দেশে নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি বুঝতে এখন কারও সশরীরে বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আশপাশে সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অফ বাংলাদেশের (টিসিবি) ভর্তুকি দামে খোলা ট্রাকে পণ্য বিক্রির তৎপরতাই বাজারের প্রকৃত চিত্র সবার কাছে স্পষ্ট করে দেয়।
টিসিবির এমন কার্যক্রম সারা বছর চলে না। বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি হলেই কেবল সক্রিয় হয় এ সংস্থাটি। তখন ছোট্ট পরিসরে তিন-চারটি পণ্য নিয়ে অল্প কয়েক দিনের জন্য মাঠে তাদের তৎপরতা চলে।
তবে বাজারে টিসিবির ভূমিকা সব সময় এত নাজুক ছিল না। একটা সময় বাজার নিয়ন্ত্রণ করত টিসিবিই। ব্যবসাও হতো তাতে। লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট কিছু নিত্যপণ্যের আপৎকালীন মজুত গড়ে তুলে প্রয়োজনের সময় ভোক্তার কাছে তা সরবরাহ করার মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা। সেই কার্যক্রমের আওতায় ভোক্তার তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে প্রচুর পণ্য আমদানি এবং সেগুলো ভোক্তাপর্যায়ে ন্যায্য দামে বিক্রির পাশাপাশি স্থানীয় অনেক ক্ষুদ্র শিল্পের জন্যও সংস্থাটি প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জোগান দিত।
তবে সময়ের পালাবদলে টিসিবির আগের জোরদার ভূমিকায় বিরাট ছেদ পড়েছে। বাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে এটি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
কেন এটা ঘটেছে, জানতে চাইলে দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্টরা জানান, নব্বই দশকে দেশ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করার পর সরকার ব্যবসা করা ছেড়ে দিয়েছে। এতে বাজারে টিসিবির ভূমিকাও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এসেছে। বাজারে সেই জায়গা দখল নিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
অভ্যন্তরীণ ভোক্তার চাহিদাযোগ্য বিভিন্ন ভোগ্য ও ব্যবহার্য্য পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, মূল্য সংযোজন, পরিশোধন এবং বাজারজাতকরণ– সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে তারা।
এর বিপরীতে কম মূলধন ও জনবল, অবকাঠামো দুর্বলতা, তিন-চারটি পণ্য এবং নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা নিয়ে কোনো মতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে টিসিবি।
টিসিবির পরিধি ছোট হয়ে আসায় দেশে ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। এ কারণে মাঝেমধ্যেই বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। পণ্যের মজুত চলে যাচ্ছে বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীদের পকেটে। নানা কারসাজিতে সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন অজুহাতে বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দাম। এভাবে পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি চলতে থাকায় আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের।
এ পরিস্থিতিতে টিসিবির খোলা ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইনে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদেরও দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে।
কেন অস্থির হয় বাজার
দেশে সব নিত্যপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন হয় না। কিছু পণ্যের উৎপাদন হলেও তা দিয়ে চাহিদা মেটে না। ফলে উৎপাদন হয় না কিংবা কম উৎপাদন হয়- এমন সব পণ্য আমদানির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ভোক্তার চাহিদা পূরণ করা হয়। এদিকে আমদানি বাজার সব সময় আবর্তিত হতে থাকে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। কখনও কমে, কখনও বাড়ে। ক্ষেত্রভেদে সকাল-বিকেলেও এই উত্থান-পতন দেখা যায়। এরই প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানিকারক দেশগুলোতে।
দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্য তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ, খেঁজুরসহ বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি করতে হয়। যার আমদানিকারক আবার গুটিকয়েক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। কিছু পণ্যের পরিশোধন কোম্পানির সংখ্যাও নগণ্য। এর বিপরীতে এসব নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে পরিবেশক, পাইকার ও খুচরা বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীর সংখ্যা লাখ লাখ। ফলে কোনো পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি কিংবা দাম বেড়ে গেলে কোন স্তরে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে তা তাৎক্ষণিক জানার উপায় কম।
