মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের গদা হাতে হেঁটে যাওয়া ইকবাল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, মণ্ডপে কোরআন রেখে গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। তাকে খুঁজছে পুলিশ।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ইকবাল হোসেন নামের এক যুবককে। এই ইকবালকে গ্রেপ্তারে গত কয়েক দিন ধরে চলছে জোর অভিযান।

ইকবালের সহযোগী হিসেবে অন্তত চারজন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, ইকবাল গ্রেপ্তার হলেই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু, সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যে কোনো একসময়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআন শরিফটি রেখে যান মণ্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

এ ধরনেরই একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে দেখা যায়, কোরআন শরিফটি রাখার পর হনুমানের মূর্তির গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন প্রধান অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি রাত তখন সোয়া ৩টার মতো।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। নূর আলম পেশায় মাছ ব্যবসায়ী।

পরিবারও চায় ইকবালের শাস্তি

ইকবালের মা আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে জানান, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ইকবাল সবার বড়।

তিনি জানান, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই নেশা করা শুরু করেন। ১০ বছর আগে তিনি জেলার বরুড়া উপজেলায় বিয়ে করেন। ওই ঘরে তার এক ছেলে রয়েছে। পাঁচ বছর আগে ইকবালের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

তারপর ইকবাল চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে আরেকটি বিয়ে করেন। এই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইকবাল নেশা করে পরিবারের সদস্যদের ওপর অত্যাচার করত। বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটেও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াত।’

ইকবাল মাজারে মাজারে থাকতে ভালোবাসতেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেত। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল।’

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
ইকবালের জাতীয় পরিচয়পত্র

পঞ্চম শ্রেণি পাস ইকবালের সঙ্গে ১০ বছর আগে বন্ধুদের মারামারি হয়। এ সময় তারা ইকবালকে পেটে ছুরিকাঘাত করেন। তখন ইকবাল অপ্রকৃতিস্থ আচরণ শুরু করেন বলে দাবি করে তার পরিবার। আমেনা বেগম জানান, তিনি স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন ইকবাল পূজামণ্ডপ থেকে হনুমানের গদা সরিয়ে সেখানে কোরআন শরিফ রেখেছেন। আমেনা বলেন, ‘ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারে। তার বোধবুদ্ধি খুব একটা নেই। ছেলে সত্যিই যদি অন্যায় করে, তাহলে যেন তার শাস্তি হয়।’

ইকবালের ছোট ভাই রায়হান নিউজবাংলাকে জানান, ইকবালকে খুঁজতে পুলিশকে তারাও সহায়তা করছেন।

১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে ইকবালকে চিনি। সে রঙের কাজ করত। মাঝে মাঝে নির্মাণকাজের সহযোগী হিসেবেও কাজ করত। ইকবাল ইয়াবা সেবন করায় প্রায়ই তাকে নিয়ে অনেক দেনদরবার করতে হতো।’

ইকবালের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীও বিরক্ত বলে জানান তিনি। সোহেল বলেন, ‘আমার দৃঢ়বিশ্বাস ইকবালের মানসিক অসুস্থতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ কাজটি করেছে।’

কোরআন রাখার পর যেভাবে ছড়ানো হয় উত্তেজনা

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকবাল তাদের একজন। তিনি কোরআন রাখার পর ভোরে আরেক অভিযুক্ত ইকরাম হোসেন (৩০) ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

নগরীর বজ্রপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন চিনু রানী দাশ। নানুয়ার দিঘির পূর্ব পাড়ের একটি বাসায় তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মণ্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান দুই নারী মণ্ডপে কোরআন শরিফ দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে রাখা হনুমানের মূর্তির গদা সরিয়ে রাখা হয় পবিত্র কোরআন শরিফ। বাঁয়ের ছবিটি মঙ্গলবারের, ডানেরটি বুধবার সকালের

চিনু রানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সময় এক ছেলে ছুটে এসে চিৎকার করে বলে, হনুমানের পায়ের কাছে কোরআন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোরআন এখান থেকে সরিয়ে নেবে, তার হাত কেটে ফেলা হবে।’

এ কথা শুনে ভয় পেয়ে যান চিনু। তিনি বলেন, ‘আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলাম। ছেলেটা কাকে যেন ফোন দিয়ে কোরআনের বিষয়টা জানায়। এর কিছুক্ষণ পর সিএনজি দিয়ে একজন লোক আসে। সে এসে কোরআন শরিফটিকে বুকের মধ্যে নেয়।’

সিএনজি অটোরিকশায় আসা ওই ব্যক্তিই হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে একটা সিএনজিতে করে দ্রুত মণ্ডপে আসি।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইকরামও রাতে নেশা করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ওই রাতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেন। পরে মণ্ডপের পাশে অবস্থান নেন। মণ্ডপে কোরআন রাখেন ইকবাল। আর ইকরামের দায়িত্ব ছিল ভোরে বিষয়টি পুলিশকে জানানোর। সে অনুযায়ী তিনি ৯৯৯-এ ফোন করেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার সেই আলোচিত ফেসবুক লাইভ। ডানে লাইভ করা ব্যক্তি ফয়েজ আহমেদ

ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোরআন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করেন ফয়েজ নামের এক যুবক। সেই লাইভের পরেই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে, শুরু হয় সহিংসতা। এই ফয়েজকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, তাদের ধারণা, দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আনা হয় পাশের একটি মাজার থেকে।

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান, মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দায় দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

দারোগাবাড়ী মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), আরেকজনের বিষয়ে নিউজবাংলা তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

দারোগাবাড়ী মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক নিউজবাংলাকে জানান, হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করতেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পরদিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এ ছাড়া মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করতেন। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাজারে নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি।

‘তবে তৃতীয় যুবক ইকবালকে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সেই জেব্রা ক্রসিংয়ের মালিকানা কার

সেই জেব্রা ক্রসিংয়ের মালিকানা কার

জেব্রা ক্রসিং দেখা গেলেও রাস্তা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ছবি: নিউজবাংলা

আশরাফুল ইসলাম নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী বলেন, ‘এখানে ক্রসিং দিয়ে চালকদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। কারণ এই চিহ্ন দেখলে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেয়ার কথা। তবে রাস্তা পার হওয়ার তো ব্যবস্থা নেই। আমার মনে হয়, এটির কোনো প্রয়োজনই নেই। আবার যদি ক্রসিং দেয়াই হলো, তবে সেখানে পকেট গেট কেন রাখা হলো না।’

রাজশাহীর রেলস্টেশন থেকে ভদ্রা মোড় পর্যন্ত রাস্তায় আছে বেশ কয়েকটি জেব্রা ক্রসিং। কিছুদূর পরপর রাস্তা পার হতে রাখা হয়েছে পকেট গেট।

ছোট এসব গেট জেব্রা ক্রসিংয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে শুভ পেট্রল পাম্পের পাশে একটি জেব্রা ক্রসিং দেখা গেলেও রাস্তা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিভাজক অংশে লোহার পাত, রড বসানো হয়েছে। মাঝখানে লাগানো হয়েছে গাছ। সম্প্রতি এই ক্রসিংয়ের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, কীভাবে এই জেব্রা ক্রসিংটি এলো সেটি তাদের অজানা।

সরেজমিন দেখা গেছে, জেব্রা ক্রসিংয়ের এক পাশে কোনো স্থাপনা নেই। অন্য পাশে রয়েছে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগ। রাস্তায় সাদা প্রলেপ দেয়া জায়গাটি থেকে এক পাশে প্রায় ২০ গজ দূরে আছে ছোট পকেট গেট। আরেক পাশে প্রায় ৫০ গজ দূরে আছে ইউটার্ন নেয়ার মতো রাস্তা। এ অবস্থায় সেখানে এই জেব্রা ক্রসিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আশরাফুল ইসলাম নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী বলেন, ‘এখানে ক্রসিং দিয়ে চালকদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। কারণ এই চিহ্ন দেখলে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেয়ার কথা। তবে রাস্তা পার হওয়ার তো ব্যবস্থা নেই। আমার মনে হয়, এটির কোনো প্রয়োজনই নেই। আবার যদি ক্রসিং দেয়াই হলো, তবে সেখানে পকেট গেট কেন রাখা হলো না।’

পথচারী ষাটোর্ধ্ব আবুল কাশেমকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রথমে তিনি হাসতে শুরু করেন। তিনি বলেন, এই পথ দিয়ে তিনি মাঝেমধ্যে যাওয়া-আসা করেন। তবে এভাবে তার নজরে আসেনি। এটি বড় কোনো ঘটনা না হলেও একটা ভুল। কর্তৃপক্ষের এটি নজরে নেয়া বা ভাবনা থাকা উচিত ছিল।’

৫০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে নিজের ফ্যান পেজে পোস্ট করেন মাহফুজ আরেফিন নামে এক কৌতুকশিল্পী। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার বার। এতে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দিয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ।

রহমান শিশির নামে একজন কমেন্টে লিখেছেন, ‘হাইজাম্প শেখার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যে এটা করা হয়েছে তা কে বোঝাবে!’

