বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক

player
ট্রান্সজেন্ডার

করোনারোগীদের সেবায় গত এপ্রিলে এগিয়ে এসেছিল ট্রান্সজেন্ডারদের সংগঠন বৃহন্নলা। ফাইল ছবি

ক্লিনিকের নামের সঙ্গে ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট’ থাকা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা। তারা বলছেন, ‘রোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় ট্রান্সজেন্ডারদের সম্পর্কে সমাজে ভুল ও নেতিবাচক ধারণা বাড়বে। শৈশবে ট্রান্সজেন্ডার শনাক্ত করা সম্ভব নয় দাবি করে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তনের সার্জারি তাদের ভবিষ্যত জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মত দিচ্ছেন তারা।

ট্রান্সজেন্ডারসহ অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের লিঙ্গ রূপান্তরের জন্য সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) একটি বহির্বিভাগ ক্লিনিক চালু হয়েছে ।

‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক’ এর উদ্বোধন হয়েছে ২১ নভেম্বর। তবে এই ক্লিনিকের নাম এবং লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, আধুনিক বিজ্ঞান ট্রান্সজেন্ডারকে আলাদা লিঙ্গ হিসেবে স্বীকার করেছে। বাংলাদেশেও নারী-পুরুষের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে এই লিঙ্গ স্বীকৃতি পেয়েছে। এমন অবস্থায় ট্রান্সজেন্ডারকে ‘অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গ’ হিসেবে উপস্থাপন করে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ অসংবেদনশীল মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে।

ক্লিনিকের নামের সঙ্গে ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট’ থাকা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন তারা। ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, ‘রোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় ট্রান্সজেন্ডারদের সম্পর্কে সমাজে ভুল ও নেতিবাচক ধারণা বাড়বে।

শৈশবে নারী ও পুরুষের বাইরে ট্রান্সজেন্ডার শনাক্ত করা সম্ভব নয় দাবি করে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তনের সার্জারি তাদের ভবিষ্যত জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মত দিচ্ছেন তারা।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের দাবি, অনেক ভেবেচিন্তেই ক্লিনিকটির এমন নাম রাখা হয়েছে। বিভিন্ন দেশে এই নামে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।

নতুন সেবা উদ্বোধনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মূলত তৃতীয় লিঙ্গসহ অপূর্ণাঙ্গ বা ক্রটিপূর্ণ লিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের শারীরিক ফেনোটাইপ (বাইরের প্রজনন অঙ্গ) ও জেনোটাইপ (জিনগত ভিতরের প্রজনন অঙ্গ) অনুযায়ী সার্জারিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ লিঙ্গে রূপ দিতে ক্লিনিকটি চালু করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, শূন্যের কোটায় আসবে থার্ড জেন্ডার’। সবাই মিলে চেষ্টা করলে এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আন্দোলনে পরিণত করতে পারলে অবশ্যই এই শ্লোগান বাস্তবায়ন করা সম্ভব।”

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক

উপাচার্য বলেন, ‘রূপান্তরিত লিঙ্গ বা ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে মানুষ অনেক কিছুই জানেন না। সমাজে যারা হিজরা নামে পরিচিত চিকিৎসার মাধ্যমে তারা পূর্ণাঙ্গ নারী বা পুরুষে রূপান্তরিত হতে পারেন। শিশুকালেই এ সমস্যা সমাধানের জন্য শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করে চিকিৎসা নিলে ভুক্তভোগীরা দ্রুত মুক্তি লাভ করবে।’

তবে এই বক্তব্য চরম আপত্তিকর বলে মনে করছেন ট্রান্সজেন্ডার নারী তাসনুভা আনান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে প্রথম আপত্তিকর শব্দ তৃতীয় লিঙ্গের শিশু। তাহলে প্রথম লিঙ্গ কারা, দ্বিতীয় বা ‍চতুর্থ কারা? লিঙ্গতে এমন কোনো ক্রমবিভাজন নেই।’

তাসনুভা বলেন, ‘জন্মের পর অনেক শিশুর ক্ষেত্রে সময় মতো যৌন অঙ্গের ডেভেলপমেন্ট হয় না। এদের আমরা ইন্টারসেক্স ফিমেল ও ইন্টারসেক্স মেল বলে থাকি। শিশুদের হারমোন ডেভেলপমেন্ট হয় ৬ থেকে ৭ বছর বয়সে। তখন সে বিপরীত লিঙ্গর প্রতি আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করে।

অপরিণত যৌনাঙ্গের ভিত্তিতে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তনের চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ দাবি করে তিনি বলেন, ‘ওই বয়সে বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে সার্জারি করার পর বড় হয়ে শিশুটি যদি মনে করে পরিবর্তিত লিঙ্গটা সে বিলং (ধারণ) করছে না, তাহলে কী ঘটবে? তখন যদি সে ভারসাম্যহীন জীবনে চলে যায় তার দায়িত্ব কে নেবে? বর্তমানে বিশ্বে যেসব ইন্টারসেক্স শিশু রয়েছে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজেরাই নিজেদের লিঙ্গের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এটি রাষ্ট্র বা বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নয়।’

অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গের সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও উল্লেখ করেন তাসনুভা। ‘ট্রান্সজেন্ডারের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা’র লক্ষ্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এটি একটি স্বতন্ত্র লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য। আমি তো বায়োলজিক্যালি পুরুষ বা নারী নই। তাহলে কেনো আমাকে আমার মতো থাকতে দেয়া হবে না। আমাকে জোর করে কেনো খোপের মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে!’

ক্লিনিকের নামকরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “তারা ব্যবহার করছে ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক। সেক্স ডেভেলপমেন্টে ডিসঅর্ডার কী রকম, এটা আমি বুঝতে পারছি না। এমন হলে সাধারণ মানুষ ট্রান্সজেন্ডারকে এক ধরনের রোগী হিসেবে ধরে নেবে। মনে করবে তারা ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। এই নামের পরিবর্তে তারা ‘সেক্সুয়াল রিঅ্যাসাইন সেন্টার’ নাম দিতে পারত।”

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক

ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট হোচিমিন ইসলামও বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করেছেন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শিশুদের এই চিকিৎসা দেয়ার উদ্যোগ একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত ও ভুল কাজ।’

‘কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সেক্স অর্গান স্পষ্ট হয় না। এমন সন্তান যখন জন্ম নেয় তখন আমাদের সামাজে অভিভাবকেরা চান সার্জারি করে ছেলে সন্তান বানাতে। ওই বাচ্চাটি বড় হয়ে যদি দেখে তার ইমোশন মেয়েদের মতো, তখন সে ভাবতে থাকে কেনো আমাকে ছেলে বানানো হলো। এমন জটিল সমস্যায় ভোগা অনেক ব্যক্তি আমাদের সামনেই রয়েছে।’

ট্রান্সজেন্ডারের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করে হোচিমিন বলেন, ‘ট্রান্সজেন্ডারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের আত্মার সঙ্গে সত্তার মিল থাকে না। ফলে সেক্স ডিজঅর্ডার বা লৈঙ্গিক ত্রুটির সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই।’

তিনি বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রতিবছর যে ডিরেক্টরি বের হয় সেখানে শিশুর লৈঙ্গিক অপূর্ণতাকে ডিসঅর্ডার বলতে নিষেধ করা হয়েছে।’

হোচিমিন এবং তাসনুভা দুজনেই মনে করছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার আগে ট্রান্সজেন্ডারদের সঙ্গে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের আলোচনা করা উচিত ছিল।

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক
দুই ট্রান্সজেন্ডার নারী হোচিমিন ইসলাম (বাঁয়ে) এবং তাসনুভা আনান শিশির

তবে উদ্যোগটি নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই বলে দাবি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ হোসেন।

ট্রান্সজেন্ডারকেও একটি ‘রোগ’ দাবি করে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট একটি ডেভেলপমেন্টমূলক রোগ। এই নামটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এর আগে ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স এসব নামে এগুলো পরিচিত ছিল। তবে টার্ম নিয়ে আপত্তির কারণে সবগুলোকে এখন ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বলা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই নামটি শিকাগো থেকে ২০০৫ সালে নির্ধারণ করা হয়েছে, আমাদের টেক্সবুকেও রয়েছে। এই ডেভেলপমেন্টমূলক রোগ শিশুদের জন্ম থেকেই দেখা যায়।’

অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ হোসেন ট্রান্সজেন্ডারকে ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট হিসেবে দাবি করলেও বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ দুটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেস (এনএইচএস) বলেছে, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি হলেন এমন কেউ যিনি নিজের জন্মগতভাবে পাওয়া লিঙ্গের সঙ্গে নিজের মনোগত লিঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যের তফাৎ অনুভব করেন।

অন্যদিকে এনএইচএস-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বা ডিএসডি হলো বিরল একটি শারীরিক অবস্থা যার সঙ্গে জিন, হরমোন এবং যৌনাঙ্গসহ প্রজনন অঙ্গের অপূর্ণাঙ্গতা জড়িত। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির যৌন বিকাশ অন্যান্য মানুষের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এনএইচএস সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসডির পূর্ণাঙ্গ অর্থের ক্ষেত্রে ‘ডিসঅর্ডার’ শব্দটিও আর ব্যবহার করছে না। তারা ডিএসডিকে বলছে ডিফারেন্সেস ইন সেক্স ডেভেলপমেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির সেন্ট লুইস চিলডেন হসপিটালের ওয়েবসাইটে ট্রান্সজেন্ডার ও ডিএসডি আলাদা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ট্রান্সজেন্ডার এবং ডিএসডি এক জিনিস নয়। ট্রান্সজেন্ডাররা জন্মের সময় প্রাপ্ত লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যকে নিজের বলে মনে করেন না।

উদাহরণ দিয়ে হাসপাতালটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, একজন ট্রান্সজেন্ডার নারীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও পরে তিনি নিজেকে মানসিকভাবে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন। এসব মানুষ চাইলে হরমোন থেরাপি বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের পছন্দসই লিঙ্গ বেছে নিতে পারেন।

অন্যদিকে, ডিএসডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরবৃত্তীয় বিকাশ বা হরমোন উৎপাদনে তারতম্য দেখা যায়। এ ধরনের বেশিরভাগ শিশুর জেন্ডার তাদের নির্ধারিত লিঙ্গের ভিত্তিতেই চিহ্নিত হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।

বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ ট্রান্সজেন্ডারদের ‘রোগী’ হিসেবে দাবি করলেও ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ট্রান্সজেন্ডারকে আলাদা লিঙ্গ বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি দেয়। এটি কোনো মানসিক রোগ নয় বলেও সিদ্ধান্ত দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিএসএমএমইউতে ট্রান্সজেন্ডারদের ক্লিনিক নিয়ে বিতর্ক
বিএসএমএমইউতে ২১ নভেম্বর ‘ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক’ এর উদ্বোধন হয়

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় ভাবে ট্রান্সজেন্ডারকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রেও তাদের আলাদা লিঙ্গ স্বীকার করা হয়েছে। এর পরেও তাদের কেন ‘রোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, এমন প্রশ্নে বিএসএমএমইউর অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের মেডিক্যাল রিলেটেড নামটিই রেখেছি। আর আমাদের চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই নাম দেয়া হয়েছে। আমরা আগেও এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছি। তবে আগে একটা ডিভিশনের আন্ডারে করতাম না। এখন সেটা শুরু হচ্ছে।’

শিশুদের ক্ষেত্রে লিঙ্গ পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করলে অধ্যাপক এ কে এম জাহিদ বলেন, ‘যাদের বাবা-মা সন্তানের চিকিৎসার জন্য রাজি হয়ে আমাদের এখানে আসবে তাদের আমরা সার্জারি করব। আমাদের সমাজ আর ওয়েস্টার্ন সমাজ এক নয়। আমাদের সমাজের বাচ্চারা বাবা-মায়ের উপরে নির্ভর করে। তারা যদি রাজি হয় আমাদের চিকিৎসা দিতে সমস্যা নেই।’

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

কর্ণাটকের কলেজে হিজাবে বিধিনিষেধ

কর্ণাটকের কলেজে হিজাবে বিধিনিষেধ

কর্ণাটকের একটি কলেজে পাঠদানের সময় হিজাব বা নেকাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ছবি: এনডিটিভি

ভারতের কর্ণাটকের উদুপির জেলার একটি সরকারি কলেজে গত ৩১ ডিসেম্বর পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ হয়। এতে মুসলিম ছাত্রীরা ক্লাস চলাকালে হিজাব বা নেকাব পরে থাকতে পারবেন না। তবে ক্লাস শেষে বা শুরুর আগে পর্দা করতে আপত্তি নেই।

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমের কর্ণাটকের একটি কলেজে ছাত্রীদের হিজাব নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ বড় হচ্ছে। নতুন করে কলেজের আরও সাত ছাত্রী প্রতিবাদে যোগ দিয়েছেন। গত ৩১ ডিসেম্বর নিষিদ্ধ ঘোষণার পর পরই বিক্ষোভ শুরু করেন ছয় ছাত্রী। হিজাববিষয়ক নীতিমালা তুলে নিয়ে ছাত্রীরা মুসলিম শিক্ষার্থীদের সক্রিয় সংগঠন ক্যাম্পাস ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়ার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

তবে কলেজের নীতিমালা মেনে চলতে আন্দোলনরতদের পরামর্শ দিয়েছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী বি সি নাগেশ। এই ঘটনাকে নিয়ে বিরোধীরা রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

উদুপির জেলার একটি সরকারি কলেজে গত ৩১ ডিসেম্বর পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ হয়। এতে মুসলিম ছাত্রীরা ক্লাস চলাকালে হিজাব বা নেকাব পরে থাকতে পারবেন না। তবে ক্লাস শেষে বা শুরুর আগে পর্দা করতে আপত্তি নেই।

এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, গত ৩১ ডিসেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের কলেজ নির্ধারিত ড্রেস কোড মেনে চলতে কড়াকড়ি আরোপ করেন। ১৯৮৫ সাল থেকে এই কলেজছাত্রীদের ড্রেস কোড- চুড়িদার কিংবা দুপাট্টা। কিন্তু অনেক মুসলিম ছাত্রী এসবের ওপর হিজাব বা নেকাব পরে আসতেন।

কলেজ থেকে ঘোষণার পর পরই ছয় ছাত্রী এর বিরোধিতা করেন। শুরু করেন বিক্ষোভ। বুধবার তাদের সঙ্গে সংহতি জানান আরও সাত ছাত্রী।

এদিন সকালে উদিপুরের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের নেতৃত্বে জেলা কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভরত ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরামর্শ দেন, ড্রেস কোড মেনে চলার।

কর্ণাটকের শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘৯৪ ছাত্রীর বিষয়টি মানতে সমস্যা নেই। তাই দয়া করে সবাই কলেজ কোড মেনে চলেন। বিরোধীরা এই ইস্যুকে রাজনীতিকরণের চেষ্টা করছে।

‘আসলে আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে বিরোধীরা এসব করাচ্ছে। তারা কোনো ইস্যু পাচ্ছিল না। ভোটার টানতে তাই এই ঘটনাকে বড় করে তুলতে চাইছে তারা। কলেজের পোশাক নিয়ে সরকারের নির্ধারিত কোনো কোড নেই, তা সত্য। তবে ১৯৮৫ সালে সাউথ দিল্লি মিউনিসিপাল করপোরেশন (এসডিএমসি) কলেজ কোড বাধ্যতামূলক করে। সেই ধারায় অব্যাহত রাখতে চাইছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘৩৬ বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। বেশির ভাগ মুসলিম ছাত্রীর এতে আপত্তি নেই। কেবল কয়েকজনের সমস্যা। তাদের অনুরোধ করব, ড্রেস কোড মেনে চলেন।’

এর আগে রোববার উগ্র ইসলামপন্থি সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়ার কর্ণাটক ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নাসির পাসা জানান, হিজাব ইস্যুতে কলেজ কর্তৃপক্ষ মুসলিম ছাত্রীদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে।

