ফ্লাডলাইট বন্ধ দেড় যুগ, মাসে বিল দেড় লাখ টাকা

ফ্লাডলাইট বন্ধ দেড় যুগ, মাসে বিল দেড় লাখ টাকা

রাজশাহীর দুটি স্টেডিয়ামে বছরের পর বছর ফ্লাডলাইট বন্ধ। ছবি: নিউজবাংলা

নেসকো কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজশাহী জেলা ও বিভাগীয় স্টেডিয়ামের লাইন সাপ্লাই দেয়া হয়েছে কোম্পানির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩ থেকে। সেখান থেকে জেলা স্টেডিয়ামকে ৪০০ কিলোওয়াট ও বিভাগীয় স্টেডিয়ামকে ১০০০ কিলোওয়াট লোড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ জন্য নির্ধারিত বাড়তি বিল দিতে হয় তাদের।

রাজশাহী জেলা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়াম ও শহীদ কামারুজ্জামান বিভাগীয় স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট দেড় যুগ ধরে বন্ধ। তবে প্রতি মাসে এই দুই স্টেডিয়ামকে গুনতে হচ্ছে দেড় লাখ টাকার মতো বিল। বাড়তি লোড নিয়ে রাখার কারণে বাতি না জ্বললেও বড় অঙ্কের বিল হচ্ছে বলে জানায় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।

নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) তথ্য মতে, প্রতি মাসে দুই স্টেডিয়ামের বিল আসে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতিবছর শোধ করতে হয় ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

নেসকো কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজশাহী জেলা ও বিভাগীয় স্টেডিয়ামের লাইন সাপ্লাই দেয়া হয়েছে কোম্পানির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩ থেকে। সেখান থেকে জেলা স্টেডিয়ামকে ৪০০ কিলোওয়াট ও বিভাগীয় স্টেডিয়ামকে ১০০০ কিলোওয়াট লোড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ জন্য নির্ধারিত বাড়তি বিল দিতে হয় তাদের।

শহীদ কামারুজ্জামান বিভাগীয় স্টেডিয়ামে ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসের পর আর ফ্লাডলাইট জ্বলেনি। অথচ এই সাড়ে ১৭ বছরে এ বাবদ বাড়তি বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়েছে।

ফ্লাডলাইট বন্ধ দেড় যুগ, মাসে বিল দেড় লাখ টাকা

রাজশাহী জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার তথ্য মতে, ২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব ১৯ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভেন্যু ছিল বিভাগীয় স্টেডিয়াম। তখন প্রয়োজন পড়ায় ফ্লাডলাইট বসানো হয়। সে বছরের ৫ মার্চ খেলা শেষ হওয়ার পর থেকে আর জ্বলেনি ফ্লাডলাইটগুলো।

জেলা স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইট বসানো হয় ২০০০ সালের আগেই। তবে এর নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ওহাদেন্নবী অনু। তিনি জানান, এই স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটের একটি ৬ থেকে ৭ বছর আগে ঝড়ে ভেঙে পড়ার পর আর মেরামতও করা হয়নি।

নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (অতি:) শরিফুল আওলাদ বলেন, ‘জেলা স্টেডিয়াম ৪০০ কিলোওয়াট ও বিভাগীয় স্টেডিয়াম ১০০০ কিলোওয়াট লোড নিয়ে রেখেছে। বিভাগীয় স্টেডিয়ামে এই লোডের জন্য প্রতি মাসের মিনিমাম মিটার চার্জ এক লাখ টাকা। এ ছাড়া জেলা স্টেডিয়ামে ৪০ হাজার টাকা প্রতি মাসে বিল আসে।

‘লোড নিয়ে রাখার কারণেই প্রতি মাসে তাদের এই বিল দিতে হচ্ছে। ব্যবহার না করলেও তাদের এই বিল দিতে হবে। ব্যবহার করলে বিলের পরিমাণ বাড়বে। এখন পর্যন্ত তারা এই আনুপাতিক হারে বিল দিয়ে যাচ্ছে।’

এ বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক (চলতি দায়িত্বে) নাসির উল্লাহ্ বলেন, ‘আমাদের ফ্লাডলাইট বন্ধ আছে। এটি ক্রিকেট বোর্ডের আন্ডারে। তাদের দিয়ে দেয়া হয়েছে। বিলও তারাই পরিশোধ করে। এক সময় বিল ২২-২৩ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে ছিল। তবে ক্রিকেট বোর্ড পুরোটা পরিশোধ করে দিয়েছে।’

ফ্লাডলাইট বন্ধ দেড় যুগ, মাসে বিল দেড় লাখ টাকা

তিনি বলেন, ‘আমরা বোর্ডকে বলেছিলাম প্রয়োজন না হলে ফ্লাডলাইটের লাইন যেন কেটে দেয়, কিন্তু তারা কাটেনি। হয়তো আইসিসির কাছে এখানকার ফ্লাডলাইটের প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য দেয়া আছে। এ জন্যই বোর্ড আপাতত বন্ধ করতে চাচ্ছে না।

‘যেকোনো সময় আন্তর্জাতিকমানের খেলা শুরু হলে আবার ফ্লাডলাইট চালু হয়ে যাবে। এভাবেই চট্টগ্রাম ও সিলেটে চালু হয়েছে।’

ফ্লাডলাইটগুলো সচল আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে জ্বালানো হয়। ৩-৪টার তার কাটা আছে। আসল কথা হলো এই লাইটগুলো এখন চলে না। এখন এলইডি লাইট হয়ে গেছে। এখান থেকে কিছু লাইট নিয়ে চট্টগ্রামেরটা রেডি করেছে। ক্রিকেট বোর্ড এটাকে ভেন্যু করলেই এটি সচল হয়ে যাবে।’

রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ওহাদেন্নবী অনু বলেন, ‘স্টেডিয়ামের একটি ফ্লাডলাইট ৬-৭ বছর আগে ঝড়ে ভেঙে পড়েছিল। পরে চট্টগ্রামে লাইটের সমস্যা হলে ৫-৬ বছর আগে এখন থেকে ওই লাইটগুলো খুলে নিয়ে যায়। একটি ফ্লাডলাইটের স্থাপনায় ফাটলও ধরেছে।’

বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এনএসসি থেকেই এটি পরিচালিত হয়। তাদের কাছে আমরা লোড কমানোর জন্য চিঠি দিয়েছি। যেহেতু প্রয়োজন হচ্ছে না। তাই লোড ক্যাপাসিটি ১০০ কিলোওয়াটে নামিয়ে দেয়ার জন্য বলেছি। আমাদের জেলা ক্রীড়া সংস্থার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সবশেষ দুই মাস আগে আমরা চিঠি দিয়েছি। নষ্টটি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত লোড কমানোর জন্য।

‘জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয় খুব কম। আশা করছি, খুব দ্রুতই বিল কমানোর বিষয়টি সমাধান হবে।’

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মুরাদকে সমালোচনার ভাষাতেও ‘অশালীনতার’ ছড়াছড়ি

মুরাদকে সমালোচনার ভাষাতেও ‘অশালীনতার’ ছড়াছড়ি

মুরাদের আচরণের সমালোচনাকারীদের অনেকেই ব্যবহার করেছেন অশ্লীল ও কুরুচিকর শব্দ। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা

মুরাদ হাসানের আচরণের সমালোচনাকারীদের বেশির ভাগই ব্যবহার করেছেন অশ্লীল ও কুরুচিকর শব্দ-বাক্য। কেউ কেউ মুরাদের ‘জন্ম পরিচয়’ নিয়ে কথা বলেছেন। তার মাথায় চুল না থাকা নিয়ে করেছেন কটাক্ষ। তির্যক মন্তব্যের সঙ্গে অকথ্য গালিগালাজও করেছেন অনেকে।

নারীর প্রতি অবমাননাকর ও বর্ণবাদী মন্তব্য এবং অশালীন ফোনালাপের জেরে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন ডা. মুরাদ হাসান। তার আচরণের তীব্র সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ফেসবুকে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর বিভিন্ন পোস্টে কমেন্ট করেও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন নেটিজেনরা।

তবে সেসব কমেন্ট ঘেঁটে দেখা গেছে, মুরাদের আচরণের সমালোচনাকারীদের বেশির ভাগই ব্যবহার করেছেন অশ্লীল ও কুরুচিকর শব্দ ও বাক্য।

কেউ কেউ মুরাদ হাসানের ‘জন্ম পরিচয়’ নিয়ে কথা বলেছেন। তার মাথায় চুল না থাকা নিয়ে করেছেন কটাক্ষ। তির্যক মন্তব্যের সঙ্গে অকথ্য গালাগালাজও করেছেন অনেকে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর মঙ্গলবার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন মুরাদ হাসান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে পদত্যাগপত্রটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠান। রাতেই সেটি গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

মুরাদ হাসান মঙ্গলবার পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে, নিজের ভুলের জন্য ‘মা-বোনদের কাছে’ ক্ষমা চান।

নিজের ভেরিফায়েড পেজে তিনি লিখেন, ‘আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি অথবা আমার কথায় মা-বোনদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মমতাময়ী মা দেশরত্ন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সকল সিদ্ধান্ত মেনে নেব আজীবন।’