মেরাজ মুহাম্মদ মেসবাহ নামে একজন লিখেছেন, ‘কাজলা এবং মেইন গেটে স্পিড ব্রেকারের ওপর দিয়ে জেব্রা ক্রসিং দেয়া। মানে কী বলব বুঝতে পারছি না।’

নবিউল ইসলাম নামে একজন লিখেছেন, ‘মুরগি দিয়ে হাল চাষ করলে এমনই হয়।’

পোস্টদাতা কৌতুকশিল্পী মাহফুজ আরেফিন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কমেডি রিয়েলিটি শো ‘হা-শোর’ সিজন পাঁচে অংশ নিয়েছিলেন।

সেই জেব্রা ক্রসিংয়ের মালিকানা কার


নিউজবাংলাকে মাহফুজ আরেফিন বলেন, ‘আমি ওই রাস্তা দিয়েই নিয়মিত যাওয়া-আসা করতাম। দেখতাম জেব্রা ক্রসিং দিয়ে কেউ পার হচ্ছে না। সেখান থেকে ১০-১২ হাত দূর দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। সেটি দেখতে গিয়ে দেখি জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখান থেকে ১০-১২ হাত দূরে পকেট গেট আছে।

‘আমার মনে হয়, সেখানে লোহার রড দিয়ে যে ডিভাইডার দেয়া হয়েছে, ভুলটা সেখানেই হয়েছে। যে গেটটি ১০ হাত দূরে করেছে, সেটি ক্রসিং চিহ্নর সামনে করলে এটা নিয়ে কথা উঠত না।’

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নজরে এসেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগেরও। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নূর ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ক্রসিংয়ের বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। এটি সিটি করপোরেশনের দেয়া জেব্রা ক্রসিং কিনা এটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যতটুকু মনে হচ্ছে, এটি আমাদের করা নয়। এটি কে করেছে, কখন করেছে, কেন করেছে এসব আমরা খতিয়ে দেখছি।’

যে কেউ যে কোনো স্থানে ইচ্ছে হলেই জেব্রা ক্রসিং দিতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য প্রশাসন রয়েছে। এসব দেয়ার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা হয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানার চেষ্টা করছি আদৌ সেখানে কোনো ক্রসিং দরকার আছে কি না। যদি থাকে তবে পকেট গেট করে দেব। আর না থাকলে ক্রসিং মুছে দেয়ার ব্যবস্থা করব।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন

প্রকল্পের মেয়াদের চেয়ে পরামর্শকের মেয়াদ বেশি

প্রকল্পের মেয়াদের চেয়ে পরামর্শকের মেয়াদ বেশি

বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেল প্রকল্পে বাড়তি আড়াই বছরের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ছবি: সংগৃহীত

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সরাসরি রেলপথ নির্মাণ হলে ঢাকার সঙ্গে বগুড়ার রেলপথের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের বেশি কমে যাবে। এ-সংক্রান্ত প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাবে আর দুই বছরের মধ্যে। তবে যে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের মেয়াদ থাকবে বাড়তি আড়াই বছর। এটিকে নিয়মের ব্যত্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ৮৬ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে তিন বছরে এ প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি বলতে সামান্যই। এতে পরামর্শক নিয়োগ হয়েছে মাত্র কিছু দিন আগে।

প্রকল্পের মেয়াদ আর দুই বছরের কম থাকলেও মেয়াদের পরও বাড়তি আড়াই বছরের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়, যা উন্নয়ন শৃঙ্খলার পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় জানায়, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এতে ভারতীয় ঋণ পাওয়া যাবে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৮ সালের জুলাইতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশের মতো।

প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে আর মাত্র দেড় বছরের কিছু বেশি, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। তবে গত সেপ্টেম্বরে এ প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। দেড় বছর মেয়াদ থাকলেও পরামর্শক নিয়োগ পেয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত।

দুই ভাগে এ কাজ করবে ভারতের দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রাইটস লিমিটেড ও আরভি অ্যাসোসিয়েটস আর্কিটেক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসালট্যান্ট প্রাইভেট লিমিটেড।

প্রথম ধাপে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা, বিস্তারিত নকশা তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠান দুটিকে সময় দেয়া হয়েছে ১৩ মাস। দ্বিতীয় ধাপে ৩০ মাসের জন্য নির্মাণকাজ তদারক করবে প্রতিষ্ঠান দুটি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদন জমা দিলে রেললাইন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করাসহ অন্যান্য কাজ শুরু হবে।

চুক্তি হয়েছে গত ২৭ সেপ্টেম্বর। চুক্তিমূল্য ৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের জন্য পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে তা করা যেতে পারে। তবে সে রকম নজির নেই বললেই চলে।

প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও তা কত সময়ের জন্য বাড়বে তাও আগে থেকে বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে আগে থেকে নিশ্চয়তার কোনো সুযোগ নেই। প্রকল্প সংশোধনের পরই কেবল বাড়তি মেয়াদের জন্য পরামর্শক নিয়োগ পেতে পারে। ঠিকাদার নিয়োগ বা পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এমনটি করা হলে তা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্পের শৃঙ্খলার ব্যত্যয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মামুন-আল-রশীদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কোনো প্রকল্পেই মেয়াদের পর বাড়তি সময়ে কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ প্রকল্পের যেখানে মেয়াদই নেই, সেখানে পরামর্শক নিয়োগ পাবে কীভাবে? পরামর্শকের ফি-ই বা আসবে কোথা থেকে? এ ক্ষেত্রে হয়তো মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব পাঠানোর কথা। প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে মেয়াদ বাড়লেই সেই মেয়াদের জন্য পরামর্শক বা অন্য কোনো পক্ষের চুক্তি করা যাবে।

‘অথবা বিশেষ বিবেচনায় পরিকল্পনা কমিশনের সম্মতি নিয়ে মেয়াদ পরে বাড়তে পারে এমন কারণ দেখিয়ে সম্মতিপত্র চাইলে তা বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু রেলের কোনো প্রকল্পের বিষয়ে এমন কোনো চিঠি আসেনি।’

মেয়াদের পরও পরামর্শক নিয়োগ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. কামরুল আহসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, জটিলতা কাটিয়ে এটির কাজ আবার শুরু হচ্ছে। মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে থাকলেও প্রকল্পটি সংশোধন করা হবে, এ জন্য বাড়তি সময়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হবে।’

প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ জুন পর্যন্ত, তবে আমাদের কনসালট্যান্ট নিয়োগের মেয়াদ ২০২৫ পর্যন্ত। এ প্রকল্প রিভাইজ করতে হবে। তাই পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

প্রকল্পের মেয়াদ কম কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ বেশি সময়ের জন্য, এটা আইন মেনে হয়েছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এখন কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা স্টাডি করবে। তারপর কাজ শুরু হবে। তবে করোনার কারণে কাজে অনেক বিলম্ব হয়েছে। তা ছাড়া কনসালট্যান্ট প্রথম ১৩ মাস ডিটেইল ডিজাইন করবে। তারপর ৩০ মাস সুপারভিশন করবে।’

প্রকল্পের মেয়াদসংক্রান্ত কোনো সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখনও প্রস্তাব পাঠানো হয়নি। এখনই পাঠাব না। আগে ডিটেইল স্টাডি হবে, তার উপর ভিত্তি করে যদি ব্যয় কম বা বেশি প্রাক্কলন করা হয়, তার ভিত্তিতে সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হবে। আসলে বাংলাদেশে তো অনেক প্রকল্প পাস হয়, কিন্তু একদম ডিউ টাইমে তো আর কোনো প্রজেক্ট শেষ হয় না। এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়বেই।’

তিন বছরে কাজ শুরু হয়নি কেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরে টেন্ডারিং হলো, কনসালট্যান্ট নিয়োগ হয়েছে, এটা তো প্রকল্পের কাজ।’

কী থাকবে প্রকল্পে

রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে ঢাকা থেকে রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে ট্রেন যায় পাবনার ঈশ্বরদী ঘুরে বগুড়ার সান্তাহার হয়ে। এ কারণে শত কিলোমিটার বাড়তি পথ পাড়ি দিতে হয় উত্তরের যাত্রীদের। রেলের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা থেকে বগুড়ার বর্তমান দূরত্ব ৩২৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাহালু সান্তাহার-আব্দুলপুর-ঈশ্বরদী বাইপাস-জামতৈল-শহীদ এম মনসুর আলী (বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়) রুটই প্রায় ১৮৭ কিমি দীর্ঘ।

তাই ঢাকা থেকে সরাসরি বগুড়ার রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ বহুদিনের। ২০০৫ সালে এই রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে তখন প্রাক-সমীক্ষাও হয়েছিল। কিন্তু অর্থায়ন না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের নভেম্বরে বগুড়া সফরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে বগুড়া হয়ে রংপুর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের নির্দেশ দেন। ২০১৭ সালে ভারতের তৃতীয় লাইন অফ ক্রেডিটের (এলওসি) ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।

এতে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন থেকে বগুড়া রায়পুর-রায়গঞ্জ-শেরপুর-রানিরহাট রুটে সরাসরি রেল সংযোগ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বগুড়া স্টেশন থেকে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশনের মধ্যকার রুটের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া রানিরহাট স্টেশন থেকে কাহালু স্টেশনের মধ্যে রুটে ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ হবে। এ জন্য ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে।

বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের মধ্যে সরাসরি এ রেল যোগাযোগের ফলে প্রায় ১১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পথ এবং প্রায় তিন ঘণ্টা ভ্রমণের সময় কমবে। নতুন রেলপথ নির্মাণ হলে ঢাকা-বগুড়ার দূরত্ব কমে হবে ২১২ কিলোমিটার। এ রুটের মাধ্যমে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকার সরাসরি রেল যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন

মেয়র আব্বাসের উত্থান যেভাবে

মেয়র আব্বাসের উত্থান যেভাবে

রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী। ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানান, ২০০২ সালের পর আব্বাস আলী যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। এর তিন বছরের মাথায় তিনি মহানগর যুবলীগের সহসভাপতি পদ পেয়ে যান। এর পর থেকে তিনি রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে থাকেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি উপরে উঠে আসেন।

বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বসানোয় আপত্তি তোলা রাজশাহীর কাটাখালীর নৌকার মেয়র আব্বাস আলীকে দলে অনুপ্রবেশকারী বলেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা। তার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের ভূমিকা আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে আব্বাসকে নৌকা প্রতীক দিতে সুপারিশ করেছিলেন তারা।

বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ইস্যু নিয়ে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর ওই সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন এখন আব্বাসের শাস্তি দাবি করছেন। আর আব্বাস বলছেন, তিনি বিপদে পড়েছেন, এ জন্য তাকে ঘিরে অপপ্রচার চলছে। তিনি দলে সব সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিই করেছেন।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ২০০২ সালের পর আব্বাস আলী যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। এর তিন বছরের মাথায় তিনি মহানগর যুবলীগের সহসভাপতি পদ পেয়ে যান। এর পর থেকে তিনি রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে থাকেন। দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বিরোধে। এরই জেরে ২০০৭ সালে তিনি যুবলীগের সহসভাপতি পদ থেকে বহিষ্কৃত হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেরাজউদ্দিন মোল্লা। আব্বাস তার সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেন এবং কাটাখালী এলাকায় নিজের আধিপত্য পাকাপোক্ত করেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। পশুর হাটের ইজারাসহ শ্যামপুর বালু মহাল দখলের অভিযোগ ওঠে তার বিরদ্ধে।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান আয়েন উদ্দিন। তখন মেরাজ উদ্দিন মোল্লা হন বিদ্রোহী প্রার্থী। নৌকার প্রার্থী আয়েন উদ্দিনের বিপক্ষে মাঠে ছিলেন আব্বাস ও তার সমর্থকরা। নির্বাচনের সময় বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়ায় আব্বাস বাহিনী।

নির্বাচনে আয়েন উদ্দিন বিজয়ী হলে আব্বাস আবার তার অবস্থান পাল্টান। এমপি আয়েনও তাকে কাছে টেনে নেন নিজের অবস্থান শক্ত করার আশায়। ফলে এমপি বদল হলেও আব্বাসের আধিপত্য থেকেই যায়। এর সুবাদে দলে কোনো পদে না থাকলেও ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর কাটাখালী পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যান আব্বাস আলী। মেয়র হওয়ার পর তার প্রতাপ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয় আব্বাসের। এই সময়ে তার বেপরোয়া আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও ত্যাগী নেতা-কর্মীরা হয়ে যান নিরুপায়।

মেয়র নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর ২০১৮ সালে কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটি (আহ্বায়ক কমিটি) দেয়া হয়। এই কমিটির আহ্বায়ক হন আব্বাস।

২০২০ সালের পৌরসভা নির্বাচনে একটি বড় অংশ তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি তারা। সেবারও আওয়ামী লীগের টিকিট পান মেয়র আব্বাস। দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে আব্বাস হয়ে যান লাগামহীন। নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তিনি থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পৌরসভা ভবনে শুক্রবার প্রতিবাদ সভায় কাউন্সিলররা মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘রাজস্ব আদায় বাবদ পৌরসভার ফান্ডে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ছিল। অথচ এখন চা খাওয়ার টাকাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে পৌর ফান্ডের টাকা গায়েব হয়ে গেছে। বিষয়টি আমি দ্রুত তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন অনুদান দেয়ার জন্য কাটাখালী বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেন মেয়র আব্বাস। কিন্তু সে টাকা কাউকে দেয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

‘কারোনাকালে চা দোকানদারদের অনুদান দেয়ার নামে কয়েক লাখ টাকা পৌরসভার ফান্ড থেকে হাতিয়ে নেন মেয়র। কিন্তু কোনো চায়ের দোকানদার করোনাকালে অনুদান পাননি।’

৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল মজিদ জানান, পৌরসভার কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩৬ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া আছে। ফান্ডে টাকা থাকার পরও মেয়র আব্বাস এই বেতন-ভাতা দেননি। তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোর করে বিভিন্ন কাগজে সই করতে বাধ্য করেন। কেউ সই না করলে তাকে চাকরিচ্যুতিসহ নানা হুমকি দেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ করলে কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গালিগালাজ করতেন মেয়র। আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঠিকাদারী লাইসেন্স করে নগর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ মেয়র নিজে করতেন। আত্মীয়-স্বজনদের নামে হাট-ঘাট ও যানবাহনের টোল আদায়ের ইজারা নিয়েছেন। এসব টোল আদায়ের নামে নিজের লোকজন দিয়ে চাঁদাবাজি করেন।’

পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘মেয়র ভোটের পর থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের কারও সঙ্গে চলেন না। তার সঙ্গে থাকেন বিএনপি নেতারা। কৃষি প্রণোদনাও পায় বিএনপি নেতারা। তার আপন ভাই বিএনপি করে। অন্য এক পক্ষের ভাই করে জাতীয় পার্টি।’

কাঁটাখালি পৌরসভার যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জনি ইসলাম বলেন, ‘মেয়র বিভিন্ন জায়গা দখল করেছেন। স্কুলের জমি দখল করে তার বাড়ি যাওয়ার রাস্তা তৈরি করছেন। জমি দখল করে তার বাবার নামে স্কুল করেছেন। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার দোকানদারদের হয়রানি করে চাঁদাবজি করেছেন। সরকারি খাল দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছেন।’

মেয়র আব্বাসের উত্থান যেভাবে
শুক্রবার ফেসবুক লাইভে এসে কাঁদেন রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী

কাটাখালি পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোত্তালেব বলেন, ‘মেয়রের অপকর্মের শেষ নেই। একেবারে জিরো থেকে হিরো। প্রথম মেয়র হওয়ার সময় তেমন টাকা ছিল না, অথচ এখন এখন তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক।’

তিনি বলেন, ‘৯০ সালের দিকে তিনি (আব্বাস) জাতীয়তাবাদী তরুণ দল করতেন। তারপর তিনি জাতীয় পার্টি করতেন। গোপনে গোপনে জামায়াতের সঙ্গে তার আঁতাত ছিল। তার প্রমাণ হচ্ছে ২০১১ সালের নির্বাচনে দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে বিদ্রোহী হওয়া। ওই নির্বাচনে তিনি নিজেও হারেন, দলীয় প্রার্থীকেও হারান। জিতে যান জামায়াতের নেতা।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের কাছে বৃহস্পতিবার আব্বাসের উত্থান প্রসঙ্গে জানতে চান সংবাদ কর্মীরা। এ সময় তিনি জানান, তাকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়নপত্র দেয়ার দায়িত্ব আসলে মহানগর আওয়ামী লীগের নয়। এটি কেন্দ্রীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করে দেয়। এখানে জেলা আওয়ামী লীগের হয়তো সুপারিশ থাকে। এভাবে হয়তো সুপারিশের ভিত্তিতে নৌকা পেয়ে থাকতে পারেন।

ডাবলু সরকার বলেন, ‘আমরা জানি, আব্বাসের পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার এক ভাই হত্যা মামলার আসামি। তার ভাই যুবদল করে। আমাদের বুঝতে দেরি হয়েছে, তিনি একজন অনুপ্রবেশকারী।’

কার ছত্রছায়ায় তিনি আওয়ামী লীগে প্রবেশ করলেন, দলীয় মনোনয়ন পেলেন, সে বিষয়ে তদন্ত হবে বলেও জানান ডাবলু সরকার।

জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিল কুমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে জানান, ওই সময় কে বা কারা তাকে দলে ঢোকাল, কার সুপারিশে আব্বাস আলী নৌকার মনোনয়ন পেল, এটা তারও প্রশ্ন। তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ওই সময়ের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওই সময়ে পৌর আওয়ামী লীগ এবং থানা আওয়ামী লীগের রেজুলেশনে মনোনয়নের জন্য চার জনের নামের তালিকা দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে আব্বাসের নাম এক নম্বরে দিয়েছিল তারা। আমি আর জেলা সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সম্পাদক, কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক বসেছিলাম।

‘তখন এমপি আয়েন উদ্দিন বলল, আব্বাসকে দিলে আমরা জিততে পারব। প্রস্তাবিত চার জনের নামই আমরা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই তাকে মনোনয়োন দেয়া হয়েছে। কেন্দ্র থেকেই তাকে দেয়া হয়েছে। আমাদের কাছে যে প্রস্তাব এসেছিল সেই প্রস্তাবগুলো আমার শুধু বাহক হিসেবে পৌঁছে দিয়েছি কেন্দ্রে।’

