প্রাথমিক থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায়েই মানুষ তার করণীয় সম্পর্কে একটা দিকনির্দেশনা পায়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না, তা নিয়ে ওরিয়েন্টেশন থাকে। কিন্তু ডিজিটাল শিক্ষার শুরুতে মানুষের কোনো নির্দেশনা থাকে না। তাই ডিজিটাল লাইফেরও ডিজিটাল রিটারেসি বা ব্যবহারবিধি বা আচরণবিধি প্রয়োজন বলেই মনে করেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাহলে ডিজিটাল পণ্যগুলোর সঠিক ব্যবহার কিভাবে করতে হবে তাও জানতে পারবে মানুষ।
মঙ্গলবার ‘নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস-২০২২’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) উদ্যোগে বিসিসি অডিটরিয়ামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিসিসির নির্বাহী পরিচালক ড. আব্দুল মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক। আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলমও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
ইন্টারনেট থেকে শিশুরা ভালোর সঙ্গে খারাপটাও শিখছে। তারা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডকে আসল জগৎ মনে করে। ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ড তাদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। ইউটিউব দেখে তারা অনলাইনে শিক্ষকদের ভেংচাচ্ছে। অনলাইন কনটেন্টে ৭০ শতাংশই গালাগালিতে পূর্ণ। তাই এ সম্পর্কে তাদের করণীয় শেখাতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক বলেন, ‘দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি মানুষ যাতে নিরাপদ থাকে তা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে মানুষকে জানাতে ডিজিটাল লিটারেসি সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষকে জানানো হবে ডিজিটাল স্পেসে তার কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
‘দেশের তরুণরা শুধু বাংলাদেশের সাইবার স্পেস নয়, সারা বিশ্বের ডিজিটাল স্পেস নিরাপদ রাখতে সাহসী ভূমিকা নিচ্ছে। তরুণরা এখন আর শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং ইন্টারনেটের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে একেকজন ডিজিটাল খাতে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে। তারা পরিবারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে ডিজিটাল অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তুলছে। তাই তাদের মতামত, পরামর্শ ও সুপারিশগুলো আমাদের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হতে হবে।’
গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, ‘ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য শিশুদের অবশ্যই যথাযথ শিক্ষা দিতে হবে। এখান থেকে শিশুরা ভালোর সঙ্গে খারাপটাও শিখছে। তারা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডকে আসল জগৎ মনে করে। ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ড তাদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। ইউটিউব দেখে তারা অনলাইনে শিক্ষকদের ভেংচাচ্ছে। অনলাইন কনটেন্টে ৭০ শতাংশই গালাগালিতে পূর্ণ। এটা শিশু-কিশোররা শিখছে। তাই এ সম্পর্কে তাদের করণীয় শেখাতে হবে। যেভাবে বাচ্চাদের গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি বাধ্যতামূলক শেখানো হয়; তেমন করে ডিজিটাল লিটারেসি সম্পর্কেও বাধ্যতামূলক কোর্সের মাধ্যমে তাদের শেখাতে হবে।’
প্রশ্ন আসে, বাচ্চাদের ইন্টারনেট দেয়া ঠিক কি না। তাদের ইন্টারনেটে না আনলে শিখবে কিভাবে? আমরা তাদের শেখাব কিভাবে ইন্টারনেটের জগতে সাইবার বুলিং থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হয়। কিভাবে প্রয়োজনীয় কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। এ জন্য তাদের মা-বাবাকে প্রথমে ট্রেনিং দিতে হবে।
ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ মুখার্জী বলেন, ‘বর্তমান সময়ে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধদেরও ডিজিটাল লাইফে অভ্যস্ত হতে হবে। কিন্তু তারা জানে না কিভাবে সেগুলো ব্যবহার করতে হয়। শিশুদের শেখানো আর বৃদ্ধদের শেখানোর ধরন আলাদা। সবার উপযোগী ডিজিটাল লিটারেসি প্রয়োজন। এ জন্য তরুণদের বেশি করে জানতে হবে। একসময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আসত বিদ্যালয় থেকে, আর মূল্যবোধ শেখানো হতো পরিবার থেকে। কিন্তু এখন পরিবারের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। মূল্যবোধ শেখানোর কেউ নেই। এদিকে নজর ও বিনিয়োগ করতে হবে।’
রবির পরিচালক শাহেদ আলম বলেন, ‘ডিজিটাল লিটারেসির বিকল্প নেই। আমরা যেটাই ইউজ করব, দেখতে হবে সেটার রিস্ক কোথায়। রিস্কটা বুঝতে পারলেই আমরা সাবধানতা অবলম্বন করতে পারব। এটা পারব ডিজিটাল লিটারেসির মাধ্যমে। ডিজিটাল লিটারেসির মাধ্যমেই একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধও প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারছেন।’
ইউনিসেফের চাইল্ড প্রোটেকশন স্পেশালিস্ট মনিরা হাসান বলেন, ‘ইউনিসেফ শিশু-কিশোর নিয়ে কাজ করে। প্রশ্ন আসে, বাচ্চাদের ইন্টারনেট দেয়া ঠিক কি না। তাদের ইন্টারনেটে না আনলে তারা শিখবে কিভাবে? আমরা তাদের শেখাব কিভাবে ইন্টারনেটের জগতে সাইবার বুলিং থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। কিভাবে প্রয়োজনীয় কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে। তাদের মা-বাবাকে প্রথমে ট্রেনিং দিতে হবে। এ জন্য ১০ মিলিয়ন ঝরে পড়া শিশুকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইউনিসেফ।’
সিসিমপুরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম বলেন, ‘সিসিমপুর ১০ বছরের নিচের শিশুদের কনটেন্ট নিয়ে কাজ করে। এখন কিশোর নিয়েও ভাবা হচ্ছে।’
বেসিসের সভাপতি রাসেল টি আহমেদ, ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার হেড অব পাবলিক পলিসি, বাংলাদেশের সাবহানাজ রশীদ আলোচনায় অংশ নেন। স্বাগত বক্তব্য দেন আইসিটি বিভাগের ডিজিটাল লিটারেসি সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক সাইফুল আলম খান। উপস্থাপনা করেন টেন মিনিট স্কুলের উদ্যোক্তা আয়মান সাদিক।
পরে প্রতিমন্ত্রী পলক www.digitalliteracy.gov.bd ওয়েবসাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশালাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। নতুন এই বাজেট বুধবার (১ জুলাই) থেকে সারা দেশে কার্যকর হতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে এই বাজেট অনুমোদিত হয়। এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের করের বোঝা কমানোসহ বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ রদবদল আনা হয়েছে।
এর আগে সোমবার (২৯ জুন) প্রয়োজনীয় কয়েকটি সংশোধনীর মাধ্যমে অর্থবিল পাস করে জাতীয় সংসদ। সংশোধিত এই বিলে সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয় আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগটি এবার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজের ওপর আরোপিত করপোরেট কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থবিল পাসের মাধ্যমেই কর ও শুল্ক সংক্রান্ত এসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চূড়ান্ত করা হলো।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট পাসের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সোমবার সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। বুধবার থেকে নতুন এই অর্থবছরের সকল কার্যক্রম ও আর্থিক পরিকল্পনা কার্যকর হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের সুদৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে জনস্বার্থ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেই এই প্রকল্প সম্পন্ন করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জনগণ এবং নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এতে অন্য কোনো দেশের ‘কনসার্ন’ থাকার সুযোগ নেই।’
তথ্য উপদেষ্টা উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর তিস্তা নদীর প্রভাব তুলে ধরে বলেন, বর্ষাকালে নদীভাঙন এবং গ্রীষ্মে পানির তীব্র সংকট এই অঞ্চলের মানুষের জন্য এক মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। এই সংকট নিরসনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় নদী শাসন, ড্রেজিং এবং পানি সংরক্ষণের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের কাজে চীনের বিশেষ দক্ষতা ও পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই কাজ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রকল্পটি নিয়ে উদ্ভূত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ হিসেবে জণগণ ও তার নিজস্ব স্বার্থে পদক্ষেপ নেবে। এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রকাশের অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে। আমাদের এই উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে অন্য কোনো দেশের কনসার্ন হওয়ার কারণ দেখি না। ভারত বা অন্য যেকোনো দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই এনগেজ করবে। যদি কারো কোনো সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা কনসার্ন থাকেও, বাংলাদেশ তা মাথায় রাখবে। এসব সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো আপস না করেই কাজ করবে।’ তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারগুলোর সময় জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করা হলেও বর্তমান প্রশাসন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং যেকোনো দেশের সঙ্গে এখন পারস্পরিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই কাজ করা হবে।
অভিন্ন নদীর পানির হিস্যার বিষয়ে উপদেষ্টা নিশ্চিত করে বলেন যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ কোনোভাবেই ন্যায্য অধিকার ছেড়ে দেওয়া নয়। তাঁর ভাষায়, ‘এই প্রকল্প বা ব্যারাজ নির্মাণের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করা ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা তিস্তা ও গঙ্গাসহ অভিন্ন ৫৩টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তবে নদী শাসন ও সুরক্ষায় অভ্যন্তরীণ ডাউনস্ট্রিম ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ নিজেদের স্বার্থেই দ্রুত করতে হবে।’
