× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট

বাংলাদেশ
Arbitrary use of education engineering vehicles
hear-news
player
print-icon

শিক্ষা প্রকৌশলের গাড়ি ব্যবহারে যথেচ্ছাচার

শিক্ষা-প্রকৌশলের-গাড়ি-ব্যবহারে-যথেচ্ছাচার
দামি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও শিক্ষা প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা নিয়ম মানছেন না। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ৩০টি গাড়ির অধিকাংশই বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করছেন এটির ক্ষমতাধর কয়েকজন কর্মকর্তা এবং শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ একাধিক কর্মকর্তা, যাদের গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার নেই।

বুলবুল আখতার। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী। অবসর নিয়েছেন ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর। নিয়ম অনুযায়ী শেষ কর্মদিবসে তার গাড়িটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরিবহন শাখায় বুঝিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু সে নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি এখনও ব্যবহার করে চলেছেন ‘পাজেরো স্পোর্ট’ ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি। আর সেই গাড়ির জ্বালানি ও অন্যান্য খরচও নিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে শিক্ষা প্রকৌশলের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকেই।

শিক্ষা প্রকৌশলের পরিবহন শাখা নিউজবাংলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার বুলবুল আখতারকে ফোন ও এসএমএস করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

শুধু সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নন, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) মো. আরিফুর রহমান নিয়মবহির্ভূতভাবে একটির বেশি গাড়ি ব্যবহার করছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তিনি একটি গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকারভুক্ত। কিন্তু তিনি ব্যবহার করছেন বিলাসবহুল দুটি গাড়ি। এর একটি তিনি দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করেন। আরেকটি তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনগুলোর সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কার এবং আসবাবপত্র সরবরাহের কাজ করে থাকে। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ, আইসিটি সুবিধা সরবরাহের কাজও তারা করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) প্রধান কার্যালয়ে চলমান রয়েছে ৩০টি গাড়ি। ইইডির পরিবহন ও অফিস সরঞ্জাম ব্যবহার সংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলী, তিনজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ছয়জন নির্বাহী প্রকৌশলী মোট ১০ জন সরকারি গাড়ি ব্যবহারে প্রাধিকারভুক্ত। বাকি ২০টি গাড়ির অধিকাংশই বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করছেন ইইডির ক্ষমতাধর কয়েকজন কর্মকর্তা ও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ একাধিক কর্মকর্তা, যাদের গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার নেই।

এ ছাড়া কয়েকটি গাড়ি শিক্ষা প্রশাসনের বাইরের অন্য দপ্তরেও ব্যবহার হচ্ছে, যা অফিস সময়ের পরেও ব্যবহার করা হচ্ছে। আর কয়েকটি গাড়ি শিক্ষা প্রশাসনের ‘ক্ষমতাধরদের’ জন্য স্ট্যান্ডবাই করে রাখা হয়, যাতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িগুলো সরবরাহ করা যায়।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক গাড়িচালক নিউজবাংলাকে জানান, ‘অফিস সময় ৯টা থেকে ৫টা হলেও কর্মকর্তারা জোর করে এর পরও তাদের ব্যক্তিগত কাজে গাড়ি চালাতে বাধ্য করেন।’

শিক্ষা প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দামি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারে ইইডি ও শিক্ষা প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা কোনো নিয়ম মানছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী নিউজবাংলাকে বলেন, ইইডির গাড়িগুলো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কবজায় থাকায় জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীরা ‘সাইট ভিজিট’ (প্রকল্প কাজ পরিদর্শন) কমিয়ে দিয়েছেন। কারণ তাদের কখনও পাবলিক পরিবহনে, কখনও একটি গাড়ি দু-তিনজন কর্মকর্তা সমন্বয় করে ব্যবহার করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে গাড়ি নিয়ে ‘হরিলুট’ চলছে। যে যেভাবে পারছে, প্রাধিকারভুক্ত না হয়েও গাড়ি ব্যবহার করছে। আবার কিছু কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের অবৈধভাবে গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা দিচ্ছেন, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও অনৈতিক।”

গাড়িগুলো ব্যবহার করছেন কারা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে চালু ৩০টি গাড়ির মধ্যে মিতসুবিশি পাজেরো স্পোর্ট কিউএক্স ও নিসান এক্স-ট্রেইল মডেলের এসইউভিই বেশি। এর মধ্যে ১০ কর্মকর্তা সরকারি গাড়ি ব্যবহারে প্রাধিকারভুক্ত। বাকি গাড়িগুলো নিয়ম অমান্য করে ব্যবহার করছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা প্রশাসনের অন্য দপ্তরের ক্ষমতাধর কয়েকজন কর্মকর্তা।

শিক্ষা প্রকৌশলের সব পরিবহন দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন পরিবহন শাখার সহকারী প্রকৌশলী জার্জিস ইউ রহমান। অবৈধভাব গাড়ি ব্যবহারে তিনিও পিছিয়ে নেই। প্রাধিকারভুক্ত না হলেও তিনি ব্যবহার করছেন একটি গাড়ি।

বিষয়টি নিয়ে তার বক্তব্য জানতে তাকে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনি চিফ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে যান।’

এসব গাড়ির জ্বালানি খরচ ও অন্যান্য ব্যয়ের জোগান দেয় ইইডির হিসাবরক্ষণ শাখা। সেই শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. ইউনুস আলীও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। তিনিও একটি পাজেরো গাড়ি ব্যবহার করছেন প্রাধিকার ছাড়া।

বিধিবহির্ভূতভাবে গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইউনুস আলী বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপনি প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেন।’

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুটি দায়িত্বে রয়েছেন আসাদুজ্জামান। তিনি প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক (প্রশাসন)। এর বাইরে তিনি উপপরিচালকের (অর্থ) অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও একটি গাড়ি ব্যবহার করছেন প্রাধিকার ছাড়া।

এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি জোর করে গাড়িটা ব্যবহার করছি না। নিশ্চয় অফিস থেকে গাড়িটি ব্যবহারের জন্য দেয়া হয়েছে, দাপ্তরিক প্রয়োজনে। অফিস যদি অনুমোদন না করে, আমি ব্যবহার করব না।’

গাড়ি বিলাসিতায় পিছিয়ে নেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলামও।

জানতে চাইলে বিধিবহির্ভূতভাবে গাড়ি ব্যবহারের কথা প্রথমে স্বীকার না করলেও পরে বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে একটি গাড়ি ব্যবহার করি।’

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন অন্য কয়েকটি দপ্তর এবং পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তাও ব্যবহার করছেন ইইডির বিলাসবহুল এসব গাড়ি। এ ছাড়া একাধিক গাড়ি মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের জন্য ‘স্ট্যান্ডবাই’ রাখা হয়। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন গাড়ির জন্য প্রাধিকারভুক্ত শিক্ষা প্রকৌশলের কর্মকর্তারা।

অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের গাড়ির সুবিধা কেন দেয়া হয়?

বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক সুবিধা পেতেই শিক্ষা প্রকৌশলের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কেনা গাড়িগুলো অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন এ দপ্তরের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী যখন-তখন গাড়ি না দিলে বিভিন্ন ফাইল আটকে দেয়া হয়। এ ছাড়া শাস্তিমূলক বদলি, পদোন্নতি আটকে দেয়ার হুমকি তো রয়েছেই। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প পাস করতে তাদের (মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের) সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। তাই বিধিবহির্ভূতভাবে গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা দেয়া হয়।

কথা বলতে রাজি নন প্রধান প্রকৌশলী

শিক্ষা প্রকৌশলের গাড়িগুলো কেন প্রাধিকারহীন কর্মকর্তারা ব্যবহার করছেন এবং অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের কেন গাড়ি ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে– এমন প্রশ্ন করা হলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন ইইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. আরিফুর রহমান।

শুরুতে বিষয়টি জানতে একাধিকবার তাকে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে তার দপ্তরে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘আমি এ বিষয়ে কথা বলব না, সাক্ষাৎকার দেব না। আপনি আসতে (চলে যেতে) পারেন।’

একপর্যায়ে প্রতিবেদক এ বিষয়ে একাধিকবার মন্তব্য করতে অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আমি ২৮ এপ্রিল এলপিআরে (লিভ প্রিপারেশন ফর রিটায়ারমেন্ট বা অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি) যাব। এরপর আপনি যোগাযোগ করবেন, সব বলব।’

এটা ভয়াবহ দুর্নীতি

প্রাধিকারভুক্ত না হয়ে গাড়ি ব্যবহার এবং অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের অনৈতিকভাবে গাড়ি ব্যবহারে সুবিধা দেয়াকে ভয়াবহ দুর্নীতি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘এটা সরকারি নিয়মের সুস্পষ্ট ব্যত্যয়। এটা ভয়াবহ প্রতারণা ও দুর্নীতি। যারা ক্ষমতার এমন অপব্যবহার করছেন, সুষ্ঠু তদন্ত করে অবশ্যই এদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

গাড়িগুলো যারা ব্যবহার করছেন এবং যারা এ ধরনের অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন, উভয় পক্ষকেই জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘যারা নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব গাড়ি ব্যবহার করছেন, তারা যেমন অপরাধ করছেন, আবার যারা তাদের এ ধরনের অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন, তারাও সমান অপরাধে অপরাধী। তাই উভয় পক্ষকেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

এ বিষয়ে একাধিকবার শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দীককে ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি।

পরে এসএমএস দিলে শুধু সাড়া দেন শিক্ষা উপমন্ত্রী। হোয়াটসঅ্যাপে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল লেখেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি জিজ্ঞেস (প্রধান প্রকৌশলীকে) করব। তবে গাড়ির প্রয়োজন হলে ব্যবহার করতে পারে যে কোনো সময়। বিনা প্রয়োজনে কি না সেটা দেখার বিষয়।’

আরও পড়ুন:
অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে অধ্যক্ষ বরখাস্ত
স্বাস্থ্যে অবকাঠামো বাড়লেও সেবা বাড়েনি
বানকোর মুহিতের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা
দুর্নীতির অভিযোগ: প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগ দাবি শিক্ষার্থীদের

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
The shoelace around the principals neck is in front of the OC

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর সময় ডান পাশে কলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীর। ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষক স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরানোর পর তার আশপাশে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বাহিনীর অন্তত ১০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে যেখানে দাঁড় করিয়ে জুতার মালা পরানো হয়, তার তিন-চার হাত দূরেই দৃশ্যত নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীর।

নড়াইলের সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টের জের ধরে ব্যাপক সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটে। পুলিশের সামনে এমন ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে গলায় জুতার মালা দিয়ে অপদস্থ করার ঘটনায় কারও দায়িত্বে গাফিলতি আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরানোর পর তার আশপাশে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বাহিনীর অন্তত ১০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে যেখানে দাঁড় করিয়ে জুতার মালা পরানো হয়, তার তিন-চার হাত দূরেই দৃশ্যত নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর।

ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার সমর্থনে কলেজের এক হিন্দু শিক্ষার্থীর পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন দিনভর নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, সহিংসতা চলে। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস।

এরপর পুলিশ পাহারায় বিকেল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। শিক্ষক স্বপন কুমার হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই

মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, স্বপন কুমার ও অভিযুক্ত ছাত্রসহ তিনজনকে কলেজের ভেতর থেকে বের করে আনার সময় ডান পাশে কলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর।

ভিডিওতে দেখা যায়, কলাপসিবল গেটের বাম পাশের আরেকটি গেট দিয়ে তিনজনকে বের করে আনা হচ্ছে। এ সময় পুলিশি পাহারার মধ্যেই কলেজের ভেতর থেকে এক তরুণ জুতার মালা হাতে বেরিয়ে আসেন। ওই তরুণের কোমরের এক পাশে আইডি কার্ড ঝুলছিল।

স্বপন কুমার ও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে যে তিন যুবক জুতার মালা পরিয়ে দেয়, তাদের একজনের কাছে আইডি কার্ডধারী তরুণটিই ভেতর থেকে আনা মালা ধরিয়ে দেন। মালা পরানোর আগে ওই তিন যুবকের দুজন ওসি শওকত কবীরের সামনে দিয়ে রেলিং টপকে শিক্ষকের সামনে যান। রেলিং টপকানোর সময়ে দুই যুবকের মধ্যে আকাশি রঙের টি শার্ট পরা যুবকের বাহুতে হাত দিতেও দেখা যায় ওসিকে।

এরপর তিন যুবক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ছাত্রকে জুতার মালা পরিয়ে দেন। এ সময়ে ওসিসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়।

শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর সময় পাশেই নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীরের উপস্থিতি ভিডিওতে শনাক্ত করেছেন পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মলয় কুমার কুণ্ডু।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন ‘ওখানে ওসি ছিল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিল, অতিরিক্ত পুলিশ ছিল। ভিডিওতে দেখেছি, বোঝাই যাচ্ছে উনি ওসি। পুলিশ সে সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।’

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই
রেলিং টপকানো আকাশি রঙের টি শার্ট পরা যুবকের বাহুতে হাত দিতেও দেখা যায় ওসিকে

তবে এ ঘটনার সময় অন্যত্র ছিলেন বলে শুরু থেকে দাবি করছিলেন ওসি শওকত কবীর।

বিষয়টি নিয়ে রোববার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা। সেদিন তিনি বলেন, ‘ওই দিন পাবলিক খুব বেশি উত্তেজিত ছিল। তাদের কন্ট্রোলে নেয়া যাচ্ছিল না। আর আমার চোখে জুতার মালার মতো কোনো কিছু পড়েনি। তাকে যখন গাড়িতে তোলা হয়েছে তখন তার গলায় এ ধরনের কিছু ছিল না।’

আরও পড়ুন: পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?

