শারীরিক গঠন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে নারীরা মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন। দেশের ৬৯.৯২ শতাংশ নারী শারীরিক গঠন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হচ্ছেন। ৩৭.২৪ শতাংশ নারীকে শরীরের গঠন নিয়ে আত্মীয়রা হেয় করেছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণাটি করেছে আঁচল ফাউন্ডেশন। শনিবার সকাল ১১টায় ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মলনে ‘নারীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শীর্ষক জরিপটি প্রকাশ করা হয়।
বৈষম্য, যৌন হয়রানি ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সম্মুখীন হয়েছেন এমন ১ হাজার ১৪ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। জরিপে অংশ নেন সারা দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগের ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা।
জরিপে বলা হয়েছে, দেশের ৬৯.৯২ শতাংশ নারী শারীরিক গঠন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৭.২৪ শতাংশ নারী জানান, শরীরের গঠন নিয়ে তাদের আত্মীয়রাই হেয় করেছে।
বন্ধুর কাছে হেয় হয়েছে ২২ শতাংশ। এমনকি পরিবার থেকে এ ধরনের মন্তব্য শুনেছেন বলে জানিয়েছেন ১৪.২৫ শতাংশ। শারীরিক গঠন নিয়ে পথচারীর কাছ থেকে নেতিবাচক কথা শুনেছেন ১১.৮৫ শতাংশ নারী।
এর কারণ খুঁজতে গিয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের গবেষণায় এসেছে, ওজনের কারণে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হতে হয় বলে ৩৯.৪৯ শতাংশ নারী মনে করেন। গায়ের রঙের কারণেও ৩৬.৯৫ শতাংশ নারী এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এ ছাড়া উচ্চতা, মুখাবয়বের গঠন, কণ্ঠস্বর প্রভৃতি বিষয় নিয়ে নারীরা বিরূপ মন্তব্য শুনে থাকেন।
মানসিক সমস্যার জন্য দায়ী পারিবারিক টানাপোড়েন
জরিপ বলছে, পারিবারিক টানাপোড়েন নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে, যা ৩১.৮৫ শতাংশ।
আর্থিক অসচ্ছলতা অংশগ্রহণকারীদের ২৪.৪৬ শতাংশের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বেকারত্বের কারণে ১৪.৭৯ শতাংশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ততার শিকার হন। ১৪.৪০ শতাংশ সামাজিকভাবে হেয় হওয়ায় ও ২.৩৭ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের কারণে মানসিকভাবে প্রভাবিত হন।
অমতে বিয়ে বাড়ছে
২৩.৭৭ শতাংশ নারী সম্মতি ছাড়াই পরিবার থেকে বিয়ের চাপের সম্মুখীন হয়েছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে। যারা এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তাদের মধ্যে ১০৯ জনের পরিবার পরে বিয়ে না হওয়ার ভয় থেকে এমন চাপের সৃষ্টি করেন বলে জানা গেছে।
কম বয়সী মেয়েদের ভালো স্বামী পাওয়া যায়- এমন ধারণার কারণে ৮৬ জনের ওপর পারিবারিকভাবে বিয়ের চাপ আসে। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাবর্ষ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ৮৫ জনকে বিয়ের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
যৌন হয়রানির শিকার ৬৫.৫৮ শতাংশ
৬৫.৫৮ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জরিপে জানা গেছে। এর মধ্যে ৩৫.৪৯ শতাংশ নারী জানান, তারা বিকৃত যৌন ইচ্ছার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বা কুদৃষ্টির শিকার হয়েছেন। ২৯.৬২ শতাংশ নারীকে আপত্তিকর স্পর্শের ভুক্তভোগী হতে হয়েছে। আর বিভিন্ন জায়গায় ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়েছেন ২২.২৬ শতাংশ।
ভ্রমণেও অনিরাপদ নারী
গণপরিবহনে ৪৫.২৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন বলে জরিপে উঠে এসেছে। গণপরিবহন হিসেবে সর্বাধিক ব্যবহৃত বাস বা বাসস্ট্যান্ডে যৌন হয়রানির শিকার হন ৮৪.১০ শতাংশ নারী। রেল বা রেলস্টেশনে ৪.৫৮ শতাংশ এবং রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ১.৫৩ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন।
শৈশবে আত্মীয়ের মাধ্যমে যৌন নিগ্রহের শিকার ৩৫ শতাংশ
জরিপে অংশ নেয়াদের মধ্যে ৩৮.৮৬ শতাংশ শৈশবে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। তার মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের দ্বারা ৩৫.২৮ শতাংশ যৌন নিগ্রহের শিকার হয়। শৈশবে অপরিচিতদের দ্বারা যৌন নিগ্রহের শিকার হন ২৮.১৭ শতাংশ। এ ছাড়া ১৬.৫০ শতাংশ প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এমন আচরণের শিকার হয়।
জরিপে উঠে এসেছে, শৈশবের এসব ঘটনা ২৮.৪৩ শতাংশের মনে সবার প্রতি অবিশ্বাসের জন্ম দেয় ও ২৮.১৭ শতাংশের ভেতর পুরুষবিদ্বেষী মনোভাবের সৃষ্টি হয়।
অনলাইনেও বিড়ম্বনার শিকার নারী
জরিপ অনুযায়ী, অনলাইনে বিড়ম্বনার শিকার হন ৪৩.৮৯ শতাংশ নারী। এর মধ্যে কুরুচিপূর্ণ মেসেজ পাঠিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে ৬১.১২ শতাংশকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে ১০.৩৪ শতাংশ। ৯.৮৯ শতাংশ ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল ছবি নিয়ে দুর্ভোগ পোহান বলে জানায়।
আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট নারীদের মানসিক বিপর্যস্ততার পেছনে অনেকাংশেই দায়ী জানিয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বলেন, ‘নারীদের প্রতি সঠিক মনোভাব ধারণ করার জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। এই শিক্ষার শুরু হতে হবে শৈশব থেকে।’
নারী ক্ষমতায়নের যুগে নারীদের এমন আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, ‘সমাজের একটি অংশ হিসেবে নারীদের যতটুকু মর্যাদা পাওয়া উচিত, সেটা আধুনিক সময়ে এসেও আমাদের সমাজে এখনও নেই।’
ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এ অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
সমাজের প্রতিটি মানুষকে নারীদের জন্য নিরাপদ জায়গা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে সিটি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সুরঞ্জনা সাহা বলেন, ‘বাংলাদেশে ইন্টারনেট তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে আস্থার প্রতীক হলেও অশুভ প্রয়োগ ও ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতার অনেক নারীর কাছে তা এক আতঙ্কের নাম।’
সমাজকে এগিয়ে নিতে সাইবার জগৎকে নারীদের জন্য নিরাপদ রাখা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারবিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান, ব্যক্তিগত সচেতনতা ও পারিবারিক শিক্ষা সাইবার দুনিয়াকে সুরক্ষিত রাখতে পারে বলে জানান তিনি।
নারীদের সামাজিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিতে আঁচল ফাউন্ডেশন কিছু সুপারিশ করেছে। নারীদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিতে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ব্যবসা। কথার কথা বলেছে তারা। গণপরিবহন ও তার স্টপেজগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
ইভ টিজিং ও যৌন হেনস্তার মতো ঘটনাগুলোর তাৎক্ষণিক সমাধান পেতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। শৈশবকালীন যৌন হেনস্তা, বডি শেমিং থেকে রক্ষা করতে পরিবারকে সচেতন করতে হবে।
ছবি: সংগৃহীত
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার উৎরাইল-শিবচর সড়কে আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর নির্মিত ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘লিটন চৌধুরী’ সেতুর পশ্চিম প্রান্তে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। সেতুর একটি পিলার ও সংযোগ সড়কের অতি কাছ পর্যন্ত ভাঙন পৌঁছে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
শিবচর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ৫৫০ মিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন সেতুটি ২০২৩ সালে সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তবে নির্মাণের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আড়িয়াল খাঁ নদের ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে এ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
বর্তমানে সেতুর পশ্চিম প্রান্তের দক্ষিণ পাশে নয়াবাজার এলাকায় নদীতে তীব্র ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। সেই স্রোতের আঘাতে নদীতীর দ্রুত ভেঙে পড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত বর্ষা মৌসুমেও একই এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার নদীতীর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। চলতি বর্ষার শুরুতেই পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। এখন ভাঙন সেতুর একটি মূল পিলারের ১০০ ফুটেরও কম দূরত্বে পৌঁছে যাওয়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম সরদার বলেন, ‘গত বছর বর্ষার শুরুতেই সেতুর নিচের অনেক জায়গা ভেঙে যায়। এবারও একইভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো সেতুই নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের আগে কিংবা পরে প্রয়োজনীয় নদীশাসন (রিভার ট্রেনিং) এবং স্থায়ী গাইড বাঁধ নির্মাণ না করায় প্রতিবছর বর্ষা এলেই নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। তাদের মতে, সময়মতো কার্যকর নদীশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে শুধু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত লিটন চৌধুরী সেতুই নয়, এর সংযোগ সড়ক এবং নয়াবাজারের একাংশও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। তাই সেতু রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। ভাঙনের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে।’
ছবি: সংগৃহীত
উৎপাদন নেই, তবুও থেমে নেই ব্যয়। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে সরকারের প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা। বছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৮ কোটিরও বেশি, অথচ উৎপাদন থেকে সরকারের কোনো আয় নেই। এদিকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরছে, আর কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন হাজারো শ্রমিক।
