যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের

যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের

যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বাস ভাড়া নেয়া কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া বেধে দিলেও তাতে গা নেই ড্রাইভার-হেল্পারদের। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা

নগর পরিবহনগুলোতে অবৈধ সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রীতিতে পরিণত হওয়ার পরের ধাপে ২০১৭ সালে আসে এই ওয়েবিল পদ্ধতি। এটি মূলত সিটিং সার্ভিস নামে চলা বাসগুলো একটি নির্ধারিত দূরত্বের পরপর কতজন যাত্রী উঠেছে, সেটি গণনা করার উপায়। একজন লাইনম্যান নির্ধারিত দূরত্ব পরপর বাসের একটি কাগজে যাত্রীর সংখ্যা লিখে দেন। পরে এটিই হয়ে যায় যাত্রী ঠকানোর নতুন কৌশল।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির সামনে থেকে উত্তরা আবদুল্লাহপুর হয়ে ধউর চৌরাস্তা পর্যন্ত যায় মিনিবাস ভূঁইয়া পরিবহন। মোট দূরত্ব ২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার। ভাড়া আসে ৫৪ টাকা। এক টাকা খুচরার ঝামেলা বলে নেয়া হয় ৫৫ টাকা।

এই পথে বিআরটিএ যে ভাড়া ঠিক করেছে, তাতে পাঁচটি স্টপেজে এক দূরত্ব থেকে আরেক দূরত্বে ১০ টাকা করে, একটি স্টপেজে ১৬ টাকা এবং একটি স্টপেজে ১২ টাকা ভাড়া ঠিক করা হয়েছে।

কিন্তু যেসব স্টপেজে ১০ টাকা করে ভাড়া ঠিক করা হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা করে। যে স্টপেজে ঠিক করা হয়েছে ১৬ টাকা, সেটাতে নেয়া হচ্ছে ২০ টাকা। আর যে পথের ভাড়া ঠিক করা হয়েছে ১২ টাকা, সেখানেও নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা।

বিআরটিএ নিজেই ভাড়া নির্ধারণ করেছে কিলোমিটার হিসেবে, অথচ এখন এক দূরত্ব থেকে আরেক দূরত্বে ভাড়া ঠিক করেছে, যেটা এতদিন ধরে অবৈধ বলে আসা ওয়েবিলের মতোই।

ডিজেলের দাম পুনর্নির্ধারণের কারণে গত ৭ নভেম্বর ঢাকায় ডিজেলের বড় বাসে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ টাকা ১৫ পয়সা আর মিনিবাসে ২ টাকা ৫ পয়সা নির্ধারণ করে দেয় বিআরটিএ। আর বড় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ঠিক করা হয় ১০ টাকা, মিনিবাসে ৮ টাকা।

আবার বলে দেয় হয়, যেসব বাস সিএনজিতে চলে, সেগুলোতে ভাড়া বাড়বে না, আগের হারেই নিতে হবে ভাড়া।

কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বাসগুলো এই হারের চেয়ে বেশি আদায় করত আগেই। আর এখন আদায় করছে আরও বেশি হারে।

এই বাসগুলো বেশি ভাড়া আদায়ে বছর পাঁচেক ধরে ওয়েবিল নামে একটি পদ্ধতি চালু করেছে, যাতে কিলোমিটারের কোনো হিসাব নেই। একটি দূরত্ব থেকে আরেকটি দূরত্ব পর্যন্ত ভাড়া ঠিক করেছে তারা। একটি নির্ধারিত দূরত্বের পর এক কিলোমিটার গেলেও পরের সেই ধাপের পুরোটার ভাড়া দিতে হয়।

গত বুধবার বাসমালিকদের সংগঠন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্লা সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেন, রাজধানীতে কোনো সিটিং সার্ভিস আর ওয়েবিল থাকবে না। কিন্তু ঘোষণার পরেও বন্ধ হয়নি কোনো জায়গায়।

ভূঁইয়া পরিবহনের মোহাম্মদপুরের রিংরোডের সিনিয়র লাইনম্যান সোহেল হোসেন বলেন, ‘ওয়েবিল চেকআপের আগে উঠলে ১৫ টাকা দিতে হবে। আর ওয়েবিল চেকআপের পরে উঠলে ১০ টাকা ভাড়া দিতে হবে।’

তিনি জানান, তাদের বাসে শ্যামলী, আগারগাঁও, বনানী- এই ৩টি পয়েন্টে বাস চেকআপ করা হয়। জাপান গার্ডেন সিটি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ভাড়া ২০ টাকা। অথচ বিআরটিএর তালিকায় এই দূরত্ব দেখানো হয়েছে ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার। বিআরটিএর হার অনুযায়ী এই দূরত্বে ভাড়া হওয়ার কথা ছিল ১০ টাকা।

আবার আগারগাঁও থেকে বনানীর কাকলী পর্যন্ত আরেক ওয়েবিলের ভাড়া ঠিক করা হয়েছে ১৫ টাকা। এই পথের দূরত্ব ৫ দশমিক ৭ কিলোমিটার। ভাড়া হয় ১২ টাকা।

আবার কোনো যাত্রী শ্যামলীর শিশুমেলা থেকে উঠে কাকলী নামলে তাকে ২০ টাকা দিতে হবে বলে জানান সোহেল। এই পথের দূরত্ব ৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার। ভাড়া হওয়ার কথা ১৭ টাকা।

সোহেলের সঙ্গে থাকা লাইনম্যান রুবেল জানান, জাপান গার্ডেন থেকে আগারগাঁও চেক পয়েন্টের ৫ হাত দূরে নামলেও বাড়তি ১০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। আবার আগারগাঁওয়ের আগে থেকে কেউ যদি আড়াই কিলোমিটার দূরের বিজয় সরণিতে নামেন, তাহলেও তাকে কাকলী পর্যন্ত ২৫ টাকা ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু কেউ যদি ওই চেক পয়েন্টের পরে ওঠেন, তাহলে ভাড়া দিতে হবে ১৫ টাকা।

নগর পরিবহনগুলোতে অবৈধ সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রীতিতে পরিণত হওয়ার পরের ধাপে ২০১৭ সালে আসে এই ওয়েবিল পদ্ধতি।

এটি মূলত সিটিং সার্ভিস নামে চলা বাসগুলো একটি নির্ধারিত দূরত্বের পরপর কতজন যাত্রী উঠেছে, সেটি গণনা করার উপায়। একজন লাইনম্যান নির্ধারিত দূরত্ব পরপর বাসের একটি কাগজে যাত্রীর সংখ্যা লিখে দেন। পরে এটিই হয়ে যায় যাত্রী ঠকানোর নতুন কৌশল।

বাড়তি ভাড়া আদায় ‘জায়েজ’ করতে প্রথমে এসব বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হতো না। কিন্তু এখন যত খুশি তত ওঠে। যাত্রীরা এ নিয়ে তর্ক করলে শ্রমিকরা উল্টো স্বর গরম করে বলেন, ‘অফিস টাইমে দু-একজন উঠবেই।’ অথবা বলে, ‘সামনের মোড়েই নাইম্যা যাইব’ অথবা ‘অত চেতেন ক্যান? হেরা যাইব না?’

এই ওয়েবিলের নামে একটি স্টপেজ থেকে আরেকটি স্টপেজ পর্যন্ত একই হারে ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও পুরোটা পথেই যাত্রী তোলা হয় আগের লোকাল বাসের মতোই। আবার ওয়েবিল এমন জায়গায় বসানো হয়, যেখানে যাত্রী নামে কম।

যেমন বিমানবন্দর সড়কে যাত্রী নামার একটি প্রধান জায়গা খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ড। কিন্তু ওয়েবিল বসানো হয়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ মিটার আগের জোয়ার সাহারা এলাকায়। সেখানে যাত্রীর ওঠানামা খুবই কম।

এবার ফার্মগেট থেকে শাহবাগের দিকে যাওয়া বাসগুলোর বেশির ভাগের ওয়েবিল বসানো হয়েছে সোনারগাঁও হোটেলের নামনে। ২৫০ গজ দূরত্বে বাংলামোটর নামতে গেলেই তাকে ভাড়া দিতে হচ্ছে পরের গন্তব্য গুলিস্তান বা মতিঝিল পর্যন্ত।

আবার মহাখালী হয়ে সাতরাস্তা দিয়ে মগবাজার হয়ে মতিঝিল বা গুলিস্তানের দিকে চলা বাসগুলোর বেশির ভাগের ওয়েবিল সাতরাস্তার খানিকটা আগে। কেউ যদি মগবাজার নামতে চায়, তাহলে দেড় কিলোমিটার ‍দূরত্বের জন্য তার কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয় গুলিস্তান বা মতিঝিল পর্যন্ত।

৩ নম্বর এয়ারপোর্ট-বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিবহনের বাসে ফার্মগেট থেকে উঠে বাংলামোটর বা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল বা শাহবাগ মোড়ে নামলে সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা নেয়ার কথা। কিন্তু যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে গুলিস্তান বা বঙ্গবাজার পর্যন্ত যাওয়ার পথের পুরোটার ভাড়া হিসেবে ১৫ টাকা।

মালঞ্চ পরিবহন রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে দয়াগঞ্জে চলাচল করে। ওই বাসের সুপারভাইজার বিপ্লব মিয়া নিউজবাংলাকে তিনি জানান, মোহাম্মদপুর থেকে দয়াগঞ্জের ভাড়া ৩৫ টাকা। আর মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তানের ভাড়া ২৫ টাকা।

ওই বাসে মোট ৩টি পয়েন্টে ওয়েবিল বসানো হয়েছে। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝিগাতলা পর্যন্ত যেখানেই নামুক না কেন, ভাড়া ধরা আছে ১৩ টাকা, কিন্তু খুচরা না থাকার কথা বলে আদায় করা হয় ১৫ টাকা।

এর চেয়ে কম দূরত্বে ঝিগাতলা থেকে ঢাকা ক্লাব পর্যন্ত ভাড়া ঠিক করা হয়েছে আরও ১৩ টাকা, এখানেও আদায় করা হয় ১৫ টাকা। ঢাকা ক্লাব থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত আদায় করা হয় আরও ১৫ টাকা, কিন্তু কাগজে-কলমে লেখা ১৩ টাকা। বঙ্গভবন থেকে পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জের জন্যও ১৩ টাকা নির্ধারণ করে আদায় করা হয় ১৫ টাকা।

অর্থাৎ ৩৫ টাকার মোট ভাড়া চার ভাগে আদায় করা হয় ৬০ টাকা।

যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের

আবার পুরো পথের ভাড়া নিয়ে নেয়ার পরেও সেই দূরত্বে যতগুলো মোড় বা লোকসমাগমের এলাকা আছে, সবগুলো থেকে যাত্রী তোলা হয়।

যেমন বৈশাখী পরিবহনের একটি বাসে শ্যামলীর শিশুমেলা ও ৬০ ফিটে এলাকায় কোনো ওয়েবিল রাখেনি। কিন্তু দুই জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করানো হলো।

একইভাবে জাহাঙ্গীর গেট, মহাখালী ওয়্যারলেস এলাকায় বাসটি থেকে যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি করল। কিন্তু সেখানে কোনো ওয়েবিল নেই।

বাসটির একটি ওয়েবিল আগারগাঁওয়ে, পরেরটি গুলশানে। অর্থাৎ কেউ মহাখালী নামলেও তাকে ভাড়া মেটাতে হচ্ছে গুলশান পর্যন্ত।

