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। এই দুই পরিবহনের বাস চলে চুক্তিতে। এ ছাড়া অন্য রুটের অনেক বাসই চলে চুক্তিতে।

তাদের একজন বলেন, ‘যখন কাউন্টারে ই-টিকিট দেয়া হতো, তখন ব্যানার মালিকরা দুর্নীতি করে টাকা মেরে দিত। পরে বাসের ভেতরে টিকিট দেয়া শুরু হলে কনডাক্টর ভাড়ার টাকা নিয়ে টিকিট দিত না। আর টিকিট না দিলে মেশিনে টাকার পরিমাণ উঠত না। বেলা শেষে আমরা টাকা পেতাম না।

‘এখন প্রতিদিন আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে চুক্তিতে তাদের গাড়ি ভাড়া দিই। আমাদের বাসপ্রতি আড়াই হাজার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে সব খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, সেটা ড্রাইভার ও কনডাক্টরের লাভ।’

অর্থাৎ বাস মালিকদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, টিকিট নামে মাত্র। বাকি সব আগের নিয়মেই চলছে।

সব বাস চুক্তিতে না চললেও চুরি ও নৈরাজ্য রয়েই গেছে। বিকাশ পরিবহনের তিনটি বাসের মালিক মো. কাওসার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাস চুক্তিতে চলে না। আমাদের কোম্পানি থেকে বলা আছে সবাইকে টিকিট দিতে হবে, তবে তারা মাঝে মাঝে টিকিট দেয় না, এটা আমরা জানি। কয়েক দিন ই-টিকেটিং চালু হয়েছে। আশা করছি কয়েক দিন গেলে ঝামেলা দূর হবে।’

যাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের দায়িত্ব নিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। প্রতিদিন দেড় শ টাকা মেশিন ভাড়া দিই। এটা তো আর এমনি এমনি দেব না।’

ভাড়ার বিষয়টা কিছুটা সমাধান হলেও বাকি দুই বিষয়ে এখনও বিশৃঙ্খলা রয়ে গেছে বলে স্বীকার করে নেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আগে যাত্রীদের থেকে অধিক ভাড়া আদায় করা হতো। ই-টিকেটিং চালু করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভাড়ার নৈরাজ্য ঠেকানো। শতভাগ ভাড়ার নৈরাজ্য ঠেকানো না গেলেও ম্যাক্সিমাম নৈরাজ্য বন্ধ হয়েছে।’

বাসের রেষারেষি এখনও আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনও যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো হচ্ছে। এই ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর ৯৭ রুটে ই-টিকেটিংয়ের আওতায় আনার কাজ শেষ হবে। পরবর্তী সময়ে এই দুই বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করব। পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে আমরা ব্যবস্থা নেব। এ ছাড়া লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলো চলাচল বন্ধ করব।’

কিছু কিছু রুটে চুক্তিতে বাস চলছে স্বীকার করে তিনি যাত্রীদের টিকিট নেয়ার বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন।

এসব বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ভাড়া নির্ধারণের যে শর্ত আছে, সেই শর্তে না চলে যদি বাস চুক্তিতে চলে, তাহলে পরিবহনের শৃঙ্খলা, রেষারেষি এবং ভাড়ার নৈরাজ্য কোনোভাবেই বন্ধ হবে না। তার আগে চালকের স্বচ্ছ নিয়োগ ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে।

‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সঠিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে যেন তৃতীয় পক্ষের হাতে টাকা না যায়। ই-টিকেটিং তার অন্যতম একটা হাতিয়ার ছিল।’

তিনি বলেন, ‘গণপরিবহনে যদি নগদ লেনদেন বন্ধ না থাকে, ভাড়ার নৈরাজ্য কমবে না। দেশ উন্নত হচ্ছে, কিন্তু পরিবহন খাত উন্নত হচ্ছে না। ভাড়া আদায়ের পরে মালিকের পকেটে পৌঁছাবে কি না, এটা নিয়ে যদি চিন্তা করা লাগে, তাহলে র‍্যাপিড পাসের প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিবহনে নগদ লেনদেন বন্ধ করা গেলে এ খাতের মানোন্নয়ন হবে।’