সেই স্ট্যাটাসে বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত রিঅ্যাক্ট করেছেন ১ লাখ ৭১ হাজার মানুষ। যাদের মধ্যে ‘হাহা’ রিঅ্যাক্ট করেছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার। স্ট্যাটাসে কমেন্ট পড়েছে ৬৬ হাজার।

নারীর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্যের কারণে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে মুরাদকে। তবে তাকে সমালোচনা করতে গিয়েও নারীবাচক আপত্তিকর অসংখ্য শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী। সম্পাদকীয় নীতির অংশ হিসেবে অশালীন এসব কমেন্টের নমুনা নিউজবাংলা প্রকাশ করছে না।

তবে কমেন্টকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই কোনো সাড়া দেননি। কয়েকজন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন। আর কারও দাবি, তাদের অবস্থান ‘সঠিক’।

অস্ট্রিক ঋষি নামের এক সংস্কৃতিকর্মীর কমেন্টে রয়েছে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। আপত্তিকর আচরণের সমালোচনা করতে গিয়ে পাল্টা অশালীন মন্তব্যের কারণ জানতে চাইলে অস্ট্রিক ঋষি দাবি করেন, খারাপ লোকের সঙ্গে আরও খারাপ আচরণ করাই যথার্থ।

তিনি বলেন, ‘যাই হোক আজাইরা প্যাঁচাল পাড়তে আর ভাল্লাগছে না। যা লেখার সেইটা মন দিয়া লেখেন। বেস্ট অব লাক।’

আলোচিত ইউটিউবার তাহসিন্যাশন তার ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকেও করেছেন অশ্লীল কমেন্ট। তার এই কমেন্টে আবার হাহা রিঅ্যাক্ট করেছেন ১৪ হাজার মানুষ।

এ ধরনের হাজার হাজার কুরুচিপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক কমেন্টের মধ্য দিয়ে মুরাদ হাসানের অশ্লীল শব্দ প্রয়োগের জবাব দিচ্ছেন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।

কোনো ব্যক্তির বিতর্কিত আচরণের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পাল্টা অশালীন শব্দ ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে সমালোচনাকারীদেরও একই মানসিকতার প্রকাশ ঘটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান যে ভাষায় কথা বলেছেন তা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অবমানকর। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার এমন মন্তব্যের নিন্দা জানাই। কিন্তু তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে তাও গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি বলেন, “আমি যখন তাকে বলব- ‘টাকলা মুরাদ’ তখনই তাকে বডি শেমিং করা হবে। এটা আমি করতে পারি না।”

ড. আমানুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের দেশে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম বলতে কিছু নেই। ডা. মুরাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কিছু মানুষ অতি উৎসাহের কারণে তার (মুরাদ) যে ব্যক্তিগত কিছু অধিকার আছে তাও ভুলে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের দেশে ডিজিটাল সিটিজেনশিপ সম্পর্কে জানার অভাব।’

মুরাদ হাসানের মন্তব্যের প্রতিবাদ অবশ্যই হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘কিন্তু প্রতিবাদ করতে গিয়ে যেন তাকে ব্যক্তিগতভাবে অশালীন আক্রমণ করা না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, ’এখন অনেকে যে ভাষায় পদত্যাগ করা প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের সমালোচনা করছেন, সেটাও এক ধরনের অপরাধ। কারণ, সমালোচনা করার একটা ভাষা আছে, ব্যাকরণ আছে, তারও একটি শিষ্টাচার আছে।’

আলোচনা-সমালোচনায় কোনো বাধা নেই বলে মনে করেন এই শিক্ষক। তবে সেটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে হওয়া উচিত বলে তার মত।

তিনি বলেন, ‘সমালোচনা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তার জন্য তার পদ ছাড়তে হয়েছে। এখন যারা একইভাবে সমালোচনা করছেন তাদেরও আইনের আওতায় আনার সুযোগ আছে।’

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক, আদর্শিক, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মানুষের অবস্থান, অধিকার, আত্মমর্যাদা, কোন কথা বলা উচিত, কোন কথা বলা উচিত না, সেই বলার ভাষাটা কেমন হবে, ধরন কেমন হবে- এগুলোর ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, আমাদের এক ধরনের সামাজিক, আদর্শিক, নৈতিক শিক্ষা প্রয়োজন।

‘সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে আমরা দেখতে পাচ্ছি এই শিক্ষাটার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এই ঘাটতির কারণেই আমরা বুঝতে পারি না, আমরা কোন অবস্থানে আছি, সেখান থেকে কীভাবে কথা বলতে হয়।’

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন

মালদ্বীপে ‘সুদিনের অপেক্ষায়’ বাংলাদেশি কর্মীরা

মালদ্বীপে ‘সুদিনের অপেক্ষায়’ বাংলাদেশি কর্মীরা

মালদ্বীপে কাজ করা বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় এক লাখ। ছবি: আশিক হোসেন/নিউজবাংলা

মালদ্বীপে বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য বলছে, দেশটিতে কাজ করা বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় এক লাখ। অথচ সরকারি হিসাবে দেশটির জনসংখ্যাই হলো পাঁচ লাখ। অর্থাৎ দেশটিতে প্রতি পাঁচজনে একজন বাংলাদেশি বাস করছেন।

মালদ্বীপের রাজধানী মালের সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত একমাত্র দ্বীপ হুলুমালে। দ্বীপটির রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে বা যেকোনো দোকানে পণ্যের দাম জানতে গিয়ে যদি কানে বাংলা ভেসে আসে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। শুধু হুলুমালে নয়, মালেসহ মালদ্বীপের যেকোনো দ্বীপেই দেখা মিলবে বাংলাদেশি কর্মীদের।

দেশটির অবকাঠামো, পর্যটন, মৎস্যশিল্পসহ সব খাতেই কাজ করছেন বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য বলছে, দেশটিতে কাজ করা বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় এক লাখ। অথচ সরকারি হিসাবে দেশটির জনসংখ্যাই হলো পাঁচ লাখ। অর্থাৎ দেশটিতে প্রতি পাঁচজনে একজন বাংলাদেশি বাস করছেন।

মালদ্বীপে কাজ করা বাংলাদেশিদের অভিযোগ, দেশটিতে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি হলেও বাংলাদেশ সরকার শ্রমবাজার সম্প্রসারণে যথেষ্ট তৎপর নয়। এ ছাড়া বাংলাদেশি কর্মীদের মজুরি বাড়াতেও তৎপর নয় বাংলাদেশ দূতাবাস।

মালদ্বীপে ‘সুদিনের অপেক্ষায়’ বাংলাদেশি কর্মীরা

হুলুমালের নিরোলহু মাগু এলাকার গেস্ট হাউস সি এরিনার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন কুমিল্লার মো. রিয়াদ। তিনি জানান, প্রায় চার বছর ধরে দেশটিতে আছেন তিনি।

মালদ্বীপে কাজের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে রিয়াদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানকার মানুষ খুব ভালো মানসিকতার। মধ্যপ্রাচ্যের মতো এখানে বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় কম। এখানে প্রচুর বাংলাদেশি কাজ করছেন, সামনে আরও কাজের সুযোগ বাড়বে। ‘কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে, মালদ্বীপ অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি দেশ। সে হিসেবে কর্মীরা যে বেতন পান তা অত্যন্ত কম।’

বাংলাদেশিদের গড় বেতন কত- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিরা এখানে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার করে পান। পাশাপাশি থাকা ও খাওয়ার জন্য সামান্য ভাতা। এ কারণে একটি ঘরে অনেককে গাদাগাদি করে থাকতে হয়।’

মালদ্বীপে ‘সুদিনের অপেক্ষায়’ বাংলাদেশি কর্মীরা

হুলুমালের একই এলাকার বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিনের অভিজ্ঞতাও একই। তিনি মালদ্বীপে আছেন প্রায় ১২ বছর।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অন্য দেশ থেকে যারা আসেন যেমন ভারত বা শ্রীলঙ্কা, তাদের বেতনের বিষয়টি ওই দেশগুলোর দূতাবাস আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দূতাবাস কোনো উদ্যোগ নিলে আমরা আরও ভালো অবস্থানে থাকতাম। এ বিষয়টিতে আমাদের সরকারের নজর দেয়া উচিত।’

মালদ্বীপে প্রবাসীরা কীভাবে থাকেন তা কিছুটা আন্দাজ করা যায় নিরোলহু মাগুর দোকান কর্মচারী আফতাবের কথা থেকে। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশিরা এখানে মূলত গেস্টহাউসগুলোতে থাকেন। একটি কক্ষে দেখা যায় ১২ থেকে ১৬ জন পর্যন্ত থাকেন।

‘আমি যেখানে থাকি, সেখানে এক কক্ষে ১৬ জন আছেন। মাস শেষে আমাদের ভাড়া আসে প্রায় ৫০ হাজার রুপিয়া (এক রুপিয়া সমান ৫ টাকা)। এটিই এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা।’

মালদ্বীপে ‘সুদিনের অপেক্ষায়’ বাংলাদেশি কর্মীরা

ভারত মহাসাগরের নীল পানিবেষ্টিত ছোট দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। প্রায় ১২০০ ছোট-বড় দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এ দেশ। স্থলভাগ মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটার আর সমুদ্রসীমা ধরলে আয়তন প্রায় ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার।

