× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট

বাংলাদেশ
Behind the escalation of elephant human conflict in Sherpur
hear-news
player
print-icon

শেরপুরে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব বাড়ার নেপথ্যে

শেরপুরে-হাতি-মানুষ-দ্বন্দ্ব-বাড়ার-নেপথ্যে
হাতির এই পালটি এখন শ্রীবরদী উপজেলায় অবস্থান করছে। ছবি: নিউজবাংলা
শেরপুরে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব এখন চরমে। পাহাড় থেকে নেমে এসে বেশ কিছু হাতি সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর কাছাকাছি অবস্থান করছে। যেকোনো মুহূর্তে হাতির পাল আক্রমণ করবে- এমন আশঙ্কা করছেন এসব গ্রামের বাসিন্দারা। হাতিকে তারা বহু বছর ধরেই মোকাবিলা করে এসেছেন, কিন্তু গত কয়েক বছরে হাতিদের উৎপাত কেন এত বাড়ছে?

পাহাড় থেকে দল বেঁধে নেমে আসে হাতি। গুঁড়িয়ে দেয় মানুষের ঘর-বাড়ি, নষ্ট করে ফসলি জমি। এমনকি হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যুও ঘটে।

ক্ষতি থেকে বাঁচতে হাতির এমন উন্মত্ত পালকে সংঘবদ্ধ হয়ে, ভয় দেখিয়ে তাড়া করে মানুষও। তাড়া খেয়ে পালিয়ে যায় হাতিরা। মাঝেমধ্যে ঘটে তাদেরও প্রাণহানি।

শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় হাতি-মানুষের এমন দ্বন্দ্ব বহু বছর ধরেই চলছে। ভারতসংলগ্ন শেরপুর জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তজুড়ে এই গারো পাহাড় অঞ্চল। এখানে ভারত থেকে নেমে আসা বন্য হাতিরা প্রায়ই বিচরণ করে।

বর্তমানে হাতির একাধিক দল ওই পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ীভাবেই অবস্থান নিয়েছে। খাদ্যের সন্ধানে তারা ঘন ঘন নেমে আসছে লোকালয়ে। ক্ষিপ্ত হাতিদের তাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। বর্তমানে আতঙ্কে দিন কাটছে সীমান্তবাসীর।

এমন ভীতিকর পরিস্থিতির জন্য হাতির খাদ্য সংকটকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে পাহাড়ে ফলদ ও পরিবেশ সহায়ক বনজ বৃক্ষ নিধন এবং হাতির খাদ্য হিসেবে চিহ্নিত গাছপালা রোপণ না করে ক্ষতিকর আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাসগাছ লাগানোকেই সবচেয়ে বেশি দায় দিচ্ছেন তারা। খাদ্য না পেয়েই জীবন বাঁচাতে লোকালয়ে চলে আসছে হাতির দল। মানুষ তাদের তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে হাতিও ক্ষিপ্ত হচ্ছে। ক্ষিপ্ত হাতির আক্রমণে মারা পড়ছে মানুষ। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মারা পড়ছে হাতিও।

শেরপুরে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব বাড়ার নেপথ্যে
পাহাড়ের নিচে আগুন জ্বালিয়ে হাতির পালকে ভয় দেখাচ্ছে গ্রামের মানুষ

সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় মানুষজন দাবি করেছে, হাতি তাড়াতে গিয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত শতাধিক মানুষের মৃত্যু ছাড়াও আহত হয়েছে সহস্রাধিক। এসব ঘটনায় অর্ধশতাধিক হাতিও মারা পড়েছে। হাতি-মানুষের এই দ্বন্দ্বের নিরসন চায় এখন সীমান্তবাসী।

সীমান্তবর্তী রাংটিয়া গ্রামের আলম হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ে হাতি আইলে আমরা ঘুমাইতেও পারি না। কেমনে ঘুমাই? ঘুমের মধ্যে হাতি চইলা আইলে বাঁচুম কেমনে? হাতি আইলে কামেও যাইতে পারি না। কারণ রাতে হাতি পাহারা দিয়া সারা দিন ঘুমাই।’

ছোট গজনীর কাশেম মিয়া বলেন, ‘পাহাড়ে অনেক দিন ধরেই হাতি আছে। কিন্তু পাহাড় থেকে এরা এখন আমাদের গ্রামে চলে এসেছে। আমি লিচু আর কাঁঠালের বাগান করছি এক একর জমিতে। কিছুদিন পরই পেকে যেত লিচুগুলো। কিন্তু হাতির ভয়ে ভালো করে পাকার আগেই সব লিচু পেড়ে বেচে দিচ্ছি।’

তাওয়াকুচার তোতা মিয়া বলেন, ‘হাতি তো আইতে আইতে আমাদের গ্রামেও চলে আইছে। এইডাই ডর। আমাদের যেন জীবনের ক্ষতি না করে আবার।’

নওকুচি গ্রামের ফজেন মারাক জানান, পাহাড় থেকে নেমে তাদের পাড়ার খুব কাছেই ৩০ থেকে ৪০টি হাতি অবস্থান করছে। এ জন্য গ্রামের সবাই এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে এখন আসলে খাবারের অভাব। তাই আমগোর বাড়িঘরে হাতি নাইমা আহে। পাহাড়ে আগে পশুপাখির খাবারের অনেক গাছ আছিল। অহন নাইক্কা। পশুপাখির খাবারের গাছ থাকলে আমাদের ওপর আক্রমণ কম হতো।’

শেরপুরের রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মুহাম্মদ মকরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, ‘পাহাড়ে হাতির বিচরণ দেখা যাচ্ছে। রাংটিয়া রেঞ্জের তাওয়াকুচা ও গজনী এলাকাগুলো একসময় হাতির রাস্তা ও বিচরণ ভূমি ছিল। তাই সেই রাস্তা ব্যবহার করতে গিয়ে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আমরা সবাইকে নিয়ে চেষ্টা করছি যেন হাতিগুলো লোকালয়ে না আসে। তবে মানুষ-হাতি উভয়কে রক্ষা করতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য একটি অভয়ারণ্য তৈরির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ চলছে বলেও জানান এই বন কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন:
হাতির আক্রমণে দিনমজুরের মৃত্যু
‘চাঁদা দিতে দেরি করায়’ হাতির আক্রমণে আহত ২
হাতি তাড়ানোর সব উদ্যোগ ব্যর্থ, গচ্চা কোটি টাকা
সেই হাতি ফিরে গেল মালিকের বাড়ি
হাতি চলাচলের ১২টি করিডর সংরক্ষণে কমিটি

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
The government wants more speed on motorcycles

মোটরসাইকেলে আরও গতি চায় সরকার

মোটরসাইকেলে আরও গতি চায় সরকার দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো যার যার সক্ষমতা অনুযায়ী দেশে মোটরসাইকেলের একটা স্থায়ী বাজার তৈরি করেছে। ছবি: সংগৃহীত
মোটরসাইকেল উৎপাদনে এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ১০ কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে। এদের সম্মিলিত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। দেশে এখন প্রতি ৫৪ জনে একজন মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল প্রতি ১৬১ জনে মাত্র একজন।

দেশে উৎপাদিত ও সংযোজিত মোটরসাইকেলের গতি আরও বাড়াতে চায় সরকার। বর্তমানে সর্বনিম্ন ৮০ সিসি থেকে সর্বোচ্চ ১৬০ সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন ফোর স্ট্রোক ও টু স্ট্রোক মোটরসাইকেল স্থানীয়ভাবে বাজারজাত হচ্ছে। সরকার চায় এগুলোকে ২৫০ সিসির ওপরে নিয়ে যেতে।

মোটরসাইকেল উৎপাদনে এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ১০ কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে। এদের সম্মিলিত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার লোকের।

কোম্পানিগুলো যার যার সক্ষমতা অনুযায়ী ইতোমধ্যে দেশে মোটরসাইকেলের একটা স্থায়ী বাজার তৈরি করেছে। এখন চেষ্টা সেই বাজার অংশীদারত্বকে আরও বড় করার। এ জন্য ক্রেতা টানতে মোটরসাইকেলে যুক্ত করা হচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। নতুন ডিজাইন করা হচ্ছে। বাড়ানো হচ্ছে ইঞ্জিনের শক্তি। এ উদ্যোক্তাদের নীতি-সহায়তা দিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিতে চায় সরকার। এবারের বাজেটে সেই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

মোটরসাইকেলে আরও গতি চায় সরকার

দেশে এখন প্রতি ৫৪ জনে একজন মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল প্রতি ১৬১ জনে মাত্র একজন। ছবি: নিউজবাংলা

ফোর স্ট্রোক ইঞ্জিন চারটি ধাপে জ্বালানিকে ব্যবহার উপযোগী করে। এটি একই সঙ্গে যেমন জ্বালানি-সাশ্রয়ী, তেমনি মাইলেজ বেশি, শব্দ কম এবং তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব। অন্যদিকে টু স্ট্রোক ইঞ্জিন দুই ধাপে জ্বালানিকে ব্যবহার উপযোগী করে। তবে এ জ্বালানির একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে। ফলে এর জ্বালানিও বেশি লাগে এবং এটি কালো ধোঁয়া উৎপন্ন করে।

সরকারের পরিকল্পনা হলো আগামীতে দেশে তৈরি সব ধরনের মোটরসাইকেল হবে আরও বেশি গতিসম্পন্ন। তাই কারখানায় ফোর স্ট্রোক বা টু স্ট্রোক ইঞ্জিন মোটরসাইকেলের উৎপাদন বা সংযোজন পর্যায়েই দুই চাকার এই বাহনটির গতি ২৫০ সিসির ওপরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ খাতে বিনিয়োগ করা কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেয়ার অংশ হিসেবে উচ্চগতির মোটরসাইকেল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে।

বাজেটে কী পেল মোটরসাইকেল খাত

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, দেশে ২৫০ সিসির ঊর্ধ্বের ইঞ্জিন ক্যাপাসিটি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল প্রস্তুত করার কারখানা গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে ২৫০ সিসি পর্যন্ত মোটারসাইকেল আমদানিতে ফোর স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ এবং টু স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ২৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপিত আছে।

অর্থমন্ত্রী ২৫০ সিসির ঊর্ধ্বের ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল আমদানিতে ফোর স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ এবং টু স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ২৫০ শতাংশ বহাল রাখার প্রস্তাব করেছেন বাজেটে।

