× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট

বাংলাদেশ
In the investigation report information about the effect of Chinu
hear-news
player
print-icon

তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক এমপি চিনুর প্রভাব খাটানোর তথ্য

তদন্ত-প্রতিবেদনে-সাবেক-এমপি-চিনুর-প্রভাব-খাটানোর-তথ্য
রাঙ্গামাটির ডিসি বাংলো পার্ক। ফাইল ছবি
রাঙ্গামাটির ডিসি বাংলো পার্ক আরেকজনের নামে বরাদ্দ নিয়ে প্রকারান্তরে এটির দখলদার হয়ে বসেন নাজনীন আনোয়ার নিপুণ। রাঙ্গামাটির সাবেক এমপি ফিরোজা বেগম চিনুর মেয়ে হওয়ার প্রভাব খাটিয়ে পার্কটি ব্যবহারের শর্তও ভঙ্গ করেন তিনি। পুলিশের বিশেষ শাখা ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে এর প্রমাণ মেলে।

রাঙ্গামাটির ডিসি বাংলো পার্ক অবৈধভাবে দখল করে রাখার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। দুই বছরের জন্য অন্য একজনের নামে পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত সময়ের পরও তা দখলে রেখেছিলেন নাজনীন আনোয়ার নিপুণ। তিনি রাঙ্গামাটির সাবেক সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনুর মেয়ে।

২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে মোহাম্মদ হোসেন নামে একজনকে বার্ষিক ৩৬ হাজার টাকা ভাড়া চুক্তিতে পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ১৩টি শর্তে দুই বছরের জন্য এই অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন।

আরেকজনের নামে বরাদ্দ নিয়ে প্রকারান্তরে পার্কটির দখলদার হয়ে বসেন নাজনীন আনোয়ার নিপুণ। নাজনীন ও তার সঙ্গীরা পার্কটি ব্যবহারে প্রায় সব শর্ত ভঙ্গ করেন। পুলিশের বিশেষ শাখা ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে এর প্রমাণ মেলে।

প্রতিবেদন দুটির কপি নিউজবাংলার হাতে এসেছে। তাতে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ৯ আগস্ট রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক বরাবর তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেন একই জেলার সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বোরহান উদ্দিন মিঠু।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, মাদকমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং পার্কটি সাধারণ জনগণের ব্যবহার উপযোগী করে উন্মুক্ত রাখার নিমিত্ত অবৈধ পাইরেটস দোকানটি অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’

এর প্রায় এক মাস পর ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ডিআইজি (রাজনৈতিক) বরাবর একটি প্রতিবেদন জমা দেন রাঙ্গামাটি জেলার বিশেষ শাখার পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবীর।

তাতে বলা হয়, ‘সার্বিক বিবেচনায় বলা চলে যে, পার্কটি আবাসিক এলাকায় ও জেলা প্রশাসকের বাংলোর সৌন্দর্য্যের অংশ হওয়ায় রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার কোনোভাবে সমীচীন হবে না।’

জেলা প্রশাসন ও এসবির পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার প্রায় তিন মাস পর ৩ ডিসেম্বর ডিসি বাংলো পার্কে অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয় স্থানীয় একটি অনলাইন পোর্টালে।

ফজলে এলাহী সম্পাদিত পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডটকম নামের ওই পোর্টালে ‘রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের পাইরেটস বিড়ম্বনা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনে এই ডিসি বাংলো পার্কের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়।

ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি ফিরোজা বেগম চিনুর কন্যা নাজনীন আনোয়ার নিপুণ নিয়ম লঙ্ঘন করে ডিসি বাংলোর পার্ক এলাকায় ‘পাইরেটস’ নামে একটি রেস্তোরাঁ গড়ে তোলেন। জেলা প্রশাসন পরে উচ্ছেদের নোটিশ দিলে খোদ জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধেই মামলা করেন নিপুণ।

নিপুণের অনিয়মের পেছনে তার মা ফিরোজা বেগম চিনুর প্রভাব রয়েছে বলেও দাবি করা হয় প্রতিবেদনে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাঙ্গামাটির কোতোয়ালি থানায় ১২ ডিসেম্বর সাংবাদিক ফজলে এলাহীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন চিনুর কন্যা নিপুণ। পরদিন ১৩ ডিসেম্বর চিনু আরেকটি অভিযোগ করেন।

পুলিশ অভিযোগ তদন্তের অনুমতি চাইলে ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুমতি দেয় আদালত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই মামলায় সর্বশেষ চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল পরোয়ানা জারি করলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফজলে এলাহীকে গ্রেপ্তার করে রাঙ্গামাটি থানা পুলিশ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছেন রাঙ্গামাটির সাবেক এমপি ফিরোজা বেগম চিনু।

ফজলে এলাহী গ্রেপ্তার হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে ফিরোজা বেগম চিনু নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন- মেয়ের নয়, তার করা মামলাতেই সাংবাদিক এলাহীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ডিসি বাংলো পার্কে আমার মেয়ে লিজ নিয়ে রেস্টুরেন্ট দেয়। তিন বছরের জন্য লিজ ছিল, বিনিয়োগ করেছিল প্রায় ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ডিসি পরিবর্তন হলে রেস্টুরেন্ট নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়। ডিসি অফিসের লোকজনের সঙ্গে রেস্টুরেন্ট কর্মচারীদের বিবাদ হয়।

‘সে সময় এলাহী নিউজ করে যে এই লিজ পেতে আমি আমার প্রভাব খাটিয়েছি। সে আপত্তিকর কথাবার্তা লিখেছে। আমি তখন কোর্টে মামলা করেছি।’

গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় মেয়ের নাম থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের নাম কেন দিয়েছে জানি না, বাদী আমি-ই।’

গ্রেপ্তারের পরদিন বুধবার সাংবাদিক ফজলে এলাহীকে জামিন দিয়েছে আদালত। জেলার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক ফাতেমা বেগম মুক্তা তাকে জামিনের আদেশ দেন।

বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিক ফজলে এলাহী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের করা প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক। জেলা প্রশাসন, এসবির রিপোর্ট এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের সমন্বয়ে প্রতিবেদনটি করা হয়। প্রতিবেদনে কোনো অসত্য তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।’

যা আছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে

২০২০ সালের ৯ আগস্ট রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জেলা প্রশাসক বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

‘ডিসি বাংলো পার্ক গেটের তালা ভেঙে অবৈধভাবে প্রবেশ সম্পর্কিত তদন্ত প্রতিবেদন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে-

‘অদ্য ০৭/০৮/২০২০ তারিখ বনরূপা এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালীন ফোনের মাধ্যমে অবগত হই যে, ডিসি বাংলো পার্কের পেছনের গেটের দুটি তালা ভেঙে কে বা কারা জোরপূর্বক প্রবেশ করে। মোবাইল কোর্ট টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখতে পাই, পার্কের পেছনের গেটের দুটি তালা ভাঙা। অর্থাৎ ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। এ সময় এসআই সাগর বড়ুয়া ও কনস্টেবল জাকারিয়া উপস্থিত ছিলেন।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘পার্কে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ও স্থানীয় লোকজনের বক্তব্য নেয়া হয়। পার্কে পাইরেটস দোকানে অবৈধভাবে অবস্থানকারী মো. ইরফান হুসেন বলেন- গত ০৬/০৭/২০২০ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ ঘটিকায় সাবেক সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনুর মেয়ে নিপুণ ম্যাডাম আমাকে পার্কের পেছনের গেটের দুটি তালা ভেঙে ফেলতে বলেন। আমি আর জয় (পাইরেটস দোকানে অবৈধভাবে অবস্থানকারী আরেকজন) তালা ভেঙে ফেলি। পরে নিপুণ ম্যাডাম প্রবেশ করেন।

‘ডিসি বাংলো পার্ক সংলগ্ন মসজিদের ইমাম মো. রুকনোজ্জামান জানান, পাইরেটস দোকানে প্রতিরাতে বিভিন্ন লোকজনের সমাগম হয়, তারা গভীর রাতে গেট টপকে ভেতরে প্রবেশ করে এবং দোকানে হৈ-হুল্লোড় করতে থাকে। এলাকার কিছু বখাটে ছেলে গভীর রাতে দোকানে আড্ডা জমায় এবং মদ, গাঁজা সেবন করে। গেটে তালা থাকায় বিভিন্ন সময় তা ভাঙার হুমকি দেয়া হয়। এভাবে পরিবেশ নষ্ট করে ফেলছে। স্থানীয় লোকজনও একই কথা বলেছেন।

‘প্রসঙ্গত, ডিসি বাংলো পার্কটি রাঙ্গামাটিবাসী ও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিন দর্শনার্থীদের জন্য একটি বিশ্রামাগার ও শৌচাগার নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে পার্কের কিছু স্থাপনা পরিবর্তনসহ অবৈধভাবে পাইরেটস দোকান নির্মাণ করা হয়। এমনকি সাবেক জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে নির্মিত বিশ্রামাগার উদ্বোধন ফলকটিও ভেঙে ফেলা হয়। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, মাদকমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং পার্কটি সাধারণের ব্যবহার উপযোগী করে উন্মুক্ত রাখার জন্য অবৈধ পাইরেটস দোকানটি অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া পারে।’

যা আছে এসবির প্রতিবেদনে

২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি এসবির পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবীর ডিসি বাংলো পার্ক নিয়ে এসবির ডিআইজি (রাজনৈতিক) বরাবর একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

এসবির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়-

‘অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৮/১২/২০১৭ তারিখে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার সাহিদা আক্তার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে ১৩টি শর্তে রাঙ্গামাটির কোতোয়ালি থানার দেবাশীষ নগরের মো. হোসেনকে বার্ষিক ৩৬ হাজার টাকা ভাড়ায় দুই বছরের জন্য পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়।

পার্কটি মো. হোসেনের নামে অনুমোদন নিয়ে পক্ষান্তরে নাজনীন আনোয়ার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছেন। করোনা মহামারির কারষে ডিসি বাংলো পার্কটি বর্তমানে বন্ধ আছে।

পার্কটি বন্ধ হওয়ার আগে এখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কয়েকটি ঘটনা ঘটে। যেমন-

১. গভীর রাত পর্যন্ত পার্কটি খোলা রাখা হতো। সে কারণে সেখানে মাদক বিক্রি ও সেবনের মতো ঘটনা ঘটে এবং ওঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা সেখানে রাত অবধি ভিড় করত। ১৪/০৮/২০১৯ তারিখ রাতে ১০/১২ জন উচ্ছৃঙ্খল বখাটে যুবক সেখানে আইন-শৃঙ্খলাবহির্ভূত ঘটনা ঘটায়।

২. গভীর রাত পর্যন্ত যুবক ছেলেরা মোটর সাইকেলসহ এখানে অবস্থান করত এবং লেকসংলগ্ন কুঁড়েঘরে মাদক সেবন করে মাতলামি ও হুল্লোড় করতো।

৩. গোপন সূত্রে জানা যায় যে, পার্কের পাইরেটস রেস্টুরেন্টের ভেতরে নারীসহ অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপ সংঘটিত হতো।

৪. অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বরাদ্দের সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও জেলা প্রশাসক পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি বিভিন্ন কারণে বাতিল করতে পারছেন না। যেমন- রাজনৈতিক প্রভাব, জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা।

৫. পার্কটি জেলা প্রশাসক ও পর্যটকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু সেটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেয়ায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নষ্টসহ জেলা প্রশাসকের বাংলোর ঐতিহ্য ও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা মোটেও কাম্য নয়।

৬. উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা গভীর রাত পর্যন্ত পার্কে উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করায় আশপাশের বাসিন্দাদের শান্তির ব্যাঘাত ঘটতো।

৭. পার্ক ব্যবহারের মেয়াদ পার হওয়ার পরও ব্যবহারকারীরা প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে অন্যায় ও বেআইনিভাবে পার্কটি দখলে রাখায় উল্লিখিত কার্যকলাপের কারণে প্রশাসনের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। জেলা পুলিশও বিভিন্ন প্রশ্ন ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে।

৮. সার্বিক বিবেচনায় বলা চলে যে, পার্কটি আবাসিক এলাকায় ও জেলা প্রশাসকের বাংলোর সৌন্দর্য্যের অংশ হওয়ায় রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার কোনোভাবে সমীচীন হবে না।

পার্ক এখন কার দখলে?