এ ছাড়া ব্রিফিংকালে তথ্য উপদেষ্টা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা এবং নতুন তথ্য কমিশন গঠনের অগ্রগতির বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ফাইল ছবি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাসানুল হক ইনু আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ২১১ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ রায়ের বিবরণীতে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগসমূহের সত্যতা ও সাক্ষীদের জবানবন্দি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে এই রায় প্রদান করা হলো। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাউ’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের "বিএনপি-জামায়াত ও সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন"। এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের সভায় অংশ নিয়ে তিনি "নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে দমনে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা কার্যকরেও ভূমিকা রাখেন"। কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সেখানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর নির্দেশনার ফলে পুলিশ ও জোটের সশস্ত্র কর্মীদের গুলিতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, মারণাস্ত্রের ব্যবহার এবং কারফিউ জারির মাধ্যমে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রতিটি ক্ষেত্রে হাসানুল হক ইনু উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কেবল হত্যাযজ্ঞের উসকানিই দেননি, বরং ২৯ জুলাইয়ের এক সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের প্রস্তাব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নৃশংসতাকে কৌশলে বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করেন। এমনকি সরকার পতনের পূর্বদিন ৪ আগস্টেও তিনি শেখ হাসিনার গৃহীত দমনমূলক পদক্ষেপসমূহ অনুমোদন করেছিলেন। ট্রাইব্যুনালের এই পুরো বিচারিক কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
এই মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী ইনুর বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। গত ১৪ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছিলেন। অবশেষে মঙ্গলবার চূড়ান্ত এই দণ্ডাদেশের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার সম্পন্ন হলো।
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি এই জানাজায় যোগ দিতে তেহরান সফরে যাচ্ছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ৪ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া খামেনির দীর্ঘ শোক ও বিদায় কর্মসূচিতে স্পিকার সশরীরে উপস্থিত থাকবেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর এক যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনি তার পরিবারের সদস্যসহ নিহত হন। মৃত্যুর আগে তিনি টানা ৩৬ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মৃত্যুতে দেশটিতে কয়েক দিনব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সূচি অনুযায়ী, আগামী ৪ জুলাই খামেনির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৭ জুলাই কোম শহরে দ্বিতীয় জানাজা শেষে ৯ জুলাই মাশহাদে তাকে সমাহিত করার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার পর বাংলাদেশের স্পিকারের এই সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি সেখানে মরহুমের জানাজায় অংশগ্রহণ করবেন এবং শোকসন্তপ্ত ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করবেন। আন্তর্জাতিক এই শোকযাত্রায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের অভিশাপ জলাবদ্ধতা সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সমন্বিতভাবে একাধিক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সরকার বর্তমানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
সংসদকে অবহিত করে মন্ত্রী বলেন, “রাজধানীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ১০৮টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করে সেগুলোর স্থায়ী সমাধানে কাজ করছে। একই সঙ্গে ১০টি অঞ্চলে ২১টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) গঠন করা হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এসব দল নিয়মিত পিট, ক্যাচপিট, ড্রেনেজ লাইন ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো পরিষ্কার করছে, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দ্রুত কমে এসেছে।” অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, গত অর্থবছর ডিএনসিসি ১১০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা ও নর্দমা নির্মাণ করেছে এবং আগামী অর্থবছরে আরও বিস্তৃত পরিসরে এই উন্নয়ন কাজ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ দখল রোধে খালের সীমানা নির্ধারণে এক হাজার ১৮১টি পিলার স্থাপন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল—এই তিনটি আউটলেটের মাধ্যমে ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করা হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।” এই সংকট নিরসনে দ্রুত আরও দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বৃহৎ নর্দমা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, নিউমার্কেট, গ্রিন রোড ও শান্তিনগরসহ ৩৩টি প্রধান জলাবদ্ধ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত নর্দমা পরিষ্কার ও পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থায়নে কালুনগর, শ্যামপুর, জিরানী ও মান্ডা খালের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