দেশটিতে সাধারণত দুই ধরনের দ্বীপ দেখা যায়। এর মধ্যে এক ধরনের দ্বীপকে বলা হয় লোকাল আইল্যান্ড, যেখানে স্থানীয়রা বসবাস করেন। আর পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত দ্বীপগুলো রিসোর্ট আইল্যান্ড নামে পরিচিত। দুই ধরনের দ্বীপেই আছেন বাংলাদেশি কর্মীরা।

দেশটিতে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে মালদ্বীপে আরও কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে কাজ করছেন তারা।

মালদ্বীপে ‘সুদিনের অপেক্ষায়’ বাংলাদেশি কর্মীরা

মালদ্বীপে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মালদ্বীপে সব মিলিয়ে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ। এদের মধ্যে ৫০ হাজারই এখন অনিয়মিত। তারা এখানে কাজ করলেও ওয়ার্ক পারমিট নেই।

‘অন্য দিকে ২০১৯ সালে মালদ্বীপ সরকার একটি সিদ্ধান্ত নেয়। সেটি ছিল তারা এক বছর বাংলাদেশ থেকে কোনো কর্মী নেবে না। এক বছর পার হয়ে গেলে এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা, তবে আমরা জানতে পারছি, তারা নতুন করে বাংলাদেশ থেকে কাউকে এখানে ওয়ার্ক পারমিট দিচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে দেশটির সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা কথা বলছি। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীও তুলেছিলেন।’

বাংলাদেশের হাইকমিশনার বলেন, ‘শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মালদ্বীপ সফরের কথা রয়েছে। সফরের সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটি হয়তো দুই-এক মাসের মধ্যেই হবে। সেই সফরে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যখন নানা ইস্যুতে কথা উঠবে, এটি নিয়েও কথা হবে। শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক থেকে একটি সুখবর আসবে বলে আমরা আশা করছি।’

মালদ্বীপে বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে যে বাংলাদেশিরা আছেন তারা দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এটা মালদ্বীপ সরকারও স্বীকার করে। তাদের অবকাঠামো, ফিসিং, পর্যটনসহ সব খাতেই বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করছেন।

‘অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা এখানে যেসব কাজ করেন, সেটা অন্য দেশের কর্মীরা করতে চান না। মালদ্বীপে সামনে অবকাঠামো খাতে অনেক প্রকল্প শুরু হবে। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের বিকল্প নেই। কোভিডের পর এখন নতুন করে মালদ্বীপের পর্যটন খাত খুলতে শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রেও তাদের অনেক বিদেশি কর্মী লাগবে, যার ভালো জোগান আসতে পারে বাংলাদেশ থেকে।’

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন

গ্যাস ও আগুনে নারায়ণগঞ্জে দুই বছরে ১১৮ মৃত্যু

গ্যাস ও আগুনে নারায়ণগঞ্জে দুই বছরে ১১৮ মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গত ১২ নভেম্বর একটি বাড়ির নিচতলায় গ্যাস বিস্ফোরণে চারজনের মৃত্যু হয়। ছবি: নিউজবাংলা

ফায়ার সার্ভিস বলছে, ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা বন্ধ থাকা অবস্থায় লিকেজ থেকে ঘরে গ্যাস জমে গেলেই বিপদ। কারণ এ সময় বৈদ্যুতিক সুইচ অথবা চুলা জ্বালানো হলেও বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটবে। সেখানে থাকা মানুষ মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই দগ্ধ হয়ে যাবে।

একের পর এক গ্যাস বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দাদের জন্য। এ ধরনের ঘটনায় ওই জেলায় দুই বছরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১৮ জন। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন শতাধিক মানুষ।

বেশির ভাগ ঘটনাতেই থানায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও এগুলোর যথাযথ তদন্ত হয়নি। ফলে এত মৃত্যুর পরও দায়ীদের চিহ্নিত করার কোনো উদ্যোগ নেই। এতে এ ধরনের দুর্ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলছে।

চলতি বছর এই জেলায় ১১৭টি দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দগ্ধ ও আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে আরও অর্ধশত মানুষকে। ২০২০ সালেও একই রকম ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৪ জন।

এসব তথ্য ফায়ার সার্ভিসের তালিকায় উল্লেখ থাকলেও দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া অনেকের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিন।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘বাসাবাড়িতে গ্যাস পাইপ লিক করে বিস্ফোরণের অধিকাংশ কারণ অসচেতনতা ও অবহেলা। দেখা যায়, অনেকে বাড়ির লাইনে লিকেজের কথা জেনেও তা মেরামত করেন না। দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় তিতাস গ্যাসের পাইপগুলোতে প্রায়ই লিকেজ হয়ে যায়।’

তিনি জানান, ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা বন্ধ অবস্থায় তিতাসের গ্যাসলাইন বা গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ লিক হয়ে রুমে গ্যাস জমে গেলেই বিপদ। কারণ এ সময় বৈদ্যুতিক সুইচ কিংবা চুলা জ্বালানো হলেও বিস্ফোরণ ঘটে আগুন ছড়িয়ে যাবে এবং মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই সেখানে থাকা মানুষ দগ্ধ হবেন।

ফায়ার সার্ভিসের তালিকায় আছে, ২০২১ সালের ৩১ সেপেম্বর পর্যন্ত রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ১৮টি ঘটনা ছাড়াও তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে ৭১টি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বয়লার বিস্ফোরণ ও বৈদ্যুতিক কারণে আরও ২৩টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া নভেম্বরের শুরু থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ৫টি ঘটনা মিলে মোট ১১৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এ বছর।

এসব ঘটনায় অন্তত ৭৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।

এর মধ্যে গত ৬ ডিসেম্বর ভোরে আড়াইহাজারের কুমারপাড়া গ্রামের একটি বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার লিক করে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে দুই শিশুসহ এক পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে সোলাইমান নামের একজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার এক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বিলাসনগর এলাকায় একটি ছয়তলা ভবনে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হন চারজন।

গ্যাস ও আগুনে নারায়ণগঞ্জে দুই বছরে ১১৮ মৃত্যু
৫ ডিসেম্বর ফতুল্লার বিলাসনগর এলাকায় একটি ছয়তলা ভবনে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হন চারজন

গত ২৫ নভেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জের আদনান টাওয়ারের চতুর্থ তলায় গ্যাসের পাইপ লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটলে পারভেজ ও মামুন নামে দুই পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার চার দিন আগে রূপগঞ্জে সিটি অটো রাইস মিলে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ ২ শ্রমিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

১২ নভেম্বর ফতুল্লার পূর্ব শেয়াচরের লালখা এলাকায় একটি ৫ তলা বাড়ির নিচ তলায় গ্যাস পাইপের লিকেজ থেকে জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণে মায়া রানী দাস, মঙ্গলী রানী দাস, ঝুমা রানী ও তুলসী রানী নামে চার নারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

৯ মার্চ রাতে ফতুল্লার মাসদাইরের পতেঙ্গা এলাকায় ছয়তলা ভবনের ষষ্ঠতলার একটি ফ্ল্যাটে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৬ জন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পোশাক শ্রমিক মো. মিশাল, শিশুপুত্র মিনহাজ, চাচাতো ভাই মাহফুজ ও স্কুলছাত্র সাব্বির হোসেনের মৃত্যু হয়।

শহরের আমলাপাড়ায় গ্রিন জিএম গার্ডেন নামের একটি ভবনের আটতলায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটলে দগ্ধ দুজনের মধ্যে চিকিৎসাধীন একজন মারা যান।

গ্যাস ও আগুনে নারায়ণগঞ্জে দুই বছরে ১১৮ মৃত্যু

এর আগে শহরের পশ্চিম তল্লা এলাকায় তিনতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে লিকেজ থেকে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে শিশুসহ দুটি পরিবারের ১১ জন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে হাবিবুর রহমান ও তার স্ত্রী আলেয়া বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

৭ জানুয়ারি ফতুল্লার বিলাসনগরে একটি দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে রফিক উল্লাহ নামের এক মিস্ত্রি মারা যান। আড়াইহাজারে একটি রেস্তোরাঁয় গ্যাসের লাইনে বিস্ফোরণে তিনজন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন ১ জনের মৃত্যু হয়।

বন্দরের লক্ষণখোলা এলাকায় একটি তুলার গোডাউনে আগুন লাগলে আমেনা বেগম নামের এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

২৩ জুন ফতুল্লায় একটি ডাইং কারখানার বয়লার বিস্ফোরণে শরীফ মিয়া নামের এক শ্রমিক মারা যান। তা ছাড়া বন্দরে রান্না ঘরের গ্যাসের আগুনে ৫ জন দগ্ধ হন। সোনারগাঁর নয়াবাড়ি এলাকায় একটি ডাইং কারখানায় গ্যাস রাইজারের আগুনে দগ্ধ হন আরও পাঁচজন। শহরের চাষাঢ়া বালুর মাঠ এলাকায় অ্যাপোলো নামের একটি ক্লিনিকে অক্সিজেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুজন ওয়ার্ড বয়ও দগ্ধ হয়েছেন।

গ্যাস ও আগুনে নারায়ণগঞ্জে দুই বছরে ১১৮ মৃত্যু
হাসেম ফুডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ৫৪ জন

তবে এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে রূপগঞ্জের হাসেম ফুডের কারখানার অগ্নিকাণ্ডে। ওই ঘটনায় নিহত ৫৪ জনের দেহাবশেষ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের ২০২০ সালের খাতায় দেখা গেছে, এ জেলায় গ্যাস থেকে ১০৬টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ওই সব অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দগ্ধ ও আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে অন্তত ২৬ জনকে।

এর মধ্যে তল্লায় মসজিদে এক বিস্ফোরণেই মৃত্যু হয় ৩৭ জনের। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভোরে সদর উপজেলার সাহেবপাড়া এলাকায় পাঁচতলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে লাইনের লিকেজ থেকে গ্যাস ছড়িয়ে বিস্ফোরণ ঘটলে একই পরিবারের ৮ জন দগ্ধ হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যু হয়। একই বছর রূপগঞ্জে একটি রড প্রস্তুতকারক কারখানায় গলিত লোহা বার্টি বিস্ফোরণে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও চারজন শ্রমিক দগ্ধ হন।

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন

মুরাদের এমপি পদের কী হবে?

