ঘড়িতে রাত ১০টা বেজে ১৫ মিনিট। ঢাকার পান্থপথ কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ায় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস। রাঙ্গামাটিগামী বাসটি ছাড়তে তখনও মিনিট পনেরো বাকি। যাত্রীরা বাসে উঠে যে যার আসনে বসছেন। বাড়ি ফেরার আনন্দ নিয়ে বাসে উঠলেন রাঙ্গামাটির মেয়ে সাজিয়া জাহান।
উচ্চশিক্ষার জন্যই ঢাকায় এসেছেন সাজিয়া। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন; থাকেন ইস্কাটনে। গাড়িতে উঠতেই পরিচিত আরেক তরুণী বলে উঠলেন, ‘তুই হন্ডে যদ্দে? বালা আছছ না তুই (তুই কই যাচ্ছিস? ভালো আছিস তুই)?’
উত্তরে সাজিয়া বললেন, ‘আফু, আঁই তো বালা আছি। বউত দিন ফর তুঁয়াল্লই দেহা অইলো দে এনা। তুঁই ক্যান আছ (আপু, আমি ভালো আছি। অনেক দিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো। তুমি ভালো তো)?’
আরও কয়েক লাইন এগোয় দুজনের আলাপচারিতা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ‘চাটগাঁইয়া’ ভাষায় কথা বলছিলেন তারা।
তাদের আলাপের ফাঁকে বাসের কয়েকজন যাত্রী অবাক দৃষ্টিতে তাকান, আবার কেউ কেউ হেসে ফেলেন। হাসতে হাসতে কী যেন বলে নিজেদের মধ্যে।
সেদিকে খুব একটা কান দেন না সাজিয়া, তবে বিষয়টি তার জন্য বিব্রতকর। আলাপ সংক্ষিপ্ত করে বসে পড়েন নিজের আসনে।
সাজিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এমন ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটে। পরিবারের কারও ফোন এলে বন্ধুদের সামনে চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলতে গেলেও কটাক্ষের শিকার হতে হয়। শুরুতে অনেক খারাপ লাগত। এখন গা সয়ে গেছে। আবার বন্ধুরাও বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছে।’
সাজিয়ার মতো এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন অনেকেই। বিশেষ করে বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে কটাক্ষ, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শিকার হতে হয়।
একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত পটুয়াখালীর ছেলে রাশেদ রহমান অমিত। সরাসরি সম্প্রচার বা প্রতিবেদন তৈরিতে কণ্ঠ রেকর্ডের সময় প্রমিত বাংলায় কথা বলেন, তবে এর বাইরে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য তার।
অমিত বলেন, ‘বন্ধুদের আড্ডায় ভাষার জন্য খোঁচা যে খাইনি, তা কিন্তু নয়, তবে এসব আমি থোড়াই কেয়ার করি। আমার কিছু যায় আসে না; বরং পটুয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেই আমি ভালোবাসি। মনে শান্তি লাগে।’
চাটগাঁইয়া ভাষার মধ্যে মহাপ্রাণ ধ্বনি হারিয়ে যায়। এ ছাড়া ও-কারান্ত আর উ-কারান্ত বর্ণকে আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ে। যেমন: ‘বোন’ শোনা যায় ‘বুন’-এর মতো।
নোয়াখালীর অঞ্চলের ভাষার মধ্যে ‘প’-এর উচ্চারণ ‘ফ’-এর মতো শোনায়। আবার ‘পানি’কে তারা বলেন ‘হানি’।
সিলেটি ভাষার দিকে তাকালেও উচ্চারণগত নানা তারতম্য দেখা দেয়। ‘সিলডি বাষা অইল অন্যান্য বাষার চেয়া ফুরাফুরি আলাদা’, যার অর্থ হলো: সিলেটের ভাষা হলো অন্যান্য ভাষার চেয়ে পুরোপুরি ভিন্ন।
আবার কন্যা শব্দটিকে চট্টগ্রামে বলা হয় ‘মাইয়েফোয়া’, সিলেটিরা বলে ‘ফুরি’, বরিশালে বলা হয় ‘ছেমরি’। আর এমন সব শব্দের ভিন্নতা নিয়ে ভাষাকে ব্যঙ্গ করতে প্রচলিত আছে নানা কৌতুক।
অনেকেই ঠাট্টাচ্ছলে বলেন, বাংলা ভাষা সিলেটে গিয়ে আহত হয়, আর নোয়াখালী পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে গিয়ে হয় নিহত।
এটি প্রচলিত কৌতুক হলেও এতে আপত্তি আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকউল্লাহ খানের। তার মতে, আঞ্চলিক ভাষার কারণে উল্টো সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা।
রফিকউল্লাহ খান বলেন, ‘ভাষা একেকটি অঞ্চলের সংস্কৃতিকে লালন করে। তাদের ভূগোলকে লালন করে। তাদের উচ্চারণের যে সরলতম পদ্ধতি, সেই পদ্ধতিকে লালন করে। আমার মনে হয় কোনো একটি অঞ্চল, অন্য আরেকটি অঞ্চলের ভাষা নিয়ে কৌতুক করতেই পারে। সেটাকে কৌতুকের পর্যায়ে রাখাই ভালো, কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি এবং এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষা কাঠামো এবং আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার আমার মনে হয় না যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে।’
মুখের বুলি যত বৈচিত্র্যময় হবে, বাংলা ভাষা তত সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. রফিকউল্লাহ খান।