বাজার অস্থিরতার নেপথ্যে কারা
নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা শুরু হলে কেউ দায় স্বীকার করতে চায় না। তদন্তের আগে সরকারের কাছেও তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য থাকে না। এই সুযোগে চলতে থাকে একে অপরের ওপর দোষ চাপানো।
দেশে বছরের পর বছর নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিরতার পেছনে কখনও আমদানিকারক, কখনও পরিশোধন ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর সংঘবদ্ধ অপতৎপরতা দায়ী বলে চিহ্নিত হয়েছে। কখনও আবার চিহ্নিত হয়েছে পরিবেশক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সরাসরি দায়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বাজার সম্পর্কিত সব কটি গোষ্ঠীর সংঘবদ্ধ কারসাজিও চিহ্নিত হয়েছে।
কারা দায়ী, সরকার তা বুঝতে পারা এবং হস্তক্ষেপের আগেই ভোক্তার পকেট থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয় হলো, সরবরাহ চেইনে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় দায়ীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আবার বিপুল বিনিয়োগের প্রশ্ন জড়িত থাকায় গুটিকয়েক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্যও তৈরি করা যাচ্ছে না। এখানে মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণেও সরকারকে অনেক ক্ষেত্রে আপোষ করতে হচ্ছে।
দায়ী টিসিবির দুর্বল ভূমিকা
বাজারে কখনও সুনির্দিষ্ট কোনো পণ্যের, আবার কখনও একযোগে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। এ ঘাটতির পেছনে বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে কারসাজির ভূমিকাই বেশি থাকে। এতে সংশ্লিষ্ট পণ্যের দামও বেড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
বাজার বিশ্লেষকরা এমন পরিস্থিতিতে টিসিবির প্রয়োজনকে গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছেন। ১৭ কোটি ভোক্তার এই দেশে সংস্থাটির বিদ্যমান কার্যক্রম যথেষ্ট বলে মনে করছেন না তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বিরাট জনগোষ্ঠীর বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে টিসিবির যে সামর্থ্য থাকা প্রয়োজন, সেটি আসলে নেই। সংস্থাটির পণ্য বিক্রি কার্যক্রম চলে শুধু স্বল্প আয়ের মুষ্টিমেয় লোকের জন্য। সেটিও বছরব্যাপী নয়। বিক্রীত পণ্যের সংখ্যাও কম। আবার যা সরবরাহ দেয়া হয়, তাও সীমিত; রাজধানীসহ মাত্র ১২টি অঞ্চলের শুধু শহরকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে।
সারা দেশে বেশির ভাগ এলাকা টিসিবির কাভারেজের বাইরে থেকে যাচ্ছে। আবার টিসিবি থেকে পণ্য কেনার পরও সংশ্লিষ্ট ভোক্তাকে অন্যান্য নিত্যপণ্যের জন্য নিয়মিত বাজারেরই মুখাপেক্ষি হতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন বলেন, ‘এবার রমজানে ব্যতিক্রম ছাড়া বছরব্যাপী টিসিবির কাভারেজ এরিয়া বলতে গেলে খুবই কম। তা সত্ত্বেও বাজার দামের এই ঊর্ধ্বগতিতে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে টিসিবিই এখন ভরসা হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই পণ্য কেনায় মানুষের চাপ যে হারে বাড়ছে, সে অনুযায়ী টিসিবি তো তা সরবরাহ দিতে পারছে না। ভোক্তারা তো শুধু তিন-চারটি পণ্যই কেনেন না, তারা আরও অনেক পণ্য কেনেন।
‘আবার যে পরিমাণ পণ্য দেয়া হয়, তা দিয়ে বেশির ভাগ পরিবারের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। সব মিলিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির ভূমিকা খুবই দুর্বল। সব দিক থেকে টিসিবির সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আমদানি) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান অবশ্য টিসিবির কার্যক্রমের প্রভাব কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে রাজি নন। তিনি বলেন, ‘অংশগ্রহণ কম হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে এখনও টিসিবি কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে। বছরে বিভিন্ন সময় পরিচালিত টিসিবির স্বল্প পরিসরের এই অংশগ্রহণও যদি না থাকত, তাহলে নানামুখী ছাড় দিয়েও বাজার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ত। টিসিবি কাজ করছে বলেই ঊর্ধ্বগতির বাজার পুনরায় স্থিতিশীলতায় ফিরে আসছে। কারসাজি বা সিন্ডিকেট কোনোটাই সুবিধা করতে পারছে না।’
বাজার চাহিদার কতটুকু টিসিবি সরবরাহ করে
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাজার চাহিদা সব সময় এক রকম থাকে না। সারা বছর যে চাহিদা থাকে, রমজানে পণ্যভেদে তার দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়। এবার রমজানে টিসিবি সরবরাহকৃত প্রতিটি পণ্য বাজার চাহিদার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে।’
টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ূন কবির ভূইয়া জানান, একটা সময় পণ্যভেদে বাজারে টিসিবির অংশগ্রহণ মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে টিসিবি বছরজুড়ে পরিচালিত কার্যক্রমে প্রতিটি পণ্যের বাজার চাহিদার ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ দিতে সক্ষম হচ্ছে।’
সরকারের উপলব্ধি
দেরিতে হলেও টিসিবির কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে সরকার। তাই শুধু এক মাসের (রমজান) জন্য হলেও টিসিবির পণ্য বিক্রির পরিধি সারা দেশে বিস্তৃত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ কোটি পরিবারকে এর উপকারভোগীর আওতায় আনা হয়েছে।
বাজারে পণ্যের দামের ধারাবাহিক উত্তাপ থেকে স্বল্প আয়ের মানুষ, দরিদ্র্য ও অতিদরিদ্র্য জনগোষ্ঠীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি নিউজবাংলাকে জানান, ‘ভবিষ্যতে টিসিবিকে আমরা ভেরি স্ট্রং পজিশনে রাখতে চাই। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রী চান টিসিবিকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে, যাতে যখনই প্রয়োজন পড়বে, টিসিবি যেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই রমজানে টিসিবির শক্তির পরীক্ষা হয়েছে। ১ কোটি পরিবারের কাছে মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেয়ার কাজটি সহজ ছিল না। কিন্তু সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও টিসিবি সেটি করে দেখিয়েছে। এর মাধ্যমে টিসিবি যে শক্তি সঞ্চয় করেছে, ভবিষ্যতে প্রতিটি পদক্ষেপে তার সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যাবে। টিসিবি সক্রিয় থাকলে বাজারে অনেক অঘটনও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।’
বর্তমানে বছরব্যাপী বিভিন্ন সময় দেশের ১২টি অঞ্চলে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়ে থাকে, যা নিয়ন্ত্রণ করা হয় ঢাকার কাওয়ানবাজারের প্রধান কার্যালয় থেকে। এর বাইরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর, ময়নসিংহ এবং মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্প অফিস রয়েছে কুমিল্লা, মাদারীপুর, ঝিনাইদহ ও বগুড়ায় রয়েছে।
টিসিবির সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এটির কার্যক্রমকে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী করে ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ে টিসিবির পণ্য বিক্রি সবসময় প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজনগুলো সারা বছর থাকেও না। মাঝে মাঝে টিসিবির প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। তখন সেটার ব্যবস্থা টিসিবিকে করতে হয়। তাই এখন থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে টিসিবিকে পূর্ণ মাত্রায় সহযোগিতা করবে সরকার। এর জন্য যখন যা করার প্রয়োজন পড়বে, তখনই টিসিবির জন্য তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘টিসিবি বাজারে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা অর্জন করলে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব থাকবে না। এর ফলে বাজারে মালামাল থাকার পরেও যারা অধিক মুনাফার আশায় সিন্ডিকেট করে, তাদের সেই সুযোগ বন্ধ হবে।’
টিসিবির যতো প্রতিবন্ধকতা
প্রতিবেশী ভারতে দ্য স্টেট ট্রেডিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (এসটিসি) ও ট্রেডিং করপোরেশন অব পাকিস্তান (টিসিপি) তাদের অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি বছরে হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে। বিপরীতে টিসিবি ধুঁকছে অস্তিত্ব সংকটে।
বিভিন্ন সময় পরিচালিত টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে সাতটি সমস্যায় ভুগছে টিসিবি। এগুলো হলো: প্রয়োজনীয় পণ্য কেনায় মূলধনের সংকট, ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাতে পর্যাপ্ত জনবল ও দাপ্তরিক কার্যালয়ের অভাব, কেনা পণ্য মজুতে অবকাঠামো দুর্বলতা, স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়েও পরিস্থিতি বুঝে তাৎক্ষণিক পণ্য ক্রয়-বিপণনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা না থাকা, টিসিবির কেনাকাটা অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাটমুক্ত না হওয়া, ভর্তুকি বরাদ্দ কম হওয়া, কার্যক্রম পরিচালনায় দুর্নীতি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব সমস্যা সমাধানে বারবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু এর কোনোটিই আশানুরূপ বাস্তবায়ন হয়নি। যে কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবি ক্রমেই গুরুত্ব হারাতে বসেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিসিবির সচিব (যুগ্ম সচিব) মো. মনজুর আলম প্রধান নিউজবাংলাকে জানান, ‘টিসিবিকে শক্তিশালী করতে জনবল, মাঠপর্যায়ের দাপ্তরিক কার্যক্রম, আধুনিক গুদাম নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ ও কেনাকাটায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়াগুলো সব সময় চলমান। তবে একদিনে তো হওয়ার কথা নয়, সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
