রাস্তায় এনার বাস কেন ‘বেপরোয়া’

player
দুর্ঘটনা

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় গত ২৮ ডিসেম্বর রোড ডিভাইডার টপকে মাইক্রো বাসকে ধাক্কা দেয় এনা পরিবহনের একটি বাস। ছবি: নিউজবাংলা

সড়কসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, এনা পরিবহনের বাসগুলো অন্য কোম্পানির বাসের চেয়ে ‘বেপরোয়া’ গতিতে রাস্তায় চলছে। এর পেছনে চালকদের একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালনা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, ক্ষমতার অপপ্রয়োগসহ বেশ কয়েকটি কারণ জানা গেছে অনুসন্ধানে।

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় গত ২৮ ডিসেম্বর একটি সড়ক দুর্ঘটনার ছবি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ওই ছবিতে দেখা যায়, এনা পরিবহনের একটি বাস সড়ক বিভাজক ভেঙে রাস্তার অন্য পাশের একটি মাইক্রোবাসের ওপরে উঠে গেছে।

দুর্ঘটনায় আহত হন মাইক্রোবাসটির চালক। ওই দুর্ঘটনার পর এনা পরিবহনের বাসের বেপরোয়া চলাচলের পুরোনো অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার খবর নিয়মিত হলেও আলাদাভাবে এনা পরিবহন কেন বারবার আলোচনার জন্ম দিচ্ছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা।

দেখা গেছে, সড়কসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, এনা পরিবহনের বাসগুলো অন্য কোম্পানির বাসের চেয়ে ‘বেপরোয়া’ গতিতে রাস্তায় চলছে। এর পেছনে চালকদের একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালনা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, ক্ষমতার অপপ্রয়োগসহ বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।

তবে বাস কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। দুর্ঘটনা এড়াতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে তাদের।

অভিযোগ অনেক, আছে প্রশংসাও

এনা পরিবহনে চলাচল করা একাধিক যাত্রী ও অন্য পরিবহনের চালকদের সঙ্গে কথা বলে এনার বাসের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এর সঙ্গে রয়েছে খানিকটা প্রশংসাও।

এনা পরিবহনে নিয়মিত ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যান মো. সোহান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এনা পরিবহন নির্দিষ্ট কাউন্টার ছাড়া যাত্রী তোলে না। এ কারণে তাদের সুনাম আছে।

‘তবে এনা ফাঁকা রাস্তা পেলে উড়ে চলে। আমি কখনোই এনা পরিবহনের গাড়ির সামনের দিকে বসি না, ভয় লাগে। তারা ওভার স্পিডে গাড়ি চালানোর জন্য বিখ্যাত।’

ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটের শাহ জালাল ট্রাভেলসের একটি বাসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এনার গাড়ি রাফ চালালেও প্রতিবাদ করার কেউ নাই। তাদের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ার আগেই আমরা সেভ হয়ে (নিরাপদ দূরত্বে চলে) যাই। এনার ড্রাইভাররা মাহাজনের (মালিক) সাপোর্ট পায়। তাই তাদের অন্য রকম দাপট আছে।’

এনার সব ড্রাইভার অবশ্য বেপরোয়া গাড়ি চালান না বলেও জানান ওই বাসচালক। তিনি বলেন, ‘কিছু ড্রাইভার আছে রাফ গাড়ি চালান। এই ড্রাইভারদের কারণে সব ড্রাইভারের দোষ হয়। আমাদের মাহাজন তো সাধারণ মাহাজন, তাই আমাদের মেনে নিতে হয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৌখিন পরিবহনের এক চালক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এনার এক গাড়িতে দুই ড্রাইভার থাকেন। এক ড্রাইভার টানা ১০-১৫ দিন গাড়ি চালান, এরপর আরেকজন। প্রথম ড্রাইভার যে কয় দিন চালান, অন্য ড্রাইভারকেও সেই কয় দিন চালাতে হয়।

‘এমনও আছে সারা মাস একজনই গাড়ি চালান। ময়মনসিংহ রুটে একজন ড্রাইভার প্রতিদিন তিন, চার এমনকি পাঁচটা ট্রিপও মারেন। বেশি ট্রিপ মারার জন্যই অ্যাকসিডেন্ট হয়।’

তিনি বলেন, ‘ড্রাইভাররাও তো মানুষ। টানা গাড়ি চালালে শরীর দুর্বল হয়ে ঘুম আসবে এটাই স্বাভাবিক। এনার মালিক ক্ষমতাবান হওয়ায় এদের বাস সবাই সাইড দিয়ে চলে। আটকাইয়া রাখলেই সমস্যা।’

চালকদের নেই নিয়োগপত্র

এনা পরিবহনের ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের এক সুপারভাইজার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই রুটে প্রতি ট্রিপে হেলপার ২১০ টাকা, সুপারভাইজার ২২০ টাকা এবং ড্রাইভার ৫০০ টাকা পান। দুইজন ড্রাইভার কম্প্রোমাইজ করে একজনের পর একজন টানা ১০-১৫ দিন করে গাড়ি চালাতে পারেন।’

এনা পরিবহনের ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের এক চালক বলেন, ‘আগে দিনে চারটা ট্রিপ মারতে পারতাম। এখন যানজটের কারণে সর্বোচ্চ তিনটা ট্রিপ মারতে পারি। জ্যামের কারণে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যেতে চার, পাঁচ, ছয় ঘণ্টাও লেগে যায়।’

তিনি বলেন, ‘এনার গাড়ি কাউন্টার ছাড়া যাত্রী নেয় না। সময় মেইনটেইন করে বলে সবাই এনা পরিবহনে চড়তে চায়। এই কারণে গাড়িটা একটু টেনে চলে।’

দিনের পর দিন টানা গাড়ি চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পেটের দায়ে চালাই। সংসারের দিকে তাকালে তখন চালাতেই হয়। আমরা তো নিরুপায়, আল্লাহ ছাড়া কেউ নাই আমাদের। আমাদের কর্মঘণ্টা কে ঠিক করবে!’

দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অ্যাকসিডেন্ট ড্রাইভারের নিজের দোষে হয়, আবার গাড়ির দোষেও হয়। বড় কারণ টেনশন। কয় টাকা পাই আমরা? পরিবার তো চালানো লাগে। যদি সংসার ভালোভাবে চলত, তাইলে কোনো টেনশন থাকত না।

‘টানা গাড়ি চালানোর জন্য শরীরে সমস্যা হয়। এক গাড়ি দুইজন চালানোর জন্য মাসে ১৫ দিন ট্রিপ পাই। এর মধ্যে গাড়ি নষ্ট হয়ে দুই-এক দিন মিস হয়। এই কারণে বেশি ট্রিপ মারার চিন্তা থাকে, যে কারণে শরীর দুর্বল হয়ে অ্যাকসিডেন্ট বেশি হয়।’

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘গাড়ি আট ঘণ্টা চালানোর কথা, কিন্তু চালাতে কি দিচ্ছে? মাসিক বেতন দিচ্ছে? নিয়োগপত্র দিচ্ছে? কই কোনো খবরই তো নাই। মালিক নেতারা এটা নিয়ে ভাবেন না। আমরা পরিবহন শ্রমিকরা সুখে নাই। তেলের দাম বাড়ায় মালিকেরা লাভবান হইছে, আমরা আগের মতোই আছি।’

এনার হবিগঞ্জ রুটের এক চালক বলেন, ‘ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ যেতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগে। তবে জ্যামের কারণে এখন বেশি সময় লাগে। আমরা দিনে তিন ট্রিপও মারি। আমাদের রুটে এক দিন পরে এক দিন গাড়ি চালান ড্রাইভারেরা। ঈদের সময় তো টানা ৩০ ঘণ্টাও গাড়ি চালাইছি।’

বিয়ানীবাজার রুটের এনা পরিবহনের এক সুপারভাইজার বলেন, ‘এনা পরিবহনের প্রধান রুট চিটাগাং, কক্সবাজার, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর। এনার সব রুট মিলিয়ে গাড়ি রয়েছে পাঁচ-ছয় শ। যে কোম্পানির গাড়ি যত বেশি, অ্যাকসিডেন্ট তত বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। যার গাড়ি কম তার অ্যাকসিডেন্টও কম। আমাদের গাড়ির স্পিড ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারে ফিক্সড, তবে চিটাগাং রোডে সর্বোচ্চ ১০৫ কিলোমিটারে ওঠে।’

অভিযোগের বিষয়ে কী বলছে এনা কর্তৃপক্ষ

একজন চালকের দীর্ঘ সময় ধরে টানা গাড়ি চালানোর অভিযোগ মানতে রাজি নন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও এনা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘না, এটা নিয়ম না। ময়মনসিংহ রুটে একজন ড্রাইভার ৮-১০ দিন টানা গাড়ি চালায়, এটা আমার নলেজে নাই। ময়মনসিংহ রুটে তো দুই দিন পরপর শিফট পরিবর্তন হয়।’

এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে এনা পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক আতিকুল আলম আতিকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন এনায়েতুল্লাহ।

তিনি দাবি করেন, এনার চালকদের ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি এলাকায় গিয়ে গিয়ে এই ট্রেনিং দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা এড়াতে আমি যত কাজ করে থাকি, খুব কম মানুষ তা করে। আমরা এমন ব্যবসা করি যে ড্রাইভাররা অপরাধ করলে আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ে। আমার কাগজপত্র, রোড পারমিট সব ঠিক আছে। একজন ড্রাইভারের ১০-১৫ দিন টানা গাড়ি চালানোর প্রশ্নই আসে না। কেউ বললে এটা অতিরিক্ত বলেছে, মিথ্যা বলেছে।’

এ বিষয়ে এনা পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক আতিকুল আলম আতিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ময়মনসিংহ রুটে রাতে গাড়ি চলে না, শুধু দিনে চলে। রাতের লাস্ট ট্রিপ ৯টায়। কাছাকাছি রুট হওয়ায় ড্রাইভাররা টানা এক, দুই বা তিন দিন চালাতে পারে। তবে লং রুটে এক দিন পর এক দিন করে মাসে ১৫ দিন গাড়ি চালায়।’

ড্রাইভাররা নিজস্ব সমঝোতার ভিত্তিতে টানা গাড়ি চালাচ্ছেন কি না, প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এর কোনো সুযোগ নাই। আমাদের প্রতিটা গাড়ি বের হওয়ার সময় কত নম্বর গাড়ি, ড্রাইভার, সুপাইভাইজার সব লেখা থাকে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ রুটে এক-দুই দিন চালালে আমরা তাকে অফ করে দেই। এটা যে আপনাকে বলেছে সে আমাদের ড্রাইভার কি না জানি না।’

বাসশ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। গাড়ি একবার পৌঁছিয়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা রেস্ট নিয়ে এর পরে আসবে। যদি কোনো ড্রাইভার স্টাফের সঙ্গে কথা বলে ২৪ ঘণ্টায় তিন ট্রিপ মারে. তবে সে অন্যায় করছে। এটা যদি কেউ করে থাকে সেটা আমাদের নলেজের বাইরে।’

এনা পরিবহনের বেপরোয়া গতিতে চলা এবং মালিকের ক্ষমতার অপপ্রয়োগের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের গাড়িতে অভিযোগ করার জন্য নম্বর দেয়া আছে। কেউ অভিযোগ দিলে আমরা ওই গাড়ির ড্রাইভারকে ডেকে এনে ব্যবস্থা নেই। আমাদের গাড়ি সিল করে দিছে, গতি কখনও ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটারের বেশি উঠবে না।

