আট বছরের স্কুলছাত্রী তানিশা। চোখে সমস্যা থাকায় তাকে ল্যাপটপ, মোবাইলের মতো ডিভাইস বেশি সময় ব্যবহার না করতে বলেছিলেন চিকিৎসক, তবে করোনাভাইরাস মহামারিতে চিকিৎসকের সে পরামর্শ মানতে পারেনি শিশুটি।
করোনায় তানিশার মতো খুদে শিক্ষার্থীদের দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা অনলাইনে ক্লাসসহ স্কুল কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়েছে। হোমওয়ার্ক ও অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করে জমা দিতে হয়েছে অনলাইনেই। এ কারণে দীর্ঘ সময় ধরে হেডফোন ব্যবহার করতে হয়েছে তাদের।
হেডফোনের এ ব্যবহার শিশুদের শ্রবণক্ষীণতা বাড়ার একটি কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিভাইসটির অতি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
গত বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটে যায় তানিশা। ওই সময় তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার।
তিনি বলেন, ‘অনলাইনে ক্লাস করার সময় কানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিক্ষকের কথা মনোযোগ সহকারে শুনতে হেডফোন ব্যবহার করার কারণে কানে সমস্যা বেড়েছে। কখনো কখনো মাথাব্যথা করে, চোখব্যথা করে।’
শুধু তানিশা নয়, দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাসের কারণে হাজারো শিক্ষার্থীর এমন সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা জানান, করোনা মাহামারি কারণে প্রায় দুই বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এ সময়ে শিশুদের জীবন বদলে গেছে। বিশেষ করে অনলাইন পাঠদানের কারণে দীর্ঘসময় তাদের হেডফোনের ব্যবহার বেড়েছে।
নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনার কারণে দীর্ঘদিন মানুষ ঘরবন্দি ছিল। অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাসের কারণে ব্যাপকভাবে কানের ওপর প্রভাবে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত হেডফোন ব্যবহারের কারণে ক্লাসে অমনোযোগীও ছিলেন। ভারতের একটি গবেষণায় আরও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।
‘গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত হেডফোন ব্যবহারের কারণে ভারতে ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনলাইনে ক্লাসে মনোযোগ ছিল না। এসব শিক্ষার্থীর ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। তাদের মাথাব্যথা, চোখব্যথা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আরও বেশি দৃশ্যমান হবে আরও কয়েক বছর পর। কারণ কানের সমস্যা মানুষ সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করতে পারেন না। যখন গুরুতর হয়, তখন হাসপাতালে আসেন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ ধরনের দূষণ। এর মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম।
শব্দদূষণের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি হৃৎস্পন্দনে পরিবর্তন, হৃৎপিণ্ডে ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। শ্বাসকষ্ট, মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, দিক ভুলে যাওয়া, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা তৈরি করে এ দূষণ।
ডা. মনিলাল আইচ বলেন, ‘দেশে গড়ে ৩৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কানের সমস্যায় রয়েছে। প্রতি তিনজনে একজন গড়ে কানে কম শোনে। এ ছাড়া যেসব কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে, এটা কমাতে যেসব নীতিমালা করা হয়েছে, তার একটাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না, যার কারণে শব্দদূষণ বাড়ছে।’
২০১৭ সালের একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শব্দদূষণের দেশ হচ্ছে ঢাকা। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের কানের সমস্যা দেখা দেবে।’
জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মানস রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘দেশে শ্রবণক্ষীণতার প্রধান কারণ শব্দদূষণ। শব্দের একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রা রয়েছে। সাধারণত মানুষের ৮০ ডেসিবল শব্দ গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে।
‘এর চেয়ে বেশি পরিমাণ শব্দের মধ্যে মানুষ নিয়মিত কাজ করলে, কানে সমস্যা দেখা দেয়, কিন্তু রাজধানীসহ সারা দেশেই নগরায়নের প্রভাবে সবখানেই মাত্রাতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, দেশে অনেক মানুষ জন্মগত ও কানপাকা রোগের কারণে কানে কম শোনে। এ ছাড়া দেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার শিশু জন্মগতভাবে শ্রবণ সমস্যা নিয়ে বেড়ে উঠছে, কিন্তু জাতীয়ভাবে এ সমস্যা শনাক্তে তেমন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পরে এটি প্রকাশ পাচ্ছে।
এ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জাতীয়ভাবে জন্মের পরপর শিশুর শ্রবণ শনাক্তের ব্যবস্থা থাকলে এ সমস্যা অনেক কমে আসত। এ ছাড়া দেশে তরুণ সমাজের মধ্যে যে হারে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, বিশেষ করে কানে অনিয়ন্ত্রিত ইয়ার প্লাগ ব্যবহার বাড়ছে, তাতে করে ধীরে ধীরে শ্রবণক্ষীণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করেছে। সেখানে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া আছে, কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।
বিশ্ব শ্রবণ দিবস-২০২২ উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জীবনভর ভালো শ্রবণশক্তি বজায় রাখার উপায় হিসেবে নিরাপদ শ্রবণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
এর আগে ২০২১ সালে ডব্লিউএইচও শ্রবণ সংক্রান্ত বিশ্ব প্রতিবেদন চালু করে, যেখানে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ শব্দ কমানোর ওপর গুরুত্বরোপ করা হয়।
ডব্লিউএইচও বলছে, কানের যত্নের মাধ্যমে সারা জীবন ভালো শ্রবণশক্তি পাওয়া সম্ভব; শ্রবণশক্তি কমার অনেক সাধারণ কারণ প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
শব্দদূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বের মতো বৃহস্পতিবার দেশে পালন হচ্ছে বিশ্ব শ্রবণ দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপ্রাদ্য ‘টু হিয়ার ফর লাইফ, লিসেন উইথ কেয়ার!’ এর মানে দাঁড়ায়, ‘জীবনভর শুনুন, যত্নের সঙ্গে শুনুন’।
ফাইল ছবি