তিনি বলেন, ‘একটা ভাষার মধ্যে অনেকগুলো আঞ্চলিক রূপ সেই ভাষার ধ্বনিগত তাৎপর্যকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।’
তাই আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাসঙ্গিক মনে করেন না এই শিক্ষক।
তিনি বলেন, ‘যখন আমি গ্রামে যাই, তখন ঢাকা শহরের এবং বাংলাদেশের একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকের ভাষায় কথা বলি না। আমি সেখানে আমার অঞ্চলের প্রিয় মানুষদের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষাতেই কথা বলি।’
আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতির পক্ষ নিয়েই কথা বলেছেন কথাসাহিত্যিক শাহনাজ মুন্নী।
নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে যে মাধুর্য আছে, অবশ্যই আমি মনে করি তার স্বীকৃতি দেয়া উচিত। এটাতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কারণ সেটা যদি আমার অঞ্চলের ভাষা হয়, সেই ভাষায় যদি আমি কথা বলি, সেটা যদি আমার পরিমণ্ডলের হয়, সেটা নিয়ে লজ্জা পাওয়ারও কিছু নেই, হীনমন্যতায় ভোগারও কিছু নেই।’
আনুষ্ঠানিক কথা বলায় প্রমিত বাংলাকে উৎসাহ দেয়ার পক্ষে এ কথাসাহিত্যিক।
তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক ভাষাকে হেয় করার বা দেখার যে প্রবণতা, এই মানসিকতা আমাদের দূর করতে হবে। কারণ প্রতিটা অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা বৈশিষ্ট্য আছে। সেটা থাকবেই। এটা খুব স্বাভাবিক। পৃথিবীর সব দেশের, সব অঞ্চলের ভাষাতেই আঞ্চলিক টান থাকে। এটা মানুষের সহজাত ব্যাপার।’
আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার কারণে কটাক্ষ করা নিয়ে ঘোর আপত্তি আছে তার। ‘কটাক্ষ করা, ব্যঙ্গ করা, খোঁচা দেয়া, লজ্জা দেয়া, কেউ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা মানে তিনি অশিক্ষিত, মূর্খ, অভদ্র এসব ভাবার সুযোগ নেই; বরং এমন মানসিকতা পরিহার করা উচিত এবং প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব থাকা উচিত, সমান মর্যাদা থাকা উচিত।’
সাহিত্যে আঞ্চলিকতা ও কথ্যরূপ
আঞ্চলিকতা শুধু মুখের ভাষাতে আটকে নেই। আঞ্চলিক ভাষায় তৈরি হয়েছে শক্তিশালী সাহিত্যও।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান উদাহরণ হিসেবে সামনে আনেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য ‘নুরলদীনের সারাজীবন’-এর কথা। এই কাব্যনাট্যের জনপ্রিয় সংলাপ ছিল ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তার অর্থ, ওই অঞ্চলের অস্তিত্বকে, আত্মপ্রকাশের কাঠামোকে সেখানে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে কোনোভাবে প্রমাণ হয় না আঞ্চলিক ভাষা বাংলা ভাষার জন্য ক্ষতিকর। সেটা বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করছে; বৈচিত্র্যময় করেছে।’
ভাষা ও সাহিত্যের জন্য লোকজীবন, লোকসংস্কৃতি, লোকসংগীতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের যে লোকসংগীত, সেই লোকসংগীতে কি প্রমিত বাংলা ব্যবহৃত হয়? না তো। কিন্তু আমরা তো সেটা ত্যাগ করিনি। সেটা আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে।’
সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার নিয়ে শাহনাজ মুন্নী বলেন, ‘কুষ্টিয়া অঞ্চলের গল্প যদি বলি, তাহলে যদি ওই ভাষায় আমি লিখি, শুধু সংলাপ না, পুরো উপন্যাসও ওই ভাষায় লেখা যায়, লেখা সম্ভব।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি সামনে আনেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক হাসান আজিজুল হকের ‘আগুন পাখি’ উপন্যাসকে। তিনি বলেন, ‘সেটা তো পুরো আঞ্চলিক ভাষায় লেখা। একজন নারীর কথ্য ভাষায় লেখা।’
মাহবুব লীলেন পুরো মহাভারতটাই লিখেছেন কথ্যভাষায়। তার বই অভাজনের মহাভারত কথ্যরূপের একটি স্বার্থক উদাহরণ। লেখক বলতে চান, এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা না, এটা আগামীর ভাষা। সেই ভাষাটিকে তিনি এগিয়ে নিতে চান তার লেখনীতে।
তিনি বলেন, ‘আমার কথা হইল, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণগো মিলিত চেষ্টায় বর্তমানে আগামীর বাংলা ভাষাটা তৈরি হইতেছে। সেইটা ধরার চেষ্টা করছি আমি।’
এখন পর্যন্ত মাহবুব লীলেনের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২, যার মধ্যে ১১টি বই লেখা হয়েছে প্রচলিত বাংলায়। লীলেন বলেন, ‘২০১৫ সালে পয়লা আমি ভাষা বদলাই অভাজনের মহাভারত দিয়া।’
