সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের মজুত ২০ লাখ টনের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই সরকারিভাবে এত খাদ্যশস্য মজুত ছিল না, কিন্তু বিস্ময়কর হলো তারপরও চালের দাম কমছে না; উল্টো বাড়ছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে বুধবার রাজধানীর বাজারগুলোতে ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে মোটা চাল বিক্রি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর সরু চাল (মিনিকেট-নাজিরশাইল) বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৬৮ টাকা কেজি দরে। এক বছরে বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বুধবার দেশে মোট খাদ্যশস্য মজুতের পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ২ হাজার টন। এর মধ্যে চালের মজুত হচ্ছে ১৬ লাখ ৯৪ হাজার টন। গম ২ লাখ ৭৭ হাজার; আর ধান ৪৯ হাজার টন।
অতীতের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, সরকারিভাবে চালের এত মজুত আগে কখনই ছিল না। গত বছর এই সময়ে সরকারের গুদামে খাদ্যশস্যের মজুতের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ২১ হাজার টন। এর মধ্যে চালের মজুত ছিল ৫ লাখ ৩৭ হাজার টন, যা মজুত হিসেবে ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে কম।
‘বর্তমান মজুত সন্তোষজনক’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আমন ধান, চাল ও গম সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং বিদেশ থেকে চাল আমদানির কারণে খাদ্যশস্যের মজুতে রেকর্ড হয়েছে।
আমনের ভালো ফলন আর সবশেষ বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনের রেকর্ড হলেও বুধবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পুরোনো চালের দাম কেজিতে অন্তত দুই টাকা করে বেড়েছে।
রাজধানীর শেওড়াপাড়ার একটি মুদি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভালো মানের সরু চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬৮ থেকে ৭০ টাকা; যা এক মাস আগেও ছিল ৬৫ থেকে ৬৬ টাকা।
মুদি দোকানের মালিক রিপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে মোটা চালের দাম বাড়েনি। তবে পুরোনো সরু চালের দাম দুই টাকার মতো বেড়েছে।’
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে মোজাম্মেল রাইস এজেন্সির আড়ত রয়েছে। এখান থেকে ঢাকা শহরে পাইকারি দামে চাল সরবরাহ করা হয়।
এই আড়তের কর্ণধার মতিউর রহমান তরু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক মাস ধরে মিনিকেট ও নাজিরশাইলের বাজার বাড়তি। গত এক সপ্তাহেও এ দুটো চালের ৫০ কেজির বস্তা ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।’
তিনি জানান, নতুন মৌসুমের নাজিরশাইল চাল প্রতি কেজি ৫৮ টাকা এবং পুরান মৌসুমের চাল ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে দাম বেড়েছে ২ টাকা করে।
রেকর্ড মজুতের পরও কেন বাজারে চালের দাম না কমে উল্টো বাড়ছে, এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ও ব্যবসায়ীরা।
চলতি আমন মৌসুমে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৩ লাখ টন আমন ধান এবং ৫ লাখ টন সিদ্ধ আমন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। এর মধ্যে গত জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ৪ লাখ টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে।
সোমবার রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবৈধ মজুতদারি রোধে করণীয় ও বাজার তদারকিসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার রেকর্ড পরিমাণ মজুতের পরও চালের চড়া দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘গতবার আম্পানে ধান নষ্ট হয়েছে। ভালো সংগ্রহ হয়নি। সর্বনিম্ন মজুত ছিল চার লাখ মেট্রিক টন। সেই সময়ও চালের দাম বাড়তে দিইনি। এবার বোরোতে যেমন বাম্পার ফলন হয়েছে, আমনেও বাম্পার ফলন। জাতীয় মজুত সর্বকালের সেরা, ২০ লাখ টনের বেশি। এখন চালের দাম বাড়ছে। এটা হাস্যকর। এখন চালের দাম বাড়াটা ভালো ঠেকছে না। হয়তোবা এই তিন বছর পরে আপনাদের কাছে আমার নতুন করে শিক্ষা নিতে হবে। আমার এই তিন বছর বরবাদ গেল। আমার সারাজীবনের রাজনীতিই বরবাদ।
সম্প্রতি ঢাকায় ডি-৮ সম্মেলন উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে চালের দাম নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, চালের উৎপাদন প্রতি বছর বাড়ছে। বাজারে চালও আছে পর্যাপ্ত। গত বোরো মৌসুমে (২০২০-২১ অর্থবছর) ২ কোটি ৮ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদিত হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
একই সময়ে সব ধরনের খাদ্যের উৎপাদনও বেড়েছে। মোটা চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন, গম ১২ লাখ টন, ভুট্টা ১৭ লাখ টন, আলু এক কোটি ৬ লাখ টন এবং পেঁয়াজের উৎপাদন এক লাখ টন বেড়ে ৩৩ লাখ টন হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেও চালের দাম বাড়ছে কেন, প্রশ্ন করা হলে কৃষিমন্ত্রী রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘দাম বৃদ্ধির বৈশ্বিক কারণ ছাড়াও একটা বড় কারণ হচ্ছে সম্প্রতি গমের দাম বেড়ে যাওয়া। গমের দাম বাড়লে চালের দামও বাড়ে।
‘এখন গমের দাম চালের চেয়েও বেশি। যখন আটার দাম কম থাকে তখন মানুষ আটা খায়। এখন আটার দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে মানুষ আটা খাওয়া ছেড়ে দিয়ে চাল খাওয়া শুরু করেছে।
