সবার জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর তহবিলে জমাকৃত অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। আর এই কর্তৃপক্ষকে সময়ে সময়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত ১৭ সদস্যের গভর্নিং বোর্ড।
চলতি বছরের মধ্যে সবার জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ প্রণয়ন করেছে সরকার। আইনে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং তা পরিচালনায় সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের একজন নির্বাহী চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে মাসিক পেনশন সংশ্লিষ্ট পেনশনারের কাছে প্রতি মাসে সুনির্দিষ্টি সময়ে পৌঁছানো নিশ্চিত করবে। এর জন্য জাতীয় পেনশন স্কিমকে প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সাপোর্ট দিতে এক বা একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংককে নিজস্ব ব্যাংকার হিসোবে নিয়োগ করা যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় প্রণীত আইনের প্রাথমিক খসড়ায় এসব সুপারিশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
সর্বজনীন পেনশন স্কিম বা এই স্কিমের আওতাধীন কোনো কার্যক্রম, স্কিম অথবা প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কর্মচারী এই আইনের কোনো ধারা অথবা এর অধীনে প্রণীত কোনো বিধি বা প্রবিধানের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে আদালতের মাধ্যমে তার এক বা একাধিক ব্যাংক হিসাব ক্রোক করতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
খসড়ায় কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম মনিটরিং ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে নির্দেশনা প্রদানের লক্ষ্যে একটি গভর্নিং বোর্ড গঠনের কথাও বলা হয়েছে। ১৭ সদস্যের এই গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন অর্থমন্ত্রী। সদস্য সচিব থাকবেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান। বাকিরা বোর্ডে সদস্য হবেন।
গভর্নিং বোর্ডের দায়িত্ব পালনে মনোনীত অপরাপর সদস্য হলেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় সচিব, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সচিব, এফবিসিসিআই সভাপতি, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি এবং উইমেন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আইনের পূর্ণাঙ্গ খসড়াটি প্রাথমিক। এর আরও পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। এজন্য প্রাথমিক খসড়ার ওপর ১২ এপ্রিলের মধ্যে বিভিন্ন মহলের মতামত চাওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যে কেউ দিকনির্দেশনামূলক নিজস্ব মতামত দিতে পারবেন। এরপর পূর্ণাঙ্গ খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।
আইনের খসড়ায় বলা হয়, প্রণীত আইনটি ‘সার্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ আইন-২০২২’ নামে অভিহিত হবে। আইনে পেনশন পদ্ধতি চালু করতে গভর্নিং বোর্ড ও কর্তৃপক্ষ গঠন, ঢাকায় প্রধান কার্যালয়সহ প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের যে কোনো স্থানে শাখা স্থাপন ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা যাবে।
প্রণীত খসড়ায় জাতীয় পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত চাঁদাদাতা বা পেনশনারদের জমাকৃত অর্থের সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
সে অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন স্কিম বা এই স্কিমের আওতাধীন কোনো কার্যক্রম, স্কিম অথবা প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কর্মচারী এই আইনের কোনো ধারা অথবা এর অধীনে প্রণীত কোনো বিধি বা প্রবিধানের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে আদালতের মাধ্যমে তার এক বা একাধিক ব্যাংক হিসাব ক্রোক করতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো, প্রতি বছর পেনশনারদের জমা দেয়া অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগের পর সুদসহ সমুদয় হিসাব জাতীয় বাজেট পেশের আগে সরকারকে জানাতে হবে।
খসড়ায় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় তহবিল ব্যবস্থাপনা কমিটির কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া আইন অনুযায়ী বিধিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
আইন অনুযায়ী গভর্নিং বোর্ডের দায়িত্ব হলো– পেনশন স্কিমে জমাকৃত অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ, কম ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য সিকিউরিটিজ, লাভজনক অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত গাইডলাইন অনুমোদন দেয়া। এছাড়া সময়ে সময়ে কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেবে বোর্ড। এর পাশাপাশি আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রণীত প্রবিধান বা কর্তৃপক্ষের যেকোনো নীতি বা কৌশল অথবা কর্তৃপক্ষ উত্থাপিত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরামর্শ দেবে তারা। এ লক্ষ্যে গভর্নিং বোর্ড প্রতিবছর ন্যূনতম চারটি সভায় বসবে।