একই অধিবেশনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জানান, প্রবাসীদের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে আইটি-নির্ভর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রথমবারের মতো আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার আওতায় ভোটার নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) পদ্ধতি চালু করেছে।” আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও এই সুবিধা অব্যাহত থাকবে এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রবাসীকে এর আওতায় আনতে নির্বাচন কমিশন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে আজ সকাল ১১টা ৪ মিনিটে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই সংসদ অধিবেশন শুরু হয়।
জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এই প্রকল্পকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
হিমালয়ের বরফগলা জলধারা থেকে উৎপত্তি হয়ে যে নদীটি সিকিম আর পশ্চিমবঙ্গ ছুঁয়ে বাংলাদেশের উত্তর জনপদে প্রবেশ করেছে, তার নাম তিস্তা। এককালে এই নদীকে বলা হতো ‘উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা’। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে তিস্তা রূপ নিয়েছে দুঃখ, বঞ্চনা আর কান্নার অপর নাম। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ধূ ধূ মরুভূমি, আর বর্ষায় উজানের ঢলে সর্বগ্রাসী বন্যা—এই দুই চরম সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা। এই মরণফাঁদ থেকে উত্তরবঙ্গকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকার হাতে নিয়েছে এক যুগান্তকারী ও চোখধাঁধানো রূপরেখা—‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এই প্রকল্পকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘নদী, খাল ও সেচ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় পানি। সংসদ সদস্যরা নিয়মিত পদ্মা ও তিস্তা নদী নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। আমরা এসব সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি।’
সারা বছর কৃষির জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিসহ অন্যান্য খাতে তা ব্যবহার করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে। যেন পুরো শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের অন্যান্য সময় কৃষি ও প্রয়োজনীয় খাতে সেই পানি সরবরাহ করা যায়।’
কী আছে এই মহাপরিকল্পনায় : তিস্তা মহাপরিকল্পনা হলো মূলত প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রজেক্ট, যা চীনের ‘হোয়াংহো’ নদীর সফল ব্যবস্থাপনার আদলে তৈরি করা হয়েছে। ২০১৬ সালের একটি স্মারক চুক্তির মাধ্যমে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। এই মহাপরিকল্পনায় নদী শাসনের প্রথম ধাপ হিসেবে তিস্তা নদীর প্রায় ১০২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রেজিং করা হবে। নদীর গভীরতা ১০ মিটার পর্যন্ত বাড়ানো হবে, যাতে বর্ষার অতিরিক্ত পানি নদী নিজের বুকেই ধরে রাখতে পারে। নদীর দুই তীরে ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও শক্তিশালী গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এর ফলে প্রতি বছরের চিরচেনা নদীভাঙন চিরতরে বন্ধ হবে। নদীকে একটি নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত সীমানার মধ্যে এনে প্রায় ১৭১ বর্গকিলোমিটার চরভূমি (যা আগে নদীগর্ভে বিলীন ছিল) উদ্ধার করা হবে। উদ্ধার হওয়া এই বিশাল জমিতে গড়ে উঠবে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট শহর, পাঁচতারকা হোটেল, রিসোর্ট, বিনোদন কেন্দ্র এবং মেরিন ড্রাইভ। এছাড়া থাকবে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট এবং অসংখ্য কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা।
কেন এই মহাপরিকল্পনা : বাংলাদেশে তিস্তার গতিপথ ১১৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার তীরভূমি চরম ক্ষয়প্রবণ।ক) শুষ্ক মৌসুমের মরুভূমি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকটশুষ্ক মৌসুমে ভারতের গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে একতরফাভাবে পানি আটকে রাখার ফলে তিস্তা বাংলাদেশ অংশে কঙ্কালসার হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IFPRI) মতে, পানির অভাবে এই অঞ্চলে বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় তীব্র পানির সংকট তৈরি হয়। খ) বর্ষার উন্মত্ততা ও অর্থনৈতিক ক্ষতিআবার বর্ষাকালে যখন ভারতে পানির চাপ বাড়ে, তখন গজলডোবা বাঁধের সবগুলো গেট একসাথে খুলে দেওয়া হয়। আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যায় লাখো মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষেত। প্রতি বছর এই বন্যার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৮৩ সালের অন্তর্বর্তী চুক্তি কিংবা ২০১১ সালের সমান ভাগের খসড়া চুক্তি—কোনোটিই পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে আলোর মুখ দেখেনি। এই স্থায়ী অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্ম।