‘তবে এটা বলতে পারি, সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কারণে ধীরে ধীরে টিসিবি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সংস্থার কার্যক্রমেরও সম্প্রসারণ ঘটছে। চলতি বছর সারা দেশে রাজধানী থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়েও পৌঁছে গেছে টিসিবির কার্যক্রম। ভবিষ্যতে বাজার নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়ন পর্যায়েও টিসিবি সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। সরকার সে লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।’
দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড র' নেশন (Raw Nation) সাফল্যের সঙ্গে পথচলার ১০ বছর পূর্ণ করেছে। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই ব্র্যান্ডটি গত এক দশকে আধুনিক, আরামদায়ক ও রুচিশীল ক্লথিংয়ের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে।
দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর গুলশান-২ এ অবস্থিত র' নেশনের হেড অফিসে কেক কাটার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন র' নেশনের চেয়ারম্যান মারুফা ইসলাম, ম্যানেজিং ডিরেক্টর শাহরিয়ার আহমেদসহ ব্র্যান্ডের বিভিন্ন বিভাগের টিম মেম্বাররা। সকলের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে ব্র্যান্ডটির এক দশকের পথচলা উদ্যাপন করা হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বিশেষ আয়োজনের অংশ হিসেবে র' নেশনের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর লয়্যালটি প্রোগ্রাম হিসেবে প্রিভিলেজ কার্ড (Privilege Card) উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা ভবিষ্যতে কেনাকাটায় বিভিন্ন সুবিধা এবং ব্র্যান্ডের এক্সক্লুসিভ (Exclusive) ক্যাম্পেইনে অগ্রাধিকার পাবেন। এক দশকের এই যাত্রায় গ্রাহকদের আস্থাই ব্র্যান্ডটির সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে সকল স্টোরে বিশেষ ফ্ল্যাট ডিসকাউন্ট এবং কাস্টমার অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যাকটিভিটির (Customer Appreciation Activity) আয়োজন করা হয়েছে, যাতে ক্রেতারা ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও বিশেষভাবে অনুভব করতে পারেন।
শুরু থেকেই মানসম্মত, আরামদায়ক ও আধুনিক ডিজাইনের ক্লথিং তৈরি র' নেশনের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে এই ব্র্যান্ডের পুরুষদের ফ্যাশন লাইন—শার্ট, ক্যাজুয়াল পোশাক ও ডেনিম কালেকশন তরুণ ক্রেতাদের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কাস্টমারদের ব্যাপক সাড়া পেয়ে র' নেশন বেশ কিছু বছর ধরে নারীদের জন্য নিয়ে এসেছে ‘র' নেশন পিংক’, যেখানে নারীদের নানা রকম ওয়েস্টার্ন, এথনিক এবং রেগুলার ওয়্যার যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাকসেসরিজ এবং অ্যাকটিভওয়্যারও যুক্ত করেছে তারা।
এক দশকের এই মাইলফলক প্রসঙ্গে র' নেশনের চেয়ারম্যান মারুফা ইসলাম বলেন, “র' নেশন শুধু একটি ক্লথিং ব্র্যান্ড নয়; এটি গ্রাহকদের রুচি এবং আধুনিক জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত ১০ বছরের অর্জন আমাদের একার নয়, এটি আমাদের গ্রাহক ও টিমের সম্মিলিত ভালোবাসা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন।”
ব্র্যান্ডটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, “আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ছিল মানসম্মত ফ্যাশন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ১০ বছর পূর্তির এই সময়ে আমরা পণ্যের মান, ডিজাইন এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছি।”
দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরবর্তী দশকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে র' নেশনের। ব্র্যান্ডটির নতুন কালেকশন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ আয়োজন এবং অন্যান্য তথ্য জানা যাবে তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (www.rawnation.net) এবং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম পেজ থেকে।