আইনের খসড়ায় কর্তৃপক্ষের কাজও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের কাজ হবে পেনশন পদ্ধতি চালুকরণ, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা; চাঁদাদাতার স্বার্থ সংরক্ষণ, জমাকৃত অর্থের সুরক্ষা প্রদান, স্কিমে প্রবেশের যোগ্যতা ও শর্ত নির্ধারণ, অনুমোদন, স্কিম পরিচালনা, তত্ত্বাবধান এবং পেনশন তহবিলে জমার পুঞ্জিভূত অর্থ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা।
জনগণকে পেনশন সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত করতে প্রচারণার উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্বও পড়েছে এই কর্তৃপক্ষের ওপর। এছাড়া চাঁদাদাতার অভিযোগ নিষ্পত্তি ও প্রতিকার প্রদান নিশ্চিতে সরকারের অনুমোদনক্রমে প্রয়োজনীয় প্রবিধান প্রণয়নের দায়িত্বও দেয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
কর্তৃপক্ষের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো, প্রতি বছর পেনশনারদের জমা দেয়া অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগের পর সুদসহ সমুদয় হিসাব জাতীয় বাজেট পেশের আগে সরকারকে জানাতে হবে।
নিয়ম অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন যে কারও জন্য কমপক্ষে ১০ বছর চালিয়ে নেয়া বাধ্যতামূলক। তবে মাঝে কোনো পর্যায়ে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এককালীন টাকা তুলতে চাইলে পেনশন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনসাপেক্ষে জমাকৃত মোট অর্থের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ হিসাবে উত্তোলনের সুযোগ থাকছে।
প্রণীত খসড়ায় সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি কেমন হবে তারও রূপরেখা দেয়া হয়েছে। আইন অনুযাযী, নির্দিষ্ট মেয়াদে সর্বজনীন পেনশন ম্যাচিউর হওয়ার আগেই তহবিলে জমা হওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট চাঁদাদাতা বা পেনশনার সুবিধাভোগীর জন্য তুলে নেয়ার সুযোগ থাকছে।
নিয়ম অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন যে কারও জন্য কমপক্ষে ১০ বছর চালিয়ে নেয়া বাধ্যতামূলক। তবে মাঝে কোনো পর্যায়ে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এককালীন টাকা তুলতে চাইলে পেনশন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনসাপেক্ষে জমাকৃত মোট অর্থের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ হিসাবে উত্তোলনের সুযোগ থাকছে।
পেনশন সুবিধা অব্যাহত রাখতে তুলে নেয়া অর্থ সর্বজনীন ধার্যকৃত ফিসহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। তবে ফিসহ পরিশোধিত অর্থ চাঁদাদাতার নিজ হিসাবেই আবার জমা হবে।
পেনশন সুবিধায় নাম অন্তর্ভুক্তির পর মেয়াদ পূর্তির (কমপক্ষে ১০ বছর) আগে কোনো পেনশনার মারা গেলে তার জমাকৃত অর্থ নমিনিকে মুনাফাসহ ফেরত দেয়া হবে। এর বাইরে যে কোনো পেনশনারই আমৃত্যু পেনশন সুবিধা পাবেন। তবে পেনশনে থাকাকালীন ৭৫ বছরের আগেই কেউ মারা গেলে তার নমিনিও ৭৫ বছর পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পেতে থাকবেন।
মাসিক চাঁদা দিতে বিলম্ব হলে বিলম্ব ফিসহ চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পেনশন সুবিধা চালু রাখতে পারবেন। আর বিলম্ব ফি-ও পেনশনারের হিসাবেই যোগ হবে।
সবার জন্য পেনশন আওয়ামী লীগের গত আমলের চিন্তা। আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২০১৭-১৮ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে তিনি একটি রূপরেখা দিয়েছিলেন। এ জন্য পাইলট প্রকল্পের কথাও বলেছিলেন তিনি।
উল্লেখ্য, সবার জন্য পেনশন আওয়ামী লীগের গত আমলের চিন্তা। আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২০১৭-১৮ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে তিনি একটি রূপরেখা দিয়েছিলেন। এ জন্য পাইলট প্রকল্পের কথাও বলেছিলেন তিনি।
সর্বজনীন পেনশনকে মুহিত তার স্বপ্নের প্রকল্প উল্লেখ করলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কাজ চলেনি।
তবে সরকারের নানা কাজ যে পর্দার আড়ালে হয়েছে, সে বিষয়টি স্পষ্ট হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেদিন এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তন’ বিষয়ে একটি উপস্থাপনা দেয় অর্থ বিভাগ।
এরপর প্রধানমন্ত্রী ষাটোর্ধ্বদের জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রণয়ন এবং কর্তৃপক্ষ স্থাপনের নির্দেশ দেন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার আলোকে বিভিন্ন নির্দেশনার পাশাপাশি জরুরিভিত্তিতে আইন করার উদ্যোগ নিতে অর্থ বিভাগকে নির্দেশ দেন তিনি।
খসড়ায় আরও যা রয়েছে:
#১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী কর্মক্ষম সব নাগরিক সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারবে; জাতীয় পরিচয়পত্রকে ভিত্তি ধরে নাগরিকরা পেনশন হিসাব খুলবেন।
#বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরাও এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।
#সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের আপাতত নতুন জাতীয় পেনশন ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
#প্রাথমিক পর্যায়ে এ পদ্ধতি স্বেচ্ছাধীন থাকলেও পরে তা বাধ্যতামূলক করা হবে।
# ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দিলে মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন হবে।
# প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি আলাদা পেনশন হিসাব থাকবে। ফলে তিনি কর্মক্ষেত্র পাল্টালেও পেনশন হিসাব অপরিবর্তিত থাকবে।
#এ পেনশন পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে কর্মী বা প্রতিষ্ঠানের চাঁদা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে।
#মাসিক সর্বনিম্ন চাঁদার হার নির্ধারিত থাকবে; তবে প্রবাসী কর্মীদের সুবিধার্থে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চাঁদা জমার সুযোগ থাকবে।
#সুবিধাভোগী বছরে ন্যূনতম বার্ষিক জমা নিশ্চিত করবে। অন্যথায় তার হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত হবে এবং পরে বিলম্ব ফিসহ বকেয়া চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে হিসাব সচল করা হবে।
#সুবিধাভোগী আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে চাঁদা হিসেবে বর্ধিত অর্থ (সর্বনিম্ন ধাপের অতিরিক্ত যেকোনো অঙ্ক) জমা করতে পারবেন।
#পেনশনের জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা পূর্তিতে পেনশন তহবিলে পুঞ্জীভূত লভ্যাংশসহ জমার বিপরীতে নির্ধারিত হারে পেনশন প্রদেয় হবে।
#পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হবে এবং মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থ আয়করমুক্ত থাকবে।
# নিম্ন আয় সীমার নিচে থাকা নাগরিকদের ক্ষেত্রে পেনশন স্কিমে মাসিক চাঁদার একটি অংশ সরকার অনুদান হিসেবে দিতে পারে।
#পেনশন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের খরচ বহন করবে সরকার।
ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বিশেষ আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বর্তমান সরকার গঠনের পর এটিই তাঁর প্রথম কোনো বৈদেশিক সফর। আজ রবিবার দুপুর আড়াইটায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন।
সফরসূচি অনুযায়ী, মালয়েশিয়া সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীন ভ্রমণে যাবেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর আমন্ত্রণে তিনি সেখানে অবস্থান করবেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে আগামী শুক্রবার রাতে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশ সফরের প্রাক্কালে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে সফরের খুঁটিনাটি ও লক্ষ্য নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফ করেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
ছবি: সংগৃহীত
দেশের সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ‘প্রাইমারি হেলথ নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার বিশাল এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী চার বছরের মধ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী এবং ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে। রোববার (২১ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ড. হায়দার জানান, নতুন এই ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে দুইজন করে মিডওয়াইফ নিযুক্ত করা হবে। এছাড়া বর্তমানে পরিচালিত ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিককে আধুনিক ‘স্বাস্থ্য হাবে’ রূপান্তর করে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কমিউনিটি ক্লিনিক নামে আলাদা কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। এই পুরো কার্যক্রমের পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথম পর্যায়ে খুলনা, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী ও বগুড়া জেলাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আর্থিক দিক নিয়ে তিনি জানান, আগামী একনেক সভায় ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক’ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ১৫ মিলিয়ন ডলার এডিবি প্রদান করবে এবং অবশিষ্ট ৩০ মিলিয়ন ডলার সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশের সকল নাগরিককে ‘ই-হেলথ কার্ড’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যার প্রাথমিক কার্যক্রমও ওই পাঁচটি জেলা থেকেই শুরু হবে।
সংবাদ সম্মেলনে হামের টিকা কার্যক্রম নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “‘অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির জন্যই হামের টিকা দেওয়া হয়নি। এটা সত্যি এবং পরিষ্কার। এর জন্য আলাদা করে তদন্ত করার প্রয়োজন নেই’।” প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকে আরও গণমুখী ও আধুনিক করতেই সরকার এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফাইল ছবি