এর পেছনে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষার মূল চরিত্রটা হইল, কথা কইতে গিয়া যদি কোনো শব্দ মুখে আটকাইয়া যায় কিংবা চেহারা ভচকাইয়া তার উচ্চারণ করা লাগে, তবে বাঙালি সেই শব্দটা বদলাইয়া ফালায়। দরকার পড়লে নতুন শব্দ বানায়; সুযোগ থাকলে বাইর থাইকা আইনা বাংলার লগে ফিট কইরা দেয়।
‘এই পুস্তকে (অভাজনের মহাভারত) আমি সমস্ত বাঙালি জাতির ভাষা থাইকা যখন যে শব্দ পছন্দ হইছে, সেইটাই নিছি। খালি খেয়াল রাখছি কোথাও আটকায় কি না। চেষ্টা করছি সহজিয়া বাংলায় গল্পগুলান কইতে, যেমনে মহাভারতের গল্পখান কইতে দিলে কইত বাংলার পালাকার কিচ্ছাকার বয়াতি বাউলেরা।’
আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণে নেই উদ্যোগ
আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই বাংলা একাডেমির, তবে আঞ্চলিক ভাষার অভিধানের কলেবর বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে প্রতিষ্ঠানটির।
বাংলা একাডেমির পরিচালক (গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগ) মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমার জানা মতে, বাংলা একাডেমির এই ধরনের কোনো উদ্যোগ নেই। মূলত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট হওয়ার পরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা এগুলো নিয়ে কিছু কাজ বোধ হয় তারা করছে।’
অবশ্য বাংলা একাডেমি এ বিষয়ে একেবারে নীরব আছে, এমন মনে করতে নারাজ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোবারক হোসেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমির কাজ নেই, এমনটা নয়। দেশের প্রথম আঞ্চলিক ভাষার অভিধান বাংলা একাডেমি করেছে একবার। আমাদের নতুন একটা উপবিভাগ করা হয়েছে অভিধান ও বিশ্বকোষ। আমরা অবশ্যই ওই কাজের দিকে হাত দেব।’
আঞ্চলিক ভাষা বিপণ্ন হচ্ছে এমনটা মনে করেন না আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (ভাষা, গবেষণা ও পরিকল্পনা) মো. শাফীউল মুজ নবীন।
যদিও অভিবাসন প্রক্রিয়া আর অনুপ্রবেশের কারণে পুরান ঢাকার আদি কুট্টি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।
শাফীউল মুজ নবীন বলেন, ‘ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। এটি গ্রহণ-বর্জনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায়।’
আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে কেউ গবেষণা করতে চাইলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের দুয়ার খোলা বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি তহবিল অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। কোনো গবেষক আগ্রহী হলে আমরা তাদের বৃত্তি দেব। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আগ্রহী গবেষকরা আবেদন করতে পারবেন।’
আগামী অর্থবছর থেকে গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন শাফীউল মুজ নবীন, তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে সেটা আরও আগেও হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গবেষকদের জন্য বঙ্গবন্ধু গবেষণা ট্রাস্ট ঘোষণা করেছেন। সেই ফান্ড থেকেও গবেষণা খাতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট অর্থ পাবে বলে আশা তার।
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ছবি: সংগৃহীত
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, চীন-মিয়ানমার করিডোরে বাংলাদেশ যুক্ত হলে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ট্রাকযোগে বাংলাদেশ থেকে চীনে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল হবে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও চট্টগামে ৮০০ একরের একটি চাইনিজ শিল্প পার্ক স্থাপনের ব্যাপারে কিছুদিন আগেই মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগদানকারী নবীন আইনজীবীদের কর্মশালা ও নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী, শীর্ষ নেতারা ও বড় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। এর ফলে আগামী দিনে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক চীনা বিনিয়োগ আসবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমবে।
তিনি বলেন, চীন ইতোমধ্যে আমাদের সব পণ্য শুল্কমুক্ত করে দিয়েছে। আমাদের কাছে একটাই সম্ভাব্য উপায় যেটি আমরা অনুসরণ করছি। আর তা হলো, বাংলাদেশে বেশি বেশি চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