একসময় উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত জাতীয় জুট মিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান। জেলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল আজ বন্ধের তালায় বন্দি। ফলে শ্রমিক, কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিলটি দ্রুত চালুর দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
জানা যায়, ১৯৬০ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুর এলাকায় প্রায় ৭৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নর্দান পিপলস জুট মিল। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কওমি জুট মিল, পরে যা জাতীয় জুট মিল নামে পরিচিতি পায়। একসময় প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ টন পাট সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরনের পাটজাত পণ্য উৎপাদন করা হতো। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি করা হতো।
দীর্ঘদিন লাভজনকভাবে চললেও দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক সংকটের কারণে ২০০৭ সালে প্রথমবার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে পুনরায় চালু হলেও সংকট কাটেনি। পরে ২০২০ সালের ১ জুন লোকসান, ঋণের বোঝা ও কাঁচামাল সংকটের অজুহাতে আবারও উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ ২০ বছরের জন্য মিলটি লিজ নিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই ২০২৪ সালে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
জাতীয় জুট মিল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মিলটির নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে প্রতি মাসে সরকারের খরচ হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয়করণ, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণেই বারবার বন্ধের মুখে পড়েছে এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তাদের মতে, দ্রুত মিলটি চালু করা গেলে যেমন হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে, তেমনি পাটচাষিরাও তাদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য পাবেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও ফিরে পাবে নতুন গতি।
সাবেক শ্রমিক রতন আলী বলেন, মিল চালু থাকাকালে প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করতেন। বর্তমানে ঘটকালি ও সামান্য কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতে হচ্ছে।
আরেক শ্রমিক বেলাল হোসেন বলেন, জুট মিলই ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। মিল বন্ধ হওয়ার পর বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করে কষ্টে দিন কাটছে। মিল পুনরায় চালু হলে পুরনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জ জেলা শ্রমিক দলের (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি বিশা শেখ বলেন, জাতীয় জুট মিল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি জেলার অর্থনীতি, পাটচাষি ও হাজারো শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মিলটি চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।
জাতীয় জুট মিলের মজদুর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে মিলটি পুনরায় চালু করা। এতে শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় অর্থনীতি সবাই উপকৃত হবে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বাচ্ছু বলেন, জাতীয় জুট মিল জেলার অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে মিলটি বন্ধ থাকায় শুধু হাজারো শ্রমিকই কর্মহীন হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাটচাষি, ব্যবসায়ী, পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ। বর্তমান সময়ে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে। তাই সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জাতীয় জুট মিল পুনরায় চালু করা। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে পাটচাষিরা তাদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং সিরাজগঞ্জের অর্থনীতিও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।
জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন জানান, মিলটি বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে রয়েছে। বর্তমানে ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। উপযুক্ত বিনিয়োগকারী পাওয়া গেলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। এছাড়া দেশের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পুনরায় চালুর বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চার বছর ধরে বন্ধ পড়ে থাকা জাতীয় জুট মিল এখন শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, জীবিকা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার এক বড় পরীক্ষার নাম। এখন প্রশ্ন একটাই নতুন লিজের মাধ্যমে কি আবারও ঘুরবে জাতীয় জুট মিলের উৎপাদনের চাকা, নাকি কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি মরিচা ধরেই ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে?