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আজ রোববার বিকেলে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া সফর শেষে তিনি আগামীকাল সোমবার চীন সফরে যাবেন। আওয়ামী সরকার ক্ষমতাচ্যুতের পর নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশর জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীনে এ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ সফরে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দ্বার উন্মোচনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপির সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়ায় দুদিনের সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে শ্রমবাজার, আসিয়ানে যোগদান ও রোহিঙ্গা ইস্যু। চার দিনের চীন সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও বিনিয়োগসহ বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, মোংলা বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, যৌথ মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা পরিকল্পনা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা সহযোগিতা ও বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন।
দুই দেশে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে অন্তত দুই ডজন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গতকাল শনিবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করে সফরের বিস্তারিত জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মালয়েশিয়া সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে শ্রমবাজার, রোহিঙ্গা ও আসিয়ানে যোগদান ইস্যু: মালয়েশিয়া সফরের সময় ২২ জুন তারেক রহমান দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন। পরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় বিষয় আলোচনা হবে। আলোচনার ইস্যু হবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপন নিয়ে আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্রসচিব আরও বলেন, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়া হবে। এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সাংস্কৃতিবিনিময় আর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুটি দলিল সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দেশটিতে শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ, সুনীল অর্থনীতি ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির তালিকায় চতুর্থ দেশ মালয়েশিয়া। দেশটিতে এখন প্রায় আট লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের পর ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে দেশটির শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করছেন।
মালয়েশিয়ায় পৌঁছে কুয়ালালামপুরে সাংগ্রিলা হোটেলে উঠবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২২ জুন সকাল ৯টায় পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রধান প্রশাসনিক ভবন পেরদানা পুত্রতে যাবেন তিনি। সেখানে দুই দেশের প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক শেষে সমঝোতা স্মারক সই হবে। এরপর দুই দেশের যৌথ সংবাদ সম্মেলন শেষে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন সেরি পেরদানায় যাবেন তারেক রহমান।
চীনে সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে বিনিয়োগ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা, হচ্ছে ১৬ এমওইউ, ৩ চুক্তি: ২২ জুন বেলা ৩টায় মালয়েশিয়া থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে চীনের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। দেশটিতে তার চার দিনের সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৬টি সমঝোতা স্মারক এবং ৩টি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি, চীনে উচ্চমানের বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, যৌথ মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা পরিকল্পনা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা সহযোগিতা, বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নকে সমর্থন এবং তাজা কাঁঠাল রপ্তানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে।
এছাড়া চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়ার সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বাসসের সমঝোতা স্মারক। চায়না মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দেশটির সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা-সংক্রান্ত, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত এবং চীনা ভাষা সহযোগিতা-সংক্রান্ত তিনটি চুক্তি হচ্ছে।
চীন থেকে বছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নেও চীন অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।
২২ জুন বিকেলে কুয়ালালামপুর থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ৯টায় চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ান ঝুশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে চীনের ডালিয়ান শহরের সাংগ্রিলা হোটেলে উঠবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