শাহজালাল মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে স্থান দেওয়া হয়নি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রে বিচারহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হলে সামাজিক চুক্তি ও আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার- সমতা, বৈষম্যহীনতা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নে আইনজীবীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় অনলাইন জুয়া প্রতিরোধকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিলাম। এ লক্ষ্যে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, যা সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে শিগগিরই পাস হবে। একই সঙ্গে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ রয়েছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে সরকার, বিচার বিভাগ, আইনজীবী এবং সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও আইনজীবী সমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন প্রতিকূল সময়ে বহু বিচারপতি ও আইনজীবী ব্যক্তিগত ও পেশাগত ঝুঁকি নিয়েও আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখতে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছেন। সিলেটের আইনজীবী ও বিচারকরাও এ ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
তিনি বলেন, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি আধুনিক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আইনবিষয়ক গবেষণা, কেস স্টাডি বিশ্লেষণ এবং আদালতে কার্যকর উপস্থাপনার ওপর ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আইনজীবীদের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে দক্ষ আইনজীবী ও বিচারক তৈরিতে সহায়ক হবে।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম ইয়াহ-ইয়া চৌধুরী সুহেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. জুবায়ের বখত জুবের, ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ এরফান উল্লাহ, বিভাগীয় স্পেশাল জজ এম আলী আহমদ, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসাম ইমাম, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুদীপ্ত তালুকদার, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম, জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
ফাইল ছবি
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নবায়ন বাধ্যতামূলক করার কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এনআইডির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হলে অবশ্যই নবায়ন করতে হতে পারে। ইসি জানিয়েছে, আইন ও বিধিমালায় এনআইডি নবায়নের বিষয়টি থাকলেও তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে বিষয়টি এখন বাধ্যতামূলক করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ১৫ বছর দীর্ঘ সময়। এই সময়ের মধ্যে মানুষের চেহারায় অনেক পরিবর্তন আসে। অনেকে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন করেন। অনেকেই সার্জারির মাধ্যমে জেন্ডার চেঞ্জ করেন। আবার মানুষের আঙুলের ছাপেরও পরিবর্তন আসে কোয়ালিটি কমে যাওয়ার মাধ্যমে। ব্যক্তির পরিচিতি নিশ্চিত করতে এমন ক্ষেত্রে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। তাই নবায়ন বাধ্যতামূলক করার আলোচনা চলছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০১০ এর ধারা ৭(১)-এ বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন কোনো নাগরিককে প্রদত্ত জাতীয় পরিচয়পত্রের মেয়াদ হবে, তা প্রদানের তারিখ থেকে ১৫ বছর। আইনের ২ ধারাতে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বে বা পরে নবায়নের জন্য প্রত্যেক নাগরিককে নির্ধারিত পদ্ধতি ও ফি প্রদান সাপেক্ষে কমিশনের কাছে আবেদন করতে হবে।
এদিকে জাতীয় পরিচয়পত্র বিধিমালার ৫ বিধিতে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র নবায়নের জন্য প্রত্যেক নাগরিক বা ক্ষেত্রমতো তার আইনানুগ অভিভাবককে ফরম-৫ অনুযায়ী সরাসরি অথবা কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করতে হবে।
সরাসরি আবেদনের ক্ষেত্রে, বিধি ৮-এর উপবিধি (২) অনুসারে ফি পরিশোধপূর্বক রশিদের কপি আবেদনের সহিত সংযুক্ত করে ‘জরুরি’ বা ‘সাধারণ’ হিসাবে দাখিল করতে হবে অথবা অনলাইনে আবেদনের ক্ষেত্রে ফি পরিশোধপূর্বক রশিদের স্ক্যানকৃত কপি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ‘জরুরি’ বা ‘সাধারণ’ হিসেবে দাখিল করতে হবে।
