× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট

বাংলাদেশ
Bhairab Rupsha Mayur poisoned in city waste
hear-news
player
print-icon
বিশ্ব পরিবেশ দিবস

শহরের বর্জ্যে বিষাক্ত ভৈরব-রূপসা-ময়ূর

শহরের-বর্জ্যে-বিষাক্ত-ভৈরব-রূপসা-ময়ূর
ময়ূর নদ। ছবি: নিউজবাংলা
নগরে সৃষ্ট বর্জ্যের সবটুকু নিষ্কাশনের সক্ষমতা নেই খুলনা সিটি করপোরেশনের। ফলে প্রতিদিন কঠিন বর্জ্যের একটি বড় অংশ নালা-নর্দমার মাধ্যমে মিশে যাচ্ছে এই তিন নদীতে। এতে নদীর পানির দূষণ মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে ময়ূর নদে দূষণের মাত্রা ভয়াবহ।

খুলনা মহানগরীর অবস্থান ভৈরব ও রূপসা নদীর মিলনস্থলে। আর রূপসা নদী থেকে একটি শাখা বেরিয়ে ময়ূর নদ নামে প্রবেশ করেছে এ শিল্প শহরের ভেতরে।

সঠিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাবে এই তিন নদী বিশেষ করে ময়ূর নদ ভাগাড়ে পরিণত হতে চলেছে। অন্য দুটিতেও জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে বর্জ্য। ঘটছে পরিবেশ দূষণ। পানি দূষিত হয়ে পড়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ।

এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

নগরে সৃষ্ট বর্জ্যের সবটুকু নিষ্কাশনের সক্ষমতা নেই খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি)। ফলে প্রতিদিন কঠিন বর্জ্যের একটি বড় অংশ নালা-নর্দমার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে মিশে যাচ্ছে এই তিন নদীতে। ফলে নদীর পানির দূষণ মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে ময়ূর নদ বদ্ধ থাকায় সেখানে দূষণের মাত্রাও কয়েক গুণে বেশি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক দুটি গবেষণাপত্র ও পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা কার্যালয়ের ‘রিভার ওয়াটার এনালাইসিস শিট’ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭ অনুসারে অভ্যন্তরীণ ভূ-পৃষ্ঠের পানির বিশুদ্ধতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয় সাধারণত পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ, প্রাণরাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা ও পানিতে দ্রবীভূত ভৌত উপাদানের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে।

গত এপ্রিল মাসে ময়ূর নদ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের সংগ্রহ করা নমুনার জরিপে দেখা যায়, পানি বিশুদ্ধতার মানদণ্ড ও আদর্শ সীমার সঙ্গে ওই নদের পানির ব্যাপক তারতম্য রয়েছে।

শহরের বর্জ্যে বিষাক্ত ভৈরব-রূপসা-ময়ূর

দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ (ডিও)

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে ময়ূর নদের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি লিটারে দশমিক ২ থেকে দশমিক ৬ মিলিগ্রাম। অথচ ডিওর আদর্শ মাত্রা বিবেচনায় প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলিগ্রামের বেশি হওয়া উচিত। পানিতে ডিওর মাত্রা কম হওয়ায় এই নদীর পানি জলজ প্রাণী ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

ময়ূর নদে প্রতিদিন যেসব কঠিন বর্জ্য মিশে যাচ্ছে, তা জারনের মাধ্যমে বিনষ্ট হতে প্রচুর পরিমাণ দ্রবীভূত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। ফলে ওই পানির ডিও দিন দিন কমে যাচ্ছে।

প্রাণ রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি)

পানিতে মিশ্রিত বর্জ্য বিয়োজিত করতে অণুজীবগুলোর যে পরিমাণ অক্সিজেন দরকার হয়, তাকে বিওডি বলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, পানির আদর্শ বিওডি হলো প্রতি লিটারে ৬ মিলিগ্রাম। এই মান ১০-এর ওপরে গেলে সেই পানিকে দূষিত পানি হিসেবে ধরা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে ময়ূর নদের পানির বিওডির মাত্রা প্রতি লিটারে ৭৮ থেকে ৮৬ মিলিগ্রাম, যা আদর্শ মানদণ্ডের সীমা থেকে বহুগুণে বেশি।

পানিতে দ্রবীভূত ভৌত উপাদান (টিডিএস)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, পানিতে দ্রবীভূত ভৌত উপাদানের আদর্শ পরিমাণ (টিডিএস) প্রতি লিটারে ৩০০ মিলিগ্রাম। এই মাত্রা এক হাজারের ওপরে গেলে সেই পানি মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী ধরা হয়। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ময়ূর নদের প্রতি লিটার পানিতে সর্বোচ্চ ৬০৬০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত টিডিএস পাওয়া গেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘খুলনায় সবচেয়ে বেশি দূষণ এখন পানিতে। বিশেষ করে শহরের পার্শ্ববর্তী নদীর পানির মান অনেক বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আর ময়ূর নদের পানির দূষণের মাত্রা অনেক বেশি।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা

ময়ূর নদের পানি নিয়ে ২০১৩ ও ২০২০ সালে পৃথক দুটি গবেষণা করেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণা দুটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত।

তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালের গবেষণায় আমরা পেয়েছিলাম, ময়ূর নদের পানিতে অতিমাত্রায় টিডিএস রয়েছে। ফলে ওই পানি বেশ দূষিত ও গন্ধযুক্ত ছিল। তবে ওই নদের মাটির পুষ্টি গুণাগুণ বেশ ভালো পাওয়া গিয়েছিল।

‘সেখানে মাটির যেসব গুণাগুণ পাওয়া গিয়েছিল তা কৃষিকাজের জন্য বেশ উপযোগী ছিল। কেসিসি বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকলে এ নদীর পরিবেশ ভালো থাকত।’

শহরের বর্জ্যে বিষাক্ত ভৈরব-রূপসা-ময়ূর

অধ্যাপক দিলীপ বলেন, ‘২০২০ সালে আমাদের গবেষণাটি ছিল মূলত খুলনা শহরের পানির নিরাপত্তা নিয়ে। এ গবেষণায় আমরা পেয়েছিলাম, খুলনা শহরের পানির চাহিদা মেটাতে ময়ূর নদকে বিশুদ্ধ পানির আধার হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।’

তিনি জানান, খুলনার বিল পাবলা এলাকা থেকে রূপসার আলুতলা পর্যন্ত ময়ূর নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার। আলুতলায় ১০ বেন্টের একটি গেট তৈরি করে এটির প্রবাহ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে এখানে কোনো জোয়ার-ভাটা হয় না। খুলনা শহরের মধ্যে এই নদের ৬টি শাখা ছড়িয়ে আছে। শহরের গৃহস্থ ও বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানির ৮০ শতাংশ ২২টি ড্রেনের মাধ্যমে এই নদে পড়ছে। ফলে এখানে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি।

দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘নদটি সংস্কার করে বর্ষা মৌসুমে স্বাদু পানি ধরে রাখা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে বছরজুড়ে সেই পানি দিয়ে শহরের মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো যাবে।’

শহরের বর্জ্য পড়ছে নদীতে

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান কনজারভেন্সি অফিসার আব্দুল আজিজ বলেন, ‘শহরে প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১২৫০ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে মেডিক্যাল বর্জ্যই থাকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ টন।’

‘সিটি করপোরেশনের কর্মীরা প্রতিদিন ৮০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ফেলে আসেন। বাকি ৪০০ থেকে ৪৫০ টন বর্জ্য ড্রেন বা ফাঁকা জমিতে শহরের মানুষ ফেলে দেয়।’