ডিসি বাংলো পার্কটি বর্তমানে জেলা প্রশাসনের দখলে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পার্কটি নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান। তবে পার্কটি এখন জেলা প্রশাসনের দখলে রয়েছে এবং পার্কটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত আছে।

তবে নাজনীন আনোয়ার নিপুণ বলেন, ‘পার্কটির লিজ নবায়নের জন্য নির্ধারিত সময় পার হওয়ার একদিন আগেই আবেদন করেছিলাম। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা ওই আবেদন জেলা প্রশাসক গ্রহণ করেননি। আবার বাতিল করেও দেননি। সেই জায়গা থেকে পার্কটি এখনো আমাদের রয়েছে।’ নিপুণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা চারজন পার্টনার মিলে এই পার্ক ভাড়ার বিনিময়ে লিজ নেয়ার আবেদন করি। এই চারজনের দুজন চট্টগ্রামের বাসিন্দা এবং আমি ও মোহাম্মদ হোসেন রাঙ্গামাটির। আমিও যেহেতু চট্টগ্রামে থাকি, তাই লিজ নেয়ার সময় আবেদন করা হয়েছিল মোহাম্মদ হোসেনের নামে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক আমাদের দুই বছরের জন্য লিজ দিয়েছিলেন।

‘আমরা কী কী কাজ করবো এর একটা প্রস্তাবনাও দিয়েছিলাম। সেই প্রস্তাবনা অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করি। পার্কের সৌন্দর্য্য আরও বাড়তো, আমাদের সে পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যে জেলা প্রশাসক বদলি হয়ে যান। দায়িত্বে আসেন এ কে এম মামুনুর রশীদ। তিনি কোনোভাবেই আমাদের কাজ করতে দিচ্ছিলেন না। পদে পদে বাধা দিয়েছেন।

‘এদিকে কোভিড চলে আসে। আমরা পার্কের সৌন্দর্য্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেই। জাহাজ আকৃতির একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করি, যা আমাদের প্রস্তাবনায় ছিল। কিন্তু জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ কোনো কাজই করতে দিচ্ছিলেন না। আমাদেরকে ব্যবসা করতেও দিচ্ছিলেন না। কোভিডের পর আমরা খুলতে গেলে বাধা দেয়া হয়। মিথ্যা-বানায়োট মামলা দেয়া হয়।’

নিপুণ আরও বলেন, ‘আমরা এসব বিষয় নিয়ে রাঙামাটিতে সংবাদ সম্মেলন করি। সেই সংবাদ সম্মেলনের কয়েকদিন পরই ফজলে এলাহী ও আরেকজন সাংবাদিক মিলে আমাদের বিরুদ্ধে নিউজ করেন। নিউজে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মানহানিকর শব্দ ও তথ্য ব্যবহার করেন। আমরা তার পরিপ্রেক্ষিতেই আইন ব্যবস্থা নিয়েছি।’

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল চান এলাহী
ফজলে এলাহীর প্রতি যাতে অন্যায় না হয় ‘দেখবেন’ তথ্যমন্ত্রী
এরশাদ আমলে আমিও সাংবাদিক ছিলাম: সাবেক এমপি চিনু

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Another chemical responsible for the Sitakunda depot fire

সীতাকুণ্ডে ডিপোর আগুনে দায়ী ‘অন্য রাসায়নিক’

সীতাকুণ্ডে ডিপোর আগুনে দায়ী ‘অন্য রাসায়নিক’ সীতাকুণ্ডের ডিপোতে আগুন ও বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত ৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ছবি: এএফপি
ডিপোতে অন্য রাসায়নিক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্মার্ট গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেখানে অন্যদেরও কনটেইনার ছিল। সেসব কনটেইনারে অনুমতি ছাড়া অন্য পণ্যের আড়ালে কোনো কেমিক্যাল ছিল কি না আমাদের জানা নেই।’

সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুন ও বিস্ফোরণে অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক শ মানুষ।

প্রায় ৮৭ ঘণ্টা জ্বালিয়ে বুধবার দুপুরের দিকে নেভে কনটেইনার ডিপোর আগুন।

আগুন-বিস্ফোরণের মাত্রা কেন এতটা ভয়াবহ হলো সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে নিউজবাংলা।

ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে রপ্তানির উদ্দেশ্যে ডিপোতে কনটেইনারে মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করে ফায়ার সার্ভিস। তারা বলছে, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আগুনের তাপের সংস্পর্শে আসায় ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধান বলছে, ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছাড়াও অন্য কোনো রাসায়নিকের মজুত থাকতে পারে। প্রথম দিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সেই রাসায়নিককে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ওই রাসায়নিকের কারণে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম দলটি অপেক্ষাকৃত ছোট মাত্রার আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়। পরে আগুনের তাপ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কনটেইনার পর্যন্ত পৌঁছালে ধারাবাহিকভাবে ছোট-মাঝারি ও বড় অন্তত ১০টি বিস্ফোরণ ঘটে।

একাধিক ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে আগুন লাগার শুরুর দিকের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে নিউজবাংলা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, শনিবার ডিপোর শেডে একটি কনটেইনার থেকে তুলা আনলোড করা হচ্ছিল। এর বাম দিকে প্রায় ৫০০ ফুট দূরে শেডের মাঝ বরাবর পাশাপাশি ও একটার ওপর আরেকটি এভাবে ৩৭টি কনটেইনার আলাদা করে রাখা ছিল। বেশ কয়েক দিন আগে ডিপোতে আনা এসব কনটেইনারে রপ্তানির উদ্দেশ্যে রাসায়নিক মজুত করা ছিল।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কয়েকজন কাভার্ড ভ্যানচালক পাশের ৩৭টি কনটেইনারের মধ্যে সবচেয়ে নিচে বাম দিক থেকে দ্বিতীয় কনটেইনারের ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখেন। তারা ডিপোর নিরাপত্তাকর্মীদের বিষয়টি জানান।

ডিপোতে আগুন লাগা থেকে বিস্ফোরণ ঘটা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে ছিলেন কাভার্ড ভ্যানচালক আলী আহমেদ। বিস্ফোরণে তিনি নিজেও আহত হন।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম দুপুর ১২টায়। মূলত ঢাকা থেকে রপ্তানির জন্য তৈরি পোশাক নিয়ে গিয়েছিলাম ওই দিন। ডিপোর উত্তর দিকে সন্ধ্যা ৭টা বা সাড়ে ৭টার দিকে একটি কনটেইনার থেকে প্রথম ধোঁয়া উঠতে দেখি।

‘নিরাপত্তারক্ষীদের জানালে তারা বলল, মাঝে মাঝেই এমন হয়। এসব কিছু না। এগুলো এমনিতেই নিভে যায়।’

আলী আহমেদ জানান, তবে আগুন হঠাৎ বাড়তে শুরু করলে সবার টনক নড়ে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিপোর কর্মচারীরা ধোঁয়ার সঙ্গে কনটেইনারের ভেতরে আগুনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে রাত ৯টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইন ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে পুলিশ পাশের কুমিরা ফায়ার স্টেশনে খবর দেয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ডিপোতে পৌঁছায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফায়ার ফাইটাররা কিছুক্ষণ কনটেইনারের আগুনের ধরন যাচাই, কনটেইনারে মজুত পণ্য এবং আশপাশে পানির উৎস খোঁজায় কিছুটা সময় ব্যয় করে রাত ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেন। ততক্ষণে প্রায় ৭০০ ফুট দূরের শেড থেকে কনটেইনারের আগুন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

প্রথমে দুটি হোসপাইপ দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কনটেইনারের ভেতরের আগুনে পানি দিতে শুরু করেন। এর ৫ মিনিটের মধ্যে ছোট ছোট তিনটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুন আরও উসকে ওঠে। ঘটনাস্থল থেকে মোবাইল ফোনে করা লাইভের ভিডিও বিশ্লেষণ করেও এসব ছোট বিস্ফোরণ শনাক্ত করা গেছে।

এ পর্যায়ে আগুন ধীরে ধীরে পাশের ও ওপরের অন্য রাসায়নিকের কনটেইনারেও ছড়াতে শুরু করে।

এরই মধ্যে ক্রেনের সাহায্যে ওপর থেকে কয়েকটি কনটেইনার সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় ডিপো কর্তৃপক্ষ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুটি গাড়ি সামনে এনে সেগুলোর মাধ্যমে আগুনে পানি ছিটাতে শুরু করেন। এর মাঝে আরও কয়েক দফা ছোট ও মাঝারি বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণের আগের দিন রাত থেকে ডিপোতে ছিলেন ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার পুলিশ রেজ্জাক মণ্ডল। তিনিও বিস্ফোরণে আহত হন।

রেজ্জাক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগুন লেগেছিল কেমিক্যালের কনটেইনারে। একটার ওপর আরেকটা কনটেইনার ছিল। সেগুলো সরানোয় আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের সময় পানির মতো কেমিক্যাল আমাদের শরীরে এসে পড়ে। যেখানে যেখানে লেগেছে সেখানেই পুড়ে গেছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। গেটও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আমরা দেয়াল টপকে বের হয়েছি অনেক কষ্টে।’

রাত পৌনে ১১টার দিকে বিকট বিস্ফোরণে পুরো ডিপোতে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। এই বিস্ফোরণেই হতাহতসহ পুরো ডিপো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

পরদিন সকালে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডিপোতে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মজুত ছিল। আর এই রাসায়নিক সম্পর্কে ডিপো কর্তৃপক্ষ ফায়ার সার্ভিসকে অবহিত করেনি। উচ্চ তাপে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন নির্গত হয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিস আগুনের সূত্রপাত ও প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে না আসার বিষয়ে এখনও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

তবে রাসায়নিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উচ্চ তাপ ও আগুনের সংস্পর্শে এসে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের বিস্ফোরকের মতো আচরণ করলেও প্রথম কনটেইনারে আগুনের উৎস ছিল অন্য কোনো রাসায়নিক।

তারা বলছেন, হাইড্রোজনের পার-অক্সাইড (H2O2) বিশুদ্ধ অবস্থায় একটি বর্ণহীন তরল। উচ্চ তাপমাত্রায় এটি আগুন ছড়াতে সহায়ক হলেও নিজে জ্বলতে পারে না। অর্থাৎ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডে আগুন জ্বলবে না। তবে উচ্চ তাপ ও আগুনের সংস্পর্শে এলে এই রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আগুন জ্বালাতে পারে না। অথচ আমরা বিভিন্ন ফুটেজে দেখলাম, কনটেইনারে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তারপর সেটা ব্লাস্ট করেছে।