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক বাজারে নাইট্রোজেনভিত্তিক রাসায়নিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়ার দামে ব্যাপক দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের প্রভাব কাটিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার আগেই সারের বাজার নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার বিষয়ক তথ্যদাতা প্রতিষ্ঠান আর্গুসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ইউরিয়া সারের আদর্শ বা বেঞ্চমার্ক মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত এপ্রিলে যখন সরবরাহ সংকট চরমে ছিল, তখন প্রতি টন ইউরিয়া সারের দাম উঠেছিল ৯১৮ ডলারে। সেই দাম এখন নাটকীয়ভাবে কমে ৪৭৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা মূলত যুদ্ধের আগের মূল্যের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত বিশ্বব্যাপী সারের চাহিদা হ্রাস এবং চীন পুনরায় সার রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করায় আন্তর্জাতিক বাজারে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আর্গুসের সার মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান সারাহ মার্লো এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর ইউরিয়ার দাম সবচেয়ে দ্রুত ও বেশি বেড়েছিল। আবার এ নৌপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হওয়ার আগেই এর দামই সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কমে গেছে।” তবে সারের এই আকস্মিক দরপতনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না অনেক বিশেষজ্ঞ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো সতর্ক করে বলেন যে, সারের চাহিদা কমে যাওয়া কৃষি খাতের জন্য ভালো কোনো খবর নয়। অনেক কৃষক চড়া দামের সময় প্রয়োজনীয় সার কিনতে পারেননি এবং খরচ বাঁচাতে জমিতে কম সার ব্যবহার করেছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব আগামী মৌসুমে ফসলের ফলনের ওপর পড়বে এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সারের দাম যখন আকাশচুম্বী ছিল, তখন ফসলের দাম ছিল তুলনামূলক কম। এতে কৃষকদের মুনাফা হ্রাস পাওয়ায় তারা সার কেনা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেন। সার ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান স্টোনেক্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিনভিল জানান, চড়া দামের কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষকরা প্রায় ৫ শতাংশ কম নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করেছেন। শতাংশের হিসাবে এটি কম মনে হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর বিশাল প্রভাব রয়েছে, যা বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে।
ছবি: সংগৃহীত
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতির পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। সোমবার (২২ জুন) ইরান তাদের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করার পর বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারদরে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
বাজারের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ দশমিক ৫৩ ডলার বা ১ দশমিক ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৭৯ দশমিক ০৪ ডলারে নেমে এসেছে। অথচ দিনের শুরুতে যখন আলোচনার অনিশ্চয়তা ছিল, তখন এর দাম ব্যারেলে ৮২ দশমিক ৩০ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর হুমকি এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারিতে তেলের বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হলেও আলোচনার সফল সমাপ্তি সেই আতঙ্ক কাটিয়ে দিয়েছে।
একইভাবে মার্কিন বাজার ডব্লিউটিআই ক্রুড তেলের দামও চুক্তির মেয়াদ শেষে ৭৬ দশমিক ৫৩ ডলারে স্থির হয়েছে। তবে আগস্ট মাসের ভবিষ্যৎ চুক্তির জন্য তেলের দাম ৫৫ সেন্ট কমে প্রতি ব্যারেলে ৭৫ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ছুটির কারণে গত শুক্রবার বাজারের আনুষ্ঠানিক দর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এই প্রথম দফার আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো জানিয়েছে যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা গত রোববার থেকে নিবিড় সংলাপে অংশ নেন। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল গত এপ্রিল থেকে চলে আসা সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অন্তত ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো এবং দুই দেশের সম্পর্ককে পুনরায় স্বাভাবিকীকরণের পথে এগিয়ে নেওয়া। আলোচনার এই ইতিবাচক ফলাফলেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতার আভাস মিলছে।