‘জরুরি’ আবেদন কমিশনে এবং ‘সাধারণ’ আবেদন স্থানীয় কার্যালয়ে দাখিল করতে হবে এবং আবেদনপত্র প্রাপ্তির পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদন ফরম এর অংশ ‘ক’ স্বাক্ষর করে তা আবেদনকারী বা তার আইনানুগ অভিভাবককে ফেরত দেবেন অথবা অনলাইনে আবেদনের ক্ষেত্রে আবেদনকারী বা তার আইনানুগ অভিভাবক বরাবর মোবাইল নম্বর বা ই-মেইল ঠিকানায় অংশ ‘ক’ পাঠাবেন।
তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদনপত্রে কোনো ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা পরিলক্ষিত হলে তিনি অংশ ‘ক’-এ তা উল্লেখ করে ওই ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা দূরীকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য আবেদনকারী বা তার আইনানুগ অভিভাবককে আবেদনপত্রটি ফেরত দেবেন এবং আবেদনকারী বা তার আইনানুগ অভিভাবক ওই ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা দূরীকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে দ্রুত আবেদনপত্র পুনরায় দাখিল করবেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সন্তুষ্ট হলে আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক ফিচার দেওয়ার জন্য তারিখ নির্ধারণপূর্বক অংশ ‘ক’ দেবেন।
সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে অংশ ‘ক’-এ উল্লিখিত তারিখে কমিশন বা স্থানীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হইয়ে বায়োমেট্রিক ফিচার প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন করতে হবে। এখানে বায়োমেট্রিক ফিচার বলতে আঙুলের ছাপ, হাতের ছাপ, তালুর ছাপ, চোখের আইরিশ, মুখাবয়ব, ডিএনএ, স্বাক্ষর ও কণ্ঠস্বরকে বোঝানো হয়েছে। বর্তমানে কেবল আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ নেওয়া হচ্ছে।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক ফিচার গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন করে আবেদন ফরম এর অংশ ‘খ’ স্বাক্ষর করে আবেদনকারী বা তার আইনানুগ অভিভাবককে দেবেন।
এসব কার্যক্রম সম্পন্ন হবার পর কমিশন অংশ ‘খ’-এ উল্লিখিত তারিখে পুরাতন জাতীয় পরিচয়পত্র ফেরত প্রদান সাপেক্ষে পুরাতন জাতীয় পরিচয়পত্র নবায়নপূর্বক আবেদনকারী বা তার আইনানুগ অভিভাবককে ফরম-২ বা ফরম-৪ অনুসারে একই নম্বরে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
বিধিমালায় জরুরি আবেদনের জন্য সাতদিন ও সাধারণ আবেদনের জন্য ৩০ দিন সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। জরুরি আবেদনের জন্য ১৫০ টাকা এবং সাধারণ আবেদনের জন্য ১০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনআইডির মেয়াদ ১৫ বছর হলে নবায়ন করার বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, এটা হচ্ছেই। কেউ চাইলে যখন তখন নবায়ন করতে পারেন; আবেদন করে নতুন এনআইডি নিচ্ছেন হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে।
১৫ বছরে চেহারায় বা অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যক্তির যে পরিবর্তন আসে, এতে অনেকেই কারসাজির আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পায়—এমন বিষয় উত্থাপন করা হলে ইসি সচিব বলেন, বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, তাও আমরা ভেবে দেখব, আলোচনা চলছে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নথিতে উত্থাপন করা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি খুব করে চাই। কেননা, বিধিতে আছে। তবে সেখানে ফি নির্ধারণের বিষয় আছে। ফি ছাড়াই করা যায় কি না, সেটাও ভাবা হচ্ছে। তবে এই প্রস্তাব আমরা জোরালোভাবে দেব। কেননা ১৫ বছরে কেউ দাড়ি রাখতে পারেন, কারো চেহারায় অন্য পরিবর্তন আসতে পারে। কাজেই অসদুপায় অবলম্বনের একটা সুযোগ থেকে যায়।
নির্ধারিত ফি কত টাকা: সাধারণত মানুষ এনআইডি নষ্ট বা পুরাতন হয়ে গেলে নিজ থেকেই নতুন এনআইডির জন্য আবেদন করেন। এক্ষেত্রে ফি কিছুটা বেশি। প্রথমবার আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণ হলে ২০০ টাকা, জরুরি হলে ৩০০ টাকা; দ্বিতীয়বার আবেদন করলে সাধারণ ৩০০ টাকা ও জরুরি ৫০০ টাকার আর পরবর্তী যে কোনোবার সাধারণ আবেদনের জন্য ৫০০ টাকা এবং জরুরি হলে ১০০০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে। এক্ষেত্রে দুই ধরনের অসুবিধা আছে। প্রথমত, হারানো বা নষ্ট হওয়ার জন্য নতুন এনআইডি পেতে যে আবেদন করা হয়, সে জন্য এনআইডির তথ্যে কোনো পরিবর্তন হয় না। টাকাও লাগে বেশি। দ্বিতীয়ত নবায়ন করা হলে ছবি, আঙুলের ছাপ, আইরিশের মতো তথ্যে পরিবর্তন হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির পরিচয় যাচাই আরও সহজ হয়। টাকাও লাগে কম।