বাসটিতে ভাড়া কাটা রফিকুল ইসলামের কাছে কেন এত জায়গায় থামানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যাত্রী তো উঠব-নামবই।’

যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওয়েবিল আসলে যাত্রীদের সঙ্গে মালিকদের প্রতারণার একটি কৌশল। হেলপার ও চালকরা যাতে টাকা আত্মসাৎ করতে না পারে, সে জন্য মালিকরা এই পদ্ধতি চালু করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল পরে নৈরাজ্যের হাতিয়ার হয়ে গেল এই ওয়েবিল। সরকার থেকে ভাড়া নির্ধারণ করার পরও যাত্রীদের কাছ থেকে এই ওয়েবিলের কথা বলে বেশি ভাড়া আদায় করা হয়েছে গত কয়েক বছরে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি কিলোমিটার ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া আছে। তাহলে একজন যাত্রী কেন ৩ কিলোমিটার গিয়ে ৮ কিলোমিটারের ভাড়া দিচ্ছেন।’

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’

নৌরুটের দূরত্ব বাড়িয়ে নতুন ভাড়ার পার্সেন্টেজ যোগ করে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

নৌরুটের দূরত্ব নির্ণয় করে এমন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক বেগম সামসুন নাহার বলেন, ‘আমাদের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ দূরত্ব নিয়ে কাজ করে। আমাদের সঙ্গে লঞ্চ মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। মালিকরা বাড়তি সুবিধা নিতে দূরত্ব বাড়িয়ে বলতে পারে, এটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে যে জরিপ আছে, এর বাইরে দিয়ে লঞ্চ যদি ঘুরে ঘুরে যায় তাহলে দূরত্ব বাড়তেও পারে।’

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে নৌপথে লঞ্চভাড়া প্রতি কিলোমিটারে আগের চেয়ে ৬০ পয়সা করে বেড়েছে। এ হিসাবে কম দূরত্বে লঞ্চের ভাড়া ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ ও বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ভাড়া বাড়ানোর আগেই অনেক লঞ্চ বেশি ভাড়া নিত। এবার বেশি ভাড়া আদায়ের জন্য নতুন ফন্দি এঁটেছে ঢাকা থেকে বিভিন্ন রুটে চলা লঞ্চগুলো। নৌরুটের দূরত্ব বাড়িয়ে নতুন ভাড়ার পার্সেন্টেজ যোগ করে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকায় উল্লেখ আছে ঢাকা টু হাতিয়া নৌরুটের দূরত্ব ২০৩ কিলোমিটার।

তবে ৮ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ প্রকাশিত ভাড়ার তালিকায় ঢাকা টু হাতিয়া রুটের দূরত্ব ২৩৩ কিলোমিটার হিসাব করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাতিয়াগামী ফারহান-৪ লঞ্চের চালক হারুনুর রহমান মাস্টার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত এই রুটে লঞ্চ চালাই। জিপিএস ব্যবহার করি, কতটুকু যাই আসি তা আমাদের জানা। ঢাকা টু হাতিয়ার দূরত্ব ১০৫ নটিকাল মাইল (১৯৪ কিলোমিটার)। এখন আরও শর্টকাটে যাওয়া যায়, তাই দূরত্ব আরও কম লাগে। দূরত্ব বাড়ার প্রশ্নই আসে না।’

ডিজেলের দাম বাড়ায় লঞ্চে প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৩০ পয়সা করা হয়েছে। প্রথম ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী ২০৩ কিলোমিটারে আগের ভাড়া ৩১৪ টাকা। বাড়ানোর পরে বর্তমান ভাড়া আসে ৪৩৬ টাকা। নতুন তালিকা অনুযায়ী ২৩৩ কিলোমিটারে আগের ভাড়া ৩৫৬ টাকা, এখনকার ভাড়া ৪৯৬ টাকা।

যাত্রীরা জানালেন, ঢাকা-হাতিয়ায় আগে নিত ৩০০, এখন নিচ্ছে ৫০০ টাকা। চালকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪ কিলোমিটার হিসাবে আগের ভাড়া আসে ৩০১ টাকা।

ঢাকা থেকে ভোলার চরফ্যাশনের বেতুয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকায় উল্লেখ আছে এ রুটের দূরত্ব ২০৩ কিলোমিটার।

৮ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ প্রকাশিত তালিকায় ঢাকা-বেতুয়ার দূরত্ব ২৪৬ কিলোমিটার দেখিয়ে নতুনভাবে ভাড়া ঠিক করা হয়েছে।

এই রুটে চলা ফারহান-৫ লঞ্চের ইনচার্জ রিয়াদ বলেন, ‘বেতুয়ার দূরত্ব আমি জানি না। বাইরে বিআইডব্লিউটিএর সাইনবোর্ড টানানো আছে, ওখানে যা আছে তাই।’

যাত্রীরা জানালেন, ঢাকা-বেতুয়ায় আগে ৩০০-৩৫০ টাকা নেয়া হতো, এখন ৫০০ টাকা নেয়া হচ্ছে।

বেতুয়াগামী যাত্রী মেহেদী আরিফ বলেন, ‘ভোলার লঞ্চ মালিকরা অনেক প্রভাবশালী ও বিত্তশালী। ওরা যা ইচ্ছা তা করতে পারেন। সরকারের যেসব সংস্থা নৌপথের দূরত্ব নির্ণয় করে, তারা যেন নতুনভাবে সঠিক দূরত্ব নির্ণয় করে বিআইডব্লিউটিএ এবং লঞ্চ কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয়, এই অনুরোধ করব। এটি হলে যাত্রীরা সঠিক দূরত্বের ভাড়া দিতে পারবে।’

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’
বিআইডব্লিউটিএর বেঁধে দেয়া ভাড়ার তালিকা

বাড়তি দূরত্বের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এখন নদীর বিভিন্ন স্থানে চর পরে, লঞ্চ ঘুরে যেতে হয়, তাই হয়তো বা দূরত্ব বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কোনো লঞ্চে যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করে সে জন্য আমাদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে লঞ্চে মনিটর করছি। সোমবার থেকে বিআইডব্লিউটিএ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অতিরিক্ত ভাড়া না নিতে মোবাইল কোর্ট বসাবেন। বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে ওই লঞ্চের যাত্রা বাতিল করব।’

নৌরুটের দূরত্ব নির্ণয় করে এমন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক বেগম সামসুন নাহার বলেন, ‘আমাদের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ দূরত্ব নিয়ে কাজ করে। আমাদের সঙ্গে লঞ্চ মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। মালিকরা বাড়তি সুবিধা নিতে দূরত্ব বাড়িয়ে বলতে পারে, এটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে যে জরিপ আছে, এর বাইরে দিয়ে লঞ্চ যদি ঘুরে ঘুরে যায়, তাহলে দূরত্ব বাড়তেও পারে।’

অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (জাপ) সংস্থার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন বলেন, ‘যাত্রীরা কোভিডের সময় ৬০ ভাগ বাড়তি ভাড়া দিয়ে অভ্যস্ত। তাই এখন ভাড়া নিয়ে কথা বলার প্রশ্ন আসে না।’

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন

ইউনিক আইডি: ফরম পূরণে ভোগান্তির শেষ নেই

ইউনিক আইডি: ফরম পূরণে ভোগান্তির শেষ নেই

ইউনিক আইডিতে থাকবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষা সংক্রান্ত সব তথ্য। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

এক অভিভাবক বললেন, ‘বাচ্চার ইউনিক আইডির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন চাওয়া হচ্ছে। আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। তাহলে কেন আবার জন্মনিবন্ধন লাগবে?’

দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক আইডি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত সব তথ্য থাকবে। এ আইডির জন্য প্রয়োজনীয় ফরম পূরণ করতে গিয়ে প্রক্রিয়াগত জটিলতায় ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের।

রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন স্কুলে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ইউনিক আইডির কাগজপত্র নিয়ে মঙ্গলবার স্কুলে আসেন অভিভাবক ওয়াহিদুর রহমান। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, শিক্ষার্থীর ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে অভিভাবকের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনও লাগবে। তা না হলে তার ইউনিক আইডির কাগজ জমা নেয়া হবে না।

একই অভিযোগ করেন রাজধানীর একাধিক বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা। তেমনই একজন তাসমিয়া বিনতে জামান। তিনি বলেন, ‘বাচ্চার ইউনিক আইডির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন চাওয়া হচ্ছে। আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। তাহলে কেন আবার জন্ম নিবন্ধন লাগবে?’

তবে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন তমাল পাল। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে ইস্পাহানি গার্লস স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ইউনিক আইডির ফরমের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব কাগজ জমা দেয়ার পর হঠাৎ করে স্কুল থেকে ফোন করে জানায়, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের কাগজ জমা দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওর রক্তের গ্রুপ তো ছোট্ট সময়েই নির্ণয় করে রেখেছি। ইউনিক আইডির জন্য এখন আবার রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করতে হলো। এ জন্য অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হলো।’

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন করতে কিছু শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের নানা ভোগান্তিতে পড়ার কথা স্বীকার করেন ইউনিক আইডির প্রকল্প পরিচালক শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আসলে আমাদের কিছুই করার নেই। জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে এন্ট্রি দেয়ার জন্য অফিস অফ রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় অনেক আগেই অফিস আদেশ জারি করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে এখন জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তাই আমরা ধরে নিতেই পারি, সব শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন আছে। যারা স্কুলে ভর্তিই হয়নি, তাদের জন্ম নিবন্ধন নাও থাকতে পারে।

‘সমস্যা হলো, জন্ম নিবন্ধনের কোনোটা ম্যানুয়াল, কোনোটা ডিজিটাল। যেসব শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন ম্যানুয়াল, তাদের ডিজিটাল অর্থাৎ অনলাইনে এন্ট্রি দেয়া জন্ম নিবন্ধন লাগবে। কারণ ইউনিক আইডি দেয়ার অন্যতম শর্ত হলো শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র বা অনলাইন জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে মিল থাকতে হবে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধনের।

‘যদি কোনো শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকে, সে ইউনিক আইডি পাবে না। কারণ আমরা শিক্ষার্থীদের তথ্যগুলো পাঠাব অফিস অফ রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে। তারপর সেখান থেকে যাবে নির্বাচন কমিশনে। এরপর তারা ইউনিক আইডি তৈরি করবে। এটাই সিস্টেম। এ জন্য কোনো শিক্ষার্থীর যদি অনলাইন জন্ম নিবন্ধন না থাকে, তাহলে সে ইউনিক আইডি পাবে না।’

শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধনে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন কেন প্রয়োজন হয়, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন করতে গেলে শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন আগে করে নিতে হবে। এটা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন-২০১৯ অনুযায়ী করা হচ্ছে। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। যদি কেউ তা না করে তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

যেসব শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন নেই, তাদের করণীয় কী, এমন প্রশ্নে শামসুল আলম বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থীর অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন ইতিমধ্যে করা আছে, তাদের বাবা-মায়ের শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই শিক্ষার্থী ইউনিক আইডি পাবে। আর যেসব শিক্ষার্থীর অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন এখনও করা হয়নি, তাদের জন্ম নিবন্ধন করতেও বাবা-মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন লাগবে। এটা আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে।’

রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের কাগজ ইউনিক আইডির ফরমের সঙ্গে দেয়া বাধ্যতামূলক কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের কাগজ ইউনিক আইডির ফরমের সঙ্গে দেয়া বাধ্যতামূলক না। তবে কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ ইউনিক আইডির ফরমের সঙ্গে রক্তের গ্রুপের কাগজ নিচ্ছে, যেন ফরমে দেয়া তথ্য ভুল না হয়।

ইউনিক আইডি: ফরম পূরণে ভোগান্তির শেষ নেই

‘ইউনিক আইডি’র তথ্য পূরণের ক্ষেত্রে পাঁচটি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

ইউনিক আইডি কেন

প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এক জায়গায় রাখার জন্য তৈরি করা হচ্ছে ইউনিক আইডি। শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে এই আইডি জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) রূপান্তরিত হবে।

ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইজ)। আর প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরি করছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

কেন শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক আইডি তৈরি করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলেই স্থানীয় সরকার বিভাগের অফিস অফ রেজিস্ট্রার জেনারেলের আওতায় তার জন্ম নিবন্ধন হয়। আর ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া সবার জন্য আছে জাতীয় পরিচয়পত্র। কিন্তু যারা প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮-এর নিচে তারা এই সিস্টেমের বাইরে। এ জন্য তাদের সিস্টেমের মধ্যে আনতেই ইউনিক আইডি তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

ফরমে যেসব তথ্য দিতে হয়

স্ট্যাবলিশমেন্ট অফ ইন্টিগ্রেটেড এডুকেশনাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইইআইএমএস) প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা চার পৃষ্ঠার ফরমে শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ফরমে শিক্ষার্থীর নাম, জন্ম নিবন্ধন নম্বর, জন্মস্থান, জেন্ডার, জাতীয়তা, ধর্ম, অধ্যয়নরত শ্রেণি, রোল নম্বর, বৈবাহিক অবস্থা, প্রতিবন্ধিতা (ডিজ-অ্যাবিলিটি), রক্তের গ্রুপ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কি না, মা-বাবার নামসহ বেশ কিছু তথ্যের ঘর রয়েছে।

বৈবাহিক অবস্থার অপশন হিসেবে অবিবাহিত, বিবাহিত, বিধবা, বিপত্নীক ছাড়াও স্বামী-স্ত্রী পৃথক বসবাস, তালাকপ্রাপ্ত, বিয়েবিচ্ছেদের ঘরও রয়েছে ফরমে।

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন

কয়লা বাদ দিয়ে হালনাগাদ হচ্ছে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা

কয়লা বাদ দিয়ে হালনাগাদ হচ্ছে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা

বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয় ২০১০ সালে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রণীত এ পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে মোট ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ছিল ৫০ শতাংশ। এই মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ সালে হালনাগাদ করা হয়। তাতে ২০৪১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জ্বালানিভিত্তিক ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন পরিকল্পনা দেখানো হয়। এতে কয়লার ব্যবহার ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা ও জলবায়ুর ক্ষতিকর পরিবর্তন সামনে রেখে বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যানে (পিএসএমপি) পরিবর্তন আসছে। জ্বালানি খাত অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান (পিইএমপি) প্রণয়নের কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নিউজবাংলাকে বলেন, সমন্বিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মাস্টারপ্ল্যান জ্বালানি নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে।

‘এই মহাপরিকল্পনায় ২০৫০ সাল অবদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং দিকনির্দেশনা রয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এটি চূড়ান্ত করা হবে।’

জ্বালানি বিভাগের মতে, মহাপরিকল্পনায় পরিবেশ দূষণ রোধে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনায় কয়লার ব্যবহার কমানো হচ্ছে। বিপরীতে বাড়ানো হবে আমদানি করা গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংখ্যা। জোর দেয়া হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরও।

মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সঞ্চালন ও বিতরণ এবং মূল্য ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা করা হবে।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি-জাইকা এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে সহযোগিতা করছে। এ জন্য ইতিমধ্যে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হয়েছে। এর অধীনে খাতভিত্তিক কয়েকটি কারিগরি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। জাইকাকে এ কাজে সহযোগিতা করছে স্থানীয় দুটি ফার্ম।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যমান মাস্টারপ্ল্যান পর্যালোচনা করে প্রযুক্তি ও নীতিমালা যুগোপযোগী করা, জ্বালানি তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম উন্নয়ন করা, প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ চূড়ান্ত করে বিশ্লেষণ, চাহিদার পূর্বাভাস, পাওয়ার সিস্টেম পরিকল্পনা গ্রহণ, এলএনজি আমদানি, পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনা- এই সমন্বিত মহাপরিকল্পনায় স্থান পেয়েছে। এখানে চাহিদার পূর্বাভাস বিষয়ে বিভিন্ন মডেল তুলে ধরা হয়েছে।

নসরুল হামিদ বলেন, ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি) ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে। সরকার কার্বন নিঃসরণ কমানোকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন অগ্রগতি কম- এমন ১০টি কয়লাভিত্তিক প্রকল্প ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। উদ্যোক্তারা চাইলে কয়লার পরিবর্তে এই প্রকল্পগুলো এলএনজিভিত্তিক করার উদ্যোগ নিতে পারে।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ও পটুয়াখালীর পায়রায় কয়লাভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। এগুলোর উৎপাদনক্ষমতা এক হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনের ৮ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৩ শতাংশ বা ৭২২ মেগাওয়াট, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশে উন্নীত করার চিন্তা রয়েছে সরকারের।

প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় বিদ্যুৎ বিভাগ গ্রিন ও ক্লিন এনার্জির প্রসারে জোর দিয়েছে। তাছাড়া কপ-২৬-এ বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। তাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, সোলার বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমে আসছে। এ খাতে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

পাওয়ারসেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, সারা বিশ্ব পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। চীন কয়লার ব্যবহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগী অনেক সংস্থাও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগ না করার ঘোষণা দিয়েছে। সব মিলিয়ে সামনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিউক্লিয়ার বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে। বাংলাদেশও সেদিকে এগোচ্ছে।

হালনাগাদ হচ্ছে মাস্টারপ্ল্যান

জাইকার সহযোগিতায় বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয় ২০১০ সালে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রণীত এ পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে মোট ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ছিল ৫০ শতাংশ। এই মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ সালে হালনাগাদ করা হয়। তাতে ২০৪১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জ্বালানিভিত্তিক ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন পরিকল্পনা দেখানো হয়। এতে কয়লার ব্যবহার ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, বিদ্যুতের মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদে কয়লার ব্যবহার কমবে। গ্রিন ও ক্লিন এনার্জির দিকে বেশি জোর দেয়া হবে।

বাতিল ১০ বিদ্যুৎ প্রকল্প

কয়লা বাদ দিয়ে হালনাগাদ হচ্ছে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা
মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প।

তালিকায় বাদ পড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- সরকারি প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ পাওয়ার কোম্পানির (এপিএসসিএল) পটুয়াখালী এক হাজার ৩২০ ও উত্তরবঙ্গে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট (গাইবান্ধা) কেন্দ্র এবং ওরিয়নের মাওয়া ৫২২, ঢাকা ২৮২, চট্টগ্রাম ২৮২ ও খুলনা ৫৬৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র। এর মধ্যে খুলনার কেন্দ্রটির স্থান পরিবর্তন করে মহেশখালীতে ৭২৬ মেগাওয়াটের এলএনজিভিত্তিক করার প্রস্তাব দিয়েছে ওরিয়ন।

মহেশখালীতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট করে দুটি প্রকল্প বাতিল করেছে সরকার। এর একটি নির্মাণ করার কথা ছিল পিডিবি ও চায়না হুয়াদিয়ান হংকং (সিএইচডিএইচকে) কোম্পানির যৌথ অংশীদারত্বে প্রতিষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানি। এটি কয়লার পরিবর্তে এলএনজিভিত্তিক প্রকল্পে রূপান্তর হতে পারে। মহেশখালীর অন্য প্রকল্পটি দক্ষিণ কোরিয়ার কেপকোর সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে নির্মাণের কথা ছিল।

বাতিলের তালিকায় আরও রয়েছে মাতারবাড়ীতে প্রস্তাবিত কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (সিপিজিসিবিএল) এক হাজার ২৫০ মেগাওয়াট প্রকল্প। জাপানের সুমিতোমোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এটি নির্মাণের কথা ছিল। এ প্রকল্পটি এলএনজিভিত্তিক প্রকল্পে রূপান্তরিত হতে পারে। এ ছাড়া কোল পাওয়ার কোম্পানির ৭০০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের সিম্বকোর্পের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে এটি স্থাপনের কথা ছিল।

এ ছাড়া ওরিয়নের গজারিয়া ৬৩৫ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক প্রকল্পটি এলএনজিতে রূপান্তরের কথা রয়েছে।

নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি

ছয় হাজার ৬৯১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে সিপিজিসিবিএলের কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির নির্মাণকাজে অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ। জাইকার আর্থিক সহযোগিতায় দেশটির সুমিতোমো করপোরেশন এটি বাস্তবায়ন করছে।

বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির (বিআইএফপিসিএল) এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। এটি পিডিবি ও ভারতের এনটিপিসির যৌথ মালিকানায় নির্মিত হচ্ছে।

রুরাল পাওয়ার কোম্পানি (আরপিসিএল) ও চীনের নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন পটুয়াখালীর এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩৬ শতাংশ। পায়রায় বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানির (বিসিপিসিএল) দ্বিতীয় পর্যায়ের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের অগ্রগতি ২০ শতাংশ। চীনের সিএমসির সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে কেন্দ্রটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশের নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল)।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস আলমের (এসএস পাওয়ার) এক হাজার ২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৮২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বরগুনায় নির্মাণাধীন আইসোটেকের বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫৮ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে হাংঝু চায়নার ১২৪০ মেগাওয়াট প্রকল্পের এলওআই ইস্যু করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির স্পন্সর বদলের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।

এলএনজিভিত্তিক প্রকল্প

কয়লা বাদ দিয়ে হালনাগাদ হচ্ছে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা
বাগেরহাটের এলএনজি প্রকল্প।

এলএনজিভিত্তিক দুই হাজার ৭৬৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার চারটি কেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে একটি দ্বৈত জ্বালানির। খুলনার রূপসায় এনডব্লিউপিজিসিএলের ৮৮০ মেগাওয়াট প্রকল্পের অগ্রগতি ৪০ শতাংশ।

নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে সামিটের ৫৮৩ মেগাওয়াটের একটি দ্বৈত জ্বালানির (এলএনজি/ডিজেল) নির্মাণ অগ্রগতি ৩৩ শতাংশ। একই স্থানে ইউনিক গ্রুপের ৫৮৪ মেগাওয়াটের এলএনজিভিত্তিক প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে ২২ শতাংশ।

মেঘনাঘাটেই ভারতের রিলায়েন্সের ৭১৮ মেগাওয়াট প্রকল্পের অগ্রগতি ৪৭ শতাংশ। চুক্তি প্রক্রিয়াধীন মেঘনাঘাটে আনলিমা পাওয়ারের ৪৫০ ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ইউনাইটেড গ্রুপের ৫৯০ মেগাওয়াটের দুটি প্রকল্প।

এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে পায়রায় এনডব্লিউপিজিসিএল ও জার্মানির সিমেন্সের যৌথ অংশীদারত্বের ২৪০০ মেগাওয়াট, মহেশখালীতে পিডিবি ও যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিকের (জিই) যৌথ মালিকানায় ২৪০০ মেগাওয়াট, পিডিবির হরিপুরে ২৫০, সিদ্ধিরগঞ্জে ৬০০, ভেড়ামারায় ৬০০ ও ঘোড়াশালে ২২৫ মেগাওয়াট; গজারিয়ায় আরপিসিএলের ৬০০ মেগাওয়াট, ফেনীর সোনাগাজীতে ইলেকট্রিসিটি পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (ইজিসিবি) ৬০০ মেগাওয়াট এবং মহেশখালীতে জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে ৬০০ মেগাওয়াটসহ আট হাজার ২৭৫ মেগাওয়াটের মোট ৯টি এলএনজিভিত্তিক প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। যৌথ প্রকল্পগুলোর যৌথ মূলধনি কোম্পানি গঠনের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে দেশ

কয়লা বাদ দিয়ে হালনাগাদ হচ্ছে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা
কক্সবাজারে বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প।

সিরাজগঞ্জে পিডিবির দুই মেগাওয়াটের একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। বরিশালে পিডিবির ১, ফেনীতে ইজিসিবির ৫০, মোংলার দুর্গাপুরে এনারগনের ১০০, লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বাংলাদেশের জিএইচইএল ও চীনের সিইটিসির ৫, সিলেটের গোয়াইনঘাটে ইকি সুজি সান সোলার পাওয়ারের ৫, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ইন্ট্রাকো সোলারের ৩০, গাইবান্ধার লাটশালে তিস্তা সোলারের (বেক্সিমকো গ্রুপ) ২০০, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় করতোয়া সোলারের ৩০ এবং সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় এডিসন-হাওরবাংলা-কোরিয়া গ্রিন এনার্জির ৩২ মেগাওয়াটসহ মোট ৪৫১ মেগাওয়াটের ৯টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। কক্সবাজারে ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জির ৬০ মেগাওয়াটের একটি বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়ায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- জামালপুরের মাদারগঞ্জে সিআইআরবিআর পাওয়ার জোনের ১০০, মৌলভীবাজারে ১০, সিঙ্গাপুর হোল্ডিংসের পঞ্চগড়ে ৫০, অ্যাপোলো ইঞ্জিনিয়ারিং ও এসএমই ইলেকট্রিক্যালের চাঁদপুরে সাত, নীলফামারীর ডিমলায় এসকেটিকের ৫০, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে রহিমআফরোজের ২০, ঢাকার ধামরাইয়ে আইবিভি-এসএস অ্যাগ্রোর ৫০, পাবনায় ভারতের সাপরজি পালনজির ১০০, চট্টগ্রামের বারইয়ারহাটে ৫০, পাবনার বেড়ায় মোস্তফা মোটরের ৩ দশমিক ৭৭ ও রাঙ্গুনিয়ায় ৫৫ মেগাওয়াট এবং জামালপুরে ৮১৩ কিলোওয়াটসহ মোট ৪৯৬ মেগাওয়াটের ১২টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র।

বর্জ্যভিত্তিক দুটি প্রকল্পও বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। ছয় মেগাওয়াটের একটি বর্জ্যভিত্তিক কেন্দ্র হবে নারায়ণগঞ্জে। চীনের সিএমসির সঙ্গে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের বর্জ্যভিত্তিক আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

বায়ুভিত্তিক দুটি প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষরের পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো হলো ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ ও মোংলায় ৫০ মেগাওয়াটের বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প। সোনাগাজীর প্রকল্পটি যৌথভাবে করবে ভাগতী প্রোডাক্টস ও রেগান পাওয়ার টেক।

দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ৩৩২ মেগাওয়াটের ছয়টি প্রকল্পে। এর মধ্যে এনডব্লিউপিজিসিএল এবং চীনের সিএমসি যৌথভাবে দুটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে পাবনা (৬৪ মেগাওয়াট) ও সিরাজগঞ্জে (৬৮ মেগাওয়াট)। এ জন্য বাংলাদেশ-চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি (বিসিআরইসিএল) নামে যৌথ মূলধনি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে।

বেসরকারি উদ্যোগে নেত্রকোণা ও চুয়াডাঙ্গায় ৫০ মেগাওয়াট করে দুটি এবং চাঁদপুর ও কক্সবাজারের ইনানীতে ৫০ মেগাওয়াট করে দুটি বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প হওয়ার কথা রয়েছে।

পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এক হাজার ৯৯ মেগাওয়াটের ১৭টি প্রকল্প নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ২২১ মেগাওয়াটের চারটি বায়ুভিত্তিক প্রকল্প রয়েছে। এগুলো হলো- চট্টগ্রামের আনোয়ারার পার্কি বিচে পিডিবির ২ ও ইজিসিবির ১০০, পটুয়াখালীতে আরপিসিএলের ১০ এবং মাতারবাড়ীতে কোল পাওয়ার কোম্পানির ১০০ মেগাওয়াট প্রকল্প।

সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো হলো- পিডিবির সেন্ট মার্টিনে ৫০০ কিলোওয়াট, সোনাগাজীতে ৮৩, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ৬৯ ও বরিশালে ১০০ মেগাওয়াট করে দুটি প্রকল্প; আরপিসিএলের পঞ্চগড়ে ৩০, জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ ও গজারিয়ায় ৫০; ইজিসিবির সোনাগাজীতে প্রতিটি ১০০ মেগাওয়াটের দুটি, সিপিজিসিবিএলের মাতারবাড়ীতে ৫০, এসপিএসসিএলের পটুয়াখালীতে ২০০ ও সাতকানিয়ায় ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র।

এই প্রকল্পগুলো সম্ভাব্যতা যাচাই, দরপত্র আহ্বান বা ভূমি অধিগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। যৌথ অংশীদারত্বে বিসিআরইসিএলের ৫০ মেগাওয়াটের একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে পায়রায়।

এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪৫ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন ৩৫ মেগাওয়াটের দুটি বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প দুটি স্পন্সর করছে ক্যানভাস এনভায়রনমেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

কয়লা বাদ দিয়ে হালনাগাদ হচ্ছে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।

পাবনার রূপপুরে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এটি ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। একই স্থানে সমান ক্ষমতার আরেকটি পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি

দেশে স্থাপিত ১৪৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ১১ হাজার ১০০, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক পাঁচ হাজার ৩৪১, ডিজেল এক হাজার ২৮৬, কয়লা এক হাজার ৬৮৮, হাইড্রো ২৩০, আমদানি এক হাজার ১৬০, অন-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ১২৯ মেগাওয়াট এবং ক্যাপটিভ দুই হাজার ৮০০ ও অফ-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৪০৪ মেগাওয়াটসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪ হাজার ১৩৮ মেগাওয়াট।

তবে চাহিদা না থাকায় এবং সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় না। চাহিদার বিপরীতে ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় ১৩ হাজার ৭৯২ মেগাওয়াট।

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন

একজনের কবজায় শিক্ষার ২৫ প্রকল্প

একজনের কবজায় শিক্ষার ২৫ প্রকল্প

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ৫০ প্রকল্পের অর্ধেকের দায়িত্বে একজন প্রকৌশলী। এতো প্রকল্পের দায়িত্বে একজন থাকাকে অস্বাভাবিক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে।

একজন কর্মকর্তার একটি প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের কথা। এটাই সরকারি বিধান। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু এ নির্দেশকে অমান্যকে করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর হাতেই রয়েছে ২৫ প্রকল্প।

বিষয়টিকে নজিরবিহীন বলছেন শিক্ষা প্রকৌশল সংশ্লিষ্টরা। আলোচিত এই কর্মকর্তার নাম মো. আবুল হাসেম সরদার।

কাজ বণ্টনের নথিতে দেখা যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদার চলতি অর্থবছরের ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রকল্পে তার সহযোগী হিসেবে আছেন সহকারী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলৗ মো. জাফর আলী সিকদার, মো. শাহজাজান আলী এবং শাহ মো. রাকিব।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনগুলোর সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কার এবং আসবাবপত্র সরবরাহের কাজ করে থাকে। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ, আইসিটি সুবিধা সরবরাহের কাজও তারা করে থাকে।

এক প্রকৌশলীর অধীনে এতো বিপুল প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিষয়টি অস্বীকার করেন প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদার। তিনি বলেন, ‘আমি ২৫টি প্রকল্পের দায়িত্বে না।’

তার অধীনে কয়টি প্রকল্প আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১০-১১টি হতে পারে।’ একটু পরেই তিনি বলেন, “অফিস থেকে আমাকে ২৫টি প্রকল্পের ‘দেখভালের’ দায়িত্ব দিয়েছে। আমি প্রকল্প পরিচালক না।

“এ রকম একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বে অনেকেই আছেন। আমি এর বেশি কিছু বলতে পারব না। যদি আপনার কিছু জানার থাকে তাহলে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে যান।”

তিনি আরও বলেন, ‘২৫ প্রকল্পের মধ্যে অনেকগুলোই আছে ২ কোটি, ৫ কোটি, ১৪ কোটি টাকার। আমি অনেকগুলো প্রকল্প তৈরি করেছি। এ জন্য হয়তো আমার নামের পাশে এতগুলো প্রকল্প লেখা আছে।’

২৫ প্রকল্পের দায়িত্বে একজন কর্মকর্তা থাকতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) মো. আরিফুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি কয়টি প্রকল্পের দায়িত্বে? অফিস প্রধান হিসেবে সব প্রকল্পের দায়িত্বেই তো আমি। আমার তো কাজ করাতে হবে। এ জন্য একজন কর্মকর্তা অনেকগুলো প্রকল্প দেখভাল করেন।’

অনেকের কাছেই একাধিক প্রকল্প থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘অনেকের কাছেই একাধিক প্রকল্প থাকতে পারে। ধরেন আমার কাছে আছে ১০০টা কাজ। অফিসে যারা আছে, তাদের মধ্যেই তো কাজগুলো ভাগ করে দিতে হবে। আগে তো কাজগুলো ভাগ করে দেয়া হতো না। এখন আমরা কাজগুলো ভাগ করে দিচ্ছি। এতে কাজের সুবিধা হচ্ছে।’

সরকারি নিয়মে একাধিক প্রকল্পে এক কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগের সুযোগ নেই। ২০০৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের ১৬(৩৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগ করতে হবে। ১৬(৩৭) অনুচ্ছেদে বলা হয়, এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব দেয়া যাবে না।

এছাড়া এক ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পে দায়িত্ব না দিতে গত ২০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক শামীম আহম্মেদের সই করা চিঠি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, একজন কর্মকর্তার ১০-১৪টি প্রকল্পের দায়িত্ব পালনকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন। চিঠিতে যেসব কর্মকর্তা একাধিক প্রকল্পে পিডি আছেন, তাদের অতিরিক্ত প্রকল্পের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারির পর্যন্ত সময় দেয়া হয়।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে বর্তমানে চলমান প্রকল্পের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। এর অর্ধেক সংখ্যকের দায়িত্বেই প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদার। অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীর সংখ্যা সাত জন। খোঁজ নিয়ে অন্য কারো দায়িত্বে এতো বিপুল সংখ্যক প্রকল্প পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কার্য বণ্টনের তালিকায় নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল হাসেম সরদারের নামের পাশে ‘অর্পিত দায়িত্ব’/কাজসমূহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ২৫টি প্রকল্পে।