ভিডিওতে তাকে দেখা গেছে, এমন তথ্য জানিয়ে বুধবার এ বিষয়ে ওসির বক্তব্য আবার জানতে চায় নিউজবাংলা। এ সময়ও তিনি দাবি করেন, অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর সময় তিনি আশপাশে ছিলেন না।

মোহাম্মদ শওকত কবীর নিউজবাংলাকে বলেন, ’আমি মেইন গেটের দিকে ছিলাম। ক্রাউড কন্ট্রোল করছিলাম। রুমের ভেতরে ও ওপরে আমাদের অফিসার এবং ফোর্স ছিল। বের করে নিয়ে আসার পরে তিন-চারজন ওরা যে এইটা করবে, বা ওখানে থাকবে এ রকম কিছু ইনটেনশন ছিল না।’

এরপর তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ভিডিও থেকে নেয়া স্ক্রিনশট পাঠানো হলে বক্তব্যে পরিবর্তন আনেন। অবস্থানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে তিনি বলেন, ‘আমি জুতার মালা পরাতে দেখিনি।’

ঘটনার বর্ণনায় শওকত কবীর বলেন, ‘আমাদের জুনিয়র অফিসাররা বেসিক্যালি পেছন সাইটটায় ছিল, ওনাদের নিয়ে আসার সময়। কোনো ইনটেনশন ছিল না। রাহুলকে (অভিযুক্ত ছাত্র) দিলে পরে আমরা এক্সকিউজ করতে পারি, কিন্তু প্রিন্সিপালকে কোনো দোষ ছাড়াই এটা দিছে। একটা ঘটনা ঘটে গেছে।

‘এখানটাতে এত মানুষ, কোনো ক্যাজুয়ালিটি ছাড়া ওনাকে (স্বপন কুমার) বের করে নিয়ে আসাই আমাদের প্রধান টার্গেট ছিল। কেউ প্রেডিক্ট করতে পারেনি, এমনটি ঘটবে।’

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই

নড়াইল জেলা পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়ও শুরুতে দাবি করেছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা তার জানা নেই, সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এ-সংক্রান্ত ভিডিও তার চোখে পড়েনি। তবে পরে অবস্থান পরিবর্তন করেন পুলিশ সুপার।

ওসি পাশে থাকার পরও এমন ঘটনাটি কীভাবে ঘটল জানতে চাইলে বুধবার পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হঠাৎ করে সবকিছু হচকচ লেগে গেছে। আমরা তদন্ত করছি। কারও গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারেও ‘অনিয়ম’

যে ছাত্রের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে কলেজে উত্তেজনা, সেই ছাত্রের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির মামলার এজাহার নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

মামলার বাদী বলছেন, অভিযুক্ত ছাত্র রাহুল দেব রায় ফেসবুকে কী পোস্ট দিয়েছেন তা তিনি দেখেননি। ওসি শওকত কবীরের ‘অনুরোধে’ তিনি মামলার বাদী হয়েছেন, এমনকি এজাহারও লিখে দিয়েছে পুলিশ। তিনি শুধু সই করেছেন। ঘটনার পরদিন ১৯ জুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাটি হলেও ২০ জুন পুলিশ বাদীর বাড়ি গিয়ে এজাহার ‘সংশোধন’ করে আবার তার সই নিয়েছেন।

আরও পড়ুন: শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক পুলিশ

রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী মির্জাপুর হাজিবাড়ী দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার পরের দিন দুপুরের দিকে ওসি সাহেব আমারে ফোন দিছেন যে, মামলার একজন বাদী হতে হবি, একজন বাদী বের করেন। কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করলাম, কেউ যাতি রাজি না।

‘আমি (ওসিকে) বললাম, মাগরিবের পরে আলোচনা করে কিডা যাবে আমি জানাচ্ছি আপনাদের। সে বলল, না, দেরি হয়ে যাবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে। তাহলে একটা কাজ করেন, আপনি নিজেই বাদী হন। আমরা গাড়িতে করে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি, আবার দিয়ে যাব।’

ফারুক হোসেন বলেন, ‘পরে ওসি সাহেবের গাড়িতে করে গেলাম নড়াইল। নড়াইল গেলে ওসি সাহেব সব লিখেটিখে সব কমপ্লিট করার পর আমি বললাম যে, আমার তো আবার মিটিং আছে, একটু তাড়াতাড়ি যাতি হবে।

‘তখন কলো (বলল), ঠিক আছে, কমপ্লেইন নিয়ে আমি এসপির কাছে যাব। ওখানে ডিআইজির সঙ্গে ফোন করে এডা আলোচনা করে আপনার স্বাক্ষর নেব। আপনার একটু দেরি করে যাতি হবে। তখন আমি ওখানে মাগরিবের নামাজ পড়লাম।’

এর পরের ঘটনার বিবরণ দিয়ে ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওসি সাহেব এরপর যাইয়ে এসপির সঙ্গে আলোচনা করে। ওইটা দেখাদেখি করার পর আমার কাছ থেকে একটা স্বাক্ষর নিল কেসে। যা লেখার উনারা লিখেছেন, আমি কিছু লেখিনি। আমি বলিওনি।

‘আমাক পড়ে শোনাল যে, এই ঘটনা। দেখলাম ওখানে যা হইছে, তাই। আমি যতদূর জানি সব সঠিক। সেইভাবে আমি স্বাক্ষর করি আসলাম।’

মামলা হয়ে যাওয়ার পর এজাহারের কপি পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে জানান, পরদিন পুলিশ তার বাসায় এসে জানায় এজাহারে কিছু সংশোধন করা হয়েছে। এরপর সেই ‘সংশোধিত’ কপিতে আগের দিনের তারিখেই ফারুক হোসেনের সই নেয়া হয়।

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ওসির সামনেই
শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারের মূল ও সংশোধিত কপি

এজাহারের প্রথম দিনের এবং পরদিনের দুটি কপিই পেয়েছে নিউজবাংলা। ফারুক হোসেনকে পুলিশ বলেছিল এজাহারের নতুন কপিতে কিছু বানান সংশোধন করা হয়েছে। তবে নিউজবাংলা দেখেছে, দুটি কপির মধ্যে ‘উক্ত সময়ে পুলিশ আইন শৃংখলা রক্ষার্থে ০৬ রাউন্ড গ্যাস গান ফায়ার করে‘- এই বাক্যটির হেরফের রয়েছে। একটি কপিতে বাক্যটি থাকলেও আরেকটিতে নেই।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার প্রশ্ন করলে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

আর পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়ের দাবি, মামলার এজাহার পরিবর্তনের বিষয়টি তার জানা নেই। রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার এজাহার লিখে ফারুক হোসেনের সই নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘জোর করে কাউকে তো বাদী বানানোর কথা নয়। ওই প্রসঙ্গটা আমার জানা নেই, থানায় যখন মামলা হয়েছে ওসি সাহেব জানেন।

‘আমি তো এই ব্যাপারটা জানি না। যদি কেউ মামলা না করতে চায়, যদি কোনো বাদী না পাওয়া যায় তখন তো একভাবে না একভাবে মামলা করতেই হবে। উনি যদি মামলা করতে না যেত, তাহলে কি আমরা মামলা করতে পারতাম? যদিও এটা আমার জানা নেই।’

পুলিশ সুপার অবশ্য অভিযোগ অনুসন্ধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যেহেতু বলেছেন, আমি খোঁজ নেব জিনিসটা কী হয়েছিল। যদি কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’

আরও পড়ুন:
শিক্ষক হত্যা: আলামত জব্দে দেরি, আসামির বয়সও ভুল
শিক্ষক উৎপল হত্যা: তৃতীয় দিনেও সড়কে শিক্ষার্থীরা
‘শিক্ষকের গলায় জুতার মালায় দুঃখিত, দায়িত্বে অবহেলায় ব্যবস্থা’
শিক্ষক নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় শিক্ষক সমিতি
শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা: অভিযুক্তের বাবা গ্রেপ্তার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Shoe garland to the teacher The author of the statement against the student is the police

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ পুলিশের গাড়িতে তোলার আগে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস ও শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়কে জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি (বাঁয়ে) এবং রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারের কপি। ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী মো. ফারুক হোসেন বলছেন, এজাহারে কী আছে সেটি তার জানা নেই। তিনি রাহুলের ফেসবুক পোস্টও দেখেননি। সহিংসতার পরদিন পুলিশ তাকে থানায় ডেকে নিয়ে তাদের লেখা এজাহারে সই করিয়ে নিয়েছে। পরদিন সেটি সংশোধন করে আবার নেয়া হয় সই।  

নড়াইলের সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টের জের ধরে ব্যাপক সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ফেসবুকে পোস্ট দেয়া শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায় এখন কারাগারে আছেন।

তবে মামলার বাদী বলছেন, রাহুল ফেসবুকে কী পোস্ট দিয়েছেন তা তিনি দেখেননি। পুলিশের অনুরোধে তিনি মামলার বাদী হয়েছেন, এমনকি এজাহারও লিখে দিয়েছে পুলিশ। তিনি শুধু সই করেছেন। ঘটনার পরদিন ১৯ জুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাটি হলেও ২০ জুন পুলিশ বাদীর বাড়ি গিয়ে এজাহার ‘সংশোধন’ করে আবার তার সই নিয়েছেন।

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাস ১৮ জুন আকস্মিকভাবে উত্তাল হয়ে ওঠে। একদল শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, আগের দিন একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার সমর্থনে পোস্ট দিয়েছেন।

বিষয়টি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জানান ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আশপাশের এলাকার হাজারও মানুষ ক্যাম্পাসে জড়ো হয়। স্বপন কুমার সাহায্য চান স্থানীয় থানার।

একপর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস। বিক্ষুব্ধরা স্বপন কুমার বিশ্বাসসহ কলেজের আরও দুই হিন্দু শিক্ষকের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে দেশব্যাপী। অলংকরণ: মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা

পুলিশ পাহারায় বিকেল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। শিক্ষক স্বপন কুমার হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পুলিশের সামনে শিক্ষকের এমন অপদস্ত হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

নূপুর শর্মাকে সমর্থন করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী রাহুল দেবের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। তবে কলেজে হামলা ও শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় ৯ দিন পর মামলা করেছে পুলিশ। এই সময়ের মধ্যে পুলিশের দাবি ছিল, স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরানোর ঘটনা তারা ‘দেখেনি’। ভাইরাল ভিডিওটিও তাদের চোখে পড়েনি। এরই মধ্যে স্বপন কুমারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার তোড়জোড় শুরু করে কলেজ পরিচালনা কমিটি।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

বিষয়টি নিয়ে রোববার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

আরও পড়ুন: পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?

শিক্ষক স্বপন কুমারকে নিয়ে নিউজবাংলার প্রতিবেদনটি নজরে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ সোমবার নিউজবাংলাকে জানান, স্বপন কুমারকে তার চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ এমন চেষ্টা করলেও মাউশি তাতে অনুমোদন দেবে না।

স্বপন কুমার ইস্যুতে সমালোচনার মুখে পড়া নড়াইলের প্রশাসনও নড়েচড়ে বসে।

আরও পড়ুন: শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ

কলেজে হামলা ও শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় সোমবার দুপুরে নড়াইল সদর থানায় মামলা করেন পুলিশের উপপরিদর্শক ও মির্জাপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ মোরছালিন। রোববার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় তিনজনকে। বিষয়টি নিউজবাংলাকে মঙ্গলবার নিশ্চিত করেন নড়াইলের পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর।

কলেজে সহিংসতার পরদিন ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্ট দেয়া শিক্ষার্থী রাহুল দেব শর্মার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় রাহুল এখন কারাগারে।

রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার বাদী যা বলছেন

শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী মির্জাপুর হাজীবাড়ী দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলছেন, এজাহারে কী আছে সেটি তার জানা নেই। তিনি রাহুলের ফেসবুক পোস্টও দেখেননি। সহিংসতার পরদিন পুলিশ তাকে থানায় ডেকে নিয়ে তাদের লেখা এজাহারে সই করিয়ে নিয়েছে।

ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার পরের দিন দুপুরের দিকে ওসি সাহেব আমারে ফোন দিছেন যে, মামলার একজন বাদী হতে হবি, একজন বাদী বের করেন। কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করলাম, কেউ যাতি রাজি না।

‘আমি (ওসিকে) বললাম, মাগরিবের পরে আলোচনা করে কিডা যাবে আমি জানাচ্ছি আপনাদের। সে বলল, না, দেরি হয়ে যাবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে। তাহলে একটা কাজ করেন, আপনি নিজেই বাদী হন। আমরা গাড়িতে করে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি, আবার দিয়ে যাব।’

ফারুক হোসেন বলেন, ‘পরে ওসি সাহেবের গাড়িতে করে গেলাম নড়াইল। নড়াইল গেলে ওসি সাহেব সব লিখে-টিখে সব কমপ্লিট করার পর আমি বললাম যে, আমার তো আবার মিটিং আছে, একটু তাড়াতাড়ি যাতি হবে।

‘তখন কলো (বলল), ঠিক আছে, কমপ্লেইন নিয়ে আমি এসপির কাছে যাব। ওখানে ডিআইজির সঙ্গে ফোন করে এডা আলোচনা করে আপনার স্বাক্ষর নেব। আপনার একটু দেরি করে যাতি হবে। তখন আমি ওখানে মাগরিবের নামাজ পড়লাম।’

এর পরের ঘটনার বিবরণ দিয়ে ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওসি সাহেব এরপর যাইয়ে এসপির সঙ্গে আলোচনা করে। ওইটা দেখাদেখি করার পর আমার কাছ থেকে একটা স্বাক্ষর নিল কেসে। যা লেখার উনারা লিখেছেন, আমি কিছু লেখিনি। আমি বলিওনি।

‘আমাক পড়ে শোনাল যে, এই ঘটনা। দেখলাম ওখানে যা হইছে, তাই। আমি যতদূর জানি সব সঠিক। সেইভাবে আমি স্বাক্ষর করি আসলাম।’

মামলা হয়ে যাওয়ার পর এজাহারের কপি পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ফারুক হোসেন নিউজবাংলাকে জানান, পরদিন পুলিশ তার বাসায় এসে জানায় এজাহারে কিছু সংশোধন করা হয়েছে। এরপর সেই ‘সংশোধিত’ কপিতে আগের দিনের তারিখেই ফারুক হোসেনের সই নেয়া হয়।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারের মূল ও সংশোধিত কপি