আরও পড়ুন:
এলিফ্যান্ট রোডে বাসচাপায় বৃদ্ধার মৃত্যু
দেশের প্রতিটি নাগরিকের হেলথ কার্ড থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
রাজধানীতে ৭১১ বাসে ই-টিকেটিং চালু মঙ্গলবার
নতুন বছরেও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা
বগুড়ায় জমি নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৫০

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Auto driver by day thief by night

দিনে অটোচালক, রাতে চোর

দিনে অটোচালক, রাতে চোর মোটরসাইকেল চোর চক্রের মূলহোতা মো.জসিম ও তার সহযোগীর। ছবি: নিউজবাংলা
গত ডিসেম্বরে মিরপুর মডেল থানাধীন একটি বাসা থেকে দুটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তদন্তে নেমে মোটরসাইকেল চোর চক্রের মূলহোতা মো.জসিম ওরফে বাইক জসিমের সন্ধান পায় পুলিশ।

দিনে রাজধানীর মিরপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন মাদারীপুর শিবচরের বেলদারহাট গ্রামের বাসিন্দা মো. জসিম। রাতে চুরি করতেন মোটরসাইকেল। এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় তার নাম হয় বাইক জসিম। সম্প্রতি নারায়নগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ।

পুলিশ জানায়, জসিমের ২০ সদস্যের একটি দল রয়েছে। এ দল জসিমের নেতৃত্বে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল চুরি করে আসছে। গত দশ বছরে পাঁচ শতাধিক মোটরসাইকেল চুরি করেছেন জসিম।

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোহাম্মদ মহসীন জানান, গত ডিসেম্বরে মিরপুর মডেল থানাধীন একটি বাসা থেকে দুটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তদন্তে নেমে মোটরসাইকেল চোর চক্রের মূলহোতা মো.জসিম ওরফে বাইক জসিমের সন্ধান পায় পুলিশ। পরে গত ১৪ জানুয়ারি তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর মোটরসাইকেল চোর চক্রের আরও চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে চারটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছ ।

মিরপুর থানার ওসি বলেন, ‘জসিমের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় কমপক্ষে ১২ টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সে ১০ বার জেল খেটেছেন। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। ’

আরও পড়ুন:
গরু ব্যবসায়ীর ১৩ লাখ টাকা চুরি, কারাগারে বন্ধুবেশী ‘চোর’
গুনে দেয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে পালাল প্রতারক
চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল হাফিজারের
বিদ্যালয়ের ১৪ ল্যাপটপ চুরি
গরুচোর আতঙ্ক শেরপুরে

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The meter is not a money laundering factory

মিটার তৈরি নয়, টাকা পাচারের ফ্যাক্টরি ‘বেসিকো’

মিটার তৈরি নয়, টাকা পাচারের ফ্যাক্টরি ‘বেসিকো’ খুলনার মোহাম্মদনগরে বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানির (বেসিকো) একমাত্র ফ্যাক্টির ও মূল কার্যালয়। ছবি: নিউজবাংলা
বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানির (বেসিকো) অনিয়ম-দুর্নীতির ডালপালা ছড়িয়েছে চারপাশে। ভিত্তিহীন বাজেট তৈরি, মালামাল ক্রয়ে সরকারি নিয়ম অমান্য, স্বাক্ষর স্ক্যান করে বোর্ড সভার ভুয়া কার্যবিবরণী তৈরি, ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি, সার্কুলার ছাড়া নিয়োগ, জাল স্বাক্ষরে ব্যাংক থেকে টাকা হন্তান্তর, সর্বোপরি মিটার ক্রয়ের জন্য চুক্তিবহির্ভূত ও মিথ্যা ডিক্লারেশনে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে কোম্পানিটি।