‘প্রতি টন গম ২৫০ থেকে ৩০০ ডলারে আমদানি করা যেত কয়েক বছর আগে। এখন তা আমদানি করতে হচ্ছে ৪৫০ ডলারে।’
টিসিবির হিসাবে দুই মাস ধরে আটার দাম বেড়েছে। এক বছর আগের তুলনায় আটার দাম বেড়েছে ২৪ থেকে ৩৮ শতাংশ। খুচরা বাজারে এখন খোলা আটা ৩৮ টাকা আর প্যাকেট আটা প্রতি কেজি ৪৫ টাকা।
এদিকে চাল ও আটার দাম লাগামের মধ্যে রাখতে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে মূল্য সহায়তা প্রদান এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে ২০১২ সালে ওএমএস ব্যবস্থা চালু করে সরকার। এ ব্যবস্থায় বর্তমানে দেশব্যাপী ডিলারদের দোকান ও খোলা ট্রাকের মাধ্যমে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা ও আটা ১৮ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। একজন ক্রেতা একবারে সর্বোচ্চ ৫ কেজি করে চাল ও আটা কিনতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যসচিব ড. মোছাম্মাৎ নাজমানারা খানুম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনাকালে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় খাদ্য মন্ত্রণালয় সরকারি গুদামগুলোতে এরই মধ্যে খাদ্যশস্যের বাফার মজুত গড়ে তুলেছে। এখন আমাদের খাদ্যশস্যের মজুতের পরিমাণ ২০ লাখ টনের বেশি। এই বাফার মজুত দেশে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে। এর পাশাপাশি বাজার পর্যায়ে দাম সহনীয় রাখতে আমরা ওএমএস কার্যক্রমও জোরদার করেছি। উদ্দেশ্য এই করোনা পরিস্থিতিতে যাতে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ কম দামে চাল বা আটা কিনতে পারেন।’
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং করোনা বিধিনিষেধের মধ্যে চাপে আছে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ পরিস্থিতিতে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ওএমএসের আওতা বৃদ্ধি এবং দেশে খাদ্যশস্যের বাফার মজুত কিছুটা হলেও ক্রেতা-ভোক্তার জন্য স্বস্তিদায়ক হবে বলে মনে করছেন দেশে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান।
নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘খোলাবাজারে চাল-আটা বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রম জোরদার হলে বাজারে ওই পণ্যগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যার সুফল ভোক্তারা পাবে।’
তিনি বলেন, ‘বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারি গুদামে নিরাপত্তা মজুত হিসেবে অন্তত ১০ লাখ টন চাল থাকতে হয়। এর বাড়তি থাকা আরও ভালো। খাদ্যশস্যের বর্তমান মজুত দিয়ে দেশে চাল ও আটার দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি যে কোনো সংকট মোকাবেলা সম্ভব।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মজুত বেড়েছে, এটা ভালো। কিন্তু দাম কেন বাড়ছে, সেটার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেউ কারসাজি করে বা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দাম বাড়িয়ে দিয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎপাদন বাড়বে; মজুত রেকর্ড হবে; দাম কমবে না- এটা মেনে নেয়া যায় না।’
তিনি বলেন, ‘লকডাউন ও করোনার কারণে পেশা হারিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের অবশ্যই কম দামে খারাপ দিতে হবে।’
চালের দাম কেন কমছে না- এ প্রশ্নের উত্তরে চালকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো, মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, ‘চালের দাম বাড়ার সঙ্গে মিলমালিকরা আদৌ দায়ী নন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ধান কিনে চাল উৎপাদন করি। অতিরিক্ত মুনাফা করলে আমরা দায়ী। আমরা কখনই অধিক হারে চালের দাম বাড়াই না। চালের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আদৌ মিলাররা (চালকল মালিক) জড়িত নন। এমন অভিযোগের ভিত্তি নেই।’
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস লিমিটেড। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় বাচ্চা উৎপাদনের উপযোগী ১০ হাজার ৪৪০টি ডিম বা ‘হ্যাচিং এগ’ রপ্তানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আজ রবিবার (২৮ জুন) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী করার দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দুয়ার উন্মোচিত হলো, যা দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নাইজেরিয়ায় রপ্তানি করা এই ডিমগুলো মূলত উচ্চমানের ‘রস ৩০৮ ব্রয়লার’ (প্যারেন্ট হ্যাচিং এগস) জাতের। এই সাড়ে ১০ হাজার হ্যাচিং ডিম বিক্রি করে বাংলাদেশের মোট ১৮ হাজার ৭২৯ মার্কিন ডলার (বর্তমান বাজারে প্রায় ২২ লাখ টাকা) বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। আজ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিশেষ রপ্তানি কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, “প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি খাতকে রপ্তানিমুখী হিসেবে গড়ে তোলার যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, তাঁর সেই দূরদর্শী নির্দেশনায় আমাদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতও ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত হচ্ছে। আজকের এই পোলট্রি পণ্য রপ্তানি কার্যক্রম সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।” তিনি আরও যোগ করেন, বাংলাদেশ যখন নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ করে বিদেশে পোলট্রি পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়, তখন তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সক্ষমতা ও উন্নত মানেরই প্রতিফলন ঘটায়।