চলতি মাসের শুরুতে পোশাক নিয়ে বিতর্ক শুরুর পর কোপ্পা জেলার একটি কলেজের ছাত্ররা জাফরান রঙের স্কার্ফ পরে ক্লাসে এসে হিজাব পরার প্রতিবাদ করেন।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন

‘মন হিস্টোইরি’: তালেবান থেকে বাঁচা নারী ফুটবলারের আত্মজীবনী

‘মন হিস্টোইরি’: তালেবান থেকে বাঁচা নারী ফুটবলারের আত্মজীবনী

ডেনীয়  ভাষা ‘মন হিস্টোইরি’র বাংলা মানে হলো ‘আমার গল্প’। ছবি: সংগৃহীত

নাদিয়ার বাবা ছিলেন আফগান সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল। তালেবানরা যখন প্রথম দেশটিতে ক্ষমতায় আসে। সে সময় ২০০০ সালে এক প্রহসনের বিচারে তার বাবাকে হত্যা করা হয়। তখন নাদিয়ার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।

ডেনমার্কের নারী ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত মুখ এখন নাদিয়া নাদিম। অথচ জন্মসূত্রে তিনি একজন আফগান। জন্মেছিলেন হেরাত প্রদেশে।

তার বাবা ছিলেন আফগান সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল। তালেবান যখন প্রথম দেশটিতে ক্ষমতায় আসে। সে সময় ২০০০ সালে এক প্রহসনের বিচারে তার বাবাকে হত্যা করা হয়। তখন নাদিয়ার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।

তালেবানদের ক্রমশ চাপ প্রয়োগে সে সময় তার পরিবার আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে ডেনমার্কে আশ্রয় নেয়।

এ রকম একটি পারিবারিক পরিস্থিতিকে সঙ্গে নিয়ে আজ তিনি একজন অনুপ্রেরণা দানকারী নারী ক্রীড়াবিদ। শৈশবেই তিনি ভেঙে পড়তে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে ফুটবলকেই বেছে নিয়েছেন। হয়েছেন সর্বকালের সেরা আফগান নারী ফুটবলার।

শুধু ফুটবলই নয়, ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানেও ডিগ্রি নিয়েছেন। কথা বলতে পারেন ১১টি ভাষায়। লিখেছেন নিজের আত্মজীবনী।

অনেক দিন ধরেই আমি ভাবছিলাম আমার কিছু বলা উচিত। এমন কিছু, যা আমি বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই। আমার যাত্রা আমাকে পৃথিবীর অনেক জায়গায় নিয়ে গেছে। সম্ভবত এই যাত্রায় শামিল হওয়া আপনার জন্য উপভোগ্য হবে।

ইন্ডিয়া.কমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেনমার্ক জাতীয় দলের হয়ে ৫ ফিট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার দীর্ঘকায় স্ট্রাইকার নাদিয়া খেলেছেন ৯৯টি ম্যাচ। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলে করেছেন ২০০টি গোল। চুক্তি ছিল ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবের সঙ্গে।

ডেনমার্কের প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে ২০১৭ সালে হন নাইকির শুভেচ্ছা দূত। ফোর্বসও তাকে প্রভাবশালী নারী ক্রীড়াবিদের তালিকায় ২০তম স্থান দিয়েছিল।

৩৪ বছর বয়সী নাদিয়া নাদিম বর্তমানে নারী ফুটবলের সবচেয়ে দামি ফুটবলারদের একজন।

অথচ অনেক প্রস্তাবই তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যদি তা না করতেন, তিনি হতে পারতেন সবচেয়ে দামি নারী ফুটবলার।

নাদিয়া নাদিম সব সময়ই বলেন, তিনি অর্থের জন্য ফুটবল খেলেন না। ভবিষ্যতে ডাক্তারি করেই এর থেকে বেশি অর্থ তিনি রোজগার করতে পারবেন। তিনি ফুটবল খেলেন, খেলাটিকে ভালোবেসে।

সর্বশেষ তার ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে ডেনীয় ভাষায় লিখেছেন বই। নাম দিয়েছেন ‘মন হিস্টোইরি’। ডেনীয় ভাষা ‘মন হিস্টোইরি’র বাংলা মানে হলো ‘আমার গল্প’। অ্যামাজন, কিন্ডলের মত প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে তার বই।

তার আত্মজীবনী সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই আমি ভাবছিলাম আমার কিছু বলা উচিত। এমন কিছু, যা আমি বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই। আমার যাত্রা আমাকে পৃথিবীর অনেক জায়গায় নিয়ে গেছে। সম্ভবত এই যাত্রায় শামিল হওয়া আপনার জন্য উপভোগ্য হবে।’

তালেবান তার পিতাকে হত্যা করেছে, হুমকির মুখে ছেড়েছেন দেশ। হার মানেননি। ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন নাদিয়া নাদিম। তার এ যাত্রা যে রোমাঞ্চকর ও বেদনার, হারানোর ও প্রাপ্তির, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন

মেয়েদের জন্য স্কুল খুলে দিচ্ছে তালেবান

মেয়েদের জন্য স্কুল খুলে দিচ্ছে তালেবান

তালেবান মুখপাত্র জানিয়েছেন, মার্চের মধ্যেই পুরো আফগানিস্তানে মেয়েদের জন্য স্কুল খুলে দেয়া হবে। ছবি: সংগৃহীত

গত বছর আগস্টে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা নারীদের শিক্ষা বন্ধে কোনো ঘোষণা দেয়নি। যদিও দেশব্যাপী তালেবান যোদ্ধারা বিভিন্ন জায়গায় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

আফগান নারীরা চাকরি ও পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মেয়েদের জন্য বন্ধ দেশটির মাধ্যমিক স্কুলগুলো। বারবার অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে তাদের। এমন অবস্থায় মার্চের মধ্যে দেশটিতে নারীদের জন্য সব স্কুল খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে তালেবান সরকার।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবান সরকারের মুখপাত্র ও দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাবিউল্লাহ মুজাহিদ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গে আলাপকালে আশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মার্চের মধ্যেই পুরো আফগানিস্তানে মেয়েদের জন্য স্কুলগুলোকে খুলে দেয়া হবে।

মুজাহিদ আরও বলেন, ‘আমরা শিক্ষার বিরুদ্ধে নই। নারী শিক্ষার বিষয়টি আসলে সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। আমরা এই বছরই এগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। ফলে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চালু করা সম্ভব হবে।

অনেক রাজ্যেই নারীদের জন্য স্কুল খোলা আবার অনেক স্থানেই নারীদের স্কুল বন্ধ। এর কারণ অর্থনৈতিক সংকট। যেসব এলাকায় অধিক মানুষের বাস। সেসব এলাকা নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের নতুন পদ্ধতিও তৈরি করতে হবে।’

গত বছর আগস্টে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা নারীদের শিক্ষা বন্ধে কোনো ঘোষণা দেয়নি। যদিও দেশব্যাপী তালেবান যোদ্ধারা বিভিন্ন জায়গায় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

এ ছাড়া তালেবান সরকার নারীদের দূরবর্তী স্থানে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও পুরুষসঙ্গী বাধ্যতামূলক করেছে। নারীদের বোরকা পরতে উৎসাহিত করতে প্রচার চালিয়ে আসছে দেশটির পুণ্যের প্রচার ও পাপ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়।

এর আগে আফগানিস্তানে নারীশিক্ষায় তালেবানের পদক্ষেপ ‘খুবই হতাশাজনক’ ও ‘পশ্চাৎমুখী’ বলে মন্তব্য করেছিলেন কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি।

কাতার যে প্রক্রিয়ায় ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে, সেদিকে নজর দিতেও তালেবান নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

গর্ভধারণের চেষ্টা করেও সফল হচ্ছেন না অনেক নারী। সন্তান ধারণের সক্ষমতা বাড়াতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি। তবে খাদ্যাভ্যাসসহ কিছু শারীরিক কৌশল অনুসরণেও বাড়তে পারে গর্ভধারণের সম্ভাবনা। এ ধরনের ১০টি সহায়ক কৌশল জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