এ বিষয়ে এনআইডি মহাপরিচালক এএইচএম আনোয়ার পাশা বলেন, এখনো বিষয়টি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। দেখা যাক কী হয়।
ফাইল ছবি
ঢাকার তুরাগ নদীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ ভাসার খবর ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বাহিনীটি বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সদরদপ্তর এই অনুরোধ জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, একটি মহল এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। যারা এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর রয়েছে।
কেউ এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
এই ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
ফাইল ছবি
ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করতে আগামী ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘বাংলা কিউআর’। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, একক এই কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে, কমবে নগদ টাকার ব্যবহার ও প্রতারণার ঝুঁকি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন এই নিয়মের ফলে ছোট থেকে বড় সব ধরনের ক্যাশলেস লেনদেন সহজ হবে।
এখন থেকে একজন বিক্রেতার দোকানে নগদ, বিকাশ, রকেট বা বিভিন্ন ব্যাংকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কিউআর কোড ঝুলিয়ে রাখতে হবে না। একটিমাত্র সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করেই যেকোনো গ্রাহক সহজে তার পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার বলেন, ‘ক্যাশলেস লেনদেনকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। ডিজিটাল এই পদ্ধতিতে লেনদেন বাড়লে টাকা ছাপানোর খরচ যেমন কমবে, তেমনি আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।’
আরেক ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান জানান, ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় শপিংমল- সবখানেই নগদ টাকার লেনদেনের ঝুঁকি কমাবে এই বাংলা কিউআর। এর মাধ্যমে দেশের রাজস্ব আয়ও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডিজিটাল লেনদেনে মোট প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে ৮১ হাজার ৪২৩টি। এসব জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। বাধ্যতামূলকভাবে সর্বজনীন বাংলা কিউআর চালু হলে এই ধরনের প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। শনিবার রাজধানীর মগবাজারে সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান তারা।
সংগঠনের নেতারা বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে মুদি দোকান, প্রসাধন সামগ্রীর দোকানসহ ১৬টি খুচরা ও সেবামূলক খাতকে সুনির্দিষ্ট করের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে এবারের বাজেটে। কিন্তু অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করবেন তা স্পষ্ট নয়। তারা বলেন, রাজস্বের বেশিরভাগই আসে বড় প্রতিষ্ঠান থেকে। ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ অনেক বেশি এসব প্রতিষ্ঠানেই। তাই খুচরা পর্যায়ে হয়রানি বন্ধ করার আহ্বান জানান তারা।
ব্যবসায়ী নেতাদের উপস্থাপিত তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে লার্জ ট্যাক্সপেয়ার্স ইউনিটের (এলটিইউ) মাত্র ১০৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে আসে মোট ভ্যাটের ৬০ শতাংশ। বৃহৎ ৫০০টি প্রতিষ্ঠান দেয় মোট ভ্যাটের ৯৮ শতাংশ, আর বাকি লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর অবদান মাত্র ২ শতাংশ। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এ বাস্তবতায় রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান মনোযোগ হওয়া উচিত বড় করদাতাদের ওপর।
দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, দেশে প্রকৃত ভ্যাটদাতার সংখ্যা বাড়াতে খুচরা পর্যায়ে হয়রানি বন্ধ করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত অটোমেশন (স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি) চালু করা হোক। একই সঙ্গে এনবিআরকে খুচরা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে বড় খাতগুলো থেকে এবং উৎস পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ের দাবি জানান হেলাল উদ্দিন।
প্রস্তাবিত বাজেটে ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেন সড়ক নির্মাণে বিশেষ অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষ। শনিবার সকালে রাজধানীর প্রেসক্লাবের সামনে দীর্ঘ লাইনের এক মানববন্ধনে এই দাবি জানানো হয়।