চীনের আগ্রহ ও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI): চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ কোম্পানি প্রায় ৩ বছর ধরে তিস্তা অববাহিকায় ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সমীক্ষা চালিয়েছে। চীন এই প্রকল্পের সিংহভাগ (প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা) ঋণ দিতে এবং কারিগরি সহায়তা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এর মাধ্যমে চীন মূলত তাদের বৈশ্বিক ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোরে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চায়।
ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ: ‘চিকেনস নেক’ আতঙ্কচীন যখনই টাকা নিয়ে প্রস্তুত, তখনই তীব্র আপত্তি তোলে নয়াদিল্লি। কারণ, তিস্তা প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছে। মাত্র ২১ থেকে ২৫ কিলোমিটার চওড়া এই করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টার্স) যুক্ত করেছে। ভারত ভয় পাচ্ছে, চীন যদি তিস্তা প্রজেক্টের উসিলায় উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে এসে বছরের পর বছর অবস্থান করে এবং ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করে, তবে যুদ্ধ বা যেকোনো সংকটের সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই চীনকে হঠাতে ২০২৪ সালে ভারত পাল্টা প্রস্তাব দেয়—‘চীনের দরকার নেই, তিস্তা প্রকল্পের টাকা এবং কাজ আমরাই করব।
পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংসদে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে তিস্তা এবং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে এবং চীন ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কারিগরি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরেই ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা অন্য যেকোনো নামেই হোক, এর দৃশ্যমান কাজ শুরু করতে বদ্ধপরিকর। সরকারের লক্ষ্য—আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন করা, যার একটি বড় অংশজুড়ে থাকবে তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।
বাস্তবায়িত হলে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে: যদি এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে আলোর মুখ দেখে, তবে উত্তরবঙ্গের মানচিত্র চিরতরে বদলে যাবে। সেচব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সচলতা তৈরি হবে। শিল্প ও কর্মসংস্থান নদীর দুই তীরে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অর্থনৈতিক অঞ্চলে লজিস্টিক সেন্টার ও প্রসেসিং জোন গড়ে উঠবে। এতে প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান হবে, কাজের জন্য আর ঢাকা বা অন্য শহরে ছুটতে হবে না। পর্যটন ও বিনোদনইকো-পার্ক, নদীকেন্দ্রিক রিসোর্ট, পাঁচতারকা হোটেল এবং মেরিন ড্রাইভের কারণে উত্তরবঙ্গ পরিণত হবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মূল আকর্ষণীয় কেন্দ্রে।
মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তা: প্রায় ১ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ পারিবারিক সম্পদ নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে। তিস্তাপাড়ের ২ কোটি মানুষ ফিরে পাবে মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠাঁই।
পানিহীন নদীতে মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ কী? তিস্তা আজ শুধু একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার এক এসিড টেস্ট। তবে নদী বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মৌলিক সত্যকে এড়িয়ে এই মহাপরিকল্পনা সফল করা অসম্ভব—সেটি হলো পানির ন্যায্য হিস্যা। নদীতে যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিই না থাকে, তবে নদীর বুকে চোখধাঁধানো স্যাটেলাইট শহর বা বিশাল ব্যারাজ তৈরি করে লাভ কী? তাই বেইজিং বা নয়াদিল্লির ঋণের অঙ্কের চেয়েও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভারতের কাছ থেকে শুষ্ক মৌসুমের পানির হিস্যা আদায় করা। তবে বিষয়টি এখন শুধু বাংলাদেশের ন্যায্য পানির চাওয়ার মধ্যে আটকে নেই। কারণ, তিস্তার ওপারে ভারত। তিস্তার উজানের অংশ আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে। সেখানেও চীনের একটি প্রকল্প পরিকল্পনা আছে। মনে করা হয়, তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহের বড় কারণ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প। যার মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশকে একীভূত করতে চায়। তাই তিস্তা প্রকল্প ঘিরে ভূরাজনৈতিক নানা হিসাবনিকাশের বিষয় রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এ বিষয়ে বলেছেন, তিস্তা নদীর সঙ্গে ভারত, চীনসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নদীপ্রবাহ জড়িত। আমরা কতটুকু পানি পাব, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলে প্রকল্প জটিল হয়ে যাবে। তাই ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি হতে হবে। নদীর উজানে চীনের নিয়ন্ত্রণ। তাই ভারতও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। সবচেয়ে ভালো হয় যদি এ বিষয়ে বহুপাক্ষিকভাবে আলোচনা করা যায়।
তবে আশার কথা হলো, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিস্তা পানি চুক্তি নিয়ে এক নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। ঢাকার দক্ষ কূটনীতি যদি বেইজিংয়ের কারিগরি সক্ষমতা এবং নয়াদিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবেই তিস্তার প্রতিটি ঢেউয়ে বয়ে চলবে উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের স্বপ্ন। উত্তরের আকাশে তখন সত্যিই উদিত হবে এক নতুন আশার সূর্য।