‘মাঝেসাঝে এর কম-বেশি হয়ে যায়। ড্রাইভার যখন অতিরিক্ত রেস দেয় সে ইচ্ছা করে পিকআপে বাড়ি দিয়ে এটা ওঠাতে পারে। কিন্তু আমাদের সর্বোচ্চ ৯০ কিলোমিটার গতি লক করা আছে।’

বাসচালকদের নিয়োগপত্র না দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে আতিক বলেন, ‘শুধু আমাদের না, পরিবহনের সিস্টেম হলো সবার বেলায় বায়োডাটা, কাগজপত্র জমা রেখে আমরা চাকরি দেই। এই এতটুকই। বায়োডাটা, কাগজপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স ঠিক আছে কি না দেখি। আমাদের গাড়ি চালানোর উপযুক্ত কি না, সেটা দেখে নিয়োগ দেই।’

নিয়োগপত্র দেয়ার কোনো সিস্টেম দেশের পরিবহন খাতে এখন পর্যন্ত নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘নিয়ম আছে ঠিক আছে, কিন্তু লিখিতভাবে কেউ দেয় নাই। মৌখিকভাবে নিয়োগ হয় আরকি।’

রাজধানীর রাস্তায় সম্প্রতি এনা পরিবহনের বাসের দুর্ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাত সাড়ে ১২টায় এই গাড়ি সিলেট থেকে ছেড়ে আসছে। টার্মিনালে জ্যাম থাকার কারণে গাড়িটা টার্মিনালে ঢুকতে পারে নাই। রাস্তার পাশে পার্কিং করে ড্রাইভার ঘুমাতে গিয়েছিল। টার্মিনালে এসে গাড়ি প্লেস করার পরে সব গাড়ির চাবি স্টিয়ারিংয়ে থাকে। গাড়ির হেলপার গাড়িতে ঘুমায়। ধারণা করছি, ওই হেলপার গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিল।

‘কামারপাড়া আমাদের একটা ডিপো আছে। সে কি ডিপোতে যাচ্ছিল, না অন্য কোথাও যাচ্ছিল আমার জানা নাই। সে এখনও পলাতক। আর ড্রাইভারকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে।’

এনা পরিবহনের কয়েকটি দুর্ঘটনা

গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার রশিদপুরে একটি পেট্রলপাম্পের কাছে এনা পরিবহন ও লন্ডন এক্সপ্রেসের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ছয়জন ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়।

২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর হবিগঞ্জে মাধবপুরে এনা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের এক আরোহী নিহত হন।

২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এনা পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষ ঘটে। এতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুজন আহাম্মেদ নিহত হন। এ ছাড়া অটোরিকশার চালক ও সুজনের মা, ভাবিসহ কয়েকজন বাসযাত্রী আহত হন।

ওই বছরের ৬ মার্চ রাজধানীর বনানী এলাকায় এনা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ নিহত হন।

২০২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভাওয়াল উদ্যানের পাশে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে এনা পরিবহনের একটি বাস কাভার্ড ভানের পিছনে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলে দুইজনের মৃত্যু হয়।

২০২০ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ঢাকাগামী এনা পরিবহনের একটি বাস অটোরিকশাকে চাপা দিলে অটোরিকশার চালক আবু সাঈদ নিহত হন।

২০১৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে বিয়ানীবাজারগামী এনা পরিবহনের একটি বাস খাদে পড়ে যায়। তবে দুর্ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।

২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের দয়ামীরে এনা পরিবহনের বাসের ধাক্কায় ১৪ বছরের এক কিশোর গুরুতর আহত হয়।

২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় এনা পরিবহনের বাস খাদে পড়ে তিন যাত্রী নিহত হন।

২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট নরসিংদীর শিবপুরে এনা পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসের চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের অভিযোগ, ‘এনা পরিবহনের মালিক পরিবহন মালিকদের শীর্ষস্থানীয় নেতা। এ কারণে তার বাসের চালক ও শ্রমিকেরা বেপরোয়া আচরণ করেন। রাস্তায় তারা অন্য কোনো গাড়িকে সাইড দেন না। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।’

গণপরিবহনের চালকদের নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার ওপরেও জোর দিচ্ছেন তিনি।

পরিবহনের নামে নয়, নম্বর প্লেটে মামলা

পরিবহন হিসেবে এনার বাসের অনিয়ম বা দুর্ঘটনার বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই হাইওয়ে পুলিশের কাছে।

হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর বিভাগের পুলিশ সুপার আলী মোহাম্মদ খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেকোনো গাড়ি ওভার স্পিডে চললে আমরা মামলা দিয়ে দেই। আমাদের যে সফটওয়্যার আছে সেখানে গাড়ির নম্বর ধরে মামলা দেয়া হয়। কোনো পরিবহনের বিরুদ্ধে মামলা হয় না।’

হাইওয়ে পুলিশের সিলেট বিভাগের পুলিশ সুপার মো. তরিকুল্লাহ বলেন, ‘কোন পরিবহনের গাড়ি কী করল সেটা আমরা দেখি না। গাড়ি চালায় মানুষে, ড্রাইভার ডেসপারেট হয়ে গেলে সে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। মানুষ মারা গেলে আমরা মামলা করে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে চার্জশিটের ব্যবস্থা করি। কোন পরিবহন কী করল সেটা আমরা দেখতে যাই না। স্পেসিফিক কোনো পরিবহন না, আমরা গাড়ির নম্বর নিয়ে মামলা দেই।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

দুর্নীতিতে ডুবছে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়

দুর্নীতিতে ডুবছে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়

রাজধানীর মিরপুরে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশ পথ। ছবি: নিউজবাংলা

ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ ও সম্মানীতে আছে অনিয়ম আর ছলচাতুরি। বিদ্যালয়ের জায়গায় তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য দোকান। কাগজে-কলমে কম দেখিয়ে অবৈধভাবে কয়েক গুণ বেশি জমিতে দোকান বরাদ্দের মাধ্যমে চলছে ভাড়া-বাণিজ্য। আর এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কেন্দ্রে বসে আছেন প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির যোগসাজশেরও অভিযোগ রয়েছে।

অনিয়ম আর দুর্নীতি অনেকটাই নিয়মে পরিণত করেছে রাজধানীর মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে। শিক্ষকদের নিয়ে ক্লাস-বাণিজ্য চলে খোলামেলা। শিক্ষক এমপিওভুক্তিতেও হয় অর্থের লেনদেন। আর এসব অনিয়ম ঘেঁটে যে কেন্দ্রীয় চরিত্র পাওয়া যায়, তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক আহমাদ হোসাইন। তার সঙ্গে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির যোগসাজশেরও অভিযোগ রয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে কম বেতনের খণ্ডকালীন শিক্ষকদের সম্মানীতেও আছে অনিয়ম আর ছলচাতুরি। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের জায়গায় তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য দোকান। কাগজে-কলমে আয়তন কম দেখিয়ে অবৈধভাবে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জমিতে দোকান বরাদ্দের মাধ্যমে বছরের পর বছর চলছে ভাড়া-বাণিজ্য।

সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লেখাপড়া দেখভালের চেয়ে এসব কাজ নিয়েই প্রধান শিক্ষক আহমাদ হোসাইনের বেশি ব্যস্ততা। ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে আঁতাত করে ঐতিহ্যবাহী স্কুলটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন তিনি। অনিয়মকে নিয়ম বানাতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যতটা তৎপর, ঠিক ততটাই উদাসীন শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া আর প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার উদ্যোগে।

ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি ও জেলা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো মাধ্যম থেকেই কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রধান শিক্ষক বা ব্যবস্থাপনা কমিটির সার্বিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখার উদ্যোগটুকুও নেয়া হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব অভিযোগের তীর বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিকে ঘিরে; যার নেপথ্যে কলাকাঠি নাড়ছেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের কয়েকজন জানান, বিদ্যালয়টি পরিচালনার ক্ষেত্রে একদিকে প্রধান শিক্ষক ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন, অন্যদিকে তথাকথিত নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যক্রমেও রাখছেন স্বেচ্ছাচারী ভূমিকা। দিনের পর দিন প্রধান শিক্ষকের এমন কর্মকাণ্ডে বিদ্যালয় ও ব্যবস্থাপনা কমিটি বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হলেও অজ্ঞাত কারণে চুপ থাকছেন দায়িত্বশীলরা।

ব্যবস্থাপনা কমিটি নিশ্চুপ থাকার নেপথ্য কারণও অনুসন্ধান করা হয়েছে। তাতে উঠে এসেছে আরেক তথ্য। জানা গেছে, এ কমিটির নেতৃত্বে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পরিবার।

তথাকথিত নির্বাচন ও সমাঝোতার মাধ্যমে ওই পরিবারের লোকজনই ঘুরেফিরে ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বে আসছে। আর এতে সব রকম সহায়তা দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। এসব অনিয়ম-দুর্নীতিতে প্রধান শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটি একে অন্যের সহযোগী। ফলে কেউ কারও বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটুকুও করে না।

এসব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার প্রভাব পড়েছে সার্বিক শিক্ষাদানেও। দিন দিন শিক্ষার্থী কমতে থাকায় বিদ্যালয়টি এখন পরিচালন সংকটে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষায় খাতা টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদটি বাগিয়ে নেন আহমাদ হোসাইন। এরপর ‘বিশেষ কায়দায়’ ধর্ম শিক্ষক থেকে বাংলার শিক্ষক হয়ে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করান এমপিওভুক্তির তালিকায়। এর পরই বিদ্যালয় পরিচালনায় তার স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হয়। চালিয়ে যেতে থাকেন একের পর এক অনিয়ম।

এসব বিষয়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি ও জেলা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করা হয়েছে। সেসব অভিযোগের অনুলিপি নিউজবাংলার হাতেও এসেছে। কিন্তু কোনো মাধ্যম থেকেই এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রধান শিক্ষক বা ব্যবস্থাপনা কমিটির সার্বিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখার উদ্যোগটুকুও নেয়া হয়নি।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহমাদ হোসাইন এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অবসরে গেলে কপাল খুলে যায় আহমাদ হোসাইনের। তিনি যখন প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসেন, তখন তিনি ছিলেন একজন নন-এমপিওভুক্ত ধর্ম শিক্ষক।

এরপর ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক চেয়ে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণের অন্তত ১৫ দিন আগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মেয়াদ ছিল মাত্র চার দিন।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষায় খাতা টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদটি বাগিয়ে নেন আহমাদ হোসাইন। এরপর ‘বিশেষ কায়দায়’ ধর্ম শিক্ষক থেকে বাংলার শিক্ষক হয়ে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করান এমপিওভুক্তির তালিকায়। এর পরই বিদ্যালয় পরিচালনায় তার স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হয়। চালিয়ে যেতে থাকেন একের পর এক অনিয়ম।

প্রধান শিক্ষক হওয়ার নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আহমাদ হোসাইন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নিয়োগ পরীক্ষায় খাতা টেম্পারিংয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আর এমপিওভুক্তির বিষয়ে যে দুর্নীতির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আমার কোনো হাত নেই। কারণ এমপিও করে মাউশি আঞ্চলিক অফিস।’

এ বিষয়ে মাউশির পরিচালক (বিদ্যালয়) বেলাল হোসাইন বলেন, ‘অভিযোগগুলো গুরুতর। আমি অবশ্যই খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

