রংপুরের অর্থনীতিতে যোগ হওয়া হাঁড়িভাঙা আমে এবার কম ফলন হয়েছে। চাষিরা বলছেন, গত পাঁচ বছরে এত কম ফলন দেখেননি তারা।
কী কারণে গাছে আমের ফলন কম, তা সঠিকভাবে বলতে না পারলেও প্রতি বছর আমগাছে নিষিদ্ধ ‘কালটার্ন’ নামক হরমোন প্রয়োগে এমনটা হতে পারে বলে ধারণা কৃষিসংশ্লিষ্টদের।
সম্প্রতি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের আখিরাহাট, লালপুর, রুপসি, গাছুয়াপাড়া, মাঠের হাট, লালপুকুর, পদাগঞ্জহাট, পাইকারহাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় সব আমগাছেই গুটি এসেছে। তবে প্রতিটি গাছে যে পরিমাণ আমের গুটি রয়েছে, তা অন্যান্য বছরের চেয়ে অর্ধেক।
স্থানীয় আমবাগান মালিক ও চাষিদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেপারিরা বাগান কিনছেন। তাদের বাগানের আমের আকার বড়, দেখতেও সুন্দর। তাদের দেখে রংপুরের আমবাগান মালিক এবং বাগান কেনা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা গাছের গোড়ায় হরমোন দিয়েছেন।
এ ছাড়া গাছে দিয়েছেন মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক। এর প্রভাবও পড়তে পারে।
একশ্রেণির কীটনাশক ব্যবসায়ী এই হরমোন গোপনে বিক্রি করছেন। চাষিরা দোকান থেকে কিনে তা গাছে প্রয়োগ করেছেন।
খোড়াগাছের জারুল্লাপুর গ্রামের আমবাগান মালিক মাহসিন আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেসব ব্যবসায়ী এক বা দুই বছরের জন্য আমবাগান ইজারা নেন, তাদের অনেকেই বেশি আম পাওয়ার লোভে গোপনে এই হরমোন ব্যবহার করছেন।
‘বছর দুয়েক আগে থেকে আমাদের এলাকার অনেকেই তাদের গাছে হরমোন ব্যবহার করেছেন। গাছের গোড়া খুঁড়ে ওষুধ দিয়েছেন। এতে আমের সাইজ বড় হয়েছে, কিন্তু এবার কম ধরেছে।’
মিঠাপুকুরের আখিরাহাটের আমবাগান মালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বেপারিরা এসে বাগান লিজ নেয়, তারপর মেলা ওষুধ দেয়, হরমোন দেয়। তাতে গাছের ক্ষতি তো আসবে, অবশ্যই আসবে। এবার কম আসছে, দুই-চার বছর পর হয়তো আম নাও ধরতে পারে।’
খোড়াগাছের লালপুর গ্রামের নুর ইসলাম বলেন, ‘আমার ৫০ শতকের তিনটা বাগান আছে। ফলন কম হইছে। মানে, ফুল খুব আসছে কিন্তু আম টেকে নাই। আমরা বাগান মালিকরা ভয়ে আছি, ভবিষ্যতে বাগানের যে কী অবস্থা হবে, গাছের কী হবে, আম ধরবে কি না?’
লালপুর গ্রামের আমচাষি আবু বক্কর বলেন, ‘আমগাছের বৈশিষ্ট্য হলো এক বছর বেশি ফলন হলে পরের বছর তুলনামূলক কম হয়। গাছ তার স্বাভাবিক নিয়মে দীর্ঘমেয়াদে ফল দেয়। আমরা অনেকেই হরমোন দিই নাই। যারা দেই নাই, তাদের বাগানে আবার ভালো আম আছে।’
‘আমাদের এলাকায় অন্য আবাদ নাই। আমরা সর্বস্ব বিনিয়োগ করে আমের বাগান করি। আমবাগানের ওপর আমাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। ব্যবসায়ীরা এসে সেই গাছের ওপর হরমোন প্রয়োগ করে অত্যাচার করছে। এতে আমরা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার শঙ্কায় আছি।’
খোড়াগাছ এলাকার জারুল্লাপুরে চারটি বাগান কিনেছেন রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রায় আট বছর থেকে আমি বাগান কিনি। এবারও কিনছি। প্রতিটি বাগানে যখন ফুল আসে, তখনই কেনা হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়।
‘যখন গাছে ফুল আসে তখন গাছের গোড়া খুঁড়ে একবার হরমোন দিছি। এরপর দুবার কীটনাশক দিছি। বছরে একবার করে হরমোন আর তিন থেকে চারবার করে কীটনাশক দিলে আম ভালো ধরে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসে হাঁড়িভাঙার বাগান কেনা শহিদুল্লাহ শহীদ বলেন, ‘আমরা কখনও হরমোন দিই না। যখন মকুল আসে তখন কীটনাশক এবং পরে ভিটামিন দিই। অনেকেই আমাদের বিরুদ্ধে ব্লেম (অভিযোগ) দিচ্ছে বলে শুনতেছি, এটা না জেনে বলা ঠিক না।’
তদারকির অভাব কৃষি বিভাগের
রংপুর মেট্রোপলিটনসহ জেলার আটটি উপজেলায় এবার হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমিতে এবার আমের আবাদ হয়েছে।
এর মধ্যে মেট্রোপলিটন এলাকায় ২৫ হেক্টর, রংপুর সদর উপজেলায় ৬০, কাউনিয়া উপজেলায় ১০, গঙ্গাচড়া উপজেলায় ৩৭, মিঠাপুকুর উপজেলায় ১ হাজার ২৭০, পীরগঞ্জ উপজেলায় ৬০, পীরগাছায় ১০, বদরগঞ্জে ৪০০ এবং তারাগঞ্জে ১৫ হেক্টর রয়েছে।
আমবাগান চাষি এবং মালিকদের অভিযোগ, আমচাষিদের এমন দুর্দিনে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। আমগাছের অবস্থা এবং পোকার ধরন দেখে দোকান থেকে ওষুধ এনে ছিটানো হচ্ছে।
রুপসি গাছুয়াপাড়া গ্রামের চাষি নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘এক বিঘা জমিত আমার বাগান আছে। যখন ফুল (মুকুল) আসছে, তখন একবার গাছোত হরমোন দিছি। তারপর কিছুদিন পর পোকার মতো ধরছে, পরে দোকান থাকি কীটনাশক আনি দিছি। একনা কমছে। ফের দেমো।’
এমন অন্তত ১০ চাষির সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। সবার প্রায় একই অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সময়মতো পাওয়া যায় না।
কীটনাশক দোকানই ভরসা চাষিদের
মাঠের হাটের সুলতান আলী নামে আমবাগানি বলেন, ‘গাছ এবার সকসকা (আম নাই)। যেলা মইল (মুকুল) আসিল খোকনের দোকান থাকি ওষুধ আনি দিল, কিছু হইল নে। যামরা যামরা (যারা যারা) সাদা ওষুধটা দিছে তার বাগানোত কিছু কিছু আম টেকছে (টিকছে)।