এজাহারের প্রথম দিনের এবং পরদিনের দুটি কপিই পেয়েছে নিউজবাংলা। ফারুক হোসেনকে পুলিশ বলেছিল এজাহারের নতুন কপিতে কিছু বানান সংশোধন করা হয়েছে। তবে নিউজবাংলা দেখেছে, দুটি কপির মধ্যে ‘উক্ত সময়ে পুলিশ আইন শৃংখলা রক্ষার্থে ০৬ রাউন্ড গ্যাস গান ফায়ার করে‘- এই বাক্যটির হেরফের রয়েছে। একটি কপিতে বাক্যটি থাকলেও আরেকটিতে নেই।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শওকত কবীর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

আর পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়ের দাবি, মামলার এজাহার পরিবর্তনের বিষয়টি তার জানা নেই। রাহুলের বিরুদ্ধে মামলার এজাহার লিখে ফারুক হোসেনের সই নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘জোর করে কাউকে তো বাদী বানানোর কথা নয়। ওই প্রসঙ্গটা আমার জানা নেই, থানায় যখন মামলা হয়েছে ওসি সাহেব জানেন। আমি তো এই ব্যাপারটা জানি না। যদি কেউ মামলা না করতে চায়, যদি কোনো বাদী না পাওয়া যায় তখন তো একভাবে না একভাবে মামলা করতেই হবে। উনি যদি মামলা করতে না যেত, তাহলে কি আমরা মামলা করতে পারতাম? যদিও এটা আমার জানা নেই।’

পুলিশ সুপার অবশ্য অভিযোগ অনুসন্ধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যেহেতু বলেছেন, আমি খোঁজ নেব জিনিসটা কী হয়েছিল। যদি কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’

এ ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. কামরুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাদী মামলার একটা বড় অনুষঙ্গ। মামলা করতে গেলে বাদী লাগবেই। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আমরা সুয়োমোটো মামলা নেই, যেটাতে পুলিশই বাদী হয়।

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার বাদী (ফারুক হোসেন) যেটা বলেছেন, সেটা ওনার ব্যক্তিগত মতামত। মামলার বিষয়টি লোকচক্ষুর আড়ালে হয় না। সাক্ষীসাবুদ নিয়েই এজাহার করা হয়। বাদী এখন বলছেন যে তাকে বাদী বানানো হয়েছে, তিনি কিছু জানেন না। তিনি এটা বলতে পারেন। এটা যদি আমাদের কাছে আসে তাহলে আমরা তদন্তসাপেক্ষে দেখব।’

কোনো ব্যক্তির করা মামলার এজাহার পরে সংশোধন বা পরিবর্তন করার সুযোগ পুলিশের নেই বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। বিষয়টি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ বাদী হয়ে কোনো মামলা করলে পরে পুলিশ চাইলে সেটি পরিবর্তন করতে পারে। তবে কোনো সাধারণ মানুষ বাদী হয়ে এজাহার তৈরির পর মামলা দায়ের হয়ে গেলে, তা আর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এটি পরিবর্তন করা হলে তার আইনগত কোনো ভিত্তিও নেই।’

শিক্ষক হেনস্তার ৯ দিন পর মামলা

মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজে সহিংসতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ঘটনার ৯ দিন পর সোমবার এ-সংক্রান্ত মামলা করেছে পুলিশ।

দণ্ডবিধির ৩৪, ১৪৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩, ৩৪১, ৩৩২, ৩৫৩, ৩৫৫, ৪৩৬, ৪২৭, ৫০০ ধারায় করা এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ১৭০ থেকে ১৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

এরপর রোববার রাতেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে আছেন কলেজের পাশের মির্জাপুর বাজারে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী শাওন খান। লাল গেঞ্জি পরা ৩০ বছর বয়সী শাওনকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরানোর ভিডিওতে চিহ্নিত করা গেছে।

শাওনের মা হোসনেয়ারা বেগম মঙ্গলবার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গতকাল রাতে আমার ছেলেকে দেখা করতে বলে মির্জাপুর ক্যাম্প পুলিশ। দেখা করতে গেলে তাকে আটকায় দিছে।’

হোসনেয়ারা বেগম দাবি করেন, তার ছেলে ঘটনার দিন শিক্ষক বা অভিযুক্ত ছাত্রকে বিক্ষুব্ধ লোকজনের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। এর পরেও ‘বিনা কারণে’ পুলিশ তাকে নিয়ে গেছে। তবে স্বপন কুমারকে জুতা পরানোর ভিডিওতে শাওনকে শনাক্ত করেন হোসনেয়ারা।

এ মামলায় গ্রেপ্তার আরও দুজন হলেন মির্জাপুর মধ্যপাড়া মো. মনিরুল ইসলাম এবং মির্জাপুরের সৈয়দ রিমন আলী।

কী আছে মামলার ধারায়

কলেজে হামলা ও শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় সোমবার দুপুরে নড়াইল সদর থানায় পুলিশের উপপরিদর্শক ও মির্জাপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ মোরছালিনের করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা রয়েছে।

এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যখন কিছু ব্যক্তি মিলে সবার একই অভিপ্রায় পূরণের জন্য কোনো অপরাধমূলক কাজ করেন তখন ওইসব ব্যক্তির প্রত্যেকেই ওই কাজের জন্য এভাবে দায়ী হবেন যেন কাজটি ওই ব্যক্তি এককভাবে করেছেন।’

মামলায় ১৪৩ ধারাও দিয়েছে পুলিশ। এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো বেআইনি সমাবেশের সদস্য হবেন তিনি যেকোনো বর্ণনার সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, যার মেয়াদ ছয় মাস পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

৩২৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি ধারা৩৩৪ এ ব্যবস্থিত ক্ষেত্র ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত দান করলে তিনি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে- যার পরিমাণ এক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

দণ্ডবিধির ৩৪১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কেউ কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাধাদান করলে তিনি বিনাশ্রম কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ এক মাস পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে- যার পরিমাণ পাঁচশ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৩৩২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদান করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করলে যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৩৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদানের উদ্দেশ্যে আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করলে যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে অথবা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৩৫৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘মারাত্মক প্ররোচনা ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে অপমান করার জন্য আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করলে যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে অথবা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৪২৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি অনিষ্ট সাধন করে এবং তার মাধ্যমে ৫০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি লোকসান বা ক্ষতি করলে সে ব্যক্তি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৪৩৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘গৃহ ইত্যাদি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে আগুন বা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করে অনিষ্ট সাধন করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে-দণ্ডিত হবেন, এর সঙ্গে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।’

৪৪৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ করলে তিনি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ তিন মাস পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে যার পরিমাণ পাঁচশ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৪৪৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অনধিকার গৃহপ্রবেশ করলে তিনি যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে যার পরিমাণ এক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

৫০০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি কারও মানহানি করলে তিনি বিনাশ্রম কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

শিক্ষককে জুতার মালা: ছাত্রের বিরুদ্ধে এজাহারের ‘লেখক’ পুলিশ
নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে দেশব্যাপী। অলংকরণ: মামুন হোসাইন/নিউজবাংলা

আগের অবস্থান থেকে সরেছে প্রশাসন

শিক্ষক স্বপন কুমারকে প্রকাশ্যে জুতার মালা পরিয়ে দেয়ার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হলেও পুলিশ সপ্তাহখানেক পরেও দাবি করেছিল, তারা এ সম্পর্কে কিছু জানে না।

নড়াইল জেলা পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় রোববার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অধ্যক্ষকে যখন কলেজের কক্ষ থেকে বের করে আনা হয়, তখন সেখানে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। এ ছাড়া নড়াইল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তখন কেউ তাকে জুতার মালা দিয়েছে কি না, আমরা দেখতে পারি নাই। এটা আমার জানাও নেই।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমি এখনও কোনো ভিডিও দেখি নাই। জুতার মালার ব্যাপারটাও জানি না। এ ঘটনায় আমি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তারা প্রতিবেদন দিলে যে বা যারা দোষী হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তবে পুলিশ সুপার মঙ্গলবার নিউজবাংলাকে বলেন, ঘটনার দিন তিনি বেশ খানিকটা দূরে অবস্থান করছিলেন। এ কারণে স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরিয়ে দেয়ার ঘটনা তার চোখে পড়েনি।

তিনি বলেন, ‘ওইদিন চারিদিক থেকে বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার জনতা ছিল। তাদের নিবৃত্ত করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। ওখানে স্বয়ং ডিসি সাহেব ছিলেন, আমি ছিলাম। আমরা সর্বদা চেষ্টা করেছি, যতটুকু কম বলপ্রয়োগ করে রক্তপাতহীনভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়, সেইভাবে আমরা চেষ্টা করেছি।

‘ডিসি সাহেব, আমরা অনেক বুঝিয়েছি লোকদের। ডিসি সাহেব এবং আমরা চেয়েছিলাম তাদের (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত ছাত্র) দ্রুত গাড়িতে তুলে রেসকিউ করতে। আমরা চেষ্টা করেছি সেইভাবে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে ঠান্ডা করার জন্য, কথা বলার জন্য আমি এবং ডিসি সাহেব মেইন যে রাস্তা… ওই জায়গায় ছিলাম।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘যখন ওখান থেকে (কলেজ) তাদেরকে (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত ছাত্র) নামায়, আমি আর ডিসি সাহেব ছিলাম অন্য জায়গায়। মেইনে যে রাস্তা, যেখানে টার্ন করবে ওই জায়গাতে আমরা। আমাদের মুখটা ছিল উল্টোদিকে, জনগণকে আমরা বুঝাচ্ছিলাম, ওইটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।

‘এদিকে তারা টান দিয়ে নিয়ে যেয়ে গাড়িতে তুলবে সেই সময় হয়তো হঠাৎ করে এই কাজটা হয়তো হয়ে গেছে। এটাতে কিন্তু আমাদের নিজেদের কোনো ইয়ে ছিল না যে এ রকম হতে পারে। হওয়ার পরপর, কিছুক্ষণ পর হয়তো যখন তাদেরকে গাড়িতে তুলেছি হুড়োহুড়ির ভেতরে, তখন তার কিন্তু গলায় এটা দেখি নাই। একটু পরে যখন গাড়িতে তুলেছি হুড়োহুড়ির ভেতরে কেউ হয়তো খুলে ফেলে দিছে। ওই সময় তাদের নিয়ে মুভ করানোর সময় হয়তো কাজটা হয়ে গেছে।’

আরও পড়ুন:
শিক্ষককে জুতার মালা: ঘুম ভাঙল প্রশাসনের, হারাচ্ছেন না পদ
শিক্ষককে হত্যা: দুই দিনেও ধরা পড়েনি অভিযুক্ত ছাত্র
শিক্ষকের গলায় জুতার মালা: প্রতিবাদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে
পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?
শিক্ষক নিয়োগ: চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কাজ শুরু

মন্তব্য

বাংলাদেশ
That is why the Padma Bridge was opened

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের বোল্টের নাট টাইট দিয়ে আঠা লাগানোর কাজ চলছে। ছবি: সংগৃহীত
পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভায়াডাক্ট অংশে পদ্মা সেতুর রেলিংটি বানানো হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে। এসব ক্ষেত্রে বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট করার সময়, সেখানে এক ধরনের গ্লু বা আঠা ব্যবহার করতে হয়। তবে সেতু উদ্বোধনের আগে গ্লু দিয়ে সব নাট আটকানো সম্ভব হয়নি।’

পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেতুটির রেলিংয়ের নাট খুলে টিকটক বানানোর ঘটনা আলোড়ন তুলেছে গোটা দেশে। এরপরই নড়েচড়ে বসেছে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা, চলছে নাট টাইট দেয়ার কাজ।

সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েকটি নাট খোলার ঘটনাটি ঘটে পদ্মা সেতুর জাজিরাপ্রান্তের ভায়াডাক্ট অংশে। সময় স্বল্পতায় সেতুর রেলিংয়ের সব নাট পরিকল্পনা অনুযায়ী শক্তভাবে এঁটে দেয়া যায়নি, সেতু উদ্বোধনের পর সেই কাজটি এখন চলমান।

রোববার সকাল পৌনে ৯টার দিকে সেতুতে নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেছে। রেঞ্জ দিয়ে নাট টাইট দিচ্ছিলেন তারা। সেই সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের আঠা।

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট
পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের বোল্টের নাট টাইট দিয়ে আঠা লাগানোর কাজ চলছে। ছবি: সংগৃহীত

মেরামত কাজে জড়িত শ্রমিকরা জানান, সেতুতে রেলিং স্থাপনে বোল্টের ওপর প্রথমে একটি ওয়াসার বসানো হয়। তারপর বোল্টের নাটটি ঘুরিয়ে আটকে দেয়া হয়। এই নাট যাতে সহজে খোলা না যায় সেজন্য বোল্টের মধ্যে নাটটি কিছুদূর ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের গ্লু (আঠা)।

টিকটকারদের ওপর কর্মকাণ্ডে সেতুর নির্মাণ শ্রমিকদেরও প্রচণ্ড বিরক্ত দেখা গেছে। বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভিকে তাদের একজন বলেন, ‘এই সাইড থেকে দুইটা ফেলাইছে, ওই সাইড থেকে দু্ইটা ফেলাইছে, এরম করে বহু নাট ফেলাই দিছে। এখন নতুন করে লাগাইতে হইতাছে। বাঙালিরা টিকটক করছে, আর মনে করেন নাট ফেলাই দিছে।’

আরও পড়ুন: পদ্মা সেতুর নাট খোলায় বাইজীদের সঙ্গী কায়সার

এই শ্রমিক বলেন, ‘এখন পদ্মা সেতুর নাট নিয়ে টিকটক করা শুরু করছে। তারে (গ্রেপ্তার টিকটকার বাইজীদ) উচিত শিক্ষা দেয়া উচিত, যে এই ক্ষতি করছে।’

কেন খোলা গেল নাট?