খাতসংশ্লিষ্টরা এই বাজেট পদক্ষেপের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, মোটরসাইকেল ইস্যুতে অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে রাজস্ব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় মোটরসাইকেল শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো ও উৎপাদিত কিংবা সংযোজিত মোটরসাইকেলের গতিকে উন্নত দেশের মতো করা, যাতে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও উন্নত দেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর বিদেশি মোটরসাইকেলের প্রতি ঝোঁক কমিয়ে ক্রেতাকে দেশে তৈরি মোটরসাইকেল কিনতে উৎসাহিত করাও উদ্দেশ্য।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দার প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে মোটরসাইকেলের মতো বিলাসপণ্যের আমদানি ঠেকাতে ক্রেতাকে নিরুৎসাহিত করা, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অহেতুক অপচয় রোধ করতে ভূমিকা রাখবে।

বাড়ছে মোটরসাইকেলের ব্যবহার

দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে স্থানীয় উৎপাদনও। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এখন প্রতি ৫৪ জনে একজন মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল প্রতি ১৬১ জনে মাত্র একজন। অর্থাৎ ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় তিন গুণ (২ দশমিক ৯৮ গুণ)। এখন দেশে সর্বনিম্ন ৭৭ হাজার টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে প্রায় সব ব্র্যান্ডের যেকোনো মডেলের মোটরসাইকেল মিলছে।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ২৯ লাখ ৯১ হাজার।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, সম্প্রতি দেশে ভাড়ায় চালিত অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল বৃদ্ধির কারণে এর ক্রয়-বিক্রয় এবং নিবন্ধনের হারও ঊর্ধ্বমুখী। নিবন্ধিত প্রায় ৩০ লাখ মোটরসাইকেলের মধ্যে ২৫ শতাংশই চলাচল করছে ঢাকায়।

মোটরসাইকেলের বাজার

বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএএমএ) তথ্যমতে, ২০১৭ সালে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫২৩টিতে। ২০১৭ সালে মোটরসাইকেলের বাজার ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার। সেটি ২০১৯ সালে বেড়ে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

সংগঠনটির তথ্যমতে, ২০১৪ সালে দেশে সবকটি ব্র্যান্ড মিলে মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ইউনিট। ২০১৮ সালে সেই বিক্রি বেড়ে হয় ৪ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ ইউনিট, যা ২০১৯ সালে এসে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ ইউনিটে।

মোটরসাইকেলে আরও গতি চায় সরকার

দেশে উৎপাদিত ও সংযোজিত মোটরসাইকেল বর্তমানে সর্বনিম্ন ৮০ সিসি ও সর্বোচ্চ ১৬০ সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন ফোর স্ট্রোক ও টু স্ট্রোক। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোটরসাইকেলকে ২৫০ সিসির ওপরে নিয়ে যেতে চায় সরকার। ছবি: সংগৃহীত

এর মধ্যে বাজার অংশীদারত্বের হিসাব অনুযায়ী ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজের একক অংশীদারত্ব ছিল ৫৩ শতাংশ এবং টিভিএসের ১২ শতাংশ। এ ছাড়া ভারতীয় ও জাপানি ব্র্যান্ড হিরো হোন্ডার ১৫ শতাংশ এবং দেশীয় ব্র্যান্ড রানারের ৮ শতাংশ। বাকি ১২ শতাংশের বাজার ছিল দেশীয় ও বিদেশি অন্য ব্র্যান্ডগুলোর। তবে বাজার অংশীদারত্বে ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ইয়ামাহা, সুজুকি ও মাহেন্দ্রাও।

আগামীর সম্ভাবনা যেখানে

খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকারের নীতি-সহায়তার কারণেই মোটরসাইকেল শিল্পে এই বিপ্লব ঘটেছে। তবে উন্নতির এখনও অনেক বাকি। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে প্রতি চারজনে একজন মোটরসাকেল ব্যবহারকারী। ভারতে সেটি প্রতি ২০ জনে একজন। সেদিক থেকে বাংলাদেশ জনবহুল হয়েও মোটরসাইকেল ব্যবহারে অনেক পিছিয়ে। আর এটাই হলো দেশের মোটরসাইকেলের বাজারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার জায়গা। যার ওপর দাঁড়িয়ে আজ দেশে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, আগামীর বাংলাদেশে মোটরসাইকেল শিল্পের সম্ভাবনা বিরাট।

এ প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন নিউজবাংলাকে বলেন, সরকারের নীতি-সহায়তার কারণেই মোটরসাইকেল শিল্পে বিপ্লব ঘটেছে। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা এগিয়ে এসেছেন। খাতটির উন্নয়নে ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা অব্যাহত রাখা হবে। তিনি জানান, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি এ শিল্প খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোরও উদ্যোগ রয়েছে।

লক্ষ্য প্রতি বছর ১০ লাখ ইউনিট উৎপাদন

শিল্প মন্ত্রণালয়ের দাবি, চাহিদার ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল দেশেই উৎপাদন হয়। বাকি ৪০ শতাংশ এখনও আমদানি হয়। তবে সরকারের মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতি ২০১৭ অনুযায়ী, প্রতি বছর ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে মোটরসাইকেল উৎপাদন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে ২০২৭ সালের মধ্যে সরকার স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেলের উৎপাদন বছরে ১০ লাখ ইউনিটে নিয়ে যেতে চায়। এর পাশাপাশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

মোটরসাইকেলে বাজার মাত করছে যারা

বর্তমানে ভারতের বাজাজ, টিভিএস ও হিরো, জাপানের হোন্ডা, সুজুকি ও ইয়ামাহার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিদেশি মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে কারখানা স্থাপন করেছে। কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশি কোম্পানি, কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ব্র্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের একক বিনিয়োগের মাধ্যমে রানার, গ্রামীণ মোটরস, লিফান, রোডমাস্টারের মতো স্থানীয় ব্র্যান্ডও ইতোমধ্যে সুপরিচিত হয়ে গেছে।

পাশাপাশি এসব কোম্পানির মাধ্যমে এ শিল্পের যন্ত্রাংশ তৈরিতে রানার ইন্ডাস্ট্রিজ, নিটল মেশিনারিজ, কিউভিসিসহ বিভিন্ন সহযোগী শিল্পও গড়ে উঠেছে। বাজারজাতকারী এসব প্রতিষ্ঠান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈশ্বিক সর্বশেষ প্রযুক্তির সমন্বয়ে ক্রেতার রুচি অনুযায়ী সামনে আনছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের নতুন নতুন মডেল, যা বাজারে আসামাত্র লুফে নিচ্ছেন ক্রেতারা।

যেভাবে দেখছে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো

দেশে ভারতের হিরো ও জাপানোর হোন্ডা ব্র্যান্ডের পরিবেশক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নিটল-নিলয় গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহমাদ নিউজবাংলাকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মোটরসাইকেলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ, চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা সমান্তরাল বাড়ছে। এখন এটি মোটেও বিলাসপণ্য নয়। বরং দ্রুত সময়ে সবার গন্তব্যে পৌঁছানোর নিরাপদ ও অত্যাবশ্যকীয় বাহন।’

তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের মূল বার্তা হচ্ছে: সরকার স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে চায়। সক্ষমতা বাড়াতে চায়। এ ক্ষেত্রে ২৫০ সিসি পর্যন্ত সুরক্ষা শুল্ক বা সম্পূরক শুল্কের উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় কোম্পানিগুলোও যাতে সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আবার এ পদক্ষেপ নেয়ার আরেকটি সময়োপযোগী উদ্দেশ্য হলো, সারা বিশ্ব এখন অর্থনৈতিকভাবে খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি যতটা সংকুচিত করা যাবে, বৈশ্বিক ঝুঁকি তত কম থাকবে। ফলে রিজার্ভও সুরক্ষিত থাকবে। এখানে পদক্ষেপ একটি, কিন্তু কাজ হয়েছে দুটি।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলার অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও দেশীয় ব্র্যান্ড ‘রানার’-এর উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪ অনুযায়ী সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে, উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কারখানায় কম্পোনেন্ট কাজে ব্যবহার ছাড়া দেশে ১৬৫ সিসির ঊর্ধ্বে কোনো মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে না। তবে শুধু পুলিশ বাহিনীর কাজে ব্যবহার প্রয়োজনে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণসাপেক্ষে আমদানি করার সুযোগ রাখা হলেও বাকিদের জন্য তা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

‘প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানিতে ২৫০ সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন ফোর স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ ও টু স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্কারোপের হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি সেই অর্থে কিছু যায় আসে না। কারণ দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার বিষয়টি আমদানিনীতির মাধ্যমেই সুস্পষ্ট করা হয়েছে। রাজস্ব পদক্ষেপের আওতায় কম শুল্কেই উদ্যোক্তারা শিল্পের প্রয়োজনে আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এখানে আমদানিকারকদের সঙ্গে দেশীয় শিল্পের কোনো সম্পর্ক নেই।

‘তবে এটা ঠিক, এখন পর্যন্ত দেশে মোটরসাইকেল শিল্পের যে অগ্রগতি সেটি সরকারের নীতি-সহায়তার ওপর ভর করেই হয়েছে। সামনে সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে যদি কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং বাংলাদেশে আরও বেশি হয়। এর জন্য স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। যত বেশি উৎপাদন স্থানীয়ভাবে করতে পারব, তত বেশি যন্ত্রাংশ স্থানীয় মার্কেট থেকেই কেনা সম্ভব হবে। তখন প্রতিযোগিতার বাজারে দামও কমে আসবে, যা আমাদের মোটরসাইকেলের বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়াবে।’

