× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট

বাংলাদেশ
Easy to manage train tickets by manipulating tenders
hear-news
player
print-icon

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ

দরপত্রে-কারসাজি-করে-ট্রেনের-টিকিট-ব্যবস্থাপনায়-সহজ
ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সহজ। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। টিকিট ব্যবস্থাপনা খরচ কম দেখাতে তারা রেলের নিজস্ব আয়কে নিজেদের দরপ্রস্তাবে যুক্ত করেছে। এরপর সেই আয় সহজের মোট ব্যয় প্রস্তাবের সঙ্গে বিয়োগ করে টিকিটপ্রতি রেলের কাছ থেকে তাদের পাওনা মূল্য বা সার্ভিস চার্জ কম দেখানো হয়েছে।

তিন মেয়াদে টানা দেড় দশক বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস)। তবে টিকিট বিক্রিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছিল এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

প্রায় দুই বছর আগে রেলের আহ্বান করা দরপত্রে সিএনএসের পরিবর্তে টিকিট ব্যবস্থাপনার জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হয় সহজ লিমিটেড জেভি। এরপর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রেলভবনে আনুষ্ঠানিক সহজ ও রেলের চুক্তি হয়। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ট্রেনের টিকিট বিক্রি করবে সহজ।

তবে দরপত্রের মাধ্যমে সহজকে বেছে নেয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। টিকিট ব্যবস্থাপনা খরচ কম দেখাতে তারা রেলের নিজস্ব আয়কে নিজেদের দরপ্রস্তাবে যুক্ত করেছে। এরপর সেই আয় সহজের মোট ব্যয় প্রস্তাবের সঙ্গে বিয়োগ করে টিকিটপ্রতি রেলের কাছ থেকে তাদের পাওনা মূল্য বা সার্ভিস চার্জ কম দেখানো হয়েছে।

সহজের কারসাজির বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায় ধরা পড়লেও বিষয়টি অজ্ঞাত কারণে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে রেলের ঊর্ধ্বতন কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনও নিউজবাংলার জিজ্ঞাসায় সাড়া দেননি।

সহজের আগের প্রতিষ্ঠান সিএনএস প্রতিটি টিকিট ইস্যু বাবদ রেলের কাছ থেকে ২ টাকা ৯৯ পয়সা সার্ভিস চার্জ নিত। চলতি বছরের চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি টিকিট ইস্যুর জন্য মাত্র ২৫ পয়সা চার্জ নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে কাজটি পায় সহজ।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
রেলওয়েতে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব ফরম (বাঁয়ে), সহজ এই ফরমে একটি সারি বাড়িয়ে ৮.০২ পর্যন্ত করেছে

তবে নিউজবাংলার হাতে আসা সহজ লিমিটেড জেভির আর্থিক দরপ্রস্তাবে ব্যাপক কারসাজির প্রমাণ মিলেছে।

রেলওয়েতে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব ফরম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ফরমটিতে ৮.০১ পর্যন্ত সারি রয়েছে। তবে সহজের জমা দেয়া আর্থিক প্রস্তাবে একটি সারি বাড়িয়ে ৮.০২ পর্যন্ত করা হয়। রেলওয়ের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির একাধিক কর্মকর্তার সইসহ সহজের আর্থিক প্রস্তাবের একটি অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

রেলওয়েতে জমা দেয়া আর্থিক দরপ্রস্তাবে সহজ লিমিটেড জেভি তাদের মোট ব্যয় দেখিয়েছে ৩০ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ১২৯ টাকা। যার সঙ্গে ২০ কোটি টিকিট ভাগ করলে প্রতিটি টিকিটের সার্ভিস চার্জ দাঁড়ায় ১ টাকা ৫১ পয়সা।

ওই দরপত্রে সহজসহ মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। অতীতে টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সিএনএসও অংশ নিয়েছিল সেখানে। সিএনএস যে ব্যয় প্রস্তাব দেয় তাতে টিকিটের সার্ভিস চার্জ ছিল ১ টাকা ২২ পয়সা।

তবে সহজ রেলওয়ের দরপত্রের আর্থিক প্রস্তাবে অতিরিক্ত একটি সারি তৈরি করে কারসাজির মাধ্যমে টিকিট প্রতি সার্ভিস চার্জ ১ টাকা ৫১ পয়সার পরিবর্তে মাত্র ২৫ পয়সা দেখিয়েছে।

ফরমের অতিরিক্ত ওই সারিতে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন থেকে রেল কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য আয় ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকাকে নিজেদের আয় হিসেবে দেখায় সহজ। এরপর তা দরপ্রস্তাবের মোট দর থেকে বাদ দেয়া হয়।

এর ফলে মোট ব্যয় প্রস্তাব ৩০ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ১২৯ টাকার পরিবর্তে নেমে আসে ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ১২৯ টাকায়। আর এর সঙ্গে ২০ কোটি টিকিট ভাগ করে প্রতিটি টিকিটের সার্ভিস চার্জ দেখানো হয় মাত্র ২৫ পয়সা।

টিকিটসহ বিভিন্ন স্টেশনে নানান প্রতিষ্ঠানের দেয়া বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া অর্থ রেলের নিজস্ব আয় হিসেবে বিবেচিত। তবে দরপ্রস্তাবে এই আয় নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজেদের হিসেবে দেখিয়েছে সহজ।

দরপ্রস্তাবে অনিয়মের বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায় ধরা পড়লেও সহজের কাজ পাওয়ায় তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিপিটিইউ-এর প্রতিবেদন

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) তৈরি করা একটি প্রতিবেদনের অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সহজ লিমিটেড জিভি পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে আর্থিক প্রস্তাবের ৮ নং মেইন হেডে একটি অতিরিক্ত লাইন সংযোজন করে বিজ্ঞাপন থেকে ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকা আয় দেখিয়ে তা নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের মূল উদ্ধৃত দর থেকে বিয়োগ করেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সহজ লিমিটেড জেভি ছাড়া অন্য কোনো দরদাতাই তাদের আর্থিক প্রস্তাবে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দাখিল করেনি। যা থেকে প্রতীয়মান হয় রেলওয়ের মূল্যায়ন কমিটি ও সহজ লিমিটেড জেভি নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য পারস্পরিক যোগসাজশে এ ধরনের শর্তযুক্ত প্রস্তাব পেশ করে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এ ধরনের বিজ্ঞাপন খাতে ৫ বছরে ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকার চেয়ে আরও বহুগুণ (বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ৫০০ কোটি টাকা) বেশি আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা একান্তভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের তথা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব আয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার জন্যই পারস্পরিক যোগসাজশে সহজ লিমিটেড জেভি এ ধরনের প্রস্তাব দাখিল করেছে এবং দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বেআইনিভাবে তা অনুমোদন করেছে।’

সহজের দরপত্রে অনিয়মের বিষয়টি রেলের তখনকার অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানও চিহ্নিত করেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি ২০২০ সালে একটি প্রতিবেদনও দেন। তবে সেটি আমলে নেয়া হয়নি। সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথিতে পরে অবশ্য মিয়াজাহানও সই করেন।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানের প্রতিবেদন

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মিয়াজাহান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টেন্ডার ডকুমেন্ট ওখানে যেভাবে আছে সেভাবেই আছে। তারপর আমরা চলে আসছি আড়াই বছর হলো। এখন আড়াই বছর আগের ঘটনা আপনি নিয়ে আইসা প্রশ্ন করলে আমি কি সেগুলো বলতে পারব? এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না।’

দরপত্র দাখিলের যোগ্যতাই ছিল না সহজের

বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকিটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস) দরপত্রের ৭.১(এ). (১).(৩) এর শর্ত অনুযায়ী, দরদাতা প্রতিষ্ঠানের বছরে ৫০ লাখ টিকিট ইস্যু করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এ ছাড়া দরপত্র দলিলের আইটিটি ৭.১(এ) এর টেন্ডার এলিজিবিলিটির শর্ত সমূহের ১(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে একটি সিস্টেমের মাধ্যমে কমপক্ষে ৫০ লাখ টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কোনোভাবেই একাধিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের খণ্ডিত অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।

তবে এই শর্ত পূরণ করেনি সহজ। ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাওয়ার আগে বিভিন্ন বাস কোম্পানির টিকিট বিপণনে যুক্ত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে তাদের বিক্রি করা বাসের টিকিটের সংখ্যা ৫০ লাখ অতিক্রম করেনি।

রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানের প্রতিবেদনেও বিষয়টির উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়, সহজ লিমিটেড বাসের প্রতি টিকিট বাবদ গড়ে ৩০ টাকা করে কমিশন নিয়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম থেকে ২০১৯ সালে ৯ লাখ ৭০ হাজার, ২০১৮ সালে ৭ লাখ ৬১ হাজার, ২০১৭ সালে ৭ লাখ ১০ হাজার, ২০১৬ সালে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ও ২০১৫ সালে ১ লাখ ২০ হাজার টিকিট ছাড় হয়েছে। অর্থাৎ কোনো একক বছরে ৫০ লাখ তো নয়ই, পাঁচ বছরে সহজ সব মিলিয়ে মোট ৩০ লাখ বাসের টিকিট বিক্রি করেছে ।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথি

মিয়াজাহান প্রতিবেদনে বলেন, ‘সহজ বাংলাদেশ রেলওয়ের চাহিত বিগত পাঁচ বছরের কোনো বছরেই সিস্টেম হতে ইস্যুকৃত টিকিটের সংখ্যা ৫০ লাখ অতিক্রম করতে পারে নাই, এমনকি সংখ্যাটি ৫০ লাখের কাছাকাছিও না। সহজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগের অভিজ্ঞতার টিকিটপ্রতি কমিশনের সঠিক হিসাব করলে সিস্টেম হতে ইস্যুকৃত টিকিটের সংখ্যা আরও কম হবে। এ ক্ষেত্রে সহজের দাখিলকৃত দরপত্র প্রস্তাবে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন না করে ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

মিয়াজাহানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে নিউজবাংলার প্রশ্ন ছিল, এই প্রতিবেদন দেয়ার পরও আপনি কেন সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথিতে সই করেছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু আমি দেই নাই, আরও অনেকের সই আছে।’

বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তার সাড়া পায়নি নিউজবাংলা। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু হোয়াটসঅ্যাপে লিখে পাঠানোর পর তিনি ‘সিন করলেও’ কোনো জবাব দেননি।

বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘কথা বলার সময় নেই’ জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার কল করা হরেও তিনি ফোন ধরেননি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহজের এমডি মালিহা এম কাদিরের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ধরেননি। তবে খুদেবার্তা পাঠানো হলে তার জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহাত আহমেদ নিউজবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ফারহাত আহমেদ ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বললে ১১ মে সেগুলো পাঠানো হয়। এর আট দিন পর বুধবার তিনটি প্রশ্নের জবাব দেন মালিহা।

তিনি দাবি করেন, দরপ্রস্তাব দাখিলের যোগ্যতা সহজের নেই- এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির লিড পার্টনার সহজ লিমিটেডের তৈরি করা একটি সফটওয়্যার তথা একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক বছরে মাত্র চারটি অপারেটরের মাধ্যমেই ৭৫ লাখের বেশি টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতা রাখে। এ ছাড়া সহজ লিমিটেড-এর আছে ১০০+ বাস অপারেটর। যদিও অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা টেন্ডার বা উন্মুক্ত দরপত্রে উল্লেখ নেই। তবে সব দিক মিলিয়ে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের দরপত্র অনুযায়ী টেন্ডার এলিজিবেল।’

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
যেভাবে সহজের টিকিটপ্রতি সার্ভিস চার্জ ২৫ পয়সা

দরপত্র ফরমে অতিরিক্ত সারি যোগ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী ৮.০১ পর্যন্ত রোতে জেভির রেভিনিউয়ের বর্ণনা দিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক দরপত্র প্রস্তাবে এও উল্লেখ আছে টেন্ডারারকে অবশ্যই তার রেভনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ উল্লেখ করতে হবে।

‘অতিরিক্ত ৮.০২ রোতে রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এভিনিউয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা যোগ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ রেলওয়ের টেন্ডার নির্দেশনাতেই আছে। সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি কোনোভাবেই আর্থিক দরপত্রের প্রস্তাব থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মতো করে রো কিংবা অপ্রাসঙ্গিক কোনো তথ্য তৈরি করেনি বা যোগ করেনি।’

রেলের বিজ্ঞাপন আয়কে নিজেদের হিসেবে দেখিয়ে টিকিটের সার্ভিস চার্জ কম দেখানোর অভিযোগও অস্বীকার করেন মালিহা।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী টেন্ডারারকে অবশ্যই তার রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ উল্লেখ করতে হবে। টেন্ডার ফরমে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে যে রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ সুষ্ঠুভাবে টেবিল বা রো আকারে উল্লেখ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয়কৃত মূল্যের বিস্তারিত তথ্য দরপত্রে বিস্তারিতভাবে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি উল্লেখ করেছে।

‘দরপত্রের আর্টিকেল জি.৯ সেকশনের (আরইভি) টেন্ডারারকে অনুমতি দেয় তার প্রস্তাবিত রেভিনিউর বিভিন্ন এভিনিউয়ের বিস্তারিত তথ্য দেয়া এবং একই সঙ্গে কীভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে এ থেকে সার্ভিস প্রদান করতে পারবে। সেই সঙ্গে আর্টিকেল জি.৯ সেকশনের আরইভি-০২ টেন্ডারারকে অনুমতি দেয় নিজের মূল্য কমিয়ে নেবার। এগুলো পর্যালোচনা করলেই কীভাবে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি প্রতি টিকিটের টাকা ২৫ পয়সা করেছে তা মূল্যায়ন করা যাবে।’