‘হামার গাছের ডাল একবারে সকসকা। কিছুই নাই। এত টেকা-পইসে খরচ করনো, সোউগ পানিত ভাসি গেইছে। আর বাগান বেইচপের নই। নিজে থাকি আবাদ করমো।’
মিঠাপুকুরের এরশাদ মোড় এলাকার কীটনাশক বিক্রেতা আখেরুজ্জাম রাজা বলেন, ‘বর্তমানে ফ্লোরা, বায়োফার্টি, কমপ্লেসান সুপার, পিজিআর এগুলাই বেশি ইউজ হচ্ছে। বোতলের গায়ে মাত্রা দেয়া আছে। যে নির্দেশনা দেয়া আছে, সে অনুযায়ী দিতে বলি। অনেক ক্ষেত্রে চাষিরা ওদের প্রয়োজন মতো নেয়। ওরা দিতে দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। জানে এই পরিমাণ দিতে হবে, সে অনুযায়ী নেয়।
‘এ ছাড়া মাঝে মাঝে কৃষি অফিসের বিএসরা (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা) আসে বসে, তারাও পরামর্শ দেয়। আমি হরমোন বিক্রি করি না। আমার দোকানে হরমোন নেই।’
আরেক কীটনাশক বিক্রেতা আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার বলেন, ‘হরমোন তো আমাদের কাছে নেই, আছে ভিটামিন। কৃষকরা এসে নাম ধরে চায় আমরা দিই। ওরা ওদের মতো করে ভিটামিন ও কীটনাশক ব্যবহার করে।’
কী বলছে কৃষি বিভাগ
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে সংবাদ এসেছে গোপনে আমে হরমোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং হচ্ছে। কালটার্ন নামে হরমোন ব্যবহার করছেন আমের আকার বড় করার জন্য। তারা হয়তো তাৎক্ষণিক সুফল পাবেন, কিন্তু কালটার্ন হরমোন ব্যবহারে গাছের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হয়।’
কৃষি কর্মকর্তাদের না পাওয়ার অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা আমের মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হরমোন প্রয়োগকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এই হরমোন যেন আম ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে উঠান বৈঠক, মাঠ বৈঠক করা হচ্ছে। তবে আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কোনো ওষুধের দোকানে এ হরমোন পাননি। শুনেছি এটি ভারত থেকে চোরাইপথে আসে। গোপনে বিক্রি হতে পারে। এ জন্য চাষিদের সজাগ থাকতে হবে।’
‘এই হরমোন নিয়ে আমাদের গবেষণা চলছে। আমরা খুব নিকট ভবিষ্যতে এই হরমোনের ফলাফলটা জানতে পারব’, যোগ করেন ওবায়দুর।
তিনি আরও বলেন, ‘কখনও কখনও গাছে একবার ভালো ফলন হলে অন্যবার কম হয়। এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। সেটা এবার হয়েছে কি না সে জন্য আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
হরমোন নিয়ে কী বলছেন বিজ্ঞানীরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোখলেসুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আট-দশ বছরের বেশি সময় ধরে এই হরমোনের ব্যবহার হচ্ছে। এতে যেটা সমস্যা হয়, প্রচুর পরিমাণে মকুল আসে। প্রচুর আম হয়। পাতা কম বের হয় শুধু আমই চলে আসে।
‘কৃষকরা এটা গোপনে গোপনে ব্যবহার করেন। এরপর ধীরে ধীরে গাছের শক্তি কমে যায়। যে কারণে আমের উৎপাদন বা আম কম ধরে। এমনকি ঠিকমতো গাছকে খাবার না দিলে গাছ মরে যায়। আমরা গবেষণা করে দেখেছি, বিভিন্ন এলাকায় গাছ মরেও গেছে।’
ড. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে খুব প্রেসারক্রিয়েট করেছি, যাতে এটা কেউ ব্যবহার না করে। রাতে এটা ব্যবহার করায় বহু চাপাচাপি করেও ঠেকানো যায় না। এখন এটা সরকারিভাবে অনুমোদ দেয়া হয়েছে। তবে মাত্রা ঠিকঠাক ব্যবহার করতে হবে। মাত্রা বেশি হলে সমস্যা হয়।
‘এই হরমোন ব্যবহার করলে গাছকে প্রচুর পরিমাণে অন্যান্য খাবার দিতে হবে। একবার ব্যবহার করলে পরের তিন বছর ব্যবহার করা যায় না, যাবেও না।’
রংপুরে হাঁড়িভাঙা আমের সম্প্রসারক ও চাষি আব্দুস সালাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাগানে হরমোন ব্যবহারের অভিযোগ কিছুদিন ধরে শুনতেছি। আমি প্রশাসনকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে অনুরোধ করব। এই আম প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। অনেক সুনাম রয়েছে। ধীরে ধীরে এই আমকে নষ্ট করা যাবে না।’
রাজবাড়ী জেলায় পদ্মার তীরে বন্যা পরবর্তিতে জেগে ওঠা চরে চাষ করা হয়েছে উন্নত জাতের টমেটো। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগাম চাষ করা এই টমেটোর এবার বাম্পার ফলন ফলেছে। দামও ভালো পাওয়ায় লাল সবুজ টমেটো হাসি ফুটিয়েছে কৃষকের মুখে। ক্ষেতে উৎপাদিত এই টমেটো স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার চরাঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও সঠিক দিক নির্দেশনায় উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে টমেটোর ভালো ফলন হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের টমেটো বিউটি প্লাস বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় এক লক্ষ টাকার মত। হাইব্রিড জাতের টমেটো যেমন বিউটি প্লাস আবাদ করে কৃষকের প্রতি বিঘায় টমেটোর ফলন পাচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ মন করে। এছাড়াও বাজারে টমেটোর ব্যাপক চাহিদা থাকায় ভালো দামও পাচ্ছে কৃষকেরা।