দেশের বিদ্যুৎ খাত ডিজিটালাইজেশনে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সংযোজনে কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে বেশ আগেই। এই মিটার তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানিকে (বেসিকো)। কিন্তু সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি সে পথে হাঁটেনি। তারা মিটার তৈরি না করে চীন ধেকে আমদানি করে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ চালিয়ে দিয়েছে।

আর রেডিমেইড মিটার আমদানির জন্য ব্যাংকে যে অংকের এলসি খোলা হয়েছে, সেই সংখ্যক মিটার বা যন্ত্রাংশ দেশে আসেনি। মিটার ক্রয়ের জন্য চুক্তিবহির্ভূত ও মিথ্যা ডিক্লারেশনে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে কোম্পানিটি।

বেসিকোর অনিয়ম-দুর্নীতির ডালপালা ছড়িয়েছে চারপাশে। ভিত্তিহীন বাজেট তৈরি, মালামাল ক্রয়ে সরকারি নিয়ম অমান্য, স্বাক্ষর স্ক্যান করে বোর্ড সভার ভুয়া কার্যবিবরণী তৈরি, ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি, সার্কুলার ছাড়া নিয়োগ, ফ্যাক্টরি ও আবাসিক ভবনের ভাড়ার টাকা আত্মসাৎ, জাল স্বাক্ষরে ব্যাংক থেকে টাকা হন্তান্তরসহ লাগামহীন দুর্নীতির কারণে গত দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে কোম্পানিটি।

তবে কোম্পানি বন্ধ থাকলেও দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিদ্যুৎ খাতকে ডিজিটালাইজেশনের জন্য স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সংযোজনে ব্যয় সাশ্রয় করতে ২০১৮ সালে দেশেই মিটার তৈরির নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) পক্ষ থেকে খুলনায় মিটার তৈরির কারখানা তৈরির প্রস্তাব করা হয়।

২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর নিবন্ধিত হয় কোম্পানি। এর ৫১ শতাংশ মালিকানা ওজোপাডিকো এবং ৪৯ শতাংশ চায়না হেক্সিংয়ের। শুরুতে কোম্পানির নাম ছিল বাংলাদেশ স্মার্ট প্রিপেইড কোম্পানি। পরে নামকরণ হয় বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি। ২০২০ সালে শুরু হয় বাণিজ্যক কার্যক্রম। এক বছরের মাথায় ধারাবাহিক অনিয়মের কারণে কোম্পানি বন্ধ রাখে পরিচালনা পর্ষদ।

শর্ত ভঙ্গ করে রেডিমেইড মিটার আমদানি

বেসিকোর মিটার তৈরির ব্যাপারে ২০১৯ সালের ৩০ মে তৎকালীন বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়, ‘মিটার অবশ্যই বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল করে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।‘

২০২০ সালে ওজোপাডিকোর আওতাধীন যশোর এলাকায় ৬৯ হাজার ১৬০টি মিটার সরবরাহের অর্ডার পায় বেসিকো। এর বিপরীতে ওই বছরের ৫ ও ১৪ মে দুটি এলসি খুলে ২০ লাখ ১১ হাজার ৬৬০ ডালারের বিনিময়ে চীন থেকে রেডিমেইড মিটার আমদানি করা হয়। সরবরাহের সময় সেই মিটারে ‘সার্টিফিকেট অফ কান্ট্রি অফ অরিজিন’-এ বলা হয়, ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড বা আস ইন বাংলাদেশ’। এর মাধ্যমে সরাসরি শর্ত ভঙ্গ করা হয়।

দেশে স্মার্ট মিটারের যন্ত্রাংশ আমদানিতে ১০ শতাংশ ও রেডিমেইড মিটার আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। বেসিকোর আমদানি করা রেডিমেইড মিটারের জন্য ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়েছে, যাতে আর্থিকভাবে লোকসান হয় বেসিকোর।

২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর বেসিকো থেকে ওজোপাডিকোতে পাঠানো পত্রে দেখা যায়, শর্ত ভঙ্গ করে তারা চীন থেকে সরাসরি মিটার আমদানি করেছে।