মেয়র আব্বাস আলীর উত্থানের জন্য অনেকে দায়ী করেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আয়েন উদ্দিনের ভূমিকার। তবে আব্বাসের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে তার শাস্তির দাবি করেন এমপি আয়েন।

দলে তার অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা তো অনেক সময় বুঝতে পারি না। যদি বুঝতেই পারতাম...তাহলে জাতির পিতাকে হারাইতাম না। খন্দকার মোশতাকের অনুসারীরা অনেক সময় অনেক ঘটনা ঘটায়। সেটি শুধু দলের নয়, দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখজনক ঘটনা।’

আয়েন বলেন, ‘এটাও সত্য তার (আব্বাস) ভাই যুবদল করত। সে অন্য দলের সঙ্গে জড়িত ছিল। আপনারা নিশ্চই জানেন, এক ভাই বিএনপি করে, এক ভাই আওয়ামী লীগ করে - এটি দেশের অনেক জায়গাতেই আছে। সংসদ সদস্য নির্বাচনে রহিম ভরসা, করিম ভরসার মতো দুই ভাই দু দলের হিসেবে কাজ করেন। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা হয়তো সেটি মনে করেছে।’

অভিযোগের বিষয়ে মেয়র আব্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পৌরসভার ফান্ড থেকে টাকা নেয়ার প্রশ্নই আসে না। অনুপ্রবেশকারী নয়, আমি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। এখন আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’

নৌরুটের দূরত্ব বাড়িয়ে নতুন ভাড়ার পার্সেন্টেজ যোগ করে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

নৌরুটের দূরত্ব নির্ণয় করে এমন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক বেগম সামসুন নাহার বলেন, ‘আমাদের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ দূরত্ব নিয়ে কাজ করে। আমাদের সঙ্গে লঞ্চ মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। মালিকরা বাড়তি সুবিধা নিতে দূরত্ব বাড়িয়ে বলতে পারে, এটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে যে জরিপ আছে, এর বাইরে দিয়ে লঞ্চ যদি ঘুরে ঘুরে যায় তাহলে দূরত্ব বাড়তেও পারে।’

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে নৌপথে লঞ্চভাড়া প্রতি কিলোমিটারে আগের চেয়ে ৬০ পয়সা করে বেড়েছে। এ হিসাবে কম দূরত্বে লঞ্চের ভাড়া ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ ও বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ভাড়া বাড়ানোর আগেই অনেক লঞ্চ বেশি ভাড়া নিত। এবার বেশি ভাড়া আদায়ের জন্য নতুন ফন্দি এঁটেছে ঢাকা থেকে বিভিন্ন রুটে চলা লঞ্চগুলো। নৌরুটের দূরত্ব বাড়িয়ে নতুন ভাড়ার পার্সেন্টেজ যোগ করে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকায় উল্লেখ আছে ঢাকা টু হাতিয়া নৌরুটের দূরত্ব ২০৩ কিলোমিটার।

তবে ৮ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ প্রকাশিত ভাড়ার তালিকায় ঢাকা টু হাতিয়া রুটের দূরত্ব ২৩৩ কিলোমিটার হিসাব করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাতিয়াগামী ফারহান-৪ লঞ্চের চালক হারুনুর রহমান মাস্টার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত এই রুটে লঞ্চ চালাই। জিপিএস ব্যবহার করি, কতটুকু যাই আসি তা আমাদের জানা। ঢাকা টু হাতিয়ার দূরত্ব ১০৫ নটিকাল মাইল (১৯৪ কিলোমিটার)। এখন আরও শর্টকাটে যাওয়া যায়, তাই দূরত্ব আরও কম লাগে। দূরত্ব বাড়ার প্রশ্নই আসে না।’

ডিজেলের দাম বাড়ায় লঞ্চে প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৩০ পয়সা করা হয়েছে। প্রথম ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী ২০৩ কিলোমিটারে আগের ভাড়া ৩১৪ টাকা। বাড়ানোর পরে বর্তমান ভাড়া আসে ৪৩৬ টাকা। নতুন তালিকা অনুযায়ী ২৩৩ কিলোমিটারে আগের ভাড়া ৩৫৬ টাকা, এখনকার ভাড়া ৪৯৬ টাকা।

যাত্রীরা জানালেন, ঢাকা-হাতিয়ায় আগে নিত ৩০০, এখন নিচ্ছে ৫০০ টাকা। চালকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪ কিলোমিটার হিসাবে আগের ভাড়া আসে ৩০১ টাকা।

ঢাকা থেকে ভোলার চরফ্যাশনের বেতুয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকায় উল্লেখ আছে এ রুটের দূরত্ব ২০৩ কিলোমিটার।

৮ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ প্রকাশিত তালিকায় ঢাকা-বেতুয়ার দূরত্ব ২৪৬ কিলোমিটার দেখিয়ে নতুনভাবে ভাড়া ঠিক করা হয়েছে।

এই রুটে চলা ফারহান-৫ লঞ্চের ইনচার্জ রিয়াদ বলেন, ‘বেতুয়ার দূরত্ব আমি জানি না। বাইরে বিআইডব্লিউটিএর সাইনবোর্ড টানানো আছে, ওখানে যা আছে তাই।’

যাত্রীরা জানালেন, ঢাকা-বেতুয়ায় আগে ৩০০-৩৫০ টাকা নেয়া হতো, এখন ৫০০ টাকা নেয়া হচ্ছে।

বেতুয়াগামী যাত্রী মেহেদী আরিফ বলেন, ‘ভোলার লঞ্চ মালিকরা অনেক প্রভাবশালী ও বিত্তশালী। ওরা যা ইচ্ছা তা করতে পারেন। সরকারের যেসব সংস্থা নৌপথের দূরত্ব নির্ণয় করে, তারা যেন নতুনভাবে সঠিক দূরত্ব নির্ণয় করে বিআইডব্লিউটিএ এবং লঞ্চ কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয়, এই অনুরোধ করব। এটি হলে যাত্রীরা সঠিক দূরত্বের ভাড়া দিতে পারবে।’

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’
বিআইডব্লিউটিএর বেঁধে দেয়া ভাড়ার তালিকা

বাড়তি দূরত্বের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এখন নদীর বিভিন্ন স্থানে চর পরে, লঞ্চ ঘুরে যেতে হয়, তাই হয়তো বা দূরত্ব বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কোনো লঞ্চে যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করে সে জন্য আমাদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে লঞ্চে মনিটর করছি। সোমবার থেকে বিআইডব্লিউটিএ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অতিরিক্ত ভাড়া না নিতে মোবাইল কোর্ট বসাবেন। বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে ওই লঞ্চের যাত্রা বাতিল করব।’

নৌরুটের দূরত্ব নির্ণয় করে এমন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক বেগম সামসুন নাহার বলেন, ‘আমাদের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ দূরত্ব নিয়ে কাজ করে। আমাদের সঙ্গে লঞ্চ মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। মালিকরা বাড়তি সুবিধা নিতে দূরত্ব বাড়িয়ে বলতে পারে, এটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে যে জরিপ আছে, এর বাইরে দিয়ে লঞ্চ যদি ঘুরে ঘুরে যায়, তাহলে দূরত্ব বাড়তেও পারে।’

অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (জাপ) সংস্থার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন বলেন, ‘যাত্রীরা কোভিডের সময় ৬০ ভাগ বাড়তি ভাড়া দিয়ে অভ্যস্ত। তাই এখন ভাড়া নিয়ে কথা বলার প্রশ্ন আসে না।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ‘স্পেশাল খালা’ হাজেরা বেগমের হুইলচেয়ার আটকে রাখার ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। ছবি: সংগৃহীত

ঘটনাটি সরাসরি ফেসবুকে লাইভের সময় হুইলচেয়ার কেড়ে নেয়া নারীর পরিচয় বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ওই নারীর নাম হাজেরা বেগম। তিনি হাসপাতালটিতে ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত শুক্রবার গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে একজন মুমূর্ষু রোগী নিয়ে আসেন স্বজনেরা। সেই রোগীকে হাসপাতালের ভেতর নিতে প্রয়োজন হুইলচেয়ার। তবে হুইলচেয়ারের জন্য দেড়শ টাকা দাবি করে বসেন হাসপাতালের এক নারী।

এই টাকা না পেয়ে মুমূর্ষু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে রেখেই হুইলচেয়ার কেড়ে নিয়ে ওই নারী চলে যেতে উদ্যত হন। এ সময় তার সঙ্গে একজনের বাগবিতণ্ডার ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। প্রায় ২৫ মিনিট পর ওই রোগীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান স্বজনেরা।

ঘটনাটি সরাসরি ফেসবুকে লাইভের সময় হুইলচেয়ার কেড়ে নেয়া নারীর পরিচয় বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ওই নারীর নাম হাজেরা বেগম। তিনি হাসপাতালটিতে ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত।

