দেশের সব বিভাগে শুক্রবার দিনভর ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিপাতের আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি জানিয়েছে, ২১ মাঘ চট্টগ্রাম বাদে সব বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় সারা দিনই বৃষ্টি হতে পারে। চট্টগ্রামের কিছু জায়গায় বৃষ্টিপাত দেখা যেতে পারে।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. আবুল কালাম মল্লিক শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে নিউজবাংলাকে জানান, দমকা অথবা ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টিপাত হবে আটটি বিভাগে। এতে অঞ্চলভেদে দিনের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে, বর্তমানে যেটি ২২ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। একই সঙ্গে কমতে পারে রাতের তাপমাত্রাও।
এ বৃষ্টি শীতের বিদায়বার্তা কি না জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, ফেব্রুয়ারিতে সাধারণত এ ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টি শেষে তাপমাত্রা কমবে। একে শীতের বিদায়বার্তা বলা যাবে না এখনই।
আবুল কালাম মল্লিকের এ বক্তব্যের আগেই মেঘাচ্ছন্ন দেখা যায় ঢাকার আকাশ। রাজধানীর বাইরে দিনাজপুর, মেহেরপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী থেকে বৃষ্টিপাতের খবর জানিয়েছেন নিউজবাংলার প্রতিনিধিরা।
২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।
পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটের অনেক জায়গা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আহসান হাবিব। বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি। সোমবার (২৯ জুন) এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এর আগে এনবিআরের সদস্য এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আহসান হাবিব।
১৫তম বিসিএস (ট্যাক্সেশন) ক্যাডারের কর্মকর্তা আহসান হাবিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এ ছাড়া বিসিএস পরীক্ষায় তিনি তার ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
কর্মজীবনে কর অঞ্চল-১৫-এর কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন আহসান হাবিব। সিআইসির মহাপরিচালক থাকাকালে কর ফাঁকি ও আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি আলোচিত অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি।
অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম ‘উল্কাগেমস’ থেকে বকেয়া কর আদায়ের উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আহসান হাবিব। বর্তমানে বিসিএস ট্যাক্সেশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত রোববারের (২৮ জুন) তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা স্বস্তিদায়ক এবং সরকার ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী সংসদে দেওয়া বক্তব্যে উল্লেখ করেন, কারিগরি ত্রুটি ও কয়লা সংকটের কারণে গত দুই দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যেখানে চাহিদার পরিমাণ ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। ফলে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩৩৯ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পরিস্থিতি বেশ খারাপ ছিল, তবে আল্লাহর রহমতে আজ আমরা সেখান থেকে উত্তরণ করতে পেরেছি। আমরা চেষ্টা করছি ৩৩৯ মেগাওয়াটের এই ঘাটতিও কমিয়ে আনার জন্য। পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষ্যে সরকার অত্যন্ত সচেষ্ট রয়েছে।
তবে পরিস্থিতির উন্নতি সত্ত্বেও কিছু কিছু জায়গায় লোডশেডিং থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেন। এর আগে রোববার সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে ছিদ্র (লিকেজ) হওয়া এবং বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাস ব্যাহত হওয়ায় প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার বিষয়টিই সোমবার তিনি সংসদে পুনরায় নিশ্চিত করেন।
এদিকে, লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে রোববার (২৮ জুন) দেশের অন্তত সাতটি জেলায় গ্রাহক বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। মন্ত্রী এ ধরনের জাতীয় সংকট ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করার জন্য সংসদ সদস্য ও দেশবাসীর প্রতি ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।
ছবি : পিএমও
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যে কোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যানকে জাতীয় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যে কোনো মূল্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।'
আজ দুপুরে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘নদী, খাল ও সেচ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তারেক রহমান বলেন, 'বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় পানি। সংসদ সদস্যরা নিয়মিত পদ্মা ও তিস্তা নদী নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। আমরা এসব সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি। '