আরও পড়ুন:
টিটিই শফিকুলের বিরুদ্ধে তদন্ত: প্রতিবেদন জমা দেয়নি কমিটি
রেললাইনে পড়েছিল অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ
প্রতি বগিতে বিনা টিকিটের ১০ যাত্রী
কাজে ফিরেই ৯ হাজার টাকা জরিমানা টিটিই শফিকুলের
বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ার ‘সুযোগ দেন’ রেলকর্মীরাই

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Semai is not making cosmetics in Amins Henolax factory

আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী নয়, তৈরি হচ্ছে সেমাই

আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী নয়, তৈরি হচ্ছে সেমাই কদমতলী এলাকায় নুরুল আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী উৎপাদন বহু বছর ধরে বন্ধ। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
নিউজবাংলা কদমতলী এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, সেখানে নুরুল আমিনের একটি কারখানা থাকলেও প্রসাধনসামগ্রীর উৎপাদন বহু বছর ধরে বন্ধ। কারখানাটি ভাড়া দেয়া হয়েছে একটি সেমাই উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে। প্রসাধনীর পরিবর্তে সেই কারখানায় উৎপাদন করা হচ্ছে সেমাই।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে সোমবার নিজের শরীরে আগুন দিয়ে ব্যবসায়ী গাজী আনিসের আত্মাহুতির ঘটনায় সামনে এসেছে হেনোলাক্স কোম্পানির নাম।

মৃত্যুর আগে গাজী আনিস অভিযোগ করে গেছেন, হেনোলাক্স কোম্পানিতে তিনি ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। লভ্যাংশসহ সেই টাকা ৩ কোটির ওপরে পৌঁছালেও কোম্পানির মালিক নুরুল আমিন কোনো অর্থ ফেরত দেননি। এই নিয়ে মামলা করেও লাভ হয়নি।

এই হতাশা থেকেই সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিজের গায়ে আগুন দেন কুষ্টিয়ার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গাজী আনিস। রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

নুরুল আমিনকে হেনোলাক্স কোম্পানির মালিক বলা হলেও নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেড় যুগ আগেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি।

নুরুল আমিন বর্তমানে আমিন পোল্ট্রি লিমিটেডের চেয়ারম্যান, আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আমিন ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন। এর আগে আমিন হারবাল কোম্পানি লিমিডেট প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ করেছেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে।

আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী নয়, তৈরি হচ্ছে সেমাই
কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের মালিক নুরুল আমিন

ফেসবুকে নিজেকে ডা. এন আমিন হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন তিনি। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যাবসায়িক জীবন শুরু করার আগে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন নুরুল আমিন। ১৯৮৪ সালে হেনোলাক্স কোম্পানি শুরু করার পর তিনি আগের পেশা থেকে সরে এলেও নামের আগে ডা. ব্যবহার করছেন।

ফেসবুকে তিনি বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছেন, বাস্তবে সেগুলোর কার্যক্রম নেই। ঠিকানা হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরানা পল্টনের ‘হেনোলাক্স সেন্টার’-এর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। আর আমিন হারবাল কোম্পানি লিমিডেটের ঠিকানা হিসেবে রাজধানীর কদমতলী এলাকার একটি ঠিকানা রয়েছে।

নিউজবাংলা কদমতলী এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, সেখানে নুরুল আমিনের একটি কারখানা থাকলেও প্রসাধনসামগ্রীর উৎপাদন বহু বছর ধরে বন্ধ। কারখানাটি ভাড়া দেয়া হয়েছে একটি সেমাই উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে। প্রসাধনীর পরিবর্তে সেই কারখানায় উৎপাদন করা হচ্ছে সেমাই।

কদমতলীতে নুরুল আমিনের আরেকটি ভবন রয়েছে। সেখানে ফ্ল্যাট তৈরি করে আবাসিক ভবন হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এই ভবনের নিচতলায় কিছু দোকানও রয়েছে। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেশ কয়েক বছর ধরে নুরুল আমিনের কোনো প্রসাধনসামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি।

আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী নয়, তৈরি হচ্ছে সেমাই
কদমতলীতে হেনোলাক্স কারখানার প্রধান ফটক

কদমতলীর কারখানায় ভৌতিক পরিবেশ

রাজধানীর কদমতলী এলাকায় একসময়ের বিশাল কর্মযজ্ঞের কারণে এখনও এক নামে হেনোলাক্স কারখানাকে চেনেন স্থানীয়রা। লোকমুখে কদমতলীর একটি অংশ হেনোলাক্স নামেই পরিচিত।

কদমতলীর মোহম্মদবাগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কথিত হেনোলাক্স কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১০ কাঠা জায়গার ওপর মূল কারখানা, এর পাশের আরও ১০ কাঠা জমিতে একতলা ভবন রয়েছে।

৯৮৭ মোহম্মদবাগ, কদমতলী- এই ঠিকানার মূল কারখানা ভবনটি তিনতলা। আলো নেভানো এবং ভেতর থেকে বন্ধ কারখানাটিতে ভূতুড়ে পরিবেশ দেখা গেছে। ভেতরে ছিলেন একজন নিরাপত্তাকর্মী। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে গেট খোলার অনুরোধ করলেও তিনি ঢুকতে দেননি।

ওই নিরাপত্তাকর্মী নিজের নাম প্রকাশ না করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কারখানার ভেতরে কেউ নেই। এটি এখন বন্ধ।’

কারখানা কবে বন্ধ হয়েছে এবং সেখানে কী উৎপাদন হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে সেমাই তৈরি করা হয়, তবে দুই-তিন দিন ধরে কারখানা বন্ধ।’

পাশের দোকানি আফজাল হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই এই কারখানা দেখে আসছি। আগে এটা কদমতলীর মেরাজবাগে ছিল, পরে মোহম্মদবাগে আনছে। একসময় তো এই কারখানায় দিন-রাত কাজ চলত। ক্রিম-তেল এগুলা বানাইত। সারা এলাকায় কত সুন্দর ঘ্রাণ পাওয়া যাইত।

‘কারখানার শ্রমিকও ছিল অনেক। কিন্তু ২০০৫ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে কারখানার শ্রমিক আর কাজকর্ম কমতে থাকে। এখন তো দেখি এইখানে সেমাই বানায়া ভ্যানে কইরা নিয়া যায়।’

আফজাল হোসেনের সঙ্গে কথা শেষে আবারও কারখানার মূল ফটকের সামনে গিয়ে মিন্টু নামের এক কাভার্ড ভ্যানচালকের দেখা পাওয়া যায়। তিনি হেনোলাক্স গ্রুপের একমাত্র কাভার্ড ভ্যানের চালক।

কারখানা সম্পর্কে জানতে চাইলে মিন্টু বলেন, ‘ব্যবসায় লসের কারণে নুরুল আমিন সাহেব এই কারখানার এক অংশ এখন সেমাই কারখানাকে ভাড়া দিয়েছেন। অন্য অংশে অনেক বছর ধরে হেনোলাক্সের মেশিন ও যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে আছে।’

মিন্টু বলেন, ‘আরও ১০ থেকে ১২ বছর আগেও কসমেটিকসের নিয়মিত প্রোডাকশন হতো এখানে। কিন্তু লসের পর একে একে হেনোলাক্স, আমিন ফুড ও আমিন হারবালের সব প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অনেক দিন বন্ধই পড়েছিল কারখানাটি। গত দুই বছর ধরে একটি সেমাই প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেয়া হয়েছে।

‘তবে ব্যবসা মন্দার কারণে গত কয়েক দিন ধরে এখানে সেমাই উৎপাদনও বন্ধ। সেমাই কারখানার মালিক-শ্রমিক কেউ দুই দিন ধরে এখানে আসছেন না।’

নুরুল আমিনের সম্প্রতি হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে বলে জানান মিন্টু।

তিনি বলেন, ‘এ জন্য স্যার বেশ কিছুদিন ধরে এখানে আসেন না। কারখানা বন্ধ থাকলেও স্যার আগে কয়েক দিন পরপরই আসতেন। এখন মাঝেমধ্যে ম্যাডাম (নুরুল আমিনের স্ত্রী ফাতেমা আমিন) আসেন, গাড়ি নিয়ে আসেন একটু ঘুরে দেখে আবার চলে যান।’

গাজী আনিসের আত্মাহুতির ঘটনায় করা মামলায় নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী নয়, তৈরি হচ্ছে সেমাই
কদমতলীর মেরাজনগরে হেনোলাক্স ভবন

কদমতলীর হেনোলাক্স ভবন দেয়া হয়েছে ভাড়া

ফেসবুকে আমিন হারবাল কোম্পানি লিমিডেটের ঠিকানা হিসেবে কদমতলীর মেরাজনগরের একটি ঠিকানা দেয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সেটি ‘হেনোলাক্স বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত।

মোহম্মদবাগের কারখানা থেকে অটোরিকশায় মেরাজনগর বাজারে পৌঁছান নিউজবাংলার প্রতিবেদক। এই এলাকার অন্য নাম ‘হেনোলাক্স মোড়’। স্থানীয়রা জানান, বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ‘হেনোলাক্স ভবন-১’ নামের ভবনটির কারণেই লোকমুখে এলাকাটির এমন নামকরণ।

এই ভবনের ঠিকানা: ১০৭৬, মেরাজনগর, কদমতলী। এলাকাবাসী জানান, এই ভবনেই হেনোলাক্সের প্রথম কারখানা ছিল, পরে সেটি মোহম্মদবাগে স্থানান্তর করা হয়। এখানকার কারখানা থেকেই নুরুল আমিনের উত্থান।

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৯৮০ সালের পরে নুরুল আমিন সাহেব এই জায়গা কিনে কারখানা বানান। তখন উনি সারা দিন এখানে থাকত। অনেক শ্রমিক ছিল। হেনোলাক্স দিয়ে উনি খুব অল্প সময়ে নাম করে ফেলেন।

‘তখন তো এই এলাকায় বাড়িঘর তেমন হয়নি। আশপাশে ডোবা আর জঙ্গল ছিল। এখানে মানুষ খুব একটা যাতায়াত করত না। আমিন সাহেব এই কারখানা করার পর এখানে সারা দিন শ্রমিকের আনাগোনা থাকত। ওদের দেখাদেখি সাধারণ মানুষও এখানে যাতায়াত শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘মানুষ শুরু থেকে হেনোলাক্সের কারখানা দিয়েই এই এলাকাকে চেনে। এরপর আমিন সাহেব এই এলাকায় প্রচুর জায়গা-সম্পত্তি কিনেছিলেন। এখন শুধু এই বাড়ি আর মোহম্মদবাগের কারখানাটার কথাই জানি। বাকি সম্পদ আছে কি না আমার জানা নাই।’

দেখা গেছে, পাঁচ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে চারতলা ‘হেনোলাক্স ভবন-১’। এর নিচতলায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ওপরের তিনতলা আবাসিক ফ্ল্যাট আকারে ভাড়া দেয়া হয়েছে। নিচতলায় একপাশে বাজার, অন্যপাশে সেলুন, মুদি দোকান রয়েছে। আর ওপরের তিনতলায় দুটি করে মোট ছয়টি ফ্ল্যাট রয়েছে।

প্রতিটি ফ্ল্যাট মাসিক ১৫ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছেন নুরুল আমিন। আর নিচের বাজার ও দোকান থেকে মাসে প্রায় ১ লাখ টাকা ভাড়া আদায় হয়।

একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া আঞ্জুমান আরা নিউজবাংলাকে জানান, তারা প্রায় পাঁচ বছর ধরে এখানে ভাড়া থাকেন। তিনি বাড়ির মালিক হিসেবে নুরুল আমিন ও তার স্ত্রীর নাম জানেন, তবে কখনও দেখেননি। একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রতি মাসে ভাড়া তুলে নিয়ে যান এবং বাড়ির দেখাশোনা করেন।

আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী নয়, তৈরি হচ্ছে সেমাই
পুরানা পল্টনে কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের প্রধান কার্যালয় এখন বন্ধ

হেনোলাক্সের কথিত প্রধান কার্যালয়ও জনশূন্য

ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে ৩/১ পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ উল্লেখ করেছেন নুরুল আমিন।

সেখানে মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, ১১ তলা বাণিজ্যিক ভবনটির নাম ‘স্কাই ভিউ হেনোলাক্স সেন্টার’। এর তৃতীয় তলায় কথিত হেনোলাক্সের প্রধান কার্যালয়। আমিন ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ঠিকানা হিসেবেও এটি ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে কক্ষটির বাইরের কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলতে দেখা যায়। অফিসের ঠিকানার ফোন নম্বরে কল করা হলেও কেউ ধরেননি।

ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী আবদুল কাদের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সোমবার বিকেল থেকে হেনোলাক্সের এই কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত অফিসে কেউ আসেননি। এর আগে নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী নিয়মিত অফিসে আসতেন। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার তাদের অফিসে আসতে দেখা গেছে।’