হাসপাতালটির কর্মকর্তারা জানান, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার নিজস্ব কর্মীর অভাবে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে ট্রলি-হুইলচেয়ার বাণিজ্য। রোগীপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে তাদের।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

ট্রলি বা হুইলচেয়ার টানার কাজ যারা করছেন তারা ‘স্পেশাল বয়’ বা ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত। হাজেরা বেগম এমনই একজন ‘স্পেশাল খালা’। সিন্ডিকেটের সদস্যরা ২৪ ঘণ্টাই পালাক্রমে হাসপাতালে অবস্থান করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চতুর্থ শ্রেণির বেশ কয়েকজন কর্মচারী নিয়ন্ত্রণ করেন এই সিন্ডিকেট। কমিশনের ভিত্তিতে তারা সিন্ডিকেটের সদস্যদের নিয়োগ দেন। হাসপাতালের কর্মী নন এমন অন্তত ১০০ জন ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার কাজ করছেন।

এই হাসপাতালে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্পেশাল বয় ও খালাদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড সর্দার টুলু হাওলাদার, কিরণ মিয়া ও রায়হান মিয়া। তারা প্রকাশ্যে হুইলচেয়ার-ট্রলি বাণিজ্য করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’

সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলি আর হুইলচেয়ার নিয়ে রোগীর অপেক্ষায় আছেন অন্তত ১৫ জন স্পেশাল বয় ও খালা। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী এলেই তার কাছে ছুটে যাচ্ছেন। স্বজনেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা হুইলচেয়ার বা ট্রলিতে রোগী তুলে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়ার্ডেও রোগী নিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এমনকি রোগীর শরীরের তাপমাত্রা কেমন সেটাও এই স্পেশাল বয় ও খালাদের কাছ থেকে চিকিৎসকেরা জেনে নিচ্ছেন। করোনা সংক্রমণের ভয়ে রোগীর কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখছেন চিকিৎসকেরা। আর রোগীদের ‘সেবা দেয়ার বিনিময়ে’ স্বজনদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা নিচ্ছেন স্পেশাল বয় ও খালারা।

আসিয়া বেগম নামে এক ‘স্পেশাল খালা’ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি এই হাসপাতালের কেউ না। তবে পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। বাসা কেরানীগঞ্জ। প্রতিদিন ভোরে হাসপাতালে আসি। বেলা ২টা পর্যন্ত কাজ করে চলে যাই। প্রতিদিন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হয়।’

এ কাজের জন্য হাসপাতাল থেকে কোনো বেতন পান কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক টাকাও দেয় না। বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিদিন বিনা বেতনে ধোয়ামোছার কাজ করি। হাসপাতাল পরিষ্কার করি। এ জন্য এক টাকাও তারা দেয় না, তাই হুইলচেয়ার থেকে টাকা নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী এলে এভাবেই ছুটে যান ‘স্পেশাল বয়’ বা ‘স্পেশাল খালা’

ঢাকার বাইরে থেকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন আমিরুল ইসলাম। অ্যাম্বুলেন্সটি হাসপাতালের সামনে থামার সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি নিয়ে হাজির হন এক যুবক। জরুরি বিভাগে রোগী নেয়ার জন্য ১৫০ টাকা দাবি করেন। আমিরুল সেই টাকা দিয়েই বাবাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।

নিউজবাংলা প্রতিবেদক সোমবার বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে স্পেশাল বয় ও খালাদের তৎপরতা দেখলেও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. খলিলুর রহমানের দাবি, হাজেরা বেগমের ঘটনাটি জানার পর চক্রের সবাইকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

জনবল সংকটের কারণেই এমন সমস্যা তৈরি হয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘হুইলচেয়ার ও ট্রলি পরিচালনার জন্য হাসপাতালে অল্প কিছু লোক নিয়োগ দেয়া রয়েছে। এই সংখ্যা অনেক কম। এ কারণেই কিছু লোক সুযোগ নিচ্ছে। তাদের স্পেশাল বয় ও খালা বলে ডাকা হয়। হাসপাতাল থেকে তাদের কোনো বেতন দেয়া হয় না।’

রোগীর স্বজনের কাছে টাকা দাবি করা হাজেরার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘তাকে (হাজেরা) হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। উনারা আমাদের স্টাফ না, যে কারণে প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঝামেলা করেন। এ ঘটনার পর তাদের সবাইকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।’

হাসপাতালে এখনও স্পেশাল বয় ও খালাদের উপস্থিতি দেখার তথ্য জানানো হলে পরিচালক বলেন, ‘আমরা যখন অভিযানে যাই, তখন কাউকে পাই না। মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আমি ইতোমধ্যে আদেশ দিয়েছি দেখামাত্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

স্পেশাল বয় ও খালাদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে নাম আসা জরুরি বিভাগের সর্দার রায়হান মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জরুরি বিভাগে তিনজন ওয়ার্ড সর্দার আছে। ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার জন্য যারা আছে তাদের আমরা তিন শিফটে ভাগ করে দিয়েছি। এদের দেখভাল আমাদেরই করতে হয়।’

কমিশন নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন অভিযোগ সত্যি না। কেউ আপনাকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। আমাদের কেউ এ ধরনের ঘটনায় জড়িত নয়। আমরা হাসপাতাল থেকেই বেতন পাই।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শুক্রবার রাতে নিয়ে আসা মুমূর্ষু রোগীর অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে জানা গেছে, তাকে পরে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতালের নার্স রুবিনা আক্তার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। তবে সে সময় হাসপাতালে একটি আইসিইউও খালি ছিল না। এ কারণে রোগীর স্বজনেরা সেই রাতেই তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের দেয়ালজুড়ে ক্ষোভ-হাহাকার লিখে রেখেছেন সেবাগ্রহীতারা। ছবি: নিউজবাংলা

অসংখ্য মানুষ তাদের হাহাকার আর ক্ষোভের কথা লিখে রেখেছেন পাসপোর্ট অফিসের দেয়ালজুড়ে। দালালের দৌরাত্ম্য, লোকবল সংকট আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

‘ফাগলা কুত্তায় কামরাইলে পাসপোর্ট অফিসে আইয়ো’- সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের ভেতর দিককার দেয়ালে লিখে রেখেছেন কেউ একজন।

‘ফাগলা কুত্তা’ মানে পাগলা কুকুর। এই আক্ষেপ কার- জানেন না কেউ। তবে আরও অনেকে তাদের নাম বা মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ করেও লিখেছেন দুর্ভোগের কথা।

এই দেয়ালেই কাদির আহমদ নামের একজন নিজের মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘এতো কষ্ট জানলে আগে আইতাম না।’

ওই মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে কাদির নিশ্চিত করেন তিনিই বাক্যটি লিখেছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হারা দিন ধরি লাইনে উবাইয়া (না খেয়ে) আছলাম। কিচ্ছু খাইতে পারছি না। পানিও না। বাইর হইলেই যদি সিরিয়াল মিস করি লাই, ডরে তাই লাইন ছাড়ছি না। খুব বিরক্ত লাগছিল। একদিকে ক্ষুধা, আরেক দিকে সারা দিন উবাইয়া (না খেয়ে) থাকিয়া পাওয়ো (পায়ে) বেদনা, বিরক্তি, সব মিলিয়া কান্দতে (কাঁদতে) ইচ্ছা করছিল। এর লাগি মনের দুঃখে দেওয়ালো (দেয়ালে) ইতা লেখছি।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

পাসপোর্ট আবেদন জমা দেয়ার সময় নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, সকাল ৭টায় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রাত ৮টায় বের হয়ে আসেন। একের পর এক লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সেদিন জীবনের সবচেয়ে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

কাদিরের মতো অসংখ্য মানুষের হাহাকার, ক্ষোভের কথা ছড়িয়ে আছে পাসপোর্ট অফিসের ভেতর দিকের দেয়ালজুড়ে।

দালালের দৌরাত্ম্য, লোকবল সংকট আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ আর হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। সারা দিন পেরিয়ে রাত পর্যন্ত পাসপোর্ট আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন লেগে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লকডাউনের পর বিশ্ব শ্রমবাজার খুলে যাওয়া ও শিক্ষার্থী ভিসায় বিদেশ যাওয়ার হিড়িকের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পাসপোর্ট আবেদনের হার অনেক বেড়েছে। এই চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দেয়ালজুড়ে হাহাকার

সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের অবস্থান। অফিসের ফটক দিয়ে ঢুকলেই পাসপোর্টের আবেদন জমা ও পাসপোর্ট গ্রহণ করার আলাদা কাউন্টার। এরপর একটি সরু গলি পেরিয়ে পাসপোর্টের জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার একাধিক কাউন্টার। ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় আবেদনকারীদের। ফলে সব সময় ভিড় লেগে থাকে।

এখানকার দেয়ালের রং হলদেটে সাদা। তবে ক্ষোভ-হাকারের অক্ষরে এই রং হারিয়ে ফেলেছে দেয়ালটি। পুরো দেয়ালজুড়ে এখন কালো ছোপ ছোপ, লালও আছে কোথাও। কলমের কালিতে দেয়ালজুড়ে নিজেদের দুর্ভোগ আর তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন পাসপোর্টগ্রহীতারা।

বেশির ভাগ লেখাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু বেশ পরিষ্কার।

একজন লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট তৈরি করতে আসলে কিয়ামতের ডাক এসে যাবে। তাই টিফিনসহ যাবতীয় জরুরি জিনিস সাথে আনবেন। নইলে বুঝবেন ঠেলা কাকে বলে কত প্রকার ও কী কী?’