২৩ জুন সাংগ্রিলা হোটেলে সকালে ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। বিকেলে ডালিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ সেশনে অংশ নেবেন তিনি। এরপর চীনের স্টেট কাউন্সিল প্রধানের নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি।
২৪ জুন সকাল ১০টায় ডালিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে ‘সামার দাভোস’ নামে পরিচিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি সভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান। এরপর বেইজিংয়ে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় যাবেন তিনি।
২৫ জুন সকালে দিয়াওউতাই হোটেলে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তারেক রহমান। সেখানে চেরি গ্রুপের সভাপতি, হান্ডা গ্রুপ ও চীনাটেক্সট করপোরেশনের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিকেলে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। এখানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
২৬ জুন রাতে চীনের আইনসভা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে যাবেন তারেক রহমান। এরপর বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে অবস্থিত ‘পিপলস হিরোজ’ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন তিনি। সেখানে চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠক করবেন।
শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সফরের বিস্তারিত সূচি ও লক্ষ্য তুলে ধরেন। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কূটনীতি ও অন্যান্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়) এ কে এম শহিদুল করিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধি দলে থাকছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ আরও কয়েকজন।
পররাষ্ট্রসচিব জানান, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে। সফরসঙ্গী প্রতিনিধি দল তুলনামূলকভাবে ছোট রাখা হয়েছে, যার সদস্য সংখ্যা ২৭ থেকে ২৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুইটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও এ সফরে এ সংক্রান্ত কোনো সমঝোতা স্মারক সই হবে না।
সফরের সূচি অনুযায়ী, চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৩ থেকে ২৫ জুন লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নিউ চ্যাম্পিয়নসের ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন।
চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠেয় ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন। ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ ফোরামে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭০০-এর বেশি প্রতিনিধি অংশ নেবেন। সেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হবে।
চীন সফর পর্যালোচনায় থাকবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র: মালয়েশিয়া ও চীনকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ। এই দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হলে বেশি বিনিয়োগ আসবে বলে মনে করছেন তিনি।
ফয়েজ আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি যদি চীনে যেতেন, তাহলে নানাজনে নানান কথা বলতে পারতেন। এখন চীনকে আলাদা করে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, চীনের যে গুরুত্ব পাওয়া উচিত, সেটিই দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা যেহেতু এখন একটি ভিন্ন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে আছি, সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কোন দেশ সফর করছেন, সেটি কারও কারও কাছে একটি ইস্যু। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের মধ্যে বাংলাদেশের কূটনীতিতে ভারসাম্য এবং স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টার কূটনৈতিক বার্তা রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে ভারত বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের পর্যালোচনা থাকবে জানিয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কূটনীতিতে বা পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা যদি দেখি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন ভারত সফর করেন, তখন অন্যান্য দেশও তা পর্যালোচনা করে।’
তাই সতর্ক করে এই অধ্যাপক বলেন, ‘মাথায় রাখতে হবে, এই সফরের মাধ্যমে এমন কোনো বার্তা যেন তৈরি না হয় যে চীনের ওপর আমরা অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি এবং বৃহৎ কোনো শক্তির তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হলে উভয় দেশ থেকে বেশি বিনিয়োগ আসবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তবে এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এমন বার্তা যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশে হবে, এ নিয়ে বেশ জল্পনা ছিল। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরকারি সফর ভারতে হবে কি না, সে বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা ছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, কোরবানির ঈদের কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের আগে মালয়েশিয়া সফরের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়াকে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