কৃষক শুকুর আলি জানান, এবার মাচা পদ্ধতিতে হাইব্রিড বিউটি প্লাস টমেটো চাষ করেছি ফলন ভালো হয়েছে আর বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি। প্রতি কেজি টমেটো বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা। এবার আমি আধুনিক পদ্ধতিতে পাঁচ বিঘা জমিতে হাইব্রিড টমেটো আবাদ করেছি। হাইব্রিড টমেটো আবাদে খরচ কম লাভ বেশি।
আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, এ বছরে ৭ বিঘা জমিতে হাইব্রিটি বিউটি প্লাস আগাম জাতের টমেটো আবাদ করেছি এবং ভালো ফলনও হয়েছে। স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে টমেটোর ফলন হচ্ছে প্রায় ১ শত থেকে ১২০ মন করে। দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকেরা অনেক লাভবান হচ্ছে। ক্ষেতের৷ খরচ বাদ দিয়ে এবার অনেক টাকা লাভ হবে আশা করা যাচ্ছে।
গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওয়াজানি গ্রামের চাষি সোবান শেখ বলেন, ‘এ বছর টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়াও আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা দমন করা হয়েছে। আমরা ভালো দাম পেয়ে খুশি।’
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, চলতি বছরে এই উপজেলায় ২১৬ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের টমেটো আবাদ হয়েছে এছাড়াও টমেটোর ফলনও ভালো হয়েছে, বাজারে দামও বেশি পাচ্ছে কৃষককেরা।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের সেক্স ফরোমোন ফাঁদ দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন, টমেটোর বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই, উন্নত জাত সম্পর্কে ধারণা ও সুষম মাত্রায় সার, কীটনাশক ব্যাবহারে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে কৃষক লাভের মুখ দেখছেন। এতে তাদের জীবনমান উন্নত হবে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করছেন কৃষকরা।
উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় এবার পেঁয়াজ আমদানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন ভারতীয় রপ্তানিকারকরা। সেই সঙ্গে বছরের শেষ সময়ে এসে নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা জাতীয় এ পণ্যটি নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে যারা ব্যবসায় করে আসছিলেন তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভেঙে গেছে সিন্ডিকেট চক্রের ব্যবসাও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তে অন্তত ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ এখন পচনের মুখে। বিশাল ক্ষতি এড়াতে ২ রুপি কেজিতে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর সত্যতা মিলেছে আমদানিকারকদের বক্তব্যেও। তারা বলছেন, এতে শুধু ভারতের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বাংলাদেশের অন্তত ৩০-৪০ জন বড় ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক বলেন, ক্ষতির কথা বলে শেষ করা যাবে না। কেন যে সরকার ব্যবসায়ীদের এমন ক্ষতির মধ্যে ফেলেছে তা বোধগম্য নয়।
হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সহ-সভাপতি ও আমদানিকারক শহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে। কেননা, তারা অগ্রিম অর্ডার করে সীমান্তেও নিয়ে এসেছিল হাজার হাজার টন পেঁয়াজ। শেষ পর্যন্ত সরকার আইপি না দেওয়ায় তা খালাস করতে পারেনি। ভবিষ্যতের জন্য এটা খুব খারাপ নজির স্থাপন হয়েছে।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এটা উভয় দেশের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রের জন্য বড় বার্তা। ভবিষ্যতে ইচ্ছা করলেই কোনো বিশেষ গোষ্ঠী দেশের সাধারণ ভোক্তাকে জিম্মি করতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. জামাল উদ্দীন বলেন, এর আগে ঢাকার শ্যামবাজার, বাবুবাজার, দিনাজপুরের হিলি ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বেশকিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বছরের শেষ সময়ে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে ভারত থেকে আমদানিতে বাধ্য করত। এক্ষেত্রে ভারতেও এক ধরনের রপ্তানি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এবার আমাদের দেশের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। সিন্ডিকেট যখনই দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেছে তখনই কৃষকরা তাদের হাতের পেঁয়াজ ছেড়ে দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে।
জামাল উদ্দীন বলেন, এখন আমরা উৎপাদনে স্বাবলম্বী, ফলে আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের অনেক চাপ থাকলেও আমরা এ বিষয়ে দৃঢ় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হলো সিন্ডিকেট চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করেই পেঁয়াজ আমদানির চেষ্টা করেছিল।