কাদের জানান, ১১ তলা বাণিজ্যিক ভবনটির জমির মালিক নুরুল আমিন। তবে স্কাই ভিউ ডেভেলপার কোম্পানি এর ওপর ১১ তলা ভবনটি নির্মাণ করেছে। ভবনের ৩৬টি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটের ১৮টির মালিক নুরুল আমিন, বাকি অর্ধেক পেয়েছে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান।

কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপক রতন কুমারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে পেরেছে নিউজবাংলা। তিনি মঙ্গলবার দাবি করেন, পাঁচ দিনের ছুটিতে তিনি গাজীপুর আছেন এবং অফিস বন্ধ থাকার কোনো তথ্য তিনি জানেন না। নুরুল আমিন ও তার স্ত্রীর ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গেও সোমবার থেকে যোগাযোগ নেই রতনের।

গাজী আনিসের আত্মহত্যার বিষয়টি অবশ্য জানেন রতন কুমার। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি নিউজে দেখেছি এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আমি এই প্রতিষ্ঠানে ২৮ বছর ধরে কাজ করছি, আমি আনিস নামের ভদ্রলোককে কখনও আমাদের অফিসে দেখিনি৷ ওনার নাকি ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা পাওনা ছিল। এমনটা হলে তার তো অফিসে আসার কথা এবং পুলিশেরও আসার কথা।

‘আমি এমন কিছু কখনও দেখিনি এবং আমাদের স্যার-ম্যাডামও এ বিষয়ে কখনও কোনো কিছু বলেননি। বিষয়টি জেনে আমি খুবই অবাক হয়েছি।’

রতন কুমার বলেন, ‘হেনোলাক্স ১৯৮৪ সালে প্রথমে ত্বক ফর্সা করা ও মুখের দাগ দূর করার কয়েকটি ক্রিম নিয়ে বাজারে ব্যবসা শুরু করে। এরপর এর জনপ্রিয়তার কারণে হেনোলাক্সের মোড়কে নকল ক্রিমে বাজার সয়লাব হয়ে যায়। মামলা মোকদ্দমা করেও নকল ক্রিমের বাজার বন্ধ করতে না পেরে ২০০৪ সালে এই ব্যবসা গুটিয়ে নেয় হেনোলাক্স কর্তৃপক্ষ।

‘এরপর নুরুল আমিন হেনোলাক্স ফুড নামে লাইসেন্স নিয়ে রেডি টিসহ দুই-একটি খাদ্যপণ্য বাজারে নিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়ে এটিও বন্ধ হয়ে যায়। নুরুল আমিন ২০১২ সালে আমিন হারবাল কোম্পানি লিমিডেটের লাইসেন্স নিয়ে এর অধীনে বেশ কিছু প্রসাধনসামগ্রী উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেন। তবে ২০১৯ সালের পর এই ব্যবসাতেও ধস নামে।’

রতন কুমার বলেন, ‘আমিন হারবালের উৎপাদনও বন্ধ, কোনো অর্ডার পাওয়া গেলে কেবল সেগুলো তৈরি করে সরবরাহ করা হয়।’

তিনি জানান, ব্যাবসায়িক মন্দার কারণে কদমতলীর কারখানাটি অন্য এক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন নুরুল আমিন। এখন পুরানা পল্টনের ফ্ল্যাট ও কারখানা ভাড়া ছাড়া হেনোলাক্স গ্রুপের আর কোনো দৃশ্যমান আয়ের উৎস নেই।

রতন কুমার বলেন, ‘আমরা কয়েকজন কর্মকর্তা আছি, তারা পল্টনের অফিসে বসি। আমি মূলত পুরানা পল্টনের ভবনটির ও কারখানার ভাড়া তুলি। আর মো. তসলিম উদ্দীন নামে আমিন হারবালের একজন মার্কেটিং ম্যানেজার আছেন। তিনি দৌড়াদৌড়ি করে হারবালের কিছু অর্ডার নিয়ে আসেন, এভাবেই চলছে।’

আমিনের হেনোলাক্স কারখানায় প্রসাধনী নয়, তৈরি হচ্ছে সেমাই
হেনোলাক্স গ্রুপের মালিক নুরুল আমিন (মাঝে) ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিন (ডানে)

আমিন হারবাল লিমিটেডের মার্কেটিং ম্যানেজার মো. তসলিম উদ্দীনের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে। ২০১৬ সাল থেকে তিনি এই পদে আছেন। তিনি মূলত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আমিন হারবালের প্রসাধনীর প্রচার ও বিপণনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে সোমবারের পর থেকে তাকেও অফিসে দেখা যায়নি। তসলিমের ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

নুরুল আমিনের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরে। শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাদিম সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নুরুল আমিনের পরিবারের সদস্যরা অনেক আগে থেকেই ঢাকায় থাকেন। গ্রামের সবাই তাকে হেনোলাক্সের কর্ণধার হিসেবে চেনেন।’

ঢাকায় হেনোলাক্স প্রতিষ্ঠার পরই নুরুল আমিনের পরিবারে সচ্ছলতা আসে উল্লেখ করে নাদিম সরকার বলেন, ‘নুরুল আমিন সাহেব আমাদের এলাকায় সহজ-সরল মানুষ হিসেবে পরিচিত। তার পরিবার অতটা সচ্ছল ছিল না। শুনেছি আগে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। তবে ঢাকায় গিয়ে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হেনোলাক্স প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়।

‘বড় ব্যবসায়ী হিসেবে নাম কামান। ঢাকাসহ নরসিংদীতে অনেক জায়গাজমি কেনেন। তবে আবার এই হেনোলাক্স লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে যায় বলে আমরা শুনেছি। হেনোলাক্স ছাড়া তার আর কোনো ব্যবসা আছে বলে আমার জানা নেই।’

নুরুল আমিনের শ্বশুরবাড়িও একই এলাকায় জানিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ওনার কোনো সন্তান নেই। স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। শুধু ঈদের সময় বছরে দুই-একবার গ্রামে আসেন।’

আরও পড়ুন:
হেনোলাক্স মালিকের বিচার চেয়ে ফেসবুকেও সোচ্চার ছিলেন আনিস
বাঁচানো গেল না গায়ে আগুন দেয়া গাজী আনিসকে
নিজের গায়ে আগুন দিলেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা
কারওয়ান বাজারে ‘রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে যুবকের আত্মহত্যা’
ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছিল কিশোরীর মরদেহ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Merchants Sacrifice Amins Henolax has been closed since 2004

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’ হেনোলাক্সের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল আমিনের (ডানে) বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ী গাজী আনিস আত্মহত্যা করেছেন। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
নুরুল আমিনকে হেনোলাক্স কোম্পানির মালিক বলা হলেও দেড় যুগ আগেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যবসায়িক জীবন শুরু করার আগে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন নুরুল আমিন।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিজের শরীরে আগুন দিয়ে ব্যবসায়ী গাজী আনিসের আত্মাহুতির ঘটনায় সামনে এসেছে হেনোলাক্স কোম্পানির মালিক নুরুল আমিনের নাম।

মৃত্যুর আগে গাজী আনিস অভিযোগ করে গেছেন, হেনোলাক্স কোম্পানিতে তিনি ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। লভ্যাংশসহ সেই টাকা ৩ কোটির ওপরে পৌঁছালেও নুরুল আমিন কোনো অর্থ ফেরত দেননি। এ নিয়ে মামলা করেও লাভ হয়নি।

এই হতাশা থেকেই সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিজের গায়ে আগুন দেন কুষ্টিয়ার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গাজী আনিস। রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, আনিসের মুখমণ্ডলসহ শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। এ ঘটনায় হেনোলাক্স গ্রুপের মালিক নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন আনিসের বড় ভাই নজরুল ইসলাম। মামলার দুই আসামির বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’
আত্মাহুতি দেয়া ব্যবসায়ী গাজী আনিস

হেনোলাক্সের মালিক নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিন সোমবারের ঘটনার পর থেকে লাপাত্তা থাকলেও মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

হেনোলাক্স কোম্পানি বহু আগেই বিলুপ্ত

নুরুল আমিনকে হেনোলাক্স কোম্পানির মালিক বলা হলেও নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেড় যুগ আগেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি।

নুরুল আমিন বর্তমানে আমিন পোল্ট্রি লিমিটেডেটের চেয়ারম্যান, আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আমিন ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন। এর আগে আমিন হারবাল কোম্পানি লিমিডেট প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ করেছেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে।

ফেসবুকে নিজেকে ডা. এন আমিন হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন তিনি। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যবসায়িক জীবন শুরু করার আগে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন নুরুল আমিন। ১৯৮৪ সালে হেনোলাক্স কোম্পানি শুরু করার পর তিনি আগের পেশা থেকে সরে এলেও নামের আগে ডা. ব্যবহার করছেন।

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’
ফেসবুকে তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত থাকার কথা লিখেছেন নুরুল আমিন

ফেসবুকে তিনি বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছেন, বাস্তবে সেগুলোর কার্যক্রম নেই। ঠিকানা হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরানা পল্টনের ‘হেনোলাক্স সেন্টার’-এর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ঠিকানায় গিয়ে ছোট একটি অফিসকক্ষ পাওয়া গেলেও সেটি তালাবদ্ধ দেখা গেছে।

‘বায়বীয়’ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয় দেয়া নুরুল আমিন কথিত হেনোলাক্স গ্রুপে বিনিয়োগের কথা বলে কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী গাজী আনিসের কাছ থেকে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সেই টাকা ফেরত পাননি আনিস।

বিষয়টি নিয়ে গত ২৯ মে তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন। সেখানে তিনি জানান, ২০১৬ সালে নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই সূত্রে ২০১৮ সালে তিনি এই টাকা হেনোলাক্স গ্রুপে বিনিয়োগ করেন।

গত ৩১ মে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সব শেষ স্ট্যাটাস দেন গাজী আনিস। সেখানেও নুরুল আমিন এবং তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের বিচার দাবি করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপও কামনা করেছিলেন তিনি।

ওই স্ট্যাটাসে আনিস লেখেন, ‘২০১৬ সালে হেনোলাক্স গ্রুপের কর্ণধার মো. নুরুল আমিন এবং তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাদের সাথে আমার সখ্যতা এবং আন্তরিকতা গড়ে উঠে। আমি কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেছি এবং কুষ্টিয়া শহরেই বসবাস করি।’

কাজেকর্মে ঢাকায় যাতায়াত করতে হতো আনিসকে। যার মধ্য দিয়ে অভিযুক্ত দম্পতির সঙ্গে তার সখ্য আরও গভীর হয়।

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’
শরীরে আগুন দেয়ার পর হাসপাতালে নেয়ার পথে গাজী আনিস (বাঁয়ে), মামলার আসামি হেনোলাক্স মালিক নুরুল আমিন

আনিস লিখেছেন, ‘তবে প্রতিমাসেই নিজের প্রয়োজনে ঢাকা এলে তাদের সাথে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ হতো এবং উপহার বিনিময় ও ভালো রেস্তোরাঁয় আমরা একসাথে খাওয়া-দাওয়া করতাম এবং বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেতাম। যেহেতু আমি স্বাচ্ছন্দ্য দিনযাপনে অভ্যস্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নিজস্ব গাড়িতেই সব সময় যাতায়াত করি। আমি মো. নুরুল আমিন এবং ফাতেমা আমিনের সঙ্গে নিজের খরচায় দেশের বাইরেও একাধিকবার বেড়াতে গিয়েছি।’

বিদেশে বসেই ওই দম্পতি তাকে হেনোলাক্সে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন বলে উল্লেখ রয়েছে আনিসের স্ট্যাটাসে।

তিনি লেখেন (বাক্য ও বানান অপরিবর্তিত), ‘২০১৮ সালে কলকাতা হোটেল বালাজীতে একইসাথে অবস্থান কালে উনারা আমাকে হেনোলাক্স গ্রুপে বিনিয়োগের এবং যথেষ্ট লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে বলে জানান। আমি প্রথমে অসন্মতি জ্ঞাপন করলেও পরবর্তীতে রাজি হই এবং প্রাথমিক ভাবে এককোটি টাকা বিনিয়োগ করি। পরবর্তীতে তাদের পীড়াপীড়িতে আরও ছাব্বিশ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করি (অধিকাংশ টাকা ঋণ হিসেবে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে নেয়া)।’

তিনি লিখেছেন, ‘বিনিয়োগ করার সময় পরস্পরের প্রতি সম্মান এবং বিশ্বাসের কারণে এবং তাদের অনুরোধে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি চুক্তি করা হয়নি তবে প্রাথমিক চুক্তি করা হয়েছে। বিনিয়োগ পরবর্তী চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি চুক্তিপত্র সম্পাদন করার জন্য বারবার অনুরোধ করি, কিন্তু উনারা গড়িমসি করতে থাকেন।

‘এক পর্যায়ে উনারা প্রতিমাসে যে লভ্যাংশ প্রদান করতেন সেটাও বন্ধ করে দেন এবং কয়েকবার উনাদের লোকজন দ্বারা আমাকে হেনস্তা ব্ল্যাকমেইল করেন এবং করার চেষ্টা করেন। বর্তমানে লভ্যাংশসহ আমার ন্যায্য পাওনা তিন কোটি টাকার অধিক।’

স্ট্যাটাসের শেষ দিকে এসে তিনি লিখেছেন, ‘ভীষণ মানসিক নিপট খরায় আমি উল্লেখিত তথ্যাদি উপস্থাপন করলাম। আমার সামনে বিকল্প পথ না থাকায় ফেসবুকেও সবাইকে জানালাম।