ভায়াডাক্ট অংশে পদ্মা সেতুর রেলিংটি বানানো হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে। এসব ক্ষেত্রে বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট করার সময়, সেখানে এক ধরনের গ্লু বা আঠা ব্যবহার করতে হয়। তবে সেতু উদ্বোধনের আগে গ্লু দিয়ে সব নাট আটকানো সম্ভব হয়নি বলে জানান পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই সেতুর রেলিংয়ে লোহা নয়, ব্যবহার করা হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল। ফলে রেলিংয়ের বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট দেয়ার সময় বিশেষ এক ধরনের গ্লু (আঠা) দিতে হয়। তাতে নাটটি শক্ত করে আটকে যায়। কিন্তু এখনও গ্লু দেয়া হয়নি।’

পদ্মা সেতুতে রেলিংয়ের নাট টাইট দেয়ার সময় শ্রমিকদের ‘লকটাইট ২৬৩’ নামের একটি থ্রেডলকার ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

এই সরঞ্জামটি সম্পর্কে ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বোল্টের সঙ্গে নাট টাইট দেয়ার সময় এটি ব্যবহার করলে সংযোগটি শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। কোনো আঘাত বা কম্পন তৈরি হলেও নাটটি আর ঢিলে হয় না। উচ্চতাপে কিংবা তেল প্রয়োগেও সংযোগকে দুর্বল করা যায় না।

বোল্ট, নাট এগুলো ঠিকঠাক ও মেরামত করাকে সেতু রক্ষণাবেক্ষণের চলমান প্রক্রিয়া বলেও মন্তব্য করেন দেওয়ার আব্দুল কাদের।

তিনি বলেন, ‘সেতুর ওপর আমাদের আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সেতুতে যান চলাচলের মাঝেই সেই কাজগুলো চলতে থাকবে।’

যে কারণে খোলা গেল পদ্মা সেতুর নাট
রোববার পদ্মা সেতুতে উঠে রেলিংয়ের নাট খুলে টিকটক ভিডিও বানান মো. বাইজীদ। ছবি: সংগৃহীত

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে ভায়াডাক্ট অংশের কাজ শেষ করতে সময় স্বল্পতা ছিল বলে যে দাবি শ্রমিকরা করেছেন তা স্বীকার করেন সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী।

দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৬ জুন পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট অংশের রেলিংয়ের নাট-বোল্টের প্রথম চালান আসে। তারপর শুরু হয় এগুলোর লাগানোর কাজ। দীর্ঘ সেতুতে ২৩ জুন পর্যন্ত সেগুলো সেট করার কাজ পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে ২৪ তারিখে নিরাপত্তাজনিত কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি।’

আরও পড়ুন: পদ্মা সেতুতে নাট খোলা বাইজীদ পটুয়াখালীর, করতেন ছাত্রদল

তবে এরপরেও পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের নাট হাত দিয়ে খোলা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘নাট খুলে যে ভিডিও ছাড়লো সে প্রথমে রেঞ্জ দিয়ে নাটের প্যাঁচ হালকা করে পরে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে খুলেছে।’

সেতুর রেলিংয়ের নাট খুলে টিকটক ভিডিও বানানো বাইজীদের গাড়ি থেকে রেঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান দেওয়ান মো. আবদুল কাদের।

চিন্তিত নন বিশেষজ্ঞরা

নাট খুলে ফেলার ঘটনায় বিচলিত নন সেতুটি নির্মাণে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অনেক সময় থাকে না, লোহা দিয়ে আটকে রাখা, সেগুলো। কিন্তু ব্রিজের কোনো কিছু খোলার কোনো সম্ভাবনাই নেই। ব্রিজের কোনো কিছুতে হাত দেয়ার সুযোগই নেই।’

ভিডিওটি দেখেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনও কিছু কিছু টেম্পরারি স্ট্রাকচার আছে। সেগুলো আমরাই রেখেছি। সেগুলো খুলছে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে আমি আর যুক্ত নই।’

সেতুর কোনো ক্ষতি হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, না, না, এটি খুব সামান্য বিষয়।’

মন্তব্য

বাংলাদেশ
How about a shoelace around the teachers neck in front of the police?

পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?

পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে? নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষককে প্রকাশ্যে জুতার মালা পরিয়ে দেয়ার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হলেও পুলিশের দাবি, তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। এমনকি ঘটনার এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখেননি জেলার পুলিশ সুপার। অন্যদিকে, হেনস্তার শিকার শিক্ষককে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

‘৩০ বছর ধরে আমি এই কলেজে শিক্ষকতা করি। ছাত্ররা আমার প্রাণ, স্থানীয়রাও আমাকে ভালোবাসত। তবু আমার সঙ্গে যা ঘটে গেল, এরপর এই মুখ নিয়ে কী করে আমি কলেজে যাব’- বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে নিউজবাংলাকে বলছিলেন নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস।

ফেসবুকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত মুখপাত্র নূপুর শর্মার সমর্থনে কলেজের এক হিন্দু শিক্ষার্থীর পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন দিনভর বিক্ষোভ, সহিংসতা চলে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

এরপর পুলিশ পাহারায় বিকেল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল ব্যক্তি। শিক্ষক স্বপন কুমার হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পুলিশের সামনে শিক্ষকের এমন অপদস্ত হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

ঘটনার পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন স্বপন কুমার বিশ্বাস। প্রশাসনের দাবি, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে নিউজবাংলাকে স্বপন কুমার জানিয়েছেন গত এক সপ্তাহে দুই বার ঠিকানা বদল করেছেন তিনি।

ঘটনার ভয়াবহতায় মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন স্বপন কুমার। এরপরেও তিনি জীবিকার প্রয়োজনে ফিরতে চান কলেজে।

ভারাক্রান্ত গলায় নিউজবাংলাকে তিনি বলেছেন, ‘কলেজে গেলে নতুন করে আবার হামলা হয় কি না, সেই শঙ্কায় আছি। তারপরেও কলেজে ফিরতে চাই। কারণ আমার পরিবার আছে, সন্তান আছে, তাদের ভরণ-পোষণের খরচ আমাকে বহন করতে হয়। কলেজের চাকরিই আমার আয়ের উৎস।’

ফেসবুকে ভাইরাল ভিডিওতে শিক্ষক স্বপন কুমারের গলায় জুতার মালা পরানোর সময় আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেলেও তারা এখন দাবি করছে, এমন কোনো ঘটনা তাদের চোখে পড়েনি। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ওই ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি তারা। শিক্ষক হেনস্তা বা কলেজে সহিংসতার ঘটনায় কোনো মামলাও হয়নি।

এরই মধ্যে কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিবর্তনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু। টিংকুর দাবি, আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য কবিরুল হক তাকে দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব করেছেন।

যেভাবে ঘটনার শুরু

ভারতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করে সম্প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার মুখে পড়েন বিজেপি নেতা নূপুর শর্মা। চাপের মুখে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি মামলাও হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় গত ১৭ জুন রাতে ফেসবুকে নূপুরকে প্রশংসা করে একটি পোস্ট দেন। রাহুলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন স্থানীয় মির্জাপুর হাজীবাড়ি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মো. ওমর ফারুক।

ফারুক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরদিন শনিবার সকালে রাহুল কলেজে আসার পর বন্ধুরা পোস্টটি মুছে ফেলতে বললেও সে তা করেনি। এরপর বিষয়টি নিয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের কাছে নালিশ জানায় কয়েকজন মুসলিম ছাত্র।’

বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে জানান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। একপর্যায়ে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফেসবুকে পোস্ট দেয়া ছাত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সকালে কিছু ছাত্র আমাকে ঘটনাটি জানালে আমি তিনজন শিক্ষককে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। তাদের মধ্যে ছিলেন কলেজের পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক শেখ আকিদুল ইসলাম, পরিচালনা পরিষদের আরেক সদস্য ও কৃষি শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক কাজী তাজমুল ইসলাম। বাকি আরেক জন হলেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু।’

স্বপন কুমার বলেন, ‘কলেজের যেকোনো অঘটন ঘটলে আমি সব থেকে আগে এই তিন শিক্ষককে জানাই। প্রতিবারের মতো সেদিনও একইভাবে তাদের জানালাম।

‘স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়ার বিষয় নিয়ে আমি তাদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তবে তারা নীরব ছিলেন। কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

‘এরই মধ্যে কলেজে গুজব ছড়িয়ে পড়ে আমি ওই ছাত্রকে সাপোর্ট করছি। তখন কিছু ছাত্র কলেজে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।’

স্বপন কুমার বলেন, ‘একপর্যায়ে কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে স্থানীয় লোকজন ও পাশের একটি মাদ্রাসার ছাত্ররা এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে। তখন আমি কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেককে ফোন করে কলেজে ডেকেছি। তবে কেউ সময়মতো আসেননি।’

‘এরপর জড়ো হওয়া লোকজনের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। আমার মোটরসাইকেলসহ শিক্ষকদের তিনটি মোটরসাইকেল আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়।’

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, ‘পরে পুলিশ এসে আমাকে বলে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আপনাকে আমাদের হেফাজতে নিতে হবে। তখন আমি পুলিশের কাছে একটি হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট চাই। তবে আমাকে হেলমেট দেয়া হয়নি। একটি বুলেট প্রুফ জ্যাকেট দেয়া হলেও পরে তা পুলিশ খুলে নেয়।’

চূড়ান্ত হেনস্তার বর্ণনা দিয়ে শিক্ষক স্বপন কুমার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ আমাকে কলেজ কক্ষ থেকে বের করে আনে। তখন দুই পাশে শত শত পুলিশ ছিল। এর মধ্যেই স্থানীয়রা আমাকে পুলিশের সামনেই জুতার মালা পরিয়ে দিল।

‘আমাকে পুলিশ ভ্যানের কাছে নেয়ার সময় পিছন থেকে অনেকে আঘাত করেন। আমি মাটিতে পড়ে যাওয়ায় পায়ের কিছু জায়গায় কেটে যায়। তখন অনুভব করি পিছন থেকে কেউ আমার মাথায় আঘাত করছে।’

পুলিশের সামনে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা কীভাবে?
মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস ও অভিযুক্ত ছাত্র রাহুল দেব রায়কে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ

পুলিশকিছু দেখেনি

শিক্ষককে প্রকাশ্যে জুতার মালা পরিয়ে দেয়ার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হলেও পুলিশের দাবি, তারা এ সম্পর্কে কিছু জানে না। এমনকি ঘটনার এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখেননি জেলার পুলিশ সুপার। তার উল্টো অভিযোগ, পরিস্থিতি সামালে পদক্ষেপ নিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ‘দেরি’ করেছেন।

নড়াইল জেলা পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার দিন কলেজ প্রাঙ্গণের পরিস্থিতি খুব বেশি অস্বাভাবিক ছিল। পুলিশ সেখানে চেষ্টা করছিল বিনা রক্তপাতে পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।’

তিনি বলেন, ‘অধ্যক্ষকে যখন কলেজের কক্ষ থেকে বের করে আনা হয়, তখন সেখানে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। এ ছাড়া নড়াইল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তখন কেউ তাকে জুতার মালা দিয়েছে কি না, আমরা দেখতে পারি নাই। এটা আমার জানাও নেই।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমি এখনও কোনো ভিডিও দেখি নাই। জুতার মালার ব্যাপারটাও জানি না। এ ঘটনায় আমি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তারা প্রতিবেদন দিলে যে বা যারা দোষী হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ঘটনার দিনের বর্ণনায় পুলিশ সুপার বলেন, ‘সেদিনের পরিস্থিতি খুবই বিপৎসংকুল ছিল। আমরা কোনো প্রকার গুলি চালাতে চাইনি, তবে ছয় রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়তে হয়েছে।’

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘অধ্যক্ষের উচিত ছিল ওই দিন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া। কলেজ থেকে ওই ছাত্রের (ফেসবুকে পোস্ট দেয়া ছাত্র) বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা বিলম্ব করায় পরিস্থিতি এত খারাপ হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে।

‘স্থানীয়দের প্রচুর অভিযোগ ছিল অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। তবে আমরা তাকে দ্রুত রেসকিউ করতে চেয়েছিলাম।’

ফেসবুকে পোস্ট দেয়া ছাত্রের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে কলেজে সহিংসতা ও শিক্ষককে হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশের কোনো পদক্ষেপ নেই। তারা বলছে, কলেজ বা অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে মামলা না হওয়ার কারণেই বিষয়টিতে কোনো গতি নেই।

পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ এখন চাইলে মামলা দায়ের করতে পারেন। এ ছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইলেও মামলা দায়ের করতে পারে। আমরা বার বার তা বলে আসছি, কিন্তু কেউ এখনও রাজি হয়নি।

‘এ বিষয়ে আরও অধিক তদন্ত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।’

এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন থেকে সেখানে ২১ সদস্যের পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে। এ ছাড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সেখানে নিয়মিত টহল দিচ্ছে। আশা করি এরপর আর পরিস্থিতি খারাপ হবে না।’

পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষক স্বপন কুমারের নিরাপত্তা জোরদারের দাবিও করা হয়েছে। নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অধ্যক্ষের কোনো অপরাধ না থাকায় তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাও দেয়া হচ্ছে।

‘তবে রাহুল নামের ওই ছাত্রের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে সে কারাগারে আছে। কলেজে ও ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা আছে। এখন পরিস্থিতি শান্ত।’

স্বপন কুমারকে জুতার মালা পরানোর ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘ওই দিন পাবলিক খুব বেশি উত্তেজিত ছিল। তাদের কন্ট্রোলে নেয়া যাচ্ছিল না। আর আমার চোখে জুতার মালার মতো কোনো কিছু পড়েনি। তাকে যখন গাড়িতে তোলা হয়েছে তখন তার গলায় এ ধরনের কিছু ছিল না।’

এদিকে পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি করলেও হেনস্তার শিকার শিক্ষক এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন ঠিকানায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