গর্ভধারণের সঠিক ও কার্যকর উপায় বলতে গেলে নানা রহস্যে ঘেরা। ফলে গর্ভধারণে সক্ষম নারীও অনেক সময় জটিলতায় ভুগতে পারেন। আবার খাদ্যাভ্যাসসহ কিছু শারীরিক কারণেও বিলম্বিত হতে পারে গর্ভধারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবার আগে জানতে হবে নিজের শরীরকে। যত্ন নিতে হবে শরীরের। এ ছাড়া কিছু অভ্যাস মেনে চললে গর্ভধারণের জটিলতা অনেকটাই কমে আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিনস রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগের কৃত্রিম প্রজনন শাখার পরিচালক ও ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ ড. ম্যারি অ্যালেন পাভোনের মতে, গর্ভধারণে আগ্রহী নারীর জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিজের শরীর, বিশেষত ঋতুচক্রকে জানা।

পাভোন বলেন, ‘ঋতুচক্রের বিরতি কত দিনের সেটা সবার আগে জানা দরকার। এতে করে নারী তার যৌন মিলনের সময় নির্দিষ্ট করতে পারবেন ও গর্ভধারণের চেষ্টা চালাতে পারবেন।’

বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট লাইভ সায়েন্সের এক প্রতিবেদনে নারীর গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে ১০টি সহায়ক কৌশলের কথা বলা হয়েছে। নিউজবাংলার পাঠকদের জন্য বাংলায় প্রকাশ করা হচ্ছে কৌশলগুলো।

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

. ঋতুচক্রের পুনরাবৃত্তির তথ্য সংরক্ষণ

সন্তান গ্রহণে ইচ্ছুক নারীর প্রতি মাসে তার পিরিয়ডের প্রথম দিনটির তারিখ লক্ষ রাখা উচিত। প্রতি মাসেই সমান দিনে পিরিয়ড শুরু হলে তা নিয়মিত বলে ধরে নেয়া হয়। তবে এর হেরফের হলে অনিয়মিত পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হয়। দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালেন্ডারে এ তথ্যের ভিত্তিতে নারীর ওভুলেশন কখন হচ্ছে, তা অনেকটা সঠিকভাবে অনুমান করা যায়। ওভুলেশন হচ্ছে নারীর ডিম্বাশয় থেকে একটি ডিম নিঃসরণ। ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পর সেটি ফেলোপিয়ান টিউবের নিচের দিকে চলে যায়, আর সেখানেই শুক্রাণু কোষ এই ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে।

ঋতুচক্রের পুরো বিষয়টি হিসাবে রাখতে গ্লোওভুলেশনের মতো বেশ কিছু পিরিয়ড ট্র্যাকার অ্যাপ অনলাইনে পাওয়া যায়। আমেরিকান প্রেগন্যান্সি অ্যাসোসিয়েশনের মতে, নারীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে। অন্যদিকে নারী দেহে প্রবেশের পর পুরুষের শুক্রাণু পাঁচ দিন পর্যন্ত কার্যক্ষম থাকতে পারে।

. ওভুলেশনের দিকে দৃষ্টি রাখা

ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ ড. ম্যারি অ্যালেন পাভোন বলছেন, ‘সাধারণত পিরিয়ডের দুই সপ্তাহ আগে একজন নারীর ওভুলেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়। অবশ্য যাদের ক্ষেত্রে ঋতুচক্র ব্যাহত হয়, তাদের ওভুলেশনের সময় নির্ণয় করা বেশ কঠিন। তবে সাধারণত পরবর্তী পিরিয়ডের আগের ১২ থেকে ১৬ দিন আগে এটি ঘটতে পারে।’

নেচার জার্নালে ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ঋতুচক্রের দৈর্ঘ্য নারীভেদে আলাদা হতে পারে। সেই সঙ্গে নারীর রজঃশীল থাকার বছরগুলোর বিভিন্ন সময়ে ওভুলেশনের সময় ও দৈর্ঘ্যও বদলে যেতে পারে। এ কারণে ওভুলেশনের সময়কে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে নারীর গর্ভধারণ সহজ হয়। মাসের কোন সময়টি গর্ভধারণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, সেটি বের করার অনেক উপায় আছে।

ওভুলেশন প্রেডিকশন কিটের সাহায্যে নারীর কখন ওভুলেশন হচ্ছে, সেটা অনুমান করার ঝামেলা কমে যায়। ওষুধের দোকানে বিক্রি হওয়া এ কিটগুলো মূত্রে লিউটেনাইজিং হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করে। প্রতি মাসে ওভুলেশনের সময় এর মাত্রা বৃদ্ধি পায় ও ডিম্বাশয়কে ডিম্বাণু নির্গত করতে প্রস্তুত করে। আমেরিকান প্রেগন্যান্সি অ্যাসোসিয়েশনের মতে, পজিটিভ ফল আসার পরের তিন দিন কোনো দম্পতির যৌন মিলনের মাধ্যমে গর্ভধারণের জন্য সেরা সময়।

ওভুলেশন কখন হবে সেটা বের করার আরেকটি উপায় হচ্ছে সার্ভিক্যাল শ্লেষ্মার দিকে খেয়াল রাখা। এই প্রক্রিয়ায় নারীর যৌনাঙ্গে শ্লেষ্মার পরিমাণ ও ধরন নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয়।

মা ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা এনজিও মার্চ অফ ডাইমসের মতে, ওভুলেশনের ঠিক আগে যখন একজন নারী সবচেয়ে সক্রিয় অবস্থায় থাকেন, তখন শ্লেষ্মার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং পাতলা, স্বচ্ছ ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। সার্ভিক্যাল শ্লেষ্মা এভাবে পিচ্ছিল হয়ে শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে সহায়তা করে। ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি জার্নালে ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, যেসব নারী ছয় মাসে নিয়মিত নিজেদের সার্ভিক্যাল শ্লেষ্মা পরখ করেন তাদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা ২.৩ ভাগ বেশি।

ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি জার্নালের মতে, শরীরের তাপমাত্রা নিরীক্ষণও ওভুলেশন পর্যবেক্ষণের অন্যতম পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে বিছানা ছাড়ার আগে নির্দিষ্ট সময়ে দেহের তাপমাত্রা মাপতে হবে এবং প্রতিদিনের তাপমাত্রার চার্ট করতে হবে। ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের হেলথ সিস্টেমের মতে, নারীর ডিম্বাশয় ডিম্বাণু ছাড়ার প্রস্তুতির সময় দেহের তাপমাত্রা হালকা কমে যায়। এ সময় দেহের গড় তাপমাত্রা থাকে ৯৭ থেকে ৯৭.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (৩৬.১ থেকে ৩৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মধ্যে। ডিম্বাণু ছেড়ে দেয়ার ২৪ ঘণ্টা পর দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় ও বেশ কয়েক দিন সে অবস্থায় থাকে।

ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের হেলথ সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, ওভুলেশনের পরপর একজন নারীর দেহের সাধারণ তাপমাত্রা ৯৭.৬ থেকে ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৬.৪ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) হতে পারে। তারা বলছে, ওভুলেশনের পর ডিম্বাণু ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকে।

ওভুলেশনের সময় দেহের মূল তাপমাত্রা খুব কম মাত্রায় পরিবর্তিত হয় বলে ডিজিটাল থার্মোমিটার বা বিশেষ বেজাল থার্মোমিটার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

. ফার্টাইল উইন্ডোর সময় বিকল্প দিনে যৌন মিলন

আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্টিলিটি উইন্ডো (ডিম্বাণু নিগর্ত হওয়ার প্রস্তুতি ও নির্গত হওয়ার পরে কার্যকর থাকার সময়) সাধারণত ছয় দিনের। ওভুলেশনের দিন এবং এর আগের পাঁচ দিন। প্রতি মাসে একজন নারী এই সময়টাতেই জন্মদানে সবচেয়ে বেশি সক্ষম বা উর্বর থাকেন।