মুরাদের এমপি পদের কী হবে?

মুরাদের বিষয়টিতে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দৃষ্টান্ত হতে পারে আওয়ামী লীগের আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে হজ নিয়ে তার করা মন্তব্য দেশে তুমুল প্রতিক্রিয়া তৈরি করলে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেন প্রধানমন্ত্রী। বহিষ্কার করা হয় দল থেকেও। কিন্তু সংসদে সদস্য পদ থেকে যায়। পরে তিনি নিজ থেকেই পদত্যাগ করেন।

প্রতিমন্ত্রীর পদ হারিয়েছেন, আওয়ামী লীগে দলীয় পদ যাওয়া এখন কেন্দ্রের ঘোষণার ব্যাপার। মুরাদ হাসানের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না-এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে।

তবে এ বিষয়ে সংবিধানে অস্পষ্টতা রয়েছে। আর দল বহিষ্কার করলে এখন পর্যন্ত কারও সদস্য পদ খারিজের উদাহরণও নেই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, দল তাকে সকল পদ থেকে বহিষ্কার করলে তার সংসদ সদস্য পদ চলেও যেতে পারে। তবে এই বিষয়টি স্পিকারের রুলিংয়ের ওপর নির্ভর করছে।

মঙ্গলবার মন্ত্রিত্ব হারানোর পর মুরাদকে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকেও বহিষ্কারের প্রস্তাব দলের কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক এরই মধ্যে নিশ্চিত করেছেন, তারা দলে রাখবেন না নারীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করা নেতাকে।

দল বহিষ্কার করলে সংসদ সদস্য পদ চলে যাবে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সেটা স্পিকারের বিষয়। এমপির বিষয়ে যদি গুরুতর কোনো অভিযোগ আসে তাহলে সেটা স্পিকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’

মুরাদের বিষয়টিতে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দৃষ্টান্ত হতে পারে আওয়ামী লীগের আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।

২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে হজ নিয়ে তার করা মন্তব্য দেশে তুমুল প্রতিক্রিয়া তৈরি করলে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেন প্রধানমন্ত্রী। বহিষ্কার করা হয় দল থেকেও। কিন্তু সংসদে সদস্য পদ থেকে যায়।

এ নিয়ে তখনও বিতর্ক ওই বছরের ১৩ জুলাই সে সময়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে চিঠি দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এতে লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ থাকা না থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়।

তবে ১ সেপ্টেম্বর সংসদে উপস্থিত হয়ে লতিফ সিদ্দিকী এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো এখতিয়ার থাকতে পারে না বলে মন্তব্য করে নিজেই পদত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেন। সেদিন তিনি বলেন, ‘আমার নেতার অভিপ্রায়, আমি যেন সংসদ সদস্য পদে না থাকি। কারো প্রতি কোনো ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করব না, অভিযোগও নয়। আমি জাতীয় সংসদ ১২৩, টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে পদত্যাগ করছি।’

নবম সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-২ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়ে জিতে আসা এম এ জব্বারকে বছর তিনেকের মাথায় দল থেকে বহিষ্কার করে দল। সে সময় দলের পক্ষ থেকে তার সংসদ সদস্য পদ খারিজের অনুরোধ করা হয় স্পিকারের কাছে। কিন্তু স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, তিনি যেহেতু দলের বিরুদ্ধে ভোট দেননি, তাই তার সদস্য পদ যাবে না। নবম সংসদের পুরো মেয়াদেই তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন।

মুরাদ হাসানের ক্ষেত্রে বিষয়টি কেমন হবে- জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেহেতু উনি দল থেকে মনোনীত সংসদ সদস্য, যদি দল উনাকে বহিষ্কার করে, এর পর দল থেকে স্পিকারকে জানানো হয় সে ক্ষেত্রে তার সংসদ সদস্য পদ না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য হিসেবে উনি আবেদন করতে পারবেন।‘

এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ মাহাবুব আরা বেগম গিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সংসদীয় প্রদ্ধতিতে কতগুলো ধারা আছে। সে অনুসারে সবকিছু হবে। তবে এই মুহূর্তে সব কিছু বলতে পারছি না।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তিনি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েছেন আওয়ামী লীগের লীগের প্রার্থী হিসেবে। যুক্তি হিসেবে বলা যায়, দল বহিষ্কার করলে তার এমপি পদ থাকে না। কারণ, তিনি তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে নাই। কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে যেটা বলা হয়েছে, তিনি যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন তাহলে তার পদ শূন্য হবে।’

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এ বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি যদি দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে।

১৯৯৮ সালে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিলে সংবিধান অনুসারে সংসদ সদস্য পদ হারান তৎকালীন সিরাজগঞ্জ-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব-উল-আলম জানান, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্যপদ খোয়ান বিএনপির আখতারুজ্জামান। তখন বিএনপি তাকে বহিষ্কার করে, পাশাপাশি স্পিকারকে চিঠি দিয়ে তার সদস্য পদ খারিজের অনুরোধ করে।

দলীয় সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে বিএনপি নেতা যান হাইকোর্টে। ওই মামলায় হাইকোর্ট বলেছিল, যেহেতু তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন এবং দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে গিয়েছেন, তাই তার সদস্য পদ বাতিল হবে।

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন

বর্ণবিদ্বেষ নিয়েও সচেতনতা চান বিশেষজ্ঞরা

বর্ণবিদ্বেষ নিয়েও সচেতনতা চান বিশেষজ্ঞরা

ছবি: সংগৃহীত

সমাজবিজ্ঞানী ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, নারীর মর্যাদা নিশ্চিতের পাশাপাশি বর্ণবাদ ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণামূলক আচরণ ও শব্দের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। বন্ধ করতে হবে ‘কালো তালিকা’ বা ‘কালো হাত’-এর মতো শব্দের প্রয়োগ।

নারীর প্রতি ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য করে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন ডা. মুরাদ হাসান। তার বিরুদ্ধে বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

গত ১ ডিসেম্বর রাতে ‘অসুস্থ খালেদা, বিকৃত বিএনপির নেতাকর্মী’ শিরোনামে এক ফেসবুক লাইভে যুক্ত হন মুরাদ হাসান। সেখানে বিএনপির রাজনীতি সমালোচনার একপর্যায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ও দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে তিনি বিভিন্ন অশালীন মন্তব্য করেন। এ সময় আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষমূলক মন্তব্যও ছিল মুরাদের কণ্ঠে।

সমাজবিজ্ঞানী ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, জেন্ডার সংবেদনশীলতার পাশাপাশি বর্ণবাদ ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণামূলক আচরণ ও শব্দ প্রয়োগের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহার না করার নীতি গ্রহণ করছে বিভিন্ন রাষ্ট্র। টেকজায়ান্ট প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলেও শব্দের বর্ণবাদী ব্যবহার নিয়ে সচেতন হতে হবে।

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সভিত্তিক সাইট ভাইসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বিতর্কিত স্পাইওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এনএসও-এর পণ্য বিক্রি ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ তালিকাভুক্ত করে। খবরটি প্রচারের সময় নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও সিএনএনের মতো সংবাদমাধ্যমে ব্যবহার করা হয় ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করার মতো বর্ণবাদী শব্দ। এই শব্দ ব্যবহারের সমালোচনা চলছে যুক্তরাষ্ট্রেই।

গুগলের প্রোডাক্ট সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির গ্লোবাল হেড ও অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে অধিকারমূলক সাইট শেয়ার দ্য মাইক ইন সাইবার ক্যামিলা স্টুয়ার্ট কারেন্ট ভাইসকে বলেন, ‘ব্ল্যাকলিস্ট' কালোকে খারাপের সঙ্গে এবং সাদাকে ভালোর সঙ্গে সম্পর্কিত করে। বর্ণবাদের শিকড় যে কত গভীরে সেটি এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ থেকে বোঝা যায়।’