‘তাহলে প্রথমে কনটেইনারে আগুনটা শুরু হলো কীভাবে, সে প্রশ্ন এসেই যায়। ওই কনটেইনারে আগুন জ্বালানোর জন্য অন্য একটি দাহ্য রাসায়নিকের উপস্থিতি ছিল, যা কি না প্রথমে আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়ে অনেকক্ষণ পুড়িয়েছে। পরে সেটার তাপে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে বিস্ফোরকের ভূমিকায় দেখা গেছে।’

একই ধরনের মত দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেহেতু অন্য কোনো আগুনের সোর্স পাওয়া যায়নি, তাহলে ওই কনটেইনারে নিশ্চিতভাবে একটি আগুন জ্বালানোর কেমিক্যাল থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখানে বড় প্রশ্ন আগুনটা জ্বালালো কে? আমরা যদি দেখতাম- কোনো গার্মেন্টসের কনটেইনারে আগুন লেগে পরে তা কেমিক্যালের কনটেইনারে ছড়িয়েছে, তাহলে এ প্রশ্ন তোলার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

‘যেহেতু হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নিজে আগুন জ্বালাতে পারে না, তাহলে হয়তো ওই কনটেইনারে অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ ছিল। সেটা কোনো কারণে লিক করে কনটেইনারে বা এর বাইরেও ছড়িয়েছে। পরে কেউ ওই কনটেইনারের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো বা অন্য কোনো উপায়ে ছোট একটা স্পার্ক থেকে আগুনের সূত্রপাত হলো। এরপর যা ঘটেছে তার জন্য হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে দোষারোপ করাই যায়।’

ডিপোতে মজুত থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আল রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্স। তাদের নীল রঙের প্রতিটি গ্যালনের গায়ে স্টিকারে লেখা আছে, ৬০ শতাংশ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড- মেডিক্যালে ব্যবহারে প্রযোজ্য নয়, ওজন ৩০ কেজি। সতর্কীকরণে বলা হয়েছে, এই রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এসে আগুন ছড়াতে পারে, উচ্চতাপে বিস্ফোরিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিস্ফোরণ ও আগুনে যেখানে ডিপোর অনেক কনটেইনার ও শেড পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেখানে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের গ্যালনগুলোর বেশির ভাগই পোড়েনি। শুধু বিস্ফোরণে সেগুলো ফেঁটে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বেরিয়ে গেছে। এই রাসায়নিক আগুন জ্বালাতে পারলে গ্যালনগুলোও পুড়ে যেত।

আল রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্স ও বিএম কনটেইনার ডিপো দুটিই স্মার্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।

হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের সঙ্গে ডিপোতে অন্য কোনো রাসায়নিকের কনটেইনার ছিল কি না জানতে চাইলে স্মার্ট গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বুধবার নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, সেখানে রপ্তানির উদ্দেশ্যে শুধু হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কনটেইনারবন্দি অবস্থায় ছিল। প্রতিটি কনটেইনারে ২০ টন করে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মোট ৩৭টি কনটেইনার ছিল। অন্য কোনো রাসায়নিক তাদের কনটেইনারে ছিল না।

তবে ডিপোতে অন্য রাসায়নিক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেখানে অন্যদেরও কনটেইনার ছিল। সেসব কনটেইনারে অনুমতি ছাড়া অন্য পণ্যের আড়ালে কোনো কেমিক্যাল ছিল কি না আমাদের জানা নেই।

‘আমাদের দেশে তো নিয়মের বাইরে অনেক কিছুই হয়। ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছাড়া অন্য কোনো কেমিক্যাল ছিল কি না তা ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখতে তদন্ত কমিটিকে আমরা অনুরোধ করেছি।’

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ‘তদন্তের স্বার্থে’ ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ও তদন্ত কমিটির প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল করিম মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে তিনি জানান, সব কিছু মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে, ডিপোতে অন্য কোনো রাসায়নিক থাকলে তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

আরও পড়ুন:
সীতাকুণ্ডে আহতদের চোখের সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি
সীতাকুণ্ডে আগুন: দগ্ধদের চোখে ‘অজানা উপসর্গ’
সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণ: ডিপোতে মিলল আরও দুজনের দেহাবশেষ
সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণ অবহেলাজনিত হত্যা: বাম জোট
সীতাকুণ্ডে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দাবিতে যশোরে মানববন্ধন

মন্তব্য

বাংলাদেশ
What will the hydrogen peroxide of Sitakunda mix with the clouds?

সীতাকুণ্ডের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কি মেঘে মিশবে?

সীতাকুণ্ডের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কি মেঘে মিশবে? বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মেঘে মিশে যাওয়ার তথ্য ছড়িয়েছে ফেসবুকে। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মেঘে মিশে যাওয়ার দাবির বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন তাদের নামে ফেসবুকে প্রচার করা তথ্যটি ভুয়া।  

সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের পর সেখানকার কনটেইনারের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আকাশের মেঘে মিশে গেছে। এর ফলে আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিতে না ভিজতে সতর্ক করে একটি পোস্ট শেয়ার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আশংকার কোনো ভিত্তি নেই। মনগড়া তথ্য প্রচার করে জনমনে ভীতি তৈরি করা হচ্ছে।

ফেসবুকে শেয়ার করা পোস্টের শেষে ‘ডিএমপি পরিচালক’ উল্লেখ রয়েছে। তবে এ ধরনের কোনো বার্তা দেয়ার তথ্য নাকচ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

ফেসবুকের পোস্টে বলা হয় (বাক্য ও বানান অপরিবর্তিত), ‘ব্রেকিং... সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে।। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে কোন বৃষ্টি আসলে কেউ এটা তে ভিজবেন না। চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড ভয়াবহ আগুনে যে, রাসায়নিক কেমিক্যাল গুলো ঝলসে গেছে। তার ফলে আকাশের মেঘ গুলোতে HYDROGEN PER OXIDE GAS টা মিশে গিয়েছে। সকলকে সতর্ক বার্তাটি প্রদান করুন, নিজে বাঁচুন, অন্য কে ও সাহায্য করুন৷ বিশেষ করে বৃদ্ধদের বৃষ্টির সময় ঘর থেকে বের হতে দিবেন না। -ডিএমপি পরিচালক’

ডিএমপির কর্মকর্তারা নিউজবাংলাকে জানান, ডিএমপিতে পরিচালকের কোনো পদ নেই। এই পদ ব্যবহার করে প্রচার করা ম্যাসেজটি ভুয়া।

ডিএমপির মুখপাত্র উপ-কমিশনার মো. ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডিএমপির পক্ষ থেকে এমন কোনো ম্যাসেজ পাঠানো হয়নি। যারা এ ধরনের তথ্য ছড়াচ্ছে তাদের শনাক্তে আমাদের সাইবার টিম কাজ করছে।’

হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মেঘে মিশে যাওয়ার দাবির বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. জি এম গোলজার হোসাইন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মূলত ডিকম্পোজ হয়ে অক্সিজেন তৈরি হয়। এই এইচটুওটু (H2O2) মূলত হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন। এটাকে ভেঙে অক্সিজেন রিলিজ হয় আর পানি তৈরি হয়। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে যদি কনটেইনারে রাখা হলে উত্তাপে অক্সিজেন রিলিজ হয়ে ব্লাস্ট (বিস্ফোরিত) হয়।’

বিএম কনটেইনার ডিপোর হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মেঘের সঙ্গে মেশার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সেভাবে থাকবে না। ওটা ডিকম্পোজ হয়ে যাবে। ডিকম্পোজ হয়ে গেলে অক্সিজেন বাতাসের সঙ্গে চলে যাবে, আর পানিটা নিচে থাকবে। এটা মেঘের সঙ্গে মেশার কোনো সুযোগ নেই।’

একই মত দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম মিজানূর রহমান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নিজে জ্বলে না, কিন্তু সে যখন বেশি হিটেড অবস্থায় থাকে তখন ডিকম্পোজ হয়ে অক্সিজেনের লেভেলটা বেড়ে গেলে বিস্ফোরণ ঘটে।’

মেঘের সঙ্গে এই যৌগ মিশলেও কোনো ক্ষতি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মেঘের সঙ্গে মিশলে তখন সেটা আর হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থাকবে না। সেটা অক্সিজেনে কনভার্ট হয়ে যাবে। তখন আর কোনো ক্ষতি নেই।

একই বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নিজে জ্বলে না, কোন কারণে হিট হলে সেটা অক্সিজেন প্রডিউস করে। আর সেই অক্সিজেন অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করে। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ভেঙে খুব পিওর অক্সিজেন তৈরি করা যায়। আর এটা অনেক দামি হয়।’

হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মেঘে মিশে মানুষের ক্ষতির কারণ হওয়ার দাবিকে ‘কাল্পনিক ও অবান্তর কথাবার্তা’ বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ওমর।

অন্যদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ শাহ আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে এসিড বৃষ্টি হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও সামান্য হয়, তা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায়। কারখানা থেকে বের হওয়া ধোঁয়া বা অন্যান্য রাসায়নিক জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে বৃষ্টি শুরুর প্রথম ১-২ মিনিটে ঝরে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত ডিসেম্বর, জানুয়ারি মাসে, যে সময় বৃষ্টিপাত কম হয়, তখন খুবই অল্প পরিমাণে এসিড বৃষ্টি হয়ে থাকে। এতে বৃষ্টি পানির রং লালচে দেখা যায়। এই এসিড বৃষ্টিতে খুবই সামান্য ক্ষতি হয়ে থাকে। এবং তা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় হয়।

‘আমাদের দেশে এ ধরনের এসিড বৃষ্টি হলেও সীতাকুণ্ডের কনটেইনারে থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কারণে হবে না। এটা ভ্রান্ত ধারণা।’

আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ শাহ আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যখন বেশি পরিমাণে বৃষ্টি হয় না, সেই সময়টায়- বিশেষ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এসিড বৃষ্টি হয়। আর তা হয় ধোঁয়ায় থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড, সিলিকনের মতো পদার্থ মিশে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সঙ্গে নিচে নেমে আসে এবং খুব অল্প সময়েই তা ঝরে যায়।’

আরও পড়ুন:
হাসপাতালে ভিড় না করতে অনুরোধ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
ডিপোর আগুনে কারও দায় থাকলে ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরিচয় না মেলা মরদেহ শনাক্তে লাগবে এক মাস
চট্টগ্রাম বার্ন ইউনিটে সুযোগ-সুবিধার অভাব: সামন্ত লাল
মৃতের সংখ্যা সংশোধন, সীতাকুণ্ডে প্রাণহানি ৪১

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The trap of selling phones at half price

অর্ধেক দামে ফোন বিক্রির ফাঁদ

অর্ধেক দামে ফোন বিক্রির ফাঁদ রিয়েলমির নামে নকল ওয়েবসাইট খুলে প্রতারকরা অর্ধেকের কম দামে ফোন বিক্রির অফার দিচ্ছে।
সম্প্রতি realme.pro ওয়েবসাইট থেকে রিয়েলমির জনপ্রিয় সবগুলো মডেলের মোবাইল অর্ধেকের কম দামে অফার দেয়া হচ্ছে। তবে নিউজবাংলা রিয়লমি এবং নগদ- দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছে, এই ধরনের কোনো অফার দেয়া হয়নি। এটি প্রতারণার চেষ্টা উল্লেখ করে ক্রেতাদেরকে সাবধানও করা হয়েছে।

দেশের বাজারে জনপ্রিয় ফোন বিক্রেতা কোম্পানি রিয়েলমির ট্রেডমার্ক লোগোসহ ওয়েবসাইট থেকে বিশাল ছাড়ে মোবাইল বিক্রি হচ্ছে।