ভবিষ্যতে নাইজেরিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই বিশেষ ডিম রপ্তানির পরিধি আরও সম্প্রসারিত হবে এবং বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অন্যতম চালিকাশক্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। এই ঐতিহাসিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, শাহজালাল বিমানবন্দরের কোয়ারেন্টাইন স্টেশনের ইনচার্জ মোহাম্মদ ওমর ফারুক, কাজী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান, পরিচালক কাজী জিশান হাসান, কাজী জাহিন হাসান এবং সিইও গাজী এম শামসুদ্দিনসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ ১১৫ দিন আটকে থাকার পর অবশেষে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে অপরিশোধিত তেলবাহী (ক্রুড অয়েল) বিশাল ট্যাংকার ‘নর্ডিক পোলক্স’। ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজটি গত বুধবার (২৪ জুন) নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। আগামী ৬ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই তেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে (ইআরএল) সরবরাহ করা হবে, যা প্রক্রিয়াজাতকরণের পর দেশজুড়ে স্বাভাবিক জ্বালানি চাহিদা মেটাবে।
বিদেশি পতাকাবাহী এই বিশালাকার ট্যাংকারটি গত ১ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে ১ লাখ টন ক্রুড তেল বোঝাই করেছিল। কিন্তু হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজটি সেখানেই আটকা পড়ে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে এই পরিবহন কার্যক্রম তদারকি করছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। দীর্ঘ ৩ মাস ২৫ দিন আটকে থাকার কারণে বিপুল পরিমাণ ডেমারেজ বা বিলম্ব মাশুল তৈরি হলেও বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক নিশ্চিত করেছেন যে, পূর্ব চুক্তির কঠোর শর্তানুযায়ী বিএসসি বা বিপিসি কাউকেই এই অতিরিক্ত খরচের এক টাকাও বহন করতে হবে না; সম্পূর্ণ ডেমারেজ খরচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই মেটাবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো ও আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডিএনওসি) থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যার মূল রুটই হলো হরমুজ প্রণালি। চলতি বছরের শুরুতে এই কৌশলগত নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নর্ডিক পোলাক্স আটকে পড়ে এবং ক্রুড তেলের তীব্র অভাবে গত ১৪ এপ্রিল ইআরএলের শোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত হয়ে যায়। এর ফলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়ে সাময়িক তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল।
এই চরম সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার তখন দ্রুত চড়া মূল্যে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি শুরু করে। একই সঙ্গে বিকল্প রুট হিসেবে সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর এবং ওমান উপসাগরে অবস্থিত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর ব্যবহার করে ক্রুড তেল আনা শুরু হয়, যা হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলে। বিএসসি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা এই বিকল্প রুটগুলোর মাধ্যমেই অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রাখবে, যার ফলে ইআরএলের বর্তমান উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। এর মাঝে ‘নর্ডিক পোলক্স’ মুক্ত হয়ে ফিরে আসা দেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় স্বস্তির খবর।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান ইসলামীক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের আর্থিক অবস্থার ধারাবাহিক অবনতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) কোম্পানিটির লোকসান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর পাশাপাশি, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের ব্যবসায় বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো ধরনের লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। লোকসান বৃদ্ধি ও লভ্যাংশ না দেওয়ার এই দ্বিমুখী ধাক্কায় প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইসলামীক ফাইন্যান্সের শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ০.৯৩ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ০.৬২ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়েছে ০.৩১ টাকা বা প্রায় ৫০ শতাংশ। এছাড়া গত ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৪৬ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটির চরম আর্থিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, বিগত ২০২৫ সালের সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ০.