ওজোপাডিকো সূত্র জানায়, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (ওটিএম) ওইসংখ্যক মিটার কিনলে তাদের প্রায় ১৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সাশ্রয় হতো।

সেবা খাতের ক্রয়ে কোটি কোটি টাকা পাচার

২০২০ সালের ২৫ অক্টোবরে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঢাকার গুলশান শাখায় একটি এলসি খোলে বেসিকো। ওজোপাডিকোর সঙ্গে মিটার বিক্রির চুক্তিতে বিভিন্ন সেবা খাতের জন্য এই এলসি খোলা হয়।

ওই এলসির এক নম্বর ছিল এমডিএম ও হেস (এইচইএস) সিস্টেম সফটওয়্যার বাবদ ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকার। তবে ওই সফট্যাওয়ারটি ওজোপাডিকোর কাছে বিক্রির জন্য বেসিকো চুক্তি করেছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা এলসি করে চীনে পাচার করা হয়েছে।

হেস সিস্টেম হলো বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটারের ডাটা মূল সার্ভারে পাঠানোর একটি সফটওয়্যার। যদিও ইতোপূর্বে এ ধরনের সফটওয়্যার আইডিয়াল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ওজোপাডিকোকে মাত্র ৫৮ লাখ ৬২ হাজার টাকায় সরবরাহ করেছিল। এই সফট্যাওয়ারটি পুনরায় কেনার জন্য ওজোপাডিকোর বোর্ড সভায় কখনও অনুমোদন করা হয়নি। তারপরও বেসিকোর সঙ্গে সফটওয়্যারটি কেনার জন্য চুক্তি করে ওজোপাডিকো।

বেসিকো’র পক্ষ থেকে ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকায় হেস সিস্টেম আমদানি দেখানোতে ঢাকা কাস্টমস অথরিটি ভ্যাট বাবদ ৬ কোটি ২০ লাখ টাকার চাহিদা ইস্যু করে। এর ফলে মাত্র ৫৮ লাখ ৬২ হাজার টাকার একটি হেস সিস্টেম কিনতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

শুধু তাই নয়, বেসিকো থেকে ওই হেস সিস্টেমটি ওজোপাডিকোকে সরবরাহ করার পর সোর্স কোডসহ যাবতীয় ডাটাবেজ হস্তান্তর করা হয়নি। এ কারণে হেস সিস্টেমে কোনো ত্রুটি হলে ওজোপাডিকোর কিছুই করার থাকবে না। তবে আইডিয়াল ইলেক্ট্রনিক এন্টারপ্রাইজ থেকে যে হেস সিস্টেমটি ওজোপাডিকোকে সরবরাহ করা হয়েছিল, তার সঙ্গে সোর্স কোড ও ডাটাবেজ হস্তান্তর করা হয়েছিল।

২০২১ সালের ২৪ অক্টোবরে ওজোপাডিকোর প্রি-পেইড মিটারিং প্রকল্পের পরিচালকের এক পত্রে বলা হয়েছে, বেসিকোর হেস সিস্টেমের সোর্স কোড, ডাটা ফ্লো ডায়াগ্রাম, ডাটাবেজসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি।

ওই এলসির দুই নম্বরে রয়েছে হেস সিস্টেম স্টেস্টিং ও ইনস্টলিং বাবদ ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। যদিও হেস সিস্টেমের সঙ্গে স্টেস্টিং ও ইনস্টলিং যুক্ত থাকে। আলাদা করে এই খাতে অর্থ নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ টাকার পুরো অংশই পাচার হয়েছে।

এলসির তিন নম্বরে রয়েছে প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট সার্ভিস বাবদ ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। যদিও ওজোপাডিকোর সঙ্গে বেসিকোর চুক্তিতে এ বাবদ কোনো অর্থের উল্লেখ নেই। বেসিকো তার নিজস্ব টেকনিক্যাল লোকবল দিয়ে মিটার স্থাপন ও ফ্যাক্টরিতে উৎপাদনের কথা ছিল। যারা টেকনিকাল পার্সন হিসেবে চীন থেকে এসেছেন তারা বেসিকো থেকে বেতন নিয়ে কাজ করেছেন। ফলে এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো অর্থ দেয়ার সুযোগ নেই। এভাবে পুরো টাকাটাই পাচার হয়েছে।