দেশে ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরসের অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং ম্যানেজার ও ইয়ামাহা মোটরসাইকেল বাংলাদেশের হেড অফ মার্কেটিং হুসেইন মোহাম্মদ অপশন বলেন, ‘দেশে এখন ৮০, ১১০, ১২৫, ১৩৫, ১৫০, ১৫৫ ও ১৬০ সিসির গতিবেগসম্পন্ন মোটরসাইকেল বাজারজাত হচ্ছে। এই মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ হয় দীর্ঘমেয়াদি। অথচ কোনো নতুন মডেল কিংবা ভিন্ন ভিন্ন সিসির মোটরসাইকেল উৎপাদনে ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যান্টের প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে যে বিনিয়োগ করতে হয়, তা খুবই ব্যয়বহুল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোম্পানিগুলোর সেই ব্যয়বহুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এখন নেই। তবে সবাই চায় তাদের সক্ষমতাকে আরও ছাড়িয়ে যেতে। নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে। সেই চেষ্টাও হয়তো অনেকে করছে। তবে প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা দেয়ার যে চেষ্টা হয়েছে, তা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। এখনই তার সুফল পাওয়া যাবে না, তবে ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।’

সামনে যত চ্যালেঞ্জ

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোটরসাইকেল শিল্পের বর্তমানে চার চ্যালেঞ্জ আছে।

প্রথমত, মোটরসাইকেল শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের ৭০ শতাংশ এখনও আমদানিনির্ভর। বাকি ৩০ শতাংশ স্থানীয় জোগান আসে। তাই মোটরসাইকেল শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা সহযোগী শিল্প কিংবা ভেন্ডরের উন্নয়ন প্রয়োজন, যারা কারখানার জন্য বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করবে।

দ্বিতীয়ত, মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস।

তৃতীয়ত, সহজ শর্তে ক্রেতাকে মোটরসাইকেল কেনায় ঋণ প্রদান।

চতুর্থত, মোটরসাইকেল চালনার প্রশিক্ষণের জন্য সহায়তা প্রদান।

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Conditions are being relaxed to get corporate tax benefits

করপোরেট করের সুবিধা পেতে শর্ত শিথিল হচ্ছে

করপোরেট করের সুবিধা পেতে শর্ত শিথিল হচ্ছে জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ছবি: সংসদ টিভি
বুধবার অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট বিষয়ে সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন। যেসব সংশোধনী আনা হচ্ছে, সেগুলো মূলত আয়কর, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং আমদানি শুল্কসংক্রান্ত। পাচার করা অর্থ ফেরত আনার সুযোগ প্রত্যাহার করা হচ্ছে না।

বিদেশ থেকে পাচারের টাকা ফেরত আনা ও করপোরেট কর হ্রাসের সুবিধা পেতে শর্ত শিথিলসহ কিছু সংশোধনী এনে প্রস্তাবিত অর্থবিল পাস হচ্ছে।

বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে বাজেট বিষয়ে এসব সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন এবং পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হবে। সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২২-২৩ প্রস্তাবিত অর্থবছরের বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্য রাখবেন।

যেসব সংশোধনী আনা হচ্ছে, সেগুলো মূলত আয়কর, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং আমদানি শুল্কসংক্রান্ত। গত ৯ জুন নতুন অর্থবছরের জন্য যে বাজেট ঘোষণা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী, তাতে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বিভিন্ন খাতে করহার বৃদ্ধি, করারোপসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়।

এরই মধ্যে দেশের ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট মহল কিছু ক্ষেত্রে এসব কর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং তা প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবারের মতো এবারও প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হচ্ছে।

অর্থবিল পাসের পরের দিন অর্থাৎ ৩০ জুন পাস হবে প্রস্তাবিত বাজেট, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।

আগের দুই বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারে লিস্টেড এবং নন-লিস্টেড উভয় ধরনের কোম্পানির ক্ষেত্রে বর্তমানের চেয়ে করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়। তবে এই সুবিধা পেতে কঠিন শর্ত জুড়ে দেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, কোনো কোম্পানিকে এই সুবিধা পেতে হলে তাকে অব্যশই বছরে ১২ লাখ টাকার বেশি লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে করতে হবে। তা না হলে আগের রেটে কর পরিশোধ করতে হবে। কোম্পানি ছোট হোক বা বড়, সবার ক্ষেত্রে একই শর্ত প্রযোজ্য।

মূলত অর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব লেনদেনকে ব্যাংকিং চ্যানেলের আওতায় নিয়ে আসার এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে এ শর্তের বিরোধিতা করে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এর মাধ্যমে ‘ক্যাশলেস লেনদেন’ (নগদ মুদ্রাবিহীন লেনদেন) চালু করতে যাচ্ছে সরকার, যা বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে সম্ভব নয়। বাজেটের এ উদ্যোগ কার্যকর হলে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করা কঠিন হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এটি বাতিল হচ্ছে না। বরং ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে শর্ত শিথিল করে এখানে কিছুটা ছাড় দেয়া হচ্ছে। কোম্পানির লেনদেন ১২ লাখ টাকার পরিবর্তে ৩৬ লাখ টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোম্পানি বছরে ৩৬ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন ব্যাংকের বাইরে করতে পারবে। এর বেশি লেনদেন করতে হলে অব্যশই ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবে।

যেসব কোম্পানি কম হারে করপোরেট কর দিতে চাইবে, তাদের অবশ্যই এই শর্ত মানতে হবে।

অস্থাবর সম্পত্তি আনতে চাইলে শতাংশ কর

প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশ থেকে নগদ টাকাসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর দিয়ে বৈধ করার ঘোষণা দেয়া হয়।

বাজেট ঘোষণার পর দেশজুড়ে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ওঠে।

জানা যায়, সরকার তার অবস্থান থেকে সরেনি। তবে শর্ত কিছু শিথিল করে এ ক্ষেত্রে কিছুটা সংশোধনী আনা হচ্ছে।

বাজেটে বলা হয়, বিদেশে অবস্থিত কেউ যদি অস্থাবর সম্পত্তি বৈধ ঘোষণা করতে চান, তা হলে ১০ শতাংশ কর দিলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না।

সূত্র জানায়, এখানে করের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে।

অন্য দুটি– নগদ টাকা এবং স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে শর্ত একই রাখা হচ্ছে।

কিছু পণ্যের কর প্রস্তাবে সংশোধনী

ব্যবসায়ীর দাবির মুখে ল্যাপটপ কম্পিউটার, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল হ্যান্ডসেটসহ কিছু পণ্যের করহার তুলে দেয়া হতে পারে।

বাজেট ঘোষণায় কম্পিউটার-ল্যাপটপ আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়। সংশোধনীতে এই পণ্যটির ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার হতে পারে।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল হ্যান্ডসেট বিক্রি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। স্থানীয় শিল্পের বিকাশের ধারা অব্যাহত রাখতে মোবাইল সেটের ওপর থেকে এই কর প্রত্যাহার হতে পারে।

কম্পিউটার প্রিন্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলেও তা প্রত্যাহার হতে পারে।

আরও পড়ুন:
মোবাইলে ভ্যাট বাড়ানোয় এফআইসিসিআইয়ের উদ্বেগ
‘ধ্যানের ওপর ভ্যাট’ প্রত্যাহারের প্রস্তাব সংসদে
ব্যবসা সহজ নাকি কঠিন হলো
সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিতে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The Padma Bridge is reducing the time and cost of transporting goods

পণ্য পরিবহনে সময়-খরচ কমাল পদ্মা সেতু

পণ্য পরিবহনে সময়-খরচ কমাল পদ্মা সেতু পদ্মা সেতুর কারণে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই কমেছে। ছবি: নিউজবাংলা
ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে ট্রাকভর্তি আনারস আনা ড্রাইভার সর্দার হোসেন আলী বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে খুলনায় পণ্য আনা-নেওয়ায় সময় অনেক কম লাগছে, তাই পরিবহনে ভাড়া কমিয়ে দিয়েছি। তবে ট্রাক মালিক পরীক্ষা করে দেখতে বলেছেন সময় কেমন লাগে। এই হিসাবে তিনি হয়তো পরে ভাড়া আরও কমিয়ে দেবেন।’

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় যাত্রীদের সঙ্গে উল্লাসের জোয়ারে ভাসছেন খুলনার ব্যবসায়ীরাও। কারণ আগের চেয়ে এখন স্বল্প সময়ে রাজধানী ঢাকায় পণ্য আনা-নেয়া করতে পারছেন তারা।

সময় কম লাগায় ট্রাক ভাড়াও বর্তমানে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

খুলনার সোনাডাঙ্গার ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার পাইকারি কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী লিয়াকত মোল্লা বলেন, ‘আমাদের মোকাম থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন ধরনের কাঁচা শাক-সবজি পাঠানো হয়। আগে সকাল ৬টার দিকে ট্রাকে করে কাঁচামাল পাঠালে কারওয়ান বাজারে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা বেজে যেত।

‘মূলত মাওয়া ঘাটে যানজটের জন্য ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হতো। ফলে সময়টাও বেশি লাগত।’

তিনি বলেন, ‘আজ সকালেও ট্রাকে করে কাঁচা কাঁঠাল, পুঁইশাক পাঠাইছি। সকাল ৯টার মধ্যে তারা পদ্মা পার হয়ে গেছে। মাত্র ৩ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাক খুলনা থেকে পদ্মা নদী পাড়ি দিল। সেখান থেকে আড়াই ঘণ্টা লেগেছে ঢাকার মোকামে পৌঁছাতে।

‘ফলে খুলনা থেকে এখন ট্রাকে করে ঢাকায় পণ্য পাঠাতে মাত্র সাড়ে ৫ ঘণ্টা সময় লাগছে, আগে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগত।’

ব্যবসায়ী লিয়াকত মোল্লা আরও বলেন, ‘আগে একটি ট্রাক খুলনা থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে পাঠাতে আমরা ভাড়া দিতাম ১৫ হাজার টাকা। আজ দিয়েছি ১১ হাজার টাকা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার কারণে প্রতি ট্রিপে পণ্য পাঠাতে আমাদের ৪ হাজার টাকা সেভ হচ্ছে।

‘এখনও অনেক ট্রাক মালিক পরীক্ষামূলকভাবে দেখছেন যাতায়াতের সময় কেমন লাগে। আশা করছি, সামনে ট্রাক ভাড়া আরও ১ থেকে ২ হাজার টাকা কমবে।’

খুলনার কদমতলা ফল আড়তের সততা বাণিজ্য ভান্ডারের স্বত্বাধিকার রহমত আলী বলেন, ‘আগে ঢাকা থেকে এক ট্রাক ফল আনতে আমাদের ভাড়া দিতে হতো ২০ হাজার টাকা। সোমবার রাতে এক ট্রাক আনারস এনেছি ১৬ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে।