৩৯ টাকা হলেও সার্বিক আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার ‘নো ডিভিডেন্ড’ নীতি গ্রহণ করেছে পর্ষদ। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য ছিল ২.৩৮ টাকা। লভ্যাংশ না দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য আলোচ্য বিষয়াবলি শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতিক্রমে অনুমোদনের জন্য আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আহ্বান করা হয়েছে। এই এজিএমে অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণের জন্য আগামী ৯ আগস্ট রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে সারা দেশে বাধ্যতামূলকভাবে চালু হতে যাচ্ছে সর্বজনীন আন্তঃলেনদেন ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ক্যাশলেস সোসাইটি বা নগদবিহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় নগদ অর্থের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসার পাশাপাশি লেনদেনের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা আরও বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এতদিন দেশের খুচরা বিক্রেতা বা দোকানদারদের বিকাশ, রকেট, নগদ কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের জন্য আলাদা আলাদা কিউআর কোড প্রদর্শন করতে হতো, যা ছিল বেশ ঝামেলার। ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক হওয়ার পর থেকে বিক্রেতাদের দোকানে একটিমাত্র কিউআর কোড থাকবে। গ্রাহকরা তাদের সুবিধাজনক যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাপ ব্যবহার করে সেই একক কোড স্ক্যান করেই দ্রুত পেমেন্ট করতে পারবেন। ফুটপাতের ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় শপিংমল—সর্বত্র এই ব্যবস্থা চালু হলে ছোট-বড় সব ধরনের কেনাকাটা সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার ও হাবিবুর রহমান জানান, এই উদ্যোগের ফলে ডিজিটাল লেনদেনে মানুষের অভ্যস্ততা বাড়বে, যা টাকা ছাপানোর বিশাল খরচ বাঁচাবে এবং সরকারি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এই অনবদ্য প্রসারের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালেই ডিজিটাল লেনদেনে ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গ্রাহকদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রগুলো। এই ঝুঁকি এড়াতে বাংলা কিউআর ব্যবহারের পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের তাদের ব্যক্তিগত পিন (PIN) বা ওটিপি (OTP) গোপন রাখার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কার্যাদেশের ঘাটতি, মালিকদের তীব্র আর্থিক সংকট, শ্রম অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা হ্রাস, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নানা অর্থনৈতিক সংকট সামগ্রিক শিল্প খাতকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ৩৯৮টিই গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অবস্থিত, যার ফলে কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজার হাজার শ্রমিক।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের বাইরের কারখানার সংখ্যাই বেশি—প্রায় ২৮৭টি। বাকি কারখানাগুলোর মধ্যে বিজিএমইএ-র ১০৮টি, বিকেএমইএ-র ৩৫টি, বিটিএমএ-র আটটি এবং বেপজার আওতাধীন ১৯টি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বৈশ্বিক মন্দার কারণে কেবল চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (৩১ মে পর্যন্ত) উৎপাদন ও কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় ৭৯টি কারখানা মোট ৭ হাজার ৭৮৪ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড নামের দুটি বড় কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এর আগে আল-মুসলিম গ্রুপও তাদের কারখানা থেকে ১ হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়।
এই চরম বিপর্যয় থেকে শিল্প খাতকে টেনে তুলতে এবং বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের জন্য আরও ৫ হাজার কোটি টাকার পৃথক বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। তবে বিজিএমইএ এবং অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের কঠোর শর্ত ও জামানতসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এই জরুরি ঋণের সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না।
বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সিআইবি (CIB) প্রতিবেদন সন্তোষজনক না থাকা এবং অদক্ষতার কারণে সব বন্ধ কারখানা হয়তো চালু করা সম্ভব নয়। তবে সংগঠনটির সহসভাপতি শিহাব উদদোজা চৌধুরী জানান, প্রায় ২০০টি বন্ধ এবং ১২৩টি আংশিক বন্ধ কারখানা সরকারের এই আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সিএমএসএমই খাতের জন্য ৭ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ এবং ন্যূনতম ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়ার জন্য তারা সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। আগ্রহী কারখানাগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে ইতিমধ্যেই দুটি নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজিএমইএ, যাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠানো হবে।