সারা বছর কৃষির জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিসহ অন্যান্য খাতে তা ব্যবহার করা হবে।'
তিনি আরো বলেন, 'পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে। যেন পুরো শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের অন্যান্য সময় কৃষি ও প্রয়োজনীয় খাতে সেই পানি সরবরাহ করা যায়।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তঃনদী সংযোগের অভাবে বাংলাদেশ ভুগছে। এর ফলে অনেক নদীর নাব্যতা হারিয়ে গেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় সেচ ও পানির সংকট তৈরি হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'আমি এমন এলাকা পরিদর্শন করেছি, যেখানে বর্ষায় চারদিকে পানি থাকলেও অল্প দূরের কৃষকরা পানির অভাবে জমিতে সেচ দিতে পারেন না।তবে এই সমস্যা সমাধানে দেশব্যাপী নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'পানি প্রবাহ, সেচব্যবস্থা এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা যাতে উন্নত করা যায় এ লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি চলছে। গত তিন মাসে প্রায় ৯শ’ কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন করা হয়েছে।'
কৃষকদের জন্য সরকারের সহায়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অন্যতম প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ এবং তার সুদ মওকুফ করা। এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন।'
তিনি বলেন, 'কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকার বিশেষ কৃষক কার্ড চালু করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষক এই কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা এবং অন্তত ১০টি অতিরিক্ত সেবা পাবেন। আমরা কৃষকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছি। '
যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, 'দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানো এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সেবার পরিধি বাড়াতে সরকার কাজ করছে।'
এর অংশ হিসেবে প্রবাসীদের বিভিন্ন সেবা সহজলভ্য করতে এবং বিদেশে তাঁদের ভোগান্তি কমাতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি অভিযোগ করেন, 'দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দুর্বল পরিকল্পনা ও অবহেলার কারণে দেশের জ্বালানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে অবহেলা করে বিদেশি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকার এখন জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে আমদানি নির্ভরতা কমানো যায়।'
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এ পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো এমন একটি শক্তিশালী ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।'
শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষিত ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে আগের শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষা খাতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট এ অধিবেশনে প্রথমে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন।
সূত্র : বাসস
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ হয়তো আপাতত শেষ হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তীব্র জ্বালানিসংকটে ভুগছে। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
দেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডায়িং কারখানাগুলো বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবহার করে। আর বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। জ্বালানির বাড়তি দাম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। গত ৬ জুন, বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ ঢাকায় তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগই নারী। তারা জারা এবং এইচঅ্যান্ডএমের মতো পশ্চিমা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করেন। প্রায় চার কোটি মানুষ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই এসেছে পোশাক খাত থেকে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ। চীনের পর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ।
তবে এই খাত আগে থেকেই সংকটে আছে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় ধাক্কা লাগে। বলে মন্তব্য করেন শিল্প বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব।
সেই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, পাঁচটি কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের কারাবন্দি বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতারও পোশাক কারখানা ছিল। গত তিন বছরে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে।
গত মে মাসে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকত। চট্টগ্রামের কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। উৎপাদন চালিয়ে যেতে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে।
এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের আবিল বিন আমিন বলেন, এই শিল্প দক্ষতানির্ভর, সেখানে জেনারেটর চালু করতেই যদি ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে, তা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
উৎপাদনে বিলম্ব, জাহাজীকরণে বিঘ্ন ও পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতাদের কম চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছে। এক জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর তার কারখানার ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; বছরওয়ারি হিসাবে তা কমেছে ৮ শতাংশ।
তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কাঁচামালের খরচও বেড়েছে। পোশাক তৈরির মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ যায় কৃত্রিম তন্তু, রং, ফিনিশিং কেমিক্যাল, প্লাস্টিক বোতাম ও চেইনে, যেগুলোর বেশির ভাগই পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর।
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ পোশাক পলিয়েস্টার ফাইবার ও সুতা দিয়ে তৈরি হয়, যার মূল উপাদান ন্যাফথা। যুদ্ধ শুরুর পর ন্যাফথার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। এ ছাড়া উৎপাদনব্যবস্থাও খণ্ডিত। কিছু সমন্বিত টেক্সটাইল মিল থাকলেও বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদনের একটি অংশ সম্পন্ন হয়। আবদুল্লাহ হিল নকিবের হিসাবে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ।
সংকটগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর বড় অংশই বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক খাতের জন্য। তবে এই ঋণের সুদহার প্রায় ৭ শতাংশ। উদ্যোক্তারা এমনিতে চাপে আছেন, তাদের জন্য এটা কঠিন।
এদিকে কোভিড মহামারির সময় উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বড় ব্র্যান্ডগুলো পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হয়নি। এবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যে শ্রম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এবার তার চেয়েও বেশি হবে—এমন শঙ্কা আছে।
উৎপাদনে বিলম্ব, পরিবহন বিঘ্ন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ভোক্তাদের কম পোশাক কেনার প্রবণতার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও কম অর্ডার দিচ্ছে।
ঢাকার একটি জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তার কারখানার অর্ডার প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
মে মাসে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকটে থাকা ব্যবসাগুলোর জন্য ৬০০ বিলিয়ন টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যার সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক শিল্পের জন্য। তবে এসব ঋণের সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশ, যা এরই মধ্যে আর্থিক চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বহন করা কঠিন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
দেশের জ্বালানি খাতে যুগান্তকারী এক খবরের কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। উৎপাদনের সবশেষ জটিল ধাপ পেরিয়ে আর মাত্র দুই মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বর্তমানে কমিশনিং ও স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্ববর্তী শেষ এবং অত্যন্ত জটিল ধাপ।
মন্ত্রী এরপর বলেন, চলতি আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রথমবারের মতো পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার এই ঘটনাটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
ফাইল ছবি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে কোণঠাসা হয়ে এবার পাচারের কৌশল ও মাদকের রূপ বদলেছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র। ফেনসিডিল বা ইয়াবার মতো প্রচলিত মাদকের চেয়ে এখন কম দামি, সহজলভ্য ও ছদ্মবেশী বিকল্প তরল সিরাপ এবং উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ট্যাবলেটের দিকে ঝুঁকছে তারা। শুধু চোরাচালানই নয়, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং ভারত সীমান্ত থেকে ‘পুশইন’-এর মতো ঘটনা এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় সুরক্ষায় ‘স্মার্ট সীমান্তে’ রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কী এই নতুন ‘রূপ: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সিন্ডিকেটগুলো এখন প্রেসক্রিপশন ড্রাগ বা ওষুধের আড়ালে মাদক নিয়ে আসছে। ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার স্পর্শকাতর অন্তত ২৭টি রুট দিয়ে দেশে ঢুকছে এস্কাফ, ফেয়ারডিল, চকোপ্লাসের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর কোডিনযুক্ত সিরাপ এবং ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, যা দেশের যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অবক্ষয়ের দিকে।
কোডিনযুক্ত সিরাপ (এস্কাফ, ফেয়ারডিল, চকোপ্লাস): ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা এসব সিরাপে উচ্চমাত্রার কোডিন ফসফেট রয়েছে। এর নেশার তীব্রতা হুবহু নিষিদ্ধ ফেনসিডিলের সমান।
ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট: এটি মূলত তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ হলেও মাদকসেবীরা এটিকে হ্যালুসিনেশন বা তীব্র আচ্ছন্নভাব তৈরির বিকল্প উচ্চমাত্রার নেশা হিসেবে ব্যবহার করছে।
ভয়াবহতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো সেবনের ফলে লিভার ও কিডনি স্থায়ীভাবে নষ্ট হচ্ছে। সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করায় তরুণেরা দ্রুত স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।
অরক্ষিত সীমান্ত, পাচারের ২৭ ‘রুট : অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর ভারত-বাংলাদেশ বিস্তীর্ণ সীমান্তের অন্তত ২৭টি রুট ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে ক্ষতিকারক নিষিদ্ধ ‘নেশা সিরাপ’ ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট।
মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সীমান্তের ইউনিয়নভিত্তিক অরক্ষিত পয়েন্ট ও গ্রামীণ গোপন কাঁচা রাস্তাগুলোকে বেছে নিয়ে এই চোরাচালান চক্র সচল রেখেছে। পরে এসব মাদক চলে যায় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে।
সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন অরক্ষিত অংশগুলোকে কারবারিরা সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ রুট মনে করছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে মাদক দেশে ঢোকানোর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে পথিমধ্যে বারবার ‘হাতবদল’ বা ক্যারিয়ার পরিবর্তন করার কৌশল নিচ্ছে সিন্ডিকেটগুলো।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সীমান্ত সুরক্ষায় তিনটি ব্যাটালিয়ন দ্বায়িত্ব পালন করছে, এর মধ্যে ৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ১৬টি চোরাচালান রুট সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় রয়েছে ৮টি সক্রিয় রুট এবং ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় তিনটি পয়েন্ট মাদক পাচারের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বাইরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ লাগোয়া রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত রুট দিয়ে নিয়মিতই আসছে মাদক, যা বিজিবিসহ অনন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরাও পড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়য়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর ও দুর্লভপুর, আলাতুলি ইউনিয়নের কোদালকাটি ও বকচর এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী সীমান্ত রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের কিরণগঞ্জ, কালীগঞ্জ ও জমিনপুর; শাহবাজপুর ইউনিয়নের শ্মশানঘাট, আজমতপুর ও উনিশবিঘী; মনাকষা ইউনিয়নের শিংনগর; দুর্লভপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর; পাঁকা ইউনিয়নের ওয়াহেদপুর এবং তেলকুপি, চকপাড়া, শিয়ালমারা ও দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের সোনামসজিদ-বালিয়াদিঘী সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান আসছে।
ভোলাহাট উপজেলার ভোলাহাট সদর ইউনিয়নের চামুসা, হোসেনভিটা, গিলাবাড়ী ও বিলভাতিয়া; গোহালবাড়ী ইউনিয়নের আলী সাহপুর, দলদলি ইউনিয়নের পোল্লাডাঙ্গা-ময়ামারি সীমান্ত এবং গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর ও বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের শিবরামপুর সীমান্তকে মাদক কারবারিরা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিজিবির রেকর্ড পরিমাণ মাদক উদ্ধার: মাদকের এই নতুন রূপ রুখতে বিজিবি সীমান্ত এলাকায় কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। উদ্ধার অভিযানের চিত্রে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৫৯ বিজিবি রেকর্ড ১২ হাজার ২৪৯ বোতল ফেনসিডিলের বিকল্প সিরাপ উদ্ধার করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের নেশা জাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে ৫১ হাজার ৭৭৪ পিস। অন্যদিকে ৫৩ বিজিবি চলতি জুন মাসে ০১ জন আসামিসহ ১১৬১ বোতল নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ, ১৮৭ বোতল নেশাজাতীয় ফেয়ারডিল সিরাপ, ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে।
পাশাপাশি ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে এস্কাফ সিরাপসহ রেকর্ড ৩০ হাজার ৭০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পরে এসব মাদক যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
ধ্বংসের মুখে যুবসমাজ: ভারত থেকে আসার ঔষদের আড়ালে এসব ভয়ঙ্কর মাদক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন সেবনের ফলে যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটি সরাসরি মানুষের লিভার ও কিডনি স্থায়ীভাবে নষ্ট করে এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আঘাত করে স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি কেড়ে নেয়। ফলে আসক্ত তরুণরা অল্প দিনেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একাংশের আচরণ ও পড়াশোনায় এক ধরনের নীরব অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে মাদক বলতে অভিভাবকরা গাঁজা, ফেনসিডিল বা ইয়াবা বুঝতেন এবং সন্তানদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। কিন্তু এখনকার তরুণরা নেশাজাতীয় সিরাপের আড়ালে মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এই ছদ্মবেশী মাদকের কারণে অনেক পরিবার বুঝতেই পারছে না যে কখন তাদের সন্তান অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম মেধা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