‘আবার ঢাকা থেকে মধ্যরাতে রওনা হয়েছে ফলভর্তি ট্রাক। আজ ভোরে খুলনায় ট্রাকটি এসে পৌঁছাইছে। আগে দুপুর ১২টা বেজে যেত পৌঁছাতে।’

সৈয়দ আহমেদ নামে আরেক ফল ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে টাঙ্গাইল থেকে খুলনায় আনারস নিয়ে আসতাম আরিচা ফেরিঘাট হয়ে। তখন টাঙ্গাইল থেকে খুলনা আসতে ১২ ঘণ্টার মতো সময় লাগত। অথচ সোমবার রাতে আমরা মাত্র ৬ ঘণ্টায় আরিচা ঘাট হয়ে মালামাল নিয়ে এসেছি।

‘এখন ঘাটেও তেমন ভিড় নেই। আগে ঘাট এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকের দুই থেকে তিন কিলোমিটারের সিরিয়াল থাকত। এখন ঘাটে এসে সঙ্গে সঙ্গে ফেরি পাওয়া যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মাওয়ার দিক থেকেও কম সময় লাগছে আবার আরিচা ঘাটেও যানজট না থাকায় কম সময় লাগছে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমে যাচ্ছে।’

ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে ট্রাকভর্তি আনারস আনা ড্রাইভার সর্দার হোসেন আলী বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে খুলনায় পণ্য আনা-নেওয়ায় সময় অনেক কম লাগছে, তাই পরিবহনে ভাড়া কমিয়ে দিয়েছি।

‘তবে ট্রাক মালিক পরীক্ষা করে দেখতে বলেছেন, সময় কেমন লাগে। এই হিসাবে তিনি হয়তো পরে ভাড়া আরও কমিয়ে দেবেন। এ ছাড়া আগে পণ্য নিয়ে আমরা ৪০-৫০ কিলিমিটার গতিবেগে ট্রাক চালাতাম। কিন্তু পদ্মা সেতুর আশপাশের সড়ক দিয়ে পণ্যভর্তি ট্রাক এখন ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে চালানো সম্ভব হচ্ছে। বলা যায়, আগের থেকে অর্ধেক সময়ে এখন আমরা ঢাকা থেকে খুলনায় আসতে পারব।’

খুলনার কদমতলা এলাকায় কয়েকজন ট্রাকচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত মাঝারি আকারের ১৩ টনের ট্রাকে ১৮ থেকে ২০ টনের মতো পণ্য পরিবহন করা যায়। এ ছাড়া ছোট আট টনের ট্রাকে ১২ থেকে ১৩ টন পণ্য পরিবহন করা হয়।

মাঝারি আকারের ট্রাকে ১৮ থেকে ২০ টন পণ্য খুলনা থেকে ঢাকাতে নিতে তারা পরিবহন খরচ নিতেন ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছোট ট্রাকে নিতেন ১৩ হাজার টাকা থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত।

কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সময় কম লাগায় ভাড়া বর্তমানে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ট্রাক প্রতি কমানো হয়েছে। অনেক ট্রাক মালিক পরীক্ষামূলকভাবে দেখছেন। তারা হয়তো পরে ভাড়া আরও কমাতে পারেন বলে জানিয়েছেন ট্রাক চালকরা।

এর আগে গত রোববার ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয় পদ্মা সেতু। আগের দিন শনিবার দুপুর ১২টার একটু আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর উদ্বোধন করেন। এরপর রাত থেকেই সেতু পাড়ি দিতে দুই প্রান্তে গাড়ি নিয়ে ছুটে আসেন অনেকে।

আরও পড়ুন:
কলকাতা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে এলো ‘সৌহার্দ্য’
পদ্মা সেতুতে বাইক দুর্ঘটনা কীভাবে
পদ্মা সেতুতে সেনা টহল জোরদার
নাট খোলা বাইজীদের বাড়িতে হামলা
স্থবির বাংলাবাজার ফেরি ও লঞ্চ ঘাট

মন্তব্য

বাংলাদেশ
That tree has changed Rangpur

যে গাছ বদলে দিয়েছে রংপুরকে

যে গাছ বদলে দিয়েছে রংপুরকে একটি আমগাছ দিয়ে শুরু হয়ে রংপুর জেলায় এখন ১২ হাজার হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাগান। ছবি: নিউজবাংলা
অর্ধশতাব্দী আগে বাগানের একটি আমগাছ দিয়ে শুরু। সেই আমগাছ গত কয়েক দশকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো রংপুর জেলায়। হাঁড়িভাঙ্গা আম এ অঞ্চলের অর্থনীতিকেই বদলে দিতে শুরু করেছে।

রংপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ বাজার। বাজারের প্রবেশপথে চোখে পড়বে হাঁড়িভাঙ্গা আমের ভাস্কর্য। তিনটি আম দিয়ে তৈরি এই ভাস্কর্যের জায়গাটিকে বলা হয় আম চত্বর। যে কেউ এখানে এলেই বুঝতে পারবেন এটি হাঁড়িভাঙ্গা আমের জগৎ।

সম্প্রতি এই চত্বরে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মুনতাসির রহমান মামুনের। বাড়ি পঞ্চগড় জেলায়। বন্ধুর সঙ্গে আম কিনতে এসে তাকে নতুন করে বলতে হয়নি জায়গাটি ‘পদাগঞ্জ’। ভাস্কর্য দেখেই চিনে নিয়েছেন।

পদাগঞ্জ থেকে মিঠাপুকুর বা বদরগঞ্জ উপজেলার যেকোনো পথে এগোলে চোখে পড়বে সারি সারি আমগাছ। গত তিন দশকে সুস্বাদু এই আম অর্থনৈতিকভাবে বদলে দিয়েছে মিঠাপুকুর, এমনকি পুরো রংপুরকে।

যে গাছ বদলে দিয়েছে রংপুরকে

রংপুর কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রংপুর জেলায় এখন ১২ হাজার হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাগান। সব থেকে বেশি আম হয় মিঠাপুকুরের খোঁড়াগাছ ইউনিয়নের পদাগঞ্জে। এ এলাকাটির মাটি লাল হওয়ায় আমের স্বাদও ভিন্ন। দ্বিতীয় অবস্থানে জেলার বদরগঞ্জ উপজেলা। আরও বেশ কয়েকটি উপজেলায় এ আমের চাষ হয়।

পদাগঞ্জের সীমানায় পৌঁছলে চোখে পড়বে এক অভাবনীয় দৃশ্য। পথের ধারে, প্রতিটি বাসাবাড়ির পরিত্যক্ত জায়গা, বাড়ির উঠানে লাগানো আমগাছ। কোথাও কোথাও ধানিজমির আলের চতুর্দিকে সারি সারি করে আমগাছ লাগানো হয়েছে। সব গাছ প্রায় একই আকারের। আর তাতে ঝুলে আছে শত শত আম।

রংপুর কৃষি বিভাগ বলছে, জেলার আট উপজেলায় ১ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমিতে এবার আমের আবাদ হয়েছে, যেখান থেকে ২৯ হাজার ৪৩৬ টন আম উৎপাদন হবে।

যে গাছ বদলে দিয়েছে রংপুরকে

আমের নাম হাঁড়িভাঙ্গা যেভাবে

আমের নাম হাঁড়িভাঙ্গা। এলাকার এ জাত এখন সারা দেশে পরিচিত হয়ে উঠেছে। কোথা থেকে এলো এই জাত? আর এর নামটাই বা এলো কোথা থেকে?

এলাকায় যে জনশ্রুতি চালু আছে, সেটি এলাকার আম ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন পাইকারের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত।

আমজাদ হোসেন পাইকার নিউজবাংলাকে জানান, তার বাবা নফল উদ্দিন পাইকারও আমের ব্যবসা করতেন। ১৯৭০ সালে শতাধিক বছর বয়সে তিনি মারা যান। তার মুখে এই আমের জন্ম-ইতিহাস শুনেছেন তিনি।

যে গাছ বদলে দিয়েছে রংপুরকে

আমজাদ হোসেন পাইকার বলেন, ‘যতটুকু শুনেছি, রংপুরের মিঠাপুকুরের বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়নে জমিদার রাজা তাজ বাহাদুর সিংয়ের বাড়িতে বিভিন্ন প্রজাতির সুগন্ধি ফুল ও সুস্বাদু ফলের বাগান ছিল। বাগানটি যমুনেশ্বরী নদীর তীরে। জমিদার বাড়িতে আব্বার আসা-যাওয়া ছিল। জমিদারের বাগানসহ অন্য আমচাষিদের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করে তিনি পদাগঞ্জসহ বিভিন্ন হাটে বিক্রি করতেন। জমিদারের বাগানের বিভিন্ন আমের মধ্যে একটি আম অত্যন্ত সুমিষ্ট, সুস্বাদু ও দেখতে সুন্দর হওয়ায় তিনি ওই গাছের একটি কলম (চারা) নিয়ে এসে নিজ বাগানে লাগান।’

তিনি বলেন, ‘গাছটি রোপণের পর গাছের গোড়ায় পানি দেয়ার জন্য একটা হাঁড়ি বসিয়ে তাতে ফিল্টার দিয়ে গাছে পানি দিতেন তিনি। কিছু দিন পরপর কে বা কারা সেই হাঁড়ি ভেঙে দেয়। কিন্তু গাছের নিচে যে আব্বা হাঁড়ি বসিয়েছেন, সেটা সবাই জানত। এরপর গাছে খুব আম ধরে। খেতে সুস্বাদু। এলাকার লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করেন, “নওফেল এটা কোন গাছের আম?” তখন আব্বা তাদের বলেন, “এটা হাঁড়ি দিয়ে যে গাছে পানি দেয়া হয়েছে, সেই গাছের আম।” তখন থেকে এই আমের নাম হয় “হাঁড়িভাঙ্গা”।’

আমজাদ হোসেন পাইকারের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে সেই মাতৃগাছটি মিঠাপুকুরের তেকানি মসজিদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

হাঁড়িভাঙ্গা আমের এই জন্মকথার সত্যতা যাচাই করার উপায় নেই। তবে এলাকার বয়স্করা অনেকে এটি সমর্থন করেন।