জামাল উদ্দীন আরও বলেন, ২৮ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে গত মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৪৪ লাখ টন; এখনো মার্কেট প্রসেসে ও কৃষকের হাতে তিন লাখেরও বেশি পুরাতন পেঁয়াজ রয়েছে। এরই মধ্যে ৭০-৮০ হাজার টন গ্রীষ্মকালীন বাজারে এসেছে। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে আরো আড়াই লাখ টন মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসবে। ফেব্রুয়ারিতে তো মৌসুমের পেঁয়াজ আসতে শুরু করবে।
গত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমদানিকারকদের চাপ থাকলেও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় এবার পেঁয়াজ আমদানি না করার সিদ্ধান্ত বদল করা হবে না। যদিও এর আগেই পেঁয়াজ আমদানির জন্য দুই হাজার ৮০০টি আবেদন পড়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়ে। তবে কোনো আবেদনই আমলে নেওয়া হয়নি। শেষপর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কৃষি মন্ত্রণালয়কে আমদানির জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় অনঢ় অবস্থানে থাকায় আমদানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার।
ফলে ঘোজাডাঙ্গা, পেট্রাপোল, মাহাদিপুর ও হিলি সীমান্তে কোটি কোটি টাকার পেঁয়াজ পচতে শুরু করেছে। হিলি ও সোনা মসজিদ এলাকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মাহাদিপুর-সোনামসজিদ সীমান্তে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই রুপিতে। ৫০ কেজির এক বস্তা পেঁয়াজ মিলছে মাত্র ১০০ রুপিতে। অথচ নাসিক থেকে ১৬ রুপি দরে কেনা এসব পেঁয়াজ পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সীমান্তে পৌঁছাতে খরচ পড়েছিল ২২ রুপি। সে পেঁয়াজ এখন প্রায় বিনামূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে। রপ্তানিকারকদের দাবি, বাংলাদেশ হঠাৎ আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশি আমদানি-রপ্তানি গ্রুপ এক নোটিসে জানায়, বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ভারতীয় পেঁয়াজের ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) সীমিত করেছে। অথচ বছরের এ সময়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা সব সময় বেশি থাকে এবং বর্তমানে দেশে প্রতি কেজি পেঁয়াজ প্রায় ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অধিক লাভের আশায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে তাহিরপুর উপজেলার কৃষকদের মধ্যে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ও অনিয়মিত বৃষ্টির প্রভাব পড়লেও থেমে নেই কৃষকদের শীতকালীন সবজি চাষ। উপজেলার উঁচু জমিতে নানা জাতের সবজির চারা রোপণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। সরজমিন দেখা গেছে, কেউ জমি তৈরি করছেন, কেউ চারা রোপণে ব্যস্ত, কেউবা আগাছা পরিষ্কার ও কীটনাশক স্প্রে করছেন। এক কথায়, আগাম বাজার ধরার আশায় এখন মাঠে মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাহিরপুর কৃষকরা। এ অঞ্চলের কৃষকরা মুলা, শিম, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লালশাক, পালংশাক, করলা, লাউ, কাঁচামরিচ, ঢেঁড়স ও গাজরসহ নানা জাতের সবজি চাষ করছেন। শুধু পরিবারের প্রয়োজন মেটানো নয় বাণিজ্যিকভাবে এসব সবজি চাষ হচ্ছে। আগাম মৌসুমে সবজি বাজারে তুলতে পারলে বিভিন্ন অঞ্চলে তা পাঠানো হবে বলে জানান কৃষকরা।
জানা গেছে, আগাম ফসলের চাহিদা ও দাম দুই-ই বেশি থাকে। ফলে মুনাফাও বেশি হয়। উঁচু জমি পানি না জমায় ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো সবজি চাষের জন্য উপযুক্ত। অল্প সময়ে কম খরচে অধিক লাভ পাওয়ায় এসব ফসলে ঝুঁকছেন তারা।
বাদাঘাট ইউনিয়নে এলাকার রকমতপুর গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন জানান, প্রতি বছরই আমরা আগাম শিম ও অন্যান্য সবজি চাষ করি। এবারও এক বিঘা জমিতে শিম চাষ করছি। আশা করছি ভালো ফলন হবে।
বিন্না কুলি গ্রামের সোহেল বলেন, আগাম চাষে লাভ বেশি হয়। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদন সম্ভব। এখন আমরা জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করছি ফলে সবজির গুণগত মান ভালো, চাহিদাও বেশি।
উত্তর বড় দল ইউনিয়নের বারওয়াল গ্রামের শিম চাষি জয়নাল জানান, এখন বাজারে শিম বিক্রি করছি পাইকারি প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। এ দামটা আগাম মৌসুমেই পাওয়া যায়। চরাঞ্চল বোরচর এলাকার কৃষকরাও জানান, শীতের আগে সবজি তোলা গেলে বাজারে দাম থাকে ভালো, তাই সবাই এখন ব্যস্ত আগাম ফসল তুলতে।
কৃষক রহিম বলেন, বাজার ধরতে আমরা এবার আগেভাগেই ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোর চারা রোপণ করেছি। প্রায় সাড়ে এক একর জমিতে ১৫-১৮ হাজার চারা রোপণ করা হবে। প্রতিটি চারার খরচ আট থেকে দশ টাকা। তিন মাসের মধ্যে বিক্রি হবে প্রতি কপি ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায়। আশা করছি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় হবে।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, গত বছর উপজেলায় প্রায় ১,৫০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন সবজি চাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা বৃদ্ধি পেয়ে ১,৭৪৫ হেক্টরে পৌঁছেছে। জমিতে আগাম রবি ১৯/২০ জাতের সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির পর থেকেই কৃষকরা আগাম শীতকালীন বিভিন্ন সবজির আবাদ শুরু করেছেন। এখন বাজারে এসব সবজি উঠছে এবং কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। আগাম চাষে কিছুটা ঝুঁকি থাকে, তবে আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, সুষম সার ব্যবহারে ও কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