প্রকল্পগুলো হলো ১. সুনামগঞ্জ জেলায় তিনটি বেসরকারি কলেজ উন্নয়ন; ২. বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ বিজিবি হেড কোয়ার্টার, ঢাকা-এর অবকাঠামো উন্নয়ন; ৩. গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও রাজবাড়ী জেলার তিনটি বেসরকারি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন; ৪. মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুল, খুলনা-এর অবকাঠামো উন্নয়ন; ৫. নোয়াখালী ও ফেনী জেলার দুটি সরকারি ও একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন; ৬. শেখ রাসেল উচ্চ বিদ্যালয়, সদর গোপালগঞ্জ ও শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়, সূত্রাপুর, ঢাকা-এর অবকাঠামো উন্নয়ন; ৭. রাজস্ব খাতের অধীনে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার (৪৯৩১); ৮. রাজস্ব খাতের অধীনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার (৭০২৬); ৯. রাজস্ব খাতের অধীনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র সরবরাহ; ১০. সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন; ১১. তিন পার্বত্য জেলায় বিদ্যমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আবাসিক ভবন নির্মাণ ও নতুন আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন; ১২. কলেজবিহীন পাঁচ উপজেলায় সরকারি কলেজ স্থাপন; ১৩. ১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন; ১৪. উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (২য় পর্যায়); ১৫. কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি; ১৬. সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন; ১৭. বাংলাদেশ ভূমি জরিপ শিক্ষার উন্নয়ন; ১৮. কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই ডিগ্রি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন; ১৯. নয়টি সরকারি কলেজ স্থাপন; ২০. অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিদ্যমান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহের অবকাঠামো উন্নয়ন; ২১. উপকূলীয় এলাকায় ভোলা জেলার তজুমউদ্দিন উপজেলায় নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলবায়ু প্রভাব সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ; ২২. ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলাধীন কুতকুড়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেজ ম্যানেজমেন্ট কলেজ জলবায়ু প্রভাব সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ; ২৩. উপকূলীয় এলাকায় পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া ও ইন্দুকানি উপজেলায় নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলবায়ু প্রভাব সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ; ২৪. সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন (৩২৩ সরকারি স্কুল); এবং ২৫. পাইকগাছা কৃষি কলেজ স্থাপন।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, একজনের হাতে এত প্রকল্প থাকা অস্বাভাবিক। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় ইতোমধ্যে দুই থেকে তিনটি প্রকল্প সেখান থেকে কমানো হয়েছে।

আবুল হাসেম সরদার মোট কত কোটি টাকার কাজের দায়িত্বে রয়েছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অ্যাকচুয়াল হিসাব বলা সম্ভব না। তবে এটুকু বলতে পারি, ২৫ প্রকল্পের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প রয়েছে, যেগুলোর একেকটি কয়েক হাজার কোটি টাকারও বেশি।

একজন কর্মকর্তার ২৫ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকাকে অস্বাভাবিক বলছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও।

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অবশ্যই অস্বাভাবিক। এটা কেমন করে সম্ভব হলো তা খতিয়ে দেখা দরকার। এতে কাজের দীর্ঘসূত্রতা বাড়বে। এ ছাড়া এর ফলে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে কি না, সেটাও দেখা দরকার।’

এ বিষয়ে জানতে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে ফোন করা হলে তিনি ফোন কেটে প্রশ্ন এসএমএস করতে মেসেজ পাঠান। পরে ৬ ঘন্টা ১৪ মিনিট পর এসএমএসে লেখেন, ‘উনার ব্যাপারে আপনারা খবর নেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ব্যাখা দিবে।’

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন

ট্যাবে আটকে জনশুমারি

ট্যাবে আটকে জনশুমারি

ট্যাব হাতে পাওয়ার পরই ডিজিটাল পদ্ধতির জনশুমারি শুরু হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

বিবিএস বলছে, চলতি বছরের মধ্যেই শুমারি শুরুর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ জন্য প্রথমে গত ২ থেকে ৮ জানুয়ারি জনশুমারি করার কথা ছিল, যা করোনার কারণে পিছিয়ে যায়। পরে চলতি মাসের ২৫ থেকে ৩১ অক্টোবর করার সিদ্ধান্ত হয়। ট্যাব জটিলতায় তা শুরু করা যায়নি। ট্যাব কেনার প্রস্তাব অনুমোদন ও প্রধানমন্ত্রীর সায় পেলে ২৪ থেকে ৩০ ডিসেম্বর শুমারি সপ্তাহ ধরে জনগণনা করার কথা ছিল, কিন্তু তা আর সম্ভব নাও হতে পারে।

সরকারের তথ্যের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। আর বিবিএসের সবচেয়ে বড় কার্যক্রম জনশুমারি, কিন্তু এবারের ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২১’ শীর্ষক প্রকল্পটি বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

বেশি দামে ট্যাব (ট্যাবলেট কম্পিউটার) কেনা, দরপত্রে কঠিন শর্ত আরোপসহ বেশ কিছু বিষয় সমালোচিত হওয়ায় এবং করোনা মহামারির কারণে প্রকল্পটির কাজ এখনও শুরুই করা যায়নি। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, চলতি বছরে যে সময় আছে, তাতে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে কি না।

জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পের জন্য ট্যাব কেনার প্রস্তাব দুইবার বাতিল করে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা। এরপর প্রায় এক মাস পার হলেও প্রস্তাব আর ওঠেনি।

প্রতি ১০ বছর পর সরকার জনশুমারি পরিচালনা করে থাকে। সেখানে এ বছরের মধ্যেই শুমারি করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ট্যাব কেনাতেই আটকে আছে শুমারির কার্যক্রম।

শুমারির আওতায় ট্যাব কিনতে বিবিএসের সর্বশেষ দরপত্রের শর্ত হিসাবে প্রস্তাব অনুমোদনের পর ট্যাব সরবরাহে কমপক্ষে দেড় মাস সময় লাগার কথা। আবার গণনাকারীদের এসব ট্যাব চালানোর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যাপারও রয়েছে। তবে হাতে সময় মাত্র এক মাস।

কবে নাগাদ জনশুমারি শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিবিএসের মহাপরিচালক মো. তাজুল ইসলাম।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমরা শুমারির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। এটা হবে সামনে। আমরা ট্যাব কেনার প্রস্তাব সিসিজিপিতে (ক্রয় কমিটি) পাঠিয়েছি। এটা পাস হলে তারপরে শুমারি শুরুর সময় বলা যাবে। যন্ত্রপাতি না পেলে তো আর শুমারি করা যাবে না।’

এ বছরের (ডিসেম্বর) মধ্যে শুমারি করা সম্ভব হবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এখনই কনফার্ম করতে পারতেছি না। কারণ প্রস্তাব পাস হলেই পরে প্রাথমিক কিছু কাজ আছে, তারপর ঠিক কত দিনে ট্যাব হাতে পাব, আর কবে শুমারি শুরু করতে পারব, এসব বিষয় ঠিক হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জনশুমারির সম্ভাব্য তারিখ ধরে তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠিয়েছি। তিনি অনুমোদন দিলেই শুমারি হবে। বাকিটা নির্ভর করবে ট্যাব হাতে পাওয়ার ওপর। কারণ এবারের শুমারিতে ডিজিটালি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও তা সংরক্ষণ করা হবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ক্রয় কমিটির সভায় ট্যাব কেনার প্রস্তাবটি দ্বিতীয় দফায় উত্থাপিত হতে পারে।

তবে আগের দুই দফার মতো এখনও বিবিএসের প্রস্তাবে ত্রুটি রয়ে গেছে বলেই জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র। এ জন্য প্রকল্পের সংশোধন প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানিয়েছে সূত্রটি।

বিবিএস বলছে, চলতি বছরের মধ্যেই শুমারি শুরুর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ জন্য প্রথমে গত ২ থেকে ৮ জানুয়ারি জনশুমারি করার কথা ছিল, যা করোনার কারণে পিছিয়ে যায়। পরে চলতি মাসের ২৫ থেকে ৩১ অক্টোবর করার সিদ্ধান্ত হয়। ট্যাব জটিলতায় তা শুরু করা যায়নি। ট্যাব কেনার প্রস্তাব অনুমোদন ও প্রধানমন্ত্রীর সায় পেলে ২৪ থেকে ৩০ ডিসেম্বর শুমারি সপ্তাহ ধরে জনগণনা করার কথা ছিল, কিন্তু তা আর সম্ভব নাও হতে পারে।

আগে জনশুমারির নাম ছিল আদমশুমারি। ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘পরিসংখ্যান আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী ‘আদমশুমারি ও গৃহগণনার নাম পরিবর্তন করে ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা’ করা হয়।

নানা সমালোচনার পরও দেশের ষষ্ঠ এ জনশুমারিকে ডিজিটাল শুমারি আখ্যা দিয়ে এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪ লাখ ট্যাব কিনতে চায় বিবিএস। শুমারি প্রকল্প আগেই অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।

পরবর্তী ধাপে প্রকল্পের কেনাকাটা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য তুলতে হয়। কিন্তু পর পর দুইবার বিবিএসের প্রস্তাব ফেরত পাঠায় কমিটি।

শুরু থেকেই এ প্রকল্পে ট্যাব কেনা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। সবশেষ দরপত্রে শর্ত অনুযায়ী বিবিএসকে দরপত্র আহ্বানের দেড় মাসের মধ্যে সব ট্যাব হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া দরপত্র খোলার পাঁচ দিন পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ট্যাব সরবরাহ শুরু করতে হবে।

বিবিএসের এমন কঠিন শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে এমন শর্ত আরোপ করেছে বলেও অভিযোগ আছে। ট্যাব কেনার জন্য উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও মাত্র দুটি দরপত্র জমা পড়ে। তার মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি ব্যয়ের দরদাতাকে কাজ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রীর দপ্তরেও নানা বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে একাধিক চিঠি এসেছে।

গত ২৩ জুন আহ্বান করা বিবিএসের দরপত্রের ভিত্তিতে ট্যাব কেনার প্রস্তাব প্রথমবার গত আগস্টে উপস্থাপন করা হয় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। তবে দরপত্রে ‘ত্রুটি’ থাকায় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পুনরায় দরপত্র আহ্বানে বিবিএসকে নির্দেশনা দেয়।

নির্দেশনা অনুযায়ী ফের দরপত্র আহ্বান করে বিবিএস, কিন্তু সেখানে আরোপ করা হয় কঠিন কিছু শর্ত। দ্বিতীয় দফায় পুনঃপ্রস্তাবও বাতিল হয় একই অভিযোগে।

সবশেষ গত ২৭ অক্টোবর প্রস্তাব বাতিল হওয়ার পর প্রায় এক মাস পার হলেও এখনও অনুমোদনের জন্য এ প্রস্তাব ক্রয় কমিটিতে তোলা হয়নি।

দরপত্রের শর্তে অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে ‘বিগত তিন বছরে শুধু একটি একক চুক্তির মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকার পূর্ব-অভিজ্ঞতা থাকার কথা বলা হয়েছে।’