৩২ হাজার টাকা দামের একটি ফোন ১৮ হাজার টাকায়, আর ২২ হাজার ৯৯০ টাকার ফোন ১২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।

এই ফাঁদকে বিশ্বাসযোগ্য করতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘নগদ’ এর নাম জুড়ে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে ‘নগদ’ অ্যাপ ব্যবহার করে টাকা পরিশোধ করলেই কেবল এই ছাড় মিলবে।

সম্প্রতি realme.pro ওয়েবসাইট থেকে রিয়েলমির জনপ্রিয় সবগুলো মডেলের মোবাইল অর্ধেকের কম দামে অফার দেয়া হচ্ছে।

তবে নিউজবাংলা রিয়লমি এবং নগদ- দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছে, এই ধরনের কোনো অফার দেয়া হয়নি। এটি প্রতারণার চেষ্টা উল্লেখ করে ক্রেতাদেরকে সাবধানও করা হয়েছে।

নিউজবাংলার পক্ষ থেকে রিয়েলমির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছে, যে ওয়েবসাইট থেকে এই অফারটি দেয়া হয়েছে, সেটি তাদের নয়।

অর্ধেক দামে ফোন বিক্রির ফাঁদ
মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ জানিয়েছে, তারা এমন কোনো সাইটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কোনো অফার দেয়নি।

অন্যদিকে ‘নগদ’ বলছে, realme.pro ওয়েবসাইটের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগও করেছে রিয়েলমি।

ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সিনিয়র সহাকারী কমিশনার আবু তালেব।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সাইবার সার্ভিলেন্সের মাধ্যমেও এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ডিএমপি।’

রিয়েলমির নাম ব্যবহার করে ওয়েবসাইটটি নতুন

চীনা মোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রিয়েলমি বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে জনপ্রিয় হয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে কার্যক্রম শুরু করা কোম্পানিটির ওয়েবসাইটের ঠিকানা www.realme.com/bd

অন্যদিকে রিয়েলমির নাম ব্যবহার করে realme.pro ঠিকানাটা খোলা হয়েছে গত ১৫ মে। এরপর সাইটটি ডেভেলপ করে সেই সাইটের লিংক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্পন্সর করে গ্রাহকের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বলা হয়েছে, এই ওয়েবসাইট থেকে নির্ধারিত অফারটি নিতে হলে নগদে সেন্ড মানি করতে হবে। একটি নগদ পার্সোনাল নম্বর দেয়া আছে, যা 01745443626। এই নম্বরে সেন্ড মানি করার পর ট্রানজেকশন আইডিটি নির্ধারিত বক্সে তা বসিয়ে কনফার্ম করতে হয়।

ফুল পেমেন্ট করে অর্ডার করতে হবে- এমন শর্ত দিয়ে বলা হচ্ছে, অর্ডার করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরইডিক্স কুরিয়ারের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে নির্ধারিত ফোন।

অর্ধেক দামে ফোন বিক্রির ফাঁদ
ওয়েবসাইটে দেয়া মোবাইল নম্বর ট্রু কলার অ্যাপে ডায়াল করলে এই নাম ভেসে আসছে।

তবে কোনো কোম্পানি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে পণ্য বিক্রি করে, সেখানে সেন্ড মানির কোনো সুযোগ থাকে না। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে টাকা পরিশোধ করতে হলে পেমেন্ট অপশনের মাধ্যমে টাকা দিতে হয়।

আবার যে নম্বরটিতে টাকা পাঠানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তা ট্রু কলারের মাধ্যমে যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেছে, নাম হিসেবে কেউ একজন লিখে রেখেছেন ‘বাটপারি কেয়ার’।

বিয়েলমির বক্তব্য

রিয়েলমির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করে নিউজবাংলা। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে এশিয়াটিক ৩৬০ এর ব্ল্যাকবোর্ড স্ট্র্যাটেজিক।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি যে কিছু ফেসবুক পেজ রিয়েলমি অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের নকল করে পেজ বানিয়ে রিয়েলমির নাম ব্যবহার করে মিথ্যা অফার ছড়াচ্ছে। আমরা এই ফেসবুক পেজগুলোর নামে রিপোর্ট করেছি এবং এই সমস্যাটি সমাধানের লক্ষ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি৷’

গ্রাহকদের রিয়েলমির প্রকৃত অফার জানতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ (https://www.facebook.com/realmeBD) ফলো করার পরামর্শও দেয়া হয়।

যে কোনো প্রশ্নের জন্য এই পেজে আমাদের ম্যাসেজ করার জন্য অথবা আমাদের কল সেন্টারে ০৯৬১০৫৫৫৫৫৫ নম্বরে যোগাযোগের পরামর্শও দেয়া হয়েছে।

রিয়েলমির একজন কর্মকর্তা জানান, তারা এই বিষয়টি নিয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পুলিশ এই বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।

কী বলছে ‘নগদ’

নগদের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান জাহিদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলো আমাদের নজরে এসেছে। এদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

আরও পড়ুন:
রিয়েলমির জিটি মাস্টার এডিশনে অফার
নাম্বার ও সি সিরিজের ফোন আনছে রিয়েলমি
সারা দেশে পাওয়া যাচ্ছে রিয়েলমি নারজো ৫০ ও সি৩১
ঈদে রিয়েলমি ফোন কিনে বালি ভ্রমণ, বাইক জেতার সুযোগ
ঈদের আগে এলো রিয়েলমি সি৩১

মন্তব্য

বাংলাদেশ
What happened to Zias body?

কী ঘটেছিল জিয়ার মৃত্যুর পর

কী ঘটেছিল জিয়ার মৃত্যুর পর
৯ মিনিটেই অপারেশন শেষ। ভোর সাড়ে ৪টার কিছু পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২৪ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে মেজর মোজাফফর হোসেন ফোন করে জানালেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড।’

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে একদল সেনা কর্মকর্তা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সামরিক বাহনে চেপে বেরিয়ে আসেন। তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। সেনাসদস্যদের গন্তব্য ৭ কিলোমিটার দূরে শহরের কেন্দ্রস্থল কাজীর দেউরিতে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিথিশালা সার্কিট হাউস।

ব্রিটিশ আমলে গড়া বাংলো প্যাটার্নের নয়নাভিরাম তিন তলা এই ভবনে তখন অবস্থান করছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আগের দিন তিনি এখানে এসেছেন রাজধানী থেকে, স্থানীয় বিএনপিতে চলতে থাকা কোন্দল মেটাতে।

জিয়া হত্যার পূর্বাপর নিয়ে প্রোবনিউজ-এর প্রধান সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলীর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট ১৯৯৪ সালের মে মাসে মতিউর রহমান সম্পাদিত দৈনিক ভোরের কাগজ-এ ধারাবাহিকভাবে আট কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। এই রিপোর্টে জানা যায় যে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে ২৯ ও ৩০ মে তারিখের মধ্যবর্তী রাত সাড়ে ৩টায় তিনটি গাড়ি নিয়ে ১৬ জন সেনা কর্মকর্তা রওনা হন। প্রেসিডেন্ট জিয়া তখন সার্কিট হাউসে ঘুমিয়ে।

গুলি করতে করতে তাদের একটি দল দোতলায় উঠে যায়। গোলাগুলির শব্দ শুনে বাইরে কী হচ্ছে দরজা ফাঁক করে দেখার চেষ্টা করলেন জিয়া। তখন গর্জে ওঠে আততায়ীর হাতের অস্ত্র। ৯ মিনিটেই অপারেশন শেষ। ভোর সাড়ে ৪টার কিছু পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২৪ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে মেজর মোজাফফর হোসেন ফোন করে জানালেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড।’

বলা হয়, এক সামরিক অফিসার তার স্টেনগানের এক ম্যাগাজিন গুলি পুরোটাই জিয়ার ওপর চালিয়ে দেন।

মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ারে জিয়াউর রহমানের মুখের একপাশ উড়ে গিয়েছিল। একটি চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। পেছনের দেয়ালে লেগেছিল বীভৎসতার চিহ্ন। বারান্দায় পড়ে থাকা প্রেসিডেন্টের রাতের পোশাক সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি লাল হয়েছিল রক্তে।

জিয়ার লাশ এতটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে তাকে চিনতে পারা কঠিন ছিল। চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ সুপার সৈয়দ শফিউদ্দীন আহমেদের পরিবারের সদস্যরা জানান, জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দায়িত্বরত কোনো বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে শফিউদ্দীন আহমেদই প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি বারান্দায় পড়ে থাকা প্রেসিডেন্টের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে সেখানেই স্ট্রোক করেন।

জিয়ার সঙ্গে ওইদিন সার্কিট হাউসে গুলিতে নিহত হয়েছিলেন আরও দুই সেনা কর্মকর্তা– লে. কর্নেল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান। এরা ছিলেন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য।

জিয়ার এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখক-সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তার অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর কাছে। তিনি বলেন, ‘জিয়া নিহত হয়েছিলেন তার প্রিয় সহকর্মী ও অনুগতদের হাতে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।’

অন্যদিকে জিয়ার এই মৃত্যু নিয়ে তার অন্যতম রাজনৈতিক সহযোগী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদকে উদ্ধৃত করে গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, যাদের ওপর জিয়া বেশি নির্ভর করেছিলেন, তারা যদি তাদের আনুগত্য বজায় রাখতেন, তাহলে জিয়ার এ রকম মর্মান্তিক পরিণতি হতো না। তার মতে, দুই পক্ষই (মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা) তার পতন চেয়েছে, এক পক্ষ কাজটা করেছে, লাভ গেছে অন্য পক্ষের ঘরে। দাবার চালে একদল জিতেছে, অন্য দলটি হেরেছে।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানের এক বিশৃঙ্খল পর্বের শেষ অধ্যায়, যা শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। জিয়াউর রহমানের সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার পেছনেও ভূমিকা ছিল একই রকম সামরিক অভ্যুত্থানের।

৩০ মে ভোররাত ৪টার দিকে জিয়াকে হত্যা করা হয়। সকালবেলা সেনানিবাস থেকে যে দুজন সামরিক কর্মকর্তা প্রথম সেখানে হাজির হন, তারা ছিলেন মেজর শওকত ও মেজর রেজাউল করিম। এদের মধ্যে মেজর শওকতের দায়িত্ব ছিল নিহত তিনজনের মরদেহ সংগ্রহ করে কবর দেয়া। আর মেজর রেজার দায়িত্ব ছিল প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যদের সংগ্রহ করে সার্কিট হাউস থেকে ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে আনা। তারা দুজনই সার্কিট হাউসের দোতলার বারান্দায় নিজ কক্ষের সামনে জিয়ার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ দেখেছেন।

মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) রেজাউল করিম ওইদিনের স্মতিচারণা করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দোতলায় উঠে সিঁড়িবারান্দায় দেখি ছোটখাটো একটা ডেডবডি ঢাকা। একজন পুলিশ দাঁড়ানো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে এটা কার ডেডবডি। সে বলল রাষ্ট্রপতির। তাকে মুখটা খুলতে বলার পর দেখলাম পরনে সাদা পাঞ্জাবি। তার একটা চোখ বের হয়ে ঝুলে আছে। পুরো মুখ ঝাঁঝরা। আমি তারপর তাকে বললাম ঠিক আছে ঢেকে রাখো। এর বেশি দেখার আর ইচ্ছা হয় নাই।