সরকার গঠনের পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর। মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু করা প্রধানমন্ত্রীর এই সফর চীন ভ্রমণের মাধ্যমে শেষ হবে ২৬ জুন। সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী শুক্রবার রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’-এর জাতীয় পর্যায়ের ফাইনাল খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শিশুদের শুধু খেলাধুলা করলেই চলবে না, এর পাশাপাশি পড়াশোনা, সংস্কৃতি চর্চা ও উদ্ভাবনী কাজেও পারদর্শী হতে হবে। তোমরাই আগামীর ভবিষ্যৎ, তোমাদের হাতেই আগামীদিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। শনিবার (২০ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’-এর জাতীয় পর্যায়ের ফাইনাল খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
শিক্ষার্থীদের বহুমুখী প্রতিভা বিকাশের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু খেললে চলবে না, লেখাপড়াও করতে হবে। এর পাশাপাশি গান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, কবিতা আবৃত্তি, কোরআন-কেরাত থেকে শুরু করে নতুন নতুন ইনোভেটিভ কাজেও নিজেদের যুক্ত করতে হবে। তোমরা যদি সব কিছুতে নিজেদের পারদর্শী করতে পারো, তবেই আমরা একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।
ক্ষুদে খেলোয়াড়দের দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তোমরা যারা আজ এখানে খেলছো বা গ্যালারিতে বসে আছো, তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আমরা যারা বড় আছি, আমরা বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। বড় হয়ে তোমাদেরই এই দেশ চালাতে হবে এবং আমাদের চেয়েও ভালোভাবে চালাতে হবে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচিতি তুলে ধরতে শিশুদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ক্রিকেট দিয়ে সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে চেনে। আগামীতে ফুটবল, সাঁতার, হকি, টেনিসসহ সব ধরনের খেলা দিয়ে বিশ্ব বাংলাদেশকে চিনবে। তোমরাই হবে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর।
শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন অলিম্পিক— এমনটি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু স্থানীয় পর্যায়ে খেলা নয়, অলিম্পিকেও যেন আমরা ভালো ফলাফল করতে পারি সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। সেজন্য আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।
খেলাধুলার প্রসারে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই টুর্নামেন্টে গত দেড় মাসে সারাদেশে প্রায় ২২ লাখ শিশু অংশ নিয়েছে। আগামীতে আমরা মাধ্যমিক (সেকেন্ডারি) স্কুলেও এই গেম শুরু করব। এ ছাড়া এ বছর মাধ্যমিক ও আগামী বছর প্রাথমিক পর্যায় থেকে ‘প্রাইম মিনিস্টারস কাপ’ চালু করা হবে। শিশুদের সবুজ মাঠে খেলার সুযোগ করে দিতে নতুন নতুন মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী ও রানার্সআপ দলের অধিনায়ক, খেলোয়াড় ও কোচদের হাতে ট্রফি, মেডেল ও প্রাইজমানি তুলে দেন। একইসঙ্গে টুর্নামেন্ট সফল করতে সহযোগিতা করায় সব শিক্ষক ও অভিভাবকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
এবারের টুর্নামেন্টে বালক বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রানার্সআপ হয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দড়িররামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অন্যদিকে, বালিকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাবনার সাঁথিয়ার জোড়গাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রানার্সআপ হয়েছে ময়মনসিংহের নান্দাইলের আউচারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
টুর্নামেন্টের বালক বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা (গোল্ডেন বুট) এবং সেরা খেলোয়াড়ের (গোল্ডেন বল) পুরস্কার জিতেছে বরিশাল বাকেরগঞ্জের যথাক্রমে আবু রেদওয়ান ও শাহাদাত ইসলাম। বালিকা বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন নান্দাইলের পরশমনি এবং সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন পাবনার সাঁথিয়ার মোসাম্মৎ মারিয়া খাতুন।
অনুষ্ঠানে টুর্নামেন্ট পরিচালনায় যুক্ত রেফারি ও ম্যাচ কমিশনারদের হাতেও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় গ্যালারি ভর্তি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