অনেক নারী গর্ভধারণের সঠিক সময় জানতে ফার্টিলিটি-ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করেন। তবে বিএমজে সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাকটিভ হেলথে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক রিভিউ অনুযায়ী, এই অ্যাপ বা ওয়েবসাইট কতটুকু নিখুঁত সেটা নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি।

অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়নোকলজি জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ৫০টি প্রচলিত ফার্টিলিটি ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ও অ্যাপ পরখ করে দেখেছেন। লাইভ সায়েন্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অ্যাপ ও সাইটগুলো প্রায়ই উদ্ভট ফল দিচ্ছিল। অনেক ফার্টিলিটি উইন্ডোর দিন-তারিখ একেবারে ভুলভাবে জানাচ্ছিল।

পাভোন বলেন, ‘ফার্টিলিটি উইন্ডোর সময়ে প্রতিদিন যৌন মিলনে অংশ নেয়া দম্পতিদের গর্ভধারণের হারে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায় না। এই হার ৩৭ শতাংশ। ফার্টিলিটি উইন্ডোর বাইরে অন্য দিনগুলোতে যৌন মিলনে অংশ নেয়াদের ক্ষেত্রে এ হার ৩৩ শতাংশ।

পাভোনের মতে, মাসজুড়ে নিয়মিত যৌন মিলনে অংশ নিলেই বরং গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি বৃদ্ধি পায়।

গবেষকরা অ্যাপল অ্যাপ স্টোরের শত শত গর্ভধারণ ক্ষমতাসংক্রান্ত অ্যাপ ঘেঁটে দেখেছেন। এসব অ্যাপের তথ্য ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় কানাডার জার্নাল অফ অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়নোকলজিতে। অ্যাপগুলোর ৩১টিতে ভুলভ্রান্তির ছড়াছড়ি ছিল। তবে কয়েকটি বেশ কার্যকর। এর মধ্যে সেরা তিনটি অ্যাপ হচ্ছে:

গ্লো.ওভুলেশন অ্যান্ড পিরিয়ড ট্র্যাকার (Glow.Ovulation & Period Tracker)

ফার্টিলিটি ফ্রেন্ড এফএফ অ্যাপ (Fertility Friend FF App)

ক্লু: হেলথ অ্যান্ড পিরিয়ড ট্র্যাকার (Clue: Health & Period Tracker)

গর্ভধারণ নিয়ে প্রচলিত অনেক মিথ রয়েছে। তবে এগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া বেশ কঠিন। যেমন- অনেকে মনে করেন যৌন মিলনের সময় বিশেষ কোনো পজিশন সন্তান ধারণের সম্ভাবনাকে ব্যাহত করে। তবে এর কোনো প্রমাণ নেই। পাভোন বলেন, যৌন মিলনের পর একজন নারীর নির্দিষ্ট সময় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকার সঙ্গে তার গর্ভধারণের সম্ভাবনা বৃদ্ধিরও কোনো সংযোগ নেই।

পাভোন অবশ্য বলেছেন, পানিভিত্তিক কিছু ভ্যাজিনাল লুব্রিকেন্ট পাওয়া যায়, যা শুক্রাণুর সচলতাকে আটকে দিতে পারে। তার পরামর্শ, লুব্রিকেন্ট প্রয়োজন হলে অ্যাস্ট্রোগ্লাইড বা কে-ওয়াই জেলির বদলে প্রি-সিড ব্যবহার করা।

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

. দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

একজন নারীর ওজন তার গর্ভধারণের সামর্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। অতিরিক্ত ওজন বা অনেক কম ওজন গর্ভধারণের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। পাভোন বলছেন, সাধারণ বডি মাস ইনডেক্সের (বিএমআই) একজন নারীর চেয়ে অতিরিক্ত ওজনের নারীর গর্ভধারণে দ্বিগুণের বেশি সময় লাগতে পারে। আর যেসব নারীর ওজন অনেক কম তাদের ক্ষেত্রে চার গুণ সময় লাগতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলে তা অতিরিক্ত এস্ট্রোজেন তৈরি করে। এটি ওভুলেশন প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। হিউম্যান রিপ্রোডাকশন জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষকদের দাবি, যেসব দম্পতির দুজনই অতিরিক্ত ওজনের এবং যাদের বিএমআই অন্তত ৩৫ (বিএমআই অনুযায়ী ২৫-২৯.৯ পর্যন্ত অতিরিক্ত ওজন ও ৩০ এর বেশি স্থূলকায় বা ওবিস ধরা হয়) তাদের গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ দম্পতির চেয়ে ৫৫ থেকে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত সময় বেশি লেগেছে।

পিএলওএস ওয়ান জার্নালে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুসারে, বিএমআই বৃদ্ধি পেলে নির্দিষ্ট সময়সীমায় নারীর গর্ভধারণের ক্ষমতা কমে আসে। গবেষকরা চীনের সন্তান গ্রহণে ইচ্ছুক ৫০ হাজার দম্পতির ওপর করা এক গবেষণার ডেটা ঘেঁটে এ তথ্য পেয়েছেন।

অ্যান্ড্রোলজিয়া জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরুষের ওবিসিটি বা স্থূল দেহের জন্য হরমোন উৎপাদনের জন্য নিয়োজিত এন্ডোক্রিন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শুক্রাণুর কার্যক্ষমতা ও ঘণত্ব কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়ে নারীর গর্ভধারণের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন হসপিটালস অ্যান্ড ক্লিনিকস অথরিটি জানিয়েছে, যেসব নারীর ওজন অনেক কম (বিএমআই ১৮ এর নিচে) তাদের পিরিয়ড অনিয়মিত হতে পারে বা ওভুলেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে করে গর্ভধারণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

. গর্ভাবস্থার আগে ভিটামিন খাওয়া

যেসব নারী গর্ভধারণের চেষ্টায় আছেন তাদের ভিটামিন খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন পাভোন। এতে করে গর্ভাবস্থায় দেহের উপযোগী ভিটামিন তিনি আগে থেকেই চিহ্নিত করতে পারবেন।

পাভোন প্রতিদিন মাল্টিভিটামিন খেতে বলেন। তবে তাতে ন্যূনতম ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড থাকতে হবে। এটি এক ধরনের বি-ভিটামিন, যা শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড মজবুত করতে সহায়তা করে।

জন্মের সময় শিশুর কোনো ধরনের ত্রুটি এড়াতে গর্ভধারণের অন্তত এক মাস আগে থেকে নারীদের প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করতে বলে দ্য সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)।

আগে থেকে ফলিক অ্যাসিড খাওয়া শুরু করাটা ভালো। এর কারণ, নিউরাল টিউব যা গর্ভধারণের তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে পরিণত হয়। ওই সময়ে অধিকাংশ নারী বুঝতেও পারেন না যে তিনি গর্ভবতী।

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

. স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া

আমেরিকার দাতব্য স্বাস্থ্য সংস্থা মেয়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভধারণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খাদ্যতালিকা না থাকলেও, স্বাস্থ্যকর খাবার একজন নারীর দেহে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদানে সুষম অবস্থা বজায় রেখে গর্ভধারণে সহায়তা করে। এর অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, সুষম প্রোটিন, বার্লি-ওটমিল জাতীয় হোল গ্রেইন, দুগ্ধজাত পণ্য ও চর্বিযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে।

ফলিক এসিডযুক্ত সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পাশাপাশি একজন নারী সবুজ শাক-সবজি, ব্রকোলি, ভিটামিন ও মিনারেল যুক্ত রুটি ও সিরিয়াল, বিনস, লেবু জাতীয় ফল ও কমলার রস খেতে পারেন।

মেয়ো ক্লিনিকের মতে, গর্ভধারণের প্রক্রিয়া শুরুর সময় পারদের উচ্চ মাত্রা সমৃদ্ধ মাছ কম খাওয়া উচিত। এর কারণ পারদ গর্ভবতী নারীর রক্ত প্রবাহে মিশে যেতে পারে, যা শিশুর বেড়ে ওঠায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি পারদযুক্ত খাদ্য গ্রহণ নারী ও পুরুষ উভয়ের বন্ধ্যাত্ব ডেকে আনতে পারে।