তবে অনেক টেক জায়ান্ট ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা ‘হোয়াইটলিস্ট’-এর মতো শব্দের ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে। মাইক্রোসফটের এজ ও গুগলের ক্রোম ব্রাউজারের ওপেন সোর্স কোড ক্রোমিয়ামের ডেভেলপাররা ২০১৯ সালে ঘোষণা করেন, কালো=খারাপ এবং হোয়াইট=ভালো এমন ধারণাকেই জোরদার করে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ ও ‘হোয়াইটলিস্ট’। এ কারণে ডেভেলপাররা এখন ‘ব্লকলিস্ট’ ও ‘অ্যালাউলিস্ট’ শব্দ ব্যবহার করছেন। বিশ্বজুড়ে অন্যতম জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ পাইথন ২০১৮ সালে বর্ণবাদী শব্দগুলোর ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (এনসিএসসি) গত বছর এক ব্লগ পোস্টে জানায়, ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ ও ‘হোয়াইটলিস্ট’ পরিভাষাতে তীব্র বর্ণবাদ রয়েছে। এ ধরনের শব্দ মানসিকভাবে এমন ধারণা দেয় যাতে মনে হতে পারে, সাদা মানেই ভালো ও নিরাপদ; আর কালো মানে খারাপ, বিপজ্জনক ও নিষিদ্ধ। ‘ব্ল্যাকলিস্ট’-এর পরিবর্ত ‘ব্লকলিস্ট’ বা ‘ডিনাইলিস্ট’ শব্দ ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছে এনসিএসসি।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইএসটি) চলতি বছরের শুরুতে পরিভাষার নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করে। সেখানে ‘ব্ল্যাকলিস্ট/হোয়াইটলিস্ট’-এর মতো পক্ষপাতমূলক শব্দ ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

আরেক সংস্থা ইঞ্জিনিয়ারিং টাস্ক ফোর্স ২০১৮ সালে এক নথিতে উল্লেখ করে, ‘প্রভু-দাসের মতো, ভালো-মন্দ বোঝাতে সাদা-কালোর রূপক ব্যবহার আক্রমণাত্মক। প্রভু-দাসকে বর্ণবাদের গুরুতর উদাহরণ বলে মনে হলেও সাদা-কালো আরও খারাপ শব্দ; কারণ এ দুটি শব্দের প্রয়োগ অনেক বিস্তৃত।’

আন্তর্জাতিক পরিসরে বর্ণবিদ্বেষী শব্দ ও ভাষার প্রয়োগ বন্ধ হওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান, তবে বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে অসচেতনতার মাত্রা প্রকট বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের সংবাদমাধ্যমসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন জায়গায় ‘কালো তালিকা’ একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। অনিয়মে অভিযুক্ত বা প্রতিপক্ষের ‘কালো হাত’ ভেঙে দেয়ার দাবি তোলা হয় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মিছিলে। এমনকি বিতর্কিত ব্যক্তিকে ‘ইহুদি’র সঙ্গে তুলনা করাও একটি জনপ্রিয় স্লোগান।

সমালোচনার মুখে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হওয়া ডা. মুরাদ হাসান ‘খারাপ ব্যক্তির’ প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে এনেছেন আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীকে। তাদের তিনি ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ সম্বোধন করেন ফেসবুক লাইভে। এ ছাড়া উপহাসের ভঙ্গিতে ব্যবহার করেন ‘মক্ষীরানি’র মতো শব্দ।

বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত বর্ণবাদী শব্দ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতিমা রেজিনা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দীর্ঘ বছরের যে ইতিহাস রয়েছে, সেখানে সাদারা কালোদের নির্যাতন করেছে। এখনও আমরা সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি।’

তিনি বলেন, “‘কালো হাত ভেঙে দাও’ বা ‘কালো অধ্যায়’ না বলে ‘অশুভ হাত বা অধ্যায়’ এ রকম শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত শব্দ থেকে আমরা রাতারাতি উত্তরিত হতে পারব বলে আমি মনে করি না। সময় লাগবে। তারপরেও বিষয়টিকে যদি আমরা অভ্যাস হিসেবে নিতে পারি তাহলে হবে।”

ফেসবুক লাইভে মুরাদ হাসানের অসংবেদনশীল ও বর্ণবাদী শব্দ প্রয়োগে ভীষণ ক্ষুব্ধ আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উনি (মুরাদ) একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, জাইমা কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে থাকেন, এটার মানে কী? কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে থাকাটা কি অপরাধ? কৃষ্ণাঙ্গ বলতে উনি কী বুঝিয়েছেন? কৃষ্ণাঙ্গরা খুবই খারাপ? কৃষ্ণাঙ্গরা খুবই সেক্সিস্ট? ওদের সঙ্গে খারাপ মেয়েরা থাকে?

‘আমরা কিন্তু এখন কৃষ্ণাঙ্গ শব্দটাই ব্যবহার করি না। আমরা বলি আফ্রিকান-আমেরিকান। আমরা নিগ্রো বলি না। আমরা ব্ল্যাক বলার সময় চিন্তা করি, বলব কি না। কিন্তু উনি অবলীলায় বলে ফেললেন। এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক, হতাশাজনক।'

জিনাত আরা হক বলেন, “উনি (মুরাদ) ‘মক্ষীরানির’ মতো শব্দ বলেছেন। এ ধরনের কথা বলার মধ্য দিয়ে যে নারীরা প্রান্তিক, যে নারীরা অনেক বেশি বিপর্যস্ত, তাদের আরও বিপর্যস্ত করছেন। এই শব্দগুলো আসলে কারা বলে? যারা লেম্যান, যাদের জানাশোনা কম, সমাজে যারা প্রথাগত আচরণ করে তারা বলে।’'

বাংলা ভাষায় বর্ণবাদী বিভিন্ন শব্দ নিয়ে এই অধিকারকর্মী বলেন, ‘এর মূল কারণ হচ্ছে আমাদের ঔপনিবেশিক মন। আমরা জানতাম সাদা মানে ভালো, সুন্দর, প্রগ্রেসিভ ও ইতিবাচক।

‘গায়ের রং কেমন জিজ্ঞেস করলে আমরা উত্তরে বলতাম ময়লা। শ্যামলা বলতাম না। এগুলো মাথার মধ্যে গেঁথে গেছে। তবে আমরা এখন এই বর্ণবাদের বিষয়গুলো বুঝতে পারছি। এটা তো এক দিনে হবে না। আমাদের গবেষণা করে বর্ণবাদী শব্দ চিহ্নিত করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দূর করতে হবে।’

বর্ণবাদী মানসিকতা দূর করতে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার ওপরেও জোর দিচ্ছেন জিনাত আরা হক।

তিনি বলেন, “আপনি যখন কোনো মিডিয়া হাউসে কাজ করছেন, তখন আপনাকেই শব্দগুলো বদলাতে হবে। ‘কালো তালিকা’কে অন্যভাবে লিখতে হবে। আমরা যখন কাজ করি তখন বাবা-মার জায়গায় মা-বাবা বলি। বৈষম্য দূর করতে সচেতনভাবে এগুলো করতে হবে। দায়টা আমাদের সবার। সরকারের জায়গা থেকেও বর্ণবাদী শব্দগুলো পরিহার করতে হবে।”

কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে করছেন জিনাত। তিনি বলেন, “শিশু ও নারীবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি যখন বলল, ‘ধর্ষিতা’ বলা যাবে না, ‘ধর্ষণের শিকার’ বলতে হবে; এর মানে সরকার থেকেও প্রস্তাব আসছে। এখন যেমন ‘ব্যাটসম্যান’ না বলে বলা হচ্ছে ‘ব্যাটার’। এটা কিন্তু একটা দীর্ঘ আন্দোলনের ফল। এভাবে খুবই পরিকল্পনা মাফিক প্রচেষ্টাগুলো এগিয়ে নিতে হবে।

‘দীর্ঘদিন আমরা মহিলা বলতাম। তবে এখন আমরা নারীতে এসেছি।‘

অ্যাকাডেমিশিয়ান এবং মিডিয়া ও কমিউনিকেশন নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের নারী বা বর্ণবিদ্বেষী শব্দ নিয়ে কাজ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন জিনাত আরা হক।

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন

মুক্তিযুদ্ধে ৬ ডিসেম্বর ছিল মাইলফলক

মুক্তিযুদ্ধে ৬ ডিসেম্বর ছিল মাইলফলক

পশ্চিমবঙ্গের শিকারপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুশীলন। ছবি: সংগৃহীত

যখন মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল এবং একটি পর্যায়ক্রমিক অবস্থান তৈরি করল, সে সময় ভারত ওই অবস্থাতেই বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিল। এতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ন্যায্যতা পেল।

৬ ডিসেম্বরকে বাংলাদেশ ও ভারতের মৈত্রী দিবস হিসেবে পালন করছে ঢাকা ‍ও দিল্লি। কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিনটিকে পালনের সিদ্ধান্ত হয় চলতি বছরের মার্চে ভারতের নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়।

ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়াও আরও ১৮টি দেশ এই মৈত্রী দিবস পালন করবে। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বেলজিয়াম, কানাডা, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর টালমাটাল ছিল পরিস্থিতি। স্নায়ুযুদ্ধের সেই সময়ের সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তখন পাকিস্তানের পক্ষে।

অন্যদিকে ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন অবস্থান নেয় বাংলাদেশের পক্ষে। সম্প্রতি প্রকাশিত দলিলপত্রে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে মার্চের আগেই বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের আগমনের সংবাদ দেন তাদের কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার।