‘আমি এই প্রতারক দম্পতির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট অনুরোধ করছি। সেইসাথে যারা আমার শুভাকাঙ্ক্ষী তারাও সোচ্চার হবেন বলে আশা করছি।’

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’
হেনোলাক্স গ্রুপের মালিক নূরুল আমিন (মাঝে) ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিন (ডানে)

স্ত্রীসহ উধাও হন নুরুল আমিন

ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে ৩/১ পুরানা পল্টন, ঢাকা- ১০০০ উল্লেখ করেছেন নুরুল আমিন।

সেখানে মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, ১১ তলা বাণিজ্যিক ভবনটির নাম ‘স্কাই ভিউ হেনোলাক্স সেন্টার’। এর তৃতীয় তলায় কথিত হেনোলাক্সের প্রধান কার্যালয়। আমিন ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ঠিকানা হিসেবেই এটি ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে কক্ষটির বাইরের কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলতে দেখা যায়। অফিসের ঠিকানার ফোন নম্বরে কল করা হলেও কেউ ধরেননি।

ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী আবদুল কাদের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সোমবার বিকেল থেকে হেনোলাক্সের এই কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত অফিসে কেউ আসেননি। এর আগে নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী নিয়মিত অফিসে আসতেন। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার তাদের অফিসে আসতে দেখা গেছে।’

কাদের জানান, ১১ তলা বাণিজ্যিক ভবনটির জমির মালিক নুরুল আমিন। তবে স্কাই ভিউ ডেভেলপার কোম্পানি এর ওপর ১১ তলা ভবনটি নির্মাণ করেছে। ভবনের ৩৬টি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটের ১৮টির মালিক নুরুল আমিন, বাকি অর্ধেক পেয়েছে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান।

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’
কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের প্রধান কার্যালয় এখন বন্ধ

নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের ফোন নম্বর মঙ্গলবার দুপুরেও বন্ধ পাওয়া যায়। নুরুল আমিনের ফেসবুক পেজটি উন্মুক্ত থাকলেও তার স্ত্রীর ফেসবুক লকড রয়েছে। নুরুল আমিনের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরে খোঁজ নিয়ে সেখানেও তাদের পাওয়া যায়নি।

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাদিম সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নুরুল আমিনের পরিবারের সদস্যরা অনেক আগে থেকেই ঢাকায় থাকেন। গ্রামের সবাই তাকে হেনোলাক্সের কর্ণধার হিসেবে চেনেন।’

ঢাকায় হেনোলাক্স প্রতিষ্ঠার পরই নুরুল আমিনের পরিবারে সচ্ছলতা আসে উল্লেখ করে নাদিম সরকার বলেন, ‘নুরুল আমিন সাহেব আমাদের এলাকায় সহজ সরল মানুষ হিসেবে পরিচিত। তার পারিবার অতটা সচ্ছল ছিল না। শুনেছি আগে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। তবে ঢাকায় গিয়ে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হেনোলাক্স প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়।

‘বড় ব্যবসায়ী হিসেবে নাম কামান। ঢাকাসহ নরসিংদীতে অনেক জায়গাজমি কেনেন। তবে আবার এই হেনোলাক্স লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে যায় আমরা শুনেছি। হেনোলাক্স ছাড়া তার আর কোনো ব্যবসা আছে বলে আমার জানা নেই।’

নুরুল আমিনের শ্বশুরবাড়িও একই এলাকা জানিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ওনার কোনো সন্তান নেই। স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। শুধু ঈদের সময় বছরে দুই-একবার গ্রামে আসেন।’

কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপক রতন কুমারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে পেরেছে নিউজবাংলা। তিনি দাবি করেন, পাঁচ দিনের ছুটিতে তিনি গাজীপুর আছেন এবং অফিস বন্ধ থাকার কোনো তথ্য তিনি জানেন না। নুরুল আমিন ও তার স্ত্রীর ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গেও সোমবার থেকে যোগাযোগ নেই রতনের।

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’
আমিন হারবাল লিমিটেডের মার্কেটিং ম্যানেজার মো. তসলিম উদ্দীন ফুলের তোড়া দিচ্ছেন নুরুল আমিনকে

গাজী আনিসের আত্মহত্যার বিষয়টি অবশ্য জানান রতন কুমার। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি নিউজে দেখেছি এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আমি এই প্রতিষ্ঠানে ২৮ বছর ধরে কাজ করছি, আমি আনিস নামের ভদ্রলোককে কখনও আমাদের অফিসে দেখিনি৷ ওনার নাকি ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা পাওনা ছিল। এমনটা হলে তার তো অফিসে আসার কথা এবং পুলিশেরও আসার কথা।

‘আমি এমন কিছু কখনও দেখিনি এবং আমাদের স্যার-ম্যাডামও এ বিষয়ে কখনও কোনো কিছু বলেননি। বিষয়টা জেনে আমি খুবই অবাক হয়েছি।’

রতন কুমার বলেন, ‘হেনোলাক্স ১৯৮৪ সালে প্রথমে ত্বক ফর্সা করা ও মুখের দাগ দূর করার কয়েকটি ক্রিম নিয়ে বাজারে ব্যবসা শুরু করে। এরপর এর জনপ্রিয়তার কারণে হেনোলাক্সের মোড়কে নকল ক্রিমে বাজার সয়লাব হয়ে যায়। মামলা মোকদ্দমা করেও নকল ক্রিমের বাজার বন্ধ করতে না পেরে ২০০৪ সালে এই ব্যবসা গুটিয়ে নেয় হেনোলাক্স কর্তৃপক্ষ।

‘এরপর নুরুল আমিন হেনোলাক্স ফুড নামে লাইসেন্স নিয়ে রেডি টিসহ দুই-একটি খাদ্যপণ্য বাজারে নিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়ে এটিও বন্ধ হয়ে যায়। নুরুল আমিন ২০১২ সালে আমিন হারবাল কোম্পানি লিমিডেটের লাইসেন্স নিয়ে এর অধীনে বেশ কিছু প্রসাধনসামগ্রী উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেন। তবে ২০১৯ সালের পর এই ব্যবসাতেও ধস নামে।’

রতন কুমার বলেন, ‘আমিন হারবালের উৎপাদনও বন্ধ, কোনো অর্ডার পাওয়া গেলে কেবল সেগুলো তৈরি করে সরবরাহ করা হয়।’

তিনি জানান, হেনোলাক্স গ্রুপের বড় কারখানা রয়েছে রাজধানীর কদমতলীতে। তবে ব্যবসায়িক মন্দার কারণে সেই কারখানাটি অন্য এক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন নুরুল আমিন। এখন পুরানা পল্টনের ফ্ল্যাট ও কারখানা ভাড়া ছাড়া হেনোলাক্স গ্রুপের আর কোনো দৃশ্যমান আয়ের উৎস নেই।

ব্যবসায়ীর আত্মাহুতি: ২০০৪ সাল থেকেই বন্ধ আমিনের ‘হেনোলাক্স’
কথিত হেনোলাক্স গ্রুপের মালিক নুরুল আমিন

রতন কুমার বলেন, ‘আমরা কয়েকজন কর্মকর্তা আছি, তারা পল্টনের অফিসে বসি। আমি মূলত পুরানা পল্টনের ভবনটির ও কারখানার ভাড়া তুলি। আর মো. তসলিম উদ্দীন নামে আমিন হারবালের একজন মার্কেটিং ম্যানেজার আছেন। তিনি দৌড়াদৌড়ি করে হারবালের কিছু অর্ডার নিয়ে আসেন, এভাবেই চলছে।’

আমিন হারবাল লিমিটেডের মার্কেটিং ম্যানেজার মো. তসলিম উদ্দীনের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে। ২০১৬ সাল থেকে তিনি এই পদে আছেন। তিনি মূলত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আমিন হারবালের প্রসাধনীর প্রচার ও বিপণনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে সোমবারের পর থেকে তাকেও অফিসে দেখা যায়নি। তসলিমের ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন:
ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছিল কিশোরীর মরদেহ
কৃষকের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার
গৃহবধূর ঝুলন্ত দেহ ঘরে, অভিযোগ হত্যার
ছাত্র ইউনিয়ন নেতা সাদাতের আত্মহত্যা
‘আত্মহত্যা’য় অভিযুক্ত সুদের কারবারি

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Many have been left out of the census

গণশুমারিতে কেন বাদ পড়লেন অনেকে

গণশুমারিতে কেন বাদ পড়লেন অনেকে গণশুমারিতে বাদ পড়েছেন অনেকে। ফাইল ছবি
নিউজবাংলা মূলত ১০০ পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে। এদের মধ্যে ৭৬টি পরিবারে গণশুমারির লোকজন সরাসরি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে। ২৪টি পরিবার বলেছে, তাদের পরিবারে কোনো গণনাকারী যায়নি।

দেশের ষষ্ঠ গণশুমারিকে ‘ডিজিটাল শুমারি’ আখ্যা দিয়ে মানুষ গণনার কাজ শেষ হলেও অনেকে রয়ে গেছেন সেই গণনার বাইরে। গণনাকারীরা অনেক ক্ষেত্রে বাসায় বাসায় যাননি। অনেক বাসায় না গিয়েও বাইরে দরজায় ‘গণনা হয়ে যাওয়ার স্টিকার’ লাগিয়ে দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে গণনা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ তুললে গণশুমারি শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর নিউজবাংলা এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালায়।

কত লোক বাদ পড়ে থাকতে পারেন, সে বিষয়ে একটি চিত্র পেতে দৈবচয়ন ভিত্তিতে রাজধানীতে বিভিন্ন মহল্লার ১০০ জনের কাছে তাদের শুমারির অভিজ্ঞতা জানতে চায় নিউজবাংলা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীতে অনেক মানুষই গণশুমারির বাইরে থেকে গেছেন।

দেশজুড়ে ১৫ থেকে ২১ জুন ষষ্ঠ ধাপের জনশুমারির কাজ হয়। এবারের জনশুমারি ও গৃহগণনা কার্যক্রমে দেশজুড়ে ৩ লাখ ৬৫ হাজার গণনাকারী ট্যাবের সাহায্যে ৭ দিন ধরে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। বন্যাকবলিত সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় এক সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে ২৮ জুন পর্যন্ত গণনা কার্যক্রম চালানো হয়েছে।

গণশুমারি শেষে গত মঙ্গলবার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জনশুমারির কাজে অবহেলা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘জনশুমারি ও গৃহগণনার কাজের দায়িত্বশীল মন্ত্রী হিসেবে স্বীকার করছি, এবারের মানুষ গোনার কাজে অবহেলা হয়েছে।’

নিউজবাংলা ১০০ পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে। সে ক্ষেত্রে প্রতি পরিবারের সদস্য যদি ৩ জন করে ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে ৩০০ মানুষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ হয়।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০০ পরিবারের মধ্যে ৭৬টি পরিবারে গণশুমারির লোকজন সরাসরি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে। ২৪টি পরিবারে কোনো গণনাকারী যায়নি। এদের মধ্যে ১০টি পরিবার বলেছে, পরিবারের দায়িত্বশীল লোকজনের কাছ থেকে তথ্য না নিয়ে তাদের বাসার বাইরে স্টিকার সাঁটিয়ে দেয়া হয়েছে।

জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পের পরিচালক দিলদার হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এ রকম অভিযোগ ছিল। এসব নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, পরিবারের অন্য কেউ তথ্য দিয়ে দিয়েছে, যারা অভিযোগ করেছে তারা জানে না।’

কোনো বাসায় গণনাকারী গিয়ে কাউকে না পেলে প্রতিবেশীর কাছ থেকে তথ্য নিতে পারে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ । যদি গিয়ে না পায়, তাহলে তো তাদের গণনার বাইরে রাখা যাবে না।’

গণনা না করেও বাসায় স্টিকার লাগিয়ে চলে আসার অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একদিকে কাজ শুরু করে আবার সেই দিকে যাওয়ার কথা রয়েছে। তাই হয়তো বা এ রকম হয়েছে।’

অনেকে জনশুমারির বাইরে রয়ে গেছে মন্তব্য করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা ২১ তারিখের পর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা হটলাইন চালু রেখেছি। যারা গণনার বাইরে ছিল তাদের জন্য সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

গণণাকারী গেছে কি না খোঁজ নিতে যোগাযোগ করা হলে ম-২৫/২/এ, পশ্চিম মেরুল বাড্ডার বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি একটু অসুস্থ থাকার কারণে সব সময় বাসায় থাকি। আমার বাসায় জনশুমারির লোক আসে নাই, কোনো তথ্য নেয় নাই।’

পশ্চিম হাজিপাড়ার রামপুরার বাসিন্দা শাহ আলম খান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাসায় শুমারির লোক আসেও নাই, কোনো স্টিকারও লাগায় নাই। তবে আমাদের ভবনের দোতলায় স্টিকার লাগানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের বাসায় কেউ আসে নাই। বাসার নিচে জনশুমারির লোক দেখেছি। কিন্তু কেন আমাদের বাসায় আসল না জানি না।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলার বাসিন্দা মোস্তাফিজ মিঠু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাসায় শুমারির লোকজন এসেই তথ্য নিয়ে গেছে। কোনো ঝামেলা হয় নাই।’

ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের বাসিন্দা নাজমুল হাসান সাগর। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাসায় কোনো লোক আসে নাই। স্টিকারও মারে নাই। আমরা গণনার বাইরে রয়ে গেলাম।’