‘শহরের সব বর্জ্য সংগ্রহের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট ও কর্মী নেই। আমাদের ৩১টি ওয়ার্ডের সেকেন্ডারি ট্রান্সপোর্ট স্টেশন থেকে প্রতিদিন ১৯৮ জন স্থায়ী ও ৭১০ জন অস্থায়ী কর্মী বর্জ্য অপসারণ করেন। নগরবাসীর উচিত, ড্রেনে বা ফাঁকা জমিতে ময়লা না ফেলে কেসিসির সেকেন্ডারি ট্রান্সপোর্ট স্টেশনে ফেলা।’

খুলনাঞ্চলের নদ-নদী ও পরিবেশ নিয়ে প্রায় ২৫ বছর ধরে গবেষণা করছেন গৌরাঙ্গ নন্দী। তিনি বলেন, ‘কেসিসি যেসব বর্জ্য সংগ্রহ করে না, তা কোনো না কোনোভাবে ড্রেনের মাধ্যমে ময়ূর, ভৈরব ও রূপসা নদীতে গিয়ে পতিত হয়। এতে নদীর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, পানিতে দূষণের মাত্রাও বাড়ছে।’

‘ভৈরব ও রূপসা নদীতে এখনো জোয়ার-ভাটা হয়। তাই সেখানে পতিত বর্জ্য বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ময়ূর নদটি বদ্ধ হওয়া পতিত বর্জ্য সেখানে দূষণ বাড়াচ্ছে। শহরের পরিবেশ রক্ষার জন্য অবিলম্বে নদটি সংস্কার করে স্বাদু পানির আধার হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।’

আরও পড়ুন:
দূষণ: সেই চুল্লি গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন
শব্দ দূষণের জন্য দায়ীদের শাস্তি দাবি
নদীতে ওষুধের যৌগ বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি: গবেষণা
আগেই ফুটছে ফুল, শঙ্কায় বিজ্ঞানীরা
যত্রতত্র আবর্জনায় হুমকিতে চবির পরিবেশ

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Seeing the bridge the horrible memory of the launch sink floats in my mind

সেতু দেখে লঞ্চডুবির ভয়াল স্মৃতি মনে ভাসে

সেতু দেখে লঞ্চডুবির ভয়াল স্মৃতি মনে ভাসে
খাদিজা আক্তার বলেন, ‘যে দিন লঞ্চ ডোবে, সেই দিন আমি ওই লঞ্চে উঠতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পেছন থেকে আমার ভাই ডাক দেয়ায় আমি লঞ্চে উঠতে পারিনি। পরের লঞ্চে উঠি। ওই লঞ্চটি (পিনাক-৬) ডুবে যাওয়ার সময় আমাদের লঞ্চটি পেছনেই ছিল।’

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবার বাসিন্দা খাদিজা আক্তার। এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন ২০১৪ সালে পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ভয়াবহ স্মৃতি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর জাজিরা প্রান্তের বাংলাবাজার এলাকায় জনসভায় বক্তব্য দেবেন। সেই জনসভার মঞ্চ দেখতে শুক্রবার বিকেলে এসেছিলেন খাদিজা। এ সময় তার সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার।

খাদিজা বলেন, ‘যে দিন লঞ্চ ডোবে, সেই দিন আমি ওই লঞ্চে উঠতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পেছন থেকে আমার ভাই ডাক দেয়ায় আমি লঞ্চে উঠতে পারিনি। পরের লঞ্চে উঠি। ওই লঞ্চটি (পিনাক-৬) ডুবে যাওয়ার সময় আমাদের লঞ্চটি পেছনেই ছিল। সেই দিন চোখের সামনে লঞ্চটি ডুবে যায়। হারিয়ে যায় কত মানুষ। ওই দৃশ্য মনে পড়লে এখনও ভয় লাগে।’

তিনি বলেন, ‘এখন পদ্মা সেতু হয়ে গেল। দেখেই মনডা আনন্দে ভরে যায়। আমরা এখন সেতুর উপর দিয়ে যেতে পারব। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই।’

শরীয়তপুর থেকে এক দিন আগেই সমাবেশস্থলে হাজির হয়েছেন মো. আলী। তিনি বলেন, ‘এই পদ্মা সেতু করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন। এই সেতুর ফলে আমাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে।’

ঝিনাইদহ থেকে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধা নূর বক্স। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানে আসবেন, তাই আমি এসেছি। এই সেতু পেয়ে আমাদের আনন্দের সীমা নেই। আমি তিন দিন আগেই এসেছি। প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি এখানে থাকব।’

তিনি বলেন, ‘এই সেতুর ফলে দেশ স্বাধীনের পর দ্বিতীয় বড় আনন্দ হচ্ছে আমাদের।’

সেতু দেখে লঞ্চডুবির ভয়াল স্মৃতি মনে ভাসে
পিনাক-৬ লঞ্চডুবির প্রত্যক্ষদর্শী খাদিজা আক্তার। ছবি: নিউজবাংলা

স্থানীয় বাসিন্দা নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমরা কখনও ভাবিনি সেতু দেখে যেতে পারব। স্বপ্নের সেতু এখন সত্য (বাস্তব) হয়েছে। পদ্মা সেতুর ফলে আমরা নতুন জীবন পাইলাম।’

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পিনাক-৬ লঞ্চটি ডুবে যায়। সেই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া নিখোঁজ হন ৬৪ জন, যাদের আর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া পদ্মায় বিভিন্ন সময় ট্রলার, স্পিডবোট ডুবে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

আরও পড়ুন:
পদ্মা সেতু ঘিরে সবুজের সমারোহ
পদ্মা সেতুর বর্ণিল ছটা হাতিরঝিলেও
যাদের জমিতে পদ্মা সেতু, চোখে তাদের আনন্দাশ্রু
দ্য লাস্ট ফেরি অন পদ্মা
পদ্মায় পাইলিংয়ে লেগেছে বিপুল শক্তির জার্মান হ্যামার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The skyrocketing day of pride in Bangladesh

বাংলাদেশের আকাশছোঁয়া অহংকারের দিন

বাংলাদেশের আকাশছোঁয়া অহংকারের দিন বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আজ। ছবি: নিউজবাংলা
প্রমত্তা পদ্মার ওপর দিয়ে নির্মিত সেতুটি খুলে দেয়ার আগেই বিশ্বব্যাপী এটি পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশের ‘মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক’ হিসেবে। স্বপ্নের সেই সেতুর বহুল প্রতীক্ষিত উদ্বোধন আজ।

‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়ঃ/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

গল্পটা মাথা তুলে দাঁড়াবার, গল্পটা বিশ্বকে বিস্মিত করে নিজেদের সক্ষমতা জানান দেয়ার। গল্পটা পদ্মা সেতুর। এই গল্প বাংলাদেশের আকাশস্পর্শী অহংকারের।

আর তাই প্রমত্তা পদ্মার উপর দিয়ে নির্মিত সেতুটি খুলে দেয়ার আগেই বিশ্বব্যাপী এটি পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশের ‘মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক’ হিসেবে। স্বপ্নের সেই সেতুর বহুল প্রতীক্ষিত উদ্বোধন আজ।

দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ এনে অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নিলে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সেতু নির্মাণ, শুরু হয় রাজনৈতিক বাদানুবাদ। উত্তাল-অস্থির সেই সময়ে অনমনীয় দৃঢ়তায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর প্রায় এক দশক পর তার হাতেই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে স্বপ্নের সেতুটি।

২৫ জুন শনিবার ঘড়ির কাঁটা সকাল ১০টা নির্দেশ করতেই উদ্বোধন হবে পদ্মা সেতু। মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। তবে এর একদিন পর যান চলাচল শুরু হবে পদ্মা সেতুতে।