আরেকজন লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট অফিস আমারে দেশ ছাড়ার শিক্ষা দিল!’

এই লেখার নিচে ইংরেজি হরফে লেখা জুবায়ের আহমদ।

এর পাশেই লেখা, ‘ভাইরে সারা জীবন মনো থাকবো’, ‘যত জীবন বাচমু মনো থাকবো রে ... (গালি)’, ‘সকাল ৬টা থেকে অপেক্ষা করতেছি। উৎসাহ পেলে সারাজীবন করবো। হাহা খুব মজা লাগতেছেরে ভাই।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

একজন লিখেছেন, ‘কারো মরার ইচ্ছে হইলে পাসপোর্ট অফিসে আসুন’, একটি বাক্য এমন- ‘জীবনে যা গুণাহ করছি তার প্রায়শ্চিত্ত।’

দেয়ালে আরও লেখা আছে, ‘বাংলাদেশে যত দুর্নীতি আছে, তার বেশিরভাগই পাসপোর্ট অফিসে হয়’, ‘আমি নিজ ইচ্ছায় স্বীকার করছি, স্কুলে এসএমব্লি (এসেম্বলি) ভাগার জন্য এই শাস্তি’, ‘জীবনে যা পাপ করেছি তার ফল।’

সৌরভ নামে একজন লিখেছেন, ‘সকাল ৮টা থাকি রাইত ৯টা পর্যন্ত উবা (না খাওয়া)। মাদার বোর্ড হকল।’

সেবাগ্রহীতাদের এ রকম অসংখ্য অভিযোগ আর হাহাকার ধারণ করে আছে এই দেয়াল।

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দেয়ালের এই লেখাগুলো চোখ এড়ায়নি সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক একেএম মাজহারুল ইসলামের।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। সেই দুর্ভোগের কথা তারা দেয়ালে লিখে রাখছে। তবে আবেদনকারীদের তো একদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়, কিন্তু আমাদের প্রতিদিন এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। কিন্তু অতিরিক্ত আবেদনের চাপে আমাদের সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অফিস করতে হয়। তখন পর্যন্ত ভিড় থাকে। আমাদের এই দুর্ভোগের কথা আমরা কোথায় লিখব!’

পাসপোর্ট অফিসে এক ঘণ্টা

পাসপোর্ট অফিসে দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ও বাইরে চারটি লাইন। চারটি লাইনের প্রতিটিতেই দাঁড়িয়ে আছেন শতাধিক মানুষ। একটি লাইন আবেদন জমা দেয়ার, একটি রোহিঙ্গা পরীক্ষা আর অপর দুটি ফিঙ্গার প্রিন্টের।

আবেদন জমা দেয়া আর রোহিঙ্গা পরীক্ষার লাইনগুলো অফিস ভবনের বাইরে। খোলা আকাশের নিচে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন গ্রহীতারা।

শোয়েব আহমদ নামে এক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ হঠাৎ করে লাইনের বাইরে থেকে আসা একজনের আবেদন পরীক্ষা করা হচ্ছে। এভাবে মাঝে মাঝেই লাইন ভেঙে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।’

তবে রোহিঙ্গা পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মী এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন, যদিও তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ফিঙ্গার প্রিন্টের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সজল মালাকার বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু সামনে এগোচ্ছেই না। খুব মন্থর গতিতে কাজ চলছে। এভাবে চলতে থাকলে সারা দিনেও এই লাইন শেষ হবে না।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দোতলায় পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে গিয়েও দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। এই লাইনে দাঁড়ানো সবাই নানা অভিযোগ নিয়ে এসেছেন।

তাদের একজন সালেহ আহমদ। মাস দেড়েক আগে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিয়েছিলেন। নির্ধারিত তারিখ পেরিয়ে গেলেও তার পাসপোর্ট আসেনি। পাসপোর্ট বিতরণ কাউন্টারের লোকজন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এরপর পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন সালেহ।

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলামের কক্ষে ঢুকে সালেহ আহমদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি সালেহকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে আসেন।

এরপর তার আবেদনপত্রের স্লিপ কম্পিউটারে পরীক্ষা করে বলেন, ‘সালেহ আহমদ পাসপোর্টের আবেদনে নিজের নামের যে বানান লিখেছেন, তার সঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের বানানের মিল নেই। এক জায়গায় ‘ই’ এর বদলে ‘এ’ লিখেছেন তিনি। ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে সামান্যতম ভুল থাকলেও পাসপোর্ট দেয়া হয় না। ঢাকা থেকেই এটি করা হয়। এতে আমাদের কিছু করার থাকে না।’

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এখানে এ ধরনের সমস্যাই বেশি। মানুষজন আবেদনে ভুল করেন। এরপর আমাদের দোষারোপ করেন।’

ই-পাসপোর্ট আবেদনকারীদের সব তথ্য সঠিকভাবে দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

আবেদনের এই ভুল প্রসঙ্গে সালেহ আহমদ বলেন, ‘আমি তেমন লেখাপড়া জানি না। ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন করেছিলাম। আবেদন জমা দেয়ার সময় পাসপোর্ট অফিসের কর্মীরাও ভুল থাকার কথা বলেননি। এখন বলা হচ্ছে ভুল ছিল।’

পরিচালকের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে কথা হয় আশরাফ আলী মণ্ডল নামে আরেক আবেদনকারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার নাম আনসার আলী মণ্ডল। আমার সব সার্টিফিকেটে এমনটিই লেখা রয়েছে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে আমার বাবার নামের শেষাংশের ‘মণ্ডল’ যুক্ত করা হয়নি। আমি আমার পাসপোর্টের আবেদনে বাবার পুরো নামটাই লিখেছিলাম। এখন পাসপোর্ট আটকে দেয়া হয়েছে।’

আবেদনকারী আনসার আলী বলেন, ‘আমি উচ্চ শিক্ষা নিতে যুক্তরাজ্যে যাব। আগামী মাসেই আমার সেখানে পৌঁছানোর কথা। এখন পাসপোর্ট না পেলে আমি যাব কীভাবে?’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

অভিযোগের অন্ত নেই

সিলেট পাসপোর্ট অফিস নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই গ্রাহকদের। অনিয়ম, দুর্নীতি আর মানুষজনকে অহেতুক হয়রানির অভিযোগ এই অফিসের কর্মরতদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, পাসপোর্ট অফিস ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি দালাল সিন্ডিকেট। এই দালালদের মাধ্যমে আবেদন এলে আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। দ্রুতই সব কাজ হয়ে যায়। আর দালালদের মাধ্যমে না এলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাকিল আহমদ চৌধুরী বলেন, “আমি অনলাইনে আবেদন করি। কিন্তু ‘গিভেন নেম’ না লেখার কারণ দেখিয়ে আমার আবেদন বাতিল করা হয়। কিন্তু অনলাইনে সংশোধন করার ব্যবস্থা নেই। পাসপোর্ট অফিসের লোকজন এটি সংশোধন করতে পারেন, তবে তারা করেননি। অথচ দালালদের মাধ্যমে যারা আবেদন করেন তাদের এ রকম ভুল থাকলেও কোনো সমস্যা হয় না।”

একাধিক পাসপোর্টগ্রহীতার অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্টের আবেদন করলে আবেদনের ফরমে তারা একটি চিহ্ন দিয়ে দেয়। এই চিহ্ন থাকলে আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। আবেদনে ছোটখাটো ভুল থাকলেও সমস্যা হয় না, কিন্তু দালাল ছাড়া এলেই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আবেদনকারী জানান, একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে বাড়তি এক হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্টের আবেদন করেন তিনি। আবেদন ফরম পূরণ করাসহ বাকি সব প্রক্রিয়া ওই ট্রাভেল এজেন্সিই করবে।

অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্রাভেল এজেন্ট অফ বাংলাদেশের (আটাব) সিলেট অঞ্চলের সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য হয়রানি নিয়ে অনেকেই আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট জমা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মানুষজনের এমন হয়রানি দূর করতে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদেরই উদ্যোগী হতে হবে।’

তবে দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এখন তাদের একেবারে উৎপাত নেই। আমি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সব মনিটর করি। এখন কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। তবে আবেদনের চাপ বাড়ায় মানুষজনকে কিছু দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

লোকবল সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি

পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন তরুণ চিত্রশিল্পী দ্বীপ দাস। সেই আবেদন জমা দিতেই দুদিন লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে।

দীপ দাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আগের দিন সকাল থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সারা দিন পর বলা হয়, সার্ভার নষ্ট। পরদিন সকাল ৭টা থেকে আবার লাইনে দাঁড়াই। এরপর দুপুরের দিকে আমার ছবি তোলা ও ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হয়।’

এমন দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন আরও অনেক পাসপোর্টগ্রহীতা। লোকবল সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন পাসপোর্ট অফিসের সংশ্লিষ্টরা।

পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক একেএম মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এই অফিসে ৩২টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১৯ জন। ডিএডি, অ্যাকাউন্টেন্ট ও কয়েকটি অপারেটরের পদ খালি রয়েছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি এখানে সব সময় লেগে থাকে। সার্ভার বিকল হয়ে যায়। নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকে। আজকেও জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষার সার্ভার নষ্ট। এগুলো ঢাকা থেকে ঠিক না করলে আমাদের কিছুই করার থাকে না। এ কারণে মানুষজনকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘লকডাউনের পর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ আবেদন গ্রহণ করতে হচ্ছে। আমার ২০ বছরের চাকরিজীবনে এ রকম চাপ কোনো দিন দেখিনি। অথচ এই চাপ সামলানোর মতো লোকবল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি আমার নেই। ফলে এখানে সব সময়ই ভিড় থাকে। মানুষ এসব সমস্যা বুঝতে চায় না। তাদের দুর্ভোগের পাশপাশি আমাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যা নিয়ে চলছে বিতর্ক। ছবি: সংগৃহীত

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিআরটিএ থেকে শুরু করে পরিবহন খাত নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষ, এমনকি বাস মালিক সমিতি কারও কাছেই এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নেই। রাজধানীর যেসব পেট্রল পাম্প বা সিএনজি স্টেশন থেকে বাসের জ্বালানি সরবরাহ করা হয়, সেখান থেকেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেকটা ধারণার ভিত্তিতে প্রচার হচ্ছে সিএনজিতে ৯৫ শতাংশ বাস চলার তথ্য।    

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরই বাসের ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নামেন মালিকেরা। তাদের আকস্মিক ধর্মঘটের মুখে সরকার বাস ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

সরকারের সঙ্গে মালিকপক্ষের সমঝোতা অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাস ভাড়া ২৭ শতাংশ এবং মহানগরে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই বাড়তি ভাড়া কার্যকর হয়েছে শুধু ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রে, সিএনজিচালিত পরিবহনের ভাড়া আছে আগের মতোই। তবে সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে প্রথম দিনেই।

সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে চলা বাসের কত শতাংশ ডিজেল ও সিএনজিচালিত? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ঢাকায় বর্তমানে যত বাস চলাচল করে তার ৯৫ শতাংশই জ্বালানি হিসেবে সিএনজি ব্যবহার করে। ডিজেলে চলে মাত্র পাঁচ শতাংশ বাস। সারা দেশেও শতাংশের এই হারটি প্রায় একই।

তবে এই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিউজবাংলার অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, বিআরটিএ থেকে শুরু করে পরিবহন খাত নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষ, এমনকি মালিক সমিতি কারও কাছেই এ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান নেই। রাজধানীর যেসব পেট্রল পাম্প বা সিএনজি স্টেশন থেকে বাসের জ্বালানি সরবরাহ করা হয় সেখান থেকেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এসব পেট্রল পাম্প বা সিএনজি স্টেশনসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঢাকায় অর্ধেকের বেশি বাস এখন ডিজেলচালিত। কোনো কোনো বাসে ব্যবহার করা হচ্ছে দুই ধরনের জ্বালানি।

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

জার্মানভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমের বাংলা সংস্করণের প্রতিবেদনে বিআরটিএর বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় ৯৫ শতাংশ বাসই এখন সিএনজিচালিত৷ এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার ভেতরে মোট বাস ১২ হাজার ৫২৬টি৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হজার ৯০০টি৷ ডিজেলে চলে ৬২৬টি৷ ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস মোট ১৬ হাজার৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হাজার ২০০৷ ডিজেলে চলে চার হাজার ৮০০৷ সারা দেশে মোট বাস ৭৮ হাজার৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ৪৬ হাজার ৮০০টি৷ ডিজেলে চলে ৩১ হাজার ২০০টি৷’

তবে বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকাসহ সারা দেশে এখন ডিজেল ও সিএনজিতে কত বাস চলছে, সে বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। ২০০৮ সালে এ বিষয়ে পরিসংখ্যান তৈরির একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

বিআরটিএ-এর পরিচালক (সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি) মাহবুব ই রাব্বানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের ডেটাবেজে এ তথ্যগুলো নেই। কোন কোন কোম্পানির বাস গ্যাসে চলে সেই ডেটাবেজও নেই। ফুয়েলের ওপর নির্ভর করে আমাদের কোনো ডেটাবেজ এখন পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘২০০৮-২০০৯ সালের দিকে যখন ডেটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন বেশির ভাগ বাস সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছিল। পরে রূপান্তরিত গাড়ির সমস্যার কারণে অনেকে আবার তেলে ফিরে আসে। এর পরে আর গ্যাসের বাস নামেনি।’

বিআরটিএর বরাতে ঢাকার ৯৫ শতাংশ গাড়ি গ্যাসে চলার তথ্য নাকচ করে মাহবুব ই রাব্বানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গ্যাসের বাস পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের বেশি আছে বলে আমার মনে হয় না। এখন সিএনজিচালিত বাস কেউ নামায় না, বেশির ভাগই ডিজেলচালিত।’

ডিজেলে বাস বেশি চলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে যখন গ্যাসের দাম কম ছিল তখন গাড়ি গ্যাসে চলে গিয়েছিল। পরে গ্যাসের দাম বাড়া এবং ইঞ্জিন না টেকার কারণে গাড়িগুলো তেলে চলতে শুরু করে। আর এখন তো গ্যাসের দাম অনেক বেশি। গ্যাসে আগের সুবিধা পায় না বলেই মালিকেরা তেলে ফিরেছে।’

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকে, ‘৯৫ শতাংশ বাস সিএনজিতে চলার’ তথ্য দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বরাতে। এই তথ্যের উৎস জানতে চাইলে মোজাম্মেল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা এই তথ্য বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে পেয়েছি।’

তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উনাকে (মোজাম্মেল হক চৌধুরী) এমন কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির কয়েকটি কারণ আছে। আমি মনে করি, ২০১৫ সালের দিকে সিএনজির দাম যখন বাড়ানো হয়, তখন বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বা শ্রমিক ফেডারেশন অনেকটা জোর গলায় বলেছিল, তাদের অধিকাংশ বাস সিএনজিতে চলে। সিএনজির দাম বেড়েছে, ফলে ভাড়া বাড়াতে হবে। আমার মনে হয়, ওটা ধরেই তিনি (মোজাম্মেল) কথাটা বলেছেন।’

ঢাকা শহরে মাত্র ৫ শতাংশ গাড়ি সিএনজিতে চলে, এমন দাবিকে একেবারেই ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এটা আমার কাছে একেবারেই অসম্ভব মনে হয়।’

বুয়েটের এআরআই ২০১৯ সালে খুব স্বল্প পরিসরে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের জন্য একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। ওই প্রকল্পকেন্দ্রিক গণপরিবহনের মাত্র ২৫ মালিকের সঙ্গে কথা বলে সমীক্ষাটি করা হয়। এতে দেখা যায়, সুনির্দিষ্টভাবে ওই রুটের ২৫ জন মালিকের ৮০ ভাগ গাড়ি চলে সিএনজিতে, আর ২০ ভাগ গাড়ি চলে ডিজেলে।

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

হাদিউজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সে সময় কিন্তু একটি ছোট স্যাম্পল নিয়ে কাজ করেছি। এতে বাসমালিকদের বাসের সংখ্যা বিবেচনা করা হয়নি। এই স্যাম্পল থেকে আমরা দেখতে পেয়েছি, ৮০ ভাগ মালিক বলছেন তারা সিএনজি দিয়ে গাড়ি চালান।

‘পুরো ঢাকা শহরের যত বাস চলে সবগুলোর ওপর জরিপ করা হলে যেটা আমি বলছি ৮০ ভাগ, সেটা ৫০ ভাগেও নামতে পারে।’

এর আগে ২০১০ সালে বুয়েট আরেকটি গবেষণা করেছিল, সেখানে দেখা গেছে ৭০ শতাংশ গাড়ি সিএনজিতে চলে। অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘২০১০ সালে ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে সার্ভে করা দেখা হয়েছিল। তখন ৭০ শতাংশ গাড়ি সিএনজিচালিত তথ্য পাওয়া গেছে।’

তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের যে গবেষণা, সেখানে আমরা অল্প স্যাম্পল নিয়েছিলাম। সেটাকেই অনেকে ভুল করে ৮০ ভাগ মনে করছে। প্রাইভেট গাড়ির ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। ২০১০ সালে দেখেছি ৮২ ভাগ, ২০১৬ সালে এসে সেটা ৯০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। তার মানে সবকিছুই বাড়তির দিকে। সেই হিসাবে তারা অনুমান করে নিচ্ছে এটাও (সিএনজিচালিত গণপরিবহন) ৯০ ভাগের বেশি।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বাস ও মিনিবাস চলাচল করে। সাড়ে ১২ হাজারের মতো অনুমোদিত বাস আছে, যা ঢাকা শহরে চলতে পারবে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার চলছে।’

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনের চিত্র কী

ঢাকায় সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের সংখ্যা কেমন, সে বিষয়ে ধারণা পেতে নগরীর মিরপুর ও গাবতলী এলাকার ১৯টি পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