অন্যদিকে আগস্টের মাঝামাঝি বেইজিংয়ে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত খাজা মোহাম্মদ কায়সারকে ডেকে চীনের প্রেসিডেন্ট চৌ এন লাই সাফ জানিয়ে দেন, চীন পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না। এ সংবাদ জেনেভায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত পি কে হালদারকে জানিয়ে দেন সেখানে নিযুক্ত পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ কূটনীতিক ওয়ালিউর রহমান।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যতই যুদ্ধবিরতির দাবি তুলুক না কেন, দিল্লি ও মস্কোর দাবি ছিল আগে আত্মসমর্পণ, পরে যুদ্ধবিরতি।

মুক্তিযুদ্ধে ৬ ডিসেম্বর ছিল মাইলফলক
জাতিসংঘে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা চালিয়ে গেছে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধবিরতির। ছবি: সংগৃহীত

সেই সময় সম্পর্কে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার অপারেশন ভারতীয় হাইকমিশন বইয়ে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ নিয়ে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে একটা ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার চলছিল কয়েক মাস ধরে। ৩ ডিসেম্বর শুরু হয়ে যায় সরাসরি যুদ্ধ। ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতীয় স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন জাতিসংঘে একটি বিবৃতি দেন।

মুক্তিযুদ্ধে ৬ ডিসেম্বর ছিল মাইলফলক
৩ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ভারত। ছবি: সংগৃহীত

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সামরিক নির্যাতন ও গণহত্যার বিষয়টিকে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একদিন সত্যি সত্যিই স্বাধীন হবে…ভারত চেয়েছে বলেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবে না, যদিও ভারত তাকে সাহায্য দিয়ে যাবে।

‘১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল । আজ তিনি জেলে পচছেন। তার কী অবস্থা কেউ জানে না। কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু বলতে পারবে না—আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছি। পাকিস্তানের সৈন্যরা যে ভয়াবহ নৃশংসতা চালাচ্ছে, মানব ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, শিশুদের খুন করা হচ্ছে, নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। আপনারা এসব ঘটনার ছবি দেখেছেন, যা এসবের সাক্ষী। পাকিস্তানে একটা বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটছে বললে যথেষ্ট বলা হবে না। এ ব্যাপারে আমাদের সহানুভূতি থাকা এবং এসব ভুলে যাওয়া উচিত—এ রকম মনে করলে হবে না। এসব নৃশংসতা ঘটেছে এবং এক কোটি মানুষ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।’

এর দুই দিন পর ৬ ডিসেম্বর প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ভারত কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। ওই দিন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে একটি বিবৃতি দেন সমর সেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সরে যাওয়া উচিত। শেখ মুজিবুর রহমানকে অবশ্যই মুক্তি দিতে হবে। ২৫ মার্চের পর থেকেই তিনি জেলে পচে মরছেন। পাকিস্তানিদের উচিত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া। এ কাজগুলো এখনও করা সম্ভব। এখনও যথেষ্ট সময় আছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ পদক্ষেপগুলো নিতে পাকিস্তান সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে।’

ওই সময় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুধু বাংলাদেশ সীমান্তেই নয়, পশ্চিম সীমান্তেও ছড়িয়ে পড়েছিল। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার জন্য উভয় দেশের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ছিল। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি জর্জ বুশ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে একটি চিঠি দেন।

চিঠিতে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের একটি পক্ষ পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। কিন্তু অপর পক্ষ ভারত এখনও মেনে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদের কর্তব্য হলো জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকা।’

একই দিন সমর সেন জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টকে একটি চিঠি দেন। তিনি জর্জ বুশের বক্তব্যের ইঙ্গিত দিয়ে যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের পেছনে যে সূক্ষ্ম রাজনীতি কাজ করেছিল, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বিধিসম্মত মনে হলেও এর শিকার হতো বাংলাদেশ।

জাতিসংঘ মহাসচিবকে লেখা চিঠিতে সমর সেন বলেন, ‘যদি একটি রাষ্ট্রের ওপর ওই রাষ্ট্রের একটি অঞ্চলের জনগণের আস্থা না থাকে—যেটা বাংলাদেশের বেলায় হয়েছে, তাহলে একটা আলাদা রাষ্ট্রের জন্মের শর্ত তৈরি হয়ে যায়।

‘ভারত মনে করে, ঠিক এটাই ঘটছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ নামে নতুন একটি রাষ্ট্র তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। ভারত এই রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। নতুন এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্য না শুনে ভারতকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বলা কি বাস্তবসম্মত?’

গবেষক মঈদুল হাসান তার মূলধারা ’৭১ বইয়ে লিখেছেন, ৩ নভেম্বর পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত বেঞ্জামিন ওয়েলার্ট সীমান্ত অঞ্চল থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারে ভারতের অসম্মতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং অযাচিতভাবে ১৯৫৯ সালের পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “পাকিস্তান যেকোনো রাষ্ট্র কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার পর এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের অস্ত্র ও সৈন্যবল সহযোগে পাকিস্তানকে সাহায্য করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ।”’

ওয়েলার্টের বিবৃতিতে স্পষ্ট হুমকি দেয়া হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত এমন এক চুক্তি সই করে, যাতে দিল্লি আক্রান্ত হলে মস্কো মনে করবে তারা আক্রান্ত হয়েছে।

চীন আগেই পাকিস্তানকে বলেছিল, যুদ্ধে জড়াবে না

মুক্তিযুদ্ধের ওই সময়টাকে অন্যভাবে দেখেন তখনকার তরুণ কূটনীতিক ওয়ালিউর রহমান। জেনেভায় পাকিস্তানের স্থায়ী মিশনের এ কর্মকর্তা সেই সময়টা স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তান যখন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে তাদের সেনাদের লেলিয়ে দিল, তখন কেবল জেনোসাইডই ঘটল না, আরো দুটো ঘটনা ঘটল। মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। তখন থেকে আমরা হলাম পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ। আর সীমান্তের ওপারে ভারত বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে দেখছিল। স্টাডি করছিল। তারা জানত, এখানে কী হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে। তারা আমাদের বন্ধু ছিল। কোনো সন্দেহ নাই।

‘কিন্তু এটাও ঠিক যে, ঐতিহাসিকভাবে পিওরলি স্ট্র্যাটেজিক্যালি রাষ্ট্রে ব্যক্তির কোনো জায়গা নেই। যখন অবস্থার অবনতি হলো, যুদ্ধ হলো, যুদ্ধের শুরুতেই তখন আমরা সবাই বুঝলাম, পাকিস্তান সব কিছু হারাচ্ছে। এর কারণ আমাদের মুক্তিবাহিনী। প্রথমে তারা একটু সমস্যায় ছিল, কিন্তু যখন মুক্তিবাহিনী এক থেকে দেড় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে একেকজন ফিরছিল, তখনই তারা দক্ষতার প্রমাণ রাখছিল। যখন এই সংখ্যা এক লাখ পেরোল, তখন ভারত আমাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া শুরু করল। তারা আমাদের এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অস্ত্র দিয়েছে। এটা আমাদের জন্য বিশাল পাওয়া ছিল।’

তিনি বলেন, “প্রশ্ন হলো ভারত কেন এটা করল? তারা আমাদের সহায়তা করেছে আমাদের চাওয়ার কারণেই। আমরা চেয়েছি। আর ভারত চেয়েছে শরণার্থীর হাত থেকে রক্ষা পেতে। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকা, ইউরোপ সফর করেছেন। আর বলেছেন, এই ১ কোটি শরণার্থী আমি খাবার দিতে পারব না। তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বললেন, ‘আপনারা যদি অ্যাকশন না নেন, তাহলে আমি অ্যাকশানে যাব। এটা আমাদের অস্তিত্বর জন্য। কেননা ১ কোটি শরণার্থীকে আমি খাওয়াতে পারব না।’”

“যুদ্ধ শেষ হতে লাগল। বিশেষ করে নভেম্বরের শেষের দিকে। আমরা কিন্তু যুদ্ধ জিতছি। এ সময় যে বড় যুদ্ধটা হলো, সেটা হলো আখাউড়ায়। সে সময়ই কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের মিত্রবাহিনী একই সঙ্গে মেঘনা নদী পার হলো, যদিও তখন পশ্চিম সীমান্তে ভারত ধীরে এগিয়েছে, যদিও সেখানে তাদের ৫ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত আছে।”

মুক্তিযুদ্ধে ৬ ডিসেম্বর ছিল মাইলফলক
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরির জন্য ইন্দিরা গান্ধী কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। ছবি: সংগৃহীত

ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘ডিসেম্বরের শুরুতে ভারত প্রথম বাংলাদেশকে ভুটানকে দিয়ে স্বীকৃতি দেয়ালো। নিজেরা আগে দিল না। এই কারণে যে, এটা করলে যাতে তারা চাপে না পড়ে। কিন্তু ভুটানের সাত ঘণ্টা পর তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল।