কিছু গবেষণায় গর্ভাবস্থায় নারীদের ক্যাফিন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, গর্ভবতী নারী যদি ২০০ মিলিগ্রাম ক্যাফিন (দুই কাপ কফির কম) পান করেন তাহলে গর্ভের সন্তানের কোনো ঝুঁকি নেই। তবে ২০২০ সালে বিএমজে এভিডেন্স বেজড মেডিসিনের রিভিউ গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভবতী নারী বা সন্তান গ্রহণের ইচ্ছুক নারীদের জন্য ক্যাফিনের কোনো নির্দিষ্ট নিরাপদ মাত্রা নেই।

. কঠিন বা ভারী ব্যায়াম কমানো

২০২০ সালের মার্চে হিউম্যান রিপ্রোডাকশন জার্নালের প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিজ্ঞানীরা জানান, প্রতিদিনের শারীরিক সক্রিয়তা একজন নারীর দেহকে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের জন্য প্রস্তুত করে। এতে করে তাদের জন্মদান ক্ষমতা সংক্রান্ত সমস্যাও কমিয়ে দেয়।

তবে লাইভ সায়েন্সের প্রতিবেদন অনুসারে, যে সব নারী অতিরিক্ত ব্যায়াম করেন বা নিয়মিত ভারী কাজ করেন তাদের ওভুলেশন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

যে সব নারী ভারী ব্যায়াম করেন তাদের রজঃচক্রে ব্যাঘাত ঘটতে দেখেছেন চিকিৎসকেরা। লাইভসায়েন্সকে পাভোন বলেন, নারী গর্ভধারণ করতে চাইলে ব্যায়ামের পরিমাণ কমাতে হবে।

. বয়স বাড়লে কমে উর্বরতা

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নারীর সন্তান জন্মদান ক্ষমতা বা উর্বরতা কমতে থাকে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকা ডিম্বাণু ও মান কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউটেরিন ফাইব্রয়েডস, ফেলোপিয়ান টিউবে ব্লক ও এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। যে কারণে উর্বরতা কমে যেতে পারে।

পাভোন বলেন, ‘৩০ বছরের পর নারীদের জন্মদান ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ৩৭ বছরের পর তা আরও কমে যায় এবং ৪০ এর পর তা অনেকখানি হ্রাস পায়।‘

হ্রাস পাওয়ার অর্থ গর্ভধারণে বেশি সময় লাগতে পারে।

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

. ধূমপান মদ্যপানে ক্ষতি

ধূমপানের কারণে নারী ও পুরুষ উভয়েরই বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমেরিকান সোসাইটি অফ রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিনের মতে, সিগারেটের নিকোটিন ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো রাসায়নিক নারীর ডিম্বাণু নষ্ট হওয়ার হারকে ত্বরান্বিত করে।

মেয়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধূমপান নারীর ডিম্বাশয়ের জীর্ণতা তৈরি করে এবং দ্রুত এর ডিম্বাণুকে নিঃশেষ করে দেয়। ২০২০ সালে রিপ্রোডাকটিভ বায়োলজি অ্যান্ড এন্ডক্রাইনোলজি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জন্মদান ক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে ধূমপানের যোগাযোগ রয়েছে।

বিএমজে জার্নালে ২০০৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, নারীদের সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোক (পরোক্ষ ধূমপান) থেকেও দূরে থাকা উচিত। পরোক্ষ ধূমপানও গর্ভধারণের ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। গর্ভাবস্থা বা গর্ভ ধারণ প্রক্রিয়ায় থাকার সময় মারিজুয়ানা গ্রহণ থেকেও বিরত থাকা উচিত।

গর্ভধারণের ইচ্ছা থাকলে মদ্যপানে ইস্তফা দেয়াটি নিরাপদ। তবে, ২০০৯ সালে হিউম্যান রিপ্রোডাকশন জার্নালে ১,৭০৮ জন নারীকে নিয়ে ডেনিশ বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে বিজ্ঞানীদের দাবি, পাঁচ বছর ধরে চলা তাদের গবেষণায় নিয়মিত মদ্যপান, অত্যাধিক মদ্যপান ও জন্মদানের ক্ষমতার মধ্যে কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়নোকলজিতে ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক নারী গর্ভাবস্থায়, গর্ভধারণের ঠিক আগে বা যখন তারাও জানেন না যে গর্ভধারণ করতে যাচ্ছেন সে সময় মদ্যপান করেন।

দ্য আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়নোকলজির মতে, মাঝারি মাত্রায় মদ্যপান (দিনে ১-২ বার) বা বেশি মদ্যপান (দিনে দুই বা ততোধিকবার মদ্যপান) একজন নারীর গর্ভধারণের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পাভোনও একমত এ বিষয়ে। তার মতে, গর্ভধারণের পর নিরাপদ মাত্রায় মদ্যপান বলে কিছু নেই।

১০. কখন সাহায্য লাগবে সেটা জানুন

পাভোন বলেন, ‘নারীর বয়স ৩৫ বছরের ওপরে হলে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া নিয়মিত যৌন সম্পর্কের পর ছয় মাসের মধ্যে সন্তানসম্ভবা না হলে নারী ও পুরুষ উভয়েরই বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষা করানো উচিত।’

পাভোনের মতে, যে সব নারীর বয়স ৩৫ বছরের নিচে, তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে এক বছর নিয়মিত যৌন সম্পর্কের পরেও গর্ভধারণ করতে না পারলে তার সঙ্গীর বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষা করানো উচিত।

গর্ভধারণ সক্ষমতা বাড়ানোর ১০ কৌশল

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে করণীয়

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওএস) একটি হরমোনজনিত সমস্যা। নারীর বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ এটি। আমেরিকায় প্রজননক্ষম ৬-১২ শতাংশ নারী এ রোগে ভোগেন।

পিসিওএস চিহ্নিত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা নেই, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসকেরা নিচের তিনটি লক্ষণের অন্তত দুটি খোঁজার চেষ্টা করেন:

ওভুলেশন হ্রাস পাওয়ায় পিরিয়ড না হওয়া অথবা অনিয়মিত হওয়া।

সাধারণ মাত্রার চেয়ে বেশি পুরুষ হরমোনের কারণে মুখে শরীরে পশমের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া।

ডিম্বাশয়ে একাধিক সিস্ট হওয়া।

নারীরা কেন এ ধরনের সমস্যায় ভোগেন সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এখনও পরিষ্কার নন। তবে গর্ভধারণের চেষ্টা করার সময়ে অনেকের মধ্যে সমস্যগুলো ধরা পড়ে।

পিসিওএসজনিত বন্ধ্যাত্ব ও ওজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। থেরাপিউডিক অ্যাডভান্সেস ইন রিপ্রোডাকটিভ হেলথ জার্নালে ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করা হয়, পিসিওএসে আক্রান্ত ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ নারী অতিরিক্ত ওজন বা ওবিসিটিতে ভুগছেন। স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস পিসিওএসে আক্রান্ত নারীর প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যা কমাতে সক্ষম।

মেটফরমিন ও লেট্রোজোলের মতো অনেকগুলো ওষুধ ওভুলেশনে সাহায্য করে এবং ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। ইনসুলিনের মাত্রা উচ্চ হলে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যায়, যা ওভুলেশন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।

আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে ল্যাপারোস্কোপিক ওভারিয়ান ড্রিলিং। আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিনের তথ্য অনুসারে, এ পদ্ধতিতে একজন সার্জন বাড়তি হরমোন কমাতে ডিম্বাশয়ে ছোট কয়েকটি ফুটো করে দেন। তবে রোগীকে পুরো অজ্ঞান করে করা এ সার্জারি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অনেক সময় এতে ডিম্বাশয়ের ক্ষতি হতে পারে, যা হিতে বিপরীত ফল ডেকে আনতে পারে।

বিকল্প পদ্ধতিগুলো কাজ না করলে চিকিৎসকেরা ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (টেস্ট টিউব বা এ ধরনের কোনো পদ্ধতিতে গর্ভধারণ) করার অনুমোদন দেন।