কাঠ ও কংক্রিট দিয়ে উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে ২২টি বেড। প্রতিটি বেড ৪ ইঞ্চি পরিমাণ মাটি দিয়ে ভরাট করা। তাতে লাগানো হয়েছে লাউ, শিম, কুমড়া, বরবটি, বাঁধাকপি, পেঁপে, কাঁচামরিচসহ ২২ ধরনের সবজি। শুধু সবজি নয়, এই চার ইঞ্চি বেডেই রোপণ করা হয়েছে পেয়ারা, জলপাইসহ নানা ফলদ গাছ। এগুলো থেকে সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি ফল সংগ্রহ করা হচ্ছে নিয়মিত। যা পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বাজারে।
বলছিলাম যশোর সদর উপজেলার হামিদপুরের বাসিন্দা কৃষিবিদ ইবাদ আলীর ছাদবাগানের কথা। তিনি নিজের ছাদে গবেষণার মাধ্যমে চাষ করে সফলতা পেয়েছেন।
নাম দিয়েছেন ‘শেকড় প্রযুক্তি। তার এ সফলতা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতোমধ্যে আশপাশসহ সারাদেশে এ প্রযুক্তিতে প্রায় এক হাজার ছাদবাগান গড়ে উঠেছে। এই শেকড় প্রযুক্তিতে শুধু ছাদে নয়, জলাবদ্ধ এলাকা ও পরিত্যক্ত জমিতে চাষ করেও লাভবান হওয়া সম্ভব বলে দাবি প্রায় চার বছরের গবেষণায় সফল হওয়া এই কৃষিবিদের।
কৃষিবিদ ইবাদ আলী পেশায় সরকারি চাকরিজীবী। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি শুধু গবেষক নন, বরং একজন স্বপ্নবুননকারী। স্থানীয় সরকার বিভাগের চাকরির ব্যস্ততা সামলে তিনি ছাদে, মাটিতে, আর বইয়ের পাতায় এক নতুন কৃষি দর্শন গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি তিনি শেকড় প্রযুক্তি নিয়ে একটি বইও লিখেছেন, যাতে ছাদকৃষি করতে ইচ্ছুক মানুষ সহজেই তার পদ্ধতি শিখে নিতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইবাদ আলীর বাড়ির ছাদ যেন দিগন্তজোড়া সবজি খেতে পরিণত হয়েছে। মাচায় ঝুলছে লাউ, বরবটি ও কুমড়া। বাঁধাকপির পাতা বাঁধতে শুরু করেছে। ফলন হয়েছে কাঁচামরিচের। নিজের উদ্ভাবিত শেকড় প্রযুক্তিতে ২২ ধরনের সবজি ও ফল চাষ করেছেন তিনি।
কৃষিবিদ ইবাদ আলী বলেন, গাছের শেকড়ই ফসলের প্রাণ। শেকড় বুঝতে পারলেই গাছকে বোঝা যায়। এই বিশ্বাস থেকেই এসেছে ‘শেকড় প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে গাছের শেকড়ের গঠন ও বিন্যাস অনুযায়ী মাটি, পানি, বায়ু, আলো ও খাবারের (সার) সঠিক ব্যবহার হয়। গাছ মাটির অগভীর অঞ্চল থেকে খাবার গ্রহণ করে। গাছ সাধারণত সমবায় পদ্ধতিতে খাবার গ্রহণ করে। কিছু গাছের শেকড় মাটির অগভীর অঞ্চল থেকে মূল রোমের মাধ্যমে খাবার নেয়। সাধারণত মূল রোমের সংখ্যা উৎপাদনের সমানুপাতিক। মূল রোমের সংখ্যা যত বেশি হবে, ফসল উৎপাদন তত বেড়ে যাবে। মূল রোমের সংখ্যা বৃদ্ধি করার উপায় হলো পাশে স্পেস বা জায়গা বাড়ানো এবং পরিমিত খাবার, পানি সরবরাহ।
শেকড় প্রযুক্তির মূল কথা হলো- সবজি বীজ বা চারা বেডে রোপণ করতে হবে। ফলের চারা চ্যানেল সিস্টেমে রোপণ করতে হবে। ড্রামে বা টবে রোপণ করা যাবে না। সবজির জন্য মাটির গভীরতা ৪ ইঞ্চি হতে হবে (৬ ফুট বাই ৩ ফুট মাটির গভীরতা ৪ ইঞ্চি) এবং ফলের জন্য মাটির গভীরতা ১০ ইঞ্চি। ফলের টবের ব্যাস কমপক্ষে ৩ ফুট। ফর্মুলা অনুযায়ী মাটিতে সব ধরনের খাদ্যপ্রাণ মেশাতে হবে। পরিমিত সেচ নিয়মিত দিতে হবে। ফলের গাছে চ্যানেল আকারে রোপণ করতে হবে। যে গাছের শেকড়ের জন্য যতটুকু মাটি প্রয়োজন, সেই পরিমাণ মাটি ব্যবহার করতে হবে। একটুও কম বা বেশি নয়। এই পদ্ধতিতে প্রতি বর্গফুট জায়গায় ১২ কেজি মাটি লাগে।
তিনি বলেন, ১৮ বর্গফুটের বেডে ৩ দশমিক ৫ বস্তা মাটি লাগে। যার ওজন ১৫৪ কেজি। একটি সাধারণ ড্রামের মাটির সমান। একই মাটি ব্যবহার করে ছাদে ১০ গুণ বেশি ফসল ফলানো সম্ভব। বেডগুলো সুন্দর করে সাজাতে পারলেই ছাদের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। হাঁটার জন্য অনেক ফাঁকা জায়গা থাকে। পুষ্টির প্রায় ৯৫ শতাংশ আসে সবজি ও মসলা থেকে, যা ড্রামে বা টবে চাষ করা সম্ভব নয়। ড্রাম বা টব পদ্ধতিতে খরচ বেশি। সে অনুযায়ী উৎপাদন কম। শেকড় প্রযুক্তিতে ফল বা সবজি রোপণ করলে ফলন দ্বিগুণ হয়।
কৃষিবিদ ইবাদ আলী বলেন, গতানুগতিক ছাদ কৃষিতে লাভ কম, খরচ বেশি। আমার উদ্ভাবিত শেকড় প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী খরচে কম জায়গায় বেশি উৎপাদন হচ্ছে।
ইবাদ আলীর শেকর প্রযুক্তি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাদবাগান করা প্রতিবেশী খায়রুল ইসলাম বলেন, শেকড় প্রযুক্তিতে আমিও ছাদবাগান করেছি। পাশাপাশি টবেও সবজি লাগিয়েছিলাম। তবে ইবাদ আলী ভাইয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে তুলনামূলক ভালো ফলন পেয়েছি।