কীভাবে এলো এই আম

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বুড়িরহাট, রংপুর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশিষ কুমার সাহা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙ্গার অরিজিন এখানেই (রংপুরের পদাগঞ্জ)। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী বা ভারতের মালদহ জেলা একসময় তো একই ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের যত আমের ভ্যারিয়েন্ট আছে, সব মালদহ ডিস্ট্রিকের। কিন্তু এখানে হাঁড়িভাঙ্গা আমের বহু ভ্যারিয়েন্ট আছে। সুতরাং অনুমান করা যায়, হাঁড়িভাঙ্গার অরিজিন এখানেই।’

তিনি বলেন, ‘কথিত আছে বা প্রচার করা হয় হাঁড়িভাঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তসংলগ্ন এলাকার মালদিয়া বা মালদই আম থেকে এসেছে। আসলে এটা সত্যি নয়। মালদিয়া আমের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই হাঁড়িভাঙ্গা আমের।’

যে গাছ বদলে দিয়েছে রংপুরকে

যেভাবে সম্প্রসারণ

হাঁড়িভাঙ্গা আম এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছেন যে লোকটি, তিনি আবদুস সালাম সরকার। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘’আমি সমবায় অফিসার ছিলাম। চাকরির মেয়াদের ১০ বছর আগে স্বেচ্ছায় অবসর নিই। ১৯৯২ সালে একদিন বিকেলে আমার এক নাতি এসে বলে, “দাদু আমটা খেয়ে দেখো, অনেক সুস্বাদু।” আম খেয়ে অনুসন্ধান করি গাছের। পরে নওফেল উদ্দিন পাইকারের সেই গাছ থেকে অনেক কলম এনে আমার ১০ একর জমিতে রোপণ করি।’

তিনি বলেন, ‘এই আম সম্প্রসারণ করতে এমন কোনো কাজ নেই করিনি। গ্রামের মানুষের কাছে গেছি, ব্যবসায়ীদের বাড়িতে গেছি। ঢাকায় দুটি বিক্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। মিডিয়াকে ডেকে ডেকে নিউজ করা হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাকে ডেকে এ বিষয়ে অবগত করা হয়েছে। সরকারের কৃষিমন্ত্রীকে এনে আমের মেলা করেছি। পোস্টার করে পুরো জেলায় ছাপিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের এমন কোনো সেনানিবাস নেই যেখানে এই আমের চারা দেয়া হয়নি। সরকারের বড় কর্মকর্তাদের এই গাছের চারা উপহার দিয়েছি। এখন পুরো বাংলাদেশ, এমনকি বিশ্বের বহু দেশে যাচ্ছে এই আম।’

আব্দুস সালাম সরকার প্রায় ৩০ বছর ধরে হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ করছেন। এখন রংপুরে কয়েক লাখ হাঁড়িভাঙ্গা আমের গাছ রোপণ করেছেন আমচাষিরা। আব্দুস সালামের নিজেরই ২৫টির বেশি বাগান রয়েছে। অন্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভ হয় বলে লোকে এখন জেলার উঁচু-নিচু ও পরিত্যক্ত জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

মৌসুমি ব্যবসায়ী

একসময় রংপুর অঞ্চলের মানুষ ধানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রতি মৌসুমে পাঁচ-দশ বিঘা জমি চাষাবাদ করে কোনো রকমে চলত। এখন সেই জমিতে আম চাষ করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন কৃষকরা। রংপুরের এই ‘আম অর্থনীতি’ মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে।

বলা হয়ে থাকে, বর্তমানে রংপুরের নতুন অর্থকরী ফসল ‘হাঁড়িভাঙ্গা আম’। মিঠাপুকুর, রংপুর সদর, বদরগঞ্জের বিস্তৃত এলাকার হাজার হাজার কৃষক এই আম চাষ করে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। পরিবারে এসেছে আর্থিক সচ্ছলতা। কৃষক, দিনমজুর থেকে অনেকেই হয়েছেন আমচাষি। বছর বছর এটি চাষের পরিধি বাড়ছে।

রংপুরের মিঠাপুকুর সদরের গোলাম মোস্তফা জানান, ‘খোড়াগাছ এলাকায় মাত্র ৬০ হাজার টাকায় আমি একটি বাগান কিনি। এবার সেই বাগানের আম আমি ২ লাখ বিক্রি করেছি। আরও ১ লাখ টাকার বিক্রি করতে পারব। যে খরচ হয়েছে, তাতে প্রায় ২ লাখ টাকা আয় হবে।’

তিনি বলেন, ‘আগে একটু অভাব-অনটন ছিল। এখন ভালো আছি। সাত বছর থেকে আমি এই আমের ব্যবসা করতেছি।’

ছবিউল ইসলাম নামে এক আম বিক্রেতা বলেন, ‘আগে তো মানুষের বাড়িতে মজুর করছি, গাড়ি চালাইছি। এখন আমার দুইটা বাগান আছে। বছর চারেক থেকে আমের বাগান কিনে আম বিক্রি করি। সেজনে সেজনে (বছরে বছরে) যে টাকা লাভ হয়, তা দিয়ে পুরো বছর চলে সংসার চলে। ছৈলদের পড়ালেখা চলে। যে টাকা বাঁচে, সেটা দিয়ে পরের বছর বাগান কিনি।’

মতিয়ার রহমান নামে এক আম বিক্রেতা বলেন, ‘আমি বাগান কিনি না। বাজার থেকে আম কিনে ব্যবসা করি। প্রায় ১০-১২ বছর ধরে বাড়ির আম প্রতিদিন দুই ভ্যান, তিন ভ্যান, চার ভ্যান, পাঁচ ভ্যান বিক্রি করি। আম বেচে জমিজমা টুকিটাকি করছি।’

আমের ঝুড়ি বা ক্রেট বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আগে আমি ঢাকায় চাকরি করতাম। এখন গ্রামে আসছি ব্যাবসা করার জন্যে। প্রতি সিজনের ক্রেট ব্যবসা করে ভালোই চলে। প্রতি ক্রেটে ১০-১৫ টাকা লাভ করি।’

যে গাছ বদলে দিয়েছে রংপুরকে

হাঁড়িভাঙ্গা আম ঘিরে রংপুরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মিঠাপুকুর উপজেলার লালপুর, পদাগঞ্জ, তেয়ানিসহ আশপাশের গ্রামের বেকার যুবকরা এখন আম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

কয়েক বছর ধরে এ আমের চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমন দামও পাচ্ছেন চাষিরা। শুরুতে বাগানে ১ হাজার ২০০ থেকে ১৬ হাজার টাকা মণ দরে আম বিক্রি হলেও শহরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা মণ।

সুমন মিয়া নামে এক শিক্ষাথী বলেন, ‘আমি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আমার বাবা মারা গেছেন ১০ বছর আগে। চার বছর ধরে প্রতি সিজনে আমের কাজ করে সংসার চালাই। সঙ্গে লেখাপড়া করি। প্রতিদিনে কখনও ৫০০, এক হাজার, আবার কোনো কোনো দিন বারো শ’ টাকা ইনকাম হয়।’

আশাদুর জামান নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি বাসায় থাকি, বাসায় থেকে পড়া লেখা করি। আমের সিজেন এলে আমের গোডাউনে কাজ করি। ঢাকা বা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমের ব্যবসায়ীরা আসেন আম কিনতে। আমরা সেই আম প্যাকেট করে গাড়ি লোড দিয়ে দিই। এইখানে আমরা কাজ করলে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পাই।’

আজহারুল ইসলাম নামে এক আমচাষি কৃষি শ্রমিকের কাজ ছেড়ে এখন হাঁড়িভাঙ্গা আমের ব্যবসা করছেন। গত বছর পাঁচ একর জমির আম আগাম কিনে তা ১৫ লাখ টাকা বিক্রি করেন তিনি। এবার ১০ একর জমির আম কেনা হয়েছে। এবারও ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তৈরি হয়েছে তরুণ উদ্যোক্তা

জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প সমিতির রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি মো. রাকিবুল হাসান রাকিব নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার জানাশোনার মধ্যে রংপুরের দুই শতাধিক তরুণ উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা এই আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইনে অফলাইনে বিক্রি বিক্রি করেন। এরা মৌসুমি ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে কেউ শিক্ষার্থী, কেউ অন্য ব্যবসা করেন। এ বছর আমরা কমপক্ষে ১০০ মণ আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাব।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর নতুন নতুন উদ্যাক্তা তৈরি হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো খবর বা আশার দিক।’

রংপুর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙ্গার কারণে যে উদ্যাক্তা তৈরি হচ্ছে, তা আশাব্যঞ্জক। আমি শুনতেছি অনেকে এই ব্যবসা করেন।’

বিশ্বদুয়ারে হাঁড়িভাঙ্গা

রংপুরের বিখ্যাত এই আম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ৪ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য উপহার হিসেবে পাঠান।

এই আম খেয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রশংসা করেছিলেন বলে গণমাধ্যমে সংবাদ বেরিয়েছিল।

এ ছাড়া প্রতি বছর মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয় এই আম।

রপ্তানির টার্গেট

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন নিউজবাংলাকে জানান, গত বছর ৫০০ টন হাঁড়িভাঙ্গা আম বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এ বছর ৭০০ টন বা তার বেশি রপ্তানির টার্গেট আছে। ইতোমধ্যে গত ১৭ জুন ভারতে ২০ টন হাঁড়িভাঙ্গা আম রপ্তানি করা হয়েছে। ধীরে ধীরে তা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অনেকে বেসরকারিভাবে আম বিদেশে রপ্তানি করে থাকেন। তাদেরও সহযোগিতা করি আমরা। সরকারিভাবেও রপ্তানি করা হবে।’

অর্থনীতিতে অবদান

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোরশেদ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙ্গা আম রংপুরের অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। অনেক বছর ধরে শত শত কোটি টাকার আম বিক্রি করছেন চাষিরা। এই টাকা রংপুরের অর্থনীতিতে প্রভাব রাখছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সৈয়দপুর বিমানবন্দর রয়েছে, চিলমারী নৌবন্দর রয়েছে। আমরা যদি সেভেন সিস্টার বলে ভারতের যে রাজ্যগুলো আছে, সেগুলোতেও রপ্তানি করতে পারি, তাহলে অনেক আয় অর্জন সম্ভব। এই আম তৃণমূল পর্যায়ের মানুষকে সচ্ছল বানিয়েছে। রংপুর অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে এই আম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