তবে এ শর্তে বেশির ভাগ দেশীয় প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তাই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ৪০০ কোটির পরিবর্তে তা ৫০ কোটিতে নামিয়ে আনার কথা বলছে। তা ছাড়া ৪ লাখ ট্যাবই একক লটে কেনার কথা বলা হয়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, একক অন্তর্ভুক্ত না করে কয়েকটি লটে বিভক্ত করে সুষম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ দেয়া হলে অধিক প্রতিষ্ঠান কাজের সুযোগ পাবে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, বড় পর্যায়ে কোনো কাজ করতে হলে আগে পাইলটিং করতে হয়। এর আগে বিবিএসের এনএসডি প্রকল্পের আওতায় রংপুর ও নীলফামারীতে ট্যাবের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের পরীক্ষা করা হয়েছিল, কিন্তু সেই প্রকল্পে ট্যাব ব্যর্থ হয়। তারপরও ট্যাব দিয়ে শুমারি করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন

জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশ

জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশ

জাপানের অর্থায়নে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর। ছবি: সংগৃহীত

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো দক্ষিণ এশিয়ায়ও আর্থিক সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে জাপান। এ অঞ্চলে প্রচুর উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে টোকিও। এর মধ্যে বাংলাদেশেই জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশও জাপানকে দেখছে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক মিত্র মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান এবং এ অঞ্চলে চীনের ক্রমশ আগ্রাসী বিনিয়োগ টোকিওকে দক্ষিণ এশিয়ামুখী হতে বাধ্য করেছে। আর এর পুরো সুফলই পেতে যাচ্ছে ঢাকা।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও বঙ্গোপসাগরীয় সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে জাপানের কাছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত কূটনীতিতে ভূমিকা রাখছে। এর সুবিধাও এসে ধরা দিচ্ছে। সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের নীতিই ঢাকাকে এ সুবিধা এনে দিয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দিনকে দিন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে। সামনের দিনগুলোয় আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে হাতছানি দেয়া সুবিধা পেতে আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে।

‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা এমন হতে হবে, যেখানে যার সঙ্গে কাজ করলে আমাদের সুবিধা হবে, যাদের বিনিয়োগ আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আমরা তাদের সঙ্গেই কাজ করব।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো দক্ষিণ এশিয়ায়ও আর্থিক সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে জাপান। এ অঞ্চলে প্রচুর উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে টোকিও। এর মধ্যে বাংলাদেশেই জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশও জাপানকে দেখছে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে।

বিগত দশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী দেশ হিসেবে মিয়ানমার পরিচিতি পায় এশিয়ার ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ হিসেবে। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল জাপান। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক সরকারের পতন এবং সেনা অভ্যুত্থানে নাখোশ জাপানি বিনিয়োগকারীরা চাইছে মিয়ানমার থেকে বিদায় নিতে। তাদের কাছে এ অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কয়েকটি দেশ চীনা প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়ায় সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ।

আবার চীনকে অর্থনৈতিকভাবে মোকাবিলায় কোয়াডভুক্ত দেশ অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এ অঞ্চলে সক্রিয় করেছে জাপানকে। এ ছাড়াও ইন্দো-প্যাসেফিক জোটেও জাপানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছে। এই জোট দুটিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়েও বেশ আগ্রহী টোকিও।

যদিও সামরিক জোটের বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ঢাকা। তার পরও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে হিসেবে দেশটির বিনিয়োগকারীদের কাছে দিনে দিনে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জাপান খুব পরিচ্ছন্ন ব্যবসা করে, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সবার সঙ্গে বন্ধুত্বর, কারো সঙ্গে বৈরিতার নয়। সে ক্ষেত্রে এখানে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কোনো প্রভাব থাকবে বলে আমি মনে করি না।’

সবচেয়ে বেশি জাপানি ওডিএ বাংলাদেশে

আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা (ওডিএ) কর্মসূচির আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন সহযোগিতা দিয়ে আসছে জাপান। বর্তমানে জাপানি ওডিএর সবচেয়ে বড় গন্তব্য বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে জাপানের মোট সহযোগিতার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪২৫ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরেও দেশটির কাছ থেকে আরও ২৬৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।

গত বছরের আগস্টে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তি হয়। এখন পর্যন্ত ওডিএ কর্মসূচির আওতায় এটিই জাপান-বাংলাদেশের বৃহত্তম ঋণ চুক্তি, যার পরিমাণ প্রায় ৩২০ কোটি ডলার। জাইকার মাধ্যমে সাতটি সরকারি প্রকল্পে এ অর্থ ঋণ দিচ্ছে জাপান।

অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর তুলনায় বেশ শিথিল শর্তেই বাংলাদেশকে ঋণ দিয়ে থাকে জাপান। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সাম্প্রতিক স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তিগুলোয় সুদহার ধরা হয়েছে শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ। পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ বছর। এর সঙ্গে গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে ধরা হয়েছে আরও ১০ বছর।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর

২০২২ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। একই বছরে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উদ্বোধন হওয়ার প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। তবে শেষ পর্যন্ত বন্দরটির নির্মাণকাজ শেষের অনুমিত সময় ধরা হয়েছে ২০২৬ সাল।

জাপানি অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় নির্মাণাধীন সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থায়ন করছে জাইকা। বন্দরটি নির্মাণ হচ্ছে জাপানের কাশিমা ও নিগাতা বন্দরের আদলে।

শুরুতে শুধু মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা করা হলেও পরে তা সংশোধন করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। দেশের প্রথম এ গভীর সমুদ্রবন্দরকে জাপানিরা দেখছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার যোগসূত্র স্থাপনকারী বন্দর হিসেবে। জাপানি কূটনীতিকদের বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশ
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল হচ্ছে জাপানের অর্থায়নে

শাহজালালে তৃতীয় টার্মিনাল

জাপানি বিনিয়োগে বাস্তবায়নাধীন আরেকটি মেগাপ্রকল্প হলো রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকায় নির্মীয়মাণ প্রকল্পটিতে জাইকার অর্থায়ন ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে লক্ষ্যের চেয়েও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৩ সালের জুনেই এটি উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।

মেট্রো ও পাতাল রেল

রাজধানীর সড়ক অবকাঠামোয় চলমান মেগাপ্রকল্পগুলোর মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে জাপানি বিনিয়োগ। এর মধ্য দিয়ে ঢাকায় গণপরিবহনের যাতায়াত উন্নয়নে গৃহীত মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করতে চায় সরকার।

মোট ১২৮ দশমিক ৭১ কিলোমিটার (উড়াল ৬৭ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার এবং পাতাল ৬১ দশমিক ১৭ কিলোমিটার) দীর্ঘ, ১০৪টি স্টেশন (উড়াল ৫১টি এবং পাতাল ৫৩টি) বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার এই প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এতে বড় বিনিয়োগ করছে জাপানি সাহায্য সংস্থা- জাইকা।

এর মধ্যে এমআরটি-৬ মেট্রোরেল প্রকল্পটি ২০২২ এর মধ্যে শেষ হবে। আর শেষটা অর্থাৎ এমআরটির শেষ প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হবে। এগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

এসবের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মেট্রোরেল-লাইন-৬ প্রকল্পটি। অন্যগুলো হলো মেট্রোরেল লাইন-১ এবং মেট্রোরেলের লাইন-১ (ই/এস), মেট্রোরেল লাইন-৫ এর নর্দার্ন রুট এবং সাউদার্ন রুট।

জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশ
রাজধানীতে যে মেট্রোরেল হচ্ছে তার অর্থায়নে রয়েছে জাপান

২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পে (এমআরটি-৬) জাইকার বিনিয়োগ ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। হেমায়েতপুর-ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল (এমআরটি-৫) নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে আগামী বছর। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা দিচ্ছে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। আগামী মার্চে শুরু হচ্ছে ঢাকার পাতাল রেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ। এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এ প্রকল্পেও প্রধান অর্থায়নকারী জাইকা।

জাপানি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জাপান বাংলাদেশের পরীক্ষিত ও অকৃত্রিম বন্ধু দেশ। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক জাপান সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এটি ছিল অংশীদারত্বের সূচনা, যা দিনে দিনে শক্তিশালী হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী জানান, জাপানি অর্থায়নে বঙ্গবন্ধু সড়ক ও যমুনা নদীর ওপর রেল সেতু, ঢাকা শহরের মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী পাওয়ার প্লান্ট, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরসহ চলমান বেশ কয়েকটি মেগাপ্রকল্প চলমান রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলসেতু

দেশের অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামোর মেগাপ্রকল্পগুলোতেও বড় বিনিয়োগ রয়েছে জাইকার। যমুনা নদীর ওপর ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলসেতুটি। প্রকল্প ব্যয়ের ৭২ শতাংশ বা ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দিচ্ছে জাইকা।

পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় সেতু অবকাঠামো নির্মাণে চলমান ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্টের মোট ব্যয় ১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার অর্থায়ন ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। আন্তসীমান্ত সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে গৃহীত ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের অনুমিত ব্যয় ৩ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকার মধ্যে সংস্থাটি দিচ্ছে ২ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।

জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশ
যুমনা নদীতে নির্মিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু রেলসেতু

বেসরকারি খাতে জাপানি বিনিয়োগ

গত কয়েক বছরে দেশে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেআইটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে চালু জাপানি কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৭০।

এর প্রায় এক যুগের মাথায় (চলতি বছরের এপ্রিল) দেশে চালু জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ৩২১টিতে দাঁড়িয়েছে বলে জাপান দূতাবাসের তথ্যে উঠে এসেছে। নামিদামি জাপানি কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশে কারখানাও স্থাপন করছে।

মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড হোন্ডা এরই মধ্যে কারখানা স্থাপন করেছে। এ ছাড়া দেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের কারখানা ও বিপণন করছে এসিআই।

তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান জাপান টোব্যাকো সম্প্রতি আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কিনে নেয়। এতে জাপানের কোম্পানিটি বিনিয়োগ করছে ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা।

বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিপ্পন স্টিল অ্যান্ড সুমিতমো মেটাল দেশীয় প্রতিষ্ঠান ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং প্রডাক্টসের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইস্পাত কারখানা করছে। এ জন্য ১০০ একর জমি বরাদ্দের বিষয়ে বেজার সঙ্গে চুক্তিও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকায় একের পর এক স্টোর খুলছে জাপানি পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড মিনিসো।

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের (জেবিসিসিআই) মহাসচিব তারেক রাফি ভুঁইয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ দেখানোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী।

‘বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় আগের চেয়ে অনেক বেশি। মাথাপিছু আয়ে ভারতকে আমরা ছাড়িয়ে গেছি। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বড়। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলে ভোক্তারা দ্রুত উন্নতি করে। এ কারণে ফুডস আইটেমসহ নানা ধরনের পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে।’

জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশ
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

বিদ্যুৎকেন্দ্রে জাপানি বিনিয়োগ

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও বড় অংশীদার হয়ে উঠেছে জাপান। জাইকার অর্থায়নে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৩৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটিতে জাইকার অর্থায়ন ২৯ হাজার কোটি টাকা।

টোকিওভিত্তিক কোম্পানি জাপানস এনার্জি ফর আ নিউ এরার (জেরা) বিনিয়োগ পরিকল্পনায় এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে ঢাকার অদূরে মেঘনাঘাটে বাস্তবায়নাধীন রিলায়েন্স পাওয়ারের বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৪৯ শতাংশ ও সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ২২ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে জেরা।

এর বাইরেও দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর আগ্রহ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এর মধ্য দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব বিস্তারকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে জেরা।