ইবাদ আলীর স্ত্রী পাপিয়া সুলতানা বলেন, শেকড় পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবেও ছাদবাগান করা সম্ভব। এতে পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আর্থিকভাবে উপকৃত হওয়া যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, ইবাদ আলী শেকড় প্রযুক্তিতে পরিকল্পিতভাবে বাড়ির ছাদে সবজি চাষ করেছেন। তার নতুন চাষ প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে কৃষিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। যদি তার শেকড় প্রযুক্তি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরেও মানুষ নিরাপদ ও পুষ্টিকর সবজি উৎপাদন করতে পারবে।
মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, ভবদহের মতো জলাবদ্ধ এলাকাতেও ভাসমান শেডে এই পদ্ধতিতে চাষ সম্ভব। যে দেশ প্রতিদিন মাটি হারাচ্ছে নদী ও নগরায়ণের চাপে, সেখানে ইবাদ আলীর শেকড় প্রযুক্তি যেন এক নতুন আশার আলো।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে গাজর ও টমেটো উৎপাদন বিষয়ে কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং বীজ ও চারা বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন চর নিলক্ষীয়ায় প্রায় ৪০ জন কৃষকের অংশগ্রহণে ওই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এ সময় কৃষকদের মাঝে ৩ হাজার টমেটোর চারা এবং কৃষক প্রতি দুই শতাংশ জমিতে বপনযোগ্য ৫০ গ্রাম করে গাজরের বীজ প্রদান করা হয়।
‘খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিকূল পরিবেশে সহনশীল পুষ্টিসমৃদ্ধ রঙিন গাজর ও টমেটোর উদ্ভাবন ও বিস্তার’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান, প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হারুন অর রশিদ।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সেন্টারের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমানের সভাপতিত্ব করেছেন। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সদস্য ও বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক এ. এস. এম. গোলাম হাফিজ কেনেডি, কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন ও প্রকল্পের কো-পি আই অধ্যাপক ড. মো. গোলাম রাব্বানী, বাকৃবির আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী, গাজর ও টমেটো গবেষণার প্রকল্প পরিচালক ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. মো. হারুন অর রশিদ এবং অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান বলেন, এখন বাজারে সব সবজির দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। গাজরের দাম এখন ১০০ টাকার উপরে। টমেটোরও দাম বেশি। কারণ এগুলোর চাহিদা অনেক। তাই গাজর টমেটো চাষ হবে কৃষকদের জন্য অধিক লাভজনক। কৃষকরা; কিন্তু এখন শিক্ষিত, এবং এখন তারা বোঝে ভালো বীজের গুরুত্ব। এ বছর অমরা বীজ দিয়ে গেলাম সামনের বছর আপনারাই বীজ সংগ্রহ করে পরবর্তী বছর লাভবান হবেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় আপনাদের পাশে থাকবে।
অধ্যাপক এ. এস. এম. গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, গাজর জনপ্রিয় সবজি। এটার অনেক রোগ প্রতিরোধ গুণাবলি আছে। এর বাজার মূল্য; কিন্তু অনেক বেশি। যদি সঠিকভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পোকা-মাকড় দমন করে ফসল করেন তাহলে বেশি লাভবান হবেন এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে গাজর রপ্তানি করা সম্ভব হবে। বেশি সার দিলেই উৎপাদন বাড়বে, এমন ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সিজনে চাষ করলে এর বাজার মূল্য বেশি পাওয়া যায়। সেই কারণেই সবজি এবং বীজ এবং সার বিতরণ কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হারুন অর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষকদের পাশে থেকে চরাঞ্চলে উচ্চমূল্যের ও পুষ্টিকর ফসল চাষে উৎসাহ দিচ্ছে। টমেটো ও গাজরের মতো ফসল চাষে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন। বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীরা কৃষি সমস্যা সমাধান ও প্রযুক্তি সহায়তায় কাজ করছেন। প্রকল্পটি কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে অবদান রাখবে।
কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, আমরা আগে ভাবতাম রঙিন গাজর বা উন্নত টমেটো চাষ করা কঠিন হবে। কিন্তু আজকের প্রশিক্ষণে বুঝলাম সঠিক বীজ, পরিচর্যা আর সময়মতো সার দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাদের হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। এখন আশা করছি আগামী মৌসুমেই এই জাতগুলো চাষ শুরু করব।
আরেক কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাকৃবির গবেষকরা আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে কম খরচে বেশি উৎপাদন করা যায়। আগের মতো আন্দাজে চাষ না করে এখন বৈজ্ঞানিকভাবে করতে পারব। গাজর আর টমেটোর এই নতুন জাতগুলো বাজারে ভালো দাম দেবে বলেও আশা করছি।
অনেকটা শিঙাড়ার মতো দেখায়। আর এই পাতার নিচেই লুকিয়ে আছে ত্রিকোণাকৃতির এক ফল, যার নাম পানিফল। এখন এই জলজ ফলই জয়পুরহাটের চাষিদের কাছে ‘সোনার ফসল’ হয়ে উঠেছে। কচি অবস্থায় লাল আর পেকে গেলে কালো বর্ণ ধারণ করা এই ফল চাষ করে ভালো আয়ের মুখ দেখছেন তারা।