‘বারান্দায় আরেকটু সামনে গিয়ে দেখি আরেকটা ডেডবডি। দেখি একটা হাত বের হয়ে আছে। মুখ খুলে দেখি এটা কর্নেল আহসান। আরেকটু সামনে গিয়ে দেখি একটা বড়সড় মরদেহ। যেটার শুধু পা বের হয়ে আছে। সেটা খুলে দেখি আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন হাফিজ।’

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তার গবেষণা তুলে ধরেছেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিবাহিনী, জিয়া হত্যাকাণ্ড, মনজুর খুন’ বইয়ে। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে যে তার মুখ ও কাঁধে ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। তাছাড়া হাতে গুলির ক্ষত আছে। পায়ে গুলির ক্ষত আছে। মাথার খুলি একদিকে উড়ে গিয়েছিল ও মস্তিষ্ক বেরিয়ে গিয়েছিল। এগুলো রিপোর্টে লেখা আছে। রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন লে. কর্নেল তোফায়েল।’

মাটিচাপা মরদেহ

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর কর্নেল শওকত তা রাঙ্গুনিয়ায় এক পাহাড়ের পাদদেশে মাটিচাপা দিয়ে আসেন। আবার ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ্ কয়েক দিন পর তা গর্ত খুঁড়ে তুলে এনে ঢাকা পাঠান। এই অংশটি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। গবেষকরা এখানে খুব বেশি আলো ফেলতে পারেননি।

মেজর রেজাউল নিউজবাংলাকে বলেন, সার্কিট হাউস থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়া ও আরও দুই সেনা কর্মকর্তার মরদেহ সংগ্রহ করে তা সমাহিত করার দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর শওকতকে। এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন লে. কর্নেল মতিউর রহমান, যাকে জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পরপর চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সবচেয়ে সক্রিয় দেখা গেছে।

মেজর (অব.) রেজাউল করিমের ভাষ্য মতে, “কর্নেল মতিউর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন, তার হাতে চায়নিজ স্টেনগান। আমাকে দেখেই বললেন, ‘রেজা কাম হিয়ার।‘ যাওয়ার পর আমাকে বললেন, ‘তুমি কোথায় ছিলে? তোমাকে তো খুঁজেই পাওয়া যায় না।’ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে ‘কী হয়েছে’। তখন তার কাছ থেকেই আমি প্রথম শুনলাম যে জিয়া মারা গেছেন। উনি বললেন, ‘এখন আমাদের সব মুক্তিযোদ্ধাকে একসঙ্গে থাকতে হবে।’

“উনি আমাকে বললেন, ‘তুমি সার্কিট হাউজে যাও। তুমি মেজর শওকত ও আরও কয়েকজন অফিসারকে নিয়ে যাও। প্রেসিডেন্টের ডেডবডি পাহাড়ের ভেতরে কোথাও কবর দিয়ে আসো।‘

“আমি তাকে বললাম, ‘স্যরি স্যার, আমাকে অন্য কাজ দেন।’ আমি মেজর শওকতকে দেখিয়ে দিলাম।

“উনি তখন শওকতকে ডেকে বললেন যে তার দল নিয়ে যেতে। আর আমাকে বললেন, ওখানে গার্ড রেজিমেন্টের যেসব সদস্য আছে তাদের নিয়ে আসতে।”

সার্কিট হাউসে গিয়ে প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যদের একত্র করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসেন মেজর রেজা। আর জিয়াউর রহমানসহ তিন সেনা কর্মকর্তার লাশ একটি সামরিক পিকআপ ভ্যানে তুলে দাফনের উদ্দেশে রওনা দেন মেজর শওকত।

মেজর (অব.) রেজা বলেন, ‘ওরা তিনটা ডেডবডি ওদের গাড়িতে ওঠাল। আর আমি আমার লোকগুলোকে অস্ত্র জমা রাখার পর আমার গাড়িতে ওঠালাম। মেজর শওকতের নেতৃত্বে ওরা চলে গেল কবর দিতে। আর আমি চলে গেলাম ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে।’

মেজর শওকত মেজর মোজাফফরসহ আরও কয়েকজন সেনাসদস্যকে সঙ্গে করে জিয়াউর রহমানের লাশ নিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ে চলে যান। নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে একটি গর্ত করে সেখানে জিয়াউর রহমান, কর্নেল আহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজের লাশ মাটিচাপা দিয়ে আসেন তারা। দুই দিন পর ১ জুন ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহ্ চট্টগ্রামের সেই পাহাড় থেকে লাশ উদ্ধার করেন।

কীভাবে সেই কবর শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটা এক ধোঁয়াশা।

মেজর জেনারেল আবুল মনজুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছেন সাংবাদিক ও লেখক মশিউল আলম। ‘দ্বিতীয় মৃত্যু’ নামের সেই উপন্যাস লিখতে গিয়ে সেই সময়ের অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ও কুশীলবের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। ঘেঁটেছেন অনেক দলিল-দস্তাবেজ, সেই সময়ের পত্রপত্রিকা।

নিউজবাংলাকে মশিউল আলম বলেন, রাঙ্গুনিয়া থেকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। সেখানেই তাকে কবর দেয়া হয়। কবর দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মেজর মোজাফফরের ওপর। কর্নেল মতিউর তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়ার লাশ সার্কিট হাউস থেকে নিয়ে চট্টগ্রামের কোনো পাহাড়ের খাদে ফেলে দিয়ে আসতে।

কিন্তু পাহাড়ের কোনো খাদে ফেলে না দিয়ে মেজর মোজাফফর রাঙ্গুনিয়ায় এক গ্রামের কাছে সমতলে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় সেখানে কবর দেন। পাথরঘাটা সেই গ্রামের নাম। গ্রামবাসীর সহায়তায়, তাদের কোদাল-খুন্তি দিয়ে গর্ত খুঁড়ে একই গর্তে তিনজনের লাশ সমাহিত করে রেখে আসেন তারা। ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ ও ওসি কুদ্দুসের নেয়া সাক্ষাৎকারে মশিউল আলম এটুকু জেনেছেন।

এ বিষয়ে পরে বিএনপির প্রয়াত সিনিয়র নেতা ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহ কথা বলেছিলেন বিবিসির সাংবাদিক কাদির কল্লোলের সঙ্গে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় হান্নান শাহ ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদায় চট্টগ্রাম মিলিটারি একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন।

বিবিসিকে দেয়া সেই সাক্ষাৎকারে হান্নান শাহ বলেন, জিয়ার মৃত্যুর দিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তার দায়িত্ব নিয়ে ৩০ মে দুপুরের দিকে রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল, সেটা তার পরের দিন দ্রুত পাল্টাতে থাকে।

৩০ মে অনেক সেনা কর্মকর্তার মতো হান্নান শাহকেও মিলিটারি একাডেমি থেকে ডেকে নিয়ে বিদ্রোহের পক্ষে সমর্থন চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু হান্নান শাহ তাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এবার ৩১ মে ঢাকার সঙ্গে সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে অনুরোধ করা হয় হান্নান শাহকে।

প্রয়াত হান্নান শাহের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাংবাদিক-ঔপন্যাসিক মশিউল আলমও। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, হান্নান শাহ তাকে বলেছিলেন, তিনি নিজে থেকেই জিয়ার লাশ খুঁজছিলেন। তখন লাশ খোঁজার মূল দায়িত্ব পড়েছিল তৎকালীন ফটিকছড়ি সার্কেলের সার্কেল ইন্সপেক্টর গোলাম কুদ্দুসের ওপর, পরবর্তী সময়ে যিনি ওসি কুদ্দুস নামে পরিচিতি পান। এই গোলাম কুদ্দুস পরে পলায়নরত মেজর জেনারেল মনজুরকেও আটক করে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হান্নান শাহ জানান, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে তিনি নিজ থেকেই পয়লা জুন জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ খুঁজতে বের হয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন সিপাহি, একটি ওয়্যারলেস সেট এবং একটি স্ট্রেচার।

হান্নান শাহ ওই সাক্ষাৎকারে জানান, তারা কাপ্তাই রাস্তার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। একটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নতুন কবরের সন্ধান করছিলেন তারা। তখন একজন গ্রামবাসী এসে তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা কী খুঁজছেন।

ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ ওই গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সেনাবাহিনীর সৈন্যরা সেখানে কোনো ব্যক্তিকে সম্প্রতি দাফন করেছে কি না?

তখন সেই গ্রামবাসী একটি ছোট পাহাড় দেখিয়ে জানান, কয়েক দিন আগে সৈন্যরা সেখানে একজনকে কবর দিয়েছে। তবে গ্রামবাসীর কোনো ধারণা নেই কাকে সেখানে কবর দেয়া হয়েছে।

গ্রামবাসীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী হান্নান শাহ সৈন্যদের নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন নতুন মাটিতে চাপা দেয়া একটি কবর।

সেখানে মাটি খুঁড়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আরও দুই সেনা কর্মকর্তার মৃতদেহ দেখতে পান তারা। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মরদেহ তুলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আনা হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তা ঢাকায় পাঠানো হয়।

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শহরের বাইরে পাহাড়ের ঢালে পুঁতে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে তুলে আনা হয় অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর। সেটা ১ জুন তুলে চট্টগাম সিএমএইচে নিয়ে আসা হয়। তার লাশ আইডেন্টিফাই করেন তার পিএস লে.কর্নেল মাহফুজ। এরপর পোস্টমর্টেম ও সেলাই করার পর কফিনে ভরে সেটাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

‘ঢাকায় আনার পর বেগম জিয়াকে কফিনটা দেখানো হয়। ঢাকনা খোলা হয় নাই। সেটা জাতীয় সংসদের নর্থ প্লাজায় তাকে দাফন করা হয়। তার আগে মানিক মিয়া অ্যাভেনিউয়ে যে জানাজা হয়েছিল, সেখানে স্মরণকালের বৃহত্তম সমাবেশ আমরা দেখেছি।’

লেখক ও গবেষক আনোয়ার কবির বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর মেজর মোজাফফরের সঙ্গে তার একাধিকবার কথা হয়েছে। তিনি জিয়াউর রহমানের লাশ সম্পর্কে বলেছেন, লাশের একটি অংশ, বিশেষ করে মুখের অপশন প্রায় উড়ে গিয়েছিল। তা দেখে কোনটা কার লাশ বোঝা কঠিন ছিল।

মেজর (অব.) রেজা বলেন, মেজর জেনারেল মনজুর ধরা পড়ার পর হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া বেশির ভাগ অফিসারই আটক ও নিহত হন। এরশাদের লোকজন জিয়াউর রহমানের লাশ ঢাকায় পাঠায় এবং যে কফিন ঢাকায় আসে, তা আর খোলা হয়নি বলে জানা যায়। তাই কফিনে কী ছিল বা ছিল না তা বলা কঠিন।

ঢাকায় জিয়ার মরদেহ আসার পর

সেই সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন। তার বয়ানে: ‘৩০ মে ঢাকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হওয়ার এবং এতে জিয়াউর রহমানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। জিয়ার মৃত্যু সংবাদ শুনে সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়।

‘সন্ধ্যায় ৩০টা বেবিট্যাক্সিতে 'তাহের মাইক' লাগিয়ে পরদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে জিয়ার জানাজা হবে—এটা প্রচারের ব্যবস্থা করলাম। ইচ্ছে করেই 'গায়েবানা' শব্দটা ব্যবহার করিনি। ভেবেছিলাম, মানুষ মনে করবে জিয়ার লাশ এসে গেছে এবং তারা বেশি সংখ্যায় জানাজায় হাজির হবে।

সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শামসুল হুদা চৌধুরী, শাহ আজিজ আর ডা. মতিন ছিলেন। তারা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ডা. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে ডেকে এনে হম্বিতম্বি করলেন- কার হুকুমে জানাজার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে? তারা বললেন, 'ক্যান্টনমেন্টগুলোর পরিস্থিতি আমরা জানি না, বিশেষ করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। অ্যাকটিং প্রেসিডেন্ট জানাজায় যাবেন না।'

৩১ মে সকাল ৯টায় ঢাকা স্টেডিয়ামে জানাজা হলো। মোনাজাতের ঠিক আগের মুহূর্তে জাস্টিস সাত্তার এসে উপস্থিত হলেন। তখন এটা অফিশিয়াল জানাজা হয়ে গেল। জিয়ার লাশ ঢাকায় আসার পর মানিক মিয়া অ্যাভেনিউতে অনুষ্ঠিত হলো স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জানাজা।’

রেডক্রসের আহ্বান

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের এক দিন পর ১৯৮১ সালের ৩১ মে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত’। উপশিরোনামে লেখা হয়: ‘বিচারপতি সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান’। বিএনপি তখনও ক্ষমতায়, অথচ দলের প্রতিষ্ঠাতার মরদেহের কোনো সন্ধান নেই। এমন অবস্থায় ১ মে ইত্তেফাকে একটি সংবাদ ছাপা হয়, যেখানে বলা হয়, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের কর্মকর্তারা বিদ্রোহী সেনাদলের নেতা মেজর জেনারেল আবুল মনজুরের সঙ্গে দেখা করে রাষ্ট্রপতির মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করেন, যদিও মনজুর তা অস্বীকার করেন।

ঢাকায় প্রকাশিত এক প্রেসনোটের বরাত দিয়ে বাসস জানায়, হত্যাকাণ্ডে নিহত প্রেসিডেন্টের দাফনের জন্য আন্তর্জাতিক রেডক্রসের মাধ্যমে লাশ ফেরত চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর দেশজুড়ে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সাত্তার, প্রধানমন্ত্রী শাহ আব্দুল আজিজ, স্পিকারের অংশগ্রহণে গায়েবানা জানাজা হয়।

এর পরদিনই গণমাধ্যমে সংবাদ ছাপা হয়, রাঙ্গুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল। খবরে বলা হয়, কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজের মরদেহের সঙ্গে একই কবরে জিয়াউর রহমানের মরদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল। জিয়ার মরদেহ ছিল অন্য দুইজনের মরদেহের মাঝে।

ইত্তেফাক সেই কবরের ছবিও ছাপে। এতে বলা হয়, রাঙ্গুনিয়া কলেজের কাছে ছিল এই কবর। ২৫ টাকা করে পারিশ্রমিক দিয়ে তালেব আলীসহ দুইজন স্থানীয় ব্যক্তিকে দিয়ে এই কবর খোঁড়ানো হয়। দোয়া পড়ানো হয় স্থানীয় মৌলভকে দিয়ে। পরে গর্ত খুঁড়ে এই লাশ তোলা হয়।

লাশ শনাক্তের পরের দিন ‘ঢাকায় জিয়ার মরদেহ’ শিরোনাম ছাপা হয় সংবাদপত্রগুলোতে।

ইত্তেফাকের খবরে লেখা হয়, ‘কফিনটি প্রেসিডেন্ট ভবনে লইয়া যাওয়ার পর সেখানে এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ও দুই পুত্র কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়েন। কিন্তু কফিনের ঢাকনা খোলা হয় নাই।’

বিতর্ক যে কারণে

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ তড়িঘড়ি এক নির্জন পাহাড়ে সমাহিত করা, পরে সেখান থেকে সেটি উদ্ধার করে কফিনে ভরে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া– এই বিষয়গুলো সবই হয়েছে অনানুষ্ঠানিকভাবে, খুব কম লোকই যুক্ত ছিল এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে। ফলে তখন থেকেই একটি সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে: যে মরদেহ তুলে আনা হয়েছে, সেটা যে জিয়াউর রহমানেরই, তার নিশ্চয়তা কী।

লেখক ও সাংবাদিক আনোয়ার কবীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুরো ঘটনাটিকেই রহস্যের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর লাশ নিয়ে যে বিতর্ক চলছে সেটা বড় রকমের বিতর্ক। সেটা কিন্তু তখনও ছিল। ১৯৮১ সালে জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর তার লাশ নিয়ে আসার পর সেটা কাউকে দেখানো হয়নি। কফিনের ভেতর তার লাশ ছিল কি ছিল না? জিয়া হত্যার পর দ্রুততার সঙ্গে সবকিছু করা হয়েছিল।

জেনারেল মনজুরকেও দ্রুত হত্যা করা হয়। সেটার মূল কারণ ছিল জিয়ার হত্যাকে ধামাচাপা দেয়া। জিয়াউর রহমানের লাশ নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সেটার বড় কারণ হলো লাশগুলো এতটা বিকৃত হয়েছিল যে উপস্থিত কারও পক্ষে আইডেন্টিফাই করা সম্ভব ছিল না যে কোনটি জিয়াউর রহমানের লাশ বা আদৌ তার লাশ ছিল কি না।’

মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ নিউজবাংলাকে বলেন, এই প্রক্রিয়াগুলো অস্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছিল বলেই এখনও সেগুলো রহস্যাবৃত বলে মনে করার অবকাশ আছে। কারণ কোনো কিছুরই দালিলিক প্রমাণ রাখা হয়নি।

তিনি বলেন, যেভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল এবং যেভাবে তা সরকার, সিভিল প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সামলানোর চেষ্টা করা হয়েছে, সেই সময় থেকেই মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। এই বিতর্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি যোগ করেন, জিয়াউর রহমানের মরদেহ উদ্ধার ও ঢাকায় দাফনের আগে-পরে কোনো স্বজন বা সহকর্মী তা দেখেননি বা শনাক্তও করেননি। যে একজন মাত্র ব্যক্তি তাকে শনাক্ত করেছিলেন, তিনি জিয়াউর রহমানের পিএ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ। তাকে সরিয়ে দেয়া হয় এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলানোর মধ্য দিয়ে।

তিনি বলেন, যেহেতু কেউ এটা দেখেননি, তাই এখন কেউই বলতে পারছেন না, সত্যি সত্যিই সেখানে মরদেহ ছিল কি ছিল না!

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ অবশ্য মনে করেন, জিয়ার মরদেহ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকার কারণ নেই। কেননা মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের ডেডবডিকে চিহ্নিত করেছেন তার পিএস। লে. কর্নেল মাহফুজ। তাকে পরে ফাঁসি দেয়া হয়। মাহফুজের ভাষ্য অনুযায়ী জিয়া ও আরও দুটো মৃতদেহকে ৩০ মে বেলা আড়াইটায় চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কাছে কবর দেয়া হয়। ১ জুন মাহফুজ জিয়ার মৃতদেহ তুলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে ১ জুন সকাল ১০টায় তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। সেটার বিস্তারিত প্রতিবেদনও আছে।

সবকিছু শেষ করে কফিনে মুড়ে বেলা ১টায় ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম, লে. কর্নেল মাহফুজ ও লে. কর্নেল মাহবুবুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রতিবেদনে যার স্বাক্ষর আছে তার নাম লে. কর্নেল কে জেড তোফায়েল আহমেদ, প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ।’

মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, আইন মোতাবেক মরদেহ ময়নাতদন্তের দায়িত্ব সিভিল সার্জনের। তার আগে পুলিশ সুরতহাল রিপোর্ট করবে। এরপর পুলিশ পোস্টমর্টেমের আবেদন করবে। এ জন্য পুলিশের নির্দিষ্ট একটা ফরম আছে। সেটা তারা ফিলাপ করে পোস্টমর্টেমের আবেদন করবে। সিভিল সার্জনেরও ময়নাতদন্তের একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাট আছে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সামরিক হাসপাতালে ময়নাতদন্তে এগুলোর কোনোটাই অনুসরণ করা হয়নি। একটি সাদা কাগজে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট লেখা হয়েছে। মরদেহ হস্তান্তরের সময় কফিনের মুখ খোলা হয়নি, স্বজনদের কাউকে মরদেহ দেখতে দেয়া হয়নি। ফলে কফিনে মরদেহ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারেন, এমন কাউকেই পাওয়া যায় না।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার নিউজবাংলাকে বলেন, সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে পৌঁছায় নিহত রাষ্ট্রপতির কফিন।

এখনকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছিল তখনকার সংসদ ভবন। বিমানবন্দর থেকে কফিন সেখানে এনে রাখা হয়। ঢাকায় কফিন পৌঁছানোর পর থেকে সমাহিত করা পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী শিকদার তার লোকবল নিয়ে সেখানে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি তখন ক্যাপ্টেন পদে ছিলেন। একেবারে তরুণ অফিসার। তিনি জানান, সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বহু মানুষ লাশ দেখতে এসেছিলেন। কেউ কেউ ফুল নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তারা প্রেসিডেন্টের মুখ দেখতে পারেননি। কারণ কফিনের ঢাকনা খোলা হয়নি।

মোহাম্মদ আলী শিকদার জানান, তাদের ওপর থেকে নির্দেশ ছিল, কফিনের ঢাকনা খোলা যাবে না। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী তারা সেই নির্দেশ পালন করেছেন। কাউকে কফিনের মুখ খুলতে দেননি। পরদিন ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আরও লোক আসেন। এরপর কফিন সমাহিত করা হয়।

হত্যা আর প্রহসনের বিচারের রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক অভিলাস আর রক্তপাতের বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যার উত্থান হয়েছিল, একই রকম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তবে অনেকে এটাকে শুধুই এক বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখেন না। তারা বলেন, সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের সঙ্গে পাকিস্তান প্রত্যাগত অংশের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ এইসব ঘটনা। এবং প্রতিটি ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সেনা সদস্যদের কোণঠাসা বা নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে বিচারকাজ চলেছে, তাতে সেটি আরও স্পষ্ট হয়।

লেখক ও সাংবাদিক আনোয়ার কবির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত ক্যুয়ের নামে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। যার অধিকাংশের শিকার হন মুক্তিযোদ্ধারা। এখন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অনেকগুলো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পাকিস্তানফেরত সদস্যরা জড়িত ছিলেন। যেটা বলা হয় যে তখন সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে জেনারেল এরশাদের সঙ্গে পাকিস্তান প্রত্যাগতরাই ছিলেন।’

জিয়াউর রহমান এবং বিশেষ করে মনজুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম, যেটির নাম: দ্বিতীয় খুনের কাহিনি। উপন্যাসের রসদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটেছেন তিনি, কথা বলেছেন এইসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নানাজনের সঙ্গে।

মশিউল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে একটা ক্ষোভ ছিল যে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের বেশি সুযোগ- সুবিধা দিচ্ছেন। এর মধ্যে এরশাদও ছিলেন। এটা নিয়ে একটা ক্ষোভ ছিল। তাদের মূল দাবিটাই ছিল যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। যারা পাকিস্তানফেরত তাদের এত সুযোগ-সুবিধা দেয়া যাবে না।’

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সব দিক আজও উন্মোচিত হয়নি। অনেকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে বিচারের নামে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়া হয় এবং এটির সঙ্গে যুক্ত নন এমন অনেককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, সেটি সন্দেহ উদ্রেককারী।

