নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে কেবল একটিতে আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, বাকি চারটিতেই আসামিদের সবাই অজ্ঞাতপরিচয়।
একটি মামলায় যে ২৪ আসামির নাম উল্লেখ করেছে নিউ মার্কেট থানা পুলিশ, তাদের সবাই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। তবে এই আসামিদের অভিযোগ, রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে পুলিশ তাদের নাম এজাহারে দিয়েছে। অবশ্য পুলিশের দাবি, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই আসামি করা হয়েছে সবাইকে।
নিউ মার্কেটের দুটি ফাস্টফুডের দোকানে গত ১৮ এপ্রিল ইফতারের আগে টেবিল পাতা নিয়ে দুই কর্মচারীর বাগবিতণ্ডা হয়। এর জেরে এক কর্মচারীর ডাকে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের তিন কর্মীর নেতৃত্বে কিছু ছাত্র ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তবে তারা মারধরের শিকার হয়ে কলেজে খবর দিলে ছাত্ররা মার্কেটে হামলা চালান।
এ ঘটনার পরে ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় দুই দিনের সংঘর্ষে প্রাণ হারান দুজন, সাংবাদিকসহ আহত হন অর্ধশতাধিক।
সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের কাজে বাধা দেয়া ও হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগে ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে গত ২০ এপ্রিল নিউ মার্কেট থানায় একটি মামলা করেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইয়ামিন কবীর। ওই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয়ে থাকা ঢাকা কলেজের ৬০০ থেকে ৭০০ ছাত্র এবং নিউ মার্কেট এলাকার ২০০ থেকে ৩০০ ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারীকেও আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংঘর্ষে নিহত নাহিদ মিয়ার চাচা মো. সাঈদ ২০ এপ্রিল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। একই দিন বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে অজ্ঞাতনামা ১৫০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন নিউ মার্কেট থানার উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান।
চতুর্থ মামলাটি হয় ২১ এপ্রিল মধ্যরাতে। নিহত দোকান কর্মচারী মোরসালিনের বড় ভাই নুর মোহাম্মদের করা হত্যা মামলাটিতে অজ্ঞাতপরিচয় ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সবশেষ মামলাটি করেছেন সংঘর্ষের সময় ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাম্বুলেন্স মালিক মো, সুজন। গত ২৩ এপ্রিল তার করা মামলাতেও আসামিদের পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।
পুলিশের কাজে বাধা দেয়া ও হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগে করা মামলায় যে ২৪ আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে মকবুল হোসেন, আমীর হোসেন, মিজান, হাজি জাহাঙ্গীর হোসেন পাটোয়ারী, টিপু, হাসান জাহাঙ্গীর মিঠু, হারুন হাওলাদার, শাহ আলম শন্টু, শহীদুল ইসলাম শহীদ, জাপানি ফারুক, মিজান ব্যাপারী ও আসিফের নাম এসেছে উসকানিদাতা হিসেবে। আর রহমত, সুমন, জসিম, বিল্লাল, হারুন, তোহা, মনির, বাচ্চু, জুলহাস, মিঠু, মিন্টু ও বাবুল সরাসরি ঘটনায় জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার ১ নম্বর আসামি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরদার নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। নিউ মার্কেটের ক্যাপিটাল ফাস্টফুড ও ওয়েলকাম ফাস্টফুড নামের দোকান দুটির মালিকও তিনি। এই দুই দোকান কর্মচারীদের বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত।
ওয়েলকাম নামের দোকানটি সরাসরি পরিচালনা করেন মকবুলের ছোট ভাই রফিক হোসেন সরদার, আর ক্যাপিটাল দোকানটি পরিচালনা করেন মকবুলের চাচাতো ভাই শহিদুল হোসেন সরদার।
বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী মকবুল হোসেনকে ২২ এপ্রিল সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তবে এর আগে মকবুল নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ফাঁসাতে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে দোষীদের চেহারা স্পষ্ট থাকার পরও জড়িত ছাত্রদের নাম বাদ দিয়ে শুধু স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্রলীগ কর্মীদের বাঁচাতে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে বিএনপিকে জড়াচ্ছে প্রশাসন।’
মামলার এজাহারে আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ না থাকলেও মকবুল দাবি করেন ২৪ জনই নিউ মার্কেট এলাকায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
তিনি জানান, দুই নম্বর আসামি আমীর হোসেন আলমগীর নিউ মার্কেট থানা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক, মিজান ওই থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, আনোয়ার হোসেন টিপু ছাত্রদলের সাবেক নেতা, জাহাঙ্গীর হোসেন পাটোয়ারী নিউ মার্কেট বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, হারুন হাওলাদার নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, হাসান জাহাঙ্গীর মিঠু সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও ছাত্রদল নেতা, শন্টু ওরফে নান্টু সাবেক সহসভাপতি।