এ জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে এই মৌসুমে পানিফলের চাষ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। সরেজমিনে জয়পুরহাট সদর উপজেলার গতনশহর এলাকায় দেখা যায়, নিচু জলাভূমিতে পানিফলের চাষ হয়েছে। চাষিরা পানিফল উত্তোলন করে সড়কের পাশে বসে ক্রেতাদের হাঁক-ডাক করে বিক্রি করছেন।
সেখানকার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ফলকে কেউ পানিফল, পানি শিঙাড়া, শিংড়া, শিংগাইর বা হিংগাইর বলে ডাকে। এই ফল চাষের পদ্ধতি বেশ সহজ। সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে জলাশয়ে চারা রোপণ করা হয়। ছয় মাসের মধ্যেই অর্থাৎ আশ্বিন-কার্তিক মাস থেকে ফল সংগ্রহ শুরু হয়। এই চাষে সার ও কীটনাশক লাগে খুবই কম। প্রতি বিঘা জমিতে পানিফল চাষে খরচ হয় গড়ে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। আর ফলন ভালো হলে প্রতি বিঘা থেকে কৃষক বিক্রি করেন ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। এতে তাদের প্রায় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়। স্বল্প খরচে ভালো লাভ হওয়ায় এটি এখন এ এলাকায় লাভজনক মৌসুমি ফল হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে। আর চাষিদের মুখে ফুটছে হাসি।
পানিফল চাষি মো. আজাদ বলেন, ‘এই জমিগুলোতে পানি বেশি থাকে। এ জন্য ধান আবাদ হয় না। তাই পানিফল আবাদ করি। এই ফল চাষে লাভ আছে। বিঘায় ৪০ থেকে ৫০ মণ হয়। ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ বিক্রি করি। তাতে ধানের থেকে বেশি লাভ হয়।’
‘এ্যাসো (এসো) ভাই পানিফল, খালি ত্রিশ টাকা কেজি, এ্যাসো। টাটকা (সদ্য তোলা) ফল ভাই, এ্যাসো ভাই পানিফল, টাটকা ফল। এই যে ভিওত (জমি) থেকে তুলে দ্যাচি (দিচ্ছি), এ্যাসো।’ এমন ভাবে হাঁক-ডাক দিয়ে ক্রেতাদের ডাকছিলেন চাষি জিয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, পানিফলের আবাদ ভালো হয়। ১০ দিন পরপর তুলতে হয়। বিঘায় প্রতি টিপে ১০ মণের বেশি হয়। এক মাস সুন্দর ফল হয়, পরে কমে যায়। ফলের ওপর নির্ভর হয়। ভালো ফলন হলে ভালো ফল পাওয়া যায়। সেলিম হোসেন নামে আরেক চাষি বলেন, ‘আমার সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি আছে। পানি থাকে এক কোমর করে, আমন ধান লাগান পারি না, এ জন্য ফল লাগাচি। এই ফলে প্রচুর টাকা লাভ, লছ নাই। এখানে সর্বোচ্চ খরচ ১২ হাজার; কিন্তু এত খরচ হবেই না, কমই খরচ হয়। আর বিঘায় ৩০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা বিক্রি করা হয়। কারও জমিতে আমন ধান না হলে এক হাঁটু বা এক কোমড় পানি থাকলে তাদের জন্য ভালো। একদম ওয়া (রোপণ করা) বেটার, কোনো লছ হবে না। এটি পাঁচবিবি হাটে মণ হিসেবে বিক্রি হয়। আর আমরা গিরস্তরা (চাষিরা) এখানে হাতে ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি। আগে ৫০ টাকা কেজিতেও বিক্রি করিচি (করা হয়েছে)।’
পানিফল ক্রেতা রায়হান কবির জনি বলেন, ‘আমি ইউনিয়ন পরিষদে চাকরি করি। জয়পুরহাট শহরে যাওয়ার পথে পানিফল কেনার জন্য গতনশহর এলাকায় দাঁড়িয়েছি। এই পানিফল বাচ্চা থেকে শুরু বড় সবাই পছন্দ করে। আমি ৩০ টাকায় এক কেজি পানিফল কিনেছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ জেলায় আনুমানিক ৩০ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ হচ্ছে। এটা এক সময় সৌখিন পর্যায়ে ছিল, মানুষ ৫-১০ হেক্টর জমিতে চাষ করত। কিন্তু এখন বাণিজ্যিকভাবে আবাদ হচ্ছে। এটি লাভজনক হওয়ায় কৃষক ভাইয়েরা খরচ করে উৎপাদন করছে এবং বিক্রি করছে।’
সাদিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এই ফলটি পুষ্টিকর ফল, ছোট-বড় সবাই খেয়ে থাকে। এর মধ্যে বেশি কিছু খনিজ পদার্থ আছে, যেটা শরীরের জন্য উপকারী। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষক ভাইদের পরামর্শ দিচ্ছি, যেন তারা বাণিজ্যিকভাবে এই পানিফল আবাদ করে লাভবান হতে পারে। সেই সঙ্গে আমরা বিক্রির ব্যাপারে সহযোগিতা করছি।’
হঠাৎ করে যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোলসহ বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের মূল্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। উপজেলার বাজারগুলোতে ৪ দিনের ব্যবধানে পণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানেই বেড়েছে অন্তত ২০ টাকা। দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত।
শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া, নাভারণ, শার্শা ও বেনাপোল বাজারের অধিকাংশ দোকানে ১১০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি হলেও পাড়া বা মহল্লার দোকানে ১২০-১৪০ টাকা পর্যন্ত কেজিপ্রতি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত মঙ্গলবারেও এ পণ্যটি ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলেন, পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে এক লাফে দাম বেড়ে ১০০ টাকায় পৌঁছেছে, যা গত মঙ্গলবার এর মূল্য ছিল ৭০-৭৫ টাকা। শনিবার বেনাপোলে তা আরও বেড়ে ১১০-১২০ টাকা হয়েছে।