বিদ্যালয় পরিচালনায় প্রধান শিক্ষকের অনিয়মের অভিযোগের তালিকা বেশ দীর্ঘ। তিনি চান বিদ্যালয়ে ঘন ঘন শিক্ষক নিয়োগ হোক। আর কর্মরত খণ্ডকালীন শিক্ষকরা চলে যাক। উদ্দেশ্য, নতুন করে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া। করোনার মধ্যে কিছুদিন আগে স্কুলের খণ্ডকালীন কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার পাওনা পরিশোধ না করেই জোরপূর্বক স্কুল থেকে বের করে দেন তিনি।

প্রধান শিক্ষক আহমাদ হোসাইন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নিয়মের বাইরে গিয়ে আমি কিছু করিনি। আর দোকান বরাদ্দের বিষয়ের আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক খণ্ডকালীন শিক্ষক বলেন, ‘তার (প্রধান শিক্ষক) চাপের কারণে তিনজন শিক্ষক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন। বাকি যারা ছিলেন তাদের ক্লাস-রুটিনে রাখা হয় না। ২০১৮ সাল থেকে আমাদের কোনো ক্লাস দেয়া হয় না। এমনকি খণ্ডকালীন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তিন-চার মাস পর পর এক মাসের বেতন দেয়া হয়। এসএসসি কোচিং এবং মডেল টেস্টের নামেও পরীক্ষার্থীদের থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আহমাদ হোসাইন দাবি করেন, নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি কিছু করেননি। নিয়মের ভেতরেই সবকিছু করা হয়েছে।

স্কুলের জায়গা কম বরাদ্দ দেখিয়ে বেশি ভোগ করতে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। সরেজমিন অনুসন্ধানে এর সত্যতাও মিলেছে। দেখা গেছে, স্কুলের সঙ্গে পূর্ণিমা রেস্তোরাঁ হোটেলটি কার্যকরী পরিষদ ৯ ফুট প্রস্থ ও ২০ ফুট দৈর্ঘ্য হিসেবে বিক্রি করেছে। কিন্তু সেখানে দখল দেয়া হয়েছে প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গা। অথচ এ বাড়তি বরাদ্দের টাকা বিদ্যালয়ের তহবিলে যায়নি কখনই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘দোকান বরাদ্দের বিষয়ের আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’ কারা সংশ্লিষ্ট এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা আমি বলতে যাব কেন?’

সরাসরি না বললেও প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির দিকেই উঠেছে অভিযোগের তীর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ মোহন রায় বলেন, ‘আপনি প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’

শেয়ার করুন

যে রহস্যের কিনারা নেই

যে রহস্যের কিনারা নেই

৩১ মে ২০২১। সকালবেলা আচমকা বদলে যায় গোটা ভবনের দৃশ্য। তিন তলার ফ্ল্যাটে নিজ কক্ষের দরজা ভেঙে ডা. সাবিরার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কক্ষের বিছানার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল রক্তাক্ত মরদেহ। গলা ও পিঠে ছুরির আঘাত। সেই হত্যার ৮ মাসে কোথায় আছেন তদন্তকারীরা?

ঢাকার কলাবাগান।

ফার্স্ট লেনের ৫০/১ নম্বর বাড়ি। পাঁচ তলা এই ভবনের প্রতিটি তলায় দুটি করে ফ্ল্যাট। তিন তলায় সিঁড়ির বাম পাশের ফ্ল্যাটে মাস পাঁচেক হলো ভাড়া থাকেন কাজী সাবিরা রহমান লিপি।

২০২১ সালের শুরুতে ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেন গ্রিন লাইফ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক সাবিরা। ৪৭ বছর বয়সী ডা. সাবিরার স্বামী-সন্তান থাকেন অন্য বাসায়।

বাসা ভাড়া নেয়ার মাসখানেক পর বাসার একটি কক্ষ সাবলেট দেন তিনি। প্রথম সাবলেট নেয়া তরুণী ছিলেন এক মাস। এরপর মাস চারেক আগে ওঠেন কানিজ সুবর্ণা নামের আরেক তরুণী।


যে রহস্যের কিনারা নেই
কলাবাগান ফার্স্ট লেনের এই বাড়িতে থাকতেন ডা. সাবিরা। ছবি: নিউজবাংলা

৩১ মে ২০২১। সকালবেলা আচমকা বদলে যায় গোটা ভবনের দৃশ্য। তিন তলার ফ্ল্যাটে নিজ কক্ষের দরজা ভেঙে ডা. সাবিরার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কক্ষের বিছানার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল রক্তাক্ত মরদেহ। গলা ও পিঠে ছুরির আঘাত।

সারা ঘরে তখন আগুনের ধোঁয়া। মরদেহের সালোয়ার-কামিজ পুড়ে গেছে, বিছানার চাদরও পুড়েছে অনেকটা। তবে দরজা ভেঙে পুলিশ যখন ভেতরে ঢোকে, ততক্ষণে আগুন নিভে গেছে, কেবল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক।

সাবিরার পাশের কক্ষে সাবলেট থাকা তরুণী সুবর্ণার ভাষ্য, সেদিন ভোর ৬টার দিকে তিনি ধানমন্ডি লেকে হাঁটতে বের হন। এ সময় সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। সাবিরার কক্ষ ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তিনি স্বাভাবিকভাবে অন্য দিনের মতোই সকালে বেরিয়ে যান। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এটাই ছিল সুবর্ণার ভোরের রুটিন।

সুবর্ণা ফ্ল্যাটের প্রধান দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যান। বাড়ি ছাড়ার সময় প্রধান ফটক খুলে দেন দারোয়ান রমজান। এর তিন ঘণ্টা পর সকাল ৯টার দিকে বাসায় ফেরেন সুবর্ণা। নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকেই দেখতে পান ধোঁয়া। সাবিরার কক্ষের বন্ধ দরজার নিচ দিয়ে আসা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে ড্রয়িংরুমেও।

যে রহস্যের কিনারা নেই
ডান দিকের কক্ষে থাকতেন ডা. সাবিরা, বাম পাশে থাকতেন সুবর্ণা। ছবি: নিউজবাংলা

তখন সকাল প্রায় সাড়ে ৯টা। হতভম্ব সুবর্ণা ফোন করে ডেকে আনেন দারোয়ান রমজানকে। ছুটে আসেন ভবনটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা সামিয়া রহমানসহ আশপাশের অনেকে।

এই ভবনের মালিক মাহবুবুল ইসলাম একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায়। আর ভবন দেখভালের দায়িত্বে থাকা সামিয়া থাকেন পাশের আরেকটি ভবনে।

ডা. সাবিরার কক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সকাল ১০টার দিকে খবর দেয়া হয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে। তারা এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে সাবিরার নিথর দেহ।

কীভাবে এই মৃত্যু? ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে কী ঘটেছিল ওই কক্ষে? খুনি কীভাবে ঢুকল, কীভাবেইবা বেরিয়ে গেল সবার অগোচরে? হত্যার মোটিভ কী? সাবিরার গলায় ও পিঠে ছুরির আঘাত থাকলেও সেই ছুরিটি কোথায়?

ঘটনার প্রায় আট মাস পরেও এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বদল হয়েছে তিনবার, কিন্তু রহস্যের জাল ছিন্ন হয়নি এখনও।

ঘটনার দুদিন পর অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন ডা. সাবিরার মামাতো ভাই রেজাউল হাসান মজুমদার জুয়েল। মামলা নম্বর ১/৯৪। এর পরেই প্রথম তদন্ত শুরু করে কলাবাগান থানা পুলিশ। পাশাপাশি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও নামে তদন্তে।

তবে রহস্যের জট না খোলায় মামলাটি এরপর চলে যায় পিবিআইয়ের কাছে।

ডা. সাবিরা হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে কেন এই দীর্ঘসূত্রতা, তা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক বনি আমিন বিশ্লেষণ করেছেন ঘটনার আগে-পরের বিভিন্ন দিক।

ঘটনার দিন পুলিশের বিশেষ ইউনিট ক্রাইম সিনের ধারণা ছিল, ডা. সাবিরার মৃত্যু হয় মরদেহ পাওয়ার বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে, মধ্যরাতে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সাবলেট থাকা সুবর্ণা কেন তা জানতে পারেননি, না কি তিনি জানতেন?

আবার সুবর্ণার দাবি ধানমন্ডি লেকে হেঁটে বাসায় ফিরে আগুনের ধোঁয়া দেখতে পান। তাহলে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে আগুন লাগাল কে? মৃত মানুষের পক্ষে তো আর আগুন লাগানো সম্ভব নয়!

ডাক্তার সাবেরার মরদেহের গলায় ও পিঠে ছিল ছুরির আঘাতের চিহ্ন। তার মানে, এটি আত্মহত্যা নয়। ছুরিটি না পাওয়ায় হত্যার বিষয়টি নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত তদন্তকারীরা। কিন্তু খুনি কে?

সাবিরা রহমান দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন, সেদিক থেকে কোনো ঝামেলা ছিল কি না, খুঁজেছে নিউজবাংলা।

মাস চারেক সাবলেট থাকা সুবর্ণাকে বাসার তত্ত্বাবধায়ক ও দারোয়ানের কাছে নিজের বোনের মেয়ে হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সাবিরা। ঘটনার পর জানা যায়, তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। আবার বাসার তত্ত্বাবধায়ক থেকে শুরু করে সবাই জানত কানিজ সুবর্ণা একজন মডেল। কিন্তু কানিজ সুবর্ণার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি মডেলিংয়ের সঙ্গে জড়িত নন। প্রশ্ন হলো, তারা দুজনেই কেন মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করলেন?

ডাক্তার সাবিরা ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন গত বছরের জানুয়ারিতে। পরের মাসেই সাবলেট হিসেবে উঠেছিলেন আরেক তরুণী। স্কুলশিক্ষক পরিচয় দেয়া সেই তরুণী সাবলেট ছিলেন এক মাস। পরের মাসে ওই ফ্ল্যাটে আসেন সুবর্ণা।

কলাবাগানের বাসাটি ভাড়া নেয়ার আগে ডা. সাবিরা থাকতেন একই এলাকার বশিরউদ্দীন রোডের আরেকটি ফ্ল্যাটে। ৭/২ নম্বর ভবনের বাড়িওয়ালা ফজলুল হকের ফ্ল্যাটে এক কক্ষ ভাড়া নিয়ে একাকী থাকতেন এই চিকিৎসক।

ডা. সাবিরার দ্বিতীয় স্বামী সাবেক ব্যাংকার শামসুদ্দিন আজাদ। তিনি তার প্রথম স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে থাকেন শান্তিনগরের বাসায়।

ডা. সাবিরার প্রথম স্বামীর নাম ডা. ওবায়দুল্লাহ। ২০০৩ সালে ওবায়দুল্লাহ মারা যাওয়ার পর ২০০৬ সালে তিনি বিয়ে করেন শামসুদ্দিন আজাদকে।

সাবিরা কলাবাগানের বশিরউদ্দীন রোডে একাকী বাসা ভাড়া নেয়ার আগে থাকতেন গ্রিন রোডে মায়ের বাসায়। সেখানে তার প্রথম পক্ষের সন্তান আহমেদ তাজওয়ার এবং দ্বিতীয় পক্ষের মেয়েও থাকেন।