রাজধানীর শাহীনবাগের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম রিপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাসায় শুমারির লোকজন এসেছিল। তথ্য নিয়েছে। তবে আমি একটা ভুল তথ্য দিয়ে দিছি। সেটাই আপলোড হয়ে গেছে। পরে অবশ্যই সে নোট নিয়ে গেছে। পরে কারেকশন করবে। কিন্তু সেটা কারেকশন হবে কি না সে শঙ্কা তো রয়েই যায়।’

একই এলাকার বাসিন্দা সৌরভ ইসলাম সিহাব। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাসার চারতলার একপাশ করেছে, আরেক পাশে যায় নাই। পঞ্চম তালায় তো ওঠেই নাই। ১২টা ফ্ল্যাটের মধ্যে ৭টা করছে। বাকি ৫টায় কেউ আসে নাই।’

তথ্য সংগ্রহকারী কারা

প্রকল্প পরিচালক দিলদার হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উপজলোগুলোতে থানা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনওর সভাপতিত্বে একটি কমিটি করা হয়েছিল। সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারকে সভাপতি করে কমিটি করা হয়েছে। যেহেতু ডিজিটাল শুমারি হয়েছে, তাই অ্যানড্রয়েড (ট্যাব) চালাতে পারে কি না, সেটা দেখা হয়েছে। কোথাও লিখিত পরীক্ষা আবার কোথাও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে তাদের বাছাই করা হয়েছে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত দেশে পাঁচটি আদমশুমারি হয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রথম, ১৯৮১ সালে দ্বিতীয়, ১৯৯১ সালে তৃতীয়, ২০০১ সালে চতুর্থ এবং ২০১১ সালে পঞ্চম আদমশুমারি হয়।

২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৮ লাখ। ১০ বছর পর পর শুমারি হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

২০১৩ সালে পরিসংখ্যান আইনের মাধ্যমে আদমশুমারি শব্দটিকে পরিবর্তন করে জনশুমারি করা হয়। আগের প্রতিটি শুমারি হয়েছিল জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে। এবারই প্রথম বর্ষাকালে জনশুমারি হচ্ছে।

শুমারির জন্য প্রথম সময় নির্ধারণ করা হয় গত বছরের ২ থেকে ৮ জানুয়ারি। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে পিছিয়ে ২৫ থেকে ৩১ অক্টোবর ও পরে ২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ট্যাব কেনাকাটার জটিলতার কারণে তৃতীয় দফার সময় পিছিয়ে ১৫ থেকে ২১ জুন সময় ঠিক করা হয়। এবার শুমারিতে ৩ লাখ ৬৫ হাজার গণনাকারী ও ৬৩ হাজার সুপারভাইজার তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

আরও পড়ুন:
জনশুমারি থেকে যেন কেউ বাদ না পড়ে: রাষ্ট্রপতি
ভাসমানদের গণনার মাধ্যমে জনশুমারি শুরু
জনগণনা শুরু মধ্যরাতে

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The humiliated Swapan Kumar was forced to take over as principal

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছনার ঘটনায় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। গ্রাফিক্স মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতে স্বপন কুমার অনীহা দেখালেও আইনি বাধ্যবাধকতায় তিনি পদটি নিতে বাধ্য হন। এরপর বেশ কয়েকবার তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সরে যেতে পারেননি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কলেজটিতে শিক্ষকদের মাঝে রয়েছে নানান সমীকরণ। 

নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টের জের ধরে ব্যাপক সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ঘটনার পেছনে কলেজ শিক্ষকদের একটি অংশেরও উসকানি থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বপন কুমার বিশ্বাসের আগে ওই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু। তবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের কারণে প্রায় দেড় বছর আগে আক্তারকে সরিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয় স্বপন কুমারকে।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতে স্বপন কুমার অনীহা দেখালেও আইনি বাধ্যবাধকতায় তিনি পদটি নিতে বাধ্য হন। এরপর বেশ কয়েকবার তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সরে যেতে পারেননি।

কলেজসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বপন কুমার দায়িত্ব ছেড়ে দিলে পরবর্তী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে আক্তার হোসেনের সামনে আইনি কোনো বাধা থাকবে না। আবার আক্তারেরও রয়েছে বিরোধী পক্ষ। কলেজে গত ১৮ জুনের ঘটনা জটিল হওয়ার পেছনে এসব হিসাব-নিকাশের ভূমিকা থাকতে পারে।

ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার সমর্থনে কলেজের এক হিন্দু শিক্ষার্থীর পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন দিনভর নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, সহিংসতা চলে। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস।

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে
নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল যুবক

এরপর পুলিশ পাহারায় বিকেল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। শিক্ষক স্বপন কুমার হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

ঘটনা তদন্তে কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। এই কমিটিতে নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুবায়ের হোসেনের নেতৃত্বে আছেন নড়াইল সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবির ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমান।

আরও পড়ুন: শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে হেনস্তার পেছনে কলেজে অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়গুলোও অনুসন্ধান করছে এই তদন্ত কমিটি। কমিটির সদস্য নড়াইল জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওই দিনের ঘটনার সঙ্গে শিক্ষকদের কেউ জড়িত কি না আমরা খোঁজার চেষ্টা করছি। ঘটনার ধারাবাহিকতায় বিষয়টি আমাদের এ রকম মনে হচ্ছে।

‘এত শিক্ষক থাকতে যখন ঘটনাটি অল্পের মধ্যে ছিল, তখন বিষয়টি সবাই মিলে চেষ্টা করলে সমাধান করা যেত। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ বিষয়টি জটিল করার দিকে নিয়ে এটা করেছি কি না, সে বিষয়টি আমাদের অনুসন্ধানের মধ্যে আছে। আমি বিষয়টি এখনও পরিষ্কার হতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘তদন্তে এমন কিছু এখনও প্রমাণ করতে পারিনি। তবে যারা আমাদের সাক্ষাৎ দিয়েছেন, তারা বলছেন অভ্যন্তরীণ কোনো ঝামেলা থাকতে পারে।’

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘কলেজে বেশ কয়েক বছর ধরে অধ্যক্ষের পদ ফাঁকা আছে। স্বপন কুমারের আগে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন আক্তার হোসেন টিংকু নামের আরেক শিক্ষক। পরে তাকে সরিয়ে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

‘আমরা শুনেছি, এদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোনো বিরোধ থাকতে পারে। তবে স্পষ্ট করে কেউ কিছু বলেনি। হয়তো তাদের অন্তরে বিরোধিতা ছিল। প্রকাশ্যে কিছু ছিল না।’

আরও পড়ুন: পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?

আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে স্বপন কুমার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হন গত বছরের ২৭ এপ্রিল। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আক্তার হোসেন জুনিয়র ছিলেন, তার ওপরে ছিলেন স্বপন কুমার বিশ্বাস। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনা আছে, অধ্যক্ষের অনুপস্থিতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অন্যজন দায়িত্ব পালন করবেন। সে কারণে তাকে (আক্তার) সরিয়ে নতুন একজনকে অধ্যক্ষ করা হয়েছিল।’

আইনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বেসরকারি কলেজ শাখার উপপরিচালক (কলেজ-২) মো. এনামুল হক হাওলাদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০১১ সালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে বলা হয়, বেসরকারি কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা অনুসরণ করতে হবে।’

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে
শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছনার ঘটনায় তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। গ্রাফিক্স মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা

আক্তার হোসেনের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতে অনীহা ছিল স্বপন কুমারের। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচীন চক্রবর্তী। তবে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই পদটি গ্রহণ করতে হয় স্বপন কুমারকে।

অচীন চক্রবর্তী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আক্তার হোসেনের আগে কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন রওশান আলী। তিনি দুর্নীতির দায়ে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। তখন স্থানীয় সংসদ সদস্য (নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক) কলেজের সভাপতি ছিলেন, তিনি আক্তার হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। আক্তার কয়েক বছর দায়িত্বে ছিলেন।

‘পরে কলেজের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা সেলিম। তিনি পর্যালোচনা করে দেখেন, নীতিমালায় আছে অধ্যক্ষ না থাকলে টপ মোস্ট সিনিয়র শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পাবেন। এরপর তিনি নীতিমালা অনুসারে স্বপনকে দায়িত্ব নিতে বলেন।

‘তিনি (স্বপন কুমার) রাজি ছিলেন না। তবে নীতিমালায় আছে, উপযুক্ত কারণ ছাড়া টপ মোস্ট সিনিয়র দায়িত্ব না নিতে চাইলে তার শাস্তি হবে। তাই তিনি দায়িত্ব নিতে বাধ্য হন।’

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে
স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু

নীতিমালার এই দিকটি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বেসরকারি কলেজ শাখার উপপরিচালক (কলেজ-২) মো. এনামুল হক হাওলাদারও নিশ্চিত করেছেন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কেউ দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (পরিচালনা পর্ষদ) তদন্ত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হলে ভুক্তভোগী শিক্ষক মাউশিতে অভিযোগ করতে পারেন। এরপর মাউশি থেকে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেয়া হয়।’

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচীন চক্রবর্তীর দাবি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিবর্তন নিয়ে স্বপন কুমারের সঙ্গে আক্তার হোসেনের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তবে কলেজে শিক্ষকদের মধ্যে আগে থেকে দ্বন্দ্ব আছে। কলেজে বিভিন্ন জটিলতার কারণে স্বপন কুমার এরই মধ্যে তিনবার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে আইনি বাধ্যবাধকতায় তিনি পদটি ছাড়তে পারেননি।

অচীন চক্রবর্তী বলেন, ‘স্বপন বাবু খুব ভালো মানুষ। সে কারও সাত-পাঁচে জড়ায় না, কারও সঙ্গে দ্বন্দ্বও বাধায় না। সে আগেও তিনবার আমাকে বলেছে, এই ঝামেলার জায়গায় থাকতে চায় না। বলেছে তার শরীর ভালো নেই।’

ঘটনার দিন প্রভাবশালী শিক্ষকরা ছিলেন নিশ্চুপ

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় গত ১৭ জুন রাতে ফেসবুকে নূপুরকে প্রশংসা করে একটি পোস্ট দেন। পরদিন রাহুলের বিষয়ে অভিযোগ নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে যান একদল শিক্ষার্থী। কলেজের চারপাশ ঘিরে জড়ো হয় হাজারো বিক্ষুব্ধ মানুষ।

এমন পরিস্থিতিতে পরামর্শের জন্য স্বপন কুমার কলেজের কয়েক শিক্ষককে ডেকে নিলেও তারা নিশ্চিপ ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একপর্যায়ে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফেসবুকে পোস্ট দেয়া ছাত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আরও পড়ুন: অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই

এ বিষয়ে স্বপন কুমার বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সকালে কিছু ছাত্র আমাকে ঘটনাটি জানালে আমি তিনজন শিক্ষককে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। তাদের মধ্যে ছিলেন কলেজের পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক শেখ আকিদুল ইসলাম, পরিচালনা পরিষদের আরেক সদস্য ও কৃষি শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক কাজী তাজমুল ইসলাম। বাকি আরেক জন হলেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু।’

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে

স্বপন কুমার বলেন, ‘কলেজের যেকোনো অঘটন ঘটলে আমি সব থেকে আগে এই তিন শিক্ষককে জানাই। প্রতিবারের মতো সেদিনও একইভাবে তাদের জানালাম।

‘স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়ার বিষয় নিয়ে আমি তাদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তবে তারা নীরব ছিলেন। কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এরই মধ্যে কলেজে গুজব ছড়িয়ে পড়ে আমি ওই ছাত্রকে সাপোর্ট করছি। তখন কিছু ছাত্র কলেজে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।’

কলেজের শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে সাহায্য করেছে বলে মনে করছেন পরিচালনা পরিষদের সভাপতিও।

আরও পড়ুন: শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক পুলিশ

তিনি বলেন, ‘যেকোনো ক্লাব, স্কুল, কলেজ, বাজার, রাজনীতিক যা বলেন সবখানে পক্ষ-বিপক্ষ আছে। সেই রকম একটি বিষয় আমাদের কলজেও আছে। কলেজের কোনো বিষয় নিয়ে স্বপন বাবুর সঙ্গে আক্তার হোসেনের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তবে আক্তার হোসেনের হয়তো উদ্দেশ্য ছিল স্বপন বাবু সরে গেলে সে প্রিন্সিপাল হতে পারবে। এটা হয়তো আশা।

‘তবে কলেজের ১৮ জুনের ঘটনাটি এলাকার জামায়াত-বিএনপির লোকজনই ঘটিয়েছে। তারা চারপাশের পাঁচ থেকে সাতটি গ্রাম থেকে নছিমন ভরে ভরে লোক এনেছে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, জামায়াত-বিএনপিরাই এসব করেছে। তারা হ্যান্ড মাইক নিয়ে এসে জামায়াত স্টাইলে এসব করেছে।’

কলেজের ভেতর থেকেই বাইরে গুজব ছড়ানো হয়ে থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করছেন অচীন চক্রবর্তী।

কলেজের কোনো শিক্ষক জড়িত থাকতে পারেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘থাকতে পারে মেবি। এটা ইন্টারনালি ইনফর্ম করে দিছে। এখন সারা দেশে জামায়াত-বিএনপি খুবই সোচ্চার। টেলিফোন পেলেই চলে আসে।’