‘এটা বুঝতে হবে যে, ভারত সরকারের নীতির বাইরেও ইন্দিরা গান্ধীর আলাদা লক্ষ্য ছিল। আর তা হলো একদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। সে সময় চীনের আগ্রহে নিরাপত্তা পরিষদে জোর আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র তাতে সমর্থন দিচ্ছে। তারা চাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি। ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থায়ী প্রতিনিধিকে জানালেন, আলোচনা করো, নো সিসফায়ার উইদাউট স্যারেন্ডার অফ পাকিস্তানি সোলজারজ। পাকিস্তানি সেনাদের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের পরই কিন্তু যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয় এবং রেজুলেশনে স্বাধীন বাংলাদেশে সব ধরনের মানবিক সহায়তা দেয়ার জন্য সব দেশ রেজুলেশনে সই করে।’

ওয়ালিউর বলেন, ‘অগাস্ট ১৯৭১। ২১ ও ২২ তারিখে জেনেভায় একটি বৈঠক হলো। যেখানে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ সব দেশকে ডাকল। সেখানে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো জাস্ট টু টেক অ্যা নোট। সবাই ভয় পাচ্ছিল, চীন হয়তো পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। উত্তর-পশ্চিম বা উত্তর সীমন্ত দিয়ে হয়তো তারা আক্রমণ করবে। খাজা মোহাম্মদ কায়সার ছিলেন আমাদের (পাকিস্তান) রাষ্ট্রদূত। তিনি বেইজিং থেকে এসেছিলেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি। আমার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। রাত্রে আমরা কথা বললাম। আমরা হোটেলে গেলাম। ইন্টার কন্টিনেন্টাল। তিনি আমাকে বললেন, বয় তুমি হোটেলে ফিরে যাও। চায়না পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে জাড়বে না।

‘আমি হোটেলে ফিরে গেলাম। রাত্রে ভালো ঘুম হলো। পরের দিন সকালে মিটিং শুরু হলো। কায়সার প্রথমেই পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান জেনারেল গোলাম মোহাম্মদকে বললেন, চীন পাকিস্তানকে সরাসরি যুদ্ধে সহায়তা করবে না এবং যুদ্ধে অংশও নেবে না। গোলাম মোহাম্মদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে জেনেভায় এসেছিলেন। খাজা মোহাম্মদ বললেন, আমি জেনেভায় রওনা দেয়ার আগের দিন চীনা প্রেসিডেন্ট চৌ এন লাই আমাকে ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে ডেকেছিলেন এবং চীনের এই মনোভাবে কথা জানিয়ে দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি সেই মোস্ট স্কুপ ও ইম্পোর্টেন্ট খবরটি কলকাতা পাঠাই ও বলি এটা দিল্লিকে জানাতে। এটা ছিল নয় মাসের যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে জরুরি খবর। কারণ চীন পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে রাজি হয়নি। আমি তখন জেনেভায়। আমি সুইস সরকারকে নোটিশ দিয়েছি, চাকরি ছাড়ার। কিন্তু মুজিবনগর সরকার আমাকে বলছে যে, তুমি মিটিং শেষ করে পাকিস্তান সরকারের চাকরি ছাড়। আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে কিবরিয়াকে ও কলকাতায় হোসেন আলিকে খবর দেই। দিল্লিকে এই খবর বলে দিতে বলি। একই সময় জেনেভায় ভারতের রাষ্ট্রদূত পি কে হালদারকেও এ কথা জানাই।’

ভারত জানত বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমদ বলেন, ভারত জানত, বাংলাদেশের স্বাধীন না হওয়ার কারণ নেই।

তিনি বলেন, ‘একটা জিনিস হলো, যেহেতু ১৯৭১ সাল একটা স্নায়ুযুদ্ধের সময় ছিল, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব ছিল, দুপক্ষই সে সময় এমন ছিল একজন এক পক্ষ হলে অন্যজন অন্যপক্ষ, তখন ভারত ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, তাদের কী করতে হবে এবং বাংলাদেশের মানুষ কী চায়, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে ৭ মার্চের ভাষণ শোনার পর। জেনোসাইড যখন হলো হলো (২৫ মার্চের গণহত্যা), ১০ মিলিয়ন শরণার্থী যখন তাদের দেশে গেল, ভারতের তখন বুঝতে কষ্ট হয়নি, কী ঘটতে যাচ্ছে। সম্ভবত এপ্রিল মাসেই তাদের ইন্টেলিজেন্স গুরু যাকে বলা হয়, সেই কে সুব্রমানিয়াম তার রিপোর্টে বলেছিলেন, নতুন এক বাংলাদেশ হচ্ছে। একইভাবে আমেরিকার হেনরি কিসিঞ্জার ৭ মার্চের আগেই রিপোর্টে বলে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ নতুন দেশ হচ্ছে। বর্তমান প্রকাশিত রিপোর্টগুলোতে তাই দেখা যাচ্ছে। ফলে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে কিন্তু রিপোর্ট ছিল সীমান্তের এপারে কী ঘটতে যাচ্ছে। তাই সবাই বুঝে গিয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষ আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকছে না। আর গণহত্যার পর তো তা সম্ভবও ছিল না।

‘ইন্দিরা গান্ধীর তখন কেবল দরকার ছিল আন্তর্জাতিক সমর্থন। কেননা আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করছিল এবং চীনেরও পাকিস্তানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল, যে কারণে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলো এবং একটি চুক্তিও করল। সেই ফ্রেন্ডশিপ চুক্তিটায় বলা হলো, ভারতকে যদি কেউ আক্রমণ করে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন মনে করবে, তার গায়েই আঘাত লেগেছে এবং সে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে ও ভারতকে সব ধরনের সহায়তা করবে। তাই বাংলাদেশের যুদ্ধে জড়ানো ভারতের জন্য বড় ঝুঁকি ছিল এটা বলা মনে হয় না ঠিক হবে। কেননা বাংলাদেশের মানুষ তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেয়ায় গ্রাম অঞ্চল তখন প্রায় মুক্তিবাহিনীরই অধীনে ছিল।’

তিনি বলেন, ‘দিল্লির তখন দরকার ছিল কেবল ঢাকার পতন। কারণ ঢাকার পতন না হলে যুদ্ধটা অন্যদিকে মোড় নিতে পারত। কারণ জাতিসংঘে তখন কেবল যুদ্ধবিরতির কথা উঠছিল। দিল্লি আর মস্কো তখন বলছিল, ঢাকার পতন হলেই কেবল যুদ্ধবিরতি হতে পারে। পাকিস্তানিদের জন্যও দরকার ছিল ভারতীয় সৈন্যদের হাতে আত্মসমর্পণের। কেননা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পড়লে তাদের বেঁচে থাকাটা কঠিন হতো।

‘বিশেষ করে ২৫ মার্চের গণহত্যার পর থেকে তারা বাঙালিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন চালিয়েছিল। তাই যখন তাদের আল্টিমেটাম দেয়া হয়, তারা দ্রুত রাজি হয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়ার কোনো কারণই ছিল না, যখন গুটিকয় মানুষ ছাড়া সারা বাংলাদেশই স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ ছিল।’

ভারতের স্বীকৃতি ছিল মুক্তিযুদ্ধে ন্যায্যতার স্বীকৃতি

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা হওয়ার পরই মুক্তিযুদ্ধের ন্যায্যতা ও স্বীকৃতি জরুরি ছিল। যেহেতু তখন বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধের যুগে। বিশ্ব ছিল দ্বিধাবিভক্ত এবং পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আমরা দেখলাম, যখন মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল এবং একটি পর্যায়ক্রমিক অবস্থান তৈরি করল, সে সময় ভারত ওই অবস্থাতেই বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিল। এতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা পেল। এতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তৈরি হলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ন্যায্যতা পেল।

‘যারা তখন বাংলাদেশের গণহত্যা সম্পর্কে জানত না, তাদের কাছেও সেই বার্তা পৌঁছে গেল। এটা ছিল ভারতের সময়োপোযোগী সিদ্ধান্ত। প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ভারত সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে আগস্টের ৪ তারিখে চিঠি লিখেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বছর বাংলাদেশ সফরের সময় দিনটিকে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর দিন হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। তাই দুই দেশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাসে এটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।’

তিনি বলেন, ‘যারা পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়, তারা বলতে থাকে, এটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এর বিরুদ্ধে ভারত শক্ত অবস্থান নেয়। অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র সফরেই ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেন, কেউ কোনো অবস্থান না নিলেও তিনি বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেবেন। সেখানে যে গণহত্যা চলছে, তাতে সবাই চোখ বুজে থাকলেও ভারত বসে থাকবে না। কেননা এক কোটি শরণার্থীর বোঝা বহন করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। তিনি সবার চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।’

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন

ভাইরাল হওয়ায় গতি মারুফের, সঙ্গীদের কী হবে

ভাইরাল হওয়ায় গতি মারুফের, সঙ্গীদের কী হবে

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় হচ্ছে পথশিশুরা। তাদের ব্যাপারে উদাসীন সমাজসেবা অধিদপ্তর। ছবিটি ঢাকা জজকোর্ট এলাকা থেকে তোলা।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় থাকত মারুফ। সেই পার্ক, কোর্টকাচারি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সদরঘাটসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মারুফের মতো অনেক পথশিশুরাই ঘুরে বেড়ায়। তারাও পার্ক বা ফুটপাতে ঘুমায়। কেউ খাবার দিলে খায়, আবার অনেক সময় চেয়ে নিয়ে খায়। তাদের কাউকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি।