এ ছাড়া শহীদুল হক শহীদ ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি, জাপানি ফারুক সাবেক প্রচার সম্পাদক, মিজান ব্যাপারী যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্যসচিব এবং নিউ মার্কেট ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক, রহমত ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক, সুমন ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সদস্য, জসিম থানা কমিটির সাবেক সদস্য।
মকবুল হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, বিল্লাল ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক, হারুন ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা, তোহা নিউ মার্কেট থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক, মনির স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি, বাচ্চু ও জুলহাস ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য এবং মিঠু, মিন্টু ও বাবুল ওয়ার্ড যুবদলের নেতা।
মকবুল হোসেন দাবি করেন, মামলার আসামিদের মধ্যে টিপু দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে আছেন। এ ছাড়া আসামিদের মধ্যে একজন ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব গিয়েছেন।
মামলার অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাঁচজন ছাড়া বাকি সবার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
মামলায় নিউ মার্কেট বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন পাটোয়ারীকে সংঘর্ষের উসকানিদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।
নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারকেন্দ্রিক এই বিএনপি নেতার নিউ মার্কেটে বরাদ্দ পাওয়া একটি দোকান আছে, যেটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন। জাহাঙ্গীরের বাসা ধানমন্ডির রায়ের বাজার এলাকায়।
বিএনপির এই নেতার দাবি, যে রাতে নিউ মার্কেটের দুই ফাস্টফুডের দোকানে ঝামেলা তৈরি হয়, সেদিন তিনি নিজের বাসায় ছিলেন না, আগের দিন থেকেই কামরাঙ্গীর চরে বোনের বাসায় অবস্থান করছিলেন। আর ১৯ এপ্রিল তিনি ব্যক্তিগত কাজে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে চলে যান।
জাহাঙ্গীরের দাবি, টেলিভিশন, ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি সংঘর্ষের খবর জানতে পারেন। ঘটনা সূত্রপাতের আগের দিন বোনের বাসায় অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মামলার জন্য বিএনপির কেউই নিজ বাসায় থাকতে পারেন না।’
মামলায় তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন জাহাঙ্গীর।
মামলার আরেক আসামি মহানগর বিএনপির সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও ছাত্রদল নেতা হাসান জাহাঙ্গীর মিঠুও দাবি করছেন, তিনি ঘটনার সূত্রপাতের সময় বাসায় ছিলেন না।
মোবাইল ফোনে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, 'আমি ঘটনার সময় ঢাকাতেই ছিলাম না। আমার বাসা ধানমন্ডির জিগাতলায়। ওই দিন সন্ধ্যায় আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিলাম, সেখানে সেহরি খেয়েছি। এর পরদিন বিকেলে ঢাকায় ফিরছিলাম, কিন্তু মামলা হওয়ার পর কুমিল্লায় চলে এসেছি।‘
মামলার অন্য আসামিদের অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলার পর তারা সবাই ফোন নম্বর পরিবর্তন করেছেন।’
এই মামলার আরেক আসামি মো. আনোয়ার হোসেন টিপুর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা গেছে। টিপু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদ্য সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রদল নেতা। উসকানিদাতা হিসেবে তার নাম এসেছে এজাহারে।
হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে যুক্ত হলে দেখা যায়, টিপুর অবস্থান লন্ডনে। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেখতেই তো পারছেন, আমি এখন লন্ডনে। আমি ২০১৫ সালের ১ মার্চ থেকে লন্ডনে আছি। আমার বিরুদ্ধে ১৩ মামলা চলমান, মামলা থেকে বাঁচতে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছি।
‘মামলার কারণে আমার দেশে ফেরার সুযোগ নেই। না বুঝেই পুলিশ এ মামলায় আমার নাম যুক্ত করেছে। এখন বুঝতে পারছে কাঁচা কাজ করে ফেলেছে।‘
লন্ডন থেকেও তো উসকানি দেয়া সম্ভব, এমন মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কীভাবে উসকানি দিয়েছি সেটা তারা প্রমাণ করুক।’
সংঘর্ষে সরাসরি যুক্ত হিসেবে মামলায় হারুন নামে বিএনপির এক নেতার নাম রয়েছে। মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি দাবি করেন, ‘তিনি মামলার আসামি নন, অন্য কোনো হারুনের কথা বলা হয়েছে।’
রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী দাবি করে ফোন কেটে দেন, পরে আর ফোন ধরেননি।