ছবি: সংগৃহীত
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি শনিবার (৪ জুলাই) খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি প্রকল্পের প্রধান সড়ক, চারটি সুইচগেট, প্রকল্প এলাকার ম্যাপ, রূপসা সেতুর প্রবেশমুখে নির্মাণাধীন ব্রিজ সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রকল্প এলাকার জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলেন।
পরিদর্শন শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খুলনা সার্কিট হাউসে শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন (তৃতীয় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন সভায় যোগ দেন। এর আগে তিনি সার্কিট হাউস চত্বরে একটি গাছের চারা রোপণ করেন।
সভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)’র সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কেডিএ’র চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম, প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেনসহ বিভাগীয়, জেলা প্রশাসন ও কেডিএ’র কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ে গত কয়েক দিন ধরে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। হঠাৎ এই অস্বাভাবিক গরমে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন, বিশেষ করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। রিকশা-ভ্যানচালক, দিনমজুর, কৃষি শ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিকরা কাজ ফেলে ছুটছেন গাছের ছায়ায় কিংবা কোনো ঠাণ্ডা আশ্রয়ে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, দুপুরের দিকে শহরের প্রধান সড়ক ও বাজারগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে রিকশা-ভ্যানের ভিড় লেগে থাকে, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকজন চালক দেখা যাচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে সকাল ও বিকালের অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ সীমাবদ্ধ রাখছেন।
স্থানীয় এক ভ্যানচালক বলেন, ‘রোদের মধ্যে ভ্যান চালাতে গেলে শরীর যেন পুড়ে যায়। মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই দুপুরে কাজ বন্ধ রেখে গাছের নিচে বসে থাকি।’
কৃষি শ্রমিকদের অবস্থাও একই রকম। মাঠে কাজ করা শ্রমিকরা জানান, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম সময় কাজ করতে হচ্ছে তাদের, ফলে দৈনিক আয়ও কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। একজন কৃষি শ্রমিক বলেন, ‘আগে সারা দিন মাঠে কাজ করতাম, এখন গরমের কারণে দুপুরের পর আর মাঠে থাকা যায় না। রোজগার কমে গেছে অনেকটাই।’
নির্মাণ শ্রমিকরাও পড়েছেন বিপাকে। ঝুঁকি নিয়েই অনেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন জীবিকার তাগিদে, তবে ঘন ঘন বিশ্রাম নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তীব্র গরমে হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতাজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। চিকিৎসকরা এই সময়ে অতিরিক্ত রোদে কাজ না করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরার পরামর্শ দিচ্ছেন।
এদিকে দিনমজুর শ্রেণির মানুষদের দাবি, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে তাদের জন্য বিশ্রামাগার বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হলে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলবে।
স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষক মো. সামিউজ্জামান জানান, আজকের (গতকাল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি আরও জানান আগামী ২-৩ দিন এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
একের পর এক বিসিএসে সাফল্য অর্জন করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. হাসান মিয়া। ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার, ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর এবার ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে বিসিএসে হ্যাটট্রিক সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. সগির আহমেদের জ্যেষ্ঠ সন্তান হাসান মিয়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। বিসিএসের পাশাপাশি এ পর্যন্ত মোট নয়টি সরকারি চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, শিক্ষাজীবন থেকেই মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন হাসান। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে প্রথম এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সিজিপিএধারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তিনি অন্যতম ছিলেন।