স্বামী-সন্তান এমনকি মায়ের বাসা ছেড়ে ডা. সাবিরা কেন একাকী বাসা ভাড়া নিলেন- সেই প্রশ্নের জবাবও খুঁজেছে নিউজবাংলা।

তার আগে চলুন একবার ঘুরে আসি কলাবাগানের যে ফ্ল্যাটে ডা. সাবিরা খুন হন, সেখানে।

রাজধানীর কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড। কলাবাগান ফার্স্ট লেনের পাকা সড়কটি ধরে ৩৩৫ কদম হাঁটলে বাঁ পাশে চোখে পড়ে ৫০ নম্বর বাসা। এই বাসার পাশ দিয়ে একটি গলি। সেই গলি দিয়ে ঢুকতেই দ্বিতীয় বাসাটির নম্বর ৫০/১। এই ভবনের তৃতীয় তলায় থাকতেন ডা. সাবিরা রহমান।

যে রহস্যের কিনারা নেই
কলাবাগান ফার্স্ট লেনের সড়ক। ছবি: নিউজবাংলা



প্রধান ফটকে নক করতেই বেরিয়ে আসেন দারোয়ান রমজান। ডা. সাবিরার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলে যান ঘটনাপ্রবাহ।

ঘটনার আগের দিন ৩০ মে ২০২১। রাত ১০টায় বাসায় ঢোকেন ডা. সাবিরা। সাবলেট থাকা সুবর্ণা বাসায় ফেরেন আরও আগে।

বাসার নিয়ম অনুযায়ী, রাত ১১টায় প্রধান গেট বন্ধ হয়। তবে সেদিন রাত ১১টায় গেট বন্ধ হয়নি। কারণ পাশের বাসার তত্ত্বাবধায়ক সামিয়া দারোয়ান রমজানকে পাঠিয়েছিলেন ধানমন্ডিতে তার ব্যক্তিগত কাজে। রমজান কাজ শেষ করে কলাবাগানে ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে ১২টা বেজে যায়।

মধ্যরাতে ফিরে প্রধান ফটকসহ ছাদের গেট বন্ধ করেন রমজান। এরপর ঘুমিয়ে যান তিনি।

৩১ মে সকাল ৬টা। ঘুম থেকে উঠে সুবর্ণার জন্য গেট খুলে দেন রমজান।

এরপর নিজের কিছু কাজ সেরে রমজান বাজারে যান, সেখান থেকে বাসায় ফেরেন সকাল ৯টার দিকে। এর কিছু আগেই বাসায় ফেরেন সুবর্ণা।

কিছুক্ষণ পর সুবর্ণা রমজানকে ফোন করে তিন তলায় ডাকেন। রমজান গিয়ে দেখতে পান ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে সুবর্ণা পায়চারি করছেন আর মোবাইলের বাটন টিপছেন। এ সময় সাবিরার রুম থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।

রমজান নেমে পাশের বাসায় গিয়ে ভবনের তত্ত্বাবধায়ক সামিয়াকে ডেকে আনেন। এরপর খবর দেয়া হয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে। পরে দরজা ভেঙে উদ্ধার করা হয় ডা. সাবিরার মরদেহ।

ডা. সাবিরা হত্যার আগে ওই ভবনে কোনো সিসিটিভি ছিল না। তবে এখন বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। ভবনের আশপাশে কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করেছে পুলিশ।

ভবনের প্রধান ফটকের পরেই গ্যারেজ। গ্যারেজটির দুই পাশের ওয়াল ডিঙিয়ে কেউ যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারে সে জন্য রয়েছে রডের তৈরি বেড়া। তাই এদিক দিয়ে কারও ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই।

ভবনের পাশ দিয়ে বেয়ে তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে ঢুকতে গেলে জানালার গ্রিল ভাঙতে হবে। সে ধরনের কোনো আলামত পায়নি পুলিশ। এর অর্থ, খুনি ঢুকেছে এবং বেরিয়েছে ভবনের প্রধান ফটক দিয়েই।

তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায় সাবিরার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। অনুসন্ধানের স্বার্থে চাবি পুলিশের কাছে।

তবে এই বাসার সব ফ্ল্যাট একই ধরনের। সাবিরা হত্যার পর ভবনের তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ারা একে একে চলে গেছেন। ভবনের এসব ফ্ল্যাটের সবগুলো এখনও ফাঁকা।

যে রহস্যের কিনারা নেই
ডা. সাবিরা কলাবাগানের এই ভবনে থাকতেন। ছবি: নিউজবাংলা

ডা. সাবিরার ফ্ল্যাটের ঠিক ওপরের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে গিয়ে এর নকশা পর্যবেক্ষণ করেছেন নিউজবাংলার বনি আমিন।

দেখা গেছে, দুই রুম, এক ড্রইং আর এক কিচেনের ফ্ল্যাটে থাকতেন ডা. সাবিরা রহমান। ফ্ল্যাটে ঢুকতেই সোজাসুজি রুমে থাকতেন সুবর্ণা আর ডান পাশেরটিতে থাকতেন সাবিরা।

প্রতিটি কক্ষের দরজার লক ভেতর থেকে বন্ধ করা যায়। তবে বাইরে থেকে চাবি ঘুরিয়ে খোলা সম্ভব। ফ্ল্যাটের প্রধান দরজার লকেও একই ব্যবস্থা। ফলে এমন হতে পারে সাবিরাকে হত্যার পর ভেতর থেকে লক করে দরজা টেনে বেরিয়ে গেছে খুনি।

সাবিরা হত্যার পর থেকে পুলিশের বিধিনিষেধের মধ্যে আছেন ওই ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকা সুবর্ণা। সাবিরা সুবর্ণাকে আত্মীয় পরিচয় দিলেও তিনি বলছেন, সাবিরা তার পূর্বপরিচিত নন। সুবর্ণা ওই বাসায় উঠেছিলেন টুলেট বিজ্ঞাপন দেখে।

সুবর্ণা গ্রিন রোড এলাকায় ছিলেন চার বছর। পড়াশোনা করছিলেন সেখানকারই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুবর্ণা বলছেন, তিনি সাবিরার কাছে শিক্ষার্থী পরিচয়ই দিয়েছিলেন।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সুবর্ণাকে মডেল হিসেবে বলা হলেও তার দাবি, ওইভাবে তিনি মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত নন। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজে পার্টটাইম কাজ করতেন।

টুলেট দেয়ার সময় সুবর্ণাকে ডা. সাবিরা বলেছিলেন, তার স্বামী বিদেশ থাকেন। তবে পরে সুবর্ণা জানতে পারেন, ডা. সাবিরার স্বামী থাকেন ঢাকার শান্তিনগরে। সাবিরা কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা ব্যক্তিগত জটিলতার মধ্যে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে দাবি করছেন সুবর্ণা।

সাবিরা রহমান কলাবাগানের ৫০/১ নম্বর বাসায় ওঠার আগে থাকতেন একই এলাকার বশিরউদ্দীন রোডের একটি ভবনে। সেই ভবনের মালিক ফজলুল হক জানান, সাবিরার সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্ক ভালো ছিল না। দুই সন্তান নানির ভক্ত হওয়ায় মায়ের সঙ্গে দূরত্ব ছিল।

ফজলুল হক বলছেন, দ্বিতীয় স্বামী শামসুদ্দিন আজাদের সঙ্গে ডা. সাবিরার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। শামসুদ্দিন-সাবিরার ঘরে যে মেয়েসন্তান আছে তার খরচ দিতেন শামসুদ্দিন। তবে প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও তার সন্তান পছন্দ করতেন না বলে সাবিরা আলাদা থাকতেন। এসব বিষয় নিয়ে মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন সাবিরা। প্রায়ই কান্নাকাটি করতেন।

তবে সাবিরার প্রথম পক্ষের সন্তান আহমেদ তাজওয়ারের দাবি, মায়ের সঙ্গে তাদের কোনো টানাপোড়েন ছিল না। সাবিরার প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষের দুই সন্তান তার মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন। এ জন্যই দুই সন্তান নানির কাছে আছেন।

তাজওয়ারের দাবি, করোনা সংক্রমণ শুরুর পর সন্তানদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই সাবিরা আলাদা বাসায় থাকতে শুরু করেন।

ডা. সাবিরা ছেলেকে কানাডা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই খরচ জোগাড় করতে তিনি নিজের গহনা বিক্রি করেন বলে জানান তাজওয়ার। তবে তিনি এও বলছেন, একসঙ্গে থাকলে কিছু মনোমালিন্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে ধরনের কিছু ঘটনা তাদের পরিবারেও ঘটেছে।

অর্থ হাতিয়ে নিতে ডা. সাবিরাকে খুন করা হতে পারে এমন ধারণার পক্ষে নন তাজওয়ার। তিনি বলছেন, ‘তেমন ঘটনা ঘটলে অন্য কারও তো টাকা পাওয়ার কথা নয়। সব টাকা তো আমারই থাকবে।‘

ডা. সাবিরার বাসায় সুবর্ণা চার মাস সাবলেট থাকলেও তাজওয়ার বলছেন, তিনি কখনও সুবর্ণার নামও শোনেননি, মায়ের বাসায় গেলেও কখনও তাদের কথা হয়নি।

সৎবাবার সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না বলেও দাবি করছেন তাজওয়ার।

ডা. সাবিরার বিষয়ে তথ্য জানতে তার দ্বিতীয় স্বামী শামসুদ্দিন আজাদের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পায়নি নিউজবাংলা।

ডা. সাবিরা ছিলেন গ্রিন লাইফ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক। সহকর্মীরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে তার সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। তিনি নিয়মিত নামাজ-রোজা করতেন। ছিলেন যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।

ডা. সাবিরার ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করতেন শাপলা আক্তার। ভবনের দারোয়ান রমজান বলছেন, ২০২১ সালের শুরু থেকেই শাপলা ওই ফ্ল্যাটে কাজ করেন। শুরুতে সকাল-বিকেল কাজ করলেও মাস খানেক পর থেকে তিনি দুপুরের পর এক বেলা কাজে আসতেন।

রমজানের তথ্য বলছে, খুনের ঘটনার আগের দিন কাজে আসেননি শাপলা। এর কারণ নিউজবাংলা জানতে পারেনি।

ডা. সাবিরার মায়ের বাসার গাড়িচালকের নাম আামিন। ওই পরিবারে ৪ বছর চাকরির পর ২০১৮ সালে চাকরি ছাড়েন আমিন। তবে এরপরেও সাবিরার পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।

প্রায়ই বাসার বাজার করে দিতেন আমিন। ডা. সাবিরার ভাড়া বাসাতেও মাঝেমধ্যে তার যাতায়াত ছিল। আমিন বলছেন, সবশেষ ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি সাবিরার বাসায় কিছু আসবাবপত্র দিতে যান।

শাপলা ও আমিনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব এখন পিবিআইয়ের কাছে। পিবিআই প্রধান (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার জানাচ্ছেন, বলার মতো অগ্রগতি এখনও আসেনি।

তিনি বলেন, ‘রহস্য উদ্ঘাটনে বিভিন্নমুখী কাজ আমাদের করতে হয়, সেগুলো করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত কিলারকে শনাক্ত করা না যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বলব যে মামলার তেমন অগ্রগতি হয়নি।’

৮ মাস পেরিয়ে গেছে এই হত্যার। কিন্তু রহস্য ঘিরে আছে প্রতিটি অংশে। বহুবার তদন্তকারীরা ভেবেছেন এই বুঝি পাওয়া গেল খুনের মোটিভ, চিহ্নিত হতে যাচ্ছে ডা. সাবিরার খুনি!