রহমত নামের একজনকে সেদিনের ঘটনায় সরাসরি যুক্ত থাকার কথা অভিযোগে উল্লেখ করেছে পুলিশ। তার পুরো নাম রহমত উল্লাহ। তিনি নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক।
রহমত নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, ব্যাবসায়িক কারণে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত। তবে মিটিং মিছিলে অংশ নেয়া ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক তৎপরতায় কখনও অংশ নেননি। তার বিরুদ্ধে এর আগে কোনো মামলা বা জিডিও হয়নি।
রহমত বলেন, ‘নিউ সুপার মার্কেটে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে আমি কাপড়ের ব্যবসা করছি। গণ্ডগোল শুরুর পরপরই দোকান বন্ধ করে পল্টনের বাসায় চলে যাই। পরদিন মার্কেট বন্ধ থাকায় আমি আর বাসা থেকে বের হইনি।’
তিনি অভিযোগ করেন, মামলার অন্যতম আসামি ও নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজি জাহাঙ্গীর হোসেন পাটোয়ারীর অনুসারী হওয়ায় তাকেও মামলায় জড়ানো হয়েছে।
মামলার বাকি সব আসামির মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি নিউজবাংলা।
মামলায় আসামি হিসেবে শুধু বিএনপি নেতা-কর্মীদের নাম উল্লেখের কারণ জানতে চাইলে পুলিশের নিউ মার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে তো কারও রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। এত বড় সংঘর্ষের পর গোয়েন্দারা প্রাথমিক তদন্ত করে উসকানিদাতা ও সরাসরি সম্পৃক্তদের নাম পেয়েছেন। সেই তালিকা ধরেই মামলা হয়েছে।
‘এখন আমরা বিশদ তদন্ত করে দেখব। যারা নিরপরাধ তাদের নাম পরে বাদ যাবে, আর জড়িতদের শাস্তি হবে।’
ঘটনার শুরুতে সিসিটিভি ফুটেজে ছাত্রদের অনেককেই চিহ্নিত করা গেলেও তাদের নাম কেন মামলায় নেই, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত ছিলাম। আর ঘটনার ছায়া তদন্ত করে গোয়েন্দারা রিপোর্ট দিয়েছেন। সেখানে আাসামিদের যার যার নাম এসেছে আমরা মামলায় শুধু তাদের নামই দিয়েছি। মামলায় ছাত্রদের অজ্ঞাতপরিচয় বলা হয়েছে, তাই জড়িত ছাত্রদেরও ছাড় দেয়া হবে না।’
মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা শুধু ঘটনাটি কীভাবে শুরু হলো তা তদন্ত করেছি। টানা সংঘর্ষ চলার কারণে প্রথমেই ঘটনা সম্পর্কে আমরা কোনো স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছিলাম না। তাই শুরুতেই দুই দোকানের যারা ঝামেলা পাকিয়েছে, তাদের শনাক্ত করতে চাচ্ছিলাম।‘
মকবুল হোসেনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুই দোকানের মালিক হওয়ায় এবং কর্মচারীদের বিরোধ মীমাংসা না করে ঘটনাকে বড় হতে দেয়ার দায় তিনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। তবে সেখানে আমরা পলিটিক্যাল কোনো ইস্যু বা ইন্ধন পাইনি, তাই মকবুলের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।’
নিউ মার্কেটে বাইরে পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষকে আলাদা ঘটনা বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার শুরুর দিকে অনেক তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা এই ২৪ আসামির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। নিউ মার্কেটের দুই দোকানের কর্মচারীরা নিজেদের বিবাদে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের ডেকে আনে। তবে ছাত্ররাই উল্টো মার খান। এর জেরে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে যায়।’
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আদালতে সব তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরব। আসামিরা যদি পারেন, সেখানে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করবেন।’
সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে দোয়া মোনাজাতের মধ্য দিয়ে নিজ কার্যালয়ে কাজ শুরু করেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল
নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কিছু আইন কর্মকর্তার অনিয়ম, নোট বাণিজ্য ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আজ দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিজের কার্যালয়ে প্রথম কর্মদিবসে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে দোয়া মোনাজাতের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল। এসময় সিনিয়র আইনজীবীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
এ সময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিলন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ফিদা এম কামাল, সিনিয়র আইনজীবী ও সংসদ সদস্য ফজলুল রহমান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ, মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা ও মোহাম্মদ অনীক আর হক প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।