হত্যা আর অভ্যুত্থানের এই অধ্যায় বাংলাদেশ অনেক পেছনে ফেলে এসেছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে ইতিহাসের অন্ধকার অংশগুলো উন্মোচিত না হলে, অনেক কিছুরই জট খুলবে না।

আরও পড়ুন:
যে গ্রামে অপরাধ কম, কালেভদ্রে পুলিশ  
রহস্যে ঘেরা মানুষশূন্য মঙ্গলপুর গ্রাম
ষাটের দশকের সেই হেলিকপ্টার সার্ভিস ও ভুলে যাওয়া দুর্ঘটনা
যে রহস্যের কিনারা নেই

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Office closed Jamaat meeting at home mosque

অফিস বন্ধ, জামায়াতের বৈঠক বাসায়-মসজিদে

অফিস বন্ধ, জামায়াতের বৈঠক বাসায়-মসজিদে মানবতাবিরোধী অপরাধে শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে প্রায় এক দশক ধরে বন্ধ জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ছবি: নিউজবাংলা
মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, ফটকের বাইরে নীল রঙের একটি নামফলক। বন্ধ ফটকের বাইরের চিত্রেই বোঝা যায়, যত্নআত্তি খুব একটা হচ্ছে না সেখানে। ফটকে শতছিন্ন পোস্টারগুলো জানান দিচ্ছে, সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। বাইরে থেকে ভেতরের চিত্র যতটুকু দেখা যায়, তাতে দোতলা থেকে প্রতিটি তলার বারান্দার বাইরের অংশে শ্যাওলা পড়ে আছে।

রাজধানীর বড় মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এক নিরাপত্তারক্ষী জানালেন, তিনি নেতাদের মুখ দেখেননি গত সাত বছরেও।

২০১৫ সালে নিয়োগ পাওয়া আবদুল কুদ্দুস অবশ্য কথা বলতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি। ফলে নেতারা না এলে তিনি বেতন কীভাবে পান, কার সঙ্গে যোগাযোগ করে চাকরি পেয়েছেন, সেসব তথ্য জানা হলো না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা দলটি স্বাধীনতার পর ছিল নিষিদ্ধ। তখন অন্য দলে ভিড়ে গিয়ে বা গোপন রাজনীতিতে জড়ানো জামায়াত ও তার সে সময়ের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা-কর্মীদের তৎপরতাও এখন অনেকটাই স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতির মতোই।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মানবতাবিরোধী অপরাধে যখন থেকে জামায়াত নেতারা গ্রেপ্তার হতে থাকেন, তখন থেকে তাদের কার্যালয়ে ঝুলে যায় তালা। বছরের পর বছর ধরে সে তালা খুলছে না। অনেকটা গোপনে চলে তাদের তৎপরতা।

অফিস বন্ধ, জামায়াতের বৈঠক বাসায়-মসজিদে

রাজধানীর বড় মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ছবি: নিউজবাংলা

আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো, ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ দেয়ার পর জামায়াতের প্রতিক্রিয়া ছিল ধ্বংসাত্মক। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সম্পদে বেপরোয়া হামলা চালানো দলটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বিএনপির শরিক হিসেবে সরকার পতন আন্দোলনে নেমে খালি হাতে ঘরে ফেরার পর একেবারে কার্যালয়বিমুখ হয়ে গেছে।

তবে ইদানীং হঠাৎ করেই অস্তিত্বের জানান দিতে শুরু করেছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। চলতি মাসে ঢাকায় বেশ কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছেন জামায়াতের মহানগরের নেতারা। গত ফেব্রুয়ারিতেও রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর চত্বরে একটি মিছিল হয়।

মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, ফটকের বাইরে নীল রঙের একটি নামফলক। বন্ধ ফটকের বাইরের পাশের চিত্রেই বোঝা যায়, যত্নআত্তি খুব একটা হচ্ছে না সেখানে। ফটকে শতচ্ছিন্ন পোস্টারগুলো জানান দিচ্ছে, সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। বাইরে থেকে ভেতরের চিত্র যতটুকু দেখা যায়, তাতে দোতলা থেকে প্রতিটি তলার বারান্দার বাইরের অংশে শ্যাওলা পড়ে আছে।

ভবনের তৃতীয় তলায় এক পাশ দিয়ে একটি সাইনবোর্ড আছে, তাতে লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, কেন্দ্রীয় দপ্তর’।

ভবনে কেউ নেই বলে জানালেন কার্যালয়ের নিচতলায় থাকা নিরাপত্তাকর্মী আব্দুল কুদ্দুস। তিনি জানালেন, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে অফিসে কেউ আসে না বলে জেনেছেন, যদিও তার নিয়োগ আরও চার বছর পর।

কুদ্দুস বলেন, ‘আমি সাত বছর ধরে এই ভবনে চাকরি করছি। ২০১৫ সাল থেকে আমি এখানে আছি। কী কারণে এটা বন্ধ আমি কিছু জানি না। আমি জানবই বা কী করে?’

বৈঠক, কথাবার্তা কীভাবে

জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের এক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বাড়াতে রাজি হননি। বলেন, ‘আপনার যদি কোনো তথ্য জানার থাকে আপনি কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকের সঙ্গে যোগোযোগ করতে পারেন।’

এমনকি তার নামটিও ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়ে রাখলেন তিনি।

পরে দলের মহানগর উত্তর শাখার এক নেতা বলেন, ‘দলীয় কার্যালয় ছাড়াই কাজ চলছে আমাদের। জামায়াত একটি ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন। অফিস ছাড়াই আমরা দলের টপ টু বটম যোগাযোগ করে আসছি। তবে এ জন্য অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সাংগঠনিকভাবেও কার্যক্রম চালাতে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে।’

ঝটিকা মিছিলগুলো কীভাবে করা সম্ভব হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান যুগে তো যোগাযোগ রাখা কঠিন না। তথ্য পাওয়ার মধ্য দিয়ে সেগুলো হয়ে যাচ্ছে।

‘সুনির্দিষ্ট কোনো স্থানে বর্তমানে জামায়াতের মিটিং হয় না। যখন যেখানে সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই দলের মিটিং করা হচ্ছে। নেতাদের বাসায়-মসজিদে মিটিংগুলো হয়।’

কার্যালয় বন্ধ থাকাতে তেমন কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক কাজগুলো এখন বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতেই হয়।

‘এ ছাড়া সাংগঠনিক কাজগুলো এখন প্রযুক্তির কল্যাণে সহজ হয়ে গেছে। মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ আছে, এর মাধ্যমে…। এ ছাড়া ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য তো অফিস লাগে না।’

এই জামায়াত নেতা জানান, ‘যখনই আমাদের বৈঠক করা দরকার হয় তখন বৈঠক হচ্ছে। সেখানে বড় জমায়েতের সুযোগ এখন নেই, বৈঠকগুলো ছোট পরিসরেই করা হচ্ছে।

কোথায় বৈঠক করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বৈঠকগুলো বাংলাদেশের ভেতরেই মাটির ওপরেই হয়। বিভিন্ন জয়গায় বসে মিটিংগুলো হয়। মিটিং করার জন্য আমাদের এর চেয়ে বেশি কোনো জায়গার দরকার পড়ে না।’

স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ থাকলেও জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় রাজনীতিতে ফেরার অনুমতি পাওয়া জামায়াত এখন দলীয় কার্যক্রম চালাতে পারলেও নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে।

২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর দলটির নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

এতে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২–এর আওতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধন দেয়া হয়। তবে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে করা ৬৩০ নম্বর রিট পিটিশনের রায়ে আদালত নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে। এরপর নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন বাতিল করে।

নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় দলীয় প্রতীকে ভোটে লড়ার যোগ্যতাও নেই জামায়াতের। অন্যদিকে তাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের খড়্গ ঝুলছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক রায়ে জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দেয়ার পর নেতাদের মতো দলটিরও বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়।

সেটি আট বছর আগের কথা। কিন্তু এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের জন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বিভিন্ন সময়ে বলেছিলেন, অপরাধী সংগঠনের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের সংশোধনীর খসড়া শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উঠবে। শেষ পর্যন্ত সেটা আর মন্ত্রিসভায় ওঠেনি। ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সংগঠনের বিচারকাজও শুরু করা যায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগীর। দলটির নেতা-কর্মীরা সে সময় গঠন করে রাজাকার বাহিনী। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ গঠন করে খুনে বাহিনী আলবদর। এই বাহিনীর বিরুদ্ধেই আছে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ। এসব ঘটনায়ই স্বাধীনতা-উত্তর জামায়াত হয় নিষিদ্ধ।

আরও পড়ুন:
জামায়াতের মিছিল থেকে হামলা, ওসিসহ আহত ২
উগ্রবাদী বইসহ দুজন গ্রেপ্তার
জামায়াতের ৪৫ নেতাকর্মী কারাগারে
রাজশাহী নগর জামায়াতের সেক্রেটারি গ্রেপ্তার
‘নাশকতার পরিকল্পনা’য় বৈঠক, ৩ জামায়াত নেতা আটক

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Easy to manage train tickets by manipulating tenders

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সহজ। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। টিকিট ব্যবস্থাপনা খরচ কম দেখাতে তারা রেলের নিজস্ব আয়কে নিজেদের দরপ্রস্তাবে যুক্ত করেছে। এরপর সেই আয় সহজের মোট ব্যয় প্রস্তাবের সঙ্গে বিয়োগ করে টিকিটপ্রতি রেলের কাছ থেকে তাদের পাওনা মূল্য বা সার্ভিস চার্জ কম দেখানো হয়েছে।

তিন মেয়াদে টানা দেড় দশক বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস)। তবে টিকিট বিক্রিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছিল এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

প্রায় দুই বছর আগে রেলের আহ্বান করা দরপত্রে সিএনএসের পরিবর্তে টিকিট ব্যবস্থাপনার জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হয় সহজ লিমিটেড জেভি। এরপর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রেলভবনে আনুষ্ঠানিক সহজ ও রেলের চুক্তি হয়। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ট্রেনের টিকিট বিক্রি করবে সহজ।

তবে দরপত্রের মাধ্যমে সহজকে বেছে নেয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। টিকিট ব্যবস্থাপনা খরচ কম দেখাতে তারা রেলের নিজস্ব আয়কে নিজেদের দরপ্রস্তাবে যুক্ত করেছে। এরপর সেই আয় সহজের মোট ব্যয় প্রস্তাবের সঙ্গে বিয়োগ করে টিকিটপ্রতি রেলের কাছ থেকে তাদের পাওনা মূল্য বা সার্ভিস চার্জ কম দেখানো হয়েছে।

সহজের কারসাজির বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায় ধরা পড়লেও বিষয়টি অজ্ঞাত কারণে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে রেলের ঊর্ধ্বতন কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনও নিউজবাংলার জিজ্ঞাসায় সাড়া দেননি।

সহজের আগের প্রতিষ্ঠান সিএনএস প্রতিটি টিকিট ইস্যু বাবদ রেলের কাছ থেকে ২ টাকা ৯৯ পয়সা সার্ভিস চার্জ নিত। চলতি বছরের চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি টিকিট ইস্যুর জন্য মাত্র ২৫ পয়সা চার্জ নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে কাজটি পায় সহজ।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
রেলওয়েতে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব ফরম (বাঁয়ে), সহজ এই ফরমে একটি সারি বাড়িয়ে ৮.০২ পর্যন্ত করেছে

তবে নিউজবাংলার হাতে আসা সহজ লিমিটেড জেভির আর্থিক দরপ্রস্তাবে ব্যাপক কারসাজির প্রমাণ মিলেছে।