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে

অচীন চক্রবর্তীর দাবি, স্বপন কামারের সঙ্গে কলেজের কোনো শিক্ষকের দ্বন্দ্ব নেই। তবে শিক্ষক আক্তার হোসেনের সঙ্গে শেখ আকিদুল ইসলাম নামের আরেক শিক্ষকের দ্বন্দ্ব আছে। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই শেখ আকিদুলকেও পরামর্শের জন্য ডেকেছিলেন স্বপন কুমার।

শিক্ষক দ্বন্দ্বে সামনে আসছে আক্তার আকিদুলের নাম

স্বপন কুমারের আগে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য কবিরুল হকের সমর্থন ছিল তার সঙ্গে।

আক্তার হোসেনের দাবি, ১৮ জুনের ঘটনার পরদিন কলেজে এক সমাবেশে যোগ দিয়ে এমপি কবিরুল তাকে আবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হওয়ার প্রস্তাব করেন।

আক্তার হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার পরের দিন স্থানীয় এমপি এসে আমাকে নতুন করে দায়িত্ব নেয়ার কথা বলেছিলেন। তবে আমি রাজি হইনি। তিনি (এমপি কবিরুল) বলেছিলেন, এখানে মুসলমান লেবেলের একজন কড়া শিক্ষক দিতে হবে, যিনি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এই কথা বলে তিনি আমার নামটা বলে ফেলেছেন।’

শিক্ষককে অপদস্ত করার ঘটনায় তার নাম আলোচিত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে আক্তার হোসেন বলেন, ‘এমপি সবার সামনে কথাটি বলায় অনেকে এসব ধারণা করছেন। তবে বাস্তবে আমি এর সঙ্গে জড়িত নই।’

আক্তার পাল্টা অভিযোগ তুলছেন আরেক শিক্ষক শেখ আকিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত ভাবাপন্ন যারা আছেন, বিশেষ করে আকিদুল সাহেব। উনি মূলত আমার বিরোধিতা করছেন। তদন্ত কমিটির কাছে এভাবে বলেছেন যে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হওয়ার জন্য সেদিনের ঘটনায় আমার ভূমিকা আছে।’

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ আকিদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে আক্তার হোসেনের কোনো ঝামেলা নেই। মাঝে মাঝে কলেজে টুকটাক বিষয় নিয়ে মতের অমিল হতে পারে। ওই দিনের ঘটনায় কোনো শিক্ষকের উসকানি আছে বলে আমার মনে হয় না। ভিডিও ফুটেজ দেখলেই অনেক কিছু বোঝা যাবে।’

লাঞ্ছিত স্বপন কুমার অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন বাধ্য হয়ে
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক শেখ আকিদুল ইসলাম

দলীয় কোনো পদে না থাকলেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলেও দাবি করেন আকিদুল।

অন্যদিকে আক্তার হোসেনকে নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি গত রোববার নিউজবাংলার কাছে অস্বীকার করেন নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক।

তবে পরে আবারও এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘটনার পরদিনই কলেজে একটি শান্তিশৃঙ্খলার মিটিং হয়েছিল। সেখানে এলাকার উত্তপ্ত মানুষ বিভিন্ন রকম প্রস্তাব দিয়েছিল, শান্ত করার জন্য তাদের বিভিন্ন প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলাম।

‘তবে অধ্যক্ষ স্বপনকে দায়িত্ব থেকে সরানোর কোনো উদ্যোগ আমরা নেব না।’

কলেজে কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও বিরোধ

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজে সৃষ্ট পাঁচটি পদের জন্য গত মার্চে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। তবে নিয়োগ পরীক্ষার দুই দিন আগে কার্যক্রম স্থগিত করে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অচীন চক্রবর্তী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই নিয়োগগুলো এমপিওভুক্ত না। গ্রামের লোকদের দলাদলির কারণে নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। গ্রামের মানুষকে জোর করে কেউ কলেজে চাকরি দিতে চেয়েছিল।

‘বিষয়টি আমি এই মুহূর্তে বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না। তাহলে আমি গ্রামের মানুষের শত্রু হয়ে যাব। শহরের কলেজ হলে এ সমস্যা হতো না।’

জটিলতার কিছুটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয়কে নিয়োগের চাপ ছিল। তাই বন্ধ করা হয়েছিল। তিনি বারবার অনুরোধ করতেছিলেন। তারা আবার দ্বন্দ্ব করতেছিলেন। এই কারণে এটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে কলেজের ১৮ জুনের ঘটনার সঙ্গে ওই নিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই।’

আরও পড়ুন:
শিক্ষকের সঙ্গে অশোভন আচরণ: রাবি ছাত্র কারাগারে
শিক্ষক নিপীড়ন: পুলিশের নির্লিপ্ততা নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্ন
শিক্ষককে জুতার মালা: প্রধান অভিযুক্ত রনি গ্রেপ্তার
অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই
শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যায় জিতু গ্রেপ্তার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The shoelace around the principals neck is in front of the OC

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর সময় ডান পাশে কলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীর। ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষক স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরানোর পর তার আশপাশে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বাহিনীর অন্তত ১০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে যেখানে দাঁড় করিয়ে জুতার মালা পরানো হয়, তার তিন-চার হাত দূরেই দৃশ্যত নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীর।

নড়াইলের সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টের জের ধরে ব্যাপক সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটে। পুলিশের সামনে এমন ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে গলায় জুতার মালা দিয়ে অপদস্থ করার ঘটনায় কারও দায়িত্বে গাফিলতি আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরানোর পর তার আশপাশে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বাহিনীর অন্তত ১০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে যেখানে দাঁড় করিয়ে জুতার মালা পরানো হয়, তার তিন-চার হাত দূরেই দৃশ্যত নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর।

ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার সমর্থনে কলেজের এক হিন্দু শিক্ষার্থীর পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন দিনভর নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, সহিংসতা চলে। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস।

এরপর পুলিশ পাহারায় বিকেল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। শিক্ষক স্বপন কুমার হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই

মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, স্বপন কুমার ও অভিযুক্ত ছাত্রসহ তিনজনকে কলেজের ভেতর থেকে বের করে আনার সময় ডান পাশে কলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর।

ভিডিওতে দেখা যায়, কলাপসিবল গেটের বাম পাশের আরেকটি গেট দিয়ে তিনজনকে বের করে আনা হচ্ছে। এ সময় পুলিশি পাহারার মধ্যেই কলেজের ভেতর থেকে এক তরুণ জুতার মালা হাতে বেরিয়ে আসেন। ওই তরুণের কোমরের এক পাশে আইডি কার্ড ঝুলছিল।

স্বপন কুমার ও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে যে তিন যুবক জুতার মালা পরিয়ে দেয়, তাদের একজনের কাছে আইডি কার্ডধারী তরুণটিই ভেতর থেকে আনা মালা ধরিয়ে দেন। মালা পরানোর আগে ওই তিন যুবকের দুজন ওসি শওকত কবীরের সামনে দিয়ে রেলিং টপকে শিক্ষকের সামনে যান। রেলিং টপকানোর সময়ে দুই যুবকের মধ্যে আকাশি রঙের টি শার্ট পরা যুবকের বাহুতে হাত দিতেও দেখা যায় ওসিকে।

এরপর তিন যুবক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ছাত্রকে জুতার মালা পরিয়ে দেন। এ সময়ে ওসিসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়।

শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর সময় পাশেই নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীরের উপস্থিতি ভিডিওতে শনাক্ত করেছেন পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মলয় কুমার কুণ্ডু।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন ‘ওখানে ওসি ছিল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিল, অতিরিক্ত পুলিশ ছিল। ভিডিওতে দেখেছি, বোঝাই যাচ্ছে উনি ওসি। পুলিশ সে সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।’

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই
রেলিং টপকানো আকাশি রঙের টি শার্ট পরা যুবকের বাহুতে হাত দিতেও দেখা যায় ওসিকে

তবে এ ঘটনার সময় অন্যত্র ছিলেন বলে শুরু থেকে দাবি করছিলেন ওসি শওকত কবীর।

বিষয়টি নিয়ে রোববার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা। সেদিন তিনি বলেন, ‘ওই দিন পাবলিক খুব বেশি উত্তেজিত ছিল। তাদের কন্ট্রোলে নেয়া যাচ্ছিল না। আর আমার চোখে জুতার মালার মতো কোনো কিছু পড়েনি। তাকে যখন গাড়িতে তোলা হয়েছে তখন তার গলায় এ ধরনের কিছু ছিল না।’

আরও পড়ুন: পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?

ভিডিওতে তাকে দেখা গেছে, এমন তথ্য জানিয়ে বুধবার এ বিষয়ে ওসির বক্তব্য আবার জানতে চায় নিউজবাংলা। এ সময়ও তিনি দাবি করেন, অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর সময় তিনি আশপাশে ছিলেন না।

মোহাম্মদ শওকত কবীর নিউজবাংলাকে বলেন, ’আমি মেইন গেটের দিকে ছিলাম। ক্রাউড কন্ট্রোল করছিলাম। রুমের ভেতরে ও ওপরে আমাদের অফিসার এবং ফোর্স ছিল। বের করে নিয়ে আসার পরে তিন-চারজন ওরা যে এইটা করবে, বা ওখানে থাকবে এ রকম কিছু ইনটেনশন ছিল না।’

এরপর তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ভিডিও থেকে নেয়া স্ক্রিনশট পাঠানো হলে বক্তব্যে পরিবর্তন আনেন। অবস্থানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে তিনি বলেন, ‘আমি জুতার মালা পরাতে দেখিনি।’

ঘটনার বর্ণনায় শওকত কবীর বলেন, ‘আমাদের জুনিয়র অফিসাররা বেসিক্যালি পেছন সাইটটায় ছিল, ওনাদের নিয়ে আসার সময়। কোনো ইনটেনশন ছিল না। রাহুলকে (অভিযুক্ত ছাত্র) দিলে পরে আমরা এক্সকিউজ করতে পারি, কিন্তু প্রিন্সিপালকে কোনো দোষ ছাড়াই এটা দিছে। একটা ঘটনা ঘটে গেছে।

‘এখানটাতে এত মানুষ, কোনো ক্যাজুয়ালিটি ছাড়া ওনাকে (স্বপন কুমার) বের করে নিয়ে আসাই আমাদের প্রধান টার্গেট ছিল। কেউ প্রেডিক্ট করতে পারেনি, এমনটি ঘটবে।’

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই

নড়াইল জেলা পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়ও শুরুতে দাবি করেছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা তার জানা নেই, সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এ-সংক্রান্ত ভিডিও তার চোখে পড়েনি। তবে পরে অবস্থান পরিবর্তন করেন পুলিশ সুপার।

ওসি পাশে থাকার পরও এমন ঘটনাটি কীভাবে ঘটল জানতে চাইলে বুধবার পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হঠাৎ করে সবকিছু হচকচ লেগে গেছে। আমরা তদন্ত করছি। কারও গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারেও ‘অনিয়ম’

যে ছাত্রের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে কলেজে উত্তেজনা, সেই ছাত্রের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির মামলার এজাহার নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

মামলার বাদী বলছেন, অভিযুক্ত ছাত্র রাহুল দেব রায় ফেসবুকে কী পোস্ট দিয়েছেন তা তিনি দেখেননি। ওসি শওকত কবীরের ‘অনুরোধে’ তিনি মামলার বাদী হয়েছেন, এমনকি এজাহারও লিখে দিয়েছে পুলিশ। তিনি শুধু সই করেছেন। ঘটনার পরদিন ১৯ জুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাটি হলেও ২০ জুন পুলিশ বাদীর বাড়ি গিয়ে এজাহার ‘সংশোধন’ করে আবার তার সই নিয়েছেন।

আরও পড়ুন: শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক পুলিশ

রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী মির্জাপুর হাজিবাড়ী দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার পরের দিন দুপুরের দিকে ওসি সাহেব আমারে ফোন দিছেন যে, মামলার একজন বাদী হতে হবি, একজন বাদী বের করেন। কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করলাম, কেউ যাতি রাজি না।

‘আমি (ওসিকে) বললাম, মাগরিবের পরে আলোচনা করে কিডা যাবে আমি জানাচ্ছি আপনাদের। সে বলল, না, দেরি হয়ে যাবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে। তাহলে একটা কাজ করেন, আপনি নিজেই বাদী হন। আমরা গাড়িতে করে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি, আবার দিয়ে যাব।’

ফারুক হোসেন বলেন, ‘পরে ওসি সাহেবের গাড়িতে করে গেলাম নড়াইল। নড়াইল গেলে ওসি সাহেব সব লিখেটিখে সব কমপ্লিট করার পর আমি বললাম যে, আমার তো আবার মিটিং আছে, একটু তাড়াতাড়ি যাতি হবে।

‘তখন কলো (বলল), ঠিক আছে, কমপ্লেইন নিয়ে আমি এসপির কাছে যাব। ওখানে ডিআইজির সঙ্গে ফোন করে এডা আলোচনা করে আপনার স্বাক্ষর নেব। আপনার একটু দেরি করে যাতি হবে। তখন আমি ওখানে মাগরিবের নামাজ পড়লাম।’

এর পরের ঘটনার বিবরণ দিয়ে ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওসি সাহেব এরপর যাইয়ে এসপির সঙ্গে আলোচনা করে। ওইটা দেখাদেখি করার পর আমার কাছ থেকে একটা স্বাক্ষর নিল কেসে। যা লেখার উনারা লিখেছেন, আমি কিছু লেখিনি। আমি বলিওনি।