ছবি: সংগৃহীত
জাপানের বাজারে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের প্রতীক্ষার পর অবশেষে প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম কমেছে, যা সাধারণ ক্রেতা এবং সরকারের জন্য একটি বড় স্বস্তির সংবাদ হয়ে এসেছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত দেশটির সরকারি তথ্যের বরাতে জানানো হয় যে, জরুরি রাষ্ট্রীয় মজুদ থেকে বাজারে চাল সরবরাহ বৃদ্ধিসহ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপের ফলে এই দরপতন সম্ভব হয়েছে। মূলত গত দুই বছর ধরে তীব্র সরবরাহ সংকটের কারণে জাপানে চালের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। খবর জাপান টুডে।
দেশটির সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিলাসবহুল ‘কোশিহিকারি’ জাত ছাড়া অন্যান্য সাধারণ চালের দাম গত বছরের মে মাসের তুলনায় এবার প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর জাপানে এটিই চালের মূল্যে প্রথম কোনো বড় দরপতন। উল্লেখ্য যে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশটিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনরোষের সৃষ্টি করেছিল। চালের উচ্চমূল্য, জীবনযাত্রার মান হ্রাস এবং তৎকালীন সরকারের দুর্নীতির অভিযোগে সৃষ্ট ক্ষোভের জেরে গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন সরকার চালের এই সংকট মোকাবিলা করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি জরুরি তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ চাল উন্মুক্ত বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়, যার ফলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং দাম নিম্নমুখী হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপানে ক্রমবর্ধমান পর্যটকের সংখ্যা এবং স্থানীয় কৃষকদের বয়স বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ভবিষ্যতে আবারও সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আপাতত সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে বাজারে স্বস্তি ফিরলেও দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখাই হবে নতুন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের বিনিময় হার কমে যাওয়ায় নতুন করে রাবারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ওসাকা এক্সচেঞ্জে আগামী নভেম্বর মাসের জন্য প্রতি কেজি রাবারের সরবরাহ চুক্তিমূল্য দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৪০ দশমিক ৬ ইয়েনে দাঁড়িয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের মান বর্তমানে ১৬১ দশমিক ৪৫ ইয়েনে নেমে এসেছে, যা গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়।
মুদ্রার এই দরপতনের প্রভাবে চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে রাবারের মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী থাকায় রাবারের এই মূল্যবৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাধারণত মুদ্রার মান পরিবর্তন সরাসরি কমোডিটি বাজারের মূল্যে প্রভাব ফেলে, যার প্রতিফলন বর্তমানে রাবারের বাজারে দেখা যাচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
দেশীয় টায়ার শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তুলতে মোটরসাইকেল টায়ারে আমদানির বিপরীতে সুরক্ষা প্রদান, কৃষি টায়ারে শুল্ক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ টায়ার-টিউব ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমইএ)। সোমবার (২২ জুন) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা এই দাবিগুলো তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমইএ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে লাইট ট্রাক টায়ারে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং কৃষি টায়ার আমদানিতে ভ্যাট চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, দীর্ঘদিন নীতি-সহায়তার অভাবে ধুঁকতে থাকা এই খাতের জন্য এসব উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক। আগে দেশীয় কৃষি টায়ারে ভ্যাট থাকলেও আমদানিকৃত পণ্যে তা না থাকায় স্থানীয় উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছিলেন; নতুন বাজেটে সেই বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শিল্পের পূর্ণ বিকাশের জন্য আরও শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