স্বপন কুমার শনিবার নিউজবাংলাকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘শনিবার (১৮ জুন) বিকেলে আমাকে থানায় নেয়া হয়। পরের দিন সন্ধ্যায় জানানো হয়, আমাকে বাড়িতে পাঠানো হবে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোথায় যেতে চাই। তখন আমি আমার কলেজের এক শিক্ষকের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিই। তখন নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সঙ্গে ছিল।

‘২৩ তারিখে তাদের বাড়ি থেকে নড়াইল সদরের একটি গ্রামে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছি। লোকলজ্জা ও হামলার ভয়- দুটিই কাজ করছে। তাই পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

স্বপন কুমারের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে বর্তমান অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য নিউজবাংলা প্রকাশ করছে না।

দায়িত্ব হারানোর মুখে স্বপন কুমার

দেড় বছর ধরে স্বপন কুমার বিশ্বাস মির্জাপুর ইউনাইডেট ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে আছেন। তবে ১৮ জুনের ঘটনার পর তাকে এই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ঘটনার পরদিন ১৯ জুন নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক কলেজে এসে স্থানীয়দের সঙ্গে সভা করেন। সেখানে নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার বিষয়টি আলোচিত হয়।

কলেজের প্রধান সহকারী খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এমপি কবিরুল হক সভা করে দোষীর শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি পরিস্থিতি বিবেচনায় কলেজ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছেন।

‘কলেজ খোলার পর পুনরায় সভা হবে। ওই সভায় হয়তো নতুন কোনো শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হতে পারে।’

কলেজের একজন শিক্ষক নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কলেজের পরিচালনা পরিষদের কমিটি নতুন কাউকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ এলাকার মানুষ স্বপন কুমারকে এ দায়িত্বে দেখতে চাচ্ছে না। কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু হয়তো নতুন দায়িত্ব পাবেন।’

জেলা প্রশাসন ৪ জুলাই পর্যন্ত কলেজ না খুলতে নির্দেশ দিয়েছে।

নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে এমপি ও কলেজ পরিচালনা পরিষদের কয়েকজনের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু।

তবে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে একেবারে না করে দিয়েছি। আমি চাই যিনি দায়িত্বে আছেন তিনিই থাকুন।’

ঘটনার দিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরামর্শের জন্য ডাকার পর কেন নীরব ছিলেন জানতে চাইলে আক্তার হোসেন বলেন, ‘আমি সেদিন নীরব ছিলাম না। আমি চেয়েছিলাম যে দোষীর শাস্তি হোক।’

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানো কাউকে চিনতে পেরেছেন কি না- এমন প্রশ্নে আক্তার হোসেনের দাবি, তিনিও এমন কোনো ঘটনা দেখেননি।

তিনি বলেন, ‘জুতার মালা পরানোর ঘটনাটি আমি নিজে দেখি নাই। ওই সময় সেখানে পুলিশ ছিল। তারা ভালো বলতে পারবে। আমি আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রটেক্ট করতেছিলাম। সে সময় আমার গায়ে বেশ কয়েকটি ইটপাটকেল লেগেছে। আমি দোষীদের শাস্তি চাই।’

কলেজের পক্ষ থেকে মামলা করার দায়িত্ব নিতেও রাজি নন আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘এটা এখন একটা বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসন বিষয়টির তদন্ত করছে। এ ছাড়া কলেজ খুললে আমরা শিক্ষকরা আলোচনা করে দেখব কী করা যায়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক নিউজবাংলাকে বলেন, মাসখানেক আগে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পাঁচজন কর্মচারী নিয়োগের চেষ্টা চালায় কলেজের প্রভাবশালী একটি চক্র। এতে বাধা দেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস। এরপর থেকেই চক্রটির তোপের মুখে আছেন তিনি।

স্বপন কুমারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কলেজটি ঈদুল আজহা পর্যন্ত বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের পর কলেজ রান করতে নতুন করে একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। কে দায়িত্ব পাবেন সে ব্যাপারে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবেন।’

স্বপন কুমারকে দায়িত্ব থেকে সরানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সাময়িক সময়ের জন্য করা হচ্ছে। এটা শাস্তিমূলক কিছু না। আপাতত কলেজ ও এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য এটা করা হচ্ছে।

‘এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাকে কিছুদিনের জন্য ছুটিতে রাখা হতে পারে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ওই দিনের ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জুবায়ের হোসেন চৌধুরীকে। বাকি দুজন হলেন জেলা শিক্ষা অফিসার এস এম ছায়েদুর রহমান ও নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত কবীর।

‘২৩ জুন এ কমিটি গঠনের পর তারা কাজ শুরু করেছে। ৩০ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। তদন্ত প্রতিবেদন থেকে ঘটনায় কারা জড়িত তা জানা যাবে। এর আলোকে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হককে ফোন করলে তিনি দাবি করেন, স্বপন কুমারকে দায়িত্ব থেকে সরানোর তথ্য সঠিক নয়। নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে তিনি আক্তার হোসেন টিংকুকে কোনো প্রস্তাবও দেননি।

কবিরুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক একটা ঘটনা এখানে ক্যানসার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তেজিত জনতা যেন আবারও উত্তেজিত না হয়, সে জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।

‘আমি সেদিনের ঘটনাটির নিন্দা জানাই। ঘটনার দিন আমাকে জানানো হয়েছিল। তখন আমি পার্লামেন্টে ছিলাম। রাতেই রওনা দিয়ে নড়াইলে এসেছি। পরের দিন কলেজে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যা যা করার দরকার করেছি।’

অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোয় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি ভিডিওটি দেখি নাই। আমাকে বলা হয়েছে শুধু ছাত্রকে জুতার মালা পরানো হয়েছে।’

এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার ‘পরামর্শ’ দেন এমপি কবিরুল। তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে যদি আবার নিউজ করেন, তখন বাইরের দেশে মিডিয়াও নিউজ করা শুরু করবে। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।’

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Arrogance has given land to take Padma bridge

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার
পদ্মা সেতুর জন্য বাবুল শেষ পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জমি দিয়েছেন। ২০০৮ সালের ৩ জুলাই জমি অধিগ্রহণের নোটিশ পায় তার পরিবার। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালে ক্ষতিপূরণ বাবদ তারা পান ২১ লাখ ৬ হাজার ৪১৫ টাকা।

আলোয় উদ্ভাসিত রাতের পদ্মা সেতু। প্রতিবিম্ব পদ্মার বুকে তৈরি করেছে অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। নিজ ঘর ছেড়ে মৃদু পায়ে নদীর তীরে এসে দাঁড়ান ৪২ বছর বয়সী বাবুল হাওলাদার। দুই চোখ বেয়ে নামছে অশ্রুধারা।

বাংলাদেশের অহংকার হয়ে প্রমত্তা পদ্মাকে পরাস্ত করে দুই প্রান্তের সংযোগ ঘটিয়েছে যে সেতু, তার নাড়ির টান বাবুল হাওলাদারের। আরও অনেকের মতো তার পৈতৃক জমি এই সেতুর জন্য করা হয়েছে অধিগ্রহণ। ফলে পদ্মা সেতু কেবল একটি স্টিল-কংক্রিটের কাঠামো নয়, বাবুলের কাছে এই সেতু যেন আপন সন্তানতুল্য।

জাজিরা প্রান্তের ১০১ নম্বর নাওডোবা মৌজার ১০৪৯ নম্বর খতিয়ানের ৪৩৪৯ নম্বর দাগে পদ্মা সেতুর টোলপ্লাজার আগে ভায়াডাক্টের সর্বশেষ পিলারের জায়গায় ছিল বাবুল হাওলাদারের বসতি। ৯ দশমিক ৮১ একর জমিতে বসতবাড়ির পাশাপাশি ছিল কৃষিজমি।

সেই জমিতে কৃষিকাজ করত বাবুলের পরিবার। পাশাপাশি ঢাকার শ্যামবাজারে হকারের কাজ করতেন বাবুল। ২০০৬ সালের শেষ দিকের কথা। বাবা লাল মিয়া হাওলাদার মোবাইল ফোনে বাবুলকে জানান তাদের জমি থেকে পাঁচ একর জায়গা পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছাড়ার শঙ্কায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে বাবুলের।

তবে নিজেকে সামলে নেন দিন কয়েকের মধ্যেই, বুঝতে পারেন তার মতো আরও অনেকের ত্যাগের মধ্য দিয়েই দক্ষিণের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের দ্বার উন্মোচিত হবে।

পদ্মা সেতুর জন্য বাবুল শেষ পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জমি দিয়েছেন। ২০০৮ সালের ৩ জুলাই জমি অধিগ্রহণের নোটিশ পায় তার পরিবার। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালে ক্ষতিপূরণ বাবদ তারা পান ২১ লাখ ৬ হাজার ৪১৫ টাকা।

তারপর কেটে গেছে প্রায় ১১ বছর। বাবুলের চোখের সামনে ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেয়েছে বিশ্বকে অবাক করে দেয়া বাংলাদেশের গর্বের গল্প।

রাতের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে আলো ঝলমলে পদ্মা সেতুর দিকে তাকিয়ে সেই সব দিনের স্মৃতিতাড়িত হন বাবুল।

নিউজবাংলাকে শোনান, প্রথম কয়েক দিনের টানাপড়েন আর এখনকার গর্ব-আনন্দের নানা কথা। পদ্মা সেতু নিয়ে প্রথম দিককার ষড়যন্ত্রে বাবুল হাওলাদারও ভেঙে পড়েছিলেন। তবে কি তার মতো আরও অনেকের ত্যাগ আর দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন বিফলে যাবে?

বাবুল বলেন, ‘জমি দেয়ার পর জানতে পারলাম সেতু নিয়া ষড়যন্ত্র হইতাছে। বিদেশিরা নাকি টাকা দিব না। তহন ভাবছিলাম পদ্মা সেতু মনে অয় অইব না। কিন্তু আইজ এই সেতু এভাবে দেইখা খুবই আনন্দ লাগতাছে।’

বাবুলের মতোই এমন অসংখ্য গল্পের নায়ক পদ্মাপারের খেটে খাওয়া অসংখ্য মানুষ। পৈতৃক জমি অধিগ্রহণের পর তাদের অনেকের আশ্রয় হয়েছে পুনর্বাসন কেন্দ্রে। নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রের মো. আজাহারের বয়স ৬৫ বছর। সেতুর কারণে জমি হারানোর কষ্ট ভুলে গেছেন অনেক আগেই।

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০০৭ সালে প্রথম যখন আমাগো জমি অধিগ্রহণ করল, তখন খুবই খারাপ লাগতেছিল। পরে যখন টাকা-পয়সা দিল আর থাকার জন্য একটা প্লট দিল, তখন থেকে মন ভালো হয়ে গেছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হইতাছে, দেশের অনেক উন্নতি হইব। আমাগো সব কষ্ট দূর হইয়া গেছে।’

পদ্মা সেতুর কারণে জমি হারানোদের সবাইকে পুনর্বাসন করেছে সরকার। তাদের সবাই আছেন আগের চেয়ে সচ্ছল জীবনে।

পুনর্বাসন কেন্দ্রের ৩৮ বছর বয়সী মাকসুদা বেগম বলেন, ‘দ্যাশের একটা বড় কাজের লিগ্যা জমি ছাইড়া দিছি। সরকার আমাগো জমির লিগ্যা টাহাও দিছে। আবার থাকোইন্যা ব্যবস্থাও কইরা দিছে। ঢাহা (ঢাকা) শহরের মতো পানি টিপ দিলেই পড়তে থাকে। কারেন আছে। হাসপাতালে গেলে ওষুদ-বড়ি দেয়। এহানের স্কুলে পোলাপাইনে লেহাপরা করাইতে পারি। এইহানে অনেক ভালো আছি।’

পূর্ব নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা আলেয়া বেগম বলেন, ‘পোলাইনের পড়ালেখার জন্য সুন্দর বিদ্যালয় আছে। যারা কাজ শিখতে চায় তাদের জন্য গাড়ি চালানোর ট্রেনিং দিয়া আবার চাকরিও দিয়া দিছে। মেয়েছেলেরা শিলাইয়ের (টেইলারিং) কাজ শিখছে। অহন তারা জামাকাপড় বানাইয়া টাকা কামাই করতে পারে।’

পদ্মার বুকে এখন সগর্বে দাঁড়ানো পদ্মা সেতু নির্মাণের শুরুর দিকের পথ ছিল ভয়ংকর পিচ্ছিল। আড়াই দশক আগেও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে এই নদীর ওপর সেতু ছিল কষ্টকল্পনা।

পদ্মার ওপর সেতু তৈরির দাবিতে আশির দশকে প্রথম আনুষ্ঠানিক আন্দোলনে নামেন ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের এই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এখন শরীয়তপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে আছেন।

খোকা সিকদার নিউজবাংলাকে বলেন, সে সময়ে আন্দোলনের মূল প্রেরণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি নিজে ডেকে নিয়ে আন্দোলনে উৎসাহ দিয়েছেন।

খোকা সিকদার বলেন, এ আন্দোলনের কারণে নানান বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাকে। অনেকে তাকে পাগল বলেও উপহাস করেছেন।

খোকা সিকদারসহ আরও কিছু মানুষের স্বপ্ন আলোর মুখ দেখার সুযোগ পায় আন্দোলন শুরুর এক দশকেরও পর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের প্রথম মেয়াদে ১৯৯৯ সালে শুরু হয় প্রাক-সম্ভাব্যতা জরিপ। এরপর ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়ায় সেতুর ভিত্তি স্থাপন করেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে। শুরু হয় বিদেশি দাতাদের যুক্ত করার কাজ।

মূল সেতু ও নদীশাসন কাজের কারিগরি মূল্যায়ন ও সুপারভিশন কনসালট্যান্সির প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠন হয় মূল্যায়ন কমিটি।

পদ্মার ওপর সেতু নিয়ে গোটা জাতি যখন স্বপ্নে বিহ্বল, ঠিক তখন আকস্মিকভাবে প্রকল্পে দুর্নীতিচেষ্টার অভিযোগ তুলে অর্থায়ন থেকে সরে যায় বিশ্বব্যাংক। অন্য বিদেশি দাতারাও একই পথ অনুসরণ করে। অনিশ্চয়তায় পড়ে পুরো প্রকল্প।