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের জোয়ার: ব্লুমবার্গ

করোনা মহামারি, চীনের প্রতিবেশীদের ওপর খবরদারি, মিয়ানমারের সেনাশাসনের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাপানের উদ্যোক্তারা তাদের কোম্পানিগুলোকে চীনের বাইরে স্থানান্তরে উৎসাহিত করছে। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাপানি বিনিয়োগের জোয়ার আসতে পারে বলে ধারণা করছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।

তাদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে সরিয়ে বাংলাদেশে আনার জন্য জাপান সরকার নানাভাবে উৎসাহিত করছে। জাপান এমন সময় কারখানাগুলোকে স্থানান্তরে উৎসাহিত করছে, যখন বাংলাদেশে দেশটির জন্যই শুধু একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হচ্ছে।

ব্লুমবার্গ জানায়, বাংলাদেশে এ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০ বিলিয়ন ডলার জাপানি বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ।

জাপানি রাষ্ট্রদূত নাওকি ইতো নাওকি গত ফেব্রুয়ারিতে ব্লুমবার্গকে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের শিল্পাঞ্চল তৈরিতে বিশেষ ঋণ হিসেবে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে জাপান। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে গোটা এশিয়ার মধ্যেই এত বড় সহযোগিতা আর হয়নি।

১ বিলিয়ন ডলারের জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আসবে ২০ বিলিয়ন ডলারের।

২০২২ সালের শেষের দিকে উৎপাদনে যাবে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এক বিলিয়ন ডলারের জাপানি বিনিয়োগে এটি করা হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক এক লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান ইউসুফ হারুন নিউজবাংলাকে বলেন, জাপান এ ইকোনমিক জোনে ২০২২ সালের শেষের দিকে উৎপাদনে যাবে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় এক হাজার একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ইতিমধ্যেই ৬২০ একর জায়গা সরকার দিয়েছে। বাকি ৩৮০ একর জায়গা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় আছে।

২০১৯ সালে বেজা ও জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ভূমি উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে সুমিতোমো করপোরেশন। বেজার তত্ত্বাবধানে জমি বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) যৌথভাবে প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।

বেজার তথ্য মতে, এখানে বাংলাদেশের শেয়ার ৩০ শতাংশ আর জাপানের ৭০ শতাংশ। জাপান সরকার সুমিতোমো কোম্পানিকে তাদের ডেভেলপার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ইতিমধ্যে ১৬০ একর জমি উন্নয়নের মাধ্যমে সুমিতোমো করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। যেখানে বিনিয়োগের জন্য এরই মধ্যে ২২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। মার্চের মধ্যে আরও ১৬০ একর জমি সুমিতোমো বুঝে পাবে।

বেজা চেয়ারম্যান জানান, তালিকাভুক্ত কোম্পানি দ্রুতই তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান করবে। অধিকৃত বাকি জমিরও উন্নয়নের কাজ চলছে। নতুন জমি অধিগ্রহণের কাজও চলমান আছে।

এই অর্থনৈতিক জোনে অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি, মোটরসাইকেল, মোবাইল হ্যান্ডসেটসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য ও যন্ত্রপাতি, অ্যাগ্রো ফুড, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছে বেজা।

এরইমধ্যে এখানে বিনিয়োগ করতে জাপানের টয়োটা, মিতসুবিশি, সুমিতোমো, তাওয়াকি, সুজিত লিমিটেডের মতো কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখিয়েছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানান, এই শিল্পাঞ্চলে ১০০ জাপানি কোম্পানি থাকবে। এই অঞ্চল তৈরিতে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে জাপান। আর কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কারখানা করবে জাপানি বিনিয়োগকারীরা।

আড়াইহাজারের এই অর্থনৈতিক অঞ্চল সফল হলে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাপান আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলবে। সেটি সফল হলে কক্সবাজারের মহেশখালীতে পরবর্তী অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে বলে জানান ইতো নাওকি।

ঢাকায় জাপান দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে জাপানের ক্রমবর্ধমান প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৯০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার।

চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৩২১টিরও বেশি জাপানি কোম্পানি কাজ করছিল। এ সংখ্যা ২০১০ সালে কাজ করা ৮৩টি কোম্পানির সংখ্যার প্রায় চারগুণ।

কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও ২০২০ অর্থবছরে জাপানের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬০ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১০ অর্থবছরের প্রায় তিনগুণ বেশি।

জাপানি বিনিয়োগের প্রধান গেটওয়ে হচ্ছে বাংলাদেশ
জাপানের অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গড়ে উঠছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল

আড়াইহাজার হবে গেমচেঞ্জার

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রস্তুত হলে জাপানভিত্তিক কোম্পানি ও যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের একটি নতুন ঢেউ আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে জাপান ও বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে অথবা আইসিটির মতো উদীয়মান খাতে উন্নয়ন অংশীদার হতে পারে। ক্রমবর্ধমান ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট অনুযায়ী যেহেতু জাপান বাংলাদেশের বিদেশি শীর্ষ পাঁচটি বিনিয়োগকারী দেশের অন্যতম। তাই অর্থায়ন, নির্মাণ, পুঁজি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মেগা-প্রজেক্টগুলোতে দেশটি আমাদের অন্যতম প্রধান অংশীদার হতে পারে।

‘জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক এখন এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। জাপানে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং জাপান থেকে আমদানির পরিমাণ ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের বিনিয়োগ, পণ্য ও রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য চাই। আমরা সম্ভাব্য সর্বোত্তম উপায়ে শিল্প ও ভোক্তা উভয় বৈশ্বিক বাজারেই সেবা দিতে চাই। বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোকে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোতে সহায়তা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে জোরদার, বিস্তৃত ও গভীর সম্পর্ককে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে।’

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন

‘দেশের বিরোধিতা কারও ইচ্ছার স্বাধীনতা হতে পারে না’

‘দেশের বিরোধিতা কারও ইচ্ছার স্বাধীনতা হতে পারে না’

‘পাকিস্তানি দালাল রুখবে তারুণ্য’-এর নেতৃত্বে রয়েছেন হামজা রহমান অন্তর। ছবি: নিউজবাংলা

ঘরোয়া ক্লাবভিত্তিক খেলায় সমর্থন আলাদা বিষয়। কিন্তু বিষয়টা যখন জাতিগত, তখন সেটা কখনও ঐচ্ছিক হতে পারে না। আমি মনে করি যে, এটা নিজের জাতির বিরুদ্ধে যাওয়া; যা এক ধরনের অপরাধ। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে সেখানে তো বাংলাদেশের কোনো সমর্থক পাবেন না।

বাংলাদেশের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানের পতাকা-জার্সি গায়ে দেশের বিরুদ্ধে গলা চড়াচ্ছেন কিছু মানুষ। এই দৃশ্য দেখে সহ্য করতে পারেননি একদল তরুণ। প্রতিরোধের ডাক নিয়ে তারা স্টেডিয়ামে যাওয়ার পর ‘পাকিস্তানি সমর্থক’ বাংলাদেশিদের আর সেভাবে দেখা যায়নি।

‘পাকিস্তানি দালাল রুখবে তারুণ্য’ নামে এই প্রতিরোধের আহ্বানের নেতৃত্বে হামজা রহমান অন্তর নামে এক তরুণ। তিনি একজন ক্রিকেটপ্রেমী, রাজনৈতিক কর্মী। জড়িত ছাত্রলীগের রাজনীতিতে।

বিশৃঙ্খলা ছাড়াই ‘সফল’ হওয়া এই তরুণ নিউজবাংলার মুখোমুখি হয়েছেন। বলেছেন তার সেই প্রতিরোধের ডাকের পেছনে কী চিন্তা ছিল। পাকিস্তানকে সমর্থনের পক্ষে যেসব যুক্তি সামনে আনা হচ্ছে, সেগুলোকে খেলো উল্লেখ করে এই তরুণ বলেছেন, দেশের বিরোধিতা করা কারও ইচ্ছার স্বাধীনতা হতে পারে না।

পাকিস্তানের মাটিতে তাদের সঙ্গে ম্যাচ হলে এবং পাকিস্তান বাজে খেললে কেউ বাংলাদেশকে এভাবে সমর্থক করতেন কি না, সেই প্রশ্ন রাখেন হামজা। জানিয়েছেন, মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের মতো চট্টগ্রামেও জারি থাকবে তাদের প্রতিরোধ।

রকম একটি উদ্যোগ কেন নিলেন?

আসলে উদ্যোগটা হঠাৎ করেই নেয়া। কারণ বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের চলমান যে ক্রিকেট সিরিজ তার টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচ থেকেই আমরা দেখেছি যে, কিছু দর্শক বাংলাদেশি হয়েও পাকিস্তানের পতাকা ও জার্সি নিয়ে মাঠে আসছেন। প্রথম ম্যাচে আমরা এটা লক্ষ্য করি। দ্বিতীয় ম্যাচেও একই জিনিস আমরা লক্ষ্য করি। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই এই বিষয়টির একটি প্রতিবাদ করা দরকার। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আমরা তরুণদের একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলে আমরা মাঠে গিয়ে এর প্রতিবাদ করব।

উদ্যোগে আপনার সঙ্গে আর কারা কারা ছিল?

এই উদ্যোগটা আমরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমেই জানান দিই। এর পরে যারা অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আছেন, তারা সংগঠিত হন। এরপর আমরা একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলি।

একটি সংগঠনের ব্যানারে আমরা বিভিন্ন মিডিয়া হাউসে প্রেস রিলিজ দিই, তৃতীয় ম্যাচের খেলার ঠিক আগের দিন। ‘পাকিস্তানি দালাল রুখবে তারুণ্য’ এই সংগঠনের মাধ্যমে আমরা তরুণ প্রজন্মকে একত্রিত করি। আমাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সবাই ছিল। ছাত্রলীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যারা বাংলাদেশকে ধারণ করেন তারা ছিলেন।

অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, যার যার ইচ্ছামতো দলকে সমর্থন করার অধিকার আছেকী বলবেন?

আসলে এটা তো কোনো ক্লাব ফুটবল কিংবা ক্রিকেট নয়। কোনো ঘরোয়া লিগও না। এখানে একটা জাতির সঙ্গে আরেকটা জাতির খেলা হচ্ছে। আমরা যদি ব্রিটিশ আমলের দিকে দেখি, কলকাতায় মোহনবাগানের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ। সেই ম্যাচের মাধ্যমেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটেছিল। সেই ম্যাচটিকে শতবর্ষ পরে আজও খুবই গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

ঘরোয়া ক্লাবভিত্তিক খেলায় সমর্থন আলাদা বিষয়। কিন্তু বিষয়টা যখন জাতিগত, তখন সেটা কখনও ঐচ্ছিক হতে পারে না। আমি মনে করি যে, এটা নিজের জাতির বিরুদ্ধে যাওয়া, যা এক ধরনের অপরাধ। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে সেখানে তো বাংলাদেশের কোনো সমর্থক পাবেন না।

অনেকে এও বলার চেষ্টা করছেন যে, বাংলাদেশ পারে না বলে এমনটা করা হচ্ছে বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

অনেকে বলে যে বিসিবির ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা খারাপ খেলছে বলে এটা প্রতিবাদ। অনেকে এর পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু এটা বলে আসলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বিশ্বের ক্লাব পর্যায়ের খেলায় আমরা দেখেছি, বার্সেলোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদ যখন খারাপ খেলে তখন সমর্থকরা কিন্তু তাদের দুয়ো ধ্বনি দেন। সেখানেও কিন্তু তাদের সমর্থকরা তাদের ছেড়ে অন্য দলকে সমর্থন করেন না।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা খারাপ খেললে আমরা তাদের সমালোচনা করতে পারি। আমরা অবশ্যই তাদের বিপক্ষের খেলোয়াড়দের সমর্থন করব না। আমি মনে করি, যাদের পারিবারিক শিক্ষার অভাব আছে, যাদের পূর্বপুরুষরা একাত্তর সালে বাংলাদেশের বিরোধিতাকারী, এটা তারাই করছেন।

আসলে তাদের পারিবারিক শিক্ষাটাই এমন যে তারা বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি পতাকা ও জার্সি নিয়ে মাঠে আসছেন। এটা কিন্তু ছোট করে দেখার কোনো উপায় নেই।

পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন এর আগেও বাংলাদেশে দেখা গেছে কিন্তু বাংলাদেশের বিপক্ষের ম্যাচে এভাবে দেখা যায়নি আপনার কী মনে হয়, কারণ কী?