গত বুধবার ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মাদারীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুন বাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এক নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। কমিশনের সহকারী পরিচালক এস. এম. রাশেদুল হাসান বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ঐশী খানের নামে অনুসন্ধানে ১ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৭৫০ টাকার সম্পদ এবং ১১ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৪ টাকার পারিবারিক ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়। মোট ১ কোটি ৮১ লাখ ৭১ হাজার ৯০৪ টাকার সম্পদের বিপরীতে তার বৈধ আয় পাওয়া যায় মাত্র ১০ লাখ ৫৩ হাজার ৮৯২ টাকা। তার নামে ১ কোটি ৭১ লাখ ১৮ হাজার ৯২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক।
এছাড়া তার নামে বা বেনামে আরও সম্পদ থাকার সম্ভাবনার কথাও অনুসন্ধান টিম প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
দুদক জানায়, অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কমিশন তাকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারি করে। নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়েও নোটিশ প্রদান সম্ভব না হওয়ায় গত ১০ জুলাই সম্পদ বিবরণী ফরম লটকিয়ে জারি করা হয়। পরে তিনি এক মাস সময় বৃদ্ধির আবেদন করলে নির্ধারিত ২১ কার্যদিবসের পাশাপাশি, আরও ১৫ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। তবে বাড়তি সময় পেলেও তিনি সম্পদ বিবরণী দাখিল করেননি।
দুদক উল্লেখ করে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পাশাপাশি তার নামে বিপুল অপ্রদর্শিত ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ায় ২৭ (১) ধারার অভিযোগও প্রযোজ্য বলে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা পৃথক ৩ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন মামলার রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে ২৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন। এই তিন মামলায় কেবল রাজউকের সাবেক সদস্য (ভূমি ও স্থাপনা) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম আত্মসমর্পণের পর কারাগারে রয়েছেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ হাসিনা, তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে, ছোট বোন শেখ রেহানা ও তাঁর দুই ছেলে-মেয়ের নামে প্রতিটি ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে করা ছয়টি মামলার মধ্যে এই তিনটির রায় হয়েছে আজ।
এ ছাড়া শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও রেহানার বড় মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে করা অপর একটি মামলার রায়ের দিন ধার্য রয়েছে আগামী ১ ডিসেম্বর। আজ যে তিন মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে হয় ২৩ নভেম্বর। সেদিনই রায়ের এই তারিখ ধার্য করা হয়।
চলতি বছরের ১২,১৩ ও ১৪ জানুয়ারি এই তিন মামলাসহ ছয়টি মামলা করে দুদক। ২৫ মার্চ প্রতিটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ৩১ জুলাই আদালত এই তিন মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনার নামে প্লট বরাদ্দের মামলায় তিনিসহ ১২ জন আসামি। আরেক মামলায় জয়সহ ১৭ জন এবং অন্য মামলায় পুতুলসহ ১৮ জন আসামি। প্রতিটি মামলায়ই শেখ হাসিনা এবং রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা আসামি। ছয় মামলার মধ্যে বাকি তিনটি মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এ বিচারাধীন। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, টিউলিপ ও অন্যদের বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ের জন্য ১ ডিসেম্বর রায়ের দিন ধার্য রয়েছে।
অপর দুটি মামলা করা হয়েছে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, মেয়ে আজমির সিদ্দিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। এ দুই মামলায়ও শেখ হাসিনা ও রাজউকের কর্মকর্তারা আসামি। এ দুটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৩০ নভেম্বর ও ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য আছে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তাঁরা বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর সড়কের ৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বহুল আলোচিত সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে ৬ আসামির যাবজ্জীবন দণ্ডও বহাল রেখেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় প্রকাশ করেছেন। এখন ৩০ দিনের মধ্যে আসামিরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন।
এর আগে এ বছরের ২ জুন মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ৬ আসামির যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল রাখেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামির ৫০ হাজার টাকার জরিমানার আদেশও বহাল রাখা হয় রায়ে। যাবজ্জীবন বহাল থাকা আসামিরা হলেন— টেকনাফ থানার সাবেক এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল রুবেল শর্মা, সাগর দেব, কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিন।