তবে থেমে যায়নি বাংলাদেশ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনমনীয় দৃঢ়তায় নিজস্ব অর্থায়নেই শুরু হয় সেতু নির্মাণের কাজ। কঠিন সেই সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা নিউজবাংলাকে বলছিলেন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি শুরু থেকে এই প্রকল্পে ছিলাম না। এখানে এসেছি ২০১১ সালের নভেম্বরে। বিশ্বব্যাংক চলে যাওয়ার কারণে ক্রাইসিস তৈরি হলো। তখন আমাদের সে সময়ের সচিব, প্রকল্প পরিচালক, এমনকি মন্ত্রীও চলে গেছেন। ওই সময়ে আমি এলাম আর একজন নতুন মন্ত্রী ও নতুন সচিবও এলেন দায়িত্বে। ততদিনে ডিজাইন শেষ হয়েছে, টেন্ডার শেষ হুয়েছে, প্রি-কোয়ালিফিকেশনও শেষ হয়েছে। সরকার বলল, যেখানে থেকে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে আমরা শুরু করব।

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

‘আমরা কিছু ফাউন্ডেশন পেয়েছি, একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছি এটা বলা ঠিক হবে না। ভুল হবে। নির্মাণকাজের শুরুটা আমাদের সময়ের। তার মানে ফুল টেন্ডার, টেন্ডার প্রকিউরমেন্ট এবং কনস্ট্রাকশন আমাদের হাতে হয়েছে।

‘বাংলাদেশে সবচেয়ে কঠিন হলো প্রকিউরমেন্ট। প্রকিউরমেন্টে অনেক গন্ডগোল লাগে, মামলা-মোকদ্দমা হয়, এটা-সেটা অনেক কিছু হয়। এই প্রকল্পে ওসব কিছু ওভারকাম করে আমরা নির্মাণকাজ করতে পেরেছি।’

এত বড় প্রকল্প নিজেদের টাকায় আর কখনও করেনি বাংলাদেশ। ফলে বিপুল অর্থের জোগান নিশ্চিত করাই ছিল প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কীভাবে সেই টাকার জোগান এলো- বলছিলেন শফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “ওটা অচলাবস্থা ঠিক আছে, কিন্তু আমরা সব মহল থেকে সহায়তা পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বললেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করব। অনেকের প্রশ্ন ছিল যে নিজস্ব অর্থায়ন কীভাবে সম্ভব? কারণ আমাদের বাজেটের আকার এমন, এটা হলে সব উন্নয়ন থমকে যাবে। একই সঙ্গে এত ফরেন কারেন্সি আমরা কোথায় পাব? ৮০ ভাগ ফরেন কারেন্সি, আড়াই বিলিয়ন ডলার ফরেন কারেন্সি লাগবে। এটা নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় কাজ করেছে।

“তখন আমি মিটিং করেছি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে। আমার ব্যাংকার ছিল অগ্রণী ব্যাংক। তাদের দুই জিএম সাহেবকে নিয়ে আমি গেলাম। তারপর ওনাকে ব্যাখ্যা করলাম যে টাকা তো আমাদের একবারে লাগবে না। চার-পাঁচ বছরে টাকাটা লাগবে।

“শুনতে আড়াই বিলিয়ন ডলার মনে হলেও এটা তো আর একসঙ্গে লাগছে না। বাংলাদেশের তখনকার বাজেটের হয়তো একটা বড় অংশ। তবে পরের বাজেটে কিন্তু এটা কমে আসবে, কারণ বাজেট বড় হচ্ছে। আমার সেতুর বাজেট তো আর সামনে বাড়বে না।

“ওনারা কনভিনসড হলেন। অগ্রণী ব্যাংক বলল, যে টাকাটা লাগবে তারা দিতে পারবে। আমি বললাম, আমার এক মাসে ম্যাক্সিমাম ২০০ মিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। তখন অগ্রণী ব্যাংক বলল, তারা এটা দিতে পারবে। গভর্নর সাহেব খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে ফাইন। তাহলে তো আমার ওপর কোনো চাপই নেই। লাগলে আমি আপনাকে সাহায্য করব।’

“পরে বিষয়টা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা করলাম। তারাও দেখল টাকা তো আর একবারে লাগছে না। আমাদেরও আত্মবিশ্বাস বাড়ল যে আমরা এটার অর্থ দিতে পারব। ফরেন কারেন্সির জন্য কোনো সমস্যা হবে না।”



এভাবেই অনিশ্চয়তার পাহাড় ডিঙিয়ে যাত্রা শুরু স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। কেবল অর্থায়ন নয়, প্রমত্তা পদ্মা বহু দিক থেকে বিশ্বের অনন্য এক নদী। তাই এর ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণে পেরোতে হয়েছে অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ।

শফিকুল বলেন, ‘এখানে পানির স্রোত অনেক বেশি। কারণ দুটি নদীর সম্মিলন ঘটেছে এখানে । আমরা এর আগে পদ্মাতেও ব্রিজ করেছি, যমুনাতেও করেছি। লালন শাহ ব্রিজ করেছি পদ্মায়, আর যমুনায় করেছি বঙ্গবন্ধু সেতু। তবে এখানে কিন্তু ওই দুইটা নদীর কম্বিনেশন।

‘সাধারণ সেন্সই তো বলবে দুই নদীর স্রোত যখন এক জায়গায় আসে, তখন সমস্যা এমনিতেই বেশি হবে। যমুনায় আমরা তলদেশে ৮০ মিটার যাওয়ার পর হার্ড লেয়ার পেয়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এর থেকে মজার আর ভালো কিছুই হতে পারে না। আর এখানে আমরা ১৪০ মিটার গিয়েও হার্ড লেয়ার পাচ্ছি না। সে ক্ষেত্রে বিয়ারিংয়ের জন্য আমার অন্যান্য মেথড খাটাতে হয়েছে। যে কারণে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে গেছে।’

পদ্মার তলদেশের নরম মাটির স্তর অনেক ভুগিয়েছে প্রকৌশলীদের। প্রকল্প সফল করতে নিতে হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। যার অনেক কিছুই বিশ্বে এই প্রথম।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাটির ভিন্নতা থাকার কারণে ২২টি পিয়ারে আমরা বিয়ারিং ক্যাপাসিটি পাইনি। পরে আবার ডিজাইন করা হয়েছে। সেখানে ছয়টির জায়গায় সাতটি পাইল দেয়া হয়েছে। তার পরও আমাদের বিয়ারিং আসছিল না। তখন আমরা একটা নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করেছি। সেটার নাম গ্রাউটিং, যেটা আগে বাংলাদেশে ব্যবহার হয়নি।

‘আবার যে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা আগে বাংলাদেশে ব্যবহার করা হয়নি। মাইক্রোফাইন সিমেন্ট, যেটা অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছে। এই সিমেন্ট আর গ্রাউটিং দিয়ে বিয়ারিং ক্যাপাসিটি বাড়ানো হয়েছে।

‘এর পরও আমরা কনফিডেন্স পাচ্ছিলাম না। শুধু থিওরিটিক্যালি দেখলে আসলে হবে না, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং তো প্র্যাকটিক্যাল বিষয়। আপনারা দেখবেন পাইলিংয়ের লোড টেস্ট হয়। বিল্ডিং বানাতে গেলেও লোড টেস্ট করে। ইঞ্জিনিয়ার প্রথমে ডিজাইন করে দেন পাইলের লেন্থ এত হবে। সেটা হওয়ার পর কিন্তু আবার লোড টেস্ট করে যে থিওরিটিক্যাল ক্যালকুলেশন বাস্তবের সঙ্গে মিলছে কি না। আমরাও তেমন টেস্ট করেছি এবং সেটায় ভালো ফল আসছে। এরপর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াতে আমরা দ্বিতীয়বারের মতো টেস্ট করেছি। এটা বিশ্বে শুধু পদ্মা সেতুতেই হয়েছে। সেটাতেও ভালো ফল আসায় আমরা কনফার্ম হয়েছি, হ্যাঁ এখন এটাতে যেতে পারি।’

পদ্মা সেতুতে ১২০ মিটার পাইল বিশ্বরেকর্ড। একই সঙ্গে গ্রাউটিং টেকনোলজি ও মাইক্রোফাইন সিমেন্ট দেয়াও বিশ্বরেকর্ড। আরও বেশ কিছু অনন্য প্রযুক্তি রয়েছে এই সেতুতে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভূমিকম্প প্রতিরোধের জন্য বিয়ারিং ব্যবহার করেছি ৯০ দশমিক ৬ হাজার কিলো ইউনিট টন, মানে সবচেয়ে বড়। পৃথিবীতে এত বড় বিয়ারিং আর কোনো সেতুতে ব্যবহার হয়নি। নদীশাসনের ক্ষেত্রেও বিশ্বরেকর্ড হয়েছে। এখানে ২৮ মিটার ডেপথে এত বড় দৈর্ঘ্যে নদীশাসন আর কোথাও হয়নি।‘

এই সেতু নির্মাণে বিশেষভাবে অর্ডার দিয়ে বানানো কিছু সরঞ্জামও ব্যবহার করা হয়েছে। এদিক থেকেও বিশেষত্ব রয়েছে পদ্মা সেতুর।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে যে ক্রেনটা ব্যবহার করা হয়েছে সেটা পাঁচ হাজার টন ক্যাপাসিটির। এর নাম তিয়ানি; চাইনিজ একটি ক্রেন। এটি পৃথিবীর অন্যতম বড় ক্রেন। সবচেয়ে বড় ক্রেন কি না জানা নেই। যেহেতু আমাদের স্প্যানের ওজন ৩ হাজার ২০০ টন। তাই এর চেয়ে বেশি ক্যাপাসিটির ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে।

‘এ সেতুর ব্যবহৃত হ্যামারটাও বিশেষ হ্যামার। যমুনাতেও একই কোম্পানির হ্যামার ব্যবহার হয়েছিল, তবে সেটা এত বড় ছিল না। এখানে যেহেতু ডেপথ বেশি, তাই হ্যামারের ক্যাপাসিটিও বেশি লেগেছে।’

বিশেষজ্ঞদের কাছে পদ্মা সেতু শুধু একটি যোগাযোগের বড় মাধ্যম নয়, এটা এক আবেগ ও ভালোবাসারও নাম। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে দেশে রূপান্তরকামী এক চেতনা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. সামছুল হকের কাছে পদ্মা সেতু দেশ রূপান্তরকারী একটি প্রকল্প, এটা দেশের সক্ষমতার প্রতীক।

তিনি বলেন, ‘পদ্মা ব্রিজ না থাকার ফলে আমাদের দেশটা দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল পূর্ব ও পশ্চিমে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ঢাকার এত কাছে থাকার পরও বিনিয়োগ ও উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল। এটা একটা বৈষম্য ছিল। খুলনা ঐতিহাসিকভাবে একটা শিল্পাঞ্চল ছিল। সবচেয়ে পুরোনো মোংলা পোর্ট ছিল। কুয়াকাটা হয়েছে। এদের সংযোগকারী যে অবকাঠামো দরকার ছিল সেটাই পদ্মা সেতু।’

পদ্মা সেতু নিয়েছে জমি, দিয়েছে অহংকার

পদ্মা সেতুর নির্মাণকৌশল ও প্রযুক্তিগত দিক নিয়েও মুগ্ধ ড. সামছুল হক। তিনি বলছেন, সেতুর নির্মাণকৌশল দেখতে গেলে বিজ্ঞানের আশীর্বাদই সামনে ভেসে ওঠে।

ড. সামছুল হক বলেন, ‘আমরা যদি দেশের উল্লেখযোগ্য একটি স্থাপনা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব সেখানে ট্র্যাডিশনাল প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটেছে। লোহা, নাট-বল্টু ব্যবহৃত হয়েছে। ওই সেতুটার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সময়-অর্থ ও জনবলের প্রয়োজন হয়। নাট-বল্টু ও রেবেটিং থাকলে সেগুলো ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। সেতু যত পুরোনো হতে থাকে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খরচও তত বাড়তে থাকে।

এই সেতুর কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অবকাঠামোগত অভূত পরিবর্তন দেখা দেবে বলে আশা করেন ড. সামছুল হক।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা-মাওয়া যে এক্সপ্রেসওয়েটা, সেটা বড় ধরনের যোগাযোগের ও সংযোগের জন্য সহায়ক। যে কারণে অর্থনৈতিক সার্বিক উন্নতির পাশাপাশি যোগাযোগ উন্নয়ন ও পর্যটনের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এ সেতু প্রভাব রাখবে। পর্যটন এমন একটা খাত, যেটার সঙ্গে ৩১টি খাত একই সঙ্গে চাঙা হয়। সেদিক থেকে পদ্মা ব্রিজ আমাদের অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গেছে। যমুনা ব্রিজের যে উন্নয়ন ছিল, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সেটার গতি ছিল ধীর। এখন আমাদের উদ্যোক্তারা অনেক সাহসী। ঢাকা অনেক কাছে। সে কারণে উন্নয়নটা আরও বেশি হবে। এর সঙ্গে যে রেলসেতু হবে, সেটাও যোগাযোগের বহুমাত্রিকতা নিয়ে আসবে। যাত্রী পরিবহন ও পায়রা বন্দর থেকে কনটেইনার বহনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে। সার্বিকভাবে বলা যায়, অনেক দিক থেকেই বলিষ্ঠ উন্নয়ন হবে।’

জাজিরার বাবুল হাওলাদারের মতো কয়েক হাজার পরিবারের ভিটেমাটি অধিগ্রহণ হয়েছে পদ্মা সেতুর জন্য। তবে তা নিয়ে বাবুলের আক্ষেপ নেই, বরং গোটা বাংলাদেশের গৌরবের সামনের সারিতে নিজেকে ভাবছেন তিনি।