এনডোমেট্রিওসিস আক্রান্তদের গর্ভধারণ

প্রজননতন্ত্রের আরেকটি রোগ এনডোমেট্রিওসিস। আমেরিকায় প্রতি ১০ জন নারীর একজন এই রোগে আক্রান্ত হন। এক্ষেত্রে জরায়ুতে পাওয়া টিস্যু নারীর ডিম্বাশয় বা ফেলোপিয়ান টিউবেও তৈরি হতে শুরু করে।

জার্নাল অফ অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়নোকলজি অফ ইন্ডিয়ার করা ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মৃদু এনডোমেট্রিওসিসও প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। রোগের তীব্রতা বেশি হলে তা নারীর শ্রোণি অঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ফেলোপিয়ান টিউবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

এনডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত নারীর পক্ষেও গর্ভধারণ করা সম্ভব। আর একবার গর্ভবতী হলে এনডোমেট্রিওসিস আক্রান্ত নন এমন নারীর সঙ্গে তার গর্ভাবস্থার কোনো পার্থক্য নেই।

যুক্তরাজ্যের এনডোমেট্রিওসিস সংক্রান্ত দাতব্য সংস্থা এনডোমেট্রিওসিস ইউকের মতে, ওষুধের সাহায্যে চিকিৎসায় প্রজনন সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় না। আমেরিকার দাতব্য স্বাস্থ্য সংস্থা মেয়ো ক্লিনিকের মতে, এই ওষুধগুলোর মাধ্যমে রোগীর হরমোন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে করে তার জরায়ুর টিস্যুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং নতুন টিস্যু তৈরিতেও বাধা সৃষ্টি করে। তবে ওষুধগুলো হরমোনের ওপর নির্ভরশীল বলে (এগুলো সাধারণত জন্মনিয়ন্ত্রণ, ওভুলেশন পদ্ধতিকে আটকে দেয়া বা অ্যাস্ট্রোজেনের পরিমানকে কমানোর ওষুধ) এটি নারীর গর্ভধারণে বাধা দেয়।

আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিনের মতে, একেক নারীর ওপর এনডোমেট্রিওসিস একেকভাবে প্রভাব ফেলে। যে কারণে চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা।

জার্নাল অফ অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গায়নোকলজি অফ ইন্ডিয়ার করা ২০১৫ সালের গবেষণাটিতে দেখা গেছে, এনডোমেট্রিয়াল ও স্কার টিস্যু সার্জারি করে আপসারণ করলে প্রজনন ক্ষমতা বাড়তে পারে এবং এনডোমেট্রিওসিসের ব্যথা দূর করতে পারে।

প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যান্য পদ্ধতি যেমন, আইভিএফ, ওভুলেশন ঘটানো, কৃত্রিম ইনসেমিনেশন ও নারীর ডিম্বাশয়কে উদ্দীপ্ত করে ডিম্বাণু উৎপন্ন করার অন্য প্রক্রিয়াগুলো একজন এনডোমেট্রিওসিস আক্রান্ত নারীকে গর্ভধারণে সহায়তা করতে পারে।

তবে বিষয়টি এনডোমেট্রিওসিসের তীব্রতা, নারীর বয়স ও প্রজনন সংক্রান্ত অন্যান্য কোনো জটিলতা আছে কি না তার ওপর নির্ভরশীল। এনডোমেট্রিওসিস ইউকের মতে, প্রজনন ক্ষমতা বাড়ানোর চিকিৎসায় চিন্তার বিষয় হচ্ছে এর মাধ্যমে অনেক সময় ডিম্বাশয় বাড়তি উদ্দীপনা গ্রহণ করে। এতে একাধিক ডিম্বাণু নিষিক্ত হয় এবং একাধিক সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন

নারীদের সমাবেশে মরিচ পানি ছুড়ল তালেবান

নারীদের সমাবেশে মরিচ পানি ছুড়ল তালেবান

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে আফগান নারীদের আন্দোলন। ছবি: সংগৃহীত

পড়াশোনা ও কাজের অধিকারের দাবিতে প্রায় ২০ জন নারী কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সমাবেশ করলে তালেবান বাহিনী এ ঘটনা ঘটায়।

গতবছর আগস্টে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর দেশটিতে বেকায়দায় পড়েছে নারীরা। ইতিমধ্যে অধিকাংশ কর্মজীবী নারীর চাকরি চলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছে না নারী শিক্ষার্থীরা। পুরুষ সঙ্গী ছাড়া দূরবর্তী জায়গায় ভ্রমণেও দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। নারীদের বোরকা পরতে বলছে দেশটির পুণ্যের প্রচার ও পাপ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়। এসব পদক্ষেপের বিরোধিতা করে প্রায়ই রাস্তায় আন্দোলন করছেন নারীরা।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনরত একদল নারীকে লক্ষ্য করে এবার পিপার (গোল মরিচ) স্প্রে ছুড়েছে তালেবান।

পড়াশোনা ও কাজের অধিকারের দাবিতে প্রায় ২০ জন নারী কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সমাবেশ করলে তালেবান বাহিনী এ ঘটনা ঘটায়। এ সময় নারীরা ‘সমানাধিকার ও ন্যায়বিচার’ এবং ‘নারী অধিকার, মানবাধিকার’ লেখা ব্যানার নিয়ে আসে।

তিনজন নারী আন্দোলনকারী এএফপিকে বলেন, ‘আন্দোলন ভেস্তে যায় যখন কয়েকটি গাড়িতে তালেবান যোদ্ধারা ঘটনাস্থলে আসে এবং আমাদের লক্ষ্য করে পিপার স্প্রে ছুড়ে।’

একজন নারী জানান, পিপার স্প্রে লাগায় তার ডান চোখ যেন পুড়ছিল।

এ সময় তিনি একজন তালেবান যোদ্ধাকে বলেন, ‘তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।’ তখন যোদ্ধাটি তার দিকে বন্দুক তাক করে।

এ ছাড়া পিপার স্প্রের পর একজন নারীর এলার্জির সমস্যা হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।

তালেবানরা দেশটির দায়িত্ব গ্রহণের পর নারীরা চাকরি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অধিকাংশ মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে নারীরা এখনও ফিরতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে বারবার রাস্তায় নেমে আসছে।

যদিও তালেবান সরকারের দাবি, নারীদের অধিকার প্রদানে আন্তরিক তালেবান। ধীরে ধীরে তাদের নেতৃত্বাধীন আফগান সরকার ইসলামি শরিয়াহর আলোকে নারীদের সব অধিকার প্রদান করবে।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন

সংগীতশিল্পীর বাদ্যযন্ত্রে আগুন দিল তালেবান

সংগীতশিল্পীর বাদ্যযন্ত্রে আগুন দিল তালেবান

সংগীতশিল্পীর সামনেই তার বাদ্যযন্ত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তালেবান যোদ্ধারা। ছবি: সংগৃহীত

এবার সহনশীলভাবে দেশ চালানোর কথা বললেও পূর্বের কট্টর পন্থায়ই হাঁটতে দেখা গেছে তালেবানদের। এমনকি দোকানগুলোয় কাপড় সাজিয়ে রাখার ম্যানিকিনগুলোর মাথাও কেটে ফেলেছে তালেবানরা।

গত বছরের আগস্টে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর নতুন অনেক নিয়মকানুন দেশটির জনগণকে মানতে বাধ্য করছে। প্রকাশ্যে ও বিয়ের অনুষ্ঠানে গানবাজনা নিষিদ্ধ করেছে তারা। ইতোমধ্যে অনেক আফগান শিল্পী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।

এবার এক আফগান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন সংগীতশিল্পীর সামনেই তার বাদ্যযন্ত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তালেবান যোদ্ধারা।

সে সময় ওই স্থানীয় সংগীতশিল্পীর ক্রন্দনরত অবস্থা দেখে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা বন্দুকধারী তালেবান যোদ্ধাদের হাসতে দেখা গেছে।

আফগান সাংবাদিক আবদুল্লাহ ওমেরির বরাতে জানা যায়, আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশের জাজারি আইউব জেলায় এ ঘটনা ঘটেছে।