ছবি: সংগৃহীত
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল এবং ঋণনির্ভর থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে যাত্রার প্রত্যাশা করে একাধিক সংশোধনী এনে জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০২৬ পাস হয়েছে। সোমবার (২৯ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের আহ্বানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি চূড়ান্ত পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
পাস হওয়া অর্থবিল-২০২৬ এ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের পাশাপাশি ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে লাগবে না টিআইএন নম্বর।
এর আগে, বিলটির ওপর সংসদ সদস্যদের আনা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব এবং বিলের সাধারণ নীতি নিয়ে দীর্ঘ ও প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অধিবেশনের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের আর্থিক প্রস্তাবগুলো কার্যকরকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধন করতে ‘অর্থ বিল, ২০২৬’ সংসদে অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণের প্রস্তাব তোলেন।
বিলটি টেবিলে ওঠার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ বেশ কয়েকজন সদস্য বিশাল ঘাটতি বাজেট, কর ও ভ্যাটের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা এবং প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর থেকে ঋণের আশ্বাসের বাস্তবতার মতো নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বিলটি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। সংসদ সদস্যদের এসব সমালোচনা ও প্রস্তাবের ওপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে অর্থ বিলটি একাধিক সংশোধনীসহ চূড়ান্তভাবে পাস হয়।
বিল পাসের পর বাজেটের ওপর দেওয়া সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার একটি চরম দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ আশাবাদী। চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক না কেন, কার্যকর নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সব ধরনের বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, সরকার এখন থেকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেসরকারি উদ্যোগ, নতুন উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানই হবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি। সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে এবং মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
বাজেট নিয়ে দীর্ঘ ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মতামত জনগণের প্রত্যাশারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে তিনি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট কেবল একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি নির্ভরযোগ্য রূপরেখা।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, লাগামহীন দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে কারসাজি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বর্তমান সরকার একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন। তবে কৃষি, শিল্প, সেবা ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতা এবং সরকারের শক্ত নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার করের হার বাড়াবে না, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ করবে। স্বচ্ছতা বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ পৃথক করা হচ্ছে এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রস্তাবিত একক হারের ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ছোট মুদি দোকানগুলোকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হবে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হবে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল মাত্র ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বর্তমানের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
পূর্ববর্তী সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে যত্রতত্র ঋণের কারণে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি নিম্ন পর্যায় থেকে মধ্যম পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই বিশাল ঋণের আসল ও চড়া সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বর্তমান সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর একটি বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই ঋণ নির্ভরতা কমাতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং বন্ড ও ইকুইটি ফাইনান্সিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশ-বিদেশে মোট ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
এছাড়া ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ১৫টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
মন্তব্য