এটা আসলে ভূরাজনৈতিক কিছু কারণেও হতে পারে। আমার ধারণা, পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইরমান খান কিংবা পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপ্রধান অনেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে আবার বাংলাদেশের কনফেডারেশনের কথা বলেছেন। তাদের একটা ভাব এমন যে, ‘ভাইয়েরা ভাইয়েরা অনেক কিছু হয়েছে, আসুন আমরা সব ভুলে যাই। ওনারা চান আমরা যাতে আবার এক হয়ে যাই।’

এটা আসলে কীভাবে সম্ভব? ৩০ লাখ শহীদ ও ৩ লাখ বীরাঙ্গনার আত্মচিৎকারের বিনিময়ে আমরা এই বাংলাদেশ পেয়েছি। আমরা কী এগুলোকে এত সহজেই ভূলুণ্ঠিত হতে দিতে পারি।

আমরা তাদের সঙ্গে আবার এক হবো এটা আসলে সম্ভব না। কিন্তু পাকিস্তান সরকার থেকে শুরু করে তাদের এ দেশে যারা এজেন্ট, আমার ধারণা তাদের একটা মিশন আছে, বাংলাদেশে তারা সমর্থকদেরকে উসকে দিতে চায়। তারা এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

আপনি কি এটা অনুমান করছেন? না এর পক্ষে আপনার কাছে তথ্য আছে?

তথ্যপ্রমাণ তো রাষ্ট্রীয় বিষয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে দেখা যায়, জুলফিকার আলী ভুট্টোও কিন্তু বলেছিলেন, আমরা আবার কনফেডারেশন করি। ইমরান খানও (পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী) কিন্তু কয়েক দিন আগে একই কথা বলেছেন যে আমরা তো একই, এক হয়ে যাই।

আমরা খেলার মাঠেও দেখেছি, বাংলাদেশে যারা তাদের অনুসারী- দালাল আছে, তারা কিন্তু কয়েকটি মিডিয়ার বলেছে, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ একই দেশ। তাহলে কী ৩০ লাখ শহীদ, ৩ লাখ বীরাঙ্গনা- এগুলো বৃথা।

পাকিস্তানের কাছ থেকে আমরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি, তারা কিন্তু আমাদের দয়া দেখিয়ে স্বাধীনতা দেয়নি। আমরা এখনও তাদের কাছে বিপুল পরিমাণে ক্ষতিপূরণ পাই, কিন্তু দিচ্ছে না।

আপনাদের প্রতিহতের ঘোষণায় অনেকে পতাকা কিংবা জার্সি পরে আসেননি কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষে স্টেডিয়ামে কেউ কি গলাও ফাটায়নি?

হ্যাঁ, পাকিস্তানের পক্ষে অনেকেই গলা ফাটিয়েছেন। আমাদের ঘোষণা ছিল, কোনো বাংলাদেশি যদি পাকিস্তানি প্রতীক পতাকা ও জার্সি নিয়ে মাঠে আসেন আমরা তাকে প্রতিহত করব। তবে পাকিস্তানসহ অন্য বিদেশি নাগরিকদের আমরা কিছু বলিনি। যারা এ দেশের মাটিতে খেয়ে-পরে, এ দেশের আলো-বাতাসে বড় হয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন করছেন, আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম তাদের প্রতিহত করব। তার প্রভাবও কিন্তু আপনারা দেখেছেন। মাঠের বাইরে ও মাঠের মধ্যেও চুপিসারে পাকিস্তানি পতাকা ও জার্সি নিয়ে গিয়েছিলেন সেই বাংলাদেশিদের কিন্তু আমরা প্রতিহত করেছি।

ধরে নিলাম, আপনাদের ঘোষণায় ভয় পেয়েছে কিন্তু এভাবে কি সমাধান হবে?

পাকিস্তানি চিহ্নকে যদি আমরা চোখের সামনে থেকে সরাতে পারি, একসময় তাদের মন থেকেও সরাতে পারব। তারা একসময় বাংলাদেশের ইতিহাস জানবে, বুঝতে শিখবে। আমার ধারণা, আসলে তাদের মধ্যে ইতিহাসের শিক্ষার অভাব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে, ইতিহাসের চর্চা বাড়াতে হবে, যাতে আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা জানতে পারে।

গতকাল আমরা যখন ঘোষণা দিয়ে স্টেডিয়ামে এসেছি, কিন্তু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শুরুতে আমাদের সঙ্গে যুক্ত করিনি। স্টেডিয়ামের বাইরে মিরপুরের অনেক স্কুল ও কলেজ পড়ুয়াদের আমরা সমর্থন পেয়েছি। তাদের মধ্যে ইতিহাসের শিক্ষা ছিল বলেই তারা এসেছে। আমরা তাদের কোনো কিছু করতে বলিনি। তারপরও কিন্তু তারা আমাদের সমর্থন করতে এসেছে। এদের হাতেই তো আমরা আমাদের পতাকা দিয়ে আমরা সার্বভৌম বাংলাদেশ নিশ্চিত করব।

আপনারা যেভাবে পাসপোর্ট পরীক্ষা করেছেন, সেটা কি আপনারা পারেন? পুরো ঘটনায় তো বিশৃঙ্খলাও হতে পারত! ঝুঁকি হয়ে গেল না?

আমরা কোনো পাকিস্তানি নাগরিকের পাসপোর্ট পরীক্ষার কর্মসূচি দিইনি। কোনো পাকিস্তানি নাগরিকের পাসপোর্ট পরীক্ষাও করিনি। কোনো পাকিস্তানি নাগরিকের সঙ্গে আমরা দ্বন্দ্বেও জড়াইনি। তবে কিছু বাংলাদেশি স্টেডিয়ামে গিয়ে নিজেদের পাকিস্তানি বলে পরিচয় দিয়েছেন। তারা বলতে চেয়েছেন, তারা পাকিস্তানের সমর্থক। এমন সন্দেহভাজন বাঙালিদের কয়েকজনকে আমরা পরীক্ষা করেছি। এর মধ্যে দুই-একজন পাকিস্তানি নাগরিক ঢুকে গেছেন, যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

আমাদের পরিকল্পনাই ছিল শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি করতে হবে। কোনো বিশৃঙ্খলার পরিকল্পনা আমাদের ছিল না।

আপনারা যাদের স্টেডিয়ামে পেয়েছেন, তারা আসলে কারা? তাদের কারও পরিচয় পেয়েছেন কি? কারণ অনেকে বলার চেষ্টা করছেন তারা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের উত্তরসূরি তাদের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলে কী মনে হয়েছে?

তারা তো পরিষ্কার বাংলা ভাষায় কথা বলছেন। তাদের কাছে যখন জানতে চাইলাম, আপনি বাঙালি, বিহারি না পাকিস্তানি, তখন তারা বলেছেন, বাঙালি ও বাংলাদেশি। তাদের বাড়ি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। তারা ঢাকায় চাকরি করেন। এমনটা নয় যে তারা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ছেলেমেয়ে কিংবা নাতিপুতি।

আপনি বলছেন, কয়েকজন আপনাকে বলেছেন তারা বাঙালি কিন্তু তাহলে তারা কেন এমনটা করেছেন, কাউকে কি জিজ্ঞেস করেছেন?

তারা বলার চেষ্টা করছেন খেলা। যেকোনো দলকে তো ভালো লাগতেই পারে। তবে কেউ কিন্তু এটা বলেনি যে, বাংলাদেশ খারাপ খেলছে বলে তারা প্রতিবাদস্বরূপ এমনটা করেছেন।

আপনাদের কর্মসূচি কি এখানেই শেষ, নাকি অব্যাহত থাকবে?

হ্যাঁ। ভবিষ্যতেও আমরা এ কর্মসূচি অব্যাহত রাখব। পাকিস্তানের সঙ্গে টেস্ট সিরিজেও এটা চলমান থাকবে।

পাকিস্তানে যদি বাংলাদেশের খেলা হতো এবং পাকিস্তানের নাগরিকরা যদি বাংলাদেশকে সমর্থন করতেন, তাহলে কী হতো বলে আপনার ধারণা?

পাকিস্তানে যখন বাংলাদেশের খেলা হয়, পাকিস্তানের কোনো মানুষ বাংলাদেশকে সমর্থন করেন না। কিন্তু পাকিস্তানে বাংলাদেশের সমর্থক আছেন, একই ঘটনা ভারতেও। ভারতেও বাংলাদেশি সমর্থক আছেন, বাংলাদেশ-পাকিস্তান খেলা হলে ভারতের অনেক মানুষ বাংলাদেশের সমর্থন করেন। কিন্তু নিজ দেশের খেলা হলে কিন্তু করেন না। একমাত্র বাংলাদেশেই দেখা যায় নিজের দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য দেশকে সমর্থন করা।

আমি মনে করি এটা কখনোই ঐচ্ছিক কোনো বিষয় হতে পারে না। কারণ, আমার নিজের বাবাকে যদি খারাপ লাগে, তাহলে তো আমি আমার পাশের বাসার চাচাকে বাবা ডাকব না।

পাকিস্তানে পাঞ্জাব ছাড়া অনেকগুলো প্রদেশ স্বাধীনতা চায়, কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের খেলা হলে আমার ধারণা তারা পাকিস্তানকেই সমর্থন করবে। তাছাড়া এমনিতে পাকিস্তান সরকারও তাদের দেশের সঙ্গে খেলায় অন্য দেশকে সমর্থন করবে, এটা মেনে নেবে না।

কয়েক দিন আগে আমরা দেখেছি, পাকিস্তানের এক দর্শক ভারতের ক্রিকেটার বিরাট কোহলির ভক্ত। এটা তিনি জানান দেয়ায় তার জেল হয়েছে।

তবে আমরা এটাও দেখেছি, পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়ার এক ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কয়েকজন পাকিস্তানের পরাজয়ে উল্লাস করেছেন। সেটার সঙ্গে তো আমাদের এটাকে মেলালে হবে না। বেলুচিস্তান স্বাধীনতার আন্দোলন করছে। তারা পাকিস্তানকে ঘৃণা করে।

আরও পড়ুন:
সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা, তবে বাসে উঠলেই ১৫
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিক, আমলাদের দায় নেই’
ভাড়া বেশি নিলে বাস ডাম্পিং
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ

শেয়ার করুন