হাসান জানান, ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। সেই লক্ষ্য নিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে যান। তবে শিক্ষকতায় সুযোগ পাওয়ার পথ কঠিন বুঝতে পেরে তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে মাস্টার্সের লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পূর্ণোদ্যমে বিসিএস প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করেন। বরিশালে থাকাকালীন অনেকগুলো টিউশন করিয়েছি। টিউশন করানোর অভিজ্ঞতাই আমার প্রস্তুতিকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করেছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগ দিলেও ৪৭তম ও ৪৯তম বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সাড়ে চার মাস পর চাকরি ছেড়ে দেন। পরে বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বিপিএটিসি-তে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।
হাসান জানান, বিপিএটিসিতে যোগদানের মাত্র ছয় দিন পর ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি পান। এ জন্য তিনি প্রতিষ্ঠানটির রেক্টরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নিজের সাফল্যের একটি স্মরণীয় মুহূর্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, যেদিন সাভার থেকে বরিশালে লিখিত পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলাম, সেদিনই ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয় এবং আমি প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। এরপরও সব পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেই সিদ্ধান্তই আমাকে আজ পররাষ্ট্র ক্যাডারে পৌঁছে দিয়েছে।
হাসান বলেন, আমার বাবা শূন্য থেকে নিজের পরিশ্রমে জীবন গড়েছেন। তার সংগ্রাম ও অধ্যবসায় আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। পাশাপাশি শিক্ষক, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতাও পেয়েছি। সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে তিনি মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা, একাডেমিক পড়াশোনায় মনোযোগ এবং নিয়মিত টিউশন করানোর মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের কথা জানান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে হাসান আরো বলেন, সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে চাই। দেশের মর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ ও আত্মসম্মান রক্ষায় কাজ করাই আমার লক্ষ্য।
হাসানের এই ব্যতিক্রমী অর্জনে আনন্দ প্রকাশ করেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা তার এ সাফল্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গৌরবের বিষয় হিসেবে দেখছেন ।
ছবি: সংগৃহীত
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে একটি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে প্রধান শিক্ষকের মদ্যপ অবস্থায় মাতলামির অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে এলাকায় শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার নুকালি বহুপ্বার্শিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে মদ্যপ অবস্থায় বিদ্যালয়ে এসে অস্বাভাবিক আচরণ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের দাবি, সকাল ১০টার দিকে তিনি টলতে টলতে নিজের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এরপর চিৎকার-চেঁচামেচি ও বিশৃঙ্খল আচরণ শুরু করলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ পুরো বিদ্যালয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। পরে পরিবারের লোকজন এসে তাকে টালমাটাল অবস্থায় বাড়িতে নিয়ে যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়ের পাশেই তার বাড়ি হওয়ায় পারিবারিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও তিনি বিদ্যালয়ে এসে প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ে বসেই মদ্যপান ও অস্বাভাবিক আচরণ করেছেন। তার প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না বলেও জানান স্থানীয়রা।
বিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের সহকারী শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, স্কুলে সাময়িক পরীক্ষায় সময় আমি সকালে পরীক্ষার দায়িত্বে বিদ্যালয়ের তৃতীয় তলায় ছিলাম। প্রধান শিক্ষকের অফিসে ঠিক কী হয়েছে তা দেখিনি। তবে একটি স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজের চেয়ারে বসে মদ্যপান করেছেন—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হচ্ছে এবং শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, আমি বাইরে থেকে মদ্যপান করে বিদ্যালয়ে একটি কাগজ নেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। তখন কিছুটা মাতলামি হয়েছে। পরে আমার বড় ভাই আমিনুল ইসলাম ও ছোট ভাই নুরুল ইসলাম আমাকে বাড়িতে নিয়ে যান।
এ ঘটনায় আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দেব।
শাহজাদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইদুল ইসলাম শেখ বলেন, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে।
শাহজাদপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জেনে ইউএনওকে অবগত করা হয়েছে। ইউএনও শিক্ষা বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত থানায় এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।
ছবি: সংগৃহীত