এর মধ্যে গাবতলী এলাকায় গ্যাস ও তেলের পাম্প ছিল আটটি ও মিরপুর এলাকার ১১টি।

গাবতলী এলাকার মোহনা ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ইউনুস আলী নিউজবাংলাকে জানান, তাদের পাম্প থেকে প্রতিদিন গড়ে ঢাকা সিটির ১২০টি বাস তেল নেয়। একই পাম্প থেকে কোনো বাস গ্যাস নেয় না।

শাহানাজ ফিলিং স্টেশনের হেড অফ অ্যাকাউন্টস সুমন খন্দকার জানান, তাদের পাম্প থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১৫০ বাস তেল নেয়। এসপি ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মাধব কর্মকার জানান, তারা প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ বাসে তেল সরবরাহ করেন। এই ফিলিং স্টেশন থেকেও কোনো বাস গ্যাস নয় না।

যমুনা ফিলিং স্টেশন শুধু জ্বালানি তেল বিক্রি করে। এখানকার কর্মী সহিদুল জানান, তারা কোনো বাসে তেল বিক্রি করেন না। অন্যদিকে নাভানা সিএনজি স্টেশনের শিফট ইনচার্জ ইমাম হোসেন জানান, তারা সাধারণত বাসে গ্যাস সরবরাহ করেন না।

ডেনসো সিএনজি পাম্প থেকে দিশারি পরিবহনের একটি বাস গ্যাস নেয় বলে জানান ক্যাশিয়ার আকবর হোসেন। আর পূর্বাচল গ্যাস ফিলিং স্টেশনের ইঞ্জেক্টর বশির আহমেদ নিউজবাংলাকে জানান, তারা আশীর্বাদ পরিবহনের দুটি বাসে গ্যাসের জোগান দেন।

মিরপুর-১২ থেকে তালতলা পর্যন্ত আটটি গ্যাস স্টেশন ও তিনটি পেট্রল পাম্প রয়েছে।

এই এলাকার রিফুয়েলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টার থেকে শিকড়, বিহঙ্গ, আশীর্বাদ ও বিআরটিসি পরিবহনের ৫০ বাস প্রতিদিন গ্যাস নেয় বলে জানান স্টাফ মো. রুবেল। ইন্ট্রাকো সিএনজি অ্যান্ড এলপিজি থেকে সেফটি, মিরপুর লিংক, আশীর্বাদ ও বিহঙ্গ পরিবহনের ৪০টি বাস গড়ে প্রতিদিন গ্যাস নেয় বলে জানান ম্যানেজার মাসুদ।

স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশনের সুপারভাইজার আলাউদ্দিন জানান, সেফটি, বিকল্প ও মিরপুর লিংকের তিনটি বাসে তারা গ্যাস দেন। মিনারভা সিএনজি স্টেশনের আপারেটর নজরুল ইসলাম জানান, তাদের পাম্প থেকে কোনো বাস গ্যাস নেয় না। আর ঢাকা সিএনজি লিমিটেডের ইঞ্জিনিয়ার মোক্তার হোসেন জানান, বিহঙ্গ পরিবহনের পাঁচটি বাসে তারা গ্যাস সরবরাহ করেন।

শাহজালাল সিএনজি স্টেশনের ম্যানেজার সারোয়ার হোসেন জানান, তারা পাঁচটি বাসে গ্যাস দেন। নাম প্রকাশ না করে মনি সিএনজি স্টেশনের এক কর্মী জানান, তিনটি বাস গ্যাস নেয় তাদের স্টেশন থেকে।

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

অন্যদিকে, সোবহান ফিলিং অ্যান্ড সারভিসিং স্টেশন থেকে প্রতিদিন ১৫টি বাসে তেল নেয় বলে জানান সুপারভাইজার মাসুদ ইসলাম। এনার্জি প্লাসের ইঞ্জিনিয়ার তাপস রায় জানান, তাদের কাছ থেকে কোনো বাস গ্যাস নেয় না। এএস ফিলিং স্টেশনের কর্মী লুৎফর রহমান জানান, তারা প্রতিদিন গড়ে চারটি বাসে তেল সরবরাহ করেন। আর তালতলা এলাকার ফাসান ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার সুজন মিয়ার হিসাবে, তাদের কাছ থেকে তেল নেয় প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি বাস।

নিউজবাংলা যে ১৯টি পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনের তথ্য পেয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুই এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৬২৮টি গাড়ি তেল ও গ্যাস নিচ্ছে। এর মধ্যে ৫১৯টি গাড়ি তেল নিচ্ছে, আর ১০৯টি নিচ্ছে সিএনজি। এই হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজেলচালিত গাড়ি ৮২.৬৪ শতাংশ এবং গ্যাসে চলছে ১৭.৩৬ শতাংশ বাস। তবে অনেক বাস মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার করায় শতাংশের প্রকৃত হিসাব বের করা কঠিন।

কী বলছেন বাসমালিক-শ্রমিকেরা

ঢাকা শহরে ‘৯৫ শতাংশ বাস গ্যাসচালিত’ এমন তথ্য মানছেন না ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটি একটা কাল্পনিক নিউজ। কিসের ভিত্তিতে এই নিউজ করেছে জানি না। ঢাকা শহরে গ্যাসচালিত ম্যাক্সিমাম ৫০০ গাড়ি থাকতে পারে। ঢাকায় ৯৫ শতাংশ গাড়ি ডিজেলে চলে।’

তিনি বলেন, ‘আজ থেকে ৮-১০ বছর আগে বিআরটিএর কাছে গ্যাসের গাড়ির তথ্য ছিল, পরে বেশির ভাগ বাস ডিজেলে চলে আসে। এর পরে তাদের কাছে আর তথ্য নেই। যারা ৯৫ শতাংশের কথা বলছে তারা পুরোনো রেকর্ড নিয়ে কথা বলছে।’

বাস কেন সিএনজি থেকে ডিজেলে আসে-যায়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আট থেকে ১০ বছর আগে মানুষ গ্যাসের গাড়ির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন তেলের থেকে গ্যাস বেশি সাশ্রয়ী ছিল। পরে দেখা গেল, গ্যাসের গাড়ি ছয় মাসও টেকে না, ছয় মাস পরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। তখন অনেকেই গ্যাসের গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে, অনেকে গ্যাস থেকে তেলে চলে এসেছে।’

ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যার তথ্য মালিক সমিতির কাছে আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে চেক করা শুরু করেছি। এ বিষয়ে গতকালও (সোমবার) মিটিং ডাকা হয়েছিল। ঢাকা শহর এবং শহরতলিত ছয় হাজার বাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০০ বাস গ্যাসে থাকতে পারে। এর বেশ কিছু ঢাকা হয়ে ঢাকার আশপাশে যায়।

‘শুধু ঢাকার ভেতরে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার বাস হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও নাই। এই কাজ চলছে। ৯০ শতাংশ কাজ এগিয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পরে সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।’

তেলের ও গ্যাসের গাড়ির সুবিধা-অসুবিধা জানতে চাইলে শিকড় পরিবহনের চালক আফির উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গ্যাসে বাস চালালে ছয় মাস পরপর ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। গ্যাস তো শুকনা জিনিস, তাই ইঞ্জিন ডাউন হয়। গ্যাসের গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে সহজে স্টার্ট করা যায় না। তেলের গাড়ি সহজে স্টার্ট করা যায়। এ ছাড়া হঠাৎ করে গ্যাস ফুরিয়ে গেলে ওই গাড়ি গ্যারেজে আনা যায় না। সব জায়গায় গ্যাসও পাওয়া যায় না, ফলে গাড়ি টেনে আনতে হয়।’

প্রজাপতি পরিবহনের চালক, মো. আজিজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গাড়ির জন্মই তেলে চলার জন্য। আমরা তারে মডিফাই করে গ্যাসের গাড়ি বানাই। ১৫ সালের পরের মডেলের বাস সব তেলের। এর আগে গ্যাসের কম দাম ছিল তাই মানুষ গ্যাসে গাড়ি চালাইছে। গ্যাস শুকনা বলে গাড়ির ক্ষতি হয়। যখন মানুষ বুঝতে পারছে গ্যাসে চালালে গাড়ির ইঞ্জিন দুই দিন পরপর নষ্ট হয়, তখন আবার তেলে চলে আসছে। এখন ঢাকার প্রায় সব গাড়ি তেলে চলে। ঢাকার বাইরে কিছু গাড়ি গ্যাসে চলে।’

রজনীগন্ধা বাসের চালক বাকের মিয়া বলেন, ‘ইঞ্জিন ভালো থাকে তেলে। তা ছাড়া মাইলের হিসাব করলে তেল আর গ্যাসের দামে আহামরি তেমন পার্থক্য হয় না। তাই সেধে কেউ আর গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট করে না।’

আরও পড়ুন:
ভুয়া ভিডিও ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: র‍্যাব
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান, প্রধানমন্ত্রীকে জাফরুল্লাহ
সাম্প্রদায়িক হামলা: সরকারকে আরও সময় দিল ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 
পীরগঞ্জে সহিংসতার তদন্তে মানবাধিকার কমিশন

শেয়ার করুন