ঢাকার জজকোর্ট এলাকায় পথে পথে ঘুরত শিশু মারুফ। হয়ে যায় মাদকে আসক্ত। একটি সংবাদমাধ্যমের লাইভে ঢুকে ‘লকডাউন ভুয়া’ বলার পর তাকে নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। এরপর তাকে উদ্ধার করে নিরাময় শেষে মাকে খুঁজে তুলে দেয়া হয় তার কাছে।

শিশুটি এখন মাতৃস্নেহে সিক্ত। সরকারি আশ্রয় থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় মামা কথা দিয়ে যান, তার ভাগ্নেকে স্কুলে ভর্তি করবেন।

মারুফকে উদ্ধার করে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ আরও একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে দিয়েছে তাদের কর্তব্যনিষ্ঠার প্রতি।

মারুফকে নিয়ে গেলেও তার মতোই আরও যে শিশু আছে, যারা পরিবারের বাইরে একা একা পথে ঘুরে বেরিয়ে মাদকে আসক্ত হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় হচ্ছে, তাদের বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর পুরোপুরি উদাসীন।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় থাকত মারুফ। সেই পার্ক, কোর্ট কাচারি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সদরঘাটসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মারুফের মতো অনেক পথশিশুরাই ঘুরে বেড়ায়। তারাও পার্ক বা ফুটপাতে ঘুমায়। কেউ খাবার দিলে খায়, আবার অনেক সময় চেয়ে নিয়ে খায়।

ডান্ডি নামক এক প্রকার মাদকে আসক্ত বেশির ভাগ। মারুফের মতো নেশা বা টাকা-পয়সা নিয়ে প্রায়ই মারামারি করে।

তারা বলছে তাদেরকে কেউ এসে মাদক দিয়ে যায়। তবে কে বা কারা তাদের মাদক দেয় তারা তা বলতে পারে না।

এদের অনেকেরই বাবা-মা নেই। কেউ ভাই বা বোনের সঙ্গে থাকে। কেউ কারও সঙ্গে থাকতে থাকতে তাকেই ভাই বোন বানিয়ে নিয়েছে। এই শিশুদেরকে ব্যবহার করে মাদক বিক্রি করা হচ্ছে, কখনও কখনও ভিক্ষাও করানো হচ্ছে এদেরকে দিয়ে।

পার্কের বেদিতে ডান্ডি নামক মাদক সেবন করছিল ‘আ’ আদ্যাক্ষরের ৭ থেকে ৮ বছর বয়সী এক ছেলে।

কেন খাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বলে, সবাই খায়, তাই সেও খায়।

বুদ্ধি হওয়ার পর বাবা-মাকে দেখেনি ছেলেটা। থাকে বোনের সঙ্গে। মানুষের কাছে খাবার চেয়ে খায়।

তার পাশে বসে ছিল আরও তিনটি শিশু। তাদের জীবন ও বক্তব্যও অনেকটা একই ধরনের। পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘এসব বড়লোকের পুলাপাইন করে। আমরা করি না।’

এই শিশুদের মধ্যে একজন পথচারী দেখলেই হাত পাতছিল। জানায়, তার বাবাও ভিক্ষা করে, মা নেই। ছোট ভাইকে নিয়ে ভিক্ষা করে দুই বেলা খায়।

পড়াশুনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, ‘গেছিলাম, হেরা আটকাইয়া রাখে; ভালো লাগে না; সাইন দিয়া আইয়া পড়ছি।’

ভাইরাল হওয়ায় গতি মারুফের, সঙ্গীদের কী হবে
সেই পথশিশু মারুফ

কেন শুধু মারুফ

মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে মূলেই গলদ। আসলে এসব পথশিশুরা যখন একটা অপরাধ করে বসে তখন পুলিশ, সমাজসেবা অধিদপ্তর সবাই নড়েচড়ে বসে। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা কথিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতাই লক্ষ্য করি।’

তিনি বলেন, ‘মারুফ যখন আলোচিত হয়, তখন সবাইকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। রাষ্ট্রের এটা দায়িত্ব, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, কখনও কখনও এসব বিষয়ে ২-১ টি পদক্ষেপ দেখলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। যে কারণে এইসব পথশিশুদের আশ্রয়কেন্দ বা পুনর্বাসনে পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা হয় না। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক ও অমানবিক।’

‘সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি বেসরকারি উদ্যোগ এই শিশুদের নিয়ে কাজ করে। মারুফকে উদ্ধার থেকে শুরু করে পুনর্বাসন ও স্বজনদের হাতে তুলে দেয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা পারভেজ হাসান তরুণ পারভেজ হাসান।

নিউজবাংলাকে তিনি, ‘মারুফ ভাইরাল হয়েছে দেখে নিয়েছি সেটা নয়। মারুফ অসহায় ছিল, তার পাশে দাঁড়ানোর মতো ওই সময় কেউ ছিল না। আমরা অন্যান্য পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। যেকোনো পথশিশু যদি আলোর পথে ফিরতে চায়, তাকে সহযোগিতা করি। আর এই দায়িত্ব কারও একার নয়, সবার।’

জানতে চাইলে ঢাকা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রুকনুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সরাসরি কোনো পথশিশুকে ধরতে পারি না। এটা করতে পারে পুলিশ। তারা আমাদের কাছে ধরে এনে দেয়, তখন আমরা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তাদেরকে (পথশিশুদের) সংশোধনাগারে দিয়ে দেই।’

ভাইরাল হওয়ায় গতি মারুফের, সঙ্গীদের কী হবে

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) শহীদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পথশিশুদের নিয়ে আমাদের একটি প্রজেক্ট রয়েছে। আমরা পথশিশুদের সংশোধনাগারে পাঠানো এমনকি তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া এসব কাজ করি। আমাদের বিভাগেই এ ধরনের কাজ রয়েছে। আমরা এসব কাজের পরিধি আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’

পথশিশুদের নিয়ে চাইল্ড সেনসেটিভ স্যোসাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) নামে একটি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পটির পরিচালক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) সাইফুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কিছু ক্যাম্প রয়েছে (সদরঘাট, গাবতলী)। এছাড়াও আমাদের কিছু সমাজকর্মী রয়েছে। আমাদের একটি জরুরি সেবা নম্বর (১০৯৮) রয়েছে। সেখান থেকে সংবাদ পেলে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের অধীনে আমরা সেইসব পথশিশুদের প্রথমে সংগ্রহ করি। তারপর তাদের সংশোধনাগারে পাঠাই।

‘তাদের বাবা-মা যদি পাওয়া যায় বা তারা যদি আগ্রহী হয়, তখন আমরা তাদেরকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি। কোনো শিশু যদি আইন ভঙ করে ফেলে, তখন তাদেরকে গাজীপুরে কোণাবাড়ির দুটি বা যশোরের সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। সংশোধনাগারে তাদেরকে কাউন্সেলিং করা হয়। এরপর তারা যখন বলে আমরা বাড়িতে ফিরতে চায়, তখন আমরা ব্যবস্থা করি।’

ভাইরাল হওয়ায় গতি মারুফের, সঙ্গীদের কী হবে

ভাসমান শিশু কত

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪ লাখের মতো পথশিশু রয়েছে। যার অর্ধেকই অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকায়।

অন্যদিকে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। ঢাকার হিসাব অবশ্য তাদের কাছে নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ঢাকাতেই ছয় লাখ পথশিশু রয়েছে।

সহমর্মিতা ফাউন্ডেশনের পারভেজ হাসান বলেন, ‘এদের অধিকাংশ বসতবাড়িহীন, পোশাকহীন, রাস্তায় থাকে। এদের আবার বেশির ভাগ মাদকাসক্ত। এদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘এদের জীবনটাই করুণ। তারা ছোটবেলা থেকে বিরূপ চিত্র দেখে বড় হয়েছে। তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। তাদের প্রয়োজনটা পূরণ করতে হবে। যেমন: খাবার, পোশাক, থাকার ব্যবস্থা। যাতে তারা মনে করে পিছনে যা হওয়ার হয়েছে, সামনে ভালো কিছু হবে।’

পুরান ঢাকা এলাকায় পথশিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনোমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো)।

এর টিম লিডার আরিফুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমদের এখানে অনেক শিশুই থাকছে, পড়াশোনা করছে, কিন্তু অনেকেই থাকতে চায় না। আমরা চেষ্টা করি তাদের পূর্বের জীবনকে ভুলিয়ে নতুন পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে। যতটুকু সম্ভব তাদেরকে নিয়ে আমরা বিভিন্ন প্রোগ্রাম করার চেষ্টা করি।’

ভাইরাল হওয়ায় গতি মারুফের, সঙ্গীদের কী হবে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিপ্রা সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরিবারের ভাঙনের কারণেই কিন্তু একজন পথশিশু তৈরি হচ্ছে। সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এই বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা প্রয়োজন। তারপর তা রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘এখন অনেক পথশিশুই মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পরিবার থেকে বের হয়েই কিন্তু একটা শিশু মাদক ধরে না। এই জায়গায় সমাজ, রাষ্ট্রের তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জরুরি। তাদের জন্য ভালো পরিবেশের পুনর্বাসনের জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।’

আরও পড়ুন:
বদলে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেহারা

শেয়ার করুন