এই মামলায় গত ২৯ মে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষ হয়।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। ঘটনার পাঁচ দিন পর ২০২০ সালের ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়ে র্যাব। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল এই মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত এবং কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি সাত আসামি খালাস পান। পরে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। কারাগারে থাকা দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেন।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ঐতিহাসিক এ রায় ঘোষণা করেন। রায় প্রদানকারী এই ট্রাইব্যুনালে অপর দুই সদস্য বিচারক হলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
বহুল আলোচিত এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিলেন প্রসিকিউশন।
অন্যদিকে, আসামিদের নির্দোষ দাবি করে খালাস চায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী। এছাড়া রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের খালাস চান তার আইনজীবী।
এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এস. এইচ. তামিম শুনানি করেন। এছাড়া শুনানিতে প্রসিকিউটর বি. এম. সুলতান মাহমুদ, শাইখ মাহদি, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। আর রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
ঐতিহাসিক এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের পিতাসহ স্বজনহারা পরিবারের অনেকে। এছাড়া স্টার উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। সর্বোমোট ৫৪ জন সাক্ষী এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
একপর্যায়ে দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনে (অ্যাপ্রুভার) রাজসাক্ষী হন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মামলার বৃত্তান্ত
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার—সব পর্যায়ের বৃত্তান্ত এভাবে এগিয়েছে।
মামটির নম্বর আইসিটি বিডি কেস নম্বর ২/২০২৫। চিফ প্রসিকিউটর বনাম শেখ হাসিনা ও অন্যান্য শিরোনামে দায়ের হওয়া এই মামলায় আসামি করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে।
অভিযোগ প্রাপ্তি ও তদন্ত শুরু
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট এবং ২৯ অক্টোবর অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়। মিস কেস নং ০২/২০২৪ করা হয় ১৬ অক্টোবর। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় ১৬ অক্টোবর এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ১৭ অক্টোবর। গ্রেপ্তার আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জ
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ১২ মে। ১ জুন দাখিল হয় ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। এতে ১৪ খণ্ডে প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার দালিলিক সাক্ষ্য জমা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল পত্রুপত্রিকা, দেশি-বিদেশি অনুসন্ধান প্রতিবেদন, শহীদ ও আহতদের তালিকাসহ গেজেট, বই, স্মারকগ্রন্থ, ঘটনাভিত্তিক তালিকা, গ্রাফিতির বই, অভ্যুত্থানকালীন প্রকাশিত পত্রিকার প্রথমপাতার সংকলন, আহতদের চিকিৎসা সনদ, পোস্টমর্টেম ও সুরতহাল প্রতিবেদন, অস্ত্র ও বুলেট ব্যবহারের জিডি, হেলিকপ্টারের ফ্লাইট শিডিউলসহ নানান নথি। ৯৩টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে এসব দালিলিক সাক্ষ্য ও ৩২টি বস্তু প্রদর্শনীর মাধ্যমে বুলেট, পিলেট, রক্তমাখা কাপড়, ভিডিও, অডিও, ডিভিডি, পেনড্রাইভ ও বই ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়।
মোট ৮৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি জমা পড়ে, যার মধ্যে ৫৪ জন সরাসরি সাক্ষ্য দেন। ১৭ জুন পলাতক আসামিদের জন্য দুই জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ২৪ জুন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। ১ জুলাই চার্জ শুনানি শুরু হয় এবং ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হয়। এ সময় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করেন।
প্রসিকিউশনের ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপন করা হয় ৩ আগস্ট; একই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী ছিলেন গুরুতর আহত খোকন চন্দ্র বর্মন। ৮ অক্টোবর শেষ সাক্ষ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর। মোট ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ১২ অক্টোবর শুরু হয় যুক্তিতর্ক। ২৩ অক্টোবর এটর্নি জেনারেলের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তা শেষ হয় এবং রায়ের তারিখ ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় রাখা হয়। ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল ১৭ নভেম্বরকে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগসমূহ
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ ১: চব্বিশের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা রাজাকারের নাতিপুতি সম্মোধন করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। এরপর ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজন নেতা একই ধরনের মন্তব্য করেন। এসব বক্তব্যের পর ছাত্ররা আন্দোলনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণ করে ও নির্যাতন চালায়।
অভিযোগ ২: কাউন্ট-১, ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মাকসুদ কামালকে ফোন দিয়ে আসামি শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে তাদের ফাঁসি অর্থাৎ হত্যার নির্দেশ দেন।
কাউন্ট-২, ১৮ জুলাই শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথোপকথনে লেথাল উইপন (মরণাস্ত্র) ব্যবহারের নির্দেশ, ড্রোন ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার নির্দেশসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুড়িয়ে জনতার উপর দায় চাপানোর নির্দেশনা প্রদান করেন।
কাউন্ট-৩, হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে ফোনে ২ বার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে বোমা নিক্ষেপ, আটক-নির্যাতন এবং বিএনপি, জামায়াত ও জঙ্গি ট্যাগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
অভিযোগ ৩: ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
সাক্ষ্যপ্রমাণ:
শেখ হাসিনার ১৪ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও, ঢাবি ভিসি মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনের রেকর্ড, আবু সাঈদকে পুলিশের গুলির সময় এনটিভির লাইভ ভিডিও ও মূল কপি, আবু সাইদের পাঁচটি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট যা পুলিশের নির্দেশে চারবার পরিবর্তন করা হয়, ওই ঘটনায় সাজানো মামলার নথি, আবু সাঈদের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক, ডাক্তার, ছাত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য।
অভিযোগ ৪: চব্বিশের ৫ আগস্ট ঢাকার চানখারপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
অভিযোগ ৫: চব্বিশের ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানা এলাকায় ছয়জনকে হত্যা করে তাদের লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ।
জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রায় ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড একটি ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে সর্বস্তরের জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এতে বলা হয়েছে, রায়-পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা, উত্তেজনাপ্রসূত আচরণ, সহিংসতা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হচ্ছে। জনগণের, বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই রায়কে ঘিরে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আবেগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে যেন কেউ জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়—সরকার এ বিষয়ে দৃঢ়ভাবে সবাইকে সতর্ক করছে।
জাতি ঐক্যবদ্ধ আর জনগণ যদি জেগে থাকে তাহলে দেশের ভাগ্য নিয়ে বা দেশে নৈরাজ্য করার শক্তি কারোরই কোনোদিন ছিল না কিংবা হবেও না বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
শেখ হাসিনার মামলার রায়ের দিন ধার্যের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রায় ঘোষণার দিন ধার্য ঘিরে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, সরাসরি যদি কেউ বিচারপ্রক্রিয়াকে বানচালের জন্য কোনো হুমকি দেন কিংবা কোনো কার্যক্রম করেন, সেটা আদালতের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল হবে। আমরা আমাদের আইনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে চাই। তবে দেশে সরকার আছে, জনগণ আছেন তারা সবকিছু ভালো বোঝেন। এছাড়া যারা উসকানি দেবেন বা সন্ত্রাসের চেষ্টা করবেন সে ব্যাপারে আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। আমরা বাংলাদেশের জনগণের দেশপ্রেম ও ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দেশের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাহিনীর প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। আশা করি যা কিছু বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে সেগুলো কোনো জায়গায় প্রভাব পড়বে না। সবকিছু স্মুথলি হবে এবং বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে।