এবার সহনশীলভাবে দেশ চালানোর কথা বললেও পূর্বের কট্টর পন্থায়ই হাঁটতে দেখা গেছে তালেবানদের। এমনকি দোকানগুলোয় কাপড় সাজিয়ে রাখার ম্যানিকিনগুলোর মাথাও কেটে ফেলেছে তালেবানরা।

এ ছাড়া নারীদের ওপরও দিয়েছে বিভিন্ন বিধিনিষেধ। মাহরাম ছাড়া তাদের দূরবর্তী ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যানবাহন চালকদের বলে দেয়া হয়েছে, তারা যাতে বোরকা ছাড়া কোনো নারী যাত্রী না তোলেন।

তালেবানরা দেশটিতে ‘পুণ্যের প্রচার ও পাপ প্রতিরোধ’ নামের নতুন একটি মন্ত্রণালয় খুলেছে। এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই তারা দেশটিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি করছে।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন

লাপোল কড়াকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত পুরো সম্প্রদায়

লাপোল কড়াকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত পুরো সম্প্রদায়

পরিবারের সঙ্গে লাপোল কড়া। ছবি: নিউজবাংলা

ঝিনাইকুড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কড়া সম্প্রদায়ের সবার মুখে মুখে লাপোল কড়ার নাম। একসঙ্গে ২-৪ জনের জটলা বাধলেই গল্পের বিষয় হয়ে উঠে লোপাল কড়া। নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রাখা লাপোলকে নিয়ে গর্বিত এলাকাবাসী।

দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার হালজায় ঝিনাইকুড়ি গ্রামের অবস্থান। প্রায় সাড়ে তিন শ একর এলাকাজুড়ে এ গ্রামে কড়া সম্প্রদায়ের ২৪টি পরিবারের বসবাস। এ সম্প্রদায়ের রাজা পারু রাজা বৃটিশ আমলে এ জমিগুলো কড়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের জন্য দিয়ে যান। এরপর থেকেই তারা এখানে বাসবাস করছেন। বর্তমানে ২৪টি পরিবারের সদস্য ৯৪ জন।

তবে, কেউ শিক্ষার আলোয় সেভাবে কেউ আলোকিত হতে পারেননি। দুই বছর আগেও কেউ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেননি।

সেই অতীতকে এবার পিছনে ফেলেছেন দিনাজপুরের ঝিনাইকুড়ি গ্রামের লাপোল কড়া। উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি গুচ্ছ পরীক্ষায় কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে ১৫তম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন লাপোল কড়া। তিনি ঝিনাইকুড়ি গ্রামের মৃত রতন কড়ার ছেলে। মা সাতোল কড়া একজন কৃষাণি।

কড়া সম্প্রদায়ের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে; এই খবরে আনন্দের বন্যা বইছে সবার মাঝে। লাপোল কড়ার মতো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্ন দেখছে এ সম্প্রদায়ের আরও অনেক ছেলে-মেয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, সেই চিন্তা এখন লাপোল কড়ার মাথায়।

ঝিনাইকুড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এখানকার সম্প্রদায়ের সবার মুখে মুখে লাপোল কড়ার নাম। একসঙ্গে ২-৪ জনের জটলা বাধলেই গল্পের বিষয় হয়ে উঠে লোপাল কড়া। নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রাখা লাপোলকে নিয়ে গর্বিত এলাকাবাসী।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া লাপোল কড়ার এক ভাই ও এক বোন। বড় ভাই সাপোল কড়া পড়াশোনা করেছেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। আর ছোট বোন পূর্ণিমা কড়া পড়ছেন অষ্টম শ্রেণিতে। ভাই লাপোল কড়ার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছেন পূর্ণিমা কড়াও।

নানা কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ার চিন্তা করা ছেলে-মেয়েরাও এখন পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে। অজয় কড়া, পূজা কড়া, গীতা কড়া, সুমি কড়া, রিদয় কড়া, মুক্তা কড়ার মতো আরও অনেকের চোখেমুখে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন।

নিউজবাংলাকে দশম শ্রেণির ছাত্র জয়ন্ত কড়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘লাপোল কড়া আমার এলাকার বড় ভাই। বিভিন্ন কারণে বাইরের স্কুল বা কলেজে পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করে না। বাইরে পড়াশোনা করতে গেলে আমাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভাবে কথা বলে। নানাভাবে অপমান করে। মাঝেমধ্যে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু সব ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লাপোল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, এই জন্য আমার খুব আনন্দ লাগছে।

লাপোল কড়াকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত পুরো সম্প্রদায়

‘আমিও ভালোভাবে পড়ালেখা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব। আমাদের কড়া সম্প্রদায়ের নানা অবহেলা ও সমস্যার কথা সমাজের সামনে তুলে ধরব।’

লাপোল কড়ার বড় ভাই সাপোল কড়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০১২ সালের দিকে আমি দশম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা দিতে পারি নাই। পরের বছর বিদ্যালয়ে গেলে শিক্ষকরা আমাকে আর ভর্তি নেয় নাই। তাই আর পড়তে পারি নাই।

‘আমরা বিদ্যালয়ে পড়তে গেলে আমাদের বিভিন্ন ধরনে কথা-বার্তা শুনতে হয়। নানাভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। সবাই আমাদের দেখে ঘৃণার চোখে দেখে। এই অবস্থায় পড়লে যেকোনো মানুষই পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। তারপরও আমার ছোট ভাই সব বাধা-বিপত্তি পার করে পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলো, এতে আমার সম্প্রদায়ের সবাই খুব খুশি।’

যাকে নিয়ে এ আনন্দের জোয়ার সেই লাপোল কড়া শোনালেন নিজেদের অবহেলা আর বঞ্ছনার কথা। বলেন, ‘নানা সময়ে সমাজে আদিবাসীদের সাথে জমি নিয়ে অন্যায় করা হয়। অনেক সময় আদিবাসীদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। আমরা ঠিকমত বিচার পাই না।

‘অনেক সময় আমাদের খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হয়েছে। আমি নাট্যকলা বিভাগে পড়ব। এই নাট্যকলার নাটকের মাধ্যমে আমাদের কড়া সম্প্রদায়ের অবহেলা ও সমস্যার কথা সমাজের সামনে তুলে ধরব।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কি, প্রথমে আমি ঠিকমতো বুঝতাম না। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে পারছি। এখন মনে হচ্ছে, আগে অন্ধকার জগতে ছিলাম। এখন আলোর জগতে যাচ্ছি। এ সব দেখে আমার পড়ালেখার প্রতি আরও আগ্রহ জেগে গেছে। আমি চাই কড়া সম্প্রদায়ের আরও সন্তান ভালোভাবে পড়ালেখা করে আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক।’

নিজের মতো সম্প্রদায়ের অন্য শিক্ষার্থীদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে, এমন স্বপ্ন দেখলেও নিজের পড়াশোনার খরচ নিয়ে যেনো অন্ধকারে তিনি।

বলেন, ‘যখন আমি নবম শ্রেণিতে, তখন বাবা মারা গেছেন। তারপরও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতায় আমি পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার মত আমার কোন সামর্থ্য নেই। যদি কোনো বিত্তবান আমাকে সহযোগিতা করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ভালোভাবে করতে পারব।’

নিউজবাংলাকে লাপোল কড়ার মা সাতোল কড়া বলেন, ‘ছেলে ঢাকায় গিয়ে পড়ালেখা করবে, এই জন্য খুব ভালো লাগতেছে। জীবনে আমি কোনো দিন স্কুলে যাই নাই। গ্রামের আর বাইরের লোকজন জানবে, কড়া সম্প্রদায়ের কেউ ঢাকায় গিয়ে পড়ালেখা করতেছে।

‘তবে শুধু আমার ছেলেই নয়, গ্রামের অন্য সন্তানরাও যাতে বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারে এটাই আমি আশা করি।’

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার ঋতুর বিশাল জয় যে কারণে
প্রথম চার তারকা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাডমিরাল
ব্যাংকিং খাতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নিয়োগ দিল ব্র্যাক ব্যাংক
‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
ট্রান্সজেন্ডার ববিতার লাশ দাফনে বাধা

শেয়ার করুন