জমকালো আয়োজন চূড়ান্ত

সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে পদ্মার দুই পার এখন উচ্ছ্বাস মুখরিত। জমকালো আয়োজনে সেতু খুলে দেয়ার অপেক্ষায় সারা দেশ।

শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের উদ্দেশে হেলিকপ্টারে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যোগ দেবেন সুধী সমাবেশে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাড়ে তিন হাজার নাগরিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এই সমাবেশে।

পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে দায়ী করা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও বাদ পড়েনি আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা থেকে। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেতু নিয়ে নানা সমালোচনা করে আসা রাজনৈতিক দল বিএনপির সাত নেতাকেও।

বেলা ১১টার দিকে স্মারক ডাকটিকিট, স্যুভেনির শিট, উদ্বোধনী খাম ও সিলমোহর অবমুক্ত করবেন সরকারপ্রধান। পদ্মা সেতু নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেয়ার কথাও রয়েছে তার। বেলা ১১টা ১২ মিনিটে টোল দিয়ে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর ১১টা ২৩ মিনিটের দিকে পদ্মা সেতু পাড়ি দেবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এ সময় কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি থেকে নেমে সেতুতে পায়চারি করতে পারেন তিনি।

বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের দিয়ে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে পৌঁছেই পদ্মার সেতুর আরেকটি উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর কাঁঠালবাড়ির ইলিয়াছ আহমেদ চৌধুরী ফেরিঘাটে আওয়ামী লীগের জনসভায় দলপ্রধান হিসেবে যোগ দেবেন শেখ হাসিনা।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের দিকে ছয়টি স্প্যান ও জাজিরা প্রান্তের দিকের ছয়টি স্প্যান সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হতে পারে।

রোববার ভোর ৬টা থেকে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে পদ্মা সেতু। ফুরাবে ফেরি পারাপারের বিড়ম্বনা, বাঁচবে সময়। বদলে যাবে দৃশ্যপট, আরও সচল হবে দেশের অর্থনীতির চাকা।

স্বপ্নের শুরু

বিচ্ছিন্ন জনপদ হয়ে থাকা দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করতে পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। তবে সেটি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান তৎপরতা শুরু হয় ২৫ বছর আগে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে জাপান সফরে যান তিনি। সে সময়ের ঘটনা স্মরণ করে বুধবার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পদ্মা নদী এবং রূপসা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করি। জাপান সরকার দুটি নদীর ওপরই সেতু নির্মাণে রাজি হয়। যেহেতু পদ্মা অনেক খরস্রোতা, বিশাল নদী, তাই পদ্মা নদীতে সমীক্ষা শুরু করে।’

সমীক্ষা শেষে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তকে পদ্মা সেতু নির্মাণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করে জাপান। সেই সমীক্ষার ভিত্তিতে ২০০১ সালের ৪ জুলাই মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। এর ঠিক ১১ দিন পর, অর্থাৎ ওই বছরের ১৫ জুলাই শেষ হয় আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ। পরের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট।

পদ্মা সেতুকে মাওয়া প্রান্ত থেকে সরিয়ে আরিচায় নেয়ার চেষ্টা করে বিএনপি-জামায়াত জোট। তবে শেষ পর্যন্ত হয়নি পদ্মা সেতু।

আবারও ঘুরে দাঁড়ানো

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। আবারও শুরু হয় পদ্মা সেতু নির্মাণে তোড়জোর।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে ২০১১ সালের মধ্যে শেষ করা হয় সেতুর মূল নকশা প্রণয়নের কাজ। ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঠিক এক বছর পর ২০১১ সালের ১১ এপ্রিল সেতুতে রেলপথ যুক্ত করে প্রকল্প সংশোধন করা হয়।

তার ১৭ দিন পর অর্থাৎ ২৮ এপ্রিল সেতু নির্মাণে অর্থায়নের বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে সই করে সরকার। ওই বছরের ২৪ মে সই হয় আইডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি সই হয় ৬ জুন।

চোখ রাঙানোর সাহস

২০১২ সালের জুনে এসে পাল্টে যায় সব হিসাব-নিকাশ। ওই বছরের ২৯ জুন দুর্নীতিচেষ্টার অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে এগিয়ে আসা দাতা সংস্থাগুলো বাতিল করে ঋণচুক্তি।

অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় পদ্মা সেতুর ভবিষ্যৎ। ঠিক পাঁচ দিন পর ৪ জুলাই সংসদে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। শুরুতে সেই কথা অনেকে গ্রহণ করতে পারেননি। ৮ জুলাই আবারও সংসদে দাঁড়িয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা জানান বঙ্গবন্ধুকন্যা।

পরে অবশ্য বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ কানাডার আদালতে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। বিশ্বব্যাংক কানাডার আদালতে এসএনসি লাভালিন নামে দেশটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। এই প্রতিষ্ঠানটিই পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পাওয়ার কথা ছিল। তবে সেই মামলা টেকেনি, দেশটির একটি আদালতে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে ‘গালগপ্প’ বলে উড়িয়ে দেয়।

স্বপ্ন হলো সত্যি

২০১৪ সালের ৭ জুলাই শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত সেতুটির নির্মাণকাজ। দেশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় সেতুটি। তিন বছরের বেশি সময় পর ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বসানো হয় প্রথম স্প্যান। পদ্মার দুটি তীরকে সংযুক্ত করতে প্রয়োজন হয় ৩ হাজার ২০০ টন ওজনের ৪১টি স্প্যান।

পদ্মা সেতুর পিলারে প্রতিটি স্প্যান বসানোর খবর জায়গা করে নেয় সংবাদপত্রের শিরোনামে। প্রমত্তা পদ্মায় সেতুটি যত দৃশ্যমান হয়েছে, বেড়েছে মানুষের আগ্রহ। সবশেষ ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ৪১তম স্প্যানটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে পদ্মার বুকে রচিত হয় বাংলাদেশের গৌরবগাথা।

প্রকৃতির বাধা

খরস্রোতা পদ্মা জয়ের কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। দুর্নীতিচেষ্টার ভিত্তিহীন অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের সরে দাঁড়ানো, রাজনৈতিক বাদানুবাদ পেরিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের শুরুতেই সামনে আসে প্রমত্তা পদ্মাকে নিয়ন্ত্রণে আনার চ্যালেঞ্জ।

২০১৫ সালের শেষ দিকে সেতুর ৬ ও ৭ নম্বর পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়। তিনটি করে ছয়টি পাইলের নিচের দিকে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন প্রকৌশলীরা। এর প্রধান কারণ নদীর তলদেশে নরম মাটির স্তর।

তখন ওই দুটি পিলারের ছয়টি পাইলের ওপরের কাজ বন্ধ রাখা হয়। পরে আরও ২১টি পিলারের পাইলিংয়ের সময় তলদেশে কাদামাটি পাওয়া যায়। নদীর তলদেশে পাথর না থাকায় পাইলিংয়ের কাজ ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। ফলে নকশা বদলে পাইলিংয়ের উপরিভাগে করতে হয়েছে স্ক্রিন গ্রাউটিং। স্ক্রিন গ্রাউটিং বা অতিমিহি সিমেন্টের স্তরের মাধ্যমে পাইলের উপরিভাগে ওজন বহনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

পিলার নির্মাণ করতে গিয়ে ৯৮ থেকে ১২২ মিটার গভীর পর্যন্ত পাইলিং করতে হয়েছে। পৃথিবীতে আর কোনো সেতু নির্মাণে এতটা গভীর পাইলিং করতে হয়নি। ফলে এটি একটি বিশ্ব রেকর্ড।