তবে তারপরই আবার ঘিরে ধরেছে অন্ধকার। আর এভাবেই রহস্যের জালে আটকে আছে ডা. সাবিরা লিপির হত্যাকাণ্ড।

শেয়ার করুন

কেন পুলিশের দিকে টাকা ছুড়েছিলেন চীনা নাগরিক?

কেন পুলিশের দিকে টাকা ছুড়েছিলেন চীনা নাগরিক?

রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশের দিকে এক চীনা নাগরিকের টাকা ছুড়ে মারার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। ছবি: ভিডিও থেকে নেয়া

চীনা নাগরিকের চিৎকার ও টাকা ছুড়ে মারার দৃশ্যটি মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন স্যাম আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। এরপর তিনি ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করেন। তবে নিউজবাংলার পক্ষ থেকে স্যামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, পুলিশের টাকা দাবির অভিযোগ তুললেও বিষয়টি তিনি নিজে দেখেননি বা কারও কাছ থেকে শোনেননি। ধারণা থেকেই তিনি অভিযোগটি তুলেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে এক চীনা নাগরিক ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন। এক পর্যায়ে ‘তুমি টাকা চাও, এই নাও টাকা’ বলে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের দিকে টাকা ছুড়ে মারেন তিনি।

কী ঘটেছিল, কেন ওই বিদেশি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের দিকে টাকা ছুড়ে মারেন- সেসব প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে নিউজবাংলা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনাটি মঙ্গলবার বিকেলের। আর ঘটনাস্থল মহাখালী রাওয়া ক্লাব সংলগ্ন ফ্লাইওভারের নিচে ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশে।

ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, রাওয়া ক্লাবের পাশ দিয়ে একটি সড়ক গেছে মহাখালী ডিওএইচএসের দিকে। ডিওএইচএস থেকে আসা গাড়িগুলো যাওয়ার জন্য এই পয়েন্টে জাহাঙ্গীর গেট থেকে আসা গাড়ির সারিকে কিছু সময় পর পর সিগন্যাল দিয়ে থামানো হয়।

এই সিগন্যালে যান নিয়ন্ত্রণ ও গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করতে পুলিশের একাধিক সদস্য নিয়োজিত। পাশেই রয়েছে শেরে বাংলানগর ট্রাফিকের পুলিশ বক্স।

প্রত্যক্ষদর্শীরা নিউজবাংলাকে জানান, মঙ্গলবার বিকেলে নিয়মিত চেকের অংশ হিসেবে একটি প্রাইভেটকার থামান কনস্টেবল রুহুল আমিন খান। চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজ নিয়ে যাচাই করতে নিয়ে যান পাশেই দায়িত্বপালনরত টিএসআই হারুন অর রশীদ সরকারের কাছে।

গাড়ি থামিয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজ নেয়া, যাচাই করার জন্য টিএসআইয়ের কাছে যাওয়া এবং সেগুলো ফেরত দেয়া পর্যন্ত কিছুটা সময় লেগেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পথচারী বলেন, ‘এর মাঝেই হঠাৎ গাড়ি থেকে নেমে আসেন একজন বিদেশি। তিনি তাড়া দিচ্ছিলেন। তার চালককে কাগজগুলো ফিরিয়ে দিয়ে যেন যেতে দেয়া হয়। তবে ‍পুলিশ কাগজপত্র চেক করতে সময় নিচ্ছিল।’

এই পথচারী বলেন, ‘আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কী কথা হচ্ছিল তা বোঝা যাচ্ছিল না। বিদেশি ভদ্রলোক যখন চিৎকার শুরু করেন, আমরা এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, উনি পুলিশের সঙ্গে রাগারাগি করছেন। এক পর্যায়ে টাকা ছুড়ে দেন পুলিশের দিকে।’

চীনা নাগরিকের ওই চিৎকার ও টাকা ছুড়ে মারার দৃশ্যটি মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন স্যাম আহমেদ নামে একজন ব্যক্তি। এরপর তিনি ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করেন।

স্যাম পোস্টের বিবরণে লিখেন, “গতকাল রাওয়া ক্লাব এর সামনে এই সাদা রঙের গাড়িতে থাকা বিদেশিদের দেখে ট্রাফিক পুলিশের মাথা নষ্ট হয়ে যায়৷ সব কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও ড্রাইভারকে লেইম একটা অজুহাত দেখিয়ে যখন টাকা দাবি করলো তখন বিদেশি ভদ্রলোকটি পুলিশকে অনুরোধ করে বলেন, ‘HE IS A POOR MAN PLEASE DON DO THIS’. কে শোনে কার কথা টাকা দিতেই হবে না হলে কাগজপত্র দেবে না মামলা ছাড়া। অতঃপর বিদেশি ভদ্রলোকটি পুলিশের মুখে টাকা ছুড়ে মেরে ড্রাইভারকে বাঁচিয়ে নেয় পুলিশের হাত থেকে।”

তবে নিউজবাংলার পক্ষ থেকে স্যামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, পোস্টে তিনি পুলিশের টাকা দাবির অভিযোগ তুললেও বিষয়টি তিনি নিজে দেখেননি বা কারও কাছ থেকে শোনেননি। ধারণা থেকেই তিনি টাকা দাবির অভিযোগ তুলেছেন।

স্যাম বলেন, ‘টাকা না চাইলে তো চাইনিজ লোকটা টাকা ছুড়ে মারতো না।’

চীনা নাগরিকের ক্ষেপে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ ড্রাইভারকে পাশে থাকা বক্সে যাওয়ার জন্য বলছিল। কিন্তু চাইনিজ নাগরিক তার ড্রাইভারকে দ্রুত ছাড়িয়ে নিতে চাইছিলেন। তার হয়ত তাড়া ছিল, সেজন্য ক্ষেপেছেন মনে হয়।’

স্যাম পরে তার পোস্টগুলো সরিয়ে নেন। তবে এর আগেই ভিডিওটি ডাউনলোড করে আরও অনেকে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন।

ঘটনাস্থলের ১০ গজের মধ্যে ছিলেন সিগারেট বিক্রেতা ফজলুল হক। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশ কোনো টাকা চায়নি। কাগজ দেখতেছিল। বিদেশি হুদাই চিল্লাইছে। ‍উল্টা উনি পুলিশের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে।’

চীনা নাগরিক যে প্রাইভেটকারে ছিলেন তার চালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গেও কথা বলেছে নিউজবাংলা। পুরো বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে দাবি করে রফিক বলেন, ‘ছোট একটা ঘটনা, এটারে অন্যরা এতো বড় বানাইছে। একটা ভুল বোঝাবুঝি হইছে। এই বাইরে কিছু হয় নাই।’

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই চীনা নাগরিক ঢাকার একটি বায়িং হাউজে কর্মরত।

ঘটনা নিয়ে যা বলছে ট্রাফিক পুলিশ

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিউজবাংলাকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নজরে আসতেই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে ওই দিনই দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল রুহুল আমিন খান ও টিএসআই হারুন অর রশীদ সরকারকে ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের উপ কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশের দায় পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-শেরে বাংলানগর জোন) শোভন চন্দ্র হোড় প্রাইভেটকার চালকের বরাত দিয়ে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ নরমালি গাড়ি থামিয়ে কাগজ চেক করছিল। ওই ফরেইনার যে গাড়িতে ছিলেন সেটা থামান একজন কনস্টেবল। থামিয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজগুলো নেন।

‘এরপর কাগজগুলো যাচাই করার জন্য ওখানে দায়িত্বে থাকা টিএসআই এর কাছে নিয়ে যান। টিএসআই হারুন অর রশীদ তখন অন্য আরেকটি গাড়ির কাগজ চেক করছিলেন। যে কারণে ওই গাড়ির কাগজটি চেক করতে দেরি হয়। আর তখনই গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন চীনা নাগরিক। চিৎকার শুরু করেন। টাকা ছুড়ে মারেন।’

গাড়ি চালকের কাছে কোনো টাকা চাওয়া হয়নি বলে জানান শোভন চন্দ্র হোড়। তিনি বলেন, ‘টাকা চাইলে চালকের কাছে চাইত। কিন্তু চালক বলছে তার কাছে কোনো টাকা চাওয়া হয়নি। চীনা নাগরিকের কোনো একটি মিটিং ছিল। চেকিংয়ের কারণে তার হয়তো দেরি হচ্ছিল। যে কারণে তিনি উত্তেজিত হয়ে যান। ভেবেছেন টাকার জন্য আটকে রাখছে। যেটা মোটেও ঠিক না। একটি গাড়ি থামানো থেকে শুরু করে চেক করে কাগজগুলো ব্যাক করতে একটা সময় প্রয়োজন হয়। সেই সময়টুকু চীনা নাগরিক দিতে চাননি।’

তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সাহেদ আল মাসুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি জানার পরই তদন্ত শুরু করি। প্রতিটি পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের দুই সদস্যের কোনো অপরাধ পাইনি। এরপরেও তদন্তের স্বার্থে তাদেরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ডিসি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

‘এছাড়া গাড়ি চালক ও চীনা নাগরিকের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। চালকের কাছে আমাদের ট্রাফিক সদস্যরা কোনো টাকা দাবি করেননি। এমনকি চীনা নাগরিকের সঙ্গেও আমাদের সদস্যদের কোনো কথা হয়নি। উনি ধারণা করেছিলেন, টাকার জন্য হয়ত আটকিয়েছে। এই ধারণা থেকে তিনি এমন আচরণ করেছেন।’

এমন আচরণের জন্য চীনা ওই নাগরিক ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানান সাহেদ আল মাসুদ। তিনি বলেন, ‘ফোনে ওই চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি এমন আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তার প্রতিক্রিয়া এভাবে ভাইরাল হয়ে যাবে এমনটি বুঝতে পারনেনি এবং এ ধরনের কোনো ইনটেনশন তার ছিল না বলেও জানিয়েছেন।’

শেয়ার করুন

সিটি করপোরেশনের আড়াই কোটি টাকা জাহাঙ্গীরের পকেটে

সিটি করপোরেশনের আড়াই কোটি টাকা জাহাঙ্গীরের পকেটে

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। ফাইল ছবি

প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। তাতে পে-অর্ডারের মাধ্যমে ২ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৫ টাকা জমা হয়। এরপর ছয়টি চেকের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেয়া হয় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর কোনো হিসাবই সিটি করপোরেশনের রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সদ্য বহিষ্কৃত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে।

২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রিমিয়ার ব্যাংকের কোনাবাড়ি শাখায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নামে একটি চলতি হিসাব খোলেন জাহাঙ্গীর আলম। যার হিসাব নম্বর: ০৩৫১১১০০০০০৫৭৮।

নথিপত্র অনুযায়ী সিটি করপোরেশনে যে টাকা জমা পড়ার কথা, সেই টাকা জমা পড়েছে এই ব্যাংক হিসাবে। সেই টাকা তুলে নেয়া হয়েছে, যার একটি পয়সাও করপোরেশনের নথিতে তোলা হয়নি।

বিভিন্ন সময় অ্যাকাউন্টটিতে পে-অর্ডারের মাধ্যমে ২ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৫ টাকা জমা হয়। এরপর ছয়টি চেকের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেয়া হয় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর কোনো হিসাবই সিটি করপোরেশনের রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।