বিভিন্ন দেশ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেতে ২২ হাজার প্রবাসীর আবেদন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যথাযথ না হওয়ায় তাদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। শনিবার (২০ জুন) এনআইডি শাখার কর্মকর্তারা বিষয়টি জানিয়েছেন।
প্রবাসীদের আবেদন সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট নিবন্ধন আবেদন পড়েছে ৮৯ হাজার ৮৯৭টি।
বায়োমেট্রিক প্রদান করেছেন ৫৩ হাজার ২২৯ জন। তদন্তের পর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে এমন আবেদনের সংখ্যা ২ হাজার ৯৭৮টি। তদন্তের পর অনুমোদন হয়েছে ৪৭ হাজার ১৩২টি আবেদন। বাতিল হয়েছে ২২ হাজার ৩৫২টি আবেদন। সার্ভারে তথ্য আপলোডের অপেক্ষায় রয়েছে ১০ হাজার ১৪১ জনের আবেদন। আপলোড করা হয়েছে ৩৭ হাজার ১৬ জনের আবেদন। এছাড়া আবেদন অনুমোদনের পর এনআইডি প্রিন্ট করা হয়েছে ২২ হাজার ১৮টি। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে যা বিতরণ চলছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবী ও দুবাই; সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা; যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেষ্টার ও বার্মিংহাম; ইতালির রোম ও মিলান; কুয়েতের কুয়েত সিটি; কাতারের দোহা; মালয়েশিয়ার কুলালামপুর; অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ও সিডনি; কানাডার অটোয়া ও টরেন্টো; জাপানের টোকিও; আমেরিকার নিউইয়র্ক, মিয়ামি, ওয়াশিংটন ডিসি ও লসঅ্যাঞ্জেলস; মালদ্বীপের মালে; ওমানের মাসকাট; দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়াসহ মোট ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনে ভোটার তালিকা ও এনআইডি বিতরণ কার্যক্রম চলছে। কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদন বাতিল হলেও অসুবিধা নেই। পুনরায় আবেদন করা যাবে।
সবচেয়ে বেশি ভোটার আবেদন এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থেকে, ২৩ হাজার ৯৪০টি। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সবচেয়ে কম আবেদন এসেছে, ১২৬টি আবেদন। সৌদি আরবে আবেদন জমা পড়েছে ৬ হাজার ৩৫২টি। যুক্তরাজ্যে ১৭ হাজার ৩০টি। ইতালিতে ৯ হাজার ৩৮টি। কুয়েতে আবেদন জমা পড়েছে ৫ হাজার ৫৭৩টি। কাতারে ৫ হাজার ৪০৬টি। মালয়েশিয়া থেকে ১ হাজার ৮৩৩টি আবেদন এসেছে। অস্ট্রেলিয়াতে আবেদন জমা পড়েছে ১ হাজার ২০৬টি। কানাডায় ৩ হাজার ২৯৮টি। জাপানে আবেদন জমা পড়েছে ৩০৯টি। যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ হাজার ৮১২টি। মালদ্বীপে ২৯৮টি ও ওমান থেকে আবেদন এসেছে ২ হাজার ২৪৬টি।
প্রবাসীদের চার তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক: বিদেশে বসে ভোটার হওয়ার জন্য অনলাইনে পূরণকৃত আবেদনপত্র (ফরম-২(ক), মেয়াদ সম্বলিত বাংলাদেশি পাসপোর্ট/মেয়াদহীন পাসপোর্ট/এনআইডিধারী তিন নাগরিকের প্রত্যায়ন, অনলাইন জন্ম নিবন্ধন ও পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি বাধ্যতামূলকভাবে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কেন্দ্রে (দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট ডেস্কে) জমা দিতে হবে।
ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন বিভাগের (জেআইএম) বিশেষ অভিযানে ১৮৬ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। গত শুক্রবার (১৯ জুন) দিনগত রাতে রাজধানী কুয়ালালামপুরের পুডু মার্কেট এলাকার আশপাশে বিদেশি নাগরিকদের আবাসস্থল লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়।
‘অপস কুতিপ’ নামের এ অভিযানে বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার এবং বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেন। তবে কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পরে সবাইকে আটক করা হয়।
ইমিগ্রেশন বিভাগের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, শুক্রবার (১৯ জুন) রাত ১২টা ৫ মিনিটে শুরু হওয়া এ অভিযানে কুয়ালালামপুর ফেডারেল টেরিটরি ইমিগ্রেশন বিভাগ, পুত্রাজায়া ও সেলাঙ্গর ইমিগ্রেশন বিভাগ, রয়্যাল মালয়েশিয়া পুলিশ (পিডিআরএম), কুয়ালালামপুর সিটি হল (ডিবিকেএল) এবং জাতীয় নিবন্ধন বিভাগের (জেপিএন) মোট ১৩৭ জন কর্মকর্তা ও সদস্য অংশ নেন।
অভিযান চলাকালে ৩২০ জন বিদেশি নাগরিকের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। এর মধ্যে ১৮৬ জনকে বিভিন্ন ধরনের অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করা হয়েছে।
আটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিক। মোট ১১৮ জন বাংলাদেশি পুরুষকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ২৮ জন ইন্দোনেশীয় (৭ পুরুষ ও ২১ নারী), ২৬ জন মিয়ানমার নাগরিক (১৩ পুরুষ ও ১৩ নারী), ৫ জন ভিয়েতনামি (৩ পুরুষ ও ২ নারী), ৪ জন নেপালি, দুজন ভারতীয়, একজন পাকিস্তানি এবং দুজন চীনা নাগরিককে (১ পুরুষ ও ১ নারী) আটক করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন, আবার কেউ বৈধ ভ্রমণ নথি বা অনুমতিপত্র ছাড়াই দেশটিতে বসবাস করছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন আইন ১৯৫৯/৬৩-এর ধারা ১৫(১)(সি) (অতিরিক্ত সময় অবস্থান) এবং ধারা ৬(১)(সি) (বৈধ নথিপত্র ছাড়া অবস্থান)-এর আওতায় তদন্ত চলছে।