পদ্মা সেতুর পাইলগুলোও তিন মিটার ব্যাসার্ধের। অন্য কোনো সেতুর পাইলের ব্যাসার্ধও এত নয়। পদ্মা সেতুর প্রতিটি পাইল ৫০ মিলিমিটার পুরু স্টিলের পাইপে মোড়া।

আর এ কাজটি করার জন্যই জার্মানি থেকে আনা হয় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। জার্মানির মিউনিখে তৈরি ৩৮০ টন ওজনের হ্যামারটি সর্বোচ্চ শক্তি তিন হাজার কিলোজুল। এর সাহায্যে পিটিয়ে পাইলের স্টিলের পাইপগুলো নদীতে পোঁতা হয়।

তিন হাজার ২০০ টন ওজনের স্প্যানকে পদ্মার বুকে নিয়ে পিলারে বসানোর কাজটিও সহজ ছিল না। এ জন্য চীন থেকে নিয়ে আসা হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তির ভাসান ক্রেন ‘তিয়ান-ই’-কে। পদ্মা সেতুর নির্মাণের প্রতি মুহূর্তকে তাই বলা হয় চ্যালেঞ্জিং।

জনসাহসে মাথা উঁচু

দীর্ঘ এক দশক পর যখন সেতুটির সফল বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে, তখন তার পুরো কৃতিত্বটা দেশের জনগণকেই দিলেন সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ হাসিনা। দেশের মানুষের সাহসের কারণেই পদ্মা সেতু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বলে বিশ্বাস করেন প্রধানমন্ত্রী।

বুধবার শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। শুধু ধন্যবাদ নয়, আমি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। কারণ যেদিন আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম, এই সেতু নিজস্ব অর্থায়নে করব, অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মানুষের শক্তিতে আমি বিশ্বাস করি।

‘মানুষের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব সাড়া আমি পেয়েছিলাম, এটাই কিন্তু আমার সাহস এবং শক্তি। সেটুকু আপনাদের জানিয়ে রাখি। তাই দেশের মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের সহযোগিতার, তাদের সাহসে, এই জনমানুষের সাহসে আজ পদ্মা সেতু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।’

পদ্মা সেতুর ব্যয়

২০১১ সালে সেতুর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে সংশোধিত ডিপিপিতে পদ্মা সেতুর ব্যয় ধরা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।

প্রথম ডিপিপিতে সেতুর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে তিনটির নিচ দিয়ে নৌ চলাচলের ব্যবস্থা রেখে নকশা করা হয়। পদ্মার স্রোতের কথা ভেবে পরে ৩৭টি স্প্যানের নিচ দিয়েও নৌযান চলাচলের সুযোগ রাখার বিষয়টি যুক্ত করা হয়। যুক্ত হয় রেল সংযোগ।

কংক্রিটের বদলে ইস্পাত বা স্টিলের অবকাঠামোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেতু নির্মাণে পাইলিংয়ের ক্ষেত্রেও বাড়তি গভীরতা ধরা হয়। বেড়ে যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ব্যয়ও।

২০১৬ সালে যখন ব্যয় বাড়ানো হয়, তখন মূল সেতু নির্মাণ, নদীশাসনসহ সব কাজের ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হয়ে যায়। এর মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৯ টাকা কমে যায়। ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ নতুন করে যুক্ত হয়। মূল সেতু, নদীশাসন ও সংযোগ সড়কে যে পরিমাণ অর্থে ঠিকাদার নিয়োগ দেয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তা থেকে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়। ২০১৮ সালে সর্বশেষ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয় জমি অধিগ্রহণের কারণে।

সবমিলিয়ে পদ্মা সেতুর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়ে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

প্রধানমন্ত্রী নিজে জানিয়েছেন, এর মধ্যে মূল সেতু তৈরিতে খরচ হয়েছে, ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এই টাকার মধ্যে আবার ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন টাওয়ার ও গ্যাসলাইনের জন্য খরচ হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা।

এছাড়া নদী শাসনে ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, অ্যাপ্রোচ সড়কে এক হাজার ৯০৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, পুনর্বাসনে এক হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, ভূমি অধিগ্রহণে ২ হাজার ৬৯৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন ২১ জুন পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৯৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর মূল সেতুর কাজ শেষ হয়েছে ৯৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।

আরও পড়ুন:
পদ্মা সেতু ঘিরে সবুজের সমারোহ
পদ্মা সেতুর বর্ণিল ছটা হাতিরঝিলেও
যাদের জমিতে পদ্মা সেতু, চোখে তাদের আনন্দাশ্রু
দ্য লাস্ট ফেরি অন পদ্মা
পদ্মায় পাইলিংয়ে লেগেছে বিপুল শক্তির জার্মান হ্যামার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Sing the joy of winning dreams

স্বপ্ন জয়ের আনন্দ গানে গানে

স্বপ্ন জয়ের আনন্দ গানে গানে আনন্দে মেতেছে পুরো দেশ। গানে গানে সেই আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন দেশসেরা কয়েকজন শিল্পী। ছবি: সংগৃহীত
গান নিয়ে ইমরান বলেন, ‘পদ্মা সেতু আমাদের স্বপ্নের সেতু। এতটা বছর আমরা অপেক্ষা করেছি সেতুটির জন্য, যাতে আমাদের জীবনযাত্রার মান অনেক সহজ হয়। সেই সময়টা চলে এসেছে, আমরা সবাই খুব খুশি।’

স্বপ্ন জয়ের আনন্দে পুরো দেশ। জলে ভাসতে থাকা স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে পদ্মা সেতু হয়ে। শনিবার সেতুটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সেতু নির্মাণের মাধ্যমে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের স্বপ্নই যে শুধু পূরণ হয়েছে তা নয়। পদ্মা সেতু দেশের সক্ষমতার প্রতীক।

তাই সেতু চালু হওয়াকে কেন্দ্র করে আনন্দে মেতেছে পুরো দেশ। গানে গানে সেই আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস করেছেন দেশসেরা কয়েকজন শিল্পী।

পদ্মা সেতুর অফিশিয়াল থিম সংয়ের কথা এমন- ‘তুমি অবিচল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তুমি ধুমকেতু/বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন দেশ তুমি দিলে পদ্মা সেতু/পেরিয়ে সকল অপশক্তি শত সহস্র বাধা/পদ্মা সেতু মাথা উঁচু করা আত্মমর্যাদা/মাথা নোয়াবার নয় বাঙালি যেহেতু/বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন দেশ তুমি দিলে মর্যাদা পদ্মা সেতু’।

কবীর বকুলের কথায় গানটির সুর-সংগীত করেছেন কিশোর দাস। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন, রফিকুল আলম, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, কুমার বিশ্বজিৎ, বাপ্পা মজুমদার, মমতাজ বেগম, দিলশাদ নাহার কনা, ইমরান মাহমুদুল, নিশিতা বড়ুয়া ও কিশোর দাশ।

গানটি নিয়ে কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘স্রষ্টার কাছে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছেও কৃতজ্ঞ, আমাদের এমন একটি গৌরব ও মর্যাদা এনে দেয়ার জন্য।’

বাপ্পা মজুমদার বলেন, ‘স্বপ্নটাকে চোখের সামনে দেখে এক আনন্দ লাগল, কী বলব! এ এক বিস্ময়। আমরা সবাই খুব খুশি।’

কনা বলেন, ‘শুটিং করতে গিয়ে যখন সেতুটি কাছ থেকে দেখলাম, তখন মনটা ভরে গেছে। এর আগে টিভিতে বা অনেক দূর থেকে দেখেছি। খুবই ভালো লাগছে।’