বিচারকাজ নিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের অভিযোগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যারা যা খুশি প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারেন। এই বিচার আমরা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছি সেটা ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) ছিল। এখানে অকাট্য ও শক্তিশালী সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। জাতির সামনে এই বিচার হয়েছে। আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুনিয়ার সামনে ক্রিস্টাল ক্লিয়ারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং তারা যত খুশি প্রশ্ন করতে পারেন। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। ন্যায়বিচার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
এদিন দুপুর ১২টা ৯ মিনিটে জুলাই গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের রায়ের দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদসহ অন্যরা। শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। এছাড়া মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও ছিলেন।
গত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় সমাপনী বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রীসহ হেভিওয়েট নেতাদের যেভাবে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল; সেসব বর্ণনা ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন। পরে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর যুক্তি উপস্থাপনের কয়েকটি বিষয়ে জবাব দেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এরপর তাদের কিছু কথার পাল্টা উত্তর দেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন। পরে রায়ের তারিখ ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার রায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে জুলাই গণহত্যার প্রথম কোনো রায় শুনবে এ জাতি।
এ মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের নামও রয়েছে। তবে রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। এজন্য যুক্তিতর্কে শেখ হাসিনা-কামালের চরম দণ্ড বা সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও তার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে প্রসিকিউশন। মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও তার অ্যাকুইটাল (খালাস) চেয়েছেন। সবমিলিয়ে সাবেক এই আইজিপির মুখে হাসি ফুটবে নাকি অন্য কিছু; তা জানা যাবে রায় ঘোষণার দিন।
শেখ হাসিনার এ মামলায় ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৫৪ জন। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় চলতি বছরের ৩ আগস্ট। প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেন খোকন চন্দ্র বর্মণ। ৮ অক্টোবর মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরের জেরার মাধ্যমে শেষ হয় সাক্ষ্যগ্রহণের ধাপ। এরপর প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীর যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয় ২৩ অক্টোবর।
এ মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছে উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার, আবু সাঈদ হত্যা, চানখারপুলে হত্যা ও আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার ও শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। সাক্ষী করা হয়েছে ৮৪ জনকে। গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলায় বন বিভাগের ফরেস্টার সুলতানুল আলম চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (১২ নভেম্বর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত এ আদেশ দেন।
এদিন আসামি সুলতানুল আলম আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে তা নামঞ্জুর করেন এবং আসামিকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগের দাগনভূঞা সামাজিক বন বিভাগের ফরেস্টার সুলতানুল আলম চৌধুরী ১৯৯০ সালে বন বিভাগের নার্সারি প্রকল্পে প্ল্যান্টেশন সহকারী হিসেবে অস্থায়ীভাবে যোগ দেন। ২০০০ সালে তাঁর চাকরি স্থায়ী হয় এবং পরে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে ফেনীর দাগনভূঞায় কর্মরত আছেন।
২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরিচালক বাদী হয়ে সুলতানুল আসামি করে মামলাটি করেছিলেন। তদন্ত শেষে গত ১২ মার্চ চট্টগ্রাম দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতানুল আলম চৌধুরীর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীর বাইরে তার নামে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পায় দুদক। এছাড়া, দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে তিনি আরও ১ লাখ ৬১ হাজার টাকার সম্পদ গোপন করেন।
দুদক চট্টগ্রামের আইনজীবী মো. রেজাউল করিম রনি বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চেয়েছিলেন। কিন্তু আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মন্তব্য