‘আমাক পড়ে শোনাল যে, এই ঘটনা। দেখলাম ওখানে যা হইছে, তাই। আমি যতদূর জানি সব সঠিক। সেইভাবে আমি স্বাক্ষর করি আসলাম।’

মামলা হয়ে যাওয়ার পর এজাহারের কপি পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে জানান, পরদিন পুলিশ তার বাসায় এসে জানায় এজাহারে কিছু সংশোধন করা হয়েছে। এরপর সেই ‘সংশোধিত’ কপিতে আগের দিনের তারিখেই ফারুক হোসেনের সই নেয়া হয়।

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই
শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারের মূল ও সংশোধিত কপি

এজাহারের প্রথম দিনের এবং পরদিনের দুটি কপিই পেয়েছে নিউজবাংলা। ফারুক হোসেনকে পুলিশ বলেছিল এজাহারের নতুন কপিতে কিছু বানান সংশোধন করা হয়েছে। তবে নিউজবাংলা দেখেছে, দুটি কপির মধ্যে ‘উক্ত সময়ে পুলিশ আইন শৃংখলা রক্ষার্থে ০৬ রাউন্ড গ্যাস গান ফায়ার করে‘- এই বাক্যটির হেরফের রয়েছে। একটি কপিতে বাক্যটি থাকলেও আরেকটিতে নেই।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার প্রশ্ন করলে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

আর পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়ের দাবি, মামলার এজাহার পরিবর্তনের বিষয়টি তার জানা নেই। রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার এজাহার লিখে ফারুক হোসেনের সই নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘জোর করে কাউকে তো বাদী বানানোর কথা নয়। ওই প্রসঙ্গটা আমার জানা নেই, থানায় যখন মামলা হয়েছে ওসি সাহেব জানেন।

‘আমি তো এই ব্যাপারটা জানি না। যদি কেউ মামলা না করতে চায়, যদি কোনো বাদী না পাওয়া যায় তখন তো একভাবে না একভাবে মামলা করতেই হবে। উনি যদি মামলা করতে না যেত, তাহলে কি আমরা মামলা করতে পারতাম? যদিও এটা আমার জানা নেই।’

পুলিশ সুপার অবশ্য অভিযোগ অনুসন্ধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যেহেতু বলেছেন, আমি খোঁজ নেব জিনিসটা কী হয়েছিল। যদি কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’

আরও পড়ুন:
শিক্ষক হত্যা: আলামত জব্দে দেরি, আসামির বয়সও ভুল
শিক্ষক উৎপল হত্যা: তৃতীয় দিনেও সড়কে শিক্ষার্থীরা
‘শিক্ষকের গলায় জুতার মালায় দুঃখিত, দায়িত্বে অবহেলায় ব্যবস্থা’
শিক্ষক নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় শিক্ষক সমিতি
শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা: অভিযুক্তের বাবা গ্রেপ্তার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Shoe garland to the teacher The author of the statement against the student is the police

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ পুলিশের গাড়িতে তোলার আগে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস ও শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়কে জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি (বাঁয়ে) এবং রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারের কপি। ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী মো. ফারুক হোসেন বলছেন, এজাহারে কী আছে সেটি তার জানা নেই। তিনি রাহুলের ফেসবুক পোস্টও দেখেননি। সহিংসতার পরদিন পুলিশ তাকে থানায় ডেকে নিয়ে তাদের লেখা এজাহারে সই করিয়ে নিয়েছে। পরদিন সেটি সংশোধন করে আবার নেয়া হয় সই।  

নড়াইলের সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টের জের ধরে ব্যাপক সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ফেসবুকে পোস্ট দেয়া শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায় এখন কারাগারে আছেন।

তবে মামলার বাদী বলছেন, রাহুল ফেসবুকে কী পোস্ট দিয়েছেন তা তিনি দেখেননি। পুলিশের অনুরোধে তিনি মামলার বাদী হয়েছেন, এমনকি এজাহারও লিখে দিয়েছে পুলিশ। তিনি শুধু সই করেছেন। ঘটনার পরদিন ১৯ জুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাটি হলেও ২০ জুন পুলিশ বাদীর বাড়ি গিয়ে এজাহার ‘সংশোধন’ করে আবার তার সই নিয়েছেন।

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাস ১৮ জুন আকস্মিকভাবে উত্তাল হয়ে ওঠে। একদল শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, আগের দিন একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার সমর্থনে পোস্ট দিয়েছেন।

বিষয়টি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জানান ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আশপাশের এলাকার হাজারও মানুষ ক্যাম্পাসে জড়ো হয়। স্বপন কুমার সাহায্য চান স্থানীয় থানার।

একপর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস। বিক্ষুব্ধরা স্বপন কুমার বিশ্বাসসহ কলেজের আরও দুই হিন্দু শিক্ষকের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে দেশব্যাপী। অলংকরণ: মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা

পুলিশ পাহারায় বিকেল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। শিক্ষক স্বপন কুমার হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পুলিশের সামনে শিক্ষকের এমন অপদস্ত হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

নূপুর শর্মাকে সমর্থন করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী রাহুল দেবের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। তবে কলেজে হামলা ও শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় ৯ দিন পর মামলা করেছে পুলিশ। এই সময়ের মধ্যে পুলিশের দাবি ছিল, স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা তারা ‘দেখেনি’। ভাইরাল ভিডিওটিও তাদের চোখে পড়েনি। এরই মধ্যে স্বপন কুমারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার তোড়জোড় শুরু করে কলেজ পরিচালনা কমিটি।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

বিষয়টি নিয়ে রোববার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

আরও পড়ুন: পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?

শিক্ষক স্বপন কুমারকে নিয়ে নিউজবাংলার প্রতিবেদনটি নজরে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ সোমবার নিউজবাংলাকে জানান, স্বপন কুমারকে তার চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ এমন চেষ্টা করলেও মাউশি তাতে অনুমোদন দেবে না।

স্বপন কুমার ইস্যুতে সমালোচনার মুখে পড়া নড়াইলের প্রশাসনও নড়েচড়ে বসে।

আরও পড়ুন: শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ

কলেজে হামলা ও শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় সোমবার দুপুরে নড়াইল সদর থানায় মামলা করেন পুলিশের উপপরিদর্শক ও মির্জাপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ মোরছালিন। রোববার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় তিনজনকে। বিষয়টি নিউজবাংলাকে মঙ্গলবার নিশ্চিত করেন নড়াইলের পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর।

কলেজে সহিংসতার পরদিন ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্ট দেয়া শিক্ষার্থী রাহুল দেব শর্মার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় রাহুল এখন কারাগারে।

রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার বাদী যা বলছেন

শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী মির্জাপুর হাজীবাড়ী দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলছেন, এজাহারে কী আছে সেটি তার জানা নেই। তিনি রাহুলের ফেসবুক পোস্টও দেখেননি। সহিংসতার পরদিন পুলিশ তাকে থানায় ডেকে নিয়ে তাদের লেখা এজাহারে সই করিয়ে নিয়েছে।

ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার পরের দিন দুপুরের দিকে ওসি সাহেব আমারে ফোন দিছেন যে, মামলার একজন বাদী হতে হবি, একজন বাদী বের করেন। কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করলাম, কেউ যাতি রাজি না।

‘আমি (ওসিকে) বললাম, মাগরিবের পরে আলোচনা করে কিডা যাবে আমি জানাচ্ছি আপনাদের। সে বলল, না, দেরি হয়ে যাবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে। তাহলে একটা কাজ করেন, আপনি নিজেই বাদী হন। আমরা গাড়িতে করে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি, আবার দিয়ে যাব।’

ফারুক হোসেন বলেন, ‘পরে ওসি সাহেবের গাড়িতে করে গেলাম নড়াইল। নড়াইল গেলে ওসি সাহেব সব লিখে-টিখে সব কমপ্লিট করার পর আমি বললাম যে, আমার তো আবার মিটিং আছে, একটু তাড়াতাড়ি যাতি হবে।

‘তখন কলো (বলল), ঠিক আছে, কমপ্লেইন নিয়ে আমি এসপির কাছে যাব। ওখানে ডিআইজির সঙ্গে ফোন করে এডা আলোচনা করে আপনার স্বাক্ষর নেব। আপনার একটু দেরি করে যাতি হবে। তখন আমি ওখানে মাগরিবের নামাজ পড়লাম।’

এর পরের ঘটনার বিবরণ দিয়ে ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওসি সাহেব এরপর যাইয়ে এসপির সঙ্গে আলোচনা করে। ওইটা দেখাদেখি করার পর আমার কাছ থেকে একটা স্বাক্ষর নিল কেসে। যা লেখার উনারা লিখেছেন, আমি কিছু লেখিনি। আমি বলিওনি।

‘আমাক পড়ে শোনাল যে, এই ঘটনা। দেখলাম ওখানে যা হইছে, তাই। আমি যতদূর জানি সব সঠিক। সেইভাবে আমি স্বাক্ষর করি আসলাম।’

মামলা হয়ে যাওয়ার পর এজাহারের কপি পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে জানান, পরদিন পুলিশ তার বাসায় এসে জানায় এজাহারে কিছু সংশোধন করা হয়েছে। এরপর সেই ‘সংশোধিত’ কপিতে আগের দিনের তারিখেই ফারুক হোসেনের সই নেয়া হয়।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারের মূল ও সংশোধিত কপি

এজাহারের প্রথম দিনের এবং পরদিনের দুটি কপিই পেয়েছে নিউজবাংলা। ফারুক হোসেনকে পুলিশ বলেছিল এজাহারের নতুন কপিতে কিছু বানান সংশোধন করা হয়েছে। তবে নিউজবাংলা দেখেছে, দুটি কপির মধ্যে ‘উক্ত সময়ে পুলিশ আইন শৃংখলা রক্ষার্থে ০৬ রাউন্ড গ্যাস গান ফায়ার করে‘- এই বাক্যটির হেরফের রয়েছে। একটি কপিতে বাক্যটি থাকলেও আরেকটিতে নেই।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

আর পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়ের দাবি, মামলার এজাহার পরিবর্তনের বিষয়টি তার জানা নেই। রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার এজাহার লিখে ফারুক হোসেনের সই নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘জোর করে কাউকে তো বাদী বানানোর কথা নয়। ওই প্রসঙ্গটা আমার জানা নেই, থানায় যখন মামলা হয়েছে ওসি সাহেব জানেন। আমি তো এই ব্যাপারটা জানি না। যদি কেউ মামলা না করতে চায়, যদি কোনো বাদী না পাওয়া যায় তখন তো একভাবে না একভাবে মামলা করতেই হবে। উনি যদি মামলা করতে না যেত, তাহলে কি আমরা মামলা করতে পারতাম? যদিও এটা আমার জানা নেই।’

পুলিশ সুপার অবশ্য অভিযোগ অনুসন্ধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যেহেতু বলেছেন, আমি খোঁজ নেব জিনিসটা কী হয়েছিল। যদি কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’

এ ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. কামরুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাদী মামলার একটা বড় অনুষঙ্গ। মামলা করতে গেলে বাদী লাগবেই। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আমরা সুয়োমোটো মামলা নেই, যেটাতে পুলিশই বাদী হয়।

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী (ফারুক হোসেন) যেটা বলেছেন, সেটা ওনার ব্যক্তিগত মতামত। মামলার বিষয়টি লোকচক্ষুর আড়ালে হয় না। সাক্ষীসাবুদ নিয়েই এজাহার করা হয়। বাদী এখন বলছেন যে তাকে বাদী বানানো হয়েছে, তিনি কিছু জানেন না। তিনি এটা বলতে পারেন। এটা যদি আমাদের কাছে আসে তাহলে আমরা তদন্তসাপেক্ষে দেখব।’

কোনো ব্যক্তির করা মামলার এজাহার পরে সংশোধন বা পরিবর্তন করার সুযোগ পুলিশের নেই বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। বিষয়টি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ বাদী হয়ে কোনো মামলা করলে পরে পুলিশ চাইলে সেটি পরিবর্তন করতে পারে। তবে কোনো সাধারণ মানুষ বাদী হয়ে এজাহার তৈরির পর মামলা দায়ের হয়ে গেলে, তা আর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এটি পরিবর্তন করা হলে তার আইনগত কোনো ভিত্তিও নেই।’

শিক্ষক হেনস্তার ৯ দিন পর মামলা

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজে সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ঘটনার ৯ দিন পর সোমবার এ-সংক্রান্ত মামলা করেছে পুলিশ।

দণ্ডবিধির ৩৪, ১৪৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩, ৩৪১, ৩৩২, ৩৫৩, ৩৫৫, ৪৩৬, ৪২৭, ৫০০ ধারায় করা এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ১৭০ থেকে ১৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

এরপর রোববার রাতেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে আছেন কলেজের পাশের মির্জাপুর বাজারে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী শাওন খান। লাল গেঞ্জি পরা ৩০ বছর বয়সী শাওনকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ভিডিওতে চিহ্নিত করা গেছে।

শাওনের মা হোসনেয়ারা বেগম মঙ্গলবার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গতকাল রাতে আমার ছেলেকে দেখা করতে বলে মির্জাপুর ক্যাম্প পুলিশ। দেখা করতে গেলে তাকে আটকায় দিছে।’