গান নিয়ে ইমরান বলেন, ‘পদ্মা সেতু আমাদের স্বপ্নের সেতু। এতটা বছর আমরা অপেক্ষা করেছি সেতুটির জন্য, যাতে আমাদের জীবনযাত্রার মান অনেক সহজ হয়। সেই সময়টা চলে এসেছে, আমরা সবাই খুব খুশি।’

আরও পড়ুন:
হংকং সিঙ্গাপুরের মতো সম্ভাবনা শরীয়তপুরের সামনে
কেমন থাকবে পদ্মা সেতু এলাকায় উদ্বোধনী দিনের আবহাওয়া
পদ্মা সেতুর জন্য বিদ্যুৎ লাগবে কতটা?
স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে জড়িয়ে বিশ্বখ্যাত গ্রি এসি
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অসাধারণ অনন্য এক স্থাপনা

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The Last Ferry on Padma

দ্য লাস্ট ফেরি অন পদ্মা

দ্য লাস্ট ফেরি অন পদ্মা শিমুলিয়া থেকে মাঝিরকান্দির উদ্দেশে যাত্রা করা ফেরি কুঞ্জলতা। ছবি: নিউজবাংলা
মাওয়া-জাজিরাকে যুক্ত করা পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে এই নৌরুটের শিমুলিয়া ছেড়ে যাওয়া শেষ ফেরি ‘কুঞ্জলতা’। আর ওপারের মাঝিরকান্দি থেকে ছাড়ে ‘বেগম রোকেয়া’। যানবাহন নিয়ে শেষ যাত্রায় আবেগতাড়িত কুঞ্জলতার ইনচার্জ মাস্টার সামশুল আলম সাইফুল। খুলে দিলেন অজস্র স্মৃতির ঝাঁপি।

সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। পদ্মার তীরে মৃদুমন্দ বাতাস। একটা মিনি ট্রাক ওঠার পর বন্ধ হয়ে গেল ফেরির দরজা। গগনবিদারী শব্দ তুলে সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় কুঞ্জলতায় বাজল প্রস্থান ঘণ্টা।

নদীর অন্য প্রান্তে মাঝেরকান্দি ঘাট। কুঞ্জলতা যখন পদ্মায় ভাসে এই ঘাটের পথে, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তখন শিমুলিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে মাঝিরকান্দিতে নোঙর করা ফেরি ‘বেগম রোকেয়া’। এই দুটি ফেরির ঘাট ছাড়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে দক্ষিণের পথে সড়কযাত্রায় পদ্মার মাওয়া-জাজিরা নৌরুটে ফেরি যুগের দৃশ্যত অবসান ঘটল।

দেশের অহংকার হয়ে প্রমত্তা পদ্মার বুকে নির্মিত হয়েছে সেতু। সেই সেতু খুলে দিতে শনিবার মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের পর রোববার ভোরে পদ্মা সেতু খুলে দেয়া হবে যান চলাচলের জন্য।

সেতুটি উদ্বোধনের পর স্থানীয় পর্যায়ের নৌযান পারাপারে সীমিত পরিসরে এই রুটে ফেরি থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে দূরপাল্লার প্রায় সব যানবাহন ২৬ জুন থেকে সহজ চলাচলের জন্য ব্যবহার করবে পদ্মা সেতু।

কর্তৃপক্ষ বলছে, সেতুর উদ্বোধন কেন্দ্র করে শনিবার রাত পর্যন্ত এই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে কয়েক দিন ধরে পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে প্রতি রাতেই ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে। একই অবস্থা শনিবার রাতেও থাকলে যান চলাচলের জন্য রোববার ভোরে সেতু খুলে দেয়ার আগে শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি নৌরুটে আর ফেরি চলাচলের সম্ভাবনা নেই।

কুঞ্জলতার শেষ প্রাইভেট কার

নদী পার হয়ে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাচ্ছেন ঢাকার বাসিন্দা মো. খোকন। সব শেষ ব্যক্তিগত গাড়ি হিসেবে তার চালিত প্রাইভেট কারটি ‘দ্য লাস্ট ফেরি’ কুঞ্জতলায় ওঠে।

শেষ ফেরির যাত্রায় উচ্ছ্বসিত খোকন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এতদিন আমাদের যে কী ভোগান্তিটা না হতো- ঘাটে এসে বসে থাকা কিংবা সিরিয়াল মেইনটেইন করা। ওই সব আর হবে না। ঢাকা থেকে সরাসরি হাইওয়ে দিয়া এসে ব্রিজ দিয়ে চলে যাব।’

পদ্মা সেতু তৈরি করে সরকার দক্ষিণবঙ্গবাসীকে ঋণী করে ফেলেছে বলেও মন্তব্য খোকনের। তিনি বলেন, ‘অনুভূতি বলার মতো না। দক্ষিণাঞ্চলে আমরা যারা চলাচল করি, বিভিন্ন জায়গায় যায়, আগে যেমন একটা মানুষ মারা গেলেও ফেরির জন্য বসে থাকতে হতো। এখন আর বসে থাকার অপশন নাই। এখন আমরা সরাসরি সেতু দিয়া যামুগা।’

ফেরির শেষ গাড়ি

কুঞ্জলতা ফেরির সব শেষ গাড়ি ‘ঢাকা মেট্রো- ন ১৬-৭২৭০’ নম্বরের একটি মিনিট্রাক। ফরিদপুরের কিশোর বয়সী লিমন চালাচ্ছিলেন গাড়িটি। বললেন, সামনে আর কখনও ফেরিতে উঠতে চান না। সেতু পাড়ি দিয়ে সোজা চলে যেতে চান গন্তব্যে।

দুই বছর হলো এই পেশায় এসেছেন লিমন। ফেরি পারাপারের এই অভিজ্ঞতা মোটেও তার কাছে সুখকর নয়।

লিমন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর ওপর দিয়া যামু। ভালো উপকার হইল। এই যে আমি আম টানি। সেদিনকা পইচা গেছিল প্রায়, যদি রাইতে না যাইতে পারতাম।’

ফেরির ইনচার্জ মাস্টার সাইফুল আবেগতাড়িত

কুঞ্জলতাকে মাঝিরকান্দি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়েছে ইনচার্জ মাস্টার সামশুল আলম সাইফুলের কাঁধে। এই নৌরুটে সাড়ে চার বছর ধরে ফেরি চালাচ্ছেন তিনি। সেতু উদ্বোধনের আগে শেষবারের যাত্রায় নিজের আসনে বসে আপ্লুত সাইফুল। একের পর স্মৃতি ভর করে কথায়।

সাইফুল বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত থাকার কারণে আন্তরিকতা কাজ করতেছে। পদ্মা সেতু জাতির জন্য খুব প্রয়োজনীয় একটা জিনিস। যখন ওয়েদার খারাপ থাকে, যখন স্পিডবোট, লঞ্চ এসব বন্ধ থাকে, তখন পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের অনেক কষ্ট হয়। আমি নিজে দেখছি। অনেক সময় দেখা যেত, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এসে মানুষ যেতে পারছে না।’

দক্ষিণবঙ্গের মানুষের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে সাইফুল জানালেন, দাফনের সময় নির্ধারণ করেও ফেরি পারাপারের জটিলতায় ঠিক সময়ে মরদেহ দাফন না করার ঘটনাও ঘটেছে।

তিনি বলেন, ‘এই পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে এই কষ্ট আর থাকবে না। আমরা চাকরি করছি। আমাদের হয়তো যেখানে প্রয়োজন ম্যানেজমেন্ট সেখানে নিয়ে যাবে। সর্বশেষ ফেরিটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। তবে যতটুকু জেনেছি, এখানে ওভারলোড গাড়ি এলে বা সেতুর ওপর যেসব গাড়ি চলতে পারবে না, সেগুলো পারাপারে ফেরির দরকার পড়তে পারে।’