এ সময় বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত, নদীভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং কুয়াকাটায় বিমানবন্দর করার দাবিও আসে। মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।
আলাল বলেন, ‘জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হয়। মানুষ বড় প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন ও বিভাগ প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো স্মরণ রেখেই তারা আশা করছে, বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত সরকার বরিশালের প্রতি ন্যায্য দৃষ্টি দেবে।
দেশের সব অঞ্চলের উন্নয়ন হোক, সেটিই তারা চান বলে জানান তিনি। বরিশালের ন্যায্য দাবি ও প্রাপ্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়, মনে করেন আলাল।
তারা সরকারের অংশ না হলেও সংসদে বরিশালের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে জানিয়ে আলাল বলেন, ‘স্পিকার, চিফ হুইপ, বরিশালের কয়েকজন মন্ত্রী এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। তাই বরিশালের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংসদে জোরালোভাবে উত্থাপন করা উচিত।’
তার দাবি, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেন সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, সহকারী, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিতে হবে।
আলাল বলেন, ‘শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে বরিশাল মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা উচিত।’ একই সঙ্গে নদীভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে সেখানে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাই ওই এলাকাকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে।’
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের ভাঙনের প্রসঙ্গ তুলে আলাল বলেন, ‘সৈকতের অনেক অংশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ঐতিহ্যও নষ্ট হচ্ছে।’ এ বিষয়ে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জাতীয় সংসদে বিষয়টি জোরদারভাবে উত্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দেশটিতে বর্তমানে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার ব্যাপারে দেশটির সরকার ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে শনিবার (২৭ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই কূটনৈতিক সাফল্যের তথ্য নিশ্চিত করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু করার পাশাপাশি সেখানে নানা জটিলতায় অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন। এর পাশাপাশি মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধানে ঢাকাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। একই সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রভাবশালী আঞ্চলিক জোট আসিয়ানে (ASEAN) বাংলাদেশের সদস্যপদ বা ডায়ালগ পার্টনারশিপ অর্জনের চলমান প্রচেষ্টায় কুয়ালালামপুর দৃঢ় সমর্থন জানাবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রসঙ্গে মন্ত্রী খলিলুর রহমান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন এক নতুন ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আন্তরিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর শেয়ার করা ঐতিহ্যবাহী ‘মহাজাদু’ গানটিও এখন দুই দেশের মধ্যকার গভীর ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একটি অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের নানাবিধ সুদূরপ্রসারী অর্জনের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের উত্তর বর্গের অর্থনৈতিক লাইফলাইন খ্যাত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা তিস্তা প্রকল্প’ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে চীন। এই লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিতে দুই দেশই যৌথভাবে একমত প্রকাশ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে সামগ্রিক মূল্যায়ন করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জোরালোভাবে বলেন, এবারের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও অনেক বেশি গভীর, মজবুত ও বন্ধুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
মন্তব্য