সম্প্রসারণে কী করা উচিত

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম জাকির হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই আম এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। স্বাদ, গুণাগুণ, মিষ্টতা সব মিলিয়ে এটি অনন্য। এই আম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে, আরও বৃহৎ আকারে পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই আম কীভাবে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা করা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘এই আমকে ঘিরে ফুড প্রসেসিং জোন প্রতিষ্ঠা করা হলে আম দিয়ে যে বিভিন্ন প্রডাক্ট তৈরি হয়, সেটা বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘শুধু রংপুর অঞ্চল নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে যদি এই আম সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের একটি উপায়।’

আরও পড়ুন:
উপহারের আম এবার ত্রিপুরায়
মোদিকে এবার ‘আম্রপালি’ পাঠালেন হাসিনা
বাজারে চড়া দামে হাঁড়িভাঙ্গা
কিছুতেই লাগাম পরানো যাচ্ছে না আমদানিতে
ঠা ঠা বরেন্দ্রে আমের মৌতাত, হিমাগার নেই

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Shoe garland to the teacher The administration is not losing its position

শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ

শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে দেশব্যাপী। অলংকরণ: মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, অপদস্ত শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না। কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতিও বলছেন, স্বপন কুমার নিজে থেকে না চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদেই থাকছেন। তার নিরাপত্তাও জোরদার করেছে পুলিশ।

নড়াইলে পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা দিয়ে অপদস্ত করার ঘটনায় অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। এ ঘটনার ৯ দিনের মাথায় তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

মাউশি বলছে, অপদস্ত শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না।

কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতিও বলছেন, স্বপন কুমার নিজে থেকে না চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে তাকে সরানো হবে না।

ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার সমর্থনে কলেজের এক হিন্দু শিক্ষার্থীর পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন দিনভর বিক্ষোভ, সহিংসতা চলে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস।

এরপর পুলিশ পাহারায় বিকেল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। শিক্ষক স্বপন কুমার হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পুলিশের সামনে শিক্ষকের এমন অপদস্ত হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

ফেসবুকে ভাইরাল ভিডিওতে শিক্ষক স্বপন কুমারের গলায় জুতার মালা পরানোর সময় আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেলেও তারা এখন দাবি করছে, এমন কোনো ঘটনা তাদের চোখে পড়েনি। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ওই ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি তারা। শিক্ষক হেনস্তা বা কলেজে সহিংসতার ঘটনায় কোনো মামলাও হয়নি।

এরই মধ্যে কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিবর্তনের তোড়জোড় শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু। আক্তার হোসেনের দাবি, আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য কবিরুল হক তাকে দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব করেছেন।

শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ
স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

বিষয়টি নিয়ে রোববার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

আরও পড়ুন: পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?

শিক্ষক স্বপন কুমারকে নিয়ে নিউজবাংলার প্রতিবেদন নজরে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। এ ঘটনায় মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নেবে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ নিউজবাংলাকে জানান, স্বপন কুমারকে তার চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ এমন চেষ্টা করলেও মাউশি তাতে অনুমোদন দেবে না।

তিনি বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ম্যানেজিং কমিটি এ ধরনের কাজ করতে পারে না, আইনত সে সুযোগও নেই। তারপরও তারা (ম্যানেজিং কমিটি) যদি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সেটি কার্যকর করতে মাউশির অনুমোদন লাগবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ ধরনের কাজ তারা করলে মাউশি থেকে অনুমোদন দেয়া হবে না।’

অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সত্যিকার অর্থে সেখানে কী ঘটনা ঘটেছে তা জানা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সংবাদ এসেছে। তবে সবশেষ কথা হলো, একজন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’

বিষয়টি নিয়ে মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন উইং) অধ্যাপক মো. শাহেদুল কবির চৌধুরীর সঙ্গেও কথা বলেছে নিউজবাংলা।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা কেন ঘটল তা নিশ্চয়ই তদন্তে বেরিয়ে আসবে। কোনো ব্যক্তি বিশেষ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার বিচার হবে প্রচলিত আইনে। কিন্তু পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা দেয়ার ঘটনা শিক্ষক সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। এটি অবশ্যই নিন্দনীয়।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। আমরাও মাউশি থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মু. ফজলুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। অবশ্যই এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহসান হাবিব। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আইনত এ বিষয়ে বোর্ডের করণীয় কিছু নেই। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি এ ঘটনার নিন্দা জানাই।’

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজে সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে হেনস্তার ঘটনায় ২৩ জুন জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি করে। পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিতে নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুবায়ের হোসেনের নেতৃত্বে আছেন নড়াইল সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবির ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইদুর রহমান।

তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইদুর রহমান সোমবার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা গতকাল (রোববার) তদন্তের কাজ শুরু করেছি। প্রথমেই আমরা ভুক্তভোগী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের বক্তব্য নিয়েছি। আজও এ ঘটনার তদন্ত করছি।’

শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস ও অভিযুক্ত ছাত্র রাহুল দেব রায়কে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ

অধ্যক্ষ পরিবর্তনের উদ্যোগ ‘বাতিল’

স্বপন কুমারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার কথা রোববার নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছিলেন মির্জাপুর ইউনাইডেট ডিগ্রি কলেজের কয়েকজন শিক্ষক।

তারা জানান, ঘটনার পরদিন ১৯ জুন নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক কলেজে এসে স্থানীয়দের সঙ্গে সভা করেন। সেখানে নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার বিষয়টি আলোচিত হয়।

কলেজের প্রধান সহকারী খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এমপি কবিরুল হক সভা করে দোষীর শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি পরিস্থিতি বিবেচনায় কলেজ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছেন।

‘কলেজ খোলার পর পুনরায় সভা হবে। ওই সভায় হয়তো নতুন কোনো শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে।’

কলেজের একজন শিক্ষক নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কলেজের পরিচালনা পরিষদের কমিটি নতুন কাউকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ এলাকার মানুষ স্বপন কুমারকে এ দায়িত্বে দেখতে চাচ্ছে না। কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু হয়তো নতুন দায়িত্ব পাবেন।’

নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে এমপি ও কলেজ পরিচালনা পরিষদের কয়েকজনের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার কথা রোববার নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু।

তবে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে একেবারে না করে দিয়েছি। আমি চাই যিনি দায়িত্বে আছেন তিনিই থাকুন।’

স্বপন কুমারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান রোববার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কলেজটি ঈদুল আজহা পর্যন্ত বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের পর কলেজ রান করতে নতুন করে একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। কে দায়িত্ব পাবেন সে ব্যাপারে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবেন।’

তবে এর এক দিন পরেই বদলে গেছে পরিস্থিতি।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইদুর রহমান সোমবার নিউজবাংলাকে বলেন ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার কোনো প্রক্রিয়া চলছে বলে আমার জানা নেই। কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি অচীন কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে আজই আমাদের কথা হয়েছে। তিনি আমাদের জানিয়েছেন এ রকম কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্যায়ভাবে তো একজনকে সরানো যায় না। সরিয়ে দিতে হলে এর জন্য যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ থাকতে হয়। ইচ্ছে করলাম আর সরিয়ে দিলাম, এটা চাইলেই কেউ করতে পারে না এবং পারবেও না।’

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচীন চক্রবর্তীকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছে নিউজবাংলা। তিনিও বলছেন, স্বপন কুমার নিজে থেকে না চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে নতুন কাউকে তারা আনবেন না।

অচীন চক্রবর্তী বলেন, ‘এখন কলেজ বন্ধ আছে। ঈদের আগে বা পরে আমরা কলেজের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালনা পরিষদের সভা ডাকব। সেই সভায় অধ্যক্ষকে দায়িত্ব থেকে সরানোর কোনো প্রস্তাব উঠানো হবে না। মিটিংয়ের তারিখটা স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে।

‘স্বপন কুমার বিশ্বাস যদি নিজ থেকে দায়িত্বে থাকতে না চান, তবেই কেবল মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। তিনি বিনা দোষে অপমানিত হয়েছেন। তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আরও অপমানিত করতে চাই না।’

পরিচালনা পরিষদের সদস্য না হলেও এমপি কবিরুল হককে কেন মিটিংয়ে রাখা হবে, জানতে চাইলে অচীন চক্রবর্তী বলেন, ‘কলেজের সর্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনারা তো জানেন। সেই জন্য তাকে রাখা হবে, যাতে স্থানীয়রা আবার উত্তপ্ত না হয়।’

বিজেপি নেতা নূপুর শর্মাকে সমর্থন করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়া ছাত্রের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে কলেজে সহিংসতা ও শিক্ষককে হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশের কোনো পদক্ষেপ নেই। তারা বলছে, কলেজ বা অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে মামলা না হওয়ার কারণেই বিষয়টিতে কোনো গতি নেই।

জেলা পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় রোববার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ এখন চাইলে মামলা করতে পারেন। এ ছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইলেও মামলা করতে পারে। আমরা বারবার তা বলে আসছি, কিন্তু কেউ এখনও রাজি হয়নি।’

কলেজের পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালনা পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘আমি এ ঘটনার নিন্দা জানাই। আমি তাদের শাস্তি চাই। আর মামলার ব্যাপারটি নিয়ে মিটিংয়ে আলোচনা করা হবে।’

স্বপন কুমারের নিরাপত্তাও বেড়েছে

ঘটনার পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস। তিনি শনিবার নিউজবাংলাকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘১৮ জুন বিকেলে আমাকে থানায় নেয়া হয়। পরের দিন সন্ধ্যায় জানানো হয়, আমাকে বাড়িতে পাঠানো হবে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোথায় যেতে চাই। তখন আমি আমার কলেজের এক শিক্ষকের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিই। তখন নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সঙ্গে ছিল।

‘২৩ তারিখে তাদের বাড়ি থেকে নড়াইল সদরের একটি গ্রামে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছি। লোকলজ্জা ও হামলার ভয়- দুটিই কাজ করছে। তাই পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