মাদকের এই নতুন ট্রেন্ডকে পুরো দেশের জন্য একটি বড় বিপদের সংকেত হিসেবে দেখছেন সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, সিন্ডিকেটগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে যেভাবে বারবার রুট ও মাদকের রূপ বদল করছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের দাবি থাকবে—শুধুমাত্র সীমান্তে বিজিবি বা পুলিশের রুটিন অভিযান দিয়ে এই ভয়াবহতা ঠেকানো যাবে না। মাদক চোরাচালানের পেছনে থাকা মূল গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জিরো টলারেন্স নীতিতে বিজিবি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করাসহ যেকোনো অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধে এবং সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে বিজিবি সর্বদা তৎপর রয়েছে।
৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম চোরাচালানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ফাইল ছবি
বাংলাদেশে চলতি বছর হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলা টিকার কোনো ডোজ পায়নি। গত ১৫ মার্চ থেকে গত শনিবার (২৭ জুন) পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসেরও কম। শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের হিসাবে, নির্দিষ্ট সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬১৫ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গে ঘটা প্রতিটি মৃত্যুকেই হামজনিত মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হয়।
কলম্বোতে ২২ ও ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হাম-রুবেলাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিশনের সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক। প্রতিনিধিদলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিব, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচও ঢাকা কার্যালয়ের রোগ প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, শিশুদের হাম প্রতিরোধক্ষমতার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচিতে নজরদারির ঘাটতি এই সংকটের প্রধান কারণ। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ ও ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার বিধান থাকলেও মৃত শিশুদের মাত্র ৮ শতাংশ এই টিকার আওতায় এসেছিল।
কলম্বোর সভায় উপস্থাপিত বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সি শিশুর মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে ২ থেকে ৫ বছর বয়সি ১৮ শতাংশ, ৯ থেকে ১১ মাস বয়সি ১৪ শতাংশ, ১ থেকে ২ বছর ও ৫ থেকে ৯ বছর বয়সি ১৩ শতাংশ করে, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সি ৪ শতাংশ এবং ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে ১২ শতাংশ। এই চিত্র থেকে স্পষ্ট যে শিশুদের পাশাপাশি বড় বয়সিরাও হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।
একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ হাজার ২৬৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫৯৪ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭৮ হাজার ২৮৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, কলম্বোতে উপস্থাপিত তথ্য জুন মাসের প্রথমার্ধের। তাতে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলার টিকা পায়নি। জুনের শেষ সপ্তাহে মৃত্যু বেড়ে সাতশর বেশি হয়েছে, সে ক্ষেত্রেও টিকা না পাওয়ার হার একই থাকবে বলে আমার ধারণা।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল টিকাদান কর্মসূচির ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘বহু শিশুকে টিকা না দিয়েই বলা হয়েছে টিকা পেয়েছে, টিকার সাফল্যের কথা গাওয়া হয়েছে। সব পরিসংখ্যান ছিল বানোয়াট। তথ্য-উপাত্তে কারচুপি করা হয়েছে। নজরদারির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না কোনো জবাবদিহি। এত সব অনাচারের মূল্য দিতে হলো শিশুদের।’
চলতি বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কলম্বোর সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। গত ২৫ জুন ডব্লিউএইচও এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাম মোকাবিলায় জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের পরিস্থিতি সরেজমিনে মূল্যায়নের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং সদস্যদেশগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাম নির্মূলের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। দেশের প্রতিটি জেলায় ডব্লিউএইচওর মেডিকেল কর্মকর্তারা হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন রোগের তথ্য সংগ্রহ করেন, যা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়।
মন্তব্য