এলসির চার নম্বরে রয়েছে বিদেশ প্রশিক্ষণ বাবদ ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। যদিও এ খাতে ওজোপাডিকোর সঙ্গে বেসিকোর চুক্তি ছিল ৪২ লাখ টাকা। তবে বাস্তবে ওজোপাডিকোর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়নি। এভাবে প্রশিক্ষণের নামেও বিদেশে টাকা পাচার করা হয়েছে।

এলসির পাঁচ নম্বরে রয়েছে মিটারের তিন বছর ওয়ারেন্টি বাবদ ৭ কোটি ২২ লাখ টাকা। ভুল অজুহাতে এ খাতের টাকাটাও বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

এলসির ছয় নম্বরে রয়েছে হেস সিস্টেম তিন বছরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তবে এই বাবদ ওজোপাডিকোর সঙ্গে বেসিকোর চুক্তি ছিল ৩২ লাখ টাকা। সে হিসাবে অতিরিক্ত ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ব্যাংকে এই এলসি খোলা হয়েছিল বেসিকোর অর্থ পরিচালক আব্দুল মোতালেব ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ে ওয়েনজুনের যৌথ স্বাক্ষরে। তবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছেড়ে যান ওয়েনজুন। বাংলাদেশে তার অনুপস্থিতিতেই ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি এলসিগুলোর বিল দেয়া হয় তার জাল স্বাক্ষরে।

এছাড়াও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) সঙ্গে ২০২০ সালের ১১ জুন বেসিকোর ২০ হাজার মিটার বিক্রির চুক্তি হয়। এ চুক্তির বিভিন্ন সেবা খাত দেখিয়ে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের খুলনা শাখা থেকে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার এলসি খোলা হয়। তার মধ্যে ছিল মিটার ইন্টিগ্রেশন, প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, মিটার ওয়ারেন্টি ও ট্রেনিং; যাতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল না। এমনকি মিটার ক্রয়ের জন্য এসব খাতে অর্থ প্রদানের সুযোগ নেই।

এসব টাকা পাচার না হলে বেসিকোর ৩৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বেশি লাভ হতো।

ওজোপাডিকোর এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এই অর্থ পাচারের সঙ্গে বেসিকোর অর্থ পরিচালক আব্দুল মোতালেব এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ে ওয়েনজুন ও রুলং ওয়াংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব অর্থ পাচার করে তারা মানি লডারিং-এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

আমদানির পরিবহন খাতেও অর্থ পাচার

বেসিকোর পক্ষ থেকে মোট এক লাখ ৯০ হাজার মিটার বা তার যন্ত্রাংশ আমদানির পরিবহন খরচ বাবদ বিভিন্ন সময়ে প্রিমিয়ার ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে এলসি খোলা হয়েছে। এ বাবদ মোট টাকা ব্যায় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। তবে ওজোপাডিকোর নীরিক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যক মিটার আমদানিতে পরিবহন বাবদ ৩৭ লাখ টাকার বেশি কোনোভাবেই খরচ হতে পারে না। এখান থেকেও কমপক্ষে এক কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।

দুই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন দামে মিটার বিক্রি

ওজোপাডিকো ও ডিপিডিসি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) বেসিকো’র কাছ থেকে মিটার কিনেছে। তবে বেসিকো প্রতিটি সিঙ্গেল ফেজ মিটার ডিপিডিসিকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় ও ওজোপাডিকোকে ৫ হাজার ৮৮৯ টাকায় বিক্রি করেছে। সে হিসাবে ডিপিডিসি থেকে ওজোপাডিকো’র কাছে মিটার প্রতি এক হাজার ৩৮৯ টাকা করে বেশি নিয়েছে।