রাতের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে আলো ঝলমলে পদ্মা সেতু বাবুলের চোখে বইয়ে দেয় আনন্দ অশ্রু। অতীতের স্মৃতিতাড়িত বাবুল স্বপ্ন দেখেন আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। এই সমৃদ্ধির মেরুদণ্ড হিসেবে পদ্মার ওপর দিয়ে গড়ে উঠেছে সেতু। বাবুল হওলাদারের অহংকারের সেতু এখন গোটা বাংলাদেশের অহংকার।

আরও পড়ুন:
যে গ্রামে অপরাধ কম, কালেভদ্রে পুলিশ  
অ্যামাজন, গুগল ও অ্যাপলে নিউজবাংলা পডকাস্ট
রহস্যে ঘেরা মানুষশূন্য মঙ্গলপুর গ্রাম
ষাটের দশকের সেই হেলিকপ্টার সার্ভিস ও ভুলে যাওয়া দুর্ঘটনা
যে রহস্যের কিনারা নেই

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Another chemical responsible for the Sitakunda depot fire

সীতাকুণ্ডে ডিপোর আগুনে দায়ী ‘অন্য রাসায়নিক’

সীতাকুণ্ডে ডিপোর আগুনে দায়ী ‘অন্য রাসায়নিক’ সীতাকুণ্ডের ডিপোতে আগুন ও বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত ৪৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ছবি: এএফপি
ডিপোতে অন্য রাসায়নিক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্মার্ট গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেখানে অন্যদেরও কনটেইনার ছিল। সেসব কনটেইনারে অনুমতি ছাড়া অন্য পণ্যের আড়ালে কোনো কেমিক্যাল ছিল কি না আমাদের জানা নেই।’

সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুন ও বিস্ফোরণে অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক শ মানুষ।

প্রায় ৮৭ ঘণ্টা জ্বালিয়ে বুধবার দুপুরের দিকে নেভে কনটেইনার ডিপোর আগুন।

আগুন-বিস্ফোরণের মাত্রা কেন এতটা ভয়াবহ হলো সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে নিউজবাংলা।

ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে রপ্তানির উদ্দেশ্যে ডিপোতে কনটেইনারে মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করে ফায়ার সার্ভিস। তারা বলছে, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আগুনের তাপের সংস্পর্শে আসায় ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধান বলছে, ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছাড়াও অন্য কোনো রাসায়নিকের মজুত থাকতে পারে। প্রথম দিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সেই রাসায়নিককে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ওই রাসায়নিকের কারণে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম দলটি অপেক্ষাকৃত ছোট মাত্রার আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়। পরে আগুনের তাপ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কনটেইনার পর্যন্ত পৌঁছালে ধারাবাহিকভাবে ছোট-মাঝারি ও বড় অন্তত ১০টি বিস্ফোরণ ঘটে।

একাধিক ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে আগুন লাগার শুরুর দিকের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে নিউজবাংলা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, শনিবার ডিপোর শেডে একটি কনটেইনার থেকে তুলা আনলোড করা হচ্ছিল। এর বাম দিকে প্রায় ৫০০ ফুট দূরে শেডের মাঝ বরাবর পাশাপাশি ও একটার ওপর আরেকটি এভাবে ৩৭টি কনটেইনার আলাদা করে রাখা ছিল। বেশ কয়েক দিন আগে ডিপোতে আনা এসব কনটেইনারে রপ্তানির উদ্দেশ্যে রাসায়নিক মজুত করা ছিল।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কয়েকজন কাভার্ড ভ্যানচালক পাশের ৩৭টি কনটেইনারের মধ্যে সবচেয়ে নিচে বাম দিক থেকে দ্বিতীয় কনটেইনারের ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখেন। তারা ডিপোর নিরাপত্তাকর্মীদের বিষয়টি জানান।

ডিপোতে আগুন লাগা থেকে বিস্ফোরণ ঘটা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে ছিলেন কাভার্ড ভ্যানচালক আলী আহমেদ। বিস্ফোরণে তিনি নিজেও আহত হন।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম দুপুর ১২টায়। মূলত ঢাকা থেকে রপ্তানির জন্য তৈরি পোশাক নিয়ে গিয়েছিলাম ওই দিন। ডিপোর উত্তর দিকে সন্ধ্যা ৭টা বা সাড়ে ৭টার দিকে একটি কনটেইনার থেকে প্রথম ধোঁয়া উঠতে দেখি।

‘নিরাপত্তারক্ষীদের জানালে তারা বলল, মাঝে মাঝেই এমন হয়। এসব কিছু না। এগুলো এমনিতেই নিভে যায়।’

আলী আহমেদ জানান, তবে আগুন হঠাৎ বাড়তে শুরু করলে সবার টনক নড়ে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিপোর কর্মচারীরা ধোঁয়ার সঙ্গে কনটেইনারের ভেতরে আগুনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে রাত ৯টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইন ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে পুলিশ পাশের কুমিরা ফায়ার স্টেশনে খবর দেয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ডিপোতে পৌঁছায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফায়ার ফাইটাররা কিছুক্ষণ কনটেইনারের আগুনের ধরন যাচাই, কনটেইনারে মজুত পণ্য এবং আশপাশে পানির উৎস খোঁজায় কিছুটা সময় ব্যয় করে রাত ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেন। ততক্ষণে প্রায় ৭০০ ফুট দূরের শেড থেকে কনটেইনারের আগুন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

প্রথমে দুটি হোসপাইপ দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কনটেইনারের ভেতরের আগুনে পানি দিতে শুরু করেন। এর ৫ মিনিটের মধ্যে ছোট ছোট তিনটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুন আরও উসকে ওঠে। ঘটনাস্থল থেকে মোবাইল ফোনে করা লাইভের ভিডিও বিশ্লেষণ করেও এসব ছোট বিস্ফোরণ শনাক্ত করা গেছে।

এ পর্যায়ে আগুন ধীরে ধীরে পাশের ও ওপরের অন্য রাসায়নিকের কনটেইনারেও ছড়াতে শুরু করে।

এরই মধ্যে ক্রেনের সাহায্যে ওপর থেকে কয়েকটি কনটেইনার সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় ডিপো কর্তৃপক্ষ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুটি গাড়ি সামনে এনে সেগুলোর মাধ্যমে আগুনে পানি ছিটাতে শুরু করেন। এর মাঝে আরও কয়েক দফা ছোট ও মাঝারি বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণের আগের দিন রাত থেকে ডিপোতে ছিলেন ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার পুলিশ রেজ্জাক মণ্ডল। তিনিও বিস্ফোরণে আহত হন।

রেজ্জাক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগুন লেগেছিল কেমিক্যালের কনটেইনারে। একটার ওপর আরেকটা কনটেইনার ছিল। সেগুলো সরানোয় আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের সময় পানির মতো কেমিক্যাল আমাদের শরীরে এসে পড়ে। যেখানে যেখানে লেগেছে সেখানেই পুড়ে গেছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। গেটও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আমরা দেয়াল টপকে বের হয়েছি অনেক কষ্টে।’

রাত পৌনে ১১টার দিকে বিকট বিস্ফোরণে পুরো ডিপোতে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। এই বিস্ফোরণেই হতাহতসহ পুরো ডিপো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

পরদিন সকালে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডিপোতে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মজুত ছিল। আর এই রাসায়নিক সম্পর্কে ডিপো কর্তৃপক্ষ ফায়ার সার্ভিসকে অবহিত করেনি। উচ্চ তাপে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন নির্গত হয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিস আগুনের সূত্রপাত ও প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে না আসার বিষয়ে এখনও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

তবে রাসায়নিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উচ্চ তাপ ও আগুনের সংস্পর্শে এসে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের বিস্ফোরকের মতো আচরণ করলেও প্রথম কনটেইনারে আগুনের উৎস ছিল অন্য কোনো রাসায়নিক।

তারা বলছেন, হাইড্রোজনের পার-অক্সাইড (H2O2) বিশুদ্ধ অবস্থায় একটি বর্ণহীন তরল। উচ্চ তাপমাত্রায় এটি আগুন ছড়াতে সহায়ক হলেও নিজে জ্বলতে পারে না। অর্থাৎ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডে আগুন জ্বলবে না। তবে উচ্চ তাপ ও আগুনের সংস্পর্শে এলে এই রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আগুন জ্বালাতে পারে না। অথচ আমরা বিভিন্ন ফুটেজে দেখলাম, কনটেইনারে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তারপর সেটা ব্লাস্ট করেছে।

‘তাহলে প্রথমে কনটেইনারে আগুনটা শুরু হলো কীভাবে, সে প্রশ্ন এসেই যায়। ওই কনটেইনারে আগুন জ্বালানোর জন্য অন্য একটি দাহ্য রাসায়নিকের উপস্থিতি ছিল, যা কি না প্রথমে আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়ে অনেকক্ষণ পুড়িয়েছে। পরে সেটার তাপে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে বিস্ফোরকের ভূমিকায় দেখা গেছে।’

একই ধরনের মত দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেহেতু অন্য কোনো আগুনের সোর্স পাওয়া যায়নি, তাহলে ওই কনটেইনারে নিশ্চিতভাবে একটি আগুন জ্বালানোর কেমিক্যাল থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখানে বড় প্রশ্ন আগুনটা জ্বালালো কে? আমরা যদি দেখতাম- কোনো গার্মেন্টসের কনটেইনারে আগুন লেগে পরে তা কেমিক্যালের কনটেইনারে ছড়িয়েছে, তাহলে এ প্রশ্ন তোলার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

‘যেহেতু হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নিজে আগুন জ্বালাতে পারে না, তাহলে হয়তো ওই কনটেইনারে অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ ছিল। সেটা কোনো কারণে লিক করে কনটেইনারে বা এর বাইরেও ছড়িয়েছে। পরে কেউ ওই কনটেইনারের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো বা অন্য কোনো উপায়ে ছোট একটা স্পার্ক থেকে আগুনের সূত্রপাত হলো। এরপর যা ঘটেছে তার জন্য হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে দোষারোপ করাই যায়।’

ডিপোতে মজুত থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আল রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্স। তাদের নীল রঙের প্রতিটি গ্যালনের গায়ে স্টিকারে লেখা আছে, ৬০ শতাংশ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড- মেডিক্যালে ব্যবহারে প্রযোজ্য নয়, ওজন ৩০ কেজি। সতর্কীকরণে বলা হয়েছে, এই রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এসে আগুন ছড়াতে পারে, উচ্চতাপে বিস্ফোরিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিস্ফোরণ ও আগুনে যেখানে ডিপোর অনেক কনটেইনার ও শেড পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেখানে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের গ্যালনগুলোর বেশির ভাগই পোড়েনি। শুধু বিস্ফোরণে সেগুলো ফেঁটে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বেরিয়ে গেছে। এই রাসায়নিক আগুন জ্বালাতে পারলে গ্যালনগুলোও পুড়ে যেত।

আল রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্স ও বিএম কনটেইনার ডিপো দুটিই স্মার্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।

হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের সঙ্গে ডিপোতে অন্য কোনো রাসায়নিকের কনটেইনার ছিল কি না জানতে চাইলে স্মার্ট গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বুধবার নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, সেখানে রপ্তানির উদ্দেশ্যে শুধু হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কনটেইনারবন্দি অবস্থায় ছিল। প্রতিটি কনটেইনারে ২০ টন করে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মোট ৩৭টি কনটেইনার ছিল। অন্য কোনো রাসায়নিক তাদের কনটেইনারে ছিল না।

তবে ডিপোতে অন্য রাসায়নিক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেখানে অন্যদেরও কনটেইনার ছিল। সেসব কনটেইনারে অনুমতি ছাড়া অন্য পণ্যের আড়ালে কোনো কেমিক্যাল ছিল কি না আমাদের জানা নেই।

‘আমাদের দেশে তো নিয়মের বাইরে অনেক কিছুই হয়। ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছাড়া অন্য কোনো কেমিক্যাল ছিল কি না তা ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখতে তদন্ত কমিটিকে আমরা অনুরোধ করেছি।’

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ‘তদন্তের স্বার্থে’ ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ও তদন্ত কমিটির প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল করিম মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে তিনি জানান, সব কিছু মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে, ডিপোতে অন্য কোনো রাসায়নিক থাকলে তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

আরও পড়ুন:
সীতাকুণ্ডে আহতদের চোখের সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি
সীতাকুণ্ডে আগুন: দগ্ধদের চোখে ‘অজানা উপসর্গ’
সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণ: ডিপোতে মিলল আরও দুজনের দেহাবশেষ
সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণ অবহেলাজনিত হত্যা: বাম জোট
সীতাকুণ্ডে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দাবিতে যশোরে মানববন্ধন

মন্তব্য

বাংলাদেশ
In the investigation report information about the effect of Chinu

তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক এমপি চিনুর প্রভাব খাটানোর তথ্য

তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক এমপি চিনুর প্রভাব খাটানোর তথ্য রাঙ্গামাটির ডিসি বাংলো পার্ক। ফাইল ছবি
রাঙ্গামাটির ডিসি বাংলো পার্ক আরেকজনের নামে বরাদ্দ নিয়ে প্রকারান্তরে এটির দখলদার হয়ে বসেন নাজনীন আনোয়ার নিপুণ। রাঙ্গামাটির সাবেক এমপি ফিরোজা বেগম চিনুর মেয়ে হওয়ার প্রভাব খাটিয়ে পার্কটি ব্যবহারের শর্তও ভঙ্গ করেন তিনি। পুলিশের বিশেষ শাখা ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে এর প্রমাণ মেলে।

রাঙ্গামাটির ডিসি বাংলো পার্ক অবৈধভাবে দখল করে রাখার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। দুই বছরের জন্য অন্য একজনের নামে পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত সময়ের পরও তা দখলে রেখেছিলেন নাজনীন আনোয়ার নিপুণ। তিনি রাঙ্গামাটির সাবেক সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনুর মেয়ে।

২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে মোহাম্মদ হোসেন নামে একজনকে বার্ষিক ৩৬ হাজার টাকা ভাড়া চুক্তিতে পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ১৩টি শর্তে দুই বছরের জন্য এই অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন।