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) হাসপাতালটির নির্বাহী পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে পাঠানো এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে চিঠিটি পাঠিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ)। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপনার আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে।
চিঠিটির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, ২ বড় মগবাজার, ঢাকা-এর কারণ দর্শানোর জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত সিদ্ধান্ত।’ চিঠিতে বলা হয়, গত ২৭ মে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন এই হাসপাতালটির ‘লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না’ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ৭ জুন বিকেল পাঁচটার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কারণ দর্শানোর সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করলে এই সময়সীমা ৯ জুন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
বিষয়টি উল্লেখ করে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারীকে চিঠিতে বলা হয়েছে, ৯ জুন আপনার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে জবাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো। এই অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপনার আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল স্কয়ার হসপিটাল। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ‘রোবোটিক অ্যাসিস্টেড এমআরআই-ইউএসজি ফিউশন প্রোস্টেট বায়োপসি’। গত ৭ জুন ২০২৬ তারিখে স্কয়ার হসপিটালের ইউরোলজি বিভাগের কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. এন আই ভূঁইয়া এবং তাঁর বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম এই অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি সফলভাবে পরিচালনা করেন। এই ঐতিহাসিক অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রোস্টেট ক্যান্সার শনাক্তকরণে এক নতুন যুগের সূচনা হলো, যা আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় দেশের সক্ষমতাকে বিশ্বমানে উন্নীত করেছে।
এই বিশেষ পরীক্ষায় বিশ্বখ্যাত 'মোনা লিসা' (Mona Lisa) রোবোটিক বায়োপসি সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। এটি মূলত একটি উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর রোবোটিক ব্যবস্থা যা সার্জনকে প্রোস্টেটের নমুনা সংগ্রহে সর্বোচ্চ নিখুঁত সহায়তা প্রদান করে। এই প্রযুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি রোগীর আগের করা এমআরআই এবং পরীক্ষার সময়কার তাৎক্ষণিক আল্ট্রাসাউন্ড ছবিকে একত্রে সমন্বয় বা ফিউশন করে একটি ত্রিমাত্রিক বা থ্রি-ডি ম্যাপ তৈরি করে। এই ম্যাপটি ব্যবহারের ফলে চিকিৎসকরা প্রোস্টেটের ভেতরের যেকোনো অস্বাভাবিকতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান এবং রোবোটিক গাইডেন্সের মাধ্যমে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেন।
প্রথাগত বায়োপসি পদ্ধতিতে অনেক সময় প্রোস্টেটের ভেতরের ছোট টিউমারগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে অথবা বায়োপসি সুই সঠিক স্থানে পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে রোগ নির্ণয়ে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু নতুন এই রোবোটিক সিস্টেমে ঠিক যে জায়গায় ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ রয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে সেখান থেকেই নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এর ফলে রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বা একুরেসি প্রায় শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছায়। পাশাপাশি এই পদ্ধতিতে শারীরিক জটিলতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং রোগীকে বারবার কষ্টদায়ক বায়োপসি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না।
এই সাফল্য সম্পর্কে অধ্যাপক ডা. এন আই ভূঁইয়া জানান যে, প্রোস্টেট ক্যান্সার নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে স্বীকৃত। দেশের ভেতরেই এখন এমন উন্নত সেবা নিশ্চিত হওয়ায় রোগীদের এই জটিল পরীক্ষার জন্য আর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। স্কয়ার হসপিটালের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা দেশেই সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ইউরোলজি চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিশ্বমানের সেবা প্রদানে পুরোপুরি সক্ষম।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। রবিবার (৭ জুন) সকাল ১১টা থেকে তারা এই কর্মবিরতি শুরু করেন। রামেক হাসপাতালের ইন্টার্ন প্রতিনিধি ডা. তানভীর আহমেদ তৌকির বলেন, “কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলবে।”রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, “হাসপাতালে ২৬২ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক রয়েছেন। আজ সকাল থেকে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন।” স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক একটি নোটিশ এবং চিকিৎসকদের বিভিন্ন অনিয়ম ও বৈষম্যের প্রতিবাদে সারাদেশের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। বৃহস্পতিবার (৬ জুন) বাংলাদেশ সম্মিলিত ইন্টার্ন চিকিৎসক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে দেশের সব ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করেছেন। সমাবেশে তাদের ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। তারা দাবি করেন, এর আগে বিএমডিসি প্রকাশিত একটি নোটিশের মাধ্যমে তাদের ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রথম দাবির বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাকি দাবিগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে তারা হতাশা প্রকাশ করেন।এ অবস্থায় সংগঠনটি পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি, দেশের সব মেডিকেল কলেজের প্রথম থেকে পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বেলা ১১টার পর থেকে ক্লাস বর্জন, সব মিড-লেভেল চিকিৎসকদের চলমান আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। কর্মসূচিতে দেশের সব ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালীকরণে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে গত বুধবার (৩ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং পরিদর্শন কার্যক্রমে সহযোগিতা করার নির্দেশনা জারি করেছে। অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী আদেশে সই করেন।
আদেশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং রোগীদের জন্য অধিকতর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা সংখ্যা সীমিত হওয়ায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে উপজেলা পর্যায়েই অধিকসংখ্যক রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাবেন এবং জেলা সদর হাসপাতালের ওপর চাপও কমবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শন দল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পরিদর্শন করবে। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে অবকাঠামোগত সক্ষমতা, বিদ্যমান ভবন, সম্প্রসারণের সম্ভাবনা, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং অতিরিক্ত শয্যা স্থাপনের উপযোগিতা যাচাই করা হবে।
নির্দেশনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) পরিদর্শন দলের সঙ্গে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে পরিদর্শন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে করতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, নথিপত্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হলে চিকিৎসাসেবার পরিধি আরও বাড়বে। এতে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, জরুরি চিকিৎসা, মেডিসিন, সার্জারি ও অন্যান্য বিশেষায়িত সেবার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি রোগীদের দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজনও অনেকাংশে কমে আসবে।
অফিস আদেশটির অনুলিপি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় প্রেরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ই-মেইলের মাধ্যমেও নির্দেশনাটি জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, রুমে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সচিবালয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালটি কার্যক্রম পরিচালনার উপযুক্ত নয়। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন সুবিধা না থাকা, ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি করা এবং দায়িত্বে চরম অবহেলার বিষয়গুলো তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তির বিষয়ে তিনি আরও জানান, এ ধরনের ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে বিষয়ে আগামী রোববার (৭ জুন) সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এ ধরনের ঘটনা রোধে সরকার আরও কঠোর হতে যাচ্ছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এর আগে, গত ২৭ মে ভোরে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৩ ঘণ্টার মধ্যে ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ এনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। শিশুর স্বজনের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রমনা থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। সেদিন রাতেই মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) জাহিদুল ইসলাম।
রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বুধবার (৩ জুন) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একই ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঈদের আগ মুহূর্তে এমন ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশু মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর নিকট জমা দিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কমিটি আজ তাদের রিপোর্ট জমা দেবে।
এছাড়া আগামীকাল দুপুর ৪টায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল গণমাধ্যমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলেও জানানো হয়েছে।
গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর মৃত এক নবজাতকের স্বজন রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর পুলিশ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শন করে বিভিন্ন অসঙ্গতি পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং করণীয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি কমিটি। পরে তারা ৩ জুন পর্যন্ত সময় চান। এ কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল উইংয়ের উপপরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তা রয়েছেন।
এর আগে গত তিন দিন আগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে তারা সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ওই দিন বিকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
দেশে গত সোমবার (০১ জুন) সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার (০২ জুন) সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৩৪ জন। মঙ্গলবার (০২ জুন) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১ হাজার ২৯২ জন শিশু সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছে। এর বাইরে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামরোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ৪২ জন। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৩৬২ জনে। আর এখন পর্যন্ত ল্যাব পরীক্ষায় মোট নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯ হাজার ১৩৬ জন।
সরকারি তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৯ হাজার ১০৬ জন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৮১২ জন।
বিজ্ঞপ্তিতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, দেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর পাশাপাশি ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামরোগীদের মধ্যে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৯০ জন।
চিকিৎসকেরা জানান, শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ রোধে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য