আগামী ১ জুলাই থেকে অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌপথে চলাচলকারী সব ধরনের যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযানের বিভিন্ন চার্জ ও সেবামূলক ফি সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাঝে এই ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
সর্বশেষ ২০১৯ সালে সরকার নৌপথের এই ফি বৃদ্ধি করেছিল। দীর্ঘ ৭ বছর পর গত মাসে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে কার্গো জাহাজ, বাল্কহেড ও মাছ ধরার নৌকার সংরক্ষণ ফি (কনজারভেন্সি চার্জ) প্রতি গ্রস টনে বর্তমানের ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে লঞ্চ মালিকদের জন্য বার্ষিক সংরক্ষণ ফি ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা থেকে ১৫০ টাকা করা হয়েছে এবং প্রতি আট ঘণ্টার জন্য পাইলটেজ ফি ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে যাত্রী ও পণ্যবাহী উভয় খাতের মালিকরাই বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন। ঢাকা-বরিশাল রুটের সুন্দরবনস নেভিগেশন কোম্পানির পরিচালক আক্তার হোসেন জানান, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই তারা যাত্রী সংকটে ভুগছেন এবং টিকে থাকতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম নিচ্ছেন। এই অবস্থায় নতুন চার্জ তাদের ক্ষতির মুখে ফেলবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নাজমুল হোসেন হামদু বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া সিমেন্টের কাঁচামাল, গম, ডাল, তেল ও লবণ লাইটার জাহাজের মাধ্যমে সারা দেশে যায়। নৌপথের খরচ বাড়লে তাদের বাধ্য হয়েই জাহাজের ভাড়া বাড়াতে হবে, যা পুরো সাপ্লাই চেইনকে প্রভাবিত করবে।
ব্যবসায়িক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মোট নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই অভ্যন্তরীণ নৌপথে পরিবহন করা হয়। নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ফির কারণে গম, সয়াবিন ও ভুট্টার মতো পণ্য পরিবহনের খরচ প্রতি টনে ৩৬ টাকা পর্যন্ত বাড়বে। এছাড়া আবাসন ও সিমেন্ট খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্লিংকার ও ফ্লাই অ্যাশের মতো কাঁচামাল পরিবহনে বাড়তি খরচের কারণে প্রতি বস্তা সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয় ৩ টাকারও বেশি বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এমনিতেই জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী, তার ওপর দেশের নৌপথের এই বাড়তি ব্যয়ের চূড়ান্ত বোঝা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকেই মেটাতে হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র) জন্য প্রায় ৩৪৮.৫ মিলিয়ন (প্রায় ৩৫ কোটি) মার্কিন ডলারের একটি বড় আর্থিক তহবিল অনুমোদন করেছে। কঙ্গোর জন্য চলমান দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক কর্মসূচির অগ্রগতি ও কাঠামোগত সংস্কারের সফল পর্যালোচনা বা রিভিউ সম্পন্ন করার পর ওয়াশিংটন ভিত্তিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্থ ছাড়ের ঘোষণা দেয়। আইএমএফের এই নতুন তহবিল দেশটির সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি ত্বরান্বিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আইএমএফের অফিশিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী, কঙ্গোর জন্য তাদের 'এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি' (ইসিএফ) এবং 'রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি' (আরএসএফ) প্রোগ্রামের আওতায় এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ইসিএফ-সমর্থিত কর্মসূচির তৃতীয় পর্যালোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রায় ২৫৮.২ মিলিয়ন ডলার তহবিল উন্মুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত আরএসএফ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যালোচনা শেষে আরও প্রায় ৯০.৩ মিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কঙ্গো সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির অর্থমন্ত্রী দুদু রাসেল ফাম্বা লিকুন্দে লি-বোতাইয়ি এক ইমেইল বার্তায় জানিয়েছেন, আইএমএফের কাছ থেকে পাওয়া এই অর্থ মূলত দুটি প্রধান খাতে বরাদ্দ করা হবে। তহবিলের প্রায় ১৯৩.৯ মিলিয়ন ডলার সরাসরি বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যয় করা হবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে। আর তহবিলের বাকি অর্থ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস) বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা হবে।
আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড জানিয়েছে, কঙ্গো সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স এবং বেশিরভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সন্তোষজনক ছিল। তবে দেশটির পূর্বাঞ্চলে চলমান সশস্ত্র সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজেটে এক ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে কঙ্গো সরকার আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং আইএমএফের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তাদের সংস্কার কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে পুনরায় পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মন্তব্য