ইমিগ্রেশন বিভাগ জানিয়েছে, পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আটক ব্যক্তিদের ইমিগ্রেশন ডিপোতে পাঠানো হয়েছে।
ফাইল ছবি
দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের মজুত সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোটিং (ভাসমান) মজুতসহ দেশে খাদ্যশস্যের মোট সরকারি মজুতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ মেট্রিক টন। খাদ্য অধিদপ্তরের দৈনন্দিন খাদ্যশস্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামগুলোতে বর্তমানে প্রধান খাদ্যশস্য চালের মজুত রয়েছে ১৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন। এছাড়া গমের মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৩১ মেট্রিক টন এবং ধানের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন। এর ফলে ফ্লোটিং বা ভাসমান মজুত বাদে মোট মজুতের পরিমাণ ২০ লাখ ৩৮ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন। এর সাথে গমের ২০ হাজার ৪৩২ মেট্রিক টন এবং চালের ১ হাজার ৯৬২ মেট্রিক টনের ফ্লোটিং মজুত যুক্ত হয়ে সর্বমোট মজুতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ মেট্রিক টনে।
উল্লেখ্য, ধানের এই পরিমাণকে চালের আকারে রূপান্তর করেই মোট মজুতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে দেশব্যাপী বোরো সংগ্রহ অভিযান পুরোদমে চলছে। ১৭ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সর্বমোট ৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৭৩ মেট্রিক টন বোরো খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন, সিদ্ধ চাল ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭ মেট্রিক টন, আতপ চাল ৩১ হাজার ৯৬৮ মেট্রিক টন এবং গম সংগ্রহ করা হয়েছে ৪৯৪ মেট্রিক টন। এক্ষেত্রেও ধানকে চালের আকারে (১০০:৬৫ অনুপাতে) মোট সংগ্রহের হিসাবভুক্ত করা হয়েছে।
১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে মোট ৮৫ লাখ ৮৩ হাজার ৫১ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে চাল আমদানি হয়েছে ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ১৯৪ টন এবং গম আমদানি হয়েছে ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭ টন।
আমদানির খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি ব্যবস্থাপনায় (জিটুজি ও আন্তর্জাতিক টেন্ডার) মোট ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৮ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫ লাখ ৩১ হাজার ৮০ টন চাল এবং ৭ লাখ ৩৫ হাজার ১৮ টন গম রয়েছে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মোট ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৩ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে; যার মধ্যে সিংহভাগই চাল (৬৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৬ টন) এবং গম ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৭ টন। চলতি অর্থবছরে খাদ্য সাহায্য হিসেবে কোনো চাল বা গম আমদানি করা হয়নি।
শুধু গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে দৈনিক আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১২০ টন (৫.১২ হাজার মে. টন)। যার মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২ হাজার ৯০ টন চাল এবং ৩ হাজার ৩০ টন গম ইতোমধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানের এই মজুতের পরিমাণ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ এবং আমদানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকায় বাজারে চাল ও গমের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের এই মজুত সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মামুন মিয়া।
তিনি বলেন, ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য মজুত থাকলে তা নিরাপদ মজুত হিসেবে গণ্য হয়। সে হিসেবে এখন দেশে যা মজুত আছে তা খুবই নিরাপদ।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জামাল হোসেন বলেন, সরকার যেসব লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, তা বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। খাদ্য মজুত এখন খুবই সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে।
অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে নতুন ধান ও চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আগামী দিনগুলোতে এই মজুতের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গত ৩ মে থেকে খাদ্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এসময় ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান, ১২ লাখ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল, ৫০ হাজার মেট্রিক টন গমসহ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
খাদ্য সচিব জানান, আমদানিসহ সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে খাদ্য মজুত আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে থাকবে।
মন্তব্য