এই রুটে যানবাহনবোঝাই শেষ ফেরি চালানোর অনুভূতি জানাতে গিয়ে ইনচার্জ মাস্টার বলেন, ‘এই পারাপারে কথা আসলে…সবকিছু তো স্মৃতি হয়ে থাকবে। এগুলো জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে থাকবে।’

দ্য লাস্ট ফেরি অন পদ্মা
ফেরি কুঞ্জলতার ইনচার্জ মাস্টার সামশুল আলম সাইফুল। ছবি: নিউজবাংলা

সাইফুল বলেন, ‘নিরাপদে পার করে দেয়ার চেষ্টা সব সময় ছিল, আজকেও আছে। সব সময় চেষ্টা থাকে জানমাল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, জনগণের সম্পদ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিরাপদে পৌঁছে দেয়ার। এটাই কাম্য, এটাই কামনা করি। এই যাত্রাতেও যেন অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা পথে না ঘটে।’

এ রুটের যাত্রীদের খুব ‘মিস করবেন’ সাইফুল। বলেন, ‘যাত্রীরা এসে কতক্ষণ আনন্দ উল্লাস করে এ রুট-ওই রুট পার হয়ে চলে গেছেন। আবার করোনার মধ্যে কয়েকজন যাত্রী মারা গেছেন তীব্র গরমে। এগুলো হৃদয়বিদারক ঘটনা। স্মৃতি হয়ে মনে থাকবে।’

আবেগতাড়িত সাইফুল বলেন, ‘অনেক যাত্রী এসে স্টিয়ারিং ধরে বলতেন আমি একটু চালাই। আমি ভিডিও নিয়েছি, তারা সেলফি তুলেছেন। আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে দেখিয়েছেন তিনি ক্যাপ্টেন। এসব মিস করব।’

খরস্রোতা পদ্মা নিয়ে তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় যখন বাংলাবাজার থেকে এপারে আসতাম, স্রোতের কারণে ফেরি সোজা রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। আড়াআড়ি হয়ে যেত ফেরি।’

ফেরি চালাতে গিয়ে তার জীবনে ওই সময়টায় খুব কষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।

সাইফুল বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে যাতে আঘাত না লাগে, যাত্রী আর গাড়িগুলো যেন নিরাপদে পৌঁছে দিতে পারি, সেই চেষ্টাটা থাকত।’

ফেরিতে সুখ-দুঃখ

কুঞ্জলতা ফেরির লস্কর নাজমুলকে সেতু ও ঘাটের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই চটজলদি উত্তর, ‘পদ্মা ব্রিজ হইছে খুব খুশি হইছি, মানুষের কষ্ট কমব, দেশের উন্নতি হইব। আমরা এই ঘাট ছাইরা হয়তো অন্য ঘাটে ডিউটি করমু, কিন্তু এই ঘাটের সঙ্গে বহু বছরের সম্পর্ক।

‘ব্রিজের জন্য মানুষ অহন কম আসব। ফেরিতে গাড়ি লোড-আনলোড করলে গাড়ির ড্রাইভাররা খুশি হইয়া পাঁচ-দশ টাকা দিত, এইডা আমাগো বাড়তি ইনকাম ছিল। তবে দেশের ভালো তো সবার ভালো, আমাগো ইনকাম কম হইলেও সমস্যা নাই, দেশ উন্নতি করুক।’

কুঞ্জলতার কোয়ার্টার মাস্টার মো. মান্নান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সবাই একত্রিত হলে আনন্দ লাগত। সব সময় মানুষ দেখছি। সব সময় হৈ-হুল্লোড়, উল্লাসে দিন কাটাচ্ছি। এখন আমরা হয়তো আস্তে আস্তে পণ্যবোঝাই ট্রাক নেব। মানুষ থাকবে না। এত আনন্দও লাগবে না।’

শেষ ফেরি কুঞ্জলতায় ওঠা অ্যাম্বুলেন্সচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এই ঘাট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে কত রোগী নিয়ে গেছি। ঘাটের জ্যামে আটকে আমার গাড়িতে ছেলের সামনে বাবা মারা গেছে, ছোট বাচ্চা মারা গেছে। কতবার চোখের পানি মুছছি।

‘পদ্মা খালি ব্রিজ না, আল্লাহর রহমত। আমি চাই না আমার গাড়িতে আর কেউ মারা যাক।’

ফেরিঘাটে এতদিন অবর্ণনীয় দুর্ভোগ যাদের নিত্যসঙ্গী ছিল, সেই ট্রাকচালকরাও শেষ ফেরিতে চড়তে তিন দিন ঘাটে অপেক্ষা করেছেন।

পণ্যবাহী ট্রাকের চালক মিজান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত তিন দিন এই ঘাটে বসা। ১ হাজার ৫০০ টাকা এই কয়দিন এখানে বসেই খরচ করছি। শেষে উপায় না পাইয়া ঘাটে ৩০০ টাকা ঘুষও দিছি। অহন ফেরিতে উঠলাম। আল্লায় হাতে ধইরা না তুললে আর কখনও ফেরিতে উঠমু না, অহন আমাগো ব্রিজ আছে।’

আরেক ট্রাকচালক রাব্বানি অবশ্য ভাবছেন খরচ নিয়ে। এখন ফেরির খরচ কমলে তিনি সেতুর পাশাপাশি ফেরিতেও চড়তে চান।

রাব্বানি বলেন, ‘ব্রিজ হইছে ভালা কথা। কিন্তু ব্রিজের যে টোল এত টাকা দিলে আমরা পোষামু কেমনে? অহন যদি ফেরির ভাড়া কমে তাইলে আমি জরুরি কিছু না হইলে ফেরিতেও যামু। এত বছর ধইরা ঘাটের লগে পরিচয় আমার, তারে ভুইলা গেলে কেমনে হইব। আর যদি কখনও ঘাট না থাকে তাইলে মাঝেমইধ্যে বেড়াইতে আমু।’

আরও পড়ুন:
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অসাধারণ অনন্য এক স্থাপনা
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নিয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কুষ্টিয়া অঞ্চল
সেতু উদ্বোধন ও সমাবেশ নিয়ে সতর্ক নিরাপত্তা বাহিনী
‘শেষ ফেরি’তে শেষ নিঃশ্বাস
পদ্মায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রস্তুত ‘পরিদর্শন’
বাংলাদেশ
Last breath on the last ferry

‘শেষ ফেরি’তে শেষ নিঃশ্বাস

‘শেষ ফেরি’তে শেষ নিঃশ্বাস মাঝিরকান্দি থেকে ছেড়ে আসা কুঞ্জলতা ফেরিতে প্রাণ হারান আমেনা বেগম। ছবি: নিউজবাংলা
সেতু উদ্বোধনের আগে পদ্মা পাড়ি দেয়া শেষ ফেরি ‘কুঞ্জলতা’য় শেষ নিঃশ্বাস পড়ল ৭০ বছর বয়সী আমেনা বেগমের। সুচিকিৎসার জন্য বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে আসছিলেন স্বজনেরা। তবে পদ্মা পাড়ি দেয়ার সময় মাঝনদীতেই ফেরিতে প্রাণ হারান তিনি। একই ফেরিতে তার নিষ্প্রাণ দেহ নিয়ে বরিশালের পথ ধরেছে অ্যাম্বুলেন্স।

বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের বাকি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের সড়কযাত্রায় ঘুঁচবে ফেরিঘাটের ভোগান্তি। সেতু উদ্বোধনের আগের দিন মাঝিরকান্দি থেকে ছেড়ে আসা শেষ ফেরিতে প্রাণ হারালেন বৃদ্ধা আমেনা বেগম। সেতু উদ্বোধনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আমেনা পদ্মা পারাপারের সময় প্রাণ হারানো হতভাগ্য মানুষের তালিকায় আরও একটি সংখ্যা যোগ করলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার সকালে উদ্বোধনের পর রোবরার ভোরে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে পদ্মা সেতু। এর আগের দিন শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে শিমুলিয়া থেকে মাঝিরকান্দি নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় প্রশাসন।

কর্তৃপক্ষ বলছে, সেতুর উদ্বোধন কেন্দ্র করে শনিবার রাত পর্যন্ত এই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে কয়েক দিন ধরে পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে প্রতি রাতেই ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে। একই অবস্থা শনিবার রাতেও থাকলে যান চলাচলের জন্য রোববার ভোরে সেতু খুলে দেয়ার আগে শিমুলিয়া থেকে মাঝিরকান্দি নৌরুটে আর ফেরি চলাচলের সম্ভাবনা নেই। সে ক্ষেত্রে মাঝিরকান্দি থেকে ছেড়ে আসা এবং শিমুলিয়ায় পৌঁছে আবার মাঝিরকান্দির উদ্দেশে যাত্রা করা ‘কুঞ্জলতা’ হবে সেতু খুলে দেয়ার আগে শেষ ফেরি।

আর এই শেষ ফেরিতেই শেষ নিঃশ্বাস পড়ল ৭০ বছর বয়সী আমেনা বেগমের। সুচিকিৎসার জন্য বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে আসছিলেন স্বজনেরা। তবে পদ্মা পাড়ি দেয়ার সময় মাঝনদীতেই কুঞ্জলতা ফেরিতে প্রাণ হারান তিনি। একই ফেরিতে তার নিষ্প্রাণ দেহ নিয়ে বরিশালের পথ ধরেছে অ্যাম্বুলেন্স।

স্বজনেরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে স্ট্রোক করায় আমেনার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে তাকে ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দেন।

‘শেষ ফেরি’তে শেষ নিঃশ্বাস
আমেনা বেগমের মৃত্যুর পর স্বজনের বিলাপ

গুরুতর অসুস্থ আমেনাকে নিয়ে শুক্রবার সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তার বড় মেয়ে ও স্বজনেরা। সেনাবাহিনীতে কর্মরত আমেনার ছেলে ঢাকায় সিএমএইচে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। বেলা ৩টার দিকে মাঝিকান্দি ঘাটে পৌঁছে সময়মতো ফেরিও পেয়ে যায় অ্যাম্বুলেন্সটি। তবে ফেরি মাওয়া প্রান্তের কাছাকাছি এসে পাড়ে ভেড়ার আগেই মারা যান আমেনা।

দিনের শেষ ফেরি হওয়ায় কুঞ্জলতাতেই আবার ফিরতি পথ ধরে অ্যাম্বুলেন্সটি।

আমেনার ভাতিজা শাওন মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ফুপু রাতে স্ট্রোক করার পর জরুরি ভিত্তিতে সকালে ঢাকায় উদ্দেশে রওনা হই। ফেরি পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে এভাবে মাঝনদীতে তিনি চলে যাবেন আমরা বুঝিনি।’

এমন ঘটনায় হতবাক অ্যাম্বুলেন্সচালক মো. আল আমিন। আক্ষেপ করে বলেন, ‘এত তড়াহুড়া করে গাড়ি চালিয়ে আসলাম, গাড়ির পর গাড়ি ওভারটেক করলাম, পুরো রাস্তায় আল্লাহ আল্লাহ করে গেলাম যেন ফেরি পেতে সমস্যা না হয়। কিন্তু মানুষটারে হাসপাতালে পৌঁছায়ে দিতে পারলাম না।’

আমেনা প্রাণ হারানোর পর স্বজনদের আর্তনাদে কুঞ্জলতা ফেরিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ফেরির কর্মীসহ অন্য যানবাহনের কর্মী ও যাত্রীরা অ্যাম্বুলেন্সটি ঘিরে ধরেন। ফেরির লস্কর নাজমুল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাগো ফেরিতেই ওনার দম ছাড়ার কথা কপালে লেখা ছিল। ব্রিজ হয়ে গেছে, এখন আর অমন দৃশ্য দেহন লাগব না।’

পদ্মা পারাপারে ঝরেছে অসংখ্য প্রাণ

২০১৯ সালের ২৫ জুলাই। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত নড়াইলের কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স রাত ৮টার দিকে পৌঁছায় পদ্মার কাঁঠালবাড়ী প্রান্তের ১ নম্বর ফেরিঘাটে।

উন্নত চিকিৎসার জন্য তিতাসকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনেরা।

তবে এটুআই প্রকল্পে কর্মরত যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডল পিরোজপুর থেকে ঢাকা যাবেন বলে ফেরি আটকে অপেক্ষা করতে থাকে ঘাট কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৩ ঘণ্টা পর সবুর মণ্ডল ঘাটে পৌঁছালে ফেরি ছাড়ে। অ্যাম্বুলেন্সটিও ফেরিতে ওঠার সুযোগ পায়। তবে এরই মধ্যে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণে ফেরিতেই মারা যায় তিতাস।

তিতাতের মৃত্যুর ঘটনা আলোড়ন তোলে দেশব্যাপী। পরে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক সালাম হোসেনসহ তিনজনকে দায়ী করে হাইকোর্টে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. রেজাউল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি। তাতে অবশ্য যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডলকে দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

ঢাকার পথে যাত্রায় পদ্মার মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে যুগের পর যুগ দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। দুর্ভোগ অনেক সময়ে হয়েছে প্রাণঘাতী। পদ্মা পাড়ি দিতেও প্রাণহানি হয়েছে অসংখ্য।

শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি নৌপথ। ঘরির কাঁটা ১৮ জুন মধ্যরাত পেরিয়ে সাড়ে ৩টা। শরীয়তপুরের জাজিরা অংশে পদ্মা নদীর টার্নিং পয়েন্টে তীব্র স্রোতের মাঝে বেগম সুফিয়া কামাল ও বেগম রোকেয়া ফেরির সংঘর্ষ।

এই দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় ৪০ বছর বয়সী পিকআপ ভ্যানচালক খোকন শিকদারের প্রাণ। খোকনের বাড়ি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া থানার চিংবাখালী গ্রামে। পদ্মার দুই পারের মানুষ বলছেন, স্বপ্নের সেতু নৌযাত্রার বিভীষিকাময় এই অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটাতে চলেছে।

তারা বলছেন, সেতু চালু হওয়ার পরও স্থানীয়ভাবে চালু থাকবে ফেরি ও লঞ্চ পরিবহন ব্যবস্থা। তবে ঢাকা থেকে দক্ষিণের পথে যাত্রায় প্রায় সবাই ব্যবহার করবেন পদ্মা সেতু। ফেরি, লঞ্চ বা স্পিডবোটে বিপদসংকুল পদ্মা পাড়ির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আর হতে হবে না।

এই পথে নদী পারাপারের সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের সঠিক পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও স্থানীয় নৌ-পুলিশের অনানুষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে পদ্মায় বিভিন্ন নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দেড় শতাধিক মানুষ। নিখোঁজ আছেন অনেকে।

এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালের। সে বছরের ৪ আগস্ট আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে পদ্মায় ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। সরকারি হিসাবে, দুর্ঘটনার পর ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ ৬৪ জন। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ২১ জনকে মাদারীপুরের শিবচর পৌর কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। গত আট বছরেও তাদের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। হদিস পাওয়া যায়নি দুর্ঘটনার শিকার পিনাক-৬ লঞ্চটির।