বিটিএমইএ নেতারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল টায়ার উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলেও বাজারটি এখনও আমদানিনির্ভর রয়ে গেছে। যদি স্থানীয় মোটরসাইকেল সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দেশীয় টায়ার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয় এবং আমদানিতে যথাযথ শুল্ক বসানো হয়, তবে বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। টায়ার আমদানিকারকদের শঙ্কা নাকচ করে দিয়ে নেতারা বলেন, লাইট ট্রাক টায়ারে সম্পূরক শুল্ক বাড়ালে পরিবহন ব্যয় বাড়বে না; বরং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে প্রতিযোগিতার ফলে বাজারদর স্থিতিশীল থাকবে।
তবে টায়ার উৎপাদনের অপরিহার্য কাঁচামাল যেমন রাবার অ্যাক্সিলারেটর ও স্টিল কর্ডের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তারা জানায়, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই অবিলম্বে এই প্রস্তাব প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইভি খাতে ব্যবহৃত টায়ারের ক্ষেত্রেও দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এবং আমদানিকৃত সুবিধাদি সহজ করার দাবি জানানো হয়েছে।
বিটিএমইএ-এর পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়, দেশীয় টায়ার শিল্পে বর্তমানে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হচ্ছে। যদি সরকার ধারাবাহিক নীতি-সহায়তা প্রদান করে, তবে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই টায়ার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে। এটি দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘সবুজ অর্থনীতি’ বা গ্রিন ইকোনমির পরিধিও দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। প্রথমবারের মতো এই খাতের মোট বাজারমূল্য ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এলএসইজি) প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে সবুজ অর্থনীতিভিত্তিক কোম্পানিগুলোর আয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই খবরটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস।
এলএসইজি-র সংজ্ঞা অনুসারে, যেসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি কিংবা পরিবেশগত সমাধানভিত্তিক কার্যক্রম থেকে আসে, তাদের সবুজ অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশ্বের প্রায় ২১ হাজার কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, এই সবুজ আয়কে যদি একটি পৃথক শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এটি বর্তমান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প খাতে পরিণত হবে। কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গারনট ওয়াগনার মনে করেন, ‘১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের অর্থ হলো বিপুল পরিমাণ মূলধন নবায়নযোগ্য, সবুজ ও লো-কার্বন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এসব খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদে লাভের আশা করছেন।’ এটি কেবল পরিবেশগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বার্তাও বহন করছে।
এলএসইজি-র গ্রিন ইকোনমি বিভাগের প্রধান লিলি দাই জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সাল থেকে সবুজ আয়ের প্রবৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও এই খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করছে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে অস্থিতিশীলতা অনেক দেশকে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবিত করেছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, সবুজ অর্থনীতির কোম্পানিগুলোর মধ্যে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে, যা প্রবৃদ্ধির অন্যতম নির্দেশক। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেটএরা এনার্জি’ কর্তৃক ‘ডোমিনিয়ন এনার্জি’র সম্পদ অধিগ্রহণকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও দেশটি এখনও বিশ্বের বৃহত্তম সবুজ অর্থনীতির বাজার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালে দেশটিতে রেকর্ড ৭৯ দশমিক ৭ গিগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে মেটা, অ্যামাজন, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো, যারা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসারের কারণে ডেটা সেন্টারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, যা কিছু কোম্পানির লক্ষ্যমাত্রায় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে; তবুও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অবস্থান এখনও সুসংহত। বিশ্লেষকদের মতে, সবুজ অর্থনীতির এই ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন প্রবণতার প্রতিফলন এবং আগামী দিনেও এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে।
মন্তব্য