তবে সোমবার নিরাপত্তা নিয়ে নিউজবাংলার কাছে স্বস্তি প্রকাশ করেন স্বপন কুমার। তিনি বলেন, ‘আজকে (সোমবার) মনে হচ্ছে পুলিশ ভালো নিরাপত্তা দিচ্ছে। তবে আমি কোন বাড়িতে আছি সে ব্যাপারে কোনো তথ্য কাউকে শেয়ার করছি না। আমার নিরাপত্তার জন্য আমি কাউকে এটা বলছি না।’

স্বপন কুমারের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে তার বর্তমান অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য নিউজবাংলাও প্রকাশ করছে না।

স্বপন কুমারের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর সোমবার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার দিন থেকে ওই এলাকায় একটি ক্যাম্প খোলা হয়েছে। তারা এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রাখতে কাজ করছেন।

‘অধ্যক্ষ যে বাড়িতে আছেন, সেই বাড়িতে পুলিশ বসিয়ে রাখা হয়নি। তবে তার আশপাশে নিয়মিত পুলিশ আছে, তিনি আমাদের নলেজে আছেন। এ ছাড়া ওই ছাত্রের (ফেসবুকে পোস্ট দেয়া ছাত্র) বাড়ির আশপাশেও পুলিশ আছে। তাদেরও সার্বিক নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
ছাত্রদের বেত্রাঘাত : অবরুদ্ধ প্রধান শিক্ষককে ৯৯৯ এ কলে উদ্ধার
স্ত্রীকে নিয়োগ দিয়ে বরখাস্ত প্রধান শিক্ষক
কর্মস্থলে নিরাপত্তা দাবিতে শিক্ষকদের কর্মবিরতি
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ: দ্বিতীয় ধাপের ফল প্রকাশ
শিক্ষকের ভূমিকায় পরিবর্তন আসবে: শিক্ষামন্ত্রী

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The electric three wheeler tiger is coming in July

আসছে ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ‘বাঘ’

আসছে ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ‘বাঘ’ দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির থ্রি হুইলার বাজারে আনছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাঘ মোটরস’। আগামী জুলাইয়ে উৎপাদনে যাবে প্রতিষ্ঠানটি। ছবি: সংগৃহীত
লিথিয়াম ব্যাটারিতে চলা দেশে পেটেন্ট করা প্রথম থ্রি-হুইলার ‘বাঘ’ আসছে আগামী মাস থেকে। বাঘ মোটরস নামে একটি প্রতিষ্ঠান এটি তৈরি করছে। দাম হবে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

যানবাহনের প্রচলিত অ্যাসিড ব্যাটারির মেয়াদকাল ছয় মাস থেকে এক বছর। এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। অথচ একটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি চলে পাঁচ থেকে ছয় বছর। এটি যানবাহন চালানোর খরচ কমিয়ে দেয়। পরিবেশও বাঁচায়।

এমন দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির থ্রি হুইলার বাজারে আনছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাঘ মোটরস’। আগামী জুলাইয়ে উৎপাদনে যাবে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পি জানান, দেশে এটি হবে প্রথম ইকো থ্রি-হুইলার ট্যাক্সি। এর নাম রাখা হচ্ছে ‘বাঘ’। গাজীপুরের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে।

জসিমুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবেশ বাঁচাতে আমাদের তেলের বিকল্প নিয়ে ভাবতেই হবে। শুধু থ্রি-হুইলারই নয়, আগামী তিন বছরে বাস-ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহনও যুক্ত হবে বাঘ মোটরসের বহরে।’

গত মার্চে এ বাহনটিকে চলাচলের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। উচ্চ নিরাপত্তা ফিচার, কম খরচ ও উন্নত প্রযুক্তির এই গাড়ির দাম ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বাঘ মোটরস জানিয়েছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলেও তাদের থ্রি হুইলারে তেমন গরম অনুভূত হয় না।

জসিমুল ইসলাম বলেন, ‘বাঘ মোটরস প্রথম কোনো বাংলাদেশি কোম্পানি নিজস্ব প্যাটেন্ট দিয়ে, নিজস্ব ডিজাইনে নিজস্ব প্রকৌশলে দেশে গাড়ি উৎপাদন করছে। বর্তমানে দেশে অন্যরা যেসব গাড়ি উৎপাদন করছে, সেগুলো প্রযুক্তিসহ সব কিছুই অন্য দেশের। এখানে শুধু উৎপাদন হচ্ছে। আর আমাদের পেটেন্ট থেকে শুরু করে সবকিছুই নিজস্ব।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এ পরিবহন শতভাগ পরিবেশবান্ধব, কোনো দূষণ নাই, সৌরশক্তিতে চলে, গ্রিন এনার্জি ব্যবহার হয়। এমন হাজারটা কারণ আছে, যাতে মানুষ আমাদের এই বাঘ ইকো মোটরসের ইকো ট্যাক্সি ব্যবহার করবে।’

অ্যাসিড ব্যাটারির কারণে দেশে প্রায় ২ কোটি লিটার অ্যাসিড নির্গত হয়ে পরিবেশের ক্ষতি করছে। ফলে বিদ্যুৎচালিত যানবাহন উৎসাহিত করার সময় এসেছে।

জসিমুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই ইকো থ্রি-হুইলারের ডিজাইন-ড্রইং করে পেটেন্ট করেছি। এটা পৃথিবীর প্রথম সোলার ইকো থ্রি-হুইলার, যেটা লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে চলে। এটির পারমিশন পেতে আমাদের প্রায় ৩০ মাস সময় লেগেছে।’

এটির দাম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একটা সিএনজি অটোরিকশার দাম এখন প্রায় ১৮ লাখ টাকা, সেখানে আমরা একটা ইকো থ্রি-হুইলার ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় দিচ্ছি। আমাদের একটা ব্যাটারি ৬ বছর পর্যন্ত পরিবর্তন করতে হয় না। প্রচলিত যেসব অ্যাসিড ব্যাটারি আছে, ছয় বছরে সেখানে ১২টি ব্যাটারি প্রয়োজন হয়।’

২০২০ সালের এপ্রিলে বাঘ মোটরস ১১টি যান তৈরি করে। ডুয়াল পাওয়ার-ব্যাটারি এবং সৌরচালিত এ থ্রি-হুইলারে যাত্রীর নিরাপত্তায় বেশ কিছু ফিচার যুক্ত হয়েছে। এর একটি হচ্ছে যাত্রীর সিটের সঙ্গে ‘প্যানিক বাটন’ রাখা রয়েছে। এই বাটনে চাপ দিলে গাড়ির গতি মুহূর্তেই ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারে নেমে আসবে। এরপর ২০ মিনিটের জন্য গাড়িটি অচল হয়ে যাবে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সতর্কবার্তাও পাঠাবে। এতে কর্তৃপক্ষ ট্যাক্সির কার্যকারিতা নিষ্ক্রিয় করতে পারবে।

এতে থাকবে নিরাপত্তা ক্যামেরা, যা একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত থাকবে। সব ধরনের ভিডিও রেকর্ড ও সংরক্ষণ থাকবে সার্ভারে। থাকবে এমবেড করা রিয়াল-টাইম জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম, যা থ্রি-হুইলারের রিয়াল-টাইম অবস্থান দেখাবে। চুরি ঠেকাতে থাকবে আলাদা প্রযুক্তিও।

গাড়িগুলোতে উচ্চমানের ইস্পাত ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সাধারণত বাস-কারে ব্যবহৃত হয়।

জসিমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গাড়ি শতভাগ মেটাল বডির তৈরি। পুরো বডিই মোটরগাড়ির মতো করে তৈরি, যা যাত্রীকে অধিক নিরাপত্তা দেবে। ব্রেক ও লাইট ছাড়া পুরো গাড়ির দুই বছরের রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি থাকবে। গাড়িতে ওয়াইফাই সিস্টেম থাকবে, মোবাইল চার্জিং সিস্টেম থাকবে, জিপিএস থাকবে, মনিটর থাকবে।’

২০২৫ সালের পর বিশ্বে কোনো ডিজেলচালিত গাড়ি তৈরি হবে না। ২০৩০ সাল থেকে তৈরি হবে না কোনো অকটেন গাড়িও। সব গাড়িই বিদ্যুৎচালিত গাড়িতে পরিণত হবে।

নিজস্ব রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মাধ্যমে একটি ট্যাক্সি সার্ভিস হিসেবে কাজ করবে এই ইকো ট্যাক্সি। এর বাইরে ব্যক্তিগতভাবেও এটি কেনা যাবে।

সাধারণ সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার এবং হিউম্যান-হলারের চেয়ে বড় চাকা থাকবে বাঘ ইকো ট্যাক্সিতে। পাশাপাশি অ্যান্টি-লক ব্রেক সিস্টেম (এবিএস)-সহ একটি হাইড্রোলিক ব্রেক সিস্টেমও থাকবে। গাড়ির ছাদে থাকবে সোলার প্যানেল। এতে ব্যবহৃত একটি ৪৮০ ওয়াটের সোলার প্যানেল দিনের বেলায় ৪০ শতাংশ চার্জ হবে ব্যাটারিতে। যার ফলে অতিরিক্ত ৪০ কিলোমিটার যেতে পারবে গাড়িটি।

প্রতি কিলোমিটারে এটি চলার খরচ হতে পারে ১ দশমিক ৩৩ টাকার মতো। সম্পূর্ণ চার্জে ১৫০০ ওয়াটের গাড়িটি ৯০ কিলোমিটার চলতে পারে। এতে চালকের দিনে খরচ হবে ১২০ টাকা। ব্যাটারির চার্জ শেষ হলেও চিন্তা নেই। ৬০ ভোল্টের ব্যাটারি সম্পূর্ণ চার্জ হতে মাত্র ১৫ মিনিট সময় লাগবে।

বিভিন্ন স্থানে নিজস্ব চার্জিং পয়েন্টও বসানো হবে। চার্জিং পোর্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-সহ একটি মাইক্রো চিপ ইনস্টল করা থাকবে। একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পোর্টটি খোলা হবে। গাড়ির মালিক নির্দেশ দিলেই চার্জ শুরু হবে।

আরও পড়ুন:
মেয়রের ফ্রি বাস সার্ভিসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
‘মহাসড়কে থ্রি হুইলার ডিস্টার্ব, মারণফাঁদ’

মন্তব্য

বাংলাদেশ
How long will it take to raise the cost of Padma bridge?

পদ্মা সেতুর খরচ উঠতে কতদিন লাগবে?