এই ব্যাংক হিসাব খুলতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেননি জাহাঙ্গীর। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বারবার তাগাদা দিলে তিনি করোনার অজুহাত দেখান। পরে ব্যাংক নিজে থেকে ব্যাংক হিসাবটি বন্ধ করে দিয়ে সাড়ে আট হাজার টাকা তাকে দিয়ে দেয়।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।

নথিপত্রে দেখা যায়, ব্যাংক হিসাবে মোবাইল নম্বর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত নম্বর। ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের। এক বছর তিন দিন চালু ছিল হিসাবটি।

তবে জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, এই হিসাব তিনি খোলেননি। তাকে ফাঁদে ফেলতে একটি চক্রের কাজ। তিনি কাউকে চেক দেননি। কাউকে ব্যাংকে পাঠাননি।

যদিও ব্যাংক ম্যানেজার বলেছেন উল্টো কথা। তিনি জানান, টাকা ছাড় করানোর আগে যার নামে ব্যাংক হিসাব, তাকে ফোনও করা হয়েছে। তবে জাহাঙ্গীর ফোন পাওয়ার কথাও স্বীকার করতে চাননি।

ঘরোয়া আলোচনায় বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার পর গত ১৯ নভেম্বর মেয়রের পদ হারান জাহাঙ্গীর। এরপর সিটি করপোরেশনে তার নানা অনিয়মের খবর আসতে থাকে গণমাধ্যমে।

কবে কত লেনদেন

হিসাবটি চালুর দিনই মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দেয় নগরীর কোনাবাড়িতে অবস্থিত ইস্পাহানি ফুডস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

কারখানা কর্তৃপক্ষ লে-আউট প্ল্যান অনুমোদনের ফি ও জরিমানা বাবদ ওই টাকা জমা দেয়। একই দিন অপর একটি পে-অর্ডারে জমা হয় আরও ৫০ লাখ টাকা।

ইস্পাহানি ফুডস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে পে-অর্ডার দিয়েছি। পে-অর্ডার না দিলে তো আমরা লে-আউট প্ল্যান পেতাম না। আমাদেরকে পে-অর্ডার ফি ও জরিমানা বাবদ সিটি করপোরেশন থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেভাবেই দিয়েছি। আমরা মেয়র গাজীপুর সিটি করপোরেশন বরাবর পে-অর্ডার দিয়েছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘নগর ভবনে গিয়ে মেয়রের কাছে পে-অর্ডারটি জমা দিই। পরে তিনি (মেয়র) একজন কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে পে-অর্ডারটি জমা নিতে বলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদেরকে একটি রিসিভ কপিও দেয়া হয়।

‘মেয়র যদি পে-অর্ডারটি রিসিভ না করতেন, তাহলে তো আমরা অনুমোদন পেতাম না। ফি জমা দেয়ার কিছুদিন পর সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ি জোন থেকে ফোন করে লে-আউট অর্ডার অনুমোদন হয়েছে জানিয়ে সেটি নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়।’

একই বছরের ৫ মার্চ ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৪০৫ টাকার, ২৯ জুলাই ৮৫ লাখ ও ৬৭ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯০ টাকার দুটি পে-অর্ডার জমা হয়।



সিটি করপোরেশনের আড়াই কোটি টাকা জাহাঙ্গীরের পকেটে


এই হিসাব থেকে ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৯৩৩২৮২৭ নম্বর চেকের মাধ্যমে শামীম হোসেন নামে একজনকে ৫০ লাখ টাকা দেন জাহাঙ্গীর আলম।

একই বছরের ৫ মার্চ ৯৩৩২৮২৮ নম্বর চেকের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা তোলেন জাহাঙ্গীর। ৬ আগস্ট ব্যক্তিগত কর্মচারী শহীদুলের মাধ্যমে ৫০৬১৯২ নম্বর চেকের মাধ্যমে এক কোটি টাকা, ১০ আগস্ট বাসার ব্যক্তিগত কর্মচারী প্লটু চাকমাকে দিয়ে ৫০৬১৯১ নম্বর চেকের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা এবং ১৮ ও ২০ আগস্ট ব্যক্তিগত কর্মচারী শহীদুলকে দিয়ে ৫০৬১৯৩ ও ৫০৬১৯৪ নম্বর চেকের মাধ্যমে যথাক্রমে ৩০ লাখ ও ২০ লাখ টাকা তোলা হয়।

সর্বশেষ লেনদেনের প্রায় ৭ মাস পর প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকার কারণ দেখিয়ে ২০২১ সালে ৩ মার্চ হিসাবটি বন্ধ করে দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

তখন হিসাবটিতে জমা ছিল আট হাজার ২৩৫ টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আট হাজার পাঁচ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলমকে ফেরত দিয়ে বাকি ২৩০ টাকা অ্যাকাউন্ট বন্ধের ফি হিসেবে কেটে নেয়।


হিসাব
খোলায় মানা হয়নি নিয়ম

নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে পরিষদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাছাড়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কারও ব্যক্তিগত নম্বর ব্যবহারের বিধান নেই। হিসাবটি এককভাবে পরিচালনা করতে হলে পর্ষদ সদস্যদের নিয়ে মাসিক সভা ডেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেজ্যুলেশনের কপি ব্যাংককে জমা দিতে হয়। কিন্তু অ্যাকাউন্টটি খোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে এসব নিয়মের কোনোটাই মানা হয়নি।

এ বিষয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি এসেছে। তারা বিভিন্ন বিষয় তদন্ত করে দেখছে। এ বিষয়ে পরবর্তীতে কথা বলব।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ বলেন, ‘আমি দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে বহিষ্কৃত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের অসংখ্য অনিয়মের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়গুলো যেহেতু মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে, তাই এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’



সিটি করপোরেশনের আড়াই কোটি টাকা জাহাঙ্গীরের পকেটে


প্রিমিয়ার ব্যাংকের কোনাবাড়ি শাখার ব্যবস্থাপক এম মোর্শেদ খান বলেন, ‘হিসাবটি চালু ও বন্ধের সময় আমি এ শাখায় ছিলাম না। যেকোনো করপোরেশনের অ্যাকাউন্টে অবশ্যই দুজন অভিভাবক থাকতে হয়, এককভাবে হয় না। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করে তাদের রেজ্যুলেশনের ওপর। তাদের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় যেই সিদ্ধান্ত হয় তার ওপর। আমরা সেই সিদ্ধান্তের রেজ্যুলেশনের কপিও পাইনি। মূলত এই কারণেই অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’

এই ব্যাংক হিসাবে টাকা লেনদেন নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে এক টাকা পেমেন্ট দিতে হলেও কাস্টমারের অনুমতি নিয়ে দিতে হয়। এই অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও গ্রাহকের মোবাইল নম্বরে ফোন করে অনুমতি নিয়েই পেমেন্ট করা হয়েছে।’

জাহাঙ্গীরের দাবি, ফাঁদে পড়েছেন তিনি

নিউজবাংলার কাছে ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের নথিপত্র থাকলেও এর সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘অ্যাকাউন্টটি আমার না। আমার নাম ব্যবহার করে, আমার ভুয়া স্বাক্ষর দিয়ে অ্যাকাউন্ট করে আমাকে ফাঁসানোর জন্য এটা করেছে।

‘যাদেরকে বলা হচ্ছে আমার ব্যক্তিগত কর্মচারী, তারাও আমার ব্যক্তিগত না। অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে রেজ্যুলেশন লাগে। আমার সরকারি স্বাক্ষর ও রেজ্যুলেশন না। আমি কোনো দিন ওই প্রতিষ্ঠানে (ব্যাংকে) যাইনি, ওই প্রতিষ্ঠানের কেউও আমার কাছে আসেনি।’

‘ব্যাংক অ্যাকাউন্টটিতে আপনার ব্যক্তিগত নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে’- এমন কথা শুনে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘যেকোনো মানুষ আমাদের নম্বর নেয়। ভোটার অফিসে আমার আইডি আছে, ইন্টারনেটে ছবি আছে। যে কেউ ইচ্ছে করলে এসব ব্যবহার করতে পারছে। বেকায়দায় পড়ে গেছি তো তাই সবাই বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে।’

ব্যাংক হিসাবে নম্বর দেয়া থাকায় টাকা পরিশোধের সময় তো ফোন দেয়ার কথা- এমন মন্তব্যে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি। আমার রেকর্ডিংটা নাকি দুই বছর আগেই করা হয়েছে। আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়ার জন্য একটা চক্র পূর্ব থেকেই কাজ করছে। আমি তাদের ফাঁন্দে পড়েছি।’



সিটি করপোরেশনের আড়াই কোটি টাকা জাহাঙ্গীরের পকেটে


ব্যাংক নথি অনুযায়ী অ্যাকাউন্ট থেকে ৩০ লাখ টাকা আপনি নিজে উত্তোলন করেছেন- এই বিষয়টি বললে বহিষ্কৃত মেয়র বলেন, ‘ওই ব্যাংকে সিসি ক্যামেরা আছে। দেখেন আমি গেছি কি না সেখানে। আমি নিজে যদি টাকা উঠিয়ে থাকি তাহলে নিশ্চয়ই সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আমাকে দেখা যাবে।’

জাহাঙ্গীরের বক্তব্য নিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের কোনাবাড়ি শাখার সে সময়ের ব্যবস্থাপক (বর্তমানে আশুলিয়া শাখায় কর্মরত) মোতালেব হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

তিনি বলেন, ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নামে অ্যাকাউন্টটি সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম খুলেছিলেন। অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে তার স্বাক্ষর, ছবি ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড জমা নেয়া হয়। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় রেজ্যুলেশনের কপি চাওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়। এর ভেতর বেশ কয়েকটি লেনদেন হয়ে যায়। পরে ডকুমেন্ট ত্রুটির কারণে আমরা অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দিই।’

তিনি জানান, এই ব্যাংক হিসাব নিয়ে সে সময় জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে তাদের একাধিক কথা হয়েছে।

তিনি বলেন, “তিনি (জাহাঙ্গীর) কখনো ‘করোনা পরিস্থিতিতে মিটিং হয় না’, ‘মিটিং হবে’, ‘রেজ্যুলেশন দিচ্ছি-দেব’ বলে কালক্ষেপণ করেন। এরপরে আমরা আর কোন পে-অর্ডার জমা নিইনি।

“তারা অনেক চেষ্টা করেছিলেন পে-অর্ডার জমা দেয়ার। কিন্তু আমরা নিইনি। পরবর্তীতে এক প্রকার জোরপূর্বক ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দিই।”

অ্যাকাউন্টটি খোলেনি বলে বহিষ্কৃত মেয়র যে দাবি করেছেন- সেই প্রশ্নে মোতালেব হোসেন বলেন, ‘পে-অর্ডারের মালিক কি আমি? আমার কাছে পে-অর্ডার আসবে কোথা থেকে। সে সময় তার লোকজনই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে গেছে। এখন যদি তিনি অস্বীকার করেন তাহলে সেটা চ্যালেঞ্জ করা হবে। তদন্ত করলেই আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে। সে সময় আমরা ব্যাংক থেকে তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করেছিলাম, সেসব তো জানা যাবে।’

ব্যাংক ব্যবস্থাপক এও জানান, প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিতে জাহাঙ্গীর আলমের বাসায়ও গেছেন তিনি।