মাত্র কয়েক মাস আগেও সংসারের স্বপ্ন বুনছিলেন প্রবাস ফেরত যুবক মাসুম বিল্লাহ (২৪)। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন রক্তাক্ত এক স্মৃতি। দীর্ঘদিনের পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি এমনই অভিযোগ মায়ের।
তবে ঘটনার এক মাস পার হলেও মামলার অধিকাংশ আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন নিহতের স্বজনরা। বিচার পাওয়াতো দুরের কথা উল্টো প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে তাদের। এঘটনায় গত ১৬জুন রুমি আক্তার নওগাঁ সদর থানায় জিডি করেছেন।
সম্প্রতি মাসুম বিল্লাহ নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে। বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মা রুমি আক্তার। এর আগে বিথি আক্তার নামের এক নারীর বাবা ও ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবাদ করায় তিনিও রয়েছেন আতঙ্কে। এভাবেই পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত জেরে দুটি পরিবারের তিন জনকে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনাটি নওগাঁ সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের শ্রীধরপুর গ্রামে। ওই গ্রামে পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত জেরে গত ৬ বছরে একে একে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র নিহতের লাশ উদ্ধারের ঘটনাস্থল অন্য জেলায় সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত ভুক্তভোগী দুই পরিবারের দুই নারী। তাদের অভিযোগ পরপর দুটি হত্যা করার পর আসামিদের বিচার না হওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ২৬মে মাসুম বিল্লাহ নামের ওই যুবককে হত্যা করা হয়।
ভুক্তভোগী রুমি আক্তার বলেন, আমার ছেলে মাসুম বিল্লাহ গত ২৬ মে জয়পুরহাটের তিলকপুর বাজারে যান। রাতে বন্ধুর বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে খিরাহাটি রেলগেট এলাকায় তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেওয়ার সময় মৃত্যু হয়।
এদিকে মাসুমের নিথরদেহ উদ্ধার হয় জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর থানার সীমানায়। সে কারণে নিহতের মা রুমি আক্তার বাদী হয়ে আক্কেলপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে আরও ২২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়। একই বিরোধকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে একে একে নিহত হয়েছেন আরেকটি পরিবারের আরও দুই সদস্য। ফলে প্রথম হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
আসামিরা হলেন, নওগাঁর সদর উপজেলার শ্রীধরপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে শিবলু (৩২), মৃত গোনা মন্ডল এর ছেলে মো. গোলাম মোস্তফা (৬৪), একই গ্রামের মোস্তফার ছেলে হানিফ (২২ ), আক্কেলপুর উপজেলার নওজোর গ্রামের মৃত আবু তালেবের ছেলে উজ্জ্বল মিয়া (৩৫), সদর উপজেলার ধোপাইকুড়ি গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর ছেলে ইয়াছিন আলী নান্নু (৫৫), শ্রীধরপুর মৃত ফজলুর রহমান মন্ডল এর ছেলে মো. শাহাদৎ মন্ডল (৫৫) ও মো. আলম (৩৮) এবং একই গ্রামের মৃত আতিকুর রহমান এর ছেলে মো: অলি হোসেন (২২)।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমি আক্তার বলেন, আমার ছেলেকে হত্যার এক মাস পেরিয়ে গেলেও আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশকে বারবার তাদের অবস্থান জানিয়েছি, কিন্তু কাউকে ধরছে না।
রুমি আক্তারের অভিযোগ, আমরা যেসব তথ্য পুলিশকে দিচ্ছি, সেগুলো কোনো না কোনোভাবে আসামিদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে তারা সহজেই স্থান পরিবর্তন করছে।
আরেক ভুক্তভোগী বিথি আক্তার জানান, জমিজমা বিরোধকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালে তার বাবা ফজলুর রহমান নিহত হন। ওই মামলার বাদী ছিলেন তার ভাই রতন মণ্ডল। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকেও হত্যা করা হয়। সর্বশেষ নিহত হয়েছেন তার প্রতিবেশী ভাতিজা মাসুম বিল্লাহ।
কান্নাভেজা কণ্ঠে বিথি বলেন, দুটি পরিবারের তিনজনকে হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।
সকল অভিযোগ অস্বীকার করে তিলকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আলী নান্নু বলেন, আমি চক্রান্তের শিকার। তবে সকল হত্যার বিচার চাই। এই জন্য আমি জামিনে এসে সকলের সামনে মাসুম হত্যার সুষ্ঠু বিচারের জন্য বক্তব্যও দিয়েছি। অথচ নিহত মাসুম বিল্লাহকে নিয়ে এক রকম রাজনীতি শুরু করেছে। আওয়ামীলীগসহ আমার দলের কিছু লোক আমার সুনাম নষ্ট করার জন্য চক্রান্ত করছে।
নওগাঁ সদর মডেল থানার এসআই খোরশেদ আলম বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে। যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই গনেশ চন্দ্র রায় বলেন, বাদী পক্ষের দেওয়া তথ্য আমরা যাচাই করে আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে এক আসামিকে ধরা হয়েছে।
আক্কেলপুর থানার ওসি শাহীন রেজা বলেন, নিহত ও মামলার আসামিরা সবাই নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ঘটনার রাতেই একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরেক আসামি ইয়াছিন আলী নান্নু আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য