পদ্মা সেতুর খরচ উঠতে কতদিন লাগবে? ফাইল ছবি
পদ্মা সেতুর কারণে অর্থনীতিতে গতি আসবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত। শুধু এই প্রাপ্তি হিসাবে নিলেই মাত্র ৯ মাসে পদ্মা সেতুতে ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ যোগ হবে অর্থনীতিতে। তা ছাড়া সেতুতে প্রতিদিন যে টোল আদায় হবে, শুধু সেটা হিসাব করলে সাড়ে ৯ বছরে সরাসরি উঠে আসবে সেতুর নির্মাণব্যয়।

পদ্মা সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এই বিশাল বিনিয়োগের প্রাপ্তি হিসাবের দুটি উপায় আছে। একটি হলো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বাড়তি প্রাপ্তি বিবেচনা, অন্যটি সেতু দিয়ে পারাপার হওয়া বিভিন্ন যানবাহন থেকে নির্দিষ্ট হারে টোল আদায়ের মাধ্যমে সরাসরি খরচ উঠিয়ে আনা।

কোন উপায়ে কত বছরে পদ্মা সেতুর ব্যয় উঠে আসতে পারে, সরকারিভাবে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায় না। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নানা তথ্য-উপাত্ত থেকে এ বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

এই সেতু দিয়ে দেশের ২৩ জেলায় প্রতিদিন ২১ হাজার ৩০০ যানবাহন চলাচল করবে, যা ২০২৫ সাল নাগাদ বেড়ে দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৬০০। এদের সবার থেকে টোল বাবদ যে আয় হবে, শুধু তা দিয়ে সেতুর ব্যয় উঠে আসতে সময় লাগবে সাড়ে ৯ বছর।

অন্যদিকে সেতু চালু হওয়ার কারণে আগামী এক বছর বা ১২ মাসে অর্থনীতিতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বাড়তি প্রাপ্তি যোগ হবে চলতি বাজারমূল্যে ৪২ হাজার ৩৬২ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, যা জিডিপির ১.২ শতাংশের সমান।

এই বিবেচনায় মাত্র ৯ মাসে উঠে আসবে ৩১ হাজার ৭৭১ কোটি ৬৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা, অর্থাৎ অর্থনীতিতে মাত্র এই ৯ মাসের প্রাপ্তি হবে পদ্মা সেতুর মোট ব্যয়ের সমান।

যে তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব

বিশাল বিনিয়োগের প্রকল্প শুরু করার আগে সেটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা সুফল দেবে এবং তার প্রাপ্তি কতকাল ধরে অর্থনীতি পেতে থাকবে, তার আগাম সমীক্ষা করা হয়ে থাকে। প্রকল্পের গুরুত্ব বুঝে এ ধরনের সমীক্ষায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে সরকার এ মূল্যায়নে সম্পৃক্ত করেছে বিশ্বব্যাংক ও জাইকাকে। জাতীয়ভাবে সরকারও প্রকল্পের সমীক্ষা চালায়।
সম্ভাব্যতা জরিপে বলা হয়, সেতুটি নির্মিত হলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এতে ওই অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়বে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ৭ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সমীক্ষাতেও বলা হয়, জিডিপি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ। আর বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় বলা হয়, পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ শতাংশ হারে।

সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক মন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে পদ্মা সেতুর প্রভাবে জিডিপি ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ার তথ্য দেন। এ ছাড়া দেশীয় একাধিক গবেষণা সংস্থার দাবি, জিডিপি বাড়বে দেড় থেকে দুই শতাংশ পর্যন্ত।

টোল থেকে ব্যয় তুলে আনার হিসাব

সেতু পারাপারে টোল হার কার্যকরের মাধ্যমে সরাসরি ব্যয় তুলে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) একটি নিজস্ব গণনা পদ্ধতি রয়েছে। এই পদ্ধতিকে যে এলাকায় সেতু নির্মিত হবে, ওই এলাকায় ফেরি পারাপার থেকে দৈনিক যে পরিমাণ টোল আদায় করা হয়, সেতু পারপারে তার দেড় থেকে দুই গুণ টোল ধার্য করার নিয়ম রয়েছে।

পদ্মা সেতুতেও টোল হার নির্ধারণ করার আগে ফেরিতে কী পরিমাণ টোল আদায় হয় এবং কী পরিমাণ যানবাহন পারাপার হয়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই সংস্থার তথ্য মতে, ২০২০ সালের নভেম্বরে মাওয়া এবং জাজিরার মধ্যে ফেরিতে যানবাহন পারাপারে দৈনিক ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয় হয়েছে।

সেতু বিভাগ (বিবিএ) এ পরিসংখ্যানকে ভিত্তি ধরে প্রাথমিকভাবে দৈনিক ৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা টোল আদায়ের আশা করছে। অর্থাৎ বিআইডব্লিউটিএর আয়ের দেড় গুণের বেশি এবং দুই গুণের কম আয়ের একটি মধ্যবর্তী ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে টোল হার যেটিই নির্ধারণ করা হোক না কেন, ব্যয় উঠে আসার সময়সীমার ক্ষেত্রে পরিষ্কার কিছু বলা হয়নি। এ নিয়ে নানা গণমাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে খবর হয়েছে। এতে সেতু বিভাগের প্রাথমিক সমীক্ষায় বলা হয়, ৩৫ বছরে উঠে আসবে পদ্মা সেতুর ব্যয়। একই ইস্যুতে দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ বলছেন, সময় লাগবে ২০ থেকে ২৫ বছর এবং কেউ আবার ১৭ বছরের কথা বলছেন।

নিউজবাংলা এসব তথ্যের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করে দেখেছে, টোল থেকে পাওয়া সমুদয় হিসাব বিবেচনায় নিলে সেতুর ব্যয় তুলে আনতে ৯ বছর ৫ মাস ৬ দিনের বেশি লাগবে না।

তবে এ হিসাবে সেতুর পরিচালন খরচ এবং এর সঙ্গে ১৪৭ কিস্তির ১ শতাংশ সুদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. শফিকুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টোল হিসাবে যে রাজস্ব আসবে, সে হিসাবে পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয় উঠে আসার কথা ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। সেতুটি নিয়ে যখন প্রজেক্ট ডিজাইন করা হয়েছে, তখন এমন সম্ভাব্যতার কথাই বলা হয়েছে। তবে আদায় পর্যায়ে টোল হার বিবেচনায় এই সময় আরও কমবেশি হতে পারে।’

অন্যদিকে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোরুল ইসলাম মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, ১৭ বছরে উঠে আসতে পারে পদ্মা সেতুর ব্যয়।

তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুর টাকা সেতু কর্তৃপক্ষকে ১ শতাংশ হারে সুদে সরকারকে ফেরত দিতে হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডিতে বলা হয়েছে, ২৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে টাকাটা (নির্মাণ ব্যয়) উঠে আসবে। এখন মনে হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যেই টাকাটা উঠে আসবে, কারণ মোংলা পোর্ট যে এত শক্তিশালী হবে, পায়রা বন্দর হবে, এত শিল্পায়ন হবে, সেগুলো কিন্তু ফিজিবিলিটি স্টাডিতে আসেনি।’

জিডিপি বিবেচনায় সেতু থেকে বাড়তি প্রাপ্তির হিসাব

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সবশেষ পূর্ণাঙ্গ হিসাব আছে গত ২০২০-২১ অর্থবছরের। সেখানে টাকার অঙ্কে মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ ৩৫ লাখ ৩০ হাজার ১৮৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

আগামী বছর পদ্মা সেতুর প্রভাবে জিডিপি দেড় শতাংশ বাড়লে অর্থনীতিতে প্রথম বছর এর বাড়তি অর্থমূল্য দাঁড়াবে ৫২ হাজার ৯৫২ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। জিডিপি ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়লে সার্বিক অর্থনীতিতে ৪৫ হাজার ৮৯২ কোটি ৪০ লাখ ২৪ হাজার টাকার বাড়তি স্ফীতি ঘটবে। আর জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লে টাকার অঙ্কে জিডিপির বাড়তি প্রাপ্তি আসবে মোট ৪২ হাজার ৩৬২ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। জিডিপি সর্বনিম্ন ১ শতাংশ ধরা হলে আগামী বছর জিডিপির অতিরিক্ত প্রাপ্তি মিলবে মোট ৩৫ হাজার ৩০১ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান নিউজবাংলাকে জানান, ‘আমরা সম্ভাব্যতার বড় জায়গাটায় না গেলাম, সর্বনিম্ন সমীক্ষাটিই যদি গ্রহণ করি, তাও তো জিডিপি বাড়ার হার ন্যূনতম ১ শতাংশ হবে। এটাই হলো আমাদের পদ্মা সেতু, যা বাংলাদেশের সক্ষমতা, সমৃদ্ধি, অহংকার ও সাহসের প্রতীক, যার স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘উত্তরবঙ্গে যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে বিরাট বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার ধারাবাহিকতা এখনও আছে। পদ্মা সেতু চালুর ফলে আগামীর অর্থনীতিতে তার চেয়েও বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে যাচ্ছে।


সম্ভাব্যতার ভিত্তি যেখানে

পদ্মা সেতুর কারণে দেশের দক্ষিণ-পর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৭টি জেলার কৃষি খাত বেগবান হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে বিপ্লব ঘটবে। এতে শিল্পোৎপাদন বাড়বে। দ্রুত পণ্য আনা-নেয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার প্রভাবে সারা দেশের বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে শিক্ষা ব্যবস্থায়। এ ছাড়া কুয়াকাটা, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন খাত বিকশিত হবে। ফলে হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে উঠবে।

মোংলা বন্দর, পায়রা বন্দর ও এনার্জি হাব, ইপিজেড, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বরিশাল-পিরোজপুরে শিপ বিল্ডিং শিল্পসহ সার্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উল্লম্ফন দেখা যাবে কর্মসংস্থানে।

এখন জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের যেসব মানুষ জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী হয়েছে, তারা এলাকায় ফিরে যাবে এবং সেখানেই উৎপাদন, সেবা ও বাণিজ্যমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে। এসবেরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপি এবং টোল আদায়ে।

আরও পড়ুন:
পদ্মার পারে খুলনার ৫০ হাজার মানুষ
১২ হাজার মানুষ নিয়ে পদ্মা সেতু অভিমুখে এমপি শাওন
মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষা

মন্তব্য

p
উপরে