সূত্র জানায়, ওজোপাডিকো বেসিকোর কাছ থেকে এক লাখ ৬৬ হাজার প্রি-পেইড মিটার ক্রয় করেছে। এই হিসাবে বেসিকো অতিরিক্ত লাভ করেছে ২৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। যদিও বেসিকো লাভ বাবদ তাদের বাজেট দেখিয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

ওজোপাডিকোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই লাভের টাকার একটি বড় অংশই চীনে পাচার করা হয়েছে।

ভিত্তিহীন বাজেট প্রণয়ন

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেসিকোর ৭তম বোর্ড সভায় যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল তার বাস্তবসম্মত ভিত্তি নাই। যথাযথভাবে বাজেট প্রণয়ন করলে বেসিকোর ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা টাকা লাভ হতো। অথচ তাদের লাভ দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। বাজেটে তারা মালামাল ক্রয়ে যথাযথ অনুমোদন নেয়নি। কারণ তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থ পাচার।

মালামাল ক্রয়ে সরকারি নিয়ম অমান্য

বেসিকো সরকারি কোম্পানি হিসেবে ওজোপাডিকো ও ডিপিডিসিকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) মিটার সরবরাহ করেছে। তবে এসব মিটার বা যন্ত্রাংশ ক্রয়ে বেসিকো সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) অনুসরণ করেনি। বরং বেসিকোর শেয়ারের অংশীদার হেক্সিং থেকে বিভিন্ন মালামাল বেশি দামে কেনা হয়েছে।

বেসিকোর ৫১ শতাংশ মালিক ওজোপাডিকো। আর বেসিকোর ব্যবস্থাপনায় ওজোপাডিকো’র কর্মকর্তারা থাকা সত্ত্বেও হেক্সিংয়ের স্বার্থ সুরক্ষা হয়েছে।

নিয়োগে অনিয়ম

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোন ধরনের নিয়ম নীতি না মেনে নিজেদের ইচ্ছামতো কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে বেসিকোতে। এক্ষেত্রে নিয়োগের কোনো সার্কুলার দেয়া হয়নি। নিজেদের পছন্দের লোকবল নিয়োগের জন্য জীবন বৃত্তান্ত সংগ্রহ করে মেধা তালিকা প্রস্তুত করা হলেও তার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়নি। অনেকে মেধা তালিকা প্রস্তুতের পরীক্ষায় হাজির না হয়েও নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া এই নিয়োগের ব্যাপারে বোর্ডের কোনো অনুমোদন নেই।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

খুলনার রূপসা সেতুর বাইপাস সড়কের মোহাম্মদনগর এলাকার মৃধা কমপ্লেক্সে বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানির (বেসিকো) একমাত্র ফ্যাক্টির ও মূল কার্যালয়। সম্প্রতি ফ্যাক্টির ঘুরে দেখা গেছে পিনপতন নীরবতা। মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া সেখানে কেউ নেই।

বেসিকোর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিক উদ্দিন ২০২২ সালের ২ মে অবসরে যান।

বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফিজুল বারী বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানটি হলো অর্ডার বেইজড কোম্পানি। কিছুদিন আগে ডেসকো থেকে কিছু অর্ডার পেয়েছিলাম। তা সরবরাহ হয়ে গেছে। সামনে কিছু অর্ডার পেতে পারি। সেই প্রস্তুতি চলছে।’

কোম্পানিটির আগের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি নিয়ে তিনি কথা বলতে চাননি। প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘দেখুন সে সময়ে আমি ছিলাম না। আর সে সম্পর্কে কিছু জানলেও বলতে চাই না।’

ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্বের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে আমি অবগত আছি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থার কার্যাবলী প্রক্রিয়াধীন।’

বেসিকো’র বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, ‘কোম্পানিটি সচল রাখতে আমরা কিছু অর্ডার দেয়ার পরিকল্পনা করেছি। ওই অর্ডারগুলো পেলে তাদের কর্মকাণ্ড সচল হবে।’

মন্তব্য

p
উপরে