রেলওয়েতে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব ফরম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ফরমটিতে ৮.০১ পর্যন্ত সারি রয়েছে। তবে সহজের জমা দেয়া আর্থিক প্রস্তাবে একটি সারি বাড়িয়ে ৮.০২ পর্যন্ত করা হয়। রেলওয়ের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির একাধিক কর্মকর্তার সইসহ সহজের আর্থিক প্রস্তাবের একটি অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

রেলওয়েতে জমা দেয়া আর্থিক দরপ্রস্তাবে সহজ লিমিটেড জেভি তাদের মোট ব্যয় দেখিয়েছে ৩০ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ১২৯ টাকা। যার সঙ্গে ২০ কোটি টিকিট ভাগ করলে প্রতিটি টিকিটের সার্ভিস চার্জ দাঁড়ায় ১ টাকা ৫১ পয়সা।

ওই দরপত্রে সহজসহ মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। অতীতে টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সিএনএসও অংশ নিয়েছিল সেখানে। সিএনএস যে ব্যয় প্রস্তাব দেয় তাতে টিকিটের সার্ভিস চার্জ ছিল ১ টাকা ২২ পয়সা।

তবে সহজ রেলওয়ের দরপত্রের আর্থিক প্রস্তাবে অতিরিক্ত একটি সারি তৈরি করে কারসাজির মাধ্যমে টিকিট প্রতি সার্ভিস চার্জ ১ টাকা ৫১ পয়সার পরিবর্তে মাত্র ২৫ পয়সা দেখিয়েছে।

ফরমের অতিরিক্ত ওই সারিতে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন থেকে রেল কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য আয় ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকাকে নিজেদের আয় হিসেবে দেখায় সহজ। এরপর তা দরপ্রস্তাবের মোট দর থেকে বাদ দেয়া হয়।

এর ফলে মোট ব্যয় প্রস্তাব ৩০ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ১২৯ টাকার পরিবর্তে নেমে আসে ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ১২৯ টাকায়। আর এর সঙ্গে ২০ কোটি টিকিট ভাগ করে প্রতিটি টিকিটের সার্ভিস চার্জ দেখানো হয় মাত্র ২৫ পয়সা।

টিকিটসহ বিভিন্ন স্টেশনে নানান প্রতিষ্ঠানের দেয়া বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া অর্থ রেলের নিজস্ব আয় হিসেবে বিবেচিত। তবে দরপ্রস্তাবে এই আয় নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজেদের হিসেবে দেখিয়েছে সহজ।

দরপ্রস্তাবে অনিয়মের বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায় ধরা পড়লেও সহজের কাজ পাওয়ায় তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিপিটিইউ-এর প্রতিবেদন

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) তৈরি করা একটি প্রতিবেদনের অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সহজ লিমিটেড জিভি পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে আর্থিক প্রস্তাবের ৮ নং মেইন হেডে একটি অতিরিক্ত লাইন সংযোজন করে বিজ্ঞাপন থেকে ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকা আয় দেখিয়ে তা নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের মূল উদ্ধৃত দর থেকে বিয়োগ করেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সহজ লিমিটেড জেভি ছাড়া অন্য কোনো দরদাতাই তাদের আর্থিক প্রস্তাবে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দাখিল করেনি। যা থেকে প্রতীয়মান হয় রেলওয়ের মূল্যায়ন কমিটি ও সহজ লিমিটেড জেভি নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য পারস্পরিক যোগসাজশে এ ধরনের শর্তযুক্ত প্রস্তাব পেশ করে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এ ধরনের বিজ্ঞাপন খাতে ৫ বছরে ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকার চেয়ে আরও বহুগুণ (বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ৫০০ কোটি টাকা) বেশি আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা একান্তভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের তথা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব আয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার জন্যই পারস্পরিক যোগসাজশে সহজ লিমিটেড জেভি এ ধরনের প্রস্তাব দাখিল করেছে এবং দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বেআইনিভাবে তা অনুমোদন করেছে।’

সহজের দরপত্রে অনিয়মের বিষয়টি রেলের তখনকার অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানও চিহ্নিত করেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি ২০২০ সালে একটি প্রতিবেদনও দেন। তবে সেটি আমলে নেয়া হয়নি। সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথিতে পরে অবশ্য মিয়াজাহানও সই করেন।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানের প্রতিবেদন

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মিয়াজাহান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টেন্ডার ডকুমেন্ট ওখানে যেভাবে আছে সেভাবেই আছে। তারপর আমরা চলে আসছি আড়াই বছর হলো। এখন আড়াই বছর আগের ঘটনা আপনি নিয়ে আইসা প্রশ্ন করলে আমি কি সেগুলো বলতে পারব? এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না।’

দরপত্র দাখিলের যোগ্যতাই ছিল না সহজের

বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকিটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস) দরপত্রের ৭.১(এ). (১).(৩) এর শর্ত অনুযায়ী, দরদাতা প্রতিষ্ঠানের বছরে ৫০ লাখ টিকিট ইস্যু করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এ ছাড়া দরপত্র দলিলের আইটিটি ৭.১(এ) এর টেন্ডার এলিজিবিলিটির শর্ত সমূহের ১(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে একটি সিস্টেমের মাধ্যমে কমপক্ষে ৫০ লাখ টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কোনোভাবেই একাধিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের খণ্ডিত অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।

তবে এই শর্ত পূরণ করেনি সহজ। ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাওয়ার আগে বিভিন্ন বাস কোম্পানির টিকিট বিপণনে যুক্ত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে তাদের বিক্রি করা বাসের টিকিটের সংখ্যা ৫০ লাখ অতিক্রম করেনি।

রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানের প্রতিবেদনেও বিষয়টির উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়, সহজ লিমিটেড বাসের প্রতি টিকিট বাবদ গড়ে ৩০ টাকা করে কমিশন নিয়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম থেকে ২০১৯ সালে ৯ লাখ ৭০ হাজার, ২০১৮ সালে ৭ লাখ ৬১ হাজার, ২০১৭ সালে ৭ লাখ ১০ হাজার, ২০১৬ সালে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ও ২০১৫ সালে ১ লাখ ২০ হাজার টিকিট ছাড় হয়েছে। অর্থাৎ কোনো একক বছরে ৫০ লাখ তো নয়ই, পাঁচ বছরে সহজ সব মিলিয়ে মোট ৩০ লাখ বাসের টিকিট বিক্রি করেছে ।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথি

মিয়াজাহান প্রতিবেদনে বলেন, ‘সহজ বাংলাদেশ রেলওয়ের চাহিত বিগত পাঁচ বছরের কোনো বছরেই সিস্টেম হতে ইস্যুকৃত টিকিটের সংখ্যা ৫০ লাখ অতিক্রম করতে পারে নাই, এমনকি সংখ্যাটি ৫০ লাখের কাছাকাছিও না। সহজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগের অভিজ্ঞতার টিকিটপ্রতি কমিশনের সঠিক হিসাব করলে সিস্টেম হতে ইস্যুকৃত টিকিটের সংখ্যা আরও কম হবে। এ ক্ষেত্রে সহজের দাখিলকৃত দরপত্র প্রস্তাবে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন না করে ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

মিয়াজাহানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে নিউজবাংলার প্রশ্ন ছিল, এই প্রতিবেদন দেয়ার পরও আপনি কেন সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথিতে সই করেছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু আমি দেই নাই, আরও অনেকের সই আছে।’

বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তার সাড়া পায়নি নিউজবাংলা। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু হোয়াটসঅ্যাপে লিখে পাঠানোর পর তিনি ‘সিন করলেও’ কোনো জবাব দেননি।

বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘কথা বলার সময় নেই’ জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার কল করা হরেও তিনি ফোন ধরেননি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহজের এমডি মালিহা এম কাদিরের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ধরেননি। তবে খুদেবার্তা পাঠানো হলে তার জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহাত আহমেদ নিউজবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ফারহাত আহমেদ ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বললে ১১ মে সেগুলো পাঠানো হয়। এর আট দিন পর বুধবার তিনটি প্রশ্নের জবাব দেন মালিহা।

তিনি দাবি করেন, দরপ্রস্তাব দাখিলের যোগ্যতা সহজের নেই- এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির লিড পার্টনার সহজ লিমিটেডের তৈরি করা একটি সফটওয়্যার তথা একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক বছরে মাত্র চারটি অপারেটরের মাধ্যমেই ৭৫ লাখের বেশি টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতা রাখে। এ ছাড়া সহজ লিমিটেড-এর আছে ১০০+ বাস অপারেটর। যদিও অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা টেন্ডার বা উন্মুক্ত দরপত্রে উল্লেখ নেই। তবে সব দিক মিলিয়ে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের দরপত্র অনুযায়ী টেন্ডার এলিজিবেল।’

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
যেভাবে সহজের টিকিটপ্রতি সার্ভিস চার্জ ২৫ পয়সা

দরপত্র ফরমে অতিরিক্ত সারি যোগ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী ৮.০১ পর্যন্ত রোতে জেভির রেভিনিউয়ের বর্ণনা দিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক দরপত্র প্রস্তাবে এও উল্লেখ আছে টেন্ডারারকে অবশ্যই তার রেভনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ উল্লেখ করতে হবে।

‘অতিরিক্ত ৮.০২ রোতে রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এভিনিউয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা যোগ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ রেলওয়ের টেন্ডার নির্দেশনাতেই আছে। সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি কোনোভাবেই আর্থিক দরপত্রের প্রস্তাব থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মতো করে রো কিংবা অপ্রাসঙ্গিক কোনো তথ্য তৈরি করেনি বা যোগ করেনি।’

রেলের বিজ্ঞাপন আয়কে নিজেদের হিসেবে দেখিয়ে টিকিটের সার্ভিস চার্জ কম দেখানোর অভিযোগও অস্বীকার করেন মালিহা।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী টেন্ডারারকে অবশ্যই তার রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ উল্লেখ করতে হবে। টেন্ডার ফরমে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে যে রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ সুষ্ঠুভাবে টেবিল বা রো আকারে উল্লেখ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয়কৃত মূল্যের বিস্তারিত তথ্য দরপত্রে বিস্তারিতভাবে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি উল্লেখ করেছে।

‘দরপত্রের আর্টিকেল জি.৯ সেকশনের (আরইভি) টেন্ডারারকে অনুমতি দেয় তার প্রস্তাবিত রেভিনিউর বিভিন্ন এভিনিউয়ের বিস্তারিত তথ্য দেয়া এবং একই সঙ্গে কীভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে এ থেকে সার্ভিস প্রদান করতে পারবে। সেই সঙ্গে আর্টিকেল জি.৯ সেকশনের আরইভি-০২ টেন্ডারারকে অনুমতি দেয় নিজের মূল্য কমিয়ে নেবার। এগুলো পর্যালোচনা করলেই কীভাবে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি প্রতি টিকিটের টাকা ২৫ পয়সা করেছে তা মূল্যায়ন করা যাবে।’

আরও পড়ুন:
টিটিই শফিকুলের বিরুদ্ধে তদন্ত: প্রতিবেদন জমা দেয়নি কমিটি
রেললাইনে পড়েছিল অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ
প্রতি বগিতে বিনা টিকিটের ১০ যাত্রী
কাজে ফিরেই ৯ হাজার টাকা জরিমানা টিটিই শফিকুলের
বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ার ‘সুযোগ দেন’ রেলকর্মীরাই

মন্তব্য

p
ad-close 20220623060837.jpg
উপরে