আরেকজনের নামে বরাদ্দ নিয়ে প্রকারান্তরে পার্কটির দখলদার হয়ে বসেন নাজনীন আনোয়ার নিপুণ। নাজনীন ও তার সঙ্গীরা পার্কটি ব্যবহারে প্রায় সব শর্ত ভঙ্গ করেন। পুলিশের বিশেষ শাখা ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে এর প্রমাণ মেলে।

প্রতিবেদন দুটির কপি নিউজবাংলার হাতে এসেছে। তাতে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ৯ আগস্ট রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক বরাবর তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেন একই জেলার সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বোরহান উদ্দিন মিঠু।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, মাদকমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং পার্কটি সাধারণ জনগণের ব্যবহার উপযোগী করে উন্মুক্ত রাখার নিমিত্ত অবৈধ পাইরেটস দোকানটি অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’

এর প্রায় এক মাস পর ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ডিআইজি (রাজনৈতিক) বরাবর একটি প্রতিবেদন জমা দেন রাঙ্গামাটি জেলার বিশেষ শাখার পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবীর।

তাতে বলা হয়, ‘সার্বিক বিবেচনায় বলা চলে যে, পার্কটি আবাসিক এলাকায় ও জেলা প্রশাসকের বাংলোর সৌন্দর্য্যের অংশ হওয়ায় রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার কোনোভাবে সমীচীন হবে না।’

জেলা প্রশাসন ও এসবির পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার প্রায় তিন মাস পর ৩ ডিসেম্বর ডিসি বাংলো পার্কে অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয় স্থানীয় একটি অনলাইন পোর্টালে।

ফজলে এলাহী সম্পাদিত পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডটকম নামের ওই পোর্টালে ‘রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের পাইরেটস বিড়ম্বনা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনে এই ডিসি বাংলো পার্কের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়।

ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি ফিরোজা বেগম চিনুর কন্যা নাজনীন আনোয়ার নিপুণ নিয়ম লঙ্ঘন করে ডিসি বাংলোর পার্ক এলাকায় ‘পাইরেটস’ নামে একটি রেস্তোরাঁ গড়ে তোলেন। জেলা প্রশাসন পরে উচ্ছেদের নোটিশ দিলে খোদ জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধেই মামলা করেন নিপুণ।

নিপুণের অনিয়মের পেছনে তার মা ফিরোজা বেগম চিনুর প্রভাব রয়েছে বলেও দাবি করা হয় প্রতিবেদনে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাঙ্গামাটির কোতোয়ালি থানায় ১২ ডিসেম্বর সাংবাদিক ফজলে এলাহীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন চিনুর কন্যা নিপুণ। পরদিন ১৩ ডিসেম্বর চিনু আরেকটি অভিযোগ করেন।

পুলিশ অভিযোগ তদন্তের অনুমতি চাইলে ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুমতি দেয় আদালত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই মামলায় সর্বশেষ চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল পরোয়ানা জারি করলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফজলে এলাহীকে গ্রেপ্তার করে রাঙ্গামাটি থানা পুলিশ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছেন রাঙ্গামাটির সাবেক এমপি ফিরোজা বেগম চিনু।

ফজলে এলাহী গ্রেপ্তার হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে ফিরোজা বেগম চিনু নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন- মেয়ের নয়, তার করা মামলাতেই সাংবাদিক এলাহীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ডিসি বাংলো পার্কে আমার মেয়ে লিজ নিয়ে রেস্টুরেন্ট দেয়। তিন বছরের জন্য লিজ ছিল, বিনিয়োগ করেছিল প্রায় ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ডিসি পরিবর্তন হলে রেস্টুরেন্ট নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়। ডিসি অফিসের লোকজনের সঙ্গে রেস্টুরেন্ট কর্মচারীদের বিবাদ হয়।

‘সে সময় এলাহী নিউজ করে যে এই লিজ পেতে আমি আমার প্রভাব খাটিয়েছি। সে আপত্তিকর কথাবার্তা লিখেছে। আমি তখন কোর্টে মামলা করেছি।’

গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় মেয়ের নাম থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের নাম কেন দিয়েছে জানি না, বাদী আমি-ই।’

গ্রেপ্তারের পরদিন বুধবার সাংবাদিক ফজলে এলাহীকে জামিন দিয়েছে আদালত। জেলার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক ফাতেমা বেগম মুক্তা তাকে জামিনের আদেশ দেন।

বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিক ফজলে এলাহী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের করা প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক। জেলা প্রশাসন, এসবির রিপোর্ট এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের সমন্বয়ে প্রতিবেদনটি করা হয়। প্রতিবেদনে কোনো অসত্য তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।’

যা আছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে

২০২০ সালের ৯ আগস্ট রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জেলা প্রশাসক বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

‘ডিসি বাংলো পার্ক গেটের তালা ভেঙে অবৈধভাবে প্রবেশ সম্পর্কিত তদন্ত প্রতিবেদন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে-

‘অদ্য ০৭/০৮/২০২০ তারিখ বনরূপা এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালীন ফোনের মাধ্যমে অবগত হই যে, ডিসি বাংলো পার্কের পেছনের গেটের দুটি তালা ভেঙে কে বা কারা জোরপূর্বক প্রবেশ করে। মোবাইল কোর্ট টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখতে পাই, পার্কের পেছনের গেটের দুটি তালা ভাঙা। অর্থাৎ ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। এ সময় এসআই সাগর বড়ুয়া ও কনস্টেবল জাকারিয়া উপস্থিত ছিলেন।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘পার্কে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ও স্থানীয় লোকজনের বক্তব্য নেয়া হয়। পার্কে পাইরেটস দোকানে অবৈধভাবে অবস্থানকারী মো. ইরফান হুসেন বলেন- গত ০৬/০৭/২০২০ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ ঘটিকায় সাবেক সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনুর মেয়ে নিপুণ ম্যাডাম আমাকে পার্কের পেছনের গেটের দুটি তালা ভেঙে ফেলতে বলেন। আমি আর জয় (পাইরেটস দোকানে অবৈধভাবে অবস্থানকারী আরেকজন) তালা ভেঙে ফেলি। পরে নিপুণ ম্যাডাম প্রবেশ করেন।

‘ডিসি বাংলো পার্ক সংলগ্ন মসজিদের ইমাম মো. রুকনোজ্জামান জানান, পাইরেটস দোকানে প্রতিরাতে বিভিন্ন লোকজনের সমাগম হয়, তারা গভীর রাতে গেট টপকে ভেতরে প্রবেশ করে এবং দোকানে হৈ-হুল্লোড় করতে থাকে। এলাকার কিছু বখাটে ছেলে গভীর রাতে দোকানে আড্ডা জমায় এবং মদ, গাঁজা সেবন করে। গেটে তালা থাকায় বিভিন্ন সময় তা ভাঙার হুমকি দেয়া হয়। এভাবে পরিবেশ নষ্ট করে ফেলছে। স্থানীয় লোকজনও একই কথা বলেছেন।

‘প্রসঙ্গত, ডিসি বাংলো পার্কটি রাঙ্গামাটিবাসী ও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিন দর্শনার্থীদের জন্য একটি বিশ্রামাগার ও শৌচাগার নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে পার্কের কিছু স্থাপনা পরিবর্তনসহ অবৈধভাবে পাইরেটস দোকান নির্মাণ করা হয়। এমনকি সাবেক জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে নির্মিত বিশ্রামাগার উদ্বোধন ফলকটিও ভেঙে ফেলা হয়। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, মাদকমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং পার্কটি সাধারণের ব্যবহার উপযোগী করে উন্মুক্ত রাখার জন্য অবৈধ পাইরেটস দোকানটি অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া পারে।’

যা আছে এসবির প্রতিবেদনে

২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি এসবির পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবীর ডিসি বাংলো পার্ক নিয়ে এসবির ডিআইজি (রাজনৈতিক) বরাবর একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

এসবির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়-

‘অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৮/১২/২০১৭ তারিখে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার সাহিদা আক্তার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে ১৩টি শর্তে রাঙ্গামাটির কোতোয়ালি থানার দেবাশীষ নগরের মো. হোসেনকে বার্ষিক ৩৬ হাজার টাকা ভাড়ায় দুই বছরের জন্য পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়।

পার্কটি মো. হোসেনের নামে অনুমোদন নিয়ে পক্ষান্তরে নাজনীন আনোয়ার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছেন। করোনা মহামারির কারষে ডিসি বাংলো পার্কটি বর্তমানে বন্ধ আছে।

পার্কটি বন্ধ হওয়ার আগে এখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কয়েকটি ঘটনা ঘটে। যেমন-

১. গভীর রাত পর্যন্ত পার্কটি খোলা রাখা হতো। সে কারণে সেখানে মাদক বিক্রি ও সেবনের মতো ঘটনা ঘটে এবং ওঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা সেখানে রাত অবধি ভিড় করত। ১৪/০৮/২০১৯ তারিখ রাতে ১০/১২ জন উচ্ছৃঙ্খল বখাটে যুবক সেখানে আইন-শৃঙ্খলাবহির্ভূত ঘটনা ঘটায়।

২. গভীর রাত পর্যন্ত যুবক ছেলেরা মোটর সাইকেলসহ এখানে অবস্থান করত এবং লেকসংলগ্ন কুঁড়েঘরে মাদক সেবন করে মাতলামি ও হুল্লোড় করতো।

৩. গোপন সূত্রে জানা যায় যে, পার্কের পাইরেটস রেস্টুরেন্টের ভেতরে নারীসহ অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপ সংঘটিত হতো।

৪. অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বরাদ্দের সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও জেলা প্রশাসক পার্কটি ব্যবহারের অনুমতি বিভিন্ন কারণে বাতিল করতে পারছেন না। যেমন- রাজনৈতিক প্রভাব, জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা।

৫. পার্কটি জেলা প্রশাসক ও পর্যটকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু সেটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেয়ায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নষ্টসহ জেলা প্রশাসকের বাংলোর ঐতিহ্য ও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা মোটেও কাম্য নয়।

৬. উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা গভীর রাত পর্যন্ত পার্কে উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করায় আশপাশের বাসিন্দাদের শান্তির ব্যাঘাত ঘটতো।

৭. পার্ক ব্যবহারের মেয়াদ পার হওয়ার পরও ব্যবহারকারীরা প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে অন্যায় ও বেআইনিভাবে পার্কটি দখলে রাখায় উল্লিখিত কার্যকলাপের কারণে প্রশাসনের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। জেলা পুলিশও বিভিন্ন প্রশ্ন ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে।

৮. সার্বিক বিবেচনায় বলা চলে যে, পার্কটি আবাসিক এলাকায় ও জেলা প্রশাসকের বাংলোর সৌন্দর্য্যের অংশ হওয়ায় রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার কোনোভাবে সমীচীন হবে না।

পার্ক এখন কার দখলে?

ডিসি বাংলো পার্কটি বর্তমানে জেলা প্রশাসনের দখলে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পার্কটি নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান। তবে পার্কটি এখন জেলা প্রশাসনের দখলে রয়েছে এবং পার্কটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত আছে।

তবে নাজনীন আনোয়ার নিপুণ বলেন, ‘পার্কটির লিজ নবায়নের জন্য নির্ধারিত সময় পার হওয়ার একদিন আগেই আবেদন করেছিলাম। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা ওই আবেদন জেলা প্রশাসক গ্রহণ করেননি। আবার বাতিল করেও দেননি। সেই জায়গা থেকে পার্কটি এখনো আমাদের রয়েছে।’ নিপুণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা চারজন পার্টনার মিলে এই পার্ক ভাড়ার বিনিময়ে লিজ নেয়ার আবেদন করি। এই চারজনের দুজন চট্টগ্রামের বাসিন্দা এবং আমি ও মোহাম্মদ হোসেন রাঙ্গামাটির। আমিও যেহেতু চট্টগ্রামে থাকি, তাই লিজ নেয়ার সময় আবেদন করা হয়েছিল মোহাম্মদ হোসেনের নামে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক আমাদের দুই বছরের জন্য লিজ দিয়েছিলেন।

‘আমরা কী কী কাজ করবো এর একটা প্রস্তাবনাও দিয়েছিলাম। সেই প্রস্তাবনা অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করি। পার্কের সৌন্দর্য্য আরও বাড়তো, আমাদের সে পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যে জেলা প্রশাসক বদলি হয়ে যান। দায়িত্বে আসেন এ কে এম মামুনুর রশীদ। তিনি কোনোভাবেই আমাদের কাজ করতে দিচ্ছিলেন না। পদে পদে বাধা দিয়েছেন।

‘এদিকে কোভিড চলে আসে। আমরা পার্কের সৌন্দর্য্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেই। জাহাজ আকৃতির একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করি, যা আমাদের প্রস্তাবনায় ছিল। কিন্তু জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ কোনো কাজই করতে দিচ্ছিলেন না। আমাদেরকে ব্যবসা করতেও দিচ্ছিলেন না। কোভিডের পর আমরা খুলতে গেলে বাধা দেয়া হয়। মিথ্যা-বানায়োট মামলা দেয়া হয়।’

নিপুণ আরও বলেন, ‘আমরা এসব বিষয় নিয়ে রাঙামাটিতে সংবাদ সম্মেলন করি। সেই সংবাদ সম্মেলনের কয়েকদিন পরই ফজলে এলাহী ও আরেকজন সাংবাদিক মিলে আমাদের বিরুদ্ধে নিউজ করেন। নিউজে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মানহানিকর শব্দ ও তথ্য ব্যবহার করেন। আমরা তার পরিপ্রেক্ষিতেই আইন ব্যবস্থা নিয়েছি।’

আরও পড়ুন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল চান এলাহী
ফজলে এলাহীর প্রতি যাতে অন্যায় না হয় ‘দেখবেন’ তথ্যমন্ত্রী
এরশাদ আমলে আমিও সাংবাদিক ছিলাম: সাবেক এমপি চিনু

মন্তব্য

p
উপরে