গত বছরের ৩ মে কাঁঠালবাড়ীর বাংলাবাজার পুরোনো ঘাটে পদ্মা নদীতে যাত্রীবোঝাই স্পিডবোট বালুবোঝাই বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায়। এতে তিন শিশুসহ ২৬ যাত্রী মারা যান। একই বছর মাত্র ১০ দিনের মাথায় ১২ মে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের পদ্মা নদীতে একটি রো-রো ফেরিতে প্রখর রোদের তাপে পাঁচজন যাত্রী প্রাণ হারান। এনায়েতপুরী নামের ফেরিটি ঘাটে পৌঁছানোর পর জ্ঞান হারানো অর্ধশতাধিক যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া প্রায় প্রতি বছর পদ্মায় স্পিডবোটে উল্টে বা দুটি স্পিডবোটের সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছে। ট্রালারডুবিও হয়েছে অনেকবার।

শিবচর উপজেলার চরজানাজাত নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহানুল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নৌ-দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। ছোট-বড় কোনো দুঘর্টনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিই। কোথাও নৌপথে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নিই। এর বাইরে তেমন কিছু করার নেই।’

মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মাসুদ পারভেজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মা পারাপারের সময় কত যে মায়ের বুক খালি হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। চরম ভোগান্তি ও ঝুঁকি নিয়ে এতদিন ধরে এই রুটে যাত্রীরা চলাচল করছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু স্বজনহারাদের দুঃখ কিছুটা হলেও ঘুঁচাবে।’

মাদারীপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি ইয়াকুব খান শিশির বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটে ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচলের ক্ষেত্রে অনেক অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা ছিল। এ কারণেই বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। পদ্মা সেতুর কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমে আসবে।’

আরও পড়ুন:
পদ্মায় ফেরি বন্ধ
নৌকা নিয়ে পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে চান মিনারুল
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন: যেসব আয়োজন খুলনায়
পদ্মা সেতু: এবার দক্ষিণে পোশাক বিপ্লবের আশা
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নির্বিঘ্নে শেষ হলে আমাদের সন্তুষ্টি: আইজিপি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
We are satisfied if the inauguration of Padma Bridge is completed smoothly IGP

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নির্বিঘ্নে শেষ হলে আমাদের সন্তুষ্টি: আইজিপি

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নির্বিঘ্নে শেষ হলে আমাদের সন্তুষ্টি: আইজিপি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী আয়োজনের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা
‘এই আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আমার সন্তুষ্টি হবে আগামীকাল অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর। সেই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমরা সবাই মিলে দায়িত্ব পালন করছি। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি যেন কালকের অনুষ্ঠানটি নিরাপদ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়।’

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী আয়োজন নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার পরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্তুষ্টি আসবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ।

একই সঙ্গে আয়োজনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো প্রস্তুত আছে বলেও জানান তিনি।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে শুক্রবার দুপুরে মাওয়া প্রান্তে এ কথা জানান আইজিপি।

তিনি বলেন, ‘এই আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আমার সন্তুষ্টি হবে আগামীকাল অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর। সেই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমরা সবাই মিলে দায়িত্ব পালন করছি। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি যেন কালকের অনুষ্ঠানটি নিরাপদ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়।’

‘এই আয়োজনে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেগুলো আমরা প্রতিনিয়ত বিশ্লেষণ করছি। নিরাপত্তার জন্য যখন যে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন আমরা তাই নিচ্ছি। এত বড় আয়োজনে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো ভ্যারিয়েবল, বিভিন্ন কারণেই চ্যালেঞ্জগুলো সুনির্দিষ্ট থাকে না। এখানে যেকোনো পরিস্থিতিতেই আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করব- এটাই একমাত্র কথা। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া আছে।’

এর আগে পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ।

আরও পড়ুন:
পদ্মার আশপাশের জমি এখন সোনার হরিণ
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন: সাতক্ষীরা-পিরোজপুর থেকে যাচ্ছেন ৩৫ হাজার মানুষ
পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
পদ্মার বুকে গর্বিত বাংলাদেশের অহংকারের স্মারক
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন আম বেচাকেনা বন্ধ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Inauguration of Padma Bridge Left leaders who were invited

পদ্মা সেতু উদ্বোধন: আমন্ত্রণ পেলেন যেসব বাম নেতা

পদ্মা সেতু উদ্বোধন: আমন্ত্রণ পেলেন যেসব বাম নেতা স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হবে শনিবার। ছবি: নিউজবাংলা
সেতু বিভাগের পাঠানো আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নেতারা।

বাকি শুধু আজকের দিনটি। রাত পেরোলেই দেশের মানুষ সাক্ষী হবেন নতুন এক ইতিহাসের। শনিবার দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে সাজ সাজ রব রাজধানীতেও। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর টোল প্লাজা পর্যন্ত হাজার হাজার ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে এক্সপ্রেসওয়ে।

এ উপলক্ষে এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের কাছে পাঠানো হয়েছে আমন্ত্রণপত্র। দেশের বামপন্থি দল ও নেতারাও আছেন এ তালিকায়।

সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের পাঠানো সেই আমন্ত্রণ পেয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নেতারা।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

সিপিবির ৫ নেতা পেয়েছেন আমন্ত্রণপত্র। তারা হলেন সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সহসাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ এবং তিন প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এন রাশেদা, শাহীন রহমান ও শামসুজ্জামান সেলিম।

আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি বন্যাদুর্গত এলাকায় আছি, এখানে আসার পর শুনেছি অফিসে আমন্ত্রণপত্র এসেছে।’

বন্যাদুর্গত এলাকায় থাকার কারণে পদ্মা সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান প্রিন্স।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা পেয়েছেন এই আমন্ত্রণপত্র।

বিষয়টি নিশ্চিত করে রাশেদ খান মেনন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদেরকে দুটি আমন্ত্রণপত্র দেয়া হয়েছে, তবে আমরা দুজন যেহেতু পার্লামেন্ট মেম্বার, তাই আলাদা করে দলীয়ভাবে দেয়া হয়নি।’

শনিবার সকালে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাবেন বলেও জানান মেনন।

জাসদ

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) দুজনকে আমন্ত্রণপত্র দেয়া হয়েছে বলে জানান দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে (শিরীন আখতার) দুটি কার্ড দেয়া হয়েছে। দলীয়ভাবে আলাদা করে দেয়নি। আমাদের বলা হয়েছে আপনারা যেহেতু পার্লামেন্ট মেম্বার, তাই আলাদা করে আর দিলাম না। মেনন ভাইদেরও ক্ষেত্রেই তাই করেছে।’

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলেও জানান ইনু।

বাসদ

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) উপদেষ্টা, বর্ষীয়ান রাজনীতিক খালেকুজ্জামানকে কার্ড পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের খালেকুজ্জামান ভাইকে কার্ড দিয়েছে, তবে তার শারীরিক অবস্থার কারণে যেতে পারবেন না।’

এদিকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোনো নেতা আমন্ত্রণপত্র পাননি বলে জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

অন্যদিকে আমন্ত্রণ পায়নি গণসংহতি আন্দোলন ও দলটির সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দলটির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘আমি যতদূর জানি দলীয়ভাবে বা আমাদের কেউ আমন্ত্রণপত্র পায়নি।’

আরও পড়ুন:
কতটা আঘাত সইতে পারবে পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতুতে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের মহড়া
পদ্মার আশপাশের জমি এখন সোনার হরিণ
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন: সাতক্ষীরা-পিরোজপুর থেকে যাচ্ছেন ৩৫ হাজার মানুষ
পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

মন্তব্য

p
ad-close 20220623060837.jpg
উপরে