শার্শার লক্ষনপুর বাজারের কাঁচামালের ব্যবসায়ী আতাউর রহমান বলেন, ‘দেশের পেঁয়াজের আড়তে পেঁয়াজের সরবরাহে কমতি নেই। তারপরও দাম একলাফে এতটা বাড়ার কথা নয়। কিন্তু নতুন পেঁয়াজ না উঠায় মজুতকারীরা দাম অতিরিক্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এতে পেঁয়াজের বিক্রি কমে গেছে।’
বেনাপোলের পাইকারি বিক্রেতারা বলেছেন, বছরের এ সময় এমনিতেই পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়তি থাকে। এবার সেভাবে বাড়েনি। কিন্তু বর্তমানে ভারতের পেঁয়াজ আমদানিও বন্ধ রয়েছে। দেশি পেঁয়াজের চাহিদা অনুযায়ী পাইকারি বাজারে না পাওয়া যাওয়ায় প্রতিদিন দাম বাড়ছে। পেঁয়াজের সরবরাহ এভাবে কমতে থাকলে রমজান মাস নাগাদ ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পাইকারি বাজারে প্রকারভেদে এখন দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, তিন দিন আগে গত মঙ্গলবার যা বিক্রি হয়েছে ৭০-৭২ টাকায়।
বেনাপোলের পাইকারি বিক্রেতা হাফিজুর রহমান বলেন, বছরের এ সময় দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেলে আমদানিকৃত ভারতীয় পেঁয়াজের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। বর্তমানে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকায় দেশি পেঁয়াজের ওপর চাপ পড়ছে। এদিকে পুরোনো পেঁয়াজের মজুত ফুরিয়ে আসছে। নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে এখনো মাসখানেক সময় লাগবে। ফলে দেশের বাজারগুলোতে পেঁয়াজের সরবরাহ আর ও কমে আসবে। এর প্রভাব দামের উপর পড়বে। এদিকে রান্নার অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যের দাম একলাফে এতটা বেড়ে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন ভোক্তারা।
পেঁয়াজ ক্রেতা আব্দুল জব্বার বলেন, ‘মৌসুমের শেষে একটি পণ্যের দাম বাড়তেই পারে। তাই বলে এক লাফে ৪০ টাকা বেড়ে যায় কীভাবে। এমনিতেই আগের ৭৫ টাকা কেজি কিনে খেতে কষ্ট হচ্ছিল। এখন ১২০ টাকা কেজি দরে কজন মানুষ কিনে খেতে পারবে। আগে অল্প হলে বাজারে মনিটরিং দেখা যেত, বর্তমানে তা দেখা যাচ্ছে না। এর সুযোগ নিয়েই দাম বাড়ানো হচ্ছে।’
বেনাপোলের পেঁয়াজ আমদানিকারক মিলন হোসেন জানান, ‘ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ। বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কমে যাওয়ার অজুহাতে বেনাপোল বন্দরের বিভিন্ন খুচরা বাজারে চার দিনের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি বেড়ে সেঞ্চুরি ছাড়িয়েছে। মোকামে পেঁয়াজের সরবরাহ কম। ফলে খুচরা বাজারে হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। চার দিন আগে খুচরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা কেজি দরে।’
শনিবার সকালে শার্শার নাভারণ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে ৭৫-৮০ টাকার পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকা কেজি দরে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির হঠাৎ দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছে বিপাকে।
বেনাপোল বাজারের ক্রেতা সোহরাব হোসেন বলেন, ‘চার দিন আগেও ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় পেঁয়াজ কিনেছি। আজ এসে দেখি ১১০-১১৫ টাকা চাচ্ছে দোকানিরা। প্রতিদিনই বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। এতে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। চার দিনের ব্যবধানে ৪০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় আমরা বিপাকে পড়েছি।
আরেকজন ক্রেতা আসাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো কিছুর নিয়ম নেই। এখানে খেয়াল-খুশিমতো জিনিসের দাম বাড়ে। আমরা গরিব মানুষ। বাজারে এলেই মাথা ঘুরে যায়। কয়েক দিন আগেও ৭০ টাকায় পেঁয়াজ কিনেছিলাম, আজ দেখছি তা ১১০ টাকা কেজি। আবার ছোট পেঁয়াজ কেউ কেউ ১০০ টাকা চাচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে আমরা কীভাবে বাঁচব?’
উপজেলার বাগআঁচড়া বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে মোকামে পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। এখন আমরা ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে কিনে ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। আজ শুনলাম মোকামে পেঁয়াজের কেজি ১০৫ টাকা। তারপর খরচ আছে। পরে আবার দেখা যাবে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি করতে হবে। দাম বেশি থাকায় বিক্রিও কমে গেছে।’
বেনাপোল বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, ‘দেশের যেসব মোকামে পেঁয়াজ আসে, সেখানেই এখন সরবরাহ কম। ভারত থেকেও কোনো পেঁয়াজ আমদানি নেই। এই ঘাটতির কারণে দাম বাড়ছে। সরকার যদি ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়, তাহলেই দ্রুত বাজার স্বাভাবিক হবে।’
বেনাপোল বাজার কমিটির সভাপতি আজিজুর রহমান (আজু) বলেন, ‘বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এবং অভ্যন্তরীণ মোকামগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসলে আবার কমতে শুরু করবে।’
মন্তব্য