তিনি বলেন, “করোনা পরিস্থিতির সময় অন্তত ১০ দিন নগর ভবনে গিয়ে রেজ্যুলেশন হয়েছে কি না খবর নিয়েছি। মেয়রের বাসভবনে একাধিকবার গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ছিলাম। দোতলায় বসে থাকতাম দেখা করতেন না। অনেক সময় দেখা হলে বলতাম, ‘আমরা অনেক সমস্যায় আছি, ডকুমেন্টগুলো জমা দেন।'”

শেয়ার করুন

অব্যাহতি নিয়েও ১০ বছর বেতন নিচ্ছেন চিকিৎসক

অব্যাহতি নিয়েও ১০ বছর বেতন নিচ্ছেন চিকিৎসক

চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েও বিধিবহির্ভূতভাবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতাল থেকে বছরের পর বছর বেতন-ভাতা নিচ্ছেন এক চিকিৎসক। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে ২০০৭ সালে রেডিওলজিস্ট হিসেবে যোগ দেন ফাতেমা দোজা। প্রতিষ্ঠানটি থেকে অব্যাহতি নিয়ে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে চলে যান বিএসএমএমইউতে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেখানে চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় অসাধু উপায়ে পদোন্নতিসহ হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হারানো চাকরির সুবিধা নিচ্ছেন তিনি।

সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েও বিধিবহির্ভূতভাবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতাল থেকে ১০ বছর ধরে বেতন, ভাতা, বোনাস নিচ্ছেন ফাতেমা দোজা নামে এক চিকিৎসক। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, একবার সরকারি চাকরি ছাড়লে তা ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

২০০৭ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে রেডিওলজিস্ট হিসেবে যোগ দেন ফাতেমা দোজা। ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি থেকে অব্যাহতি নেন তিনি। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে।

তবে ছয় মাস পর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ায়নি। সেখানেই কারিশমা দেখান এই চিকিৎসক। অব্যাহতি নিলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি নিয়ে ফিরে আসেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে।

যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, একবার সরকারি চাকরি ছাড়লে তা ফিরে পাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকে না। ফাতেমা দোজা তাহলে কীভাবে চাকরি ফিরে পেলেন এবং পদোন্নতি নিলেন, তা অবাক করছে অনেককে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও।

এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিনা মাসুদ উজ্জামানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। বেঁধে দেয়া সময় শেষ হচ্ছে আগামী বুধবার।

তদন্ত কমিটির এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, অভিযুক্ত চিকিৎসককে সশরীরে সোমবার সচিবালয়ে ডাকা হয়েছে। চিকিৎসক ফাতেমা দোজার বক্তব্যের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সবকিছু জেনে নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

দুটি প্রতিষ্ঠানে ফাতেমা দোজার নিয়োগপত্র, পদোন্নতি, অব্যাহতিসহ বিভিন্ন তথ্যের কাগজের কপি এসেছে নিউজবাংলার হাতে।

এসব কাগজ থেকে জানা যায়, ফাতেমা দোজা ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ২০০৭ সালে তিনি রেডিওলজিস্ট পদে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে যোগ দেন। ২০০৯ সালে পদ পরিবর্তন করে তিনি (পরিচিতি নম্বর-৪২৭৩৭) মেডিক্যাল অফিসার পদে যোগ দেন। এই পদে কর্মরত ছিলেন ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

এরপর স্বায়ত্তশাসিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ পান।

সেখানে যোগ দিতে ২২ ফেব্রুয়ারি সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচিব বরাবর লিখিত আবেদন করেন। আবেদন পরিচালক জমা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

সব ধরনের প্রক্রিয়া শেষে বিএসএমএমইউতে যোগ দেন ফাতেমা দোজা। তবে ছয় মাস পর তার চাকরিটি স্থায়ী করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ সময় তিনি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও প্র্যাকটিস করতেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিএসএমএমইউতে চুক্তিভিত্তিক চাকরি স্থায়ী না হওয়ার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের মাধ্যমে আবার হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ফিরে আসেন ফাতেমা। পদোন্নতিসহ নিয়মিত নিচ্ছেন বেতন-ভাতা।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সে সময়ের চেয়ারম্যান এনায়েত করিমের কাছে জানতে চাওয়া হয়।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘তখন তার বিভাগে ডা. ফাতেমা দোজা ছিলেন কি না মনে করতে পারছি না। কারণ এ রকম অনেকে আসছে, আবার চলেও গেছে। সঠিক তথ্য জানতে বিএসএমএমইউর তখনকার রেজিস্ট্রার বা চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন। তাদের কাছে তথ্য-প্রমাণসহ অন্যান্য কাগজপত্র থাকবে।’

ওই সময় বিএসএসএমএমইউর রেডিওলজি বিভাগে প্রশাসনিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আল আজাদ। ফাতেমা দোজার বিষয়ে প্রশ্ন তুললে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

বিএসএমএমইউর তৎকালীন রেজিস্ট্রার (অতিরিক্তি দায়িত্ব) অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, যার স্বাক্ষরিত চিঠিতে ফাতেমাকে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। সেই শফিকুলের সঙ্গেও কথা বলেছে নিউজবাংলা।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু চাকরির বিষয়, এটা তার ব্যক্তিগত। এ বিষয়ে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।’

পরে নিউজবাংলার প্রতিবেদক জাতীয় হদরোগ ইনস্টিটিউটের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল সাফী মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেন, যিনি অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক বরাবর দরখাস্ত দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আবেদন করেছিলেন।

আব্দুল্লাহ আল সাফী বলেন, ‘অনেক বছর আগের বিষয়। এখন আমি হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আর চাকরি করি না। এ বিষয়ে আর খোঁজখবর রাখি না। (ডা. ফাতেমা দোজা) ইস্তফা দিয়ে বিএসএমএমইউতে চাকরি করে ফের কীভাবে হৃদরোগে এলেন বলতে পারব না।

‘বর্তমান পরিচালক এবং তার সহকর্মী যারা আছেন তাদের জিজ্ঞেস করেন। আমি তার অব্যাহতির জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর সুপারিশ করলেও এখন সঠিকভাবে মনে করতে পারছি না। আমি থাকাকালে তিনি পুনরায় যোগদান করছেন এমনটা হওয়ারও কথা না। যদি হয়ে থাকে কাগজপত্র দেখলে বোঝা যাবে।’

এ বিষয়ে জানতে নিউজবাংলা কথা বলে ফাতেমা দোজার সঙ্গে। বিধিবহির্ভূতভাবে চাকরি ফিরে পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি। এরপর একাধিকভার ফোন করলেও রিসিভ করেননি। কিছুক্ষণ পর নিউজবাংলার প্রতিবেদকের দুটি নম্বরই ব্ল্যাকলিস্টে রেখে দেন।

এরপর একই প্রশ্ন লিখে ফাতেমা দোজার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলে তিনি সিন করলেও কোনো জবাব দেননি।

শেয়ার করুন

কক্সবাজারে ‘ধর্ষণ’: যৌন ব্যবসার চক্র চালান ভুক্তভোগীর স্বামী

কক্সবাজারে ‘ধর্ষণ’: যৌন ব্যবসার চক্র চালান ভুক্তভোগীর স্বামী

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ করা নারীর সঙ্গে তার স্বামী। ছবি: নিউজবাংলা

কক্সবাজারে যৌনকর্মীদের একটি চক্র চালানোর কথা নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন ওই নারীর স্বামী। বর্তমান স্ত্রী ছাড়াও এর আগে তিনি আরেকটি বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের সেই স্ত্রীর অভিযোগ, তাকেও যৌনকর্মীর পেশায় নামাতে চেয়েছিলেন তার স্বামী।

কক্সবাজারে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারীর স্বামী যৌনকর্মীদের একটি দল পরিচালনা করতেন। প্রায় এক বছর ধরে এটিই তার পেশা।

কক্সবাজারে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে ঢাকা থেকে গত জানুয়ারিতে প্রথম তিনি সেখানে যান। ধীরে ধীরে সখ্য গড়ে তোলেন কক্সবাজারের স্থানীয় দালাল ও হোটেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। এই চক্রের কাছে চলতি ডিসেম্বরের শুরুতে স্থানীয় সন্ত্রাসী আশিকুল ইসলাম আশিকের নামে চাঁদা দাবি করা হয়।

ওই নারীকে ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের’ আগের দিন আশিকের সঙ্গে দেখাও হয় তার স্বামীর। তার দাবি, চাঁদা না দেয়ার কারণেই ২২ ডিসেম্বর স্ত্রীকে অপহরণের পর ধর্ষণ করেন আশিকের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা।

কক্সবাজারে যৌনকর্মীদের চক্র চালানোর কথা নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন ওই নারীর স্বামী। বর্তমান স্ত্রী ছাড়াও এর আগে তিনি আরেকটি বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের সেই স্ত্রীর অভিযোগ, তাকেও যৌনকর্মীর পেশায় নামাতে চেয়েছিলেন তার স্বামী। সেই বক্তব্যের রেকর্ডও রয়েছে নিউজবাংলার কাছে।

যৌন পেশায় জড়াতে নারীদের নেয়া হতো ঢাকা থেকে

কক্সবাজারে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারীর স্বামী ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় থাকার সময় বছরখানেক আগে যৌন পেশার সিন্ডিকেটে জড়ান। নিউজবাংলার অনুসন্ধান ও ওই ব্যক্তির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বেশি টাকা আয়ের জন্য এরপর তিনি যান কক্সবাজারে।

প্রথমবার গত ৮ জানুয়ারি সিন্ডিকেটের কয়েকজনের সঙ্গে কক্সবাজার গিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। তবে সেখানে একটি হোটেলে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ ছয়জন গ্রেপ্তার হন। ১২ দিন জেলে থাকার পর স্ত্রী জামিনে মুক্ত হলে তিনি ফিরে আসেন ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায়। এরপর ঢাকা থেকে বিভিন্ন সময় কক্সবাজারে যাতায়াত করে সেখানকার যৌন ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। এরপর গত সেপ্টেম্বর থেকে পুরো পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন তিনি।

কক্সবাজারে যাওয়া পর্যটকদের মাঝে ছদ্মনাম ও ভুয়া হোটেলের নামে ছাপানো (কেবল মোবাইল ফোন নম্বরটি সঠিক) নিজের ভিজিটিং কার্ড বিতরণ করতেন ওই ব্যক্তি। এরপর তাদের চাহিদা অনুযায়ী হোটেল ও যৌনকর্মী সরবরাহ করতেন। এ ধরনের একটি কার্ডের নমুনাও পেয়েছে নিউজবাংলা।

কক্সবাজারে ‘ধর্ষণ’: যৌন ব্যবসার চক্র চালান ভুক্তভোগীর স্বামী
এ ধরনের ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করেন ওই নারীর স্বামী

ঢাকা থেকে নারীদের তিনি যৌনকর্মীর পেশায় জড়াতে কক্সবাজারে নিয়ে যেতেন বলেও প্রমাণ পেয়েছে নিউজবাংলা। বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে এ বিষয়ে তার কথোপকথনের রেকর্ড পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে আছেন ঢাকা ও কক্সবাজারের যৌন ব্যবসায়ী সিন্ডকেটের সদস্য, একাধিক নারী ও যৌনকর্মী পেতে আগ্রহী ব্যক্তি।