হোসনেয়ারা বেগম দাবি করেন, তার ছেলে ঘটনার দিন শিক্ষক বা অভিযুক্ত ছাত্রকে বিক্ষুব্ধ লোকজনের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। এর পরেও ‘বিনা কারণে’ পুলিশ তাকে নিয়ে গেছে। তবে স্বপন কুমারকে জুতা পরানোর ভিডিওতে শাওনকে শনাক্ত করেন হোসনেয়ারা।

এ মামলায় গ্রেপ্তার আরও দুজন হলেন মির্জাপুর মধ্যপাড়া মো. মনিরুল ইসলাম এবং মির্জাপুরের সৈয়দ রিমন আলী।

কী আছে মামলার ধারায়

কলেজে হামলা ও শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় সোমবার দুপুরে নড়াইল সদর থানায় পুলিশের উপপরিদর্শক ও মির্জাপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ মোরছালিনের করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা রয়েছে।

এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যখন কিছু ব্যক্তি মিলে সবার একই অভিপ্রায় পূরণের জন্য কোনো অপরাধমূলক কাজ করেন তখন ওইসব ব্যক্তির প্রত্যেকেই ওই কাজের জন্য এভাবে দায়ী হবেন যেন কাজটি ওই ব্যক্তি এককভাবে করেছেন।’

মামলায় ১৪৩ ধারাও দিয়েছে পুলিশ। এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো বেআইনি সমাবেশের সদস্য হবেন তিনি যেকোনো বর্ণনার সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, যার মেয়াদ ছয় মাস পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

৩২৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি ধারা৩৩৪ এ ব্যবস্থিত ক্ষেত্র ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত দান করলে তিনি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে- যার পরিমাণ এক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

দণ্ডবিধির ৩৪১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কেউ কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাধাদান করলে তিনি বিনাশ্রম কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ এক মাস পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে- যার পরিমাণ পাঁচশ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৩৩২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদান করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করলে যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৩৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদানের উদ্দেশ্যে আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করলে যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে অথবা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৩৫৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘মারাত্মক প্ররোচনা ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে অপমান করার জন্য আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করলে যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে অথবা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৪২৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি অনিষ্ট সাধন করে এবং তার মাধ্যমে ৫০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি লোকসান বা ক্ষতি করলে সে ব্যক্তি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৪৩৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘গৃহ ইত্যাদি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে আগুন বা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করে অনিষ্ট সাধন করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে-দণ্ডিত হবেন, এর সঙ্গে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।’

৪৪৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ করলে তিনি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ তিন মাস পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে যার পরিমাণ পাঁচশ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৪৪৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অনধিকার গৃহপ্রবেশ করলে তিনি যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে যার পরিমাণ এক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৫০০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি কারও মানহানি করলে তিনি বিনাশ্রম কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে দেশব্যাপী। অলংকরণ: মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা

আগের অবস্থান থেকে সরেছে প্রশাসন

শিক্ষক স্বপন কুমারকে প্রকাশ্যে জুতার মালা পরিয়ে দেয়ার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হলেও পুলিশ সপ্তাহখানেক পরেও দাবি করেছিল, তারা এ সম্পর্কে কিছু জানে না।

নড়াইল জেলা পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় রোববার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অধ্যক্ষকে যখন কলেজের কক্ষ থেকে বের করে আনা হয়, তখন সেখানে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। এ ছাড়া নড়াইল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তখন কেউ তাকে জুতার মালা দিয়েছে কি না, আমরা দেখতে পারি নাই। এটা আমার জানাও নেই।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমি এখনও কোনো ভিডিও দেখি নাই। জুতার মালার ব্যাপারটাও জানি না। এ ঘটনায় আমি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তারা প্রতিবেদন দিলে যে বা যারা দোষী হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তবে পুলিশ সুপার মঙ্গলবার নিউজবাংলাকে বলেন, ঘটনার দিন তিনি বেশ খানিকটা দূরে অবস্থান করছিলেন। এ কারণে স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরিয়ে দেয়ার ঘটনা তার চোখে পড়েনি।

তিনি বলেন, ‘ওইদিন চারিদিক থেকে বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার জনতা ছিল। তাদের নিবৃত্ত করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। ওখানে স্বয়ং ডিসি সাহেব ছিলেন, আমি ছিলাম। আমরা সর্বদা চেষ্টা করেছি, যতটুকু কম বলপ্রয়োগ করে রক্তপাতহীনভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়, সেইভাবে আমরা চেষ্টা করেছি।

‘ডিসি সাহেব, আমরা অনেক বুঝিয়েছি লোকদের। ডিসি সাহেব এবং আমরা চেয়েছিলাম তাদের (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত ছাত্র) দ্রুত গাড়িতে তুলে রেসকিউ করতে। আমরা চেষ্টা করেছি সেইভাবে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে ঠান্ডা করার জন্য, কথা বলার জন্য আমি এবং ডিসি সাহেব মেইন যে রাস্তা… ওই জায়গায় ছিলাম।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘যখন ওখান থেকে (কলেজ) তাদেরকে (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত ছাত্র) নামায়, আমি আর ডিসি সাহেব ছিলাম অন্য জায়গায়। মেইনে যে রাস্তা, যেখানে টার্ন করবে ওই জায়গাতে আমরা। আমাদের মুখটা ছিল উল্টোদিকে, জনগণকে আমরা বুঝাচ্ছিলাম, ওইটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।

‘এদিকে তারা টান দিয়ে নিয়ে যেয়ে গাড়িতে তুলবে সেই সময় হয়তো হঠাৎ করে এই কাজটা হয়তো হয়ে গেছে। এটাতে কিন্তু আমাদের নিজেদের কোনো ইয়ে ছিল না যে এ রকম হতে পারে। হওয়ার পরপর, কিছুক্ষণ পর হয়তো যখন তাদেরকে গাড়িতে তুলেছি হুড়োহুড়ির ভেতরে, তখন তার কিন্তু গলায় এটা দেখি নাই। একটু পরে যখন গাড়িতে তুলেছি হুড়োহুড়ির ভেতরে কেউ হয়তো খুলে ফেলে দিছে। ওই সময় তাদের নিয়ে মুভ করানোর সময় হয়তো কাজটা হয়ে গেছে।’

আরও পড়ুন:
শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ
শিক্ষককে হত্যা: দুই দিনেও ধরা পড়েনি অভিযুক্ত ছাত্র
শিক্ষকের গলায় জুতার মালা: প্রতিবাদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে
পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?
শিক্ষক নিয়োগ: চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কাজ শুরু

মন্তব্য

বাংলাদেশ
That is why the Padma Bridge was opened

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের বোল্টের নাট টাইট দিয়ে আঠা লাগানোর কাজ চলছে। ছবি: সংগৃহীত
পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভায়াডাক্ট অংশে পদ্মা সেতুর রেলিংটি বানানো হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে। এসব ক্ষেত্রে বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট করার সময়, সেখানে এক ধরনের গ্লু বা আঠা ব্যবহার করতে হয়। তবে সেতু উদ্বোধনের আগে গ্লু দিয়ে সব নাট আটকানো সম্ভব হয়নি।’

পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেতুটির রেলিংয়ের নাট খুলে টিকটক বানানোর ঘটনা আলোড়ন তুলেছে গোটা দেশে। এরপরই নড়েচড়ে বসেছে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা, চলছে নাট টাইট দেয়ার কাজ।

সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েকটি নাট খোলার ঘটনাটি ঘটে পদ্মা সেতুর জাজিরাপ্রান্তের ভায়াডাক্ট অংশে। সময় স্বল্পতায় সেতুর রেলিংয়ের সব নাট পরিকল্পনা অনুযায়ী শক্তভাবে এঁটে দেয়া যায়নি, সেতু উদ্বোধনের পর সেই কাজটি এখন চলমান।

রোববার সকাল পৌনে ৯টার দিকে সেতুতে নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেছে। রেঞ্জ দিয়ে নাট টাইট দিচ্ছিলেন তারা। সেই সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের আঠা।

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট
পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের বোল্টের নাট টাইট দিয়ে আঠা লাগানোর কাজ চলছে। ছবি: সংগৃহীত

মেরামত কাজে জড়িত শ্রমিকরা জানান, সেতুতে রেলিং স্থাপনে বোল্টের ওপর প্রথমে একটি ওয়াসার বসানো হয়। তারপর বোল্টের নাটটি ঘুরিয়ে আটকে দেয়া হয়। এই নাট যাতে সহজে খোলা না যায় সেজন্য বোল্টের মধ্যে নাটটি কিছুদূর ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের গ্লু (আঠা)।

টিকটকারদের ওপর কর্মকাণ্ডে সেতুর নির্মাণ শ্রমিকদেরও প্রচণ্ড বিরক্ত দেখা গেছে। বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভিকে তাদের একজন বলেন, ‘এই সাইড থেকে দুইটা ফেলাইছে, ওই সাইড থেকে দু্ইটা ফেলাইছে, এরম করে বহু নাট ফেলাই দিছে। এখন নতুন করে লাগাইতে হইতাছে। বাঙালিরা টিকটক করছে, আর মনে করেন নাট ফেলাই দিছে।’

আরও পড়ুন: পদ্মা সেতুর নাট খোলায় বাইজীদের সঙ্গী কায়সার

এই শ্রমিক বলেন, ‘এখন পদ্মা সেতুর নাট নিয়ে টিকটক করা শুরু করছে। তারে (গ্রেপ্তার টিকটকার বাইজীদ) উচিত শিক্ষা দেয়া উচিত, যে এই ক্ষতি করছে।’

কেন খোলা গেল নাট?

ভায়াডাক্ট অংশে পদ্মা সেতুর রেলিংটি বানানো হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে। এসব ক্ষেত্রে বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট করার সময়, সেখানে এক ধরনের গ্লু বা আঠা ব্যবহার করতে হয়। তবে সেতু উদ্বোধনের আগে গ্লু দিয়ে সব নাট আটকানো সম্ভব হয়নি বলে জানান পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই সেতুর রেলিংয়ে লোহা নয়, ব্যবহার করা হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল। ফলে রেলিংয়ের বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট দেয়ার সময় বিশেষ এক ধরনের গ্লু (আঠা) দিতে হয়। তাতে নাটটি শক্ত করে আটকে যায়। কিন্তু এখনও গ্লু দেয়া হয়নি।’

পদ্মা সেতুতে রেলিংয়ের নাট টাইট দেয়ার সময় শ্রমিকদের ‘লকটাইট ২৬৩’ নামের একটি থ্রেডলকার ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

এই সরঞ্জামটি সম্পর্কে ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট দেয়ার সময় এটি ব্যবহার করলে সংযোগটি শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। কোনো আঘাত বা কম্পন তৈরি হলেও নাটটি আর ঢিলে হয় না। উচ্চতাপে কিংবা তেল প্রয়োগেও সংযোগকে দুর্বল করা যায় না।

বোল্ট, নাট এগুলো ঠিকঠাক ও মেরামত করাকে সেতু রক্ষণাবেক্ষণের চলমান প্রক্রিয়া বলেও মন্তব্য করেন দেওয়ার আব্দুল কাদের।

তিনি বলেন, ‘সেতুর ওপর আমাদের আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সেতুতে যান চলাচলের মাঝেই সেই কাজগুলো চলতে থাকবে।’

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট
রোববার পদ্মা সেতুতে উঠে রেলিংয়ের নাট খুলে টিকটক ভিডিও বানান মো. বাইজীদ। ছবি: সংগৃহীত

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে ভায়াডাক্ট অংশের কাজ শেষ করতে সময় স্বল্পতা ছিল বলে যে দাবি শ্রমিকরা করেছেন তা স্বীকার করেন সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী।

দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৬ জুন পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট অংশের রেলিংয়ের নাট-বোল্টের প্রথম চালান আসে। তারপর শুরু হয় এগুলোর লাগানোর কাজ। দীর্ঘ সেতুতে ২৩ জুন পর্যন্ত সেগুলো সেট করার কাজ পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে ২৪ তারিখে নিরাপত্তাজনিত কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি।’

আরও পড়ুন: পদ্মা সেতুতে নাট খোলা বাইজীদ পটুয়াখালীর, করতেন ছাত্রদল

তবে এরপরেও পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের নাট হাত দিয়ে খোলা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘নাট খুলে যে ভিডিও ছাড়লো সে প্রথমে রেঞ্জ দিয়ে নাটের প্যাঁচ হালকা করে পরে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে খুলেছে।’

সেতুর রেলিংয়ের নাট খুলে টিকটক ভিডিও বানানো বাইজীদের গাড়ি থেকে রেঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান দেওয়ান মো. আবদুল কাদের।

চিন্তিত নন বিশেষজ্ঞরা

নাট খুলে ফেলার ঘটনায় বিচলিত নন সেতুটি নির্মাণে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অনেক সময় থাকে না, লোহা দিয়ে আটকে রাখা, সেগুলো। কিন্তু ব্রিজের কোনো কিছু খোলার কোনো সম্ভাবনাই নেই। ব্রিজের কোনো কিছুতে হাত দেয়ার সুযোগই নেই।’

ভিডিওটি দেখেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনও কিছু কিছু টেম্পরারি স্ট্রাকচার আছে। সেগুলো আমরাই রেখেছি। সেগুলো খুলছে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে আমি আর যুক্ত নই।’

সেতুর কোনো ক্ষতি হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, না, না, এটি খুব সামান্য বিষয়।’

মন্তব্য

p
উপরে