একটি কথোপকথনে ওই ব্যক্তির স্ত্রীর গত জানুয়ারিতে কক্সবাজারে আটক হওয়ার বিষয়টিও এসেছে। আরেকটি কথোপকথনে তাকে বলতে শোনা যায়, স্থানীয় পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের ‘ম্যানেজ’ করে তিনি ব্যবসা করছেন। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কক্সবাজারে যৌনকর্মীর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে বলেও তাকে বলতে শোনা যায়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শুরুতে ওই নারীর স্বামী সবকিছু অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু পর্যটকদের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিই, বিনিময়ে হোটেল থেকে কমিশন পাই।’

তবে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরলে তিনি স্বীকার করেন দ্বিতীয় বিয়ে করার ছয় মাস পরই তিনি এ কাজে জড়ান। ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় সাগর নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে যৌন ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাগরের সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে আমার যাতায়াত শুরু হয়। এরপর কক্সবাজারে ব্যবসা স্থাপনের পরিকল্পনা অনুযায়ী জানুয়ারিতে আমরা চার বন্ধু্ তাদের স্ত্রীদের নিয়ে কক্সবাজার যাই। হোটেলে একটি বড় রুম ভাড়া নিয়ে সবাই একসঙ্গে ছিলাম। কিন্তু তখন পুলিশ ঝামেলা করে। এরপর সবকিছু গুছিয়ে গত সেপ্টেম্বরে স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে কক্সবাজার যাই।’

কক্সবাজারে ‘ধর্ষণ’: যৌন ব্যবসার চক্র চালান ভুক্তভোগীর স্বামী
কক্সবাজারে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি আশিককে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব

আশিকের সঙ্গে পরিচয়ের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আশিকের নাম আগে কয়েকবার শুনেছি, কিন্তু তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ২১ ডিসেম্বর রাতে। এর আগে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে আশিকের নাম করে সোহেল নামে একজন আমার কাছে ৫ হাজার টাকা চাঁদা চায়।’

সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার আসামি এই সোহেলকেও এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ওই নারীর স্বামী জানান, ২১ ডিসেম্বর তারা সপরিবারে কক্সবাজারের লাইট হাউস এলাকার একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ওই তারিখ রাতে আশিক তার পিছু নিয়ে হোটেল রুমে প্রবেশ করে। তখন স্ত্রীর সঙ্গে আশিকের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

ওই ব্যক্তি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আশিক আমার ব্যবসা নিয়ে জানতে চান। এ সময় ছেলের অসুস্থতার কথা বলে তার মন জয় করি। তখন আশিক বাচ্চার চিকিৎসার জন্য ১ হাজার টাকা দেন। আমি তখন আশিককে বলি তার নাম ভাঙিয়ে আমার কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছে। আশিক বিষয়টা দেখার কথা বলে চলে যান।’

এরপর ভোর ৪টার দিকে আশিকের সঙ্গে ফোনে কথা হয় ওই ব্যক্তির। আশিক তাকে পরদিন দেখা করতে বলেন। তবে পরদিন সকালে ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিয়ে হোটেল পরিবর্তন করে ফেলেন। এরপর সারা দিনে আশিক কয়েকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। পরে সন্ধ্যায় লাবনী পয়েন্টে স্ত্রীসহ ঘুরতে গেলে সেখানে আশিকের সঙ্গে তাদের দেখা হয়।

আশিক এরপর ‘নিজেদের খরচের জন্য’ কিছু টাকা দাবি করেন বলে জানান ওই নারীর স্বামী। তার দাবি, কিছুদিন পর এই টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে হোটেলে ফিরতে রওনা দেন। তবে কিছুদূর যাওয়ার পর তার স্ত্রী আচার কিনতে দাঁড়ালে তিনি সামনে এগিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর পেছনে ফিরে দেখেন স্ত্রী নেই।

এর আগে কক্সবাজার থেকে ঢাকা ফেরার পর ওই নারী নিউজবাংলাকে বলেছিলেন, ‘আচারের ভ্যানের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় আশিক হঠাৎ তার হাত ধরে টান দিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নেয়। তখন আশিকের সঙ্গে আরও দুজন ছিল। সিএনজিতে বসেই আশিক আমার স্বামীকে ফোন করে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলে।’

ওই নারীর দাবি, অটোরিকশায় তুলে আশিক প্রায় ১ ঘণ্টা কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়কে ঘুরে বেড়ায়। এরপর তাকে একটি একতলা বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই নারী বলেন, ‘বাসাটি তালা দেয়া থাকায় আশিক ছোটন নামে একজনকে (জিয়া গেস্ট ইন হোটেলের ম্যানেজার) ফোন করে তার মোটরসাইকেল নিয়ে আসতে বলে। এরপর সেই মোটরসাইকেলের পেছনে চড়িয়ে ওই নারীকে একটি ঝুপড়ি চায়ের দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই নারী বলেন, ‘হোটেলে ঢোকার আগে আশিক আমাকে হুমকি দিয়ে বলে আমার স্বামী-সন্তানকে আটকে রাখা হয়েছে। কোনো ঝামেলা করলে তাদের মেরে ফেলা হবে।’

কক্সবাজারে ‘ধর্ষণ’: যৌন ব্যবসার চক্র চালান ভুক্তভোগীর স্বামী
জিয়া গেস্ট ইনের চেক-ইন হোটেলের কাউন্টারে বুধবার রাতে ওই নারীর সঙ্গে অভিযুক্ত আশিক। ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া

এরপর আশিকের সঙ্গে নিজের ছদ্মনামে হোটেলের লগ বইয়ে এন্ট্রি করেন ওই নারী। এরপর একটি রুমে গিয়ে আশিক ইয়াবা সেবন করে তাকে ধর্ষণ করেন বলে জানান ওই নারী।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এরপর আমার স্বামী আশিককে ফোন করে জানান তিনি টাকা দেবেন, তবে স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে হবে।’

ওই নারীর স্বামী নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, বিচ এলাকায় স্ত্রীকে দেখতে না পেয়ে শুরুতে তিনি ৯৯৯-এ ফোন করেন। তবে সে সময় তিনি স্ত্রীকে অপহরণের কোনো তথ্য দেননি। স্ত্রীকে না পাওয়ার বিষয়টি কক্সবাজার সদর থানায় জানানোর পর থানা থেকে তাকে জিডি করার পরামর্শ দেয়া হয়। এরপর একটি বিলবোর্ড থেকে তিনি র‌্যাবের নম্বর পেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। র‌্যাবের পরামর্শেই তিনি আশিকের ফোনে যোগাযোগ করে টাকা দেয়ার প্রস্তাব করেন।

ওই নারী নিউজবাংলাকে জানান, তার স্বামী আশিককে ফোন করার কিছু সময়ের মধ্যে আরেকজন ফোন করেন। তিনি আশিককে বলেন, ডিবি পুলিশ তাকে খুঁজছে। এর পরই হোটেল ছেড়ে চলে যান আশিক।

পরে ওই নারী হোটেল থেকে বেরিয়ে কিছুটা দূরে স্বামীসহ র‌্যাব সদস্যদের দেখতে পান।

ওই নারীর অভিযোগ, ঝুপড়ি চায়ের দোকানের পেছনের কক্ষে নিয়ে আশিকের দুই বন্ধু তাকে ধর্ষণ করেন। এর কিছুক্ষণ পর আশিক এসে নারীকে আবার মোটরসাইকেলে করে জিয়া গেস্ট ইন হোটেলে নিয়ে যান।

কক্সবাজারে ‘ধর্ষণ’: যৌন ব্যবসার চক্র চালান ভুক্তভোগীর স্বামী
জিয়া গেস্ট ইন হোটেল

প্রথম স্ত্রীকে ‘খারাপ কাজের’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি

কক্সবাজারে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা স্বামী তার প্রথম স্ত্রীকে যৌন পেশায় জড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রথম স্ত্রী নিজেই নিউজবাংলার কাছে এই অভিযোগ করেন।

তার দাবি, ওই ব্যক্তি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের দুই সন্তানের ভরণ-পোষণও দিচ্ছেন না তিনি। বর্তমানে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে আছেন ওই ব্যক্তির প্রথম স্ত্রী। দুই সন্তান আছে কিশোরগঞ্জে তার মায়ের কাছে।

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে নিউজবাংলা। তিনি জানান, সাত বছর আগে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। সে সময় তার স্বামী গাজীপুরের মাওনা এলাকায় অটোরিকশা চালাতেন ও খণ্ডকালীন রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। গত বছর গোপনে আরেকটি বিয়ে করার পর তিনি প্রথম স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে পালিয়ে যান।

প্রথম স্ত্রী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সে (স্বামী) নেশা করত, আরও নানা ধরনের বাজে অভ্যাস ছিল। তাই কেউ তাকে পছন্দ করত না। আমি কেন ছেলেসন্তান দিতে পারি নাই, সেটা নিয়ে আমার ওপর তার রাগ ছিল। কিন্তু সে যে এভাবে আরেকটা বিয়ে করে ফেলবে, এটা কখনও বুঝি নাই।’

প্রথম স্ত্রী জানান, স্বামী কোনো যোগাযোগ না রাখায় ও খরচ না দেয়ায় দুই সন্তান নিয়ে না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়। এরপর তিনি বাবার বাড়ি চলে যান। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চলতি বছরের জুনে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব চলে যান তিনি।

প্রথম স্ত্রী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাত-আট মাস আগে হঠাৎ সে (স্বামী) ফোনে যোগাযোগ করে। উনি আমাকে বলেন, তার কাছে এখন প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা আসে। তার লাখ টাকা ইনকামের ব্যবস্থা হয়েছে। আমাকেও লাখ লাখ টাকা ইনকামের ব্যবস্থা করে দেবে।

কক্সবাজারে ‘ধর্ষণ’: যৌন ব্যবসার চক্র চালান ভুক্তভোগীর স্বামী
হলিডে মোড়ের সি ল্যান্ড হোটেলের ২০১ নম্বর কক্ষটি স্বামী-সন্তানকে নিয়ে ২২ ডিসেম্বর ভাড়া নেন ওই নারী

‘সে আমাকে তার কাছে যেতে বলে। আমি তখন জানতে চেয়েছি, কী এমন কাজ যা করলে আমাকে লাখ লাখ টাকা দেবে? তখন উনি বলেন কাজ যাই হোক লাখ লাখ টাকা পাওয়া যাবে এটাই মূল বিষয়। এ কথা শোনার পর আমি বুঝে গিয়েছিলাম সে কোনো খারাপ পথে চলে গেছে। সে আমাকে দিয়ে খারাপ কাজ করাতে ফোন করেছিল।

‘তখন আমি বিষয়টি আমার মামিকে জানিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল উনি নিশ্চয়ই নারী পাচার অথবা খারাপ কাজে জড়িয়েছে। তার কথা আমার সুবিধার মনে হয়নি। এরপর যোগাযোগ পুরো বন্ধ করে দিয়ে আমি সৌদি আরব চলে আসি।’

এই অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আমার প্রথম স্ত্রীকে মুখে তালাক দিয়েছিলাম, পরে আবার মাফ করে দিয়েছি।’

স্ত্রীকে দিয়ে ‘খারাপ কাজ’ করানোর পরিকল্পনা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি দুই স্ত্রীকে আলাদাভাবে রাখতে চেয়েছিলাম। তাই প্রথমজনকে দুই বাচ্চা নিয়ে চলে আসতে বলেছি। তখন আমার লাখ লাখ টাকা ইনকামের ব্যবস্থা ছিল। ওই টাকা দিয়ে দুটি পরিবার খুব ভালোভাবে চলতে পারত।’

শেয়ার করুন